somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... সীমাহীন অসংযম বনাম বাধ্যতামূলক সংযমঃ রমযান মাসের ছবি ব্লগ

রোযা রাখার জন্য আবার বয়স লাগে না-কি? আমরা আছি - সেই কবে থেকে ...


কোনটা রেখে কোনটা কিনবো? সারাদিন না খেয়ে তো কম ধকল যায় নি!


রোযা রাখায় ধকল? না ও তো অভ্যেস হয়ে গেছে ....


ইফতারে প্রোটিন না হলে চলে নাকি? শক্তি রিগেইন করতে হবে না !!


রোযায় শক্তি হারানোর মত শক্তি আছে যে শক্তি রিগেইন করার চেষ্টা করবো?


আসেন ভাই, আসেন ভাই- পেয়াজু-চপ-বেগুনি, ছোলা-সিঙ্গারা-হালিম কি লাগবো কন?


কি আর লাগবো? এই বেশ আছি ...


তর আর সয় না .. আযান ক্যান দ্যায় না ...


ভাইডিরে আরেকটু ধৈর্য ধর! ঐ তো আর কিছুদূর গেলেই পানি মিলবে ..


গরম জিলাপি, শাহী জিলাপি, গরম গরম বাদশাহী জিলাপি ...


বাদশাহী একটা তাঁবু মিলছে, কি আনন্দ আকাশে- বাতাসে ...


ওওওও-উহুহুহু-ওওও, বড় বাপের পোলায় খায় ..


বাপ পোলারে ফালায়া যে কই গ্যাছে ....


ধরি মোনাজাত, আল্লাহ মেহেরবান ..


আল্লাহ সত্যিই মেহেরবান ...


আহা কত মেহেরবান ...


মেহেরবান ...


কিছু কথা:
১। সোমালিয়ার দুর্ভিক্ষে এ পর্যন্ত ২৯০০০ শিশু না খেয়ে মারা গেছে। Click This Link
২। পুরো আফ্রিকা জুরেই খুব খারাপ অবস্থা- গত ৬০ বছরের মধ্যে ভয়াবহ খরা চলছে।
৩। নেটে পাওয়া বাছাই করা সবচেয়ে মোলায়েম ছবিগুলোই এখানে দিলাম - শেষেরটি বাদে। বেশীরভাগ ছবি, ভিডিওতে এই চামড়া পরিহিত কংকালের ছবি। দেখে মাথা ঠিক রাখা কষ্ট!
৪। আমরা কি কিছুই করতে পারি না?
৫। সোমালিয়ার প্রেক্ষাপটে না- তবে ক্ষুদা নিয়ে তৈরি করা একটা শর্ট ফিল্মের লিংক দিলাম।
http://www.youtube.com/watch?v=o1bOteXhwrw]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29426272 http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29426272 2011-08-05 23:05:29
"হাদীস/তাফসিরের প্রভাবমুক্ত কোরআন অনুবাদ" তত্ত্ব এবং কোরআনে উল্লেখিত 'রাইট হ্যান্ড পজেজ'/ 'যুদ্ধবন্দিনী'/ 'দাসী' ও এক্সট্রা ম্যারিটাল রিলেশন ******প্রথমেই বলে নিচ্ছি- মেহেদী পরাগের কোরআন বিশ্লেষণ প্রচলিত ধারা থেকে স্বতন্ত্র এবং অভিনব। আলোচনা হচ্ছিল আমার এক পোস্টে (Click This Link), কিন্তু বিষয়টাকে ঐ পোস্টের মূল বক্তব্যের জের হিসাবে না টেনে স্বতন্ত্র মাত্রা দেয়ার লক্ষে এবং অন্য সকলের যুক্তি-মতামত পাওয়ার আশায় এই পোস্টের অবতারণা।*****

মেহেদী পরাগ মূলত নিম্নোক্ত তিনটি বিষয়ে তার শক্ত অবস্থান ব্যক্ত করেছেন:
১। হাদীস-তাফসিরের প্রভাবমুক্ত অনুবাদই হচ্ছে কোরআনের সঠিক অনুবাদ। কোরআনের অনুবাদ বিবৃত হতে হবে কোরআনেরই অন্যান্য আয়াতের আলোকে, বাইরের যেকোন সোর্স থেকে মুক্ত। মুসলিমরা যতই হাদীসের পক্ষে থাকুক, স্বাভাবিক যুক্তিবোধ বলে হাদীস বর্জনীয়। কেননা, হাদীস আসলেই নবীর বানী ছিল কিনা তা নিশ্চিৎ করে বলার উপায় নাই। ২। ''রাইট হ্যান্ড পজেজ'' এর জায়গায় সকলেই ''দাসী'' অনুবাদ করে মূলত হাদীস নামক আনরিলায়েবল সোর্সের কারণে। অথচ এর অর্থ রিফিউজি যারা এসাইলাম সিক করেছে। ৩। এই রিফিউজিদের সাথে অবৈধ (!) যৌন সম্পর্কের অনুমতি দেয়া হয়নি, বিবাহের অনুমতি দেয়া হয়েছে মাত্র।
(@মেহেদী পরাগ, উপরের তিনটি পয়েন্টে আপনার অবস্থান ভিন্ন হলে অর্থাৎ আপনাকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে থাকলে অনুগ্রহ করে সংশোধন করে দিবেন।)

এবারে উপরে উল্লেখিত পয়েন্টগুলোতে এক এক করে আসা যাক ...

১। হাদীস বিষয়ে ইদানীং অনেককে মাঝেমধ্যে বলতে শুনি- অমুক হাদীস সঠিক হাদীস নয়, তমুক হাদীস বানানো। ছোটবেলায় যখন প্রচণ্ড ধার্মিক ছিলাম (এবং ধর্ম বিষয়ক পড়াশুনার প্রতি আগ্রহ যখন থেকে বিস্তৃত হয়)- তখন হুজুররা জানিয়েছিল- কোরআনের পরেই হাদীসের অবস্থান, আর বুখারী হাদীস হচ্ছে সম্পূর্ণ সহী। কিন্তু আজ যখন বিভিন্ন হাদীস নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, আজকের মূল্যবোধের নিরিখে হাদীসে বর্ণিত ঘটনা বা বক্তব্যের কারণে ইসলাম ধর্মকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে- তখন জানানো হচ্ছে, হাদীসটি ভূয়া। এমনকি বিভিন্ন আমলে বড় বড় ইসলামিক স্কলারেরা যেসব হাদীসকে কোরআনের তাফসীরে ব্যবহার করেছেন- সেগুলোও অনেকক্ষেত্রে বাতিল বলে গণ্য হচ্ছে। বাতিল ও ভুয়া হিসাবে পরিগণিত হওয়ার ক্ষেত্রে বুখারী, মুসলিম বা তিরমিযি- কোন পার্থক্য নেই। আপত্তিকর হাদীসের আপত্তির কোন জবাব না মিললেই- সেটা বাতিল। কোরআনের আয়াতের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা পাল্টানোর উদ্দেশ্যেও অনেক হাদীস বাতিল হয়ে যাচ্ছে এবং এভাবে কোরআনও জাতে উঠছে (কোরআনের আয়াতকে যেহেতু বাতিল করা সম্ভব নয়- সেহেতু অর্থ পাল্টানোই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা বটে!)।

সে হিসাবে মেহেদী পরাগের বিশেষত্ব হচ্ছে- তিনি একেবারে সমস্ত হাদীসকেই বলছেন- বর্জনীয়, এবং হাদীসের প্রভাবযুক্ত সমস্ত তাফসীরকেও বাতিলের খাতায় ফেলেছেন। তার ভাষায়:"ইসলামের বিরোধীতার জন্য নয়, যদি নিরপেক্ষভাবে চিন্তা করেন তাহলে অবশ্যই বুঝবেন এই ইতিহাসগুলোর ১০০% সত্য হবার কোন নিশ্চয়তা নেই। এইসব ইতিহাসের বইতে শত শত ভুল আর কন্ট্রাডিকটরী তথ্য আছে। আমাদের সেদিনকার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেরই ঠিক নাই আর এটা নবীর মৃত্যুর ১০০/২০০ বছর পরে লিখা ইতিহাস। নিজেদের পারিবারিক ইতিহাস দেখলেও দেখা যায় আগের ঘটনা নিয়ে বহু ভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়।...... ইসলামের মধ্যে যা কোরানে নেই তা যে হাদীস/ শরীয়া/ ইজমা/ কিয়াস/ ইজতিহাদ ইত্যাদি থেকেই এসেছে তা সহজেই অনুমেয়। মুসলিমরা যতই হাদীসের পক্ষে থাকুক, স্বাভাবিক যুক্তিবোধ বলে হাদীস বর্জনীয়। ..... চিন্তা করলেই বুঝতে পারবেন হাদীস আসলেই নবীর বানী ছিল কিনা তা নিশ্চিৎ করে বলার উপায় নাই।"

ছোটবেলার হুজুরদের দেয়া যুক্তিতেই আসি। তারা বলতেন- কোরআন হচ্ছে কেবল গাইডলাইন, আর হাদীস হচ্ছে সেই গাইডলাইন অনুযায়ী চলার জন্য পদক্ষেপের বিস্তারিত বর্ণনা। উদাহরণ দিয়ে জানাতেন- সালাতের ওয়াক্ত ঠিক কোন কোন সময়ে, কোন কোন ওয়াক্তে কয় রাকাত, প্রতি রাকাত পড়ার নিয়ম প্রভৃতি কোনটাই কোরআনে নাই- কোরআনে কেবল সালাত কায়েম করার নির্দেশ দেয়া আছে। হাদীস ছাড়া কোরআনের এই নির্দেশ মানা অসম্ভব, কেননা হাদীস না থাকলে সালাত কিভাবে আদায় করা যায়- সেটাই আমরা জানতাম না। এমন অসংখ্য উদাহরণ দেয়া যায়- আশা করি, মেহেদী পরাগ এ বিষয়ে আরো বলবেন।

আমার ধারণা, মুসলিমদের পক্ষে সম্পূর্ণ হাদীসকে ফেলে দেয়া বা বাতিল করে দেয়া সম্ভব নয়। আর, তা যদি সম্ভব না হয়- তবে কি মুসলিমরা কিছু হাদীসকে বানানো আর কিছু হাদীস সহী- এমন ধারণাকে সঠিক বলে ধরে নিবে? সেক্ষেত্রে, সহীহ হওয়ার মানদন্ড কি- অর্থাৎ কোনটি সহীহ আর কোনটি বানানো বলে বিবেচিত হবে? একেক স্কলারের কাছে যদি একই হাদীস সহী ও বানানো হয়, তবে কোন ভাষ্যকে মুসলিমরা সঠিক ধরবে?

২। মেহেদী পরাগ জানাচ্ছেন- ''রাইট হ্যান্ড পজেজ'' এর জায়গায় সকলেই ''দাসী'' অনুবাদ করে মূলত হাদীস নামক আনরিলায়েবল সোর্সের কারণে। অথচ এর অর্থ রিফিউজি যারা এসাইলাম সিক করেছে। রাইট হ্যান্ড পজেজ যে আসলে রিফিউজি- তা মোটেও "দাসী" নয়, সেটা প্রমানার্থে তিনি কোরআনের ৩৩-৫০ এবং ৬০-১০ আয়াতদুটোর অনুবাদ তুলে ধরেছেন। বলাই বাহুল্য এই অনুবাদ হাদীস প্রভাবমুক্ত(!) এবং মেহেদী পরাগের ভাষায়: "এই ট্রান্সলেশনে কোরান এক্সপ্লেইন্ড হয়েছে কোরানেরই অন্যান্য আয়াতের আলোকে, বাইরের যেকোন সোর্স থেকে মুক্ত।"

'অন্যান্য আয়াতের আলোকে এক্সপ্লেইনড হওয়া অনুবাদ' কি বস্তু তা সহসা বুঝে উঠতে পারিনা। কেননা, প্রতিটি ভাষায় আছে শব্দভাণ্ডার- আর শব্দের সংজ্ঞাই হচ্ছে মনের ভাব প্রকাশক অর্থবহ ধ্বনিসমষ্টি, অর্থাৎ শব্দ অবশ্যই নির্দিষ্ট এক বা একাধিক অর্থ ধারণ করে, বাক্যে ব্যবহার অনুযায়ী কোন শব্দের অর্থ বিভিন্নও হতে পারে, কিন্তু অনুবাদের ক্ষেত্রে বাক্যটি ঐ ভাষাভাষি মানুষের কাছে যে অর্থ বহন করে- সেটার অনুবাদ হওয়াই বাঞ্ছনীয়। কোনকিছুর আলোকে- তা সে হাদীস হোক বা অন্যান্য আয়াতই হোক যেটা হয় সেটাকে কোনভাবেই অনুবাদ বলা যায় না, হতে পারে তা ব্যাখ্যা বা তাফসীর। যাহোক, মেহেদী পরাগ বর্ণিত বিশেষ এই অনুবাদই দেখি- এর মাধ্যমেই হয়তো পরিস্কার হতে পারে তিনি কি বুঝাতে চেয়েছেন।

আহযাবের ৫০ নং আয়াতটির অনুবাদের সোর্স তিনি উল্লেখ করেননি, তবে ৬০-১০ আয়াতের অনুবাদটি তিনি নিয়েছেন প্রচলিত ইউসুফ আলীর অনুবাদ থেকে।

৩৩-৫-: O Prophet! We have made lawful to you your wives to whom you have given their due share of property, and those women who have sought asylum with you and signed the marital contract......................................

৬০-১০: O ye who believe! When there come to you believing women refugees, examine (and test) them: God knows best as to their Faith: if ye ascertain that they are Believers, then send them not back to the Unbelievers. They are not lawful (wives) for the Unbelievers, nor are the (Unbelievers) lawful (husbands) for them. But pay the Unbelievers what they have spent (on their dower), and there will be no blame on you if ye marry them on payment of their dower to them.............

৩৩-৫০ আয়াতের অনুবাদের those women who have sought asylum with you and signed the marital contract অংশটুকু খটকা লাগায়- হাতের কাছে প্রাপ্ত অনুবাদগুলোর দিকে চোখ বুলাতে থাকি। প্রথমেই আওয়ারহোলিকোরআন ডট কম (Click This Link) থেকে ৩৩-৫০ আয়াতের ১ম কয়েক লাইনের অনুবাদ:
"হে নবী! আপনার জন্য আপনার স্ত্রীগণকে হালাল করেছি, যাদেরকে আপনি মোহরানা প্রদান করেন। আর দাসীদেরকে হালাল করেছি, যাদেরকে আল্লাহ আপনার করায়ত্ব করে দেন ......."। বুঝাই যাচ্ছে, এই অনুবাদে যেহেতু দাসী আছে- সেহেতু তা হাদীস প্রভাবমুক্ত অনুবাদ নয়।

বেশী খোঁজাখুজি না করে, সরাসরি মোহাম্মাদ আসাদের (অনুবাদ, শব্দার্থ প্রভৃতি নিয়ে যিনি সবচেয়ে বেশী সোচ্চার ছিলেন এবং যিনি কোরআনের অসংখ্য শব্দ/বাক্যের প্রচলিত অর্থ থেকে ভিন্ন অর্থ, ব্যাখ্যা হাজির করেছিলেন) কাছে যাই: "O PROPHET! Behold, We have made lawful to thee thy wives unto whom thou hast paid their dowers, as well as those whom thy right hand has come to possess from among the captives of war whom God has bestowed upon thee..."

এহেন আসাদের তাফসীরেও those women who have sought asylum with you and signed the marital contract না পাওয়ায় আরো কিছু খোঁজাখুজি করতে হলো বৈকি:
Yusuf Ali: O Prophet! We have made lawful to thee thy wives to whom thou hast paid their dowers; and those whom thy right hand possesses out of the prisoners of war whom Allah has assigned to thee;..........

M. M. Pickthall: Prophet! Lo! We have made lawful unto thee thy wives unto whom thou hast paid their dowries, and those whom thy right hand possesseth of those whom Allah hath given thee as spoils of war,.........

Shakir: O Prophet! surely We have made lawful to you your wives whom you have given their dowries, and those whom your right hand possesses out of those whom Allah has given to you as prisoners of war, ..........

সবাই 'রাইট হ্যাণ্ড পজেজ' ফ্রম ওয়ার বুটি/ক্যাপটিভ হিসাবেই অনুবাদ করেছেন দেখা যাচ্ছে। তাই ভাবলাম আরেক জোচ্চোর অনুবাদক রাশাদ খলিফার (ইনি মিরাকল ১৯ এর জনক এবং নিজেকে নবী হিসাবেও দাবী ও প্রমান(!) করেছিলেন এবং কোরআনকে পাল্টে ফেলেছিলেন।) অনুবাদ দেখি: "O prophet, we made lawful for you your wives to whom you have paid their due dowry, or what you already have, as granted to you by GOD...." প্রথমবারের মতো রাইট হ্যান্ড পজেজ ছাড়া অনুবাদ পেয়ে স্বস্তি বোধ করি, আশা দেখা আরম্ভ করি- রাইট হ্যান্ড পজেজ ছাড়া অনুবাদ যেহেতু পাওয়া গেলো- তাহলে হয়তো মেহেদী পরাগ বর্ণিত "those women who have sought asylum with you and signed the marital contract"ও খুঁজে পাওয়া যাবে।

এবং অবশেষে সেই বিখ্যাত অনুবাদটি চোখে পড়ে।
এই লিংকে (Click This Link) ৩৭ জনের অনুবাদ পাওয়া যাবে। এর একমাত্র শাব্বির আহমেদ এর অনুবাদেই "those women who have sought asylum with you and signed the marital contract (6:10)" পাওয়া গেলো। (প্রায় সব অনুবাদেই রাইট হ্যান্ড পজেজ ফ্রম ওয়ার বুটি, ক্যাপটিভ, স্লেভ গার্লস প্রভৃতি আছে!)

অনুবাদক ও অনুবাদটি হাতে আসায় স্বস্তি পেলাম। এবার শাব্বির আহমেদের যুক্তি ও চিন্তা-ভাবনার সাথে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করা যাক তাহলে। এই শাব্বির আহমেদের ( Click This Link) ) জন্ম পাকিস্তানে, যদিও বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় চিকিৎসক হিসাবে কর্মরত, পেশাজীবনে একটা বড় সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কাটিয়েছেন এবং ৩১ বছর বয়স থেকে ইসলামিক স্কলার হিসাবে ক্যারিয়ার শুরু করেন। তার সবচেয়ে আলোচিত-সমালোচিত বই হচ্ছে "Islam: The True History and False Beliefs" ও "The Criminals of Islam"- যেখানে তিনি প্রথমবারের মতো হাদীসসমূহ ও প্রচলিত হাদীস নির্ভর তাফসীরকে বাতিল বলে ঘোষণা দেন। ইমাম রাজীকে কোট করা সেই বক্তব্য, যেটাকে তিনি তার যুক্তিসমূহের মূল ঢাল হিসাবে ব্যবহার করেছেন, সেটা হচ্ছে: "All my intellectual and supposedly logical statements in the explanation of the Quran turned out to be lame. All the explanations of the Quran done by the so-called Imams (Tabari, Zamakhshari, Ibn Kathir, Bukhari, Muslim etc) are misguided and misleading. All of us were the tools of Satan." পূর্বতন সমস্ত অনুবাদ/তাফসীরকে বাতিল ঘোষণা করেই তিনি ক্ষান্ত দেননি, নিজেই কোরআনের অনুবাদ/তাফসীর বের করেন। বইটির নাম:The Quran As It Explains Itself । নাম দেখেই বুঝা যাচ্ছে- এটা হাদীসের প্রভাব মুক্ত! এখান থেকে (Click This Link) বইটি ডাউনলোড করতে পারবেন।

হাদীসের প্রভাবমুক্ত অনুবাদ যা কোরআনের অন্যান্য আয়াতের আলোকে- বিষয়টি এবার বুঝার চেষ্টা করি। বেশী কষ্ট করতে হয় না। আলোচ্য ৩৩-৫০ আয়াতের অনুবাদেই কিছুটা পারিষ্কার হয়। মালাকাত ইয়ামিনুকা (مَلَكَتْ يَمِينُكَ) এর অনুবাদ তিনি করেছেন:"those women who have sought asylum with you and signed the marital contract (6:10)"। ব্রাকেটের ৬-১০, আসলে হবে ৬০-১০ (প্রিন্টিং মিসটেক!)। অর্থাৎ মালাকাত ইয়ামিনুকা যে এখানে "those women who have sought asylum with you and signed the marital contract" হয়ে গেলো- সেটার সোর্স বা রেফারেন্স হচ্ছে- ৬৬-১০ নং আয়াত। মেহেদী পরাগ উল্লেখিত প্রচলিত ইউসুফ আলীর অনুবাদ আগেই দেখেছি- এবার আওয়ারহোলিকোরআন ডট কম কৃত বাংলা অনুবাদ দেখা যাক:
"মুমিনগণ, যখন তোমাদের কাছে ঈমানদার নারীরা হিজরত করে আগমন করে, তখন তাদেরকে পরীক্ষা কর। আল্লাহ তাদের ঈমান সম্পর্কে সম্যক অবগত আছেন। যদি তোমরা জান যে, তারা ঈমানদার, তবে আর তাদেরকে কাফেরদের কাছে ফেরত পাঠিও না। এরা কাফেরদের জন্যে হালাল নয় এবং কাফেররা এদের জন্যে হালাল নয়। কাফেররা যা ব্যয় করেছে, তা তাদের দিয়ে দাও। তোমরা, এই নারীদেরকে প্রাপ্য মোহরানা দিয়ে বিবাহ করলে তোমাদের অপরাধ হবে না। তোমরা কাফের নারীদের সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রেখো না। তোমরা যা ব্যয় করেছ, তা চেয়ে নাও এবং তারাও চেয়ে নিবে যা তারা ব্যয় করেছে। এটা আল্লাহর বিধান; তিনি তোমাদের মধ্যে ফয়সালা করেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়।"

৬০-১০ আয়াতের আলমুমিনাতু মুহাজিরাতিন (الْمُؤْمِنَاتُ مُهَاجِرَاتٍ) এর অনুবাদ হিসাবে "তোমাদের কাছে ঈমানদার নারীরা হিজরত করে আগমন করে", বা "when believing women ask for asylum with you" বা "believing women come over to you as refugees" হতে পারে- কিন্তু এটাকে সোর্স হিসাবে উল্লেখ করে "মালাকাত ইয়ামিনুকা"এর অর্থ কেমন করে যে "those women who have sought asylum with you and signed the marital contract" হয়- বুঝে আসে না। এই লিংকে (Click This Link) কোরআনের আয়াতের ওয়ার্ড বাই ওয়ার্ড অর্থ দেয়া আছে- সেখানেও "মালাকাত ইয়ামিনুকা" এর অর্থ করা হয়েছে- you rightfully possess, অর্থাৎ মালিকানাধীন নারী

আর, একটু ভালো করে ৩৩-৫০ ও ৬০-১০ পড়লেই বুঝা যায়- সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রক্ষিতে আয়াতদুটো এসেছে। ৬০-১০ এ এটাই বলা হয়েছে যে, ঈমানদার নারীদের বিধর্মী/অবিশ্বাসী/কাফের স্বামী থাকলে সেই কাফের স্বামীর কাছে এদেরকে পাঠানো যাবে না, কাফের স্বামীদের যদি কোন পাওনা থাকে তবে সেটি মিটিয়ে ফেলতে হবে এবং এইসব ঈমানদার নারীদের বিবাহ করা যাবে কেননা- কাফেরদের সাথে ঈমানদার নারীর বিবাহ সম্পর্ক থাকতে পারে না- একইভাবে ঈমানদার পুরুষের সাথেও বিধর্মী নারীর বিবাহ সম্পর্ক থাকতে পারে না। অর্থাৎ এটা সেই আয়াত যার মাধ্যমে ভিন্ন ধর্মের নর/নারীর সাথে বিবাহকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আর উল্টোদিকে ৩৩-৫০, ৩৩-৫২, ৪-৩, ৪-২৪, ২৩-৫,৬, ৭০-২৯,৩০,৩১ প্রভৃতি আয়াতে যেখানে মালাকাত ইয়ামিনুকা, মালাকাত আয়মানুহুম প্রভৃতি আছে- সেসব আয়াতগুলো একটু ভালো করে পড়লেই বুঝা যায়- সেগুলোতে ঈমানদার নারীদের কথা বলা হয়নি, বিয়ের কথা বলা হয়নি, রিফিউজি কারো কথা বলা হয়নি, এসাইলাম খোঁজ করছেন এমন নারীদের কথা বলা হয় নি; বরং বলা হয়েছে ঐ সব নারীদের কথা যারা ইতোমধ্যেই মু'মিন বান্দাদের বা নবীজী'র (৩৩-৫০ এর ক্ষেত্রে) করায়ত্ত্বে আছে অর্থাৎ যারা মুমিনদের মালিকানাধীন। আশা করি সকলে একমত হবেন যে, হিজরতকারীরা তথা কাফের/বিধর্মী পরিবার/আত্মীয়-স্বজনদের হাত থেকে পালিয়ে আসা রিফিউজি নারীদেরকে কখনো নবীজীর/সাহাবাদের মালিকানাধীন হিসাবে আখ্যা দেয়া হয়নি। কৃতদাস প্রথায় দাস/দাসীরাই তার মনিবের মালিকানাধীন, রিফিউজিরা কখনো কারো মালিকানাধীন হয় কি করে, যেখানে নবী (সা) নিজেও হিজরত করেছিলেন- মক্কার অধিকাংশ সাহাবীদের হিজরত করতে হয়েছিল- এইসব রিফিউজিদের কার মালিকানাধীন বলবেন শাব্বির আহমেদ বা মেহেদী পরাগেরা? আর, এক শাব্বির আহমেদ যদি ৬০-১০ আয়াতের আলোকে ৩৩-৫০ এর মালাকাত ইয়ামিনুকার অর্থ "those women who have sought asylum with you and signed the marital contract" বানাতে পারেন, তবে আরেক ইসলামী স্কলার এসে ৩৩-৫০ আয়াতের আলোকে ৬০-১০ এর এরূপ অনুবাদ করলে: "O YOU who have attained to faith! Whenever women come unto you, those whom thy right hand has come to possess from among the captives of war whom God has bestowed upon thee, examine them, do not send them back to the deniers of the truth, [since] they are [no longer] lawful to their erstwhile husbands, and these are [no longer] lawful to them....., শাব্বির আহমেদরা কি করবেন, আর, মুসলিমরাই বা কোন অনুবাদ/তাফসীরকে সঠিক ধরবে, যেখানে উভয়টিই কোরআনের অন্য আয়াতের আলোকে করা অনুবাদ! এমন করে আসলে কোরআনকে জাতে তুলতে গিয়ে কোরআনকেই কি আরো তামাশার পাত্র করা হচ্ছে না কি?

আশা করি- রিফিউজি/ এসাইলাম সিকার বনাম রাইট হ্যান্ড পজেজ/ক্যাপটিভ/স্লেভ গার্ল বিষয়টিতে কারো কোন সন্দেহের অবকাশ থাকবে না। পরের বিষয়টিতে (অর্থাৎ মালাকাত ইয়ামিনুকা এর সাথে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ককে বৈধ করা হয়েছে কিনা) যাওয়ার আগে- শাব্বির আহমেদ সম্পর্কে আরো দুটো তথ্য দেয়া যাক। ভন্ড নবী ও মিরাক্যল ১৯ এর জনক রাশাদ খলীফা, কোরআনকে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত বানানোর কারিগর মোহাম্মদ আসাদ এর মতো শাব্বির আহমেদকে নিয়েও গুরুতর জোচ্চুরির অভিযোগ আছে। অভিযোগ আছে পূর্বতন তাফসিরকারীদের ও হাদীস সংগ্রাহকদের শয়তানের হাতিয়ার হিসাবে উপস্থাপন করতে গিয়ে তিনি বিকৃতভাবে ইমাম রাজীকে কোট করেছেন, পুরো কোটেশনটিতে নাকি so-called Imams এর পরে ব্রাকেটের থাকা "Tabari, Zamakhshari, Ibn Kathir, Bukhari, Muslim etc" এবং 'All of us were the tools of Satan'- বাক্যটি সম্পূর্ণই শাব্বির আহমেদের মস্তিষ্কপ্রসূত। মজার ব্যাপার হচ্ছে- এমন জোচ্চুরি করতে গিয়ে আসলে তিনি একটা কাঁচা কাজ করে ফেলেছিলেন (!)- বস্তুত ইমাম রাজীরও(১১৫০-১২০৯) প্রায় দেড়শ বছর পরে ইবনে কাথিরের(১৩০১-১৩৭৩) জন্ম! বিস্তারিত পড়তে এই লিংকে (Click This Link) ঢু মারুন।

আজ এ পর্যন্তই ....
চলবে]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29425043 http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29425043 2011-08-03 20:21:30
সুরা আহযাব ৫০-৫২: রাসুলুল্লাহ সা: এর প্রতি কেন বিয়ের বিশেষ বিধান, নাকি আল্লাহর অন্যায় পক্ষপাতিত্ব (!) -০- আয়াত সমূহ:
৫০। হে নবী! আপনার জন্য আপনার স্ত্রীগণকে হালাল করেছি, যাদেরকে আপনি মোহরানা প্রদান করেন। আর দাসীদেরকে হালাল করেছি, যাদেরকে আল্লাহ আপনার করায়ত্ব করে দেন এবং বিবাহের জন্য বৈধ করেছি আপনার চাচাতো ভগ্নি, ফুফাতো ভগ্নি, মামাতো ভগ্নি, খালাতো ভগ্নিকে যারা আপনার সাথে হিজরত করেছে। কোন মুমিন নারী যদি নিজেকে নবীর কাছে সমর্পন করে, নবী তাকে বিবাহ করতে চাইলে সেও হালাল। এটা বিশেষ করে আপনারই জন্য-অন্য মুমিনদের জন্য নয়। আপনার অসুবিধা দূরীকরণের উদ্দেশে। মুমিনগণের স্ত্রী ও দাসীদের ব্যাপারে যা নির্ধারিত করেছি আমার জানা আছে। আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু।

৫১। আপনি তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা দূরে রাখতে পারেন এবং যাকে ইচ্ছা কাছে রাখতে পারেন। আপনি যাকে দূরে রেখেছেন, তাকে কামনা করলে তাতে আপনার কোন দোষ নেই। এতে অধিক সম্ভাবনা আছে যে, তাদের চক্ষু শীতল থাকবে; তারা দুঃখ পাবে না এবং আপনি যা দেন, তাতে তারা সকলেই সন্তুষ্ট থাকবে। তোমাদের অন্তরে যা আছে, আল্লাহ জানেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সহনশীল।

৫২। এরপর আপনার জন্যে কোন নারী হালাল নয় এবং তাদের পরিবর্তে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করাও হালাল নয় যদিও তাদের রূপলাবণ্য আপনাকে মুগ্ধ করে, তবে দাসীর ব্যাপার ভিন্ন। আল্লাহ সর্ব বিষয়ের উপর সজাগ নজর রাখেন।

-১- উপরের আয়াতগুলোর মুল বক্তব্য:
৫০-৫২: রাসুলুল্লাহ সা: এর জন্য বিয়ের বিশেষ বিধান নাযিল হয় যা অন্য সাধারণ মুমিনদের থেকে কিছুটা আলাদা।

-২- সুরা আহযাব নাযিলের সময়কাল:
৫ হিজরী সন। কারন, এতে নিম্নলিখিত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী বর্ণিত হয়েছে:
ক. আহযাব যুদ্ধ (৫ হিজরী সনের শাওয়াল মাস),
খ. বনী কুরাইজার যুদ্ধ (৫ হিজরী সনের যিলকাদ মাস), এবং
গ. রাসুলুল্লাহ সা: এর সাথে যায়নাব রা: এর বিয়ে (একই সময়: ৫ হিজরী সনের যিলকাদ মাস)।

-৩- আহযাব যুদ্ধের আগের যুদ্ধ গুলো:
এর আগে নিকটতম সবচেয়ে বড় যুদ্ধ হল উহুদ (৩ হিজরী সনের শাওয়াল মাস)। এছাড়া উহুদ ও আহযাবের মাঝখানে একাধিক ছোট ছোট যুদ্ধ বা সৈন্যদল প্রেরণের প্রয়োজন হয়েছিল।

-৪- সামাজিক সংস্কার:
উহুদ থেকে আহযাব যুদ্ধের মধ্যকার দু'বছরে যুদ্ধের ডামাঢোলের মাঝেও মদীনার নতুন মুসলিম সমাজটির গঠন এবং সংস্কার ও সংশোধন অব্যাহত ভাবে চলছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল: বিয়ে ও তালাকের পূর্ণ আইন, উত্তরাধিকার আইনের আবির্ভাব, মদ ও জুয়াকে হারাম, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্হার আরো অন্যান্য দিক।

এর মধ্যে আরেকটি উল্লেখযোগ্য সংশোধনযোগ্য বিষয় হলো দত্তক গ্রহণ। এর একটি দিক ছিল দত্তক পিতার কাছে দত্তক ছেলের স্ত্রীকে আপন ঔরসজাত ছেলের স্ত্রীর মতো মনে করা হতো। আরবের সমাজে শত শত বছর ধরে এ রীতিটি চলে আসছিল এবং এ রীতিটি বিয়ে, তালাক, ও উত্তরাধিকারের যেসকল আইন সুরা বাকারা ও নিসায় আল্লাহ বর্ণনা করেছেন সেগুলোর সাথে পদে পদে সংঘর্ষশীল ছিল। আল্লাহর আইনে উত্তরাধিকারের যারা প্রকৃত হকদার তাদের থেকে এ রীতি সম্পদ এমন এক ব্যক্তিকে দিতো যার প্রকৃতপক্ষে কোন অধিকারই ছিল না। এছাড়া এরীতি সুরা আহযাবের পর্দার বিধানের সাথে সংঘর্ষশীল ছিল।

এ শক্ত ও ঐতিহ্যবাহী রেওয়াজটি ভেঙ্গে ফেলার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ রাসুলুল্লাহ সা: এর নিজের হাতে সম্পন্ন হওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছিল। তাই আহযাব যুদ্ধের আগে আল্লাহ রাসুলুল্লাহ সা: কে ইংঙ্গিত করেন তাঁর পালক পূত্র যায়েদ রা: এর তালাক দেয়া স্ত্রী কে বিয়ে করার জন্য। বনী কুরাইযাকে অবরোধ করার সময় তিনি এ হুকুমটি তামিল করেন।

-৫- যায়নাব রা: কে বিয়ে করার পর তুমুল অপ(!)প্রচার:
রাসুলুল্লাহ সা: ও মুসলমানদের সাফল্যের প্রকৃত শক্তি ছিল চারিত্রিক শ্রেষ্ঠত্ব। একে খতম করার জন্য গল্প ফাঁদা হয়, (নাউযুবিল্লাহ) রাসুলুল্লাহ সা: নিজের (পালক) পুত্রবধুকে দেখে আসক্ত হয়ে পড়েন! পুত্র এ প্রেমের কথা জানতে পেরে নিজের স্ত্রীকে তালাক দেন ও এর পর রাসুলুল্লাহ সা: তাকে বিয়ে করে ফেলেন।

-৬- মুসলমানদের মাঝেও সন্দেহের উদ্রেক:
যায়নাব রা: কে যখন বিয়ে করেন,তখন রাসুলুল্লাহ সা: এর চার স্ত্রী জীবিত ছিলেন। তারা হলেন:
ক. হযরত সাওদা রা: (বিয়ে: ৩ হিজরী পূর্ব)
খ. হযরত আয়েশা রা: (বিয়ে: ৩ হিজরী পূর্ব, কিন্তু ১ হিজরী সনে তিনি স্বামীগৃহে আসেন)
গ. হযরত হাফসা রা: (বিয়ে: ৩ হিজরীর শাওয়াল মাস)
ঘ. হযরত উম্মে সালামা রা: (বিয়ে: ৪ হিজরীর শাওয়াল মাস)

তাই যায়নাব রা: হলেন তাঁর পঞ্চম জীবিত স্ত্রী। একসাথে চার স্ত্রীর অধিক রাখা ইসলামী শরিয়ায় জায়েজ নেই। এতে সাধারণ মুসলমানদের মাঝেও সন্দেহ সৃষ্টি হয়। আমাদের আলোচ্য সুরা আহযাবের ৫০-৫২ আয়াতে রাসুলুল্লাহ সা: এর জন্য বিয়ে ক্ষেত্রে বিশেষ বিধানের কথা নাযিল করে আল্লাহ মুসলমানদের নিশ্চিত করেন।

-৭- সুরা আহযাবের ৫০ নং আয়াতে রাসুলুল্লাহ সা: এর জন্য বিয়ের বিশেষ বিধান:
ক. চারের অধিক স্ত্রী রাখা: যায়নাব রা: ৫ম স্ত্রী হিসেবে বিবাহ।

খ. আল্লাহ প্রদত্ত নিজের মালিকাধীন বাঁদী: তাঁর মালিকাধীন বাঁদীদের মধ্যে ছিলেন: রাইহানা রা: (বনী কুরাইযার যুদ্ধবন্দিনী), যুহাইরা রা: (বনিল মুসতালিকের যুদ্ধবন্দিনী), সাফিয়া রা: (খয়বরের যুদ্ধবন্দিনী), এবং মারিয়া কিবতী রা: (মিসরের মুকাউসিস প্রেরিত)। এর মধ্যে প্রথম তিনজনকে তিনি মুক্ত করে মোহরানা দিয়ে বিয়ে করেন। মারিয়া কিবতী রা: এই আয়াতের ভিত্তিতে তাঁর জন্য হালাল ছিলেন।

গ. চাচাত, মামাত, ফুফাত, খালাতো বোনদের যারা রাসুলুল্লাহ সা: এর হিজরতের সহযোগী: ৭ হিজরী হনে উম্মে হাবিবা রা: কে তিনি বিয়ে করেন।

ঘ. যে সকল মুমিন নারী স্বেচ্ছায় রাসুলুল্লাহ সা: কে মোহরানা ছাড়াই বিয়ে করতে চান: ৭ হিজরীর শাওয়াল মাসে মায়মুনা রা: কে বিয়ে করেন। তিনি মহর দাবী না করলেও রাসুলুল্লাহ সা: মোহর আদায় করেছেন।

-৯- (নাউযুবিল্লাহ) রাসুলুল্লাহ সা: এর প্রবৃত্তির লালসা কি খুব বেড়ে গিয়েছিল?:
(নাউযুবিল্লাহ)

-১১- মালিকনাধীন নারীদের সাথে মিলনের অনুমতি ও তাদের কোন সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়নি:
উম্মাতের জন্যও এ বিধান। এর পরিস্কার নির্দেশের জন্য আরো দেখুন: সুরা নিসার ৩, মু'মিনূনের ৬, মা'আরিজের ৩০ আয়াত সমূহ।

যুদ্ধ বন্দিনীদের ব্যাপারে ইসলামের নিয়ম হচ্ছে, ক. তাদেরকে মুসলিম বন্দী বিনিময়ের মাধ্যমে শত্রুদের ফেরত দিতে হবে, অথবা, খ. মুক্তিপণ নিয়ে ফেরত দিতে হবে, অথবা, (উপরের দুটি কাজ না করলে) গ. ইসলামী সরকারের প্রত্যক্ষ তত্বাবধানে মুসলমান মুজাহিদের মাঝে বন্টন করা হবে।

এই তৃতীয় অপশনটি শুধুমাত্র এজন্য যে, এহেন বন্দিনীরা যদি ১ম ও ২য় অপশনের মাধ্যমে তাদের আগের সমাজে ফিরে যেতে না পারেন তবে মুসলিম সমাজে তারা যেন বিপর্যয় সৃষ্টি ও নৈতকতা পরিপন্হী কোন কাজ করতে না পারে। তাদের বিয়ে করা ছাড়া ব্যবহার করার অনুমতি থাকলেও মুক্তি দিয়ে মোহরানা পরিশোধের মাধ্যমে পূর্ণ স্ত্রী হিসেবে গ্রহণই সর্বোত্তম পন্হা, যেমনটি রাসুলুল্লাহ সা: করেছেন।

বিঃদ্রঃ
১। এবার আমাকে বলেন, পোস্ট পড়ে আপনাদের কি মনে হলো- এটা আস্তিকতা বিষয়ক পোস্ট? নাকি নাস্তিক্য পোস্ট?
২। এটি একটি পরীক্ষামূলক পোস্ট।
৩। মূল পোস্টঃ Click This Link]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29419944 http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29419944 2011-07-26 02:48:34
নোবেল বিজয়ী ডঃ ইউনূস প্রসঙ্গ: কিসের লজ্জা? কার লজ্জা? (২) (Click This Link) এর পর থেকে ...

গত ৬ মে প্রথম আলোতে ফারুক ওয়াসিফ একটি প্রবন্ধ লিখেছেন, বিষয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১। শিরোনামটা চমৎকার: শুভংকরের ফাঁকিতে নারী ও রাজনীতি (Click This Link), তেমনি চমৎকার এর শুরুটাও। কিন্তু কিছুদূর পড়লেই শুরুর মুগ্ধতা দূর হয়ে যায়, হোঁচট খেতে হয়। নানা কথার ফাঁকে ফাঁকেই তার আসল কথা/দৃষ্টিভঙ্গী ধরা পড়ে। অবাক হয়ে পড়ি- "ইসলাম নারীদের সমানাধিকারের পক্ষে নয়—এমন মতবাদ কিসের ভিত্তিতে প্রচারিত হচ্ছে?" "বান্দা ও আল্লাহর মধ্যে কোনো মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন ইসলামে নেই, আল্লাহর দরবারে সবারই সমান অধিকার" !!! এ বিষয়ে আলাদা পোস্টে আলোচনা করার চেষ্টা করবো, আলোচ্য লেখাটাতে ফারুক ওয়াসিফের ঐ প্রবন্ধকে টেনে আনার কারণ প্রবন্ধটিতে উল্লেখ করা একটি লাইন: ‎"অধ্যাপক ইউনূসের বিরুদ্ধে সরকার মাঠপর্যায়ে যতটা সক্রিয়, যতটা মুখর, মুফতি আমিনী চক্রের মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে ততটা নয় কেন?"

ফেসবুকে ফারুক ওয়াসিফকে মন্তব্য করি: "অপ্রাসঙ্গিকভাবে ইউনুসরে আনা হইছে এবং পুরা স্টেটমেন্টটা ভুয়া ও ভুল"। জবাবে তিনি বলেন: "সরকারের বা সরকারি দলের রাজনৈতিক আচরণের বিশ্লেষণে এটা খুবই প্রাসংগিক। এটা বলায় ইউনূসের প্রতি কোনো সহানুভূতি যায় না, বরং নারী নীতি প্রশ্নে সরকারের অবস্থান যে ভাসা ভাসা প্রতারণাময়, তারা যে কার্যত নারীদের কিছু দিতে পারে না, তা বোঝাতে এই তুলনা খুবই দরকারি ছিল।"

এতেও পরিষ্কার হলো না। দুই বদমায়েশের কোনজনের বিরুদ্ধে সরকার কেমন ব্যবস্থা নিতেছে- এর তুলনামূলক আলোচনা কি কোন অর্থ বহন করে? ফারুক ওয়াসিফ সেটাই কি করতে চেয়েছেন? যদি তা নাহয়, তবে বক্তব্যটা কি এমন যে, ইউনুসের মতো নমস্য ব্যক্তির বিরুদ্ধে সরকার কত সক্রিয় আর আমিনীর ব্যাপারে নিষ্ক্রিয় সেই তুলনা দেখানো? তাহলে আবার তিনি কেন বলছেন যে, "এটা বলায় ইউনূসের প্রতি কোনো সহানুভূতি যায় না"? ইউনুস ইস্যুতে প্রথম আলোর অবস্থান সকলেরই জানা, ফারুক ওয়াসিফও এ বিষয়ে বিস্তর লিখেছেন। "দেশীয়" প্রতিষ্ঠানের প্রতি তার অন্তহীন টান এবং তার ষড়যন্ত্র থিউরির জুজুও অজানা নয়। ফলে, প্রথম আলো গ্রুপ এবং ফারুক ওয়াসিফেরা সুযোগ পেলেই যে ইউনুসের পশ্চাদ্দেশ রক্ষার পবিত্র দায়িত্ব পালনে ঝাঁপিয়ে পড়বে- তা আর বলতে! আর সে কারণেই এমন অপ্রাসঙ্গিক, অসত্য ও ভুল বক্তব্য প্রদান: ‎"অধ্যাপক ইউনূসের বিরুদ্ধে সরকার মাঠপর্যায়ে যতটা সক্রিয়, যতটা মুখর, মুফতি আমিনী চক্রের মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে ততটা নয় কেন?"

প্রকৃত প্রস্তাবে, ইউনুস আর মুফতি আমিনী - কোন চক্রের বিরুদ্ধেই সরকার মোটেও সক্রিয় নয়। সরকারের তর্জন-গর্জন সব উপর উপর ভাসা-ভাসা, লোক দেখানো। আমিনীর ক্ষেত্রে সরকার যেমন চিৎকার চেচামেচী করে শেষ পর্যন্ত আমিনীর বক্তব্যই পুনপ্রচার করে জানাচ্ছে- কোরআন সুন্নাহ বিরোধী আইন এই নারী নীতিতে নাই- কস্মিনকালেও করা হবে না (ফারুক ওয়াসিফও আওয়ামিলীগ সরকারের কায়দায় তার এই লেখায় বিশাল ফিরিস্তি হাজির করে শেষে জানাচ্ছে "আল্লাহর দরবারে সবারই সমান অধিকার", পশ্চিমী নারীবাদের এদেশে কোন দরকার নাই ইত্যাদি- হুবহু আমিনীরো এমন কথা আছে কিন্তু), তেমনি ইউনুসের ক্ষেত্রে যখন ইউনুসের দুর্নীতি-অনিয়ম নিয়ে অভিযোগগুলো সমানে আসছে, গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণ এর মরণ ফাঁদ নিয়ে জনমানসে প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে- সেই মুহুর্তে হুটহাট সরকার ইউনুসকে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে অপসারণ করলো। একটা তদন্ত কমিটি করতে বাধ্য হয়েছিল- কিন্তু তদন্ত কমিটির রিপোর্ট বের হওয়ার আগেই তড়িঘড়ি করে অপসারণ নাটক তৈরি করা হলো এমনভাবে যেন সমস্ত ইউনুসের অনিয়ম-দুর্নীতি চাপা পড়ে যায়। যে অনিয়মের মাধ্যমে ইউনুস এতদিন গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদটি দখল করে ছিলেন- সেটার প্রতিবিধান কেবল সেই পদ থেকে অপসারণের মাধ্যমে কেমন করে হয়? এই যে অনিয়ম- এক যুগকাল অবৈধভাবে পদদখল করে সমস্ত সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করার মাধ্যমে যে দুর্নীতি তার কি শাস্তির ব্যবস্থা জরুরী ছিল না? অপসারণ নাটক সাজিয়ে আসলে এসবকেই আড়াল করা হয়েছে। আসলে, প্রফেসর ইউনুস ও গ্রামীণ ব্যাংকের কেশাগ্রও স্পর্শ করতে চায় না- সাম্রাজ্যবাদের তাঁবেদার এই সরকারগুলো। যতটুকু করে- তা লোকদেখানো কিছু হম্বিতম্বি ও নাটক। একইভাবে আমাদের মৌলবাদী সরকারগুলো মুসলিম ভোট ব্যাংকের উপর খুব নির্ভরশীল, ভোটের বাণিজ্যে ধর্ম তাদের কাছে অনেক বড় পণ্য- সুতরাং মুফতি আমিনীর বিরুদ্ধেও কিছু ঘোৎ ঘোৎ করা ছাড়া আর কিছু করার মুরোদ এরা রাখে না।

এই সিরিজের প্রথম পর্বের জবাবে ব্লগার মুক্ত মণ একটা পোস্ট দিয়েছেন (Click This Link)। যথারীতি আর দশটা ইউনুসের অন্ধভক্তদের মত তিনিও শুরু করেছেন- ইউনুসের নোবেল বিজয়ে বাংলাদেশ কতবড় অর্জন করলো তা দিয়ে, এবং গর্বে ভক্তিতে গদগদ হয়ে তিনি যুক্তি পর্বে এসে প্রশ্ন করছেন: "এবার আসুন দুর্নিতীর বিষয়ে।..... সেই সরকারের হাতে (আপনার কথা অনুযায়ী এবং বিডিনিউজ২৪ এর ভাষ্য অনুযায়ী) নিরেট প্রমান থাকা সত্বেও আবুল মাল আব্দুল মুহিত (এবং নরওয়েজিয়ান সেই রিপোর্টার) বললো যে তারা দুর্নীতির কোন প্রমান পায়নি!" তারপরে তিনি শুরু করলেন- রাজনীতিবিদেরা কেমন দুর্নীতিবাজ সে আলোচনায়! (এ যেন গোবরের তুলনায় শেয়ালের বিষ্ঠা কম দুর্গন্ধময়- এমন যুক্তির প্রচেষ্টা!!)

এই যে আবুল মাল আব্দুল মুহিতরা দুর্নীতির কোন প্রমাণ পাননি বলছেন কিংবা আর সবাই দুর্নীতির প্রসঙ্গটিকে বেমালুম চেপে যাচ্ছে- সেকারণেই আমি বলেছি- ফারুক ওয়াসিফের দাবি "অধ্যাপক ইউনূসের বিরুদ্ধে সরকার মাঠপর্যায়ে সক্রিয়"- সম্পূর্ণ অসত্য। আসুন, তবে একে একে তদন্ত কমিটির রিপোর্টে প্রকাশিত প্রফসর ইউনুসের অনিয়ম ও দুর্নীতিগুলোর দিকেই প্রথমে দৃষ্টি দেই। এ পর্বে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদটি আকড়ে ধরে রাখা বিষয়ে তদন্ত কমিটির রিপোর্টে কি কি আছে- সেটাই দেখবো।

১.০১ ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ ১.০.১.১ 'গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ, ১৯৮৩' অনুযায়ী গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হতেন। ১৯৯০ সালের সংশোধনী অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন সাপেক্ষে পরিচালনা পর্ষদ কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হয়। সে মোতাবেক ১৯৯০ সনের ১৪ আগস্ট তারিখে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগ প্রদানের জন্য পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান কর্তৃক বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন চাওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক নিম্নলিখিত শর্ত সাপেক্ষে ২৫ আগস্ট, ১৯৯০ তারিখে ড. মুহাম্মদ ইউনুসের ব্যাপারে অনাপত্তি প্রদান করে: ১। গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ ১৯৮৩ এর ১৪(৪) ধারার বিধান অনুযায়ী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের চাকুরীর শর্তাবলী উক্ত অধ্যাদেশ অনুযায়ী প্রণীত রেগুলেশন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে; ২। উক্ত অধ্যাদেশের ৩৬ ধারা অনুযায়ী পরিচালনা পর্ষদ রেগুলেশন প্রণয়ন করবে এবং সরকারী গেজেটে প্রকাশিত হবার পর তা কার্যকর হবে; ৩। উক্ত রেগুলেশনে যেসব শর্তাবলী অন্তর্ভূক্ত হবে তা বর্তমান শর্তাবলীর অনুরূপ না হলে সেক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের পুন:অনুমোদন প্রয়োজন হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন/ অনাপত্তি প্রাপ্তির পর গ্রামীণ ব্যাংকের ২৯ আগস্ট ১৯৯০ তারিখের পত্রের কতিপয় শর্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসাবে ড. মুহাম্মদ ইউনুসের অনুকূলে নিয়োগপত্র জারী করা হয়। উক্ত নিয়োগপত্রে, অন্যান্যের মধ্যে, শর্ত আরোপ করা হয় যে, গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে ড. মুহাম্মদ ইউনূস একজন নিয়মিত কর্মকর্তা হিসাবে গণ্য হবেন এবং তাঁকে ব্যাংকের প্রচলিত বেতন কাঠামোর আওতায় মাসিক বেতন সহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক সুবিধাদি প্রদান করা হবে। ১.০১.২ পরবর্তীতে ২০ জুলাই, ১৯৯৯ তারিখে অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের ৫২ তম সভায় এ মর্মে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় যে, যতদিন পর্যন্ত পরিচালকমণ্ডলী অন্য কোন সিদ্ধান্ত না নেনে ততদিন পর্যন্ত ড. মুহাম্মদ ইউনূস ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে বহাল থাকবেন। পরিচালকমণ্ডলীর ৫২ তম সভার কার্যবিবরণী বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। (উক্ত সভার কার্যবিবরণী খুব মজার, মন্তব্যে তুলে দেয়ার চেষ্টা করবো: না.ধ.) ১.০১.৩ উল্লেখ্য, ২০ জুলাই ১৯৯৯ তারিখে ড. মুহাম্মদ ইউনূস এর বয়স ছিল ৫৯ বছর ২২ দিন (জন্ম: ২৮ জুন, ১৯৪০)। পরিচালনা পর্ষদ কর্তৃক উপরিউক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণকালে বলবৎ থাকা ১লা মার্চ, ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত গ্রামীণ ব্যাংক চাকুরী বিধিমালা অনুযায়ী কর্মীদের চাকুরী থেকে অবসরের ক্ষেত্রে সীমা ৬০ (ষাট) বছর। কিন্তু ২৭ জন ২০০০ তারিখে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বয়স ৬০ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও বলবৎ চাকুরী বিধিমালা লংঘন করে গ্রামীণ ব্যাংক তাকে অবসর প্রদানের কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করনি। ১.০১.৪ ১৯৯৯ সালে গ্রামীণ ব্যাংকের উপর প্রণীত বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মেয়াদপূর্তিতে দায়িত্ব পালনসহ অনেক অনিয়মের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক সরকারের গোচরীভূত করা হলেও কোন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। ১.০১.৫ বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নির্দেশনা প্রদানের ১১ বছর পর ১৯ নভেম্বর, ২০০১ তারিখে বাংলাদেশ গেজেটে ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ সংক্রান্ত একটি রেগুলেশন প্রকাশিত হয়। উক্ত রেগুলেশনে উল্লেখিত বিভিন্ন শর্তাবলীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য শর্তাবলী নিম্নরূপ: ১। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নিয়োগ চুক্তিভিত্তিক হবে। ২। পরিচালনা পর্ষদ নিয়োগপত্রে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কার্যকাল নির্ধারণ করে দিবেন। তবে কার্যকাল পাঁচ বছরের বেশী হবে না। পরিচালনা পর্ষদ যে কোন কার্যকালের মেয়াদ শেষে একই পদে পরবর্তী নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পুন:নিয়োগ দিতে পারবেন। পুন:নিয়োগ দেবার সময় ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের শর্তাবলী নতুনভাবে নির্ধারণ করা যাবে; ৩। ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে চাকুরীর ক্ষেত্রে বয়সের কোন নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকবে না। গ্রামীণ ব্যাংকের চাকুরীবিধি তাঁর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। ১.০১.৫ ১৯৯০ সাল গ্রামীণ ব্যাংক প্রদত্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নিয়োগপত্রে উল্লেখিত শর্ত (গ্রামীণ ব্যাংকের একজন নিয়মিত কর্মকর্তা হিসাবে বিবেচিত হওয়া) ২০০১ সালে প্রকাশিত রেগুলেশনে উল্লেখিত শর্ত (ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নিয়োগ চুক্তিভিত্তিক হওয়া, ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে চাকুরীর ক্ষেত্রে বয়সের কোন নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকা এবং গ্রামীণ ব্যাংকের চাকুরীবিধি তাঁর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না হওয়া) হতে ভিন্নতর। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ২৫ আগস্ট ১৯৯০ তারিখে প্রদত্ত অনাপত্তি পত্রের শর্ত (উক্ত রেগুলেশনে যেসব যেসব শর্তাবলী অন্তর্ভূক্ত হবে তা বর্তমান শর্তাবলীর অনুরূপ না হলে সেক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের পুন:অনুমোদন প্রয়োজন হবে) অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের পুন:অনুমোদন গ্রহণের আবশ্যকতা থাকলেও তা পরিপালন করা হয়নি। ১.০১.৬ ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ রেগুলেশন, ২০০১ এ উল্লেখ করা হয়েছে যে, পরিচালনা পর্ষদ ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নিয়োগপত্রে তাঁর কার্যকাল নির্ধারণ করে দেবেন এবং কার্যকাল পাঁচ বছরের বেশী হবে না এবং পরিচালনা পর্ষদ যে কোন কার্যকালের মেয়াদ শেষে একই পদে পরবর্তী নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পুন:নিয়োগ দিতে পারবেন। কিন্তু উক্ত রেগুলেশন জারীর পর (এমনকি ১৯৯০ সালের পর হতে) ব্যবস্থাপনা পরিচালকের জন্য আর কোন নিয়োগপত্র প্রদান করা হয়নি। ফলশ্রুতিতে গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ এর ১৪(৪) ধারা লংঘিত হয়েছে। তাছাড়া ২০০১ সালে জারীকৃত ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ সংক্রান্ত রেগুলেশনটিও উদ্দেশ্য প্রণোদিত (mala fide) বলে প্রতীয়মান হয়। ১.০১.৭ উল্লেখ্য যে, গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক The Bangladesh Penal Code, 1860 এর Section 21(12((ii) এ যে অর্থে Public Servant কথাটি ব্যবহৃত হয়েছে সে অর্থে Public Servant বলে গণ্য হবেন। তাছাড়া বাংলাদেশ সংবিধানের ১৫২ নং ধারা অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক একজন সরকারী কর্মচারী (Public Officer)। প্রাপ্ত বিভিন্ন সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে কমিটি নিশ্চিত হয়েছে যে, নিম্নোক্ত কারণে ড. মুহাম্মদ ইউনূস Public Servant হিসাবে তাঁর চাকুরীর শর্তাবলী গুরুতরভাবে লংঘন করেছেন: ১। পূর্ণকালীন কর্মকর্তা হিসেবে কর্মস্থল থেকে প্রায়শ:ই অনুপস্থিত থাকা; ২। উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতিরেকে বিদেশ ভ্রমণ; ৩। উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতিরেকে বিদেশ থেকে ব্যক্তিগত নামে তহবিল গ্রহণ; ৪। বিভিন্ন সহযোগী কোম্পানী ও প্রতিষ্ঠান গঠনকালে নিজেকে গ্রামীণ ব্যাংকের পূর্ণকালীন কর্মকর্তা হিসাবে এর প্রতিনিধি হিসাবে উপস্থাপন না করা।"
==========>>>>>
উপরের প্রতিবেদন থেকে খুব পরিষ্কারভাবেই দেখা যাচ্ছে- ড. মুহাম্মদ ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠানটিকে নিজের খেয়াল-খুশী মোতাবেক ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানের মত চালিয়েছেন এবং কোন প্রকার নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করেননি। কেবল বাংলাদেশ ব্যাংক তথা সরকারী নিয়মভঙ্গই করেননি, তিনি গ্রামীণ ব্যাংকের অধ্যাদেশ, রেগুলেশনও ভঙ্গ করেছেন অহরহই। এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করতে হয়- তা হচ্ছে অনেকে মনে করেন বা এমন কথা প্রচার করা হয়ে থাকে যে গ্রামীণ ব্যাংক একটি বেসরকারী/ প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান - যা আসলে সঠিক নয়। এমনকি ২০ জুলাই ১৯৯৯ তারিখে অনুষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের ৫২ তম সভার কার্যবিবরণী থেকে দেখা যায় পরিচালকমণ্ডলীর চেয়ারম্যান প্রফেসর রেহমান সোবহানও বলেন:"গ্রামীণ ব্যাংক দেশের অন্যান্য ব্যাংকের মত নয়। এটি একটি বেসরকারী ব্যাংক। এর ৯৩ শতাংশের উপরে মালিকানা ভূমিহীনদের। মাত্র ৭ শতাংশেরও কম মালিকানা রয়েছে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সরকারের"। এ সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে: "গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সরকার কর্তৃক মনোনীত সদস্যরা গ্রামীণ ব্যাংকের প্রকৃতি সম্বন্ধে ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে কাজ করেছেন। তারা একটি Statutory Public Authority কে বেসরকারী প্রতিষ্ঠান হিসাবে গণ্য করেছেন।"
কেবল তাই নয়, এই প্রতিষ্ঠানটিকে সরকারের জবাবদিহিতা থেকে মুক্ত করে ব্যক্তি বলয়ে আনার বিভিন্ন প্রচেষ্টাও উল্লেখ করা দরকার। তদন্ত প্রতিবেদন থেকেই বিষয়টি দেখা যাক:
১.০১ গ্রামীণ ব্যাংক গঠন
গ্রামীণ ব্যাংক গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ, ১৯৮৩ এর আওতায় প্রতিষ্ঠিত একটি সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান। উক্ত অধ্যাদেশ অনুযায়ী গ্রামের ভূমিহীন লোকদের ঋণ সুবিধাসহ অন্যান্য সেবা প্রদান এবং আনুষাঙ্গিক কার্যক্রম পরিচালনা করাই গ্রামীণ ব্যাংকের উদ্দেশ্য। প্রতিষ্ঠার পর হতে গ্রামীণ ব্যাংকের অধ্যাদেশটি ১৯৮৬ ও ১৯৯০ সালে দু'বার সংশোধিত হয়। অধ্যাদেশে এই সংশোধনীর মাধ্যমে সরকারের ক্ষমতা হ্রাস করে গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের উপর অধিকতর ক্ষমতা ন্যাস্ত করা হয়। বিধি প্রণয়নের ক্ষেত্রে সরকারের অনুমোদন গ্রহণের আবশ্যকতা রহিত করে পরিচালনা পর্ষদের উপর ন্যস্ত করার বিষয়টি প্রণিধানযোগ্য। এর ফলে সরকারের নিকট গ্রামীণ ব্যাংকের জবাবদিহিতা হ্রাস পায়।

১.০২ গ্রামীণ ব্যাংকের শেয়ার মূলধন
গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ, ১৯৮৩ অনুযায়ী গ্রামীণ ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন এবং পরিশোধিত মূলধন ছিল যথাক্রমে ১০ কোটি এবং ৩ কোটি টাকা। বর্তমানে ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন এবং পরিশোধিত মূলধন যথাক্রমে ৩৫০ কোটি এবং ৫৪.৭৭ কোটি টাকা। ১৯৮৩ সালের মূল অধ্যাদেশ অনুযায়ী সরকার ও গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্যদের মূলধনের অনুপাত ছিল যথাক্রমে ৬০% এবং ৪০%। ১৯৮৬ সালে সংশোধনীতে গ্রামীণ ব্যাংকের মূলধন ৪০% হতে বৃদ্ধি করে ৭৫% করা হয় এবং সরকারের মূলধন ৬০% হতে হ্রাস করে ২৫% করা হয়। কিন্তু ৩১ ডিসেম্বর ২০১০ এ সরকার ও গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্যদের মূলধন অনুপাত বাস্তবে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৩.২৯% এবং ৯৬.৭১% , যা অধ্যাদেশের ৭ নং ধারার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

চলবে ....]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29379509 http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29379509 2011-05-11 23:52:50
নোবেল বিজয়ী ডঃ ইউনূস প্রসঙ্গ: কিসের লজ্জা? কার লজ্জা? (১) "এই দশকে পৃথিবীতে বাংলাদেশ পরিচিত হয় প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূ'কে দিয়ে"- আর সে কারণেই তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকাটা যেন আমাদের জন্য ফরয কাম! ফলে, এহেন ইউনুস গ্রামীন ব্যাংক থেকে অপসারিত হওয়ায় আমরা সবাই হয়ে গেলাম 'অকৃতজ্ঞ'- ফেসবুকে "শেম অন আস" / "shame for the whole nation" স্ট্যাটাসের কতই না ছড়াছড়ি !!!!

আর, এত কিছুর মাঝখান দিয়ে ক্ষুদ্রঋণের মরণ ফাঁদ, গরিবী নিয়ে ব্যবসা, ইউনুসের দুর্নীতি এগুলো কি সুন্দর আড়ালে পড়ে গেল !!!!

এই কারণে, যারা সরকারকে বাহবা দিচ্ছেন (বদরুদ্দিন উমর সহ)- ইউনুসের পতনের কথা ভেবে খুশীতে মিষ্টি বিতরণের কথা বলছেন- তাদেরো বলি- ইউনুসকে সরানো মানে- গ্রামীণ ব্যাংক-ক্ষুদ্রঋণের সরা নয়, বয়সের কথা বলে ইউনুসকে সরানো মানে- ইউনুস নামক প্রতিষ্ঠানের কেশাগ্রও ছোঁয়া নয় – বরং তাকে আরো ভালোভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে হাজির করা। দেশের সমস্ত মিডিয়া- তাবৎ বুদ্ধি(!)জীবিরা লেখছেন- হোমড়া চোমড়ারা আওয়াজ তুলছেন- সাম্রাজ্যবাদী মোড়লরা এগিয়ে এসে অসন্তোষ প্রকাশ করছেন …, গ্রামীণের সদস্যরা কান্নাকাটি করছেন- ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে দেখানো হচ্ছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন হচ্ছে, প্রথম আলো সহ বিভিন্ন পত্রিকায় তা দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ প্রথম পাতায় ছবিসহ ছাপানো হয়েছে ... ইউনুসের ক্ষতি কি তাতে?

একই সাথে হাসিনার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠা দরকার। অনেকে বলছেন- এটা জীঘাংসা। এটাতেও একমত যদি না- সেখান থেকে কেউ এই সিদ্ধান্ত না টানেন যে- যেহেতু এগুলো হাসিনার জীঘাংসা সেহেতু ইউনুস মহান! শাসকগোষ্ঠী, সাম্রাজ্যবাদের দালালেরা নিজেদের মধ্য মাঝেমধ্যেই কামড়াকামড়ি করে। এ আর নতুন কি! সরকারের আসলেই যদি সদিচ্ছা থাকতো (থাকার কথাও না)- তবে দুর্নীতি বিষয়ে তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারতো- বা দুদককে ইনভল্ভ করতে পারতো, ক্ষুদ্রঋণ- উচ্চ সুদের-মাহাজনি ব্যবসাকে নিষিদ্ধ করতে পারতো- কিন্তু সেটা আওয়ামিলীগ-বিএনপি যে করবে না- সেটা সকলেই বুঝে। আর, বয়সের মত খেলো বিষয়টাকে সামনে নিয়ে আসা মানেই হচ্ছে ইউনুসকে আসল যে বিষয়গুলো নিয়ে ধরা যেত - সেগুলোকে আড়াল করা। যাহোক, সাম্রাজ্যবাদের সাথে গাটছাড়া বাঁধা সরকারগুলো সাম্রাজ্যবাদীদেরই বিশ্বস্ত অনুচর প্রফেসর ইউনুসকে কতটুকু ঘাটাতে পারে- সেটা তো আর অজানা না!

কিন্তু, এই সুযোগে ইউনুসকে নিয়ে নাচানাচি শুরু হয়েছে- সেটা ভয়ংকর। এমন কথাও হচ্ছে যে, 'ইউনুসের ব্যাপারে, গ্রামীণ ব্যাংক- ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে সমালোচনা থাকতেই পারে- কিন্তু তিনি নোবেল জিতে বহির্বিশ্বে আমাদের মুখ যেহেতু উজ্জল করেছেন-সেহেতু ইউনুসকে আমাদের সবসময়ই মাথায় তুলে রাখতে হবে!' অর্থাৎ ঐসব সমালোচনাকে আমলে নেয়ার কোন দরকার নাই। জাফর ইকবাল স্যারের লেখাতেও এই টোন। অনেকে তো আবার ইউনুসের অবদানের তালিকা তুলে ধরতে দারিদ্র বিমোচন, আত্মকর্মসংস্থান এইসব বাহারি সব জিনিসের আমদানি করছেন। প্রফেসর ইউনুস নিজ দেশের দারিদ্র বিমোচন করেছেন/করছেন? কিস্তি দিতে না পেরে অপমানে আত্মহত্যার মতো ঘটনা ঘটেছে, টিনের চাল খুলে নিয়ে যাওয়া, হালের গরু- এমনকি ছাগল-মুরগীও নিয়ে যাওয়া, কোমরে দড়ি বাধা, লোকসমাজে অপমান করা- এগুলো গ্রামীণ ব্যাংক/ ব্র্যাক কর্মীদের প্রাত্যহিক কাজ- সেটা সম্ভবত তাদের কি জানা নাই? নাকি এটাকেই তারা দারিদ্র বিমোচন বলছেন? আসলে সম্ভবত তারা চান দরিদ্র বিমোচন। ফেসবুকে কল্লোলের নীচের স্ট্যাটাসটা এখানে প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে:
"সুশীলদেরকে ৫ হাজার টাকা করে ক্ষুদ্র ঋণ দেব। মাত্র ১৫% সুদ। ১ বছরে সুদ-আসলে ৫৭৫০ টাকা। ঋণ দেয়ার সময় জামানত, বিমা, সদস্য চাদা ইত্যাদি বাবদ ২৯০ টাকা কেটে রাখবো। বাকি টাকা ৫২ সপ্তাহে সাপ্তাহিক ১০৫ টাকা করে কিস্তিতে দিলেই চলবে। দেখতে চাই, এই টাকা সম্বল করে কত মুনাফার আত্মকর্মসংস্থান তারা আবিস্কার করে যার মাধ্যমে প্রথম সপ্তাহ থেকেই পরিবারের ভরণপোষণ করার পরও নিয়মিত ঋণের কিস্তি দেবার মতো ১০৫ টাকা করে উদ্বৃত্ত তাদের হাতে থাকে!!"

যাহোক, সরকার ইউনুসরে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে অপসারণ করেছে। দুর্নীতির অভিযোগ এনে তার বিরুদ্ধে এখনো কোন ব্যবস্থা নেয়ার ব্যাপারে কোন রকম উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। আর ক্ষুদ্রঋণের মরণ-ফাঁদ নিয়ে তো কোনদিকেই কোন রা নেই। আগেই বলেছিলাম- তেমন কোন ইচ্ছা এই বুর্জোয়া সরকারগুলোর নেই। তদন্ত কমিটি এর মধ্যে গত ২৫ এপ্রিল রিপোর্ট পেশ করেছে, ইউনুসের নানাবিধ দুর্নীতি ও অনিয়মের কথা বিস্তারিতভাবে এই রিপোর্টে উঠেও এসেছে (বিডিনিউজ ডট কমের সৌজন্যে এটা হাতে এসেছে), কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে এই যে- তদন্ত কমিটির রিপোর্টে এইসমস্ত দুর্নীতির ও অনিয়মের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার কোন সুপারিশ নেই।

চলবে ... (পরবর্তী পর্ব: তদন্ত কমিটির রিপোর্ট)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29378976 http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29378976 2011-05-11 03:46:19
আলবার্ট আইনস্টাইনের "ঈশ্বর সম্পর্কে কৌতুহল" নিবারণের প্রচেষ্টায় .... Click This Link এবং Click This Link)। কিন্তু, জুতসই কোন জবাবই পাওয়া যাইতেছে না - দেখে শেষে আমার মনে হলো দেখি পারি কি না ...। দুই পোস্ট মিলে প্রশ্নের সংখ্যা ৬ টি। আমি প্রতিটি প্রশ্নের একাধিক জবাব দেয়ার চেষ্টা করেছি। দেখেন- আপনাদের কার কাছে কোনটা ভালো লাগে। আমার কোন জবাবই যদি মনো:পুত না হয়- তবে আপনারা তো আছেনই ...

১. সর্বজ্ঞ ঈশ্বরের পরীক্ষা-নিরীক্ষা দ্বারা নিশ্চিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা কী?
===>> ১। ঈশ্বর একজন আধুনিক বিজ্ঞানীও, বলতে পারেন অত্যাধুনিক বিজ্ঞানী। সব জানা-বুঝার পরেও তাই পরীক্ষা-নিরীক্ষা তিনি না করে পারেন না।
২। তিনি আসলে নিশ্চিত হওয়ার জন্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন না; তিনি জীব ও জড়কূলকে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ফেলে চাক্ষুষ আনন্দটা উপভোগ করেন। প্রতিটা পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফল তার জানা থাকলেও- সেটা কেবল জানাই- প্রত্যক্ষ কোন অভিজ্ঞতা নয়। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার এই অভাববোধ মেটানোটা তার খুব দরকার।
৩। তেনার ইচ্ছা হইছে- তিনি পরীক্ষা করছেন, আপনের কি?

২. ঈশ্বরের মনে কি অপবিত্র চিন্তা আসতে পারে? অপবিত্র শয়তানের ধারণা কীভাবে আসলো?
====>>> ১। আলবত পারে। আরে, শয়তানরে শয়তান বানানোর শয়তানিটাও ঈশ্বরের মাথা থেকেই বাইর হইছে।
২। ঈশ্বরের কাছে পবিত্র অপবিত্র বলে কিছু নাই। এগুলো কেবল মানুষের ব্যাপার। আরে, ঈশ্বর তো ঈশ্বর, ঈশ্বরের পেয়ারী বান্দাদের কাছেও কি দেখছেন এইসবের কোন বালাই ছিল? সমস্ত মুমিনের জন্য চাইরের বেশী বউ রাখা হারাম, কিন্তু ঈশ্বরের দোস্তের বেলায় কি হইলো? এইরকম নজির ভুরি ভুরি আছে।

৩. সর্বজ্ঞ ঈশ্বর মানুষ স্বাধীন ইচ্ছা দ্বারা কী সিদ্ধান্ত নিবে তা কি আগে থেকেই অবগত? তাহলে পূর্বনির্ধারিত ইচ্ছা স্বাধীন থাকলো কীভাবে?
===>>>> ১। যেহেতু সর্বজ্ঞ, সেহেতু আলবত জানত। আপনারে কে বললো, মানুষ স্বাধীন? একমাত্র ঈশ্বরই স্বাধীন। আর সবাই তার হুকুমের দাস। গাছের পাতাও তার অনিচ্ছায় নড়ে না। তিনি মানুষের বেলায় কেবল একটা সীমা তৈরি করে দিয়েছেন- কিছু অপশনের মধ্যে মানুষ স্বাধীনভাবে একটা বেছে নিতে পারবে। যদিও কি বেছে নিবে- সেটাও ঈশ্বর আগে থেকেই জানতেন। আমি/আপনি যদি সেই ঈশ্বররে একটা চরম গালিও দিতে যাই- সেইটাও তিনি আগে থেকে জানতেন। খালি- এই জানা পর্যন্ত তার দৌড়! থামানোর কোন ক্ষমতা তার নাই! (গালি দিয়া টেস্ট করবার পারেন এইখানে, সামুর মডুগো সমান ক্ষমতাও তারে দেয়া হয় নাই)
২। আগে জানতো না। মানুষ স্বাধীন ইচ্ছায় কামটা করার পর জানতেছে। একসময় জানলেই হলো। সব জানাতো হইয়াই যাইতেছে। ফলে তার সর্বজ্ঞও থাকাও হইলো!

৪. সর্বশক্তিমান ঈশ্বর কি এত্ত লম্বা একটি কবিতা লিখতে সক্ষম যেটা তিনি একদিনে পড়ে শেষ করতে সক্ষম হবেন না?
==>> ১। হুম, পারবেন। এত্ত লম্বা কবিতা লেখতে পারার জন্য প্রমাণ হইতেছে- তিনি সর্বশক্তিমান। কি আপত্তি আছে? একদিনে পড়তে সক্ষম না হওয়ায় ঈশ্বররে সর্বশক্তিমান কইবেন না? আরে মিঞা, ঈশ্বরের আসল ট্রিকস তো বুঝেন নাই! দুনিয়ার ১দিনে না পারতে পারে, আখিরাতের ১ দিন (মানে দুনিয়ার হাজার হাজার বছর) এ তিনি তা ঠিকই পারবেন! কি? এইবার তো সর্বশক্তিমান কইবেন?
২। কোবতে টোবতে যা লিখার কোরআনেই লিখছেন। নতুন করে আর কিছু লেখার মতো ঈশ্বরের অত টাইম বা ইচ্ছা নাই।

৫. সর্বশক্তিমান এবং সবজান্তা ঈশ্বর কি তার জানা ভবিষ্যত পরিবর্তন করে দিতে সক্ষম?
==>>> ১। পারেন। ফলে, তিনি সর্বশক্তিমান। আর, পরিবর্তিত ভবিষ্যতটাও তার জানা- ফলে তিনি সর্বশক্তিমান। দেখেন না- কোরআনেও কিছু রদবদল আনছিলেন (যেমন মদ খাওয়া বিধিনিষেধ সম্পর্কিত)। যদিওবা পুরা কোরআন তিনি আগেই রচনা করেছিলেন।
২। জানা ভবিষ্যতকে অজানা কোন ভবিষ্যত এ পরিবর্তন করে দিতে সক্ষম ঈশ্বর। তাহলে তিনি সর্বজান্তা থাকছেন না? পরিবর্তন করার সাথে সাথেই তো তিনি জেনে যাচ্ছেন। তাহলে এতো চিন্তার কি আছে?

৬. সবকিছু সৃষ্টির জন্য কি স্রষ্টার প্রয়োজন? যদি তাই হয়, তবে ঈশ্বরের স্রষ্টা কে? আর যদি তা না হয়, তবে এই মহাবিশ্ব নিজেই কেন স্বয়ম্ভূ, চিরঞ্জীব, শাশ্বত হতে পারে না?
==>>> ১। অবশ্যই স্রষ্টার প্রয়োজন। আর ঈশ্বরের স্রষ্টা আরেক বড় ঈশ্বর।
২। ঈশ্বরবাদে সবকিছু সৃষ্টির জন্য স্রষ্টার প্রয়োজন- তিনিই ঈশ্বর। আর তার স্রষ্টা? সেটার জানার মত জ্ঞান দিয়ে তিনি কাউকেই সৃষ্টি করেন নি।
৩। সবকিছুর স্রষ্টা থাকুক আর না থাকুক, ঈশ্বরের স্রষ্টা আলবত আছে। যিনি ঈশ্বরের স্রষ্টা তিনিই তার মৃত্যুদাতাও। আর ঈশ্বরের এই জন্মদাতা ও যম হচ্ছে- মানুষ, মানুষের কল্পনাশক্তি।

আইনস্টাইনকে ধন্যবাদ।
সবাইকে ধন্যবাদ।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29377284 http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29377284 2011-05-08 07:19:56
জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১ : সিডও সনদ, সংবিধান ও কোরআন-সুন্নাহ’র সমন্বয়ের ফসল?
আমাদের বর্তমান ডিজিটাল সরকার নানাবিধ নীতি-চুক্তি-প্রস্তাবনা প্রণয়নে ব্যস্ত। ইতোমধ্যেই আমরা শিক্ষানীতি, শ্রমনীতি, স্বাস্থ্য নীতি, শিশু নীতি, কয়লা নীতি (একাধিক), ওষুধ নীতি, গ্যাস নীতি, পিএসসি খসড়া চুক্তি ইত্যাদি পেয়েছি- আর সম্প্রতি পেলাম "জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১"। অন্যান্য নীতিমালাগুলো নিয়ে কথা বলার মতো সুযোগ এখানে নেই- আজ কেবল নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১ নিয়ে আলোচনার উদ্দেশ্যে কলম ধরা।

নারী নীতির ভূমিকার (১ম ভাগ ১ নং অনুচ্ছেদ) শুরুর কয়েকলাইনে বলা হয়েছে: "বাংলাদেশের জনসংখ্যার এক বিশাল অংশ জনসংখ্যার এক বিশাল অংশ নারী। নারী উন্নয়ন তাই জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত। সকল ক্ষেত্রে নারীর সমসুযোগ ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা জাতীয় উন্নয়ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একান্ত অপরিহার্য"। ১ম ভাগ ৪.১ নং অনুচ্ছেদটির শিরোনামই হচ্ছে "নারীর প্রতি বৈষম্য বিলোপ সনদ" (সিডও সনদ) এবং ২য় ভাগের ১৭.২ ধারায় নারী নীতি ২০১১ এর লক্ষ হিসাবে বলা হয়েছে: "নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ (CEDAW) এর প্রচার ও বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা।" ১ম ভাগের ৫ নং অনুচ্ছেদ (নারীর মানবাধিকার ও সংবিধান) এ শুরুতেই সংবিধানের ২৭ নং অনুচ্ছেদ উল্লেখ করা হয়েছে: "সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান ও আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী", এছাড়াও সেখানে সংবিধানের ২৭, ২৮(১), ২৮(২), ২৮(৩), ২৮(৪), ২৯(১), ২৯(২) ও ৬৫ (৩) অনুচ্ছেদ তুলে ধরা হয়েছে। স্বভাবতই অনেকের মধ্যেই একটা আশার সঞ্চার হয়েছিল। আওয়ামিলীগ হয়তো একটা যুগান্তকারী নারী নীতিমালা জাতিকে উপহার দিতে যাচ্ছে, নারী প্রশ্নে শক্ত ও প্রগতিশীল ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে যাচ্ছে হাসিনার ডিজিটাল সরকার- এমন স্বপ্নও ছিল কারো কারো- সাথে ছিল আশংকা - মোল্লাদের সাথে পেরে উঠবে তো। অবশ্য আমার ছিল সন্দেহ। হিজাব পরে ভোট ভিক্ষা চাওয়া হাসিনা, "নৌকার মালিক তুই আল্লাহ"র আওয়ামিলীগ, খেলাফত মজলিশের সাথে চুক্তি সম্পাদনকারী আওয়ামিলীগ আমার চোখে কখনোই প্রগতিশীল ছিল না, ফলে আশান্বিত হওয়া বা স্বপ্ন দেখার স্বম্ভাবনাও ছিলনা। সন্দেহ ছিল, প্রশ্নও ছিল- আওয়ামিলীগ আসলে কি করতে যাচ্ছে এই নীতিমালা নিয়ে এবং কি আছে এতে।

জবাব মিলতে দেরি হয় না- হাতে নারী নীতি ২০১১ চলে আসে, এবং আমিনীর হুংকার শুনে- হাসিনা থেকে শুরু করে আওয়ামি মন্ত্রী-মিনিস্টার সবাই সমস্বরে জানান দিতে থাকে, এই নারী নীতির সাথে নাকি কোরআন-সুন্নাহর কোন বিরোধ নাই। যেভাবে ও যে হারে আওয়ামিলীগ চেচাতে থাকে- তাতে এটা আবারো পরিস্কার হয় যে- এই দলের কাছে প্রগতিশীলতার চাইতেও মুসলিম ভোট ব্যাংক অনেক গুরুত্বপূর্ণ! এ নিয়ে বেশী কিছু বলার নেই, কেননা এটা তো আর নতুন নয়। বরং মজা পাই এ দাবীতে যে- নারী নীতির সাথে নাকি কোরআন-সুন্নাহর কোন বিরোধ নাই! কেননা এ দাবীও করা হয়েছে যে (নারী নীতিতেও অঙ্গীকার করা হয়েছে)- 'এটা সিডও সনদকে বাস্তবায়ন করবে!' -'এটা বাংলাদেশের সংবিধানের আলোকে নারী-পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করবে!' এসব কি কোরআন-সুন্নাহর পরিপূরক কোন নীতি দ্বারা সম্ভব? প্রথমে সেটাই দেখি তাহলে।

কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে?: সিডও সনদ বাস্তবায়ন কি কোরআন-সুন্নাহর আলোকে সম্ভব? সিডও সনদ মানেই হচ্ছে নারীর প্রতি যেকোন প্রকার বৈষম্য বিলোপ। কোরআন-সুন্নাহ কি এই বৈষম্য বিলোপের বিপক্ষে? মোটেও না, কখনো না। উল্টো কোরআন নারী-পুরুষের মধ্যকার বৈষম্যকে সমর্থন করে এবং নারীকে পুরুষের অধীনস্ত মনে করে। সুতরাং সিডও সনদ আর কোরআন-সুন্নাহ সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর।

আমাদের সংবিধানের সাথে কি কোরআন-সুন্নাহর বিরোধ নেই? সংবিধানের ২৭, ২৮(১), ২৮(২), ২৮(৩), ২৮(৪), ২৯(১), ২৯(২) অনুচ্ছেদগুলোতে সরাসরি নারী-পুরুষের সমান অধিকারের ব্যাপারে বলা আছে, সেখানে কোরআন কি মনে করে? কোরআনের চোখে নারী পুরুষের সমকক্ষ নয়। উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে পুত্র সন্তান কন্যা সন্তানের দ্বিগুন পাবে, ১ জন পুরুষ সাক্ষ্য = ২ নারী সাক্ষ্য, স্বামী স্ত্রীকে প্রহার করতে পারে ইত্যাদি। এ সবই সংবিধানের উপরের ধারাগুলোর [২৭, ২৮(১), ২৮(২), ২৮(৩), ২৮(৪), ২৯(১), ২৯(২)] বিপরীত। যদিও, উত্তরাধিকার আইন থেকে শুরু করে সংবিধান সমর্থিত অনেক আইনেই কোরআন-সুন্নাহকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে- যা আবার সংবিধানের উপরের ধারাগুলোর বিপরীত, সুতরাং- বলা যায় সংবিধান নিজেই স্ববিরোধিতায় ভরপুর। আমাদের সংবিধানে যেমন কোরআন-সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক বিষয় আছে, তেমনি পরিপূরক বিষয়াদিও আছে। সংবিধান রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের কথা বলে, বিসমিল্লাহ দিয়ে শুরু হয়, সংবিধান পারিবারিক উত্তরাধিকার আইন, মুসলিম বিবাহ আইনকে সমর্থন করে। আবার উল্টোদিকে- উপরিউক্ত ধারাগুলো যেমন আছে, তেমনি আমাদের সংবিধান সাক্ষ্য আইন ১৯৭২ কে, চুক্তি আইন ১৯৭২ কে সমর্থন করে। এই আইনের বলে- আদালতে ও নির্বাচনে, চুক্তি সম্পাদনে নারী পুরুষের সমান মর্যাদা পায়। যা সরাসরি কোরআন-সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক। নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে স্ত্রীকে প্রহার করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ, যদিও কোরআনে স্ত্রীকে প্রহার করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

সুতরাং বুঝাই যাচ্ছে, কোন নীতিই একই সাথে কোরআন-সুন্নাহ আর সিডও সনদ কিংবা সংবিধান ও কোরআণ-সুন্নাহর পরিপূরক হতে পারে না। তাহলে- আমাদের নারী নীতি ২০১১ প্রকৃত প্রস্তাবে কিরূপ? কার পরিপূরক- কার বিপরীত? সেটাই তবে দেখা যাক।

জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১ এ কি আছে?
প্রথমেই দেখা যাক প্রথম ভাগের ৪.১ অনুচ্ছেদ, যে ৪.১ অনুচ্ছেদ নিয়ে এত কথাবার্তা- সেটাতে আসলে তেমন কিছুই নেই। শিরোনামটাই কেবল "নারীর প্রতি বৈষম্য বিলোপ সনদ"! ভেতরে আছে- সিডও সনদে বাংলাদেশ কবে কিভাবে স্বাক্ষর করেছে। ফলাও করে বলা হয়েছে- বাংলাদেশ সিডও সনদে প্রথম দশ স্বাক্ষরকারী দেশের একটা। তো- সেই স্বাক্ষরও বাংলাদেশ করেছে প্রায় এক যুগ আগে। তো? বৈষম্য কি আদৌ দূর হয়েছে? ৪.১ নং অনুচ্ছেদটি তাহলে পড়া যাক:

৪.১ নারীর প্রতি বৈষম্য বিলোপ সনদ : "রাষ্ট্র, অর্থনীতি, পরিবার ও সমাজ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য দূরীকরণের লক্ষ্যে ডিসেম্বর, ১৯৭৯ সালে জাতিসংঘে নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডও) গৃহীত হয় এবং ৩ সেপ্টম্বর ১৯৮১ সালে কার্যকর হয়। নারীর জন্য আন্তর্জাতিক বিল অব রাইটস বলে চিহ্নিত এ দলিল নারী অধিকার সংরক্ষণের একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ মানদণ্ড বলে বিবেচিত। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ চারটি ধারায় [২, ১৩(ক), ১৬(ক) ও ১৬(চ)] সংরক্ষণ সহ এ সনদ অনুসমর্থন করে। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে ধারা ১৩(ক) এবং ১৬.১(চ) থেকে সংরক্ষণ প্রত্যাহার করা হয়। এই সনদে অনুস্বাক্ষরকারী রাষ্ট্ররূপে বাংলাদেশ প্রতি চার বছর অন্তর জাতিসংঘে রিপোর্ট পেশ করে। সর্বশেষ ষষ্ঠ ও সপ্তম পিরিয়ডিক রিপোর্ট ডিসেম্বর, ২০০৯ সালে জাতিসংঘে প্রেরণ করা হয় ও ২৫ জানুয়ারি ২০১১ তে সিডও কমিটিতে বাংলাদেশ সরকার রিপোর্টটি উপস্থাপন করে।

আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে প্রায় সকল ফোরামে বাংলাদেশ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ ও আন্তর্জাতিক সনদ ও দলিলসমূহে স্বাক্ষরের মাধ্যমে নারী উন্নয়নে বিশ্ব ভাবধারার সাথে সম্পৃক্ত হয়েছে। ২০০০ সালে অনুষ্ঠিত মিলেনিয়াম সামিটের অধিবেশনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জনে বাংলাদেশ অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। একই সময় Optional Protocol on CEDAW-তে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করে। গুরুত্বপূর্ণ এই সনদে স্বাক্ষরকারী প্রথম ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এছাড়াও আঞ্চলিক পর্যায়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সনদে বাংলাদেশ স্বাক্ষরকারী ও অনুসমর্থনকারী রাষ্ট্র হিসেবে নারী উন্নয়নের ক্ষেত্রে বহুমুখী ব্যবস্থা গ্রহণে নিজ অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে।"

অর্থাৎ ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ চারটি ধারায় [২, ১৩(ক), ১৬(ক) ও ১৬(চ)] সংরক্ষণ সহ এ সনদ অনুসমর্থন করে- পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে যার মধ্যে ধারা ১৩(ক) এবং ১৬.১(চ) থেকে সংরক্ষণ প্রত্যাহার করা হয়। তার মানে, ধারা ২ এবং ধারা ১৬ (ক) থেকে এখনও সংরক্ষণ প্রত্যাহার করা হয় নি! ধারা ২ ও ধারা ১৬ (ক) এ সংরক্ষণ রাখার কারণ এগুলো নাকি কোরআন-সুন্নাহর পরিপন্থী!

তাহলে শুরুতে ধারা ২ এবং ধারা ১৬ (ক) -ই দেখা যাক:

ধারা ২: Article 2
States Parties condemn discrimination against women in all its forms, agree to pursue by all appropriate means and without delay a policy of eliminating discrimination against women and, to this end, undertake:

(a) To embody the principle of the equality of men and women in their national constitutions or other appropriate legislation if not yet incorporated therein and to ensure, through law and other appropriate means, the practical realization of this principle;

(b) To adopt appropriate legislative and other measures, including sanctions where appropriate, prohibiting all discrimination against women;

(c) To establish legal protection of the rights of women on an equal basis with men and to ensure through competent national tribunals and other public institutions the effective protection of women against any act of discrimination;

(d) To refrain from engaging in any act or practice of discrimination against women and to ensure that public authorities and institutions shall act in conformity with this obligation;

(e) To take all appropriate measures to eliminate discrimination against women by any person, organization or enterprise;

(f) To take all appropriate measures, including legislation, to modify or abolish existing laws, regulations, customs and practices which constitute discrimination against women;

(g) To repeal all national penal provisions which constitute discrimination against women.

ধারা ১৬ (ক): Article 16
1. States Parties shall take all appropriate measures to eliminate discrimination against women in all matters relating to marriage and family relations and in particular shall ensure, on a basis of equality of men and women:
(a) The same right to enter into marriage;

(সূত্র: Click This Link)

সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে- ধারা ২ হচ্ছে পুরা সিডও সনদের একদম Policy Measures – যাকে বলা যায় সিডও সনদের প্রাণ তথা মূলনীতি। একে বাদ দিয়ে সিডও সনদে স্বাক্ষর করা (১ম ১০ স্বাক্ষরকারী দেশের অন্যতম হওয়া) আমার কাছে রেইনকোট পরে বৃষ্টিতে গোসল করার মতই মনে হয়েছে, কিংবা বলা যেতে পারে- মক্কায় হজ্জে যামু মাগার নামাজ পড়ুম না- এই টাইপের!!! এবং ১৬ নং ধারাটি হচ্ছে বিবাহ ও বিবাহ বিচ্ছেদ সংক্রান্ত খুবই গুরুত্বপূর্ণ নীতি, শুধু এক লাইন: "বিবাহে আবদ্ধ হওয়ার জন্য নারী ও পুরুষের একই অধিকার"- এটাও বাদ দিয়ে স্বাক্ষর করা হয়েছে কেবল এই অযুহাতে তা কোরআন-সুন্নাহর পরিপন্থী হবে!!!! এবং এই জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১ এ কোথায় বলা হয় নি যে- ধারা ২ ও ধারা ১১ থেকে সংরক্ষণ তুলে নেয়া হবে!

ফলে, এবার আমাকে বলুন- সিডও সনদ ও কোরআন-সুন্নাহ পরষ্পর পরিপন্থী হতে পারে, কিন্তু সিডও সনদে বাংলাদেশের স্বাক্ষর ও কোরআন-সুন্নাহ কি সাংঘর্ষিক? কিংবা নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১ ও কোরআন-সুন্নাহ? যতই- এই নারী নীতি ২০১১ এর ১৭.২ ধারায় বলা হোক না কেন: "নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ (CEDAW) এর প্রচার ও বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা।"- এটা দ্বারা ধারা ২ ও ১৬ (ক) বাদ দিয়েই কেবল CEDAW এর প্রচার ও বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে!

৪.১ অনুচ্ছেদের পরেই আছে ৫ নং ধারা: নারীর মানবাধিকার ও সংবিধান। সেখানে সংবিধানের ২৭, ২৮(১), ২৮(২), ২৮(৩), ২৮(৪), ২৯(১), ২৯(২) ও ৬৫ (৩) অনুচ্ছেদ তুলে ধরা হয়েছে। "কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না" (২৮/১) বা "কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ নারী পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে জনসাধারণের কোন বিনোদন বা বিশ্রামের স্থানে প্রবেশের কিংবা কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিষয়ে কোন নাগরিককে কোনরূপ অক্ষমতা, বাধ্যবাধকতা, বাধা বা শর্তের অধীন করা যাইবে না" (২৮/৩) বা "নারী বা শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন হইতে এই অনুচ্ছেদের কোন কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না" (২৮/৪) বা "প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে" (২৯/১) কিংবা "কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ নারীপুরুষ ভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিক প্রজাতন্ত্রের কর্মের নিয়োগ বা পদলাভের অযোগ্য হইবেন না কিংবা সেই ক্ষেত্রে তাঁহার প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাইবে না" (২৯/২) নারী নীতির ৫ নং ধারায় সংবিধানের এইসব অনুচ্ছেদ পড়তে কতই না ভালো লাগে- অনেক সময় এমনও মনে হতে পারে- এ বুঝি ১মবারের মত এই নারী নীতিরই আবিস্কার! বাস্তবে উল্লসিত হওয়ার মত কিছু নেই। এসমস্ত অনুচ্ছেদই ১৯৭২ সালে লিখিত (৬৫/৩ ব্যতীত)। বাস্তবে আমাদের সংবিধানটাই হচ্ছে স্ববিরোধিতায় ভরপুর- সংবিধানের উপরিউক্ত অনুচ্ছেদগুলো বলবদ থাকলে কোন প্রকারেই সংবিধান স্বীকৃত ব্যক্তিগত পারিবারিক উত্তরাধিকার আইন ১৯২৫, পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ ১৯৮৫ ও সংশোধনী ১৯৮৯, বিবাহ সংক্রান্ত আইন প্রভৃতি কোন প্রকারেই টিকার কথা নয়। অথচ- উত্তরাধিকার বন্টনের ক্ষেত্রে ইউনিভার্সল ফ্যামিলি কোড আইনের পরিবর্তে মুসলিম পারিবারিক আইন (পুত্র কন্যার দ্বিগুন পাবে), হিন্দু আইন (বৌদ্ধদের জন্যও একই: আরো বর্বর- কন্যা সন্তান কিছুই পাবে না) প্রভৃতি এখনো চলছে- মুসলিম বিবাহ আইন, হিন্দু বিবাহ আইন প্রভৃতিও চলছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে- সাক্ষ্য আইন ১৯৭২ ও চুক্তি আইন ১৯৭২ দ্বারা সাক্ষ্য হিসাবে বা চুক্তিসম্পাদনকারী হিসাবে নারী ও পুরুষ সমান হিসাবে বিবেচিত হলেও- মুসলিম বিবাহ আইন অনুযায়ী বিয়ের সাক্ষ্য হিসাবে ১জন পুরুষ সমান ২ জন নারীই কেবল নয়, ২ জন পুরুষের ক্ষেত্রে ৪ জন নারী থাকলেও চলবে না- কমপক্ষে ১ জন পুরুষ থাকতেই হবে!!!! (২ জন পুরুষ সাক্ষ্য থাকলে নারী সাক্ষ্যের কোন দরকার নেই!!)

যাহোক, যেটা বলছিলাম- খুব ভালোভাবেই দেখা যাচ্ছে যে-নারী নীতিতে উল্লেখিত সংবিধানের অনুচ্ছেদগুলো প্রায় সবই ১৯৭২ সালে রচিত হলেও সেগুলো ৪১ বছর ধরে কেবল কথার কথা হিসাবে রয়ে গিয়েছে- কেননা- এই সংবিধান অনুযায়ীই মুসলিম-হিন্দু-খৃস্টান বিবাহ আইন, উত্তরাধিকার আইন এগুলো আমাদের দেশের প্রচলিত আইন। সুতরাং- এই সব প্রচলিত আইন রদের বিষয়ে কোন সুপারিশ না রেখে- কেবল ঐসবের উল্লেখ শুভংকরের ফাঁকি ছাড়া কিছুই না। আলবৎ এগুলো ধোঁকাবাজি। নারী উন্নয়ন নীতির ২য় ভাগ দেখুন। এখানে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতির লক্ষ্য(১৬) হিসাবে প্রথমেই বলা হয়েছে: ১৬.১ "বাংলাদেশ সংবিধানের আলোকে রাষ্ট্রীয় ও গণজীবনের সকল ক্ষেত্রে নারী পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।" বর্তমানের আমাদের স্ববিরোধী সংবিধানের আলোকে আপনারাই বলেন- কতটুকু সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব?

এবারে আসি ২য় অধ্যায়ে। এই অধ্যায়কে বলতে পারেন- নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১ এর মূল পদক্ষেপ/ নীতি / লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। এসবের মাঝে অনেক ধারাই দেখা যাবে ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে আইন পর্যন্ত আছে কিংবা সব সরকারের কর্তাব্যক্তিরা মুখে হলেও নীতিগত সমর্থন জানিয়েছেন – কিন্তু আদতে সেগুলোর বাস্তবায়ন কতটা হচ্ছে তা দেখার ফুসরত কখনো কারো হয় নি (যেমন: নারী সমাজকে দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্ত করা, নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা, নারী সমাজকে দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্ত করা, নারী পুরুষের বিদ্যমান বৈষম্য নিরসন করা, নারী ও কন্যা শিশুর প্রতি সকল প্রকার নির্যাতন দূর করা, নারী ও কন্যা শিশুর প্রতি বৈষম্য দূর করা ইত্যাদি)। ফলে, এসব ধারা বা লক্ষ্য কিভাবে বাস্তবায়িত হতে পারে তা উল্লেখ না থাকলে যথারীতি একটা অনাস্থা তৈরি হয়ে যায়, কেননা এসব সুন্দর সুন্দর কথা আমাদের সেই কোন আমল থেকেই শোনানো হয়েছে এবং এখনো শুনছি কার্যত উপর উপর ও লোকদেখানো কিছু কর্মকান্ড ছাড়া কোন পদক্ষেপই চোখে পড়েনি কখনো।

নারীর মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ লক্ষ্য শীর্ষক অনুচ্ছেদের ১৭.৫ নং লক্ষ্য তথা নীতিটি দেখি: "স্থানীয় বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কোন ধর্মের কোন অনুশাসনের ভুল ব্যাখ্যার ভিত্তিতে নারী স্বার্থের পরিপন্থী এবং প্রচলিত আইন বিরোধী কোন বক্তব্য প্রদান বা অনুরূপ কাজ বা উদ্যোগ গ্রহণ না করা।" পড়ে অবাক হই এবং ভাবি- কেন আমিনী গং এই নারী নীতির বিরুদ্ধে এত চেচামেচি করছে? হাইকোর্ট পর্যন্ত যে ফতোয়ার বিরুদ্ধে রায় দিয়ে বসেছে (এবং আপিল বিভাগের রায়ের অপেক্ষায় আছে)- এই নারী নীতি ২০১১ ফতোয়াকে নিষিদ্ধ করার সাহস ধারণ করে না। বরং ফতোয়াকে একভাবে জায়েজ করে দেয়া হয়েছে এখানে। উল্লেখিত ১৭.৫ নং নীতি একটু ভালো করে পড়লেই আশা করি বুঝতে পারবেন। "কোন ধর্মের কোন অনুশাসনের ভুল ব্যাখ্যার ভিত্তিতে" নারী স্বার্থের পরিপন্থী এবং প্রচলিত আইন বিরোধী কোন বক্তব্য প্রদান বা অনুরূপ কাজ বা উদ্যোগ গ্রহণ করা যাবে না। খেয়াল করবেন কিন্তু। কোন ধর্মের কোন অনুশাসনের ভুল ব্যাখ্যার ভিত্তিতে নারী স্বার্থের পরিপন্থী কাজ করা যাবে না- এই বাক্যটি দ্বারা আসলে কি বুঝায়? ধর্মীয় অনুশাসনের সঠিক ব্যাখ্যার ভিত্তিতে নারী স্বার্থের পরিপন্থী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে তাহলে? নাকি- এই নীতিমালা প্রণেতারা মনে করেন যে- ধর্মীয় অনুশাসনের সঠিক মোতাবেক যে ব্যবস্থাই নেয়া হোক না কেন- তা-ই হয়ে যাবে নারীর স্বার্থানুযায়ী?


সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে- এই জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১ প্রকাশের পর সবচেয়ে বেশী আলোচনা হয়েছে পারিবারিক উত্তরাধিকার আইন নিয়ে। আমিনী ও তাবৎ মোল্লা থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরে পুরুষেরা হায় হায় করে উঠেছে সম্পত্তির উত্তরাধিকার বন্টন বিষয়ে, ভয়ে চিৎকার করে উঠেছে- এবং কোনমতেই যাতে পৈত্রিক সম্পত্তিতে নারী পুরুষের সমান ভাগ না পায় সে ব্যাপারে উচ্চকিত থেকেছে! বিভিন্ন জায়গায় এর পক্ষে-বিপক্ষে ডিবেট হয়েছে। আমার মাও একদিন তার অফিস থেকে হতাশ হয়ে এসে বললেন- শিক্ষিত মানুষেরাও (আমি সংশোধন করে দিয়েছিলাম- “বলো- পুরুষেরা”) যদি না বুঝে- আজে বাজে যুক্তি করতে থাকে- তাহলে কেমন করে হবে! (কয়েকটা মজার যুক্তির কথা মা বললো- “মেয়ের বিয়েতে প্রচুর খরচ করতে হয়”!! “মেয়ে তো বিয়ের পরে চলে যায়”!! “মেয়ের তো লস হচ্ছে না- তার স্বামীতো আবার ঠিকই দ্বিগুন সম্পত্তিই আনছেই” … ইত্যাদি)

এমন যুক্তি-তর্কের ঝড়, অথচ জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১ তন্ন তন্ন করে খুঁজেও আমি উত্তরাধিকার ও সমানাধিকার একসাথে কোন জায়গাতেই পেলাম না। অবাক ব্যাপার তাই না? একদল আওয়ামীলীগ কোরআন-সুন্নাহ বিরোধী কাজ করে ফেললো বলে জিগির তুলছে আর অন্যদিকে আমার মা ও অনেকেই আওয়ামিলীগকে- হাসিনাকে প্রগতিশীল ভেবে গদগদ হয়ে যাচ্ছে! এই মিথ্যাপ্রচারণাটা চালালো কে? হাসিনাদের বক্তব্য অনুসারে আমিনী গং!

নারী নীতি ২০১১ খুঁজে নীচের ধারাগুলো পেলাম- যেগুলোর দেখে অনেকে এমন মনে করতে পারে যে- উত্তরাধিকারে সমান অধিকার দেয়া হচ্ছে:

"২৩.৫ সম্পদ, কর্মসংস্থান, বাজার ও ব্যবসায় নারীকে সমান সুযোগ ও অংশীদারিত্ব দেয়া। ২৫.২ উপার্জন, উত্তরাধিকার, ঋণ, ভূমি এবং বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের ক্ষেত্রে নারীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রদান করা।"

মজার ব্যাপার হচ্ছে- ২৩.৫ এর সম্পদ মানে কেবল উত্তরাধিকার বুঝায় না। রাষ্ট্রীয়/পাবলিক সম্পদ তথা সুযোগ-সুবিধা বেশী প্রযোজ্য এখানে। ফলে, নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে এসব ক্ষেত্রে। আর, ২৫.২ ধারাটিতে উত্তরাধিকার শব্দটি উল্লেখ করা হলেও সমান অধিকার শব্দটি সেখানে নেই- আছে নারীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। অর্থাৎ উত্তরাধিকার বন্টন কেমন করে হবে- সে বিষয়ে কোন কথা নেই, আছে- তা যেমনেই বন্টন করা হোক না কেনে- বন্টিত উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের অধিকার থাকবে নারীর!! এটা আসলে, একরকম ধাপ্পাবাজিই- এমনভাবে ভাষায় প্রকাশ করেছে যে হঠাতই মনে হবে- কতই না প্রগতিশীল- ভালো করে তাকালে বুঝা যায়- পুরাটাই ঠনঠন!!

আর সে কারণেই- শুরুতে আওয়ামিলীগ সুশীল সমাজের উদ্দেশ্য প্রচার করলো- তারা কত প্রগতিশীল- নারীদের সমান অধিকার দেয়ার জন্য নারী উন্নয়ন নীতিমালা করেছে, নারীদের প্রতি সমস্ত বৈষম্য তারা দূর করে ফেলছে ইত্যাদি ইত্যাদি। আর, যখনই আমিনীরা একটু নড়েচড়ে বসলো- তখন সমস্বরে সমস্ত আওয়ামিলীগাররা বলা আরম্ভ করে দিলো যে- “এতে কোরআন-সুন্নাহর পরিপন্থী কিছু নাই, নীতিমালা পড়ে আসেন – ওপেন চ্যালেঞ্জ- একটাও নীতি বের করতে পারবেন যেটা কোরআন-সুন্নাহ পরিপন্থী” ইত্যাদি।

হরতালের আগের দিন তো ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে সমস্ত দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি আকারে ছাপানো হলো যে- আমিনী গং দের সমস্ত দাবীই মিথ্যা (Click This Link)।

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য নিয়ে বলার কিছু নেই- নারী নীতি ২০১১ পড়ার পরেই মনে হয়েছে- এগুলোর আসল অর্থ কি। এই বিজ্ঞপ্তিতে দেখার মতো বিষয়টা হচ্ছে- বিসমিল্লাহ আর আসসালামের ছড়াছড়ি! বুঝেন তাইলে- এই হইলো আমাদের সেক্যুলার(!) আওয়ামিলীগের চেহারা! আসলে, তশবী হাতে ফটুক লাগায়া দেশবাসীর ভোট চায় যে দল- ভোটে জেতার জন্য খেলাফত মজলিশের মত দলের সাথে যারা সমঝোতা করে- ফতোয়ার বিধানকে পর্যন্ত জায়েজ করতে কুন্ঠা বোধ করে না- তাদের সেক্যুলার প্রগতিশীল কেবল দলান্ধরাই বলতে পারে!

আমার যেটা মনে হয়েছে- নারীর অবস্থা যা ছিল তাই থাকবে। এটা কেবল বিদেশী দাতাগোষ্ঠীকে আকর্ষণ করার একটা কৌশল মাত্র। এনজিওগুলোরও কিছু চাপ থাকতে পারে। উদ্দেশ্য যাই থাক- ফলাফল আমার মনে হয়েছে খুব নেতিবাচক। নারীর প্রকৃত উন্নয়ন চাইলে, নারীর সমান অধিকার চাইলে, নারীর প্রতি বৈষম্য বিলোপ চাইলে সবার আগে দরকার নারীকে পরিপূর্ণ মানুষ হিসাবে বিবেচনা করা - এটা কেবল তখনই সম্ভব যখন পুরুষতান্ত্রিক কুসংস্কার দূর করা যাবে, এই পুরুষতান্ত্রিক কুসংস্কার যেহেতু পুরুষদের তৈরী ধর্মসমূহের লালন-পালনে-আশ্রয়ে পরিপুষ্ট হয়, সেহেতু নারীর সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি পুরুষতান্ত্রিক ধর্মসমূহের সাথে সাংঘার্ষিক, কোরআন-সুন্নাহ, বেদ-বেদান্ত, বাইবেল-তাওরাত প্রভৃতির নারী বিরোধী বক্তব্য/ অনুশাসনের বিরুদ্ধে দাড়িয়েই তা আদায় করতে হবে। হাসিনা ও তার আওয়ামিলীগ যে নারী নীতি ২০১১ প্রণয়ন করেছে- সেখানে এই প্রয়োজনীয় কাজটি সুচারুভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে এই যে, আমাদের পুরাতন অর্জনগুলো এমনভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এসব এই নারী নীতিতেই প্রথম আমদানী করা হয়েছে এবং আমিনী গংদের কোরআন-সুন্নাহ গেল গেল রবের মুখে শাসক গোষ্ঠীর সমস্বরে কোরআন-সুন্নাহ আছে আছে বলে জবাবে, আমাদের নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন নৈতিক ভাবে কিছুটা হলেও দুর্বল হলো- কেননা চারিদিকে কেবল এটাই প্রচারিত হলো- কোরআন-সুন্নাহ'র বিপরীত কিছু করা যাবে না এবং করা হয় নি।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29369456 http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29369456 2011-04-26 02:06:25
জন্ম ও মৃত্যুর আগে-পরে আপনি জম্মের আগে কোথায় ছিলেন?
আমি জন্মের আগে ছিলামই না। মানে, ধরেন- আপনি কাগজ দিয়ে একটা নৌকা বানালেন। নৌকাটা বানানোর আগে ঐ নৌকা কোথায় ছিলো? জবাব হচ্ছে- নৌকাটা আদতে ছিলো না। কিন্তু এটাও ঠিক- শুণ্য থেকে তো নৌকার পয়দা হয়নি- ফলে পয়দার আগে নৌকাটা না থাকলেও কিছু একটা ছিল। কি ছিল? ছিল কাগজ। নৌকা তৈরির উপাদান। তেমনি, আমার জন্মের পূর্বে ছিল- আমার বাপ আর মা- শুক্রাণু আর ডিম্বাণু। তাদের মিলনে ভ্রূণ- সেখান থেকে আমার জন্ম। আমার জন্মের পর থেকেই তো আমার থাকা- তার আগে আমার জন্মের উপাদানগুলো থাকতে পারে- আমি কেমনে থাকি?

বা ধরেন- আমি পয়দা হওয়ার সময় এতটুকুন ছিলাম- সেই আমি এখন কি বিশাল বপু। নিশ্চয়ই আমার শরীরে গোস্ত-হাড্ডি বেড়েছে- মানে কোষ বেড়েছে। সেটা কোথা থেকে এসেছে? আমি যে খাবার খাই- সেখান থেকে, যে অক্সিজেন নেই সেখান থেকে। ধরেন একটা কলা খেলাম। ঐ কলাটা পরিপাক হয়ে- গ্লুকোজ টাইপ কনিকা হয়ে রক্তের সাথে কোষে গিয়ে মাইটোকন্ড্রিয়ায় অক্সিজেনের সাথে পুড়ে শক্তি হয়ে- দ্বিভাজনে যখন নতুন কোষে পরিণত হচ্ছে- তখন সেটা কোষই- কলা নয়, একই ভাবে ঐ কোষ তৈরি হওয়ার আগে কোষটা কোথায় ছিল বললে বড়জোর বলতে পারেন সেটার উপাদান ঐ কলায় ছিল।

আপনি মৃত্যুর পরে কোথায় যাবেন?
মৃত্যু মানে আমার শেষ। ফলে- কোথায় আর যেতে পারবো বলেন? কিন্তু আমার শরীরের উপাদানগুলোর কেমন কি হওয়ার সম্ভাবনা আছে- সেগুলো আন্দাজ করতে পারি। মরণোত্তর দেহ দানের পরিকল্পনা আছে- ভালোয় ভালোয় সেটা এবং মৃত্যুটা সম্পন্ন হলে- গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো (কর্ণিয়া- কিডনি ইত্যাদি) আরেকজন জীবিত মানুষের শরীরে বেঁচে থাকবে (সেগুলোকে নিশ্চয়ই আমার কর্নিয়া বা কিডনি বলা যাবে না, সেগুলো তখন ঐ জীবিত মানুষেরই কিডনি-কর্নিয়া), আর বাকি পুরা শরীর হয়তো কোন মেডিকেলের স্টুডেন্টদের জ্ঞানের খোরাক হবে কিংবা হাড়-হাড্ডিগুলো কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহৃত হবে। আর, মৃত্যুটা যদি কিম্ভুত হয়- তাহলে দেহপোকরণের পরিণতিও ভিন্ন হতে পারে। হয়তো পরিবেশে মিশে যাবে।

আপনার সৃষ্টি কর্তা কে? প্রশ্নটির উত্তর যদি কেউ না হয় তাহলে আপনি এলেন কোত্থেকে?
কোন কর্তার প্রয়োজন দেখি না। আমার জন্ম একান্তই প্রাকৃতিক এবং এটাকে বলতে পারেন আকস্মিক কিছু ঘটনা পরম্পরার ফল। আমার বাবা আর মা এর শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলন থেকে আমি এসেছি- এটাই ফ্যাক্ট, আমার বাবা-মা মিলিত না হলে সৃষ্টিকর্তা বা কোন কর্তারই হাজার কান্না-কাটিতেও কোন ফল হতো না- অর্থাৎ আমার জন্ম হতো না। আকস্মিক বলছি এ কারণে যে- আমার বাবা-মা ভিন্ন নারী বা নরকে বিয়ে করতে পারতেন- তাহলে- তাদের মিলনে যে জন্মাতো আর যেই হোক সে তো আর আমি হতাম না (আর, দুজনে বা দুজনের যেকোনজন চিরকুমার থাকার সিদ্ধান্ত নিলে তো কথাই ছিল না)। বা, বাবা-মা যে সময়ে মিলিত হয়েছেন- সেটা অন্য সময়ে হলে হয়তো অন্য এক সেট শুক্রাণু-ডিম্বাণু কম্পিটিশনে নামতো, কিংবা যে শুক্রাণুটা ডিম্বাণুকে জয় করে আমার আদি ভ্রূণটা তৈরি করলো, সামান্য এদিক ওদিকে তার বদলে অন্য আরেকটি শুক্রাণুও ডিম্বাণুকে জয় করতে পারতো ... ইত্যাদি, আর এগুলোর কোন একটি হয়ে থাকলে সৃষ্টিকর্তা যতই পরিকল্পনা করে থাকুন না কেন- আমার জন্ম তো আর হতো না (আরেকজন জন্মাতো)। ফলে, এত আকস্মিকতার মাঝে ও অনিশ্চয়তার মাঝে সৃষ্টিকর্তার কোথায় কি যে করণীয় ছিল- সেটা বুঝা ভার!

(# নাগরিকব্লগের কমেন্টের জবাব এখানে স্বতন্ত্র পোস্ট হিসাবেই দিলাম। তাৎক্ষণিকভাবে ও সংক্ষেপে লেখা। এই পোস্টেই আপনারা আরো সুন্দর করে জবাব দিতে পারেন - তাহলে পোস্টখানি আরো সমৃদ্ধ হবে। সবাইকে ধন্যবাদ।)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29330849 http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29330849 2011-02-20 20:26:30
নাস্তিকের ধর্মকথা :: আমি নাস্তিক। আমার ধর্মকথন তথা একজন নাস্তিকের ধর্ম সম্পর্কিত কথাবার্তা তুলে ধরাই আমার উদ্দেশ্য।
:: কি আপনার ধর্ম?
:: মানবধর্ম এবং নাস্তিক্যবাদ।
:: আপনি মানবজাতির জন্য কি কাজ করেছেন?
:: কিছুই না। বলার মত আসলেই কিছু পাচ্ছি না।
:: আপনার ধর্ম বলছেন মানবধর্ম, আর মানবজাতির জন্য কিছুই করেন নি? আপনাকে বুঝা হয়ে গেছে! কাজের বেলায় ঠনঠন !!
:: হা হা। আসলে 'মানবতাবাদ/হিউম্যানিটি আমার ধর্ম'- এটা আমি একটু অন্যভাবে বুঝি- দর্শনগত দিক থেকে বিষয়টা দেখলে বুঝানোটা সহজ হবে। আমি কি একটা উদাহরণ দেব?
:: কি বলবেন জানি।
:: ও, তাহলে থাক।
:: না বলেন।
:: মানবসমাজে ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়ের একটা ধারণা আছে। প্রচলিত ধর্মগুলো নিজ নিজ ব্যাখ্যা অনুযায়ি স্ব স্ব ধারণা গড়ে তুলে এবং বিভিন্ন ধর্মে এই ধারণার মিল ও অমিলও পাওয়া যায়। প্রচলিত প্রধান ধর্মগুলোর ক্ষেত্রে এই ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়ের ধারণার মূলে আছে কোন অশরীরি একজনের নির্দেশ বা পবিত্র ও ঐশী দাবিকৃত কোন এক ধর্মগ্রন্থের দেখানো পথ বা পরলোকের ভয়/চিন্তা কিংবা কোন এক বা একাধিক মহাপুরুষ/নবী/ঋষীর আদেশ-উপদেশ। ফলে, এই ধারণা বড় বেশী স্থবির - স্ট্যাটিক। দেশ-কাল-পাত্র-পরিস্থিতি সেখানে গৌন, মানুষকে নিয়ে এই সমস্ত আদেশ-উপদেশ-নির্দেশ উত্থাপিত হলেও মানুষও যেন সেখানে গৌন; মূল হচ্ছে অশরীরি সেই একজন বা বহুজন, পবিত্র ও ঐশী দাবিকৃত সেই গ্রন্থ কিংবা কোন যুগ/আমলের এক বা একাধিক সেই মহাপুরুষ। আপরদিকে আমার ধর্ম যখন বলছি মানবধর্ম বা হিউম্যানিটি, তখন বুঝাতে চাচ্ছি আমার কাছে সবকিছু বিচারের মানদন্ড হচ্ছে এই মানবজাতি- সমগ্র মানবসমাজ, যার দেশ-কাল-পাত্র ভেদে বৈচিত্র আছে এবং যা নিয়ত প্রবাহমান ও গতিশীল। সুতরাং আমার ক্ষেত্রে ভালো-মন্দের ধারণাটাও স্ট্যাটিক তো নয়ই, প্রচন্ড গতিশীল। কোন কাল্পনিক সত্ত্বা বা বিশেষ কোন গ্রন্থ যা একান্তই কাগজের তৈরি ও ব্যক্তি বিশেষের লিখিত কিংবা কোন সে কালের এক বা একাধিক রক্তমাংসের মানুষের উপর যুগ যুগ ধরে ও সর্বভূতে অর্থহীন এবং অন্ধ নির্ভরতার কোন স্থান এই মানবধর্মে নেই।
:: 'ধর্ম' শব্দটার মানে কি- সেটা আপনি জানেন?
:: আমার মত করে আমি জানি বৈকি, এবং এটাও মানি যে সেটা আপনার মত করে না-ও মিলতে পারে।
:: বলেন।
:: ধর্ম মানে কি এটা নানাভাবেই বলা যেতে পারে, বিভিন্ন আঙ্গিক থেকে এই শব্দটাকে দেখা যেতে পারে, কেননা বাংলা 'ধর্ম' শব্দটি কিছুটা ব্যাপক। রিলিজিওন, ন্যাচার, ক্যারাক্টারিস্টিকস সবগুলোই কিন্তু ধর্ম। আমার মত করে ধর্মের সংজ্ঞায়নের চেস্টা করে দেখি।
:: ধন্যবাদ। চেস্টা করেন।
:: সাদামাটাভাবে বললে বলা যায়, কোন কিছুর সাধারণ ও বিশেষ বৈশিষ্ট্য তথা গুনাগুনকে তার ধর্ম বলা যায়। যেমন হাইড্রোজেন একটা গ্যাস, এটা বাতাস অপেক্ষা হালকা, এটা পুড়ালে পানি উৎপন্ন হয় .. ইত্যাদি হচ্ছে হাইড্রোজেনের ধর্ম। একইভাবে মানুষের ধর্ম হচ্ছে হিউম্যানিটি। একজন মানুষকে চেনা যাবে তার মানবধর্ম বা হিউম্যানিটি দিয়ে, যেমন করে হাইড্রোজেন বা লোহাকে চেনা যায় হাইড্রোজেন বা লোহার ধর্ম দিয়ে। তবে, বাংলায় মানুষ শব্দটাও ব্যাপক। ম্যান আর হিউম্যান এক না। দুই হাত, দুই পা থাকা, সোজা হয়ে হাটতে পারাটাই কিন্তু হিউম্যানিটি না, বড়জোর সেটা হোমো স্যাপিয়েনসের বৈশিষ্ট বা ধর্ম হতে পারে। ম্যান যখন ম্যানকাইন্ডের অন্তর্গত- তখনই সে হিউম্যান। এই ম্যানকাইন্ড বা মানব সমাজের অন্তর্গত মানুষের ধর্মই হচ্ছে হিউম্যানিটি।
আবার, একজন নাস্তিক যে কারণে নাস্তিক- সেটাই তার নাস্তিক্য ধর্ম। নাস্তিক হচ্ছে ঈশ্বরে অবিশ্বাসী। ফলে, নাস্তিকের ধর্ম হচ্ছে তার এই অবিশ্বাস। কেন অবিশ্বাসী সেই যুক্তিবোধ, সেই চিন্তাচেতনা প্রসূত কথাবার্তাই হচ্ছে নাস্তিকের ধর্মকথা।
:: এসব তো আপনি বলছেন বৈশিষ্টের কথা। ইসলাম বা খ্রিস্ট ধর্মগুলোর কথা বলছি। মানে রিলিজিওন অর্থে ধর্ম। সেটা কি?
:: মুসলমানদের ধর্ম ইসলাম বা খ্রিস্টানদের খ্রিস্টধর্ম। মানে আসলে কি? একজন মুসলমান কেন মুসলমান? কারণ সে কিছু জিনিস বিশ্বাস করে, কিছু বিষয় মেনে চলে - পালন করে। এই জিনিসগুলো, বিষয়গুলোকে, বিশ্বাসগুলোকেই (যার কারণে তাকে মুসলমান বলা যায়) মুসলমানের ধর্ম তথা ইসলাম বলা হয়। অন্যান্য প্রচলিত ধর্মগুলোর ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায়। তাহলে, একইভাবে একজন নাস্তিক যে কারণে নাস্তিক, অর্থাৎ তার অবিশ্বাস, চিন্তা-চেতনা এগুলোই হচ্ছে তার ধর্ম। ইসলাম-খ্রিস্ট-জৈন প্রভৃতি যেমন একেকটা রিলিজিওনের নাম নির্দেশ করে, একইভাবে নাস্তিকদের বিশ্বাস-অবিশ্বাস, চিন্তা-চেতনাকে নাস্তিক্য ধর্ম হিসাবে বিবেচিত করা যায়।
যদিও রিলিজিওন/ধর্ম শব্দটা প্রচলিত ধর্মগুলোর জন্য এমনভাবে বহুল ব্যবহৃত এবং প্রচলিত ধর্মগুলো একেকটা এমনই কুসংস্কার-কুপমন্ডুকতার আধার যে- রিলিজিওন/ধর্ম শব্দটাই অনেকটা ঋণাত্মক বোধ তৈরি করে ফেলেছে, এবং অনেক নাস্তিকই এই শব্দটায় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। ধর্ম কি এর জবাবে তারা বলেন, তাদের কোন ধর্ম নেই, অর্থাৎ 'তোমরা যে অর্থে ও যে দৃষ্টিতে ধর্মকে বুঝো- সেইরকম কোন ধর্ম আমাদের নেই'।
:: তাহলে, আপনি কেন ধর্মকথা বলছেন।
:: আমার শব্দের প্রতি কোন বিদ্বেষ তো নেই। ফলে, আমি বলি না যে আমার কোন ধর্ম নেই। অবশ্যই আমার ধর্ম আছে- সেটা প্রচলিত ধর্মগুলো থেকে স্বতন্ত্র এবং আলাদা। আরেকটা কারণে অনেক নাস্তিক বন্ধুরা নিজেদের ধর্মহীন বলতে ভালোবাসেন, তা হচ্ছে- নাস্তিকরা নিজেদের গন্ডিবদ্ধ বা সীমাবদ্ধ ভাবতে ভালোবাসেন না, ধর্মীয় পরিচয় তাদের কাছে সীমাবদ্ধতারই নামান্তর। আমি তারপরেও ধর্মের কথা বলি, কারণ এর মাধ্যমেই অন্য ধর্মগুলো থেকে স্বাতন্ত্র্য তুলে ধরতে পারি। আইডেন্টিটি বা পরিচয় বহনেও আমার কোন এলার্জি নেই, বরং জরুরিই মনে করি। নাস্তিকরা স্থান-কাল-পাত্রের গন্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়- এই আইডেন্টিটি আমাদের দরকার।
:: আজকাল হিউম্যানিজম বা নাস্তিকতাকে ধর্ম হিসাবে বলাটা অনেকের কাছে ফ্যাশনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আপনিও যে সে গ্রুপের না কে জানে!
:: কেউ যদি বলে, নাস্তিকতা আমার ফ্যাশন- তবে আপত্তি করি না। বরং ফ্যাশন বলেন আর স্টাইলই বলেন- এই নাস্তিকতা আমায় এগিয়ে যাবার শক্তি যোগায়, মানুষ যে কোন রোবট বিশেষ নয় বা অদৃশ্য কারো খেলার কোন পুতুল নয় বা মনোরঞ্জনের সামগ্রী নয়- মানুষ নিজেই নিজের জীবনের বিধাতা- এমন আত্মবিশ্বাস আমার কাছে অমূল্য। ফলে, এহেন ফ্যাশনের জন্য আমি গর্ববোধই করি।
:: এমন গর্ব করা ভালো নয়। যে বিষয়ে আপনি সঠিকভাবে জানেন না- তা নিয়ে গর্ব করবেন কেন?
:: হা হা। যতটুকু জানি তার জন্য গর্ব, কারণ যতটুকু জানি না- তার জন্য নিরন্তর চেস্টা। অন্তত, হাল ছেড়ে দিয়ে বসে থাকাটা কাজের কিছু না বলেই মনে করি- সবকিছুর মূলে কাল্পনিক সত্ত্বার ভূমিকা নিয়ে আসাটাকে যে জানা বলে মনে করি না।
:: সবকিছুতেই আপনি বেশী তত্ত্বকথা নিয়ে আসছেন! ঘুম পেয়ে যাচ্ছে।
:: হা হা। আপনার প্রশ্নগুলো যে বড় বেশী তত্ত্বমূলক। শুরুতেই বলেছিলাম- আমার জবাব/ব্যাখ্যাগুলো হবে দর্শনগত দিক থেকে।
:: আজকে তাহলে থাক। শুভ রাত্রি।
:: বিদায়, ভালো থাকবেন।

(## ফেসবুক চ্যাটের কথপোকথনকে নিজের মত সাজিয়ে পোস্টখানি তৈরি করা হয়েছে
## একই সাথে মুক্তমনা, সামহোয়ারইনব্লগ, আমার ব্লগ ও নাগরিক ব্লগে প্রকাশিত)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29330067 http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29330067 2011-02-19 17:42:04
যুক্তি-তক্কো-গপ্পো -৩ (কোরআনের আলোকে মানব সৃষ্টি রহস্য) "i convert to islam after watching this video!", অর্থাৎ "এই ভিডিওটা দেখিয়া আমি মুসলমানে ধর্মান্তরিত হইছি"। আগ্রহ বোধ হওয়ায় সরাসরি ইউটিউবেই গেলাম এবং দেখি SPAINEURO2008 নিকের এক ভদ্রলোক ভিডিওটা আপলোড করেছেন এবং ক্যাপশনে লিখেছেন: "i was catholic christian and after watching this video i became muslim and converted in islam after one week"!

খুব আগ্রহ নিয়ে ভিডিও দেখা শুরু করি, হাজার হলেও ইসলাম হলো বাপ-মা, দাদা-নানার ধর্ম, ভিডিও দেখে আমার মতিগতি পাল্টানো যায় কি না, বাপমা - আত্মীয় স্বজন, বন্ধুবান্ধবেরা আমার ইহকাল-পরকালের চিন্তায় মেলা কষ্ট পান- সেই কষ্ট লাঘব হয় কি না, .. খুব আগ্রহ ও উৎসাহ নিয়েই ভিডিও খানা দেখা শেষ করলাম। দেখে মতিগতির কি হাল তা ধীরে ধীরে বলা যাবো, তবে শুরুতে এটুক বলি- বহুত মজা পেয়েছি। নির্ভেজাল মজা। ভিডিওটার বিষয় হলো কোরআনের আলোকে ভ্রূণতত্ত্ব বা মানব সৃষ্টি রহস্য এবং সেখানে এটাই প্রমান করা হয়েছে- আধুনিক বিজ্ঞানের জটিল জটিল সব বিষয় আশয় সেই ১৪০০ বছর আগে নাযিল কৃত কোরআনেই উল্লেখ করা হয়েছে। মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে আপনাদেরকেও ভিডিওটা দেখার আহবান জানাই।



এখানে দুটি ভিন্ন সুরার আয়াত উল্লেখ করা হয়েছে:
১। ৫৩:৪৫, ৪৬: that He created pairs- the male and the female; out of a drop of a sperm as it is poured forth.
আওয়ারহলিকোরআন অনুযায়ী অনুবাদ: "এবং তিনিই সৃষ্টি করেন যুগল-পুরুষ ও নারী। একবিন্দু বীর্য থেকে যখন স্খলিত করা হয়। "
২। ৯৬:১,২: Recite: In the name of Lord. Who created man from alaq.
আওয়ারহলিকোরআন অনুযায়ী ৯৬:২ এর অনুবাদ: "সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে।"

৫ মিনিট ৪৮ সেকেন্ডের ভিডিওচিত্রের ৩ মিনিট ৪০ সেকেন্ড ধরেই দেখানোর চেষ্টা করা হলো ৫৩: ৪৫, ৪৬ আয়াতের বৈজ্ঞানিক সত্যতা এবং বাহারি এনিমেশনের মাধ্যমে এমন একটা ভাব তৈরি করার চেষ্টা করা হলো যেন বা মনে হয়- কোরআন এমন এক গ্রন্থ যেখানে বিজ্ঞানের জটিল সব বিষয় আশয় উল্লেখ করা হয়েছে। তাশকি খাওয়ার মতোই অবস্থা। চলেন দেখি কেমন কি আলোচিত হয়েছে- কিভাবে কোরআনকে এক মহান অলৌকিক (!) বিজ্ঞানগ্রন্থ বানানো হয়েছে:

"that He created pairs- the male and the female; out of a drop of a sperm as it is poured forth"- আল্লাহ মানব-মানবীকে স্খলিত বীর্য/ শুক্রাণু থেকে সৃষ্টি করেছেন? ভিডিওটার "The Sex Of A Baby" শিরোনামে পর্বটিতে আজকের বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে যে আলোচনা করা হলো তা অনেকটা এমন: নারীর ডিম্বাণুতে থাকে X ও X ক্রোমোজোম - যেখানে পুরুষ থেকে আসে X - Y ক্রোমোজোম। নারী ও পুরুষ প্রত্যেকে থেকেই আসে একটি করে ক্রোমোজোম- ফলে নারীর কাছ থেকে আসা ক্রোমোজোমের ক্ষেত্রে কেবল X অপশন বিরাজমান- যেখানে পুরুষ থেকে আসতে পারে X অথবা Y। পুরুষের কাছ থেকে যদি আসে X, তবে সন্তান হবে কন্যা আর যদি ক্রোমোজোমটি হয় Y তবে সন্তান হবে পুত্র। অর্থাৎ সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারিত হচ্ছে বাবা তথা পুরুষের বীর্য/ শুক্রাণু দ্বারা। এহেন আলোচনা ও এনিমেশন ক্যারিকাচার দেখিয়ে দাবি করা হলো- কোরআনে নির্ভুলভাবে তাই বীর্য/ শুক্রাণুর কথা বলা হয়েছে!!

প্রথমবার দেখে একটু ধন্দে পড়ে গিয়েছিলাম! 'আল্লাহ মানুষকে বীর্য/শুক্রাণু থেকে সৃষ্টি করেছেন'- এই বক্তব্যের সাথে সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণ, X অথবা Y ক্রোমোজোম ... এসবের আলোচনা কেমন করে প্রাসঙ্গিক তাই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। তাই আরো কয়েকবার ভিডিওটা দেখায় বুঝতে পারলাম, সুরা ৫৩ এর ৪৬ নং আয়াতের আগে ৪৫ নং আয়াতে আছে: 'আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জোড়ায় মানে আল্লাহ মানব ও মানবীকে সৃষ্টি করেছেন', এবং তার পরেই আছে 'শুক্রাণু থেকে'। সেখান থেকেই এটা বুঝানোর চেস্টা করা হলো যে- এই দুটি আয়াতের মাধ্যমে সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণের বিষয়টাই আলোচিত হয়েছে। আসলেই কি তাই? যদি বা এটাও কোরআনের বক্তব্য হয়ে থাকে- তথাপি আধুনিক বিজ্ঞানের ইন্টারপ্রিটেশনটা এমনই? দেখা যাক। হ্যাঁ, আধুনিক বিজ্ঞান অনুযায়ী লিঙ্গ নির্ধারণের ক্ষেত্রে ২৩ জোড়া ক্রোমোজোমের মধ্যে এক জোড়া ক্রোমোজোমের ভূমিকা প্রধান এবং XX হলে নারী অথবা XY হলে পুরুষ। ডিম্বাণু ও শুক্রাণু নিষিক্তকরণের সময়ে মায়ের কাছ থেকে আসা X এর সাথে বাবার X বা Y এর যেটি মিলে ভ্রূণ তৈরি হয়- তার উপর নির্ভর করে সন্তানটি কন্যা বা পুত্র হবে তা। কিন্তু আরেক স্টেপ এগিয়ে বিজ্ঞানের নাম করে যে সিদ্ধান্তটা টানা হলো- অর্থাৎ সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণের বিষয়টি কেবল শুক্রাণুর উপর নির্ভরশীল, তা বিজ্ঞান অসম্মত হিসাবেই জানি। আজকের বিজ্ঞান বলে- সমান সমান ভূমিকা শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর। মানে লিঙ্গ নির্ধারণী ক্রোমোজোম জোড় এর একটি- মায়ের ডিম্বাণু থেকে এবং আরেকটি বাবার শুক্রাণু থেকেই আসে। কোন একটি ছাড়া ভ্রূণ তৈরিই সম্ভব নয়।

আরো মজার বিষয়, শুক্রাণু বা বীর্য থেকে অর্থাৎ আরবী নুতফাহ থেকে মানবের সৃষ্টির কথা কোরআনে আরো অনেক জায়গায় বলা হয়েছে (৭৫:৩৭, ১৬:৪, ৪০:৬৭, ২৩:১৩ .. ইত্যাদি) যেখানে নারী- পুরুষের বা লিঙ্গ নির্ধারণের কথা উল্লেখ ছাড়াই বলা হয়েছে। যেমন: ১৬-৪ আয়াতে বলা হয়েছে "তিনি মানবকে এক ফোটা বীর্য থেকে সৃষ্টি করেছেন।" (He creates man out of a [mere] drop of sperm- Translation by Asad)

অর্থাৎ, কোরআনে কেবল লিঙ্গ নির্ধারণ নয়- মানুষের সৃষ্টির কথাই বলা হয়েছে বীর্য/ শুক্রাণু থেকে। সে কারণে ৭৫: ৩৭ আয়াতে আল্লাহ মানুষের উদ্দেশ্যে বলেছেন: :সে কি স্খলিত বীর্য ছিল না?" (Was he not once a [mere] drop of sperm that had been spilt,- Translation by Asad). বিষয়টি তাহলে কি দাঁড়াচ্ছে? মানব জন্মের শুরুটা হচ্ছে বা উৎস হচ্ছে কেবলই শুক্রাণু??? ডিম্বাণুর ভূমিকা নেই?

ঐ ভিডিওতে এক জায়গায় বলা হলো- প্রাচীণকালে নাকি লোকে মনে করতো সন্তানের সেক্স নির্ধারিত মায়েদের দ্বারাই- এবং কোরআনই নাকি প্রথম এটা আবিষ্কার করে সবকিছুর মূলে বাবার কাছ থেকে আসা শুক্রাণু!! এটাও এক ধরণের ভুল তথ্য বা মিথ্যাচার। বস্তুত, খুব অল্পদিন হলো বিজ্ঞানের বদৌলতে মানুষ জানতে পেরেছে যে- সন্তান সৃষ্টিতে বাবা ও মায়ের সমান সমান ভূমিকা। তার আগ পর্যন্ত - এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এই ধারণাটাই প্রধান ছিল (এবং এখনো আছে) যে, বাবার বীর্য বা শুক্রাণুই মূল; মায়ের ভূমিকা কেবল মাতৃগর্ভে লালন পালন। নামকরণেই বুঝা যায়- শুক্রাণু নামটা হাল আমলের, সবসময়ই এটা পরিচিত বীর্য বা বীজ রূপে। সন্তানকে বলা হয়েছে ফসল এবং মাতৃগর্ভের তুলনা কেবল শস্যক্ষেত্র বা শুধু ক্ষেত্র হিসাবে। একটা গাছের জীবনচক্রে মাটি, পানি, বাতাস, আলো সবই খুব অপরিহার্য হলেও বীজ মানেই গাছ, চারা মানেই গাছ - মোটেও মাটি-পানি-বাতাস-আলো কোনটাকেই সেই গাছ বলা হবে না। বীর্য বা শুক্রাণু হচ্ছে সেইরকম বীজ, আর সেকারণেই আল্লাহ বলছেন:"Was he not once a [mere] drop of sperm that had been spilt"!! এবং বীজ বপনের পদ্ধতির ব্যাপারে আল্লাহ পুরুষদের অপার স্বাধীনতা দিয়ে জানাচ্ছেন: "তোমাদের স্ত্রীরা হলো তোমাদের জন্য শস্য ক্ষেত্র। তোমরা যেভাবে ইচ্ছা তাদেরকে ব্যবহার কর "(২: ২২৩)।

একইরকম কথা বার্তা ভগবতে, মনুসংহিতায় পাওয়া যাবে। মনুতে তো এককাঠি এগিয়ে জানান দেয়া হয়েছে- ক্ষেত্রের মালিকানা যার- ফসলের মালিকানাও হবে তার- অর্থাৎ পত্নীর গর্ভে যদি অন্য কোন পুরুষের বীজ বপন করা হয়- তাতে যে সন্তান হবে- সেটি হবে ঐ পত্নীর মালিক তথা পতির।

ফলে- কোরআনে যেটা বলা হয়েছে- সেটা নতুন কিছু নয়- যদিও তার আজকের ইন্টারপ্রিটেশনটা অভিনব। কেননা এই ধারণাটা এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে দীর্ঘকাল ধরেই চলে আসছে এবং এহেন ধারণার বা প্রচারণার জোরেই সন্তানেরা হয় বাবার সন্তান (নামকাওয়াস্তে মায়ের- মায়ের, কেবল লালন-পালন-আদর-স্নেহ পাওয়ার নিমিত্তে)- সর্বত্রই সন্তান পরিচিত হয় বাবার পরিচয়ে, সন্তানের বংশ মানে বাবার বংশ, সন্তানের শরীরে বাবারই রক্ত, সব সব কিছুই বাবার! যেমনটা বীজটা যদি হয় আমের তবে - সেখান থেকে যেটা ফলবে তা আমই- বড়জোর রাজশাহীর আম বা দিনাজপুরের আম বলে আপনি আলাদা করলে করতেও পারেন- তবে তার মূল পরিচয়টা তো শেষ পর্যন্ত আমই।

যাহোক- ইউটিউবের ভিডিও ছেড়ে এবার আরেকটু ভালো করে কোরআনে বর্ণিত ভ্রূণতত্তের দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক। কোরআনে মানব সৃষ্টি তথা ভ্রূণতত্ত সংক্রান্ত যাবতীয় মূল আয়াত গুলোকে একত্রিত করেই আলোচনায় অগ্রসর হওয়া যাবে খন: (এই পোস্টের কোরআনের আয়াতের বাংলা অনুবাদগুলো নেয়া হয়েছে আওয়ারহলিকোরআন সাইট থেকে।)

মানব সৃষ্টি পানি থেকে?
৮৬: ৬
"সে সৃজিত হয়েছে সবেগে স্খলিত পানি থেকে।"
২৫: ৫৪
"তিনিই পানি থেকে সৃষ্টি করেছেন মানবকে, অতঃপর তাকে রক্তগত, বংশ ও বৈবাহিক সম্পর্কশীল করেছেন। তোমার পালনকর্তা সবকিছু করতে সক্ষম।"
৩২:৮
"অতঃপর তিনি তার বংশধর সৃষ্টি করেন তুচ্ছ পানির নির্যাস থেকে।"

মানব সৃষ্টি মাটি থেকে?
৩২: ৭
"যিনি তাঁর প্রত্যেকটি সৃষ্টিকে সুন্দর করেছেন এবং কাদামাটি থেকে মানব সৃষ্টির সূচনা করেছেন।"

মানব সৃষ্টি বীর্য থেকে?
৫৩:৪৫-৪৬
"এবং তিনিই সৃষ্টি করেন যুগল-পুরুষ ও নারী। একবিন্দু বীর্য থেকে যখন স্খলিত করা হয়। "
১৬:৪
"তিনি মানবকে এক ফোটা বীর্য থেকে সৃষ্টি করেছেন। এতদসত্বেও সে প্রকাশ্য বিতন্ডাকারী হয়ে গেছে।"
৭৬:২
আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মিশ্র শুক্রবিন্দু থেকে, এভাবে যে, তাকে পরীক্ষা করব অতঃপর তাকে করে দিয়েছি শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন।"

মানব সৃষ্টি জমাট রক্ত থেকে?
৯৬:২
"সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে।"

মানব সৃষ্টির ধাপসমূহ?
৭৫: ৩৭-৩৮
"সে কি স্খলিত বীর্য ছিল না? অতঃপর সে ছিল রক্তপিন্ড, অতঃপর আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেছেন এবং সুবিন্যস্ত করেছেন।"
৪০:৬৭
"তিনি তো তোমাদের সৃষ্টি করেছেন মাটির দ্বারা, অতঃপর শুক্রবিন্দু দ্বারা, অতঃপর জমাট রক্ত দ্বারা, অতঃপর তোমাদেরকে বের করেন শিশুরূপে, অতঃপর তোমরা যৌবনে পদর্পণ কর, অতঃপর বার্ধক্যে উপনীত হও। তোমাদের কারও কারও এর পূর্বেই মৃত্যু ঘটে এবং তোমরা নির্ধারিত কালে পৌঁছ এবং তোমরা যাতে অনুধাবন কর।"
২৩: ১৩-১৪
"আমি মানুষকে মাটির সারাংশ থেকে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর আমি তাকে শুক্রবিন্দু রূপে এক সংরক্ষিত আধারে স্থাপন করেছি। এরপর আমি শুক্রবিন্দুকে জমাট রক্তরূপে সৃষ্টি করেছি, অতঃপর জমাট রক্তকে মাংসপিন্ডে পরিণত করেছি, এরপর সেই মাংসপিন্ড থেকে অস্থি সৃষ্টি করেছি, অতঃপর অস্থিকে মাংস দ্বারা আবৃত করেছি, অবশেষে তাকে নতুন রূপে দাঁড় করিয়েছি। নিপুণতম সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ কত কল্যাণময়।"
২২:৫
"হে লোকসকল! যদি তোমরা পুনরুত্থানের ব্যাপারে সন্দিগ্ধ হও, তবে (ভেবে দেখ-) আমি তোমাদেরকে মৃত্তিকা থেকে সৃষ্টি করেছি। এরপর বীর্য থেকে, এরপর জমাট রক্ত থেকে, এরপর পূর্ণাকৃতিবিশিষ্ট ও অপূর্ণাকৃতিবিশিষ্ট মাংসপিন্ড থেকে, তোমাদের কাছে ব্যক্ত করার জন্যে। আর আমি এক নির্দিষ্ট কালের জন্যে মাতৃগর্ভে যা ইচ্ছা রেখে দেই, এরপর আমি তোমাদেরকে শিশু অবস্থায় বের করি; তারপর যাতে তোমরা যৌবনে পদার্পণ কর। তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ মৃত্যুমুখে পতিত হয় এবং তোমাদের মধ্যে কাউকে নিষ্কর্মা বয়স পর্যন্ত পৌছানো হয়, যাতে সে জানার পর জ্ঞাত বিষয় সম্পর্কে সজ্ঞান থাকে না। তুমি ভূমিকে পতিত দেখতে পাও, অতঃপর আমি যখন তাতে বৃষ্টি বর্ষণ করি, তখন তা সতেজ ও স্ফীত হয়ে যায় এবং সর্বপ্রকার সুদৃশ্য উদ্ভিদ উৎপন্ন করে।"

"মাটি"- "পানি"- "বীর্য"- "জমাট রক্ত"- "মাংসপিণ্ড"- "অস্থি" - "অস্থিকে আবৃতকারী মাংস" এসবের মাঝে বিজ্ঞান? বিজ্ঞান সম্পর্কে ধারণা সম্পন্নদের কাছে এগুলো নির্ভেজাল কৌতুকই কেবল হতে পারে, কিন্তু ধর্মপ্রাণেরা যে এসবের মাঝেও বিজ্ঞান খুজে পান! শুরুতে একটা ইউটিউব ভিডিওর কথা বলেছিলাম, কিন্তু ওটাই শেষ নয়। আরো আছে। ধর্মে বিজ্ঞান যারা খুজে বেড়ান তাদেরকে দুটো কাজ অতিঅবশ্যই করতে হয়- তা হলো- প্রথমত প্রচলিত অনুবাদকে একটু পাল্টে দেয়া এবং দ্বিতীয়ত- সেই পাল্টে দেয়া অনুবাদকে কেন্দ্র করে মনের মাধুরী মিশিয়ে ব্যাখ্যা হাজির করা। ফলে- কোরআনে বর্ণিত মানবসৃষ্টি রহস্য বিষয়ক আলোচনায় যারা বিজ্ঞানকে আবিষ্কার করেন- তারাও এই দুটো পথেই হাঁটেন। আর, সেটা ভালো করে বুঝতে হলে- উপরে দেয়া আয়াতগুলোর অনুবাদের তারতম্যগুলো খেয়াল করা দরকার। (সেক্ষেত্রে http://www.islamawakened.com/ ওয়েবসাইটটি খুবই ভালো, এটাতে একসাথে ১৫-১৬ জনের অনুবাদ পাওয়া যায়) ।

আলাক (عَلَقَ) শব্দটির অর্থ জমাটবদ্ধ রক্ত থেকে যখন ভ্রুণ বা এমব্রায়ো বা জার্ম-সেল হয়ে যায়, কিংবা মা'য়ুন (ماء) পানি থেকে হয়ে যায় বীর্য বা স্পার্ম বা নুতফাহ যখন হয় বীর্য থেকে একইসাথে শুক্রাণু ও ডিম্বাণু- তখন বুঝতে বাকি থাকে না- এসবের ব্যাখ্যা হিসাবে কি হাজির করা হবে। কিন্তু একটু মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করলেই বুঝা যায়- এতকিছু করেও কোরআনকে বিকৃত করা ছাড়া আর কিছুই হয় না, বিজ্ঞান সম্পর্কে যাদের ন্যুনতম ধারণা আছে- তারা মাত্রই বুঝতে পারে- আর যাই হোক গোজামিল দিয়ে কখনো বিজ্ঞান হয় না। তদুপরি- এমন করে কোরআনকে বিজ্ঞান বানানোতে তারা নিজেরাই যে স্ববিরোধিতার জন্ম দিচ্ছেন- তাতে কেবল নিজেরাই হাসির পাত্র হচ্ছেন তা না - কোরআনকেও তামাশার বস্তু বানাচ্ছেন!!

আধুনিক বিজ্ঞান যখন জানান দিচ্ছে মানব সৃষ্টিতে বাবা ও মায়ের সমান ভূমিকা- বীজ বা সিড আসলেই শুক্রাণু ও ডিম্বাণু উভয়েই- তখন আসাদ-খলিফারা "আলাক" শব্দটিকে সামনে আনছেন। যেটার অর্থ এতকাল সকলেই "জমাটবদ্ধ রক্ত" হিসাবে জানতো- সেটাই তাদের বদৌলতে হয়ে গেল ভ্রূণ বা এমব্রায়ো বা জার্ম-সেল! তাতে কি শেষ রক্ষা হয়? আলাক এর কথা তো আল্লাহ কোরআনে পরের ধাপে বলেছেন- তার আগের ধাপে বলেছেন নুতফাহ'র কথা। ২৩:১৪ তে বলা হয়েছে: "এরপর আমরা 'নুতফাহ'কে 'আলাক'রূপে সৃষ্টি করেছি"। এই নুতফাহকেও হয়তো এনারা শুক্রাণু-ডিম্বাণু হিসাবে উল্লেখ করতেন- কিন্তু আল্লাহ বিভিন্ন জায়গায় নুতফাহ'র আগে নিক্ষিপ্ত, সজোরে বা প্রবলবেগে নিক্ষিপ্ত, স্খলিত এসব বিশেষণ যুক্ত করায়- একে ডিম্বাণু বানানোটা একটু কঠিনই ছিল! তাছাড়া আরবী ডিকশনারিতে এটা পরিষ্কারভাবেই "বীর্য", পুরুষ শুক্রাণু। ফলে- আসাদকেও ২৩:১৪ এর অনুবাদ করতে হয়ে এমন করেই: "and then We create out of the drop of sperm a germ-cell, and then We create out of the germ-cell an embryonic lump, and then We create within the embryonic lump bones, and then We clothe the bones with flesh - and then We bring [all] this into being as a new creation"। এখন বলুন এটাই বা কেমনে বিজ্ঞান সম্মত হলো? ড্রপ অব স্পার্মকে বা একবিন্দু বীর্য বা শুক্রাণু থেকে জার্ম-সেল বা ভ্রূণের উৎপত্তি? এর কোন জবাব নেই। আর এটা জানেন বলেই খলিফা তার অনুবাদে নুতফাহকে বীর্য হিসাবে যথাসম্ভব না দেখানোর চেস্টা করেছেন। ২৩:১৪ এর অনুবাদে নুতফাহ'কে বানিয়েছেন স্রেফ "the drop"। ৪০:৬৭ এও খলিফা একইরকম অনুবাদ করেছেন - অর্থাৎ নুতফাহ হয়েছে "the tiny drop"! অথচ, এই খলিফাই অন্যান্য জায়গায় (৭৫:৩৮ বা ৫৩:৪৬) নুতফাহ'র অর্থ করেছেন: "a tiny drop of semen"। ভালো করে খেয়াল করলেই দেখা যায়- যেখানে নুতফাহ থেকে আলাক- এই ধারাবাহিকতা আছে, সেখানে খলীফা শুক্রাণু শব্দটা পরিহার করেছেন। এই কৌশলটা করেছেন- কোরআনকে বিজ্ঞানময় দেখানোর জন্যই- কিন্তু এতে করে কি কোরআনকে রক্ষা করা গেলো? "শাক দিয়ে কি আসলেই মাছ ঢাকা যায়?"

এতো গেলো "নুতফাহ"র কথা- এক খলিফা ছাড়া আর প্রায় সকলেই নুতফাহকে স্পার্ম বা সিড ই বলেছেন। আসল মজা তো "আলাক" শব্দটিতে। এইতো গত শতকের মাঝামাঝির আগ পর্যন্ত এই "আলাক" মানে সকলে জানতো "জমাটবদ্ধ রক্ত" বা "blood-clot" বা "a clot of blood" বা "a piece of thick coagulated blood" বা "congealed blood"। প্রাচীণ গ্রন্থগুলোতে আছে "বীর্য" আর "রক্ত" এর কথা। মনুতেও আছে- "বীর্য" আর "শোনিত" এর কথা। (শোনিত মানে রক্ত)। আধুনিক বিজ্ঞান যখন জানাচ্ছে- এসব ভুল ধারণা, তখন ধর্মগুলোও নিজেদের পরিশুদ্ধ করে নেয়ার জন্য জানান দিচ্ছে- এতদিনকার অনুবাদ বা অর্থ ছিল ভুল! "আলাক" এর সঠিক অর্থ হচ্ছে - "এমব্রায়ো" বা "ভ্রূণ" বা "জাইগোট" বা "জার্ম-সেল"!!! কোরআনের অনুবাদে আজ "ফেটাস" শব্দটাও দেখা যায়!!!! আর এমন করেই কোরআন হয়ে উঠেছে বিজ্ঞানগ্রন্থ- যেমন করে অন্যান্য ধর্মগ্রন্থগুলোকে নিজ নিজ ধর্মের অনুসারীরা বানিয়ে তুলেছে বিজ্ঞানময়!

আচ্ছা "আলাক" মানে যদি ভ্রূণও ধরে নেই তাহলেও কি মানব সৃষ্টি নিয়ে কোরআনের ব্যাখ্যাটাকে বিজ্ঞানসম্মত বলা যাবে? এক বিন্দু শুক্রাণ বা বীর্য থেকে কিভাবে ভ্রূণ হতে পারে? কমপক্ষে দুটা বিন্দু লাগবে (শুক্রাণু ও ডিম্বাণু) একটা ভ্রূণ তৈরি হতে। আবার এই ভ্রূণ থেকে হয় একতাল মাংসপিণ্ড? সেখান থেকে অস্থি?- সেই অস্থিকে আবার মাংস দিয়ে আবৃত করা হয়েছে? (২৩:১৩-১৪)। আজকের বিজ্ঞান কি এমনটাই বলছে? ৭৬:২ এ জানানো হলো- "অতঃপর তাকে করে দিয়েছি শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন", সেটা ধরেই দাবী করা হচ্ছে সেই ১৪০০ বছর আগে কোরআনে কেমন করে এটা জানানো হলো যে- মাতৃগর্ভেই শ্রবনেন্দ্রিয় ও দর্শনেন্দ্রিয় গড়ে উঠে? অতএব, এই কোরআন আজকের বিজ্ঞানের চেয়েও অনেক ফাস্ট। অর্থাৎ অলৌকিক- ঐশী!! বিজ্ঞান যারা জানেন না বা পড়েন না- তারাই এমনটা ভাবতে পারেন বা বলতে পারেন। মাংসপিন্ড থেকে হাড্ডি, তারপরে হাড্ডিকে ঘিরে আবার মাংস- এমন কথাবার্তা কেবল ভুল ও বিজ্ঞান-অসম্মতই নয়, এগুলোকে আজ কেবল গাজাখুরিই বলা যেতে পারে। মাতৃগর্ভে থাকাকালীন ৯-১০ মাস ধরে মানবভ্রূণের বিবর্তনটা নেটে একটু সার্চ দিলেই যে কেউই পড়তে পারবেন- সেখানে দেখবেন কেবল শ্রবনেন্দ্রিয় ও দর্শনেন্দ্রিয়ই নয়- সমস্ত ইন্দ্রিয় তথা স্নায়ুতন্ত্র ও অন্যান্য তন্ত্রগুলো (পরিপাক তন্ত্র, রক্ত সংবহন তন্ত্র .. প্রভৃতি) গড়ে উঠে এই সময়কালেই। আজকের বিজ্ঞান নিয়ে পরে নাহয় আরো কথা বলা যাবে- তৎকালীন "বিজ্ঞান"টা আরেকটু দেখা যাক। বৈজ্ঞানিক কোরআন থেকে এবারে বৈজ্ঞানিক হাদীস শরীফের দিকে তাকানো যাক।
বুখারী শরীফ ভলিউম ৪, বুক ৫৪, নাম্বার ৪৩০ (Click This Link) পড়লেই সবকিছু পরিস্কার হবে, কেননা আল্লাহর নবীজী (সা) তার সাহাবীদের মানবসৃষ্টি রহস্য সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন:
"আব্দুল্লাহ বিন মাস'উদ থেকে বর্ণিত আছে: আল্লাহর রাসুল (সা) বলেছেন: "মানুষকে (মানবসৃষ্টির উপাদানকে) মাতৃগর্ভে চল্লিশ দিন রাখা হয়, এবং তারপরে সে জমাটবদ্ধ রক্তকণায় পরিণত হয় একই সময়কালের জন্য এবং তারপরে পরিণত হয় ছোট একখণ্ড মাংসপিণ্ডে একই সময়কালের জন্য। তারপরে আল্লাহ এক ফেরেশতাকে পাঠান যাকে চারটি বিষয় লেখার আদেশ দেয়া হয়েছে। তার কর্ম, তার জীবন-যাপন, তার মৃত্যু (মৃত্যুর তারিখ) এবং তার ধর্ম লেখার জন্য ফেরশতা আদেশপ্রাপ্ত। তারপরে তার ভেতরে আত্মা প্রবেশ করে। ....... "

মুসলিম শরীফেও একই রকম হাদীস পাওয়া যায় (Click This Link): "Abdullah (b. Mas'ud) reported that Allah's Messenger (may peace be upon him) who is the most truthful (of the human beings) and his being truthful (is a fact) said: Verily your creation is on this wise. The constituents of one of you are collected for forty days in his mother's womb in the form of blood, after which it becomes a clot of blood in another period of forty days. Then it becomes a lump of flesh and forty days later Allah sends His angel to it with instructions concerning four things, so the angel writes down his livelihood, his death, his deeds, his fortune and misfortune. ....."।
অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে- বীর্য বা শুক্রাণু মাতৃগর্ভে চল্লিশ দিন থাকার পরে এটা আলাক বা জমাটবদ্ধ রক্ত (বা আসাদের মতে ভ্রূণ) এ পরিণত হয়, এই ভ্রূণ চল্লিশদিন পরে মাংসপিন্ড হয় এবং আরো চল্লিশ দিন পরে এসে ফেরেশতা আত্মা স্থাপন করে যান এবং ভাগ্য লিখে যান। বেশী ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে যাওয়ার প্রয়োজন দেখছি না- কেউ যদি এই গালগল্পগুলোরও কোন বিজ্ঞানময় ব্যাখ্যা দেখে থাকেন- একটু শেয়ার করবেন, নির্মল আনন্দ লাভ হবে খন।

পরিশিষ্ট:
যারা কোরআন- বাইবেল- মনু-গীতায় বিজ্ঞান না খুঁজে বিজ্ঞানের মাঝেই একে খুঁজতে চান- তাদের জন্যই এই পরিশিষ্ট। নেটে অসংখ্য তথ্য-আলোচনা-চিত্র-প্রেজেন্টেশন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে- মানব সৃষ্টির ধাপগুলো সম্পর্কে সেখানেই বিস্তারিত পাবেন। আমি অল্প কয়েকটি ছবি এখানে তুলে ধরছি:

মোটা দাগে মাতৃগর্ভে ভ্রূণের বিবর্তনকে দুটো পর্যায়ে বিভক্ত করা হয়-
এক) এমব্রায়োনিক পেরিয়ড: ০ থেকে ৮ সপ্তাহ
দুই) ফেটাল পেরিয়ড: ৮ থেকে ৩৮/৪০ সপ্তাহ (ভূমিষ্ঠের আগ পর্যন্ত)


১ম ৮ সপ্তাহ বা ৫৬ দিনে ভ্রূণ থেকে মানবশিশুর বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গড়ে উঠে- বাকি সময়ে মানে ৮ সপ্তাহের পর থেকে এগুলো পরিপূর্ণ হতে থাকে- শেপ নিতে থাকে বাড়তে থাকে। অর্গানোজেনেসিস পড়লে আরো ভালো ধারণা পাওয়া সম্ভব, সে আলোচনায় যাচ্ছি না- এখানে কেবল এমব্রায়োনিক ফেজ এর কিছু চিত্র তুলে ধরছি। ১ম দিনকে বলা হচ্ছে ফার্টিলাইজেশন, এরপরের ৫/৬ দিন পর্যন্ত প্রিইমপ্লানটেশন, তারপরে ১৬/১৭ দিন পর্যন্ত ইমপ্লানটেশন, এবং এরপর থেকে ৫৬ দিন পর্যন্ত হচ্ছে এমব্রায়োনিক ফেজ। নিচের ছবিগুলোতে দেখা যাবে- এমব্রায়োনিক ফেজে ১ম ৫৬ দিনে কিভাবে মানবশিশুর বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো গড়ে উঠছে।













আশা করি- ৪০ দিন, ৪০ দিন এবং ৪০ দিন- এই ১২০ দিনের গাজাখুরী গল্পগুলো এখন থেকে আপনাদেরও কৌতুকের খোরাক হবে!!! আর এখনো যাদের কোরআন ও আল্লাহতে অগাধ বিশ্বাস এবং আস্থা, তাদের অনুরোধ করবো নীলক্ষেতের মেডিকেলের বইয়ের দোকানে গিয়ে এমব্রায়োলজির উপর ৩০০০-৫০০০ পাতার বইগুলোর কয়েকটা দেখে আসবেন, তাহলে আশা করি- বিজ্ঞান জিনিসটা কি - তার একটা সংজ্ঞা অন্তত পাবেন, যাতে করে এই রকম কোরআন-বাইবেল-বেদ এর মত পুঁথি-পুরাণগুলোর ৫- ৬ বাক্যের মধ্যে (বাক্য হয়তো আরো কয়েকটা বেশী থাকতে পারে- কিন্তু পুনরাবৃত্তিকে গণনায় ধরছি না) বিজ্ঞানরে আবিস্কার করার মতো আস্পর্ধা দেখাতে তারা যাবেন বলে মনে হয় না।

সবাইকে ধন্যবাদ।

পরিশিষ্ট ২:
মাহফুজশান্ত কর্তৃক খন্ডন;
Click This Link

নতুন কিছু বলার নেই- মাহফুজশান্ত'র লেখা পড়ে আবার এই লেখাটা পড়লে আশা করি জবাব পেয়ে যাবেন।

আবারো ধন্যবাদ।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29238946 http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29238946 2010-09-12 20:53:28
নাস্তিকের ধর্মকথার বিশ্বকাপ ফুটবল দরশন - ৩ (শেষ) (ফাইনালের আগে)
হল্যান্ড-ব্রাজিলের খেলার দিনে, মানে ব্রাজিলের হোচট খাওয়ার দিনে জার্মানির সমর্থক এক বড় ভাই খুশীতে ডগমগ হয়ে ম্যাসেজ পাঠিয়েছিল "অলঅয়েজ লাভার অব ইউরোপিয়ান ফুটবল"! লাতিন সুন্দর ফুটবলের ঘোর সমর্থক হিসাবে আমার কিছু দুর্নাম আছে, তাই হয়তো তিনি ঐ ম্যাসেজ পাঠিয়েছিলেন। আমিও হেসে জানালাম, "অলওয়েজ ডিসলাইকার অব ইউরোপিয়ান বোরিং ফুটবল" এবং সেমিফাইনালে স্পেনের চোখ জুড়ানো খেলাটার পরে উপলক্ষ আসলো এবং জানালাম "অলওয়েজ লাভার অব লাতিন ফুটবল"।

ইউরোপিয়ান ফুটবল আর লাতিন ফুটবল বলতে আমি বুঝি দুটো ভিন্ন ঘরানার ফুটবল। একদিকে 'আগে ঘর সামলাও ও তারপরে পারলে কাউন্টার এটাকে গোল করে আসো ও সেই গোল/ লিড ধরে রেখে খেলা শেষ করো' এবং অন্যদিকে 'আক্রমণ, আক্রমণ ও আক্রমণ, ডিফেন্স? অফেন্স ইজ দ্য বেস্ট ডিফেন্স- প্রথম থেকেই বলের দখল নিয়ে নাও এবং হামলে পড়ো বিপরীত দুর্গে"। একদিকে রক্ষনাত্মক ও বোরিং ফুটবল, আরেকদিকে আক্রমণাত্মক সুন্দর ফুটবল। এবারের দুঙ্গার ব্রাজিল তাই কোনমতেই লাতিন ফুটবল খেলেনি, সে খেলেছে ইউরোপিয়ান বোরিং ফুটবল (গ্রুপ পর্বের ২য় ম্যাচ ও কোয়ার্টার ফাইনালের ১ম ১৫ মিনিট ছাড়া)। আর, অন্যদিকে এবারের স্পেন টিম লাতিন ফুটবলের অনুপম পসরা সাজিয়ে বসেছে। এই দলের খেলা কেবল মুগ্ধ হয়েই তাকিয়ে থাকতে হয়। থেকেছিও।

তবে, সাথে এটাও এবারে স্বীকার করতে হচ্ছে- জার্মানীর খেলা এবার আমার ভালো লেগেছে। শুরুতে ভেবেছিলাম এবারের কাপ নিবে স্পেন, কিন্তু বাকি তিন সেমি ফাইনালিস্ট হবে ব্রাজিল-উরুগুয়ে-আর্জেন্টিনা। ব্রাজিলের হারটা আগে কল্পনাও করতে পারিনি, তবে জার্মানী-ইংল্যান্ডের খেলা দেখার পর থেকেই বুঝতে পারছিলাম স্মরণকালের সবচেয়ে জঘণ্য ডিফেন্স নিয়ে আর্জেন্টিনা জার্মানীর কাছে নাস্তানাবুদই হবে। বাজ্জিওর আমলের ইতালীর পর এইরকম ক্ষিপ্র কাউন্টার এটাক করতে পারা ফরোয়ার্ড দেখলাম জার্মানী দলে। দলটাকে আমার পছন্দ হয়েছে, শারীরিকভাবে সমর্থ, ব্যক্তিগত স্কিলও কয়েকজনের বেশ ভালো। বয়সও কম। সামনেরবার এরা আরো পরিণত হবে এবং ব্রাজিল বিশ্বকাপে জার্মানীর ভালো সম্ভাবনা দেখছি। আফসোস- এরা লাতিন ঘরানার আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে না! পুরো সামর্থ্যই এদের আছে, খেললে যে কি হতো!!!

মেসির জন্য একটু আফসোস হচ্ছিল, জেনেত্তি-কাম্বিয়াসোদের বাদ দিয়ে এমন ফালতু ডিফেন্স গড়াতেই তো মেসির জাদুটা আর এক-দু ম্যাচ বেশী দেখা হলো না! তবে ম্যারাডোনা যেমন কিম্ভুত দলই গড়ুন না কেন- বিশ্বকাপে কোচ হিসাবে আমি তাকে লেটার মার্কই দিবো। খেলোয়াড়দের বুকে জড়িয়ে নেয়া- আদর করা, ভালো লেগেছে। টিম ফরম্যাট, আক্রমণাত্মক স্টাইল এসবও ঠিক ছিল। কাউন্টার এটাক ঠেকানোর মত ডিফেন্সটা যদি থাকতো- তবে স্পেনের মতই একটা দল হয়ে উঠতো।

আগের পোস্টে বলেছিলাম- ব্রাজিলের ভাগ্যটা খুব ভালো- খুব সহজে ফাইনালে চলে যাবে। ঘটনাটা হল্যান্ডের জন্য হলো। আমি মনে করি এই হল্যান্ড টিমকে স্পেন তো বটেই, জার্মানী-আর্জেন্টিনাও হারানোর সামর্থ্য রাখে (ব্রাজিলকেও)। ফাইনালে স্পেন হল্যান্ডের জালে ১ বা ২ এর বেশী গোল হয়তো দিতে পারবে না, তবে জার্মানী হলে তো হল্যান্ডকে প্রায় ন্যাংটো হতে হতো- মানে ৩-৪ টা গোল খেয়ে ফাইনালে নাস্তানাবুদ হতে হতো!

দুঙ্গার বিদায় ব্রাজিলের জন্য এবং আমাদের মতো লাতিন সুন্দর (জোগো বনিতা) ফুটবলের সমর্থকদের জন্য সুখবর, সে হিসাবে ব্রাজিলের এমন লজ্জার বিদায় একরকম আশীর্বাদই। আশা করবো, লুসিও-সিজার ভিত্তিক দল না হয়ে ব্রাজিল অচিরেই রবিনহো-কাকা-পাতো নির্ভর দল হয়ে উঠবে। রবিনহোরা মাঝে মাঝে জোগো বনিতার যে ঝলক মাঠে দেখিয়েছিল - সেটাই হবে ব্রাজিলের আসল খেলা। লুসিও-সিজাররা থাকবে বিপক্ষ দলের হাতে গোনা কয়েকটা প্রতি আক্রমণ ঠেকানোর দায়িত্বে। সামনের বার যে লাতিন দেশেই বিশ্বকাপ! ফুটবলের দেশেই বিশ্বকাপ। লাতিনেই বিশ্বকাপটা থাকুক আর না থাকুক- চাইবো লাতিন ফুটবলের যাদুতে বিশ্ব মোহিত হয়ে যাক বিশ্বকাপ ২০১৪ এর আসর।

শেষে- ফাইনাল ম্যাচ। কিছু বলার নেই। স্পেনের খেলা দেখার জন্য বসবো। সুন্দর ফুটবল দেখার জন্য বসবো। গোল্ডেন বুট- গোল্ডেন বল দুটাই ভিয়া জিতলে খারাপ হয় না, এবারে সে অসাধারণ খেলেছে। তবে উরুগুয়ের বিরুদ্ধে মুলার- ক্লোসা গোল করে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে ভালোভাবে আসতে পারে, বিশেষ করে ক্লোসার দুটো গোল খুব চাচ্ছি- রোনালদোর রেকর্ড ভাঙ্গার সাক্ষী হতে চাই। গোল্ডেন বলের জন্য দাবীদার আমার মনে হয় জাভিও। আমি জাভির অসম্ভব রকম ফ্যান। মেসি-ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর জন্য যার ফিফা বর্ষসেরা হ্ওয়াটা সম্ভব হচ্ছেনা - হয়তোবা হবেও না- কিন্তু বার্সাতে মেসি-জাভি জুটির খেলা যারা দেখেছেন- বুঝবেন জাভি কি জিনিস!

পরিশিষ্ট:
১। ব্রাজিল যেদিন হারলো- পরপরেই দেখি এলাকায় বড় মিছিল। হল্যান্ডের এত সাপোর্টার দেশে নাই বলে জানতাম। তাকিয়ে দেখি মিছিলের শ্লোগানে হল্যান্ডের "হ"-ও নেই। সবাই "ভুয়া"র সাপোর্টার। অনেক মজা পাইলাম।
২। এরপরে যখন আর্জেন্টিনা রীতিমত নাস্তানাবুদ হলো জার্মানীর কাছে- আগের রাতের চেয়েও মিছিল থেকে আওয়াজ জোরে শোনা গেল। যথারীতি কেউ জার্মানীর নয়- "ভুয়া"র সাপোর্টার। ব্রাজিলের সমর্থকেরা পুরো বিশ্বকাপে ঐ রাতেই সবচেয়ে আনন্দ করেছে বলে মনে হলো।
৩। আর্জেন্টিনার কিছু সমর্থককে আল্লাহ বিল্লাহ করতে দেখেছি। গোলের জন্য- মেসির জন্য- ম্যারাডোনার জন্য। ব্রাজিলের সমর্থকও মনে হয় অনেকে দোয়া দরুদ পড়েছেন। খ্রিস্টান-ইহুদীদের জন্য মুসলমানদের দরদ দেখে দারুন মজা পাইলাম। ভালো ভালো। কোরআনে কাফের-নাসারাদের তো মুসলামনদের আজীবন শত্রু হিসাবে উল্লেখ করা আছে বলেই জানতাম। বিশ্বকাপ ফুটবল দেখি মুসলমানদের কোরআন ভুলিয়ে রাখতেও সক্ষম হচ্ছে!!!!

১ম পর্ব (Click This Link)

২য় পর্ব
(Click This Link)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29196173 http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29196173 2010-07-10 01:03:59
নাস্তিকের ধর্মকথার বিশ্বকাপ ফুটবল দরশন ২ ..... (গ্রুপ পর্বের পর) স্পেন: আগের পোস্টে স্পেনের কথা বিশেষ করে বলেছিলাম। বলেছিলাম- এবার স্পেন যেরকম দল নিয়ে আফ্রিকা গিয়েছে- তাতে তাদের বিশ্বকাপ না জেতাটাই চরম অঘটন।

কিন্তু ১ম ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের কাছে ১-০ গোলে হারার পরে অনেকে টিটকারি করে উঠেছিল, ভাবটা এমন - বিশ্বকাপ ফুটবলের মঞ্চটা কখনো স্পেনের জন্য ছিল না, এবারেও নেই। যাহোক পরবর্তী দুটো ম্যাচে স্পেন তার জাত চিনিয়ে ঠিকই গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে ২য় রাউন্ডে। যদিও আমার ধারণা- এখনও স্পেন তার আসল সমার্থ্যের পুরোটা ঢেলে দিতে পারেনি...
মূল অস্ত্র, কারিগর জাভি এখনো আসল চেহারায় আসেনি। ইনিয়েস্তা, রামোস ছাড়া বাকিদের এমনকি ডেভিড ভিয়ার আসল খেলা এখনও দেখিনি বলেই মনে হয়।

ইতালি/ ফ্রান্স: এদের ১ম রাউন্ডে বিদায়টা খুব স্বাভাবিক বলেই মনে হয়েছে। চরম নড়বড়ে দুটো দল নিয়ে এরা এসেছিল- ফলাফল এমনটাই হওয়ার কথা ছিল। যদিও ইতালী-স্লোভাকদের খেলার শেষ ১৫ মিনিটের খেলাটা এ পর্যন্ত এ বিশ্বকাপের শ্রেষ্ঠ। অসাধারণ টানটান খেলা খেলেছে দুদল শেষ ১৫ মিনিটে।

ইংল্যান্ড ইংল্যান্ড সবচেয়ে হতাশ করেছে। অন্য কয়েকবারের তুলনায় এবারের ইংল্যান্ডের দলটা কিছুটা শক্তপোক্ত মনে হচ্ছিল। কিন্তু, কেউই আশানুরূপ খেলতে পারছে না। এদের বেশীদূর এগুতে পারার কথা নয়।

জার্মানি: জার্মানির খেলা আমার কখনোই ভালো লাগে না, কিন্তু বিশ্বকাপের জার্মানিকে আলাদা গুরুত্ব দিতেই হয় সবসময়। এবারেও ১ম ম্যাচেই জার্মানি আবার সে কথা মনে করে দিয়েছিল। কিন্তু একইভাবে ২য় ম্যাচে সার্বিয়ার কাছে হেরে- হতাশ করেছিল। ঘানাকে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েই ২য় রাউন্ডে গেলেও- জার্মানি এবার খুব বড় কিছু করবে বলে মনে হচ্ছে না।

পর্তুগাল/ আইভরি কোস্ট: রোনালদো আর দ্রগবার জন্য এই দুটো দলের প্রতি বিশেষ আগ্রহ ছিল। হাত-ভাঙ্গা দ্রগবা ছায়া হয়েই ছিল। রোনালদোর কিছু ঝলক দেখা গেলেও- পর্তুগালের খেলা তেমন আহামরি কিছু মনে হয় নি।

হল্যান্ড: হল্যান্ড নীরবে নিভৃতে ৯ পয়েন্ট নিয়ে ২য় রাউন্ডে গেলো। তারপরেও হল্যান্ডরে নিয়ে উচ্চকিত হওয়ার কিছু নেই- গ্রুপে সব কটাই দুর্বল দল ছিল।

আর্জেন্টিনা: আর্জেন্টিনার খেলা ভালো লেগেছে। মেসির খেলা দেখাটা খুবই দৃষ্টিসুখকর বিষয়। ফলে, আর্জেন্টিনার খেলা দেখাটাও আনন্দের বিষয়। আগের পোস্টে যেটা বলেছিলাম- ভেরনকে দিয়ে গোল বানানোর কাজ সম্ভব নয়- এ কাজটা মেসিকেই করতে হবে। মেসিকে সে ভূমিকাতেই দেখছি। ২য় ম্যাচের লাইন-আপটাই পারফেক্ট মনে হয়েছে। ভেরনের পরিবর্তে রদ্রিগেজ, পাস্তোর, মাচোরানোরাই মেসির যথার্থ সহযোগী হতে পারে। রক্ষণভাগকে খুব বড় পরীক্ষা দিতে না হলেও- বুঝা গেছে এটাতে ভালো সমস্যা আছে। সামনে খবর আছে।

ব্রাজিল: ব্রাজিলের ১ম ও ৩য় ম্যাচ হতাশ করলেও ২য় ম্যাচে বুঝা গেছে- ব্রাজিল কি জিনিস। ফরোয়ার্ডে সেরকম আহামরি খেলোয়াড় না থাকলেও- ব্রাজিল অসাধারণ কারণ টোটাল টিম ওয়ার্ক। ২য় ম্যাচটা দেখে মনে হয়েছে- একটা পুরো দল খেলছে। নিখুত পাসিং তো ছিলই, ডিফেন্সে লুসিও- আর সিজাররা থাকলে বিপক্ষ দলের আক্রমণ নিয়ে চিন্তার তেমন কিছু থাকেও না।

নক-আউট পর্ব: নকআউট পর্বের ফিকশ্চার দেখে মনে হলো, ব্রাজিল খুব ভাগ্যবান- আর আর্জেন্টিনার পোড়া কপাল। তবে এটাও ঠিক- ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার মত কোন দলের ২য় রাউন্ডেই বিদায় নেয়াটা ভালো হতো না, তার তুলনায় সেমিফাইনালে বিদায় নেয়াটা অনেক ভালো।

বুঝতেই পারছেন- কি বলতে চাচ্ছি। ২য় রাউন্ডে স্পেনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে না কাউকে। ব্রাজিল হবে ফাইনালে আর আর্জেন্টিনা সেমিফাইনালে। তার আগে অবশ্য ব্রাজিলকে হল্যান্ড আর আর্জেন্টিনাকে জার্মানি বাঁধা পেরুতে হবে।

লাটিন ফুটবল নিয়ে দুটো কথা বলেই শেষ করি- ইউরোপের এক স্পেন ছাড়া এবার সেমিফাইনালের তিনটা দলই লাটিন আমেরিকার হতে যাচ্ছে বলে মনে হয়। আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল-উরুগুয়ে। অনেকে ফিকশ্চারের দোষের কথা বলছেন (ঘানা- উরুগুয়ে-দ: কোরিয়া-যুক্তরাষ্ট্র), কিন্তু আমার মনে হয় উরুগুয়ের এই দলটা ইংল্যান্ড- পর্তুগালের চেয়েও ভালো, অর্থাৎ ঘানা-কোরিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের বদলে ইউরোপের এইসব কাগুজে বাঘরা থাকলেও তারা কিছু করতে পারতো বলে মনে হয় না। তবে, সেমি ফাইনালে ৭৫% লাটিন, ফাইনালে ১০০% হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম, এমনকি শেষ হাসিটাও এবার লাটিন নাও হাসতে পারে। কারণ ঐ স্পেন। তবে আপনারা স্পেনকে লাটিন হিসাবে ধরতে পারেন, কারণ সেতো কখনো ঐ ইউরোপের কুৎসিত ঘরানার ফুটবল খেলেনা। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29185978 http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29185978 2010-06-27 11:11:30
নাস্তিকের ধর্মকথার বিশ্বকাপ ফুটবল দরশন .....
আরেকটি ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হয়ে গেলো, চারদিকে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের পতাকার ছড়াছড়ি দেখে বিশ্বকাপের উত্তেজনা টের পেয়েছি- তা নয়। কোন পতাকা না থাকলেও সময় পেলে টিভির সামনে ঠিকই বসে যেতাম, যেমনটা ক্লাব ফুটবলের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। যাহোক কথা না বাড়িয়ে মূল আলোচনায় চলে যাই। এবারের বিশ্বকাপের প্রধান দলগুলো নিয়ে আমার বিশ্লেষণ তুলে ধরাই এ লেখাটার লক্ষ। কাজটা তেমন কঠিন নয়- কারণ অল্প কটা দল নিয়ে দুচার কথা বলেই লেখা শেষ করা যাবে আশা করা যায়। বাংলাদেশের জনপ্রিয়তম দুটো দল দিয়েই শুরু করছি:


১। আর্জেন্টিনা: কোচ ম্যারাডোনা এবং ফরোয়ার্ডে মেসি- এই দুজনের কারণেই সবচেয়ে বেশী আলোচিত আর্জেন্টিনা। তবে যতই আর্জেন্টিনা ফোকাসে থাকুক না কেন- দলটাকে নিয়ে আশাবাদী হওয়ার খুব বেশী কিছু আছে বলে মনে হয় না। ফ্রন্ট লাইন অবশ্যই বিশ্বসেরা কিন্তু ডিফেন্স একদমই সাদামাটা, বলতে গেলে খুবই জঘণ্য। টিম দেখে মনে হয়েছিল- এই দল করা হয়েছে কেবল গোল দেয়া ও গোল খাওয়ার উদ্দেশ্যে (বাস্কেটবলের ৮৮-৮৫ এর মত স্কোর না হয়ে যায়!!)। জেনেত্তি আর কাম্বিয়াসোরে না নেয়ার কারণ একমাত্র কোচই জানেন। বুড়ো ভেরনরে দিয়ে গোল তৈরি করা সম্ভব নয়- তার মানে স্ট্রাইকাররা গোল করার জন্য টগবগ করে ফুটতে থাকবেন- কিন্তু বল বানানোর মত কেউ থাকবেন না!!!! এইরকম ফ্রন্টলাইন প্লেয়ার থাকার পরেও এমন ফালতু টিম হতে পারে- সেটা অকল্পনীয়!!

তার পরেও - আর্জেন্টিনার সম্ভাবনা একেবারে ফেলে দেয়া যাচ্ছে না- তা মেসির জন্য। মেসিরে একটু নীচে খেলতে হবে, মানে বুড়ো ভেরনের কাজটা তাকে আর মাচোরানো-রদ্রিগেজদের সাথে মিলে করতে হবে, হিগুইন-তেভেজ-মিলিতোদের জন্য গোল তৈরি এবং নিজের গোল করা উভয় কাজটাই মেসিকে করতে হবে।

২। ব্রাজিল: ব্রাজিল সবসময়ের ফেভারিট, এবং এবারেও সে ফেভারিট- ফিফা র‌্যাংকিং তার ১। কিন্তু আমার দেখা ব্রাজিল দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জঘন্য দল এবারের ব্রাজিল দল। দলগত সমঝোতা যত ভালোই থাকুক- সেইরকম সুপার স্কিলড প্লেয়ার এবার ব্রাজিলে একটাও নেই, যাকে কেন্দ্র করে তারা কাপ জেতার স্বপ্ন দেখতে পারে। কাকা-রবিনহো এরা পুরো মৌসুম সাইডবেঞ্চে বসে থেকেছে। ফাবিয়ানোর অবস্থা তেমন না। সবচেয়ে ভালো খেলোয়াড় বলতে গেলে গোলকিপারটা, আর কয়েকটা ডিফেন্ডার। এদের অবস্থা ঠিক আর্জেন্টিনার বিপরীত। গোল দিতে না পারি- গোল খামু না।

আর, কোচ দুঙ্গা হলো একটা চরম বিরক্তিকর কোচ। ব্রাজিলের খেলা দেখার মজাটাই সে নষ্ট করে দিয়েছে।

৩। ইতালি ও জার্মানি: এরা এমন দুইটা দল যাদের খেলা খুবই বিরক্তিকর, এক কথায় ফালতু- কিন্তু বিশ্বকাপে তাদের ফল সবসময়ই ভালো। এবারেও এই হিসাবে তারা ফেভারিটের তকমা গায়ে এটেছে। কিন্তু- তেমন কিছু করতে পারবে বলে মনে হয় না।

৪। ইংল্যান্ড: রুনি- ল্যাম্পার্ড-জেরার্ড-টেরি মিলে মোটামুটি শক্ত দলই বলা যাবে। এদের গায়েও ফেভারিটের তকমা আছে- সবাই একসাথে জ্বলে উঠলে অনেক দূর যেতে পারে।

৫। হল্যান্ড: এক সময় চরম ফ্যান ছিলাম। একসময় মানে- খুলিত-বাস্তেন-রাইকার্ড-বার্গক্যাম্প-ওভারমার্স এর সময়ে। লম্বু-গাধার (নিস্টলরয়) আমল থেকে আগ্রহ হারাতে থাকি। এবারের বিশ্বকাপে হল্যান্ড দলকে তেমন ফলো করা হয়নি। রোবেন আর পার্সি খুব বেশীদূর নিয়ে যেতে পারবে বলে মনে হয় না।

৬/ পর্তুগাল ও আইভরিকোস্ট: রোনালদো ও দ্রগবা দলদুটোকে যতদূর নিয়ে যেতে পারবে ততটুকুই লাভ। পর্তুগাল-আইভরিকোস্টের কেউই খুব বেশী আগানোর কথা নয়- তবে দ্রগবা আর রোনালদোর খেলা যত দেখা যাবে, ততদিন বিশ্বকাপ দেখার মজা থাকনে।

৭। স্পেন: জাভি নামের খেলোয়াড়টা যে দলে আছে- সেই দলে একজন আসলাম থাকলেই চলে, কিন্তু স্পেনের আছে ভিলা-তোরেস-ফাব্রিগাসরা। জাভির সাথে আবার ইনিয়েস্তা। ডিফেন্সে আছে পিকে-পুয়োল। গোলবারে কাসিয়াস; ভালদেসের মত গোলরক্ষক সুযোগ পাচ্ছে না (ভালদেস অনায়াসে ব্রাজিল ছাড়া যেকোন দেশের গোলবার সামলানোর দায়িত্ব পেতে পারে।)
এইরকম কমপ্লিট একটা দলের বিশ্বকাপ না জেতাটাই হবে দুর্ভাগ্যের বিষয়।

পরিশিষ্ট:
১/ ক্রিকেটের চেয়ে ফুটবল বেশী উপভোগ্য কারণ:
-> এখানে সাঈদ আনোয়ার- আমলা- ইউসুফ দের মত দাড়ির ছড়াছড়ি নাই।
-> গোল দেয়ার পরে ডিগবাজি খায়, কোমর দোলায়, দৌড়ায় .. কেউ আকাশের দিকে তাকাইয়া আল্লাহ, ভগবান, গড বা মৃত পিতা-মাতারে থ্যাঙ্কু জানায় না।
-> খেলা বন্ধ করে দিয়ে সারিবদ্ধ হয়ে নামাজ পড়ার তামাশা দেখার কোন সম্ভাবনা এইখানে নাই।
২। পোলা আর মাইয়ার জন্য দুইটা জার্সি খুজতেছি- একটা আর্জেন্টিনার, আরেকটা ব্রাজিলের। কিন্তু সাইজে মিলতেছে না। কালকের মধ্যে সাইজে না মিললে- বড় সাইজেরটাই কিনবো .....
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29175766 http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29175766 2010-06-13 02:25:48
জন হেনরীর হাতুড়ি: "আমি মেশিনের হবো প্রতিদ্বন্দ্বী"
একটা গানের আবেদন, তাৎপর্য কিভাবে পাল্টে যেতে পারে- তা হেমাঙ্গ বিশ্বাসের অনেকবার শুনা "জন হেনরী" গানের ক্ষেত্রে টের পেলাম -সম্প্রতি গানটির প্রেক্ষাপট ও জন হেনরীর জীবন গাঁথা জানবার পরে। গানটি আমাদের ফকির আলমগীরের পরিবেশনায়ও অনেকবার শুনেছি, হেমাঙ্গের পরিবেশনাকে সব দিক থেকেই- গায়কিতে- কন্ঠে- মিউজিক কম্পোজিশনে সব দিকেই ফকির আলমগীরের পরিবেশনার চেয়ে অনেক বেশী দুর্দান্ত মনে হয়েছে- ফলে হেমাঙ্গের পরিবেশনাটাই বেশী শুনা। কিন্তু এতবার শুনার পরেও এই গানটা আজকের মত করে আমার অনুভূতিকে নাড়া দিতে পারেনি- এটা নিশ্চিত বলতে পারি। আগে কি আসলে খুব মন দিয়ে গানটা, গানের প্রতিটা কথা- প্রতিটা শব্দ-ছত্র শুনেছি? মনে হয় না। কেননা গানের কথায় কথায় তো জন হেনরীর জীবনগাঁথাই বিধৃত হয়েছে, একটু মন দিয়ে প্রতিটা লাইন খেয়াল করলেই তো সেটা জানতে পারতাম, সেটা হয়নি। শুনে গেছি, ভালো লেগেছে- একজন জনৈক জন হেনরী- যিনি একজন কালো শ্রমিক- যিনি হাতুড়ি দিয়ে পাহাড় কাটতেন- এতটুকুই কেবল ধরতে পেরেছিলাম- সেটাতেই সন্তুষ্ট ছিলাম। গানের সুরে একটা তেজ আছে, সেটাতেই সন্তুষ্ট ছিলাম, তাই ভালো লেগেছে- এবং অসংখ্যবার শুনেছি। কিন্তু গানটার আসল মর্ম কখনোই ধরতে পারিনি সেদিনের আগে- যেদিন টিএসসি'র সড়ক-দ্বীপে 'সৃজন' গোষ্ঠীর পরিবেশনা শুনলাম। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে, গানটি শুরু করার আগে- যখন জন হেনরী সম্পর্কে দুচার কথা বলা হলো, ইতিহাসটা জানলাম, যন্ত্রের সাথে মানুষের যুদ্ধের তথা সাদার সাথে কালোর- মালিকের সাথে শ্রমিকের যুদ্ধের এক অনবদ্য কাহিনী শুনলাম, তখন থেকে। অবাক হয়ে খেয়াল করলাম, এই প্রথমবারের মত গানটির প্রতিটা কথা, প্রতিটা শব্দ আমি শুনছি- সৃজনের শিল্পীরা কিভাবে গাচ্ছে- কেমন তাদের পরিবেশনা সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপই করছি না, এবং আরো অবাক বিষয় যে- যে মুহুর্তে
"জন হেনরীর কচি ফুল মেয়েটি/ পাথরের বুকে যেন ঝরনা/ মার কোল থেকে সে পথ চেয়ে আছে তার / বাবা তার আসবে না আর না" লাইন কটি গাওয়া হলো- আমার চোখ দিয়ে কেমন যেন পানি বেরিয়ে আসলো! "পাখির কাকলি ভরা ভোরে/ পুবালী আকাশ যবে রঙ্গীন/ হেনরীর বীর গাঁথা বাতাসে ছড়িয়ে দিয়ে/ সিটি দিয়ে চলে যায় ইঞ্জিন"- শুনে অন্যরকম অনুভূতি হয়। সিটি দিয়ে চলে যায় ইঞ্জিন- সিটি দিয়ে চলে যায় ইঞ্জিন- মাথায় বারে বারে লাইনটি ঘুরতে থাকে। আমাদের চারপাশের আরাম-আয়েশে গড়া জীবনরূপ ইঞ্জিনটা কি সুন্দর সিটি দিয়ে চলে যাচ্ছে, জন হেনরীদের অবস্থান সেখানে কোথায়?

বাসায় এসে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গানটা শুনতে থাকি। নেটে জন হেনরী দিয়ে সার্চ দেই। আরেকবার হোচট খাই। পশ্চিম ভার্জিনিয়ার সি এণ্ড ও রেইলরোডের সেই বিখ্যাত বিগ বেন্ড টানেলের সামনের ফলকে জন হেনরীর কথা উল্লেখ থাকলেও, টালকট শহরের বাইরে জন হেনরীর আবক্ষ ভাস্কর্য শোভা পেলেও- জন হেনরীর অবস্থান কোন ঐতিহাসিকের ইতিহাসে নয়, পাওয়া যায় আমেরিকান ফোকটেল এ! হবেই না বা কেন? অভিজাতদের লিখিত ইতিহাসে নিম্ন বর্গীয়রা চিরকালই উপেক্ষিত। সবকালেই- সব জায়গায়ই। চীনের মহাপ্রাচীর কোন রাজার আমলে ও তত্বাবধানে তৈরি হয়েছে- সেগুলো ইতিহাসের ছাত্রদের পাঠ্য, কিন্তু কত শত শ্রমিকের হাড়-গোড়ের উপর এই প্রাচীর দাঁড়িয়ে আছে তা কোথাও পড়ানো হয় না, তাজমহলের সৌন্দর্যের সাথে সম্রাট শাহজাহান আর সম্রাজ্ঞী মমতাজের অমর প্রেমের কাহিনী একাকার হয়ে যায়- কিন্তু এই ইমারত গড়ার কাজে যাদের অবদান সবচেয়ে বেশী সেই কারিগর, শ্রমিকদের কথা আমাদের কারো মাথায় থাকে না। একইভাবে, খুঁজলে পশ্চিম ভার্জিনিয়ার সি এণ্ড ও রেইলরোড কোন কোম্পানীর তত্ত্বাবধানে তৈরি হয়েছে, সেই কোম্পানীর প্রোফাইল- তার মালিক- তার হোমড়া চোমড়া সাদা কর্মকর্তাদের বিস্তারিত বৃত্তান্ত বের করা যাবে, খুব বেশীদিন তো হয়নি- ১৮৭০ সালে এই রেইলরোড নির্মাণের কাজ সমাপ্ত হয়- সেসব নথিপত্র আছে নিশ্চয়ই; কিন্তু একজন কালো শ্রমিক- যন্ত্রের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে যে টানা কাজ করতে করতে মারা গিয়েছে- তার কোন নথিপত্র সাদা মালিকেরা কেন সংরক্ষণ করবে? করেওনি। তাইতো সাদাদের চর্চিত ইতিহাসে জন হেনরীর কোন ঠাঁই নেই। কিন্তু এহেন বীরকে কি মানুষ ভুলে যেতে পারে, সে কি হারিয়ে যেতে পারে? পারতো, কিন্তু সাধারণ খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষেরা, কালো মানুষেরা তা হতে দেয়নি। মুখে মুখে - গল্পে গানে- জন হেনরী বেঁচে থাকে। হেনরী হয়ে উঠে উপকথার নায়ক, একজন লিজেণ্ড। তাকে নিয়ে রচিত হয় অসংখ্য গল্পকথা, উপকথা, লোকগান, কবিতা। আমেরিকার কালো মানুষের কাছে, শ্রমিকদের কাছে জন হেনরী হয়ে উঠে প্রেরণার নাম, এক স্বপ্ন পুরুষ। লৌহ মানব, পাথুরে মানুষ। শক্তির আধার। জন হেনরী। প্রতিবাদী জন হেনরী। লড়াকু জন হেনরী।

কিন্তু শুধু লড়াই-সংগ্রাম-প্রতিবাদের প্রেরণাদায়ী হিসাবেই নয়- জন হেনরী আমেরিকার কালো মানুষের কাছে এক অব্যক্ত বেদনারও নাম, কালোদের উপর- শ্রমিকদের উপর সাদাদের-মালিকদের নির্যাতন-নিপীড়নেরও ইতিহাস ঐ জন হেনরী। নেটেই জন হেনরীকে নিয়ে বেশ প্রাচীণ একটা লোকগান শুনলাম, ভাষা কিছুই বুঝতে পারিনি প্রতি লাইনের শুরুতে "জন হেনরী" ছাড়া- কিন্তু পুরো গানটা শুনলে মনে হয় একদল লোক যেন বিলাপ করছে, কি করুন সেই বিলাপ- যেন পিতা হারিয়েছে তার সন্তানকে, সন্তান মাতাকে বা বোন হারিয়েছে ভাইকে কিংবা কোন নারী হারিয়েছে তার প্রাণপ্রিয় স্বামীকে।

কে এই জন হেনরী? এরই মধ্যে মোটামুটি তার পরিচয় জানা হয়ে যাওয়ার কথা। একজন শ্রমিক। আমেরিকার কালো শ্রমিক। জন্ম ১৮৪০ থেকে ১৮৫০ এর মধ্যে কোন এক সময়ে। আমেরিকার আর সব কালো মানুষদের একজন দাস হিসাবেই তার জন্ম, কিন্তু আমেরিকার সিভিল ওয়ারের পরে দাপ্রথা নিষিদ্ধ হলে- হেনরীও দাস জীবন থেকে মুক্তি পায়। বিয়ে করে পায় প্রিয় জীবন সঙ্গিনী পলি এনকে মতান্তরে মেরি ম্যাক ডেলিনকে (হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গানে জীবন সঙ্গিনী হিসাবে মেরি ম্যাক ডেলিনকে পাওয়া যায়)। ৬ ফুট লম্বা- ২০০ পাউন্ড ওজনের জন হেনরী শ্রমিক হিসাবে বিভিন্ন জায়গায় কাজ করে শেষে পশ্চিম ভার্জিনিয়ার টালকট শহরের সি এণ্ড ও রেইলরোড (Chesapeake and Ohio Railway) নির্মাণের কাজে যোগ দেয়। প্রচন্ড শক্তিধর এই মানুষটি অচিরেই রেলরোড নির্মাণ শ্রমিকদের নেতা হয়ে দাঁড়ায়।

আমেরিকার সিভিল ওয়ারের পরে দেশজুড়ে পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু হয়। একটি ধনী কোম্পানী চেজাপীক উপসাগর থেকে ওহিও উপত্যকা পর্যন্ত রেইললাইন বাসনোর কাজটির তত্ত্বাবধানে ছিল। জন হেনরীর কর্মস্থল- পশ্চিম ভার্জিনিয়ার টালকট শহর। রেললাইন বসানোর কাজ চলতে থাকে। একসময় সামনে পড়ে 'বিগ-বেণ্ড' নামে এক পর্বত যার পুরুত্ব প্রায় সোয়া এক মাইল। পর্বত কেটে সুরঙ্গ তৈরির সিদ্ধান্ত হয়। প্রায় ১০০০ কালো শ্রমিকের সাথে জন হেনরীও সুরঙ্গ তৈরির কষ্টকর কাজে নামে। দিনে ১২/১৪ ঘন্টা অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয়। জন হেনরী ছিল স্টিল ড্রাইভিং ম্যান, বা হ্যামার ম্যান। ইস্পাতের লম্বা শলাকার এক প্রান্ত পাথরের উপর ধরে থাকে একজন- আরেকজন হাতুড়ি দিয়ে শলাকার অপরপ্রান্তে জোরে আঘাত করে। এই করে পাহাড় কাটতে থাকে। কিন্তু- এতেও মন ভরে না ঐ কোম্পানীর, মন ভরে না সাদা সর্দারের। তার চাই আরো কাজ, আরো কাজ। আরো জলদি এবং কম লোকবলে- যাতে মুনাফা হয় সর্বাধিক। এই সময় সাদা সর্দার নিয়ে আসে স্টিম ড্রিল, যেটা দিয়ে খুব সহজে পাহাড় কাটা সম্ভব হবে। অজানা আশংকায় কেঁপে উঠে শ্রমিকরা। এই বুঝি গেল তাদের চাকরি। কাজ হারালে কাজ পাবে কোথায়? খাবে কি? প্রতিবাদ করে উঠে তারা। যন্ত্রকে মনে হয় সাক্ষাৎ শত্রু। স্টিম ড্রিল ভেঙ্গে ফেলতে উদ্যত হয়, যুদ্ধ ঘোষণা করে- যার নিশ্চিত পরিণতি ছিল কালোদের উপর আরো বেশী নির্যাতন। শ্রমিকদের সবচেয়ে শক্তিশালী, সবচেয়ে কর্মঠ- জন হেনরী শ্রমিকদের যন্ত্র ভাঙ্গার সেই যুদ্ধে বাঁধা দেয়। সে নিশ্চিত জানতো, একটা যন্ত্র ভাঙ্গলে সাদা প্রভু দশটা যন্ত্র আনবে, আর উল্টোদিকে তাদের কাজ তো যাবেই- সাথে জুটবে অনেক নির্যাতন। কিন্তু তাই বলে জন হেনরী যুদ্ধ বন্ধ করে দেয়? না, তা-ও না। সে সাদা প্রভুকে গিয়ে চ্যালেঞ্জ জানায়। যন্ত্রের চেয়েও মানুষের পেশী বেশী কাজ করতে সক্ষম। স্টিম ড্রিলের চেয়ে অধিক গতিতে জন হেনরী পাহাড় কাটবে। সাদা সর্দার তো পারলে হেসেই খুন। কিন্তু জন হেনরী দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। স্টিম ড্রিলের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করবে জন হেনরীর হাতুড়ি। শর্ত থাকে- সে যদি জিতে- তবে পুরো কাজে আর যন্ত্র ব্যবহার করতে পারবে না। শুরু হয় প্রতিযোগিতা! পাহাড়ে পাশাপাশি দুটো সুরঙ্গ কাটা শুরু হয়, একটি কাটে জন হেনরী- আরেকটি স্টিম ড্রিল। জন হেনরী দুহাতে নেয় ইয়া বড় হাতুড়ি। হাতুড়িই হেনরীর সম্বল। দিন-রাত পাহাড় কেটে যায়। হাতুড়ি চলতে থাকে অবিরাম।

পাহাড়ের অপর দিকে জমা হয় সহযোদ্ধা শ্রমিকেরা। ঘরে শিশু সন্তানকে রেখে এসে শ্রমিকদের সাথে দাঁড়ায় প্রাণ প্রিয় সঙ্গিনী মেরি ম্যাক ডিলেন। পাহাড়ের গায়ে তারা কান পাতে। কান পেতে হাতুড়ির শব্দ শোনার চেষ্টা করে। তাদের নেতা, প্রাণপ্রিয় মানুষ, ভবিষ্যৎ আশা-ভরসার স্থল জন হেনরী যে যুদ্ধ করছে, যন্ত্রের সাথে মানুষের যুদ্ধ। তারা অপেক্ষা করতে থাকে- সে কি উত্তেজনা, কে জিতবে? মানুষ কি পারবে ঐ ভয়ঙ্কর যন্ত্রের সাথে? অপেক্ষার প্রহর গুনতে থাকে, অবশেষে অপর দিক থেকে একটা ক্ষীণ শব্দ ভেসে আসে- পাহাড়ের গায়ে ভালো করে কান পেতে শুনার চেষ্টা করে- এটা জন হেনরীর হাতুড়ির শব্দ, নাকি ঐ দৈত্যরূপী স্টিম ড্রিলের? আশায় বুক বাঁধে, এটা হাতুড়ির শব্দ না হয়ে পারে না- পরক্ষণেই আশংকা এসে ভর করে- যদি এটা স্টিম ড্রিল হয়? উৎকন্ঠায় মেরি ম্যাক ডিলেনের শ্বাস-প্রশ্বাসটাও বন্ধ হওয়ার উপক্রম, কান পেতে নিবিষ্টভাবে শব্দটা শুনার চেষ্টা করে। অবশেষে সকলের অপেক্ষার সমাপ্তি ঘটে, পাহাড়ের দেয়ালটা হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পড়ে- সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখে সামনে দাঁড়িয়ে আছে তাদেরই জন হেনরী।

উল্লাসে ফেঁটে পড়ে সকলে। যন্ত্রের সাথে লড়াইয়ে মানুষ জিতেছে। কালো মানুষ জিতেছে, যন্ত্রের হারা মানে তো সাদা মানুষেরই হার! জন হেনরী কয়েক পা এগিয়ে এসে পিছে পাহাড়টার দিকে তাকায়। একটাই সুরঙ্গ চোখে পড়ে- যে সুরঙ্গ দিয়ে সে বেরিয়ে এসেছে, বুঝতে পারে জয় হয়েছে কালো মানুষের, শ্রমিকের। হাত দুটো উপরে তুলে উচিয়ে ধরে হাতুড়িটা। তারপরেই মাটিতে পড়ে যায়। ছুটে আসে মেরি ম্যাক ডেলিন। ছুটে আসে কালো শ্রমিক সহযোদ্ধারা। আর উঠে না জন হেনরী।

এই হলো- জন হেনরীর গল্প। কতখানি সত্য? কতখানি মিথ্যা? এটা একাডেমিশিয়েনদের ইতিহাস নয়, এটা উপকথা; আর উপকথা মানেই তো কল্পনার সংমিশ্রণ! এমনটাই আমাদের একাডেমিশিয়েনরা শিখিয়েছেন। মুখে মুখে লোকজন যেসব কিচ্ছা-কাহিনী, গল্পকথা- উপকথা বা রূপকথা তৈরী করে- সেগুলো আধেক সত্য- আধেক কল্পনা, মানে মিথ্যে। ফলে জন হেনরীর উপকথাও পুরো সত্য নয়, এখানেও কল্পনার মিশ্রণ আছে। কেননা এটা তো আর ইতিহাস নয়। এটা হচ্ছে আমেরিকান টল ফোকটেল। একাডেমিশিয়ানরা গবেষণা করছেন- এই উপকথার কতখানি সত্য, আর কতখানি কল্পনা। তা ওনারা করতে থাকুন। আমার কাছে- এটা একটা শোষণ-নির্যাতনের কাহিনী, একটা যুদ্ধের কাহিনী- যে যুদ্ধে যন্ত্র ও মানুষ মুখোমুখি- মুখোমুখি সাদা প্রভু ও কালো শ্রমিক, এবং এটা একই সাথে মানুষের জয়গাঁথাও বটে। যারা ইতিহাস/উপকথার সত্য-মিথ্যা নিয়ে খুব ভাবিত- তাদের বলি, অভিজাতদের রচিত ইতিহাসটাই বরং মিথ্যায় ভরা- নিজ গোত্রীয়দের চাটুকারীতায় ঠাসা; যারা এই উপকথার সত্যতা নিয়ে সন্দেহ তুলতে চান- তাদের বলি, কালোর উপর- শ্রমিকদের উপর সাদাদের-মালিকদের অত্যাচারের ঘটনা সত্য, অতি মুনাফার লোভে মানুষের পেটে লাথি মারার ঘটনা সত্য, তেমনি এর বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রামটাও জ্বলজ্বলে সত্য।

পরিশিষ্ট:
১। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গানটির লিরিক:

জন হেনরী, জন হেনরী-
নাম তার ছিল জন হেনরী
ছিল যেন জীবন্ত ইঞ্জিন
হাতুড়ির তালে তালে গান গেয়ে শিল্পী
খুশী মনে কাজ করে রাত-দিন
হো হো হো হো- খুশী মনে কাজ করে রাত-দিন।।

কালো পাথরে খোদাই জন হেনরী
কালো পাথরে খোদাই জন হেনরী
গ্রানাইট পেশী গড়া ঝলমল
হাতুড়ির ঘায়ে ঘায়ে পাথরে আগুন ধরে
হাতুড়ি চালানো তার সম্বল
হো হো হো হো - হাতুড়ি চালানো তার সম্বল।।

পশ্চিম ভার্জিনিয়ার রেলে সুরঙ্গে
পশ্চিম ভার্জিনিয়ার রেল সুরঙ্গে
পাথুরে পাহাড় কেটে কেটে
রেল লাইন পাতা হবে হেনরীর হাতুড়ির -
ঘায়ে ঘায়ে রাত যায় কেটে
হো হো হো হো - ঘায়ে ঘায়ে রাত যায় কেটে।।

জন হেনরীর চির প্রিয় সঙ্গিনী
নাম তার মেরি ম্যাক ডেলিন
সুরঙ্গের কাছে যেত কান পেতে শুনত
হেনরীর হাতুড়ির বিন
হো হো হো হো- হেনরীর হাতুড়ির বিন।।

সাদা সর্দার কাজ চায় আরো
সাদা সর্দার কাজ চায় আরো
স্টীম ড্রিল করে আমদানী
আশংকা হেনরীর মেশিনের কাছে বুঝি
পেশী নিবে পরাজয় মানি
হো হো হো হো- পেশী নিবে পরাজয় মানি।।

আমি মেশিনের হবো প্রতিদ্বন্দ্বী
আমি মেশিনের হবো প্রতিদ্বন্দ্বী
জন হেনরী বলে বুক ঠুকে
স্টীম ড্রিলের সাথে চলে হাতুড়ির পাল্লা
কে আর বলো তারে রোখে
হো হো হো হো- কে আর বলো তারে রোখে।।

সাদা সর্দার বলে হেসে হেসে
সাদা সর্দার বলে হেসে হেসে
কালো নিগারের দেখো দুঃসাহস
তোর যদি জয় হয়, হবে না সূর্যোদয়
দুনিয়াটা হবে তোর বশ
হো হো হো হো- দুনিয়াটা হবে তোর বশ।।

জন হেনরীর হাতুড়ির ঝলকে
জন হেনরীর হাতুড়ির ঝলকে
চমকায় বিজলীর গতি
মানুষের সৃষ্টি দুরন্ত স্টীম ড্রিল
মানুষের কাছে মানে নতি
হো হো হো হো- মানুষের কাছে মানে নতি।।

অগ্নিগিরি হলো রুদ্ধ
থেমে গেল হাতুড়ির শব্দ
হেনরীর জয়গান চারিদিকে উঠে জমে
হৃদপিন্ড তার স্তব্ধ
হায় হায় হায় হায়- হৃদপিন্ড তার স্তব্ধ।।

জন হেনরীর কচি ফুল মেয়েটি
জন হেনরীর কচি ফুল মেয়েটি
পাথরের বুকে যেন ঝরনা
মার কোল থেকে সে পথ চেয়ে আছে তার
বাবা তার আসবে না আর না
হায় হায় হায় হায়- বাবা তার আসবে না আর না।।

পাখির কাকলি ভরা ভোরে
পুবালী আকাশ যবে রঙ্গীন
পাখির কাকলি ভরা ভোরে
পুবালী আকাশ যবে রঙ্গীন
হেনরীর বীর গাঁথা বাতাসে ছড়িয়ে দিয়ে
সিটি দিয়ে চলে যায় ইঞ্জিন
হো হো হো হো - সিটি দিয়ে চলে যায় ইঞ্জিন।।

প্রতি মে দিবসের গানে গানে
নীল আকাশের তলে দূর
শ্রমিকের জয়গান কান পেতে শোন ঐ
হেনরীর হাতুড়ির সুর
হো হো হো হো- হেনরীর হাতুড়ির সুর।।

২। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গানটি এখান থেকে ডাউনলোড করা যাবে।

৩। জন হেনরীকে একটি ফোক গানের লিরিক:
JOHN HENRY
1. Some say he's from Georgia,
Some say he's from Alabam,
But it's wrote on the rock at the Big Ben Tunnel,
That he's an East Virginia Man,
That he's an East Virginia man.
2. John Henry was a steel drivin' man,
He died with a hammah in his han',
Oh, come along boys and line the track
For John Henry ain't never comin' back,
For John Henry ain't never comin' back.
3. John Henry he could hammah,
He could whistle, he could sing,
He went to the mountain early in the mornin'
To hear his hammah ring,
To hear his hammah ring.
4. John Henry went to the section boss,
Says the section boss what kin you do?
Says I can line a track, I kin histe a jack,
I kin pick and shovel too,
I kin pick and shovel too.
5. John Henry told the cap'n,
When you go to town,
Buy me a nine pound hammah
An' I'll drive this steel drill down,
An' I'll drive this steel drill down.
6. Cap'n said to John Henry,
You've got a willin' mind.
But you just well lay yoh hammah down,
You'll nevah beat this drill of mine,
You'll nevah beat this drill of mine.
7. John Henry went to the tunnel
And they put him in lead to drive,
The rock was so tall and John Henry so small
That he laid down his hammah and he cried,
That he laid down his hammah and he cried.
8. The steam drill was on the right han' side,
John Henry was on the left,
Says before I let this steam drill beat me down,
I'll hammah myself to death,
I'll hammah myself to death.
9. Oh the cap'n said to John Henry,
I bleeve this mountain's sinkin' in.
John Henry said to the cap'n, Oh my!
Tain't nothin' but my hammah suckin' wind,
Tain't nothin' but my hammah suckin' wind.
10. John Henry had a cute liddle wife,
And her name was Julie Ann,
And she walk down the track and nevah look back,
Goin' to see her brave steel drivin' man,
Goin' to see her brave steel drivin' man.
11. John Henry had a pretty liddle wife,
She come all dressed in blue.
And the last words she said to him,
John Henry I been true to you,
John Henry I been true to you.
12. John Henry was on the mountain,
The mountain was so high,
He called to his pretty liddle wife,
Said Ah kin almos' touch the sky,
Said Ah kin almos' touch the sky.
13. Who gonna shoe yoh pretty liddle feet,
Who gonna glove yoh han',
Who gonna kiss yoh rosy cheeks,
An' who gonna be yoh man,
An' who gonna be yoh man?
14. Papa gonna shoe my pretty liddle feet,
Mama gonna glove my han',
Sistah gonna kiss my rosy cheeks,
An' I ain't gonna have no man,
An' I ain't gonna have no man.
15. Then John Henry told huh,
Don't you weep an' moan,
I got ten thousand dollars in the First National Bank,
I saved it to buy you a home,
I saved it to buy you a home.
16. John Henry took his liddle boy,
Sit him on his knee,
Said that Big Ben Tunnel
Gonna be the death of me,
Gonna be the death of me.
17. John Henry took that liddle boy,
Helt him in the pahm of his han',
And the last words he said to that chile was,
I want you to be a steel drivin' man,
I want you to be a steel drivin' man.
18. John Henry ast that liddle boy,
Now what are you gonna be?
Says if I live and nothin' happen,
A steel drivin' man I'll be,
A steel drivin' man I'll be.
19. Then John Henry he did hammah,
He did make his hammah soun',
Says now one more lick fore quittin' time,
An' I'll beat this steam drill down,
An' I'll beat this steam drill down.
20. The hammah that John Henry swung,
It weighed over nine poun',
He broke a rib in his left han' side,
And his intrels fell on the groun',
And his intrels fell on the groun'.
21. All the women in the West
That heard of John Henry's death,
Stood in the rain, flagged the east bound train,
Goin' where John Henry dropped dead,
Goin' where John Henry dropped dead.
22. John Henry's liddle mother
Was all dressed in red,
She jumped in bed, covered up her head,
Said I didn't know my boy was dead,
Said I didn't know my boy was dead.
23. They took John Henry to the White House,
And buried him in the san',
And every locomotive come roarin' by,
Says there lays that steel drivin' man,
Says there lays that steel drivin' man.

৪। জন হেনরীকে নিয়ে গানের বিভিন্ন ভার্সনের লিরিক পাওয়া যাবে এই লিংকে

৫। এছাড়া এই লিংকে জন হেনরীকে নিয়ে আরো অনেক অডিও গানের লিংক পাওয়া যাবে।

৬। এই লিংকে গেলে জন হেনরীর কাহিনীটা পাওয়া যাবে।

৭। উইকি পিডিয়ার লিংক

৮। ডিজনীর তৈরী জন হেনরীকে নিয়ে এনিমেশন ফিল্ম:


৯। এই ভিডিওতে কয়েকটা গান পাওয়া যাবে:

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29086774 http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29086774 2010-01-27 18:21:18
বিবর্তনে বাংলার গান: আজকের হালচাল এক
এফ.এম রেডিও শোনা হয় কেবল অফিসের গাড়িতে চড়লেই। বিশেষ করে জ্যামে আটকা পড়লে টাইম পাসের জন্য এফ.এম রেডিও এর চ্যানেলগুলো ঘুরাতে থাকি। রেডিও ফুর্তি, এবিসি, রেডিও টু-ডে, রেডিও আমার। ঘুম থেকে তড়িঘড়ি করে অফিসে যাওয়ার জন্য প্রায়দিনই ডেইলী নিউজ পেপারটা না পড়েই গাড়িতে চড়ে বসি- ফলে দিনের প্রথম খবরগুলো পাই এই রেডিও চ্যানেলগুলো থেকেই। ঘন্টায় ঘন্টায় খবর প্রচারিত হয়- ঐ সময়টাতে গাড়িতে থাকলে তা শুনি। বাকি সময়টাতে এ্যাড আর বকর-বকর এর ফাঁকে ফাঁকে গান- গানের খোঁজে এ চ্যানেল ও চ্যানেল ঘুরাঘুরিও কম করা হয় না। যাহোক, আজকের পোস্টের মূল উদ্দেশ্য এফ.এম রেডিও নয়, গানবাজনার হালচাল নিয়ে দু-চার কথা বলতে চাই। এবং শুরুতেই বলে নিচ্ছি যে, এসমস্ত বিষয়ে আমার জানা-বুঝা খুব কম, এগুলো সম্পর্কে আমার কিছু অভিজ্ঞতা, বিশেষ করে আমার অনুভূতি, মনোভাব এগুলোই একটু লিখতে চাচ্ছি।

মূলত এফ.এম রেডিও'র সুবাদে আজকালকার গানগুলো শোনার সুযোগ হয়। অনকে সময়ই রেডিও জকিদের বকর বকর এভোয়েড করা সম্ভব হয় না বলে শ্রোতাদের পাঠানো ম্যাসেজগুলোও শুনি, সেখান থেকে আজকের ইয়ং জেনারেশনের (ধারণা যে- ইয়ংরাই- টিনএজাররাই মূল শ্রোতা) পছন্দ/অপছন্দগুলো বুঝার চেষ্টা করি। ৩১ ডিসেম্বরে কোন রেডিও চ্যানেলে যেন শ্রোতাদের জরিপে ২০০৯ সালের সেরা ১০ গান নির্বাচিত করা হয়েছে- যার ১ম গান হাবিব-ন্যান্সি জুটির দ্বিধা, এছাড়াও আছে ফুয়াদ, শিরিন, বাপ্পা, মিলা, আনিলা .... এমন নানা নাম এবং আরো কিছ ব্যান্ডের নাম (অনেকের নাম আসলে মনে রাখতে পারিনি)। এফ.এম রেডিও এর কল্যানে জনপ্রিয় এ গানগুলোর অধিকাংশই শোনা হয়েছে। এগুলো শুনতে কেমন লাগে, কি অভিজ্ঞতা সেটা দিয়েই শুরু করি।

গত ডিসেম্বর মাস ছিল বিজয়ের মাস। ফলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়কালীন গানগুলো (স্বাধীন বাংলার বেতার কেন্দ্রের গান) রেডিও চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত হয়েছে। এটাই কাম্য। ছোটবেলা থেকেই ১৬ই ডিসেম্বর, ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চে পাড়া-মহল্লায় মাইকে, টেলিভিশনে এই গানগুলো শুনে আসছি। এফ.এম রেডিওতেও এ গানগুলো প্রচারিত হবে- সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এবার ডিসেম্বরে অবাক হয়ে প্রথমে শুনলাম নজরুলের একটা বিখ্যাত গান: "দুর্গম গিরি কান্তার-মরু দুস্তর পারাবার
লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে যাত্রীরা হুশিয়ার! ..."- কান্ডারী হুশিয়ার গানটি। অবাক হলাম, কারণ এই অসাধারণ গানটি এতদিন যেভাবে শুনে এসেছি- এবার সেভাবে নয়- একটু অন্যভাবে শুনলাম। বিকট সব আওয়াজ, বাজনা- যাকে মনে হয় বলা হয় হার্ড মেটাল, এবং সেই সাথে উৎকট চিৎকার-চেচামেচি। ব্যান্ড আর্টসেলের পরিবেশনা। শুধু এই একটি গান নয়- পুরো ডিসেম্বর জুড়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গানগুলোর অনেক কটিরই এইরকম উৎকট পরিবেশনা পর্যায়ক্রমে সবগুলো চ্যানেলে চলেছে (তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর, নোঙ্গর তোল, রক্ত দিয়ে নাম লিখেছি, সোনায় মোড়ানো বাংলা, একটি ফুলকে বাচাবো বলে, পূর্ব দিগন্তে- কে গেয়েছে তা মনে নেই)। অবাক ব্যাপার- এই গানগুলো যাতে না চালানো হয়- এমন প্রতিবাদ বা অনুরোধ সম্ভবত রেডিও জকিরা পায়নি এবং মজার ব্যাপার হচ্ছে- এই গানগুলো বাজানোর জন্য মাঝে মধ্যেই শ্রোতারা অনুরোধ জানাতো!! আমি বেশ কনফিউজড- এগুলো কি কেবল আমার কানেই এমন যন্ত্রণার অনুভূতি তৈরী করছে? অন্যদের কি মত? সমর্থন পেলাম কলিগের কাছ থেকে- সেও প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে রেডিও বন্ধ করতে বলে। কিন্তু কলিগের বয়স তো আমার বয়সের কাছাকাছি- মানে আমরা একই জেনারেশনের- নতুন জেনারেশনের আর সবার টেস্ট কেমন? বুঝতে পারছি না।

কিছু বিপরীত যুক্তিও শুনলাম। বেশ অকাট্য যুক্তি। যুক্তি খুব শক্ত হলেও কেন যেন মানতে পারছিলাম না। বেয়াড়াভাবে পাল্টা প্রশ্ন করতে থাকি...
: গানগুলোর প্রেজেন্টেশন যেমনই হোক- আজকের ছেলে-পেলেরা এর ফলেই এইসব গান বেশী করে শুনছে। অন্তত আমাদের সময়কার চেয়ে এখন এসব গানের চর্চা বেশী হচ্ছে- ইয়ং জেনারেশন এই গানগুলোতে আকৃষ্ট হচ্ছে।
: ঐ গানগুলো এভাবে শুনেই বা কি লাভ? কোথায় অরিজিনাল গান আর কোথায় এসব চিল্লা-ফাল্লা!
: এগুলো হচ্ছে নতুন সময়ের নিদর্শন, সময়ের সাথে সাথে সব কিছুই বিবর্তিত হয়। এটাকে তো মানতেই হবে। প্রশ্ন হচ্ছে- বিবর্তনের পথে আমাদের রুটকে পুরো অস্বীকার করা হচ্ছে কি না! এইদিক থেকে মনে হয়- আজকে স্বাধীন বাংলার বেতার কেন্দ্রের গানগুলো, লালনের গান, ফোক গান, প্রান্তিকজনের গানগুলোর চর্চা হচ্ছে। এটাকে তো পজিটিভ বলতেই হবে।
: কিন্তু যে ঢং এ চর্চাটা হচ্ছে- তাতে ভালো কিছু হচ্ছে? লালন ব্যান্ডের গাওয়া লালনের গান, আর্টসেলের গাওয়া স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান, শিরিনের গাওয়া শেফালি ঘোষের গানে অরিজিনাল লালনের গান, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান, শেফালি ঘোষের গানের ছিটেফোটাও কি পাওয়া সম্ভব? চিৎকার করে "দুর্গম গিরি কান্তার-মরু দুস্তর পারাবার" গাওয়া আর চিৎকার করে "ওহু- আহু- ইয়া" টাইপের গান- দুয়ের মধ্যে কি পার্থক্য?
: পার্থক্য তো আছেই। "আমি একাকী" বলে চিৎকার করা আর "দুর্গম গিরি কান্তার-মরু দুস্তর পারাবার" বলে চিৎকার করার মধ্যে অবশ্যই পার্থক্য আছে। এসব গান এখন যেভাবেই গাওয়া হোক না কেন- এদের মাধ্যমে অন্তত পরিচিতিটা তো ঘটছে। পরে শ্রোতারা যখন অরিজিনাল গান শুনবে- তখন নিশ্চয়ই পার্থক্যটা ধরতে পারবে। আনুশেহ'র মুখে লালন শুনে পরে ফরিদা পারভীনের ভক্ত হয়েছে এমন নজীর অনেক আছে।
: আমার সন্দেহ আছে। হাবিবের মাধ্যমে শাহ আব্দুল করিম, লালন ব্যান্ডের মাধ্যমে লালন, শিরিনের মাধ্যমে শেফালি ঘোষ, আর্টসেলের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গানগুলোতে আদৌ কেউ ঢুকতে পারবে বলে মনে হয় না! এইসব শুনলে তো কানটাই নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা!
: কান এত সহজে নষ্ট হওয়ার জিনিস না। একটা বয়সে একটু হই হুল্লোড় ধাচের গান সবাই শুনে, পরে ধীরে ধীরে এমনিতেই রুচি পরিবর্তিত হয়। সবচেয়ে পজিটিভ দিক হচ্ছে- দশ বছর আগেও ঝাকা-নাকা টাইপের গানের জন্য আমরা হিন্দী-ইংলিশ গানের উপর নির্ভরশীল ছিলাম। কোন পার্টিতে, বা ঈদে-পুঁজায় পাড়া-মহল্লার উঠতি বয়সী ছেলেরা সাউন্ড বক্স এ হিন্দী গান যে হারে বাজাতো আজ কিন্তু তা অনেক কমেছে। কেননা, সাউন্ড বক্সে বাজানোর মত গান আজ এখানেই তৈরি হচ্ছে।
......

তারপরেও আমি কনফিউজড। বুঝতে পারি না- এসবে ভালো কি হচ্ছে! আমার কাছে হিন্দী "ওলে ও - ওলে ও অ", বা "তু তু তু তারা" আর শিরিনের "মাতোওয়ালি", "পাঞ্জাবিপয়ালা" বা মিলার গানগুলোর মধ্যে ইতর বিশেষ নেই। আর, রেমিক্সের নামে যেগুলো হচ্ছে- শচীন দেব বর্মনের গান, বা চিত্রা সিং এর গানগুলোকে যেমনে গাওয়া হচ্ছে- শুনলে তো মেজাজ খারাপ হয়ে যায়! যেসময় ব্যান্ড ফিডব্যাক আর মাকসুদের গান খুব শুনতাম (এবং যখন রবীন্দ্র সংগীত শুনতে তেমন একটা ভালো লাগতো না- বাবা-মামাদের শুনতে দেখতাম ও ভাবতাম এগুলো বুড়োদের গান)- সেই সময়েও মাকসুদের কন্ঠে রবীন্দ্রসংগীত খুব খারাপ লেগেছিল এবং প্রিয় একজন শিল্পী এমন যখন জঘণ্য কাজ করেছে বিধায় লজ্জিতও হয়েছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় হলে বিভিন্ন রুমে ফুল ভলিউমে যখন আনুশেহ'র লালন বাজতো- লালনের ও ফরিদা পারভিনের ভক্ত হিসাবে- তখনও খুব খারাপ লাগতো। তারপরেও আনুশেহ'র গান শুনে মনে হয়েছে- তার গায়কি খুব একটা খারাপ না- কেবল মডার্ন মিউজিকের আধিক্য বাদ দিয়ে দেশীয় ইন্সট্রুমেন্ট ব্যবহার করলেই তা উতরে যেত! কিন্তু- এখন লালন নামের ব্যান্ডের মেয়েটা যা গায়- সেটা পুরো অখাদ্য ছাড়া কিছুই মনে হয় না।

পাশ্চাত্য বাজনার আধিক্যকে মনে হয় সকলে এখন স্বাগতই জানায়, অন্তত আমার মত সেকেলে অবস্থায় থাকতে কেউ রাজী নয়! এমন ধারণা হয়েছে- জাতীয় সম্পদ রক্ষা সংস্কৃতি মঞ্চের সাংস্কৃতিক সমাবেশে উপস্থিত হয়ে। সেখানে অরূপ রাহী'র গানে ঢিম-ঢুম আওয়াজে তার চিৎকারও পর্যন্ত ঠিকভাবে বুঝতে পারছিলাম না। অথচ খালি গলায় রাহীর "তুমি সেই সোনার কিষাণ" গানটা শুনে ভালোই লেগেছিল। সংস্কৃতি মঞ্চে যখন পাশ্চাত্য মিউজিকের আধিক্য সহকারে গানগুলো গাওয়া হচ্ছিল- এমনকি সমগীত কিংবা কৃষ্ণকলির গাওয়া গণসংগীতেও যখন একই অবস্থা দেখি, তখন বুঝতে পারি- এতো আমারই সমস্যা! যুগের আহবানকে অস্বীকার করা মোটেও উচিৎ নয়। আর, "সংস্কৃতি মঞ্চ" যুগের সাথে তাল মেটাবেই না বা কেন?

আসলেই কি তা-ই? আপনাদের কি মত?
=============================================

দুই
আরো বেশ কিছু যুক্তি পাচ্ছি। সেগুলোকে নিয়ে এবং আমার কিছু বেয়াড়া প্রশ্ন/আলোচনা নিয়ে এই পর্বটা কন্টিনিউ করছি:

: আসলে ব্যাপারটা সময়ের চাহিদা ছাড়া কিছুই না, আপনার কাছে শুনতে খারাপ লাগছে বা আমার কাছে শুনতে খারাপ লাগছে সেটা আমাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার, বড় ব্যাপার হচ্ছে যে অনেকেই এই সব গান শুনছে, মানুষ শুনছে জন্যই তৈরি হচ্ছে .....। গান তো আমরা শুনি বিনোদন পাওয়ার জন্যে, আনন্দ পাওয়ার জন্য, কেউ যদি এসব শুনে আনন্দ পায় তাহলে আনন্দ পাক না! তাদের সাথে হয়তো আপনার রুচিটা মিলছে না... একেক জনের রুচি একেক রকম হবে এটাই তো স্বাভাবিক, তাই না?
: একেক জনের রুচি একেক রকম হবে- এটা যেমন স্বাভাবিক- তেমনি নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর নির্দিষ্ট ধরণের রুচি দেখা যায়- যেখান থেকে এটাও বুঝতে পারি যে- এই রুচিগুলো বাই বর্ণ পাওয়া না- এগুলো তৈরি হয়- চর্চার মাধ্যমে পরিপুষ্ট হয়। মাকসুদের গাওয়া রবীন্দ্র সংগীতের বিরুদ্ধে ছায়ানটকেই সবচেয়ে বেশী সোচ্চার দেখেছিলাম। ফরিদা পারভিনকে যখন সাক্ষাতকারে জিজ্ঞাসা করা হয় যে, "আজ যে লালনের গান নিয়ে ফিউশন হচ্ছে- সেগুলোকে কিভাবে মূল্যায়ন করেন?"- তার জবাবে তিনি বলেন: "ফিউশন হচ্ছে- হতেই পারে- কিন্তু সবার আগে তো এগুলোকে শ্রাব্য হতে হবে। আজ যা হচ্ছে- তার কোনটা কি শ্রাব্য?" একজন যে বিশুদ্ধ সঙ্গীতের শ্রোতা অর্থাৎ রবীন্দ্র-নজরুল বা ক্লাসিকাল মিউজিক এর যে শ্রোতা বা যে এধরণের সঙ্গীতের চর্চার মধ্যে আছেন- তাদের কাছে - তাদের কানে আর্টসেল, ব্লাক, অর্থহীন, মিলা, শিরিনদের গান বা চিৎকার চেচামেচী ও উৎকট বাজনা কেমন লাগতে পারে? প্রশ্নটা উল্টোভাবে করলেও জবাব কি মিলবে (অর্থাৎ আর্টসেল, মিলা, শিরিনদের গানের শ্রোতাদের কাছে ক্ল্যাসিকাল মিউজিক কেমন লাগে)?

আবার, সবাই বা বেশীরভাগ কি গান পছন্দ করছে- সেটা দিয়েও ভালো গানের বিচার করা কি যায়? এ মুহুর্তে বাংলাদেশে ক্যাসেট/সিডি বিক্রির তালিকার শীর্ষে আছে মমতাজ ও আসিফ- অথচ এদের গানের রিকোয়েস্ট কিন্তু রেডিও চ্যানেলগুলোতে তেমন শুনিনি। এখানে ক্লাসটাও গুরুত্বপূর্ণ। হার্ড রক, হেভি মেটাল গান কাদের টানছে? তাহলে এই রুচির পার্থক্যটা গোষ্ঠীভেদে, শ্রেণীভেদে পার্থক্য হচ্ছে কেন? সিনেমার ক্ষেত্রেও একইরকম প্রযোজ্য। মধ্যবিত্তদের হলে টানার জন্য তানভির মোকাম্মেল, হুমায়ুন আহমেদ, মোস্তফা সারোয়ার ফারুকি, তারেক মাসুদরা যতই চেষ্টা চরিত্র করুক না কেন- এটাকে অস্বীকার করার উপায় নেই যে, মান্না বেঁচে থাকতে মান্নার হাতেই সবচেয়ে বেশী সিনেমা থাকতো। শোবিজ জগতে ডিপজলের ডিমান্ড যেকোন সময়েই জাহিদ হাসান, অপি করিম, চঞ্চল চৌধুরী'র চেয়ে বেশী। মানে- এগুলোরও কাটতি মানুষের কাছে ছিল বা আছে- যতই মধ্যবিত্ত, উচ্চ-মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত শ্রেণীর দর্শকেরা নাক সিটকাক না কেন (অবশ্য উচ্চবিত্তদের জন্য আছে হলিউডি, বলিউডি মুভি- স্টার সিনেপ্লেক্সে কোন ধরণের সিনেমাগুলো স্থান পায়- সেটাও খুব দ্রষ্টব্য)।

এখন কথা হচ্ছে, ময়ুরির নাচের কাটতি খুব আছে বলেই কি- সেটা খুব ভালো কিছু? অন্যের রুচি নিয়ে আমি আপত্তি তুলছি না, তাদের রুচিকে উড়িয়েও দিচ্ছি না। মান্না/ময়ুরির সিনেমা বা আসিফ-মমতাজ (মমতাজের কন্ঠ মানে গলা আমার খুব ভালো লাগে)-আর্টসেল-অর্থহীন-শিরিন-মিলার গানগুলো বন্ধ করার কথাও বলছি না, বরং বন্ধের বিরোধিতাই করি। কারণ- মেইনস্ট্রিমের বাংলা সিনেমাগুলোর যারা দর্শক- তাদের সিনেমাই হচ্ছে একমাত্র বিনোদনের জায়গা, সেটাকেও তো কেড়ে নিতে পারি না। ভালো কিছু দিতে না পারলে- এগুলোই তারা দেখবে- এটাই স্বাভাবিক। একইভাবে, শিরিন-মিলা-হাবিবরা, আর্টসেল-ব্লাকরা যাদেরকে আকৃষ্ট করছে- সেই ডিজুস জেনারেশনকেও তো অলটারনেটিভের স্বাদ দিতে হবে আগে। শুন্যতা তো সেখানেই! আর- সবচেয়ে বড় বিপদ হচ্ছে বাজার সংস্কৃতি। বাজার যখন সংস্কৃতিকে গাইড করে তার চেয়ে ভয়ংকর আর কিছু হয় না- সেটার ফলাফলই হচ্ছে এসব কিছু।

: একটু চিন্তা করে দেখুন আপনার সময় আপনি যে গানগুলো বা তার প্রেজেন্টেশন স্টাইলকে খুব ভালো বলে জেনেছেন তাকেই আপনি ভালো বলছেন... এখন যারা এই সব শুনছে তারাও তো তেমন ই বলতে পারে ....
: হ্যাঁ - এটাতো স্বীকার করিই। একটা সময়ে নজরুল-রবীন্দ্রনাথের গানের যতটুকু চর্চা ছিল- ভালো না লাগলেও পরিবারের গার্জিয়ানেরা যতখানি বাজাতো- তা শুনতে হতো; এখন সে পরিমাণ চর্চা হয় বলে মনে হয় না। বা চর্চা না হলেও- সেসময়ে কিম্ভুত গানগুলো অত শুনতে হতো না। ডিশ কালচার ছিল না, বাংলা চ্যানেলও এত এত ছিল না। সবে ধন নীল মনি ছিল বিটিভি। বিটিভি'র যতই সমালোচনা থাকুক না কেন- এর একটা দায়িত্ববোধ ছিল। সেদিন মোস্তফা মনোয়ারের এক সাক্ষাতকার শুনছিলাম। তিনি বলছিলেন: "প্রাইভেট বাংলা চ্যানেলগুলো দেখতে পারি না। সবগুলোর প্রায় সব অনুষ্ঠানই এত তরল যে দেখা যায় না। এরা তো কেউ কোন রেসপন্সিবিলিটি নেয় না। দেখুন- বিটিভিতে আমরা প্রতিরাতে ১১টা, সাড়ে ১১ টায় সুর লহরী নামে একটা অনুষ্ঠান প্রচার করতাম। গোটা বাংলাদেশ মিলে এর দর্শক খুব বেশী হলে কত হবে? পাঁচ হাজার? বা তারো কম? তারপরেও এটা প্রচার করা হতো। এটাই হলো দায়িত্ববোধ"। (মূল ভাবটা নিজের ভাষায় লেখা)।

আজকে আসলেই- চর্চাটা নেই। টিভি চ্যানেল ঘুরালেই মিউজিক এক্সপ্রেস, গ্লামার ওয়ার্ল্ড, .... আরো নানা ধরণের গানের অনুষ্ঠান, এফ.এম রেডিওতেও গান বাজছে- কিন্তু এগুলোতে সারাদিন চলছে মিলা-শিরিন-হাবিব-ফুয়াদ। ফেরদৌসিকে, নীলুফার ইয়াসমিনকে, কলিম শরাফিকে, কাদেরি কিবরিয়াকে চিনবে কেমনে? মনে আছে- ছোটবেলায় বিটিভিতে সন্ধার সময়ে পল্লীগীতির অনুষ্ঠান হতো- ঐ সময় সে গানগুলো নিজ থেকে মোটেও শুনতাম না; তারপরেও দেখা গেছে- নানা বেড়াতে আসলে- তার কোলে বা পাশে বসে শুনছি- কারণ নানার ঐ অনুষ্ঠানই ছিল প্রিয় অনুষ্ঠান। এসো গান শিখি নামে একটা অনুষ্ঠান হতো, সেটা দেখার জন্য মা-বাবা উৎসাহিত করতো। এই চর্চাগুলো না থাকলে- আমার মনে হয়, আমার রুচিটা পরিবর্তিত হতো না। মাইলস-সোলস-ফিডব্যাক-জেমস বা এ.আর.রহমান বা এইস অব বেইস, মাইকেল জ্যাকসন, ম্যাডোনা, এভারগ্রীন লাভ সংস- এগুলোও এককালে খুব শুনেছি স্বীকার করছি! কিন্তু অলটারনেটিভগুলোও তখন খুব এভেইলেবল ছিল।

: হয়তো আর্টসেল এর ঐ গানটার প্রেজেন্টেশন আপনার ভালো লাগেনি, ঠিকাছে ভালো না-ই লাগতে পারে ... এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু আপনি আর্টসেলের "দুঃখ বিলাস", "অনিকেত প্রান্তর", "ধুসর সময়" এই গানগুলো শুনলে মনে হয় আর্টসেল সম্পর্কে আপনার ধারণা বদলে যাবে ..... আর আর্টসেল হচ্ছে বাংলাদেশের একমাত্র প্রগতিশীল মেটাল ব্যান্ড। শুধু আমাদের সংস্কৃতি না বর্তমান পৃথিবীর অন্য দেশগুলোর সাথে তুলনা করতে গেলেও আর্টসেলই বাংলাদেশকে রিপ্রেজেন্ট করার জন্য সেরা ব্যান্ড।
: ইউটিউবে "দুঃখ বিলাস", "অনিকেত প্রান্তর", "ধুসর সময়", "চিলে কোঠার সেপাই", "উৎসবের উৎসাহে" গানগুলো শুনলাম। এবং দুঃখের সাথে জানাতেই হচ্ছে- আমার ভালো লাগেনি। ভালো লাগেনি বলাটাও যথেস্ট মনে হচ্ছে না- আমার কাছে ফালতু মনে হয়েছে, এবং "অনিকেত প্রান্তর" গানটা ৯ মিনিট ধরে শুনতে গিয়ে মাথা ধরে গিয়েছিল। (যাদের এসব গান খুব ভালো লাগে - তাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করছি- এভাবে বলার জন্য, এটা একান্তই আমার অনুভূতি ও রুচি)। গানগুলোর সুরে কিছুই পেলাম না হই হুল্লোড় ছাড়া, গায়কের গায়কি/কন্ঠ/গলা একঘেয়েমি ফ্ল্যাট - মনোটোনাস (ব্ল্যাকের তাহসানের গলাও তো দেখি একইরকম, মেটাল যারা গায়- সবার গলা একই রকম নাকি?)। এরা কি কেউ গলা সাধে না নাকি? কলিম শরাফী, নীলুফার ইয়াসমিন, ফরিদা পারভিন ... এনাদের কন্ঠ, কন্ঠের কারুকাজ, উঠা নামা- নিয়ন্ত্রণ- এগুলো কি রাতারাতি হয়েছে? কি পরিমাণ সাধনা করতে হয়- আজকালকার এই সব হিট গায়করা কি তা জানে? শচীন কর্তার গানের একটা অনুষ্ঠানে ছিলাম। সেখানে কিরন চন্দ্র নিজেকে শচীন কর্তার শিষ্য হিসাবে উল্লেখ করে বলছিলেন : "সারাজীবন সাধনা করেও শচীন কর্তার গান শুদ্ধভাবে গাওয়া সম্ভব না। তাই আমি শচীন কর্তার গান গাওয়ার সময়ে সব সময়ই খুব ভয়ে থাকি- খুব নার্ভাস থাকি, এই বুঝি ভুল করে বসলাম!" আর, কি অবলীলায় শচীন কর্তার গানের রিমিক্স করে যায়! এমন শিল্পীকেও চিনি যিনি নজরুল একাডেমি, বুলবুল একাডেমিতে পাঁচ/সাত বছর শিখেও স্টেজে উঠতে ভয় পান- এখনো নজরুল সঙ্গীতটা ঠিকভাবে আয়ত্ত করা হলো না বলে- আর এরা অবলীলায় "দুর্গম গিরি ..." গেয়ে যাচ্ছে! চর্চার দরকার কি- নিজেরা যেভাবে যে স্টাইলে গাইলো- সেটাই তো সবাই খাবে। ফলে কোন সমস্যা তো নেই!

আর, সবচেয়ে প্রগতিশীল মেটাল ব্যান্ড বলতে কি বুঝায়? মেটাল ব্যান্ডগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রগতিশীল? অন্য মেটাল ব্যান্ডের সাথে তুলনা করতে পারবো না- কারণ কোন মেটাল ব্যান্ড সম্পর্কেই জানি না। কিন্তু প্রগতিশীলই বলা হচ্ছে কোনদিক দিয়ে? "প্রগতিশীল" আসলে কি বুঝি? এরা কি করেছে? পাশ্চাত্যে বিটলস, জ্যাজ এমন অনেক গোষ্ঠীকে প্রগতিশীল বলা হতো, কারণ তারা মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে জড়িত ছিল, রাস্তায় রীতিমত পুলিশের সাথে ফাইটও করেছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় মার্কিন যুদ্ধনীতির বিরুদ্ধে, কালো মানুষের লড়াইয়ে অনেক প্রগতিশীল গান হয়েছে। পিট সিগাল তো জেলেও গিয়েছিলেন। কিন্তু এখানকার মেটাল ব্যান্ডগুলো কি করেছে? আমি আসলেই জানি না। আর, বাংলাদেশকে রিপ্রেজেন্টের কথা যেটা হচ্ছে- সেটার সাথে মোটেই একমত নই। আমাদের দেশকে রিপ্রেজেন্ট করতে পারে একমাত্র আমার দেশের কৃষ্টি-কালচার। পাশ্চাত্যকে অনুকরণ করে আমরা যেগুলো তৈরি করছই- তা ককরে আমাদের দেশকে রিপ্রেজেন্ট করতে পারে?

: মেটাল গানের চিৎকার (screaming) অনেকেই সহজভাবে নিতে পারেনা। কিন্তু আমরা যারা মেটাল ভালবাসি তাদের কাছে এটা হলো আবেগের বহিপ্রকাশ। আমি উদাহরণ দিয়ে বলি: আর্টসেলের "উতসবের উতসাহে" গানটির কথা এরকম:... "তখন ভাঙতে হবে ঘর, হাতে রেখে হাত হেরে যাওয়াকে বন্দি করে রেখে জাগতে হবে রাত আলো জ্বেলে রেখে উতসবের উতসাহে" আপনি গানটা শুনলে বুঝবেন গানটা মেটাল/ হার্ডরক হওয়াতে এটা আবেগের যে প্রকাশ হয়েছে সেটা অন্যভাবে হয়তো হতনা। মেটাল গান আমাদের আবেগ বুকের গভীর থেকে টেনে বের করে আনে। বর্তমান তরুন সমাজ হতাশাগ্রস্থ, আমাদের জীবন খুব জটিল, এটা আমাদের চেয়ে ভালো কেও বুঝেনা, আমরাও একে অপরেরটা বুঝিনা, হতাশার মূহুর্তে মেটাল গান সাথে ঠোট মিলিয়ে আমরা আবেগটাকে বাইরে ছুড়ে দিতে পারি। মেটাল গান আমাদের অনেকভাবে অনুপ্রেরনা দেয়। "লক্ষ্য হারিও না, স্বপন ছেড়না, ডাকছে জীবন তুমি বসে থেকনা, তুমি কি সাড়া দিবে, আবারো কি সাড়া দিবে?" ব্ল্যাকের গানের এ লাইন যে আমাকে কত সময় অনুপ্রেরনা দিয়েছে আমি বুঝাতে পারবনা, লিরিকস নয় গান গাওয়ার ধরনের জন্যই এটা সম্ভব হয়েছে। মেটালিকার এ গানের screaming শুণ অনেকেই ভাবে এটা কি কোনো গান? অথচ লিরিকস দেখেন: "Lady Justice Has Been Raped... See More Truth Assassin Rolls of Red Tape Seal Your Lips Now You're Done in Their Money Tips Her Scales Again Make Your Deal Just What Is Truth? I Cannot Tell Cannot Feel" আপনি হয়তো গানটাকে বলবেন "চিৎকার" কিন্তু এই চিৎকার আমার কাছে বাস্তবতাকে ঘিরে কিছু আবেগের প্রকাশ।
: এবারে চিৎকারের একটা উপযোগিতাও বুঝতে পারছি। অর্থাৎ এইভাবে গাওয়াটা এক রকম আবেগের বহি:প্রকাশই বটে। এবং এখান থেকে অনুপ্রেরণা লাভ করাও সম্ভব। আমি আসলেই জানতে চাচ্ছিলাম ও বুঝতে চাচ্ছিলাম - এই গানগুলো কেন অনেকের এত ভালো লাগছে, এগুলোতে আসলে কি আছে, কোন উপাদানের জন্য এই জেনারেশন এই গানগুলোর এত ভক্ত! ভালো লাগার কিছু কারণ/উপাদান পাওয়া গেল। এই ঢং এ গাওয়াতে আবেগের যে বহিপ্রকাশ ঘটে সেটা শ্রোতাকে নাড়া দেয় এবং অনুপ্রেরণা পাওয়া যায়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- আমরা অনেকে কেন সেই আবেগটাকে ধরতে পারছি না? আমাদেরই সীমাবদ্ধতা হয়তো! অনুপ্রেরণাটাও পাচ্ছি না- কারণ গানটাই যখন বিরক্তি উদ্রেক করছে- তখন এর কথায় মনোযোগ দেয়ার উপায় থাকে না। ভাবছি- "মুক্ত করো ভয়- আপনা মাঝে শক্তি ধরো নিজেরে করো জয়", বা "ক্লান্তি আমায় ক্ষমা করো প্রভু- পথে যদি পিছিয়ে, পিছিয়ে পড়ি কভু" বা "হাল ছেড়ো না বন্ধু- বরং কন্ঠো ছাড়ো জোরে" বা "ডিঙ্গা ভাসাও সাগরে সাথীরে", বা "কিসের ভয় সাহসী মন লাল ফৌজের ..", "পাল উড়াইয়া দে", "কারার ঐ লৌহ কপাট" প্রভৃতি যেসব গান আমাদের দারুন অনুপ্রেরণা দেয়- সেগুলো কি এসব মেটাল গানের শ্রোতারা শুনে, বা শুনলে কি তারা কোন অনুপ্রেরণা পায় না? (অনুপ্রেরণার জন্যে কেবল এই গানগুলোই শুনতে হবে- ওগুলো শুনা যাবেনা তা বলছি না)। আর, সঙ্গীত তো কেবল অনুপ্রেরণা পাওয়ার জন্যে না, মনের নানা বিচিত্র অনুভূতি নিয়ে সঙ্গীতের কাজ কারবার, - কোন এক বইয়ে পড়েছিলাম শিল্পের সংজ্ঞা যদি হয় অনুভূতির এবস্ট্রাকশন, তবে সবচেয়ে তীক্ষ্ণ শিল্প হচ্ছে সঙ্গীত কলা এবং তারো মধ্যে সবচেয়ে সবচেয়ে উচ্চমার্গীয় শিল্প হচ্ছে ক্ল্যাসিকাল মিউজিক (ইন্সট্রুমেন্টাল ও ভোকাল)। অনুভূতির সূক্ষাতিসূক্ষ্ম জগতে কি বিচরণ করতে পারে এই হার্ড মেটাল গানগুলো?

: রিমিক্স ব্যান্ডের ব্যাপারে আরো আলোচনা দরকার। মডার্ণ ইন্সট্রুমেন্ট দিয়ে পুরানো গান মূল সুর বজায় রেখে ক্লাসিক গান শালীনভাবে গাওয়া হলে সেটা কোন চোখে দেখবেন?
: তাহলে কি সেটাকে আর রিমিক্স বলা হবে? সুমন তো গিটারেও রবীন্দ্র সঙ্গীত গেয়েছেন। সেতার আর তবলা দিয়ে রাগ নির্ভর রবীন্দ্র সঙ্গীতের একটা প্রযোজনা শুনেছিলাম- বাজনাটাই মূল- ফাঁকে ফাঁকে শ্রীকান্তের কন্ঠ, অসাধারণ একটা কাজ। লালনের গানও তো ফরিদা পারভিন হারমোনিয়ামে গেয়েছেন- দোতারা, একতারা ছাড়া আরো অনেকেই গেয়েছেন। সমস্যা কি? ইন্সট্রুমেন্ট ব্যবহারটার বিরুদ্ধে কিন্তু বলছি না, বলছি না যে- সঙ্গীত স্রষ্টা প্রথম যে যে ইন্সট্রুমেন্ট ব্যবহার করেছিলেন- সবসময়ই সেটাই করতে হবে। মূল সমস্যাটা সঙ্গীত আয়োজনে, ইন্সট্রুমেন্ট ব্যবহারে পরিমিতি বোধে। "আমার সোনার বাংলা" বা "আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি" গান যদি গিটারে বা পিয়ানোতে মূল সুরে গাওয়া হয়- আপত্তি কি? কিন্তু ড্রাম সেটে প্রচণ্ড দ্রিম-দ্রুম শব্দ দিয়ে, হাই বিটে যদি এগান গাওয়া হয় বা গানের মাঝে মধ্যে গিটার-পিয়ানোর ঝ্যা-ঝ্যা আওয়াজ যুক্ত করে দেয়া হয়- তবে সেটা কেমন হবে? আর যদি তাল লয়- সব গড়বড় করে "কাণ্ডারি হুশিয়ার" গানটির মত করে চিৎকার করে করে গাওয়া হয়- তাহলে কি বলবেন? বা দু-চার লাইন গাওয়ার পরে তার মধ্যে র‌্যাপ সং ঢুকিয়ে দেন তবে কেমন লাগবে?

: ভাই রিমিক্স সবসময় ই ছিল .. এখনো আছে ... মারত্মক কিছু হয়ে না গেলে ভবিষ্যতেও থাকবে ..। আমার তো মনে হয় যে, যারা এর বিরোধী, তাদের সমস্যা রিমিক্স গান নিয়ে না, তাদের সমস্যা "রিমিক্স" শব্দটাতেই। রিমিক্সের জায়গায় যদি সিডি'র গায়ে লেখা হতো "অমুকের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি" অথবা "অমুক স্মরণে", তাহলে দেখা যেত যে বিরোধীরা আর আপত্তি করছে না, মান্না দে যখন নজরুলের গান গায় এবং সুরের কিছুটা অদল বদল করে, তখন কেউ দোষ দেখে না, শ্রীকান্ত যখন হেমন্তের গান নতুন করে গায়, তখন আপত্তি করে না ....। ধরে নিলাম যে আমাদের বাংলাদেশ এর গায়করা এত ভালো গাইতে পারে না জন্যে আসলের কাছাকাছি যেতে পারে না, কিন্তু পুরানো গান গাওয়াটা আমি সমর্থন করি .. কারণ মানুষের মানুষের মানবীয় গুন বা দোষ যাই বলেন- একটা থাকবেই- সেটা হচ্ছে স্মৃতি কাতরতা ..
: দেখুন, আমরা যারা রিমিক্সের বিরোধী তারা সিডি বা ক্যাসেট তো কিনতেই যাবো না, ফলে সেগুলোর কাভারে কি ট্যাগিং আছে তা নিয়ে কোন হেডেকও থাকার কথা নয়। মূল আপত্তিটা করি- অরিজিনাল গানের সুরের বিকৃতিতে। একটা ভালো গানকে বিকৃত ও নষ্ট করা যখন হয়, তখন তার চেয়ে বেদনার আর কিছুই হতে পারে না। আর উদ্বিগ্ন না হয়ে পারি না যখন দেখি- অরিজিনাল গানগুলোর চেয়ে বাজার যখন নষ্ট গানকে অধিক প্রোমোট করে, মূল গানকে যখন নষ্ট গানগুলো রিপ্লেস করতে চায় তখন(গুগল সার্চে অরিজিনাল "কান্ডারী হুশিয়ার" গান খুঁজে পেলাম না, সবই আর্টসেলের পরিবেশনা)।

মান্নার নজরুল গীতিতে কোন বিকৃতি কি আছে? মান্নার গাওয়া নজরুল গীতিকে কি রিমিক্স বলা হয়? আসলে "রিমিক্স" এর সংজ্ঞাটিতেই আপনি বোধ হয় ভুল করছেন। মান্না রীতিমত নজরুলের গানের চর্চা করতেন এবং করেন। যাকে বলে- ওস্তাদের কাছে হাতে কলমে শিখেছেন। এখন নজরুলের গানের বিভিন্ন শিল্পীদের মধ্যে গায়কির, সুরের বেশ কিছু এদিক-ওদিক আছে। আমাদের ফিরোজা বেগম আর ভারতের সতীনাথ একরকম গান না, ড: অঞ্জলি মুখার্জী আর ইফফাত আরার গানেও পার্থক্য পাবেন, শাকিল যতই অজয়ের মত গাওয়ার চেষ্টা করুক না কেন, কিছু এদিক ওদিক তো হয়ই। এই পার্থক্যগুলোকে কি আপনি রিমিক্স বলবেন? শ্রীকান্ত যখন হেমন্ত, শিবাজি, সতীনাথ প্রমুখের আধুনিক গানগুলো করেছেন- তখন কি সুর বিকৃত করেছেন? যতই বলা হোক যে- শ্রীকান্তের গলা খুব ফ্ল্যাট, হেমন্ত-সতীনাথের অরিজিনাল গান যারা শুনেছেন, তাদের শ্রীকান্তের গানে মন ভরবে না ঠিকই, কিন্তু তাই বলে কি শ্রীকান্ত রিমিক্স করেছেন, ঐ গানগুলোতে নতুন সুরারোপ করেছেন- এমন তো কেউ বলতে পারবে না! সাগর সেনের মাধ্যমে রবীন্দ্র সঙ্গীতে আমার প্রবেশ, কিন্তু যখন কলিম শরাফি, কনিকা, সুবিনয় প্রমুখে গিয়ে উপস্থিত হলাম- তখন সাগর সেনের ফ্ল্যাট গায়কিতে তো আর মন ভরে না। সত্যজিৎ রায়ের উদ্যোগে কিশোর কুমার কিছু রবীন্দ্র সঙ্গীত গেয়েছিলেন, চারুলতা সিনেমার গানটির পরে একটা ক্যাসেটও বোধ হয় বের করেছিলেন। বেশ সমালোচনা হয়েছিল- কারণ তিনি সুর-তাল-লয়ে ভুল করেছিলেন। তিনিও রিমিক্স করেছেন এমনটা কেউ বলেননি, তিনি রবীন্দ্র সঙ্গীত গাওয়ার চেষ্টা করেছেন- কিন্তু একিউরেট সুরে গাইতে পারেন নি। পরে নিজেই বুঝতে পেরে- সে চেষ্টা আর করেনও নি।

সুতরাং, মান্না-শ্রীকান্তের উদাহরণগুলো হাবিব, আর্টসেলের রিমিক্সের সাথে কিভাবে প্রাসঙ্গিক হতে পারে? আমার মনে হয়েছে না বুঝেই এ প্রসঙ্গকে অহেতুক টানা হয়েছে।

... (চলবে .. এই পোস্টেই যুক্ত হতে থাকবে)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29072387 http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29072387 2010-01-05 16:54:48
ঈশ্বরের সাথে কিছুক্ষণ ....
পাঠক! এই হলো আমাদের গল্পের সোলায়মান সাহেব। ওনাকে নিয়ে লিখতে বললে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লেখা যাবে এবং সেটা একই কথার পুনরাবৃত্তি না করেই। তদুপরি, মূল গল্পে সরাসরি প্রবেশ করার লক্ষে পরিচয় পর্বটা আমাকে এমন সংক্ষিপ্ত করতেই হলো। অন্তত দশপৃষ্ঠার বর্ণনাকে একটি ছোট প্যারায় নিয়ে আসাটা সবসময়ই খুব কঠিন কাজ, তবে কাজটি নেহাত মন্দ করিনি বলেই আমার বিশ্বাস, আমার ধারণা সোলায়মান সাহেব সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা আপনাদের সামনে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছি। এবার তাহলে সরাসরি গল্পেই প্রবেশ করা যাক।

একদিনের কথা। যথারীতি সৃষ্টিবাদীদের সাথে বিবর্তনবাদীদের একটি বিতর্কসভায় সোলায়মান সাহেব সৃষ্টিতত্ত্ববাদীদের ভালোই নাজেহাল করেই ফেলেছিলেন, কিন্তু শেষে সৃষ্টিতত্ত্ববাদীরা, উপস্থিত দর্শকদের একটা অংশ (এমনকি উপস্থাপকও না কি?) অনেকটা শোরগোল তুলে দেয়।
-"মৃত্যুর পরে কি কিছুই নেই? কেবল অন্ধকার, আর পঁচে যাওয়া, ধুলামাটিতে পরিণত হওয়া?" (এটা মানলে যে সাধের অনন্ত আনন্দের বেহেশতি জীবন হারাইতে হয়!)
-"যুক্তি দিয়ে তো খুব প্রমাণ করছেন যে ঈশ্বর নেই- কিন্তু শেষ পর্যন্ত যদি তিনি থেকে থাকেন তো?" (যেনবা ঈশ্বরের থাকা না থাকাটা যুক্তির উর্ধে!)
-"আজ বুঝতে পারছেন না, কিন্তু যখন বুঝতে পারবেন- তখন আর সময় পাবেন না।" (যেনবা ওনার জন্য তাদের অনেক দরদ!)
-"যে সৃষ্টি করলো- তাকে অস্বীকার করা মানে তো নিজের বাপ-মা-জন্মকেই অস্বীকার করা।" (আহা! কি যুক্তির ছিরি!) ... ইত্যাদি নানা প্রশ্নের ভীড়।
শেষ পর্যন্ত সোলায়মান সাহেব বলতে বাধ্য হোন: "এই বিতর্কসভা যুক্তি-তর্কের উপর ভিত্তি করেই আয়োজিত। যুক্তির বাইরে কোন প্রশ্নের জবাব দিতে আমি বাধ্য নই, ব্যক্তিগত প্রশ্নের তো নই-ই"।

হলরুম থেকে বের হয়ে যেন কিছুটা স্বস্তি পেলেন। আজ একটু বেশী বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলেন ভেবে কিছুটা লজ্জিত হন। বয়সের প্রভাব হয়তো বা। চশমাটা খুলে রুমাল দিয়ে যত্ন করে মুছে আবার চোখে দেন। ভাবেন- বিশ্বাসের কত জোর! যুক্তি টলে গেলেও বিশ্বাস টলে না, বিশ্বাসটাই তখন যুক্তির স্থান নিয়ে নেয়! মৃত্যুর পরের শূণ্য জগৎ মানতে এরা নারাজ! যদি ঈশ্বর সত্যি সত্যি থেকে থাকেন- এই রিস্ক নিতে তারা অপারগ! অপরপক্ষের কথাগুলো নিয়ে ভাবতে থাকেন তিনি, কিছুটা অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে হাঁটছেন- এমন সময় .....। রাস্তার অপর পাড়ে গাড়ি পার্ক করা ছিল, ভাবতে ভাবতে রাস্তা পার হতে গিয়ে- কিছুটা অন্যমনস্ক ছিলেন হয়তো, কিন্তু শেষ মুহুর্তে একটি সন্দেহও তাঁর মাথায় উকি দিয়ে যায়। এই রাস্তায় তো এত গতিতে গাড়ি চলার কথা নয়! অন্যমনস্কতার জন্য নিজেকে ধিক্কার জানাবেন, না কি এটা একটা পরিকল্পিত খুন হতে পারে- সিদ্ধান্তে আসার আগেই চারদিকে সব অন্ধকার।

সোলায়মান সাহেব যখন চোখ খুললেন, তখন অবাক হয়ে গেলেন। ছোট্ট একটা বদ্ধ প্রকোষ্ঠে নিজেকে আবিষ্কার করলেন, এবং আবছাভাবে মনে পড়ে গেল- তিনি একটি সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেছিলেন এবং তারপরে তাকে মাটির নীচে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। কিছুটা হকচকিয়ে গেলেও, ধাতস্থ হতে তাঁর সময় লাগে না; নার্ভ তাঁর বরাবরই শক্ত। মাটির নীচে কিভাবে আবার চোখ খুললেন, কিভাবে এমনটা সম্ভব হতে পারে এমন চিন্তায় মনোনিবেশ করতে চাইলেন- কিন্তু বাঁধ সাধলো দুই স্বর্গীয় দূত। চিন্তায় মগ্ন থাকতেই তিনি চাইছিলেন, কিন্তু দূত দুটি একটু বেয়াড়া ধরণের- তারা কয়েকটি প্রশ্ন করতে চায় যেগুলোর জবাব না নিয়ে তারা যাবে না- সাফ সাফ জানিয়ে দেয়। ভারী মুশকিলে পড়া গেলো তো- সোলায়মান সাহেব বিরক্তি নিয়ে তাদের দিকে তাকালেন। দূত দুটোকে তার নিম্নশ্রেণীর রোবট ছাড়া কিছুই মনে হলো না, নির্দিষ্ট কিছু প্রশ্ন করা আর প্রশ্নের জবাব নেয়ার জন্য যারা প্রোগ্রামড। কি আর করা, সোলায়মান সাহেব দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তাদের বললেন- ঠিক আছে! বলো তোমরা - কি প্রশ্নের জবাব চাও?
: বলো- তোমার রব কে?
: কি উদ্ভট প্রশ্ন? 'রব' বলতে আসলে কি বুঝাতে চাচ্ছো তোমরা?
: 'রব' মানে হচ্ছে প্রভু, 'রব' মানে সৃষ্টিকর্তা, তোমার নিয়ন্ত্রা।
: আমার প্রভু আবার কে? আমরা দাস ব্যবস্থা, সামন্তীয় যুগ পার করে এখন আধুনিক গণতন্ত্রের যুগের মানুষ- এখানে প্রভুত্ব আর নেই। তবে শিল্প মালিকরা এখনো শ্রমদাসদের প্রভু হয়ে উঠে কখনো কখনো- কিন্তু শ্রমিকরা সেই দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙ্গার সংগ্রামও করে। আর আমি একজন শিক্ষক, ছাত্রদের পড়াই, ডিপার্টমেন্টের ডীনকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে কখনো কখনো বস বলেছি ঠিকই- কিন্তু তাদের সাথে আমার সম্পর্ক কখনোই প্রভু-দাসের ছিল না। সৃষ্টিকর্তা বিষয়টা বাজে ও কল্পনাপ্রসূত। আমার নিয়ন্ত্রণকারী আমি নিজেই- তবে সমাজ-সংস্কৃতি-শিক্ষা-দীক্ষার প্রভাবকে অস্বীকার করবো না। ফলে, এবার তোমরাই বলো- আমার কোন 'রব' থাকার দরকার আছে কি না? তোমাদেরই তেমন কোন 'রব' আছে কি?
: হ্যাঁ! আমাদেরও 'রব' আছে, প্রত্যেকেরই 'রব' থাকেই থাকে- তোমারো আছে- এবং তিনি একজনই- বলো তিনি কে? তাঁকে কি চেনো না?
: না! তোমরা সঠিক বললে না। তোমাদের হয়তো একজন প্রভু থাকতে পারে যিনি তোমাদের চাকর-বাকরের মতো খাটায়, তিনি তোমাদের নিয়ন্ত্রণকারীও হতে পারে; কিন্তু তিনিই যে তোমাদের সৃষ্টিকর্তা সে ব্যাপারে তোমরা কি নিশ্চিত?
: (একটু মাথা চুলকিয়ে) অবশ্যই নিশ্চিত।
: কিভাবে?
: তিনিই আমাদের বলেছেন।
: আরে বুদ্ধু, এটাকে বলে সার্কুলার লজিক। তোমরা কি দেখেছো যে তিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন?
: (আবার মাথা চুলকিয়ে ও একে অপরের দিকে তাকিয়ে) উ- আ- হু - না ...
: হুম, আরো ভালো করে চিন্তা করো। চিন্তা করতে শিখো, তবেই না মানুষ হবে। আর, আমার ক্ষেত্রেতো অন্য দুটোও খাটছে না। তোমরা যেমন এখানে এসেছো- তোমাদের সেই কথিত 'রবে'র নির্দেশ মোতাবেক, কিন্তু আমি কার দাসত্ব করছি বলতে পারো? তোমাদের 'রব' তোমাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতেই পারে, কিন্তু আমাকেও কি নিয়ন্ত্রণ করছেন? আমার নিয়ন্ত্রণকারী আমাকে কেন প্রশ্ন করার জন্য তোমাদের পাঠাবেন? আবার তোমাদের প্রশ্নের জবাব দেয়ার স্বাধীনতা যদি আমার থাকে তবে কি তিনি আর নিয়ন্ত্রণকারী থাকতে পারেন? বলো তোমরা।

স্বর্গীয় দূত দুজনকেই একটু বিভ্রান্ত মনে হয়। তাদেরকে পাঠানো হয়েছে কয়েকটি প্রশ্ন করার জন্য, ফটাফট প্রশ্নের জবাব শুনে তারা ঈশ্বরের কাছে রিপোর্ট করবে; বরাবরই এমনটাই হয়েছে, সকলে জবাব দিয়েছে- কেউ ভুল আর কেউ সঠিক; কিন্তু এই আজব লোকটি তাদের উল্টো প্রশ্ন করছে এবং তারা ঠিক জবাব দিতে পারছে না। বুঝতেও পারছে না- কি করবে। একবার মনে হচ্ছে- পাল্টা প্রশ্ন করলেও লোকটি ঠিকই জবাব দিয়েছে- পরের প্রশ্ন করা দরকার, আরেকবার মনে হচ্ছে- ১ম প্রশ্ন নিয়ে যেহেতু লোকটি কিছু জানতে চাচ্ছে- সেহেতু পরের প্রশ্নে যাওয়া ঠিক হবে না, কেননা প্রশ্ন করেছে মানেই লোকটি তার আলোচনা বা জবাব শেষ করেনি। এ অবস্থায় কি করা যেতে পারে? ঈশ্বরের কাছে সাহায্যের জন্য চলে যাবে? তিন প্রশ্নের জবাব না নিয়েই? এটা ঠিক হবে? কি বিপদেই না পড়া গেলো! হতবুদ্ধি হয়ে তার ঠায় দাঁড়িয়েই থাকে।

শেষ পর্যন্ত ঈশ্বরই তাদের সে অবস্থা থেকে রক্ষা করে। তিনজনকেই তলব করেন তিনি। সচরাচর এমনটা তিনি করেন না, কিন্তু এবারে দূতদ্বয়ের উপর তিনি ঠিক আস্থা রাখতে পারলেন না, তাছাড়া এটা ভাবলেন যে- এই লোকের সাথে সরাসরি কথা বলাই ভালো হবে। দূতদুটিকে শিখিয়ে পড়িয়ে আবার পাঠানো যেত, কিন্তু নতুন কি না কি প্রশ্ন করে বসে কে জানে! ফলে,সোলায়মান সাহেবকেই ডেকে পাঠান। সোলায়মান সাহেব ঈশ্বরের মুখোমুখি হন।

সপ্তম আসমানে উপস্থিত হওয়ার পরে এবং ঈশ্বরের মুখোমুখি হওয়ার আগে সোলায়মান সাহেব দুটো সমস্যা নিয়ে ভাবছিলেন, কি করে এত দ্রুতগতিতে মহাশূণ্যে চলে আসলেন, এবং মহাশূণ্যে কিভাবে তিনি স্থিরভাবে ভাসছেন, দ্বিতীয় সমস্যার সমাধানটাও প্রায় বের করে ফেলেছিলেন (সম্ভবত তার উপর ক্রিয়ারত আপেক্ষিক গ্রাভিটেশনাল ফোর্স জিরো), কিন্তু এবারো বেশীক্ষণ ভাববার সময় পেলেন না। ঈশ্বর তার সামনে এসে হাজির হলেন। প্রথম দর্শনে ঈশ্বরকে তার খারাপ লাগে না। চারদিক ধবধবে সাদা আলোয় ভরে গেলো, ঈশ্বরের চেহারার মধ্যেও শ্বেত-শুভ্র একটা ভাব আছে, আর সোলায়মান সাহেব আগে থেকেই সাদা রংটি খুব পছন্দ করতেন, ফলে ঈশ্বরকে দেখতে তার ভালোই লাগলো। ঈশ্বরের চোখ দুটোর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন- উদ্ধত একটা ভাব থাকলেও বেশ বুদ্ধিদীপ্ত মনে হলো, সোলায়মান সাহেব একটু খুশী হন- একজন বোকার চেয়ে বুদ্ধিমান কারো সাথে কথা বলা অনেক মজার, তা সে যে-ই হোক না কেন। ঈশ্বর গমগম কন্ঠে বলে উঠলেন: কি হে সোলায়মান!

এই সম্বোধনে সোলায়মান সাহেবের খুব একটা পছন্দ হলো না। ভদ্রলোক কি কার্টেসি জানে না? প্রথম সাক্ষাতে প্রথম কথাতেই এরকম নাম ধরে ডাকাডাকি! যাহোক, তিনি বিষয়টাকে তেমন গুরুত্ব দিলেন না। তিনিও কথা শুরু করলেন: জ্বি বলুন! অবশ্য আপনাকে ঠিক চিনলাম না। আপনার পরিচয়টা যদি প্রথমে দিতেন..
: হ্যাঁ! আমিই 'রব'।
: (পাশেই দূত দুজন মাথা নীচু করে দাঁড়িয়েছিলো, তাদের দিকে তাকিয়ে) ওহ, এই দুজনের রব! ভালো। ওদের কিন্তু বুদ্ধির বিকাশটা ঠিকভাবে ঘটেনি।
: নাহ! (হুংকারের শব্দ) আমি সকলের রব! সবাই আমার বান্দা। সবকিছুই আমার হাতে সৃষ্ট। আমি সবকিছুর প্রভু, সবই আমার হুকুমের দাস!

হুংকার শুনে সোলায়মান সাহেব কিছুটা চমকে উঠেন। সামনা-সামনি দুজন কথা বলার সময় এমন চিৎকার করার কি দরকার তা ঠিক বুঝে আসেনা। ভোকাল কর্ডে সমস্যা, না কি সমস্যাটা মস্তিস্কে সেটা ভাবেন। দ্বিতীয়টির সম্ভাবনাকে অধিক যুক্তিযুক্ত মনে হয়- শেষের প্রলাপগুলোর কথা মনে পড়ায়। একটু হাসিও পেয়ে যায়। যাহোক, সোলায়মান সাহেবকে নীরব থাকতে দেখে কিংবা ঠোটের কোণে হাসির ঝিলিক দেখে ঈশ্বর আবার গমগম করে বলে ওঠে: কি! এবার তো বিশ্বাস হচ্ছে যে, আমিই তোমার 'রব'? আমিই ঈশ্বর?
: দুঃখিত, কিছু মনে করবেন না। আমি আসলে নাস্তিক, ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না।
: কি? ঈশ্বরকে দেখেও তুমি ঈশ্বরকে বিশ্বাস করতে পারছো না? তুমি না দুনিয়ায় বলতে যে, ঈশ্বরকে বিশ্বাস করো না কারণ তুমি ঈশ্বর দেখোনি! আজ এই মুহুর্তে তোমার সামনে তোমার ঈশ্বর দন্ডায়মান- তুমি তোমার ঈশ্বরকে কেবল দেখছোই না, তার সাথে কথাও বলছো, তারপরেও বলছো যে, তুমি ঈশ্বরকে বিশ্বাস করো না! কোন যুক্তিতে তোমার ঈশ্বরকে অস্বীকার করছো?
: জনাব, রাগ করবেন না। যুক্তি আমার আছে। সেটা হচ্ছে প্রমাণের অভাব। দুনিয়াতে আমার জন্য আমি ঐ যুক্তি করতাম ঠিকই, কিন্তু সাথে এই যুক্তিও করতাম- যে দেখেছে বলে দাবী করছে, তাকে তার দেখার সঠিকতাও প্রমাণ করতে হবে। অর্থাৎ, কেউ কেউ যখন দাবী করতো যে সে বা তারা ভূত যেহেতু দেখেছে, সেহেতু ভূত আছে, তাদের তখন বলতাম- তোমরা যেটাকে দেখে ভূত বলছো- সেটা কি আসলেই তোমাদের দাবীকৃত ভূত? আপনিই যে ঈশ্বর সে ব্যাপারে এখনো কোন প্রমাণ পাই নি আমি। দুঃখিত।
: প্রমাণ চাও?(আবার হুংকার)- জানো! তোমাকে নিয়ে আমি যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারি!

সোলায়মান সাহেব কিঞ্চিত ভয় পান। ইতিহাসে হিটলার-মুসোলিনির কথা পড়েছেন। অধুনা বিশ্বে জর্জ ডব্লিউ বুশকে মিডিয়ায় ভালোই প্রত্যক্ষ করেছেন। ঈশ্বর হিসাবে দাবী করা ভদ্রলোকটি দেখতে যতই শেত-শুভ্র হোক না কেন, এই মুহুর্তে তাকে এদের মতোই স্বেচ্ছাচারী একনায়ক মনে হয়। ক্ষমতাধরেরা এমন অমানুষ হয় কেন? ক্ষমতাই কি তবে সব নষ্টের গোড়া?
: জানি জনাব! আজ যেমন করেই হোক আমি আপনার কব্জায়, আমাকে নিয়ে যা ইচ্ছা করতে পারেন। যা ইচ্ছা করতে পারাটা কি ন্যায় সংগত? ঈশ্বরের ধারণা কি ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত নয়? দুর্বলের উপর সবলেরা এমনটা সবসময় করেও থাকে। দুনিয়াতে আমরা গৃহপালিত পশপাখির সাথে যা ইচ্ছা করে থাকি। একসময় আফ্রিকা থেকে নিগ্রোদের ধরে এনে কৃতদাস বানানো হতো- তাদের সাথেও তাদের মালিকেরা যা ইচ্ছা করতে পারতো, আমাদেরকে গৃহপালিত পশুর ঈশ্বর বলবেন? দাসমালিকদের ঐসব কৃতদাসেদের ঈশ্বর বলবেন?
: আহ! বুঝতে পারছো না যে, আমি স্রষ্টা। আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি।
: হ্যাঁ আসলেই বুঝতে পারছি না। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন? কবে, কোথায়, কিভাবে? প্রমাণ দেন।
: আমি সৃষ্টি না করলে- তবে কে তোমাকে সৃষ্টি করেছে?
: কেন, আমার বাবা-মা'র মিলনেই আমার জন্ম।
: কিভাবে?
: বাবার কাছ থেকে এসেছে শুক্রাণু, আর মা'র আছে ডিম্বাণু- শুক্রাণু দ্বারা ডিম্বাণু নিষিক্ত হলে হয় জাইগোট বা ভ্রূণ, সেখান থেকে ....
: বাস বাস! হয়েছে হয়েছে! পুরা প্রসেস বলতে হবে না। আমাকে বলো- প্রতিটা ধাপ বা প্রসেস কিভাবে সম্পন্ন হলো?
: সব কিছুই প্রাকৃতিকভাবে।
: প্রাকৃতিকভাবে? তা-ও আমার কথা বলবে না? কেন?
: কারণ, প্রাকৃতিকভাবে যখন বলছি- সেটার একটা মানে আছে। প্রকৃতির অভ্যন্তরে সুস্পষ্ট কিছু নিয়ম আছে- এই নিয়ম মেনেই সব কিছু হয়। বিজ্ঞান এই নিয়মগুলোকেই খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। বিজ্ঞান ঐ ঈশ্বরকে মানে না- যে প্রকৃতির এই নিয়মগুলোকে তোয়াক্কা করে না। অর্থাৎ মানব ভ্রূণ তৈরী করতে চাইলে ঈশ্বরকে শুক্রাণু আর ডিম্বাণুর নিষিক্তকরণের মধ্য দিয়েই যেতে হবে; আলু আর পটল মিলায়া হাজার চেষ্টা করলেও ঈশ্বর কেন- তারও ঈশ্বর- তারও ঈশ্বর- কোনদিন মানবভ্রূণ তৈরী করতে পারবে না। এখন কেউ যদি প্রাকৃতিক নিয়ম সমূহকেই ঈশ্বর বলে অভিহিত করতে চায়, বা প্রকৃতিক নিয়মের অধীন, অথর্ব, সীমাবদ্ধ ক্ষমতা ও সামর্থ্যের অধিকারী একজন ঈশ্বরে বিশ্বাস আনয়ন করতে চায় তবে তেমন আপত্তি দেখি না; কিন্তু আমি ঈশ্বর শব্দটির চেয়ে 'প্রাকৃতিক নিয়ম অনুসারে' বলতেই বেশী স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবো, কেননা ঈশ্বর শব্দের প্রচলিত অর্থের সাথে এর কোন মিলই নেই।
: দেখো- তোমার সাথে এত তর্ক করার কিছু নেই। তোমাকে তো বিশ্বাস করতে হবে যে এককালে তুমি ছিলে না- আমিই তোমাকে তোমার মায়ের পেটে জীবন দিয়েছি।
: কিভাবে বিশ্বাস করবো? আমার জন্ম পদ্ধতি তো আগে বলেইছি। বিজ্ঞান এটা প্রমাণ করেছে। আর জন্মের সময় আপনাকে আমি দেখিওনি যে আপনি আমাকে সৃষ্টি করছেন!
: কি আশ্চর্য! ঐ সময়ের স্মৃতি কারো থাকে না কি?
: ফলে যে সময়ের স্মৃতি থাকে না- সে সময়কে নিয়ে আলোচনাও অনর্থক। ধরেন- কোন একটা নির্দিষ্ট সময়ের স্মৃতি আপনি হারিয়ে ফেললেন। এখন ঐ সময়ে আপনি এই করেছেন- সেই করেছেন এমন দাবী যদি আমি তুলি- তবে সেটা কি আপনি বিশ্বাস করতে বাধ্য থাকবেন?
: তাহলে তো আমি যে তোমাকে সৃষ্টি করেছি- সেটার প্রমাণ তোমার কখনো পাওয়া হবে না!
: সেই প্রমাণ পাওয়ার খুব দরকারো দেখি না!
: কিন্তু সবকিছুরই তো একটা শুরু আছে, মানে সৃষ্টি আছে। ফলে সৃষ্টিকর্তা থাকাটাই কি স্বাভাবিক নয়?
: না, বিষয়টা এমন নয়। সবকিছুর শুরু একসাথে নয় এবং শুরু বা সৃষ্টিগুলোও প্রাকৃতিকভাবে ও প্রকৃতির নিয়মানুসারেই। আর, আপনার যুক্তি মোতাবেক যদি ধরেও নিই যে- সবকিছুর সৃষ্টি আছে বিধায় সৃষ্টিকর্তাও আবশ্যক- তবে স্বভাবতই প্রশ্ন চলে আসে যে- আপনার তাহলে সৃষ্টিকর্তা কে, তার সৃষ্টিকর্তা কে, ...। আপনি যদি অস্বীকার করতে চান- তবে বলবো, আপনার জন্মকালীন সময়কার স্মৃতিভ্রস্টতাই আপনাকে আপনার সৃষ্টিকর্তা থেকে অজ্ঞাতে রেখেছে!
: খামোস! (ভীষণ হুংকার)- তোমার এতো বড় আস্পর্ধা! সেই কখন থেকে মুখে মুখে তর্ক করছো! আমার সামনে দাঁড়িয়ে আমার সৃষ্টিকর্তার গল্প করছো! এত সাহস! তোমাকে আমি নরকের আগুনে পুড়াবো! পুড়িয়ে ছাই বানিয়ে দেবো! .... ইত্যাদি। (দূতদ্বয়ের দিকে তাকিয়ে)- তোমরা এখুনি বের হও, খুঁজে খুঁজে বের করো দোযখের সবচেয়ে কঠিন ও কষ্টদায়ক জায়গা- সেখানে আজ একে ঝুলাবো!

সোলায়মান সাহেব প্রথমে ভেবেছিলেন- দুতদ্বয়ের সামনে এইসব কথা বলায় ভদ্রলোক অপমানিত ও ক্ষিপ্ত হয়েছেন বলেই তাদের বের করে দিলেন। কিন্তু দূতদ্বয় চলে যাওয়ার পরেও যখন তিনি কিভাবে সোলায়মান সাহেবকে নরকে শাস্তি দিবেন- তা গমগম গলায় বর্ণনা করছেন, তখন তিনি একটু দমে গেলেন এবং অজানা বিপদের আশংকায় একটু কেঁপেও উঠলেন। শাস্তির ব্যাপারটা ভালো করে ঠিকঠাক করে দূতদ্বয় আসলে এবারে তিনি তাদের সোলায়মান সাহেবকে নিয়ে একটু স্বর্গ দেখিয়ে নিয়ে আসার হুকুম দিলেন।
দূতদ্বয়ের সাথে করে সোলায়মান সাহেব স্বর্গ দর্শনে বের হলেন। স্বর্গের প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতে না ঢুকতেই একটা নির্মল শীতল বায়ুর পরশ, মনমাতানো এক সুবাস, সুরের মুর্ছনা সবমিলিয়ে সোলয়মান সাহেবের শুরুতে ভালোই লাগলো। তার উপর যখন তাকিয়ে দেখেন চারদিকে- তখন সবকিছুকে ছবির মত সাজানো একটা বাগান মনে হয়, খুব সুন্দর একটা বাগান। মোটের উপর প্রথমে স্বর্গ সোলায়মান সাহেবকে আকর্ষণ করেছিল, দুঃখ-কষ্টহীন জীবনের জন্য নয়, বরং নরুপদ্রব জীবনে চিন্তা করার ও গবেষণা করার প্রচুর সময় পাওয়া যাবে এই ভাবনায়। কিন্তু স্বর্গের আরেকটু ভেতরে গিয়ে, সেখানকার বাসিন্দাদের জীবন যাপন দেখে- তার আগের সেই ভাব দূর হতেও সময় লাগে না! সুরা আর নারীতে মত্ত স্বর্গবাসীদের দেখে দুঃখ বোধ হলো। এটা কি কোন জীবন হলো? একেকজনকে অসংখ্য নারী পরিবেষ্টিত দেখে এই বেহিসেবী জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা তৈরী হয়। স্বর্গকে তার খুব অশ্লীল মনে হতে থাকে। তিনি চোখ বন্ধ করে ফেলেন। তার প্রিয়তমা স্ত্রীর কথা মনে পড়ে। নাহ! এই জায়গায় বাস করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। দুনিয়াতেই তো কতো পাব-বার- কত সেক্স শপ ছিল, সেখানে যাবার প্রয়োজন কখনো হয়নি। তার গা-গুলিয়ে উঠে। কিছুদূর যেতে তিনি অবাক হয়ে দেখেন- কিছু স্বর্গবাসী কেমন যেন উদাস হয়ে বসে আছে, সুরার পাত্র অযত্নে পাশে পড়ে আছে- সুন্দরী নারীরা তাদের চারপাশে ঘুরে ঘুরে নানা ভাব-ভঙ্গী করছে, কিন্তু তারা ঠিক সেভাবে সাড়া দিচ্ছে না! অবাক হয়ে দূতদের জিজ্ঞেস করেন- ঘটনা কি? দূতরা বলে- ঘটনা কি ঠিক বলতে পারবো না, তবে এরা স্বর্গের পুরান বাসিন্দা, অনেকদিন ধরেই এরা এখানে আছে। সোলায়মান সাহেব মুহুর্তেই বুঝতে পারেন- কেন এরা এমন উদাসী ও বিষন্ন। অনন্ত সুখ বলে আসলে তো কিছুই থাকতে পারে না। এক বিখ্যাত কবিতায় তিনি পড়েছিলেন- অন্ধকার আছে বলেই না আলোর মাহাত্ম, সেই কথাটা অনেক বেশী অনুভব করতে পারলেন। এই লোকগুলোর জন্য তিনি অন্তরে একটা বেদনা বোধ করেন। স্বর্গ দেখার সাধ তার মিটে গিয়েছে, তিনি ফিরতে চান। দূতদ্বয়ের সাথে তিনি আবার ঈশ্বরের কাছে ফিরে আসেন।

নরকের সীমাহীন যন্ত্রণার কথা শুনে সেটায় যেতে ভয় পাচ্ছিলেন ঠিকই, একইসাথে স্বর্গকে চাক্ষুষ দেখেও যে অভিজ্ঞতা হলো- তাতে সেই জীবনে যাওয়ার কথা কল্পনাও করতে পারছেন না। সবদিক দিয়ে দুনিয়ার জীবনটাকেই অসাধারণ মনে হয়। তার প্রাণপ্রিয় স্ত্রী, ছোট ছোট দু সন্তান, বাবা-মা, আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব, ছাত্র, বই-পত্র, বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুম, সেমিনার কক্ষ, গবেষণাগার, দুনিয়ার প্রকৃতি- গাছ-পালা, ফসলের মাঠ, নদী, পাহাড়, পশু পাখি ... সবকিছুই তার কত না প্রিয়, সবকেই আজ যেন আরো বেশী অনুভব করতে থাকেন।

ঈশ্বরের গমগম কথায় চিন্তায় ছেদ পড়ে।
: কি সোলায়মান! নরকবাসের জন্য প্রস্তুত তো?
: আমার প্রস্তুতিতে কি আর এসে যায়, বলেন!
: স্বর্গ কেমন দেখলে? লোভ হচ্ছে না? এখনও স্বীকার করো যে, আমিই ঈশ্বর! নরকে কিন্তু রয়েছে সীমাহীন যন্ত্রণা।
: দেখুন- ভয় বা লোভ দেখিয়ে ঈশ্বরের স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টা কি ন্যায় সংগত? আর, স্বর্গের জন্য কোন লোভ হচ্ছে না, বরং স্বর্গ ও নরক উভয়কেই ভয় পাচ্ছি।
: হা হা! তোমাকে তোমার কৃতকর্মের শাস্তি পেতেই হবে!
: শাস্তি? কোন অপরাধ করেছি যে, শাস্তি পেতে হবে?
: তুমি তোমার ঈশ্বরকে অস্বীকার করেছো!
: আপনি শাস্তি বা পুরষ্কৃত করেন কোন সময়কার কাজকে গণনায় নিয়ে? সামনা-সামনি কথাবার্তায় আপনি ক্ষিপ্ত হয়ে আমাকে শাস্তি দিতে চাচ্ছেন?
: নাহ! দুনিয়াতেও তুমি তোমার ঈশ্বরকে অস্বীকার করেছো!
: সেটা কোন অপরাধ হতে পারে না- ঈশ্বরে বিশ্বাস করার মতো কোন প্রমাণ ছিল না।
: কেন? তোমাদের জন্য আমি মহাগ্রন্থ পাঠাইনি?
: সেই গ্রন্থগুলো মানুষকেই লিখতে দেখেছি, মানুষের মুদ্রণযন্ত্রে ছাপানো হতে দেখেছি, কিন্তু কোন গ্রন্থকে কখনো কোন অশরীরীকে লেখতে দেখিনি, আকাশ থেকেও টুপ করে পড়তে দেখিনি। ফলে, কিভাবে বিশ্বাস করি যে- সেই গ্রন্থ ঈশ্বরের লেখা?
: এই বিশ্বাস করতে না পারাটাই তোমার অপরাধ, সে জন্যেই তোমার শাস্তি পেতে হবে।
: কিন্তু আমি দুনিয়ায় অনেক ভালো কাজ করেছি।
: তো?
: আমি গরীব-দুঃখীদের পাশে দাড়িয়েছি সবসময়। দুস্থদের জন্য একটা আশ্রম খুলেছি।
: তো?
: আমি সবসময় মানুষের উপকার করার চেষ্টা করেছি।
: তো?
: আমি প্রকৃতিপ্রেমী ছিলাম, প্রচুর গাছ লাগিয়েছি, যত্ন নিয়েছি- পশুপাখিও যাতে ভালো থাকে সে জন্য কাজ করে গিয়েছি।
: তো?
: আমি কোন অন্যায় করিনি। কারো ক্ষতি কখনো করিনি।
: তো?
: এসবের কোনটির জন্যই কি আমি পুরস্কৃত হতে পারিনা?
: তোমার ঈশ্বর, তোমার সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার করায় সমস্ত কিছুই মূল্যহীন হয়ে গিয়েছে।
: মানি না আপনার এ আইন। এবারে আরো ভালো করে বুঝতে পারলাম যে, ঈশ্বর একটা অন্যায় প্রতিষ্ঠান, ন্যায়ের কোন স্থান এখানে নেই।
: কি! এত বড় কথা! এক্ষুনি তোমাকে নরকে পাঠাবো- আর তুমি আমার সামনে দাঁড়িয়ে আমার বিরুদ্ধে বিষোদগার করছো?
: যেকোন পরিস্থিতিতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার সৎসাহস আমার আছে। জেনে রাখুন আমি মানুষ! মানুষই যুগে যুগে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে।
: হা! মানুষ! আমার সৃষ্ট পুঁচকে জীব কোথাকার! এত কথা না বলে আমাকে বলো- তুমি এখন কোথায়? তুমি কার সামনে দাঁড়িয়ে? কার সাথে কথা বলছো? কোন জগতে আছো? কিভাবে আছো? তোমার সাধের বিজ্ঞান এর কি ব্যাখ্যা দিবে? হা হা হা হা ....
: হাসবেন না, হাসবেন না! শুরুতে একটু কনফিউজড ছিলাম, কিন্তু এটাও জানতাম একটু চিন্তা করার ফুসরত পেলেই সব বের করতে পারবো। ফুসরতটাই ঠিক ভাবে পাচ্ছিলাম না বলে সবকিছু বের করতে এত সময় লাগলো। এখন আমি জানি এসব কিছুর ব্যাখ্যা।
: কি?
: সব কিছুই আমার উত্তপ্ত মস্তিস্কের কল্পনা! অর্থাৎ আপনার, আপনার এই জগতের, আপনাদের সৃষ্টি আমার উত্তপ্ত মস্তিষ্কে! (আরে! সবই তো লেখকের কল্পনা! সোলায়মান মিয়া তো দেখি ক্রেডিট নেবার চায়!!)
: কি ! এত সাহস! (তীব্র হুংকার) এই তোমাকে এখন নরকে নিক্ষেপ করছি।
: আরে ধুর! এক তুড়ি মেরে আপনারে আপনার নরক সমেত উধাও করে দিতে পারবো ..
এই কথার সাথে সাথে ঈশ্বর সোলায়মান সাহেবকে নরকে নিক্ষেপ করতে উদ্যত হলেন- সোলায়মান সাহেবও তুড়ি মারতে উদ্যত...। তারপর আবার সব অন্ধকার।

সোলায়মান সাহেব যখন চোখ খুললেন- তখন মুখে অক্সিজেন মাস্ক, নাকে নল, চোখের সামনে স্যালাইনের স্ট্যান্ড-নল, নানা মেডিক্যল ইকুয়েপমেন্টের ফাঁক দিয়ে আবছাভাবে প্রিয়তমা স্ত্রীর অশ্রুসজল মুখ দেখে দারুন প্রশান্তি বোধ করলেন। সন্তানদের মুখ দেখার জন্য মাথা ঘুরাতে চাইলেন, কিন্তু পারলেন না। না পারলেও ঠিকই অনুভব করতে পারছিলেন- প্রাণপ্রিয় সন্তানেরা আশেপাশেই আছে। তিনি নিশ্চিত জানেন অসংখ্য উদ্বিগ্ন মুখ এই রুমের বাইরে অপেক্ষায় আছে। তার মনে হলো- পরকালের কল্পিত স্বর্গ-নরক উভয়ই আসলে নরক, আসল স্বর্গ তো দুনিয়ার মানুষের ভালোবাসা। নাহ! তাকে তাড়াতাড়ি সুস্থ হতে হবে। মস্তিষ্ককে একটু বিশ্রাম দেয়া দরকার। পরম শান্তিতে তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন।

উপরের গল্পটি নীচের ভিডিও'র জবাবে লেখা:
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29067069 http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29067069 2009-12-28 13:44:38
কোরআনের যত কন্ট্রাডিকশনসমূহের সংকলন (ব্লগের সকল নাস্তিক বন্ধুদের অংশগ্রহণ কাম্য) ভূমিকা:
এই পোস্ট আসলে সাহোশি৬ এর পরামর্শে ও অনুরোধে লেখা। তবে আমি মনে করি, কোরআনের মত একটি বিশাল সাইজের গ্রন্থের যাবতীয় কন্ট্রাডিকশন আমার একার পক্ষে একটি পোস্টে নিয়ে আসাটা প্রায় অসম্ভব। তাই আমি কাজটি শুরু করে দিচ্ছি, আশা করবো- সকলে মিলে এই কাজটিকে এগিয়ে নিবেন।

কন্ট্রাডিকশন সমূহ:
এই সংকলনটিকে ফলপ্রসু ও কার্যকর করার জন্য কোরআনের কন্ট্রাডিকশন সমূহকে বেশ কিছু ক্যাটাগরি ও সাব ক্যাটাগরিতে ভাগ করেছি। প্রতি ক্যাটাগরিতেই আমি কিছু উদাহরণ উল্লেখ করছি, আশা করবো- আপনারা একে আরো অধিক সমৃদ্ধ করবেন। প্রত্যেকেই কোরআনের আয়াত দেয়ার সাথে সাথে (অবশ্যই বাংলায় দিবেন) সুরা ও আয়াতের নম্বর উল্লেখ করবেন এবং সেটা কোন ক্যাটাগরি/ সাব ক্যাটাগরিতে পড়ে- সেটাও উল্লেখ করবেন। আমার উল্লেখিত ক্যাটাগরির বাইরেও নতুন ক্যাটাগরি/সাব ক্যাটাগরি পেলে- সেটাও উল্লেখ করবেন। অংশগ্রহণের জন্য সকলকে অগ্রিম ধন্যবাদ। এবারে একে একে ক্যাটাগরি ওয়াইজ কন্ট্রাডিকশনগুলো তুলে ধরছি:

কন্ট্রাডিকশন ১: কোন এক আয়াতের সাথে আরেক আয়াতের বৈপরীত্য।
১। সুরা ৪১:৯, ১০, ১১, ১২
"বলুন, তোমরা কি সে সত্তাকে অস্বীকার কর যিনি পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন দু'দিনে এবং তোমরা কি তাঁর সমকক্ষ স্থির কর? তিনি তো সমগ্র বিশ্বের পালনকর্তা।
তিনি পৃথিবীতে উপরিভাগে অটল পর্বতমালা স্থাপন করেছেন, তাতে কল্যাণ নিহিত রেখেছেন এবং চার দিনের মধ্যে তাতে তার খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন-পূর্ণ হল জিজ্ঞাসুদের জন্যে।
অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোযোগ দিলেন যা ছিল ধুম্রকুঞ্জ, অতঃপর তিনি তাকে ও পৃথিবীকে বললেন, তোমরা উভয়ে আস ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়। তারা বলল, আমরা স্বেচ্ছায় আসলাম।
অতঃপর তিনি আকাশমন্ডলীকে দু'দিনে সপ্ত আকাশ করে দিলেন এবং প্রত্যেক আকাশে তার আদেশ প্রেরণ করলেন। আমি নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালা দ্বারা সুশোভিত ও সংরক্ষিত করেছি। এটা পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ আল্লাহর ব্যবস্থাপনা।"
==>> এই আয়াতসমূহ অনুযায়ী দেখা যায়- দুদিনে আকাশ সৃষ্টির আগে পৃথিবী ও পৃথিবীর যাবতীয় কিছু সৃষ্টি হয়েছে চারদিনে।

সুরা ৭৯: ২৭, ২৮, ২৯, ৩০, ৩১, ৩২, ৩৩
"তোমাদের সৃষ্টি অধিক কঠিন না আকাশের, যা তিনি নির্মাণ করেছেন? তিনি একে উচ্চ করেছেন ও সুবিন্যস্ত করেছেন। তিনি এর রাত্রিকে করেছেন অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং এর সূর্যোলোক প্রকাশ করেছেন। পৃথিবীকে এর পরে বিস্তৃত করেছেন। তিনি এর মধ্য থেকে এর পানি ও ঘাম নির্গত করেছেন, পর্বতকে তিনি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তোমাদের ও তোমাদের চতুস্পদ জন্তুদের উপকারার্থে। "
==>> এখানে আবার দেখা যায়- পৃথবীকে আকাশ সৃষ্টির পরে পৃথিবীকে বিস্তৃত করা হয়েছে ও পর্বতাদি সৃষ্টি করা হয়েছে।

২। ...

কন্ট্রাডিকশন ২: কোন এক আয়াতের নির্দেশনা, উপদেশ .. প্রভৃতির প্রতিফলন কোরআনের অন্যত্র না মেলা
১। সুরা ১০৯:৬
"লাকুম দিনুকুম ওয়ালিইয়াদিন"- "যার যার ধর্ম তার তার কাছে"
এর সাথে-
২:১৯১
"আর তাদেরকে হত্যাকর যেখানে পাও সেখানেই এবং তাদেরকে বের করে দাও সেখান থেকে যেখান থেকে তারা বের করেছে তোমাদেরকে| বস্তুত: ফেতনা ফ্যাসাদ বা দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করা হত্যার চেয়েও কঠিন অপরাধ| আর তাদের সাথে লড়াই করো না মসজিদুল হারামের নিকটে যতক্ষণ না তারা তোমাদের সাথে সেখানে লড়াই করে| অবশ্য যদি তারা নিজেরাই তোমাদের সাথে লড়াই করে| তাহলে তাদেরকে হত্যা কর| এই হল কাফেরদের শাস্তি।" এবং এমন অসংখ্যা আয়াত।

২। ...

কন্ট্রাডিকশন ৩: ভাষা/ব্যকরণগত ভুল
১। সুরা ৫:৬৯-
"নিশ্চয় যারা মুসলমান, যারা ইহুদী, ছাবেয়ী বা খ্রীষ্টান, তাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে আল্লাহর প্রতি, কিয়ামতের প্রতি এবং সৎকর্ম সম্পাদন করে, তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুঃখিত হবে না"।
এটা বুঝতে হলে- সুরা ৫:৬৯, সুরা ২:৬৭ এবং ২২:১৭ এর প্রথম লাইন পাশাপাশি দেখা দরকার:
৫:৬৯
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُواْ وَالَّذِينَ هَادُواْ وَالصَّابِؤُونَ وَالنَّصَارَى مَنْ آمَنَ بِاللّهِ
২:৬৭
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُواْ وَالَّذِينَ هَادُواْ وَالنَّصَارَى وَالصَّابِئِينَ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ
২২:১৭
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ هَادُوا وَالصَّابِئِينَ وَالنَّصَارَى وَالْمَجُوسَ
৫:৬৯ এর الصَّابِؤُونَ আসলে Nominative case এবং ২:৬৭ ও ২২:১৭ এর الصَّابِئِيহচ্ছে Accusative case (উদাহরণ: Whom, him, her, me, them, us are the accusative forms of who, he, she, I, they, and we respectively)। যারা ইহুদী, ছাবেয়ী, খৃস্টান- এখানে যারা বা who (إِنَّ) হচ্ছে Nominative case, এর পরে বসবে Accusative case, অর্থাৎ সাবেঈন বসবে (যা সুরা ২:৬৭ ও ২২:৬৭ এ বসেছে), Nominative case অর্থাৎ সাবেঊন (যা ৫:৬৯ এ বসেছে) বসালে সেটা হবে ব্যকরণগত ভুল।

২। ....

কন্ট্রাডিকশন ৪: বর্তমান জ্ঞান-বিজ্ঞান দ্বারা ভুল প্রমাণিত
(এটার ভুরি ভুরি নজির আছে)
১। ৫১:৪৯
"আমি প্রত্যেক বস্তু জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছি, যাতে তোমরা হৃদয়ঙ্গম কর।"
==>> ব্যাক্টেরিয়া, ভাইরাস, এ্যামিবা সব কিছু কি জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি হয়েছে?
২। সুরা আল-কাহফঃ
আয়াত ৮৬: পরে যখন তিনি সূর্য অস্ত যাবার স্থানে পৌঁছলেন, তিনি এটিকে দেখতে পেলেন কালো জলাশয়ে অস্তগমন করছে, আর তার কাছে পেলেন এক অধিবাসী। আমরা বললাম- "হে যুলক্কারনাইন, তোমরা শাস্তি দিতে পার অথবা এদের সদয়ভাবে গ্রহণ করতে পার"।
আয়াত ৯০: পরে যখন তিনি সূর্য উদয় হওয়ার জায়গায় পৌঁছলেন তখন তিনি এটিকে দেখতে পেলেন উদয় হচ্ছে এক অধিবাসীর উপরে যাদের জন্য আমরা এর থেকে কোন আবরণ বানাই নি
==>>> সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয়ের স্থান নাকি যথাক্রমে সর্ব পশ্চিম ও সর্ব পূর্বে!!

৩। সুরা ইয়াসীনঃ
৩৮: আর সূর্য তার গন্তব্য পথে (resting place ) বিচরণ করে। এটিই মহাশক্তিশালী সর্বাজ্ঞতার বিধান।
৩৯: আর চন্দ্রের বেলা- আমরা এর জন্য বিধান করেছি বিভিন্ন অবস্থান, শেষ পর্যন্ত তা পুরনো শুকনো খেজুরবৃন্তের ন্যায় হয়ে যাবে।
৪০: সূর্যের নিজের সাধ্য নেই চন্দ্রকে ধরার, রাতেরও নেই দিনকে অতিক্রম করার। আর সবকটিই কক্ষপথে ভাসছে।

৪। সুরা আম্বিয়াঃ
আয়াত ৩১: আর পৃথিবীতে আমরা পাহাড় পর্বত স্থাপন করেছি, পাছে তাদের সঙ্গে এটি আন্দোলিত হয়; আর ওতে আমরা বানিয়েছি চওড়া পথঘাট যেন তারা সৎপথ প্রাপ্ত হয়।
আয়াত ৩২: আর আমরা আকাশকে করেছি এক সুরক্ষিত ছাদ। কিন্তু তারা এর নিদর্শনাবলী থেকে বিমুখ থাকে।

৫। সুরা আল হিজরঃ
আয়াত ১৯: আর পৃথিবী- আমরা তাকে প্রসারিত করেছি, আর তাতে স্থাপন করেছি পর্বতমালা, আর তাতে উৎপন্ন করেছি হরেক রকমের জিনিস সুপরিমিতভাবে।

৬। সুরা আন নাবাঃ
আয়াত ৬: আমরা কি পৃথিবীটাকে পাতানো বিছানো রূপে বানাইনি?
আয়াত ৭: আর পাহাড় পর্বতমালাকে পেরেক ?

৭। সুরা আল বাক্বারাহঃ
আয়াত ২২: যিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীকে ফরাশ (couch) বানিয়েছেন, আর আকাশকে চাঁদোয়া (canopy).....

৮। সুরা লুকমানঃ
আয়াত ১০: তিনি মহাকাশমণ্ডলীকে সৃষ্টি করেছেন কোন খুঁটি ছাড়াই,- তোমরা তো দেখতেই পাচ্ছ; আর তিনি পৃথিবীতে স্থাপন করেছেন পর্বতমালা পাছে এটি তোমাদের নিয়ে ঢলে পড়ে....
==>> সূর্য কিন্তু রাতের সময় বিশ্রাম নিতে যায়!! সূর্য ও চাঁদ উভয়েই কক্ষপথে গতিশীল, কিন্তু পৃথিবী এতটুকু যাতে নড়চড় করতে না পারে- তার জন্য পেরেক রূপী পাহাড়-পর্বত।

৯। সুরা ২৩:১৩,১৪
"তারপর আমরা তাকে বানাই শুক্রকীট এক নিরাপদ অবস্থান স্থলে। তারপর শুক্রকীটকে বানাই একটি রক্তপিণ্ড, তারপর রক্তপিণ্ডকে বানাই একতাল মাংসের তাল, তারপরে মাংসের তালে আমরা সৃষ্টি করি হাড়গোড়, তারপর হাড়গোড়কে ঢেকে দেই মাংসপেশী দিয়ে, তারপরে আমরা তাকে সৃষ্টি করি অন্য এক সৃষ্টিতে। সেইজন্য আল্লাহরই অপার মহিমা, কত শ্রেষ্ঠ এই স্রষ্টা।"
==>> সম্পূর্ণ পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গী- এখানে ডিম্বাণুর কোন অস্তিত্ব নেই। শুক্রকীটই রক্তপিন্ড, একতাল মাংস, হাড়গোড় ... ইত্যাদি তৈরি হচ্ছে। ভ্রুণ থেকে নয়!! মাংসের তাল থেকে তৈরী হয় হাড়গোড়, তারপর সেটাকে ঢেকে দেয়া হয় মাংসপেশী দিয়ে!!!

কন্ট্রাডিকশন ৫: মুহম্মদ সা: একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়াদি নিয়ে তাৎক্ষণিক আয়াত
১। সুরা তাহরীমঃ
আয়াত ১: হে নবী, কেন তুমি নিষিদ্ধ করেছ, যা আল্লাহ তোমার জন্য বৈধ করেছেন? তুমি চাইছ তোমার স্ত্রীদের খুশী করতে? আর আল্লাহ পরিত্রাণকারী ও অফুরন্ত ফলদাতা।
আয়াত ২: আল্লাহ তোমাদের জন্য বিধান দিয়ে রেখেছেন তোমাদের শপথগুলো থেকে মুক্তির উপায়; আর আল্লাহ তোমাদের রক্ষাকারী বন্ধু, আর তিনিই সর্বজ্ঞাতা, পরমজ্ঞানী।
আয়াত ৩: আর স্মরণ করো! নবী তাঁর স্ত্রীদের কোন একজনের কাছে গোপনে একটি সংবাদ দিয়েছিলেন, - কিন্তু তিনি যখন তা বলে দিলেন, এবং আল্লাহ তার কাছে এটি জানিয়ে দিয়েছিলেন; তখন তিনি তাকে কতকটা জানিয়েছিলেন এবং চেপে গিয়েছিলেন অন্য কতকটা। তিনি যখন তাকে তা জানিয়েছিলেন তখন তিনি বললনে, - "কে আপনাকে এ কথা বললেন?" তিনি বলেছিলেন, "আমাকে সংবাদ দিয়েছেন সেই সর্বজ্ঞাতা ও চির- ওয়াকিফহাল"।
আয়াত ৪: যদি তোমরা উভয়ে আল্লাহর দিকে ফেরো, কেননা তোমাদের হৃদয় ইতোপূর্বেই ঝোঁকে গিয়েছে। কিন্তু যদি তোমরা উভয়ে তার বিরুদ্ধে পৃষ্ঠপোষকতা করো, তাহলে আল্লাহ,- তিনিই তাঁর রক্ষাকারী বন্ধু, আর জিব্রীল ও পুণ্যবান মুমিনগণ উপরন্তু ফেরেস্তারাও তাঁর পৃষ্ঠপোষক।
আয়াত ৫: হতে পারে তাঁর প্রভু, যদি তিনি তোমাদের তালাক দিয়ে দেন, তবে তিনি তাঁকে বদলে দিবেন তোমাদের চাইতেও উৎকৃষ্ট স্ত্রীদের- আত্মসমর্পিতা, বিশ্বাসিনী, বিনয়াবনতা, অনুতাপকারিনী, উপাসনাকারিনী, রোযাপালনকারিনী, স্বামিঘরকারিনী ও কুমারী।
==>> মুহম্মদ সা: এর বিবিদের অন্তর্কলহ মেটাতে (অনেকের মতে উপপত্নীর সাথে নবীজীর সম্পর্কে কোন কোন নবীপত্নী বাঁধা দেয়ায়) আল্লাহ মারফত নবীজীর হুংকার!!

২। সুরা ৩৩:২৮
"হে নবী, আপনার পত্নীগণকে বলুন, তোমরা যদি পার্থিব জীবন ও তার বিলাসিতা কামনা কর, তবে আস, আমি তোমাদের ভোগের ব্যবস্থা করে দেই এবং উত্তম পন্থায় তোমাদের বিদায় নেই।"

৩। সুরা ৩৩:৫১
"হে নবী! আপনার জন্য আপনার স্ত্রীগণকে হালাল করেছি, যাদেরকে আপনি মোহরানা প্রদান করেন। আর দাসীদেরকে হালাল করেছি, যাদেরকে আল্লাহ আপনার করায়ত্ব করে দেন এবং বিবাহের জন্য বৈধ করেছি আপনার চাচাতো ভগ্নি, ফুফাতো ভগ্নি, মামাতো ভগ্নি, খালাতো ভগ্নিকে যারা আপনার সাথে হিজরত করেছে। কোন মুমিন নারী যদি নিজেকে নবীর কাছে সমর্পন করে, নবী তাকে বিবাহ করতে চাইলে সেও হালাল। এটা বিশেষ করে আপনারই জন্য-অন্য মুমিনদের জন্য নয়। আপনার অসুবিধা দূরীকরণের উদ্দেশে। মুমিনগণের স্ত্রী ও দাসীদের ব্যাপারে যা নির্ধারিত করেছি আমার জানা আছে। আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু।"
===>> খাওলা বিনতে হাকিম নামে এক মহিলা নবীজীর সামনে নিজেকে উপস্থাপন করে বিয়ের প্রস্তাব করেছিল- তখন আয়েশা আপত্তি তুলে ঐ মহিলাকে 'বেহায়া' বললে- এই আয়াত নাযিল হয়। অবশ্য বুদ্ধিমান নবীপত্নী আয়েশার শেষ পর্যন্ত মন্তব্য: "বাহ! আপানার আল্লাহ আপনার জন্য তো ফটাফট কি সুন্দর আয়াত বানিয়ে দিচ্ছেন!!"

৪। ....

কন্ট্রাডিকশন ৬: মুহম্মদ সা: একান্ত ব্যক্তিগত সমস্যা সমাধানকল্পে অহেতুক সময়ক্ষেপন করে আয়াত
১। সুরা ২৪:৩, ৪
"ব্যভিচারী পুরুষ কেবল ব্যভিচারিণী নারী অথবা মুশরিকা নারীকেই বিয়ে করে এবং ব্যভিচারিণীকে কেবল ব্যভিচারী অথবা মুশরিক পুরুষই বিয়ে করে এবং এদেরকে মুমিনদের জন্যে হারাম করা হয়েছে।
যারা সতী-সাধ্বী নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে অতঃপর স্বপক্ষে চার জন পুরুষ সাক্ষী উপস্থিত করে না, তাদেরকে আশিটি বেত্রাঘাত করবে এবং কখনও তাদের সাক্ষ্য কবুল করবে না। এরাই না'ফারমান।"
==>> নবীপত্নী আয়েশা'কে কেলেংকারি থেকে মুক্ত করা হয় এই আয়াতের মাধ্যমে। আর সমস্ত আয়াত ফটাফট নাযিল হলেও- এই আয়াত নাযিল হতে প্রায় এক মাসের অধিক সময় লাগে। এই এক মাস- নবীজী যথেস্ট কনফিউজড ছিলেন (আয়েশা যখন জিজ্ঞেস করে যে তিনি তাকে সন্দেহ করছেন কি না- তখনো নবীজী সরাসরি কিছু জবাব দেননি)। শেষে ঘনিষ্ঠ সাহাবিদের পরামর্শ চাইলে একমাত্র আলী রা: জানান- এই অসতী মহিলাকে তালাক দিয়ে দেন, কিন্তু বাকি সবাই পরামর্শ দেন- নবীপত্নীকে তালাক দেয়াটা ভালো কাজ হবে না। এর পরদিনই এই আয়াত নাযিল হয়।

২। ...

কন্ট্রাডিকশন ৭: আজকের নীতি-নৈতিকতার বিচারে বর্বর ও চরম অনৈতিক আয়াত (এটারও ভুরি ভুরি নজির আছে)
ক) ঘৃণা, হত্যা, জোর-জবরদস্তি
১। সুরা ২:১৯১, ১৯২, ১৯৩
আর তাদেরকে হত্যাকর যেখানে পাও সেখানেই এবং তাদেরকে বের করে দাও সেখান থেকে যেখান থেকে তারা বের করেছে তোমাদেরকে| বস্তুত: ফেতনা ফ্যাসাদ বা দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করা হত্যার চেয়েও কঠিন অপরাধ| আর তাদের সাথে লড়াই করো না মসজিদুল হারামের নিকটে যতক্ষণ না তারা তোমাদের সাথে সেখানে লড়াই করে| অবশ্য যদি তারা নিজেরাই তোমাদের সাথে লড়াই করে| তাহলে তাদেরকে হত্যা কর| এই হল কাফেরদের শাস্তি।
আর তারা যদি বিরত থাকে, তাহলে আল্লাহ্ অত্যন্ত দয়ালু|
আর তোমরা তাদের সাথে লড়াই কর, যে পর্যন্ত না ফেতনার অবসান হয় এবং আল্লাহ্র দ্বীন প্রতিষ্ঠিত হয়| অত:পর যদি তারা নিবৃত হয়ে যায় তাহলে কারো প্রতি কোন জবরদস্তি নেই, কিন্তু যারা যালেম (তাদের ব্যাপারে আলাদা)।

২। সুরা ২:২১৬
"তোমাদের উপর যুদ্ধ ফরয করা হয়েছে, অথচ তা তোমাদের কাছে অপছন্দনীয়| পক্ষান্তরে তোমাদের কাছে হয়তো কোন একটা বিষয় পছন্দসই নয়, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর| আর হয়তোবা কোন একটি বিষয় তোমাদের কাছে পছন্দনীয় অথচ তোমাদের জন্যে অকল্যাণকর| বস্তুত: আল্লাহ্ই জানেন, তোমরা জান না।"

৩। সুরা ৩:৫৬
"অতএব যারা কাফের হয়েছে, তাদেরকে আমি কঠিন শাস্তি দেবো দুনিয়াতে এবং আখেরাতে-তাদের কোন সাহায্যকারী নেই।"

(এখান থেকে আপডেট করা হবে)

খ) নারীর অবমূল্যায়ন
১। সুরা ২:২২৩
"তোমাদের স্ত্রীরা হলো তোমাদের জন্য শস্য ক্ষেত্র| তোমরা যেভাবে ইচ্ছা তাদেরকে ব্যবহার কর| আর নিজেদের জন্য আগামী দিনের ব্যবস্খা কর এবং আল্লাহ্কে ভয় করতে থাক| আর নিশ্চিতভাবে জেনে রাখ যে, আল্লাহর সাথে তোমাদেরকে সাক্ষাত করতেই হবে| আর যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে সুসংবাদ জানিয়ে দাও।"

২। সুরা ২:২২৮
"আর তালাকপ্রাপ্তা নারী নিজেকে অপেক্ষায় রাখবে তিন হায়েয পর্যন্ত| আর যদি সে আল্লাহর প্রতি এবং আখেরাত দিবসের উপর ঈমানদার হয়ে থাকে, তাহলে আল্লাহ্ যা তার জরায়ুতে সৃষ্টি করেছেন তা লুকিয়ে রাখা জায়েজ নয়| আর যদি সদ্ভাব রেখে চলতে চায়, তাহলে তাদেরকে ফিরিয়ে নেবার অধিকার তাদের স্বামীরা সংরক্ষণ করে| আর পুরুষদের যেমন স্ত্রীদের উপর অধিকার রয়েছে, তেমনি ভাবে স্ত্রীদেরও অধিকার রয়েছে পুরুষদের উপর নিয়ম অনুযায়ী| আর নারীরদের ওপর পুরুষদের শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে| আর আল্লাহ্ হচ্ছে পরাক্রমশালী, বিজ্ঞ।"

৩। সুরা ২:২৩০
"তারপর যদি সে স্ত্রীকে (তৃতীয়বার) তালাক দেয়া হয়, তবে সে স্ত্রী যে পর্যন্ত তাকে ছাড়া অপর কোন স্বামীর সাথে বিয়ে করে না নেবে, তার জন্য হালাল নয়| অত:পর যদি দ্বিতীয় স্বামী তালাক দিয়ে দেয়, তাহলে তাদের উভয়ের জন্যই পরস্পরকে পুনরায় বিয়ে করাতে কোন পাপ নেই| যদি আল্লাহর হুকুম বজায় রাখার ইচ্ছা থাকে| আর এই হলো আল্লাহ্ কর্তৃক নির্ধারিত সীমা; যারা উপলব্ধি করে তাদের জন্য এসব বর্ণনা করা হয়|"

৪। সুরা ৪:৩৪
"পুরুষেরা নারীদের উপর কৃর্তত্বশীল এ জন্য যে, আল্লাহ একের উপর অন্যের বৈশিষ্ট্য দান করেছেন এবং এ জন্য যে, তারা তাদের অর্থ ব্যয় করে| সে মতে নেককার স্ত্রীলোকগণ হয় অনুগতা এবং আল্লাহ্ যা হেফাযতযোগ্য করে দিয়েছেন লোক চক্ষুর অন্তরালেও তার হেফাযত করে| আর যাদের মধ্যে অবাধ্যতার আশঙ্কা কর তাদের সদুপদেশ দাও, তাদের শয্যা ত্যাগ কর এবং প্রহার কর| যদি তাতে তারা বাধ্য হয়ে যায়, তবে আর তাদের জন্য অন্য কোন পথ অনুসন্ধান করো না| নিশ্চয় আল্লাহ্ সবার উপর শ্রেষ্ঠ।"
(এখান থেকে আরো আপডেট করা হবে।)

কন্ট্রাডিকশন ৮: একই কথার অহেতুক পুনরাবৃত্তি
ক) একই সুরায়
১।সুরা ১০৯:৩
"এবং তোমরাও এবাদতকারী নও, যার এবাদত আমি করি"
সুরা ১০৯:৫
"তোমরা এবাদতকারী নও, যার এবাদত আমি করি"।

২। ....

খ) ভিন্ন ভিন্ন সুরায়:
১। সুরা ২:১, ২৯:১, ৩০:১
"আলিফ-লাম-মীম"

২। ....

কন্ট্রাডিকশন ৯ : অর্থহীন অক্ষরসমষ্টি
১। সুরা ২:১
"আলিফ-লাম-মীম"
২। সুরা ২৭:১
"ত্বা-সীন"
৩। ......

কন্ট্রাডিকশন ১০ : কোরআনের ঐ সব আদেশ, নিষেধ, উপদেশ- যা মুহম্মদ সা: নিজেই মানেন নি
১। সুরা ৪:৩
"আর যদি তোমরা ভয় কর যে, এতীম মেয়েদের হক যথাথভাবে পুরণ করতে পারবে না, তবে সেসব মেয়েদের মধ্যে থেকে যাদের ভাল লাগে তাদের বিয়ে করে নাও দুই, তিন, কিংবা চারটি পর্যন্ত। আর যদি এরূপ আশঙ্কা কর যে, তাদের মধ্যে ন্যায় সঙ্গত আচরণ বজায় রাখতে পারবে না, তবে, একটিই অথবা তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসীদেরকে; এতেই পক্ষপাতিত্বে জড়িত না হওয়ার অধিকতর সম্ভাবনা।"

২। .....]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29065274 http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29065274 2009-12-25 14:32:08
যুক্তি-তক্কো-গল্প (পর্ব ২: সৃষ্টি রহস্য১) ২। ছয়দিনে বিশ্বব্রহ্মান্ড সৃষ্টির সম্পর্কেও কি তখনকার মানুষদের ধারণা ছিল, কেমন করে জানতো তারা? এ ব্যাপারে আপনার মতামত কি?
শুরুতেই ছয়দিনে বিশ্বব্রহ্মান্ড সৃষ্টির ব্যাপারে কোরআনের আলোচনাগুলো দেখি:
(৭:৫৪)
"নিশ্চয় তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ। তিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর আরশের উপর অধিষ্টিত হয়েছেন। তিনি পরিয়ে দেন রাতের উপর দিনকে এমতাবস্থায় যে, দিন দৌড়ে রাতের পিছনে আসে। তিনি সৃষ্টি করেছেন সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্র দৌড় স্বীয় আদেশের অনুগামী। শুনে রেখ, তাঁরই কাজ সৃষ্টি করা এবং আদেশ দান করা। আল্লাহ, বরকতময় যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক।"

(৪১: ৯, ১০, ১১, ১২)
"বলুন, তোমরা কি সে সত্তাকে অস্বীকার কর যিনি পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন দু'দিনে এবং তোমরা কি তাঁর সমকক্ষ স্থির কর? তিনি তো সমগ্র বিশ্বের পালনকর্তা।
তিনি পৃথিবীতে উপরিভাগে অটল পর্বতমালা স্থাপন করেছেন, তাতে কল্যাণ নিহিত রেখেছেন এবং চার দিনের মধ্যে তাতে তার খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন-পূর্ণ হল জিজ্ঞাসুদের জন্যে।
অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোযোগ দিলেন যা ছিল ধুম্রকুঞ্জ, অতঃপর তিনি তাকে ও পৃথিবীকে বললেন, তোমরা উভয়ে আস ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়। তারা বলল, আমরা স্বেচ্ছায় আসলাম।
অতঃপর তিনি আকাশমন্ডলীকে দু'দিনে সপ্ত আকাশ করে দিলেন এবং প্রত্যেক আকাশে তার আদেশ প্রেরণ করলেন। আমি নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালা দ্বারা সুশোভিত ও সংরক্ষিত করেছি। এটা পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ আল্লাহর ব্যবস্থাপনা।"

(৩২:৪)
"আল্লাহ যিনি নভোমন্ডল, ভুমন্ডল ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনি আরশে বিরাজমান হয়েছেন। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন অভিভাবক ও সুপারিশকারী নেই। এরপরও কি তোমরা বুঝবে না?"

(৭৯: ২৭, ২৮, ২৯, ৩০, ৩১, ৩২, ৩৩)
তোমাদের সৃষ্টি অধিক কঠিন না আকাশের, যা তিনি নির্মাণ করেছেন? তিনি একে উচ্চ করেছেন ও সুবিন্যস্ত করেছেন। তিনি এর রাত্রিকে করেছেন অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং এর সূর্যোলোক প্রকাশ করেছেন। পৃথিবীকে এর পরে বিস্তৃত করেছেন। তিনি এর মধ্য থেকে এর পানি ও ঘাম নির্গত করেছেন, পর্বতকে তিনি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তোমাদের ও তোমাদের চতুস্পদ জন্তুদের উপকারার্থে।

[উপরের আয়াতগুলোর বাংলা অনুবাদ নেয়া হয়েছে আওয়ারহলিকোরআনডটকম সাইট থেকে। অন্যান্য অনুবাদগুলোতে প্রধান যে পার্থক্য- সেটা হচ্ছে "দিন" এর বদলে যুগ, aeon, period এর ব্যবহার। ইউসুফ আলী, পিকথাল এর অনুবাদে "Day" থাকলেও আসাদের অনুবাদে আছে aeon এবং শাকিররে অনুবাদে আছে period।

আজকের পোস্টে আশা করি- তক্কো করার প্রয়োজন পড়বে না, কোরআনে করা যুক্তিগুলো একঝলক দেখলেই বিজ্ঞান সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা আছে এমন একজন বুঝতে পারবে এগুলো আসলে কি। ফলে- যুক্তিগুলো প্রথমে দেখবো এবং তারপরে- যেহেতু নাজনীন১ এর মূল প্রশ্ন: "ছয়দিনে বিশ্বব্রহ্মান্ড সৃষ্টির সম্পর্কেও কি তখনকার মানুষদের ধারণা ছিল, কেমন করে জানতো তারা?"- সেহেতু সেদিনকার মানুষ বিশ্বব্রহ্মান্ড সম্পর্কে কি কি জানতো- সেরকম কিছু গল্প আজকে করবো। (পরের পোস্টে যেহেতু কিছু তক্কোও থাকবে- সেহেতু এই সিরিজের শিরোনাম "যুক্তি-তক্কো-গল্প"-ই থাকছে, এই পর্বের জন্য যদিও বিষয়টি কেবল "যুক্তি-গল্প" এর।)
কোরআনে বর্ণিত সৃষ্টিরহস্য মোটামুটি বুঝা গেলো। কি পয়েন্ট হচ্ছে:
১। পৃথিবী, আকাশ ও উভয়ের মাঝখানের সবকিছু সৃষ্টিতে সময় লেগেছে ৬ দিন (বা যুগ)। ২। পৃথিবী সৃষ্টির সময় ২ দিন (বা যুগ) ৩। আকাশ (সপ্ত) সৃষ্টিতে সময় ২ দিন (বা যুগ) ৪। পৃথিবী ও পৃথিবীর যাবতীয় কিছু (যেমন পর্বতমালা, খাবারের ব্যবস্থা) সৃষ্টিতে সময় লেগেছে ৪ দিন (বা যুগ)। ৫। আগে পৃথিবী, না কি আগে আকাশ- এ নিয়ে কিছু বিতর্ক আছে। হামীম-সিজদায় জানা যাচ্ছে- আগে পৃথিবী সৃষ্টি করেই আল্লাহ আকাশ সৃষ্টি করেছেন, কিন্তু সুরা নাযিয়াতে দেখা যায়- বলা হচ্ছে, আকাশ সৃষ্টি করার পরে আল্লাহ পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছেন। অনেক ইসলামিক স্কলার এই দুটো সুরা থেকে সিদ্ধান্ত টেনেছেন- ১ম ২ দিনে পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, তারপরের ২ দিনে আকাশ সৃষ্টি, এবং শেষ ২ দিনে পৃথিবীর জিনিসপাতিগুলো সৃষ্টি করেছেন। (দারুন সমাধান! বিরুদ্ধবাদীদের মুখে একেবারে তালা!)

এবারে মারেফুল কোরআন, ইবনে কাথীরমোহাম্মাদ আসাদের কিছু ব্যাখ্যা দেখে- "যুক্তি" অংশের আলোচনা শেষ করবো..
মারেফুল কোরআনে আছে, "আকাশ ও পৃথিবী কোনটির পর কোনটি এবং কোন কোন দিনে সৃজিত হয়েছে: বয়ানুল কোরআনে হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (র) বলেন, আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টির বিষয় এমনিতে কোরআন পাকে সংক্ষেপে ও বিস্তারিতভাবে বহু জায়গায় বিবৃত হয়েছে, কিন্তু কোনটির পরে কোনটি সৃজিত হয়েছে, এর উল্লেখ সম্ভবত মাত্র তিন আয়াতে করা হয়েছে- এক. হা-মীম সিজদার আলোচ্য আয়াত, দুই. সুরা বাকারার উল্লিখিত আয়াত এবং তিন. সুরা নাযিয়াতের আয়াত। বাহ্য দৃষ্টিতে এসব বিষয়বস্তুর মধ্যে কিছু বিরোধও দেখা যায়। কেননা, সুরা বাকারা ও সুরা হা-মীম সিজদার আয়াত থেকে জানা যায় যে, আকাশের পূর্বে পৃথিবী সৃজিত হয়েছে এবং সুরা নাযিয়াতের আয়াত থেকে এর বিপরীত জানা যায় যে, আকাশ সৃজিত হওয়ার পরে পৃথিবী সৃজিত হয়েছে। সবগুলো আয়াত নিয়ে চিন্তা করলে আমার মনে হয় যে, প্রথমে পৃথিবীর উপকরণ সৃজিত হয়েছে। এমতাবস্থায়ই ধুম্র-কুঞ্জের আকারে আকাশের উপকরণ নির্মিত হয়েছে। এরপরে পৃথিবীকে বর্তমান আকারে বিস্তৃত করা হয়েছে এবং এতে পর্বতমালা, বৃক্ষ ইত্যাদি সৃষ্টি করা হয়েছে। এরপর আকাশের তরল ধুম্রকুঞ্জের উপকরণকে সপ্ত আকাশে পরিণত করা হয়েছে। আশা করি- সবগুলো আয়াতই এই বক্তব্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। বাকি অবস্থা আল্লাহ তা'আলাই জানেন।"

ইবনে কাথীর তারঁ তাফসিরে ইবনে জুবায়েরের বরাত দিয়ে ইবনে আব্বাস (রা) থেকে (সহীহ বুখারী হাদীস থেকে) জানাচ্ছেন:
"মদীনার ইহুদীরা রাসুলুল্লাহ সা: কে আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি বললেন, আল্লাহ তা'আলা পৃথিবীকে রোববার ও সোমবার, পর্বতমালা ও খনিজ দ্রব্যাদি মঙ্গলবার, উদ্ভিদ, ঝরনা, অন্যান্য বস্তুনিচয় ও জনশুন্য প্রান্তর বুধবার দিন সৃষ্টি করেন। এতে মোট চারদিন সময় লাগে। অত:পর বললেন, এবং বৃহস্পতিবার আকাশ সৃষ্টি করেন। আর, শুক্রবার তারকারাজি, সূর্য, চন্দ্র ও ফেরেশতা সৃজিত হয়। শুক্রবার দিনের তিন প্রহর বাকি থাকতে এসব কাজ সমাপ্ত হয়। এই প্রহরত্রয়ের ২য় প্রহরে সাম্ভাব্য বিপদাপদ সৃষ্টি করা হয় এবং তৃতীয় প্রহরে আদম (আ) কে সৃষ্টি করা হয়। তাঁকে জান্নাতে স্থান দেয়া হয় এবং ইবলীশকে আদেশ করা হয় আদমের উদ্দেশ্যে সিজদা করতে। ইবলীশ অস্বীকার করলে তাকে জান্নাত থেকে বহিস্কার করা হয়। এসব কাজ তৃতীয় প্রহরের শেষ পর্যন্ত সমাপ্তি লাভ করে।"

মারেফুন কোরআনে আরেকটি মজার তথ্য পাওয়া যায়- সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হযরত আবু হুরায়রার বাচনিক এক রেওয়ায়েতে জগৎ সৃষ্টির শুরু শনিবার থেকে ব্যক্ত করা হয়েছে। এটা উল্লেখ করে মারেফুল কোরআন জানাচ্ছে- এই হিসাব মোতাবেক আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি সাত দিনে হয়েছে বলে জানা যায়- কিন্তু কোরআনের আয়াত থেকে জানা যায়- এই সৃষ্টি কাজ ছয় দিনে হয়েছে। অর্থাৎ- এই আলোচনায় ধরেই নেয়া হয়েছে- সৃষ্টি কাজ সমাপ্ত হয়েছে শুক্রবারে (তা না হলে- শনিবারে সৃষ্টি শুরুর কথা বললেই তা কি করে সাতদিন ইণ্ডিকেট করবে?)।

যাহোক- আধুনিক ব্যাখ্যা এবারে একটু দেখি। মেসেজ অব কোরআন এ সুরা হা-মীম সিজদার ৯-১১ আয়াতের ব্যাখ্যা মোহাম্মদ আসাদ জানাচ্ছেন:
"(9) For the above rendering of the term yawm (lit., 'day'), as 'aeon'. As in so many verses of the Quran which relate to cosmic events, the repeated mention of the "six aeons" during which the universe was created - 'two' of which, according to the above verse, were taken by the evolution of the inorganic universe, including the earth - has a purely allegorical import: in this case, I believe, an indication that the universe did not exist 'eternally' but had a definite beginning in time, and that it required a definite time-lapse to evolve to its present condition.
(10) Almost all the classical commentators agree in that these "four aeons" include the 'two' mentioned in the preceding verse: hence my interpolation of the words "and all this He created". Together with the "two aeons" of verse 12, the entire allegorical number comes to six.
(11) Whenever the particle thumma is used, as in the above instance, to link parallel statements i.e., statements not necessarily indicating a sequence in time - it has the function of a simple conjunction, and may be rendered as 'and'.
(Smoke) I.e., a gas - evidently hydrogen gas, which physicists regard as the primal element from which all material particles of the universe have evolved and still evolve. For the meaning of the term sama ("sky" or "skies" or "heaven") in its cosmic connotation. Explaining this passage, Zamakhshari observes: "The meaning of God's command to the skies and the earth to "come", and their submission is this: He willed their coming into being, and so they came to be as He willed them to be and this is the kind of metaphor (majaz) which is called "allegory" (tamthil). Thus, the purport is but an illustration (taswir) of the effect of His almighty power on all that is willed, and nothing else. (It is obvious that Zamakhshari's reasoning is based on the oft-repeated Quranic statement, 'When God wills a thing to be, He but says unto it, 'Be' - and it is.') Concluding his interpretation of the above passage, Zamakhshari adds: "If I am asked about the meaning of [the words] 'willingly or unwillingly', I say that it is a figurative expression (mathal) indicating that His almighty will must inevitably take effect."

দারুন বৈজ্ঞানিক সব ব্যাখ্যা পাওয়া গেলো। সবচেয়ে মজার- পুরো অভূতপূর্ব হচ্ছে- ধোঁয়াকে গ্যাস হিসাবে উল্লেখ করা এবং এমনকি হাইড্রোজেন প্রভৃতির নাম নেওয়া। এছাড়াও এখানে আরেকটা বিষয় দেখার মতো- সেটা হলো: ইবনে কাথির, আশরাফ আলী থানভি থেকে শুরু করে বাঘা বাঘা স্কলারেরা যে বিষয়টিতে রীতিমত হিমশিম খাচ্ছিলেন (ইবনে আব্বাস, ইবনে জুবায়ের তথা রাসুলুল্লাহ সা: ও কি খাচ্ছিলেন না?)- সেই 'কোন কোন দিনে কি সৃষ্টি হয়েছে' বিষয়টিকে এক কথায় মেটাফরিক বলে উড়িয়ে দিয়ে জানালেন- কোরআনের এসমস্ত আলোচনা থেকে একটাই সিদ্ধান্তে আসা যেতে পারে- সেটা হচ্ছে- বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের অবশ্যই একটা শুরু আছে, বাস। যাহোক- আগেই বলেছি আজকে তক্কো করবো না, পুরোটাই আজকের এই পোস্টের জন্য আপনাদের হাতেই ছেড়ে দিলাম। কোরআনের নানা যুক্তি আপনাদের শুনা হলো- এবার আপনারাই সিদ্ধান্ত নেন।

এই পোস্ট শেষ করার আগে- নাজনীন১ এর জবাবে কিছু গল্প শুনিয়ে যাই .....

বাইবেল, ওল্ড টেস্টামেন্ট এর জেনেসিস নামক গ্রন্থের শুরুতেই সৃষ্ট রহস্য নিয়ে কিছু আলোচনা আছে। ইহুদীরা বাইবেল- ওল্ড টেস্টামেন্ট আর খৃস্টানরা বাইবেল- নিউ টেস্টামেন্ট অনুসরণ করলেও, ওল্ড টেস্টামেন্টের জেনেসিস অংশটুকুকে ইহুদী ও খৃস্টানরা উভয়েই সঠিক হিসাবে মনে করে। অর্থাৎ- ইহুদী ও খৃস্টানরা উভয়েই সৃষ্টি রহস্য সম্পর্কে একই রকম ধারণা পোষণ করে। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, যে সময়ে সৃষ্টি রহস্য সম্পর্কিত কোরআনের আলোচ্য আয়াতগুলো প্রচার করা হয়- সেই সময়ের প্রেক্ষিতেও বলা যায়, কয়েক হাজার বছর ধরে ইহুদীরা ও অর্ধ সহস্র বছরের বেশী সময় ধরে খৃস্টানরা সৃষ্টিরহস্য সম্পর্কে যা জানতো ও মানতো। ফলে- ইহুদী ও খৃস্টানরা কি জানতো ও মানতো সেই গল্প বলছি:

আদিপুস্তক জগৎ সৃষ্টির শুরু
প্রথম দিন- আলো
শুরুতে, ঈশ্বর আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করলেন। প্রথমে পৃথিবী সম্পূর্ণ শূণ্য ছিল; পৃথিবীতে কিছুই ছিল না। অন্ধকারে আবৃত ছিল জলরাশি আর ঈশ্বরের আত্মা সেই জলরাশির উপর দিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছিল। তারপর ঈশ্বর বললেন, "আলো ফুটুক"। তখনই আলো ফুটতে শুরু করলো। আলো দেখে ঈশ্বর বুঝলেন, আলো ভাল। তখন ঈশ্বর আলোকে অন্ধকার থেকে পৃথক করলেন। ঈশ্বর আলোর নাম দিলেন 'দিন' এবং অন্ধকারের নাম দিলেন 'রাত্রি'। সন্ধ্যা হল এবং সেখানে সকাল হলো। এই হলো ১ম দিন।

দ্বিতীয় দিন- আকাশ
তারপর ঈশ্বর বললেন, "জলকে দুভাগ করবার জন্য আকাশমন্ডলের ব্যবস্থা হোক!" তাই ঈশ্বর আকাশমন্ডলের সৃষ্টি করে জলকে পৃথক করলেন। এক ভাগ জল আকাশমন্ডলের উপরে আর অন্য ভাগ জল আকাশমন্ডলের নীচে থাকলো। ইশ্বর আকাশমন্ডলের নাম দিলেন "আকাশ"। সন্ধ্যা হল এবং সেখানে সকাল হলো। এই হলো ২য় দিন।

তৃতীয় দিন- শুকনো জমি ও গাছপালা
তারপর ঈশ্বর বললেন, "আকাশের নীচের জল এক জায়গায় জমা হোক যাতে শুকনো ডাঙা দেখা যায়"। এবং তা-ই হলো। ঈশ্বর শুকনো জমির নাম দিলেন "পৃথিবী" এবং এক জায়গায় জমা জলের নাম দিলেন "মহাসাগর"। .... তখন ঈশ্বর বললেন, "পৃথিবীতে ঘাস হোক, শস্যদায়ী গাছ ও ফলের গাছপালা হোক। ফলের গাছগুলোতে ফল ও ফলের ভেতরে বীজ হোক। প্রত্যেক উদ্ভিদ আপন আপন জাতের বীজ সৃষ্টি করুক। এইসব গাছপালা পৃথিবীতে বেড়ে উঠুক"। আর তা-ই হলো। ... এভাবে হলো তৃতীয় দিন।

চতুর্থ দিন - সূর্য, চাঁদ ও তারা
তারপর ঈশ্বর বললেন, আকাশে আলো ফুটুক। এই আলো দিন থেকে রাত্রিকে পৃথক করবে। ....।" এবং তা-ই হলো। তখন ঈশ্বর দুটি মহাজ্যোতি বানালেন। ঈশ্বর দিনের বেলা রাজত্ব করার জন্য বড়টি আর রাত্রিবেলা রাজত্ব করার জন্য ছোটটি বানালেন। ঈশ্বর তারকারাজিও সৃষ্টি করলেন। পৃথিবীকে আলো দেয়ার জন্য ঈশ্বর এই আলোগুলিকে আকাশে স্থাপন করলেন। ..... এভাবে চতুর্থ দিন হলো।

পঞ্চম দিন - মাছ ও পাখী
তারপর ঈশ্বর বললেন, "বহু প্রকার জীবন্ত প্রাণীতে জল পূর্ণ হোক আর পৃথিবীর ওপরে আকাশে ওড়বার জন্য বহু পাখী হোক।" সুতরাং ঈশ্বর বড় বড় জলজন্তু এবং জলে বিচরণ করবে এমন সমস্ত প্রাণী সৃষ্টি করলেন। অনেক প্রকার সামুদ্রিক জীব রয়েছে এবং সে সবই ঈশ্বরেরই সৃষ্টি। যতরকম পাখী আকাশে ওড়ে সেইসবও ঈশ্বর বানালেন। .... ঈশ্বর সামুদ্রিক প্রাণীদের সংখ্যা বৃদ্ধি করে সমুদ্র ভরিয়ে তুলতে বললেন। ঈশ্বর পৃথিবীতে পাখীদের সংখ্যাবৃদ্ধি করতে বললেন। ... এভাবে ৫ম দিন কেটে গেল।

ষষ্ঠ দিন - ডাঙার জন্তু জানোয়ার ও মানুষ
তারপর ঈশ্বর বললেন, "নানারকম প্রাণী পৃথিবীতে উৎপন্ন হোক। নানারকম বড় আকারের জন্তু-জানোয়ার আর বুকে হেঁটে চলার নানারকম ছোট প্রাণী হোক এবং প্রচুর সংখ্যায় তাদের সংখ্যাবৃদ্ধি হোক। তখন যেমন তিনি বললেন সবকিছু সম্পন্ন হলো।
..... তখন ঈশ্বর বললেন, "এখন এস, আমরা মানুষ সৃষ্টি করি। আমাদের আদলে আমরা মানুষ সৃষ্টি করবো। মানুষ হবে ঠিক আমাদের মত। তারা সমুদ্রের সমস্ত মানুষের মাছের ওপরে আর আকাশের সমস্ত পাখীর ওপরে কর্তৃত্ব করবে। তারা পৃথিবীর সমস্ত বড় জানোয়ার আর বুকে হাঁটার সমস্ত ছোট প্রাণীর ওপরে কর্তৃত্ব করবে।"
তাই ঈশ্বর নিজের মতোই মানুষ সৃষ্টি করলেন। মানুষ হল তাঁর ছাচে গড়া জীব। ঈশ্বর তাদের পুরুষ ও স্ত্রীরূপে সৃষ্টি করলেন। ঈশ্বর তাদের আশীর্বাদ করে বললেন, " তোমাদের বহু সন্তানসন্ততি হোক। মানুষে মানুষে পৃথিবী পরিপূর্ণ করো এবং তোমরা পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণের ভার নাও। সমুদ্রে মাছেদের এবং বাতাসে পাখীদের শাসন করো। মাটির উপরে যা কিছু নড়েচড়ে, যাবতীয় প্রাণীকে তোমরা শাসন করো।"
........ ঈশ্বর যা কিছু সৃষ্টি করেছেন সেসব কিছু দেখলেন। এবং ঈশ্বর দেখলেন সমস্ত সৃষ্টিই খুব ভালো হয়েছে। সন্ধ্যা হলো, তারপর সকাল হলো। এভাবে ষষ্ঠ দিন হলো।

সপ্তম দিন - বিশ্রাম
সুতরাং, পৃথিবী, আকাশ এবং তাদের আভ্যন্তরীন যাবতীয় জিনিস সম্পূর্ণ হলো। যে কাজ ঈশ্বর শুরু করেছিলেন তা শেষ করে সপ্তম দিনে তিনি বিশ্রাম নিলেন। ...... ঐ দিনটিতে পৃথিবী সৃষ্টির সমস্ত কাজ থেকে তিনি বিশ্রাম নিলেন।

এই হলো বাইবেল বর্ণিত আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টির গল্প। বাইবেলের সৃষ্টি রহস্য সম্পর্কিত গল্পের কি পয়েন্ট হচ্ছে:
১। ৬ দিনে বিশ্বজগতের সৃষ্টি (কোরআনের গল্পের অনুরূপ) ২। আকাশ সৃষ্টিতে ১ দিন এবং তারা-নক্ষত্র প্রভৃতি সৃষ্টিতে ১ দিন- মোট ২ দিন লেগেছে (কোরআনের গল্পের অনুরূপ) ৩। আগে আকাশ, পরে পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছে (সুরা হা-মীম সিজদায় বর্ণিত গল্পের বিপরীত, যদিও সুরা নাযিয়াতে বর্ণিত গল্পের অনুরূপ) ৪। ৬ দিনে সৃষ্টির প্যাকেজ শেষ করে ঈশ্বর বিশ্রাম নিয়েছেন (কোরআনের গল্পের বিপরীত, কোরআনের আল্লাহ জানান: "আমাকে কখনোই ক্লান্ত স্পর্শ করেনি")
যাহোক, কোনরূপ তক্কো করা আজকে বাদ, গল্প শুনাতে চেয়েছি - শুনালাম। প্রাচীণ মানুষের এমন নানা চমকপ্রদ গল্প শুনতে বা পড়তে দারুন মজা, তাই না? এই অঞ্চলে ব্রহ্মা কর্তৃক ব্রহ্মান্ড সৃষ্টি, বা গ্রীক পুরাণের - নর্সদের - রোমানদের বা পারসিকদের সৃষ্টি সম্পর্কিত মিথগুলোও এখানে আলোচিত হতে পারতো। পোস্ট লম্বা হয়ে যাচ্ছে বিধায়, গল্পের মুখেও লাগাম ধরলাম (আরেকদিন নাহয় সে গল্প শোনানো যাবে)- কেবল এটিই এখানে বলতে চাই- মানুষ বড় কল্পনাপ্রবণ এক প্রাণী। যুগে যুগে মানুষ অনেক অ-নেক কিছুই কল্পনা করেছে, কল্পনাগুলো আজো আমাদের অনেক আনন্দ দেয়, কেবল আনন্দই পাওয়া যায় তা না, এই কল্পনাগুলো থেকে আমরা বিভিন্ন যুগে মানুষের অবস্থাগুলোও জানতে ও বুঝতে পারি। সুতরাং, এমনটি ভাবার কোনই কারণ নেই যে- মানব ইতিহাসে একমাত্র মুহম্মদ সা: -ই কল্পনা করেছেন, আর কেউ করেননি।

.. (চলবে)

পরবর্তী পর্বের শিরোনাম:
যুক্তি-তক্কো-গল্প (পর্ব ৩: সৃষ্টি রহস্য২) ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29060673 http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29060673 2009-12-17 18:51:30
নাস্তিক হয়েও যেসব কারণে মুহম্মদ সা: কে খুব শ্রদ্ধা করি ...... (৩য় পর্ব) ২। তিনি একজন নৃশংস খুনী ছিলেন। পরাজিতদের তিনি কচু কাটা করতেন। প্রতিপক্ষকে বাগে পেলে তিনি সর্বনাশ দেখে ছাড়তেন। প্রচন্ড যুদ্ধবাজ নেতা ছিলেন।

এর আগে আমার নিজেরো একটি সিরিজ পোস্ট (পর্ব-১, পর্ব-২, পর্ব-৩, পর্ব-৪) ছিল- যেখানে মুহম্মদ সা: এর যুদ্ধবিগ্রহের বর্ণনা দিয়েছিলাম। কিন্তু তারপরেও- আমি ঠিক অশ্রদ্ধা করতে পারি না - এই লোকটাকে। কেন? সেটার কারণটাই আগের মতো করে কিছু গপসপ দিয়েই বুঝাই .....

বাল্যকালে স্কুল ম্যাগাজিনের জন্য একটা ছোট গল্প লিখেছিলাম (আমার ১ম গল্প)। পারিবাহিক আবহের কারণেই মুক্তিযুদ্ধ ছিল আমার বিশেষ আবেগের জায়গা এবং রাজাকাররা ছিল চরমতম ঘৃণার জায়গা। তো আমার গল্পের প্লটটা অনেকটা এমন- একজন মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধ করতে করতে খুব আহত হয়ে যায়- সে একটা পরিত্যক্ত বিল্ডিং- যেটা একটা একটা মুক্তি ক্যাম্প - সেখানে আহত অবস্থায় শুয়ে থাকে- এবং এখান থেকেই গল্পটা শুরু- ঐ মুক্তিযোদ্ধাটা গল্পের কথক- ... শেষে দেখা যায়- সহযোদ্ধারা আরেকটা সফল অপারেশন শেষে একটা রাজাকারকে বন্দী করে ধরে নিয়ে আসে- এবং ঐ আহত মুক্তিযোদ্ধাটা রাজাকারকে খুন করে- এবং দারুন প্রশান্তি নিয়ে নিজেও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এই গল্পের মেলা প্রশংসার পরে এক জায়গায় এক সমালোচনা শুনেছিলাম। আমার এক মুক্তিযোদ্ধা কাকু (বাবার উকিল বন্ধু- এবং জেলা শহরের একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব) আমাকে জানালো- জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী একজন বন্দীকে খুন করা চরমতম অপরাধ ও ঘৃণ্য কাজ। আমি থ হয়ে গিয়েছিলাম, অনেক ভাবলাম- অনেক চিন্তা করলাম- শেষে আমি কাকুর সাথে একমত না হয়ে পারলাম না- আসলেই যুদ্ধবন্দীকে খুন করাটা কাপুরুষতার পরিচায়ক। পরে কাকুকে ধরলাম- মুক্তিযোদ্ধরা কি কখনোই যুদ্ধবন্দীকে কিছু করে নাই? কাকুর জবাব- হুম করেছে। আবার দ্বন্দ্বে পড়ে গেলাম- মুক্তিযোদ্ধারা যারা এমন কাজে লিপ্ত ছিল- তাদের কি বলবো? সত্যি বলতে কি- আমি যেমন মনে করি- যুদ্ধবন্দীকে মারা জঘণ্য কাজ- তেমনি একই সাথে আমাদের যেসব মুক্তিযোদ্ধারা রাজাকারদের- বা যুদ্ধবন্দীদের ধরে অত্যাচার করেছে- বা খুন-টুনও করেছে তাদের এতটুকু প্রতি রাগ-ক্ষোভ তৈরি হয় না, বরং মনে হয়- ঠিকই করেছে (কেননা, পাক হানাদার বাহিনী প্রথম আমাদের নিরস্ত্র মানুষদের উপর হামলে পড়েছিল- এই ইতিহাসও আমাদের অজানা না)।

বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস যখন পড়ি- আমার শ্রদ্ধার প্রায় সমস্তটাই অধিকার করে রাখে সহিংস পথে যারা সংগ্রামে লিপ্ত ছিল- ক্ষুদিরাম-সূর্যসেন-প্রীতিলতা-ভগৎ সিং এদের সংগ্রাম,- এদের লড়াই থেকেই আমি বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের তেজটা পাই- অহিংস গান্ধীরে তার তুলনায় একজন সুবিধাবাদী- আপোষকামী - ইংরেজদের পদলেহী একজন রাজনীতিক হিসাবেই বিবেচনা করি। নিপীড়িত-লাঞ্ছিত-অত্যাচারিতদের জন্য অহিংস থাকাটাকে আমি কাপুরুষতা ছাড়া কিছুই মনে করি না- এদের জন্য একটাই নীতি থাকতে পারে বলে মনে করি: "মারের বদলা মার"। আর এ কারণে আমি ফিলিস্তিনীদের মুক্তি সংগ্রামের সমর্থক- এমনকি তাদের স্যুইসাইড বোম্বিং এ ননমিলিটারী ইজরায়েলী জনগণ মরে গেলেও- সেটা ফিলিস্তিনীদের প্রতি এতটুকু রাগ-ঘৃণা তৈরি করতে পারে না (কেবল একটা দীর্ঘ নিশ্বাসই বের হয়), কেননা ফিলিস্তিনীরা যুগ যুগ ধরে এমন মার খেয়ে এসেছে এই ইতিহাস আমার জানা। আলোচনার শুরুতে এই ব্যাখ্যার কারণ- আমার দৃষ্টিভঙ্গীটা তুলে ধরা।

যাহোক- এবারে মূল আলোচনায় আসা যাক। মুহম্মদ সা: কে আমি কোন জায়গা থেকে দেখি সেটাই আলোচনা করবো এবার ....

মুহম্মদ সা: এর যুদ্ধ-বিগ্রহ, খুন-খারাবিকে বুঝতে গেলে আমার মনে হয়- ইসলাম প্রচারের শুরু থেকে মদীনায় হিজরত করার আগ পর্যন্ত সময়টুকু খুব ভালো করে খেয়াল করা দরকার। মক্কায় এই সময়টুকুতে মুহম্মদ সা: এর অবস্থান- একটিভিটি- মুহম্মদ সা: এর অনুসারীদের পরিচয়-ধরণ ধারণ- তাদের একটিভিটি সব যদি খেয়াল করা যায়, তবে অনেক কিছু পরিস্কার হতে পারে। এবারে আমার প্রশ্ন- এই সময়টাতে মুহম্মদ সা: কোন ঘৃণা ছড়িয়েছেন কি না? "তাদেরকে হত্যাকর যেখানে পাও সেখানেই", "যারা কাফের হয়েছে, তাদেরকে আমি কঠিন শাস্তি দেবো দুনিয়াতে এবং আখেরাতে-তাদের কোন সাহায্যকারী নেই", "যদি তারা বিমুখ হয়, তবে তাদেরকে পাকড়াও কর এবং যেখানে পাও হত্যা কর", "যারা আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের সাথে সংগ্রাম করে এবং দেশে হাঙ্গামা সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয়, তাদের শাস্তি হচ্ছে এই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শূলীতে চড়ানো হবে অথবা তাদের হস্তপদসমূহ বিপরীত দিক থেকে কেটে দেয়া হবে অথবা দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে। এটি হল তাদের জন্য পার্থিব লাঞ্ছনা আর পরকালে তাদের জন্যে রয়েছে কঠোর শাস্তি", "অত:পর নিষিদ্ধ মাস অতিবাহিত হলে মুশরিকদের হত্যা কর যেখানে তাদের পাও, তাদের বন্দী কর এবং অবরোধ কর। আর প্রত্যেক ঘাঁটিতে তাদের সন্ধানে ওঁৎ পেতে বসে থাক" ..... এইসব চরম ঘৃণাসম্বলিত উক্তিগুলোর একটিও কেন মক্কায় হিজরতের পূর্বে পাওয়া যায় না? উল্টো সুরা কাফিরুনের মত (আমার মতে কোরআনের সবচেয়ে অসাধারণ) সুরা: "বলুন, হে কাফেরকূল, আমি এবাদত করিনা, তোমরা যার এবাদত কর। এবং তোমরাও এবাদতকারী নও, যার এবাদত আমি করি এবং আমি এবাদতকারী নই, যার এবাদত তোমরা কর। তোমরা এবাদতকারী নও, যার এবাদত আমি করি। তোমাদের কর্ম ও কর্মফল তোমাদের জন্যে এবং আমার কর্ম ও কর্মফল আমার জন্যে" এই মক্কাতেই হিজরতের আগে নাযিল হয়। এর কারণ কি?

আপনারা হয়তো বলবেন- ৪০ বছরের মুহম্মদ সা: আর ৬৩ বছরের মুহম্মদ সা: এক নয়। এক হওয়া সম্ভবও নয়- কেননা সময় পাল্টায়, পাল্টানোর সাথে সে মানুষকেও পাল্টিয়ে যায়- আর যারা সময়কেই পাল্টানোর কাজে নিয়োজিত- তাদের পরিবর্তন তো আরো মোটা দাগেরই হওয়া স্বাভাবিক। আপনাদের কারো কারো মতে- এই পরিবর্তনটা একজন আদর্শবাদী মুহম্মদ সা: থেকে একজন ক্ষমতাশীলের - একজন দুর্নীতিগ্রস্তের। আসলেই কি তাই? সেটাও ধীরে দেখা যাবে খন- কিন্তু আমি মনে করি- এই পরিবর্তনটা খুব ভালো করে বুঝার জন্যই হিজরত পূর্ব মুহম্মদ সা:কে বুঝা দরকার। ....

সাল ওয়াইজ মুহম্মদ সা: এর জীবনের মূল বাঁকগুলো দেখা যাক: ৫৭০ খৃস্টাব্দে মুহম্মদ সা: এর জন্ম, ৫৯৫ এ খাদিজার সাথে বিয়ে (২৫ বছর বয়সে), ৬১০ সালে ইসলামের ডাক (৪০ বছর বয়সে), ৬২০ সালে খাদিজা ও চাচা আবু তালিবের মৃত্যু (৫০ বছর বয়সে), ৬২২ সালে মদীনায় হিজরত (৫২ বছর বয়সে), ৬৩০ সালে মক্কা জয়, ৬৩২ সালে বিদায় হজ্জ ও তার কয়েক মাস পরে মৃত্যু।

মদীনায় হিজরত করার আগে- মক্কায় ১২ বছর ধরে ধর্ম প্রচার করেছেন- হিজরতের পর বেঁচে ছিলেন আর ১০/১১ বছরের মত। ইসলাম প্রচারের প্রথম ১২ বছর- কেমন ছিল? আবু লাহাব, আবু জেহেল, উমাইয়া ... এইসব কোরাইশ নেতারা মুহম্মদ সা: ও তার অনুসারীদের সাথে কেমন আচরণ করেছিলেন? অত্যাচার-নিপীড়ন-লাঞ্ছনা এগুলো কি হজম করতে হয়নি? কিন্তু এমন অত্যাচারের পরেও কিন্তু মুহম্মদ সা: এর অনুসারীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। কেন? এর আগেও বলেছি- আবারো বলছি- নিম্ম শ্রেণীর, গরীব দুখী, বিশেষত দাসরাই আসলে ছিল প্রধানতম অংশ (যতই আমরা আবু বকর, উমর, হামজা এদের নাম বেশী করে জানি না কেন), এবং কোরআইশ নেতারা মানে দাসমালিকদের মূল ভয় ছিল এটাই যে- দাসেরা সব বেয়াড়া হয়ে উঠছে। তাছাড়া- মুহম্মদ সা: এর বিরুদ্ধে অমন খেপার আর কোন কারণই তাদের ছিল না। যাহোক, আবু তালিব মুহম্মদ সা:কে যথেস্ট সাপোর্ট দেয়ার চেস্টা করেছেন ঠিকই- কিন্তু বাকিসব কোরআইশ নেতারা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। (চাচা আবু তালিবের কথা আগেও বলেছি- আমি মনে করি এই লোকটি না থাকলে মুহম্মদ সা: এর মুহম্মদ সা: হয়ে উঠাই হতো না; এবং এই চাচা নিজে ইসলাম গ্রহণ না করলেও- মুহম্মদ সা: এর কাজে সবসময়ই উৎসাহ দিয়েছেন- এমনকি নিজের ছেলে আলীকেও মুহম্মদ সা: এর পথে ঠেলে দিয়েছেন, এবং আবু তালিবের মৃত্যুর আগে সরাসরি মুহম্মদ সা: কে খুন করার কথা ভাবতেও সাহস করেনি কোরআইশ নেতারা- আবু তালিবের মৃত্যুর পরেই মুহম্মদ সা: হিজরতে বাধ্য হন)

কোরআইশ নেতারা মিলে মুহম্মদ সা: ও অনুসারীদের যতটুকু বাঁধা দেয়া সম্ভব সেটা দিতে চেয়েছে, দিয়েছে- খুন থেকে শুরু করে- অর্থনৈতিক বয়কট সবই করেছে। মুহম্মদ সা: এর হিজরতের অনেক আগে থেকেই অনুসারীদের হিজরত শুরু হয়ে যায়, হিজরত মানে কোরআইশদের অত্যাচার থেকে কোনরকমে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যাওয়া। এবার আমাকে বলেন, ঐ যুগের কথা বাদ দেন- আজকের যুগেও যদি কোন একটা গ্রুপকে ১২ বছর ধরে আরেকটা গ্রুপ এমন কন্টিনিউয়াস অত্যাচার করতে থাকে- তবে অত্যাচারিত অংশের মনোভাব কেমন হতে পারে? দেখুন- আমি এখান থেকেই পরবর্তী অংশে অর্থাৎ মূল অংশে প্রবেশ করতে আগ্রহী- আমি বারবার হিজরত পূর্ব আমলটাকে আনতে চেয়েছি- কারণ আমার কাছে ফার্স্ট ক্রাইম আর বদলা (তা সে ফার্স্ট ক্রাইমের চেয়ে আকারে যত বড়ই হোক না কেন) কোন মতেই সমান মাপের না। আজকেও এই সভ্য দুনিয়ায়- খুন হওয়া লোকের আত্মীয় সব কিছু বেঁচে দেয়- উজার হয়ে খরচ করে কেবল খুনীর ফাঁসী হওয়াটা দেখার জন্য- খুনীর ফাঁসী যে চায়- তার চোখেও কি খুন খেলা করে না?- আজকের এই অর্গানাইজড আইন-বিচার ব্যবস্থায় লোকে ঐ পথে যায়- কিন্তু এই সেদিনও তো খুনের বদলা খুন- মল্লযুদ্ধ এগুলো খুব ডালভাত ছিল - আপনি ১০০/২০০ বছর আগের সাহিত্যিকদের নোভেল-নাটকগুলো পড়লে এমন ঘটনা দেখবেন কত নৈমত্তিক ছিল! যাহোক- আমার এতক্ষণের আলোচনার মূল বক্তব্য হচ্ছে- ১২ বছরের অত্যাচার-নিপীড়নের বদলা যদি মুহম্মদ সা: নেতৃত্বাধীন বাহিনী পরবর্তীতে নিয়ে থাকেন- সেটা আমার কাছে- ঐ সময়ের রেসপেক্টে খুব অস্বাভাবিক মনে হয় না- অন্যায়ও ভাবতে পারি না।

এ প্রসঙ্গে আপনাদেরকে মুহম্মদ সা: এর উপর নির্মিত নীচের এনিমেশন ফিল্মটি দেখার আহবান জানাচ্ছি। দশ খণ্ডের বাকিগুলো পরে দেখে নিবেন- এই মুহুর্তে ৫ টি খন্ড দেখতে পারেন, যেখানে মদীনায় হিজরতের আগ পর্যন্ত মক্কার মুসলিমদের অবস্থাটা বুঝতে পারবেন (অলৌকিক ঘটনাগুলোকে বাদ দিলে- আমার কাছে মনে হয়েছে এর মধ্য দিয়ে ঐ সময়টাকে মোটামুটি ধরা যাবে)।

Part1
(Part2, Part3, Part4, Part5, Part6, Part7, Part8, Part9, Part10)

মনে রাখবেন, প্রথম খুন হওয়া মুসলিম- সুমাইয়া একজন নারী এবং একজন দাস। একজন দাস বেলালের ঘটনা আমরা জানি- সে তার মালিক উমাইয়ার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করায়- কি পরিমাণ টর্চারের সম্মুখীন হয়েছে - পরে আবু বকর যাকে খরিদ করে নেয়। সুমাইয়া, বেলাল এদের নাম আমরা ব্যাপকভাবে জানি- কিন্তু আমার মনে তো হয়- এরা অসংখ্য দাসদের প্রতিনিধি মাত্র, যারা নির্যাতিত হতে হতে শেষ পর্যন্ত মালিকদের কাছে পদানত হতে চায় নি, এবং যারা দাস মালিকদের চোখের ঘুম হারাম করেছিল। ফলে- আমি পরবর্তী যুদ্ধগুলোর মধ্যে আমি একটা দাস বিদ্রোহেরও আভাস পাই। দাসরা যখন ফুসে উঠছে- তখন কেবল ১২ বছরের নির্যাতন-নিগৃহ না- অসংখ্য বছরের অত্যাচার-নির্যাতন তাদের আরো অধিক ফুসে তুলতে সহায়তা করেছে।

এবার আসি মদীনায়। ৬২২ সালে মদীনায় হিজরতের পরে প্রথম যুদ্ধ বদর যুদ্ধ কোরআইশদের সাথে। এক হাদীসে দেখা যায়- মুহম্মদ সা: সর্বমোট ১৯ টি যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, উইকি পিডিয়ায় তার মধ্যে ১১ টির বর্ণনা দেখি। এক নজরে সাল ওয়াইজ এই ১১ টি যুদ্ধ দেখি:
৬২৪(১): বদর যুদ্ধ- কোরআইশদের সাথে
৬২৪(২): বানু কাইনুকা - মদীনার ইহুদী
৬২৫(৩): উহুদের যুদ্ধ - কোরআইশদের সাথে
৬২৫(৪): বানু নাদের - মদীনার বাইরের দিকে বাসকারী ইহুদী
৬২৭(৫): খন্দকের যুদ্ধ - কোরআইশদের সাথে
৬২৭(৬): বানু খোরাইজা - মদীনার উপকন্ঠে (খন্দকের পাশে) বাসকারী ইহুদী
৬২৮: হুদাইবিয়ার সন্ধি - কোরআইশদের সাথে
৬২৮(৭): খায়বরের যুদ্ধ - মদীনা থেকে ১৫০ কিমি দুরে বসবাসকারী ইহুদী
৬২৯(৮): মুতা'হর যুদ্ধ - বাইজেন্টাইন সম্রাটের সাথে
৬৩০(৯): মক্কা বিজয় (রক্তপাতহীন)
৬৩০(১০): হুনায়নের যুদ্ধ - মক্কা থেকে তায়েফ এর যাত্রাপথে এক উপত্যকায় এক বেদুইন গোত্রের সাথে যুদ্ধ
৬৩২(১১): তাবুকের যুদ্ধ - ঘাসানিদ গোত্রের সমন্বয়ে গঠিত বাইজেন্টাইন বাহিনীর সাথে (সরাসরি যুদ্ধ বলা যাবে না- পরবর্তী আরব-বাইজেন্টাইনদের যুদ্ধগুলোর সূত্রপাত বলা যায়: ৩০০০০ হাজার মুসলিম সৈন্যবাহিনী মুহম্মদ সা: এর নেতৃত্বে অবস্থান নিয়েছিল)

এর বাইরে বনু মশতালিকের যুদ্ধ বা মুরাইসীর যুদ্ধ, উসায়রার যুদ্ধ, ইয়ারমুকের যুদ্ধ, বি'রে মাউনার যুদ্ধ, যাতুর রিকা যুদ্ধ, বনী আনমার যুদ্ধ, যীকারাদের যুদ্ধ এগুলোর নামও হাদীসগুলোতে পাওয়া যায় (তবে বেশ কিছু যুদ্ধ একাধিক নামে পরিচিত- ফলে উল্লেখিত যুদ্ধগুলোর কোনটি কোনটি একই যুদ্ধের একাধিক নাম হতে পারে)।

এই যুদ্ধগুলোর মধ্যে আসলেই যুদ্ধ বলে অভিহিত করা যায়- কোরআইশদের সাথেকার যুদ্ধগুলোকে: বদর-উহুদ-খন্দক-হুদাইবিয়ার সন্ধি-মক্কা বিজয়: সমস্ত ঐতিহাসিকের আগ্রহ এই যুদ্ধ ক'টি নিয়েই। এর বাইরে আছে বিভিন্ন ইহুদী গোত্রের উপর আক্রমণ (এগুলো সে অর্থে যুদ্ধ নয়- ডাকাতি বললেই বেশী মানায়) এবং আশেপাশের অন্য সাম্রাজ্য- গোষ্ঠীর সাথে যুদ্ধ (এটা ইসলাম প্রসারের পর্যায়কে নির্দেশ করে- আসলে মুহম্মদ সা: এর আমলে এর সূত্রপাত কেবল হয়- পরবর্তী আমলগুলোতে এই ধরণের যুদ্ধের ছড়াছড়ি পাওয়া যাবে)। আমি মুহম্মদ সা: এর যুদ্ধগুলোকে মোটা দাগে এই তিন ভাগে ভাগ করতে ভালোবাসি। তিন নাম্বারটি যেহেতু মুহম্মদ সা: এর জন্য খুব উল্লেখযোগ্য নয় (উমরের যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করতে চাইলে- নিশ্চয়ই এই ভাগটি নিয়ে অধিক আলোচনা করতে হতো)- ফলে এটি নিয়ে বেশী আলোচনা করার নেই; ১ম দুটো ভাগ নিয়েই আলোচনাটা করছি।

কোরআইশদের সাথে যুদ্ধ:
বদর-উহুদ-খন্দক এই তিনটি সম্মুখ যুদ্ধ মক্কার কোরআইশদের সাথে মদীনার মুসলমানদের। আগেই আলোচনা করেছি- মক্কায় থাকাকালীন সময়ে মুহম্মদ সা: ও তার অনুসারীদের উপর কি পরিমাণ নির্যাতন কোরআইশ নেতারা চালিয়েছে। সেটা হিজরতের পরেও অব্যাহত রাখে- মানে ৬২২ সালে মুহম্মদ সা: হিজরত করার পরেও মক্কায় মুসলমান হওয়া কমে না- মুসলমানদের বাধ্য হয়ে মদীনায় হিজরত করা অব্যাহত থাকে। কোরআইশ নেতারা নানাভাবেই চেস্টা করতে থাকে- মুসলামনদের এই অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিতে- কিন্তু এটা ঠিকই বুঝতে পারছিল- মুহম্মদ সা:কে ঠেকানো না গেলে- ঘর সামলাতে পারবে না। আর এ কারণেই- মদীনায় আশ্রয় নেয়া মুহম্মদ সা: কে শায়েস্তা করার জন্যও তারা চেস্টা চালাতে থাকে। উহুদ আর খন্দক যুদ্ধে কোরআইশরা সরাসরি যুদ্ধের উদ্দেশ্যেই বের হয়েছিল, কিন্তু বদরে সৈন্যবাহিনী পরে গিয়ে যুক্ত হয় (তারপরেও জানা যায়- ইনিশিয়াল প্রোভোক কোরাইশদেরই ছিল)। এই তিনটি যুদ্ধে মুহম্মদ সা: বাহিনী জয়লাভ করে। কোরআইশরা ব্যাপক মার খায়। কোরআইশদের মার খাওয়াকে কি মুহম্মদ সা: বাহিনীর নৃশংসতা বলা যাবে?

কোরআনের বিভিন্ন নৃশংস আয়াতগুলোর একটা বড় অংশই কিন্তু বদর যুদ্ধের সময় নাযিল হওয়া। এবারে আপনারা নিজেরা এমন একটি পরিস্থিতির কথা একটু কল্পনা করুন তো- যেখানে দুটো বাহিনী সম্মুখ যুদ্ধে মুখোমুখি- বর্শা-তলোয়ার হলো অস্ত্র- যুদ্ধে জয়পরাজয় নির্ভর করছে কোন বাহিনী অপর বাহিনীকে কত জলদি বধ করতে পারছে তার উপর অর্থাৎ কোন বাহিনীর তলোয়ার কত বেশী খুনে রাঙ্গা হচ্ছে তার উপর- ঠিক ঐ মুহুর্তে একজন সর্বাধিনায়ক তার বাহিনীকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য কি বলতে পারে? "তাদেরকে হত্যাকর যেখানে পাও সেখানেই", "যারা কাফের হয়েছে, তাদেরকে আমি কঠিন শাস্তি দেবো দুনিয়াতে এবং আখেরাতে-তাদের কোন সাহায্যকারী নেই", "যদি তারা বিমুখ হয়, তবে তাদেরকে পাকড়াও কর এবং যেখানে পাও হত্যা কর", "যারা আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের সাথে সংগ্রাম করে এবং দেশে হাঙ্গামা সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয়, তাদের শাস্তি হচ্ছে এই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শূলীতে চড়ানো হবে অথবা তাদের হস্তপদসমূহ বিপরীত দিক থেকে কেটে দেয়া হবে অথবা দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে| এটি হল তাদের জন্য পার্থিব লাঞ্ছনা আর পরকালে তাদের জন্যে রয়েছে কঠোর শাস্তি" ..... এই কথাগুলোকে কি খুব অস্বাভাবিক-আপত্তিকর মনে হয়? আপনারা অনেকেই সোর্ড অব টিপু সুলতান- তারপর আকবর দ্য গ্রেট .. এসব সিরিয়ালে এমন অনেক যুদ্ধ দেখেছেন- সেই সম্মুখ যুদ্ধগুলোর স্টার্টিং এ সেনাপতি সব জায়গাতেই "মারো" বলে শুরু করে- তখন কি তাদের খুব নৃশংস মনে হয়?

দেখুন, বদর যুদ্ধে মুহম্মদ সা: বাহিনীকে আকারে বেশ বড় বাহিনীর সাথে মোকাবেলা করতে হয়েছে- উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধেও তাই। (খন্দকের যুদ্ধে কোরআইশরা সবচেয়ে অর্গানাইজড ও বিশাল বাহিনী নিয়ে এসেছিল- যুদ্ধকৌশলে মুহম্মদ সা: বাহিনীর কাছে হারে)। এখন বদর যুদ্ধে ঐ রকম বড় বাহিনীর কাছে টিকতে পারা, উল্টো বদর বাহিনীকে পর্যদুস্ত করা কোনভাবেই সম্ভব হতো না যদি না মুহম্মদ সা: বাহিনী মানসিকভাবে অনেক শক্ত অবস্থানে থাকতো। সেই কাজটাই মুহম্মদ সা: করেছে। এগুলো কোরআনের আয়াত হিসাবে শ্রদ্ধার সাথে আজকের মুসলিমরা পড়ে যায়- "তাদেরকে হত্যাকর যেখানে পাও সেখানেই" এটা পড়ে আজকের মুসলিমরা আল্লাহর উপাসনা করে- এই বিষয়টাকে যতই হাস্যকর বলি না কেন- বুঝতে পারি, বদর যুদ্ধের আগে মুহম্মদ সা: এর এটা বলা ছাড়া অন্য কোন কথা বলার কোন স্কোপই ছিল না।

অতএব- আমার এতক্ষণের আলোচনায় মুহম্মদ সা: বাহিনীর নৃশংসতার পেছনে মোটামুটি দুটো ব্যাখ্যা উল্লেখ করলাম:
১। ১২ বছরের নির্যাতন-নিপীড়ন, দাসদের অসংখ্য বছর ধরে নির্যাতিত হওয়া, কোরআইশ নেতা তথা দাস মালিকদের বিরুদ্ধে একটা মাইন্ড সেট করে দেয়- এবং
২। সম্মুখ যুদ্ধে এমন নৃশংস হওয়া ছাড়া কোন উপায়ই নেই।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে- বুঝলাম সংগত কারণেই মুহম্মদ সা: বাহিনী নৃশংস হয়েছে- তার জন্যে আর তাদের অশ্রদ্ধা করছি না- কিন্তু শ্রদ্ধা করবো কেন? এর জবাবে মুহম্মদ সা: এর ঘৃণার বানীগুলোর আশেপাশের বানীগুলো দেখতে বলবো। ঐ সময়ে ঘৃণার কথাগুলো আমার কাছে খুব স্বাভাবিক মনে হয়- কিন্তু সেই ঘৃণার বানীগুলোকে অমন কন্ডিশনাল করে দেয়াটা খুব উচু মাপের একজন ব্যক্তিত্বের মহৎ কর্ম হিসাবে চিহ্নিত না করে পারি না। "সেসব লোকদের সাথে যুদ্ধ কর যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই সীমালংঘন করোনা", "যদি তারা যুদ্ধ শেষ করে দেয় তাহলে আল্লাহ ক্ষমাশীল এবং দয়ালু", "যদি তারা যুদ্ধ বন্ধ করে দেয় তাহলে তাদের সাথে কোনো শত্রুতা নেই, শুধুমাত্র অত্যাচারীর সাথে ছাড়া", "যতক্ষন পর্যন্ত পৃথিবী থেকে সমস্ত বিপর্যয় দূর হয়ে আল্লাহর জীবন বিধান প্রতিষ্ঠিত না হবে, ততক্ষন পর্যন্ত যুদ্ধ করতে থাকো। যদি তারা থেমে যায় তাহলে আল্লাহ তাদের কর্মকান্ড লক্ষ্য রাখেন" ..... এসবকে কি বলবেন?

বদর যুদ্ধে ৩১৩ মুহম্মদ সা: বাহিনী লড়েছে ১০০০ এর অধিক কোরআইশ বাহিনীর সাথে। কিন্তু দেখুন- এই ৩১৩ ধীরে ধীরে বেড়েছে। ৬২৪ সালে বদর যুদ্ধের ৩১৩ বেড়ে ৬৩০ সালে মক্কা বিজয়ে হয়েছে দশ হাজারের অধিক। কই মক্কা বিজয়ের সময়ে একটাও ঘৃণার বানী বের হলো না? কেন? মাত্র ৬ বছরে এমন হাজার হাজার অনুসারী এলো কেমন করে? কেবল ঘৃণা দিয়ে- কেবল জোর-জবর দস্তি- লোভ-ভয়- আল্লাহর ভয় ও বিশ্বাস এগুলোই কি যথেস্ট? আমার মনে হয় না? তারপরে হুনায়নের যুদ্ধে ১২ হাজারের বাহিনীতে কিন্তু মক্কার প্রায় অমুসলিম ২ হাজার ছিল! সুতরাং এই যুদ্ধগুলোকে সময় দিয়েই বুঝতে হবে। মুহম্মদ সা: সময়ের উর্ধে উঠতে পেরেছিল- তার মহৎ বানীগুলো দিয়েই- ঘৃণার বানীগুলো দিয়ে কেবল মুহম্মদ সা:কে বুঝতে গেলে একজন ভুল মুহম্মদ সা:কেই পাবেন বলে মনে হয়। ঘৃণার আয়াত প্রায় ৩০-৪০ টা আছে। এক এক করে সেগুলো নিয়ে আলোচনা করা যায়- সেগুলোর শানে নুযুল দেখানো যায়- আলোচনা দীর্ঘায়িত হবে জন্য করছি না- কিন্তু এগুলো পড়ে আমার মনে হয়েছে একজন আল্লাহর প্রতিই ঘৃণা তৈরি হতে পারে- কিন্তু ১৪০০ বছর আগের একজন মানুষের প্রতি তা কোনভাবেই তৈরি হতে পারে না।

আমার এখনকার আলোচনাকে আমি এভাবে সামারাইজ করবো- আমি ইতিহাসকে এভাবে দেখছি যে, যাবতীয় ঘৃণার উপাদানগুলোকে ঐ সময়ের বেদুইন জাতির জন্য স্বাভাবিক হিসাবে ধরছি এবং মহৎ বানীগুলোকে মুহম্মদ সা: এর স্পেশালিটি হিসাবে বিবেচনা করছি। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়- "হত্যার বদলা হত্যা"- যেটাকে মুহম্মদ সা: পুরো অস্বিককার করতে পারেন নি - "কিন্তু ক্ষমা হচ্ছে প্রকৃত ঈমানদারের কাজ"- এটার মাধ্যমে হত্যার বদলা হত্যা ছাড়াও যে ক্ষমা হতে পারে- এই প্রয়াসটিকে মুহম্মদ সা: এর একটা অনন্যসাধারণ কন্ট্রিবিউশন হিসাবে ধরছি। .....

মদীনা ও আশেপাশের ইহুদী গোত্রগুলোর সাথে যুদ্ধ:
এবারে আসি- মদীনা ও এর আশে পাশের ইহুদী গোত্র ও নানা অমুসলিম গোত্রগুলোর উপর আক্রমণ। এগুলো আসলেই খুব নৃশংস- খুব বর্বর ও জঘণ্য। আস্তিকদের সাথে আলোচনায়-ডিবেট এ আমি বারেবারে এই আক্রমণগুলোই তুলে ধরি। কেননা, খালি চোখেই বুঝা যায়- এগুলো বর্বরতা-নৃশংসতা ছাড়া কিছুই না। এমনকি মুসলমানদের অভিযোগ- ঐসব ইহুদীরা মদীনার মুসলমানদের সাথে করা চুক্তি ভঙ্গ করেছে, মুসলমানদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করেছে, কোন কোন ক্ষেত্রে কোন কোন মুসলমানের সাথে বিবাদে লিপ্ত হয়েছে- এগুলোকে সত্য হিসাবে ধরে নিলেও- যে প্রকারে এই ইহুদী গোষ্ঠীগুলোকে আক্রমণ করা হয়েছে- এবং আক্রমণের পরে যেভাবে তাদের ধ্বংস করা হয়েছে- সবই চরম বর্বরতা ছাড়া কিছুই না। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে- এটা মেনে নেয়ার পরেও ব্যক্তি মুহম্মদ সা: এর প্রতি আমার শ্রদ্ধাবোধ এতটুকু কমছে না। কেন?

কোন সন্দেহ নেই: যে প্রকারে এই ইহুদী গোষ্ঠীগুলোকে আক্রমণ করা হয়েছে- এবং আক্রমণের পরে যেভাবে তাদের ধ্বংস করা হয়েছে- সবই চরম বর্বরতা ছাড়া কিছুই না। তারপরেও মুহম্মদ সা: কে শ্রেফ একজন টেরোরিস্ট, একজন জঘন্য নৃশংস খুনী বলতে পারি না- কারণ তার আরো অসংখ্য কাজ-কর্ম। সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে কেবল এই ডাকাতিগুলো কেবল দেখলে- সেরকম অভিধা দিতে আমারো খুব বেশী আপত্তি থাকতো না, কিন্তু মুহম্মদ সা: মানে কেবল তো এইসব আক্রমণই নয়। ফলে- মুহম্মদ সা: কে নিয়ে আরেকটু বেশী ভাবতে হয় বৈকি। আমার বিশ্লেষণে যাবার আগে- সবাইকে লিংকে দেয়া ইউটিউব ভিডিওটা দেখার আহবান জানাই। বৈপরীত্যের কারণ সম্পর্কে এই ভিডিওতে যে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে- আমি তার সাথে একমত পোষণ করি।



আমি আমার আলোচনাটা শুরু করবো একটা প্রশ্ন দিয়ে- তরবারি দিয়ে- নৃশংসতা দিয়ে- ডাকাতি করেও কি করে দিনে দিনে মুহম্মদ সা: এর অনুসারীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে? এমন জঘণ্য যে বাহিনী- যা মূলত একটা ডাকাত বাহিনী- যে বাহিনী একের পর এক ইহুদী গোষ্ঠীগুলোকে লুট-পাট ও মেরে কেটে চলেছে- সেই বাহিনী কিরূপে দিনদিন বাড়ছে? কেন বাড়ছে? ভয়ে? মুহম্মদ সা: এর অনুসারী না হলে- পরিণতি ঐ রকম ধ্বংস- এই সম্ভাবনায় ও ভয়ে সকলে হুড়মুড় করে ইসলাম গ্রহণ করেছে? এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি না কোনমতেই, কেননা আমার কাছে মনে হয়- ৩১৩ থেকে ভয়ে ১০০০০ হওয়ার চেয়ে সাড়ে নয় হাজারের পক্ষে ঐ ৩১৩ কে গুড়িয়ে দেয়া অধিক সহজতর। তাহলে? মূলত এই খটকার জায়গা থেকেই ইতিহাসকে আরেকটু বাজিয়ে দেখা, আরো অনুসন্ধান চালানো। মোটামুটি যেসব সম্ভাবনা মাথায় আসে- সেগুলোই এবার বলছি:
১। মুহম্মদ সা: বাহিনীর এমন ডাকাতিগুলোর কথা জানার পরে- ঝাঁকে ঝাঁকে তার বাহিনীতে যুক্ত হওয়া ও তার প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি জারি থাকা সম্ভব তখনই- যখন এই ডাকাতিগুলো সম্পর্কে ঘৃণার দৃষ্টিভঙ্গী না থাকা- অর্থাৎ সাধারণ-নৈমত্তিক হিসাবে ধরে নেয়া হয়।

২। হামজা, উমর, খালিদ ইবনে ওয়ালিদ প্রমুখ ইসলাম গ্রহণের পরে নৃশংস খুনী হননি- তারা আরো আগে থেকেই বীর বলে খ্যাত ছিলেন। এবং মক্কায় এরা সকলেই কিন্তু আগে থেকেই বীর হিসাবে শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। কোরআইশরা কি ধরণের যুদ্ধে লিপ্ত থাকতো? কোন ধরণের যুদ্ধের মাধ্যমে এরা বীর খ্যাতি পেয়েছিল? একটু ঘাটলেই বুঝা যাবে- এই সমস্ত যুদ্ধ-বিগ্রহগুলো সবই মুহম্মদ সা: এর আমলে চালানো ডাকাতিগুলোর মতোই।

৩। আরব বেদুইনদের বর্বর বলা হয়। এদের যুদ্ধবাজ-নৃশংস হিসাবে খ্যাতি ছিল। আসলে- তাদের ইকোনমিক কন্ডিশনই তাদের বাধ্য করেছিল - অপর গোষ্ঠীর উপর আক্রমণ করতে। অসংখ্য সোর্সে আমি দেখি যে- ঐ আমলের আরবদের প্রধান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ছিল: ১) পশুপালন, ২) লুটপাট, ৩) বাণিজ্য, ৪) মক্কার কাবা কেন্দ্রিক মেলা। ফলে- ডাকাতি ছিল জীবন ধারণের উপায়।

৪। তখন দাসমূলক ব্যবস্থা ছিল। দাস ব্যবস্থার সমস্ত ইতিহাসেই দেখি যে- এর সূত্রপাত এক গোষ্ঠীর উপর আরেক গোষ্ঠীর দখলদারিত্বের মধ্য দিয়ে- এবং যতদিন দাস ব্যবস্থা বিরাজ ছিল- বুঝতে হবে- তা এই দখলদারিত্বের মধ্য দিয়ে চালু ছিল। এমনকি- লেটেস্ট ইংরেজদের দাস সাপ্লাই দেখলেও বুঝা যায়- নিজ অঞ্চলে দখলদারিত্ব বন্ধ হওয়ার পরে ঠিকই দাসদের সাপ্লাই আসতো আফ্রিকা ও আমেরিকার নিগ্রো গোষ্ঠীগুলো দখল করার মধ্য দিয়ে। সুতরাং- ঐ ডাকাতিগুলো ছিল- আরব সমাজের একটা সাধারণ- স্বাভাবিক ও নৈমত্তিক ঘটনা।

৫। মদীনায় গিয়ে যখন অনেকটা রাষ্ট্র পরিচালনায় ইনভলভড হলেন- তখন মুহম্মদ সা: এর পক্ষে এই অর্থনৈতিক কর্মকান্ডকে পুরোপুরি অস্বীকার করা সম্ভব ছিল না। হাদীসেই আছে- খায়বরের অভিযানের পরে আয়েশা জানাচ্ছেন- তাদের খেজুরের সংকট অনেকটা কেটে যায়। মরু অঞ্চলের বিশেষ বাস্তবতায় অর্থনৈতিক কর্মাকান্ডগুলো আসলে ভালো করে বুঝা দরকার। ডাকাতিগুলো বেচে থাকার নিমিত্তে- সংকট থেকে বাঁচার জন্য- বিত্ত বৈভবের জন্য নয়। মুহম্মদ সা:কে কোনভাবেই অর্থলোভী বলতে পারি না- অর্থ লোভে তিনি ডাকাতিগুলো পরিচালনা করেছেন- এটাও বলতে পারি না , কেননা তিনি খাদিজার কাছ থেকে আরো অধিক সম্পত্তি লাভ করেছিলেন- যেগুলো তিনি গরীব দুঃখীদের উদ্দেশ্যে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। মদীনায় থাকা অবস্থাতেও প্রতি রাতেই তিনি অভাবী-গরীব-দুখীদের খুজে খুজে বেড়াতেন বলে কথিত আছে। মুহম্মদ সা: মারা যাওয়ার সময়েও- তার শেষ সহায়-সম্বল সব বায়তুল মালে দান করে যান (কথিত আছে- মৃত্যুর সময়ে তার নিজস্ব সম্পদ বলতে ছিল একটা ঘটি আর একটা খেঁজুর গাছ- এটা কিছুটা অতিকথন হতে পারে- তবে এটা ঠিক যে- বিলাসিতা তিনি কখনোই করেন নি)।

৬। গণিমতের মাল বা মালে গণিমত- অর্থাৎ যুদ্ধে পরাজিত বাহিনীর সহায়-সম্পদ (নারী-শিশু সমেত- যারা আসলে দাস-দাসী)- সোজাসাপ্টা ভাষায়- ডাকাতির মাধ্যমে প্রাপ্ত ধন-সম্পদ যে খুব সাধারণ-স্বাভাবিক-নৈমত্তিক ব্যাপার ছিল তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ- এটার কোরআনে পর্যন্ত উপস্থিতি এবং উপস্থিতির ধরণ। উপস্থিতির ধরণ মানে হচ্ছে- কোথাও এর সমালোচনাসূচক বানী পাওয়া যায় না। এই জিনিসটা যে আপত্তিকর- এই ধারণাই ঐ আমলে সেখানকার মানুষদের মধ্যে ছিল বলে মনে হয় না।

৭। আরেকটা সম্ভাবনা দেখি: সেটা হচ্ছে- ঐ আক্রান্ত গোষ্ঠীগুলোর দাসদের ভূমিকাও থাকতে পারে। কয়েকটি গোত্রের সমস্ত যুদ্ধক্ষম পুরুষদের হত্যা করার কথা বলা হয়- আমার ধারণা, ইতিহাস বর্ণিত সমস্ত যুদ্ধক্ষম পুরুষদের মধ্যে দাসরা ছিল না। খুবই সম্ভব যে- মুহম্মদ সা: বাহিনী এই আক্রমণগুলোতে ঐসব গোত্রের দাসদের সহযোগীতা পেয়েছিলেন। এই সম্ভাবনার কথা মনে আসে কারণ দুটি- এক, সবকটিতেই সহজ জয় ও দুই, প্রতিটি জয়ের পরেই মুহম্মদ সা: বাহিনীর কলেবর বৃদ্ধি।

এখন যদি বলেন- এই নৃশংসতাকে শ্রদ্ধা করার কিছু আছে কি না- তবে বলবো অবশ্যই কিছু নেই। কিন্তু একটা মানুষের স্থান-কাল-পাত্রের সীমাবদ্ধতা বলেও যে কিছু থাকতে পারে- সেটা কোনমতেই অস্বীকার করতে পারি না। আর, এই সীমাবদ্ধতাগুলো মাথায় রেখেও শ্রদ্ধা করি- কারণ তাঁর বিশাল কর্মযজ্ঞ। শক-হুন এমন আরো অসংখ্য গোষ্ঠী ছিল- যারা নৃশংসতায় কোন অংশে আরব বেদুইনদের তুলনায় কম যায় না- কিন্তু আরবদের মধ্য থেকে মুহম্মদ সা: শত সীমাবদ্ধতা সত্তেও ঐ জাতিকে অন্য একটা উচ্চতায় নিয়ে যেতে পেরেছিলেন- সেটা কি করে অস্বীকার করি?

.... (চলবে)

১ম পর্ব পড়তে এখানে ঢু মারুন
এবং ২য় পর্ব পড়তে এখানে ...]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29059540 http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29059540 2009-12-15 22:39:46
নাস্তিক হয়েও যেসব কারণে মুহম্মদ সা: কে খুব শ্রদ্ধা করি ......(২য় পর্ব) ১। মিথ্যাচারিতা। নিজের ইচ্ছামত- সুবিধামত আয়াত বানিয়ে আল্লাহর নামে চালিয়েছেন- সমাজ-সংস্কারের জন্য মিথ্যাচার কেন করতে হবে?
এ বিষয়ে আমি যা মনে করি, এবার তা-ই বলছি...
মুহম্মদ সা: কি মিথ্যাচার করেছিলেন?
আমরা নিশ্চিত জানি, তিনি যা যা দাবী করেছেন- তা সত্য নয়। জিবরাইল তাঁর কাছে ওহী নিয়ে আসতো? শয়তানের সাথেও মোলাকাত হতো? বোররাকে চড়ে মেরাজে বের হয়েছিলেন? চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারি এগুলোর কোনটাই সত্য নয়। কিন্তু তিনি কি তবে মিথ্যা বলেছিলেন? এর জবাব নিশ্চিতভাবে কিছুই বলতে পারি না। হয়তো হ্যাঁ, নয়তো না। না এর সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিচ্ছি না কেন- সেটা বুঝাতে বিচ্ছিন্ন কটি কথা/গল্প বলি প্রথমে।

কথায় বলে- ভূতে যে বিশ্বাস করে- সেই ভূত দেখে বা তাকেই ভূত ধরে। ফলে যদি কেউ ভূত দেখেছে বলে দাবী করে- তাহলে বুঝতে হবে- হয় সে সত্য বলেছে কারণ সে ভূতে বিশ্বাস করে নতুবা সে মিথ্যা বলেছে (এক্ষেত্রে বিশ্বাস - অবিশ্বাস ডিসাইডিং ফ্যাকটর নয়, তবে যদি ভূতে সে অবিশ্বাস করে থাকে- তবে নিশ্চিত বলা যাবে সে মিথ্যা বলেছে)।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে এক বন্ধুকে বলা যায় অনেকখানি র‌্যাশনাল বানাতে পেরেছিলাম, আল্লাহ-নবীর মোহ অনেকখানি কাটিয়ে ফেলেছি এমন একদিন হঠাৎ তার প্রশ্ন ভূত নিয়ে। (বিজ্ঞানের ছাত্র ভূতে অবিশ্বাস করতে পারছে না- এটায় অবাক হওয়ার পালা অনেক আগেই পেরুয়েছি)- বন্ধুর ঘটনাটা একটু অন্যরকম, তার মাকে নিয়ে ঘটনা, তার মা গ্রামে রাতে জানালা দিয়ে ঢুকতে দেখেছিল একটা কালো লোমশ হাত- বীভৎস টাইপের- মায়ের পেট বরাবর। এখন বন্ধুর প্রশ্ন মা তো খুবই সহজ সরল- তাকে কোনদিন মিথ্যা বলতে দেখিনি- সে কিভাবে মিথ্যা গল্প বানিয়ে বলবে। আরো ক'টি প্রশ্ন করে শুনে জবাবে বলেছিলাম- মা মিথ্যা হয়তো বলেনি- কিন্তু ওটা ভূতের হাতও ছিল না। তাহলে কি? দুটো সম্ভাবনা: ১)প্রেগনেন্ট অবস্থায় আশু বাচ্চাকে নিয়ে সবসময়ই একটা দুশ্চিন্তায় ভোগে মায়েরা এবং সেখান থেকে নানাবিধ দুঃস্বপ্ন দেখে- অনেকক্ষেত্রে স্বপ্নগুলো এত বাস্তব মনে হয় যে- স্বপ্ন আর বাস্তবের মধ্যে পার্থক্য কেউ কেউ বুঝতে পারে না। মা এমন কোন দুঃস্বপ্নই দেখতে পারে, অথবা ২) কেউ দুষ্টুমি করে ভয় দেখানোর জন্য ওরকম হাত বানিয়ে জানালা দিয়ে ঢুকিয়ে দিয়েছিল।

এবারে আমাদের এখানকার বৃটিশ বিরোধী সংগ্রামের একটা গল্প। সাঁওতাল বিদ্রোহের দুই নায়কের নাম সিধু ও কানহু- দুই ভাই। এই দু'ভাই যখন সমস্ত সাঁওতালকে ডাক দিয়েছিল ও ঐক্যবদ্ধ করেছিল বৃটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রামে - তখন তারা এই প্রচারই করেছিল যে, তারা তাদের দেবতার কাছ থেকে আদ্দিষ্ট হয়েই এই লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিতে নেমেছে। এমন কি- কখন কি কোথায় কিভাবে লড়াই এ নামবে সেটাও তারা সরাসরি দেবতা মারফতই জানতে পারতো। পুরো সাঁওতাল গোষ্ঠীই এটা বিশ্বাস করেছিল এবং অসাধারণ অসাধারণ ফাইট দিয়েছিল (শেষ পরিণতি যদিও খুব হৃদয়বিদারক এবং একি সাথে দারুন তেজোদীপ্ত)। এখন প্রশ্ন হলো- সিধু কানহু কি মিথ্যা বলেছিল? ঐ সময়ের বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের অনেকেই এবং পরেও অনেকে এ ব্যাপারে মনে করেন- মিথ্যা বলেন নি। কেননা তারা ঐরকমই বিশ্বাস করতেন। সহজ সরল জীবন যাপনের অধিকারী সাঁওতালদের এমনিতে তেমন মিথ্যার প্রয়োজন হয় না- এবং তারা সংস্কার-কুসংস্কার-দেবদেবীদের ভিতরেই বসবাস করে এবং এসবে বিশ্বাস তাদের একদম ভিতরে, যখন বৃটিশদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ- তখন বৃটিশদের উপর রাগ-ক্ষোভ এবং দেবতা এসে তাদের রক্ষা করুক এই হলো অধিকাংশের দিনরাতের সবসময়ের চিন্তা। এমন সময় সিধু-কানহু ঐরকম চিন্তার একাগ্রতায় ও বিশ্বাসের কারণেই এমন স্বপ্নাবিশ্ট হতেই পারে এবং বাকিরা যখন সিধু-কানহুর কাছ থেকে এটা শুনেছে- তখন এটাকেই সকলের কাছে সবচেয়ে কাঙ্খিত ও খুবই স্বাভাবিক বিষয় মনে হয়েছে। সিধু-কানহুরা যে মিথ্যা বলেনি তার পক্ষে সবচেয়ে জোরালো যে যুক্তি দেয়া হয় তা হচ্ছে- সিধু-কানহু যদি দেবতাদের ডাকের কথা নিজেরাই বিশ্বাস না করতো এবং মিথ্যা বলতো, তবে অমন অকুতোভয় ও কনফিডেন্ট নেতৃত্ব দেয়া ও জীবনবাজী করে ফাইট করা আদৌ সম্ভব হতো না।

সত্যেন সেনের দুটো চমৎকার উপন্যাস আছে (অসাধারণ বললেও কম বলা হবে- সবার পড়া উচিৎ)- ১ম পর্ব: অভিশপ্ত নগরী ২য় পর্ব: পাপের সন্তান। ওল্ড টেস্টামেন্ট থেকে স্থান-কাল-পাত্র নিয়ে লেখা ১ম উপন্যাসে এক নবীর গল্প আছে। এখানে সেই নবীর স্থির বিশ্বাস- তাকে কোন জায়গায় নিয়ে যায় সেই কাহিনীটাই পরিস্কার হবে। সেই নবী আসলে সফল ছিল না- শেষ পরিণতি এক পর্যায়ে তার মোহ ভাঙ্গায়- এবং এক ঝলকে সে বুঝতে পারে- এতদিন তাহলে সে কি করেছে? যাহোক- মোহ ভাঙ্গার আগ পর্যন্ত দেখা যায়- সে কিন্তু বিশ্বাস অনুযায়ীই চলেছে ও কথা বলেছে- পাঠক সহজেই বুঝতে পারে যে- তার কথাগুলো সত্য কিছু না- কিন্তু এটাও বুঝতে পারে এই লোকটা তো মিথ্যা বলছে না। এই উপন্যাসটা পড়লে খুব ভালোই বুঝা যায়- এমন ঘটনাও সম্ভব।

দেবীপ্রসাদের ছোটদের উপযোগী বেশ কিছু বই আছে- যেখানে আদি ধর্মগুলো কিভাবে তৈরি হচ্ছে- পরিবর্তিত হচ্ছে এগুলোর উপর। সেখানে টোটেম বিশ্বাস কিভাবে দেবতায় রূপান্তরিত হচ্ছে- কিভাবে পুরোহিত তৈরি হচ্ছে সেগুলো নিয়ে কিছু মজার আলোচনা পাওয়া যায়। তো সেখানে পুরোহিত তৈরি হওয়ার ইনিশিয়াল কাহিনী সম্পর্কে বলা হচ্ছে এভাবে যে, শুরুর পুরোহিতরা সবাই যে- খারাপ, ইচ্ছা করে নিজেদের সাথে ঈশ্বর বা দেবতার সম্পর্কের কথা মিথ্যা হিসাবে প্রচার করতো তা কিন্তু না। ঐ সময়ের রেসপেক্টে জ্ঞানী কিছু মানুষ, যারা প্রকৃতিকে খুব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লষণ করতো- তাদের কেউ কেউ প্রকৃতির কিছু কিছু নিয়ম যেমন বৃষ্টি-ঝড়-গ্রহণ-পূর্ণিমা-অমাবশ্যা প্রভৃতি ধরতে পারতো এবং সেখান থেকে কিছু ভবিষ্যদ্বানী করতে পারতো। কিন্তু এইসব নিয়মের কারণ তারা নিজেরাও জানতো না- উপরন্তু সাধারণ মানুষের কাছে তাদের বিশেষ কিছু টাইপের মর্যাদা- সাধারণের অনেকে তাদের ঈশ্বরের দূত বা প্রতিনিধি হিসাবে ট্রিট করা- এসব মিলিয়েই হয়তো তারা একসময় নিজেদেরকেও তেমনটা ভাবতে ও বিশ্বাস করতে শুরু করে। এখান থেকে যখন তারা নিজেদেরকে তেমনটা পরিচয় দিতো- নিশ্চয়ই তারা বিশ্বাসের জায়গা থেকেই দিতো, সত্য মনে করেই দিতো।

যাক, এবারে মুহম্মদ সা: এর কাছে ফিরে আসি। তিনি মিথ্যা বলেছেন কি না? হতে পারে তিনি মিথ্যাই বলেছেন। হতে পারে না। দ্বিতীয় সম্ভাবনার পেছনে কি কি যুক্তি থাকতে পারে? মানে, তিনি মিথ্যা বলেননি অর্থাৎ সবকিছুই সত্য হিসাবেই ভেবে বিশ্বাস করে বলেছিলেন এমনটি মনে করার পেছনের যুক্তিগুলো কি কি হতে পারে, সেগুলোই দেখি:

# তাঁর বাল্যকাল- তাঁর কৈশোর- তাঁর যৌবনকাল- ইসলাম প্রচার শুরু করার আগ পর্যন্ত মানে ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত জীবনযাপন। অসম্ভব সৎ- বিশ্বাসী - সত্যবাদী এক মানুষকে দেখা যায়। এমনকি মদীনায় যখন পালাচ্ছেন শত্রুদের আক্রমণের ভয়ে- তখনো শত্রুদের গচ্ছিত সম্পদ তিনি শত্রুদের হাতে তুলে দেয়ার ব্যবস্থা করছেন। ৪০ বছর পর্যন্ত যে মানুষটি সৎ ও সত্যবাদী ও মানুষের কাছে বিশ্বাসী - তিনি হঠাৎই মিথ্যাবাদী হতে যাবেন কেন?

# মুহম্মদ সা: এর ধর্ম প্রচারক হয়ে ওঠার ইতিহাসটা প্রাসঙ্গিক মনে করি:
==>> পৌত্তলিক কোরাইশ বংশে জন্ম নেয়ার পরেও বাল্যকাল থেকেই দেবদেবীর বলয় থেকে বের হতে পারাটা বণিক চাচা আবু তালেবের কাছে কাটানোর ফল
==>> একেশ্বরবাদী ইহুদী-খৃস্টান ও অন্যান্যদের চিন্তার সংস্পর্শে প্রথম আসা চাচা ও চাচার বণিক সঙ্গীদের কাছ থেকেই
==>> শুরুতেই বাবাহীন, তারপরে মা, পরে দাদা কে একেএকে হারিয়ে চাচার বাড়িতে বড় হওয়া, বাল্যকাল থেকে মেষপালক হিসাবে কাজ করা এসমস্তই তার চরিত্রে একটা বিশিষ্ট অবস্থা তৈরী করে, এবং তাতে চাচার অবদানও থাকতে পারে, অর্থাৎ ছোটকাল থেকেই সৎ, সত্যবাদী হওয়া- খুব নরম মনের অধিকারী হওয়া- মানুষের প্রতি দরদ এসব গুণের অধিকারী হওয়া
==>> কোরাইশদের নানা দেবদেবীর উপাসক হয়ে নিজেদের ঝগড়া-মারামারি এসব দেখে পৌত্তলিকতার প্রতি অনাস্থা এবং একেশ্বরবাদের প্রতি আস্থা তৈরী হতে থাকে
==>> ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত কার্যত তিনি ধর্মহীন অবস্থায় থাকেন, পৌত্তলিকতার প্রতি অনাস্থা তৈরী হলেও- সম্ভবত নিরীশ্বরবাদী চিন্তার সংস্পর্শে আসতে পারেননি, ফলে- বহু ঈশ্বরের জায়গায় একেশ্বরই হয়তো ভিতরে ভিতরে ভিত্তি পেতে থাকে
==>> খাদিজার বণিকী কাফেলা নিয়ে মক্কার বাইরে যাওয়াটা বিশাল অভিজ্ঞতার সম্ভার নিয়ে আসে
==>> বণিক চাচার কাছে বাল্যকাল কাটানো এবং যৌবনে নিজেও বণিকী পেশা নেয়াতে- দেশ বিদেশে ঘুরে বেড়ানো বণিকশ্রেণীর সাথেই নৈকট্য গড়ে উঠে এবং অর্থনৈতিক কারণেই এই বণিক শ্রেণীর মধ্যে একটা আর্জ তৈরি হচ্ছিল- আরবের সামাজিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটা সুস্থিতি স্থাপনের (প্রথম ইসলাম গ্রহণকারীদের একটা বড় অংশ বণিক শ্রেণীর- খাদিজা, আবু বকর প্রমুখ) এবং এই বণিক শ্রেণীই আরবের কনটেক্সটে এগিয়ে থাকা অংশ ছিল- সংস্কারমুক্তি বা জ্ঞানে-দর্শনে-ইতিহাসে
==>> নরম মনের সৎ- আদর্শবাদী তরুন মুহম্মদ সা: এর জীবনের বড় একটা টার্ণিং পয়েন্ট হিলফুল ফুযলে যুক্ত হওয়া, সমাজ পাল্টানোর স্বপ্ন মুহম্মদ সা: মায়ের পেট থেকে নিয়েই বের হননি তার প্রমাণ এই সংগঠনের অপরাপর যুবারা- এখানেই মুহম্মদ সা: এর রাজনৈতিক-সাংগাঠনিক জীবনের সূত্রপাত- যা পরবর্তীতে ভালো কাজে লেগেছে
==>> ২৫ বছর পর্যন্ত নানাভাবে বিচ্ছিন্ন বিচ্ছিন্ন নানা চেস্টা করেছেন, সমাজের উন্নয়নের জন্য- সমাজকে পাল্টানোর জন্য, কিন্তু সফল হননি, এই সফল না হওয়ার অভিজ্ঞতাটাও পরবর্তীতে কাজে লাগে
==>> একেশ্বরবাদের প্রতি আকর্ষণের জায়গা থেকে ইহুদী-খৃস্টান-পারসিকদের ধর্ম সম্পর্কে ভালো করে জানতে বুঝতে চেয়েছেন- চেস্টা করেছেন- অনেক কিছু জেনেছেন
===>> যেকোন কারণেই হোক এসব ধর্ম তাকে টানতে পারেনি
===>> এই ধর্মগুলোর কমন ভবিষ্যদ্বানী- একদিন এক নবীর আবির্ভাব ঘটবে- তাঁর মধ্যে ভালো প্রভাবে ফেলে
==>> ২৫ বছর বয়সে খাদিজার সাথে বিয়ে তাকে অর্থনৈতিকভাবে মুক্তি দেয়, অর্থাৎ পেটের ধান্দায় আর সময় ব্যয় করতে হয় না, ফলে সমাজ পরিবর্তনের চিন্তাই হয়ে দাঁড়ায় একমাত্র চিন্তা- চিন্তা থেকে প্যাশন মানে ধ্যান-জ্ঞান (যেটার প্রাথমিক বীজ হিলফুল ফুযলই বপন করে দিয়েছে বলে আমার ধারণা)
==>> ২৫ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত কি করেছেন?- গুহায় বসে কেবল ধ্যান? আমার মনে হয় না- এটা বলা হয় কারণ তার ঐ সময়ে অন্য কোন কাজ করতে হয়নি- খাবার-দাবারের চিন্তাও ছিল না, এসময়ে তিনি ব্যাপক ও গভীর চিন্তায় নিমজ্জিত ছিলেন, কিন্তু গুহার বাইরেও তিনি আসতেন- মানুষদের সাথে মিশতেন কথা বলতেন- সম্ভবত ভেঙ্গে যাওয়া হিলফুল ফুযলের কোন সঙ্গী, বা বণিকবন্ধুদের সাথে কথা হতো। আসলেই আমার ধারণা এই ১৫ টি বছরই মুহম্মদ সা: এর দর্শন সাধনা- পুরো সমাজ ব্যবস্থাটা নিয়ে একটা স্টাডি তিনি করে ফেলেন- ভবিষ্যৎ সমাজকে নিয়ে তার স্বপ্নগুলোকেও সাজিয়ে গুছিয়ে নিতে থাকেন। কিন্তু বাঁধ সাধে কি ভাবে স্বপ্ন পূরণ হবে সেটা নিয়ে। এই চিন্তাটা তাকে কম ভোগায়নি- বলতে গেলে এই চিন্তাই তাকে ঐ ২৫ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত অস্থির করে রেখেছে।
==>> অবশেষে ৪০ বছর বয়সে এসে ওহী নাযিল হওয়া, ইসলামের ডাক দেয়া- নতুন ধর্ম প্রচারে নেমে পড়া- (বুঝতে হবে "ইসলাম" আমাদের এখানকার মতো একটা প্রোপার নাউন না- আরবীতে এটার একটা অর্থ আছে- সেটা হলো শান্তি এবং আসলে তিনি আরব সমাজে শান্তির ডাক দিলেন)
এই হলো মোটামুটি প্রেক্ষাপট বা ইতিহাস।

# এখন কথা হচ্ছে যে, তিনি ৪০ বছর বয়সে এসে ওহীর নাযিলের কথাটা যে বলেছেন- সেটা মিথ্যা কাহিনী বানিয়ে প্রচার করেছেন, না কি তিনি নিজেই সেরকমটি বিশ্বাস করতেন (হতে পারে- সমাজ বদলের স্বপ্ন- সেটাকে নিয়ে একাগ্রতা- তার নিজের ঈশ্বরে বিশ্বাস- কিছু ধর্মের ভবিষ্যদ্বানী- একসময় তাকে নিজেকে ভবিষ্যদ্বানীর সেই নবী হিসাবে ভাবিয়ে তুলে- এবং এই ভাবনাটা একটা সময়ে তার মধ্যে বধ্যমূল হয়ে যায়- এবং দীর্ঘদিন কেবল ধ্যান মগ্ন থাকাটা একসময় তাকে আধো স্বপ্ন-আধো বাস্তব জগতে নিয়ে যায়- যেখানে আসলে তিনি তার মনের কথাগুলোই ঈশ্বরের দূতের কাছ থেকে শুনতে পান)। মিথ্যা দিয়ে- মানে 'তিনি আসলে আল্লাহর রাসুল ও আল্লাহই তাকে রক্ষা করবে' এমনটায় বিন্দুমাত্র সন্দেহ নিয়ে- একা একটা মানুষের যাত্রা শুরু করাটা - তাও শুরু থেকে এত কনফিডেন্স নিয়ে- বিশাল প্রতিকূলতায় পড়তে যাচ্ছেন নিশ্চিৎ জেনেও স্থির চিত্তে এগিয়ে যাওয়াটা কি সম্ভব ছিল? মিথ্যা দিয়ে মানুষকে কনভিন্স করা যায়? ধরেন আপনি নিজে যেটা বিশ্বাস করেন না- সেটা অন্য কাউকে কতখানি কনফিডেন্সের সাথে বুঝাতে সক্ষম হবেন বলে মনে করেন?

# নিজের প্রাত্যাহিক জীবনে- ইসলাম প্রচারে কাজে- রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে- তিনি যা করেছেন- যা বলেছেন- সবই কোরআন বা হাদীস হিসাবে অন্যদের সামনে হাজির করেছেন। ঈশ্বর মানুষকে বানী পাঠায় এটা সেসময়কার বদ্ধমূল ধারণা। তিনি আল্লাহর রাসুল এমন বিশ্বাস তৈরি হলে তো আল্লাহর ওহী তিনি পান বা পাবেন এমন বদ্ধমূল ধারণা তৈরি হওয়াও স্বাভাবিক, আর বদ্ধমূল ধারণা বা বিশ্বাস মানুষের মনের উপর প্রভাব ফেলতে পারে- (আমার এক পরহেজগার আত্মীয় নাকি মাঝে মধ্যে জড়বস্তুর জিকিরও শুনতে পান- এবং আমি এটাও জানি তাঁর মিথ্যা বলার কথা না; বাংলাদেশে নাকি বেশিরভাগ সাপে কাটা মারা যায় বিষহীন সাপের কামড়েই- ভয়ের কারণে- আবার দেখা গেছে ওঝা/কবিরাজের মতো হাতুড়ে চিকিৎসাতেও রোগীদের অনেকে ভালো গেছে- কেবল বিশ্বাসটুকুর জোরে)। ফলে আল্লাহর ওহীর কথা তিনি অনেকবারই বলেছেন- এবং সেগুলো অভিনয় বা ভণ্ডামি না হয়ে নিজেও সেরকম বিশ্বাস করেই বলেছেন- এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা ফেলে দেয়া যায় না।

# নিজের প্রয়োজনমাফিক সুরা-আয়াত-ওহী বানিয়েছেন, এখান থেকে মনে হতে পারে- তিনি অবশ্যই মিথ্যার উপরে নির্ভর করেছেন। কিন্তু তিনি যদি এমনটা বিশ্বাস করেন যে- তিনি আল্লাহর রাসুল এবং তিনি যা করবেন সবই আল্লাহর নির্দেশ মাফিক ও (সবই কিন্তু সমাজ বদলের স্বপ্ন অনুযায়ি) সবই ভালো - অনুসারীদের জন্য অনুকরণীয়- তাহলে এমন একটা পর্যায়ও তো সম্ভব হতে পারে যে- যেখানে তিনি ভাবছেন তার কর্মকাণ্ড ও আল্লাহর আদেশ অভিন্ন। এবং আমি এখন পর্যন্ত যতটুকু পড়েছি- সেখান থেকে বলতে পারি- মুহম্মদ সা: এর এমন কোন একটিভিটি- আদেশ-উপদেশ নেই যা এক্সিস্টিং সমাজের নৈতিকতার মানদন্ডে অনৈতিক বলা যাবে।

পরের অভিযোগটি নিয়ে কথা বলার আগে এই পয়েন্টেই আরেকটা কথা বলবো- সেটা হচ্ছে, আমি আজকে দাঁড়িয়ে ১৪০০ বছর আগের ঘটনাগুলো সম্পর্কে কেবল অনুমানই করতে পারি। তাই বারেবারে সম্ভাবনার কথা বলেছি। এবং এত সম্ভাবনার কথা বলার পরেও জানি- এটাও হতে পারে যে, আসলেই তিনি মিথ্যাচার করেছেন। কিন্তু তা যদি হয়ও- আমার কাছে সেটা কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। আমি কেবল দেখি- তার কাজগুলো, একজন নেতা হিসাবে- একজন সমাজ সংস্কারক হিসাবে- ১৪০০ বছর আগের একজন মানুষ হিসাবে- তার একটিভিটিগুলো- তার নির্দেশগুলো- তার উপদেশ-পরামর্শগুলো তৎকালীন সমাজে কি দিয়েছে, সমাজকে এগিয়ে নিয়েছে না কি পিছিয়ে নিয়েছে- এটাই আমার মূল বিবেচ্য বিষয়।

এবারে আসা যাক- ২য় পয়েন্টে....
(চলবে)

প্রথম পর্ব পড়তে এখানে ঢু মারুন....]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29059428 http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29059428 2009-12-15 19:11:45
নাস্তিক হয়েও যেসব কারণে মুহম্মদ সা: কে খুব শ্রদ্ধা করি ......(১ম পর্ব) সূত্রপাত:(এটা আসলে ফেসবুকে কিছু নাস্তিক বন্ধুদের সাথে ডিবেট করতে গিয়ে যে আলোচনাগুলো করেছি- তারই সামারি পোস্ট। মুহম্মদ সা: কে নিয়ে নাস্তিক বন্ধুদের নানা ধরণের মন্তব্যের মাঝে এক পর্যায়ে বলে ফেলি: "আমি মুহম্মদ সা: কে শ্রদ্ধা করি, শুধু শ্রদ্ধা না- অসম্ভব রকম শ্রদ্ধা করি। এরকম একজন জিনিয়াস আমি দুনিয়ার ইতিহাসে খুব একটা খঁজে পাই না। আইনস্টাইন, কার্ল মার্কস, মুহম্মদ সা: , সাহিত্যে শেক্সপিয়ার-রবীন্দ্রনাথ ... এরকম আরো কয়েকটি নাম আসবে এগুলো একেকটা সেরকম মাথা ছিল বটে। আবার ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী (influential) চরিত্র বাছাই করতে বললে মুহম্মদ সা: , গ্যালিলিও, কার্ল মার্কস, ডারউইন, এরিস্টোটল প্রভৃতি নামগুলো অনায়াসেই বলি। মোদ্দা কথা আমি মুহম্মদ সা: এর একজন ফ্যান- এবং নাস্তিক হিসাবেই ফ্যান- বস্তুত নাস্তিক বলেই এমন ভক্ত হতে পেরেছি- আল্লাহর অবদান বলে কিছু থাকতে পারে না জানি বলেই বুঝতে পারি- মানুষ হিসাবে কি অসাধারণ ছিলেন তিনি- কি বিশাল মাথা ছিল তাঁর"। যথারীতি আলোচনা জমে উঠে। মুহম্মদ সা: কে পার্ভার্ট, নারীলোভী, মিথ্যাবাদী-ভণ্ড-প্রতারক, ক্ষমতালোভী, নৃশংস খুনী হিসাবে দেখিয়ে যেসব যুক্তি এসেছিলো- সেগুলো খণ্ডন করতে গিয়ে অনেক কথা বলেছিলাম। সেগুলোকেই সাজিয়ে গুছিয়ে এই পোস্ট তৈরী করছি।)

প্রারম্ভিকা:
ইতিহাসকে দেখার ও বুঝার একটা নির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে। সেটা হলো- আপনি কখনোই আজকের নৈতিকতা দিয়ে, আরেকটা সময়/যুগ বা অঞ্চল বা আরেকটা সংস্কৃতিকে বিচার করতে পারবেন না- বা এক যুগের নৈতিকতা দিয়ে আরেকটা যুগকে বিচার করতে গেলে সবসময়ই ভুল সিদ্ধান্তই আপনার আসবে।

আমি যখন মুহম্মদ সা: কে দেখি- ঐ আরব বেদুইনদের যুগের তুলনায় দেখি ইতিহাসের এক অতুলনীয় ব্যক্তিত্বকে। এমনকি তিনি ঐ সময়ে যে সমস্ত নীতি-নৈতিকতা হাজির করেছেন- তা ঐ সময়ের তুলনায় তো বটেই তারো পরের বিশাল সময় ধরেও এমন কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। এটাকে আমি কোনভাবেই অস্বীকার করতে পারিনা। আমি যতই কোরআন পড়ি- যতই হাদীস সমূহ পড়ি- যতই তাঁর জীবনী পড়ি- অবাক হয়ে যাই। যে সুরাগুলো- যে আয়াতগুলো নিয়ে আমি আজকের মোল্লাদের তুলাধুনা করি- এমনকি সেগুলোও আমার কাছে ঐ সময়ের রেসপেক্টে চরম বৈপ্লবিক মনে হয়। সত্যি তাই।

কোন সন্দেহ নেই যে, কোরআন আসলে আগের বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাস- লোকাচারগুলোরই মডিফায়েড রূপ। এখানে ইহুদীদের- খৃস্টানদের- পাগানদের- পারসিকদের নানাবিশ্বাসকে একিউমুলেট করা হয়েছে- কিন্তু সেগুলোকে এত চমৎকারভাবে একটা নির্দিষ্ট দার্শনিক লক্ষে এত সুচারুরূপে একিউমুলেট করা অবশ্যই একটা বিশাল কাজ। একটা জীবনে/ একটা যুগেই ইতিহাসকে এমন পাল্টে দেয়া- এরকম সামর্থ্য ইতিহাসে খুব কম মানুষেরই ছিল। যীশুর ভূমিকাও অনস্বীকার্য। কিন্তু, যীশুকে যদি ঐতিহাসিক ক্যারেক্টর ধরেও নেই- তারপরেও বলতে হবে- যীশুর যীশু হয়ে ওঠায় তার ভূমিকার চেয়ে পরবর্তী যুগের চার্চগুলোর বিশাল ভূমিকা। কিন্তু মুহম্মদ সা: এখানে ইউনিক। এমন কনফিডেন্ট মানুষ- তিনি জানতেন তাঁর কি উদ্দেশ্য- তিনি কোথায় পৌঁছতে চান- এবং কিভাবে সেখানে পৌছতে হবে। বিশাল মাথা ছাড়া এটা কোনভাবেই সম্ভব নয়।

শুধু এটাই দেখেন না- কোরআন আর হাদীস মিলে- জীবনের প্রতিটা বিষয় নিয়েই সে কথা বলে গিয়েছে। এবং যেগুলো বলেছে- যেসব মাসালা দিয়েছে- সেগুলোও যেনতেন না- হেলাখেলার নয়। এমন অনেক বিষয়ই আছে যে, সেগুলো আজকেও খুব প্রাসঙ্গিক। তাঁর শুধু ঐ সময়কে নিয়ে চিন্তা ছিল না- তিনি ভবিষ্যতকেও শাসন করতে চেয়েছে- এবং ভবিষ্যতকে অসাধারণভাবে দেখতেও পারতেন। কোরআন তারপরে হাদীস- তারপরে ইজমা- তারপরে কিয়াস এমন ধারাবাহিকতাই জানিয়ে দেয় ঐ মানুষটার দূরদর্শিতা। অন্তত তিনি অনড় একটা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চাননি বলেই আমার ধারণা।

নারীর অবমাননার কথা আমি অহরহই যেকোন মোল্লার সাথে ডিবেটে বলি- কিন্তু সাথে এটাও মনে করি- নারীকে এমন মর্যাদা দেয়া মানুষ জগতের ইতিহাসে হাতেগোনা, সেটা অবশ্যই ঐ সময়ে তাঁর সংগ্রাম- তাঁর কর্মকান্ড এবং তাঁর সফলতা এসবের ভিত্তিতেই বলছি। সম্পত্তিতে নারীর অর্ধেক অধিকারের বিরুদ্ধে এখন কথা বলি ঠিকই- কিন্তু জানি এই সেদিনো ইউরোপে পর্যন্ত নারীকে কোন সম্পত্তিতে অধিকার দেয়া হতো না। আজ মোল্লাদের চোখে দেখিয়ে দেই- ইসলামে এক পুরুষ সাক্ষী সমান দুই নারী সাক্ষী- কিন্তু এটাও জানি- এনলাইটমেন্টের যুগের পরেও (সেখানে নারী স্বাধীনতার কথা উঠলেও)- এই সেদিনও নারী কোন সাক্ষ্য দিতে পারতো না। নারীর ভোটাধিকার গত শতাব্দীতে এসে চালু হয়েছে। এই লোকের বালিকা বিবাহের বিরুদ্ধে কথা বললেও- ঐ লোকতো আয়েশার সাথে বিয়ে করার পরে সাথে সাথে বাসর করেননি- অপেক্ষা করেছেন আয়েশা আরেকটু পরিণত হওয়ার জন্য। ঐ আমলে একটা মানুষ যদি এই অপেক্ষা না-ও করতো- আমি কোন আপত্তি দেখি না, কেননা আমি আমার যুগের আমার সমাজের নৈতিকতা আরেকটা আমলে চাপায় দিতে পারি না।

দার্শনিক দিক দিয়েও এই লোকটাকে হেলা করতে পারি না। বুঝতে হবে- তাঁর রুট পৌত্তলিকতা, তিনি ইহুদী বা খৃস্টান অরিজিনের নয়। ফলে- শুরুর ফাইট তাকে পলিথিজমের বিরুদ্ধে এবং তিনি একেশ্বরবাদকেও যখন বেছে নিয়েছেন- তখন সেটা উদ্দেশ্য ছাড়া নয়। তিনি ধারা-উপধারায় বিভক্ত আরব বেদুইনদের- কোরাইশ পৌত্তলিকদের ঐক্যবদ্ধ করতে চেয়েছেন। এবং এটাকে স্ট্যাবলিশ করার জন্য তিনি সবকিছুর শরনাপন্ন হয়েছেন!!! এবং বিভিন্ন কাহিনীগুলোকে- মিথগুলোকে- লোকাচারগুলোকে বিনির্মাণ করেছেন নিজের দার্শনিক মতাদর্শকে সাজাতে।

সবশেষে বলি- একাট দাসমূলক ব্যবস্থাকে পুরো উৎখাত করতে যীশু আর মুহম্মদ সা: এর ভূমিকা কোনমতেই অস্বীকার করা যাবে না। "মানুষের প্রভু কেবল ঈশ্বর"- "ঈশ্বরের তৈরি সব মানুষ সমান"- এই দৃষ্টিভঙ্গী আনা ছাড়া দাসপ্রথা উচ্ছেদ হতো কি না সন্দেহ। আমি যতই মোল্লাদের সাথে তর্কে যুক্তি করি না কেন যে, দাসদের সমান দেখার কথা বলেছেন- কই সরাসরি দাস প্রথা উচ্ছেদের কথা তিনি বলতে পারেন নি, -- কিন্তু এটাও জানি একটা সম্পূর্ণ দাসমূলক সমাজে জন্ম নিয়ে ও বেড়ে উঠে- "তুমি যা খাইবে দাসদের তা-ই খাইতে দিবে"- "তুমি যা পরবে দাসদের তাহাই পরতে দিবে"... এই আহবান জানানোটা কতটুকু বৈপ্লবিক। দাস ব্যবস্থার ইতিহাস যখন পড়ি - যখন জানতে পারি যে- দাসদের মানুষ হিসাবেই স্বীকার করা হতো না- প্লেটোর মত দার্শনিকরা যখন বলেন- "সমাজের উন্নতির নিমিত্তেই দাসেদের প্রয়োজন রহিয়াছে"- "ঈশ্বর জগতের প্রয়োজনেই কিছু মানুষকে মানুষ আর বাকিদেরকে দাস হিসাবে তৈরি করিয়াছেন" এবং এই যুক্তি- এই চিন্তা হাজার বছরের উপর দাসদের নিংড়ে শোষণের বৈধতা দিয়ে যায়; তখন ঐ চিন্তাকে চরমভাবে আঘাত করার লক্ষে ইতিহাসে আমি যীশু আর মুহম্মদ সা: কে ছাড়া ভাবতেই পারি না। দাসীদের সাথে সেক্সকে কেন বৈধতা দিয়ে গিয়েছেন- এই আপত্তি যতই তুলি- জানি তিনি তো দাসীর সাথে ঐ সেক্সকেও ঐ যুগের তুলনায় অন্য মাত্রা দিয়ে যেতে পেরেছিলেন! যে দাসদের তাদের মালিকেরা সমকক্ষ ভাবা তো দূরের কথা, ঘৃণার চোখে দেখতো- সে দাসদের সাথে নামাজ নামক অনুষ্ঠানে এককাতারে দাড়াতে বাধ্য করেছিলেন মালিকদের। প্রথম মুয়াজ্জিন বেলাল একজন দাস ছিলেন। এবং কোরাইশদের সাথে যে যুদ্ধগুলো হয়েছিল- সেগুলোর তথ্য থেকেও জানা যায়- ঐ যুদ্ধ আসলে হয়েছিল- দাসমালিকদের সাথে এবং যুদ্ধগুলো জেতার সাথে সাথে এমন হু হু করে মুহম্মদ সা: এর সমর্থকের সংখ্যা বাড়ার প্রধানতম কারণই ছিল- নিম্ন শ্রেণীর মানুষেরা- দাসেরাই হুড়মুড় করে ইসলাম গ্রহণ করেছে। আশেপাশের প্রতিবেশী অভুক্ত থাকলে কোন ইবাদতই গৃহীত হবে না- এই কথাটা জোরের সাথে বলতে পারাটা এবং সেটা নিজে ও সঙ্গী-সাথীদের- অনুসারীদের পালনে উদ্বুদ্ধ ও বাধ্য করাটা, বায়তুল মাল বা রাষ্ট্রীয় কোষাগার স্থাপন- যাকাতের প্রচলন করাটা আমি সময়ের রেসপেক্টে তুখোড় এক জিনিয়াসের কাজ হিসাবেই গণ্য করি।

আমি মনে করি, একজন নাস্তিকের কাছে ইহকালই সব- ইহজগতের মানুষই তার মূল বিবেচ্য। আর সে কারণে একজন নাস্তিকই কোন মানুষকে পূর্ণ শ্রদ্ধা করতে পারে- যেটা আস্তিকের পক্ষে সম্ভব না। আমি মাঝে মধ্যেই মোল্লাদের সাথে ডিবেটে বলি- আপনাদের চেয়ে আমি মুহম্মদ সা: কে অবশ্যই অধিক শ্রদ্ধা করি এবং এটা এত নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি কারণ- আমি জানি একজন আস্তিকের পক্ষে কোন মানুষের প্রতি পরিপূর্ণ শ্রদ্ধা আনয়ন সম্ভব নয়।

মুহম্মদ বনাম যীশু:
ইতিহাসের দুই সময়ের দুই ব্যক্তিত্বের তুলনামূলক আলোচনাটা সবসময়ই ক্রিটিক্যল- সম্ভব হলে আমি তা এড়িয়ে যেতেই ভালোবাসি। যীশুর অবদানকে আমি যথেস্ট শ্রদ্ধা করি- আমি প্রচুর লিটেচারে পেয়েছি- যীশু না আসলে প্রাথমিক দাস বিদ্রোহগুলো ঐ সময়ে শুরুই হতো না, এবং আমি এই মতের সমর্থক।

আসলে- মুহম্মদ সা: আর যীশুর আলোচনা ঐ সময়ে পাশাপাশি আনার উদ্দেশ্য একটাই ছিল, মুহম্মদ সা: একজন নেতা ছিলেন, চৌকশ ও পরিপূর্ণ নেতা। উল্টোদিকে যীশুও নেতা ছিলেন বটে- তবে তার চেয়েও একজন মানবদরদী সাধক প্রকৃতিটাই আমার চোখে বেশী ধরা পড়ে। উল্টোদিকে মুহম্মদ সা:ও মানবদরদী ছিলেন কোন সন্দেহ নেই- কিন্তু তিনি ব্যক্তিগতভাবে মানবপ্রেম বিলিয়ে জীবনপাত করতে রাজী ছিলেন না- তিনি সমাজটাকেও নিজ হাতে পাল্টে ফেলার মিশনে নেমেছিলেন- অনেক মাপা- অনেক ধীরে- অনেক বুঝে শুনে- স্টেপ বাই স্টেপ তিনি এগুয়েছেন। সবচেয়ে বড় কথা মুহম্মদ সা: সফল ছিলেন। যীশু সফলকাম হন নাই- এটার জন্য যীশুকে বাতিল করছি না, বরং মনে করি- তার প্রেক্ষাপটে সফল হওয়ার পরিস্থিতিটাও হয়তো বিরাজমান ছিল না (আসলে যেকোন সামাজিক পরিবর্তনের জন্য অবজেকটিভ কন্ডিশনটাও তো খুব জরুরী)।

মূলত এই জায়গা থেকেই আমি তুলনামূলক ইতিহাসের উপর ওভাবে আলো ফেলেছিলাম। যীশুর সমসাময়িক ঐ অঞ্চলের অনেক ঐতিহাসিকের ইতিহাস রচনায় যীশুর তেমন সরব উপস্থিতি পাওয়া যায় না কেন? যীশুর জন্ম-মৃত্যু সবকিছুতে এত বেশী মিথের ছোয়া কেন? এসব কিছু থেকেই আমার ধারণা- যীশু ক্যারেকটারটাকে আজ আমরা যেরূপে পাই বা দেখি বাস্তব যীশু আসলে তেমন কেউ ছিলেন না। তাহলে এই যীশুকে তৈরি করলো কারা? সেটা বুঝতে গেলে আমাদের চার্চের আধিপত্য তৈরি ও বিকাশের ইতিহাসটাকেও গণনায় আনতে হয় বৈকি।

মুহম্মদ সা: এর ক্ষেত্রটি ভিন্ন- তিনি এমনই এক চরিত্র - (অন্যদের হাতে তৈরি হওয়া তো দূরের কথা) যিনি কেবল নিজ যুগকে নয়- ভবিষ্যতকেও শাসন করতে চেয়েছেন এবং সফলকামও হয়েছেন (এখানেও অবজেকটিভ কন্ডিশনটাও বুঝতে হবে- আরো অনেক কিছু আছে- যা মুহম্মদ সা: এর সফলকাম হওয়াটা একরকম ঐতিহাসিক অনিবার্যতায় পরিণত করেছিল)। মুহম্মদ সা: এর জীবনকালে ও মৃত্যুর পরে অসংখ্য স্কলার- অনেক ব্যক্তির ভূমিকা অবশ্যই ছিল- কিন্তু তারা কখনোই মুহম্মদ সা:কে ছাড়িয়ে যেতে পারে নি- মুহম্মদ সা: এর ছায়ার ভেতরে থেকেই তাদের ইসলামকে এগিয়ে নিতে হয়েছে। এমনই এক নেতা ছিলেন তিনি। এটার আফটার ইফেক্ট আমরা আজো ভোগ করছি- বুঝতে পারি এতখানি প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব বা নেতা না হলে আজ হয়তো মানুষের মোহ কাটানো অনেকখানি সহজ হতো- কিন্তু এ কারণে কিছু আফসোস- মাঝে মধ্যে রাগ হলেও মুহম্মদ সা:রে তো দোষ দিতে পারিনা। (এরিস্টটলের প্রভাবের কথাও জানি, নিশ্চিত জানি - এই ব্যক্তি ও টলেমিরা মিলে আমাদের দুনিয়াটাকে কম করে হলেও ৫০০ বছর পিছিয়ে দিয়েছে- কিন্তু তাই বলে চিন্তার রাজ্যে এরিস্টটলের এমন প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতাকে তো অস্বীকার করতে পারি না)।

অভিযোগ সমূহ:
মোটামুটি বড় দাগে প্রধান তিনটি আপত্তি পাওয়া গেলো মুহম্মদ সা:কে নিয়ে।
১। মিথ্যাচারিতা। নিজের ইচ্ছামত- সুবিধামত আয়াত বানিয়ে আল্লাহর নামে চালিয়েছেন- সমাজ-সংস্কারের জন্য মিথ্যাচার কেন করতে হবে?
২। তিনি একজন নৃশংস খুনী ছিলেন। পরাজিতদের তিনি কচু কাটা করতেন। প্রতিপক্ষকে বাগে পেলে তিনি সর্বনাশ দেখে ছাড়তেন। প্রচন্ড যুদ্ধবাজ নেতা ছিলেন।
৩। নারী লিপ্সা। ১৩ টা বিয়ে? ৯ বছরের বালিকাকে বিয়ে? ছি!

এই তিন অভিযোগ নিয়ে আমি যা মনে করি- সেটাই প্রথমে বলছি।
....
(চলবে)

***** মূল আলোচনা/ডিবেট পড়তে ব্লগের নাস্তিক বন্ধুরা এই লিংকে ঢু মারতে পারেন। তার জন্য অবশ্য ফেসবুকের Atheist Association Of Bangladesh গ্রুপে জয়েন করাটা বাধ্যতামূলক।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29059378 http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29059378 2009-12-15 17:48:02
যুক্তি-তক্কো-গল্প (পর্ব ১: সেসব আরবী হরফ সম্বন্ধে ... যাদের অর্থ আল্লাহই ভালো জানেন) আধুনিক এটমিক তত্ত্বের জনক জন ডাল্টন, না কি স্বয়ং আল্লাহ? শীর্ষক পোস্টে সহব্লগার নাজনীন১ কিছু প্রশ্নের জবাব চেয়েছেন। উক্ত পোস্ট সম্পর্কে তার মতামত: "আমার নিজের মতো করে বুঝেছি, কে কি দাবী করলো, আমার দরকার কি? আমি বুঝেছি সবচেয়ে ক্ষুদ্র অর্থে" এমনটি হলেও- তিনি কিন্তু কোরআনের অন্য কিছু দাবীর ব্যাপারে যথেস্ট আগ্রহ দেখিয়েছেন। "কোরআনে পরমাণুর কথা আছে কি নেই"- এ নিয়ে মাথা না ঘামালেও তিনি ঠিকই কোরআনকে বিজ্ঞানময় করার আরো কিছু দাবীর ব্যাপারে আমার জবাব জানতে চান। জবাব দেয়ার উদ্দেশ্যেই এই পোস্টের অবতারণা। এর আগে ধর্মে বিজ্ঞানঃ নিম গাছে আমের সন্ধান শীর্ষক পোস্টেও কিছু আলোচনা করেছিলাম, কিন্তু সেটাও অনেকের যথেস্ট মনে হয়না- ফলে প্রতিটি দাবীর বিষয়েই একটু বিস্তারিত আলোচনা করার চেস্টা করবো। প্রথমেই দেখে নেয়া যাক, নাজনীন১ এর প্রশ্ন/দাবীসমূহ কি কি?
১। কিছু কিছু সূরার প্রথমে বিচ্ছিন্ন কিছু আরবী হরফ দেয়া আছে, যার মর্মার্থ আজ পর্যন্ত কেউ উদ্ধার করতে পারেনি, তখনকার মানুষরা কি এ ব্যাপারে জানতো?
২। ছয়দিনে বিশ্বব্রহ্মান্ড সৃষ্টির সম্পর্কেও কি তখনকার মানুষদের ধারণা ছিল, কেমন করে জানতো তারা? এ ব্যাপারে আপনার মতামত কি?
-এবং সূরা ২১, আয়াত ৩০ উল্লেখ পূর্বক
৩। ১৪০০ বছর আগে উম্মী নবী মুহম্মদ (সাঃ) বা আরবের লোকেরা বিগ ব্যাং সম্বন্ধে বা
৪। পানিই যে সকল জীবনের উৎস -- এ ব্যাপারে কতটা , কিভাবে জানতেন? নবী তো দূরের কথা , কোন সাহাবীও বিজ্ঞান নিয়ে লেখাপড়া করতেন বলে কোন দলিল দেখিনি। যদি ধরে নেই তাঁরা তথ্য গোপন করেছেন, কবে থেকে বিশ্বের লোকেরা উপরোক্ত দুটি তত্ত্ব জানতে পেরেছে?

একই সাথে মুক্তমনা ব্লগে ব্লগার ফুয়াদেরও একটি দাবীর জবাব দেয়ার চেস্টা করবো। ফুয়াদ উক্ত পোস্ট সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন: "আমি দাবী করি নাই যে আল কোরানে আধুনিক এটম আছে। কে দাবি করেছে এবং সে কি প্রতিষ্ঠিত হুজুর? যদি কোন মুসলিম প্রতিষ্ঠিত হুজুর আপনার উল্লেখিত দাবি করে থাকেন তাহলে তার রেফারেন্স কি ? যে কেউ আপনাকে একটা কিছু বলতেই পারে"... ইত্যাদি। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে- তিনি এই ব্যাপারে ঐরকম কোন দাবী না করলেও ঠিকই আরেকটি দাবী করে বসেছেন। সেটা হচ্ছে:
৫। রাসূল সঃ মিরাজে ২৩ অথবা ২৭ বছর ঘুরে এসে দেখেন, উনার ওযুর পানি গরিয়ে পরছে যাওয়ার সময় যেমন পরছিল। এটা আইনস্টাইনের থিওরি অব রিলেটিভিটি অনুসারে সম্ভব।

একে একে মজার মজার দাবীগুলোকে খন্ডানোর উদ্দেশ্যেই এই সিরিজটি শুরু করছি। আপাতত, নাজনীন১ ও ফুয়াদের ৫ টি প্রশ্নের প্রথমটি দিয়ে শুরু। এক পোস্টে এক বা একাধিক প্রশ্নের বা দাবীর ব্যাপারে আমার বক্তব্য উপস্থাপন করবো। এবং এই সিরিজটি চলতে চলতে আশা করবো- প্রশ্নের/দাবীর সংখ্যা আরো বাড়বে, আপনাদের প্রতিও আহবান থাকলো- এরকম যত ধরণের উদ্ভট দাবী আছে- সেগুলো এই পোস্টের কমেন্টে হাজির করবেন।

১। কিছু কিছু সূরার প্রথমে বিচ্ছিন্ন কিছু আরবী হরফ দেয়া আছে, যার মর্মার্থ আজ পর্যন্ত কেউ উদ্ধার করতে পারেনি, তখনকার মানুষরা কি এ ব্যাপারে জানতো?
শিশুরা কথা শেখার আগে, পাগলে ... নানাবিধ আওয়াজ করে, এমনকি সাহিত্যেও বিশেষ করে গানে- কবিতায় মাঝে মধ্যে এমন নানাধরণের ধ্বনি-আওয়াজ-বর্ণের ব্যবহার দেখা যায়- যেগুলোর আসলে সরাসরি কোন অর্থও হয় না, অর্থাৎ যার মর্মার্থ কেউ কখনো বের করতে পারে না; আমি যদি অসংলহ্ন দুচারটি অক্ষর পাশাপাশি রেখে আরেকজনকে জিজ্ঞেস করি- এর মর্মার্থ কি- তবে সে কি জবাব দিবে? একইরকম বিভিন্ন সুরার প্রথমে কিছু আরবী হরফের মর্মার্থ কেউ উদ্ধার করতে পারেনি- এটার মাধ্যমে কি প্রমাণ হয়? আসলে এখানে এই প্রশ্ন/দাবীতে পরিষ্কার হয়নি- এই বিচ্ছিন্ন হরফগুলো থাকার মাধ্যমে কোরআন কোনদিক দিয়ে খুব স্পেশাল হয়ে গেলো! ফলে নিজেই একটু ঘাটাঘাটি করার চেষ্টা করলাম।

কোরআনে সুরা বাকারা, হা-মীম, আর রহমান প্রভৃতি মোট ২৯ টি সুরার শুরুতেই আরবী বর্ণমালার ২৮ টি অক্ষর (হরফের) মধ্যে ১৪ টি হরফ (একসাথে দুই- থেকে পাঁচটি) বিভিন্ন কম্বিনেশনে পাওয়া যায়। হরফ ১৪ টি হচ্ছে আলিফ, লাম, মীম, সোয়াদ, রা, ক্বাফ, হা, ইয়া, আইন, তা, সিন, হা, কাফ, নুন। এদেরকে আল মুকাত্তাত বা "বিচ্ছিন্ন হরফ" বলা হয় কারণ এগুলো কোন শব্দ তৈরি করে না- এগুলোকে আলাদা আলাদা করেই উচ্চারণ করতে হয়। মজার বয়াপার হচ্ছে এই যে, বিভিন্ন সুরার শুরুতে ব্যবহৃত বিচ্ছিন্ন অক্ষরগুলোর কোন অর্থ নেই। ধার্মিকেরা একটু ঘুরিয়ে বলেন- এর অর্থ কেউ বের করতে পারে নি।

বিভিন্ন ইসলামিক স্কলার বিভিন্নভাবে এর ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। কেউ কেউ বলেন এই হরফগুলো একেকটি একেক বিশিষ্ট শব্দেরই (যা আল্লাহর বিশিষ্টতা বা বিভিন্ন গুণকে নির্দেশ করে) সংক্ষোপ্ত রূপ। ইবনে কাথিরের তাফসীরে প্রথম দিককার কিছু স্কলারের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, যেমন: "Khasif stated that Mujahid said, "The beginnings of the Surahs, such as Qaf, Sad, Ta Sin Mim and Alif Lam Ra, are just some letters of the alphabet.'' Some linguists also stated that they are letters of the alphabet and that Allah simply did not cite the entire alphabet of twenty-eight letters. For instance, they said, one might say, "My son recites Alif, Ba, Ta, Tha... '' he means the entire alphabet although he stops before mentioning the rest of it. This opinion was mentioned by Ibn Jarir."
শেষ পর্যন্ত সমস্ত ইসলামী স্কলারেরই একই মত, তা হচ্ছে:- এসব হরফগুলোর অর্থ যে কি তা আল্লাহই ভালো জানেন। এছাড়া আরেকটা মত পাওয়া যায়- এই হরফগুলো কোরআন যে আল্লাহরই বাণী- তার প্রমাণ, কেননা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসমস্ত হরফের পরের এক একাধিক আয়াতে কোরআন সংক্রান্ত সেরকম বক্তব্য পাওয়া যায়। আরেকটি আয়াতের কথা উল্লেখিত হয়: We believe in it; all of it (clear and unclear verses) is from our Lord(3:7). অর্থাৎ কোরআনেই তো পরিষ্কার জানিয়ে দেয়া হয়েছে- এর কিছু আয়াত বোধগম্য- আর কিছু বোধগম্য হবে না। তবে, ভণ্ড নবী রাশাদ খলীফা- এগুলোর গুঢ় রহস্য বের করে ফেলেছিল তার ১৯ এর তত্ত্ব অনুসারে, এবং ১৯ তত্ত দিয়ে এই হরফগুলোর অলৌকিকত্ব প্রমাণ করেছিল। আপাতত সে আলোচনায় যাচ্ছি না- কোন ধার্মিক ব্যক্তি যদি ব্যাখ্যা সমেত দাবী করেন যে- এই হরফগুলো অলৌকিকতারই প্রমাণ, তবে নাহয় আরো দু'চারটি কথা বলা যাবে খন।

ইসলামিক স্কলাররা মোটামুটি এরকম ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু এমন ব্যাখ্যা যে খুব বেশী কার্যকরী নয়, তাও তারা ভালোই বুঝতে পারেন। আর তাইতো মুহম্মদ আসাদ বিভিন্ন স্কলারদের ব্যাখ্যা উল্লেখ করার পরে উপসংহারে স্বীকার করতে বাধ্য হন: However, even this very attractive interpretation is not entirely satisfactory inasmuch as there are many surahs which open with an explicit reference to divine revelation and are nevertheless not preceded by any letter-symbol. Secondly, and this is the most weighty objection : the above explanation too is based on no more than conjecture: andso, in the last resort, we must content ourselves with the finding that a solution of this problem still remains beyond our grasp.

সুতরাং, বুঝাই যাচ্ছে- ইসলামিক স্কলারেরাও এই ইস্যুতে কিছুটা কনফিউজড, এবং কোরআন সম্পর্কে অপরিসীম বিশ্বাস থেকে ও নিস:ন্দেহ হওয়ার কারণে বিষয়টাকে এভাবে বলছেন: কোরআনে কিছু রহস্য আল্লাহ রেখে গিয়েছেন- এই হরফগুলো তারই অন্যতম, একমাত্র আল্লাহই জানেন এর আসল অর্থ কি। সুতরাং- এই গোলমেলে হরফগুলো দিয়ে সম্ভবত কোরআনের প্রতি আস্থা আনয়ন করাটা একটু কঠিনই- বরং কোরআনের প্রতি আস্থা আনিয়েই এই হরফগুলো সম্পর্কে একটা শ্রদ্ধা-শ্রদ্ধা, রহস্য-রহস্য, অলৌকিক-অলৌকিক একটা ভাব আনাটা সহজ।

তারপরেও যদি এই হরফগুলো সম্পর্কে আমার মতামত জানতে চান তবে, আমি যা বলতে পারি- তা হচ্ছে:
১। এই হরফগুলো অর্থহীন কিছু ধ্বনি মাত্র।
২। কবিতায় বা গানে মাঝে মধ্যে মাঝে মধ্যে এমন ধ্বনির ব্যবহার আমরা দেখতে পাই। রুরু রুরু রুরু, বা লা-লালালা- লা, ও হা ও হু, হাট্টিমাটিম, তাই-তাই-তাই, কুক কুক কুক .... ইত্যাদি। কোন এক জায়গায় দেখেছিলাম- আরবী সাহিত্যেও এমন ধ্বনির ব্যবহার আছে (এই মুহুর্তে রেফারেন্স দিতে পারছি না)। হতে পারে- কোরআনের এই হরফগুলোও এই উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে।
৩। খুব ভালো সম্ভাবনা- এই হরফগুলো মুহম্মদ সা নিজেও ব্যবহার করেন নি- এগুলো কোরআন সংকলনের সময়ে খলীফাদের আমলে কোরআনে যুক্ত হয়েছে। এই সম্ভাবনার পক্ষে মূল যুক্তি হচ্ছে- এই হরফ সংক্রান্ত মুহম্মদ সা এর কোন কথা নেই- একটা হাদীসও পাওয়া যায় না। যেখানে- আবু বকর রা কে প্রথম জবাব দিতে দেখা যায়- "In every divine writ (kitab) there is [an element of] mystery – and the mystery of the Qur'an is [indicated] in the openings of [some of] the surahs.", সেখানে কোন একজন সাহাবা এই রহস্যের ব্যাপারে মুহম্মদ সা এর কাছে জানতে চাবে না- তা মনে হয় না।
৪। যদি খলীফাদের আমলে কোরআন সংকলনের সময় এই হরফগুলো যুক্ত হয়ে থাকে- স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসে- কেন তারা একাজ করবেন? এর জবাবে এমন সম্ভাবনার কথা বলা যায়- হতে পারে কোরআনকে অধিক কাব্যিক করতে গিয়ে, কোরআনকে আরেকটু অলৌকিক হিসাবে দেখাতে গিয়ে, বিভিন্ন সুরার আয়াত- অক্ষর এসমস্তের হিসাব মিলাতে গিয়ে (গ্যাটিস হিসাবে) এগুলো ঢুকানো হয়েছে; আবার এমনো হতে পারে- লিখিত কোন কোরআনের আয়াত বা শব্দ থেকে এক বা একাধিক অক্ষর কোন কারণে অপাঠযোগ্য বা মুছে গিয়ে বা নষ্ট হয়ে থাকলেও সংকলনের সময়ে হয়তো এইরূপেই গৃহীত হয়েছে।
৫। মানুষ একে অপরের সাথে কমিউনিকেট করে ভাষা দিয়ে। ভাষার সংজ্ঞার মধ্যেই পাবেন যে, এর একটা বড় বিষয় হচ্ছে এর বোধগম্যতা। যেসব ধ্বনির মর্মার্থ মানুষ ধরতে পারে না- সেগুলো ভাষাই না, যে কারণে শিশুদের বিচিত্র আওয়াজগুলোকে ভাষা বলা হয় না- আওয়াজ বলা হয়। সুতরাং- যেসমস্ত হরফ সমষ্টির কোন মর্মার্থ উদ্ধার করা যায় না- সেগুলো আদতে শব্দ বা বাক্য বা ভাষা হয়ে উঠতে পারে না- সেগুলো কেবলই ধ্বনি; এবং কোরআনের ঐ এলোমেলো অক্ষরগুলো তাই কেবল বিচিত্র কিছু ধ্বনি- যার কোন অর্থ নেই।

চলবে ....
পরবর্তী পর্বের শিরোনাম:
যুক্তি-তক্কো-গল্প (পর্ব ২: সৃষ্টি রহস্য)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29056350 http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29056350 2009-12-10 01:26:34
সুরা লাহাব নিয়ে কিছু কথা .. সূরা আললাহাব (১১১) (মক্কায় অবতীর্ন)
১.ধ্বংস হোক! আবু লাহাবের উভয় হাত, আর সেও ধ্বংস হোক। ২. তার ধন-সম্পদ যা সে উপার্জন করেছে তা তার কোন কাজে আসবে না। ৩. তাকে অচিরেই লেলিহান আগুনে ঠেলে দেওয়া হবে। ৪. আর তার স্ত্রীকেও, লাকড়ীর বোঝা বহনকারিনী। (কোন কোন অনুবাদে লেখা ইন্ধন বহনকারিনী ) ৫. তার গলায় থাকবে খেঁজুর গাছের ছালের তৈরি রশি।

তানভীর চৌধুরী পিয়েল এর "একটি সুরা ও কয়েকটি প্রশ্ন" (যা ইতিমধ্যে ডিলিটেড<img src=(" style="border:0;" />) শীর্ষক পোস্ট পড়ে আমার মতে কোরআনের সবচেয়ে বিদ্বেষপূর্ণ সুরাটার কথা মনে পড়ে গেলো। যেসব সুরা আমার মোহ কাটাতে সাহায্য করেছে সেগুলোর মধ্যে এটা অন্যতম। আমি প্রথম যখন অনুবাদটা পড়লাম- (অনেকদিন এটা আরবীতে মুখস্থ ছিল এবং নামাজে বেশ ব্যবহার করতাম)- তখন কোনমতেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না যে , এটা আল্লাহর ভাষা হতে পারে!!! একজন মানুষের উপর খেপলে এমন ভাষা তো মানুষে ব্যবহার করে!!! তাই বলে আল্লাহও ... !!!! তাফসীরে আছে- লাহাব কত খারাপ, ইসলামের কত বড় শত্রু ছিল ইত্যাদি। কিন্তু তারপরেও কোনভাবেই মেনে নিতে পারছিলাম না যে, আল্লাহ এমন খেপতে পারে- তাও তারই তৈরি একজন মানুষের উপর!!! এই সুরা যতবার পড়েছি- ততই মনে হয়েছে, এ-তো মুহম্মদ সা বা ঐ সময়কার মুসলমানদের রাগ-ক্ষোভের বহিপ্রকাশ!!!

ছবিঃ ধ্বংসপ্রাপ্ত (হাত ও স্ত্রী সমেত) লাহাব

যাহোক ঐ পোস্টে তানভীর কয়েকটি প্রশ্ন করেছে। খুবই সংগত ও যৌক্তিক প্রশ্ন। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি এখানে উল্লেখ করছি:

১। এখানে আবু লাহাব নামে একজন ব্যাক্তিকে অভিশাপ দেওয়া হচ্ছে যে মোহাম্মদ স: এর প্রতিপক্ষ। এখন প্রশ্ন আল্লাহ তারই সৃষ্ট একজন মানুষকে অভিশাপ দেবেন কেন? কার্যকর ব্যাবস্থা না নিয়ে অভিশাপ দেওয়াতে কি আল্লাহর দূর্বলতা প্রকাশ পায় না? অভিশাপ তো দেওয়ার কথা মানুষের আল্লাহর কাছে যাতে তিনি বিচার করেন।

২। স্বামীর অপরাধে লাকড়ীর বোঝা বহনকারিনী স্ত্রীকে কেন জান্নামের আগুনে পুড়তে হবে?

ছবিঃ দোযখে লাহাবের স্ত্রী

৩। "তার গলায় থাকবে খেঁজুর গাছের ছালের তৈরি রশি।" - এখানে কি আঞ্চলিকতার প্রভাব দেখা যাচ্ছে না? জান্নামের মধ্যে খেঁজুর গাছের ছালের তৈরি রশি খাকবে কেন? এখানে বিদেশী নাইলনের রশি কিংবা বাংলাদেশে তৈরি উন্নতমানের পাটের রশি কিংবা কাঁটাওয়ালা অন্য কোন রশিও থাকতে পারত। অল্লাহ কি খেঁজুর গাছের ছালের তৈরি রশি ছাড়া অন্য কোন প্রকার রশির কথা জানতেন না।

যথারীতি মোল্লারা এসে ভুলভাল বুঝ দেয়া শুরু করলো। সেগুলোরই জবাব দেয়ার চেস্টা করছি:
১। ঘাতকঃ আল্লাহ কারে অভিশাপ দিবেন না দিবেন সেটা তার ইচ্ছা, মানুষের বুঝার সাধ্য নাই। আর কার্যকর ব্যবস্হা আল্লাহ নিবেন সেই ক্থাই আয়াতগুলাতে বলা হইসে।
রায়হানঃ এখানে শাস্তির কথা লিখা আছে। অভিশাপ কি-না সেটা আপেক্ষিক ব্যাপার। তাছাড়া এই আয়াতে মৃত্যুপরবর্তী জীবনের কথা বলা হয়েছে। ফলে মৃত্যুপরবর্তী জীবনে বিশ্বাস না করলে বলার কিছু নাই।
অন্যরকম : কার্যকর ব্যবস্থাও নেওয়া হইছে। ইতিহাস ভাল কইরা পইড়া আইসেন।
============>>>>>
না.ধঃ
তিনজনে তিন ব্যাখ্যা হাজির করলেন! (যেইটা লাগে আর কি...)
শাস্তির কথা ভাই- আরো অনেক জায়গাতেই আছে- অবিশ্বাসীদের নরক অভিজ্ঞতার কথা, দারুন দারুন সব ভয়ের কথা কোরআনে মেলাই লেখা হয়েছে। কিন্তু এমন ধ্বংস কামনা, হাতের ধ্বংস কামনা, একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে এমন জীঘাংসা - এটা আসলেই ইউনিক!

আল্লাহর সবচেয়ে রাগ থাকলে তো থাকবে ইবলিশ শয়তানকে কেন্দ্র করে, অথচ দেখেন- ইবলিশকে কেন্দ্র করে আয়াতগুলোও এইরকম বিদ্বেষপূর্ণ কি না!

আপনি নিজেও একটু চিন্তা করে দেখুন তো- কোন মিথিক্যল একটা দুষ্ট ক্যারেক্টর আর আপনার চরম শত্রু একজন বাস্তবের মানুষ- এই দুজনের বিরুদ্ধে বাক্যবাণ করতে দিলে আপনার কার বিরুদ্ধে আক্রোশপূর্ণ বাক্য বেশী বর্ষিত হবে?

২। ঘাতকঃ আবু লাহাবের ন্যায় তার স্ত্রীও রসূলের প্রতি বিদ্বেষ ভাবাপন্ন ছিল। সে রসুলুল্লাহর পথে খেঁজুর কাঁটা বিছিয়ে রাখত।
রায়হানঃ অন্যায়কারী আর অন্যায়ের সাহায্যকারী একই দোষে দুষ্ট।
অন্যরকম : স্ত্রীও অপরাধী ছিল।
============>>>>>
না.ধঃ
লাহাবের স্ত্রী যে কাজ করতো তার চেয়ে আরো যন্ত্রণা আরো অনেকেই দিয়েছে- তাদের নিয়ে তো এমন কোন ঘৃণা ছড়ানো হয় নি। খেজুরের কাঁটা নিয়ে এক বুড়ির গল্পের কথাও আমরা জানি! যারা নবীরে পাথর নিক্ষেপ করে দাঁত পর্যন্ত ভেঙ্গে দিলো (শহীদ!!) তাদের নিয়েও এমন একটা বাক্য নেই- অথচ লাহাবের স্ত্রী এতই বেশী ঘৃণিত হয়ে গেল!!!

আরে, এটা কেন বুঝতে পারছেন না- স্ত্রীর কথাটাও এসেছে লাহাবের উপর রাগ ঝাড়ার জায়গা থেকে। এই ধনী কোরাইশ নেতা নবীরে যে পরিমাণ বাঁধা দিয়েছেন- সেটা সহ্য হয়নি। নবী প্রথম যখন মক্কায় কোরাইশদের ডেকে তাদের ধর্ম ত্যাগ করতে বলেন ও আল্লাহর আহবান জানান তখন সর্বপ্রথম এই লাহাবই আপত্তি জানায়। লাহাব মক্কার পৌত্তলিকদের নিজ নিজ ধর্ম রক্ষার্থে সংগঠিত করে- অর্থ সম্পদও ব্যয় করে। ফলে রাগের জায়গাটা অনেকটা রাজনৈতিকও বটে। কিন্তু লাহাবের স্ত্রীর স্বতন্ত্র কি ভূমিকা ছিল- সে সময়ে কতটুকুই বা একজন নারী ভূমিকা রাখতে পারতো? (আপনাদের দাবি মোতাবেক এটাতো আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগে অসম্ভব)। সুরার নামটাও দেখেন- লাহাবের নামে। লাহাবই মূল- স্ত্রী কোন ব্যাপারই না- স্ত্রীর কথা এখানে এসেছে- লাহাবের প্রতি রাগ ঝাড়ার অংশ হিসাবে।

৩। ঘাতকঃ "খেঁজুর গাছের ছালের তৈরি রশি" প্রতীকি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আল্লাহ সমসাময়িক মানুষদের কোনো বার্তা দিতে চাইলে তাদের সীমিত গন্ডি থেকে উদাহরণ টেনেই দেবেন, সেটাই স্বাভাবিক
রায়হানঃ জান্নামের মধ্যে খেঁজুর গাছের ছালের তৈরি রশি থাকলে সমস্যা কোথায়! বিদেশী নাইলনের রশি বললে তখন কেউ বুঝত না, যেহেতু তখন 'বিদেশী নাইলনের রশি' বলে কিছু ছিল না
অন্যরকমঃ আরবীয়দের বুঝানোর জন্য উপমা হয়তে পারে। অবশ্য মরুভূমির খেজুর গাছের ছাল দেখলে কারও প্রশ্ন আসার কথা নয় কেন এইটাকে উপমা হিসেবে ব্যবহার করছে। সুযোগ পাইলে একবার মরুভূমির খেজুর গাছ দেইখা নিয়েন।
============>>>>>
না.ধঃ
এইটা হইছে- সবচেয়ে সার্কাস টাইপের জবাব।
নরকটা কি হিসাবে তৈরি করা হয়েছে? যেসময় এই ধর্মটা অবতীর্ণ করা হবে সেই সময়ের মানুষের বোধগম্য উপাদান দিয়েই কি কেবল নরক তৈরি হয়েছে? মানুষের বোধগম্যতার উপর নির্ভর করে আল্লাহ শাস্তির কথা ভেবেছেন?

ভাই- মাথাটা একটু খুলেন। মানুষের অবস্থান-কাল-পাত্র ভেদে জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা থাকে, সেটা তো আল্লাহর থাকার কথা নয়! আজকে যদি ইসলামের উৎপত্তি হতো, তবে নিশ্চিতভাবেই- দোযখে আগুন-পুঁজ-সাপটাপের বদলে গ্যাস চেম্বার, ইলেকট্রিক শক, সায়ানাইডের বিষক্রিয়া এইসব থাকতো। আপনি এটারে হয়তো বলতেন যে, আজকের মানুষের বোধগম্য শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে, কিন্তু যতই এটা বলেন না কেন- আল্লাহ কি দোযখ নির্মানের সময় বা মানুষের শাস্তির উপায় উদ্ভাবনের সময় মানুষের কোন একটা কালে বোধগম্যতার উপর নির্ভর করতে পারেন? এরচেয়ে এটাই হওয়ার সম্ভাবনা বেশী নয় যে- মানুষ তার বোধগম্যতার সীমা থেকে কল্পনাগুলোকে সাজায়?

(ফেসবুক এ প্রকাশিত এবং মুক্তমনায় প্রকাশিতব্য)

পরিশেষেঃ তানভীর চৌধুরী পিয়েল এর পোস্টখানি ডিলিটের তীব্র প্রতিবাদ জানাই এবং ঐ পোস্ট ফিরিয়ে দেয়ার দাবি জানাই।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29055270 http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29055270 2009-12-08 03:58:07
সুরা লাহাব নিয়ে কিছু কথা .. সূরা আললাহাব (১১১) (মক্কায় অবতীর্ন)
১.ধ্বংস হোক! আবু লাহাবের উভয় হাত, আর সেও ধ্বংস হোক। ২. তার ধন-সম্পদ যা সে উপার্জন করেছে তা তার কোন কাজে আসবে না। ৩. তাকে অচিরেই লেলিহান আগুনে ঠেলে দেওয়া হবে। ৪. আর তার স্ত্রীকেও, লাকড়ীর বোঝা বহনকারিনী। (কোন কোন অনুবাদে লেখা ইন্ধন বহনকারিনী ) ৫. তার গলায় থাকবে খেঁজুর গাছের ছালের তৈরি রশি।

তানভীর চৌধুরী পিয়েল এর "একটি সুরা ও কয়েকটি প্রশ্ন" (যা ইতিমধ্যে ডিলিটেড<img src=(" style="border:0;" />) শীর্ষক পোস্ট পড়ে কোরআনের আমার মতে সবচেয়ে বিদ্বেষপূর্ণ সুরাটার কথা মনে পড়ে গেলো। যেসব সুরা আমার মোহ কাটাতে সাহায্য করেছে সেগুলোর মধ্যে এটা অন্যতম। আমি যখন অনুবাদটা পড়লাম- (অনেকদিন এটা আরবীতে মুখস্থ ছিল এবং নামাজে বেশ ব্যবহার করতাম)- তখন কোনমতেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না যে , এটা আল্লাহর ভাষা হতে পারে!!! একজন মানুষের উপর খেপলে এমন ভাষা তো মানুষে ব্যবহার করে!!! তাই বলে আল্লাহও ... !!!! তাফসীরে আছে- লাহাব কত খারাপ, ইসলামের কত বড় শত্রু ছিল ইত্যাদি। কিন্তু তারপরেও কোনভাবেই মেনে নিতে পারছিলাম না যে, আল্লাহ এমন খেপতে পারে- তাও তারি তৈরি একজন মানুষের উপর!!! এই সুরা যতবার পড়েছি- ততই মনে হয়েছে, এ-তো মুহম্মদ সা বা ঐ সময়কার মুসলমানদের রাগ-ক্ষোভের বহিপ্রকাশ!!!

ছবিঃ ধ্বংসপ্রাপ্ত (হাত ও স্ত্রী সমেত) লাহাব

যাহোক ঐ পোস্টে তানভীর কয়েকটি প্রশ্ন করেছে। খুবই সংগত ও যৌক্তিক প্রশ্ন। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি এখানে উল্লেখ করছি:

১। এখানে আবু লাহাব নামে একজন ব্যাক্তিকে অভিশাপ দেওয়া হচ্ছে যে মোহাম্মদ স: এর প্রতিপক্ষ। এখন প্রশ্ন আল্লাহ তারই সৃষ্ট একজন মানুষকে অভিশাপ দেবেন কেন? কার্যকর ব্যাবস্থা না নিয়ে অভিশাপ দেওয়াতে কি আল্লাহর দূর্বলতা প্রকাশ পায় না? অভিশাপ তো দেওয়ার কথা মানুষের আল্লাহর কাছে যাতে তিনি বিচার করেন।

২। স্বামীর অপরাধে লাকড়ীর বোঝা বহনকারিনী স্ত্রীকে কেন জান্নামের আগুনে পুড়তে হবে?

ছবিঃ দোযখে লাহাবের স্ত্রী

৩। "তার গলায় থাকবে খেঁজুর গাছের ছালের তৈরি রশি।" - এখানে কি আঞ্চলিকতার প্রভাব দেখা যাচ্ছে না? জান্নামের মধ্যে খেঁজুর গাছের ছালের তৈরি রশি খাকবে কেন? এখানে বিদেশী নাইলনের রশি কিংবা বাংলাদেশে তৈরি উন্নতমানের পাটের রশি কিংবা কাঁটাওয়ালা অন্য কোন রশিও থাকতে পারত। অল্লাহ কি খেঁজুর গাছের ছালের তৈরি রশি ছাড়া অন্য কোন প্রকার রশির কথা জানতেন না।

যথারীতি মোল্লারা এসে ভুলভাল বুঝ দেয়া শুরু করলো। সেগুলোরই জবাব দেয়ার চেস্টা করছি:
১। ঘাতকঃ আল্লাহ কারে অভিশাপ দিবেন না দিবেন সেটা তার ইচ্ছা, মানুষের বুঝার সাধ্য নাই। আর কার্যকর ব্যবস্হা আল্লাহ নিবেন সেই ক্থাই আয়াতগুলাতে বলা হইসে।
রায়হানঃ এখানে শাস্তির কথা লিখা আছে। অভিশাপ কি-না সেটা আপেক্ষিক ব্যাপার। তাছাড়া এই আয়াতে মৃত্যুপরবর্তী জীবনের কথা বলা হয়েছে। ফলে মৃত্যুপরবর্তী জীবনে বিশ্বাস না করলে বলার কিছু নাই।
অন্যরকম : কার্যকর ব্যবস্থাও নেওয়া হইছে। ইতিহাস ভাল কইরা পইড়া আইসেন।
============>>>>>
না.ধঃ
তিনজনে তিন ব্যাখ্যা হাজির করলেন! (যেইটা লাগে আর কি...)
শাস্তির কথা ভাই- আরো অনেক জায়গাতেই আছে- অবিশ্বাসীদের নরক অভিজ্ঞতার কথা, দারুন দারুন সব ভয়ের কথা কোরআনে মেলাই লেখা হয়েছে। কিন্তু এমন ধ্বংস কামনা, হাতের ধ্বংস কামনা, একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে এমন জীঘাংসা - এটা আসলেই ইউনিক!

আল্লাহর সবচেয়ে রাগ থাকলে তো থাকবে ইবলিশ শয়তানকে কেন্দ্র করে, অথচ দেখেন- ইবলিশকে কেন্দ্র করে আয়াতগুলোও এইরকম বিদ্বেষপূর্ণ কি না!

আপনি নিজেও একটু চিন্তা করে দেখুন তো- কোন মিথিক্যল একটা দুষ্ট ক্যারেক্টর আর আপনার চরম শত্রু একজন বাস্তবের মানুষ- এই দুজনের বিরুদ্ধে বাক্যবাণ করতে দিলে আপনার কার বিরুদ্ধে আক্রোশপূর্ণ বাক্য বেশী বর্ষিত হবে?

২। ঘাতকঃ আবু লাহাবের ন্যায় তার স্ত্রীও রসূলের প্রতি বিদ্বেষ ভাবাপন্ন ছিল। সে রসুলুল্লাহর পথে খেঁজুর কাঁটা বিছিয়ে রাখত।
রায়হানঃ অন্যায়কারী আর অন্যায়ের সাহায্যকারী একই দোষে দুষ্ট।
অন্যরকম : স্ত্রীও অপরাধী ছিল।
============>>>>>
না.ধঃ
লাহাবের স্ত্রী যে কাজ করতো তার চেয়ে আরো যন্ত্রণা আরো অনেকেই দিয়েছে- তাদের নিয়ে তো এমন কোন ঘৃণা ছড়ানো হয় নি। খেজুরের কাঁটা নিয়ে এক বুড়ির গল্পের কথাও আমরা জানি! যারা নবীরে পাথর নিক্ষেপ করে দাঁত পর্যন্ত ভেঙ্গে দিলো (শহীদ!!) তাদের নিয়েও এমন একটা বাক্য নেই- অথচ লাহাবের স্ত্রী এতই বেশী ঘৃণিত হয়ে গেল!!!

আরে, এটা কেন বুঝতে পারছেন না- স্ত্রীর কথাটাও এসেছে লাহাবের উপর রাগ ঝাড়ার জায়গা থেকে। এই ধনী কোরাইশ নেতা নবীরে যে পরিমাণ বাঁধা দিয়েছেন- সেটা সহ্য হয়নি। নবী প্রথম যখন মক্কায় কোরাইশদের ডেকে তাদের ধর্ম ত্যাগ করতে বলেন ও আল্লাহর আহবান জানান তখন সর্বপ্রথম এই লাহাবই আপত্তি জানায়। লাহাব মক্কার পৌত্তলিকদের নিজ নিজ ধর্ম রক্ষার্থে সংগঠিত করে- অর্থ সম্পদও ব্যয় করে। ফলে রাগের জায়গাটা অনেকটা রাজনৈতিকও বটে। কিন্তু লাহাবের স্ত্রীর স্বতন্ত্র কি ভূমিকা ছিল- সে সময়ে কতটুকুই বা একজন নারী ভূমিকা রাখতে পারতো? (আপনাদের দাবি মোতাবেক এটাতো আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগে অসম্ভব)। সুরার নামটাও দেখেন- লাহাবের নামে। লাহাবই মূল- স্ত্রী কোন ব্যাপারই না- স্ত্রীর কথা এখানে এসেছে- লাহাবের প্রতি রাগ ঝাড়ার অংশ হিসাবে।

৩। ঘাতকঃ "খেঁজুর গাছের ছালের তৈরি রশি" প্রতীকি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আল্লাহ সমসাময়িক মানুষদের কোনো বার্তা দিতে চাইলে তাদের সীমিত গন্ডি থেকে উদাহরণ টেনেই দেবেন, সেটাই স্বাভাবিক
রায়হানঃ জান্নামের মধ্যে খেঁজুর গাছের ছালের তৈরি রশি থাকলে সমস্যা কোথায়! বিদেশী নাইলনের রশি বললে তখন কেউ বুঝত না, যেহেতু তখন 'বিদেশী নাইলনের রশি' বলে কিছু ছিল না
অন্যরকমঃ আরবীয়দের বুঝানোর জন্য উপমা হয়তে পারে। অবশ্য মরুভূমির খেজুর গাছের ছাল দেখলে কারও প্রশ্ন আসার কথা নয় কেন এইটাকে উপমা হিসেবে ব্যবহার করছে। সুযোগ পাইলে একবার মরুভূমির খেজুর গাছ দেইখা নিয়েন।
============>>>>>
না.ধঃ
এইটা হইছে- সবচেয়ে সার্কাস টাইপের জবাব।
নরকটা কি হিসাবে তৈরি করা হয়েছে? যেসময় এই ধর্মটা অবতীর্ণ করা হবে সেই সময়ের মানুষের বোধগম্য উপাদান দিয়েই কি কেবল নরক তৈরি হয়েছে? মানুষের বোধগম্যতার উপর নির্ভর করে আল্লাহ শাস্তির কথা ভেবেছেন?

ভাই- মাথাটা একটু খুলেন। মানুষের অবস্থান-কাল-পাত্র ভেদে জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা থাকে, সেটা তো আল্লাহর থাকার কথা নয়! আজকে যদি ইসলামের উৎপত্তি হতো, তবে নিশ্চিতভাবেই- দোযখে আগুন-পুঁজ-সাপটাপের বদলে গ্যাস চেম্বার, ইলেকট্রিক শক, সায়ানাইডের বিষক্রিয়া এইসব থাকতো। আপনি এটারে হয়তো বলতেন যে, আজকের মানুষের বোধগম্য শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে, কিন্তু যতই এটা বলেন না কেন- আল্লাহ কি দোযখ নির্মানের সময় বা মানুষের শাস্তির উপায় উদ্ভাবনের সময় মানুষের কোন একটা কালে বোধগম্যতার উপর নির্ভর করতে পারেন? এরচেয়ে এটাই হওয়ার সম্ভাবনা বেশী নয় যে- মানুষ তার বোধগম্যতার সীমা থেকে কল্পনাগুলোকে সাজায়?
(ফেসবুক এ প্রকাশিত এবং মুক্তমনায় প্রকাশিতব্য)
পরিশেষেঃ তানভীর চৌধুরী পিয়েল এর পোস্টখানি ডিলিটের তীব্র প্রতিবাদ জানাই এবং ঐ পোস্ট ফিরিয়ে দেয়ার দাবি জানাই।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29054920 http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29054920 2009-12-07 14:47:50
আধুনিক এটমিক তত্ত্বের জনক জন ডাল্টন, না কি স্বয়ং আল্লাহ? এক
কোরআনকে বিজ্ঞানময় করার আপ্রাণ চেস্টা মোল্লারা অব্যাহত রেখেছে। ফলে নানারকম দাবির কথাও কানে আসে। সেদিন সেরকমই এক মজার দাবির কথা চোখে পড়লো। কোরআনেই নাকি সেই ১৪০০ বছর আগেই পরমাণুর কথা বলা আছে!! কি সেই দাবি? আল কোরআনের ৩৪ নং সুরার ৩ নং আয়াতে নাকি আল্লাহ পরিস্কারভাবে পরমাণুর কথা উল্লেখ করে জানিয়েছেন যে- কোন কিছুই আল্লাহর অজ্ঞাত নয়।

তাহলে প্রথমে সুরা সাবা'র ৩ নং আয়াতটি দেখা যাক। ইউসুফ আলি, পিকথাল ও শাকির তিনজনের অনুবাদেই দেখা যায় "atom" শব্দটি বিদ্যমান:
034.003 YUSUFALI: The Unbelievers say, "Never to us will come the Hour": Say, "Nay! but most surely, by my Lord, it will come upon you;- by Him Who knows the unseen,- from Whom is not hidden the least little atom in the heavens or on earth: Nor is there anything less than that, or greater, but is in the Record Perspicuous:
PICKTHAL: Those who disbelieve say: The Hour will never come unto us. Say: Nay, by my Lord, but it is coming unto you surely. (He is) the Knower of the Unseen. Not an atom's weight, or less than that or greater, escapeth Him in the heavens or in the earth, but it is in a clear Record,
SHAKIR: And those who disbelieve say: The hour shall not come upon us. Say: Yea! by my Lord, the Knower of the unseen, it shall certainly come upon you; not the weight of an atom becomes absent from Him, in the heavens or in the earth, and neither less than that nor greater, but (all) is in a clear book.

অবাক হয়ে যাই। স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে যে, কোরআনেই তো পরমাণুর কথা উল্লেখ আছে। একদম তাজ্জব ব্যাপার। আরবী কোন শব্দের অনুবাদ atom করা হয়েছে- তা জানার আগ্রবোধ করি। পুরা আয়াতটি হচ্ছে:

وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُواْ لاَ تَأْتِينَا السَّاعَةُ قُلْ بَلَى وَرَبِّى لَتَأْتِيَنَّكُمْ عَـلِمِ الْغَيْبِ لاَ يَعْزُبُ عَنْهُ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ فِى السَّمَـوَتِ وَلاَ فِى الاٌّرْضِ وَلاَ أَصْغَرُ مِن ذَلِكَ وَلاَ أَكْبَرُ إِلاَّ فِى كِتَـبٍ مُّبِينٍ

এখানে مِثْقَالُ ذَرَّةٍ এর অনুবাদ ধরা হয়েছে পরমাণু পরিমাণে। এই শব্দটি নিয়ে ঘাটাঘাটির আগে ভাবলাম আরো কিছু কোরআনের দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক। হাতের কাছে ডঃ মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান কর্তৃক অনুদিত কোরআন শরীফ ছিল- সেটাই হাতে নিলাম। সেখানে কোন পরমাণু অবশ্য পেলাম না। অনুবাদটি অনেকটা এরকম:
"কাফিররা বলেঃ আমাদের উপর কিয়ামত আসবে না। আপনি বলে দিন, কেন আসবে না? কসম আমার রবের! অবশ্যই তা তোমাদের উপর আসবে। তিনি অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা। আসমানে ও যমীনে রেণু পরিমাণ বস্তুও তাঁর অগোচরে নয়, কিংবা তদপেক্ষা ক্ষুদ্রও নেই এবং বৃহৎও নেই, কিন্তু এ সবই সুস্পষ্ট কিতাবে আছে।"

এখানে তো مِثْقَالُ ذَرَّةٍ এর অর্থ করা হয়েছে রেণু পরিমাণ। কি মুশকিল? একেক জায়গায় একেক রকম অনুবাদ! ফলে নিরূপায় হয়ে ইবনে কাথিরের শরণাপন্ন হলাম:
Those who disbelieve say: "The Hour will not come to us.'' Say: "Yes, by my Lord, the All-Knower of the Unseen, it will come to you; not even the weight of a speck of dust or less than that or greater escapes His knowledge in the heavens or in the earth but it is in a Clear Book.''

ইবনে কাথিরও তো দেখি এটম ব্যবহার করেননি- করেছেন "বালিকণার সমান ওজনের"। এবারে কি করা যায়? খুঁজতে গিয়ে দেখি এই مِثْقَالُ ذَرَّةٍ শব্দটি কোরআণের সুরা যিলযাল (৯৯ নং) এর ৭ ও ৮ নং আয়াতেও আছে:
فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ
৭. অতঃপর কেউ অনু পরিমান সৎকর্ম করলে তা দেখতে পাবে ।
وَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ
৮. এবং কেউ অনু পরিমান অসৎকর্ম করলে তাও দেখতে পাবে ।

বাংলা অনুবাদে তো দেখি পরমাণুর বদলে এবার অণু! হায় হায়! তাহলে কি হুজুরেরা এবার দাবি জানাবে কোরআনে কেবল "পরমাণু" নয় "অণু"র কথাও আল্লাহ পাক সেই ১৪০০ বছর আগে জানিয়েছেন? কি মসিবতে পড়লাম! তাড়াতাড়ি করে আবার ইউসুফ আলি, পিকথাল ও শাকিরের অনুবাদ দেখি:
099.007 YUSUFALI: Then shall anyone who has done an atom's weight of good, see it!
PICKTHAL: And whoso doeth good an atom's weight will see it then,
SHAKIR: So. he who has done an atom's weight of good shall see it

099.008 YUSUFALI: And anyone who has done an atom's weight of evil, shall see it.
PICKTHAL: And whoso doeth ill an atom's weight will see it then.
SHAKIR: And he who has done an atom's weight of evil shall see it.

এবং দেখি- ইবনে কাথিরের তাফসিরে কি আছে:
7. So, whosoever does good equal to the weight of a speck of dust shall see it.
8. And whosoever does evil equal to the weight of a speck of dust shall see it.

ভালো মুশকিলেই পড়া গেল! অণু পরিমাণ, পরমাণু বা এটমের ওজনের সমান, রেণু পরিমাণ, ধুলিকণার সমান- কোনটা ঠিক? নাকি সবই? সবগুলো আয়াত ভালো করে পড়ার চেস্টা করলাম। পড়ে মনে হলো- সব অনুবাদই সঠিক। সবগুলোকে সঠিক অবশ্য কেবল তখনই বলা যাবে যখন مِثْقَالُ ذَرَّةٍ শব্দটিকে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বা সামান্য পরিমাণে এরকম অর্থে ধরা হবে। অর্থাৎ আয়াতসমূহে উল্লেখিত 'পরমাণু' বা 'অণু' পরিমাণ মানে পদার্থের গঠন উপাদান "অণু" বা "পরমাণু" নয়- বা 'ধুলি কণা সম' মানে রাস্তাঘাটের ধুলাবালিও নয়- এটা মানে একদম ক্ষুদ্র পরিমাণ। এভাবে ধরলে কোন সমস্যাই থাকে না। তাই ভাবলাম- দেখি অভিধানে مِثْقَالُ ذَرَّةٍ শব্দটির কি অর্থ করা হয়েছে? হাতের কাছে ছিল ড. মুহাম্মদ ফজলুর রহমান এর "আধুনিক আরবী-বাংলা অভিধান" বইটা, সেখানে দেখলাম مِثْقَالُ শব্দের অর্থ করা হয়েছে: পরিমাণ বা ওজন, বাটখারা, সামান্য পরিমাণ, বিন্দুমাত্র, রত্তি। আর, ذَرَّة এর অর্থ করা হয়েছে- বিন্দু (ডট), অতি ক্ষুদ্র, শস্যদানা, ক্ষুদ্র কণিকা, বালি কণা। এবং এই ذَرَّة শব্দের অর্থ কখনো কখনো পরমাণুও করা হয়েছে বটে!

তারপরেও বলববো- সুরা সাবা আর সুরা যিলযাল এ مِثْقَالُ ذَرَّة এর ব্যবহারই বলে দেয় ব্যবহৃত অণু-পরমাণু কোনমতেই পদার্থের মৌলিক কণিকারূপী অণু-পরমাণু নয়।

দুই
তদুপরি তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই যে- সুরা সাবা'র ৩ নং আয়াতে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরমাণুর কথাই বলা হয়েছে, তাহলেও কিছু কথা থেকে যায়:

১। আজকে আমরা জানি যে- পরমাণুও ক্ষুদ্রতম কণা নয়, একেও ভাঙ্গা যায়। আমি ভাবছি- একসময় مِثْقَالُ ذَرَّة কে "সামান্য পরিমাণে" বা "বিন্দুমাত্র" হিসাবে ধরা হতো, তারপরে ইবনে কাথির এর অর্থ করেছেন "ধুলি কণা সম", তারপরে এসে করা হলো "অণু পরিমাণে" বা "পরমাণুর পরিমাণে"- এই ধারাবাহিকতায় তো অচিরেই কোরআনের কোন এক অনুবাদে দেখবো مِثْقَالُ ذَرَّة এর অর্থ করা হবে "ইলেকট্রন" বা "প্রোটন" বা ফোটন- পজিট্রন-এন্টি নিউট্রিনো .. ইত্যাদি।

২। খৃস্টের জন্মেরও কয়েকশো বছর আগে ভারতীয় ও গ্রীক দর্শনে এটম এর আবির্ভাব। গ্রীক দার্শনিক Leucippus, তার ছাত্র Democritus জানান - বস্তুজগৎ মাত্রই ক্ষুদ্রতম কণিকার সমন্বয়ে গঠিত এবং সবচেয়ে ক্ষুদ্র কণিকার নাম এটম বা পরমাণু বা অবিভাজ্য কণিকা। আমাদের ভারতীয় দর্শনেও জৈন, ন্যায় ও বৈশেষিকরাও অনুরূপ অবিভাজ্য ক্ষুদ্রতম কণিকার কথা বলেছিল (ন্যায় ও বৈশেষিকেরা যাকে পরমব্রহ্মা হিসাবে অভিহিত করেছিলেন)। আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে কেউ একথা বললে যতখানি অবাক হই- তারচেয়েও কি আজ থেকে ২৫০০ বছর আগে বললে বেশী অবাক হওয়া উচিৎ নয়?

৩। ডালটনের এটমিক থিউরির ৫ টি অনুসিদ্ধান্তের একটির সাথে সরাসরি মিলে গেলেও Leucippus, Democritus বা জৈন-ন্যায় ও বৈশেষিক দার্শনিকদের এটম আর ডালটনের এটমের মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য। ফলে- আজকের পরমাণু আর প্রাচীণ গ্রীক বা ভারতীয় দর্শনের পরমাণু মোটেও একই নয়। দেকার্ত প্রথম মোলিকিউল শব্দটি ব্যবহার করলেও এটাও আজকের অণু থেকে যোজন যোজন দুরতম বিষয়। আর, কোরআনের পরমাণু তো- আজকের পরমাণুর সাথে দূরের কথা- গ্রীক-ভারতীয় দর্শনের পরমাণুর সাথে তুলনীয় হওয়ার যোগ্যতা রাখে না।

তিন
ধর্মগ্রন্থে বিজ্ঞান খোঁজাটা আজ যেন বাতিকে পরিণত হয়েছে। আগেও একটা পোস্টে (ধর্মে বিজ্ঞানঃ নিম গাছে আমের সন্ধান) এবিষয়ে আলোচনা করেছিলাম। দেখছি- এ আলোচনা শেষ হবার নয়- কেননা মোল্লারা নিত্য নতুন আবিষ্কার করছে। সামনে হয়তো এরকম পোস্ট আরো লিখতে হবে। তবে, এ মুহুর্তে অতীতে এরকম কাজ আরেক ব্যক্তি করেছিলেন- তার কথা স্মরণ করেই আজকের এই পোস্টে শেষ করবো।

প্রথিতযশা বাঙালি বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা (অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের জনক হিসাবে বিবেচিত) একবার এক উকিলের সাথে কথা বলছিলেন, উকিল সাহেব মেঘনাদ সাহার গবেষণার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি নক্ষত্রের উপাদান ও নানা বিষয়ে বুঝাতে বসলেন। এক পর্যায়ে সেই উকিল সাহেব বলেই ফেললেন, " এ আর নতুন কি- এসবই তো বেদে আছে"। সাহা আপত্তি জানিয়ে বলেন, "অনুগ্রহ করে বলবেন কি- বেদের কোন জায়গাটিতে নক্ষত্রের আয়নীভবনের তথ্যটি আছে?" ভদ্রলোক অবলীলায় জবাব দেন, "আসলে আমার বেদ পড়া হয়নি, তবে আমার বিশ্বাস বেদে সমস্তই আছে"। এ ঘটনার পরে মেঘনাদ সাহা ২০ বছর ধরে বেদ, উপনিষদ, হিন্দু জ্যোতিষ আদ্যোপান্ত পড়ে ফেলেন। তারপরে লিখেন তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ "সবই ব্যাদে আছে"

এতে তিনি লিখেন: " ..... বিগত কুড়ি বৎসরে বেদ, উপনিষদ, পুরাণ ইত্যাদি সমস্ত হিন্দুশাস্ত্রগ্রন্থ এবং হিন্দু জ্যোতিষ ও অপরাপর বিজ্ঞান সম্বন্ধীয় প্রাচীণ গ্রন্থাদি তন্ন তন্ন করিয়া খুঁজিয়া আমি কোথাও আবিষ্কার করিতে সক্ষম হই নাই যে, এই সমস্ত প্রাচীণ গ্রন্থে বর্তমান বিজ্ঞানের মূলতত্ত্ব নিহিত আছে। ....." " ... বর্তমান লেখক বৈজ্ঞানিক নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে হিন্দুর বেদ ও অপরাপর ধর্মের মূলতত্ত্ব বুঝিতে চেস্টা করিয়াছেন। ইহাতে অবজ্ঞা বা অবহেলার কথা উঠিতে পারে না। তাঁহার বিশ্বাস যে, প্রাচীণ ধর্মগ্রন্থসমূহ যে সমস্ত জাগতিক তথ্য, ঐতিহাসিক জ্ঞান ও মানবচরিত্রের অভিজ্ঞতার উপর প্রতিষ্ঠিত , তাহাদের উপর বর্তমান যুগের উপযোগী জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠিত হইতে পারে না। ...."
মেঘনাদ সাহা প্রাচীণ ভারতীয় জ্যোতিষ (যাকে হিন্দু জ্যোতিষ আখ্যা দিয়ে ধর্মের শ্রেষ্টত্ব খুঁজে পায় একদল পুরোহিত শ্রেণীর লোকেরা) নিয়েও কথা বলেছেন: " ... এদেশে অনেকে মনে করেন, ভাস্করাচার্য একাদশ শতাব্দীতে অতি অস্পষ্টভাবে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন, সুতরাং তিনি নিউটনের সমতুল্য। অর্থাৎ নিউটন আর নতুন কি করিয়াছে? কিন্তু এ সমস্ত 'অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করী' শ্রেণীর তার্কিকগণ ভুলিয়া যান যে, ভাস্কারাচার্য কোথাও পৃথিবী ও অপরাপর গ্রহ সূর্যের চতুর্দিকে বৃত্তাভাস পথে ভ্রমণ করিতেছে একথা বলেন না। তিনি কোথাও প্রমাণ করেন নাই যে, মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ও গতিবিদ্যার নিয়ম প্রয়োগ করিলে পৃথিবীর ও অপরাপর গ্রহের ভ্রমণ কক্ষ নিরূপন করা যায়। সুতরাং, ভাস্করাচার্য বা কোনো হিন্দু, গ্রিক বা আরবীয় পণ্ডিত কেপলার-গ্যালিলিও বা নিউটনের বহুপূর্বেই মাধ্যাকর্ষণতত্ত্ব আবিষ্কার করিয়াছেন, এরূপ উক্তি করা পাগলের প্রলাপ বই কিছুই নয়। ...."

চার
আজকের বিজ্ঞান দ্বারা প্রতিষ্ঠিত কোন আবিষ্কার বা কোন জ্ঞানের কাছাকাছি কিছূ বা অংশত কিছু সরাসরি বা ঘুরিয়ে পেচিয়ে যদি কোন ধর্মগ্রন্থে মিলেও যায়- তারপরেও তাকে আজকের বিজ্ঞানের সাথে মেলানো যাবে না, কারণ বিজ্ঞান হতে গেলে একটা সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি লাগে। কেন ধর্মগ্রন্থের ঐ সব মিলকে বিজ্ঞান বলা যাবে না- তা আশা করি মেঘনাদ সাহা'র উপরের আলোচনা থেকেই পরিষ্কার হয়েছে!

আর, এত কিছুর পরেও যদি পরিষ্কার না হয়- আমার আর কিছুই করার নেই। চোখের ঠুলি যদি কেউ সরাতে না চায় - অন্যের কি সাধ্য?
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29054651 http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29054651 2009-12-06 23:20:14
ঈদ? নাকি পশুহত্যার উৎসব? দুনিয়ার যত আজে বাজে কথা বইলা তাদের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হাজির করে- কিন্তু এই প্রসঙ্গটা সযত্নে এড়াইয়া যায়। শুরু করে ভেজিটেরিয়ানদের নিয়া। "পশুহত্যা মহাপাপ" এইটার জবাব দেন মনের মাধুরি মিশাইয়া। জ্ঞানীর মত সকলকে জানিয়ে দেন- পশুহত্যা মহাপাপ- কিন্তু "গাছেরও তো প্রাণ আছে"। যেনবা আমরা কেউ এই তথ্যটি জানতাম না! চলে মানুষ ও বিভিন্ন পশু পাখির দাঁতের গঠনের পার্থক্যের সচিত্র প্রতিবেদন, যা দেইখ্যা এক নিমিষেই বুঝা যাইবো- আল্লাহ মানুষরে যে মাংস চিবানোর জন্যই পয়দা করছে সেইটা। তারপরে তারা শুরু করেন ইসলামে জবাই করার নিয়মের মধ্যকার যত বৈজ্ঞানিক ব্যাপার স্যাপার। .... এগুলো নিয়াই পেচাইতে থাকেন। পেচাইতে পেচাইতে একদম ছ্যাড়াবেড়া- আর ধার্মিক ব্যক্তিরা ভাবেন- আহা! এই না হইলে আমাগো ইসলাম!!

আমি ভাবি- যে আমি ছোটবেলা থেকে পশুর মাংস খেয়ে অভ্যস্ত, যে আমার পশু জবাই করা নিয়ে কোনই বাছবিচার নাই (তিন কোপ আর এক কোপে জবাই হয়েছে কি না সেটা নিয়া মাথাই ঘামাই না, একবার আদিবাসীদের মারা পশুর মাংসও খেয়েছিলাম যা নাকি খুচিয়ে খুচিয়ে মারা)- সেই আমারে এইসব কথা কইয়া কি লাভ? আমরা আজ কসাইখানা নামক একটা আলাদা জায়গা রাখছি- কিন্তু ধর্মের নামে একটা দিন দুনিয়ারে এইরকম কসাইখানা বানায় দেয়ার মানে কি হতে পারে- এইটাই বুঝতে পারি না এবং সেইটা কেউ বুঝাইতেও আসে না। একবার একজন অবশ্য বুঝাইতে আইসা কইছিল- অন্য ধর্মেও এইরকম নির্বিচার পশুহত্যা আছে- আমি কেবল ইসলামরে নিয়া লাগছি ক্যান। আজব একখান প্রশ্ন বটে! অন্য ধর্মরে দিয়া ইসলামরে রক্ষা করার চেস্টায় বেচারার যে ঈমানের পরীক্ষায় মুনকার-নাকির দুইটা বেশী প্রশ্ন করবো- সেদিকে খেয়াল নাই- আমারে জিগায়, আমি ইসলামের পেছনে লাগছি ক্যান! যাউকগা, জবাব চাইতে গিয়া দেখি লোকে আমার কাছেই জবাব চায়- এই টাইপের প্রশ্নের মেলা জবাব দিছি, তাই এইটারে পাত্তা দেওনের খুব বেশি কারণ দেখি না।

আরেকজন আইসা কইলো- আল্লাহ কোরবানী দিতে কইছে- নিজ হাতে তো পশু হত্যা করবার কয় নাই- আলাদা নির্দিষ্ট স্থানে বা কসাইখানায় সমস্ত পশুর কোরবানীর ব্যবস্থা হইলেই তো হয়। আমি খুব খুশী হই, হুম যান পারলে এই ব্যবস্থা চালু করেন - আর আপত্তি করুম না। রোযার ঈদেও মুসলমানরা পোলাও-মাংস খায়, ফলে ঐদিনও দেশে বেশী গরু ছাগল জবাই হয়, কই এই ঈদ নিয়া তো বর্বরতার অভিযোগ কেউ তুলি না। কসাইখানা থেকে দরকারে রোযার ঈদের তুলনায় দশগুন কইরা মাংস কিনেন, কিইনা নিজে খান- বিলি করেন, ছোয়াব হাসিল করেন, পরকালের খাসা খাস সব জিনিসগুলানের বুকিং দিয়া দ্যান- কোনই আপত্তি নাই; খালি দয়া কইরা দুনিয়াটারে একটু বাসযোগ্য রাখেন- খালি আমাগো নাস্তিকগো লাইগা না- আপনেগো নিজেগো লাইগাও।

হগ্গোলরে ঈদ মুবারক।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29050760 http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29050760 2009-11-28 04:11:24
অন্ধ, বধির, হৃদয়হীন ঈশ্বরকে


এইমাত্র ক্ষুধার্ত এক শিশু
কিংবা খসখসে চামড়ার পোশাক পরা একটা কংকাল-
মরে বেঁচে গেল, কিছু আগেই যে বেঁচে মরে ছিল।
হে ঈশ্বর, তোমাকে পাঁচবার জপার আগেই
একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি-
আরেকজনকে তুলে দেই তোমার হাতে
দিনে ষোল হাজার, হাজারে হাজার-
মৃত্যুর মিছিলে তোমার স্বর্গ নরকে এখন দারুন কোলাহল।

তুমি বলেছিলে-
মানুষের রিজিকের ভার তোমার কাঁধে,
তোমার কাঁধ আজ তবে প্রশস্ত নয়?
৮৫৪ মিলিয়ন এর চিৎকার
খাবার না পাওয়ার যন্ত্রণা, কান্না-
তোমার কর্ণকুহরে প্রবেশ করে না?
আর কত জোরে চিৎকার করতে হবে? এই অপুষ্ট শরীর থেকে
কতই বা জোর আওয়াজ বের হয়- তুমিই বলো!
মাছিরা পর্যন্ত দয়ার্দ্র, ফেলে যায় না
কুকুরেরা ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকে অপলক
পিঁপড়েরা সুড়সুড়ি দেয় এখানে ওখানে-
কিন্তু তুমি? দেখতে পাও না কিছুই?
শকুন অপেক্ষায় থাকে জমপেশ একটা ফিস্টের আশায়
শিশুটা এবার হুমড়ি খেয়ে পড়লো প্রায়,
কচি শরীরের চোখ-মগজ-নাড়িভুড়ি,
গায়ে তেমন মাংস না থাকলেও জমবে বেশ।

আসল শকুনেরা তো নৃত্য করে জমকালো আসরে
কচি শরীরের চোখ-মগজ-নাড়িভুড়ি নিংড়ে চলে পানাহার সঙ্গীত ও নৃত্য
কচি শরীরের চোখ-মগজ-নাড়িভুড়ি বিকিয়ে পাওয়া ডলারে
আজ কি তোমার হৃদয়টা কেনা যায়?






]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29048860 http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29048860 2009-11-24 12:38:39
কোরআন ও নারী এবং জাকির নায়েকদের গালগল্পের জবাবে- ২ কোরআন ও নারী বিষয়ক জাকির নায়েকদের গালগল্পের জবাবে -১ এর পর থেকে.....
২। পুরুষদের একাধিক বিয়ের অনুমতি থাকলেও নারীদের নেই কেন?
জাকির নায়েকের কাছ থেকে শুনতে ইউটিউবে যান। এছাড়া ব্লগার তৌসিক আহম্মেদের ইসলাম সম্পর্কে অমুসলিমদের কিছু প্রশ্নের উত্তর। উত্তর নং: ২ শীর্ষক পোস্টেও জাকির নায়েকদের জবাব পাবেন। প্রথমে সেটাই দেখি।

সুরা নিসায় (৪:২২-২৪) এমন নারীদের তালিকা দেয়া আছে যাদের মুসলমান পুরুষ বিয়ে করতে পারে না। সেখানে বিবাহিত নারীদের কথাও বলা আছে। অর্থ্যাৎ, বিবাহিত নারীদের বিয়ে করা মুসলমান পুরুষদের জন্য নিষিদ্ধ। নারীদের বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করার জন্য কারণ হিসাবে জাকির নায়েকরা যেসব যুক্তি হাজির করেছেন সেগুলো হচ্ছেঃ

১) একজন পুরুষ যদি একাধিক বিয়ে করে তাহলে সহজেই তার সন্তানের পরিচয় পাওয়া যায়। অর্থ্যাৎ, আলাদাভাবে সেই সন্তানের পিতা-মাতা সনাক্ত করা সম্ভব। কিন্তু যদি একজন নারী যদি একাধিক বিয়ে করে তাহলে জাত সন্তানের পিতার পরিচয় নিয়ে সংশয় হতে পারে। ইসলামে মাতা-পিতা উভয়েরই সণাক্তকরণের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, যে সন্তান তার মাতা-পিতা এবং বিশেষত পিতার পরিচয় জানে না তারা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। জীবনের প্রতি পদক্ষেপেই সন্তানের তার পিতার নামের প্রয়োজন হবে। সেক্ষেত্রে সেই সন্তানের পিতার নাম কি একাধিক হবে? যদিও আমরা জানি যে, বর্তমানে বিজ্ঞান যথেষ্টই উন্নতি সাধন করেছে এবং আজকাল নিভূলভাবে পিতা-মাতার সণাক্তকরন সম্ভব। সেক্ষেত্রে হয়তো বিষয়টি বর্তমানের জন্য প্রযোজ্য নয়। কিন্তু এই প্রযুক্তি এই তো সেদিনের, আর ইসলাম সবসময়ের ধর্ম- কিছুদিন আগেও এতা সনাক্ত করা সম্ভব ছিল না। ২) প্রকৃতিগতভাবেই বহুবিবাহের ক্ষেত্রে নারীদের চেয়ে পুরুষেরা বেশি আগ্রহী। পুরুষ স্বভাবতই বহুগামী। একইকারনে, একজন পুরুষ একের অধিক স্ত্রীর প্রয়োজন পূরণে সক্ষম। কিন্তু একজন নারী সাধারনত এই সক্ষমতার অধিকারী নয়। ৩) আলাদা আলাদা পুরুষের প্রয়োজন পূরণ করতে গিয়ে একজন নারী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হতে পারে। শারীরিক প্রয়োজন পূরণের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। শারীরিক প্রয়োজন মেটানোর তাগিদ নারীর চেয়ে পুরুষের বেশি। ৪) যদি নারীর একাধিক স্বামী থাকে তবে দেখা যাবে, একই সময়ে তাকে একাধিক পুরুষের প্রয়োজন পূরণ করতে হতে পারে। আর এভাবে যৌনবাহিত বিভিন্ন রোগের ছড়িয়ে পড়ার সম্ভবণা অত্যধিক। কিন্তু বিপরীতক্রমে, একজন পুরুষের একাধিক স্ত্রী থাকার ক্ষেত্রে এই সমস্যার উদ্ভব হয় না।
জাকির নায়েকদের করা উপরের যুক্তিগুলো একাধারে মিথ্যাচার ও ভুলে ভরপুর, অশ্লীল, উদ্ভট এবং বিকৃত মস্তিস্কজাত। সেগুলো নিয়ে ধরে ধরে কথা বলার আগে- মানব ইতিহাসের দিকে একটু দৃষ্টি দেই। আমরা জানি যে- একসময় মানুষের সমাজব্যবস্থা ছিল মাতৃতান্ত্রিক এবং তখন নারীদের বহুগামিতা সামাজিকভাবে সমর্থনযোগ্য ছিল। সে সময়ে সন্তানেরা কেবল মায়ের পরিচয়েই বেড়ে উঠতো। বলা হয়ে থাকে- দুনিয়ার প্রথম ডিফাইনড সম্পর্ক হচ্ছে "মা"। আজকের যুগেও তিব্বত- নেপাল সহ অনেক জায়গাতেই নারীর বহুবিবাহের চল আছে। এই ভিডিওতে নেপালের এমনই একটি পরিবারকে দেখা যাচ্ছে (রাগ ইমনের কাছ থেকে প্রাপ্ত)।

এবারে জাকির নায়েকদের করা (কু)যুক্তিগুলো একে একে দেখা যাক:
১) নারীর একাধিক স্বামী থাকলে, সন্তানের বাবাকে নির্দিষ্ট করণ আজ সম্ভব। সবসময়ের ধর্ম বলে যে দাবী সেটা খাটে না কারণ- কোন নিয়ম-কানুনই সবসময়ের জন্য একই থাকতে পারে না, যেহেতু মানুষ-মানুষের সমাজ- তার জানা বুঝা- আহরিত জ্ঞান, বিজ্ঞান-প্রযুক্ত সবই পরিবর্তনশীল। আর, বাবা কে না জানলে সন্তান খুব কষ্টে থাকে - এটাও যে মিথ্যা সেটা উপরের ভিডিওতে নেপালের সন্তানদের দেখেই বুঝতে পারছেন। জাকির নায়েক সোসাল সাইকোলজির এই দিকটা বেমালুম চেপে গেছেন । আমাদের এই সমাজে কয়েক জন বাবা থাকাটাকে আমরা "খারাপ" বলি বলেই সন্তান নির্দিষ্ট বাবার পরিচয়ের অভাবে মানসিকভাবে সমস্যায় ভোগে- কিন্তু বুঝতে হবে সেটা এই সমাজই সন্তানকে অমন করতে বাধ্য করে। যে সমাজে কোন সন্তানের একাধিক বাবা থাকাটা খুব স্বাভাবিক, সেখানে সন্তান একাধিক বাবা দেখেই অভ্যস্ত এবং এটাতে সে মানসিকভাবে কোন সমস্যায় না ভুগারই কথা।

২। পুরুষ স্বভাবতই বহুগামী - কথাটাই আপত্তিকর। পুরুষরা কি সারাক্ষণ বহুনারীতে উপগত হইবার চিন্তায় ব্যস্ত থাকে? আর যদি থাকেই , তাহলে নিজের চারটা স্ত্রী থাকলেও তারা ৫ম, ৬ষ্ঠ কোন নারির প্রতি আকর্ষিত হতে পারে?

৩। মানসিক ও বায়োলজিকাল কারনে নারী বহু স্বামীর সাথে ঘর করতে পারে না - এটাও নেপালের ভিডিও দেখে বুঝবেন যে মিথ্যা । শিডুল মেনে সব কয়জন স্বামীর সাথেই সুখে দাম্পত্য করতে দেখা যাচ্ছে নেপালী বউদের ।

৪। বহু স্বামী থাকলে যৌন রোগের সম্ভাবনা আছে, বহু স্ত্রী থাকলে নাই- এমন কথা একজন মূর্খের পক্ষেই বলা সম্ভব। জাকির নায়েকদের মুখ থেকে এই ধরনের "জেন্ডার বেসড" রোগের নাম শুনতে পারলে ভালো হতো। আর, রোগ ছড়ানোর ব্যাপারে- নারীর বহুগামিতা নয়, একগামি পুরুষ থেকে নারীতে বা নারী থেকে পুরুষে যৌনবাহিত রোগ ছড়াতে পারে। ফলে- এক পুরুষের একাধিক স্ত্রী থাকলে কোন একজনের যৌনবাহিত রোগ হলে সেটা অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে- সেক্ষেত্রে রোগের বাহক হিসাবে স্বামী ব্যবহৃত হবে, অপরদিকে এক নারীর একাধিক স্বামী থাকলে- কারো কোন যৌনবাহিত রোগ হলে- ঐ নারী বাহক হিসাবে কাজ করবে।

৩। নারীদের বোরকার আড়ালে রেখে অবমাননা করা হয় কেন?
এবারেও তৌসিক আহম্মেদের পোস্ট পড়ে আসুন ও জাকির নায়েকের বক্তৃতা শুনে আসুন।
জাকির নায়েকরা এই প্রশ্নের জবাবের শুরুতেই - আগের সমাজগুলোতে নারীর অবস্থা কেমন ছিল সে সম্পর্কে একটা লম্বা ফিরিস্তি দেয়। ব্যবিলীয়নীয় যুগে, গ্রীক সভ্যতায়, রোমান সভ্যতায়, মিশরীয় সভ্যতায় এবং ইসলাম পূর্ব আরবে নারীদের খুব খারাপ অবস্থা ছিল- নারীদের জ্যান্ত পুড়ানো হতো- মেরে ফেলা হতো, নগ্নতা - পতিতাবৃত্তি খুব সাধারণ ছিল, নারীরা সব ধরণের অধিকার ও সুবিধা বঞ্চিত ছিল.. ইত্যাদি। এমন ঢালাও আলাপ যে প্রলাপমাত্র তা বলাই বাহুল্য, ইতিহাস নিয়ে যাদের নাড়াচাড়া আছে- তারা এটা জানে। যাহোক, জাকির নায়েকদের আলোচনায় ফিরে যাই। তাদের এই ফিরিস্তি হাজির করার উদ্দেশ্য ভালোই বুঝা যায়। তারা এই ফিরিস্তি দেয়ার মাধ্যমে এটাই প্রতিষ্ঠিত করতে চায় যে- ইসলামই প্রথম নারীদের তাদের সুষম মর্যাদায় অধিষ্টিত করেছে এবং এই মর্যাদা যেন বলবৎ থাকে তার ব্যবস্থাও ইসলাম করেছে, অর্থাৎ ইসলাম যেসমস্ত ব্যবস্থা নিয়েছে তা এই মর্যাদা বলবৎ রাখার জন্য। কি সেই ব্যবস্থা? নারীদের হিজাব।

কোরআনে বলা হয়েছে: "মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন দৃষ্টি নত রাখে এবং যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। যা সাধারণত প্রকাশমান, তা ছাড়া তারা যেন সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে, তারা যেন মাথার ওড়না বক্ষদেশে ফেলে রাখে। তারা যেন স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুষ্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, স্ত্রীলোক অধিকারভুক্ত বাদী, যৌণকামনামুক্ত পুরুষ বা বালক, যারা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ, তাদের ব্যতিত কারও কাছে সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। গোপন সৌন্দর্য প্রকাশের জন্য তারা যেন জোরে পদচারণা না করে। মুমিনগন, তোমরা আল্লাহর সামনে তওবা কর যেন সফলকাম হতে পার।" [সুরা আন-নূর (২৪:৩১)]

হিজাবের অত্যাবশ্যকীয়তা নিয়ে কোরআনে বলা হয়েছে:
"হে নবী, আপনি আপনার পত্নীগণ, কন্যাগণ, ও মুমিন স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের অংশ নিজেদের ওপর টেনে নেয়, এতে তাদের চেনা সহজ হবে এবং তারা উত্যক্ত হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালূ।" [সুরা আল-আহযাব (৩৩:৫৯)]।

নানা কথার ভিতর দিয়ে আসলে এই হিজাবের পেছনে একটি যুক্তিই পেলাম। তা হলো মোদ্দা কথায়- নারীরা হিজাব না পরলে- পুরুষদের কাম জাগ্রত হতে পারে। জাকির নায়েকরা একটা চমৎকার(!) উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা বুঝিয়ে দেয়: "দুজন যমজ বোনের কথা ধরা যাক। তারা দুজনই সমান সুন্দরী। রাস্তায় হেটে যাবার সময় তাদের একজন ইসলামী হিজাব পরিধান করেছে অর্থ্যাৎ সম্পূর্ণ দেহ কাপড়ে আবৃত শুধু মুখ ও হাতের কব্জি বাদে। এবং অন্যজন পাশ্চাত্যের মিনি স্কাট ও শটস পরেছে। রাস্তার পাশে কিছু বখাটে ছেলে বসে আছে। আপনার কী মনে হয়, তারা এই দুই বোনের মধ্যে কাকে উত্যক্ত করবে? যে ইসলামী হিজাব পরিধান করেছে তাকে নাকি যে পাশ্চাত্যের পোশাক করেছে তাকে। নিঃসন্দেহে যে পাশ্চাত্যের পোশাক পরেছে তাকে। আসলে এই ধরনের পোশাক বিপরীত লিঙ্গকে আগ্রাসী হবার পরোক্ষ আমণ্ত্রণ জানায়"

বখাটে ছেলেরা তো হিজাব পরিরহিত একজনকেও উত্যক্ত করতে পারে, আমার প্রশ্ন হলো- ঐ জায়গায় জাকির নায়েক থাকলে কাকে করতো? কোনজনকে দেখে উত্যক্ত করতেন বা তার কামের উদ্রেক ঘটতো? যাহোক, নায়েকদের কথা আরেকটু শুনি। পাশ্চাত্যের তথা যুক্তরাষ্ট্রের নারীদের নগ্নতা জাকির নায়েকদের মোক্ষম যুক্তি, সর্বশেষ অস্ত্র। জাকির নায়েকরা যুক্তরাষ্ট্রকে পৃথিবীর সর্বাধিক উন্নত দেশ হিসাবে অভিহিত করে জানান দেয় যে- যুক্তরাষ্ট্রে ধর্ষণের সংখ্যাও সর্বাধিক। শেষে চমৎকার একটা সমাধানও দেয়া হলো, "কোন নারীকে দেখামাত্র পুরুষ তার দৃষ্টি নত করবে, নারীরা ইসলামী হিজাব পরিধান করবে এবং এরপরও যদি কোন ব্যক্তি ধর্ষণ করে তবে তাকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হবে"। জাকির নায়েকরা নিশ্চিত, এতে করেই যুক্তরাষ্ট্রে ধর্ষণ একদম না-ই হয়ে যাবে। যেনবা, যুক্তরাষ্ট্রের মত দেশগুলোতে ধর্ষণের মূল কারণ নারীদের বেপর্দা থাকা বা হিজাব না পরা!
যুক্তরাষ্ট্রের গল্প শোনানো হচ্ছে- কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য বা আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে নারীর সেক্সুয়াল এবিউজমেন্টের হার কি কম? এইসব অঞ্চলে- বেশীরভাগ ঘটনাই প্রকাশ পায় না- আড়ালে থেকে যায়। সেদিন একটি রিপোর্টে পড়ছিলাম- শিশুকন্যার সেক্সুয়াল হ্যারাজমেন্ট নিয়ে- আমাদের মতো দেশগুলোতে ৬০ ভাগেরও বেশী শিশুকন্যা সেক্সুয়ালি কোন না কোন ভাবে হ্যারাজড হয় (শিশুকন্যা বলতে ১২/১৪ বছর বয়সের পূর্বে বাচ্চাদের বুঝিয়েছে)। আরো মজার কাহিনী হচ্ছে- এদের ৯০ ভাগেরও বেশী হ্যারাজড হয় না কি ফ্যামিলি মেম্বারদের দ্বারা- কাজিন, চাচা-মামা-দাদা কেউ সেই লিস্ট থেকে বাদ নেই! ঐ বাচ্চাগুলোকে বোরখা দিয়ে ঢেকে রাখলেই এসব বন্ধ হবে?

আর, উত্যক্ত করার যে উদাহরণটা জাকির নায়েক দিয়েছে- সেটা তার সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলকে তুল্যজ্ঞান করেই দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, উত্যক্ত করাটা সংস্কৃতি ভেদে ভিন্ন হবে। যে সমাজে মিনি স্কার্ট ও শর্টস একটি স্বাভাবিক পোষাক হিসেবে ব্যবহৃত ও স্বীকৃত কিন্তু হিজাব নয়, সেখানে হিজাবধারীকে উত্যক্ত করা হতে পারে। আর যে সমাজে হিজাব স্বাভাবিক, শর্টস ও মিনি অব্যবহৃত সেখানে উল্টো ঘটনা ঘটবে।

নীচের ভিডিওগুলো একটু দেখেন,- দেখে আমাকে বলেন- এই সব ন্যাংটো-আধা ন্যাংটো ট্রাইবাল নারীদের বুক পাছা দেখে জাকির নায়েকদের যেমন অনুভূতি হয়- তা কি ওদের পুরুষদেরও হয়?






শুধু একটা তথ্য আপনাকে দিতে পারি- এইসব ন্যাংটো মেয়েদের দিনে রাতে দেখেও ওদের পুরুষেরা উত্যক্ত করার কথা কল্পনাও করতে পারেনা, এরা হয়তো- অন্য সমাজের পুরুষদের (যারা নিজেদের সমাজে লজ্জা নিবারনের পোষাকে অভ্যস্ত) হাতে রেপড হতে পারে- কিন্তু এখানকার পুরুষদের তাদের নারীদের রেপ করার কোন নজির নেই।
======================
এস এম রায়হানের কোরআণের আলোকে নারী শীর্ষক পোস্টেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাব দেয়ার চেস্টা করা হয়েছে। কিন্তু সেগুলো এমনই যে- তা পড়লে কেবল কৌতুকই বোধ হবে। সন্ধাবাতি, ফারজানা, মাসুদুল হক এমনকি জ্বিনের বাদশা (ইনি মোটেও মোল্লা শ্রেণীর নন- তবে মাঝে মধ্যে ইসলাম নিয়ে আলোচনা করেন এবং তার আলোচনা এক পলক দেখলেই বুঝা যায়- যেকোন ব্লগ মোল্লার চেয়ে এনার জানা-বুঝাটা কম নয়) বা নরাধম (মডারেট মোল্লা হিসাবে নিজেকে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন- ইনিও ভালোই পড়াশুনা করেন)- প্রমুখের ইসলাম নিয়ে আলোচনায় যে বিশ্লেষণ থাকে- ইসলামকে আরো গভীরে দেখার যে চেস্টা থাকে- তার ছিটেফোটাও কপি-পেস্টার এসএমরায়হান, হিমু রুদ্র, জেমস বন্ডের পোস্টে থাকে না। শেষোক্তদের পোস্টগুলো আসলে নিখাদ কৌতুক হিসাবে গণ্য হতে পারে, এবং আমি নিশ্চিত এদের ইসলামের আহবান সম্বলিত পোস্ট পড়লেই বরং ইসলাম নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হয়, একজনকে অবিশ্বাসী হতে সাহায্য করে (আমার বাল্যকালে পাড়ার কিছু মোল্লা-ইমামদের আলোচনা-খুতবা যেমন আমার বিশ্বাস ত্যাগে ভূমিকা রেখেছে)। সুতরাং এসএমরায়হানের উক্ত পোস্টের আলোচনাকে খণ্ডন করার তেমন কিছুই দেখছি না- সেই পোস্ট পড়লেই বরং ইসলামের স্বরূপটা কেমন তা পরিস্কার হবে। ইসলামের এইসব অনুসারীরা যে কেমন পারভার্ট তা বুঝার জন্য এস এম রায়হানের ঐ পোস্ট থেকে দু একটি লাইন তুলে দিচ্ছি:

স্ত্রীকে প্রহার করা সম্পর্কিত:
"ধর্ম-বর্ণ-আস্তিক-নাস্তিক নির্বিশেষে সকল সমাজেই নারীদেরকে কম-বেশী প্রহার করা হয়। এই কমন একটি ফিনমিন্যানকে কোরআনে পজেটিভ থেরাপি হিসেবে ব্যবহার করে পরিবারের অভ্যন্তরীণ সমস্যার সম্ভাব্য একটি সমাধান দেয়া হয়েছে।" বা, "নারীদেরকেও এই অধিকার দেয়া হলে তারা সেটা পুরুষের উপর প্রয়োগ করতে পারতেন কি-না। কোন নারী এই অধিকার চাইবেন বলেও মনে হয় না! নারীদেরকে আসলে এই অধিকার দেয়া বা না দেয়া একই কথা"।
শস্যক্ষেত্র সম্পর্কিত:
"আস্তিক-নাস্তিক নির্বিশেষে সবায় কিন্তু স্ত্রীকে "শষ্যক্ষেত্র" হিসেবে ব্যবহার করে ঠিকই ফসল ফলাচ্ছেন। অথচ কোরআনের ক্ষেত্রে কারো কারো যেন লজ্জার সীমা নেই! এই ন্যাচারাল সিস্টেমকে এড়াতে হলে অবাস্তবধর্মী তথা সাধু-সন্ন্যাসী জীবন যাপন ছাড়া অন্য কোন পথ কিন্তু খোলা নেই!"
সম্পত্তির ভাগাভাগি সম্পর্কিত:
"ভাইয়ের পরিবারের এতগুলো সম্পত্তি কীভাবে স্বামীর বাড়িতে নিয়ে যাবে, এ নিয়ে সমস্যা হতো। প্রকৃতপক্ষে স্বামীর অর্থনৈতিক অবস্থা খুব খারাপ না হলে অনেক নারীই তাদের পিতার পরিবার থেকে কোন সম্পত্তি নেয় না। "
একজন পুরুষ=দুই জন নারী সম্পর্কিত:
"সাক্ষী সব সময় একজন নারীই দেবে। তবে অতিরিক্ত একজন নারীকে পাশে থাকতে বলা হয়েছে এ কারণে যে, আসল সাক্ষী কোন কারণে ভুল করলে অপরজন স্মরণ করিয়ে দেবেন। এর পেছনে যুক্তি হচ্ছে, কোরআনে যেহেতু পুরুষকে অর্থনৈতিক বিষয়ে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সেহেতু ধরে নেয়া হয়েছে যে তারা এ বিষয়ে পারদর্শী হবে। ....... তাছাড়াও নারীদের কিছু সমস্যা যেমন গর্ভাবস্থা, রজঃস্রাব, শিশু বাচা লালন-পালন, ইত্যাদিও তো মাথায় রাখতে হবে। গর্ভাবস্থায় ও রজঃস্রাব কালে নারীদের যে কিছু কিছু সমস্যা হয় সেটা তো প্রমাণিত সত্য, যে সমস্যাগুলো পুরুষদের নেই।"

যাহোক, এস এম রায়হানের প্রলাপ বা কৌতুকের জবাব দেয়ার কোন প্রয়োজন না দেখলেও যেসব প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে রায়হান সাহেব এসব প্রলাপ বকেছেন সেগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিধায় সেগুলো উল্লেখ করছি। যারা জানেন তারা এসবের জবাব দেয়ার চেস্টা করবেন আশা করি।
১) কোরআনে যেহেতু একজন পুরুষের স্থলে দু'জন নারী সাক্ষীর কথা বলা আছে কেন? এর মধ্য দিয়ে দুইজন পুরুষকে একজন নারীর সমকক্ষ হিসাবে কি গণ্য করা হলো না? ২) কোরআনে স্ত্রীকে বেধরক প্রহারের অধিকার স্বামীকে দেয়া হয়েছে। এটা কি অমানবিক নয়? একই অধিকার স্ত্রীকে দেয়া হয়নি কেন? এটা কি সম অধিকার বা ন্যায়পরায়নতা প্রকাশ করে? ৩) কোরআনে নারীদের মাসিক রজঃস্রাবকে অশুচি হিসাবে গণ্য করা হয়েছে কেন? এসময়ে নারী কেন ধর্মীয় কাজকর্মের (নামাজ-রোযা প্রভৃতি) পর্যন্ত অধিকার পাবে না? ৪) কোরআনে স্ত্রীকে শষ্যক্ষেত্রের সাথে তুলনা করে হেয় করা হয়নি কি? ৫) কোরআনে যেহেতু নারীকে পুরুষের অর্ধেক সম্পত্তি দেয়া হয়েছে। কেন? এর মধ্য দিয়ে কি প্রমাণ হয় না যে নারী-পুরুষকে সমান অধিকার দেয়া হয়নি? ৬) কোরআনে অপ্রাপ্তবয়স্ক বালিকাদের বিয়ে করাকে নিষিদ্ধ করা হয় নি কেন? ৭) কোরআনে অমানবিক হিলা বিয়ের কথা লিখা আছে কেন? ৮) কোরআনে যুদ্ধবন্দী/ক্রীতদাসীদের সাথে সেক্স করার কথা লিখা আছে- এটা অমানবিক নয় কি? (এ প্রসঙ্গে মাহমুদ রহমানের এই পোস্টও দেখেতে পারেন।)

পরিশেষে, এসবের সাথে প্রাসঙ্গিক কিছু কোরআনের আয়াত উল্লেখ করাও হচ্ছে:

তোমাদের স্ত্রীরা হলো তোমাদের জন্য শস্য ক্ষেত্র। তোমরা যেভাবে ইচ্ছা তাদেরকে ব্যবহার কর। আর নিজেদের জন্য আগামী দিনের ব্যবস্খা কর এবং আল্লাহ্কে ভয় করতে থাক। আর নিশ্চিতভাবে জেনে রাখ যে, আল্লাহর সাথে তোমাদেরকে সাক্ষাত করতেই হবে। আর যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে সুসংবাদ জানিয়ে দাও। ২-২২৩

আর তালাকপ্রাপ্তা নারী নিজেকে অপেক্ষায় রাখবে তিন হায়েয পর্যন্ত। আর যদি সে আল্লাহর প্রতি এবং আখেরাত দিবসের উপর ঈমানদার হয়ে থাকে, তাহলে আল্লাহ্ যা তার জরায়ুতে সৃষ্টি করেছেন তা লুকিয়ে রাখা জায়েজ নয়। আর যদি সদ্ভাব রেখে চলতে চায়, তাহলে তাদেরকে ফিরিয়ে নেবার অধিকার তাদের স্বামীরা সংরক্ষণ করে। আর পুরুষদের যেমন স্ত্রীদের উপর অধিকার রয়েছে, তেমনি ভাবে স্ত্রীদেরও অধিকার রয়েছে পুরুষদের উপর নিয়ম অনুযায়ী। আর নারীরদের ওপর পুরুষদের শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। আর আল্লাহ্ হচ্ছে পরাক্রমশালী, বিজ্ঞ। ২-২২৮

আল্লাহ্ তোমাদেরকে তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে আদেশ করেন: একজন পুরুষের অংশ দু’জন নারীর অংশের সমান। অত:পর যদি শুধু নারীই হয় দু-এর অধিক, তবে তাদের জন্যে ঐ মালের তিন ভাগের দুই ভাগ যা ত্যাগ করে মরে এবং যদি একজনই হয়, তবে তার জন্যে অর্ধেক। মৃতের পিতা-মাতার মধ্য থেকে প্রত্যেকের জন্যে ত্যাজ্য সম্পত্তির ছয় ভাগের এক ভাগ, যদি মৃতের পুত্র থাকে। যদি পুত্র না থাকে এবং পিতা-মাতাই ওয়ারিস হয়, তবে মাতা পাবে তিন ভাগের এক ভাগ। অত:পর যদি মৃতের কয়েকজন ভাই থাকে, তবে তার মাতা পাবে ছয় ভাগের এক ভাগ ওছিয়্যেতর পর, যা করে মরেছে কিংবা ঋণ পরিশোধের পর। তোমাদের পিতা ও পুত্রের মধ্যে কে তোমাদের জন্যে অধিক উপকারী তোমরা জান না। এটা আল্লাহ্ কর্তৃক নির্ধারিত অংশ নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, রহস্যবিদ। ৪-১১

হে মুমিনগণ! যখন তোমরা কোন নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে ঋনের আদান-প্রদান কর, তখন তা লিপিবদ্ধ করে নাও এবং তোমাদের মধ্যে কোন লেখক ন্যায়সঙ্গতভাবে তা লিখে দেবে; লেখক লিখতে অস্বীকার করবে না। আল্লাহ্ তাকে যেমন শিক্ষা দিয়েছেন, তার উচিত তা লিখে দেয়া। এবং ঋন গ্রহীতা যেন লেখার বিষয় বলে দেয় এবং সে যেন স্বীয় পালনকর্তা আল্লাহ্কে ভয় করে এবং লেখার মধ্যে বিন্দুমাত্রও বেশ কম না করে। অত:পর ঋণগ্রহীতা যদি নির্বোধ হয় কিংবা দূর্বল হয় অথবা নিজে লেখার বিষয়বস্তু বলে দিতে অক্ষম হয়, তবে তার অভিভাবক ন্যায়সঙ্গতভাবে লিখাবে। দুজন সাক্ষী কর, তোমাদের পুরুষদের মধ্যে থেকে। যদি দুজন পুরুষ না হয়, তবে একজন পুরুষ ও দুজন মহিলা। ঐ সাক্ষীদের মধ্য থেকে যাদেরকে তোমরা পছন্দ কর যাতে একজন যদি ভুলে যায়, তবে একজন অন্যজনকে স্মরণ করিয়ে দেয়। যখন ডাকা হয়, তখন সাক্ষীদের অস্বীকার করা উচিত নয়। তোমরা এটা লিখতে অলসতা করোনা, তা ছোট হোক কিংবা বড়, নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। এ লিপিবদ্ধ করণ আল্লাহ্র কাছে সুবিচারকে অধিক কায়েম রাখে, সাক্ষ্যকে অধিক সুসংহত রাখে এবং তোমাদের সন্দেহে পতিত না হওয়ার পক্ষে অধিক উপযুক্ত। কিন্তু যদি কারবার নগদ হয়, পরপর হাতে হাতে আদান-প্রদান কর, তবে তা না লিখলে তোমাদের প্রতি কোন অভিযোগ নেই। তোমরা ক্রয়-বিক্রয়ের সময় সাক্ষী রাখ। কোন লেখক ও সাক্ষীকে ক্ষতিগ্রস্ত করো না। যদি তোমরা এরূপ কর, তবে তা তোমাদের পক্ষে পাপের বিষয়। আল্লাহ্কে ভয় কর তিনি তোমাদেরকে শিক্ষা দেন। আল্লাহ্ সব কিছু জানেন। ২-২৮২

তারপর যদি সে স্ত্রীকে (তৃতীয়বার) তালাক দেয়া হয়, তবে সে স্ত্রী যে পর্যন্ত তাকে ছাড়া অপর কোন স্বামীর সাথে বিয়ে করে না নেবে, তার জন্য হালাল নয়। অত:পর যদি দ্বিতীয় স্বামী তালাক দিয়ে দেয়, তাহলে তাদের উভয়ের জন্যই পরস্পরকে পুনরায় বিয়ে করাতে কোন পাপ নেই। যদি আল্লাহর হুকুম বজায় রাখার ইচ্ছা থাকে। আর এই হলো আল্লাহ্ কর্তৃক নির্ধারিত সীমা; যারা উপলব্ধি করে তাদের জন্য এসব বর্ণনা করা হয়। ২-২৩০

তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যাদের ঋতুবর্তী হওয়ার আশা নেই, তাদের ব্যাপারে সন্দেহ হলে তাদের ইদ্দত হবে তিন মাস। আর যারা এখনও ঋতুর বয়সে পৌঁছেনি, তাদেরও অনুরূপ ইদ্দতকাল হবে। গর্ভবর্তী নারীদের ইদ্দতকাল সন্তানপ্রসব পর্যন্ত। যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ্ তার কাজ সহজ করে দেন। ৬৫-৪

পুরুষেরা নারীদের উপর কৃর্তত্বশীল এ জন্য যে, আল্লাহ একের উপর অন্যের বৈশিষ্ট্য দান করেছেন এবং এ জন্য যে, তারা তাদের অর্থ ব্যয় করে। সে মতে নেককার স্ত্রীলোকগণ হয় অনুগতা এবং আল্লাহ্ যা হেফাযতযোগ্য করে দিয়েছেন লোক চক্ষুর অন্তরালেও তার হেফাযত করে। আর যাদের মধ্যে অবাধ্যতার আশঙ্কা কর তাদের সদুপদেশ দাও, তাদের শয্যা ত্যাগ কর এবং প্রহার কর। যদি তাতে তারা বাধ্য হয়ে যায়, তবে আর তাদের জন্য অন্য কোন পথ অনুসন্ধান করো না। নিশ্চয় আল্লাহ্ সবার উপর শ্রেষ্ঠ। ৪-৩৪

সকল সধবা নারীদের তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে, কিন্তু তোমাদের স্বত্বাধীন যেসব দাসী রয়েছে তাদের হারাম করা হয়নি। এ হল তোমাদের জন্য আল্লাহর বিধান। এদের ছাড়া অন্য সব নারীকে তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে এ শর্তে যে, তোমরা তাদের কামনা করবে অর্থের বিনিময়ে বিয়ে করার জন্য, ব্যভিচারের জন্য নয়। বিয়ের মাধ্যমে যে নারীদের তোমরা সম্ভোগ করেছ তাদের দিয়ে দিবে তাদের নির্ধারিত মহর। আর তোমাদের কোন গুনাহ হবে না যদি মহর নির্ধারণের পর তোমরা কোন বিষয়ে পরষ্পর সম্মত হও। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, হেকমতওয়ালা। ৪-২৪ (শানে নুযুল সহ পড়তে চাইলে এই পোস্টে ঢু মারুন)
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29047045 http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29047045 2009-11-21 01:45:01
কোরআন ও নারী বিষয়ক জাকির নায়েকদের গালগল্পের জবাবে -১ রাগ ইমন, নিরুদ্দেশ নীহারিকা, খালদুন, আমি এবং আঁধার, মনির হাসান, বৃত্তবন্দী প্রমুখ) অনেক কিছু বলেছেন, চমৎকার সব যুক্তি করেছেন- কিন্তু জাকের নায়েকদের শিষ্যদের কোন লাজ-লজ্জার বালাই নেই, একই কাসুন্দি তারা বারেবারে ঘুরেফিরে বাজাতেই থাকে, বাজাতেই থাকে। আজকের পোস্টে সেগুলো নিয়েই কথা বলবো- এবং আশা করবো জাকের নায়েকদের শিষ্যরা (তৌসিক আহম্মেদ, মোহাম্মদ লোমান, এস.এম. রায়হান, নাজনীন১ এবং পুরান শিষ্য (যদি ব্লগে থেকে থাকেন) উম্মু আব্দুল্লাহ, মাহমুদ রহমান, মাহিরাহি, বিবেক সত্যি, আস্তমেয়ে, চতুর্ভুজ, ফারজানা প্রমুখ) এখানে আলোচনা করবেন- যুক্তি খন্ডন করবেন।

জাকির নায়েকরা কি বলছেন?
আজ সুস্থ বুদ্ধি ও বিবেক সম্পন্ন ব্যক্তিমাত্রই ইসলামের যে বিষয়গুলো নিয়ে দ্বন্দ্বে থাকে, প্রশ্ন উত্থাপন করে- আপত্তি করে, সেগুলো নিয়ে জাকির নায়েকরা এক ধরণের যুক্তি করার চেস্টা করছে, আর জাকির নায়েকদের এই ব্যাখ্যায় বুঝে হোক আর না বুঝেই হোক- কাঠ মোল্লারা দারুন উচ্ছসিত, পায়ের নীচে মাটি পাওয়ার মতই তাদের অবস্থা। আর, তাই জাকির নায়েকরা খুব শোরে "ইসলাম নিয়ে অমুসলিমদের জিজ্ঞাসার জবাবে", বা "কোরআন নিয়ে বিভ্রান্তির জবাবে" বা "কোরআন ও বিজ্ঞান" - এমন নানা শিরোনামে তারা বক্তব্য হাজির করছে। অন্য বিষয়গুলো আজ আপাতত আনছি না- শুরুতে ইসলাম ও নারী বিষয়ক আলোচনায় দৃষ্টি দেয়া যাক। এই লেখাটিতে মুহম্মদ সা কে কেন্দ্র করে কোন আলোচনা করছি না কারণ আগেই সেটা যথেস্ট করেছি- যারা এখনও পড়েননি তারা এখানেএখানে ক্লিক করতে পারেন।

প্রথমে জাকের নায়েকদের দ্বারা জবাব দেয়া ইসলাম সম্পর্কিত 'অমুসলিম'দের (মানে যারাই প্রশ্ন তুলবে- তারাই অমুসলিম!) তিনটি প্রশ্ন দেখা যাক:
১। "মুসলমান পুরুষদের একাধিক বিবাহের অনুমতি দেয়া হয়েছে কেন?"
২।"পুরুষদের একাধিক বিয়ের অনুমতি থাকলেও নারীদের নেই কেন?"
৩। "নারীদের বোরকার আড়ালে রেখে অবমাননা করা হয় কেন?"

প্রশ্ন তিনটিই খুবই যৌক্তিক এবং প্রত্যাশিত। এগুলো নিয়ে জাকের নায়েক গং রা কি বলছে সেটা দেখি। এর বাইরেও আরো কিছু প্রশ্নকে মোল্লারা "কাফিরদের অভিযোগ" হিসাবে উত্থাপন করে কিভাবে জবাব দেয়ার চেস্টা করে সেগুলোও একে একে আলোচনা করবো। সাথে সাথে এদের করা যুক্তিগুলোও খণ্ডন করার চেস্টা করবো।

১। "মুসলমান পুরুষদের একাধিক বিবাহের অনুমতি দেয়া হয়েছে কেন?"

জাকির নায়েকের "Answers to the Non-Muslims Common Questions about Islam" গ্রন্থ অবলম্বনে ব্লগার তৌসিক আহম্মেদের ইসলাম সম্পর্কে অমুসলিমদের কিছু প্রশ্নের উত্তর। উত্তর নং: ১ শীর্ষক পোস্টে মজার মজার জবাব পাবেন। সরাসরি জাকির নায়েকের মুখ থেকে এগুলো শুনতে ও দেখতে ইউটিউবে যেতে পারেন।


কি সেই জবাব- কি সেই যুক্তি? এবারে সেটাই তাহলে সংক্ষেপে দেখা যাক:
"পৃথিবীতে কোরআনই একমাত্র ধর্মগ্রন্থ যেখানে বলা হয়েছে, শুধুমাত্র একটি বিয়েই করা উচিত"- ঠিক এমনটি বলেই জাকির নায়েকদের যুক্তির শুরু। যেন বা নৈতিকতার বিচার অন্যসব ধর্মের সাথে তুলনা করেই হয়! মোল্লাদের খুব গর্বের সাথে গল্প করতে শুনা যায়- "বাকী সকল ধর্মগ্রন্থে (রামায়ন, গীতা, বাইবেল...) ইচ্ছেমত বিয়ের অনুমতি দেয়া হয়েছে। পরবর্তীকালে, পুরোহিতরা মিলে একবিবাহ নিয়ম চালু করেন। কিন্তু তাদের ধর্মগ্রন্থতে এব্যাপারে কোন নির্দেশনা নেই। .. ১৯৫০ সালেও ইহুদীদের মধ্যে বহুবিবাহের প্রথা চালু ছিল। তারপর ইহুদী নেতারা এই প্রথা বন্ধ করেন।.... ১৯৫৪ সালে হিন্দু বিবাহ আইনে একবিবাহ প্রথা চালু হয়"। কথায় আছে- ভেড়ার পালে বাছুর পরমানিক, এ যেন গোবরের সাথে তুলনা করে হাঁস-মুরগীর বিষ্ঠাকে কম দুর্গন্ধময় বলে ঘোষণা দেয়া! কিন্তু এরা যে বুঝতেও পারে না -ধর্মগ্রন্থে না থাকার পরেও যুগপ্রয়োজনে- সময়ের পরিবর্তনে ধর্মীয় প্রথাকে পাল্টিয়ে দেয়া যে কত মহৎ, কত বৈপ্লবিক!

যাহোক- একদম শুরুর যে দাবি- সেটা জাকির নায়েকরা কিসের ভিত্তিতে বলছে?
কোরআনে বলা হয়েছে:
"মেয়েদের মধ্যে থেকে যাদের ভাল লাগে তাদের বিয়ে করে নাও, দুই, তিন, কিংবা চারটি পর্যন্ত। তবে যদি আশঙ্কা হয় যে, তাদের সাথে ন্যায়সঙ্গত আচরন করতে পারবে না তবে শুধুমাত্র একটি।" আল কোরআন (৪:৩)।

এবং:
"তোমরা চাইলেও নারীদের মাঝে ন্যায়বিচার করতে পারবে না...।" আল কোরআন (৪:১২৯)।

সুরা নিসার ৩ নং আয়াত এবং ১২৯ নং আয়াতের প্রথম বাক্যকে পাশাপাশি রেখে এরা এমনই ধারণা তৈরি করতে চায় যে- কোরআন অনুযায়ি- চারটি পর্যন্ত বিয়ার অনুমতি থাকলেও তার ক্ষেত্রে শর্ত প্রযোজ্য এবং মূল শর্তটি হচ্ছে স্ত্রীদের সাথে ন্যায়সঙ্গত আচরণ করতে হবে এবং ন্যায়বিচার করতে না পারার আশংকামাত্র থাকলেই শুধুমাত্র একটা বিয়ে করতে হবে (৪:৩) এবং স্পষ্টতই আল্লাহ জানিয়ে দিচ্ছেন- চাইলেও নারীদের মধ্যে ন্যায়বিচার করা সম্ভব না (৪:১২৯)- সেহেতু চুড়ান্ত বিচারে দাঁড়াচ্ছে- কোরআনে একটি বিয়ের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। জাকির নায়েকের এই যুক্তিটুকু পড়লে বা শুনলে মনে হয় বাহ কি সুন্দর, ভালোই তো! কিন্তু জাকির নায়েক সম্পর্কে পূর্ব ধারণা থাকায় জানি যে, এই লোক নিজের যুক্তি সাজাতে মিথ্যাচার করতে, কোরআনের আয়াত নিজের ইচ্ছামত ব্যবহার করে সুকৌশলে নতুন ব্যাখ্যা হাজির করতে- এমনকি মাঝে মধ্যে কোরআনের আয়াত-শব্দের প্রচলিত অর্থ পাল্টে ফেলতে সিদ্ধহস্ত। তাই সুরা নিসার ৩ নং ও ১২৯ নং আয়াত দুটি একটু যাচাই করার চেস্টা করি। ১২৯ নং আয়াতটি পুরো পড়লেই বুঝা যাবে:
And you will never be able to be equal [in feeling] between wives, even if you should strive [to do so]. So do not incline completely [toward one] and leave another hanging. And if you amend [your affairs] and fear Allah – then indeed, Allah is ever Forgiving and Merciful.

অর্থাৎ, "তোমরা চাইলেও নারীদের মাঝে ন্যায়বিচার করতে পারবে না"- এটা বলার পরপরেই যখন আল্লাহ মুমিন বান্দাদের উদ্দেশ্যে আহবান জানায়- "সুতরাং তোমরা কোন একজনের প্রতি সম্পূর্ণ ঝুঁকে পড়ো না ও অন্যজনকে ত্যাগ করো না"- তখন কি বলা যায়, জাকির নায়েক এর টানা সিদ্ধান্তটা খোদ আল্লাহর টানা সিদ্ধান্তর অনুরূপ? একটা ফিল্ম এপ্রিসিয়েশন কোর্স করেছিলাম- সেখানে আইজেনস্টাইনের মনতাজ সম্পর্কে কিছু লেকচার দেয়া হয়েছিল। বিষয়টা অনেকটা এরকম। (আমার উদাহরণে বলছি)- ধরেন বারাক ওবামার একটা ৫ সেকেন্ডের শট - যেখানে ওবামা খুব উৎফুল্ল- দারুন হাসিখুশী- হাত তালি দিচ্ছেন। এডিটিং প্যানেলে এই শটের আগে আরেকটি শট যেখানে দেখা যায় ইরাকে বোমা ফেলা হচ্ছে- সেটা যুক্ত করে দিলে একরকম অর্থ তৈরি হয়, আবার পূর্ববর্তী শটে যদি নির্বাচনে জেতার নিউজ দেখানো হয় তবে আরেক অর্থ, পূর্ববর্তী শটে মিশেল ওবামাকে দেখালে একরকম অর্থ- আর হিলারি ক্লিনটনকে দেখালে আরেক রকম ইমপ্রেশন তৈরি হয়। সুরা নিসার দুই জায়গার দুটি আয়াতকে পাশাপাশি বসিয়ে একরকমের ইমপ্রেশন তৈরি চেস্টা দেখে মনে হলো- জাকির নায়েক ফিল্ম ডিরেকটর হলে খুব ভালো করতেন।

যাহোক, মোল্লাদের আরেকটি যুক্তি খুব জোরের সাথে করতে দেখা যায়- সেটা হলো: একের অধিক বিয়ে (চারটি পর্যন্ত) বিয়ে তো ফরজ না, সুন্নতও না, ওয়াজিব না, মুস্তাহাবও না। এটা কেবলমাত্র মুবাহ, মানে করলেও হয়- না করলেও হয়, একে কখনো উৎসাহিত করা হয়নি। অনেকে রেগে গিয়ে বলেই বসে- "আপনাকে তো বহুবিবাহ করতে বাধ্য করছে না- আপনার করতে ইচ্ছা না হলে করবেন না"। অবাক হয়ে ভাবি- এরা কি আপত্তির জায়গাটাই ধরতে পারছে না? বহুবিবাহ কেন নিষিদ্ধ নয়? কেন এটা একজন পুরুষের মর্জির উপর ছেড়ে দেয়া হলো? যে বহুবিবাহ করতে চায় না তাকে বাধ্য করা হচ্ছে না ঠিকই, কিন্তু মূল প্রশ্নতো- যে কামুক ব্যক্তি একের পর এক বিয়ে করে যেতে চায়- তার জন্য কি কোন বাধ্যবাধকতা রাখতে পেরেছে কোরআন?

না পারেনি। তবে কেন বাধ্যবাধকতা রাখেনি সেটার একটা বৈজ্ঞানিক কারণ হাজির করেছে জাকির নায়েকরা। বড়ই অভিনব সে কারণ। সেটাই তাহলে শুনি:
"সাধারনত নারীশিশু ও পুরুষশিশু সমান অনুপাতে জন্মায়। তবে নারীশিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি বিধায়, তুলনামূলক নারীশিশু বেশি বাঁচে। এছাড়াও যুদ্ধ-বিগ্রহে, নারীর তুলনায় পুরুষের মৃত্যুর হার বেশি। দুর্ঘটনা ও রোগে, পুরুষদের মৃত্যুর হার বেশি। এটা স্বীকৃত যে, পুরুষদের চেয়ে নারীরা বেশিদিন বাঁচে। এসব কারনে, যেকোন নির্দিষ্ট সময়ে জরিপ করলে দেখা যায়, বিপত্নীকদের চেয়ে বিধবার সংখ্যা বেশি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা ৭৮ লক্ষ বেশি। শুধুমাত্র নিউইয়র্কে পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা ১০ লক্ষ বেশি। নিউইয়র্কে মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ নারী। যুক্তরাষ্ট্রে ২ কোটি ৫০ লক্ষ পুরুষ সমকামী (নারীদের বিয়ে করতে উৎসাহী নয়)। কাজেই, যদি একজন পুরুষ একজন নারীকে বিয়ে করে তাহলে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই ৩ কোটি নারী সঙ্গীহীন থেকে যাবে। একইভাবে যুক্তরাজ্যে ৪০ লক্ষাধিক, জার্মানীতে ৫০ লক্ষাধিক, রাশিয়ায় ৯০ লক্ষাধিক নারী সঙ্গীহীন থাকবে। ধরা যাক, আমার বোন যুক্তরাষ্ট্রে সঙ্গীহীন অবস্থায় আছে অথবা ধরুন আপনার বোন যুক্তরাষ্ট্রে সঙ্গীহীন রয়েছে। তাহলে, তার সামনে ২টি পথ খোলা আছে। ১. বিবাহিত কোন পুরুষকে সঙ্গী হিসেবে মেনে নিতে হবে। ২. 'জনগণের সম্পত্তি (public property) হতে হবে।"

এই যুক্তি অভিনব তো বটেই, তারচেয়ে বেশি এটা অশ্লীল। সঙ্গীহীন থাকলে আমার বোনের সামনে দুটো পথই খোলা থাকবে? বিবাহিত পুরুষকে বিয়ে করতেই হবে, নচেত প্রোস্টিটিউশনে নামতে হবে? এই যুক্তির পক্ষে বলতে গিয়ে এক পর্যায়ে বলা হচ্ছে: "এটা ঠিক যে, অধিকাংশ নারীই স্বামীকে শুধু নিজের বলেই প্রত্যাশা করেন। কিন্তু বৃহত্তর স্বার্থে এই ক্ষুদ্র প্রত্যাশা ত্যাগ করা শ্রেয়"। অবাক লাগে- কতখানি পারভার্ট হলে এমন কথা লোকে বলতে পারে! নারীদের এরা কি চোখে দেখে?
আর জাকির নায়েক যে তথ্য-উপাত্ত দিয়েছে সেখানেও একটা বড় রকমের ফাঁক আছে। সেটাই এবারে দেখি:

জাকির নায়েকের তথ্যমতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানী, রাশিয়ায় পুরুষের চেয়ে নারীর মোট সংখ্যা বেশি হলেও গোটা দুনিয়ায় নারী-পুরুষ অনুপাত- ১:১.০৫, মানে পুরুষের সংখ্যাই বেশী।
এবারে আসুন বয়সের হিসেবে দেখি-
নারী:পুরুষ-
জন্মের সময়- ১:১.০৫
১৫ বছরের নিচে- ১:১.০৫
১৫-৬৪ বছর- ১:১.০২
৬৫ কিংবা তদুর্ধ- ১:০.৭৮

কাজেই দেখা যাচ্ছে এই যুক্তি তখনই খাটে যখন নবীন পুরুষ অতি প্রবীণ নারীদের বহুবিবাহ করে!!!!

এবার, জাকির নায়েকদের উল্লেখ করা যুক্তরাষ্ট্রের পরিসংখ্যানের দিকে তাকানো যাক।
যুক্তরাষ্ট্রে ১৩৪,৭৭৪,৮৯৪ জন পুরুষ এবং ১৪০,৭৮৭,৭৭৯ জন নারী।
অর্থাৎ ৬ মিলিয়নের মত নারী বেশি। এদের মধ্যে ৫.৯ মিলিয়নই কিন্তু ৬৫ বছরের উর্ধে!!
সেখান থেকে দেখা যাচ্ছে যে, ১৮ থেকে ৬৪ বছর পর্যন্ত নারী পুরুষের অনুপাত প্রায় সমান। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারী-পুরুষেরা মোটামুটি ১৮-৪০/৪৫ বছর বয়সে তাদের প্রথম বিয়ে করে থাকে বলেই জানি। সেক্ষেত্রে এক পুরুষ এক নারী বিয়ে করলে অনেক নারীকে বিয়ে করার মত পুরুষ পাওয়া যাবে না বলে যে দাবী করা হচ্ছে তা অবান্তর।

আর, ৬৫ উর্ধ নারীদের সংখ্যা বেশী। সেক্ষেত্রে দুটো বিষয় হতে পারে। এক: এরা বিবাহিত কিন্তু স্বামী মারা গিয়েছে অর্থাৎ এরা বিধবা; অথবা এরা ৬৫ বছর বয়স পর্যন্ত কোন কোন কারণে বিয়ে করেনি।

এই অংশটুকু যদি স্বামীর ঘর করতে চায় তবে পুরুষ পেতে সমস্যা হতে পারে। বিধবাদের ক্ষেত্রে বেশীরভাগ সময়ই দেখা যায় সন্তান-সন্ততি, নাতিপুতি নিয়েই এমন ব্যস্ত এবং সামাজিক অবস্থা এমনই যে বিয়ে করা হয় না, বা বিয়ে করার চিন্তাই মাথাতে আসে না। কেননা, মেনোপেজের পরে শারীরিক চাহিদাটাও সেরকম থাকে না, ফলে সঙ্গী শুধু মানসিক সঙ্গের জন্যই প্রয়োজন হতে পারে, সেটা সামাজিক পরিমণ্ডলই পূরণ করতে পারে। আর যাই হোক পোস্টদাতার কথা মত অন্য বউ আছে এমন লোককে ৬৫ বছরের এক বুড়ি বিয়ে করতে না যাওয়ারই কথা, আর পাবলিক সম্পত্তিতে পরিণত হওয়াটা তো শুধুই পাগলের প্রলাপ।
আর ৬৫ বছর পর্যন্ত বিয়ে না করে থাকলে, ৬৫ বছর পার হওয়ার পরে বিয়ে করার জন্য উতলা হবে এমন সম্ভাবনাও কম দেখি। আর যদি ৬৫ বছরে এসে বিয়ে করতে মনস্থির করে শেষে পাত্র যদি নাই পাওয়া যায়, তবে সেটাও মনে হয় সেই নারী মেনেই নিবেন। পাবলিক সম্পত্তিতে পরিণত হওয়া বা সতীনের ঘরে প্রবেশ করার সম্ভাবনা পোস্টদাতার মত কিছু ধর্মান্ধের প্রভাবপুষ্ট নারী আত্মীয় স্বজনেরা ব্যতিত কমই দেখি।

এবারে আসুন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যেখানে বহুবিবাহের হার অন্যান্য দেশের চেয়ে অনেক বেশি সেগুলোর নারী-পুরুষের অনুপাত দেখি-
নারী : পুরুষ-
বাহরাইন- ১ : ১.৩
জর্দান- ১ : ১.১
কুয়েত- ১ : ১.৫
ওমান- ১ : ১.৩১
কাতার- ১ : ১.৯৩
সৌদি আরব- ১ : ১.২৪
আরব আমিরাত- ১ : ১.৫১
(২০০০ সাল পর্যন্ত)
উপর থেকে নিঃসন্দেহে বলা যায় যে এরা কেউই নারীর আধিক্যের কারণে বহুবিবাহ করেনা। এটাও খেয়াল রাখতে হবে যে এই নারীদের অনেকেই ৬৫ বছরের উর্ধে, কাজেই বিবাহযোগ্য নারীর সংখ্যা কিন্তু আরো কমে যাচ্ছে!!

মোহাম্মদ লোমান এর পোস্টে জানানো হয়েছে- "বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে বহু বিবাহ প্রয়োজন হয়ে পড়ে। সে প্রয়োজনকে সামনে রেখেই ইসলাম বহু বিবাহের অনুমোদন দান করেছে। এখন আসুন আমরা জেনে নেওয়ার চেষ্টা করি বহু বিবাহের সেই বিশেষ প্রয়োজনীয় দিক গুলি কি কি? (১) কেউ তার বংশের ধারা অব্যাহত রাখতে ইচ্ছুক; কিন্তু তার বর্তমান স্ত্রী সন্তান ধারণে অক্ষম। এ ক্ষেত্রে পুরুষ বর্তমান স্ত্রীকে সাথে রেখে আরেকটি বিয়ে করতে পারেন। (২) বর্তমান স্ত্রী স্বামীর যৌন চাহিদা মিটাতে অক্ষম হলে (৩) কোন কোন মানুষের যৌন শক্তি খুব প্রবল ও প্রচন্ড হতে পারে। এ ক্ষেত্রে তার একাধিক বিয়ের প্রয়োজন হতে পারে। (৪) যুদ্ধ বিগ্রহ-মহামারী- ‍দুর্ঘটনা ইত্যাদির কারণে কোন দেশে পুরুষের সংখ্যা সাংঘাতিক ভাবে হ্রাস পেলে মহিলাদের সার্থেই বহু বিবাহ প্রয়োজন হতে পারে। উপরোক্ত ক্ষেত্রে সমাজ এবং মহিলাদের উচিৎ সহেযোগীতা করা"।

এই সমস্ত যুক্তিকে মানতে হলে- আরো কিছু প্রশ্ন চলে আসে- জাকির নায়েকরা সেসবের জবাব কেমন করে দিবেন?
# এই সমস্ত ঘটনা কোন নারীর সাথে হলে , মানে ১) কেউ তার বংশের ধারা অব্যাহত রাখতে ইচ্ছুক; কিন্তু তার বর্তমান স্বামী সন্তান উৎপাদনে অক্ষম হলে, (২) বর্তমান স্বামী স্ত্রীর যৌন চাহিদা মিটাতে অক্ষম হলে (৩) কোন কোন স্ত্রীর যৌন শক্তি খুব প্রবল ও প্রচন্ড হলে (৪) কোন কারণে কোন দেশে নারীর সংখ্যা সাংঘাতিক ভাবে হ্রাস পেলে ------ তখন কি নারীর বহু স্বামী জায়েজ হবে?
# যদি লিঙ্গনির্দিষ্ট গর্ভপাত নাও করা হয়, জীববৈজ্ঞানিক নিয়ম অনুসারেই একটি জনগোষ্ঠীতে জন্মগ্রহণের ক্ষেত্রে মেয়ে শিশুর অনুপাতের থেকে ছেলে শিশুর অনুপাত বেশি থাকে (জার্মানিতে ৯৪:১০০)। কিন্তু সমান সুযোগ-সুবিধা পেলে বিভিন্ন বয়স-বর্গে মেয়েদের থেকে ছেলেদের মৃত্যুর সম্ভাবনা বেশি হওয়ার ফলে মোট জনসংখ্যায় নারীর আধিক্য দেখা যায়। বাংলাদেশে লিঙ্গনির্দিষ্ট গর্ভপাত ধর্তব্যের মধ্যে না হলেও, খাদ্য, পুষ্টি, চিকিৎসা পরিষেবা ও পরিচর্যার ক্ষেত্রে বৈষম্য থাকায় পুরুষের আধিক্য (১০৬:১০০) রয়েছে। আপনাদের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা (!) অনুযায়ী এখানে প্রায় ৩০ লক্ষ পুরুষ অবিবাহিত থেকে যাবে। তাদের জন্য সমাধান কি?
# যুক্তরাষ্ট্রের সমকামী পুরুষদের হিসাবের পাশে সমকামী নারীর হিসাবকে কেনো গোপন রাখা হলো?
# পাশ্চাত্যে যেমন অনেক পুরুষ বিবাহের বাইরে সম্পর্ক বজায় রাখে, অনেক নারীও নিশ্চয়ই রাখে। এই প্রসঙ্গ কতটা প্রাসঙ্গিক?

পরবর্তী বা শেষ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29046678 http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29046678 2009-11-20 12:25:39
বিতর্ক পোস্ট: বিষয়- পতিতাবৃত্তি (উৎসর্গ: ফাহমিদুল হক) "অশ্লীল সাহিত্য থেকে নীলছবি; পর্নোগ্রাফির বিবর্তন" শীর্ষক চমৎকার সিরিজের শেষ পর্ব(Click This Link) এবং তার কমেন্টের ডিবেটগুলো পড়ে বেশ কিছু জায়গায় তাঁর সাথে একমত পোষণ করতে পারছি না। ঐ পোস্ট যেহেতু অনেক পুরাতন- তাই দ্বিমতের জায়গাগুলো তুলে ধরে স্বতন্ত্র পোস্ট হিসাবেই দিচ্ছি।

------------------------------------------
পতিতালয় অবশ্যই সমাজে থাকা উচিত। সামাজিক নৈতিকতা রক্ষায় পতিতাদের অবদান অনস্বীকার্য।
==>> আপনার কাছ থেকে এই লাইনগুলো দেখে কিছুটা হোচট খেলাম। হতাশবোধ হচ্ছে। সামাজিক নৈতিকতা রক্ষায় পতিতাদের অবদান কোথায় একটু জানাবেন কি?

বিবাহিত পুরুষদের যদি ধরে নিই শরীরের চাহিদা মেটানোর সুযোগ আছে, অবিবাহিতদের সেই সুযোগ কোথায়? পতিতালয় একটা অপশন হতে পারে। এতে ধর্মের কিছু আসলে গেলেও সমাজের অনেক উপকার হয়। যৌনতাড়িত ঐসব পুরুষ নয়তো সমাজে অনাসৃষ্টির কারণ হবে। সভ্যতার শুচিতা পতিতালয় দ্বারা খানিকটা রক্ষিত হয়।
# অবিবাহিতা নারীদের শরীরের চাহিদা মেটানোর সুযোগের কথা কি ভেবেছেন আপনি?
# পতিতাগমনে বিবাহিত পুরুষদের হার কেমন জানেন?
# ধর্মের আলোচনা অবান্তর, ধর্মের কিছু যায় আসে না- ধর্মগুলোও একইভাবে পুরুষতান্ত্রিকতার কথা বলে।
# পুরুষমাত্রই কি যৌন তাড়িত? প্রকৃতিগতভাবেই? নাকি আজকের সমাজের এই সমস্ত আয়োজনই একজনকে পুরুষকে যৌনতাড়িত পুরুষে পরিণত করে? পতিতাবৃত্তি কি আসলে আপনার ঐসমস্ত অনাসৃষ্টি রোধ করতে পারে?
# যৌন তাড়না নিবৃত্তির জন্য কি পতিতাগমনই অত্যাবশ্যক? ফ্রি সেক্স- দুজন নর-নারীর সম্মতিতে সেক্স এর মাধ্যমে সেটা নিবারিত হলে আপত্তি কিসে? যে সমাজে এরকমের চল আছে- এবং সেটা সহজসাধ্য (সামাজিক প্রতিবন্ধকতা নেই) সেখানেও পতিতাবৃত্তির ক্ষেত্রে আপনার এই অনাসৃষ্টির যুক্তি কি অচল নয়?
# সভ্যতার শুচিতা জিনিসটা আসলে কি? সেটা কেমনে রক্ষিত হচ্ছে?

আমি যখন বলছি "সামাজিক নৈতিকতা রক্ষায় পতিতাদের অবদান অনস্বীকার্য" তখন বোঝাতে চাইছি যে একজন যৌনকর্মীর পেশাটি মোটেই অবমাননাকর নয়। সমাজে তারও কিছু অবদান আছে। এটা নিয়ে তার হীনম্মন্যতা থেকে মুক্তি দরকার।...... যখন বলছি 'পতিতালয় থাকা উচিত', তখন একে নিয়ে যে ভদ্রলোকী অস্বস্তি সমাজের, তার বিপরীতেই বলছি।
===>> "এটা নিয়ে তার হীনম্মন্যতা থেকে মুক্তি দরকার" এই কথাটাই হচ্ছে চরম হিপোক্রেসিতে ভরা। কিভাবে হীনমন্যতা দূর করবেন? স্বেচ্ছায় এই পেশায় গমন করে কয়জন? আমার বোন বা আমার মেয়েকে কি এই পেশায় যেতে উদ্বুদ্ধ করতে পারবো? যে এই পেশায় স্বেচ্ছায় যায় না- সে যখন বাধ্য হয়, তখন হীনমন্যতা কি থাকবে না? সমাজের প্রতি তাদের অনেক অবদান- এই কথা বলে তাদের হীনমন্যতা দূর করবেন? কিসের অবদান? কোন অবদান? আপনি আপনার সভ্য সোসাইটিতে তাদের কোন অবস্থান রাখবেন না- আর হীনমন্যতা দূর করবেন!! চরম হাস্যকর কথা!
তবে এটা ঠিকই বুঝা যায় যে, আপনি ভদ্রলোকী অস্বস্তি নিয়েই বেশি ভাবিত। পতিতাদের অবদান মেলা, তারা পতিতা নয়- যৌনকর্মী, এই পেশায় হীনমন্যতার কিছু নেই, দুনিয়ার সব সমাজেই এটা ছিল- আছে... এসবে নিশ্চয়ই ভদ্রলোকেরা তাদের অস্বস্তি থেকে মুক্তি পাবে- বিপরীতে পতিতারা যৌনকর্মী হলেও যে তাদের অবস্থানের ইতরবিশেষ কিছু ঘটে না বা ঘটবে না- সেটাও ভদ্রলোকেদের ভালোই জানার কথা, আর জানে বলেই- তারা বড় বড় একাডেমিক রচনা লেখে- নানাবিধ তত্তকথা শুনায়- শুনিয়ে জানান দেয়- এই পেশার খুবই জরুর, সভ্যতার জন্যই নারীদের যৌনকর্মী হওয়া দরকার- যৌনকর্মীদের বহুত অবদান, ফলে তাদের প্রতি সম্মান দিতে হবে, অধিকার দিতে হবে.... ইত্যাদি।

পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কোনো জাতি বা সভ্যতা সম্ভবত ছিলনা যা পতিতালয়-মুক্ত। বর্তমান সময়েও এমন কোনো সমাজ নেই সম্ভবত নেই যেখানে পতিতালয় নেই। 'সভ্যতা'র বা মানবসমাজের একটা অংশ হিসেবেই একে ধরে নিয়েছি।
===>> এটা হলো আজকের দুনিয়ার সবচেয়ে বড় প্রচলিত মিথ্যাচার। আজকের যাবতীয় অন্যায়-অপরাধ, সমাজের যা কিছু ক্ষত- সবকিছুকেই ইতিহাস টেনে বলে দেয়া যে- সব সময় সব জায়গাতেই এমনটা ছিল- এমনটাই থাকবে। ইতিহাসের সবসময়ই মানুষ লোভী ছিল - থাকবে, মানুষ সবসময়ই একে অপরের উপর ক্ষমতার চর্চা করেছে- করবে, শোষণ সবসময় ছিল- থাকবে... ইত্যাদি। আপনার এই আলোচনাও তাই নতুন নয়।

এগুলো এমনই মিথ্যাচার যে- সাধারণ মানুষ খুব সহজেই বিভ্রান্ত হয়- নিজের বর্তমান অবস্থাকে- চারপাশের জগতকেই সবচেয়ে ভালো দেখা যায় বলে এমন কথাকে সত্য বলে মনে হয়, আর সেই সুযোগটাই নেয়া হয়। কিন্তু একাডেমিশিয়ানরা যখন এসব মিথ্যাকে আকড়ে ধরে- যুক্তি হিসাবে হাজির করে- তখন খুব বিরক্তি তৈরি হয়। আজকে তো মানুষ অনেক পুরান যুগের সংস্কৃতির সন্ধান পেয়েছে- আগের জামানার ইতিহাস তো অনেককিছুই মানুষের জানা, নৃতাত্তিক নানা গবেষণাও আজ হাতের মুঠোয়- সেগুলোতে চোখ বুলানো কি খুব কঠিন?

মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় কি পতিতাবৃত্তি ছিল? সেই আমলকে কি আপনি পৃথিবীর ইতিহাস বলবেন না? নাকি আপনার পৃথিবীর ইতিহাস পুরুষতান্ত্রিকতার শুরু থেকে শুরু হয়েছে? আজকের বিভিন্ন আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যেও যে পতিতাবৃত্তি নাই- সেটাকে কি বলবেন? নাকি তারাও আপনার ইতিহাসে স্থান পাওয়ার যোগ্য নয়?
কেন পতিতালয়ের সৃষ্টি হয়েছে, যৌনকর্মীরা কেন এই পথে আসেন -- এইসব সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে যেতে আমি আপাতত আগ্রহী না। আমি বরং যৌনকর্মীদের সম্মান ও অধিকারের দিকে মনোযোগী।
===>>> এর দ্বারাই আরো পরিষ্কারভাবে আপনার বা আপনাদের (তথাকথিত মানবাধিকার কর্মীদের বা মানবসম্পদ উন্নয়নে কর্মরতদের) উদ্দেশ্যটা বুঝা যায়, আগেই বলেছেন- আপনাদের মতে সমাজে পতিতাবৃ্ত্তির প্রয়োজন আছে- মানে আপনারা পতিতাবৃত্তি চান- আর চান বলেই ঐসব সমাজতাত্তিক বিশ্লেষণে (কেন পতিতালয়ের সৃষ্টি হয়েছে, যৌনকর্মীরা কেন এই পথে আসেন) আগ্রহী হন না- মানে সেগুলোকে এড়িয়ে গিয়ে তথাকথিত অধিকার-সম্মান এসবের মনভুলানো কথা আউড়ান!

শরীর বেচার মত মর্মান্তিক কাজটিকে আপনারা মহিমান্বিত করতে চান, একে হাত-পা-মাথার কাজের সাথে এককাতারে ফেলে সমান মর্যাদা দেয়ার কথা বলা বা কাজের অধিকারের কথা বলেন। কিন্তু এসব যে- এই পেশাটাকেই জিইয়ে রাখার লক্ষে- তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। আমার ড্রইং রুমে, আমার কর্মস্থলে, আমার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, আমার বন্ধু-বান্ধব-সোসাইটি-আড্ডায় কোন জায়গায় তো ওদের সাথে মুখোমুখি হতে হচ্ছে না- ফলে গল্পে-বক্তৃতায়-সিম্পোজিয়ামে-থিসিস পেপারে এদের নিয়ে সুন্দর সুন্দর দুচারটি কথা বললে সমস্যা কি?

সেদিন সানন্দার একটা সংখ্যায় চোখ গেলো- দেখি সেখানে গৃহপরিচারিকার প্রতি কেমন ব্যবহার/আচরণ করা দরকার সে সম্পর্কে বার পনেরটা টিপস আছে। আপনার সম্মান আর অধিকারের কথা শুনে- মনে পড়ে গেল।

পুনর্বাসন আর উচ্ছেদ-এর ডাইকোটমির মধ্যে যৌনকর্মীদের ফেলে এই 'অবমাননাকর' পেশার অধিক হেনস্থা করা হয় মাত্র। ..... শামিম ওসমান নারায়ণগঞ্জকে ভদ্রলোকের শহর বানাতে চেয়েছিলেন, যেজন্য টানবাজার থেকে যৌনকর্মীদের উৎখাত করা হয়েছিল। কিন্তু এর যে অন্য রাজনীতি আছে সেটাও সবাই বোঝে। তাই পতিতালয় বন্ধ হবার ভদ্রলোকী দাবিতে আমি নাই।
===>> শিমুল আর শুভ্রের আলোচনার জের এ শামিম ওসমানদের প্রসঙ্গ টানাকে খুব কাচা কাজই মনে হলো! শিমুলকে বলে দেখুন সে এরকমভাবে পতিতালয় উচ্ছেদ চায় কি না। শুভ্র তো মনে হয়- শামিম ওসমানদের ঐ উচ্ছেদ কার্যের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগ্রামেও ছিল।

দেখুন টানবাজার উচ্ছেদ তো দূরের কথা- আমি তো এই মুহুর্তে মনে করি- এই মুহুর্তে এক ঢাকা শহরেই টানবাজারের মত অন্তত আরো ডজনখানেক পতিতালয় দরকার, সমস্ত ভাসমান যৌনকর্মীদের একুমুলেট করতে যতটা দরকার- ততটাই করতে হবে। কিন্তু সেই সাথে আমি অবশ্য অবশ্যই পতিতাবৃত্তির উচ্ছেদ চাই। পতিতাবৃত্তির উচ্ছেদকে পতিতালয় উচ্ছেদ হিসাবে গণ্য করাটা অপরিণত মস্তিষ্কজাত ছাড়া কিছুই না। এই বৃত্তির উচ্ছেদে আপনি যে সমাজতাত্তিক বিশ্লেষণে আগ্রহী না বলেছেন- সেটারই দরকার সবচেয়ে বেশি, কেন ও কিভাবে একজন নারী যৌনকর্মী হয়ে উঠে- এই আলোচনা ছাড়া কোনভাবেই পতিতাবৃত্তি বন্ধ করা সম্ভব না- আপনার উল্লেখিত শামিম ওসমানীয় পন্থায় পতিতালয় বন্ধ করে তো নয়ই।

একই কারণে পর্নোগ্রাফি বন্ধ করার আহ্বান জানাতে আমি জোর পাইনা। বরং এটা যে পুঁজিতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার অনিবার্য পরিণতি, একটা বিলিয়ন ডলারের ইন্ডাস্ট্রি, একটা অচলায়তন -- আমার আওয়াজে এর সামান্য কেশও স্পর্শ হয়না। আমি বরং এর আধেয়তে পরবির্তন আনতে আগ্রহী। যে এতে নারীর দৃষ্টিভঙ্গীর অনুপ্রবেশের পক্ষপাতী। পুরুষরে পাশাপাশি নারীর দৃষ্টিতে যৌনতাকে দেখতে আগ্রহী। সত্যি কথা হলো 'নারী নিচে পুরুষ ওপরে' -- যৌনশাস্ত্রে এরকম অলঙ্ঘনীয় সঙ্গমকাঠামোর অনিবার্যতার বর্ণনা আছে বলে আমার জানা নেই।
====>> হাস্যকর ঠেকলো। পুঁজিতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার অনিবার্য পরিণতি বলে, এর কেশও স্পর্শ করতে পারবেন না বলে- আধেয়তে পরিবর্তন আনতে চাইছেন! সেটাই কি আপনি পারবেন? বা পারছেন? পর্নোগ্রাফিতে নারীর দৃষ্টিভঙ্গির অনুপ্রবেশ কিভাবে ঘটাবেন? উপর আর নীচের বিষয়টি পাল্টিয়ে? সঙ্গম দৃশ্যের শেষে নারীর মুখে গায়ে বীর্যপাতের দৃশ্য বন্ধ করে? হাস্যকর!


আপনি বলছেন "পর্ণোগ্রাফির প্রয়োজনীয়তা কোথায়। কোথাও নেই।"
অথচ আপনি [হয়তো] ঠিকই একজন পর্নোগ্রাফির ভোক্তা। আমি এটাও জোর করে বলতে পারিনা যে পর্নোগ্রাফি কারও কোনো ধরনের প্রয়োজনই মেটায় না।.....পর্নোগ্রাফির ভোক্তা হবার প্রাপ্তবয়ষ্ক দাবিকে আপনি উড়িয়ে দিতে পারেননা। আমি একে অপ্রাপ্তবয়ষ্কদের কাছ থেকে দূরে রাখতে চাই। একই কারণে শিশুদের পর্নোগ্রাফিতে ব্যবহারের ঘোর বিরোধী
===>> ভোক্তা হলেই কি সেটা দাবি হয়ে যাবে? কিশোরদের এগুলো সবচেয়ে বেশি টানে। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ব্যাপারে পরিসংখ্যান থেকে
জানা যায় যে- পর্নোসাইটে হিটকারীদের মধ্যে অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোররাই শীর্ষে। ফলে- আপনি কি বলবেন, এই অপ্রাপ্তবয়স্কদের দাবিকে উড়িয়ে দেয়া যাবে না? অন্যের যৌনাঙ্গ বা সঙ্গমদৃশ্য দেখার মাধ্যমে যৌনসুখলাভ করাটাকে আপনি প্রাপ্তবয়স্কের দাবি হিসাবে উল্লেখ করছেন?


আমি তো পেশাটি নিয়ে গৌরাবান্বিত হবার কথা বলিনি। আমি বলেছি যে একজন যৌনকর্মী যদি সামাজিক কারণে হীনম্মন্যতায় ভোগে , তবে সেই হীনম্মন্যতাকে কমিয়ে আনার চেষ্টা করা দরকার। তাকে একটা পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দেবার কথা বলেছি। যেজন্য একজনের বেশ্যাকে আজ যৌনকর্মী হিসেবে ডাকা হয়ে থাকে
===>> একটা পেশায় যদি গৌরাবান্বিত হওয়া সম্ভবই না হয়- তবে কি করে আপনি হীনমন্যতা দূর করবেন? বেশ্যাকে যৌনকর্মী বলার মধ্য দিয়ে?

সমস্যা তো উপসংহার নিয়ে, যৌনকর্মীদের প্রসঙ্গ বাদ দিই, উপসংহারটা কেমন হলে ভালো হতো, আপনারা এইবেলা বলেন।
===>> প্রবন্ধটি যেহেতু আপনার- উপসংহারটাও তো আপনাকেই টানতে হবে। আপনি যে উপসংহার টেনেছেন- সেটার কোন কোন জায়গা ভালো লাগেনি- সেটা যথেস্টই আলোচিত হয়েছে- সেখান থেকে কি বুঝতে পারেন নি- কেমন হলে ভালো লাগতো?


পাদটীকায় এটা বলা যায় এই প্রবন্ধ রচিত হয়েছে সাংষ্কৃতিক অধ্যয়ন বা কালচারাল স্টাডিজ ধারায়, এবং কালচারাল স্টাডিজ কালচারাল কন্টেন্ট নিয়ে বিশ্লেষণ করে, বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে কালচারাল প্রোডাক্টকে যদিও সম্পর্কায়িত করার মাধ্যমেই তা করে থাকে। কিন্তু পণ্যের উৎপাদন-সম্পর্কের জায়গায় ঝাঁকুনি দেয়না। উহার দায়িত্ব অন্য কারও হাতে ন্যাস্ত আছে।
===>> কালচারাল স্টাডিজ কেবল কালচারাল কনটেন্ট নিয়ে বিশ্লেষণ করবে, তা উৎপাদন-সম্পর্কের জায়গা ধরে ঝাঁকুনি দিতে পারে না- এমন বাঁধাধরা নিয়ম কোথায় পেলেন?

অন্য কারো হাতে ন্যাস্ত আছে- বলে নিজের দায়িত্বটুকু এড়িয়ে যাচ্ছেন নয় কি? আর তাছাড়া কমেন্টের ডিবেটগুলোও কি আপনার কালচারাল স্টাডিজের অন্তর্ভুক্ত?]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29044462 http://www.somewhereinblog.net/blog/nastikerdharmakathablog/29044462 2009-11-16 17:50:28