রাঙ্গামাটি থেকে ইন্জিন নৌকোয় রওয়ানা হয়ে এখানে পৌঁছুতে ঘন্টাখানিকের মতো লাগল। শীতের সময়, এর মাঝে টিপ টিপ বৃষ্টির সাথে দমকা বাতাস। শীতে আমাদের অবস্থা শোচনীয়। জার্মানরা বলে, খারাপ আবহাওয়া বলতে কিছুই নেই, শুধুমাত্র আছে আবহাওয়া অনুপোযোগী পোষাক। বহু বছর জার্মানীতে থেকেও এই নিয়মটি আয়ত্ব করে উঠতে পারিনি, আর বাংলাদেশে এসে যে শীতে ভোগার মতো কারণ ঘটতে পারে, সেটাই বা ভাবে কে। সুতরাং শীতে জুবুথুবু। সবাই মিলে গান ধরে শীত তাড়ানোর চেষ্টা করলাম, কিন্তু একসময় গলার আওয়াজও ততটা সবল রইল না। কিন্তু ভেতরের আনন্দ রইল সারাক্ষনই, আর তাতেই রক্ষা।
অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য চারপাশে। পাহাড়ের কোল ঘেষে ঘেষে জলের অফুরন্ত আনন্দখেলা। মাঝে মাঝে মনে হয়, জল এখানেই শেষ। কিন্তু একটু বাঁক ঘুরেই আবার জল। সভ্যতার দান হলেও সভ্যতা যেন থেমে আছে এখানে। এতটা স্পর্শবিবর্জিত সৌন্দর্য দেশের বাইরেও আর কোথাও দেখেছি বলে মনে হয়না। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে যে নিদারুন করুন কাহিনী লুকিয়ে আছে, তার কথাও মনে হয় বারবার। ১৯৬০/৬২ সালে কাপ্তাই বাঁধ তৈরীর ফলেই ডুবে যায় পুরো এলাকা। সে বাঁধ আমাদেরকে সভ্যতার আমোঘ নিদর্শন ‘বিদ্যুত’ এনে দিলেও হাজার হাজার উপজাতীয়দেরকে তাদের ঘরবাড়ী ছেড়ে পাহাড়ের উপরে আশ্রয় নিতে হয়। আমরা আজ যেখানে আমরা আমাদের প্রমোদতরী নিয়ে আনন্দে মত্ত, তার নীচেই তলিয়ে আছে হাজার হাজার মানুষের জীবনধারণের রসদপত্র। এখানেই তারা জমি চাষ করতো, ফসল ফলাতো। এখন অভুক্ত, আধাপেটে দিন কাটাতে হচ্ছে তাদের।
সভ্যতা যেমনি গড়ে, যেমনি আমাদের প্রতিদিনের আরাম আয়েশকে সহজভোগ্য করে, তেমনি গ্রাসও করে, তেমনি কেড়ে নেয় অনেক অসহায় মানুষের সামান্য আহার। তার শাস্তি হিসেবে পেদা টিং টিং এ খাবার পর সামান্য পেট খারাপ হয়েছিল আমাদের। কিন্তু এই শাস্তি কি যথেষ্ট? আমার তা মনে হয়না। হয়তো কোনদিন প্রকৃতিই ওদের হয়ে নেবে প্রতিশোধ, যেমন আরো অনেক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি একবার সুনামী নিয়েছিল।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা মার্চ, ২০০৮ রাত ১২:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


