somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বল্লার পাল্লায়

২১ শে নভেম্বর, ২০১০ বিকাল ৪:০৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

‘শব্দ আর আলোর গতি’ সম্বলিত তত্ত্ব বহু আগেই আবিষ্কৃত হয়ে গেছে। কিন্তু আজ এতকাল পরে এসে একটি অখ্যাত গেঁয়ো বল্লা– মানে বোলতা, সেই পুরনো তত্ত্বটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। ঘটনা ঘটেছে একটি ঢেউটিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে। কারখানার পাশেই অফিস। অফিসটি আধুনিক সজ্জায় সজ্জিত। অপু এই কোম্পানিতে বছর খানেক হল চাকরি করছে। সকাল ন’টায় কনফারেন্স রুমে পূর্ব নির্ধারিত একটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিং শুরু হয়েছে। কিন্তু অপুর মনটা বড় অশান্ত হয়ে আছে। সেই অশান্ত মনকে শান্ত করার জন্যে তাকে বিরতি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। ঘটনার শুরু সেখানেই।
দ্রুত হেঁটে জিপার খুলতে খুলতেই ইউরিনালের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে অপু। টয়লেটটি মোটামুটি বড়। ভিতরে তিনটি ছোট-ছোট সাব-টয়লেট। দুটিতে হাই কমোড, আর একটি নরমাল। এছাড়া বুক সমান পার্টিশান দেয়া কয়েকটি ‘দাঁড়িয়ে টয়লেট সাড়া’র ব্যবস্থা রয়েছে।
অনেক্ষণ হল অপুর ছোট বাথরুম পেয়েছে। কিন্তু অবস্থা এমন ছিল যে, মিটিঙের মাঝখানে উঠে আসা কোনভাবেই সম্ভব ছিলনা। আজকের মিটিংটি অপুর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইন্টারনাল অডিট রিপোর্টে কোম্পানীর যেসকল ত্রুটিবিচ্যুতি ধরা পড়েছে, সেসব ভুলচুক নিরসনে ম্যানেজমেন্টকে সে তার সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন প্রদান করবে আজ। তার ‘পরামর্শে’ ম্যানেজমেন্ট সন্তুষ্ট হলে অনেকদূর এগিয়ে যাবে সে। মিটিঙে পনের মিনিটের বিরতি হতেই অপু আর দেরী করেনি; ছুটে গেছে টয়লেটে। সোজা ইউরিনালের সামনে। তারপর, তারপর দু’চোখ মুদে সে অনুভব করা শুরু করতে চেয়েছিল ‘কি আনন্দ ত্যাগে!’ কিন্তু তা আর হল কই?
কর্ম সাড়ার শুরুতে অপুর মুখ দিয়ে বের হয়ে আসার কথা আরামদায়ক শিৎকার ধ্বনি - ‘আহ্’। কিন্তু নাহ্, তার পরিবর্তে বের হয়ে এল কঠিন এক আর্তনাদ। তবে অত্যন্ত চাপাস্বরে, গোঙ্গানির মত গগনবিদারী চিৎকার। শব্দও যে শব্দহীন হতে পারে, এই প্রথম বুঝতে পারল সে।
অপু একজন দায়িত্বশীল অফিসার। টয়লেট হলেও এটি যে অফিস, তা তার অবচেতনে কাজ করছিল। আবার টয়লেটের ভিতরের ছোট্ট টয়লেটগুলোতে সিনিয়ররা কেউ থাকতে পারেন তা-ও মাথায় ছিল তার। অতঃপর সময়ের এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে যা ঘটে গেছে তা হর্ষক নাকি লোমহর্ষক সেই বিবেচনা পরে করা যাবে, আপাতত অপু'র ব্যাথায় সমব্যাথি হওয়ার ইচ্ছে না জাগলেও অন্তত ব্যাথার কারণ সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক।
সময়টা ছিল সকাল। টয়লেট তখনও অব্যবহৃত। প্রতিদিন বিকেল ছ’টায় অফিস শেষ হয়। তখন প্রৌঢ় একটি লোক এসে টয়লেট পরিষ্কার করে জায়গায় জায়গায় ন্যাপথলিন ছড়িয়ে দিয়ে যায়।
সারারাতের অব্যবহারে সকালের টয়লেটটা ছিল শুষ্ক খটখটে-পরিষ্কার। দলছুট একটি বোলতা বেখেয়ালে টয়লেটে ঢুকে পড়েছিল সিসিটিভি ক্যামেরার চোখ ফাঁকি দিয়ে। বোলতাটি যে অফিসের ভিতর দিয়েই ঢুকেছিল, তা এখানে উল্লেখ না করলেও চলত। ‘অফিসের টয়লেটে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকাটা অসভ্যতার পর্যায়ে পড়ে (তাও ইউরিনালের উপর!)’ - একথা নিশ্চয় সবাই স্বীকার করবেন।
যাক, যা বলছিলাম, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন দেখে বোলতাটি স্থান করে নিয়েছিল ইউরিনালের ফুটো-ফুটো জায়গাটির ঠিক উপরে। সৌভাগ্য তার, সেদিন সেখানে কোন ন্যাপথলিন দেয়া ছিল না। নীচ হতে হয়তো ফিনফিনে হাওয়া বইছিল উপর দিকে। নইলে অছ্যুত ওই জায়গায় কেন সে বড় আরামে বসেছিল চুপটি করে? আর অতি আরামের সময়ে কিঞ্চিত ব্যাঘাত ঘটলে, তা কি মুখ বুঁজে সইতে পারে কেউ? নিশ্চয় সে তার প্রতিক্রিয়া কোন না কোনভাবে জানান দেয়।
আজকের আলোচিত বোলতাটি দেখতে অন্যান্য বোলতার মতই, বেশ সুন্দর। কালো-হলুদের অপূর্ব কালার কম্বিনেশন। তাই বলে তার সবকিছু্ই যে সুন্দর, এমনটি ভাবাটা মোটেই ঠিক হবে না। বিশেষ করে ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রতিক্রিয়াটি। তা-ও যে সে প্রতিক্রিয়া নয়, রীতিমত নিউটনের তৃতীয় সূত্রের চাইতেও এক কাঠি উপরে।
আরামে দীর্ঘ সময় পার করে তখন বোলতাটি সবে আড়মোড়া ভাঙ্গার পাঁয়তারা করছিল। ঠিক সেই সময়ে লবণাক্ত গরম পানির ছোঁয়া তার ভিতর প্রচণ্ড বিরক্তির উদ্রেক করে। সে দিগ্বিদিকজ্ঞানশূণ্য হয়ে যেদিকে পেরেছে ছুটে গেছে। তাৎক্ষণিকভাবে তার মাঝে একটি আক্রোশ মিশ্রিত খায়েশ জেগেছিল; যাতে সামনে সে এমন কিছু পায় যাকে কামড়ে সুখ পাওয়া যাবে। এখানেও তার কি সৌভাগ্য! খায়েশ পূরণ হয়েছে সাথে সাথে। বোলতার বিষদন্তে ধরা পড়েছিল নরম-সরম কিছু একটা।
বিচিত্র মানুষের মন। চরম দুঃখেও হারানো সুখের স্মৃতি এসে ধরা দেয়। আবার সুখের সময় হানা দেয় দুঃখের কোন স্মৃতি। তেমনি অতি অকষ্মাৎ সৃষ্টি হওয়া আজকের এই বেদনাদায়ক মুহূর্তটিতে, একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব সম্পর্কে সন্দেহের উদয় হয়েছিল অপুর মনের গভীরে। তার মনে হল, ‘শব্দের চেয়ে আলোর গতি বেশী’ তত্ত্বটি ভুল। বিদ্যুৎ চমকালে আমরা আলো দেখতে পাই আগে, পরে শব্দ শুনি। অর্থাৎ, ঘটনা ঘটল – দেখলাম – তারপর শুনলাম। কিন্তু এক্ষেত্রে ঘটেছে উল্টো। বোলতার দংশনের সাথে সাথে উৎসস্থলে চোখ যাবার আগে অপুর মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছিল মুখবন্ধ এক গুমোট আর্তনাদ। তারমানে ঘটনা ঘটল – শুনলাম – তারপর দেখলাম। তবে যা সে দেখল তা না দেখলেই হয়তো ভাল ছিল তার জন্যে।
ভাগ্যিস সেসময় টয়লেটে কেউ ছিল না। অপু তীব্র যাতনায় লাফাতে লাগল পাগলের মত। বোলতা তার কাজ সেড়ে কখন যে সটকে পড়েছে কেউ জানে না। ক্যামেরার জানা-না জানার কথা এখানে ফের নাইবা টানলাম। পাখী যেমন উড়ে যায় রেখে যায় পালক, তেমনি বোলতাটিও উড়ে গেছে। তবে পালক রেখে যায়নি, রেখে গেছে স্মৃতি। কি স্মৃতি? ‘বুঝিবে কি কেউ? কভু আশিবিষে দংশেনি যারে?’
অপু বুঝতেই পারল না কে-কিভাবে-কেমন করে হৃদয় না খুঁড়েও বেদনা জাগিয়ে চলে গেছে কোনফাঁকে? বোলতা ব্যাটা দেখাই দিল না অপুকে, কাজ শেষ করেই ফুরুৎ। এদিকে দংশিতাংশ দেখার পর অপুর চোখের অবস্থা কাহিল। ছানাবড়া বললেও ভুল বলা হবে। চোখ যেন কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। এতকালের চিরচেনা আদরের ছোট্টভাইটিকে বড্ড অচেনা ঠেকল তার কাছে। ‘মস্তিষ্ক’ বিকৃতি ঘটে গেছে ভাইয়ের, মুহূর্তেই ফুলে ঢোল। এই বিভৎস দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে থাকা অপুর চোখের পক্ষে সম্ভব ছিল না কোনভাবেই। সাথে সাথে দু’চোখ বন্ধ করল সে। অনুজকেও আতংকে জিপারবন্দী করল তড়িৎ (ভিতরঘরে পূর্বের চাইতে বর্তমানে জায়গার কিছুটা অভাব দেখা দিয়েছে, ব্যাপারটা এখানে না জানালেও চলে)। সহসা হাজারো প্রশ্ন ভীর করল তার মনে।
কি করবে এখন বুঝতে পারছে না সে? এমডি সাহেবকে বলে ছুটি নিয়ে চলে যাবে? কিন্তু এমডি যদি জানতে চান, কি সমস্যা? কি বলবে উত্তরে? নাকি কাউকে কিছু না বলে এক্ষুনি ছুটে যাবে ডাক্তারের কাছে? কিন্তু ডাক্তারের কাছে যাওয়ার পর? তিনি যদি জিজ্ঞেস করেন, কি করে কি হল? হায় খোদা, এই অসময়ে কোন পাপের শাস্তি দিলে তুমি? সবচেয়ে ভাল হয় বাসায় চলে গেলে। না-না-না-না, বাসায় যাবার তো প্রশ্নই ওঠে না। বাসায় তার সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী। এ অবস্থার কি জবাব দেবে সে তার সোহাগীকে? অপুর চোখে জল। কিসের যাতনায় জল ঠিক বোঝা গেল না, ইন্দ্রিয়ের নাকি অতিন্দ্রিয়ের?
অপুর চেহারায় স্পষ্ট বেদনার ছাপ। পিয়ন তাকে খুঁজতে খুঁজতে টয়লেটে চলে এসেছে। মিটিং ফের শুরু হয়েছে, এমডি সাহেব নাকি ডাকছেন। চাকরি-প্রজেক্ট-ইনক্রিমেন্ট-প্রমোশন কিছুই তখন কাজ করছে না তার মাথায়। নানাবিধ চিন্তায় অস্থির অপুর মাথায় ব্যাথা শুর হল প্রচণ্ড। ওপরে ব্যাথা, নীচেও ব্যাথা। ওপর-নীচের চাপ বুঝি আর সইতে পারলো না অপু। পার্থিব-অপার্থিব নানাবিধ চিন্তা পরে করা যাবে- এই জ্ঞান করে জ্ঞান হারিয়ে ‘ভাইরে- ’ বলে ঢলে পড়ল পিয়নের কাঁধে।
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×