somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... বিয়ে
কাল থেকে আবার এগারতম বছরটি শুরু হবে। বাবারে..

শুরু করেছিলাম দু’জন মিলে, সংখ্যাটা এখন চার। তার মানে কি এই; পরবর্তী দশ বছর দু’জনে বহাল তবিয়তে বেঁচে থাকলে — ‘ঐকিক নিয়ম’ তার তত্ব প্রমাণে সচেষ্ট হয়ে উঠবে, আরো দু’জনের আবির্ভাব হবে? নাহ্.. আমার মোটেই মনে হচ্ছে না। দেশে যে আকাল চলছে! মানুষের পাঁচটি মৌলিক অধিকারের প্রথমটি মেটাতেই নাভিশ্বাস উঠছে বেশিরভাগ হতভাগার। তার মানে কি এই; ‘ঐকিক নিয়ম’ অংকটা ভুল?

আহা! ছোট বেলাকার কথা মনে পড়ে যায়। যে অংকটি শেখাতে গিয়ে মাস্টার মশাইকে কত কষ্ট করেই না তাঁর দু-দু’টি ‘ব’ খরচা করতে হয়েছিল; বেত আর বল।

বিবাহ বার্ষিকীতে হঠাৎ ‘ঐকিক নিয়ম’ এর কথা মনে পড়ল কেন? কি জানি বাবা! মানুষের মন, বোঝা বড় দায়!

যা হোক, কথা যখন উঠলোই, শেষ করি সেই অংকের প্রসঙ্গ টেনেই।

আপনারা সুধিজনেরা কি বলেন? এই আপাত অযৌক্তিক ‘ঐকিক’টা বাতিল করা উচিত নয়কি?
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29483202 http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29483202 2011-11-14 17:56:13
মঞ্চনাটক http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29466482 http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29466482 2011-10-15 12:37:23 কলরব (অনুগল্প)
হাঁটতে হাঁটতে পাড়ার দু’এক বাড়ী পরের সর্দারনির কর্কশ কণ্ঠস্বর শোনা গেল। ‘মাঙ্গির পো শুক্কুইর্র্যার মায়রে বাপ্, নগদ তিরিশ হাজার টাকা লইয়া তিন দিন আগে এক ছুরিরে আয়ন্ন্যা দিসে আমারে। ছুরি খালি কান্দে। অ ছুরি তুই কান্দস্ ক্যান, তিন দিনেও বুঝবার পারস্ নাই কই আয়া পড়সস্? এইহানে পেত্যেক রাইতে তর নয়া নয়া লাঙ্গ আইবো, তাগোরে খাওন দেওন লাগবো। হেরা এহানে আহে খালি গোস্ত খাইতে, মাইয়া মাইনষের গোস্ত তাগো বড় পছন। তুই ভাবসস্ তারা এহানে তর কান্দন হুনবার আহে? কালহা কত্ত দামী এক খদ্দের আইলো আহা.. পরে কান্দন হুইনা তর ঘরতুন বাড়ায়া অন্য ঘরে চইলা গেল, দেহস্ নাই? ফের যদি দেহি কান্দস্, তরে আমি ওই চাম উঠা কুত্তারে দিয়া... ’। আরো অনেক খেউর চলছিল। না শোনার ভান করে দ্রুত হেঁটে পাড়ার প্রায় শেষ প্রান্তে চলে এসেছে হীরণ।

হীরণ হঠাৎ দেখতে পায়, সামনে হাতেগোনা ক’জন মানুষ পালকি কাঁধে হেঁটে আসছে টুপি মাথায়। চেহারাগুলো প্রায় চেনা, সব এপাড়ারই বাসিন্দা। মনে পড়ল তার, গতরাতে বাড়ী ফেরার সময় বাস স্ট্যান্ডে কয়েকজন বলাবলি করছিল; গতকাল রাতে নাকি এপাড়ার এক বয়োজ্যেষ্ঠার মৃত্যু হয়েছে। মাথা নীচু করে এক পাশে সরে দাঁড়াল হীরণ। দলটি তাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। তাদের মুখে মুখে রব উঠেছে সরব হয়ে, ‘আল্লাহু রাব্বি – মোহাম্মদ নবী, আল্লাহু রাব্বি – মোহাম্মদ নবী, আল্লাহু রাব্বি – মোহাম্মদ নবী..’। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29459399 http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29459399 2011-10-03 16:19:24
টান
এমন কোন ঘটনার কথা তার মনে নেই, যা তিনি স্ত্রী’র কাছে গোপন করেন। কিন্তু এই টানের ব্যাপারটা কেমন যেন, স্ত্রীকে বলতে কোথায় যেন বাঁধছে। ডাক্তারের কাছে যাবার প্রস্তুতি প্রায় নিয়ে ফেলেছিলেন ইসহাক সাহেব। কিন্তু উনি বুঝতে পারছেন না বিষয়টা কি ভাবে ডাক্তারকে ব্যাখ্যা করবেন। শেষমেষ ডাক্তারের কাছে যাবার চিন্তা বাদ দিয়েছেন। কয়েকদিন নিজের মনের সাথে যুদ্ধে করে পরাস্ত হয়ে তারপর স্ত্রীকে বিষয়টি বলার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি।

একদিন সন্ধ্যায় ইসহাক সাহেব ড্রইং রুমের সাদাকালো টিভির সামনে বসে খবর শুনছিলেন। তাঁর স্ত্রী রান্না ঘরে, চা করছিলেন। ইসহাক সাহেব ধীরে ধীরে উঠে রান্না ঘরের দিকে এগুলেন। কোন ভনিতা না করে স্ত্রীকে বললেন, ‘মিতু শোন, আমার কিছুদিন ধরে..।’ স্ত্রী ইসহাক সাহেবের দিকে প্রশ্ন নিয়ে তাকালেন, ‘কি?’ ইসহাক সাহেবের গলা কেঁপে উঠল, ‘ইয়ে.. কিছুদিন ধরে, ম্‌ম্‌ম্‌ কিছুদিন ধরে..’ তার দৃষ্টি দুধের টিনে আটকে গেল। একটু দম নিয়ে এক নিশ্বাসে বলে ফেললেন, ‘এই কিছুদিন ধরে আমার আর দুধ চা খেতে ইচ্ছে করছে না।’ স্ত্রী অবাক হয়ে গেলেন। যে মানুষ দুধ চা’র জন্যে পাগল, এক বসাতে কয়েক কাপ চা পান করে ফেলেন উনি কিনা...। তিনি স্বামীকে বললেন, ‘চা তো বানিয়ে ফেলেছি, আচ্ছা তুমি ড্রইং রুমে গিয়ে বসো আমি রং চা করে আনছি।’ ইসহাক সাহেব গোমরা মুখে ফিরে এলেন। যাস্‌স্ ‌সালা কি বলতে কি বলে ফেলেছেন। এখন হাসি মুখে চিরতার রস গিলতে হবে।

তিনি ড্রইং রুমে না গিয়ে বেড রুমে ঢুকলেন। শার্ট পড়াই ছিল, তাড়াতাড়ি প্যন্টটা পড়ে কাউকে কিছু না বলে বের হয়ে গেলেন। রাস্তায় বের হয়ে উদ্দেশ্যহীন ভাবে হাঁটতে শুরু করলেন। তার স্ত্রী চা নিয়ে ড্রইং রুমে এসে দেখলেন টিভি চলছে। দর্শক হিসেবে সোফায় বসে আছে চার পাঁচটি সুসজ্জিত কুশন। ড্রইং রুম, বাথরুম, বেডরুম কোথাও স্বামীকে না দেখে তিনি মোবাইলে ফোন করলেন। এবং একটু পরেই ভ্রু কোঁচকালেন। ভ্রমরের ডাক শোনা যায় কোত্থেকে? দেখতে পেলেন, স্বামীর মোবইলটি ড্রেসিং টেবিলের উপর ভাইব্রেট হচ্ছে, রিংগিং টোন বন্ধ।

ইসহাক সাহেব ফুটপাত ধরে হাঁটছিলেন। ফুটপাতের সাথে লাগোয়া যত্নহীন পার্ক। মেয়ের কথা মনে পড়ল আবার। ওর শ্বশুর বাড়ীর লোকেরা খুবই ভাল। বিয়েতে তিনি তেমন কিছু দিতে না পারলেও তাদের কোন অভিযোগ নেই। শুধু জামাই বাবাজির বিধবা বোনটি নাকি নানান বিষয়ে আড়েঠাড়ে খোঁটা দেয়। শশুর মশাইও মাঝে মাঝে মেয়ের পক্ষ নেন। নিবেনইতো, মেয়ে বলে কথা। তবে শাশুড়িটা নাকি সবসময় নীতুর পক্ষে থাকেন, মেয়েকে মোটেই পাত্তা দেন না। ওই বাসায় একজন মাঝবয়সী পুরনো লোক আছে। দশ বারো বছর বয়সে নাকি লোকটা সেখানে এসেছিল। জামাই বাবাজীর দাদার বাড়ীর লোক। এসব কথা তার কাছ থেকেই শোনা। ইসহাক সাহেব হঠাৎ পেছন দিক থেকে আলতো করে হেঁচকা টান অনুভব করলেন। চমকে উঠে সাথে সাথে পেছন ফিরে তাকালেন, নাহ্ কেউ নেই। পা-টা টলে উঠল নাকি? বাসায় চিন্তিত বউয়ের চিন্তা তার মনে একটুও রেখাপাত করছিল না। কারণ তিনি নিজেই তখন ডুবে গেছেন গভীর চিন্তায়। কে টানে তাকে?

ইসহাক সাহেব হাঁটতে হাঁটতে দেখতে পেলেন চার পাঁচ গজ সামনে ফুটপাত ঘেঁষে একটা সিমেন্টের বেদী। তার উপর এক মাঝ বয়সী ভদ্রলোক বসে আছেন। হাতে নেভানো সিগারেট। কাছে গিয়ে দেখলেন, পাজামা পাঞ্জাবী পড়া লোকটির চোখ গুলো লালচে দেখাচ্ছে। চুলগুলি পরিপাটি করে আঁচরানো। ইসহাক সাহেব লোকটির কাছ থেকে এক্সকিউজ চেয়ে নিয়ে পাশে খালি জায়গাটায় বসলেন। লোকটি বলল, ‘ওয়ালাইকুম আস্‌সালাম’। ইসহাক সাহেব থতমত খেয়ে বললেন, ‘জি? ইয়ে.. আস্‌সালামু আলাইকুম।’ জিহ্বা দিয়ে শুকনো ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে লোকটা বলল, ‘সম স্‌ স্‌ স্যাটা কি?’ ইসহাক সাহেব ঘামতে লাগলেন। আবার নিজেকে প্রবোধ দিলেন,‘ আমি একজন সৎ - নির্ঝঞ্জাট মানুষ, আমি তার খাই না পড়ি.. ভয় পাব কেন?’ তিনি গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে বললেন,
-জি.. আমার মেয়ের বিয়ে...
-আমি কোন সাহায্য করতে পারব না।
-না না সাহায্য লাগবে না। আমার মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে প্রায় ছ’মাস। বলছিলাম মেয়ের বিয়েকে কেন্দ্র করেই সমস্যার শুরু।
-তা আমি কি করতে পারি?
-না মানে, ‘সমস্যা কি’ জানতে চাইছিলেন, তাই বলছিলাম আরকি। তাছাড়া আপনার চেহারায় একটা ‘ভাল মানুষ’ ভাব আছে... ভাবলাম সমস্যাটা আপনাকে বলা যায়..
-বাহ্‌ বেশ বেশ, তা বলুন আপনার সমস্যা.. শোনা যাক।
-ইয়ে আমি যখন হাঁটি, মাঝে মধ্যে কে যেন আমাকে টানে। কখনো পেছন থেকে কখনো বা পাশ থেকে।
-টানে মানে?
-মানে ঠিক হাত ধরে টানা নয়.. মানে কে যেন আমাকে আকর্ষন করে আরকি। কিন্তু আমি তাকে দেখতে পাই না।
-ও বুঝতে পেরেছি, সমস্যা গুরুতর। তবে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন ভাই, আপনাকে আর যেই টানুক না কেন আমি অন্তত টানি না।’

ইসহাক সাহেব ভ্যবাচেকা খেয়ে গেলেন। লোকটা চিন্তিত ভাবে নেভানো সিগারেটটা ধরালেন। ইসহাক সাহেবের নাকে গাঁজার গন্ধ এসে লাগল। তিনি তাড়াতাড়ি উঠে হনহন করে হাঁটা শুরু করলেন। পেছন থেকে লোকটার গলা শোনা গেল, ‘আরে ভাই এই জীবনে একমাত্র আপনিই বুঝতে পারছেন যে আমি একজন ভাল মানুষ, শুনে যান.. সমস্যার সমাধান শুনে যান।’ ইসহাক সাহেব হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলেন। আরে আরে.. একি! আবার কে যেন টানছে। আবারও চমকালেন, নাহ্ এবারও কেউ নেই। একটা আলগা ইটে পা পড়েছিল বোধ হয়!

আচ্ছা তিনি কি পাগল হয়ে যাচ্ছেন? এই বাষট্টি বছরের একজন লোককে কে টানাটানি করবে? তিনি রাস্তার পাশে একটি ঝুপড়ি মত দেখতে চা’র দোকানে ঢুকে একটি টেবিলে গিয়ে বসলেন। টেবিলের উপর পড়ে আছে ব্যবহৃত পানির গ্লাস আর চা’র কাপ। ইসহাক সাহেব কিছু ভাবতে পারছেন না। তাঁর সব চিন্তা ভাবনা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। নীতু ফোন করেছিল কখন যেন.. ও হ্যাঁ.. পরশু। তার বড় মায়া হল। মেয়েটা তাকে কখনও তেমন কোন আবদার করে নি। সে ছোটবেলা থেকেই তার বাবার আর্থিক অবস্থার কথা কিভাবে যেন জেনে গেছে। ওদিন কত কাচুমাচু করেই না সে ফ্রিজের কথাটা বলল। তার শশুর বাড়ীর ফ্রিজটা নাকি নষ্ট হয়ে গেছে। বিয়েতে তাকে কিছু দিতে পারেননি ইসহাক সাহেব। আচ্ছা বিয়েতে তেমন কিছু না দেয়ায়, নীতুকে শশুর বাড়ীর লোকেরা হেনস্থা করে নাতো?

গতকাল অবশ্য তিনি ‘শ্যাকলকের’ শোরুমে গিয়েছিলেন। ফ্রিজটা খুবই উন্নত মানের। তবে দামটা একটু বেশী। পঁচিশ হাজার টাকা। এত টাকা তিনি কোথায় পাবেন? অন্যমনষ্ক ইসহাক সাহেব চা’র কাপটা ঠোঁটে ছোঁয়ালেন। আরে কাপে তো চা নেই। হোটেল বয় কখন যে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে তিনি টেরও পাননি। বয়টি বলল, ‘স্যার চা দেব?’ তিনি লজ্জা পেয়ে গেলেন। আরেক জনের এঁটো চা’র কাপটা তাঁর হাতে ধরা। তিনি আরষ্ঠভাবে হেসে চা দিতে বললেন। বয় টেবিলটা মুছে আগের কাস্টমারের এঁটো কাপ আর গ্লাসটা নিয়ে চলে গেল। ইসহাক সাহেব ঠিক করলেন অফিস থেকে আবার লোন করবেন। আগের পনের হাজার এখনও শোধ করা হয়নি। কোন উপায় নেই। একটু কষ্ট হবে, তবু তিনি ফ্রিজটা কিনবেন। ইসহাক সাহেব চমকে উঠলেন, চেয়ারের পেছন থেকে আচমকা কে যেন টান দিল। নাকি চেয়ারের খুঁটি ভালভাবে বসে নি?

ইসহাক সাহেব বাইরে থেকে সোজা ড্রইং রুমে ঢুকে টিভি’র সামনে বসলেন। তিনি ঠিক করলেন রাতে আজ কিছু খাবেন না। তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়বেন। তার স্ত্রী ভেতরের রুম থেকে এসে তাকে দেখে চমকে উঠলেন, ‘কখন এলে?’ ইসহাক সাহেব বললেন, ‘চা কই?’ তার স্ত্রী কিছু না বলে দরজা বন্ধ করে পাশে এসে বসলেন,
-এখানে একা একা কি করছ?
-টিভি দেখছি।
-টিভি তো বন্ধ।
-আহ্‌ বক বক করো না তো।

স্ত্রী’র চোখ দু’টি ছল ছল করে উঠল। তিনি স্বামীর হাতে হাতে রেখে জিজ্ঞেস করলেন,

-ক’দিন ধরে লক্ষ্য করছি তুমি সব সময় কি যেন চিন্তা করছো, কি হয়েছে তোমার.. আমাকে বল।

ইসহাক সাহেব আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলেন না। বাচ্চা ছেলের মত স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে হাউ মাউ করে কেঁদে ফেললেন। বললেন,

-আমাকে টানে।
-কে?
-ইয়ে.. ইয়ে মানে মেয়েটার জন্য মনটা বড় টানে।
ইসহাক সাহেবের স্ত্রী একটু হালকা বোধ করলেন,
-তা একবার গিয়ে ঘুরে আসলেই পার।
-ওখানে যেতেই লাগবে দু’দিন, তাছাড়া অফিস ফেলে এখন যাওয়া সম্ভব না।
-তা হলে মেয়েকে আসতে বলি, জামাই নিয়ে এসে ঘুরে যাক।
-না না, ওর এ অবস্থায় আসা ঠিক হবে না। ইয়ে.. মিতু.. পঁচিশ হাজারটা টাকা খুব দরকার..
-হঠাৎ অত টাকা.. কেন?
-ভাবছি মেয়েকে বিয়েতে তেমন কিছু তো দিতে পারিনি, একটা ফ্রিজ কিনে দিব।

দুপুর বেলার ভাত ঘুমে ইসহাক সাহেব স্বপ্ন দেখছিলেন। অফিসের লোনটা পেয়ে তিনি শ্যাকলকের শোরুমে ছুটছেন। ছুটছেন তো ছুটছেন.. ছুটছেন তো ছুটছেন। ছুটতে ছুটতে দরদর করে ঘামছে। শ্বাস প্রশ্বাস বাড়তে বাড়তে.. বাড়তে বাড়তে হঠাৎ তিনি চমকে উঠলেন, ডান পাশ থেকে কে যেন টান দিল তাঁকে। স্বপ্ন ভেঙ্গে তাকিয়ে দেখেন তাঁর ডান হাতটা স্ত্রীর হাতে ধরা। তাঁর স্ত্রী হেসে স্বামীর দিকে পেপারটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘ওঠ.. পত্রিকাটা দেখ।’

ইসহাক সাহেব ধীরে সুস্থে উঠে বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসলেন। চোখে চশমা লাগিয়ে, স্ত্রী’র হাতে ধরা পেপারের দিকে সরু চোখে তাকালেন। প্রথম পৃষ্ঠায় লাল কালিতে আন্ডারলাইন করা একটা কলাম চোখে পড়ল তাঁর। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘এটা কি মিতু?’ মিতু সামান্য এগিয়ে এসে স্বামীর চিবুকে হাত ছুঁইয়ে ঠোঁট টিপে হেসে বললেন, ‘প্রাইজ বন্ডের ড্র হয়েছে খোকা। মিলিয়ে দেখ, কিছু পেলে কিনা!’
ইসহাক সাহেব ভিতরে ভিতরে উত্তেজনা বোধ করতে লাগলেন। তারপর হঠাৎ চমকে উঠলেন! আচমকা সামনে থেকে একটা টান অনুভব করলেন তিনি। সামনেই পত্রিকা হাতে তাঁর স্ত্রী দাঁড়িয়ে আছে। ইসহাক সাহেব চিন্তিত মুখে একবার পেপার আরেকবার স্ত্রী’র দিকে তাকাতে লাগলেন; টানটা কোনদিক থেকে এল?
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29300762 http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29300762 2011-01-02 15:57:54
প্রমোদযানে একদিন
জোয়ান রিকশাঅলা গহর আলী কান খাড়া করে ধীরে ধীরে প্যাডেল মেরে চলেছে। খোলামেলা এলাকাটা একবার চক্বর দেয়া হয়ে গেছে এরই মধ্যে। চারিদিক বড় বেশী সুনসান। এদিকটায় ভারী যান চলে না। টেক্সি-রিকশাই বেশী চলে, তাও হালকা পাতলা। বৃষ্টির পানি এক ফোঁটা দু’ফোঁটা করে কখনো সখনো পড়ছে কি পড়ছে না ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। গহরের কেবলই মনে হচ্ছে, রাস্তায় মাঝে মাঝে যে দু’এজন লোক দেখা যাচ্ছে তারা সবাই তার রিকশার দিকেই তাকিয়ে আছে। বৃষ্টি নেই অথচ রিকশার হুড তোলা, পর্দা টাঙ্গানো। প্রশ্ন জাগাই স্বাভাবিক। পর্দার নীচের অংশ কিছুটা খাটো। সেখানে দু’জোড়া বেহায়া পা দেখা যাচ্ছে। পর্দাটি খাটো হওয়ায় গহরকে কন্জুস ভাবাটা ঠিক হবে না। ওটা আসলে মাপ মতই ছিল। যাত্রীরা উপরের অংশ আরো কিছুটা উপরের দিকে তুলে ধরায় নীচের অংশটিকে খাটো দেখাচ্ছে।

রিকশায় সাধারণত পাশাপাশি দু’জন প্রাপ্তবয়স্ক বসার পর সিটে আর কোন জায়গা থাকে না। কিন্তু এই রিকশার যাত্রী ধারণ ক্ষমতা অন্য আর দশটার মত হলেও, সমীকরণটা ভিন্ন। রিকশার পেছন দিকের কোণার সামান্য ফাঁক দিয়ে নির্লজ্জ ভাবে তাকালে স্পষ্ট বোঝা যাবে, পাশাপাশি দু’জন বসা সত্ত্বেও তাদের পাশে আরো একজন বসার মত জায়গা রয়ে গেছে। ভিতর থেকে নানান কিসিমের শব্দ ভেসে আসছে। কোনদিকে কোন খেয়াল নেই যাত্রীদের। গহর আলী মনযোগ দিয়ে শোনার চেষ্টা করছে ভিতরের কথাবার্তা। তবে সেখানে কথার চাইতে শব্দ হচ্ছে বেশী। টক জাতীয় কিছু খাওয়ার সময় জিহ্বা আর তালুর সংঘর্ষে যেমন টকালো আওয়াজ বের হয়, এ শব্দগুলোও অনেকটা সেরকম। কেউ একজন মাঝে মাঝে কুকুর ছানার মত কুঁই কুঁই করছে। রোদের কোন দেখা নেই। রাস্তা মসৃন হওয়ায় রিকশা চালাতে তেমন কষ্টও হচ্ছে না। তবুও গহর ভিতরে ভিতরে খানিক গরম অনুভব করছে।

সস্তায় বিনোদন পেতে সিনেমা হলের বারান্দায় লাগানো পোস্টারে, ‘বারান্দা শো’ দেখে দেখে পকেটের খরচ বাঁচায় গহর। আর বেশী খায়েস হলে, বটতলার চিপা গলির শেষ মাথায় হাকিম্মার অন্ধকার বাসায় ভি.সি.আরে একধরনের ছবি দেখানো হয়, সেসব দেখতে যায়। পেছন থেকে ভেসে আসা টকালো শব্দমালা, তার সেই খরচাটাও বাঁচিয়ে দিচ্ছে আজ। লজ্জায় সাধারণত মাথা নীচু হলেও তার মাথাটা ক্রমশ উঁচু হতে লাগল। প্যাডেল মারতে সমস্যা হচ্ছে খুব।

আজ তার দিনটা বড় ভাল যাচ্ছে। সকালে একটা সুসংবাদও পেয়েছে সে। আগামী শুক্রবার কুলসুমের গার্মেন্টস বন্ধ থাকবে। ওভারটাইম হবে না। সে বলেছে তার দজ্জাল বড় বোনটা সেদিন বাসায় থাকবে না, মাকে নিয়ে বাড়ী যাবে। কুলসুম আজ কথা দিয়েছে ওদিন সে প্রথমবারের মত গহরের সাথে বেড়াতে বের হবে। গার্মেন্টস বন্ধের কথা সে নাকি বাসায় জানায় নি, জানালে তাকেও বাড়ীতে নিয়ে যেতে চাইবে। গহর মিনমিন করে বলেছিল, রাস্তায়-রাস্তায় বেড়ানোর কি দরকার? একলা বাসায় দু’জনে কাছাকাছি বসে গল্পগুজব করলে ভাল হত না? কিন্তু কুলসুম রাজি হয় নি। সে বলেছে সে গহরের রিকশায় করে ঘুরতে চায়। তাছাড়া পুরুষ মানুষকে নাকি বিশ্বাস নাই।

আজ বিকেলে গহর নিজস্ব রিকশাটি নিয়ে গেরেজ থেকে বেরুনোর সময় এক যুবক এগিয়ে এসে বলল, ‘ঘন্টা হিসেবে যাবে?’ সে খানিক চিন্তা করে একশ টাকা বলতে যাচ্ছিল তার আগেই যুবক বলে উঠল, ‘ঘন্টায় দেড়শ করে পাবে।’ গহর মনে মনে ‘আলহামদুলিল্লা’ বলে তোলা হুডটা ফেলতে যাচ্ছিল অমনি যুবক ‘না না’ করে উঠল। এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল, ‘হুড তোলাই থাক.. পর্দাটাও লাগিয়ে দাও।’ কুয়াশার মত অতি পাতলা বৃষ্টি অথচ পর্দা টাঙ্গাতে বলছে! গহর অবাক হলেও ঘন্টায় দেড়শত টাকার লোভে কথা বাড়ালো না। যুবকটি পর্দা টাঙ্গানো শূন্য প্রমোদালয়ে ঢুকে পড়ল চট্ করে। কিছুদূর গিয়ে মহিলা কলেজের পাশের কুলিং কর্ণার থেকে এক সলজ্জ তরুণীকে আলতো করে তুলে নিল রিকশায়। তারপর থেকেই চুড়ির শব্দ, এই শব্দ, সেই শব্দ শুরু। গহর গভীর মনযোগে কান খাড়া করে রেখেছে। একবার ঘাড়ের মটকা ফুটানোর অজুহাতে পেছন ফিরে তাকাতে চেয়েছিল। কিন্তু সতর্ক যুবক তড়িৎ বলে উঠল, ‘সামনে তাকাও.. একসিডেন্ট হবে।’ কুয়াশার মত বৃষ্টি কিছুক্ষণ পর আরো হালকা হয়ে এসেছে। গহর ঘাড় না ঘুরিয়ে সামান্য পেছনে হেলে বলল, ‘বৃষ্টিতো নাই.. হুড ফালায়া দিমু?’ ভিতর থেকে উত্তরের বদলে টকালো আওয়াজ শোনা গেল। গহরের মাথাটা শিরশির করে উঠল।

কেউ একজনের মোবাইলে রিং হচ্ছে। পর্দার আড়াল হতে তরুণীর কন্ঠ শোনা গেল, ‘হ্যাঁ মা বলো.. ইয়ে আমি? আমি এখন.. আমি এখন প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসে.. স্যার ব্যাঙ ব্যবচ্ছেদ করে দেখাচ্ছেন। আরে আমাদের ক্লাসের পাশে রাস্তা আছে না.. সেখান থেকেই গাড়ীর শব্দ আসছে.. (একটি গোঙ্গানির মত শব্দ হল) কি? শব্দ.. শব্দ কোথায়? ও আচ্ছা.. ইয়ে ব্যাঙটা.. ব্যাঙটা গোঙাচ্ছে। আহ্ দাঁড়াওনা.. না না তোমাকে না মা.. খোরশেদ.. ইয়ে মানে খোরশেদা.. খোরশেদাটা যা করে না..।’ গহরের মাথাটা রীতিমত টনটন করতে লাগল। তরুণীটি আচমকা তীক্ষ্ণস্বরে ‘আউ’ করে উঠল। তারপর তোতলাতে তোতলাতে বলল, ‘না মা.. ওই ইয়ে.. কি যেন? ও হ্যাঁ ব্যাঙটা.. ব্যাঙটা হঠাৎ.. আচ্ছা মা এখন রাখছি.. আচ্ছা বাবা ঠিক আছে ঠিক আছে.. সোজা বাসায় চলে আসবো.. রাখি।’ ছি! ছি! কি বেশরম! প্যডেল মারতে গহরের ভীষন কষ্ট হতে লাগল।

আর থাকতে পারল না গহর। একটু সাইড করে রিকশা দাঁড় করিয়ে পেছনে ফিরে তাকাতেই পর্দা সমেত পুরো রিকশাটি কিঞ্চিত নড়ে উঠল। সিট থেকে নামতে নামতে গহর বলল, ‘আপনেরা এট্টু উডেন.. সিডের ভিৎরে আমার পেলাস্টিকের কোর্তা আছে, ওইডা নিমু।’ যুবক অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘বৃষ্টিতো নাই, ওটা দিয়ে কি করবে?’ গহর এবার দাঁত কেলিয়ে নিঃশব্দে হাসলো, ‘বিষ্টি যহন নাই তহন রিকশার হুডটা ফালায়া দেই.. কি কন্?’ তরুণীটি আড়ষ্ট হেসে বলল, ‘ভাই আপনি আপাতত আমার ছাতাটা নেন।’ গহর বেজার মুখে ছাতাটা নিয়ে অহেতুক খুলে কাঁধে চেপে ধরে প্যাডেল মারতে শুরু করল। ছাতাটা পেছন দিক থেকে তাকে পুরো ঢেকে রেখেছে। তার কেমন অস্বস্তি হতে লাগল। মনে হল, ছাতার জন্য পেছনের কথা বার্তা তার কানে ঠিক মত পৌঁছুতে পারছে না।

রিকশা চলছে অত্যন্ত ধীর গতিতে। চালনা অবস্থায় গহর কায়দা করে এক হাতে রিকশার হাতল ধরে আরেক হাতে দোভাঙ্গা ছাতাটা বন্ধ করল। এবং এটাকেই একমাত্র সুযোগ মনে করে সে ছাতাটা ফেরত দেয়ার জন্য এক ঝটকায় পেছন ফিরে তাকল। তারপর দৃশ্যত জমে গেল। অবাক কান্ড, পর্দার উপরের দেড় বিঘৎ পরিমান ফাঁকা জায়গা দিয়ে দেখতে পাওয়া দু’টি মাথাকে একটি বলে মনে হচ্ছে। যুবকটির কোনদিকে খেয়াল নেই। তরুণীটি গহরকে লক্ষ্য করে লজ্জায় মাথা হেঁট করল। আর গহরের মাথাটা আরো খানিক উঁচু হল। প্যাডেল মারতে আরো কষ্ট হতে লাগল। তারপর ক্ষনিকের সুখস্বপ্নে বিভোর হয়ে সামনের দিকে ফিরতে যেতেই চোখ দুটি ছানবড়া হয়ে গেল।

সামনে বিশাল বড় রঙচটা নীল রঙা জিপ। রিকশাটি গিয়ে আছড়ে পড়ল তার উপর। ভিতরের বেপর্দা তরুণীটি পর্দার ভিতর থাকলেও গহর এবং যুবক দু’জন দু’দিকে ছিটকে পড়েছে। জিপের পেছন দিক থেকে একটি জুনিয়র পুলিশ এগিয়ে আসল। তার সিনিয়রটি ড্রাইভিং সিটের পাশে বসে হাসি হাসি মুখে সিগারেট ফুঁকছে। জুনিয়র চিন্তিত মুখে রিকশাঅলার দিকে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘লাগছে?’ গহর নাকমুখ বিকৃত করে হেসে ফুলে যাওয়া কপালে হাত বুলাতে বুলাতে খসখসে গলায় বলল, ‘জ্যা না।’ জুনিয়র যুবকটির দিকে একটু তাকিয়ে রিকশার দিকে এগিয়ে গেল। তরুণীটি ভীত হরিণীর মত ছটফট করছে। বৃষ্টিহীন রাস্তায় পর্দা টাঙ্গানো রিকশা, চিন্তিত জুনিয়র ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে তুলল। তারপর দু’হাত উঁচিয়ে আড়মোড়া ভেঙ্গে সিনিয়রের উদ্দেশ্য বলল, ‘স্যার রিকশার ভিৎরে একটা মাইয়া আছে।’ তারপর সে আবার রিকশাচালকের কাছে ফিরে আসল। কোমড় থেকে ল্যামপোস্টের থামের মত মোটা লাঠিটা বের করে গহরকে বলল, ‘এ্যাই ব্যাটা, বৃষ্টি নাই.. পর্দা লাগাইছস্ ক্যান্?’ একথা শুনে গহর আকাশ থেকে পড়ার ভান করে অবাক হয়ে তার রিকশার দিকে ফিরে তাকল। ভাবখানা, পুলিশটি কি বলছে সে কিছুই বুঝতে পারছে না। জুনিয়র লাঠি দিয়ে গহরের পায়ে জোরে গুঁতো দিয়ে দুষ্টু হেসে বলল, ‘কানে শুনস্ না?’ এবার গহরের অবাক ভাব বেমালুম উবে গেল। সে হাউ মাউ করে কান্না জুড়ে দিল। তারপর আঙ্গুল উঁচিয়ে যুবককে দেখিয়ে সে বলল, ‘ওই ভাই ক’ল, তাই পর্দা দিছি।’
-তুই কস্ নাই, বৃষ্টি নাই.. পর্দা দিমু ক্যান্?
-ওই ভাই ক’ল, বিষ্টি আইতে পারে।
-বলতে পারস্ নাই, বৃষ্টি আইবো না।
-কইছি, ওই ভাই ক’ল, তাইলে রইদ উঠতে পারে.. তেনার নাকি রইদ সয় না।

জুনিয়রের দুষ্টু হাসি এবার আরো প্রসারিত হল। সে হেলেদুলে যুবকের কাছে এগিয়ে গেল। যুবকের অবস্থা মারাত্মক। জুনিয়র তার দৃষ্টি যুবকের সাড়া গায়ে ঘুরিয়ে এনে ফিচেল হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তারপর.. বলেন, মাইয়াটা আপনার কে হয়?’ যুবকের গলা যেন আঘাতে বসে গেছে। সে মিউমিউ করে বলল, ‘কাক্ কাক্ কাজিন.. খালাতো বোন।’ জুনিয়র খ্যাক খ্যাক করে হেসে মুখটা সামনে এগিয়ে নিয়ে বলল, ‘খেলাতো ভইন?’ যুবকের গলা আরো খাদে নেমে গেল। সে তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ‘না না.. খালাতো বোন।’ জুনিয়রের মুখে হাসির উৎসব, সিনিয়রকে বলল, ‘স্যার কি করব?’ সিনিয়র হাত ইশারায় ওদেরকে ছেড়ে দিতে বলল। জুনিয়র সিনিয়রকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে যুবককে বলল, ‘আপনি রিকশার পাসিন্জার ছিলেন.. রিকশার ধাক্কায় আমাদের গাড়ির ক্ষতি হইছে। কিছু ক্ষতিপূরণ দিয়া যান।’ যুবক ব্যাথায় কঁকাতে কঁকাতে দু’শটা টাকা এগিয়ে দিল। জুনিয়র চোখ সরু করে কিছু জিজ্ঞেস করতে যাবে এমন সময় অকস্মাৎ যুবকটি রিকশাঅলার মত কান্না শুরু করে দিল, তবে মিথ্যে মিথ্যে। হো হো করে হেসে সিনিয়রের অলক্ষ্যে টাকাটা পকেটে পুরে নিয়ে জুনিয়র বলল, ‘যান ভাগেন।’ যাত্রী আর চালক একসাথে রিকশার দিকে এগিয়ে গেল। পেছন থেকে চিৎকার করে জুনিয়রটি বলল, ‘ওই ব্যাটা.. হুড ফালাই দে।’ যুবক ততক্ষণে রিকশায় উঠে বসেছে। গহর তার সিটে বসে ধীরে ধীরে প্যডেল মারতে শুরু করল।

সামনের চাকাটা সামান্য টাল হয়ে গেছে। রিকশাটি কেমন মাতালের মত টলছে। মিনিট পাঁচেক সবকিছু চুপচাপ থাকার পর আচমকা বৃষ্টি নামল ঝমঝমিয়ে। গহর রিকশার গতি কমিয়ে আনলে যুবক জিজ্ঞেস করল, ‘কি হল?’ গহর তার দিকে তাকিয়ে আশায় বুক বেঁধে একটি নাদুসনুদুস হাসি দিয়ে বলল, ‘পর্দা দিমু?’ তরুণী মুখ ঝামটে বলে উঠল, ‘লাগবে না।’ গহর মলিন মুখে গতি বাড়ালো। সে ভাবতে লাগল, ভালই হয়েছে.. অপবিত্র রিকশা বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাবে।

যুবক হঠাৎ বলে উঠল, ‘ওই সময় যদি কান্নার অভিনয়টা না করতাম তাহলে এত সহজে ছাড়া পেতাম না। কি.. কিছু বলছ না যে.. এ্যাই।’ গহর কান খাড়া করল। যুবক কথা চালিয়ে যাচ্ছে, ‘বৃষ্টিতে জ্বরজারি হতে পারে.. হুডটা তুলে দিলে ভাল হত।’ তরুণীর চেহারা থমথমে হয়ে আছে। গহর শরীরটাকে কিছুটা পেছন দিকে হেলে দিল। যুবক চট্ করে তরুণীর হাতটা টেনে নিয়ে দু’হাতে চেপে ধরল। রাস্তায় দু’একজন লোক দেখা যাচ্ছে। সবাই তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। বৃষ্টির সাথে সাথে ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে। একটু শীত শীতও লাগছে।

যুবক ‘হুডটা তুলে দেই?’ বলে লজ্জার মাথা খেয়ে ফের হুড তুলে দিল। তরুণীও লজ্জার মাথা খেয়ে ফিক্ করে একটি প্রশ্রয়ের হাসি দিল। বাকী থাকে গহর। গহরের লজ্জার কথা কি আর বলব, তার মাথা ঠাণ্ডায় হিম হয়ে প্যাডেলের তালে তালে দুলতে লাগল।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29295947 http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29295947 2010-12-25 17:59:14
যুদ্ধাপরাধী
একে একে পড়ছে ধরা
আমার মায়ের হন্তারক।
আদৌ কি আর দেখতে পাবে,
সঠিক বিচার দেশের লোক?

আবারো কি শুয়োর শালা
গান গাহিবে ‘গোঁৎ গোঁৎ’,
নাইবা হল বিচার তবু
বলবো ওরা ‘মাদারচোৎ’
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29292919 http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29292919 2010-12-20 13:17:01
বঙ্গানুবাদ অনুবাদ একথার- ‘কুকুরের বাচ্চা’।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29291742 http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29291742 2010-12-18 10:56:18
বাংলাদেশ হাঁকডাক আর কাজ কারবার
জানা আছে সবার।

চল্লিশ বছর আমার, সময় হল এবার
সত্য কিনা বাইস্কোপ
একটুস্ খানি দেখার।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29290943 http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29290943 2010-12-16 20:12:58
এক টুকরো মুক্তিযুদ্ধ বাঙ্গালীরে,
বিছানাতে নিতে আয়া,
উল্টা নিজে গাঁদন খায়া,
‘পাক’ কথাডা কেমন কইরা নাপাক হয়া যায়।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29290070 http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29290070 2010-12-15 13:13:09
কুটুম (গল্প)
বাবাটা খুবই সরল। একদিন শুনছি আমাকে দেখিয়ে তাঁর এক বন্ধু মানুষকে তিনি বলছেন, ‘এটা ভুল করে চলে এসেছে হা হা হা... তবে এটাই শেষ।’ আমি যখন হাঁটি হাঁটি পা পা তখন থেকেই ভাইয়ারা টুকটাক আয় করতে শুরু করেন। ছেলেরা বাবার কাঁধের হালটা নিজেদের কাঁধে তুলে নেয়া শুরু করার পর থেকে বাবার হাসিতে স্নিগ্ধতা বাড়তে থাকে। তাই বলে আগে যে বাবা হাসতেন না তা কিন্তু নয়, তবে সেই হাসিতে দুশ্চিন্তার ছায়া থাকত বেশি। বাবার পরিবারের অভাব অনটন আমার তেমনটি দেখা হয়নি। প্রায় সবটাই বড়দের কাছ থেকে শোনা।

ভাইয়ারা চুলো জ্বালানোর লাকড়ি যোগাড় করে, খানিক দূরের পাহাড় থেকে টুকরো কাঠবোঝাই বিশাল বস্তা মাথায় নিয়ে ফিরতেন। তারপর পুকুরে গোসল সেরে কেউ স্কুলে কেউবা কলেজের দিকে ছুটতেন। ভাবতে অবাক লাগে, এত অভাবে থেকেও বাবা কি করে এতজনের পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। সেসব বছর পনের আগের কথা। এখন ভাইয়ারা কেউ ব্যবসা, কেউ টিউশনি কেউবা চাকরি করেন। এখন আর পাহাড় থেকে লাকড়ি আনতে হয় না, দোকান থেকে কিনে আনেন। আমরা এখন মোটামুটি স্বচ্ছল। তবে বাবার কর্মকাণ্ড আগের মতই রয়ে গেছে। সবসময় কিছু না কিছু করবেন। মাঝে মাঝে ভাইয়ারা কপট ধমক দেন, ‘আপনাকে বলেছি না, বসে বসে শুধু আল্লা বিল্লা করবেন। তবু সবসময় এটা না ওটা - ওটা না সেটা, একটা না একটা কিছু করতেই থাকেন।’ বাবা কোন জবাব না দিয়ে স্নিগ্ধভাবে হাসেন। ঐ হাসির মধ্যেই যেন পৃথিবীর যাবতীয় সুখ খেলা করে।

এতদিন মাটির চুলোয় রান্না হত, মায়ের খুব কষ্ট হত। ক’দিন পর পর চুলোর খুঁটি ভেঙ্গে যায়, নয়তো লাকড়ি ঢুকানোর মুখটা ভেঙ্গে যায়। মাকে প্রায় কাদামাটি দিয়ে চুলো মেরামত করতে দেখা যায়। মা তাঁর বড়লোক বাবা’র একমাত্র সন্তান। তাঁর বাবার বাড়িতে রান্না হয় কোমর সমান উঁচু বিশাল সিমেন্টের চুলোয়। তাছাড়া রান্না করে ঝি-চাকরেরা। আর এখানে...। প্রেমের ফাঁদে পড়ে বেচারাকে আজ চুলোর ধোঁয়ায় কান্না লুকোতে হয়। সরি, মা’র কান্নার ব্যাপারটা ভুল বলেছি, মা কাঁদতে যাবেন কেন? চুলোর ধোঁয়ায়তো এমনিতেই চোখে পানি আসে! হত দরিদ্র স্বামীর ঘর করতে গিয়ে মা’র মধ্যে কখনোই কোন ধরনের আফসোস লক্ষ্য করিনি। এবং কখনোই তিনি তাঁর বাবার বাড়ী থেকে কোন ধরনের অনুদান গ্রহণ করেননি, পাছে প্রিয়তম স্বামীটি লোকচক্ষে ছোট হয়। বরং মায়ের হাসিতে বাবার চাইতে স্নিগ্ধতা হাজার গুণ বেশি দেখা যায়।

বাবা পারেন না হেন কোন কাজ নেই। এখন বসেছেন মা’র জন্য একটি পাকা চুলো তৈরী করতে। ভাইয়াদের বলেছেন সিমেন্ট আর বালি এনে দিতে। ভাইয়ারা অনেক করে বললেন যে, মিস্ত্রীকে বলা হবে, সে এসে চুলো বানিয়ে দিবে। বাবার কথা একটাই, তাঁর কাছে সব যন্ত্রপাতি আছে সুতরাং চুলো তিনিই বানাবেন। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, তিনি পারেন বলেই চুলোটা বানাতে চাইছেন তা নয়, বরং স্ত্রীর জন্য একটা কিছু করছেন- এটাই হল আসল কথা। বাবাটার লজ্জা শরমও কিছু কম বলে মনে হয়। আমি না হয় সেভেনে পড়ি বলে তেমন কিছু বুঝি না, কিন্তু ভাইয়ারা বড় হয়েছে না? বাবা এখনো বাইরে বেরুনোর সময় আমাকে আদর করার ফাঁকে মা’র দিকে এগিয়ে যান। মা মুখে আঁচল চাপা দিয়ে হায় হায় করে পালিয়ে বাঁচেন।

আমাদের রান্না ঘরটা উদোম। মূল ঘর থেকে সামান্য বিচ্ছিন্ন। এক পাশে পাশের বাড়ীর সীমানা দেয়াল, আর তিন পাশ খালি। উপরে বাঁশের চালা, দু’টো বাঁশের খুঁটির সাথে ঠেকা দেয়া। রান্না ঘরের পুরনো চুলোটার কয়েক হাত ডানে নতুন চুলোর জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। পুরনোটা মা কোনভাবেই ভাঙ্গতে দেবেন না। ওটা নাকি বিয়ের পর তাঁরা দুজন মিলে তৈরী করেছিলেন। বাবা এখন নতুন জায়গাটায় ছোট্ট কোদাল দিয়ে গর্ত তৈরী করছেন। আমি মনোযোগী দর্শকের মত বাবার পাশে বসা। মা চুলোর ভেতর বেখেয়ালে ঢুকিয়ে দেয়া ভেজা কাঠটি সামলাতে ব্যস্ত।

বাবা বেশ উৎসাহ নিয়ে খোশ মেজাজে গর্ত খুঁড়ে চলেছেন। হঠাৎ কোদালের টানে মাটির সাথে ছোট্ট লাটিমাকৃতির কালচে কি যেন উঠে আসল। বাবা ভ্রু কুঁচকে জিনিসটি তুলে নিলেন। কিছুক্ষণ পর তাঁর কোঁচকানো ভ্রু সোজা হল। আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‌ওটা কি? আমার প্রশ্ন শুনে মা এগিয়ে এলেন। বাবা আমাকে কোন উত্তর না দিয়ে মাকে ওটি দেখালেন। মা চমকে আমার মাথাটা তাঁর বুকে আঁকড়ে ধরলেন। কিছু পরে আমার কাঁধে এক ফোঁটা পানি এসে পড়ল টুপ করে। মায়ের দিকে তাকিয়ে দেখি তাঁর চোখের পাপড়িতে শিশিরবিন্দু । তারপর কি যে হল, তিনজনে এক জোটে হারিয়ে যেতে লাগলাম বছর তিনেক আগের জৈষ্ঠ্যের দুপুরে।

পাশের সওদাগর বাড়ীর আমগাছটার অনেকটা অংশ এসে হামলে পড়েছে আমাদের উঠোনে। দুপুরে সেই গাছ থেকে লুকিয়ে ঢিল ছুঁড়ে আম পাড়ার চেষ্টা করছিলেন বাবা। হঠাৎ আমের পরিবর্তে ‘কিঁক কিঁক’ করে পাক খেতে খেতে খসে পড়ল একটি পাখী; টিয়া। উৎকন্ঠিত বাবা সাথে সাথে ছুটে গিয়ে পাখিটি তুলে নিলেন। বেচারার ছোট্ট দেহটি বাবার বিশাল কর্মঠ হাতের তালুতে ছটফট করছে, ভয়ে নাকি ব্যাথায় বোঝা যাচ্ছে না। মা দরজায় দাঁড়িয়েছিলেন। ছুটে এসে ছোঁ মেরে বাবার হাত থেকে পাখিটি নিজের হাতে তুলে নিলেন। তারপর ফিরে গেলেন বাড়ীর ভেতর। পাখিটির পায়ে বেশ জখম হয়েছিল। মা সেই পা পানি দিয়ে ভিজিয়ে দিতে লাগলেন। বাসায় ‘জামবাক’ নামের একপ্রকার মলম ছিল, ওটা লাগিয়ে দিলেন। তারপর এটা সেটা অনেক কিছু খেতে দিলেন। কিন্তু পাখিটি কিছুই খেতে চাইল না।

তার সঙ্গী পাখিগুলো দিন কয়েক আমাদের ঘরের চালে বিরক্ত করে করে ক্ষান্ত হয়ে অবশেষে চলে গেছে। পাখিটি টিয়া হলেও কখন-কিভাবে-কি করে যে ওর নাম ‘ময়না’ হয়ে গেল কেউ টেরই পাইনি। ময়না ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠতে লাগল। প্রথমে আমরা না বুঝলেও পরে বুঝতে পেরেছিলাম তার ডানাতেও জখম হয়েছিল। মা তাকে উড়িয়ে দিতে চাইলেও সে তাই উড়ে যেতে পারেনি। ধরা পড়ার দু’দিন পর বাবাকে বলে একটি খাঁচা যোগাড় করেছিলেন মা, যদিও খাঁচাটি আজও অব্যবহৃত রয়ে গেছে।

কিছু পাখি আছে জোড় পায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটে। আর অনেকের হাঁটা অনেকটা মানুষের মত, তারা এক পা দু’পা করে কদম ফেলে। আমাদের ময়নাও তেমনি করে হাঁটে। বেচারার খোঁড়া পায়ের হাঁটা দেখলে ভারী মায়া হত। মাঝে মাঝে তার ভারিক্কি চালের হেলেদুলে হাঁটা দেখে মনে হত, সে যেন কোন গেরস্থ বাড়ীর বয়োঃবৃদ্ধ তৃপ্ত মুরব্বী। যে কিনা শেষ বয়সে এসে, দু’হাত পেছনে দিয়ে, কষ্টে গড়া তার সাধের সংসারের সুখ অনুভব করতে করতে এঘর ওঘর হেঁটে হেঁটে স্মৃতি রোমন্থন করছে। আর সুখের চোরাবালিতে ডুবতে যেতে যেতে, গভীর থেকে আরো গভীর অতলে দেবে যাচ্ছে। এই চোরাবালিতে হারিয়ে যেতেই যেন তার আনন্দ।

বছর না ঘুরতেই ময়নার মুখে বেশ বুলি ফুটেছে। মা তাকে ‘কুটুম এসেছে’ বলতে শিখিয়েছেন। মা’র সাথে সেও সুর মেলাতো, তবে পুরোটা বলতে পারতো না। শুধু বলতো ‘কুটুম।’ বাইরে থেকে যেই আসুক না কেন ময়না তীক্ষ্ণ কন্ঠে চিৎকার করে উঠত, ‘কু..টু..ম, কু..টু..ম।’ তারপর ধীরে ধীরে তার ‘ময়না’ নামটি চাপা পড়ে গেল ‘কুটুম’ ডাকের আড়ালে।

আমি যখন স্কুল থেকে ফিরতাম, তখন বেশ মজা হত। মা আমাকে পাউরুটি আর কলা খেতে দিতেন। আমি খেতে খেতে কুটুমের সাথে খেলতাম। তাকে অনেক কষ্টে ‘কলা’ বলতে শেখাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু দুষ্টুটা কিছুতেই ‘কলা’ বলতে পারত না। আমি বলতাম ‘কলা’ সে বলত ‘কুটুম।’ কুটুম আসার পর থেকে আমার গোসল সারতে সময় বেশ কম লাগত। বাবা বাড়ীর পেছন দিকে মা’র জন্য একটি বাথরুম বানিয়ে দিয়েছিলেন। ওটার তিনদিকে ইটের গাঁথুনি, একদিকে টিনের দরজা, আর ওপরটা ফাঁকা। আমাদের বাসার সামনে একটা পুকুর ছিল। তবে মা ওখানে গোসল করতে যেতেন না। আমার আবার পুকুরে গোসল করা কড়া নিষেধ ছিল। তো গোসল করতে বাথরুমে গেলে আমার সাথে সাথে কুটুমও যেত। তারপর দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে সারাক্ষণ ‘কুটুম..কুটুম’ চেঁচাত। তার চেঁচামেচিতে হুড়োহুড়ি করে গোসল সেরে বেরিয়ে আসতে হত আমাকে।

কিভাবে কিভাবে যেন সে আমাদের পরিবারের সাথে মিশে যেতে যেতে একাকার হয়ে গেল। মা তাকে পানির সাথে কি কি সব মেখে খেতে দিতেন। বাবা বাজার করতে যাওয়ার সময় শুনতে পেতাম মা বলছেন, ‘কুটুমের খাবার শেষ, নিয়ে এসো।’ কুটুমটাও মা বলতে পাগল। কখনো সখনো সবাই এক সাথে বেড়াতে গেলে বাধ্য হয়ে তাকে বাড়ীতে রেখে যেতে হত। সে তখন মাথা গোঁজ করে এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াত। তবে নানুর বাড়ীতে গেলে মা তাকে সাথে করে নিয়ে যেতেন। আর বাসায় থাকতে বেশীরভাগ সময় মা’র আশেপাশেই ঘুরঘুর করত সে। শুধু রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে, মা তাকে লাকড়ি রাখার ঘরটাতে রেখে আসতেন।

রান্না ঘরে চুলোর পাশেই মা কুটুমের জন্য আমার সুন্দর ছোট্ট বাসনটি এনে রেখেছিলেন। বাসনটি রূপোর, ওর মধ্যে খাবারের জন্য আলাদা আলাদা ভাগ করা আছে। ওটি নাকি মা’র জন্য নানুভাই দিল্লী থেকে এনেছিলেন। ওতে সবসময় ছোলা, পানি আর এটা সেটা আরো কি কি যেন দিয়ে রাখতেন মা। কুটুম মা’র পেছনে ঘুর ঘুর করত আর কিছুক্ষণ পর পর বাসন থেকে কুটুর কুটুর করে খাবার খেত। মা রান্না ঘর থেকে কোন কাজে মূল বাসায় যেতে চাইলে অমনি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কুটুমটাও মার পিছু নিত।

কিন্তু সেই দিনটিতে হঠাৎ কি যে হল, সে খোঁড়া পায়ে মা’র পেছন পেছন দৌড়ে এসে আর কুলিয়ে উঠতে পারেনি। কিংবা মা নিজেকে নিয়ে এতটাই উদগ্রীব ছিলেন যে, কুটুমের কথা মনেই ছিল না।

কার্তিকের শুরু। ততদিনে কুটুমের সাথে আমাদের পরিচয়ের বছর দেড়েক পার হয়ে গেছে। সেদিন সকাল থেকেই চারিদিক গুমোট। প্রকৃতি বেশ থমথমে। সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত। বাইরে বিরক্তিকর গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। মা রান্না ঘরে। রান্না প্রায় শেষ পর্যায়ে। মা’র পাশে চিন্তিত কুটুমকে বেশ বিমর্ষ দেখাচ্ছে। সে কি ইতিমধ্যেই ঘটনার পূর্বাভাস পেয়ে গেছে?

হঠাৎ প্রচণ্ড বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে শুরু করল। এবং নিমিষেই তুমূল বৃষ্টিসহ দুর্বার আক্রোশে চোখ রাঙ্গাতে লাগল বাতাস। মা তড়িঘড়ি করে ভাতের ডেকচি হাতে মূল ঘরে ঢুকে ছিটকিনি আটকে দিলেন। তারপর সারারাত বৃষ্টি আর বাতাসের ঝগড়া চলতে লাগল অনবরত। ঝগড়ার বাক-বিতণ্ডায় চাপা পড়ে গেল ‘কুটুম কুটুম’ আর্তনাদ। আমাদের বাসার ফ্লোরটি ছিল মাটির। পুরনো টিনের চালের ছিদ্র গলে পড়া বৃষ্টির পানিতে ফ্লোরের এখানে সেখানে কাদা হয়ে যেতে লাগল। প্রায় সারারাত বাবা-মা-ভাইয়ারা মিলে ঘর সামলানোয় ব্যস্ত ছিলেন। আর আমি কাঁথা বালিশ রাখার জায়গাটিতে জবুথবু হয়ে ঘুম।

সকালে আমার ঘুম ভেঙ্গেছিল মায়ের নিচু স্বরের কান্নায়, সময়টা দশটা এগারটা হবে। রোদের তেজ তখনও তেমন বাড়েনি। ঘরের পেছনে এসে দেখি বাইরেটা ভেজা ভেজা, কেমন যেন আয়নার মত পরিষ্কার-ঝকঝকে। রাতের ঘটনা মনে পড়ল।

উদোম রান্নাঘরটা আরো উদোম দেখাচ্ছে। উপরের বাঁশের বেড়া উড়ে গেছে দূরে কোথাও। দূর হতে উড়ে এসেছে অন্যের ঘরের টিন, গাছের ডাল। লাকড়ি রাখার ঘরটি পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়েছে। তখনও কিছুক্ষণ পর পর ঠাণ্ডা হাওয়া বইছিল। আশপাশ দেখে বোঝাই যাচ্ছে রাতে প্রচণ্ড ঝড় বয়ে গেছে। মা চুলোর সামনে বসে আছেন। আমি পেছন দিক থেকে দেখতে পাচ্ছি মা’র পিঠটা একটুক্ষণ পরপর কেঁপে কেঁপে উঠছে। আশেপাশে কেউ নেই। আমি চোখ কচলে মা’র পাশে এসে দাঁড়ালাম। ইশারায় জানতে চাইলাম, ‘কি?’ মা বসা অবস্থায় আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। অনুভব করলাম মা সন্তর্পনে কাঁদছেন। তারপর একটু শান্ত হয়ে, কয়েক হাত ডানে একটি নতুন ছোট্ট কবর দেখিয়ে ফুঁপিয়ে বলে উঠলেন, ‘কুটুম।’
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29287645 http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29287645 2010-12-11 16:31:39
লাল কয়েন (গল্প)
এর কারণটি এখনো কেউ খোলাসা করে বলতে পারছে না। তবে যে ক’টি কারণ এ পর্যন্ত বাজারে এসেছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, স্বর্ণের খাদ দেয়ায় নাকি এই কয়েন ব্যবহার করা হবে।

রেল স্টেশনে রাত কাটানো অনেকের মধ্যে বহু পুরনো একজন বাসিন্দা, বুড়ো ভিক্ষুক ওমর আলী। সে গুনে দেখল তার কাছে প্রায় তিনশ’র মত কয়েন রয়েছে। অর্থাৎ একশ টাকা করে বিক্রি করতে পারলেও, তিনশ টাকার বদলে প্রায় ত্রিশ হাজার টাকা পাওয়া যাবে। মাগো কত্ত টাকা!

তার সঞ্চিত টাকার সঠিক পরিমাণ সে নিজেও জানে না। তাছাড়া টাকা-পয়সা ছাড়াও তার একটি স্থায়ী সম্পত্তি রয়েছে। সম্প্রতি সে বেশ দাম দিয়ে এক চিলতে জমি কিনেছে; আজিমপুর গোরস্থানে। মানব জনমের প্রথম অধ্যায়তো রাস্তাঘাটে মানুষের লাথি খেয়ে কেটেছে, তাই শেষ অধ্যায়টি ভালভাবে কাটাতে চায় সে।

এক টাকার কয়েন সংগ্রহে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার লোকজন যখন পাগল প্রায়, তখন এক যুবক লক্ষ্য করল, স্টেশনের এক কোণে মোটা পিলারের নীচে হেলান দিয়ে বসে কয়েন গুনছে এক বুড়ো। এগিয়ে যায় সে। বুড়োর কাছে অনেক কয়েন আছে জানতে পেরে সব কিনে নিতে চায় যুবকটি। রাত তখন প্রায় এগারটা। ওই সময়ে যুবকটির সাথে অত টাকাও ছিল না। যুবক জানাল, পরদিন এসে টাকা দিয়ে পয়সাগুলো নিয়ে যাবে সে। বুড়ো দরদাম নিয়ে ঝামেলা পাকানোর চেষ্টা করেছিল খানিক। অবশেষে সে-ঝামেলাও মিটিয়ে নিল যুবক, প্রতি কয়েনে দেড়শ টাকা। যুবকটি হিসেব কষে জানাল, বুড়োর কাছে যে পরিমাণ পয়সা আছে তার বিনিময় মূল্য হবে প্রায় ছেচল্লিশ হাজার টাকা। সে বুড়োকে অনুরোধ করে পঁয়তাল্লিশে রাজি করিয়ে গেছে।

যুবক চলে যাবার পর বুড়ো পড়ে গেল মহা দুশ্চিন্তায়। স্টেশনের আশপাশ চোর ছ্যাচড়ে ভরা। বুড়োর সাথে এক লোকের দীর্ঘক্ষণ কথাবার্তা হয়েছে, তা নিশ্চয় অনেকে লক্ষ্য থাকবে। লোকটি কেন এসেছে তাও হয়তো জানা হয়ে গেছে সবার কাছে। বিশেষ করে গুজবের এই গোলমেলে সময়ে ব্যাপারটা আঁচ করতে কারো দেরী হওয়ার কথা নয়। হয়তো অনেকেই ঘাপটি মেরে বসে থাকতে মনস্থির করে ফেলেছে এতক্ষণে; কখন ওমর আলী ঘুমুবে।

বুড়ো ওমর আলী সিদ্ধান্ত নিল, আজকের রাতটা না ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিবে। মোটে তো একটি রাত। এ রাত ভোর করতে কষ্ট হবে না তেমন। তবে নির্ঘুম থাকাটা তার জন্য বিপদজনকও বটে। বুড়োর আবার হাই প্রেসার।

পরদিন আসল ঘটনা প্রকাশ পেল। পত্র-পত্রিকায় লাল কালিতে শিরোনাম দিয়ে খবর ছাপা হলো; কয়েনের ব্যাপারটি সম্পূর্ণ ভূঁয়া। হয়তো কোন প্রতারক চক্র মিথ্যে এ গুজবটি ছড়িয়ে থাকবে। মোবাইল ফোনের এ যুগে যা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে।

স্টেশনের বুড়োর কাছ থেকে যে যুবকটি কয়েন কিনতে চেয়েছিল, সঙ্গত কারণে তাকে আর আসতে হল না পরদিন। তবে এলে সে দেখতে পেত, পিলারে হেলান দিয়ে, কোলে একগাদা কয়েন নিয়ে শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বুড়ো ওমর আলী। তার মুখের ভিতর মাছিরা ঘোরাঘুরি করছে পরম নিশ্চিন্তে।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29280729 http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29280729 2010-11-30 12:56:39
বল্লার পাল্লায় দ্রুত হেঁটে জিপার খুলতে খুলতেই ইউরিনালের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে অপু। টয়লেটটি মোটামুটি বড়। ভিতরে তিনটি ছোট-ছোট সাব-টয়লেট। দুটিতে হাই কমোড, আর একটি নরমাল। এছাড়া বুক সমান পার্টিশান দেয়া কয়েকটি ‘দাঁড়িয়ে টয়লেট সাড়া’র ব্যবস্থা রয়েছে।
অনেক্ষণ হল অপুর ছোট বাথরুম পেয়েছে। কিন্তু অবস্থা এমন ছিল যে, মিটিঙের মাঝখানে উঠে আসা কোনভাবেই সম্ভব ছিলনা। আজকের মিটিংটি অপুর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইন্টারনাল অডিট রিপোর্টে কোম্পানীর যেসকল ত্রুটিবিচ্যুতি ধরা পড়েছে, সেসব ভুলচুক নিরসনে ম্যানেজমেন্টকে সে তার সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন প্রদান করবে আজ। তার ‘পরামর্শে’ ম্যানেজমেন্ট সন্তুষ্ট হলে অনেকদূর এগিয়ে যাবে সে। মিটিঙে পনের মিনিটের বিরতি হতেই অপু আর দেরী করেনি; ছুটে গেছে টয়লেটে। সোজা ইউরিনালের সামনে। তারপর, তারপর দু’চোখ মুদে সে অনুভব করা শুরু করতে চেয়েছিল ‘কি আনন্দ ত্যাগে!’ কিন্তু তা আর হল কই?
কর্ম সাড়ার শুরুতে অপুর মুখ দিয়ে বের হয়ে আসার কথা আরামদায়ক শিৎকার ধ্বনি - ‘আহ্’। কিন্তু নাহ্, তার পরিবর্তে বের হয়ে এল কঠিন এক আর্তনাদ। তবে অত্যন্ত চাপাস্বরে, গোঙ্গানির মত গগনবিদারী চিৎকার। শব্দও যে শব্দহীন হতে পারে, এই প্রথম বুঝতে পারল সে।
অপু একজন দায়িত্বশীল অফিসার। টয়লেট হলেও এটি যে অফিস, তা তার অবচেতনে কাজ করছিল। আবার টয়লেটের ভিতরের ছোট্ট টয়লেটগুলোতে সিনিয়ররা কেউ থাকতে পারেন তা-ও মাথায় ছিল তার। অতঃপর সময়ের এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে যা ঘটে গেছে তা হর্ষক নাকি লোমহর্ষক সেই বিবেচনা পরে করা যাবে, আপাতত অপু'র ব্যাথায় সমব্যাথি হওয়ার ইচ্ছে না জাগলেও অন্তত ব্যাথার কারণ সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক।
সময়টা ছিল সকাল। টয়লেট তখনও অব্যবহৃত। প্রতিদিন বিকেল ছ’টায় অফিস শেষ হয়। তখন প্রৌঢ় একটি লোক এসে টয়লেট পরিষ্কার করে জায়গায় জায়গায় ন্যাপথলিন ছড়িয়ে দিয়ে যায়।
সারারাতের অব্যবহারে সকালের টয়লেটটা ছিল শুষ্ক খটখটে-পরিষ্কার। দলছুট একটি বোলতা বেখেয়ালে টয়লেটে ঢুকে পড়েছিল সিসিটিভি ক্যামেরার চোখ ফাঁকি দিয়ে। বোলতাটি যে অফিসের ভিতর দিয়েই ঢুকেছিল, তা এখানে উল্লেখ না করলেও চলত। ‘অফিসের টয়লেটে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকাটা অসভ্যতার পর্যায়ে পড়ে (তাও ইউরিনালের উপর!)’ - একথা নিশ্চয় সবাই স্বীকার করবেন।
যাক, যা বলছিলাম, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন দেখে বোলতাটি স্থান করে নিয়েছিল ইউরিনালের ফুটো-ফুটো জায়গাটির ঠিক উপরে। সৌভাগ্য তার, সেদিন সেখানে কোন ন্যাপথলিন দেয়া ছিল না। নীচ হতে হয়তো ফিনফিনে হাওয়া বইছিল উপর দিকে। নইলে অছ্যুত ওই জায়গায় কেন সে বড় আরামে বসেছিল চুপটি করে? আর অতি আরামের সময়ে কিঞ্চিত ব্যাঘাত ঘটলে, তা কি মুখ বুঁজে সইতে পারে কেউ? নিশ্চয় সে তার প্রতিক্রিয়া কোন না কোনভাবে জানান দেয়।
আজকের আলোচিত বোলতাটি দেখতে অন্যান্য বোলতার মতই, বেশ সুন্দর। কালো-হলুদের অপূর্ব কালার কম্বিনেশন। তাই বলে তার সবকিছু্ই যে সুন্দর, এমনটি ভাবাটা মোটেই ঠিক হবে না। বিশেষ করে ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রতিক্রিয়াটি। তা-ও যে সে প্রতিক্রিয়া নয়, রীতিমত নিউটনের তৃতীয় সূত্রের চাইতেও এক কাঠি উপরে।
আরামে দীর্ঘ সময় পার করে তখন বোলতাটি সবে আড়মোড়া ভাঙ্গার পাঁয়তারা করছিল। ঠিক সেই সময়ে লবণাক্ত গরম পানির ছোঁয়া তার ভিতর প্রচণ্ড বিরক্তির উদ্রেক করে। সে দিগ্বিদিকজ্ঞানশূণ্য হয়ে যেদিকে পেরেছে ছুটে গেছে। তাৎক্ষণিকভাবে তার মাঝে একটি আক্রোশ মিশ্রিত খায়েশ জেগেছিল; যাতে সামনে সে এমন কিছু পায় যাকে কামড়ে সুখ পাওয়া যাবে। এখানেও তার কি সৌভাগ্য! খায়েশ পূরণ হয়েছে সাথে সাথে। বোলতার বিষদন্তে ধরা পড়েছিল নরম-সরম কিছু একটা।
বিচিত্র মানুষের মন। চরম দুঃখেও হারানো সুখের স্মৃতি এসে ধরা দেয়। আবার সুখের সময় হানা দেয় দুঃখের কোন স্মৃতি। তেমনি অতি অকষ্মাৎ সৃষ্টি হওয়া আজকের এই বেদনাদায়ক মুহূর্তটিতে, একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব সম্পর্কে সন্দেহের উদয় হয়েছিল অপুর মনের গভীরে। তার মনে হল, ‘শব্দের চেয়ে আলোর গতি বেশী’ তত্ত্বটি ভুল। বিদ্যুৎ চমকালে আমরা আলো দেখতে পাই আগে, পরে শব্দ শুনি। অর্থাৎ, ঘটনা ঘটল – দেখলাম – তারপর শুনলাম। কিন্তু এক্ষেত্রে ঘটেছে উল্টো। বোলতার দংশনের সাথে সাথে উৎসস্থলে চোখ যাবার আগে অপুর মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছিল মুখবন্ধ এক গুমোট আর্তনাদ। তারমানে ঘটনা ঘটল – শুনলাম – তারপর দেখলাম। তবে যা সে দেখল তা না দেখলেই হয়তো ভাল ছিল তার জন্যে।
ভাগ্যিস সেসময় টয়লেটে কেউ ছিল না। অপু তীব্র যাতনায় লাফাতে লাগল পাগলের মত। বোলতা তার কাজ সেড়ে কখন যে সটকে পড়েছে কেউ জানে না। ক্যামেরার জানা-না জানার কথা এখানে ফের নাইবা টানলাম। পাখী যেমন উড়ে যায় রেখে যায় পালক, তেমনি বোলতাটিও উড়ে গেছে। তবে পালক রেখে যায়নি, রেখে গেছে স্মৃতি। কি স্মৃতি? ‘বুঝিবে কি কেউ? কভু আশিবিষে দংশেনি যারে?’
অপু বুঝতেই পারল না কে-কিভাবে-কেমন করে হৃদয় না খুঁড়েও বেদনা জাগিয়ে চলে গেছে কোনফাঁকে? বোলতা ব্যাটা দেখাই দিল না অপুকে, কাজ শেষ করেই ফুরুৎ। এদিকে দংশিতাংশ দেখার পর অপুর চোখের অবস্থা কাহিল। ছানাবড়া বললেও ভুল বলা হবে। চোখ যেন কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। এতকালের চিরচেনা আদরের ছোট্টভাইটিকে বড্ড অচেনা ঠেকল তার কাছে। ‘মস্তিষ্ক’ বিকৃতি ঘটে গেছে ভাইয়ের, মুহূর্তেই ফুলে ঢোল। এই বিভৎস দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে থাকা অপুর চোখের পক্ষে সম্ভব ছিল না কোনভাবেই। সাথে সাথে দু’চোখ বন্ধ করল সে। অনুজকেও আতংকে জিপারবন্দী করল তড়িৎ (ভিতরঘরে পূর্বের চাইতে বর্তমানে জায়গার কিছুটা অভাব দেখা দিয়েছে, ব্যাপারটা এখানে না জানালেও চলে)। সহসা হাজারো প্রশ্ন ভীর করল তার মনে।
কি করবে এখন বুঝতে পারছে না সে? এমডি সাহেবকে বলে ছুটি নিয়ে চলে যাবে? কিন্তু এমডি যদি জানতে চান, কি সমস্যা? কি বলবে উত্তরে? নাকি কাউকে কিছু না বলে এক্ষুনি ছুটে যাবে ডাক্তারের কাছে? কিন্তু ডাক্তারের কাছে যাওয়ার পর? তিনি যদি জিজ্ঞেস করেন, কি করে কি হল? হায় খোদা, এই অসময়ে কোন পাপের শাস্তি দিলে তুমি? সবচেয়ে ভাল হয় বাসায় চলে গেলে। না-না-না-না, বাসায় যাবার তো প্রশ্নই ওঠে না। বাসায় তার সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী। এ অবস্থার কি জবাব দেবে সে তার সোহাগীকে? অপুর চোখে জল। কিসের যাতনায় জল ঠিক বোঝা গেল না, ইন্দ্রিয়ের নাকি অতিন্দ্রিয়ের?
অপুর চেহারায় স্পষ্ট বেদনার ছাপ। পিয়ন তাকে খুঁজতে খুঁজতে টয়লেটে চলে এসেছে। মিটিং ফের শুরু হয়েছে, এমডি সাহেব নাকি ডাকছেন। চাকরি-প্রজেক্ট-ইনক্রিমেন্ট-প্রমোশন কিছুই তখন কাজ করছে না তার মাথায়। নানাবিধ চিন্তায় অস্থির অপুর মাথায় ব্যাথা শুর হল প্রচণ্ড। ওপরে ব্যাথা, নীচেও ব্যাথা। ওপর-নীচের চাপ বুঝি আর সইতে পারলো না অপু। পার্থিব-অপার্থিব নানাবিধ চিন্তা পরে করা যাবে- এই জ্ঞান করে জ্ঞান হারিয়ে ‘ভাইরে- ’ বলে ঢলে পড়ল পিয়নের কাঁধে।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29275393 http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29275393 2010-11-21 16:05:30
আজ আমার জন্মদিন গো!
বয়স হচ্ছে বুঝি!

তাছাড়া জন্ম-মৃত্যুর ভাবনা ইদানিং বেশ ভাবায় আমাকে। শৈশব-কৈশরেরা সময়-অসময় বোঝে না, প্রায় এসে হানা দেয় আমার বদ্ধ কপাটে। ফুৎকারে উড়িয়ে দিতে চায় স্মৃতির মলাটের ধুলিকণাগুলো। যেন ইশারায় জানিয়ে দেয়,

“একবার খুলে দেখ্ পুরনো লালচে খাতা,
শুঁকে দেখ্ একবার পুরনো সেই গন্ধ,
দেখিস,
গন্ধে গন্ধে মাতাল হবি, কত কিছুই দেখতে পাবি,
যা কখনো যায় না ভোলা, ঝকঝকে সব ছবি।”
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29275289 http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29275289 2010-11-21 12:26:00
কবি (গল্প)
“কথা দাও, কথা দিবে– ‘কথা ক’ব কবিতায়’,
কত কথার কথকতায় কবি মন খাবি খায়।”

কারণ হয়তো এই, কবিতা তার খুবই প্রিয়। না, বইয়ের পৃষ্ঠার কোন কবিতা নয়। রক্ত মাংসে গড়া কমনীয় এক রমনী; কবিতা। যদিও কবিতা কিংবা ছড়া সম্পর্কে তার স্বচ্ছ কোন ধারণা নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষে এসে কবিতার প্রেমে পড়ে কবির। কবিতা কবিরের দু’বছরের জুনিয়র। দু’জনের সম্পর্ক বড় ভাই ছোট বোনের মত। কিন্তু একদিনের ছোট্ট একটি ঘটনা উপলক্ষে এই সম্পর্ক অন্যদিকে মোড় দিতে চাইল কবির।

এদিন কবিরের ক্লাস ছিল না। দুপুর প্রায় বারটা। সে গায়ে প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে লাইব্রেরীর সিঁড়িতে ঝিম মেরে বসে আছে। জ্বরের ঘোরে তার চোখে তখন লালবাতি জ্বলছে। তবে কবিতাদের এদিন ক্লাস ছিল। কবির হঠাৎ লক্ষ্য করল তার সামনে কে যেন এসে দাঁড়িয়েছে, কি কি সব জিজ্ঞেস করছে, যার কিছুই সে বুঝতে পারছে না। শুধু ফ্যালফ্যাল করে আগন্তুকের দিকে তাকিয়ে আছে।

কবিতা অনেক প্রশ্ন করল কবির ভাইকে। কবির ভাই কোন উত্তরই দিচ্ছেন না। কেমনভাবে যেন তাকিয়ে আছেন তার দিকে। চোখ দুটো লালচে, জ্বলজ্বল করছে। একসময় কবির ভাইয়ের গায়ে হাত দিয়ে চমকে ওঠে কবিতা। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। সাহায্যের আশায় এদিক ওদিক তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেল না সে। আজ কবিতার ক্লাস ছিল, সে যায় নি। লাইব্রেরীতে কাজ আছে। কিন্তু লাইব্রেরীর সিঁড়িতে অসুস্থ কবির ভাইকে, একা ফেলে রেখে যেতে মন চাইছে না।

কবিতা শুনেছে, কবির ভাই মেসে থাকেন। মেসটাও সে চেনে না। তাছাড়া কবির ভাইয়ের কাছ থেকে তো কোন কথাও বের করা যাচ্ছে না। কবিতার খুবই মায়া লাগল। সে সিদ্ধান্ত নিল কবির ভাইকে বাসায় নিয়ে যাবে। মা একটু গাঁইগুঁই করতে পারে, কি আর করা।

কবিতাদের বাড়ীটি বিশাল। বড়লোকের আলিশান বাড়ী, শহরের একপ্রান্তে। এলাকাটা পাহাড়ী, উঁচু নীচু। কবির ভাইকে অনেক কষ্টে দাঁড় করিয়ে গাড়িতে তুলে বাসায় নিয়ে আসে কবিতা। তারপর ধরাধরি করে গেস্টরুমে এনে শুইয়ে দেয়। ভাগ্যিস ঘরে তখন মা ছিল না।

বিউটির মা খুবই করিৎকর্মা। খালি বালতি, পানিঅলা বালতি, প্লাস্টিকের মগ, পলিথিন, গামছা ইত্যাদি-ইত্যাদি সব এনে ঠিকঠাক করে দিয়ে গেছে। পানিও সে নিজেই ঢালতে চেয়েছিল, কবিতা নিষেধ করেছে। তারপর বিউটির মাকে ঘরের অন্য কাজে পাঠিয়ে, অনেক সময় নিয়ে বেশ যত্ন করে কবির ভাইয়ের মাথায় পানি ঢালতে থাকে কবিতা।

পানি চিকিৎসায় ভাল কাজ দিয়েছে। এতক্ষণ তো কবির ভাই কোন কথাই বলছিল না। এখন অন্তত ঠোঁট দু’টো নাড়ছেন। কবিতা কবির ভাইয়ের মাথাটা ভালভাবে মুছে দিয়ে, এক গ্লাস দুধের সাথে একটি প্যারাসিটামল খাইয়ে শুইয়ে দিয়েছে। কিছুক্ষণ পরেই কবির ভাই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছেন।

ঘুম ভেঙ্গেই কবির বেশ চাঙ্গা অনুভব করল। বুঝতে পারল না সে কোথায়। এত সুন্দর ঘর! কি চমৎকার পালঙ্ক! পালঙ্কে তার পাশে কবিতাকে বসা দেখে আরো অবাক হল সে। তারপর কবিতা একে একে সব খুলে বলায় সে বুঝাতে পারল, কেন সে এখানে।

কবিতা কবির ভাইয়ের কপালে হাত রাখল। কবিরের চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল! সাথে সাথে চোখ বন্ধ করে ফেলল সে। আহ! কি ঠাণ্ডা হাত! প্রাণটা যেন জুড়িয়ে গেল (নাকি শরীরটা?)।

কবিরের জ্বর দু’একদিনে সেড়ে গেলেও তারপর থেকে তার সবকিছু এলোমেলো হয়ে যেতে লাগল। সারাক্ষণ মাথায় শুধু কবিতা ঘোরে। তখন থেকেই ‘ক’ বর্ণের প্রতি সে অনুরক্ত।

এমন মদির সময়েই সে ‘ক’ বর্ণের বর্নাঢ্য আয়োজনে জীবনের প্রথম কবিতা লিখেছে। তারপর অনেক শঙ্কা-সংকোচের পাহাড় ডিঙ্গিয়ে সেই বিখ্যাত কবিতাটি কবিতা বরাবরে প্রেরণ করেছে। এবং সর্বোপরি জানতে পেরেছে, ‘আজ বহুদিন যাবত কবিতা তার সহপাঠি আহাসান উল্লাহ্’র সাথে একজোটে স্বপ্ন দেখছে ঘর বাঁধার। সুতরাং কবির ভাইয়ের কবিতার সাথে একাত্ম হওয়া কবিতা’র পক্ষে কোনভাবেই সম্ভব নয়।’

এহেন নির্দয় শুনানির পরপরই মুমূর্ষু হৃদয় হতে জন্ম নেয় ‘জ’র সমারোহে কবি’র দ্বিতীয় কবিতা।

“জ্বরে জড়সড় জীবন যখন,
জীর্ণ জানু গেঁড়ে প্রণয় মেগেছে,
বিরুদ্ধ উত্তরে জালালী কইতর
জ্বলিতে জ্বলিতে জ্বলিয়া মরিছে।”

ক’দিন পর আবার জ্বরে পড়ল কবি কবির। এই জ্বরের ঘোরেই রচিত হয়েছিল তার জীবনের শেষ কবিতাটি। ধারাবাহিকতা অনুযায়ী শেষের কবিতায় যে বর্ণটির প্রাধান্য থাকার কথা ছিল তা হল ‘আ’। আছেও তা। কিন্তু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায় সেখানে ‘আ’র চাইতে বেশী প্রাধান্য পেয়েছে ‘হ’। তবে প্রচ্ছন্নভাবে। ‘হ’র ভিতর দিয়েই বুঝি প্রেমিক হৃদয়ের চিরন্তন হাহাকার দেখা দিয়েছে করুণভাবে।

“আশেকানে আহাসান?
যাহ্ কবিতা যাহ্,
মন দিল্ পেরেশান
আহ্! আহ্!! আহ্!!!]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29260955 http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29260955 2010-10-25 12:09:33
বাসর মমতার কপাল ভাল। এমন ভাল পাত্র মিলে যাওয়াটা খুবই মুশকিল। অবশ্য কারো কপালের ভালমন্দ বিচার করাটা বেশ কঠিন। কপালের লিখন বৃত্তাকারে ঘোরে। ঘুরতে ঘুরতে কখনো সুখ আসে কখনো দুঃখ - কখনো আসে তড়িৎ কখনো বা দীর্ঘ ঘুর পথে। কারো বৃত্তের পরিধি ক্ষুদ্র কারোটা বা প্রশস্ত। এই যেমন ক’দিন আগে মমতাকে নিয়ে লোকে বলাবলি করছিল, ‘আহারে মেয়েটার কপালটাই খারাপ!’ আর এখন, কয়েক মাসের ব্যবধানে নিশ্চয় সকলে উল্টোটাই বলছে।
পাত্রপক্ষ একটি শর্ত দিয়েছেন, বিয়ের পর বাচ্চা গুলো মা’র সাথে থাকতে পারবে না। ছোট মেয়েটা শান্ত প্রকৃতির হলেও বড়টা আমার মতই বিচ্ছু, ক্লাস ওয়ানে পড়ে। মমতার জন্য বড় মায়া হচ্ছে। কি করে থাকবে সে ওদের ছাড়া? ওরাই বা কিভাবে থাকবে? ওহ্‌ খোদা, মানুষকে তুমি মাঝে মাঝে এমন জটিল পরীক্ষায় ফেলে দাও না! মায়ের সাথে বাচ্চাদের অভিমানী সময় গুলো দমকা হাওয়ার মত এসে স্মৃতির পাতাগুলো দ্রুত ওল্টাতে থাকে।
মমতার সাথে বাচ্চাদের দুষ্টুমি দুষ্টুমি খুনসুটি সবসময়ই লেগে থাকত। আর মায়ের বুক নিয়ে দু’বোনের ভাগাভাগি তো ছিলই। খেলতে খেলতে কিংবা গল্প শুনতে শুনতে প্রায়ই তুলতুলে হাতগুলো মায়ের জামার ভেতর ঢুকে বুকের উঞ্চতা পোহাতে ব্যস্ত থাকত। বিশাল পালঙ্কে চার জনে আড়াআড়ি ঘুমোতাম। মাঝে মাঝে ইচ্ছে হত মেয়ে দু’টোকে দু’পাশে নিয়ে ঘুমুতে। ওরাও আমাকে একেবারে নিরাশ করত না। দু’পাশ থেকে দু’জন আমার গলা জড়িয়ে ধরে গল্প শোনানোর আব্দার করত। তখন নিজেকে কি যে সুখী মনে হত! হঠাৎ মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে চমকে উঠতাম, আমার মানিকরা কোথায়? এদিক ওদিক খুঁজতে গিয়ে দেখতে পেতাম, একপাশে কুন্ডুলি পাকিয়ে তিনজনে একজোটে স্বপ্ন দেখছে। কুসুম রঙা বাতির মৃদু আলোয় সবকিছু রহস্যময় মনে হত। মায়ের গলা পেঁচিয়ে নিশ্চিন্ত নিদ্রায় হাসছে দুটো দেবশিশু। মনে হত যেন বিখ্যাত কোন শিল্পীর তৈরী শায়িত কোন ব্রোন্জের ভাস্কর্য। মাঝে মাঝে ওদেরকে চেনা মনে হত, মাঝে মাঝে অচেনা। আমি একলা জেগে স্রষ্টার অপার রহস্যের কথা ভাবতাম; কেউই আমার কেউ ছিল না, একে একে আমার হল।
ঘুমের মাঝেও মায়ের দু’বুকে দু’পাশ হতে দু’জনের দু’টি হাত স্বীয় অধিকার প্রতিষ্ঠা করে রাখত। তিনটি দেহ একটি প্রাণ। শ্বাস প্রশ্বাস যেন একই ছন্দে সঙ্গত করছে। আমি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে সুখদৃশ্য পান করতাম। আমার সমস্ত অনুভব উপচে উপচে সোনার পালঙ্কে গড়াগড়ি খেত। খোদা, তুমি নাকি মুহুর্তেই যা খুশী করতে পারো? মমতার জন্য একটু দয়া করো। ওঁদের মনটা দ্রবীভুত করে দাও, যাতে সে বিয়ের পর বাচ্চাদেরকে তার সাথে রাখতে পারে। তাহলে আমার উপর যে অবিচার তুমি করেছ, তার জন্যে ক্ষমা করে দেব তোমাকে। আমিতো ফুটপাতেই দাঁড়িয়েছিলাম, কেন হঠাৎ রাস্তার দানব ফুটপাতে উঠিয়ে এনেছিলে?
মমতার বিয়েটা হয়ে গেল আজ। বাচ্চারা অবশেষে মায়ের সাথে থাকবার অনুমতি পেয়েছে। ওরা এখন ওদের নতুন দাদুর সাথে ঘুমুচ্ছে। মমতার ভেতরটা গুমরে গুমরে কাঁদছে, আর বাইরে আমি মিটি মিটি হাসছি।
নববধূ তার স্বামীকে পা ছুঁয়ে সালাম করল। স্বামীটি একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বউয়ের দু’বাহু ধরে দাঁড় করালেন। মমতার চোখের কোণে পানি জমে আছে, যেন পলক পড়লেই গড়িয়ে পড়বে। কিন্তু ভুলেও পলক ফেলছে না সে, পাছে নতুন মানুষের চোখে ধরা পড়ে যায়। প্রথম বাসরের কথা মনে পড়ে গেল বুঝি তার?
আশ্চর্য, সেদিনও সে এভাবে কাঁদছিল। অনেক সাধনায় আমাদের স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল, তবুও ওদিন সে ওভাবে কাঁদছিল কেন? সেকি নতুন অধ্যায় শুরু হওয়ার আনন্দে নাকি ফেলে আসা সময়গুলো হারিয়ে ফেলার বেদনায়? হঠাৎ বিদ্যুৎটা চলে গেল। মনে হল, মমতার নিকষ কালো চুলগুলো আশীর্বাদ হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে ঘরময়। কষ্টে খুলে রাখা তার চোখের পাতাগুলো বন্ধ হল গভীর ভাবে। গড়িয়ে গেল ঝরণা।
স্বামীটি নতুন বউয়ের হাত ধরে বারান্দায় নিয়ে আসলেন। বাইরে অথই অন্ধকার, কুল কিনারা দেখা যায় না। ভদ্রলোক তাঁর স্ত্রী’র কাঁধে হাত রাখলেন। মমতা কুঁকড়ে গেল। তার ঝাপসা চোখ জোড়া স্থির হয়ে আছে তারা ভরা গহীন আকাশের দিকে।
নিজেকে লুকিয়ে নিতে ইচ্ছে হল। এই রাতে, আকাশের অযুত যোজন দূরে, আমার খোঁজ করা কি উচিৎ হবে তার?
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29192883 http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29192883 2010-07-05 12:35:35
আশ্রয় বৌমা আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার সময় হারুন মিস্ত্রি’র বয়স ছিল ঊনষাট। তবে প্রথম দিকে প্রয়োজনের চাইতে সঙ্গটাই ছিল প্রধান। প্রয়োজন অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠার পর থেকে উনি আমাকে শরীরের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বলেই মনে করতেন। স্কুল কমিটি’র লোকেরা হারুন মিস্ত্রিকে শেষ বয়সে দারোয়ানীর চাকরিটি জুটিয়ে দিয়েছিল। এতে করে চাকরির সাথে সাথে মাথা গোঁজার ঠাঁইটাও জুটে গিয়েছিল। চাকরিটা তেমন কঠিন না। টিফিনের সময় গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা, স্কুল ছুটির পর ছেলে মেয়েদের বড় রাস্তাটি পার করিয়ে দেয়া, আর মাঝে মাঝে কিছু ফাইলপত্র এখান থেকে সেখানে আনা নেয়া করা। প্রাইমারী স্কুলের ছোট ছোট ফুলকলিদের সাথে সময় কাটাতে ভালই লাগে। বারান্দায় বসে মাঝে মাঝেই তার স্কুল জীবনের কথা মনে পড়ে যায়। বহু বছর আগে ফেলে আসা বিহার অঞ্চলের রুক্ষ কষ্টকর সময়গুলো এখনও তাকে টানতে থাকে পরম মমতায়। ছেলেবেলার ধূলোবালি কি অত সহজে ভোলা যায়? সাতচল্লিশের দেশভাগের সময়কার কথা, তারা ক’জন দ্বি জাতী তত্বের ঘেরাটোপে পড়ে ছুটে এসেছিল বাংলাদেশের দক্ষিণপূর্বাঞ্চলের এই এলাকায়। ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকে এসে এইখানে যারা জড়ো হয়েছিল, তাদের মধ্যে বেশীর ভাগই ছিল নির্মাণ শ্রমিক। হারুন এই পেশার লোক না হলেও, যুবা বয়সের নতুন স্বপ্নে বিভোর হয়ে সেও সঙ্গীদের সাথে মিশে গিয়ে একই পেশা বেছে নেয়। আহা, আজ কতকাল গত হয়ে গেল!
স্কুল মাঠের পেছন দিকে বন্ধ্যা কাঁঠাল গাছটির গা ঘেঁষে একটি ঘর তুলেছে মিস্ত্রি। সেখানে সে তার স্ত্রীকে নিয়ে নতুন করে সংসার পেতেছে। সদা হাস্যময় প্রাণবন্ত স্ত্রীটি একদিন হঠাৎ করে নির্বাক হয়ে গিয়েছিল। ক’দিন আগে ছেলেটি তার বাবার উপর রেগে গিয়ে আমাকে ঘাড় ধরে উঠোনে ছুঁড়ে মেরেছিল। আমার অবশ্য তেমন কিছু হয়নি, শুধু এক জায়গায় একটু থেঁতলে গিয়েছিল। হারুন মিস্ত্রির স্ত্রী চিৎকার করে মূর্চ্ছা যান। আচ্ছা, তিনি কি সেদিন স্বামীকে অপমানিত হতে দেখে মূর্চ্ছা গিয়েছিলেন নাকি আমাকে অবহেলিত হতে দেখে? হয়তো ভেবেছিলেন, আমার গায়ে হাত তোলা মানে তো তার স্বামীর গায়েই হাত তোলা। তারপর দু’দিন ধরে খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ক’দিন বিছানায় কাটিয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠলেও বাকরুদ্ধ হয়ে যান পুরোপুরি। নতুন সংসার শুরুর পর থেকে বেচারা স্ত্রীটি পরিচিতদের বাড়ী বাড়ী গিয়ে হাত পাতা শুরু করেছিলেন। মূক বলে মুখের কাজ হাতেই সাড়া যায়। এতে লজ্জা অনেক কম লাগে।
একমাত্র ছেলে হাসেম আগে বাপের সাথে যোগানদারের কাজ করত। এখন সে পূর্ণাঙ্গ মিস্ত্রি। যতক্ষণ বাসায় থাকে ততক্ষণ শুধু বউয়ের সাথে ঝগড়া করে। বৌমা ঠিকা ঝি, পান্না খালাদের বাসায় কাজ করে। আট বছরের নাতিটা টুকটুক করে স্কুলে যায়। হরুন মিস্ত্রি’র ভাত কাপড়ের টানাটানি চললেও পান বিড়ির অভাব পূরণ করত চাচা মিয়া। তাও যে পুরোপুরি নিঃস্বার্থ ভাবে করত তা নয়, সেও নিঃসঙ্গ। ক্রেতা এলে পান সিগারেট এগিয়ে দেয়া ছাড়া আর তেমন কোন কাজ ছিল না তার। বিড়ির দোকানটা সময় কাটানোর জন্যেই দেয়া। ঘর চলে মেয়ের জামাই’র পকেট থেকে। মিস্ত্রি দিনের বেশীর ভাগ সময় দোকানের সামনে গাছের গুড়িটার উপর বসে গুনগুন করে পুরনো হিন্দি গানের সুর ভাঁজে। কয়েকমাস হয় ছেলের সাথে কথাবার্তা বন্ধ। ঘটনার শুরু সামান্য বিড়ি থেকে। এক রাতে ছেলে ঢুলতে ঢুলতে বাসায় ফিরে হুলস্থুল কান্ড বাঁধিয়ে দেয়। বৌমা যখন রক্তাক্ত দাঁতের দিকে তাকিয়ে শরীর কাঁপিয়ে নিশব্দে কাঁদছিল, নাতিটা তখন দাদার পাশে ঘুমের ভান করে পড়েছিল। হাসেম গজগজ করতে করতে জড়ানো গলায় বলতে থাকে, চাচা মিয়া সবার সামনে বাকী পাওনা চেয়ে তাকে নাকি হেনস্থা করেছে। বউমা অবাক, কারণ সংসারের কোন কিছূই সে চাচা’র দোকান থেকে বাকি করে না। এই কথা শুনে ছেলে আরো তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে। তার সাফ কথা, ওসব পান-বিড়ির পয়সা সে আর যোগাতে পারবে না। সংসারের প্রয়োজনীয় খরচা যোগাতে গিয়ে এমনিতেই তাকে হিমশিম খেতে হয়, তার উপর যতসব উটকো খরচ। বৌমার এহেন অত্যাচারিত হওয়ার জন্য নিজেকেই দোষী বলে মনে করে মিস্ত্রি। তারপর, নাতির সামনে বৌমাকে এভাবে রক্তাক্ত হতে দেখে লজ্জায় ঘর ছাড়ে। সারারাত নির্ঘুম কাটিয়ে পরদিন সকাল বেলা সস্ত্রীক স্কুল কমিটি’র দারস্থ হয়। তারপর, তারপর গাছতলায় পুরনো সংসার নতুন করে শুরু করা। নতুন সংসারটি অবশ্য বেশীদিন টেকেনি। বছর খানেকের মাথায় বোবা স্ত্রীটি হারুন মিস্ত্রিকে একা করে দিয়ে চলে যায় চিরতরে।
ইদানিং মিস্ত্রির চোখ দিয়ে প্রায় পানি গড়ায়। সুমন বলল, ‘ডাক্তর দেখান, নইলে চোখ যাইবো।’ যদিও সে ঠিকই জানে মিস্ত্রি’র চোখের চাইতে মনের সমস্যাই বেশী। সুমনের বাবা দোকানের সামনে দরজার কাছে বসা। সে ছেলেকে নির্দেশ দেয় বকবক না করে ভাল ভাবে দাঁড়ি কামাতে। বাবার ধমকে সুমন হাসে। হরুন মিস্ত্রি সুমনকে জিজ্ঞেস করে, কেন সে বুড়ো বাবাকে দোকানে এনে বসিয়ে রাখে? সুমন মুখ দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। হারুন মিস্ত্রি নাক কোঁচকায়, ব্যাটা বোধ হয় আজ দাঁত মাজেনি। সুমনের বাবা তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, ‘বউমা খুব ভালা’। সুমন ঝামটে ওঠে, সময় মত খাওয়াটাও যে দিতে পারে না তার জন্য এত দরদ দেখানোর কোন মানে হয় না। তার মুখ দিয়ে আগুনের হলকা বের হতে থাকে, ‘বাবু.. বউয়ের জ্বালায় বাপরে দোকানত আনি রাখি’। সে বকবক করতেই থাকে, ‘জমিদারের মাইয়া..।’ মিস্ত্রি শার্ট খুলে হাতটা ওপরে তুলে ধরে। ছেলেটা বড় ভাল, তার কাছ থেকে টাকা নিতে চায় না। কাজ শেষ করে আড়মোড়া ভাঙ্গে সুমন। পাশের খদ্দেরের গালটা কেটে গেছে। তিনি ‘ওফ্‌’ করে উঠলেন। সুমন এগিয়ে গিয়ে নবিশ নাপিতটির গালে সজোরে একটা চড় কষায়। তারপর খদ্দেরের কাটা স্থানে এ্যান্টিসেপটিক লাগিয়ে দিয়ে আগের জায়গায় ফিরে আসে। এসে দেখে মিস্ত্রি আগের মতই চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে। চোখের কোণে পানি নিয়ে স্থির চেয়ে আছে সামনের আয়নার দিকে। কিছুক্ষণ ডাকাডাকি করেও যখন কোন সাড়া পাওয়া যায় না, তখন গায়ে হাত দিয়ে ঝাঁকুনি দিতেই ঢলে পড়ে মিস্ত্রি। ভাল ভাবে পরখ করে দেখার পর সুমনের মুখ দিয়ে আরো একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। এবার তার দুর্গন্ধযুক্ত প্রশ্বাস মিস্ত্রি’র ঘ্রাণেন্দ্রিয়কে বিন্দুমাত্র স্পর্ষ্শ করে না আর।
পূব পাড়ার কাজটি তখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। বাইরের দেয়ালের এককোণে সিমেন্ট লাগানোর সময় মাত্র পাঁচ ফুট উঁচু মাচা থেকে পড়ে গিয়েছিল হাসেম। বয়সে পেয়ে বসেছে তাকে। আগের মত খাটতে পারে না আর। দুর্ঘটনায় পা দু’টি অক্ষত থাকলেও ডান পায়ে কি যেন হয়েছে। খুব একটা জোর পাওয়া যায় না। দেড় মাস পঙ্গু হাসপাতালে কাটিয়ে আজ ঘরে ফিরবে হাসেম। সকালের দিকে জোয়ান ছেলেটি তাকে হাসপাতাল থেকে আনতে গেছে। বউমা একহাতে আমাকে ধরে ছোট্ট রান্না ঘরের পিঁড়িতে আনমনা হয়ে বসে আছে। দরজায় কড়া নড়ার শব্দ পাওয়া যায়। ওরা এল বুঝি। বউমা কপাট খুলে দেখতে পায়, হাসেম তার ছেলের কাঁধে ভর দিয়ে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বউমা তার শশুর মশায়ের সামনে যেভাবে বাড়িয়ে ধরেছিল, এখনও ঠিক তেমনি ভাবে তার স্বামীর সামনে বাড়িয়ে দেয় আমাকে। হাসেম চমকে বউমার দিকে তাকায়। বউমা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। একদিন যে হাত আমাকে ঘাড় ধরে বাইরে ছুঁড়ে মেরেছিল, সেই হাতটি ছেলের কাঁধ হতে ছুটে এসে লাজুক ভাবে আমার বাঁকানো কাঁধে আশ্রয় খুঁজতে থাকে। সতেরটি বছর সঙ্গী হীন থাকার পর, আমার কাঁধে আরো একজনের ভার তুলে নিই আমি।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29191013 http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29191013 2010-07-03 11:28:18
পদ্ম ঘোষবাবু প্লেনে যাওয়ার কথা বলাতে রায়হান সাহেব খুশীই হলেন। যাক জীবনে প্রথমবারের মত কাছ থেকে আকাশ দেখা যাবে। প্রৌঢ় ঘোষবাবু সবদিক থেকে সিনিয়র হলেও দু’জনের মাঝে দূরত্বটা কম। রায়হান সাহেব বুঝতে পারছেন না ঢাকায় তার কাজটা কি। মনে হচ্ছে শুধুমাত্র সঙ্গ পাওয়ার জন্যেই তাকে বেছে নিয়েছেন ঘোষবাবু। কিন্তু তার যেতে ইচ্ছে করছিল না মোটেই। নেহায়েত জি এম সাহেব বলেছেন বলে যেতে হচ্ছে। জি এমের সাথে আবার এমডি সাহেবের খুবই ভাল খাতির। জি এম ব্যাটাকে খুশী রাখা দরকার। এয়ারপোর্টে ঘোষবাবু’র এক দুসম্পর্কের মামা’র সাথে দেখা হয়ে গেল। কথায় কথায় জানা গেল তিনি ঢাকায় একটা মিটিং এটেন্ড করে ফিরছেন। ঘোষবাবু অবশ্য তাঁকে খুব তাড়া দেখিয়ে অভিনয় করে বললেন, তিনি জাপানে একটা কোম্পানী সার্ভে করতে যাচ্ছেন। অবশেষে প্লেনের সুরঙ্গে প্রবেশ। বিশাল প্লেনের ভেতর তিন সারি সিট। তারা মাঝখানের সারির নির্ধারিত স্থানে বসলেন।
বেশীর ভাগ যাত্রীর দৃষ্টি গিয়ে পড়ছে ঘোষবাবুর উপর। রাস্তা ঘাটে অবশ্য দৃষ্টির সাথে কিছু কিছু মন্তব্যও ছুটে আসে। ঘোষবাবু মাঝে মাঝে অবাক হয়ে ভাবেন, খালি রিকশার ড্রাইভারেরা কেন যে তাকে ‘ভাড়া আছে’ বলে এড়িয়ে যায়? তখন বড় অভিমান হয়, চারশ পাউন্ড ওজন খুব একটা বেশী কি? ঘোষবাবু রায়হান সাহেবের কানের কাছে অনবরত বকবক করে চলেছেন। তার কোলের উপরে ঘুমিয়ে থাকা ল্যাপটপটিকে দিয়াশলাইয়ের বাক্সের মত মনে হচ্ছে। রায়হান সাহেব মনযোগ দিয়ে চারিদিক অবলোকন করছেন। সবদিকে খেয়াল রাখা দরকার। বন্ধুরা ‘প্লেন’ সম্পর্কে জানতে চাইলে কি বলবেন তিনি? লাউড স্পিকারে এক কিন্নর কন্ঠী মনভোলানো স্বরে কি যেন বলে চলেছেন। মুখে মোহনীয় হাসি লাগিয়ে এক লাল শাড়ী পরিহিতা সুবাস ছড়িয়ে পাশ দিয়ে হেটে গেলেন। রায়হান সাহেব কিছুক্ষণ উসখুস করার পর আনমনে বলে উঠলেন, ‘মেয়েটি মনে হয় অবিবাহিত।’ ঘোষবাবু কি বুঝলেন কে জানে, তিনি প্রচন্ড শব্দে ধমকে উঠলেন। তার খেয়াল ছিল না যে তিনি এখন অফিসে নন, প্লেনে। তারপর চারিদিকে লোকজন দেখে চুপসে গেলেন। আশপাশের যাত্রীদের ভ্রু কোঁচকানো দৃষ্টির সামনে দু’জন কিছূক্ষণ চুপ করে রইলেন। কিছুপরে চাপা স্বরে ঘোষবাবু বললেন, ‘চোখ এত দিকে ঘোরে কেন?’ রায়হান সাহেব অপমানিত বোধ করলেন। বিড়বিড় করে বললেন, ‘স্যার আপনি সবার সামনে এভাবে..।’ কথা শেষ করার আগেই ঘোষবাবু আগের চাইতে একটু নিচু স্বরে আবার ধমকে উঠলেন, ‘মাথায় সর্বসময় বিয়ের কথা ঘোরে, না?’ একটু দূরে লাল শাড়ীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ওই মেয়েটির কথা বলছিলে না, হ্যাঁ.. উনি অবিবাহিতা।’ অবাক রায়হান সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, ‘স্যার আপনি কি করে জানলেন?’ ঘোষবাবু একটু থমকে গেলেন। তারপর আবারো ধমকে উঠলেন, ‘গাধা.. আমি কি করে জানবো এ্যাঁ? আমি বড়জোর আমার স্ত্রীর কথা জানতে পারি.. আমার স্ত্রী বিবাহিতা।’ এসময় সেই লাল শাড়ী এসে ঘোষবাবুর কাছে জানতে চাইলেন, ‘কোন সমস্যা?’ তিনি বললেন, ‘না না.. ছেলেটা কেবলই বকবক করে চলেছে, তাই একটু ধমকে দিলাম.. হেহ্‌ হেহ্‌ ..।’। তরুনী রায়হান সাহেবের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে চলে গেলেন। ওফ্‌ এই সুন্দরীর সামনে স্যার তার সাথে এইরকম ব্যবহার করলেন? রায়হান সাহেব করুন মুখে বললেন, ‘স্যার প্লিজ..।’ ঘোষবাবু দাঁত কেলিয়ে নিঃশব্দে হাসলেন। হঠাৎ একটা ঝাকুনিতে রায়হান সাহেব চমকে উঠলেন। প্রশ্ন নিয়ে ঘোষবাবুর দিকে তাকাতেই দেখলেন তিনি সবজান্তার মত হাসছেন, ‘ভয়ের কিছু নেই.. প্লেনটা আকাশে উঠতে যাচ্ছে।’
কিছুক্ষণ পর, সেই লাল শাড়ী পরিহিতা হাতে একটা ট্রে নিয়ে পেছনের সিট গুলোয় ঘুরে তাদের কাছে আসলেন। ট্রেতে নানা রঙের, নানা আকৃতির চকোলেট। ঘোষবাবু একটি চকোলেট নিলেন। তার দেখাদেখি রায়হান সাহেব একটা নিলেন। ঘোষবাবু জেদ করে রায়হান সাহেবের দিকে তাকিয়ে আরো একটা নিলেন। রায়হান সাহেব আরো একটা নিতে গিয়ে অপ্রস্তুত হেসে তরুণীর দিকে তাকালেন। তরুণী রায়হান সাহেবকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি আর নেবেন?’ ঘোষবাবু হঠাৎ জানালা দিয়ে মেঘ দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। রায়হান সাহেব লজ্জায় হাতের চকোলেটটা রেখে দিলেন ট্রেতে। রূপসী তার ঠোঁটের ডান পাশের কালো তিলটি নাচিয়ে সামনে অগ্রসর হলেন। বয়সটাই শালার গোলমেলে। কোন সুন্দরী একটু তাকিয়ে হাসলেই বুকটা ধ্বক করে ওঠে, মনে হয় মেয়েটা বুঝি..।
রায়হান সাহেব তার চোখ নিয়ে বড় সমস্যায় পড়েছেন। চোখের মণি গুলো নড়ছে না। মণিজোড়া আটকে আছে লাল শাড়ীতে। লাল শাড়ী প্লেনের পেছনদিকের এক বয়স্ক যাত্রীকে সাহায্য করছেন। স্বেচ্ছায় দু’জনের চোখাচোখি হয়ে গেল একবার, অমনি বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। অবশেষে রায়হান সাহেবের হৃদয়টা ভেঙ্গে চুরে মাটি স্পর্শ করল প্লেন। সিটবেল্ট খুলে পেছনের দিকে হাটা শুরু করলে ঘোষবাবু তাকে ডাক দিলেন, ‘এইযে গাধা.. দরজা সামনে।’ রায়হান সাহেব থতমত খেয়ে সামনের দিকে আসতে আসতে কুঁই কুঁই করে বললেন, ‘না মানে.. ভাবলাম, নামার দরজাটা বুঝি পেছনে।’ ঘোষবাবু কাশছেন নাকি হাসছেন বোঝা গেল না। খুব রাগ হল রায়হান সাহেবের। ঘোষবাবু তাকে লাল শাড়ীর কাছ থেকে ডেকে এনে নিজেই এগিয়ে গেলেন ওদিকে। তারপর লাল শাড়ীকে কি যেন বলে ফিরে এলেন। লজ্জা শরম বলতে কিছু নেই লোকটার।
ক্যাবে করে যেতে যেতে রায়হান সাহেব ঘোষবাবুকে জিজ্ঞেস করলেন,‘স্যার অফিসের কাজতো আরো একদিন পরে.. আমরা কি ট্রেনে বা বাসে আসতে পারতাম না?’ ঘোষবাবু আড়চোখে তাকালেন, ‘পারতাম.. তবে অফিস যেহেতু বিল দেবে, এত কষ্ট করার কি দরকার।’ রায়হান সাহেবের খুবই অস্বস্থি লাগছে, ঘোষবাবুর প্যান্টের জিপারটি খোলা। সেখান থেকে ইন করা শার্টের একটি কোণা বেরিয়ে এসেছে। অন্যদিকে তাকিয়ে রায়হান সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, ‘স্যার আমরা কি এখন হোটেলে উঠব?’ ঘোষবাবু উদাস হয়ে গেলেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘নাহ্‌.. আমার দোস্তের জন্য মনটা কেমন করছে। প্রথমে একটা রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ সাড়বো। উম্‌ম্‌ তারপর, তারপর মনিপূরী পাড়া.. রাতটা ওখানেই কাটাব।’ বিষ্মিত রায়হান সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার বন্ধু বুঝি ওপাড়ায় থাকেন?’ ঘোষবাবু হাই তুললেন, ‘নাহ্‌.. ওপাড়ায় তার বউ থাকেন।’ রায়হান সাহেব আরো বেশী বিষ্মিত হয়ে বলে উঠলেন, ‘তাহলে আমি কোথায় থাকবো?’ ঘোষবাবু আরো উদাস হয়ে গেলেন। তিনি কি একটা চিন্তা করতে করতে বললেন, ‘সমস্যা নাই.. ওখানে অনেক রুম আছে।’ রায়হান সাহেব উসখুস করছেন। বেশ কিছুক্ষণ পর তিনি কাচুমাচু করে বললেন, ‘স্যার অফিস যখন বিল দেবে, তখন আমরা হোটেলে উঠি না কেন?’ ঘোষবাবু ভ্রু কুঁচকে দ্রুত সরে যাওয়া রাস্তার সাইনবোর্ড গুলো পড়তে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
হোটেল বয় আর কেউ আসবে কিনা জিজ্ঞেস করাতে ঘোষবাবু ধমকে উঠলেন, ‘কেন আমাদের পছন্দ হচ্ছে না?’ বয় রীতিমত অবাক, এত খাবার এরা দু’জনে খাবেন! বয়টা ফাজিল টাইপ। সে তরি তরকারীর বাটিগুলো ঘোষবাবুর সামনে জড়ো করতে লাগল। এবং রায়বাবুও সেই বাটিগুলো একে একে খালি করতে লাগলেন। রায়হান সাহেব বাসার বাইরে তেমনে একটা খেতে পারেন না। তবু রূপচাঁদা মাছ দিয়ে অল্প খেলেন।
রেস্টুরেন্টটা ভালই। তবে মনটা কেমন যেন আঁকুপাঁকু করছে। আসলে চাটগাঁ’র বাইরে রায়হান সাহেবের খুব একটা যাওয়া হয়না। তিনি হাত ধূয়ে এসে ঝিম ধরে বসে আছেন। মায়ের কথা মনে পড়ছে খুব। তার হাসি পেয়ে গেল। মা’টা তার বউ দেখতে পাগল হয়ে গেছে। একটি গুরুগম্ভীর গর্জনে তার ভাবনায় ছেদ পড়ল। তাকিয়ে দেখেন ঘোষবাবুর মুখ হা করা, উনি ঢেকুর তুলছেন। কিছুক্ষণ পর ঘোষবাবুর দিক থেকে আরো একটা গর্জন ভেসে এল। তবে এবার ঘোষবাবুর মুখ বন্ধ, শরীরটা একপাশে কাত করা। শব্দের ধরন শুনে রায়হান সাহেব নিশ্চিত, এটি ঢেকুরের শব্দ নয়। ঘোষবাবু হেলান দিয়ে বসে পেটটাকে যথাসম্ভব আরাম দেয়ার চেষ্টা করছেন। রায়হান সাহেব মনে মনে ভাবছেন, ‘তোর হা করা মুখে ভাত ভাসতে দেখা গেছে স্‌ সালা.. গলা পর্যন্ত খেয়েছিস আজ।’ কিন্তু মুখে বললেন, ‘স্যারতো তেমন কিছু খেলেন না?’ ঘোষবাবু উত্তর না দিয়ে, মুখ বিকৃত করে দৌড়ে একটি রুমে গিয়ে ঢুকলেন। রায়হান সাহেব বয়কে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ঐ রুমটা কিসের?’ বয় হেসে বলল, ‘ঐডা ফেশাকখানা।’ সাথে সাথে ভেতর থেকে ঘোষবাবুর নির্ঘোষ শোনা গেল। উনি বমি করছেন। কিছুক্ষণ পর বিধ্বস্ত ঘোষবাবুকে দেখা গেল কুঁজ হয়ে হেঁটে ধীর পায়ে এগিয়ে আসছেন। বেল্ট খোলা, এবার জিপারের ভিতর থেকে ইন করা শার্টের দু’টি কোণাই বেরিয়ে এসেছে। বয় বিল নিয়ে উপস্থিত। ঘোষবাবু বললেন, ‘ তাড়াতাড়ি বিলটা দাও.. উঠতে হবে।’ রায়হান সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, ‘স্যার দই খাবেন?’ কি যেন ভাবলেন ঘোষবাবু, ‘উম্‌ম্‌ম্‌.. হ্যাঁ, খাওয়া যায়।’ বয়টা কিছুই জানে না কিছুই বোঝে না এমন ভাবে জিজ্ঞেস করল, ‘দই কিসে করে দুমু?’ ঘোষবাবু বললেন, ‘ক্যান্?‌’ ফাজিল বয় যেতে যেতে বলল, ‘না মানে.. আমগো বড় গামলাডাত্ পরটার কাঁই রাখা আছে..।’ বয়ের কথা শুনে রায়হান সাহেব অপ্রস্তুত, ঘোষবাবু গম্ভীর। আরো গম্ভীর হতে গিয়ে ঘোষবাবু ফিচ্ করে হেসে ফেললেন। বললেন, ‘অফিস যখন বিল দেবে.. তখন গামলা করে খেলেই ভাল হত.. কি বল রায়হান?’ রায়হান সাহেব টেবিলে রাখা ফুলদানির লাল গোলাপটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। বিষয়টি খেয়াল করে ঘোষবাবু বললেন, ‘লক্ষ্য করছি.. আজ তোমাকে যেন লালে বেশী টানছে।’ রায়হান সাহেব লাল গোলাপ থেকে চট করে চোখ সরিয়ে নিলেন। মুখটিপে হেসে ঘোষবাবু বললেন, ‘তা পরশু তেরতম মেয়ে দেখতে যাওয়া বলেছিলে না.. কেমন দেখলে?’ রায়হান সাহেবের বুক থেকে একটি গরম শ্বাস বেরিয়ে এল, ‘এগারতম মেয়েটিকেই অন্য এক ঘটক তেরতম হিসেবে দেখিয়েছে স্যার।’ ঘোষবাবু অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন, ‘তোমাকে যে পছন্দ করেনি সেই মেয়েটাতো?’ রায়হান সাহেব লজ্জা পেলেন। ঘোষবাবু বিষয়টি লক্ষ্য করে পরিবেশটা হালকা করার জন্য বললেন, ‘আচ্ছা মেয়ে দেখতে গিয়ে তুমি সর্বপ্রথম কোন বিষয়টি লক্ষ্য করো?’ ইতিমধ্যে দই এসে গেছে। রায়হান সাহেব হাসলেন, ‘স্যার আমি পাত্রীর মা - খালাদের ভাল ভাবে লক্ষ্য করি।’ ঘোষবাবু অবাক হলেন, ‘কেন?’ এ বিষয়ে কথা বলতে রায়হান সাহেবকে খুবই উৎসাহী দেখাল, ‘মানে, বুড়ো বয়সে পাত্রীটি দেখতে কি রকম হবে তার একটা চেহারা কল্পনা করার চেষ্টা আরকি।’ ঘোষবাবুর দই পর্ব শুরু হয়েছে। চামচটি ঘোষবাবুর মুখ আর দইয়ের বাটিতে দ্রুত ওঠানামা করছে। তিনি হাসতে হাসতে বললেন, ‘বিয়ের ফুল সবে ফুটতে শুরু করেছে.. চিন্তা কোরো না.. হয়ে যাবে।’ রায়হান সাহেব উদগ্রীব হয়ে বললেন, ‘ইয়ে.. স্যার আপনি একবার আপনার এক পরিচিতা’র কথা বলেছিলেন না..।’ ঘোষবাবু চামচ চাটছেন, ‘ও হ্যাঁ..তোমার বাবার সাথে কথা হয়েছে.. তিনি বলেছেন, তুমি যা বল।’ রায়হান সাহেবের চামচ নীচে পড়ে গেল, ‘আপনিতো কোন প্রোগ্রাম দেননি স্যার।’ ঘোষবাবুর তখন আর কোথাও দই অবশিষ্ট নেই। মনে হচ্ছে, স্টিলের চামচটা লজ্জায় কুঁকরে যাচ্ছে। তার সমস্ত মনযোগ কেড়ে নিয়েছে ঐ চামচ।
রায়হান সাহেব অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন, ঘোষবাবু ঘোমটা দেয়া মহিলাটির পাশে বসে বাচ্চা ছেলের মত কাঁদছেন। মহিলাটি চোখ মুছতে মুছতে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এরই নাম রায়হান?’ ঘোষবাবু শুনলেন বলে মনে হল না, ‘দু’দিন বাদে বরাবর এক বছর হয়ে যাবে, আমার মনেই হচ্ছে না ভাবী।’ মহিলাটি রায়হান সাহেবকে বসতে ইশারা করে দেয়ালে টাঙ্গানো স্মৃতি’র দিকে হেঁটে গেলেন। ঘোষবাবু কেঁদেই চলেছেন। তিনিও ছবিটির সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘এখানে আসলে যে রুমে আমি শোয়েব ঘুমাতাম সেটা দেখতে ইচ্ছা করছে ভাবী।’ রায়হান সাহেব এই কান্নাকাটির পরিবেশে কি করবেন বুঝতে পারছেন না। তিনি কেশে বললেন, ‘পানি খাব।’ মহিলা তার দিকে একবার ফিরে তাকালেন। ঘরের দেয়ালে হালকা সবুজ রঙ। কাবা শরীফের ছবির পাশে তিন জনের মাঝারি আকৃতির একটি পারিবারিক ছবি ঝুলছে। ঘোষবাবু আর ভদ্রমহিলা ছবিটির দিকে তাকিয়ে আছেন। ছবিটি যেন তাদের সাথে কথা কইছে চুপিচুপি। ছবির ব্যাক গ্রাউন্ডে আকাশে স্থির হয়ে উড়ছে এক ঝাঁক পাখী। পাখীদের খানিক দূরে একটি প্লেন নাক উঁচু করে আকাশে উঠছে। মনে হচ্ছে বহুদূর হতে ভদ্রমহিলার কন্ঠ ভেসে আসছে, তিনি বললেন, ‘প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে ওর বিমান বাহিনীর বন্ধুরা একটা ঘরোয়া স্মরণসভা করবেন.. ওখানে আমাকে যেতে বলেছেন.. বাসাতেও একটা মিলাদ পড়াতে হবে.. তারপর সময় করে আপনাকে খবর দিব, আপনি ওঁদেরকে আসতে বলবেন।’ কিছুক্ষণ পর হয়তো তাঁর অতিথির কথা মনে পড়ল, ‘আচ্ছা কথাবার্তা পরে হবে, আপনারা হাতমুখ ধুয়ে খেয়ে নিন।’ ঘোষবাবুর পকেটে সম্ভবত রুমাল নেই। উনি শার্টের হাতা উল্টে সশব্দে নাক ঝারলেন, ‘আমরা খেয়ে এসেছি ভাবী.. অফিসিয়াল ট্যুরতো.. অফিসই সব ধরনের খরচ...। রায়হান সাহেব একটা নকল কাশি দিয়ে রুমের সাথে লাগোয়া টয়লেটে ঢুকে পড়লেন।
টয়লেটে কল ছেড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া রায়হান সাহেবের আর কোন কাজ ছিল না। যখন বুঝতে পারলেন রুমটা খালি হয়েছে তখন বেরিয়ে এলেন। কিছুক্ষণ পরে হালকা সবুজ পর্দা সরিয়ে রুমে ঢুকলেন গোলাপী কামিজ পড়া একটি পদ্মফুল। দেয়াল সবুজ, পর্দা সবুজ। আহ্, যেন সরোবরের সবুজ জলে একটিমাত্র পদ্ম ফুটে মিটিমিটি হাসছে। সদ্যস্নাতা’র ভেজা চুলগুলি পিঠে নিশ্চিন্তে ঘুমুচ্ছে। রায়হান সাহেব সালাম দিতে গিয়ে তোত্‌লাতে লাগলেন। গোলাপী’র হাতে একটি গ্লাস ধরা রয়েছে। রায়হান সাহেব একটি ঝাঁকুনি অনুভব করলেন। তার মনে হচ্ছে, তিনি এখনো প্লেনে বসে আছেন। পদ্ম কাছে আসলে, রায়হান সাহেবের চোখ আটকে যায় কালো তিলটিতে। তিলটি নেচে উঠল, সাথে সাথে রায়হান সাহেবের বুকটাও ধ্বক করে উঠল। কোন ভনিতা না করে গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে পদ্ম কথা বলে উঠলেন, ‘অত লজ্জা পেলে চলে, চকলেটটা তখন রেখে দিয়েছিলেন কেন?’
























]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29047816 http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29047816 2009-11-22 13:54:38
জোছোনায় ভার্সিটিতে পড়ার সময় ভালবেসে বাংলা ডিপার্টমেন্টের মেয়েটিকে এক দুপুরে গিয়ে বললাম, ‘মনোয়ারা মনো, তোমাকে যে ভালবাসি তা কি তুমি জান?’ মেয়েটি পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া জসিম স্যারকে ডাক দিল ক্রুর হেসে, ‘স্যার।’ আমি তৎক্ষনাৎ জোর কদমে ফিরে আসি। আর কখনো ওপথ মাড়াইনি। আমার চাকরির বয়স যখন এক বছর তখন ভাতের টেবিলে একদিন হুকুম জারি হল, ‘বিয়ে করতে হবে।’ আমি কপট অনীহা দেখালাম।
মেঘে মেঘে পাঁচ ছ’টি কনে দেখা হয়ে গেছে। তবে ‘মনে ধরা’ যাকে বলে তেমনটি হয়নি এখনো। আরো কয়েকবার মার্কেটে, পার্কে, মিষ্টির দোকানে ঘুরতে ঘুরতে সত্যিই একটিকে মনে ধরে গেল। সত্যি বলছি আমি আজ পর্যন্ত প্রেমে পড়িনি। যা এক আধটু ভাল লেগেছিল তা নিতান্তই অগভীর। কিন্তু মিতুকে দেখার পর বুকের ভেতর আচমকা ঝাঁকি খেলাম। কথা বলার পর আরো বেশী কাহিল হয়ে পড়লাম। দু’জনের নামের মাঝে একটি ছন্দ থাকলেও স্বভাবটা ঠিক আমার উল্টো। আমি কিছুটা ঘোরেল টাইপ, আর মেয়েটা সহজ সরল। চুল গুলো তেমন ঘন নয়, মুখে সর্বদা একটি শান্তি শান্তি ভাব। দু’পক্ষের কথাবার্তা যখন পরিণতির দিকে এগুচ্ছিল তখন একরাতে ভাবী এসে একটি চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘মিতুকে ফোন করিস।’ আমি আকাশ থেকে পড়ার ভান করলাম, ‘কোন মিতু?’ ভাবী মুখ টিপে হেসে বলল, ‘ঢং করিস না।’
রাত বাড়ার সাথে সাথে আমার হৃদস্পন্দনটাও অনিয়মিত হয়ে উঠছিল। ফোন করব কি করব না করে করে যখন শেষ পর্যন্ত করলাম, তখন ঘড়িতে রাত দেড়টা। রিং পড়তে পড়তে মোবাইলটা ক্লান্ত হওয়ার ঠিক আগ মুহুর্তে সতেজ কন্ঠ ভেসে এল ওপার হতে,
-হ্যালো।
-(আমি চুপ)
-হ্যালোওওও..।
বুকের ভেতর শব্দ গুলো বাইরে থেকেই শোনা যাচ্ছে যেন। গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে বললাম,
-ইয়ে আমি জিতু বলছি।
-জি.. কোন জিতু?
ভড়কে গেলাম, মেয়েটাও আকাশ থেকে পড়ল বলে মনে হল। বললাম,
-আপনি জিতু নামের কাউকে চেনেন?
যা ভেবেছিলাম তা নয়। মেয়েটি খিলখিল করে হেসে উঠে বলল,
-চিনিতো।
-কেমন আছ?
-কি সাহস!
-কেন?
-হুট করে তুমি বলে ফেললেন?
-ও সরি.. কেমন আছিস?
-হা হা হা হা হা... মজার তো!
ততক্ষণে আমার হৃদস্পন্দন স্বভাবিক হয়ে এসেছে। একটু রয়ে সয়ে বললাম,
-কি করছেন?
-ওমা, আবার আপনি কেন?
-ওই ইয়ে.. কি করছ?
-বই পড়ছি।
-কার বই?
-সঞ্জিব চট্টোপাধ্যায়।
আমি আর কথা খুঁজে পাচ্ছিনা। সে বলল,
-নাম্বারটা কোথায় পেলেন?
-ভাবী দিয়েছে। তো.. ইয়ে.. পরষ্পরকে জানার জন্য একটু ফোন করলাম আরকি।
-কি জানতে চান বলুন?
-না মানে এই আরকি..
-কি আরকি?
-আসলে ওসব জানাজানি ফানাফানি মুরুব্বিরা করবেন। আমরা একটু কথাবার্তা বলে ফ্রি হওয়া আরকি।
-খোঁজ খবর নিয়েছেন?
-কিসের?
-আমার?
-আহা বললাম না ওসব মুরুব্বিদের ব্যাপার। আপনার.. ইয়ে তোমার কথা বল.. পছন্দ কেমন?
-মানে?
-মানে কেমন ছেলে পছন্দ?
-(হেসে) আপনার মত।
বুকটা ধ্বক করে উঠল। এ মেয়ে তো সাংঘাতিক। হৃদস্পন্দন আবারো বেড়ে গেল। সুহাসিনী বলল,
-হ্যালো.. কথা বলছেন না কেন?
-না.. নাকের কাছে একটা মশা প্যাঁ করে উঠল, সরালাম।
-তা.. আপনার কেমন মেয়ে পছন্দ?
-তোমার মত।
-কেমন?
-শ্যামলা.. মুখে শান্তি শান্তি ভাব.. আর..
-আর?
-আর.. ফিগারটা..
লাইনটা কেটে গেল। নাকি কেটে দিল? আবার করলাম।
-লাইনটা কি কেটে দিয়েছিলে?
-জি না.. মনে হয় নেটওয়ার্কে সমস্যা।
-ও আচ্ছা।
আগড়ম বাগড়ম কথা চলতে লাগল কাকদের ভৈরবী গীত শুরু হওয়া পর্যন্ত। তারপর থেকে আমার সবকিছু এলোমেলো হয়ে যেতে লাগল। ঘুনাক্ষরেও আড্ডায় বিষয়টি জানাইনি। সারা জীবন ওদের জ্বালিয়ে এসেছি। এসব জানালে ওরা কি আর আমাকে ছেড়ে কথা বলবে? ভাবী জিজ্ঞেস করছিল ফোন টোন করেছি কিনা। আমি ‘না’ বলে ধরা খেয়েছি। এদিন আর ফোন করিনি। ভাবলাম সে করে কিনা দেখি। কিন্তু করেনি। আমার ঘুম আসতে কষ্ট হয়েছিল। পরদিন ভেবে দেখলাম, এমন হতে পারে না যে তার মোবাইলে পর্যাপ্ত ব্যালেন্স ছিল না তাই করতে পারেনি। সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে লজ্জার মাথা খেয়ে রাত দু’টায় ফোন করলাম। রিং অর্ধেক পড়তেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো,
-কেমন আছেন?
-জি ভাল.. আপনি?
-ওমা, আবার আপনি কেন?
-ও হ্যাঁ.. কেমন আছো?
-কাল ফোন করেন নি তো?
-ভাবীকে ফোনের কথা বলেছিলে কেন?
-ভাবী জিজ্ঞেস করলেনতো তাই বললাম।
-ও.. যাক, তো.. কি করছ?
-আমি? আমি..
মনে হচ্ছে হয়তো বলবে আমার ফোনের জন্য অপেক্ষা করছে। আহ্ যদি বলে! আমতা আমতা করে বলল,
-ইয়ে.. বই পড়ছি।
-এত রাতে!
-দিনে সময় পাই না তো, তাই রাতে পড়ি।
-রাতে কি পড়?
-উপন্যাস।
-ও আমি ভাবলাম..
-কি?
-ভাবলাম ভারী জামা ছেড়ে হালকা কিছু পড়।
লাইনটা কেটে গেল। নেটওয়ার্কে যা সমস্যা করে না! আবার করলাম। ফোনটা ধরেছে কিন্তু কোন সাড়া নেই ওপাশে। আমি বললাম,
-হ্যালো..
-জি বলুন।
-এই রাতের বেলায়ও নেটওয়ার্কে..
-নেটওয়ার্ক না.. আমিই কেটে দিয়েছি।
-ক্ ক্ কেন?
-আপনি দেখছি শুধু ফাজিল না.. মহা ফাজিল।
-হা হা হা হা হা হা... হো হো হো হো হো..
ভেংচি দিয়ে সে আমার হাসিকে কেমন ভাবে যেন নকল করে করে খানিক হাসল। আমি ধীরে ধীরে ডুবে যেতে লাগলাম তার অথৈই গভীরে।
আজ অফিসে বসের কাছে ঝারি খেয়েছি। ক’দিন ধরে আমাকে নাকি খুবই অমনোযোগী দেখাচ্ছে। প্যান্টের পকেটে মোবাইলটা ভাইব্রেট করে উঠল। ওপাশ থেকে মিতু বলল,
-ব্যস্ত?
-না.. বলো।
-কিছু জানেন?
-কি?
-এ্যাঁহ্ ন্যাকা।
-সত্যি জানিনা.. প্লিজ বলো..
-আর মাত্র একুশদিন।
-কিসের?
-(মিতু ফিসফিস করে বলল) বিয়ের, চৌদ্দ তারিখ।
-তুমি কি করে জানলে?
-একটু আগে ভাইয়া বলল।
হঠাৎ বস এসে বলল, ‘একটু কনফারেন্স রুমে আসেনতো।’ গলাটা খানিক চড়িয়ে মিতুকে বললাম, ‘ভাইয়াকে বিছানায় শুইয়ে রাখ, আমি এক্ষুণি আসছি।’ মিতু হ্যালো হ্যালো করছে, আমি ফোনটা কেটে দিয়েছি। এরপর বাটনে চাপ দিয়ে অফই করে দিয়েছি, মিতুটা নির্ঘাত এক্ষুনি আবার ফোন করবে। বস বললেন, ‘কি হয়েছে?’ আমি কান্নায় কাদা হয়ে বললাম, ‘ভাইয়া নাকি তিন তলার সিঁড়ি থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে নীচে পড়ে গেছে।’ তিনি হন্তদন্ত হয়ে বললেন, ‘যান যান তাড়াতাড়ি বাসায় যান, আর শোনেন নীচে ড্রাইভার আছে.. গাড়ীটা নিয়ে যান।’ আমি ড্রাইভারকে পাশ কাটিয়ে রাস্তায় নেমে মিতুকে ফোন দিলাম,
-হ্যালো, তুমি কি এখনই বের হতে পারবে?
-তখন কি বলছিলেন আবোল তাবোল.. ফোন অফ করে দিয়েছিলেন কেন?
-আহ্ পরে বলব.. এখন চল একটু দেখা করি।
-না.. প্লিজ...
-কেন?
-ভয় লাগে।
-আরে ধ্যাৎ.. দু’দিন পর বিয়ে, আর এখন..
-প্লিজ..
-তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।
-প্লিজ অমন করে বলবেন না। তাছাড়া একবার তো দেখেছেন।
-আরে সে তো কনে দেখার জন্যে দেখা।
-বিয়ের পর ভালভাবে..
হঠাৎ মাটি ফুঁড়ে একটি মাইক্রো এসে আমাকে ধাক্কা দিয়ে চলে গেল। আমি ছিটকে পড়লাম একদিকে, মোবাইলটা অন্যদিকে। লোকজন ছুটে এলো হৈ হৈ করে। কিছুক্ষণ পর একটু ধাতস্ত হলাম। তেমন গুরুতর কিছু হয়নি। শুধু কব্জিতে আর হাঁটুতে একটু ছরে গেছে। বাম পায়ে খুব একটা জোর পাচ্ছি না। মোবাইলটা বন্ধ হয়ে গেছে। অন করে একটু আড়ালে গিয়ে মিতুকে ফোন করলাম। রিং পড়তে না পড়তেই মিতু বলল,
-হ্যালো তখন কি হয়েছিল?
-কোত্থেকে একটা মাইক্রো এসে ধাক্কা দিল।
-(প্রচন্ড উৎকন্ঠা নিয়ে) কোথাও লেগেছে?
-না না তেমন কিছু না, হাঁটুতে একটু ছরে গেছে।
-সত্যি বলছেন তো?
-হ্যাঁ হ্যাঁ সত্যি। আচ্ছা শোন.. এখন রাখছি, পরে কথা হবে।
ভাবী এক্সিডেন্টের কথা শোনার পর সংসারের কাজকর্ম ফেলে আমার সেবায় লেগে পড়ল। কিছুক্ষণ পর মিতুর ফোন আসল। ভাবী বলল, ‘তোকে ধরতে হবে না।’ তারপর কলটা রিসিভ করে লাউড স্পিকারে দিয়ে বলল, ‘কথা বল্।’ আমি কিছু বলার আগে মিতু বলে উঠল,
-প্লিজ সত্যি করে বলুন.. কোথাও লাগেনি তো?
ভাবী জোরে বলে উঠল,
-লেগেছে.. বুকটা ভেঙ্গে খান্ খান্ হয়ে গেছে। এ্যাই মেয়ে, তোমার কাছে খবরটা কি করে গেল?
-জি.. স্লামালেকুম ভাবী।
-ও এখন ঘুমের ঘোরে শুধু তোমার কথা বলছে, গাড়ী পাঠাচ্ছি তুমি এসে দেখে যাও। আর শোন ফোনটা তোমার মাকে দাও..
ভাবী সুযোগ করে দিয়ে গেছে। রুমে আর কেউ নেই। কি মেয়েরে বাবা! হাতটা ধরতে অনেক কষ্ট হয়েছে। দু’জনে পাশাপাশি বসা। কেউ কোন কথা বলছিলাম না। ও তাকিয়ে ছিল ওর কোলের দিকে। আর আমি ওর মুখের দিকে। হাতে হাতে যেন কথা কইছে ফিসফিস করে। আমি নিরবতা ভাঙ্গলাম, ‘এ্যাই মেয়ে.. তোমাকে আমি অনেকদিন ধরে চিনি।’ ও অবাক হয়ে তাকাল,
-কি ভাবে!
-জানি না, তবে মনে হয় জনম জনম ধরে চিনি।
-অমন করে বলবেন না.. আমার কান্না আসে।
-‘তুমি’ করে বল প্লিজ।
-হাত ছাড়ুন।
-না।
-কেউ আসবে।
-আসবে না।
-প্লিজ..
আমি পায়ের ব্যাথায় কঁকিয়ে উঠলাম। মিতু বলল, ‘কি হল।’ আমি গাঢ় গলায় বললাম, ‘আরেকটু কাছে আসোতো।’ সে চট করে হাত ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়াল। আমি হো হো করে হেসে উঠলাম। নিজেকে বড় সুখী মনে হল।
আজ অফিসে যাই নি। সকাল সাড়ে দশটার দিকে মিতু ফোন করল। আমি রহস্য করে বললাম,
-আর মাত্র বিশদিন।
-দিন গুনলে দিন ফুরাবে না মিস্টার.. কি করছিলেন?
-তৃণাকে নিয়ে খেলছিলাম।
-পিচ্চিটা?
-হ্যাঁ.. পিচ্চি পাচ্চা আমার খুবই পছন্দ।
-আল্লা তাই? আমারো।
-ক’টা লাগবে?
-জি?
-তোমার ক’টা পিচ্চি লাগবে?
লাইনটা মনে হয় কেটে দিল। হাসতে হাসতে ফোন করলাম। মিতু ফোন ধরে চুপ করে আছে।
-লাইনটা কেটে দিলে কেন?
-কাটিনি তো.. সম্ভবত নেটওয়ার্কে..
-ও হ্যাঁ.. নেটওয়ার্কের কথা আর বোলো না।
-জি না.. নেটওয়ার্ক না.. আমিই কেটে দিয়েছি। আপনার মুখে কোন আগল নেই?
আমি সশব্দে হাসতে লাগলাম। ওপারে শ্যামলা মেয়েটি রাঙা হয়ে উঠল বুঝি? আচ্ছা শ্যামলা রঙের কেউ লজ্জা পেলে তাদের গালও কি লাল হয়ে ওঠে?
আজ আকাশের চাঁদ ভরাযৌবনে। কাল বাসরে দু’জনে ভিজব জোছোনায়। মিতুকে যখন ফোন করব ভাবছি তখন হঠাৎ ভাবী উঠে এল ছাদে। মুখটা থমথমে। ভাইয়া বকাঝকা করেছে বোধ হয়। ঈশ্ কাল আমার বিয়ে আর আজকে ভাইয়াটা..। ভাবী আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘পাঞ্জাবীটা পড়ে দেখেছিস?’ আমি হেসে বললাম, ‘হ্যাঁ।’ ভাবী আমার বাহুতে মাথা ঠেকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল। আরে এ কাঁদছে কেন? কি ভাবছে সে? বিয়ের পর আমি পর হয়ে যাব কিনা? আমারো কান্না পেয়ে গেল। বেচারা আমাকে এত ভালবাসে যে, মাঝে মাঝে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। আমি পরম মমতায় আমার নিসন্তান ভাবীর মাথায় হাত রাখলাম। গেল বছর বাবার মৃত্যু হলে বিয়ের প্রায় পনের বছর পর ভাইয়া তৃণা নামের মেয়েটিকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে এসেছিল। তবু ভাবী একবার বলেছিল, ‘আমার তো ছেলে একটি রয়েছেই, আর কেন?’ কিছুক্ষণ দু’জনে একসাথে কাঁদলাম। বললাম, ‘আহা এভাবে কাঁদছ কেন?’ ভাবী যেমন হঠাৎ করে এসেছিল তেমনি হঠাৎ করে চলে গেল। মিনিট পাঁচেক পরেই আবার আসল। এখন তাকে বেশ স্বাভাবিক দেখাচ্ছে। আমাকে বলল,
-মিতুর সাথে কথা হয়েছে আজ?
-দুপুরে হয়েছিল।
-ওকে আর কখনো ফোন করিস না।
আমি আকাশ থেকে পড়লাম। না এবার ভান করে নয়। সত্যি সত্যি। জিজ্ঞেস করলাম,
-কেন?
-উনাদেরকে কিছুক্ষণ আগে জানিয়ে দেয়া হয়েছে..
-কি?
-বিয়েটা হচ্ছে না।
বুকটা কেমন শূন্য মনে হল। আমি ভাবীর হাত ধরে বললাম, ‘কেন?’ ভাবী বলল, ‘পরে বলব।’ আমি আর থাকতে পারলাম না, ধমকে উঠলাম, ‘না এখনই বলো।’ ভাবীকে বেশ বিব্রত দেখাচ্ছে। আমি হাত জোর করে বললাম, ‘প্লিজ মা।’ ভাবী অন্য দিকে তাকিয়ে ঢোক গিলে বলল, ‘তোর ভাইয়া খবর পেয়েছে.. (কিছুক্ষণ চুপ) ..মিতু ক্লাস সেভেনে থাকতে একবার রেপ্ড হয়েছিল।’ ভাবী আর দাঁড়াল না। অনন্তকাল পর আমি বর্তমানে ফিরে আসলাম। নীচে নেমে ভাবীকে বেডরুম থেকে ডেকে ড্রইং রুমে আনলাম। বললাম,
-কথাটা মিথ্যেওতো হতে পারে।
-না, কথাটা একশত ভাগ সত্যি।
-আচ্ছা সত্যি হলে সত্যি, কিন্তু এখানে তো ওর কোন হাত ছিল না।
-তুই ভাল করেই জানিস, এই সংসারে তোর ভাইয়া যা বলে তা ই হয়। আমাকে ক্ষমা করিস ভাই।
ভাবী মুখে আঁচল চাপা দিয়ে চলে গেল। দুর্বল মানুষ দুর্বল পায়ে ফিরে এলাম ছাদে। চাঁদের দিকে তাকিয়ে দেখি তার গালে কান্নার দাগ। মনে মনে ঠিক করলাম কিছু একটা করা দরকার। শরীরে কোন বল পাচ্ছি না। মোবাইটা নিলাম। হাতটা কাঁপছে বলে মনে হচ্ছে। মিতুকে ফোন করলাম। ওপাশ থেকে অপ্রত্যাশিত কন্ঠ ভেসে এল, ‘আপনার ডায়ালকৃত নাম্বারটি এই মুহুর্তে বন্ধ আছে..।’ সরু একটি তার যেন ছিঁড়ে গেল বুকের ভেতর কোথাও। মিতু বুঝি অপমানে লীন হতে হতে আরো একবার রেপ্ড হল আজ রাতে।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29045362 http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29045362 2009-11-18 11:02:36
প্রজেক্ট - খোলাকপি
নোবেল প্রাইজটা কোন বাংলাদেশী হিসেবে ডঃ ইউনুসের আগে তেঁতুলতলা হাই স্কুলের ডেমোনস্ট্রেটর বিল্লাল মাষ্টার পেতে পারত। তবে তা ‘শান্তিতে’ নয়, ‘জীবতত্ত্ব বা চিকিৎসা শাস্ত্রে’। কিন্তু তা আর হবার নয়। কারণ আবিষ্কারটি উপস্থাপনের মত কোন তথ্য উপাত্ত মাষ্টার সাহেবের হাতে আর অবশিষ্ট নেই। তাছাড়া এই পর্যায়ে এসে শুরু থেকে শুরু করা একেবারেই অসম্ভব। কারণ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে শুধুমাত্র জসীমের মাথায়। জসীম তেঁতুলতলা হাই স্কুলের পিয়ন। তার বাবা ছিল মহেশখালী দ্বীপের বিখ্যাত কবিরাজ। জসীম লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে গেছেন ঊনিশ’শ একানব্বই সালের ঊনত্রিশে এপ্রিল। মনে পড়ে দিনটির কথা? সেই যে প্রলয়ঙ্করী ঘুর্ণিঝড়?

জসীমের চাকরিস্থলটি চট্টগ্রাম শহরের প্রাণ কেন্দ্রে অবস্থিত। সে মাসে দু’মাসে একবার বাড়ী যায়। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে ঝড়ের দিন সে ছিল বাড়ীতে। তার বিয়ে সংক্রান্ত ব্যাপারটা ততদিনে সকলের কাছে একটি মুখরোচক গল্প হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কারণ তার বিয়ের স্বাভাবিক বয়স পার হয়ে গেছে বছর পনের আগে। বর্তমানে যেসব পাত্রীর সন্ধান আসছে তা প্রায় তার কন্যাসম। বড়ভাইয়ের স্ত্রী আরো একটি কনে দেখা উপলক্ষ্যে তাকে বাড়ীতে ডেকে পাঠিয়েছে। তবে হ্যাঁ, লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যাওয়ার মানে এই নয় যে, সে মারা গেছে। আসলে সে অদৃশ্য হয়ে গেছে সেই ভয়াল রাতে। দৃশ্যমান থাকলে তার মহেশখালী যাওয়াটা সৌভাগ্যের কারণ হত নিশ্চয়ই। কারণ ততদিনে বিল্লাল মাষ্টারের নোবেল পাওয়ার পথ অনেকটাই প্রশস্ত হয়ে গিয়েছিল। মাস্টার সাহেব নোবেল পেলে জসীমও নিশ্চয় রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যেত।

হত দরিদ্র বিল্লাল মাস্টার সংসারের বারজন মানুষের খাওয়া পড়ার যোগান দিতে গিয়ে পাগলপ্রায়। এই দারিদ্রতাই তাকে এমন একটি গবেষনায় নিয়োজিত হতে উৎসাহিত করেছে। অবশ্য এক্ষেত্রে ‘উৎসাহিত’ শব্দটির চাইতে ‘বাধ্য’ শব্দটি অধিক যৌক্তিক বলে মনে হয়। এ্যমিবা নিয়ে এমন ঘোরতর গবেষনা পৃথিবীতে আর কেউ করেছে কিনা সেই বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। মাষ্টার সাহেব অনেকদিন ধরে ভাবছিলেন, হাইব্রিড এ্যমিবা উৎপাদন করা গেলে কেমন হয়? তখন তার স্থান আর মাইক্রোস্কোপের কাঁচের তলায় থাকবে না। সে একটি সাকার রূপ নিয়ে পৃথিবীতে আবির্ভূত হতে পারবে। আদীপ্রাণীটির বিভাজন প্রক্রিয়া শিক্ষার্থী এবং গবেষকদের খালী চোখের সামনেই ঘটতে থাকবে। সবচেয়ে বড় কথা, এই আকালের দিনে একটি সম্পূর্ণ নতুন জাতের ‘সবজি’ পাওয়া যাবে। এ্যমিবা যত দ্রুত বংশবিস্তার করে, তাতে নিশ্চয় অল্প সময়ে চারিদিকে সবজিতে সবজিতে সয়লাব হয়ে যাবে। মাত্রাতিরিক্ত উৎপাদনের ফলে নিশ্চয় এর মূল্য থাকবে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। কিংবা কোন ধরনের মূল্য নাও থাকতে পারে। হয়তো দেখা যাবে, যেকোন তরি তরকারীর দোকানে ‘ফ্রি’ হিসেবে এ্যমিবা দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে যে হারে দ্রব্যমূল্য এবং ভেজালদ্রব্য বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে নিশ্চয় বিনামূল্যে এমন উন্নতমানের সবজি মানুষের দেহ মনে অনেকটা স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে। তবে হ্যাঁ, সবজিটি কিভাবে আরেকটু বেশী মুখরোচক এবং পুষ্টিকর করা যায় সেদিকটায় একটু খেয়াল রাখতে হবে। আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে, যাতে গবেষনা কার্যে রাসায়নিকের চাইতে জৈবিক উপাদানের ব্যবহার বেশী থাকে।

মাস্টার সাহেবের পরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন সবজিটি হবে অনেকটা বাঁধাকপির মত। তবে এটি বাঁধাকপির মত বাঁধা থাকবে না, থাকবে খোলা। এতে করে আকার আকৃতিও বাঁধাকপির চাইতে বেশ বড় হবে। জসীম যদিও এইট পাশ এবং বিল্লাল মাষ্টারের কাজে দীর্ঘদিন ধরে সহায়তা করে আসছে তবুও সে এই গবেষনার বিষয়ে তেমন কিছু জানত না। কবিরাজ বাবার সাথে কাজ করার সুবাদে গাছগাছরা সম্বন্ধে ভাল ধারনা ছিল তার। বিশেষ করে পুঁইলতা আর তেঁতুল গাছ সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তার ভাল জানা ছিল। বিল্লাল মাষ্টার বলেছিলেন, গবেষনা সফল হলে তিনি গবেষনার ভেতর বাহির সব জসীমকে বুঝিয়ে দেবেন। পুঁইলতা অতিদ্রুত বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। এই বৃদ্ধির জন্য যে উপাদানটি দায়ী সেই উপাদানটি জসীমকে দিয়ে সংগ্রহ করিয়ে নেন বিল্লাল মাস্টার। সেই সাথে তেঁতুল গাছের মূল হতে সংগ্রহ করেন এক প্রকার পাচক রস (যা তেঁতুলকে টক করতে সহায়তা করে)। এটি মানুষের রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমাতে সহায়তা করবে। এই পাচক সংগ্রহ করা জসীমের জন্য খুবই কঠিন একটি ব্যাপার ছিল। বিল্লাল মাস্টার সহজ লভ্যতার কথা ভেবে তেঁতুল গাছ হতে সংগৃহীত রসের পরিবর্তে বাজারে প্রাপ্ত ভিনেগার ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সরাসরি প্রাকৃতিক নয় বলে এর দ্বারা মূল মিশ্রনের গুনাগুণ নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। তো প্রাপ্ত দু’টি উপাদানের সাথে নির্দিষ্ট অনুপাতে সোডিয়াম ক্লোরাইড আর বাঁধাকপি থেকে সংগৃহীত পুষ্টিগুণ মিশিয়ে, প্রায় পাঁচ বছর পরিশ্রম করে বিল্লাল মাস্টার একটি মিশ্রন আবিষ্কার করেন। তারপর শুরু হয় সৃষ্ট মিশ্রনটিকে এ্যমিবার ডি এন এতে স্থাপন করে এর গাঠনিক পরিবর্তন ঘটানোর মত জটিল এবং কষ্টসাধ্য কাজ। এটি ঠিকঠাক মত হলেই শুরু হবে বহুল প্রতিক্ষীত ‘এ্যমিবার বর্ধন প্রক্রিয়া’। গবেষনা কার্যটিকে সমাপ্তির পথে নিয়ে আসতে বিল্লাল মাস্টারের মোট সময় লেগেছিল সাত বছর। কিন্তু চূড়ান্ত ফল লাভের মুহুর্ত যখন সন্নিকটে তখনই ঘটে এক হৃদয়বিদারক ঘটনা।

বিল্লাল মাষ্টার কি কারণে যেন এপ্রিলের ঊনত্রিশ-ত্রিশ দুইদিন ছুটি নিয়েছিলেন। ওদিকে আবার পরের মাসের এক তারিখে মে দিবসের বন্ধ। সুতরাং এই তিনদিন জসীমও মাষ্টার সাহেবকে বলে ছুটির ব্যবস্থা করে নিয়েছে। বেশ কিছুদিন ধরে ভাবী তাকে বাড়ী যাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করছিল। ভাবীকে সে মায়ের মত শ্রদ্ধা করে। তার বাড়ীতে আরো থাকে বড় ভাই আর দু’টি ভাতিজা। সে ভাবীকে জানিয়ে দিয়েছে ঊনত্রিশ তারিখ বিকেলে বাড়ী পৌঁছুবে। তবে এখন বিয়েশাদী হবে না। সে এখন একটি জরুরী গবেষনার কাজে ব্যস্ত।

জসীম ইদানিং নিজেকে এ্যমিবা শ্রেণীর বলে সন্দেহ করে। বিল্লাল মাষ্টার জসীমকে বলেছিলেন এ্যমিবা নাকি পৃথিবীর একমাত্র মেদহীন-এককোষী প্রানী। জসীম ভেবে দেখেছে, সেও মেদহীন। হেংলাপাতলা-ছিপছিপে। এবং আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করেছে সেও এককোষী। এককোষী বলেই লজ্জায় সংকোচে তাকে সব সময় বিয়ের প্রসঙ্গটি এড়িয়ে চলতে হয়েছে। জসীম ঠিক করেছে, গবেষনার কাজটা শেষ হলে ডাক্তার দেখিয়ে অপারেশান করিয়ে সেই ঘাটতি কোষটি এবার লাগানোর ব্যবস্থা করবে। কোষ কোত্থেকে সংগ্রহ করবে তাও সে ঠিক করে রেখেছে। তবে কোষহীনতার এ কথাটি তার সবসময় মনে থাকে না। কেবল স্কুলের পৌঢ় কুকুরটির পেছনদিকটা দেখলেই মনে পড়ে। কুকুরটি এখন বয়সের ভারে ন্যূজ, সবসময় পেছনের বারান্দায় পড়ে থাকে। আর জসীম থাকে স্কুলঘরের কোণের একটি কামরায়। মূলত এই কামরাটি বিল্লাল মাস্টার গবেষনার কাজে ব্যবহার করে থাকে। আরো সুস্পষ্টভাবে বলতে গেলে বলতে হয়, ছোট্ট একটি ব্যাগের মধ্যেই রয়েছে বিল্লাল মাস্টারের মূল গবেষনাগারটি। হেড মাস্টারের ভয়েই এই সতর্কতা। হেড স্যারের কড়া নির্দেশ, বিল্লাল মাস্টারকে ফের যদি কখনো ঐসব ফালতু গবেষনায় সময় নষ্ট করতে দেখা যায় তাহলে তিনি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। বিল্লাল মাস্টারের সেই গবেষণাগারে ছিল একটি ডায়রী, পেন্সিল, কলম, গোটা চারেক টেষ্ট টিউব, একটি কাঁচের বৈয়াম, কাঁচি, আরো টুকিটাকি কিছু যন্ত্রপাতি। যাবতীয় তথ্য উপাত্তগুলি সংরক্ষিত থাকে ঐ ডায়রীতে। জসীমের ব্যাগ আর মাস্টার সাহেবের গবেষনার ব্যাগটি দেখতে প্রায় একই রকম হওয়ায় একদিন গোল বাঁধে।

জসীম বাড়ীতে রওনা দেয়ার সময় ভুলবসত তার ব্যাগের পরিবর্তে গবেষনার ব্যাগটি নিয়ে যায়। প্রচণ্ড মাথা ব্যাথা নিয়ে জসীম যখন বাড়ী পৌঁছায় তখন সন্ধ্যা। সেদিন আবহাওয়া ছিল প্রচণ্ড গুমোট। সমুদ্র আর নদী বন্দর গুলোতে চলছিল সর্বোচ্চ সতর্কতা সংকেত। কোনমতে ব্যাগটা ভাঙ্গা টেবিলটার উপর রেখে সে বিছানায় শুয়ে পড়ে। রাত ন’টা সাড়ে ন’টার দিকে তার ভাবী কামরায় ঢোকে নতুন পাত্রীর ছবি নিয়ে। কিন্তু জসীমকে ঘুমন্ত দেখে আর ডাকে না। তখন সে চিন্তা করে, জসীমকে চমকে দিলে কেমন হয়! সে ছবিটিকে জসীমের ব্যাগে পুরে রাখার কথা ভাবে। ভাবতে ভাবতে ব্যাগ খুলে একটি পুরনো ডায়রী দেখতে পায় সে। ডায়রী খুলে ছবিটি রাখতে গিয়ে তার চোখে পড়ে ঘনিভূত সবুজাভ মিশ্রনের বৈয়ামটি। এবং কৌতুহলী নারীটি খোলা ডায়রী খোলা রেখেই বৈয়াম খুলে আচার ভেবে কিছু দ্রব্য জিহ্বা দিয়ে চেখে দেখে। তারপর তো তার চোখ ছানাবড়া। বাহ্! চমৎকার! স্বাদটা তেঁতুল তেঁতুল, দেখতে অনেকটা শুষ্কপ্রায় বাটা মেহেদির মত। লবন দিয়ে খেতে নিশ্চয় আরো ভালো লাগবে। ভাবী এক দৌঁড়ে রান্না ঘর থেকে লবন নিয়ে এসে সেই মেহেদি সদৃশ্যের সাথে ভালভাবে মিশিয়ে দেয়। মনে মনে জসীমকে ধন্যবাদ দিতে দিতে এবং জিহ্বা আর তালু দিয়ে ঠাস্ ঠাস্ শব্দ করতে করতে প্রায় পুরো বৈয়ামটাই খালি করে ফেলে নিমিষে।

অবশেষে বৈয়ামটি উপুর করে ঝাড়তে গিয়ে তলানির কিছু মিশ্রন ডায়রীর উপর ছড়িয়ে পড়ে। সেখান থেকে মুছে নিতে গিয়ে সেসব ছোট্ট ডায়রীর সারা গায়ে লেপ্টে যায়। বিল্লাল মাস্টারের তৈরী মিশ্রনে সোডিয়াম ক্লোরাইড পূর্বেই মেশানো ছিল। ভাবী আবার সেখানে লবন মেশানোতে লবনাক্ততার পরিমান মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যায়। ফলে মিশ্রনের গুনাগুণ যায় উল্টে। বিল্লাল মাস্টারের আবিষ্কারের উদ্দেশ্য ছিল বিভাজনের মাধ্যমে বস্তুর সম্প্রসারন ঘটানো। কিন্তু পরিবর্তিত মিশ্রনটি ঘটাচ্ছে বস্তুর সংকোচন। ডায়রী একটি মৃত কোষ। তাই সেখানে কোন এন্টিবডি তৈরী হয় না। এঅবস্থায় ডায়রীতেই প্রথম আক্রমন করে বসে মিশ্রনটি। ভাবীর অলক্ষ্যে ডায়রীটি ছোট হতে হতে চুপসে গিয়ে এক পর্যায়ে নাই হয়ে যায়। অতি উৎসাহী ভাবীর হাত থেকে পড়ে বৈয়ামটি হঠাৎ ভেঙ্গে যায়। বৈয়াম ভাঙ্গার শব্দে ঘুম ভেঙ্গে জেগে ওঠে জসীম। বিছানায় শুয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে একবার ভাবীর দিকে একবার বৈয়ামের দিকে তাকায়। ভাবী তাকে ‘আচার খাইবা ছোট মিয়া’ বলে তার আঙ্গুলে লেগে থাকা মিশ্রনের অবশিষ্ট অংশ একটু করে খাইয়ে দেয় জসীমকে।

ইতিমধ্যে বাইরে শুরু হয়ে যায় ঝড়। চারিদিকে চিৎকার চেঁচামেচি। আশেপাশের বাড়ীঘর থেকে মানুষজন সামনের আশ্রয় কেন্দ্রে ঠাঁই নেয়ার জন্য ছুটছে প্রাণপনে। বৃদ্ধি পেতে থাকে দরিয়ার গর্জন। ঢেউ গুলো বিশাল থেকে বিশালতর হতে থাকে। বাইরে ঝড়ের তাণ্ডব চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তে থাকে হু হু করে। আর সেই সাথে পাল্লা দিয়ে ভেতরে চলতে থাকে অন্তর্হিত হওয়ার এক মর্মান্তিক স্বল্পদৈর্ঘ্য আখ্যান। হঠাৎ করে অবাক জসীমের চোখের সামনে ভাবীর সংকোচন কার্য শুরু হয়। বাকরুদ্ধ জসীম দেখতে পায়, ভাবী কিভাবে যেন অতি দ্রুত ছোট থেকে ছোটতর হতে হতে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণপর সে নিজেকে অবাক করে দিয়ে নিজেই সংকুচিত হতে শুরু করে। কিন্তু তার সংকোচন প্রক্রিয়া ঘটে ভাবীর তুলনায় কিছুটা ধীর লয়ে। তবে তকেও শেষ পর্যন্ত ঐ ভাবীর পরিণতিই বরণ করতে হয়। (আশেপাশে কোন কুকুরের পশ্চাদাংশ দেখা না গেলেও, শেষ মুহুর্তে হঠাৎ কেন যেন তার একটু করে সেই ঘাটতি কোষের কথা মনে পড়েছিল।) তাদেরকে জসীমের বড় ভাই আর ভাতিজারা সব জায়গায় তন্ন তন্ন করে খুঁজে না পেয়ে, অবশেষে নিজেরা নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয় কেন্দ্রে গিয়ে আশ্রয় নেয়।
পরদিন নদীর ধারে অসংখ্য স্বজন হারা মানুষের ভীড়। বিশ ত্রিশ ফুট উঁচু ঢেউ ভাসিয়ে নিয়ে গেছে ঘরবাড়ী, মানুষ। দূরে ভেঙ্গে পড়া শতবর্ষী বটের একটি ডালে বসে আছে জসীমের ভাই আর ভাতিজারা। তাদের হৃদয় শূন্য। দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়ে আছে দিগন্তে।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29044829 http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29044829 2009-11-17 11:53:07
খেলনা
আমার আনন্দ আর বেদনার এই দিনটি একদিন আগুপিছু হলে, মহাকালের দিন বিন্যাসে তেমন কি কোন সমস্যা হত? এ দু’য়ে কি শুধুমাত্র আমার বেলায় এক হয়েছে? নাকি এমন অহরহই ঘটে থাকে, কেউ জানে কেউ জানে না। বারান্দায় বসে দ্বৈত অনুভূতির এক দমবন্ধ সময় পার করছি একাকী। রাত গভীর। আকাশের পেয়ালা ভর্তি লক্ষ কোটি মিটিমিটি গ্রহ নক্ষত্র। প্রকৃতি দীঘির জলের মত স্থির। চারিদিক বড় নির্জন-নিশ্চুপ। নৈশব্দেরও বুঝি শব্দ থাকে, নির্বাক প্রকৃতিরও না বলা কথা থাকে। তেমনি যেন দূরে কোথাও গুমরে গুমরে সরোদ কেঁদে চলেছে একটানা। শোনা যায় না, উপলব্ধি করা যায়। বাসায় একমাত্র জেগে আমি। সারাদিন রান্না বান্নায় ব্যস্ত সময় কেটেছে। বিকেলে এতিমখানার কিছূ ছেলেপুলে খাইয়েছিলাম। আর রাতে কয়েকজন ভিক্ষুক-মিসকিন-আত্মীয়স্বজন। খাটুনি গেছে বেশ। এখন খুবই ক্লান্ত। কিন্তু ঘুমের যেন চোখের সাথে আড়ি হয়েছে চিরতরে।
পাঁচ বছর আগের এইদিনে আমার বাবা চোখ বুঁজেছিল। আবার তার এক বছর পর একইদিনে সে আমার কোলে ফিরে এসেছিল। ভেবে ভেবে আকুল হই। মনের কোণে প্রশ্ন জাগে; চূড়ান্ত কোন্ লক্ষ্য নিয়ে নানা রঙ্গের অংক কষে বিধাতা তার খেলায় মাতে? খেলায় খেলায় কষ্ট বাড়ে - কষ্ট কমে মানব মনে। আমার যে কোনটা হয় নিজেই তো বুঝিনা ছাই। রাত এগারটায় সমস্ত আয়োজন শেষ হয়ে গিয়েছিল। আমি যখন রান্না ঘরের কাজ প্রায় গুছিয়ে এনেছি, তখন ড্রইং রুম থেকে কিছু একটি ভাঙ্গার শব্দ শুনতে পাই। কিছুক্ষণ পর রান্না ঘরে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে এসে তুষার বলল, ‘মা.. লোবত তা ভেংগে গেতে।’ শুনে আমার আনন্দ আর ধরে না। আনন্দটা কিসের বুঝতে পারি, বোঝাতে পারি না।
আজ তুষারের চতুর্থ জন্মদিন গেল। চতুর্থ সুখবার্ষিকী। সেই সাথে আমার পঞ্চম বেদনাবার্ষিকীও বটে। ছেলেটার বয়সের তুলনায় কথা একটু দেরীতে ফুটছে। ডাক্তার বলেছেন, ‘সমস্যা নাই.. অনেক শিশুই দেরীতে কথা বলা শেখে।’ অনুষ্ঠানটি ছোটখাট করে করব করব করেও মোটামুটি বড়ই হয়ে গেল। আমার বিয়ের আট বছর পর, বাবার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর দিন তুষার জন্মেছিল। বড় আশার এ জন্মদিনটি স্বামী সন্তানের সাথে উপভোগ করতে পারি না কখনোই। সুখের এই দিনটিতে যে আমি কষ্টে কষ্টে লীন হয়ে যাই। বাসায় যে প্রৌঢ়া মহিলাটি আমাকে সারাদিন সাংসারিক কাজে সহযোগীতা করে, সে কিভাবে যেন জেনেছে আজ তুষারের জন্মদিন। যদিও ব্যাপারটি আমি গোপন রেখেছিলাম। সম্ভবত সেজন্যেই সে আজ একটি খেলনা মানুষ নিয়ে এসেছে। ছেলের বাবাও ছেলের জন্যে উপহার একটি এনেছিল গতকাল, সাইকেল। কিন্তু সাইকেল ফেলে এই সস্তা দামের রোবটটি কেন যে তার এত পছন্দ হয়ে গেল সে ই জানে। খুশী’র মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘তুমি আবার এটা আনতে গেলে কেন?’ সে ঠোঁট দু’টো অল্প নেড়ে বলেছিল, ‘আনলাম.. পোলাপান মানুষ।’
শুনেছি বাবা শত কষ্টের মাঝেও আমার প্রথম জন্মদিনটির আয়োজন করেছিল। পরের জন্মদিন গুলোতে কেক কাটার মত আর্থিক সংগতি তার ছিল না। তাই বাকী জন্মদিনগুলো স্মরণ করা হলেও পালন করা হয়নি আর। সেই প্রথম জন্মদিনে তার দেয়া কাঠের পুতুলটি অক্ষত আছে আজো। এত আগের খেলনাটি এখনো অটুট থাকাতে আমার ভেতর আনন্দ জাগে না মোটেও। কষ্ট হয়। বাবাও যে ওটি দেখলে কষ্ট পেত তা বড় হয়ে বুঝতে পেরেছিলাম। আমাদের টিভি রুমে দাদার সচ্ছলতার শেষ প্রতীক হিসেবে একটি কারুকাজ করা বিশালাকৃতির শোকেস ছিল। তার নীচের দিক হতে ফুট তিনেক উপরে, তাকের মত একটি বড়সড় খালি জায়গা ছিল। বাবা ওই খালি জায়গাটিতে আমাদের টিভিটা বসিয়েছিল। তবে এত বড় জায়গায় বার ইঞ্চি টিভিটাকে বড্ড বেমানান দেখাত। টেলিভিশন দেখতে বসলেই শোকেসে রাখা পুতুলটির দিকে বাবা আর আমার চোখগুলো ছুটে যেত বারবার। বাবা পরে টিভি সেটটি অন্যদিকে সরিয়ে নিয়েছিল। বাবার কষ্টের পেছনের কারণ হচ্ছে আমার মা। মা খুব কড়া ধরনের মহিলা ছিলেন। এখানে যেতে পারবে ওখানে যেতে পারবে না, এটা খেতে পারবে ওটা খেতে পারবে না, হাজারো নিয়ম কানুনের বেড়া। এরকম অনেক অনেক বিধি নিষেধের হাত থেকে সেই খেলনাটিও রেহাই পায়নি শেষ পর্যন্ত। সংসারের সবকিছুর প্রতিই মা বিশেষভাবে যত্নশীল ছিলেন। তেমনি খেলনাটির প্রতিও। সদা সতর্ক। তাই জন্যে, পুতুলটিকে মলিন বৈঠকখানার শোভা বর্ধনে শোকেসের গরাদে বন্দীত্ব বরণ করতে হয়েছিল কাঁচা বয়সেই। কখনো সখনো মায়ের অবর্তমানে বাবা পুতুলটি বার করে আমাকে সাথে নিয়ে খেলত। তবে সাবধানে থাকতে হত, যাতে পুতুলের গায়ে কোন আঁচড় না লেগে যায়।
সেটি এখন সযতনে রাখা আছে নীল মখমলে মুড়ে। তুষারের বাবাও অনেকটা আমার মায়ের মতই। সে একদিন ছেলেকে বলছিল, ‘আর কিচ্ছু আনব না কক্ষনো.. বিকালে এত সুন্দর প্লেন আনলাম, রাতেই ভেঙ্গে ফেললি।’ কোন্ ভাঙ্গাতে তুষ্টি জাগে, বুঝতে পারা ভার। খেলতে গিয়ে খেলনা ভাঙ্গা, নাকি না খেলাতে হৃদয় ভাঙ্গা? কে কিসেতে আনন্দ পায়, কান্না আসে কার?
এই মাঝরাতে নিজের কাছে নিজেকেই চোর চোর মনে হচ্ছিল। সন্তর্পনে আলমারী খুলে পুতুলটি বার করে বারান্দায় ফিরে আসি। প্রতি বছর এই বিশেষ দিনের এই সময়ে পুতুলটির সাথে আমি একা একা খেলি। স্বামী পুত্র কেউ জানে না এ খেলাটির মর্মকথা, শুধু জানি আমি। আর জানে সে, যে কিনা খেলেই চলে.. খেলেই চলে.. জীবন্ত সব খেলনা নিয়ে। ভাঙ্গা গড়ার খেলায় মেতে খুঁজতে থাকে.. খুঁজতে থাকে.. তার সৃষ্টির সার্থকতা।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29041027 http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29041027 2009-11-10 12:41:30
ইঁদুর বাচ্চার মা তার বড় বোনের দেবরের প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে, এখনো ছুটিতে আছে। আত্মীয়তার খাতিরে হোক বা অন্য যে কোন কারনেই হোক, সুফিয়ান সাহেব তাকে কিছু বাড়তি সুবিধা দিয়ে থাকেন। এই যেমন, বাচ্চাটা পেটে আসার পর থেকেই সে ম্যাটারনিটি লিভ ভোগ করে আসছে।
সারাদিন অফিস করার পর শরীরটা আর টানতে পারছিলাম না, তবু বাজারে যেতে হল। তবে হ্যাঁ, মেয়ের আব্দারের চাইতে মেয়ের মায়ের ধমকই আমাকে বেশী বাধ্য করেছিল যেতে। বাচ্চার মায়ের শখ হয়েছে বাচ্চার জন্যে জিন্সের প্যান্ট কিনবে, তাও আবার ফুল প্যান্ট। সন্ধ্যা সাতটা থেকে রাত বারটা পর্যন্ত কয়েকটি মার্কেটের প্রত্যেকটির অলিগলি ঘুরতে হয়েছে সেই দুর্লভ জিনিসের খোঁজে। তার পড়নের হাফ প্যান্টটাই ফুল প্যান্টের মত দেখাচ্ছে, আর ফুল প্যান্ট গুলো না জানি কেমন দেখাবে। দোকানিরা আকারে ইঙ্গিতে বাচ্চার মাকে বিষয়টা বোঝানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। আসল কথা হল, ছেলের বয়স চার মাস হলেও শরীরটা দেখতে যেন ঠিক চার দিনের। তবে চেহারাটা বেশ মায়াকাড়া। আমারও মায়া লাগে খুব। কিন্তু কোথায় যেন সামান্য ব্যাথা অনুভূত হয়। যখনই তার মাথার ডান পাশের চুলের পাকের সাথে, সুফিয়ান সাহেবের অবিকল প্রতিরূপ চোখে ভাসে তখনই অন্তরটা বিষময় হয়ে ওঠে।
দীর্ঘ পাঁচ ঘন্টার পরিশ্রম অবশেষে সফল হয়েছে, তবে অর্ধেক। জিন্সের একটি হাফ প্যান্ট পাওয়া গেছে তাও প্রায় দু’বছরের বাচ্চার। পড়ানোর পর প্যান্টের কোমরের অংশটা আলতো করে টেনে ধরলে হা হয়ে থাকে। মনে হয় যেন দন্তহীন কোন শত বর্ষীয় বৃদ্ধ মুখ হা করে হাসছে। অফিস থেকে এবার বোনাস দেবে না বলেছে। পকেটের অবস্থা খুবই করুণ। স্ত্রী কন্যারা তা ভাল ভাবেই জানে। কন্যাটি এবার ঈদে কিছু কিনবে না বলেছে। হয়তো বাবার জন্য তার মায়া হচ্ছে। যদিও কন্যার চাইতেও স্ত্রীর সাথে আমার সম্পর্ক আরো দীর্ঘ দিনের, সে কেন আমাকে বুঝবে না? কিন্তু এটাই সত্যিকারের সত্যি যে, সে আমাকে সত্যিই বুঝবে না। প্রায় দেড় যুগ পার হয়ে গেল, আমাকে বোঝার চেষ্টা করার তেমন কোন লক্ষণ এখনো পর্যন্ত দেখলাম না।
প্রাণান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছি, বহু কষ্টে সংসারের ঘানি টেনে চলেছি। ইদানীং ঘানির কলকব্জায় জং ধরেছে, ঘানি আর ঘুরতে চায় না। আচ্ছা, ঘানিটা আমি যেভাবে টেনে চলেছি তা অমন ভাবে টানার কোন প্রয়োজন আদৌ ছিল কি? নাকি কপালের ফেরে প্রয়োজনটা সৃষ্টি হয়েছে? যা আয় করছি তা দিয়ে ছোট্ট সংসারটা বেশ চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু প্রতিনিয়তই আমার অভাব লেগে থাকে কেন? প্রত্যেক মাসে এর ওর কাছ থেকে ধার করতে হয় কেন? আজ তিন মাস হতে চলল আমার পাশের টেবিলের সহকর্মীর কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা ধার নিয়েছি। দিতে পারছি না এখনো। কিছুদিন আগে সৌজন্যতাবশত ওঁকে বলেছিলাম, ‘টাকাটা দিতে একটু দেরী হচ্ছে ভাইজান।’ তিনি কপট গাম্ভীর্য নিয়ে বললেন, ‘ঠিক আছে.. ঠিক আছে..।’ কিন্তু তাঁর চেহারা দেখে মনে হয়েছে, ‘ঠিক নেই।’ প্রতিনিয়ত অভাব লেগে থাকার কারণ অনুসন্ধানে, অফিসে বসে কিছুদিন আগে একটা অনুসন্ধানী রিপোর্ট তৈরী করার চেষ্টা করেছিলাম। রিপোর্টটা অনেকটা এরকম,
১) প্রত্যেক মাসে আমার স্ত্রী’র আত্মীয় স্বজন বা বন্ধুদের, কিংবা তাদের সন্তান সন্তুতির বিয়ে বা অন্য কোন অনুষ্ঠান লেগেই থাকে।
২) সেখানে সব সময় ভরা হাতে উপস্থিত থাকতে হয়।
৩) এর মধ্যে আবার কোন কোন অনুষ্ঠানে যেতে বিশেষ বিশেষ কাপড় চোপড় খরিদ করতে হয়। (যেমন, তাদের অনেক প্যাঁচানো সম্পর্কের বোন সম্পর্কৃত কারো গায়ে হলুদে, বোনেরা সকলে অমুক রঙের জামদানি শাড়ী পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সুতরাং এবার অমুক রঙের জামদানি শাড়ী কিনতে এসি অলা কোন মার্কেটে ছোটো।)
৪) মহিয়সী’র ভাতিজার জন্ডিস হয়েছে, ওর রোগ মুক্তির জন্য অমুক মাজারে একটি ছাগল মানত করতে হবে। ব্যাস এবার ছাগল কিনতে হাটে ছোটো।
৫) ধারদেনা করতে করতে,
তালিকা তৈরীর এই পর্যায়ে শব্দের গঠনশৈলী ঠিক করতে এবং আরো আরো কারণ খুঁজে বের করতে, চিন্তা করার জন্য একটু ধূমপানের উদ্দেশ্যে বাইরে গিয়েছিলাম। ফিরে এসে দেখি রিপোর্টের অসমাপ্ত পঞ্চম নম্বরটির নীচে কলম দিয়ে চাপা দেয়া আছে একটি খোলা চিরকুট। সেখানে সবুজ কালিতে আমার ঋণদাতা সহকর্মীটি লিখে রেখেছেন, ‘ভাইকে বলতে লজ্জা লাগছে তাই লিখে জানাচ্ছি, দুইদিন পরে ঈদ, টাকাটা বড়ই দরকার।’
হঠাৎ একটি মাইকের আওয়াজ শুনে চমকে উঠলাম। শ্লেষ্মা জড়িত ভাঙ্গা ভাঙ্গা কন্ঠে কে একজন বলে চলেছেন, ‘চিকন ইন্দুর, মোটা ইন্দুর, গুরা ইন্দুর, ধাঁড়ি ইন্দুর..’ তার পর পরই মাইকে কাশির শব্দ শোনা যেতে লাগল। আমি অবাক হলাম। এবার ঈদে কি পথে ঘাটে ইঁদুরও বিক্রি হচ্ছে? বাম পাশে তাকিয়ে দেখি বাসস্টপের দিক থেকে এক বয়ষ্ক লোক এদিকেই এগিয়ে আসছেন। এক হাতে একটি হ্যান্ড মাইক, আর অন্য হাতে দশ বারো বছর বয়সের একটি মেয়ের কাঁধ ধরা রয়েছে। মেয়েটির অন্য কাঁধে বিশাল এক ঝোলা। কোন রকমে কাশি সামলে বৃদ্ধ তার পূর্ব কথার খেই ধরলেন, ‘এক রাইতেই সব খতম হয়া যাইবো।’ আমার কপালের ভাঁজ ঢিল হল।
মেয়েটির এক হাতে ধরা রয়েছে, ছোট্ট প্ল্যাকার্ডে কাঁচা হাতের আঁকা ইঁদুরের ছবি। কাছাকাছি আসতেই বৃদ্ধ কাশতে কাশতে ফুটপাতে বসে পড়লেন। দেখলাম অন্ধ লোকটি আসলে তেমন বয়ষ্ক নন। হয়তো ঘানি টানতে টানতে ন্যুজ হয়ে পড়েছেন। মনে হল, এ আমার মতই আরেক বলদ। তফাৎ শুধু এই, আমি কিছুটা কেতাদুরস্ত আর সে বিবর্ণ। আচ্ছা, দুই বলদে একটু কথা হলে কেমন হয়? কৌতুহল নিয়ে এগিয়ে গেলাম। জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই অষুধে ইঁদুর মরে?’ লোকটি কাশতে কাশতে বললেন, ‘মানুষ সহ মইরা যায় আর ইন্দুর.. দিমু এক পাকিট?’ আমি বললাম, ‘নাহ্ .. বাসায় ইঁদুর নাই।’ লোকটি রেগে গিয়ে ধমকে উঠলেন, ‘তাইলে খামাকা কথা কন ক্যান.. সরেন।’ আমি থতমত খেয়ে এদিক ওদিক তাকালাম। না, কেউ দেখতে পায়নি। কাশতে কাশতে তার হাত থেকে মাইকটা পরে ব্যাটারী গুলো খুলে গেল। মেয়েটি অনেক চেষ্টা করেও সেগুলো লাগাতে পারছে না। আমি তার কাছ থেকে ব্যাটারী চারটা চেয়ে নিয়ে সব ঠিকঠাক করে দিলাম। তারপর একথা সেকথায় লোকটির সাথে খানিক ভাব হয়ে গেল। ইঁদুরের অষুধ নাকি এখন তেমন একটা কেউ কেনে না। শহরে নাকি ধীরে ধীরে ইঁদুর কমে আসছে। ভেবে দেখলাম তাইতো, আমার বাসাতেও ইঁদুর নেই। এই ভাল, ইঁদুরেরা বড়ই নাদান। শুধু ঘর কাটতে ব্যস্ত। ক্ষতি টের পাওয়ার পরে গেরস্থের তখন হা পিত্যেস করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। তবে হ্যাঁ, চিকন-মোটা বা গুরা ইঁদুর কমে আসলেও ধাঁড়ি ইঁদুর এখনো রয়ে গেছে কিছু কিছু জায়গায়।
ঔষধ বিক্রেতা নাকি আজ সারাদিনে তিন প্যাকেট ঔষধ বিক্রি করে মাত্র ত্রিশ টাকা কামাই করেছে। আগামী পরশু ঈদ হওয়ার সম্ভাবনা বেশী। কথায় কথায় সে জানাল, সবার কেনা কাটা প্রায় শেষ। তার বউ হোটেলে মরিচ পেষার কাজ করে। বউটা তার স্বামীর জন্য পাঞ্জাবী আর মেয়ের জন্য ফ্রক কিনে এনেছে। সে ঠিক করেছে, যেভাবেই হোক তার বউকে একটা শাড়ী কিনে দেবে। আর দু’শ টাকা যোগাড় করতে পারলে তিনশ টাকা দিয়ে মোটামুটি ভাল মানের একটা শাড়ী পাওয়া যাবে। কেন যেন তার স্ত্রী’র শাড়ীটি আমার কিনে দিতে ইচ্ছে হল। লোকটি দু’শ টাকার জন্য ঔষধ বিক্রি করতে যে পরিমান কষ্ট করছেন, তার চাইতে অনেক কম পরিশ্রমে ভিক্ষা করেও ঐ টাকা যোগাড় করতে পারত। কিন্তু সবাই সবকিছু পারে না, কিংবা সবকিছুর প্রতি সকলের আগ্রহও তেমন থাকে না। যেমন, এই মুহুর্তে আমি শাড়ী বদলাবার আগ্রহ দূরে থাক বাস ধরার আগ্রহও বোধ করছি না বিন্দুমাত্র। আমার স্ত্রী বলেছে এই শাড়ী বদলিয়ে একই ডিজাইনের কমলা রঙের শাড়ীটা নিয়ে যেতে।
আমার ভেতরটা আদ্র হয়ে গেছে। আচ্ছা লোকটির জন্যই কি এমন বোধ হচ্ছে, নাকি তার সুখের সাংসারটির জন্য? যদিও পকেটের সার্বিক অবস্থা সুবিধার নয়, তবু ইচ্ছে হল লোকটিকে যদি কিছু সাহায্য করতে পারতাম। অবশ্য লোকটি আমার সাহায্য নিতে চাইবে কিনা সেটাও একটা কথা। দেখেশুনে যা মনে হচ্ছে, সে কারো করুণার তোয়াক্কা করে না। মেয়েটাকে বললাম, ‘আমাকে দুই প্যাকেট দাওতো মা?’ লোকটি বললেন, ‘কইলেন না, আপনার ঘরে ইন্দুর নাই?’ কোন উত্তর খুঁজে পেলাম না। তবু কিছু একটা বলার জন্য বললাম, ‘থাকতেও তো পারে।’ সে বলল, ‘আপনারে ভাল্লাগছে.. পয়সা কিন্তুক নিমু না কইলাম।’ ওমা, এ বলে কি! কিছুক্ষণ একটু কথাবার্তা হয়েছে আর তাতেই পয়সা নিতে চাইছে না, অদ্ভুত তো! কাছেই একটি বাস এসে থামল। একটি যাত্রী উঠছে। আমি দু’প্যাকেট ঔষধ নিয়ে অন্ধের হাতে দু’টা নোট গুঁজে দিয়ে, দ্রুত পায়ে বাসের দিকে এগিয়ে গেলাম। পেছন থেকে শুনলাম, মেয়েটি তার বাবাকে বলছে, ‘বাজান.. ব্যাডায় দেহি তোমারে দুইটা একশতি দিয়া গেছে।’ মাইক হতে লোকটির শ্লেষ্মা জড়িত ডাক শোনা গেল, ‘টেকা বেশী দিছেন.. ও ভাই.. ও ভাইজা.... ন।’
বাসে বসার সিট দূরের কথা দাঁড়ানোর মত কোন জায়গাও নেই। এক হাতে শাড়ীর প্যাকেট আর অন্য হাতের ক’টি আঙ্গুল দিয়ে বাসের হাতল ধরে আছি। হাতল ধরা হাতের বাকী আঙ্গুলে অপ্রয়োজনীয় ঔষধের প্যাকেট দু’টি অতিকষ্টে ধরা রয়েছে। আরে, আমি শুধু শুধু প্যাকেট দু’টা কেন ধরে রেখেছি? মাথার ভেতর আজগুবি সব চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। প্যাকেট গুলো ফেলে দেয়ার জন্য হাতটা জানালার বাইরে নিতে গিয়ে, অবচেতনে প্যান্টের পকেটে পুরে নিলাম।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29039237 http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29039237 2009-11-07 13:40:02
বেত্রাঘাত
বেলী তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে, দেখতে ভারী মিষ্টি। কেমন যেন আদর করে করে কথা বলে। মাঝে মাঝে দাদুর বাড়ী বেড়াতে গেলে জুয়েল চাচাদের বাসায় চলে যায় সে। তাকে দাদুর বাড়ীতে বেড়াতে যেতে হয় কারণ তার বাবা স্বপরিবারে শশুরবাড়ীতে থাকে, ঘরজামাই। আরামেই আছে বেলাল। শশুর মারা যাওয়ার পর মুদির দোকানটা সে ই দেখাশোনা করে আসছে। বেলীকে নিয়ে প্রায় বিকেলে বেড়াতে বের হয় বাবা। বাবাটা যা দুষ্টু! অনেক সময় দুষ্টুমি করে মা’র সামনে ছড়া কাটে, ‘শ্বশুরবাড়ী মধুর হাঁড়ি।’ আবার তাকেও মাঝে মাঝে ছড়া শেখায়। কিছু কিছু ছড়ার লাইন বেলীকে বিভ্রান্তিতে ফেলে দেয়। এই যেমন, ‘শ্বশুর বাড়ী মধুর হাঁড়ি’ কিংবা ‘ফুলের মালা গলায় দিয়ে মামার বাড়ী যায়’। বেলী বোঝে না শ্বশুর বাড়ীতে আবার মধুর হাঁড়ি কিসের? ছোট মামার সাথে তো প্রায়ই তার বাবার ঝগড়া লেগে থাকে। তার মাথায় ঢোকে না, ছেলে মেয়েরা ফুলের মালা গলায় দিয়ে কেন মামার বাড়ীতে যাবে? বরঞ্চ দাদুর বাড়ীই তার বেশী পছন্দ। নানুর বাড়ী - দাদুর বাড়ী প্রশ্নে বাবাকে জর্জরিত করে করে বেশ কয়েকবার বকা খেয়েছে সে। এরপরও বিভ্রান্তিকর ছড়াগুলো যখন বাবা আওড়াত তখন আর প্রশ্ন না করে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকত। সেটা খেয়াল করার পর থেকে বাবা তার সামনে আর ঐসব ছড়া একেবারেই বলত না। জুয়েল চাচা বিভিন্ন ভাবে বুঝিয়ে বেলীর দাদা বাড়ী নানা বাড়ীর এই কৌতুহল কিছুটা মেটাতে পেরেছিল। এ জন্যেই জুয়েল চাচাকে তার এত ভাল লাগে। জুয়েল চাচা হচ্ছে তার বাবার পাড়াতো ভাই। তাকে খু-উ-ব আদর করে। আজ জুয়েল চাচা তাকে হাঁড়ি এঁকে দেখাচ্ছে। ড্রইং রুমে ছোট্ট বেলীকে কোলে বসিয়ে ছবি আঁকতে আঁকতে পনের বছর আগের কথা মনে পড়ে যায় জুয়েলের।
বিকেল চারটায় দশ বছরের জুয়েলকে পড়াতে আসতেন সজীব স্যার। স্যারটা বেশ লম্বা ছিলেন। তাদের বাড়ীটা ছোটখাট, ছিমছাম। সামনে ইটের দেয়াল, বাকী তিনদিকে বাঁশের বেড়া দেয়া। সদর দরজাটা টিন কেটে বানানো। তারপর এক চিলতে উঠোন। উঠোন পেরিয়ে তাদের তিন কামরার ছোট্ট দোচালা ঘরটি। স্যার যখন আসতেন তখন সদর দরজা থেকে তার নাম ধরে ডাক দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতেন। জুয়েল বুঝতে পারত, বাড়ীর মহিলাদের আড়াল হওয়ার সুযোগ দিতেই স্যার এটা করতেন। তখন দরজার উপর দিয়ে স্যারের মাথার অংশ বিশেষ দেখা যেত। চারটার কিছু আগেই পড়ার টেবিলে বসে যেতে হত জুয়েলকে। সেখান থেকে বারবার চোখ ছুটে যেত সদর দরজার উপরের দিকে। স্যারের মাথাটা দেখা যাওয়া মাত্রই জুয়েলের অন্তরাত্মা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যেত। যা রাগী স্যার! পড়া না পারলে ঐদিন আর রেহাই নেই। বড় ভাইয়া প্রতিবার মেলা থেকে অনেক গুলো সরু আকৃতির বেত নিয়ে এসে মা’র হাতে জমা দিত। মা প্রতিদিন নাস্তা দেয়ার সময় নিয়ম করে সেই বেত পরিবেশন করত স্যারকে। স্যার জুয়েলকে ঐ তেলতেলে ডোরাকাটা বেতটি দেখিয়ে বলতেন, ‘সালাম করে নে।’ তাদের বাড়ীর দক্ষিণ দিকে একটি বিশাল পুকুর ছিল। স্যার পড়া শেষ করে সদর দরজা পেরিয়ে বিপ্লবকে পড়াতে চলে যেতেন উত্তরে। আর জুয়েলের হাত ঘুরে সেই তেলতেলে বেতটি চলে যেত দক্ষিণে। স্যার যখন পড়া জিজ্ঞেস করতেন তখন জুয়েলের চোখে হয় ভাসত সিরাজদের কেরাম বোর্ডের লাল ঘুঁটিটি, নয়তো রুটি বেলা বেলুন দিয়ে বানানো বিপ্লবের হাতল ভাঙ্গা নাটাইটি। তারপর অন্যমনষ্কতার জন্য যথারীতি ডোরাকাটা বস্তুটি বাতাসে শিষ কেটে সাঁই সাঁই করে আছড়ে পড়ত তার পিঠে। তবে স্যারটা তাকে আদরও করতেন ভীষন। বছরের শুরুতে তাদের প্রাইমারী স্কুলে বাৎসরিক সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠান হত। সেখানে ছোট ছোট নাটিকায় সে মাঝে মাঝে অংশগ্রহণ করত। পড়াশোনার পর স্যার তাকে অভিনয় করে করে সেসব প্র্যাকটিস করাতেন। মাঝে মাঝে চকোলেট বাদাম এটা সেটাও নিয়ে আসতেন।
‘মাষ্টার সা’ব আমি নাম দস্তখত শিখতে চাই’ এই গানটি শুনলেই জুয়েলের সমস্ত শরীর কাঁটা দিয়ে উঠত। ‘মাষ্টার’ শব্দটি যেন তার কাছে একটি জলজ্যন্ত আতঙ্ক। স্যারের বেতের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার উপায় জানতে সে বিভিন্ন জনের শরণাপন্ন হয়েছিল। তাদের মধ্যে অনেকেই রয়েছে। তার স্কুলের দুষ্টু বন্ধুটি, দাদু, বাসার পুরনো কাজের মহিলা থেকে শুরু করে পাড়ার সবজান্তা বেলাল ভাই সহ কাউকেই বাদ রাখেনি সে। বেলাল ভাই তার চাইতে প্রায় বার তের বছরের বড়। তিনি আবার টুকটাক ঝাঁড়ফুক, বান টোনা আরো কি কি যেন জানতেন। বেলাল ভাই তাকে মারের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য একটা উপায় খুঁজে বার করেছিলেন। যদিও সেই উপায়ে কাজের কাজ কিছুই হয়নি কিন্তু কিছু একটা হয়েছিল ঠিকই। যা বেতের আঘাতের চাইতেও গভীর এবং করুণভাবে দাগ কেটেছিল জুয়েলের কচি মনে।
একই ক্লাসে পড়ুয়া ছাত্রদের তুলনায় বেলাল ভাইয়ের বয়স তিন চার বছর বেশী ছিল। নবম শ্রেণীর পর স্কুল কলেজ হতে জানার আর তেমন কিছু বাকী নেই মনে হওয়াতে, বেলাল ভাই ওখানেই পড়ালেখার পর্বটি চুকিয়ে ফেলেছিলেন। জুয়েলের স্কুল ছুটি হত দুপুর বারটায়। জুয়েলকে তার সমস্যা সমাধানের পরামর্শ দেয়ার জন্য স্কুল ছুটির পর একদিন বাসায় আসতে বললেন বেলাল ভাই। এই সময়টায় অংকনে পটু বেলাল ভাই তার শিল্পচর্চায় হাত পাকাতে বসতেন। কারণ তখন বাসায় থাকতেন শুধু তাঁর শয্যাশায়ী মা। আর বাকীরা সবাই কাজেকর্মে বাইরে। নিরিবিলি পরিবেশ না হলে আঁকার ভাবটা নাকি ঠিক মত আসে না। একদিন দুপুরে বেলাল ভাই জুয়েলকে সাথে নিয়ে কাগজ আর রং পেন্সিল হাতে স্যার আতঙ্কের সমাধানে বসেন। স্যারের বিরুদ্ধে রুদ্ধদ্বার সেই ষড়যন্ত্রের সময়, সাদা কাগজে প্রথমে লম্বালম্বিভাবে হালকা দাগে একটি বেত অংকন করেন বেলাল ভাই। তিনি বলেছিলেন, মন্ত্র আর ঝাঁড়ফুকের মাধ্যমে এই ধরনের একটি জিনিস দিয়ে জুয়েলকে ভালভাবে ঝেড়ে দিতে হবে। তাহলে স্যার তাকে আর কখনো মারবেন না। আর মারলেও তার গায়ে তেমন ব্যাথা লাগবে না। কিন্তু ঝাঁড়ফুকের বর্ম গায়ে লাগানোর পরও সেদিন বিকেলে স্যার তাকে ঠিকই মেরেছিলেন এবং সেই মারে সে ঠিকই ব্যাথা পেয়েছিল। অবশ্য ব্যর্থ ঝাঁড়ফুকের সংবাদ জানাতে বেলাল ভাইয়ের কাছে আর কখনোই যায়নি সে।
বেলাল ভাই বিড়বিড় করে কি যেন পড়তে পড়তে রং পেন্সিল দিয়ে আঁচর কেটে কেটে অসমাপ্ত চিত্রকর্মটি সমাপ্ত করেছিলেন। সমাপ্তির পর রূপান্তরিত সেই চিত্রে একটি পুরুষ অঙ্গের ছবি ফুটে উঠেছিল। বেলাল ভাই ওদিন যে কৌশলে ঝাঁড়ফুক করেছিলেন, তাকে জুয়েল বড় হয়ে ‘বলাৎকার’ বলে জেনেছে।
জুয়েলের চোখে পানি এসে গেল। হাঁড়ি আঁকা শেষ। বেলীকে খুঁজতে খুঁজতে জুয়েলদের বাসায় এসে উপস্থিত হয় বেলাল। এবং জানালা দিয়ে জুয়েলের কোলে বেলীকে দেখতে পেয়ে আঁৎকে ওঠে হঠাৎ। তার মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে। সময়টা যেন থমকে আছে। থমকে যাওয়া সময়টা বেলালকে টেনে হিঁচড়ে পনের বছর আগে নিয়ে যায়। বেলীর সামনে হাঁড়ির ওপর টুপ করে এক ফোঁটা নোনতা জল গড়িয়ে পড়ে।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29028949 http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29028949 2009-10-20 13:16:16
পাঁক
রাত সোয়া বারটা। রুদ্র বিছানার উপর পাথর হয়ে বসে আছে। কিছুক্ষণ আগে দেশের সর্ববৃহৎ বিজ্ঞাপন সংস্থা ‘ঘোমটা’র কর্ণধার জুলফিকার ভাই তাকে ফোনে জানিয়েছেন, ‘ঘোমটা সিনে এওয়ার্ড’ এর এবারের শ্রেষ্ঠ পরিচালকের পুরষ্কার পেতে যাচ্ছে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘পাঁক’ এর রুদ্র রুবাইয়াত। একটু ধাতস্থ হওয়ার পর তার কেবল দাড়োয়ান চাচা’র কথা মনে পড়তে লাগল। দাড়োয়ান চাচা দাড়োয়ান হলেও তাকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে তিনি আসলেই দাড়োয়ান। কথাবার্তা চমৎকার, পরিষ্কার কাপড় চোপড় পড়েন, প্রতিদিন সকালে শেভ করেন। চকচকে টাক আর ফ্রেঞ্চ কাট কাঁচাপাকা দাঁড়ি তার ব্যক্তিত্ব অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছে। আকারে বেশ লম্বা তবে বুদ্ধিতে বেশ খাটো। যা করতে বলা হয় তার বাইরে কিছু করা তার সাধ্যের বাইরে। আহা! আজ যদি দাড়োয়ান চাচা বেঁচে থাকতেন?
রুদ্রের ছবি তৈরীর আগ্রহ তৈরী হয়েছিল ছোট বেলাতেই। এখন যেভাবে অভিনেতা অভিনেত্রীদের নির্দেশনা দিয়ে থাকে তেমনি ছোট বেলাতেও তার সে অভ্যেসটি ছিল। তখনকার অনেক ছোটখাট ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সে তার পেশাগত জীবনে দারুন ভাবে সফল হয়েছে। রুদ্র সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি পেয়েছিল স্কুলে জীবনে, দাড়োয়ান চাচা’র কাছ থেকে। স্কুলটি বেশ নামকরা, কড়া । রুদ্র এস এস সি পরীক্ষার অনুমতি পায়নি। টেস্টে দু’বিষয়ে ফেল করেছে। প্রিন্সিপাল ম্যাডাম বলেছেন বাবাকে নিয়ে আসতে। কি করবে বুঝতে পারছে না সে। বাবাটা যা রাগী। রুদ্র সেদিন বিকেলে মাঠে না গিয়ে পড়ার টেবিলে ইংরেজী গ্রামার খুলে বসেছিল। কিছুক্ষণ পর দাড়োয়ান চাচাকে জানালার পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে দেখে তার চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠে। মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে। রাতে ঘুমুতে যাওয়ার আগে আইডিয়াটা মাথায় নিয়ে চাচা’র রুমে গিয়ে হাসি হাসি মুখে সে বলল, ‘চাচা, তুমি আমার বাবা।’ চাচা বুঝতে না পেরে বেকুবের মত হাসলেন। তারপর রুদ্র বেশ সময় নিয়ে চাচাকে বোঝালো আসলে তিনি কেমন বাবা।
পরদিন সে প্রায় সারাক্ষণ কাটিয়েছে গেইটের পাশে, চাচা’র কাছাকাছি। চাচা গেইটের সামনে সর্বক্ষণ তার পেশা নিয়ে ব্যস্ত। নতুন কিছু মনে পড়লেই এদিক ওদিক তাকিয়ে রুদ্র দৌঁড়ে গিয়ে চাচাকে প্রয়োজনীয় টিপস্ দিয়ে আসে। একদিনেই চাচা নিজেকে বেশ তৈরী করে নিয়েছেন। প্রিন্সিপাল ম্যাডামের সম্ভাব্য সব ধরনের প্রশ্ন এবং উত্তর রেডি। রুদ্রের খাটুনি হয়েছে বেশ। নানান ধরনের প্রশ্নের উত্তরতো বটেই উত্তরের সাথে সাথে অভিব্যক্তি পর্যন্ত অভিনয় করে বুঝিয়ে দিতে হয়েছে চাচাকে। আর চাচাও দক্ষ অভিনেতার মত সমস্ত খুঁটিনাটি রপ্ত করে নিয়েছেন। বহুবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্র্যাকটিস করেছেন। মাঝরাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে রুদ্র আর চাচা চাচা’র রুমে গোপনে মহড়ায় মেতেছে। মহড়া চলেছে ভোর রাত পর্যন্ত।
নির্দিষ্ট দিন নির্দিষ্ট সময়ে দু’জনে প্রিন্সিপাল ম্যাডামের দরজার সামনে গিয়ে হাজির। খোলা দরজায় পর্দা দেয়া। বাবার স্যুট টাইয়ে দাড়োয়ান চাচাকে দারুন মানিয়েছে। ম্যাডাম ভেতরে কাকে যেন শাঁসাচ্ছেন। পর্দার ফাঁক দিয়ে লুঙ্গি পড়া এক লোককে দেখা গেল, ফ্লোরে দু’পায়ে ভর দিয়ে বসা। লোকটি নাকি স্কুলের পিতলের ভারী ঘন্টাটা চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে। ম্যাডাম পর্দা সরিয়ে বাইরে আসবার সময় রুদ্র আর চাচাকে দেখে থমকে দাঁড়ালেন। রুদ্র তাঁকে সালাম দিয়ে বলল, ‘ম্যাডাম.. আমার বাবা।’ ম্যাডাম ‘হুঁ’ বলে তাদেরকে ভেতরে যেতে ইশারা করে নিজে কোথায় যেন গেলেন। দু’জনে ভেতরে ঢুকে দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে রইল। ভেতরে আরো দু’জনকে দেখা গেল। হুজুর স্যার আর নার্সারীর অল্প বয়সী লুবনা ম্যাডাম। লুবনা ম্যাডাম রুদ্রের দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসলেন। রুদ্রের মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেল। ঈশ্! লুবনা ম্যাডামের সামনে তাকে হেনস্থা হতে হবে আজ? সময় যেন আর কাটে না। অবশেষে প্রিন্সিপাল ম্যাডাম ফিরে এসে সিটে বসতে বসতে চাচাকে বললেন, ‘বসুন।’ চাচা দাড়োয়ান মানুষ। তার সাহস হল না চেয়ারে বসবার। তাছাড়া এ ক’দিনের মহড়ায় দাঁড়াবার - বসবার তেমন কোন ব্যাপার স্যাপার ছিল না। চাচা’র মুখে হালকা হাসি কিন্তু চোখ দু’টি সন্ত্রস্ত। ঘটল অঘটন।
ঠিক সেদিনই রুদ্র রুবাইয়াতের মনের গহীনে রোপিত হয়েছিল চিত্র পরিচালক হওয়ার প্রথম বীজটি। ঘটনার আকষ্মিকতায় হুজুর স্যার থ, লুবনা ম্যাডাম হা। রুদ্রের চোখ জোড়া হয়ে গেল ছানাবড়া আর প্রিন্সিপাল ম্যাডামের গুলো সরু। চোরটি দাঁত কেলিয়ে হাসল। চাচাকে দেখে কিছুটা ভরসা পেয়েছে বোধ হয়। কিছুক্ষণ পর একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে প্রিন্সিপাল ম্যাডাম বললেন, ‘ইনাকে নিয়ে যাও.. কাল আসল বাবাকে নিয়ে এস।’ রুদ্র নড়তে চড়তে পারছে না। পা যেন গভীর পাঁকে আটকে গেছে। তবুও সে ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে, চোরের পাশ থেকে মাটিতে বসে পড়া চাচাকে হাত ধরে দাঁড় করিয়ে, বেরিয়ে গেল চোখের পলকে।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29020740 http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29020740 2009-10-05 12:07:01
প্রথম প্রেমের মুকুল আজ এস এস সি পরীক্ষা শেষ হল। ঈশ্ এতদিন ছাদে না উঠে কতগুলো বিকেল যে রোমেল নষ্ট করেছে! আহা কি ভাল লাগছে আজ! কি সুন্দর তুলতুলে বিকেল! কি সুন্দর পাশের দোতলা বাড়ীর ঐ কামিনী গাছ! গাছের পেছনে নীচতলার জানালাটাকেও ভারী চমৎকার লাগছে আজ। নাকি জানালার ফ্রেমে দেখতে পাওয়া মেয়েটার জন্যেই সবকিছু এত মধুর মনে হচ্ছে? রোমেল ওদিন বাবা আর মা’কে বলাবলি করতে শুনছিল, মুন্নাদের নীচতলায় নাকি নতুন প্রতিবেশী এসেছে। ক’দিন ধরে রোমেল সুযোগ পেলেই ছাদে উঠে হাত পা ছোঁড়াছুঁড়ি করে এক আধটু ব্যায়াম করার চেষ্টা করে। ছাদে ওঠা বাবার নিষেধ, তাই ব্যায়ামের অজুহাতটা দেখাতে হয়। বেসুরো গলায় গলার ব্যায়ামটা সাড়তে সাড়তে বেশ কয়েকবার মেয়েটার দৃষ্টি আকর্ষনের চেষ্টা করেছে সে। কিন্তু পাষানী নির্বিকার। কামিনি গাছটার একটা ডাল ঐ জানালার অর্ধেকটা প্রায় ঢেকে ফেলাতে চোখের ব্যায়ামটায় একটু সমস্যা হয়। তাদের বাড়ী থেকে ওবাড়ীর দূরত্ব প্রায় ফুট দশেক। ওবাড়ীর সামনে ছোট্ট এক চিলতে ঊঠোন। রোমেলদের তিন তলার ছাদ থেকে ভাললাগা জানালাটা তেরছা ভাবে চোখে পড়ে। তার ভাবতে ভাল লাগে, জানলাটা যেন একটি পালকির মত দেখতে। পালকির দুয়ারের ফাঁক গলে দেখা যায় কোন লাজুক বধুর ঘোমটা টানা আবছা অবয়ব, আহ্ কি যে ভাল লাগে। খালি বুকটা আরো খালি খালি মনে হয়। সামনের ঐ বেরসিক গাছটা বড় বিরক্তিকর। ধুশ্‌শ্ ..কামিনি গাছ একটা গাছ হল, ছ্যা। মেয়েটা কখন যে এসে জানালার পাশে বসে বা কখন যে উঠে যায় সে আজ পর্যন্ত দেখতে পায়নি। থাক ওসব তার না ভাবলেও চলবে। আচ্ছা মেয়েটার নাম কি? উম্‌ম্‌ম্‌.. তার নাম দেয়া যাক ‘কামিনী’। না না, কামিনি একটা নাম হল? ফালতু! বরং নাম দেয়া যাক..‘বৈকালী’। বিকাল বেলার কেলি, বৈকালী। আরে দারুন নাম দেয়া গেল তো! সে কবি হয়ে গেল বুঝি?
বৈকালী সম্ভবত খুবই ধার্মিক। মাথায় সবসময় একটা স্কার্ফ দেয়া থাকে। আচ্ছা মেয়েটা সবসময় জানালার দিকে পাশ ফিরে বসে কেন? সপ্তাহ খানেক পার হয়ে গেল। কিন্তু আজ পর্যন্ত সে শুধু মেয়েটার স্কার্ফ পড়া মাথাটাই দেখতে পেয়েছে, তাও আবার একপাশ থেকে। এ কয়দিনে সে কিছুটা অগ্রসর যে হয়নি তা নয়। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসলে ভেতর থেকে কে একজন এসে রুমের বাতিটা জ্বালিয়ে দিয়ে যায়। আচ্ছা মেয়েটা মাঝে মাঝে তার দিকে তাকিয়ে হাত নেড়েছে কি? নাকি সবই তার উচাটন মনের ভাবনা? ওবাড়ীর দোতলায় মুন্না’রা থাকে। সামনের বড় রাস্তার মুখে যে স্কুলটা সেখানে সে ক্লাস ফোরে পড়ে। তাকে দিয়ে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করা যায়। একদিন মুন্না স্কুল থেকে ফেরার সময় রোমেল তাকে ডেকে হাতে একটা ক্যাটবেরি চকোলেট ধরিয়ে দেয়। এই সামান্য ক্যাটবেরি’র সাহায্য নিয়ে যা সে জানতে পারে তা হল, নীচতলার প্রতিবেশীরা এসেছে প্রায় মাস দুয়েক আগে। কর্ত্রীটি গৃহিণী আর কর্তাটা সকালে যায় সন্ধ্যায় ফেরে। বৈকালী সম্পর্কে কিছু জানতে চাওয়ার আগেই মুন্নার বাবাকে বাসার দিকে এগিয়ে আসতে দেখা গেল। এটুকু তথ্যই আপাতত যথেষ্ট মনে করে মুন্নাকে তাড়াতাড়ি ছেড়ে দেয় সে। ধুর্‌ মেয়েটার নামটাও জানা হল না। থাক, নামতো একটা দেয়া আছেই এত তাড়াহুড়োর কিছু নেই। ধাপে ধাপে এগুতে হবে। কিন্তু তার তর সইছিল না যেন আর। একদিন সে অনেক যত্নে বেশ সময় নিয়ে তার আবেগগুলো একটি নীল খামে বন্দী করে। সেই সাথে অযত্ন অবহেলায় খাম ছাড়া সাদা কাগজে সাদামাটা ভাবে আরো একটি লেখা তৈরী করে, সেটা মুন্নার জন্যে। বিকেলে লেখা দু’টি নিয়ে সে পুলকিত মনে ছাদে উঠে আসে। মুন্না তখন চার হাতেপায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে ধূলো উড়িয়ে উঠোনে খেলছিল। রোমেল শিশ্ দিয়ে মুন্নাকে ডাক দেয়। সে কাছে আসলে রোমেল প্রথমে খাম ছাড়া চিঠিটা দলা পাকিয়ে ছুঁড়ে দেয়। সেখানে বড় বড় করে লেখা রয়েছে, ‘তোমাকে একটু পরে যে জিনিসটা দিব, সেটা ঐ কামিনি গাছটার পাশে যে জানালাটা রয়েছে সেই জানালায় যে মেয়েটা বসে থাকে তাকে দিয়ে আসবে।’ এটা পড়ে মুন্না রোমেলের দিকে মুখ তুলে তাকায়। চোখেমুখে চিঠির অর্থ না বোঝার ভাষা। রোমেল আঙ্গুল দিয়ে মায়াবি জানালাটি দেখিয়ে খামটা এমন আলতো করে মুন্নাদের উঠোনে ফেলে যাতে খামের গায়ে কোন চোট না লেগে যায়। তারপর চাপা গলায় বলে, ‘ঐ জানালার পাশে যে বসে থাকে, তাকে দিয়ে আসবে’। খামটা মাটি স্পর্শ করার আগে মুন্না লুফে নেয়ার চেষ্টা করে এবং সফল হয়। তবে তার ময়লা হাতের চাপে খামটা কিছুটা দুমড়ে মুচড়ে যায়। রোমেলের ভেতরটা ব্যাথায় কঁকিয়ে ওঠে। ছোঁড়াটা হয়তো রোমেলের দুর্বলতা টের পেয়েই বলে উঠল, ‘ক্যাটবেরি?’ রোমেল ইশারায় বোঝায়, ‘পরে।’ মুন্না ‘আচ্ছা’ বলে চলে যায়। রোমেল দাঁত কটমট করে বিড়বিড় করে, ‘হারামজাদা’।
পরদিন দুপুরে রোমেল কম্পিউটারের সামনে মন হারিয়ে অন্যমনষ্ক। হাতের মুঠোয় মুঠোফোন। এমন সময় মা ঢোকেন রুমে। ততক্ষনাৎ সে কম্পিউটারের দিকে ঝুঁকে মনযোগী হয়ে ওঠে। মা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি করছিস রুমু?’ রোমেল কপাল কুঁচকে বলল, ‘দেখতেই তো পাচ্ছো, কম্পিউটারে কাজ করছি।’ মা মুচকি হেসে বললেন, ‘তা মাউসের জায়গায় মোবাইল ধরে আছিস কেন বাবা?’ মুন্নার দৃষ্টি কম্পিউটার হতে তড়িৎ হাতে ধরা মোবাইলের দিকে ছুটে যায়। মা-মন-মাউস-মোবাইল, ওফ্ চারটি ‘ম’ যেন তার মাথার ভেতর দামামা বাজিয়ে চলেছে। ছেলের অসহায় অবস্থা দেখে মা প্রসঙ্গ পাল্টালেন, ‘আজ মুন্নার মা এসেছিল।’ হায় খোদা! সবকিছু ফাঁস হয়ে গেল বুঝি? আরো দু’টি ‘ম’ এসে যুক্ত হল যে! মা বললেন, ‘রাতে ওদের বাসায় দাওয়াত আছে। তোর বাবা যেতে পারবে না.. তুই গিয়ে খেয়ে আসিস।’ যাক বাবা, যা ভেবেছিল তা নয়।
উল্লসিত মনে মুন্নাদের বাসায় পা রাখে রোমেল। বসার কোন জায়গা নেই কোথাও। ডাইনিং টেবিল - ড্রইং রুমের সোফা - শো পিস্‌ রাখার টুল সহ সব ক’টি চেয়ারে অতিথিদের অসহিঞ্চু শরীর অপেক্ষা করছে। এককোনে মুন্নাকে দেখা গেল এক রাশভারী মহিলার পাশে বসে ললিপপ খাচ্ছে। মুন্না রোমেলকে দেখে মহিলাটির কানে কানে কি যেন বলল। এতগুলো মানুষের মাঝে থেকেও রোমেলের নিজেকে বড় একা একা মনে হল। সে সন্তর্পনে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যায়। ছাদে ওঠার সাথে সাথে বাজে একটি গন্ধ তার নাকে এসে লাগে। চিলেকোঠার বাইরের দেয়ালের সাথে চল্লিশ ওয়াটের একটি বাল্ব জ্বলছে। এককোণে একটি ভাঙ্গা টয়লেট চোখে পড়ল তার। টয়লেটের নীচের অংশের দেয়াল চুয়ে কালচে রঙের কিঞ্চিত তরল গড়িয়ে এসে জমাট বেঁধে এক জায়গায় বিশ্রাম নিচ্ছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও টয়লেটে ঢুকে হালকা হয় সে। দম বন্ধ অবস্থায় যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কাজ সেড়ে বের হয়ে আসে। ধুপধাপ করে কে যেন ছাদের দিকে উঠে আসছে। ভয়ে তার হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসে। আচ্ছা সে অত ভয় পাচ্ছে কেন? উৎকন্ঠিত ভাবে একটু আড়াল খুঁজতে থাকে রোমেল। ঐ দুর্গন্ধে ঢুকতে গিয়েও ঢোকে না। টয়লেটের পাশেই অন্ধকারে দাঁড়িয়ে কিছুটা লুকোনোর চেষ্টা করে নিজেকে। মাথার ওপর খোলা আকাশের দিকে অভিযোগের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সে। মনে মনে বলে, ‘হে আল্লা আমি একটা মাসুম বাচ্চা.. কেন আমার মনের উপর এত জুলুম চালানো হচ্ছে?’ ছাদের দরজার দিকে তাকিয়ে মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল তার। বান্দরটা এসে উপস্থিত। সে আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে আসে। মুন্না লাফাতে লাফাতে নাকি সুরে বলছে, ‘আমার ক্যাটবেরি কই..আমার ক্যাটবেরি কই?’ অনেক কষ্টে রাগ সামলায় রোমেল। শালা এখনো কাজের কাজ কিছুই হল না, সব সময় শুধু খাই খাই। মুখে বলল, ‘নুকু নুকু নুকু নুকু. ..তারপর..মুন্না সোনা..চিঠিটা দিয়েছিলে?’ মুন্না ঠোঁটের দু’প্রান্ত যথাসম্ভব প্রসারিত করে বলল, ‘আমি যখন গিয়েছিলাম তখন উনি ঘুম.. তাই আন্টিকে দিয়ে এসেছি। আন্টি তোমাকে চিনে না তো তাই তুমি যখন আসলে তখন তোমাকে চিনিয়ে দিয়েছি।’ ওপরে মেঘেদের বিন্দুমাত্র আনাগোনা নেই। তারাগুলো এতই স্পষ্ট যে, প্রেমিকার অপেক্ষায় অপেক্ষমান কোন প্রেমিকপুরুষ অনায়াসে গুনে ফেলতে পারে সবকটা। আসমানকে এত শান্তশিষ্ট মনে হলেও কোথায় যেন প্রচন্ড শব্দে বাজ পড়ল বলে মনে হল রোমেলের। আচ্ছা, এই হারামজাদা ইচ্ছে করে তাকে ফাঁসায়নিতো? প্রেমের প্রথম মুকুলটা না ফুটতেই ঝরে যাবে? রোমেল দাঁড়ানো অবস্থা থেকে সোজা বসে পড়ে। তার চাপে পড়ে টয়লেট হতে আগত বিশ্রামরত তরল ধ্যান ভেঙ্গে ছলাৎ করে দু’পাশে গড়িয়ে যায়। মুন্না বারবার জানতে চায় ক্যাটবেরির কথা, রোমেল করুণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। সে কি বুঝল কে জানে অমনি আগের মত নাচতে নাচতে নীচে চলে গেল। রোমেল এভাবে কতক্ষণ বসে ছিল জানে না। নীচ থেকে মুন্নার মায়ের ভাঙ্গা ভাঙ্গা কন্ঠ শোনা যায়, ‘আমরা ছাড়া আর কেউ বাকী নেই.. ও ডাক্তার সাহেব তো এখনো এলেন না.. আচ্ছা.. .আমরা সবাই এক সাথে বসে..।’ কিন্তু ওঠার কোন তাগিদ অনুভব করল না সে, বসে রইলতো বসেই রইল। আরো প্রায় মিনিট চল্লিশেক বাদে অনুষ্ঠান শেষে সবকিছু চুপচাপ হয়ে এলে ধীর পায়ে নামতে শুরু করে রোমেল। উদ্দেশ্য পলায়ন। সিঁড়ির শেষ ধাপে পা দিতেই কোত্থেকে যেন সেই রাশভারী মহিলাটি এসে উপস্থিত হয়।
রাত সাড়ে এগারটা। ড্রইং রুমে মুখোমুখি দু’জন। ভদ্রমহিলার ঠান্ডা উপস্থিতি পরিবেশকে আরো বেশী নিস্তব্ধ করে তুলেছে। এইসময় বাড়ীর সদাহাস্য কর্তাটি এসে কর্ত্রীর পাশে বসতে বসতে নাক কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘গন্ধ কিসের?’ কর্ত্রী টেবিলের উপর থেকে একটি নীল কাগজ রোমেলের দিকে এগিয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, ‘এটা তোমার লেখা?’ রোমেল মাথা নীচু করে একমনে দু’পায়ের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে কার্পেট খুঁটে চলেছে। উনি তাঁর স্বামীকে বললেন, ‘এটা পড়।’ তিনি অনিচ্ছা সত্ত্বেও চিঠিটি দ্বিতীয়বার পড়লেন, ‘লাল স্কার্ফে ঢাকা অদেখা ঐ মুখটা বড় দেখতে ইচ্ছে করে। 01819387662-এই নাম্বারে কি একটা ফোন করা যাবে? - রোমিও রোমেল।’’ ভদ্রলোক জানতে চাইলেন রোমেল কিসে পড়ে। সে এবার মেট্রিক দিয়েছে বলাতে তিনি গম্ভীর হতে গিয়ে ফিচ্ করে হেসে ফেললেন। রোমেল কিছুটা অপমানিত বোধ করল। কর্ত্রীটি তাঁর কর্তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এটাইতো ডাক্তার সাহেবের ছেলে তাই না?’ তারপর চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, ‘তোমাকে আমি অদেখা মুখটা একবার দেখাতে চাই।’ কথাটা কি ভেবে বলা ঠিক বোঝা গেল না। ভদ্রলোক সন্দেহের দৃষ্টিতে রোমেলের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলেন, ‘গন্ধটা কোত্থেকে আসছে?’ কিন্তু হঠাৎ তিনি চমকে উঠলেন, তাঁর কর্ত্রী একি বলছেন! মেয়েটাকে একবার দেখতে পারার কথা শুনে রোমেল চট করে উঠে দাঁড়াল। সে এতক্ষণ যে জায়গায় বসেছিল সেখানে কর্তার চোখ গিয়ে পড়ল। সাদা সোফার উপর নিতম্বাকৃতির একটি কালচে ভেজা দাগ। তিনি তাঁর স্যান্ডো গেন্জিটি বিশেষ কায়দায় পেটের ওপর তুলে নাক চাপা দিলেন। কর্ত্রীর এতকিছু খেয়াল নেই। উনি কঠিন মুখে উঠে দাঁড়ালেন। কর্তা বললেন, ‘করছ কি তুমি!’ স্বামীকে ধমকে উঠলেন ভদ্রমহিলা, ‘তুমি বুঝবে না।’ উনি রোমেলকে ইশারা করলেন তাঁকে অনুসরন করতে। তিনজনে পাশের রুমে ঢুকলেন। ভেতরে মৃদু নীলচে আলো। মেয়েটার মুখ পাতলা লাল স্কার্ফে ঢাকা। স্বামীটি ফিস্‌ফিস্‌ করে বললেন, ‘থাক না.. মা আমার জেগে উঠবে!’ ভদ্রমহিলা শব্দ না করে সাদা আলোর সুইচটা টিপলেন, মেয়েটার শিয়রের কাছে এগিয়ে গিয়ে রোমেলকে কাছে ডাকলেন। আর কর্তাটি মুখে বিরক্তির শব্দ করে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। রোমেল দুরু দুরু বুকে চাদরে ঢাকা মেয়েটার মুখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, যেন রূপ দর্শনে একটি মুহুর্তও নষ্ট না হয়। কর্ত্রী লাল চাদরের আবরনটা আলগোছে সরালেন। হারানো সৌন্দর্যের দিকে তাকিয়ে আঁৎকে উঠল রোমেল। ভদ্রমহিলা চাদরটা আগের মত ঢেকে দিয়ে মর্মাহত রোমিওর ঘর্মাক্ত হাতটা ধরে ড্রইং রুমে নিয়ে এলেন। তারপর স্মিত হাস্যে বললেন, ‘মাঝে মাঝে এসো বাবা.. তুমি আসলে আমার শাশুড়ি খুশী হবেন ।’
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29019239 http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29019239 2009-10-02 15:23:35
বিশ্রামের ফাঁদে
কালুর পরিচয় কেয়ারটেকার হলেও আসলে সে বাড়ীর দারোয়ান। কারণ এতবড় বাড়ী খালি পড়ে থকালেও সেখানে তার থাকার কোন অনুমতি নেই। সে থাকে গেইটের সাথে লাগোয়া পাঁচফুট বাই পাঁচফুট পাহারা দেয়ার খোঁয়াড়টিতে। মুখে তার মৌলানার মত দাঁড়ি, থুতনির দিকে সবটাই পাকা। সে কিন্তু মোটেও ধার্মিক নয়। শেভ করার টাকা বাঁচাতে গিয়ে তার দাঁড়ির এ হাল হয়েছে। তবে এই দাঁড়ি তার চেহারায় একটা নূরানী ভাব নিয়ে এসেছে। সে যে হাড়ে হাড়ে বজ্জাত সেটা ওপর থেকে দেখে বোঝার কোন উপায় নেই। তৈরী বাড়ীটা আফরান কাজী কিনেছিলেন দু’বছর আগে। তিনি ছয় মাস অন্তর বউ বাচ্চা নিয়ে একবার দেশে আসেন, পনের বিশ দিন থেকে আবার কানাডায় ফিরে যান। তাঁর ছোট ভাই গোফরান কাজী অফিস থেকে ফেরার পথে মাঝে মাঝে বিনা নোটিশে এখানে চলে আসেন। এসব দারোয়ান টারোয়ানদের কোন বিশ্বাস নেই। গোফরান কাজী ভীষন কড়া লোক। চুন থেকে পান খসলেই বলে ওঠেন, ‘চাবিটা দে, বিদায় হ.. আমি অন্য লোক দেখব।’ কালু শুরু থেকেই এ বাড়ী দেখাশোনা করে আসছে। ঝাড়ু থেকে শুরু করে বাড়ীর প্রায় সব কেনাকাটা বাবু করে দিয়েছে। সাথে অবশ্য কালুও ছিল। শেয়ার বাজারে বাবুর কিছু টাকা লগ্নি করা আছে যাতে রনির অংশই বেশী। রনি তার বাবা মা’র সাথে কানাডাতেই থাকে। প্রচন্ড আলসে এই বন্ধুটিকে রনি খুবই পছন্দ করে। যেহেতু চাকরি বাকরি তার ধাতে নেই তাই ব্যবসা করে হলেও যাতে সে দাঁড়াতে পারে এই জন্যে রনি টাকা গুলো দিয়েছে। নইলে শেয়ার ব্যবসায় তার বিন্দুমাত্র উৎসাহ নেই। বাবু আজ দশ বছর যাবত শুধু পাত্রীই দেখে আসছে। সে অবিবাহিত জানার পর থেকেই কালু টোপ ফেলতে শুরু করেছে। একদিন সাহস করে বলেই বসেছে, ‘ঘরটা খালি পড়ে থাকে, মাঝে মাঝে এসে আপনি বিশ্রাম নিতে পারেন.. তালাচাবি তো আমার কাছেই থাকে।’ শুক্রবার বাসায় নানা ধরনের কাজকর্ম থাকে, শনিবার স্টক এক্সচেঞ্জ বন্ধ। কালুর টোপটা গিলে তারপর থেকে প্রায় শনিবার দুপুরে এখানে এসেই বিশ্রাম নেয় বাবু। অবশ্য কালুকে সে বলে দিয়েছে বিষয়টা যাতে গোপন থাকে, নয়তো কোন একদিন কালুর জায়গায় গোফরান সাহেব তাকেই কেয়ারটেকারের দায়িত্ব নেয়ার জন্য অনুরোধ করে বসতে পারেন। এভাবে দিন যেতে যেতে একদিন আসল টোপটা ফেলল কালু, ‘বিয়া শাদী এখনও করেন নাই.. একা একা বিশ্রাম করতে কি আর ভাল লাগে.. ইচ্ছা করলে সাথে করে বন্ধু বান্ধবও নিয়ে আসতে পারেন।’ বাবুর মত আদর্শবান লোক দ্বিতীয় টোপটাও গিলে ফেলল অনায়াসে। শুরু হয় বিশ্রামের দ্বিতীয় পর্ব। এই নতুন এবং গোপন অভিসারে পার হয়ে যায় গোটা পাঁচেক শনিবার। একদিন, নরম বিছানায় বিশ্রামটা দীর্ঘ হতে হতে বাবু তার সাথীকে নিয়ে গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়। কালু ভাবল এবার বুঝি সময় হল বড়শিতে টান দেয়ার। রাত সাড়ে আটটায় যখন মহারাজের ঘুম ভাঙ্গল তখন চারিদিকে অন্ধকার। অন্ধকারে বাতির সুইচটাও খুঁজে পাওয়া যায় না। মোবাইলের টর্চটাও নষ্ট হয়ে গেছে। হাতরে হাতরে দরজার কাছে গিয়ে দেখে বাইরে থেকে তালা দেয়া। কালুকে ডাকতে গিয়ে কি ভেবে সে আর ডাকে না। মোবাইলে ফোন করে কালুকে আসতে বলে। কালু বিড়ালের মত এসে জানালায় টোকা দেয়। জানালা একটু ফাঁক হলে ফিসফিস করে সে জানায়, বড় ভাইজান এসেছেন, গেইটের কাছে দাঁড়িয়ে কার সাথে যেন ফোনে কথা বলছেন। তারপর গলাটা আরেকটু খাদে নামিয়ে বলল, ‘দরজা খোলা দেখলে ফাজিল ব্যাটা গালাগালি করবে তাই তালা দিছি.. বাত্তি জ্বালায়েন না।’ ইতিমধ্যে মহারানীও জেগে উঠেছেন, বিছানায় শোয়া অবস্থায় বাবুকে বলল, ‘সর্বনাশ! রাত হয়ে গেছে? বাতিটা জ্বালান।’ বাবু চুপিচুপি বলল, ‘একটু সমস্যা হয়ে গেছে, আওয়াজ করোনা।’ মেয়েটা অস্থির হয়ে উঠেছে, ‘আমার অন্য জায়গায় প্রোগ্রাম আছে।’ বাবু তাড়াতাড়ি লুসির মুখ চেপে ধরল, ‘প্লিজ তোমাকে আরো পাঁচশ টাকা বাড়িয়ে দেব, কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাক।’ বাবু প্রচন্ড ভাবে ঘামছে। মাথার উপর ফ্যান কিন্তু ছাড়তে সাহস হচ্ছে না। তার চোখের সামনে শুধু গোফরান সাহেবের বিশাল চওড়া গোঁফ জোড়া ডানা মেলে উড়ছে। যা রাগি মানুষ! সে বিক্ষিপ্ত মনটাকে অন্যদিকে ফেরানোর চেষ্টা করল। আচ্ছা মেয়েটার নাম কি সত্যিই লুসি? কে জানে, এরা কি কখনও আসল নাম বলে? গত চার শনিবারে তিনজন মহারানী এ বাড়ীতে এসেছেন। তাদের মধ্যে লুসিই এসেছে দুইবার। বাকিদের চাইতে তার চাহিদা দুইশ টাকা বেশী। হঠাৎ জানালায় টোকা শুনে বাবু চমকে ওঠে। কালু এসে জানাল গোফরান সাহেব চলে গেছেন। আহ্‌ মনে হল গোফরান সাহেব যাননি, যেন পথ ভুলে চলে গেছেন আজরাইল। কালুর কাছ থেকে মোবাইল নিয়ে আলো জ্বেলে সুইচবোর্ডটা খুঁজে নিল বাবু। এবাড়ীর প্রায় সবকিছুই তার নখদর্পনে শুধু সুইচবোর্ডটাতে একটু গন্ডগোল হয়ে যায়। কালুর খসখসে কাশির আওয়াজ শুনে বাবু অবাক হয়ে ফিরে তাকায়, ‘দাঁড়িয়ে আছো কেন? দরজা খোল তাড়াতাড়ি।’ এরপর কালু ভয়াবহ সংবাদটি রসিয়ে রসিয়ে পরিবেশন করলো, ‘ইয়ে.. চাবিটা বড় ভাইজান নিয়ে গেছেন।’ লুসি মুখে একটা ভেংচির ভাব দেখিয়ে টয়লেটে ঢুকে পড়ল আর বাবু মাথায় হাত দিয়ে ফ্লোরে বসে পড়ল। প্রায় দু’মিনিট দু’জনেই চুপচাপ থাকার পর বাবু নিরবতা ভাঙ্গল, ‘আপনি কোন ব্যবস্থা করতে পারেন না আঙ্কেল?’ কালু মুখে কিছু না বলে ইশারায় অপারগতা প্রকাশ করল। তারপর কিছুক্ষণ সময় নিয়ে বলল, ‘ভাইজানের বিশ্রাম কেমন হল?’ বাবু মনে মনে বলল, ‘ওরে.. তুই নিষ্ঠুরের মত প্রশ্ন করছিস কেন বাপ্?’ একটু পরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে কালু বলল, ‘আমারো কি মাঝে মাঝে এরকম বিশ্রাম করতে ইচ্ছা করেনা?’ বাবু অবাক হয়ে কালুর দিকে ফিরল। মিনতি করে বলল, ‘কাকা..কাকা.. এরপর থেকে না হয় আমি বেরিয়ে আসার পর তুমিও খানিক্ষণ বিশ্রাম নিও।’ কালু হঠাৎ অন্যদিকে ফিরে উদাস হয়ে গেল। বাবুর ঠোঁট দু’টি শুকিয়ে খসখসে হয়ে আছে। সে আবারো বলল, ‘চাবিটা কোন ভাবেই কি ম্যানেজ করা যায় না ভাইজান?’ এবার কালু একটু নড়ল বলে মনে হল। যেতে যেতে বলল, ‘বড় ভাইকে ফোন করে দেখি, কাছাকাছি থাকলে না হয় চাবিটা নিয়ে আসলাম।’ লুসি টয়লেট থেকে বেরিয়ে এসেছে, ‘কি হল, আমি এবার যাব.. তাড়াতাড়ি টাকা দেন দেড় হাজার।’ বাবু চোখ বড় বড় করে তাকাল, ‘দেড় হাজার কেন?’ লুসি হেসে বলল, ‘বারে, আপনি বললেন না পাঁচশ বাড়িয়ে দেবেন।’ বাবুর মুখটা কাঁদো কাঁদো হয়ে গেল। এমন সময় দরজার তালা খোলার শব্দ পাওয়া গেল। আরে এক মিনিটও হয়নি এর মধ্যেই চাবি কোথায় পেল শালা? কালু রুমে ঢুকে হাসতে হাসতে বলল, ‘বড় ভাইকে ফোন করার জন্য মোবাইলে হাত দেয়া মাত্র গাড়ীর হর্ণ শুনতে পেলাম, আমাকে ডেকে বললেন ভুলে নাকি চাবি নিয়ে গেছেন।’ লুসি ভ্রু কুঁচকে বলল, ‘কই, কোন হর্ণ শুনলাম না তো।’ কালু দাঁত কেলিয়ে হাসলো। লুসিকে সাথে নিয়ে রাগে ফুসতে ফুসতে বের হয়ে গেল বাবু।
পরের শনিবার সকাল ন’টার দিকে কালু যখন বাবুকে ফোন করে তখন সে নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে। কালু জানাল তার সন্ধানে নাকি একটা ডানা কাটা পরী আছে। বাবু ঘুম চোখে কোন উত্তর না দিয়ে হাই তোলে। কালু আমতা আমতা করে জানাল পরী’র ডিমান্ড নাকি দু’জনের জন্য তিন হাজার, তার মধ্যে আবার অগ্রীম চায় দু’হাজার। বাবু দুপুর দু’টায় আসবে বলে অগ্রীমটা কালুর কাছ থেকে দিয়ে দিতে বলে। কিন্তু কালু জানাল তার কাছে টাকা নেই, সে নাকি বেতনই পায় তিন হাজার। হঠাৎ গত শনিবারের কথা মনে পড়ায় বাবু নিরবে একটু হাসে। সে পরে পরিশোধ করে দিবে বলে অগ্রীম টাকাটা কালুকে কোন ভাবে যোগাড় করে নিতে বলে।
কালু একটি আয়েশী ঢেকুর তুলে পাজামার গিঁটটা লাগাল। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে আজ খুবই খোশমেজাজে আছে। দেখতেও দারুন লাগছে তাকে। শুধু জুলপি দু’টো পেকে সাদা হয়ে আছে। সকালে সুন্দর করে চুল ছেঁটেছে। জুলপিতে একটু কলপ করিয়ে নিলে ভাল হত। মসৃন মুখটাতে দাঁড়ির ছিটেফোঁটাটি নেই। তেলতেলে মুখে আলো পড়ে পিছলে যাচ্ছে। পরী বাথরুম থেকে বেরিয়ে চুল ঠিক করতে করতে বাকি এক হাজার টাকা চাইল। কালু বলল, ‘কোন সমস্যা নাই.. অপেক্ষা কর, একটু পরে আরেকজন এসে পড়বে।’ পরী খানিকটা বিরক্তি নিয়ে বলল, ‘আমি আর থাকতে পারবো না, যেতে হবে.. টাকা দেন।’ বাবু ভাই আসতে এত দেরী করছে কেন কে জানে। পাশের নির্মানাধীন বাড়ীর কন্ট্রাকটারের কাছ থেকে ধার করে পরীকে অগ্রীম দু’হাজার টাকা দিয়েছে কালু। ফোনও তো ধরছেনা বাবু ভাই। চিন্তিত কালু দরজা খুলে বাইরে বের হয়ে এল। চোখের সামনে হঠাৎ উদয় হওয়া চওড়া একজোড়া গোঁফ দেখে তার বুকটা কেঁপে উঠল আচমকা। সামনে গোফরান সাহেব দাঁড়িয়ে। কালু মুখে হাসি এঁটে, ‘কোঁৎ’ করে একটা ঢোক গিলল। পরী ভিতর থেকে বের হয়ে আসতে আসতে বলল, ‘বাকি টাকাটা দেন, বিদায় হই।’ গোফরান সাহেবকে দেখে পরী লাস্যময়ী হাসি দিয়ে বলল, ‘আমার কিন্তু সময় শেষ ভাই.. এখন আর কিছু হবে না।’ গোফরান সাহেব পরীর কাছ থেকে চোখ সরিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে কালুকে বললেন, ‘চাবিটা দে?’ কালুর মুখে ফ্যাকাসে হাসিটা লেগেই আছে। পা দু’টো প্রচন্ড ভারী ভারী ঠেকছে। পরী কোমরে শাড়ী গুঁজতে গুঁজতে গোফরান সাহেবকে ঝাম্‌টে উঠল, ‘বললাম না সময় শেষ।’ কালুর দিকে ফিরে বলল, ‘এই বুইরা টেকা দে।’ বিদঘুটে সংক্ষিপ্ত একটি রিং টোনের শব্দ কালুকে কিছু সময়ের জন্য রেহাই দিল বুঝি। গোফরান সাহেব রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, ‘কলটা ধর্‌ হারামজাদা।’ কালু পরীর দিকে তাকাল। পরী বলল, ‘ফোনটা ধর্‌ ব্যাটা।’ কালু মিনমিন করে বলল, ‘এটা কল না।’ সে দেখল বাবুর পাঠানো ছোট্ট ম্যাসেজে লেখা রয়েছে, ‘Bhaijaner bisram kemon holo janaben.’

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29018496 http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29018496 2009-10-01 11:39:14
অমাবস্যায় পূর্ণিমা
সেদিন এক ভদ্রলোকের মুখের দিকে তাকিয়ে আমি চমকে উঠলাম। দাঁড়িগোঁফ গুলো একটার চাইতে আরেকটা বেশ তফাতে অবস্থান করছে, অনেকটা আমার মতই। মাঝে মাঝে ভাবি বয়স কত হল যেন? এখানে ওখানে অপরিকল্পিত ভাবে ছড়িয়ে রয়েছে চুল দাঁড়ি, যেন এক বদ্ধপাগল। যদিও কেউই এই বিশেষনটি কখনও আমার ক্ষেত্রে ব্যবহার করেনা। তো লোকটি হেঁটে যাওয়ার সময় তার শার্টের পকেট বরাবর টিপ্‌ করে সাদাকালো রঙ ছড়িয়ে দিল কালো রং এর বেরসিক একটি পাখী। বেচারা আবার পেছনের পথ ধরলেন শার্ট বদলাতে। নানা রঙের এইসব পাখীরা আমাকেও বড্ড জ্বালায়, যাক সে কথা না হয় পরে বলা যাবে। বলছিলাম বয়সের কথা। ঠিক বলতে পারব না জন্মের সন তারিখ। তবে মনে আছে মানুষ জন অনেক কম ছিল তখন। এখন যেদিকে তাকাই শুধু মানুষ আর মানুষ। তখনকার দিনের মানুষেরা ছিল সহজ সরল নম্র, আর এখন কেমন যেন যান্ত্রিক-বেপরোয়া। নাকি পুরনোরা নতুনকে স্বাচ্ছন্দে গ্রহণ করতে পারেনা খুব একটা, হবে হয়তো। তবে একটা বিষয় বদলেছে আগে আমার খাবারের অভাব হতো বেশী, পেট ভর্তি হতে সময় লাগত বেশ। আর এখন নিমিষেই ভর্তি হয়ে যায়। কি যেন বলছিলাম... ও হ্যাঁ বয়স .. হাহ্‌ হাহ্‌ হা হা হা হা .. স্মৃতি শক্তিও বুঝি নষ্টের পথ ধরল। শরীরটা দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। তাই জন্যেই বয়সের কথাটা বেশী করে মনে পড়ছে। বাঁ পাশটায় কি যে হল, একদিকে বেশ বড় সড় একটি গর্তের মত হয়েছে দেখতে। বুঝিবা আস্ত একটি বিড়ালই ঢুকে যেতে পারবে তার ভেতর দিয়ে।
খাবারের কথা যেটা বলছিলাম, ইদানিং পেটটা ভর্তি হয়ে যায় খুব তাড়াতাড়ি। কোরবানির ঈদের সময়তো আমার উপর রীতিমত জুলুম চালান হয়। পেট ভর্তি হওয়ার পর গলা মুখ উপচে আমার চারিদিক একাকার হয়ে যায়। তারপর শুরু হয় সিটিটাকে তিলোত্তমা বানানোর চেষ্টায় সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতা অভিযান। অলিতে গলিতে বিক্ষিপ্ত ভাবে ছড়ানো ব্লিচিং পাউডারের আস্তরন মনে করিয়ে দেয় নিশিপ্রেয়সীদের সাজ। ওদিন একটি মজার ঘটনা ঘটল, সম্ভবত বাপের জনমে এই প্রথম দেখলাম। আচ্ছা এখানে কি ‘বাপের জনম’ কথাটা যৌক্তিক হবে? যাক তো যেদিনের কথা বলছিলাম, দেশে তখন জরুরি অবস্থা চলছে এবং ভোটার তালিকা তৈরীর জন্য পাড়ায় পাড়ায় ছবি তোলার কাজ শুরু হয়েছে। এই পাড়ায় যেদিন থেকে কাজ শুরু হবে তার আগের দিন চারিদিকে ধোয়া মোছার ধুম পড়ে গেল। একেতো জরুরি অবস্থা তার ওপর সেনা বাহিনী নাকি সার্বিক সহযোগিতার জন্য সার্বক্ষনিক মাঠে থাকবেন। সুতরাং অজানা ভয়ে কর্তাব্যক্তিরা তটস্থ, চারপাশ পরিষ্কার থাকা চাই। আমি যে কারণে অবাক, তারা এই অধমকে পর্যন্ত সুন্দর করে গোসল করিয়ে দিয়েছে। ভাবলাম আমি কে বা কি অবশেষে সেটাই না লোকে ভুলে যায়। দেখলাম আমার ধারনা ভুল। পরদিন মানে ছবি তোলার দিন, এপাড়ার নতুন বিবাহিত ছেলেটি সকালে অফিসে যাওয়ার সময় আমার দিকে কি যেন ছুঁড়ে দিল। তাকিয়ে দেখি চমৎকার চৌকোণা ছোট্ট প্যাকেট, যার ভেতর থেকে লাজুক ভাবে উঁকি দিচ্ছে পাতলা একটি বেলুন। ভাল লাগল, বাইরে ফেলেনি। বেশীর ভাগ মানুষের আবার ভেতরের দিকে ময়লা ফেলতে কিসে যেন বাধে। তারা বাইরে ফেলতেই বেশী স্বাচ্ছন্দ বোধ করে। আমার খাবারেরও বেশ সমস্যা হয়। পরে বলার কথা বলে ফেলে রেখেছিলাম কোন ব্যাপারটা যেন, ও হ্যাঁ পাখীদের বিষয়টা তাই না? এরা ক্ষেত্র বিশেষে মানুষের মত বুদ্ধিমান হয়ে থাকে। নানা জায়গায় গিয়ে এটা ওটা খাবে তারপর ওসব ছাড়ার জায়গা পাবে আমার এখানে এসে। অবশ্য এরা এই ক্ষেত্রে আরও এক কাঠি বেশী বুদ্ধিমান, জায়গা মত ফেলে। পলেস্তারা খসা অথবা ইঠ খুলে আসা কোন খাঁজে টুপ্ করে বংশধরটাকে ত্যাগ করে দেয়। যার কারণে নানান জাতের বজ্জাত সব গাছ আমার মত অধমকে আশ্রয় করে দিব্যি বেড়ে ওঠে। এদিক ওদিক ঝুলতে থাকে ছোট বড় শেকড় বাকড়। আচ্ছা আমি নিজেকে ‘বদ্ধপাগল’ ভেবেছিলাম কেন? একজন বয়োবৃদ্ধ মনিষিও তো ভাবতে পারতাম। আসলে জঞ্জালের মধ্যে থাকতে থাকতে এত হীনমন্যতায় ভুগি নিজেকে কি নামে ডাকবো তা-ই ভেবে পাই না। পাড়ার যাবতীয় এঁটো নিকৃষ্ট বস্তুরাই যেখানে আমার সাথে গা ঘেঁষে খেলা করে সেখানে কি নিজেকে আর উৎকৃষ্ট কিছু ভাবতে পারি? সাংসারিক কাজে সহযোগীতা করতে বেশকিছু কর্তাকে রাতের আহার শেষে আবর্জনার বালতি হাতে বেরিয়ে আসতে দেখি। সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে বিদ্ধস্ত পায়ে আমার দিকে এগিয়ে আসে। কেউ কেউ ধীরে সুস্থে অত্যন্ত যত্ন করে আমাকে খাবার খাওয়ায়। মনে হয় যেন বাসায় একটু দেরী করে ফিরতে পারলেই বাঁচে। তখন আবার নিজেকে ভারী সুখী মনে হয়। আমার বাড়ী নেই ঘর নেই, রাস্তার বাঁকে জন্ম আমার রাস্তার বাঁকেই বেঁচে থাকা। হয়ত ক্ষয়ে ক্ষয়ে রাস্তার বাঁকেই একদিন..। সিটি কর্পোরেশনের সেবকেরা যখন আমার পেট পরিষ্কার করতে আসে তখন তাদের দিকেও তাকিয়ে থাকি। কি করব? এটা ওটা দেখা ছাড়া আমারতো আর কোন কাজ নেই। মাঝে মাঝে ভাবি তারা এত কিছু পরিষ্কার করে নিয়ে গিয়ে কোথায় ফেলে? আরেকটি জায়গাকে অপরিষ্কার করে নিশ্চয়? আচ্ছা তাদের ঘর দুয়ার কি খুবই পরিষ্কার?
আমার ডানপাশে কয়েক গজ দূরে নতুন একটি অত্যাধুনিক দালান তৈরী হয়েছে, খুবই সুন্দর! সেখানে অনেক ভদ্রলোকের বাস। ওখান থেকে প্রায় প্রতিদিনই আমার জন্য কোর্মা, পোলাও, বিরিয়ানির ব্যবহৃত অংশ উপহার হিসাবে পাঠানো হয়। সত্যি বলতে কি আমিতো আর খাই না, হাড্ডিসার কিছু মানুষ সেখান থেকে অমৃত খুঁজে বেড়ায়। অবশ্য তারা খুবই অতিথিপরায়ন। একা খায়না, সাথে থাকে কুকুর, বেড়াল, চামচিকা।
আঁধার ঘেরা নাগরিক এক রাতে, মনটা খুবই বিমর্ষ ছিল। প্রকৃতির সব আয়োজন যেন থমকে আছে। মনে হচ্ছে আকাশের চন্দ্র তারাদের গুরুত্বপূর্ণ কোন নিমন্ত্রণ রয়েছে কোথাও। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনায়ও শুরু হয়েছে অচলাবস্থা। ইলেক্ট্রিসিটি নেই অনেক্ষণ। জাতীয় গ্রীডে নাকি ধ্বস নেমেছে। শীতের রাত, মানুষজন নিশ্চয় ঘুমিয়ে পড়েছে এতক্ষণে। অন্ধকারের নিজস্ব আবছা আলোয় দেখতে পেলাম নতুন দালান হতে এক বয়ষ্কা মহিলা এগিয়ে আসছেন আমার দিকে। হাতে ওটা কি? বিরিয়ানির প্যাকেটের মতই মনে হচ্ছে। চুপিসারে এসে আমার ভেতর অনেকটা ছুঁড়েই ফেলে দিল যেন প্যাকেটটা। মুখের মাংসপেশীতে ফুটে উঠেছে মুক্তির যতিচিহ্ন। দু’তিন সেকেন্ড দাঁড়িয়ে ফিরতি পথ ধরলেন মহিলা, অন্ধকারে ভয় পেয়েছে বলে মনে হল। আমার ভেতরে পড়ার সাথে সাথে প্যাকেট তার মুখটা খুলে দিল উদার ভাবে। নাকে এসে লাগল অচেনা একটি সুবাস। আরে.. ধরিত্রি হঠাৎ হেসে উঠল কেন? প্যাকেটের ভিতর হতে উঁকি দিল এটা কি? পূর্ণিমার চাঁদ! আহ্‌ কি চমৎকার দেখতে অসমাপ্ত দেবশিশু! আমি অতি তুচ্ছ, উচ্ছিষ্টের সাথে সহবাস করতে করতে নিজেকে আরও বেশী তুচ্ছ মনে হয়। ধন্যবাদ প্রকৃতিকে, পাপ সর্বস্ব ইট পাথরের এই জীবনে এই প্রথম কোন এক দুর্লভ পূর্ণিমার পূণ্যে পূর্ণ হলাম আমি।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29018093 http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29018093 2009-09-30 15:21:12
শুটকি
বুয়া সকালে আজকের রান্না করে দিয়ে গিয়েছিল। বিকেলে আসার কথা না থাকলেও তাকে ডেকে আনা হয়েছে। অনু বাড়ী থেকে ফিরেছে কিছুক্ষণ আগে। আসার সময় কয়েক জাতের মাছের শুটকি নিয়ে এসেছে। রাজিব মিনতি করে বলেছে যেভাবেই হোক আজ রাতে অন্তত রূপচাঁদা শুটকিটা খেতেই হবে। অনুর সাথে রাজিবেরও চট্টগ্রাম যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে যেতে পারেনি। বড়লোক বাবা মা’র একমাত্র আদরের সন্তানদের নানান ঝামেলা। এখানে যেতে পারবে ওখানে যেতে পারবে না এটা খেতে পারবে ওটা খেতে পারবে না, একশ একটা নিষেধের বেড়া। রাজিবের টিকেটে শেষ মুহুর্তে শান্তুনু গিয়েছিল। নীরু এখন পার্কের বেঞ্চিতে আনমনা হয়ে বসে, তার আজ খুবই মন খারাপ। দুপুরে শাপলা চত্বরে এক ষন্ডা মার্কা লোকের সাথে তার বুলবুলিকে একই রিকশায় দেখতে পেয়েছে সে। সাথে সাথে ফোন করে দেখেছে, বুলা’র মোবাইল বন্ধ। সেই থেকে মনটা খারাপ। আজ দুপুরে খাওয়াও হয়নি। আবার খারাপ লাগছে এই ভেবে যে না খেয়েও মিলের টাকাটা দিতে হবে। পিয়াল হারামজাদা এই ব্যাপারে খুবই কষা। পিয়াল ছাড়া বাকী তিনজনই শুচিবায়গ্রস্থ, বাইরে কেউই খায় না। যে সপ্তাহে পিয়ালের উপর বাজারের দায়িত্ব পড়ে সেই সপ্তাহে বাড়িঅলার পানি খরচা তেমন হয় না। রুচি খুব একটা পাওয়া যায়না বলে খাওয়া দাওয়া খুবই কম হয়। যার কারণে বড় কাজে বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজন খুব একটা পড়েনা। বেছে বেছে মাটির নীচের হাতে গোনা কয়েকটি খাদ্যই পিয়ালের বেশী পছন্দ। এই যেমন আলু, কচু, গাজর, শালগম। তার মতে মাটির নীচের খাদ্যে খাদ্যগুণ বেশী থাকে। সুযোগ পেয়ে শান্তুনু একবার বলেছিল বাইং মাছ আনতে। ওগুলো নাকি মাটির নীচে কাদার মধ্যে থাকে, সুতরাং মাটির নীচের খাদ্য। পিয়াল বাইং মাছের আবাসস্থল সম্পর্কে জ্ঞাত থাকলেও টাকা বাঁচাতে গিয়ে সে শান্তুনুর মনোবাসনা পূরণ করেনি আজ পর্যন্ত। মেসে অবশ্য তারা চারজনই থাকে। আর রাজিব বাবা মা’র কোলে। রাজিবের বাসা এখান থেকে ছ’সাত মাইল দূরে হলেও সে প্রায়ই আড্ডা দিতে এবং মেসের অমৃত খেতে এখানে চলে আসে। তবে বিনা মূল্যে নয়। রাজিব ওদের সাথে খাওয়াতে পিয়াল ভীষন খুশী। কারণ সারা মাসে রাজিব হাতে গোনা আট দশ মিল খেলেও গোটা মাসের মিলের টাকাটাই সে দিয়ে দেয়। এবং বলাটা অত্যন্ত বাহুল্য হবে যে, রাজিবের বাড়তি টাকাটার সাথে পিয়াল নিজের টাকাটা অনায়াসে সমন্বয় করিয়ে নেয়। বাকীরা ব্যাপারটা জানলেও তাকে তেমন ঘাঁটায় না। কষা এবং পিছল মানুষদের অনেক সুবিধা, অন্যেরা ঘাঁটাতে কম চায়। রাজিবকে ফোন করা হয়েছে। সে সময় মত চলে আসবে। শুটকির তরকারি অবহেলা করার পাত্র সে নয়। এই বিকেলে কিছুতেই গোসল করতে ইচ্ছে করছিল না অনু’র। কিন্তু দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সারা শরীর চিট চিট করছে। অনু গোসল সেরে বের হতেই শান্তুনু ঢুকে পড়ল বাথরুমে। পিয়াল হায় হায় করে উঠল, ‘দুস্ত একটু দয়া কর, আমার বড়টা পাইছে।’ শান্তুনু বিরক্তি নিয়ে বলল, ‘কষা নাকি?’ পিয়াল ভাল ভাবেই জানে এখন এই কথাটা অন্যদিকে মোড় নেবে। হেনস্থা হওয়ার ভয়ে সে চুপ মেরে যায়। অনু একটু দূরে দড়িতে গামছা শুকাতে দিতে দিতে বুয়াকে বলল, ‘বুয়া.. ধুইছো ভালভাবে?’ বুয়া রান্না ঘরে শুটকি কাটছিল, চেঁচিয়ে বলল, ‘কি.. পুটকি?’ বাথরুম থেকে বালতি জাতীয় কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ শোনা যায় এবং সেই সাথে শান্তুনুর অট্টহাসি। পিয়াল সম্ভবত লজ্জা পেয়েছে সে নাক ফুলিয়ে হাসি চেপে অন্য রুমে চলে গেল। ভাগ্যিস এই সময়ে কলিংবেল বেজে ওঠে। অনু চট করে ফিরে দরজা খোলার জন্য রওনা দেয়। নীরু ফিরেছে। তাকে খুবই উৎফুল্ল দেখাচ্ছে। কিছুক্ষণ আগে বুলাকে ফোনে পেয়েছিল সে। বুলা নাকি আজ শাপলা চত্বরের আশেপাশে যায়ই নি। নীরুটা কি বোকা, সবই বিশ্বাস করে।
টিভিতে আজ প্রমীলা ক্রিকেটের ফাইনাল। শ্রীলংকা বনাম পাকিস্তান। পিয়াল চোখ বড় বড় করে মন দিয়ে খেলা দেখছে। নাকি ব্যাটিং দেখছে? শ্রীলঙ্কার ক্যাপ্টেন ব্যাটিং করছেন। তাঁর চুলগুলো ছেলেদের মত ছোট ছোট, তবে শুধু চুলগুলোই। প্রমীলা ক্রিকেট নিয়ে পিয়ালের মনে অনেক প্রশ্ন। কারো কাছ থেকেই সে আজ পর্যন্ত সেসব প্রশ্নের সদুত্তর পায়নি। তার সবচেয়ে বেশী কৌতুহল মেয়েরা ছেলেদের মত প্যাড, গ্লাভস্, হ্যালমেট পড়লেও বিশেষ গার্ডটা কোথায় পড়ে? ক্যাপ্টেন পঞ্চাশ রান করার পর দু’হাত উঁচিয়ে দর্শক আর টিমমেটদের করতালির জবাব দিচ্ছেন। ক্যামেরাটা সাঁই করে ক্যাপটেনকে ক্লোজ শটে নিয়ে এল। পিয়ালের কৌতুহল মধ্যগামী হল এবং সাথে সাথে বিদ্যুৎটা বেরসিকের মত চলে গেল। পিয়াল একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে সিগারেট ধরায়। ততক্ষণে অনু গান শুনতে শুনতে ফ্লোরে আর নীরু স্বপ্ন দেখতে দেখতে সোফায় ঘুম। শান্তুনু বিছানায় আধ শোয়া হয়ে মোবাইলের এফ এমে কি যেন শুনছে। পিয়াল বলল, ‘শন্তু চট্টগেরামে থোরা কেমন মজা করলিরে?’ চোখ বন্ধ রেখেই শান্তুনু বলল, ‘হ্যাঁ ভাল, শোন.. রাজিব তো মরিচ বেশী খায়, নতুন বুয়া বুঝবে না.. তুই একটু বলে আয় ঝাল যাতে বেশী দেয়।’ রান্না ঘরে গিয়ে পিয়ালের কৌতুহলী চোখ দু’টো কিঞ্চিত বিস্ফারিত হয়ে গেল। বুয়া দরজার সামনা সামনি বসে পেঁয়াজ কুটছে, কিছুটা বেপর্দা। পিয়াল ‘ভু ভু’ করতে করতে বুয়া তার দিকে তাকিয়ে একটি হাসি দিল। বেমক্কা হাসিতে সে থতমত খেয়ে বলল, ‘ভুয়া থরকারীতে জাল একটু বেশী দিও।’ সামনের রুমে রাজিবের উচ্ছ্বাস শোনা যায়। পিয়াল কিছুটা অপূর্ণতা নিয়ে ফিরে আসে। রাজিব অনু’র পিঠে হালকা চাটি দিয়ে বলে, ‘ওই শালা ঘুমাস্ ক্যান.. ওঠ্।’ শান্তুনু বলল, ‘ওর মাথা ধরেছে.. বোস্।’ রাজিব না বসে বলল, ‘শুটকি কি দিয়ে খাব রে?’ শান্তুনু পিয়ালের দিকে তাকিয়ে দুষ্টু হেসে রাজিবকে বলল, ‘জানিনা.. বুয়াকে জিজ্ঞেস কর।’ রাজিব চনমনে মনে রান্না ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। বিদ্যূৎ এসেছে, পিয়াল নিশব্দে হেসে টিভিটা অন করে। হাসির শব্দ লুকাতে গিয়ে তার সমস্ত শরীর কাঁপছে। রাজিবকে দেখে বুয়া সালাম দিল। রাজিব জিজ্ঞেস করল, ‘বুয়া কি রান্ধো?’ বুয়া হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে নাক চুলকাতে চুলকাতে বলল, ‘পুটকির মইধ্যে আলু দিয়া রান্ধি।’ রাজিবের চোখ দুটো সরু হয়ে গেল। সে একটু ধাতস্থ হয়ে ঢোক গিলে বলল,
-তা পুটকি ভাল ভাবে ধুইছো?
-জ্যা।
-দেখো আলু না আবার বেশী গলে যায়।
রাজিব ধীর পায়ে ড্রইং রুমে ফিরে আসে। তাকে দেখে শান্তুনু খিক্ খিক্ করে হেসে ওঠে। রাজিব একটু সহজ হওয়ার পর বলে, ‘সাথে কয়েকটা বেগুন দিয়ে দিলে ভাল হত না?’ টিভি’র শব্দে কিছুক্ষণ আগে অনুর ঘুম ভেঙ্গেছে। সে গম্ভীর ভাবে বলল, ‘বাসায় যেগুলো আছে সেগুলো গোল বেগুন.. ওতে হবে না।’
ফ্লোরে মাদুর পেতে খাবার আয়োজন হয়েছে। তরকারী দুটো। সকালের রান্না করা ছোট চিংড়ি দিয়ে মূলা আর মূল আকর্ষন শুটকি দিয়ে আলু। পিয়াল মূলা দিয়ে খাচ্ছে, শুটকিতে তার রুচি নেই। রাজিব খুব আয়েশ করে ভাতের সাথে শুটকির তরকারী মিশিয়ে নিল। কিন্তু এক লোকমা মুখে দিতেই তার মুখটা বিকৃত হয়ে গেল। মরিচ ভালভাবে দেয়া হয়নি। শান্তুনু পিয়ালকে বলল, ‘কিরে.. ঝাল বেশী দিতে বলিস নি?’ পিয়াল বুয়াকে ডাক দিল, ‘ভুয়া, বলছিলাম না জাল বেশী দিতে?’ বুয়া রান্নাঘর থেকে চেঁচিয়ে বলল, ‘জ্বাল দিতে দিতে আর কত দুমু.. দেহেন না আলুগুলান কেমুন গলা গলছে।’ রাজিব একটু কাঁচা লবন মুখে দিয়ে বলল, ‘কেমন একটা বাজে গন্ধ, ভালভাবে ধোয়ও নাই।’ শান্তুনু ইঙ্গিতপূর্ণ ভাবে খিক্ খিক্ করে হেসে উঠল। নীরু কিছু বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, ‘কি ধোয় নাই রে?’ অনু ‘পু’ বলে কিছু বলতে গিয়ে হাসির দমকে বলতে পারে না। রাজিব ‘ওয়াক ওয়াক’ করতে করতে বাথরুমের দিকে এগিয়ে যায়।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29017532 http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29017532 2009-09-29 15:17:42
গ্রীনহাউস ইফেক্ট এবং পৃথিবীর কৈফিয়ত আমার গর্ভে তাহাদের অবস্থান অত্যাচারের পর্যায়ে পৌঁছিয়া যাইতেছিল। চিন্তা করিয়া দেখিলাম, কিছু একটা করিবার চেষ্টা একবার করিয়া দেখিনা কেন? উপরিভাগ এইভাবে জ্বলিয়া জ্বলিয়া অঙ্গার হওয়া কাঁহাতক আর সহ্য করা যায়? রবি’র অসহ্য দহন হইতে নিস্তার পাইতে সমগ্র বৃক্ষরাজি, তরুকুল, গুল্মলতা আমার পৃষ্ঠদেশের উল্টাদিকে অর্থাৎ ভূগর্ভের দিকে তাহাদের শাখা প্রশাখা বিস্তার করিতে লাগিল। প্রাণীকুলও পলায়নপর ভূগর্ভে আশ্রয় লইল। উহাদের দেখাদেখি জলবাসীগণও একই পদাঙ্ক অনুসরণ করিবার কারণে জলরাশিকেও ভূগর্ভে চলিয়া যাইতে হইল। এইভাবে সকলে আমার আব্রু ভেদ করিয়া ভিতরে প্রবেশ করিতে থাকিলে আমার ‘একান্ত ব্যক্তিগত’ কিংবা ‘অতি গোপনীয়তা’য় দারুনভাবে ব্যাঘাত ঘটিতে আরম্ভ হইল। বাহিরের আমি একটি গোলাকার শুষ্ক কালচে বৃহদাকার গোবরের মণ্ডের ন্যায় রূপ ধারণ করিলাম।
অবশেষে মনস্থির করিলাম, রবিকে অনুরোধ জানাইয়া হেলিওগ্রাফের মাধ্যমে একটি বার্তা প্রেরণ করিয়া দেখিলে কেমন হয়? কিন্তু ক্ষনিকের তরে সন্দিহানও হইলাম এই ভাবিয়া যে, রবি সর্বদা জলন্ত ডাগর চক্ষু হানিয়া চারিপাশ ভষ্ম করিতে ব্যস্ত, আমার অনুরোধ রাখিবার মত সময় কি সে বাহির করিতে পারিবে অথবা তাহার জন্য কোন তাড়না কি সে বোধ করিবে? অবাক হইয়া লক্ষ্য করিলাম রবি আমার অনুরোধ রাখিয়াছে। মনে হইল অন্যকে জ্বালাইতে গিয়া সে নিজেও বুঝি ভিতরে ভিতরে জ্বলিতেছিল। ইহাতে অনুরোধে অনুরোধও রাখা হইল আবার নিজেকেও বেশ কৌশলে রক্ষা করা গেল। রবি তাহার নিজের জ্বালা জুড়াইবার কারণেই হউক কিংবা আমার অনুরোধ রাখিবার কারণেই হউক, ইহা অত্যন্ত সুখকর বিষয় যে, আমার মনোবাঞ্চা শেষ পর্যন্ত পূরণ হইয়াছে। সুক্ষ দৃষ্টিতে লক্ষ্য করিয়া দেখিলাম, আমার অনুরোধ রাখিতে গিয়া কিংবা তাহার জ্বালা কমাইতে গিয়া তাহাকে একটি পরিপূর্ণ ডিগবাজি খাইতে হইয়াছিল। আগে তাহার সম্মুখভাগ ছিল বাহিরমুখী। আর এখন তেজ কমাইবার নিমিত্তে সম্মুখভাগ ভিতরের দিকে গুটাইয়া লওয়াতে তাহার পশ্চাতভাগ বাহিরের দিকে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে। সেইখান হইতেও ক্রমাগত অনুরূপ গরম ভাপ নির্গত হইতেছে তবে তাহা পূর্বাপেক্ষা নিতান্তই নগণ্য।
রবি তাহার ক্রুর দৃষ্টি ভিতরমুখী করিয়া লওয়াতে ধীরে ধীরে আমার বায়ুমন্ডলের প্রখর তেজ কমিয়া শীতল হইতে লাগিল। গর্ভ হইতে একে একে আমার গোপনীয়তার হন্তারকেরা বাহির হইয়া আসিতে লাগিল। ক্রমশঃ আমি যুবতী হইয়া উঠিতে লাগিলাম। আমার বহিরাংশ লতা গুল্ম বৃক্ষে ভরিয়া উঠিয়া সবুজাভ কুন্তলের ন্যায় শোভা বর্ধন করিতে লাগিল। বক্ষ স্ফীত হইয়া পর্বত শৃঙ্গ সৃষ্টি হইতে লাগিল। ঝরনা, নদী, সাগর আমাকে ভালবাসায় সিক্ত করিতে পারিয়া যেন আনন্দে কলকল ছলছল করিতে লাগিল। প্রাণীকুল অতি আবেগে উদ্বেলিত হইয়া আরাম আয়েশে বংশ বিস্তার করিয়া চলিল। সমগ্র বিভাগের নবজাতকদিগের আগমনে আমি বড়ই আনন্দ উপভোগ করিতে লাগিলাম। আমিই যেন বিশাল বিশ্ব ভ্রহ্মান্ডের একমাত্র উর্বর মাতা। দূর হইতে যৌবনপ্রাপ্ত আমাকে দেখিয়া, মহাজগতের দূর দূরান্তের অনেক গ্রহ উপগ্রহ ছায়াপথেরা মুগ্ধ হইয়া আমার দিকে তাকাইয়া থাকিত। আবার অনেকে মুখ টিপিয়া হাসিয়া নিন্দায় মাতিয়া উঠিত এই ভাবিয়া যে, কোথা হইতে আমার এত এত সন্তান সন্তুতির সৃষ্টি হইয়াছে? কোন সে গুপ্ত প্রেমিক গোপনে আসিয়া আমার গর্ভে অচ্ছুত প্রবেশ করাইয়া দিয়া চলিয়া গিয়াছে?
তবে নিন্দুকেরা যত যাহাই বলুক না কেন অতীব সত্য কথা এই যে, প্রকৃতির পরিবর্তিত রূপ হইতে পরবর্তীকালে সকলেই তাহাদের প্রয়োজনানুযায়ী উত্তাপ আর আলোক পাইয়া লাভবান হইতে পারিয়াছিল। কিন্তু সুখ বুঝি কাহারো কপালে বেশীদিন অবস্থান করিতে চাহে না। আরো অনেক পরে আসিয়া গ্রীন হাউস ইফেক্টের প্রভাবে তাপমাত্রা আবার বাড়িয়া যাইতে আরম্ভ করিল। আমি ভাবিলাম রবি বুঝি আবার ডিগবাজি খাইয়াছে। কিন্তু গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানিতে পারিলাম, আসলে তাহার কোন দোষ নাই। সমস্ত দোষ আমার কতিপয় সন্তানদিগের। তাহারাই নাকি যত্রতত্র বনাঞ্চল ধ্বংস করিয়া, পারষ্পরিক শক্তিমত্তা জাহির করিবার জন্য যুদ্ধ বিগ্রহে লিপ্ত হইয়া, নানান ধরনের অস্ত্রের অনু পরমানু ফুটাইয়া আবহাওয়া আর জলবায়ুর সর্বনাশ করিয়া, সর্বোপরি বিজ্ঞানের চমকপ্রদ আবিষ্কার গুলিকে কুপথে পরিচালনা করিয়া (সময়ে সময়ে সুপথে চালনা করিয়াও) বায়ুমন্ডলের যাবতীয় ভারসাম্য নষ্ট করিয়া ফেলিতেছে। যাহার ফলশ্রুতিতে, বায়ুমন্ডলের কোথায় যেন কেমন এক প্রকার ফুটা সৃষ্টি হইয়াছে। এবং উহার ভিতর দিয়া রবি’র রশ্মি প্রচন্ড প্রতাপে প্রবেশ করিয়া আমার উপর আসিয়া দাবড়াইয়া বেড়াইতেছে।
তবে নাড়ী ছেঁড়া ধন বলিয়া কথা। যত কেহ যত যাহাই বলুক না কেন, আমি কিন্তু বরাবরই আমার অবুঝ সন্তানদিগের পক্ষই অবলম্বন করিব। কে বলিল আমার সন্তানেরা কুকর্ম করিতেছে? কে বলিল আমার বায়ুমন্ডলে ফুটা হইয়াছে? রবি ডিগবাজি খাইবার পর তাহার যে পশ্চাদাংশ বাহিরমুখী করিয়া রাখিয়াছিল, তাহাতেওতো একটি ফুটা থাকিবার কথা। সেই ফুটা দিয়াওতো গ্রীন হাউস ইফেক্ট হইতে পারে। পারে না কি?
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29016892 http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29016892 2009-09-28 10:37:16
বধূ বিদায়
কনিকার মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে সে কোন সুখের সপ্ন দেখে হাসছে। মনে পড়ল শুভদৃষ্টির মুহুর্তটি। সেদিনও চোখ দু’টি বোজা ছিল। তবে তার দিকে তাকানোর ইচ্ছে হয়নি মোটেও। কাকীমা খুব করে মিনতি করছিল, তাই একটু করে তাকিয়েছিলাম। এরইমধ্যে কিভাবে যে তিনটি বছর পেরিয়ে গেছে টের পাইনি। বাড়ী ভর্তি লোক ঘুরে বেড়াচ্ছে চোখ ভরা ঘৃণা নিয়ে। নাকি এ শুধু আমার সংকীর্ণ মনের কল্পনা? দর্শনার্থী প্রচুর তবু চারিদিক বড় চুপচাপ। থেকে থেকে পাশের কামরা হতে এক দিনের বাবুটির ভেসে আসা বিলাপে যেন শিবরঞ্জনী তান। পাঁচ মিনিট সময় চেয়ে নিয়ে একাকী ঢুকেছি এ কামরায়। সময় গুলো দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। এই তিন বছরে সে আমাকে ভালবাসা দিয়েছিল আঁজলা ভরে। কিন্তু তা আমার আঙ্গুলের ফাঁক গলে পড়ে গেছে অবহেলায়, পান করতে পারিনি। আমি তাকে কিছুই দিইনি কখনো। না, তাকে বঞ্চিত করবার জন্যে নয়। ক্ষোভটা ছিল আমার মায়ের স্বামীর উপর। আমার পছন্দের মেয়েকে বলরামবাবুর পছন্দ হয়নি, পছন্দ হয়েছে তাঁর শ্যালকের মেয়ে কনিকাকে। মেয়েটি পিতৃহারা, একমাত্র অভিবাবক মেয়ের মেসোমশাই। মেসোমশাইটির টাকা পয়সার প্রতি একটু বেশী পরিমান ছোঁক ছোঁক ভাব আছে। ওব্যাটাকে দেখলেই রাগে আমার সমস্ত গা রি রি করে ওঠে। তিনি আজ দেবেন কাল দেবেন বলে বলে এর মধ্যেই দেড় লাখ টাকা ধার নিয়েছেন আমার কাছ থেকে।
বলছিলাম বলরামবাবুর কথা, সুস্মিতাকে ভুলতে না পারার বেদনা যতটুকু ছিল তার চাইতে বেশী ছিল রামবাবুর প্রতি তীব্র ঘৃনা। সেই ঘৃনা থেকে জন্ম নিয়েছিল প্রতিশোধের বাসনা। যে বাসনা বড় যত্ন করে মিটিয়েছি কনিকার প্রতি সচেতন ভাবে অমনযোগী থেকে। পরে অবশ্য বুঝতে পেরেছিলাম, লোকটিকে যতটুকু খারাপ মনে হত উনি আসলে ততটুকু নন। বরং আমার প্রতি তাঁর ভালবাসা ছিল অগাধ। শুনেছিলাম নৌকা ডুবিতে উনার প্রথম স্ত্রী’র সাথে ছেলেটিও মারা গিয়েছিল, যার সাথে আমার মিল ছিল শুধুমাত্র নামের আদ্যাক্ষরে। সেটি জানতে পেরেছিলাম উনি গত হওয়ার পর। আধ্যাক্ষরের মাঝে কি এমন মায়া লুকিয়ে আছে বিধাতা জানেন। বাবার জায়গায় দাঁড় করাতে পারিনি বলে কোন ভাবেই তাঁকে মেনে নিতে পারতাম না। আমার এত ভাল মানুষ বাবার সাথে কেন যে মা’র বনিবনা হল না সেটা আজো রহস্যময়। বিশ বছর আগের বাবার বলা কথা গুলো মনে পড়ে মাঝে মাঝে। আমার বয়স তখন এগার। বাবা বলেছিলেন, ‘লোকটিকে বাবা বলে ডাকিস, তোকে আদর করবে।’ কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার কথা রাখতে পারিনি। পরে নিজেই বিশ বছরের ধূলি পড়া স্মৃতি হাতড়ে দেখতে পেয়েছি আমার প্রতি রামবাবুর ভালবাসার বেশকিছু ছোট ছোট দৃশ্যপট। সেই থেকে কনিকার দিকেও ধীরে ধীরে ঝুঁকে পড়ছিল মনটা। কিন্তু সংকোচের পাহাড় ডিঙ্গোতে পারছিলাম না কোন ভাবেই। রামবাবুর সাথে কোন সখ্যতা গড়ে ওঠেনি কখনোই। তবু কেন যেন মনে হল তাঁর পিণ্ডদানের পর থেকে আরো বেশী একা হয়ে গেলাম আমি। একদিন বিকেলে খোলা ময়দানে বসে বসে বেশ দূরত্বে ভেসে চলা একা একা মেঘ গুলোকে দেখছিলাম। ভেতরটা তোলপাড়। মনের গহীনে আমার কৃতকর্মের ময়না তদন্ত চলছে। উপলব্ধিগুলো গলার কাছে ব্যাথা হয়ে জমে আছে দলা পাকিয়ে। মন বলল, সব সংকোচ পায়ে দলে কনিকার কাছে ফিরে যাও। তাকে এতটাই অবহেলা করেছি যে এক ছাদের নীচে থেকেও কখনো তার খোঁজ রাখিনি। কি করে জানবো যে সেও অভিমানে মুখ ফেরাবে অসময়ে। মনটা যখন আমাকে টেনে নিয়ে তার কাছে ছুটে যাচ্ছিল তখন সে নতুন কিছু পাওয়ার যুদ্ধে হাসপাতালে লড়ছে। নবাগতের আগমন যে এতই সন্নিকটে তা আমি জানতাম না। আমার সৎ বোন মিলা হাসপাতাল থেকে আমাকে ফোনে খবর দিয়েছিল। না না, মিলাকে সৎ ভাবাটা ঠিক হবে না। এই হৃদয়হীন দাদাটিকে সে পাগলের মত ভালবাসে যে! আমার মাও অবশ্য তার সৎ মেয়েটিকে খুবই আদর করে। আহ্ আবারো সৎ ভাবলাম, মনটা সত্যিই পঁচে গলে নষ্ট হয়ে গেছে। মিলা বলছিল বাবুটির চোখগুলো নাকি দেখতে আমার মত হয়েছে আর নাকটা কনিকার। হৃদয়ের চোরাবালিতে ডুবে যাওয়া কত কথা বুদবুদের মত উঁকি দেয়, আবার মিলিয়ে যায় চট করে। একরাতে কনিকা তার নাকছাবিটা ঠিক করে দিতে অনুরোধ করেছিল। সেদিন আমার মনটাও ছিল দ্রবীভূত, হয়তো সম্ভোগের তৃঞ্চায়। নাকছাবি ঠিক করতে গিয়ে দেখলাম সেটি আসলে ঠিকই ছিল। আমার হাতের সামান্য ছোঁয়ায় কেন সে এতটা উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিল ওদিন? সেই স্পর্শে কি এমন ছিল বুঝিনিতো। ক’দিন আগে আলমারীতে কিছু দলিলপত্র খুঁজতে গিয়ে ওর ডায়রীটি চোখে পড়েছিল। কৌতুহল বশত কয়েক পাতা পড়েছিলাম। শেষ পাতার লাইন ক’টি এখন বেশ মনে পড়ছে,
‘চিতার মাঝে বসত ভিটা
তবু কেন মধুময়,
তবু কেন পোড়া মন
বঁধুয়ার কথা কয়?’
বুক ভরা বেদনা নিয়ে এত উচ্ছ্বাস সে রাখত কি করে পুষে? বসন্ত চলে গেলেই বুঝি কোকিলের ডাকটিকে মনে পড়ে আরো বেশী। ভালবেসে কখনো ভালবাসা দেইনি তাকে। দিয়েছি শুধু ছলনার রাঙতা মোড়ানো এক আধ ফোঁটা মৈথুন। ধূপের গন্ধটি নাকে লাগছে।
যতক্ষণ বাইরে থাকতাম কনিকা এত ঘন ঘন ফোন করত যে খুবই বিরক্ত হতাম। ধমকে উঠে অকারণেই লাইনটা কেটে দিতাম। কিন্তু তাতে সে কিছু মনে করত বলে মনে হত না। উপরন্তু মাতাল হয়ে বাড়ী ফেরার পর সে অনেক যত্নে আমার ঘুমানোর ব্যবস্থা করত। এবং প্রায় প্রতি রাতেই এক সাথে খাওয়ার জন্যে অপেক্ষা করে করে অবশেষে না খেয়েই ঘুমুতে যেত। আমি শরীর মন দু’টোকে পূজো দিয়ে তবেই বাড়ী ফিরতাম, তার কথা আর মনে থাকত না। বাচ্চাটাকে নষ্ট করে ফেলতে বলেছিলাম। রামবাবুর জন্যেই তা হয়ে ওঠেনি। অবশ্য মাও আমাকে আর পাপ বাড়াতে নিষেধ করেছিল। কিন্তু কনিকা তেমন কিছু বলেনি। শুধু একটু করে বলেছিল, ‘জানি তোমায় পাবো না কোনদিনই, তবে বেঁচে থাকার জন্যে একটি অবলম্বন থাকলে ভাল হত।’এরপর আমি আর তেমন গা করিনি। পৃথিবীতে কার বেঁচে থাকার জন্যে কাকে প্রয়োজন সে হিসাব মেলানো সত্যি বড় কঠিন। বুকের ভেতরটা খালি খালি লাগছে। না চাইতে এত ভালবাসা পেয়েও কেন তাকে দুর দুর করে তাড়িয়ে দিয়েছিলাম? দরজায় টোকা পড়ল। কাকাবাবু আমাকে স্মরণ করিয়ে দিলেন কনিকার মেসোমশাই তাড়া দিচ্ছেন। ও হ্যাঁ তাকে তো তাঁরা তাঁদের বাসায় নিয়ে যাবেন। নিবে নাইবা কেন? এতদিনের অবহেলার মানুষটি হুট করে তো আর অতিপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে না আমার কাছে। তাঁরাই নাকি কনিকাকে আদরে সোহাগে সাজিয়ে দেবেন যত্ন করে। হয়তো শেষ বিদায়ে প্রায়শ্চিত্ত করে বধূ বিদায়ের ভুল শোধরাতে চাইছেন তাঁরা। দরজায় আবার টোকা পড়ল। অকস্মাৎ বিশাল এক ঢেউ জেগে উঠল অন্তরের অতল গহীনে। এই প্রথম হৃদয়ের সবটুকু ভালবাসা নিংড়ে দিলাম তার জন্যে। নিথর দেহে পাথরের পরশটি তার ঠোঁটকে চুমু হয়ে ছুঁয়ে গেল। পাপ হবে কি? পাপ তো কতই করেছি। পূণ্য ভেবে আরো একটি পাপ না হয় যুক্ত হল বালাম খাতায়। ঘরময় ছড়িয়ে আছে কনিকার অযুত নিযুত দীর্ঘশ্বাস। ইচ্ছে হল আমিও যেন একাকার হয়ে মিলিয়ে যাই তাদের সাথে।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29016377 http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29016377 2009-09-27 11:48:09
লিপ্সা উচাটন মন মজে আছে রসবতীর রসে। কিছু মনে করবেন না। ধরুন, এ হল তরুণ আবেগী মনের কবিত্বপনা। তাছাড়া এই মুহুর্তে ‘রসবতী’ ছাড়া অন্য কোন উপমা আমার মাথায় আসছিল না। শুনেছি ভাদ্র মাসে নাকি কুকুর পাগল হয়। তাহলে পৌষ মাসে কি মানুষ? তবে যে আমি পাগল হলাম! যতক্ষণ বাসায় থাকি আমার চোখ দুটো শুধু জানালা গলে পুকুর পাড়ে চলে যেতে চায়। আকাঙ্ক্ষা তীব্র হতে হতে যখন চরমে তখন সিদ্ধান্ত নিলাম, এভাবে হয় না। কারো সাহায্য দরকার। আমার দাদুর চাপরাসী তাজুলকে ঠিক করলাম। সে দিনের বেশীর ভাগ সময় বাজারে বসে বসে রাজা উজির মারে। একদিন তাকে ডেকে মনের কথা খুলে বললাম। হাবে ভাবে মনে হল ঐ ব্যাটারও লালা ঝরছে একই আশায়। সে মিনমিন করে যা বোঝাতে চাইল, আমি তা বুঝতে চাইলাম না। এই কাজে তাকে অংশীদার করতে আমার মোটেই ইচ্ছে করছিল না। কৌশলে এড়িয়ে গেলাম। চাচা যাতে টের না পায় সেদিকে ওকে বিশেষ ভাবে সতর্ক থাকতে বললাম। এমনিতেই বাবার সাথে চাচার সম্পর্ক তেমন ভাল না। তার উপর বিষয়টা জানাজানি হলে ঝামেলা হতে পারে। অবশ্য আমি না বললেও তাজুল ঠিকই সতর্ক থাকত। চাচাকে সে যমের মত ভয় পায়। ভেবেছিলাম ভাতিজাকে পেয়ে চাচার মন কিছুটা নরম হবে। কিন্তু না, আমাকে দেখে সন্দেহ আরো বেড়ে গেছে। ভেবেছে আমি এখানে সম্পত্তির ভাগ চাইতে এসেছি। পরদিন সকাল এগারটায় তাজুলকে বাজারে পাওয়া গেল। ইশারায় খবর জানতে চাওয়াতে সে জানাল, ‘ইট্টু ধৈর্য ধরেন।’ কি জানি বাবা, ভাবলাম গ্রামে যেহেতু ক’দিন আছি অপেক্ষা না হয় করেই দেখি।
অনার্স ফাইনাল দিয়ে ঘরে বসে থাকতে থাকতে বিরক্তি ধরে গিয়েছিল। প্রথমবার যখন বাড়ী আসি তখন আমার বয়স ছিল পাঁচ। এখন প্রায় দেড়যুগ পরে আবার আসলাম। পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে প্রাণটা জুড়িয়ে গেল। ভাঙ্গাচোরা ঘাট। কিন্তু সেই ভাঙ্গা ঘাট যেন আশপাশের সৌন্দর্য্য আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। বাবার কাছে শুনেছিলাম বাড়ীর চারিদিকে নাকি অনেক গাছপালা ছিল। কিন্তু এখন দেখি চাচাদের উঠোনে শুধুমাত্র একটি আম গাছ হাতেগোনা ক’টি মুকুল মাথায় দাঁড়িয়ে। এসময় কি মুকুল থাকে? কি জানি। পুকুরের পাড় ঘেঁষে গোটা সাত নারিকেল গাছ। গুটিকয় বনজ গাছ বাবা আর দাদুর জন্য রেখে ফলজ গাছগুলো চাচা একাই ভোগ করছে। চাচার গাছে কেউ হাত দিলে তার নাকি আর রক্ষা থাকে না। আমার চোখ গুলো ঘুরতে ঘুরতে এক জায়গায় গিয়ে স্থির হয়ে গেল। সাথে সাথে মনটা গুনগুনিয়ে উঠল, ‘গাছ দেখতে গিয়ে আমি তোমায় দেখে ফেলেছি..।’ নাকি চাঁদ দেখতে গিয়ে? কি জানি। গানের কলিগুলো ঠিক মনে আসছে না। গানটা সংরক্ষনে ছিল, আসার সময় অন্যগুলোর সাথে ওই ক্যাসেটটাও নিয়ে আসলে ভাল হত। অবশ্য আমি যে আসতে পেরেছি এই যথেষ্ট। আমার গ্রামে আসার কথা শুনে মা আঁৎকে উঠেছিল। কিছুতেই আসতে দিতে চাইছিল না। চাচা চাচীরা আমার খোঁজখবর ঠিক মত রাখবে কিনা, আদর সোহাগ করবে কিনা, বার রকম চিন্তা তার মাথায়। বাবা পালে পার্বনে আসলেও মা তেমন আসে না বললেই চলে। যে উৎসাহ নিয়ে আমি এসেছিলাম তাতে অনেকটাই ভাটা পড়েছে। দাদু ছাড়া অতিথি’র খবর তেমন কেউই রাখছে না। বুড়ো আবার আমার একান্ত আপন দাদু নন। বাবার কেমন যেন পেঁচানো চাচা হন। দাদু আর চাচাদের বাড়ীর মাঝ বরাবর একটি বাঁশের বেড়া। একদিন দুপুরে শুয়ে শুয়ে গুনগুন করে গান গাইছিলাম, ‘গাছ দেখতে গিয়ে আমি..।’ নাকি চাঁদ দেখতে গিয়ে? ধ্যাত্তেরি! হঠাৎ দাদুর বিকট আর্তনাদ শুনে ছুটে গেলাম পুকুর পাড়ে। দেখলাম দাদু ঘাটলায় পড়ে কাতরাচ্ছেন। তাঁর বাম পায়ের গোড়ালিতে ব্যাথা পেয়েছেন। আহত দাদুকে সাহায্য করতে গিয়ে আমার দৃষ্টি আটকে গেল ঘাটলার ধারে ঘাঁড় বাঁকা করে দাঁড়িয়ে থাকা আকাঙ্ক্ষিতের দিকে। মদির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছিতো তাকিয়েই আছি। দাদুর কঁকানিতে চমকে উঠে তৎক্ষনাৎ ভোগবাদী মনকে শাসন করলাম। তারপর দাদুকে নিয়ে হাসপাতাল - ডাক্তার - বাসা করতে করতে দিন তিনেক কেটে গেল। দাদু আমাকে কাছ ছাড়া করতে চান না কিছুতেই। সব সময় পাশে বসিয়ে রাখেন। তবে সুযোগ পেলেই আমার বাঁধনহারা মনটা জানালা টপকে পুকুর পাড়ে চলে যেতে চায়। দাদুর সাথে তাঁর একটা বিধবা বোন থাকেন, নিঃসন্তান। তাঁকে আমি বুবু বলে ডাকি। বুবুটা কেমন যেন কাঠখোট্টা, খিট্‌খিটে। সারাদিন শুধু ক্যাট ক্যাট করেন। আশেপাশে কেউ না থাকলেও নিজে নিজেই বকেন। একদিন সকালে বুবু থালায় করে পাঁচ ছ’টি চিতই পিঠা এনে আমাকে খেতে দিলেন। কিন্তু এই পিঠা আমার পছন্দ নয়। আমার পছন্দ ভাপা। ঈশ্... ভাপা পিঠা! ভাপা পিঠার কথা মনে পড়ায় আমার ভেতরটা ফের গুনগুনিয়ে উঠল। চিতই পিঠাটা দেখতে কেমন যেন। উপরের অংশ ফোঁড়া ফোঁড়া, যেন অসংখ্য বিষ পিঁপড়ের ঘর। উল্টো পিঠটা পোড়া, শুষ্ক মরুভূমি মত। আর ভাপা পিঠা? ওফ্ গড়নটাই শালার অন্যরকম। খাওয়ার আগে হাতের মুঠোয় নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। বুবু বললেন, ওসব কুলসুম বানিয়েছে। পিঠা থেকে আমার চিন্তা মুহুর্তেই ছুটে গেল তাজুলের কাছে। ব্যাটাকে আজ পাকড়াও করতেই হবে। বুবুকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কুলসুম কি করে?’ বুবু অকথ্য কিছু বিশেষন যুক্ত করে জানাল, ধিঙ্গি মেয়েটা নাকি সারাদিন খালি ঢ্যাং ঢ্যাং করে। তবে মেয়েটা দেখতে বেশ, আমার চাচী’র বোনঝি। চাচীদের সাথেই থাকে। তাকে যখন প্রথম দেখি তখন আমার বুকের ভিতর কেমন যেন ছ্যাঁৎ করে উঠেছিল। আহ্ মাথার ভিতর শুধু তাজুল ঘুরছে। তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে বাজারের দিকে রওনা দিলাম। বটগাছের নীচে ঐ হারামজাদাকে পাওয়া গেল। একটা ডব্‌কা সাপুড়ে মহিলার সাথে বসে ঘুচুর ঘুচুর করছে। তাদের সামনে দু’টি গোলাকার চ্যাপটা মুখবন্ধ ঝুড়ি। পিছন থেকে গিয়ে মাথায় চাটি দিলাম, তুমি শালা আমার নাকের ডগায় মূলা ঝুলিয়ে বেদেনীর সাথে বসে সাপের গল্প করছো? ওমা, সে দেখি আমাকে চিনতেই পারছেনা। শেষে ধমক ধামক খেয়ে একপাশে সরে এসে আমার সাথে ছলচাতুরী শুরু করে দিয়েছে। ইনিয়ে বিনিয়ে বলছে ‘ইট্টু সমস্যা আছে.. আর ইট্টু..আর ইট্টুখানি ধৈর্য ধরেন ছোড মিয়া।’ তাছাড়া সে নাকি গতকাল জায়গা মত গিয়ে জানতে পেরেছে, আগে থেকেই কেউ একজন.. .. ইত্যাদি ইত্যাদি হাজারটা অজুহাত। মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল। তাকে কিছু বললাম না। ঠিক করলাম ব্যাটাকে একটা শিক্ষা দিতে হবে। মাথার ভিতর দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল। আজ রাতে আমিই না হয়.. .।
রাত সাড়ে বারটা। শহরের যান্ত্রিক শব্দমালার চাইতে এখানকার ঠাণ্ডা ছিমছাম শব্দগুলো আমাকে ধীরে ধীরে মোহে ফেলে দিচ্ছিল। কুলসুমদের বাড়ী হতে ভেসে আসা ঢেঁকির ছন্দময় শব্দ দুপুর বেলায় আমাকে চোখে ঝিমুনি ধরিয়ে দেয়। অবাক কান্ড, সেই একই শব্দ আমাকে ভীত করে তুলছিল যখন সেটা এই মাঝরাতে নিজের বুকের ভেতর হতে শুনতে পাচ্ছিলাম। গায়ে মুখে চাদর জড়িয়ে একটু ভেবে নিলাম, সাথে করে কিছু নেয়ার দরকার আছে কি? বিছানার দিকে চোখ যাওয়াতে ছোঁ মেরে প্যাকেটটা তুলে নিয়ে লুঙ্গির প্যাঁচে গুঁজে নিলাম। বাসায় থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট পড়ে থাকতাম। এখানে এসে প্রথম লুঙ্গি পড়তে শুরু করলাম। দাদু ব্যবহার প্রণালী শিখিয়ে দিয়েছেন। পোষাকটি ব্যবহার করে বড় আরাম বোধ করছি। এককথায় চমৎকার। শুধু ঘুমোনোর আগে বাড়তি সতর্কতার জন্য দু’পায়ের মাঝখানে একটি গিঁট দিয়ে দিতে হয়। লুঙ্গি খুলে প্যান্ট পড়ে নেব কিনা ভাবছিলাম। আবার ভাবলাম, নাহ্ লুঙ্গিই থাক। প্যাকেটটা কেউ দেখে ফেলেছে কিনা কে জানে। অবশ্য বুবু আজ বিছানা ঠিক করতে আসেননি। তিনি দাদুকে নিয়ে ব্যস্ত। ধীরে ধীরে দরজা খুলে বের হলাম। ঘরের চালা থেকে মাথার উপর টুপ্ করে কি যেন পড়ল। হাত দিয়ে দেখলাম, কুয়াশা। লুঙ্গির নিম্নপ্রান্ত দু’হাতে আলতো করে ধরে সন্তর্পনে পুকুর পাড়ের দিকে এগুতে লাগলাম। কুলসুমদের বাসায় আলো জ্বলছে। কি ব্যাপার, এত রাতে কে জেগে? কুলসুম নাকি? হঠাৎ বুকের ভিতর কেন যেন ছ্যাঁৎ করে উঠল। কয়েক গজ দূরের গোরস্থানে একটি ল্যাম্পপোস্ট আপ্রাণ চেষ্টা করছে অন্ধকারকে শায়েস্তা করার। তার মৃদু আলোয় কিছুটা সাহস পেলাম। তবুও কেন জানি আমার সাড়া শরীর কাঁপতে লাগল। আজ শীতটা বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে। মনে মনে স্রষ্টাকে ডাকছি। ঘাটলার কাছে পৌঁছুতেই হঠাৎ কর্কশ গলায় ‘ক্যাডা’ ডাক শুনে শরীরের কাঁপন বেমালুম বন্ধ হয়ে গেল। একি, হৃদয়ের কাঁপন শুরু হল যে! দেখলাম ঝোপের আড়াল থেকে সাড়া গায়ে কাঁথা জড়ানো রহস্যময় কেউ একজন এগিয়ে আসছেন। কোন অতৃপ্ত মূর্দা কবর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে বুঝি? না না তা কি করে হয়। হাতে আবার একটি বিশাল লাঠি দেখা যাচ্ছে। তিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছেন। আমি এক পা দু’পা করে পিছোচ্ছি। পিছোতে পিছোতে আমার পিঠ ঠেকে গেল একটা গাছে। আবছা আলোয় তাকিয়ে দেখি খেজুর গাছ। আর পিছোনোর জায়গা নেই। যাস্‌ সালা এবার আমি শেষ। ওমা মূর্দা দেখি হঠাৎ কথা বলে উঠল। ‘পাইছি তরে’ বলে লাঠি উঁচিয়ে যেই আমাকে আঘাত করতে যাবে অমনি আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘আমি আমি.. আমি ছোট মিয়া’। তাজুল সাঁই করে মাথা থেকে কাঁথাটা সরিয়ে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তাকে দেখে আমিও অবাক। আমি সহজ হওয়ার জন্য লুঙ্গির প্যাঁচ থেকে প্যাকেট বের করে সিগারেট ধরালাম। তাজুল বলল, ‘ছোডসাব আপনে?’ আমি কেশে গলা পরিষ্কার করে বললাম, ‘না মানে.. দেখতে এলাম..।’ তাজুলের দৃষ্টিতে তখন আগুন ঝরছে। সে বলল, ‘লগে কাঁথা নিয়া আসছি, আইজ সারা রাইত আছি.. আপনে বাড়ীত যান।’ আমার ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ। যেতে উদ্যত হলাম, মাথার উপর টুপ্‌ করে কি যেন পড়ল। ডান হাতের তর্জনিটা আনমনে মাথায় ছুঁইয়ে এনে জিভে ছোঁয়ালাম। দু’চোখ মুদে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম‌। তাজুল নিজে চুরি করতে আসলেও বড় গলায় বলে উঠল, ‘দেহি.. কোন হালায় আইজ রস চুরি করে।’
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29016020 http://www.somewhereinblog.net/blog/nasiruddinkhan/29016020 2009-09-26 16:03:22