---------------------------------------------------------
সেদিন একই সাথে আমি প্রথম দেখি মুন্নিকে। স্নিগ্ধ চেহারা আর হাল্কা-পাতলা গড়নের একটা মেয়ে। আমাদের স্বপ্নে দেখা অলীক কোন সুন্দরী পরী নয়, কোমল মাটি দিয়ে গড়া আগাগোড়া একটি বাঙালি মেয়ে। যার সারা দেহেই আছে মাটির গন্ধ, ভালবাসার সুবাস আর আজাদের মতই মানুষকে সহজে আপন করে নেবার দুর্লভ ক্ষমতা। এরপর দিন গেল, বছর গেল; আজাদ হয়ে উঠলো আমার বন্ধু, আমার গুরু, আমার সমালোচক আবার প্রশংসাকারীও। নতুন নতুন বন্ধু হল, চিন্তার বিকাশ হল; ভালবাসলাম আমি নিজেকে নতুন করে, চিনলাম পুরাতন আমার ভেতর লুকিয়ে থাকা সত্যিকারের আমাকে।
কতদিন কতজায়গায় কথা হয়েছে আজাদের সাথে। কথা হয়েছে কত বিচিত্র বিষয় নিয়ে, প্রেম-ভালবাসার মূর্ত-বিমূর্ত মাত্রা নিয়ে। মাঝে মাঝে ও মুন্নিকে নিয়ে আসতো। মুন্নির মনের স্বচ্ছতা আমাকে মুগ্ধ করতো। ওদের ভেতরকার অবিচ্ছেদ্য ভালবাসাকে আমি সহজেই উপলব্ধি করতে পারতাম।ওদের সাথে মিশে মনের পরতে পরতে জমে থাকা এতদিনকার দূষিত ধূলাবালিগুলো যেন ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে আসছিল। মনে ঠাঁই নিচ্ছিল শীতল, সবুজ পাড়ে ঘেরা স্বচ্ছ একটা নদী। যে নদীর বাঁকে বাঁকে গাছেরা নিঃস্বার্থ ছায়া দিয়ে শান্ত রাখতো আমায়। এভাবেই আজাদ আমাকে আমর এই অজানা নদীটির সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। রঙিন প্রজাপতির ডানায় ভর করে ফুল হতে মধু আহরণ করতে শিখিয়েছিল, বলেছিল কিভাবে নদীতে ডুব দিয়ে উষ্ণ ভালবাসা পাওয়া যায়।
আজাদ কখনও সে নদীতে বাঁধ দেয়নি কিংবা নদীর ধারা বদলাতেও চায়নি, সে শুধুই নদীর ধারে ধারে একটা করে ছায়াদানকারী বৃক্ষের বীজ রোপণ করেছিল। কিন্তু আলো, হাওয়া দিয়ে সেটাকে বড় করেছিলাম যে আমি- সেও তার অনুপ্রেরণায়, তার উৎসাহে। আজাদ সবসময় বলত সে হবে পুরোপুরি স্বাধীন; তবে সে স্বাধীনতা মানে পুরনো মায়ার বন্ধন কেটে বেরিয়ে যাওয়া নয়, তার স্বাধীনতা ছিল তার মনে, তার চিন্তা করার ক্ষমতায়। এমনি করে কেটে গেল কত দিন, বুঝতে পারিনা আজ কিভাবে এত সহজেই এতটা সময় পার করে আসলাম। ওর সাথের অন্য বন্ধুদের নিজেদের মত করে চিন্তা করার ক্ষমতা দেখে কতবার যে অবাক হয়েছি, তখন নিজেকে খুব ছোট বলে মনে হত, ভাবতাম আমার চিন্তা-চেতনা এতটাই সংকুচিত!
তখনই ওর স্বচ্ছ শীতল মনের পরিচয় পাওয়া যেত আরো বেশি করে। হয়তোবা ডেকে নিয়ে গেল আমাকে কোন পার্কে, তারপর পাশে বসে ও বলতো, “ সবসময় এত মন খারাপ করে থাকিস কেন”? মন খারাপ ভাবটা একটা ফ্যাকাসে হাসিতে ঢেকে হয়তোবা আমি বলতাম, “ মন খারাপ থাকে তাই”। ও হেসে ফেলতো আর বলতো, “ নিজেকে এত ছোট ভাবিস না তো! যত ছোট ভাববি, আনন্দ পাওয়ার সব উপকরণ তো তোর সামনে ততই রঙ হারিয়ে ফেলবে”। আমি আর হতাশা চাপতে না পেরে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলি, “ তোরা এত নিঃস্বার্থ ভাবে এত কিছু কিভাবে চিন্তা করিস? আর...আর...তোদের কাজ। এত উদ্যম, এত সাহস তোরা পাস কোথায়”?এবারো আজাদ হেসে বলে, “ তুই তো দেখি নিজের ভিতরের পরশপাথরটাকেই এখনো চিনতে পারলিনা! সবাই যে একরকম না তা কি তোকে আর বলে দিতে হবে”! আমি কিছু একটা বলে গিয়ে থেমে যাই। ও সাথে সাথেই বলে, “ বল্না, যা বলতে চাচ্ছিলি। মনের ভিতরে এসব পুষে রাখতে থাকলে, এরা তোকে একদিন ঠিক গ্রাস করে নেবে”। এবার আমি আর হতাশা ঢাকতে পারি না, চরম হতাশা নিয়ে বলি, “ তোরা এত ভাল! তোদের মধ্যে কোন ভন্ডামি নাই, মেকিত্ব নাই, আর এই যে দেখ আমি, কেমন জানি পুরটাই একাটা ভন্ডামি তৈরির কারখানার মত। আসলে আমার খাঁটি চিন্তাগুলি কি, ভান করতে করতে সেইটাই ভুলে গেছি”! ও এবার একটু অবাক হয়ে বললো, “তুই আবার কখন ভান করিস? আর একটু-আধটু ভান তো আমাদের সবাইকেই করতে হয়, নাহলে তো পুরো পৃথিবীতে সবাই সবার শত্রু হয়ে যেত”। আমি এবার রেগে গিয়ে বলি, “ এই যে আমি তোর সামনে এত স্বপ্নের কথা বলি, আবার ভালো ভালো গাল-ভরা কত প্রস্তাব দেই- কিন্তু এগুলোত আসলে ভুয়া, সবটাই ভেজাল। এসব প্রস্তাবের কণা পরিমান বাস্তবায়নে যে শ্রম-মেধা আর সবচেয়ে বড় কথা যে ইচ্ছাটার দরকার তার কোনটাই তো আমার নাই! খালি উপরে উপরে মুখ ভরে ভাল-ভাল নীতিকথার বমি করি; কাজের সময় তো তুই আমার ইয়েটাই দেখবিনা। যার কোন কাজই ঠিকমতো করার ইচ্ছা আর যোগ্যতা নাই, তার এতসব ফাঁকা বুলি ঝাঁড়া তো ভণিতারই সমান”।
আমার পুরো কথাটাই ও শুনলো, বেশ চুপচাপই ছিল, কিন্তু উত্তরটা সাথে সাথেই দিল না, একটু যেন সময় নিল উত্তরটা গুছাতে। আর এদিকে নিজের উপর ঘৃণাতে মুখটা যেন তেতো হয়ে গেছে, মনে হচ্ছে চিনির সমুদ্র মুখে ঢেলে দিলেও কিছু হবেনা। নিজের উপরে বিরক্ত হয়ে যখন মুখ লুকিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে আছি, তখন আজাদ কথা বলে, ছোট একটা কথা। কিন্তু ও যে সেটা মনে-প্রানে বিশ্বাস করে তাতে বিন্দু-মাত্র কোন সন্দেহ নাই। ও বললো,” তুই যে কথাগুলো বললি, সেগুলো আমি চিন্তা করেই একটা কথা বলবো, আর সেটা হচ্ছে, মানুষের কোন ঘটনা বিশ্লেষনের ক্ষমতা প্রতিনিয়তই বদলায় আর সেই সাথে তার পরিবেশও। তাই তুই নিজেকে এখন যে ভাবে ছিঁড়ে-খুঁড়ে দেখছিস, আস্তে-আস্তে তোর দেখার ধরণ বদলাবে, বদলাবে তোর নিজেকে বিশ্লেষন করার দৃষ্টিভঙ্গিও। আর আমি এইটা বিশ্বাস করি যে একদিন তুই নিজেকে অন্যভাবে চিনতে পারবি। সেই ক্ষমতা তোর আছে, আর সেইটা কোন মেকি ভেল্কিবাজি নয়”। এরকম কত কথা হতো আজাদের সাথে, ওদের বন্ধুদের আড্ডায়। আজাদ ছিল খুবই সহজ-সরল আর তাই কোথাও তার কোন ভন্ডামি চোখে পড়তোনা।এই এরকম একটা সময়ে বারবার আজাদ অসুস্থ হয়ে পড়তে লাগলো। বেশ দুর্বল হয়ে পড়লো সে, চেহারা থেকে কোথায় যেন হারিয়ে গেল সেই সারল্যমাখা উজ্জ্বল আভাটা।তবুও তার চোখ দুটি ছিল তার হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা চকমকি পাথরের মত উজ্জ্বল আর শান্ত। তার ঐ চোখজোড়া সবসময়ই ছিল আমার ঈর্ষার বস্তু। আমি সবসময় অবাক হয়ে ভাবতাম, কিভাবে সম্ভব একজন মানুষের মনের স্বচ্ছতা চোখের গভীরে মিলিয়ে যাওয়া। আর আমি জানি আমি চিরকালই ঈর্ষা করে যাব ঐ শান্ত তেজস্বী চোখজোড়াকে, যেন ওর চোখ ছিল ওর প্রাণ, ওর চিরসবুজ শক্তির উৎস।
(চলবে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

