পূর্বের পর ...
ওযু (২য় ভাগ)
রাসূল (স.) যেভাবে ওযু করতেন (১ম কিস্তি)
(১) রাসূল (স.) অধিকাংশ সালাতেই নতুন ওযু করে নিতেন। কখনও এক ওযুতে কয়েক ওয়াক্ত সালাত পড়তেন। {বুখারী, ইফা ১ম খন্ড, হা/১৯০}
(২) কখনও তিনি এক 'মুদ' (প্রায় এক সের) পানি দিয়ে ওযু করতেন। {বুখারী, ইফা ১ম খন্ড, হা/২০১} ওযু করতে গিয়ে ভালভাবে পানি ব্যবহার করতেন। তিনি উম্মতদের পানি খরচের ব্যাপারে অপব্যয় থেকে বাঁচতে বলেছেন। একবার তিনি সাদ (রা.) এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি তখন ওযু করছিলেন। রাসূল (স.) বললেন, "পানির অপব্যয় করো না।" তিনি জবাব দিলেন, পানিতেও অপব্যয় হয়? রাসূল (স.) জবাব দিলেন, "হ্যাঁ, তুমি যদি একটা প্রবাহিত নদীর তীরে বসেও ওযু কর, তথাপি হয়।"
(৩) রাসূল (স.) অবস্থা ভেদে একবার করে, দুবার করে এবং তিনবার করে অঙ্গ ধুতেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি একই ওযুতে কোন অঙ্গ দুবার এবং কোন অঙ্গ তিনবার ধুয়েছেন। তবে ওযুতে রাসূল (স.) কোন অঙ্গ তিনবারের বেশী ধুয়েছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না।
(৪) রাসূল (স.) কখনও এক আঁজল পানি দিয়ে কুলি ও নাকে পানি দুটোই সারতেন। এক আঁজল পানি থেকে অর্ধেক দিয়ে কুলি করতেন ও বাকী অর্ধেক দিতেন নাকে, কিন্তু কুলি ও নাকে পানি আলাদা ভাবে করেছেন, তা কোন সহীহ হাদীসে পাওয়া যায় না। {বুখারী, ইফা ১ম খন্ড, হা/১৯০}
(৫) রাসূল (স.) ডান হাতে নাকে পানি দিতেন ও বাম হাতে পরিস্কার করতেন এবং পুরো মাথা মুছতেন। কখনও সামনে থেকে মুছে পিছনে আবার পিছন থেকে সামনে হাত নিতেন।
দ্রষ্টব্যঃ এ থেকেই কেউ দু'বার মাথা মুছার কথা বলেন। উপরে বর্ণিত হাদীস থেকে দেখা যায় যে, রাসূল (স.) অন্যান্য অঙ্গ তিনবার ধুতেন, কিন্তু মাথা একবারই মুছতেন। আল্লামা হাফিজ ইবনে কাইয়িম তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ 'যাদুল মাআদ', প্রথম খন্ডের দ্বিতীয় অধ্যায়ে হযরতের পবিত্রতা অর্জন পদ্ধতি বর্ণনা করতে যেয়ে উল্লেখ করেছেন, "এ থেকেই কেউ দুবার মুছার কথা বলেন। তবে একবারই সঠিক। অন্যান্য অঙ্গ তিনবার ধুতেন এবং মাথা একবারই মুছতেন। হযরত (স.) থেকে এটাই সুস্পষ্ট প্রমাণিত। এর ব্যতিক্রম যা কিছু পাওয়া যায় তা সহীহ নয়। উসমান ও ইবনুল ইয়ামানীর হাদীসে তিনবার যে মুছার বর্ণনা রয়েছে তা ভুল বর্ণনা। আবু দাউদ বলেন, উসমান (রা.) থেকে বর্ণিত সহীহ হাদীসে একবার মুছাই রয়েছে। কোন সহীহ হাদীসে হযরতের (স.) আংশিক মুছার প্রমাণ নেই। ... ... ... কুলি ও নাকে পানি ছাড়া তিনি কখনও ওযু করেছেন বলে প্রমাণ নেই। তেমনি তিনি ওযুতে ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছেন। তার বিপরীত কখনও কেউ তাঁকে করতে দেখেনি।"
আল্লামা হাফিজ ইবনুল কাইয়িম রচিত ও আবদুস শহীদ নাসিম কর্তৃক বাংলায় অনূদিত 'আল্লাহর রসূল কিভাবে নামায পড়তেন' শীর্ষক পুস্তকের ২০ পৃষ্ঠায় মাথা মাসেহ সম্বন্ধে নিম্নরূপ উল্লেখ রয়েছেঃ
"তিনি পুরো মাথা মাসেহ করতেন। কপালের দিক থেকে আরম্ভ করে পিছনের দিকে আবার পিছনের দিক থেকে সামনের দিকে মাসেহ করতেন। এরকম করার কারণে কেউ কেউ বর্ণনা করেছেন, তিনি দু'বার মাসেহ করতেন। আসলে তিনি মাথা একবারই মাসেহ করতেন। অন্যান্য অঙ্গ একাধিকবার ধুতেন, কিন্তু মাথা একবারই মাসেহ করতেন। একথাই অকাট্যভাবে প্রমাণিত, এর ব্যতিক্রম কথা সহীহ নয়। ইবনুল ইয়ামানী তার পিতার সূত্রে হযরত উমার (রা.) থেকে তিনবার মাসেহ করার যে হাদীস বর্ণনা করেছেন, তা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ তারা বাপ-বেটা দু'জনই জঈফ বর্ণনাকারী, যদিও বাপের অবস্থা কিছুটা ভাল।
আবু দাউদে হযরত উসমান (রা.)-এর সূত্রে তিনবার মাসেহ করার যে বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে, সেটি হযরত উসমান (রা.) থেকে বর্ণিত সমস্ত সহীহ হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক। তার থেকে বর্ণিত বিভিন্ন সহীহ হাদীসে একবার মাসেহ করার কথাই উল্লেখ হয়েছে।"
মোহাম্মদ মতিউর রহমান মোহাম্মাদী সালাফী কর্তৃক সঙ্কলিত 'তরীকায়ে মোহাম্মদীয়া', শীর্ষক পুস্তকের প্রথম খন্ডে মাথা মাসেহ করা প্রসঙ্গে উল্লেখ করে এক জায়গায় লিখেছেন, "... ... ... আর ইমাম বুখারী স্বীয় বুখারীর ১ম খন্ডের ৩১ পৃষ্ঠায় বলিয়াছেন যে, ইমাম মালিক (র.)-কে কেহ জিজ্ঞাসা করিয়াছিল, মাথার কিছু অংশ মাসেহ করিলে যথেষ্ট বা জায়েয হইবে কি? তাহাতে তিনি আবদুল্লাহ বিন যায়েদ (রা.)-এর হাদীস হইতে প্রমাণ উদ্ধৃত করিয়া বলিলেন যে, সমস্ত মাথা মাসেহ করিতে হইবে।" ইমাম বুখারী (র.)-ও উপরোক্ত হাদীস এবং আয়াত উল্লেখ করিয়াছেন। আমরা তাহার কিছু অংশ উদ্ধৃত করিয়া তরজমা করিয়া দিতেছিঃ
তরজমাঃ "তারপর দুই হস্ত দ্বারা (হযরত) স্বীয় মাথা মাসেহ করিলেন। অতঃপর হস্তদ্বয় সামনের দিক হইতে পশ্চাদ্দিকে লইয়া গেলেন। মাথার সামনের দিক হইতে আরম্ভ করিয়া স্বীয় গর্দান পর্যন্ত লইয়া গিয়া সেখান হইতে পুনরায় যেখান হইতে আরম্ভ করিয়াছিলেন সেইখানে হস্তদ্বয় ফিরাইয়া আনিলেন।"
অতএব সমস্ত মাথাই মাসেহ করিতে হইবে নতুবা ফরয আদায় হইবে না।"
অন্যদিকে রাসূল (স.) থেকে তিন বার মাথা মাসেহ করারও উল্লেখ পাওয়া যায়। এ সম্বন্ধে আলোচনা নিম্নরূপঃ
আলবানী বলেন, "উসমান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (স.) মাথা তিনবার মাসেহ করেছেন। হাদীসটি আবু দাউদ দু'টি হাসান সনদে বর্ণনা করেছেন। অত্র হাদীসের তৃতীয় আরেকটি হাসান সনদ রয়েছে। আমি এই সনদগুলির চুলচেরা আলোচনা করেছি সহীহ আবু দাউদে হা/৯৫, ৯৮।" হাফেয ইবনে হাজার 'ফাতহুল বারী'তে বলেন, "আবু দাউদ হাদীসটিকে দু'টি সনদে (সূত্রে) বর্ণনা করেছেন, যার একটি সূত্রকে ইমাম ইবনে খুযায়মাহ প্রমুখ সহীহ বলেছেন অর্থাৎ উসমান (রা.)-এর হাদীস যেখানে তিনবার মাথা মাসেহ করার কথা আছে। এই হাদীসের বাড়তি মাথা মাসেহ এর কথা যেহেতু নির্ভরযোগ্য। হাফেজ ইবনে হাজার 'তালখীছুল হাবীর' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, "ইবনুল জাওযী একের অধিকবার মাথা মাসেহ করাকে বিশুদ্ধ বলার দিকে ঝোঁক দিয়েছেন। আর এটাই হক কথা। কারণ উভয় প্রকার হাদীসে মূলতঃ কোন প্রকার দ্বন্দ্ব নেই কারণ সুন্নাত কাজ কোন সময় করা হয়, কোন সময় করা হয় না।" ইমাম সানআনীও তিনবার মাথা মাসেহ করার পক্ষে রায় দিয়েছেন। (তথ্য সূত্রঃ তামামুল মিন্নাহ)। ইমাম শাফেয়ী বহুপূর্বেই তিনবার মাথা মাসেহ করাকে মুস্তাহাব বলেছেন।
ইনশাল্লাহ চলবে ...
* ইফা = ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হা = হাদীস
** মুহাম্মদ আবু হেনা সংকলিত ও আকরামুজ্জামান বিন আব্দুস সালাম সম্পাদিত "আমার নামায কি শুদ্ধ হচ্ছে!" গ্রন্থ থেকে মুমিন ভাই-বোনদের উপকারার্থে এখানে প্রকাশিত হলো। উপরোক্ত লেখার কোনো অংশের কোনো কৃতিত্বের দাবীদার এ ব্লগ লেখক নয়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

