আমার প্রিয় পোস্ট

রবীন্দ্রনাথও মানুষ ছিলেন।

০৭ ই আগস্ট, ২০০৮ রাত ৩:৪৬

শেয়ার করুন:                   Facebook

রবীন্দ্রনাথ আমাদের প্রাণের মানুষ। বাঙালীর জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ অপরিহার্য। যেকোন বিষয়ে তাকে কোট করা যায়, সববিষয়ে তার কিছু না কিছু অবদান আছে। ঈশ্বরচন্দ্র, রামমোহন যে ভাষার আদিগুরু, রবীন্দ্রনাথ সে ভাষাকে মানে ও গুণে, প্রচার-প্রসারে বিশ্বমানে উন্নীত করেন। এজন্যে তাঁর কাছে বাঙালী মাত্রেই চিরঋণী। কিন্তু তার জীবনী পর্যালোচনায় আমরা সবসময় এত উচ্ছসিত হই যে তার ভুলগুলো সচেতন বা অসচেতনভাবে এড়িয়ে যাই।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন আগাগোড়া সামন্ততান্ত্রিক। বাবার জমিদারী দেখাশোনা করতেন, জমিদার হিসেবে তিনি হয়ত ভাল ছিলেন,অনেক প্রজাহিতকর কাজ করেছেন। প্রজাদের চিকিতসার জন্যে হোমিওপ্যাথি শিখেছেন, কৃষিব্যাংক সৃষ্টি করেছেন। তারপরেও তিনি একজন জমিদারই ছিলেন, বজরায় থাকতেন, দরিদ্র কৃষক-প্রজাদের কাছ থেকে বছর বছর খাজনা আদায় করতেন। এ কাজে হয়ত পারদর্শীই ছিলেন, না হলে পিতা দেবেন্দ্রনাথ এত পুত্র থাকতে তাকে এ কাজের ভার দিতেন না, বা বেশীদিন করতে দিতেন না।

পারিবারিক জীবনেও তিনি যথেষ্ট অবিবেচকের মত কাজ করেছেন। তিন মেয়েকে চড়া যৌতুক দিয়ে বাল্যকালে স্বামীগৃহে প্রেরণ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের মত লোক ঋণ করে যৌতুক দিয়ে নিজের মেয়েদের পার করবেন ভাবা যায় না। বাবা হিসেবে হয়ত তা ঠিক ছিল, তাই বলে বাল্যবয়সে এবং বয়স্ক ছেলের কাছে , কারণ ছেলে খুবই যোগ্য ও উচ্চবংশের। জামাতাকে তিনি বিদেশে পাঠিয়েছেন কৃষিতে উচ্চ শিক্ষা নিতে, কিন্তু তার লক্ষ্য হয়ত তা ছিল না, বিদেশে এসে অনাচার- অজাচারে শ্বশুরের পয়সার শ্রাদ্ধ করেছে। এতে কবিগুরু বড় দুঃখ পেয়েছিলেন। তার কোন মেয়েই বিবাহিত জীবনে সুখী ছিল না।

বাঙালী সমাজ হিন্দু-মুসলিম অধ্যুষিত। এত বড় সাহিত্যিক হলেও তার রচনায় মুসলিম সমাজের তেমন কোন রেপ্রেজেন্টিটিভ নেই। বড়জোর চাকর-বাকর, ডাকাত হিসেবে দু-একটা ছোট-খাট মুসলিম চরিত্র দেখা যায়। হয়ত মুসলিম সমাজ সম্বন্ধে তার অজ্ঞতার কারণে এটা হতে পারে। কিন্তু যিনি বছরের একটা বিশেষ সময় পূর্ববঙ্গে কাটাতেন তার পক্ষে মুসলিমদের সম্বন্ধে জানা তেমন কঠিন ছিল না।

আধুনিক কবি হয়েও তিনি পূর্ববঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন। বিজ্ঞানের সমকালীন ব্যাপারে তার আগ্রহ ছিল। কিন্তু বিজ্ঞান বুঝতে হলে যে ব্যাকগ্রাউন্ড দরকার তা তার ছিল না। স্বয়ং আইনস্টাইন তাকে 'রিলাটিভিটি থিয়োরী' বুঝাতে পারেনি। এরপরে তিনি এ নিয়ে উক্ত শিরোনামে ব্যঙ্গ কবিতা লিখেন। শেষের কবিতায় লিখেন, ট্যাঁকঘড়ি আর একঘড়ি এক নয়, একঘড়ি বলে কিছু নাই।

সময়ের বিবর্তনকে তিনি মেনে নিতে পারেননি। কল্লোলের কবিরা সবাই তার গুণকীর্তন করলেও তাদের সবার একটা প্রচেষ্টা ছিল তার প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে আসা। রোমান্টিক যুগের ছন্দমিল দেয়া কাব্যের সুন্দর-সুশীল ভূবন থেকে বেরিয়ে এসে প্রথম বিশ্বোযুদ্ধোত্তর পরিবর্তনশীল বিশ্বের নতুনযুগের কাব্যধারার সাথে একাত্বতা ঘোষণায় ছিল তাদের অঙ্গীকার। এদের অনেকেই পাশ্চাত্যের কাব্যধারার সাথে সম্যক পরিচিত ছিলেন, ফলে বাংলা কবিতায় নতুন যুগের সূচনা হয়। রবীন্দ্রনাথ এদের সাথে তাল মিলাতে গদ্যছন্দে তাঁর একমাত্র কাব্যগ্রন্হ 'পুনশ্চ:' লিখেন। তিনি বুঝতে পারেন এটি তার জন্যে নয়, তার সময় শেষ। এরপরে আবার ফিরে যান তাঁর আপন বলয়ে, নিরাপদ, নিরুপদ্রব, শান্ত,সুশীল ছন্দের ভূবনে।

মৃত্যুর আগে তিনি লেখেন 'সভ্যতার সংকট' , ইয়োরোপ নিয়ে টিনি খুব আশাবাদী ছিলেন কিন্তু এতে তিনি পাশ্চাত্য সভ্যতার ভবিষ্যত নিয়ে শংকিত ছিলেন। ইয়োরোপে তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতি চলছিল, উনবিংশ শতাব্দীর আদর্শ, সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্হা ভেঙ্গে পড়ছে, শ্রমিকশ্রেণীর উত্থান হচ্ছে। বিশ্বযুদ্ধের পরে এ সংকট আরও প্রকট হয়, উপনিবেশ ব্যবস্হার পতন হয়ে গড়ে ওঠে নতুন সমাজ, সাহিত্যে সমাজে , নীতি নৈতিকতায় সৃষ্টি হয় নতুন বিপ্লব। বস্তুবাদ, অস্তিত্ববাদ জেঁকে বসে সমাজে। কোন কিছুরই কোন মিনিং নেই। দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধ মানুষের চিন্তার জগতে ভীষণ নাড়া দেয়। 'আদর্শলিপির' মূল্যবোধ তার অটুট অবস্হান হারায়। রবীন্দ্রনাথের ভাগ্য ভাল যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর দুনিয়ায় তাঁক বেঁচে থাকতে হয়নি। তাঁর মূল্যবোধের সমাজব্যববস্হার পতন তিনি হয়ত সহ্য করতে পারেতেন না।

রাজনৈতিক দিক থেকেও জালিওয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে ব্রিটিশদের দেয়া নাইটহুড ত্যাগ করা ছাড়া তেমন কোন উল্লেখযোগ্য কিছু করেননি। কংগ্রেসের কর্মকান্ডে তার তেমন আস্হা ছিল না।ইংরেজ রাজত্বের অবসান তিনি চেয়েছেন, কিন্তু স্বাধীন ভারতবর্ষের পরিচালনার ভার নিয়ে তাঁর সংশয় ছিল। বন্ধকক্ষে গান্ধীজীর সাথে তাঁর দীর্ঘ বাকবিতন্ডা হয়, এ ব্যাপারে তারা কেউ কোনদিন মুখ খোলেনি। গান্ধীর সাথে ওটাই তার শেষ দেখা ছিল।

রবীন্দ্রনাথ নিয়ে বাংলাদেশে অনেক চর্চা হয়েছে ভবিষ্যতেও হবে। বিশেষজ্ঞরা তার জীবনের বিভিন্ন বিষয়ে আলোকপাত করবেন। কিন্তু বাংলাদেশে সমালোচনায় যা হয়, তা হলো হয় কাউকে সম্মান দিয়ে মাথায় তোলা হয়, অথবা আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলা হয়। এর বাইরে সমালোচকরা যেতে চান না। আর কবিগুরুর মত নমস্য পূজনীয় ব্যক্তিদের বেলায় একেবারে ভক্তি-শ্রদ্ধার বন্যা। যেমন বাংলাদেশের এক শিল্পী বলেছিলেন, রবীন্দ্রসঙ্গীত আমার কাছে ইবাদতের মত।

আমি বলছি না যে রবীন্দ্রনাথের জীবনে কাজে অনেক অসঙ্গতি ছিল, এ ব্যাপারে আমি বিশেষজ্ঞও নই,আমারও তথ্যে ভুল থাকতে পারে। আমি শুধু বলতে চাচ্ছি , যারা নমস্য, মহত তাদেরও শুধু দেবতার আসনে না বসিয়ে, মাঝে মাঝে মাটির মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করা উচিত, ভক্তিরসের এই বাংলায় যেটা সচরাচর চোখে পড়ে না।

 

 

  • ৭ টি মন্তব্য
  • ১৩০ বার পঠিত,
Send to your friend Print
রেটিং দিতে লগ ইন করুন
পোস্টটি ৩ জনের ভাল লেগেছে, ০ জনের ভাল লাগেনি
১. ০৭ ই আগস্ট, ২০০৮ ভোর ৪:০৩
comment by: জুলিয়ান সিদ্দিকী বলেছেন: লেখাটি পড়েই লগইন করলাম।

কারণ আপনি লিখেছেন:

"বাঙালী সমাজ হিন্দু-মুসলিম অধ্যুষিত। এত বড় সাহিত্যিক হলেও তার রচনায় মুসলিম সমাজের তেমন কোন রেপ্রেজেন্টিটিভ নেই। বড়জোর চাকর-বাকর, ডাকাত হিসেবে দু-একটা ছোট-খাট মুসলিম চরিত্র দেখা যায়। হয়ত মুসলিম সমাজ সম্বন্ধে তার অজ্ঞতার কারণে এটা হতে পারে।"

আগেই বলে রাখছি যে, আমার মন্তব্যকে কোনো সাম্প্রদায়িক মন্তব্য ভেবে বসবেন না। ব্যাপারটি আমিও দেখেছি যে, হিন্দু লেখকরা ইচ্ছাকৃতভাবেই এ ব্যাপারটি তাদের লেখায় ঘটিয়ে থাকেন বলে মনে করি।

বঙ্কিমচন্দ্র সরাসরি মুসলিম বিদ্বেষী লেখা লিখেছেন। শরৎচন্দ্র কোনো একমুসলিম মাঝি নেমায পড়িতেছিল বলে দায় সেরেছেন।

রবীন্দ্রনাথও তাই। হালের হিন্দু লেখকদের মাঝেও সেই প্রবণতা চলমান। কোনো মুসলিম চরিত্রকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে পারেননি। এটি তাদের ব্যর্থতা নাকি সংকীর্নতা বুঝে পাই না। হাতের কাছে তেমন বইপত্র নেই বলে কোট করতে পারলাম না। অনেক সংলাপ, অনেক বাক্য উদ্ধৃত করা যেতো।

পোস্টের জন্য ধন্যবাদ।


০৭ ই আগস্ট, ২০০৮ ভোর ৪:১২

লেখক বলেছেন: থ্যান্কস্‌, মন্তব্যের জন্যে। আমার মনে হয় মুসলিম সমাজ সম্বন্ধে তাদের অজ্ঞতাই দায়ী। এছাড়া আশরাফ-আতরাফে বিভক্ত মুসলিমদের অন্দরমহল সম্বন্ধে তাদের তেমন জানা ছিল না। যাদের সাথে চেনা-জানা হত, তারা নিম্নশ্রেণীর চাকর-বাকর, তাই তাদের চিত্রিত করেছেন।

উঁচু শ্রেণীর মুসলমানরা তেমন হয়ত হিন্দুদের সাথে মিশত না, জলচল ছিল না। হারাম-হালাল চিন্তা , এছাড়া ভূতপূজারীদের সাথে মিশতেও তাদের বাধত। ধনী উচ্চবিত্ত হিন্দুদের ক্ষেত্রেও গোমাতা ভক্ষণকারী ম্লেচ্ছদের সাথে মেশার আগ্রহ না হতে পারে।

তারপরেও রবীন্দ্রনাথের মত প্রতিভার কাছ থেকে আমরা কিছু পেতে পারতাম।

২. ০৭ ই আগস্ট, ২০০৮ ভোর ৪:৩৯
comment by: আশরাফ মাহমুদ বলেছেন: অসাধারণ লিখেছেন আপনি। কিছু নতুন জিনিস জানলাম। প্রিয়তে নিলাম।
০৭ ই আগস্ট, ২০০৮ ভোর ৪:৪২

লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ আশরাফ কষ্ট করে পড়ার জন্যে।

৩. ০৭ ই আগস্ট, ২০০৮ ভোর ৬:২১
comment by: তানভির বলেছেন: Nazim bhai, Bhalo likchen...I really appreciate your concern About Tagore. Favourite post....
৪. ০৭ ই আগস্ট, ২০০৮ সকাল ৭:৫৩
comment by: ছটিক মাহমুদ বলেছেন: ভাল বিশ্লেষণ। কিন্তু তথ্যের কিছু ঘাটতি রয়েছে। আরেকটু তথ্যপূর্ণ করে যুক্তিকে শক্তভাবে দাঁড় করানো যেত।
০৭ ই আগস্ট, ২০০৮ সকাল ৮:০৬

লেখক বলেছেন: ঠিক বলেছেন। ব্লগ লেখার এটা সমস্যা। তাড়াহুড়া করে লেখা হয়, লেখার পরপরই পোস্ট।

 



 


মার্ক্স বা হেগেল নয়;
মেধা নয়, মনন মনীষা নয়,
সুপ্রতিষ্ঠিত এবং আনন্দঘন
জীবনের মূল_--
স্বনির্বাচিত মহিলার
স্তন, স্তনন, চিবুক, যোনি ও উদ্দাম কালো চুল...
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

সর্বমোট হিট

 ৪৩০৮৬