somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... 'মনের মানুষ' দেখলাম


লালনকে শিক্ষিত শহুরে মধ্যবিত্তদের কাছে পরিচিত করাতে ঠাকুর পরিবারের ভূমিকা ছিল। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা স্কেচই লালনের একমাত্র ছবি যা টিকে আছে, মুভিটিতে এই গুণী বাঙালীকে মূল্যায়ন করা হয়েছে। কিন্তু তাই বলে বারবার তাঁকে দেখানওটা ঠিক যুতসই লাগেনি। এর বদলে কাঙাল হরিনাথকে আরও বেশি ফোকাস দিলে বোধ হয় ভাল হত কারণ কাঙাল ছিল লালনের ঘনিষ্ঠজন, কাছের মানুষ। গগন হরকরাকেও আরেকটু বেশি দেখানো যেতে পারত, তারপরেও পরিচালকের স্বাধীনতায় যেটুকু দেখিয়েছেন তাতে গৌতম ঘোষের সাধুবাদ প্রাপ্য। ফকির বাউল বা নিম্নবিত্তের মানুষের সংস্কৃতির খোঁজ মধ্যবিত্ত তেমন রাখে না, ফলে যখন হঠাৎ কোন মধ্যবিত্ত সংস্কৃতিসেবক আস্তাকুঁড়ে মণি-মাণিক্যের সন্ধান পায় , গোটা মধ্যবিত্ত ঝলসে ওঠে। আহ্‌ , উনি লালনকে আবিষ্কার করেছেন, প্রতিষ্ঠা করেছেন। একই ঘটনা এখনও ঘটছে, ব্রিটিশ হাইকমিশনার থেকে শুরু করে অনেকেই বাউল আব্দুল করিমকে আবিষ্কার করেছেন বলে আস্ফালন শোনা যায়। অথচ যাদের জন্য তাঁদের গান তারা ঠিকই জানেন, চিনেন, বুঝেন।

লালন নিয়ে লেখার পরিকল্পনা সুনীলেরও ছিল না, সেটা তিনি অকপটভাবে স্বীকার করেছেন। প্রখ্যাত লালনগীতি সংগ্রাহক, গবেষক আবুল আহসান চৌধুরীর সাথে আলাপচারিতার পর তাঁরই অনুরোধে তিনি 'মনের মানুষ' লিখেন।

মুভিতে ফেরৎ আসি। কাস্টিং মোটের উপর ভাল , কিন্তু কলকাতার অভিনেত্রীদের বড্ড তেল চকচকে মনে হয়েছে, পরিণত লালন ফকিরকেও যথেষ্ট রঙচঙ্গা মনে হয়েছে। বাউল জীবনে এত রং কি ছিল? সিরাজ সাঁইয়ের ভূমিকায় বাংলাদেশের সবেধন নীলমণি রাইসুল ইসলাম আসাদের অভিনয় অনবদ্য। আর পাগলা কালুয়ার ভূমিকায় চঞ্চল চৌধুরীর অভিনয় ছিল সাবলীল। ফকিরনীর ভূমিকায় বিবি রাসেলের অভিনয়ও খুবই চমৎকার হয়েছে, তিনি যে অভিনয় জানেন এটা জানতাম না । কস্টিউম ডিজাইনেও তিনি অনেকাংশেই পারদর্শীতা দেখিয়েছেন বলে মনে হল।

মুভিতে অনেকগুলো গান গাওয়া হয়েছে। এরমধ্যে ফরিদা পারভীনের গান মোটেই ভাল লাগে নি, তাঁর ওরকম চড়া গলার সাথে মিলায় এরকম অভিনয় শিল্পী পাওয়া ভার।

ভাল লেগেছে কালিকাপ্রসাদের গাওয়া

জলের উপর পানি, না পানির উপর জল
বল তোরা বল, বল তোরা বল...
আলীর উপর কালী, না কালীর উপর আলী
বল তোরা বল....

তাঁর গাওয়া আরেকটা গান

আমার মাত্র দুইখান চাকা, একখান গাড়ি..


লতিফ শাহের গাওয়া গানগুলোও চমৎকার।

কিন্তু গৌতম ঘোষ এ গানটা কেন যে লালনের মুভিতে দিলেন সেটা বুঝলাম না। আমার যতদূর ধারণা সরকার শাহ আলমের এ গান অনেক পরের রচনা।



আকাশটা কাঁপছিল ক্যান, জমিনটা নাচছিল ক্যান
বড় পীর ঘামছিল ক্যান
গান গেয়েছিল খাজা যেইদিন
আল্লা নবীজীর গান,পীর আউলিয়ার শান
যে বলে হারাম সে তো জ্ঞানহীন
না বুঝে ভেদ-বিধান , হারাম তোমরা বলছ ক্যান । ।
......
না করে গন্ডগোল , খোল তোরা হাদীস খোল
বিল্লাল কেন বাজায় ঢোল সেইদিন সেইদিন
যেদিন দ্বীনের নবী, ছেড়ে যান পৃথিবী
ঢোলা বাজিয়ে ক্ষমা চায়
.........

এবার গোলাম ফকিরের গলায় পুরো গানটা শুনুন।




পরিচালক হয়ত লোকশিক্ষার জন্য লালনের মুভিতে এ গানটা যোগ করেছেন। করুকগা, এত বিচার করে কি হবে, পুরো মুভিটাই তো লোকশিক্ষার জন্য। বাংলায় মুভির যা হাল চলতেছে তাতে দোষত্রুটি থাকলেও এরকম মুভি যত হয় ততই ভাল।

ফ্রি ডিভিডি দেয়ার জন্য টরন্টোর বইয়ের দোকান 'এটিএন' কে কৃতজ্ঞতা। অনলাইনেও এখন মুভিটা পাওয়া যায়।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29418160 http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29418160 2011-07-23 00:39:04
দেহঘড়ি আর ঘড়ির কারিগর

আমার ঘরের চাবি পরের হাতে
কেমনে খুলিয়ে সে ধন দেখব চক্ষেতে

আপন ঘরে বোঝাই সোনা
পরে করে লেনা-দেনা
আমি হ'লেম জন্মকানা
না পাই দেখিতে।।

রাজী হ'লে দারওয়ানী
দ্বার ছাড়িয়ে দেবেন তিনি
তারে বা কই চিনি-শুনি
বেড়াই কুপথে।।

এই মানুষে আছে রে মন
যারে বলে মানুষ রতন
লালন বলে পেয়ে সে ধন
পারলাম না চিনিতে।।


ফকির আলাউদ্দীনের গানে চাবির এনালজি :



মন আমার দেহঘড়ি, সন্ধান করি কোন মিস্তিরি বানাইয়াছে
একটা চাবি মাইরা দিছে ছাইড়া, জনম ভইরা চলতে আছে
.......
ঘড়ি দেখতে যদি হয় বাসনা
চলে যাও ঘড়ির কাছে,
যার ঘড়ি সে তৈয়ার করে ঘড়ির ভিতর লুকাইছে;
ঘড়ির ভিতর লুকাইছে...

ঘড়ির মেকার ঘড়ি বানাইয়া নিজেই ঘড়ির ভেতর লুকাইছে। পাশ্চাত্যের রিচার্ড ডকিন্সের ভাষায় 'The blind watch maker', ডকিন্স যার কাছ থেকে ধার করছেন তার নাম উইলিয়াম প্যালি। তাঁর বক্তব্য হল কেউ একজন উদ্দেশ্যমূলকভাবে এরকম জটিল ডিজাইনের ঘড়ি বানিয়েছে। প্যালির ভাষায় -

"that the watch must have had a maker: that there must have existed, at some time, and at some place or other, an artificer or artificers, who formed it for the purpose which we find it actually to answer, who comprehended its construction, and designed its use."

এরকমই কোন খায়েশে হয়ত আইনস্টাইন নিজেও ঘড়ির কারিগর হতে চেয়েছিলেন, পারমাণবিক বোমার ধ্বংসযজ্ঞ দেখে তিনি বলেছিলেন আগে জানতে পারলে এতসব বাদ দিয়ে ঘড়ির কারিগর হতেন ! "The release of atom power has changed everything except our way of thinking...the solution to this problem lies in the heart of mankind. If only I had known, I should have become a watchmaker." এমনও হতে পারে আইনস্টাইনের সাথে রবীন্দ্রনাথের দেখা হলেও, ফকির আলাউদ্দীনের সাথে নিশ্চিত দেখা হয়নি, প্যালির নামও হয়ত জীবনে শুনেন নাই। রবীন্দ্রনাথের কাছে ঘড়িতত্ত্ব শুনলেও ঠাকুর যেমন শুনে 'থিওরী অফ রিলাটিভিটি' ঠিকমত বুঝতে পারেন নাই, আইনস্টাইনও তেমনি হয়ত ঘড়ি, ঘড়ির কারিগর এতসব আধ্যাত্মিক ব্যাপার স্যাপার বুঝবার পারে নাই।

পাশ্চাত্যের বুদ্ধিজীবিদের চেয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এককাঠি বাড়া, খুবই ঈমানদার, কোন ডিজাইনার তর্কে নাই। সরাসরি তাঁর কাছে আবেদন, ঘরের ভেতর থেকে আমাকে বের করে নিয়ে যাও। মুমুক্ষু কবির আশা একবার যদি বের হওয়া যায় তাহলে যেন চাবি ভেঙে ফেলা হয়, বারেবারে যাতে আর ফিরে আসতে না হয়। দেহরুপ তালার মধ্যে ঢুকিয়ে চাবি নিয়ে আরেকজন ঘুরাঘুরি করবে এটা কি কবির পক্ষে মানা সম্ভব ?



ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে
ও বন্ধু আমার না পেয়ে তোমার দেখা দিন যে আমার কাটে না রে
বুঝিগো রাত পোহালো, বুঝি বা রবির আলো
আভাসে দেখা দিলো গগনপারে
সমুখে ঐ হেরি পথ, তোমার কি রথ পৌঁছাবে না মোর দুয়ারে । ।
আকাশের যত তারা চেয়ে রয় নিমেশ হারা
বসে রয় রাত প্রভাতের পথের দ্বারে
তোমারি দেখা পেলে সকল ফেলে ডুববে আলোক পারাবারে । ।
প্রভাতের পথিকসবে এলো কি কলরবে
গেল কি গান গেয়ে ঐ সারে সারে
বুঝিবা ফুল ফুটেছে সুর উঠেছে অরুন বীণার তারে তারে । ।


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29392585 http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29392585 2011-06-06 20:36:06
মনে কী দ্বিধা রেখে গেলে চলে সেদিন ভরা সাঁঝে যেতে যেতে দুয়ার হতে কি ভেবে ফিরালে মুখখানি
কী কথা ছিলো যে মনে
তুমি সে কি হেসে গেলে আখিঁকোণে
আমি বসে ভাবি নিয়ে কম্পিত হৃদয়খানি,
তুমি আছো দূর ভূবনে।
আকাশে উড়িছে বকপাতি
বেদনা আমার তারি সাথি
বারেকো তোমায় শুধাবারে চাই বিদায় কালে কি বলো নাই
সে কি রয়ে গেলো গো সিক্ত যুথীর গন্ধবেদনে।



আমাদের মনে কতসব দ্বিধা, দ্বন্দ যার কারণে আমরা নিজেকে নিয়েই সবসময় দন্ধে ভুগি। আমি কে আমার এ বোধ হয় না?

এ সৃষ্টিজগতে জন্মের প্রাক্কালে নিরন্জনের সাথে আমাদের শেষ সাক্ষাৎ এবং তাঁর সাথে আড়ালেরও শুরু হয় তখন। মায়ারুপী শক্তির কারণে আমাদের অতি নিকটে থেকেও এখন তাঁকে কোন দূরভূবনের লোক মনে হয়। ঠাকুর তাই বলছেন, মায়ার হাসি হেসে সেই যে শেষ বিদায় দিলে তোমার ঐ হাসির মানে তো বুঝলাম না, হাসির আড়ালে তোমার মনের ভাব যে কি ছিল তাও আন্দাজ করতে পারলাম না।

আকাশের উড়ন্ত বকপাখির যে যন্ত্রণা, অমৃতের সন্তান হিসেবে আমিও সেই যন্ত্রণার সমব্যথী। কবির জিজ্ঞাসা, বিদায়কালে কি বল নাই, কেন আমাদের এ যমযন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাওয়া ? শুধুমাত্র নিঃশেষে প্রাণের প্রকাশেই কি এর একমাত্র সার্থকতা?]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29392162 http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29392162 2011-06-05 23:50:19
লালনের গান: খোদা রয় আদমে মিশে

কার জন্য মন হলি হত
সে খোদা আদমে আছে
খোদা রয় আদমে মিশে । ।

আল্লা আদম আর মুহাম্মদ
এই তিনজনায় নাই ভেদাভেদ
এক আত্মায় মিশে।
দেখবি যদি হযরত নবী
এশকেতে আছে । ।

নাম দিয়ে সাঁই কোথায় লুকালেন
মুর্শিদ ধরে সাধন করলে নিকটে মেলে
আত্মারূপে কর্তা হলো
কর তার দিশে । ।

যার হয়েছে ভাব মহাজ্ঞান
সেই দেখবে নূর তাজুল্লাহ
অন্যে দেখবে কেন
লালন বলে জ্ঞানী যারা দেখবে অনাসে । ।

যে খোদা খোদা বলে মন্দির, মসজিদ, গুরুদুয়ারা সরব করে তুলছি সে খোদা আমাদের এ দেহে মিশে আছে। আল্লাহ, আদম আর মুহাম্মদ এ তিনজন এক, সব এক আত্মায় গিয়ে মিশে। আহাদ আর আহাম্মদ, শুধু মীমের ফারাক, এ মীম হল দুনিয়ার প্রতীক নবী মুহাম্মদ। ঐ যে বলে না তাঁকে সৃষ্টি করা না হলে দুনিয়াই সৃষ্টি করা হত না। সেই নবীকে পেতে হলে প্রেমের পথেই পাওয়া যাবে।

আদমকে সিজদা না করেই শয়তান পতিত হয়, আদম যদি আল্লাহ না হত তাহলে সিজদা করতে বলা হত না, শির্‌ক হত। আদম যদি আল্লাহ হয় আদমের বংশধররাও তাই। আমাদের এ নামরুপের আড়ালে ঈশ্বর লুকিয়ে আছেন, কামেল মুর্শিদের কাছে গিয়ে সাধন করলে তাকে কাছে পাওয়া যায়।লালন বলছেন, জীবাত্মা কিভাবে কর্তা হয় তার দিশে কর।

এর মধ্যে যার ভাব মহাজ্ঞান অর্থাৎ আত্মজ্ঞান হয়েছে সেই একমাত্র আল্লাহর নূর দেখতে পাবে। লালন বলেন, অবশ্য জ্ঞানী যারা তারা অনায়াসে তাঁকে দেখতে পাবে।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29388192 http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29388192 2011-05-29 23:46:26
লালনের গান: রবে না এ ধন জীবন যৌবন

মন আমার গেল জানা ।
কারো রবে না এ ধন জীবন যৌবন
তবেরে কেন এত বাসনা;
একবার সবুরের দেশে বয় দেখি দম কষে
উঠিস নারে ভেসে পেয়ে যন্ত্রণা । ।

যে করল কালার চরণের আশা
জানোনারে মন তার কী দুর্দশা
ভক্তবলী রাজা ছিল, সর্বস্ব ধন নিল
বামুনরুপে প্রভু করে ছলনা। ।

প্রহ্লাদ চরিত্র দেখ চিত্রধামে
কত কষ্ট হল সেই কৃষ্ণনামে
তারে অগ্নিতে জ্বালালো জলে ডুবাইল
তবু না ছাড়িল শ্রীরূপসাধনা । ।

কর্ণরাজা ভবে বড় দাতা ছিল
অতিথিরূপে তার সবংশ নাশিল
তবু কর্ণ অনুরাগী, না হইল দুখী
অতিথির মন করল সান্ত্বনা । ।

রামের ভক্ত লক্ষণ ছিল সর্বকালে
শক্তিশেল হানিল তার বক্ষস্হলে
তবু রামচন্দ্রের প্রতি, লক্ষণ না ভুলিল ভক্তি
লালন বলে কর এ বিবেচনা । ।

লালন দর্শনের সাধকদেশ পর্যায়ের গান। জগতে আমাদের বাসনার শেষ নেই, একটা শেষ হয় তো আরও কয়েকটা বাসনার জন্ম হয়। এ বাসনার কারণেই মানুষ কর্মের বন্ধনে জড়িয়ে সব হারায়। দক্ষিণেশ্বরের শ্রীমা তাই বলেছেন ঈশ্বরের কাছে যদি চাইতেই হয় তাহলে বলতে হবে , 'নির্বাসনা করে দাও'। অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি দুনিয়ার ধন, জীবন, যৌবন এসব কিছুই থাকবে না। লালন তাই বলছেন, একবার নির্বাসনা হয়ে ব্রক্ষ্মসাগরে ডুব দিয়ে দেখ, ভেসে উঠলেই যত যন্ত্রণা।

সাধকের জীবন খুবই কঠিন। নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, কখনও বা সর্বস্ব খোয়াতে হয়, কিন্তু সাধু তখনও অবিচল থাকেন।

প্রহ্লাদের নাতির নাম ছিল বালি, যার নামে ইন্দোনেশিয়ায় একটি দ্বীপ আছে। বিষ্ণু বামনরুপে বালির কাছে ভিক্ষা চায়। এতে বালি রাজি হলে বামনরুপী ভগবান তিন পদক্ষেপে তার রাজ্যের সব নিয়ে নেয়। বালি বুঝতে পেরে শেষ বারে তার মাথায় পা রাখতে বলেন।

দৈত্যকূলের প্রহ্লাদকে তার বাপ হিরণ্যকশিপু আগুনে পুড়িয়ে, পানিতে ডুবিয়ে বিভিন্নভাবে মারতে চেয়েছিল তবু সে ঈশ্বরের সাধনা ছাড়ে নাই। প্রতিবারেই বিষ্ণুর কৃপায় প্রহ্লাদ মুক্ত হন, ভগবান সবসময় তাঁর অনুরাগীকে রক্ষা করেন।

দেবতা ইন্দ্র ভিক্ষুকের বেশে এসে ভিক্ষা চাইলে দাতাকর্ণ তাকে তার একমাত্র বর্ম দিয়ে দেন, ফলে বর্ম ছাড়া যুদ্ধক্ষেত্রে সে দূর্বল হয়ে পড়ে। কর্ণ মহাভারতের আকর্ষণীয় একটা চরিত্র, তাঁর জীবন নিয়ে দেবতারা অনেক ছিনিমিনি খেলছে, কিন্তু সে আজীবন একনিষ্ঠভাবে আদর্শে অটল থেকে তার ক্ষত্রিয় মর্যাদা প্রতীষ্ঠা করে গেছে।

রাম মানে হল এক,রহস্যময়, রাবণ বা অহংকার নাশের জন্য জগতে এসেছেন। একেশ্বরের ভক্ত মনের অবস্হা হল ভাই লক্ষণ, রাম লক্ষণ এজন্য সবসময় পাশাপাশি থাকে। প্রয়োজনে রাম তো লক্ষণকে সাইজ করবেই, পূরাণাকাররা এ বিষয়গুলো গল্পের আকারে খুব সুন্দর করে সাজিয়েছেন।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29388146 http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29388146 2011-05-29 22:29:27
লালনগীতি: সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে

সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে
লালন কয় জাতের কি রূপ
দেখলাম না এই নজরে । ।

সুন্নত দিলে হয় মুসলমান
নারীলোকের কী হয় বিধান
বামুন চিনি পৈতে প্রমাণ
বামনী চিনি কিসেরে । ।

কেউ মালা কেউ তসবি গলে
তাইতে কি জাত ভিন্ন বলে
আসা কিংবা যাওয়ার কালে
জাতের চিহ্ণ রয় কারে । ।

জগৎ জুড়ে জাতের কথা
লোকে গল্প করে যথতথা
লালন বলে জাতের ফাতা
ডুবিয়েছি সাধ বাজারে । ।

এটা লালনের সাধনপর্বের স্হূলপর্যায়ের গান, অর্থাৎ হিন্দু-মুসলমান ইত্যাদি জাত-পাতের সমস্যা থাকলে সাধনা হবে না, সবার আগে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। জনশ্রুতি আছে কালীনদীর ঘাটে লালন সাঁইকে অসুস্হ অবস্হায় মলম শাহ খুঁজে পেয়ে বড় করেন, ফলে লালন আসলে কোন জাতের লোক এ নিয়েও জনমনে একটা কৌতুহল কাজ করে। কিন্তু লালন নিজেকে কোন বিশেষ জাত-পাতের অংশের উর্ধ্বে মানুষ হিসেবে ভাবতেন।

মানুষের শরীরে কোন জাতের চিহ্ণ নেই, দুনিয়াতে সব মানুষ সমান, জাত পরিচয় এসব মানুষেরই সৃষ্টি। দৃষ্টান্তস্বরুপ লালন বলছেন, সুন্নত অর্থাৎ খতনা দেখে না হয় মুসলমান পুরুষকে চেনা গেল। কিন্তু নারী কি মুসলমান না হিন্দু কিভাবে বুঝব? একইভাবে পৈতা দেখে না হয় বামুন চেনা গেল কিন্তু বামনীদের কি ধরে চিনব। তাহলে জাত যদি থাকবেই, মেয়েদের ব্যাপারে ধর্মগুলো এত অনুদার কেন, তাদের কেন জাতবিচারের জন্য কোন সিস্টেম নেই। সুতরাং সূক্ষবিচারে ধর্মমতেই জাতের কোন বালাই নেই, সবাই একই মায়ের সন্তান। সুন্নতে খতনা আসলে ট্রাইবাল চিহ্ন যা অনেক আগে থেকে চলে আসছে। আর হিন্দুধর্মে কারও পৈতা বা উপনয়ন দেয়ার মানে হল ব্রক্ষ্মোপদেশ নিয়ে এবার দ্বিতীয় জন্ম হল।

তাই বাহ্যিক আবরণ, আভরণ দেখে আমরা মানুষ বিচার করলে ভুল করব। এছাড়া জন্ম বা মৃত্যুর সময় আমাদের কোন জাত থাকে না। শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্তের সেই বিখ্যাত ডায়ালগ, মড়ার আবার জাত কিসের? মুসলমানদের মৃত্যুর পরে জানাযার নামাজে কোন আযান দেয়া হয় না কারণ এই আযান জন্মের পরপরই নবজাতকের কানে দিয়ে দেয়া হয়। জন্মের আগেই যেখানে জ্যান্তে-মরার আহবান, সেখানে জাতের বড়াই আসে কোথা থেকে?

দুনিয়ায় এই যে জাতের এত সমস্যা লোকে বলাবলি করে, লালন বলেন সেই জাতিভেদকে তিনি সাধের বাজারে, সদানন্দের বাজারে ডুবিয়েছেন।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29387887 http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29387887 2011-05-29 12:12:45
লালনের গান : কৃষ্ণপ্রেমের পোড়াদেহ কী দিয়ে জুড়াই বল সখী


কৃষ্ণপ্রেমের পোড়াদেহ
কী দিয়ে জুড়াই বল সখী ।
কে বুঝিবে অন্তরের ব্যথা
কে মোছাবে আঁখি । ।

যে দেশে গেছে বন্ধু কালা
সেই দেশে যাবো নিয়ে ফুলের মালা
আমি ঘুরিবো নগর গাঁয়ে যোগিনী বেশে
সুখ নাই যে মনে গো সখি । ।

তোমরা যদি দেখে থাকো কালারে
বলে দাও গো তাঁর খবর আমারে
নইলে আমি প্রাণ ত্যাজিব যমুনার জলে
কালাচাঁদ করে গেলো আমায় একাকী । ।

কালাচাঁদকে হারাইয়ে হলাম যোগিনী
কতো দিবানিশি গেলো কেমনে জুড়াই প্রাণই
লালন বলে কর্মদোষে না পাইল রাই
কালার যুগল চরণ কেঁদে হবে কি । ।

বাংলায় কানু ছাড়া কোন গীত নাই। লালনের কৃষ্ণলীলার এ গানটাতেও কৃষ্ণ বিচ্ছেদে রাধার অন্তরে যে বিরহ তা ফুটে ওঠেছে।

কৃষ্ণ, কালা, কানাই, কানহা, কানু, ননীচোরা, কালাচাঁদ, মুরালীধর, যশোদানন্দন, বাসুদেবনন্দন, মনমোহন কত ভিন্ন নামেই না ভগবানকে ডাকা হয়। জগতে তাঁর লীলার শেষ নেই। কৃষ্ণলাভের জন্যই আমাদের এ ভবে আসা। সেই কালার বিরহে রাধা রুপকে মানবাত্মা বা মানুষের ভেতরে যে 'divine discontent' তাই কৃষ্ণবিচ্ছেদের গান। ভক্তের হৃদয়ে ভগবানের জন্যে যে তৃষা তা আর কেউ মেটাতে পারে। আর ভাগবতপ্রেমে পুড়ে হৃদয় খাক হলে তবে তাকে পাওয়া যায়। কৃষ্ণের কৃপাছাড়া কভু জীবের কৃষ্ণ মিলে না। তাই সাধুরা বলে গেছেন, কৃষ্ণ কহো জীব, কৃষ্ণ কহো জীব।


লালন বলছেন,কর্মদোষের কারণেই কালাকে হারালে। এখন যোগিনী বেশে নগর বন্দরে ঘুরে বেড়ালে আর কালারযুগল চরণে ধর্ণা দিয়ে কি হবে?]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29387833 http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29387833 2011-05-29 10:15:26
লালনের গান: দেখ না মন ঝাঁক মারি এই দুনিয়াদারী


দেখ না মন ঝাঁকমারি এই দুনিয়াদারী ।
পরিয়ে কৌপণি ধ্বজা মজা উড়ালো ফকিরী। ।

বড়ো আশার বাসা এ ঘর
পড়ে রবে কোথারে কার
ঠিক নাই তারি,
পিছে পিছে ঘুরছে শমন
কোনদিন হাতে দেবে ডুরি । ।

বড়ো দরদের ভাই বন্ধুজনা
ম'লে সঙ্গে কেউ যাবে না
মন তোমারই,
খালি হাতে একা পথে
বিদায় করে দেবে তোরি । ।

যা করো তাই কররে মন
পিছের কথা রেখো স্মরণ
বরাবরই,
দরবেশ সিরাজ সাঁই কয় শোনরে লালন
হোসনে কারো ইন্তেজারী।


দুনিয়াটা একটা ঝাঁকমারি, কোনকিছুর তাল থাকে না, মায়ার কারণে যখন যেরকম হবার কথা সেরকম হয় না। পরিবর্তনশীল এ জগতে তাই আস্হা রাখা যায় না।

আমাদের এ মলমূত্রময় শরীরটা শেয়াল কুকুরের খাবার, কবর দিলে পোকামাকড়ে খায়।এ শরীর নশ্বর, কোনদিন কার ডাক আসবে তার কোন ঠিক নেই।

মরে গেলে ভাই-বোন, বন্ধু কেউ সাথে যাবে না, খালিহাতে নিজেকেই শুধু চলে যেতে হবে। বরং কারো মৃত্যুতে জীবিতরা মনের গভীরে একধরণের তৃপ্তি পায়, মৃতের স্মৃতিচারণ করে আসলে নিজে যে বেঁচে আছে সেটাই উপভোগ করে। মানুষের গড়নটাই এমন আনন্দস্বরুপ যে দুঃখ কখনও চিরস্হায়ী হয় না।

দুনিয়ায় যার যা করতে ইচ্ছা হয় সেটাই করা উচিত কারণ এরকম সুযোগ আবার কখন হয় কে জানে? কিন্তু অতীত ভুলে গেলে চলবে না, আমি কে, কেন দুনিয়ায় এসেছি সেটা সবসময় স্মরণ রাখলে দুনিয়ায় আসা সার্থক হবে। লালন বলছেন এজন্য কারও উপর নির্ভরশীল বা কারও দাসত্ব করার কোন দরকার নেই।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29387699 http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29387699 2011-05-28 23:42:26
লালনের গান : বিনা কার্যে ধনোপার্জন কে করতে পারে

বিনা কার্যে ধনোপার্জন কে করতে পারে ।
গুরুগত প্রেমের প্রেমিক না হলে
সে ধন পায় নারে । ।

একই স্কুলে পড়ে দশজনা
গুরুমনের এই বাসনা
সব সমান করে
কেউ পিছে এসে আগে গেলো
পরীক্ষায় চিনা যায় তারে । ।

বাংলা কিতাব কতোইজনে পড়ে
আরবী ফারসী নাগরী বুলি কে বুঝিতে পারে।
আবার শিখবি যদি নাগরী বুলি
বাংলা নেওগে পাশ করে । ।

বিশ্বম্ভর বিষপান করে
তড়কায় করে বিছা হজম কাকে কি পারে
ফকির লালন বলে রসিক হলে
বিষ খেয়ে হজম করে । ।

প্রাত্যহিক জগতে এটাই সত্য, কাজ বা পরিশ্রম ছাড়া ধন অর্জন করা যায় না। জগতে থাকতে হলে কর্ম করতেই হবে, এজন্য দুনিয়াকে বলা হয় কর্মক্ষেত্র। কর্মের ফলেই আমাদের এ জগতে আসা। কর্ম তিনপ্রকার, সঞ্চিত, আগামী এবং প্রারদ্ধ। এ তিনপ্রকার কর্মবাসনা থেকেই আমাদের চুরাশিলক্ষযোনি পরিভ্রমণ, অর্থাৎ জন্ম-মৃত্যুর চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছি, মুক্তি হচ্ছে না। কর্মবাসনা নাই হয়ে গেলেই আসল ধন উপার্জন হয়।

একমাত্র নিষ্কাম অর্থাৎ বাসনাবিহীন কর্মে আসল ধন মানে গুরুকে পাওয়া যায়। এ পাওয়ার পথে আবার সেই দশ ইন্দ্রিয় , একই স্কুল মানে দেহে দশ সতীর্থ এরা ভেজাল পাকায়, গুরুর সাথে একত্ব হতে দিতে চায় না।

এ গানে লালন মাতৃভাষা, বাংলাভাষার পক্ষ নিয়ে যেরকম ওকালতি করে গেলেন তারপরে আর কোন কথা থাকতে পারে না।

তড়কায় যেমন বিছা বা বিষ হজম করে, সংসারেও আমাদেরকে তেমনি বিষ খেয়ে বিষ হজম করতে হয়। সদাশিব তাই নীলকন্ঠ, বিষে নীল।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29387226 http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29387226 2011-05-28 00:56:02
লালনের গান : শহরে ষোলজনা বোম্বেটে


শহরে ষোলজনা বোম্বেটে।
করিয়ে পাগলপারা নিল তারা সব লুটে । ।

রাজ্যেশ্বর রাজা যিনি
চোরের শিরোমণি
নালিশ করিব আমি
কোনখানে কার নিকটে । ।

পাঁচজনা ধনী ছিল
তারা সব ফতুর হল
কারবারে ভঙ্গ দিল
কখন যেন যায় উঠে । ।

গেলো ধন মালনামায়
খালি ঘর দেখি জমায়
লালন কয় খাজনারই দায়
কখন যেন যায় লাটে । ।

শহরে যে ষোলজন থাকে তারা সবাই বোম্বেটে, ডাকাত। এদের সাথেই আমাদের বসবাস। এসব বোম্বেটেদের অত্যাচারে সবাই পাগলপ্রায়, ফলে তারা সবকিছু লুটে নিচ্ছে আমরা কিছু করতে পারছি না।

এ ষোলজন কারা? এরা হল আমাদের দশ ইন্দ্রিয় এবং ষড়রিপু। পাঁচ ইন্দ্রিয়ের যেমন চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহবা এবং ত্বকের মাধ্যমে আমরা জগত সম্বন্ধে জানি। আরেক পাঁচ কর্মেন্দ্রিয় বাক, পাণি,পদ, পায়ু, উপস্হ যাদের মাধ্যমে আমরা সংসারে কাজ করে থাকি। এরপরে আছে কাম ক্রোধ লোভ মোহ মদ ও মাৎসর্য- ষড়রিপু যাদের অত্যাচারে জীব সবসময় অতীষ্ঠ হয়ে থাকে।

এসব চোরের যে সর্দার সে থাকে সবার উপরে, সবই তাঁর লীলা। তিনিই এসব বোম্বেটেদের লেলিয়ে দিয়ে মজা দেখছেন। তাই লালন বলছেন, কার কাছে নালিশ করব?

জীবনের প্রথম দিকে আমাদের ইন্দ্রিয়েভোগের ক্ষমতা বেশি থাকে,বয়স বাড়ার সাথে সাথে এগুলো দূর্বল হতে শুরু করে, তারপর একসময় কিছুই করার থাকে না, কালের বশে ইন্দ্রিয়গুলো 'কারবারে ভঙ্গ' দেয় ফলে শরীর শেষ হয়ে যায়। মহাকালের হিসাবের খাতায় শুধু শুণ্যই জমা পড়ে, লালনের আশংকা কখন যেন খাজনার দায়ে সব লাটে ওঠে ।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29387128 http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29387128 2011-05-27 21:56:21
পড়গা নামাজ জেনে শুনে: লালন গীতি


পড়গা নামাজ জেনে শুনে
নিয়ত বাঁধগা মানুষ
মক্কা পানে । ।

শতদল কমলে কালার
আসন শূন্য সিংহাসনে
ও সে খেলছে খেলা, বিনোদ কালা
এই মানুষের তন ভূবনে । ।

মানুষে মানুষ কামনা
সিদ্ধ করো বর্তমানে
চৌদ্দ ভুবন ফিরায়ে নিশান
ঝলক দিচ্ছে নয়ন কোণে । ।

মুর্শিদের মেহেরে মোহর
যার খুলেছে সেই জানে
ও তাই বলছে লালন ঘর ছেড়ে ধন
খুঁজিস কেন বনে বনে । ।

এ মানুষ জীবনে মানুষরতনকে পাবার চেষ্টা করো, চৌদ্দভূবন খুঁজে তাকে পাবে না, তোমার নয়নের কোণে সে ঝলক দিচ্ছে। গুরুর কৃপায় জ্ঞান হলে তবে এ জানতে পারা যায়। ঠিক একই ধরণের ভাব প্রকাশ পায় পান্জাবী সুফী বুল্লা শাহের কালামে,





The God that you found while
searching in the jungle
Is found by fowl and fish and beast

You have learnt so much
by reading a thousand books
Have you ever read what's inside you?

You go and sit in mosque and temple
Have you ever visited your own soul?

You who is busy fighting Satan
Have you ever fought your evil intentions !

You have reached the sky
but have failed to reach what's in your heart!

Destroy the mosque,
Destroy the temple
Do as you please ....
Do not break the human heart
for God dwells therein !

I searched for you in jungle and wilderness
I have searched far and wide....

Do not torment me thus my love,
Morning, noon and night !
Come to my abode, my Love,
Morning, noon and night!
Come to my abode, my Guide, my Friend
Morning, noon and night!
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29383992 http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29383992 2011-05-20 02:27:03
লালনের গান: এমন মানব জনম আর কি হবে

এমন মানব জনম আর কি হবে
দয়া করো গুরু এবার
এই ভবে । ।

অনন্ত রূপ সৃষ্টি করলেন সাঁই
মানবরুপের উত্তম কিছু নাই
দেব-দেবতাগণ করে আরাধন
জন্ম নিতে এই মানবে । ।

কতো ভাগ্যের ফলে না জানি
পেয়েছ এই মানবতরণী
বেয়ে যাও ত্বরায়, তরী সুধারায়
যেন ভারা না ডোবে । ।

এই মানুষে হবে মাধূর্য ভজন
তাইতো মানবরুপ গঠলেন নিরন্জন
এবার ঠকলে আর না দেখি কিনার
লালন কয় কাতরভাবে।

মানুষের জন্ম একটা বিশাল ব্যাপার। যার জন্ম হয় সে জন্তু বা জীব, আর এ জীবজগতে মানুষই শ্রেষ্ঠ কারণ মানুষ বুদ্ধি খাটিয়ে ভালমন্দ বিচার করে ভালটা গ্রহণ করতে পারে। আজকে মানুষের যে বৈজ্ঞানিক উন্নতি, বুদ্ধির জোরেই তা সম্ভব হয়েছে।

এ মানব জন্মকে জন্মান্তরবাদে বিশ্বাসীরা খুবই সৌভাগ্যের ঘটনা বলে মনে করেন। মানুষ জন্ম-মৃত্যুর চক্রে ঘুরছে,একজন্মের কর্ম পরবর্তী জীবনে প্রতিফলিত হচ্ছে, এরমধ্যে ভাল কাজের ভাগ বেশি হলে ভাল পরিবেশে জন্ম হয়ে সে দেবজীবন লাভ করে। আর, মন্দকাজের ভাগ বেশী হলে মানুষ ইতরযোনী পায় অর্থাৎ পশু-পাখি হয়ে জন্মায়। ইতরপ্রাণির জীবন শেষ হলে আবার সে মানুষরূপে জন্মায়। দেবতা এবং পশুজীবনে কর্মের কোন স্হান নাই, ফলে কৃতকাজের ফললাভের পর তারা মানবজীবনে ফেরত আসে। এভাবে জন্ম-মৃত্যুর চক্রে মানুষ বান্ধা।

একমাত্র মানব জীবনেই কর্মের মাধ্যমে এ চক্র কেটে বেরিয়ে মোক্ষলাভের সুযোগ আছে, দেবতা বা পশুদের ভোগের জীবনে সে সুযোগ নেই। একমাত্র মানুষেই হয় মাধুর্যভজন। তাই ফকির লালন বলছেন, 'এবার ঠকলে আর না দেখি কিনার।']]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29383881 http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29383881 2011-05-19 23:05:05
লালনের গান: মায়েরে ভজিলে হয় তার বাপের ঠিকানা
মায়েরে ভজিলে হয় তার বাপের ঠিকানা
নিগুঢ় বিচারে সত্য গেলো যে জানা । ।

পুরুষ পরওয়ারদিগার
অঙ্গে ছিল প্রকৃতি তার
প্রকৃতি প্রতৃতি সংসার
সৃষ্টি সবজনা । ।

নিগুঢ় খবর নাহি জেনে
কে বা সে মায়েরে চেনে
যাহার ভার দ্বীন দুনিয়ায়
দিলেন রব্বানা । ।

ডিম্বুর মধ্যে কে বা ছিলো
বাহির হইয়া কারে দেখিল
লালন কয় সে ভেদ যে পেলো
ঘুচলো দিনকানা । ।

গোপন এ খবর না জেনে কেউ মাকে চিনবে না, আর মাকে না চিনলে বাবাকেও চিনতে পারবে না। কারণ আমাদের শরীরের নীচের পঞ্চচক্রসহ আজ্ঞাচক্র পর্যন্ত মায়ারুপ প্রকৃতির দখলে, যা পার না হয়ে পরমপুরুষের সাক্ষাৎ পাওয়া যায় না। আজ্ঞাচক্রের শেষপর্যায়ে এক মায়াবী দেবীমূর্তি সর্বশেষ পর্দা তুলে ধরেন, শ্রুতিতে এরকম অভিজ্ঞতার কথা শোনা গেছে।

এখন লালন আবার অতীত স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, কোথা থেকে আসলাম, বাহির হয়ে কারে দেখছি ইত্যাদি, কারণ এ বোধ যার হয় তার দিনকানা ঘুচে যায় অর্থাৎ জ্ঞানচক্ষু খুলে যায় এবং জানা যায় ডিমের ভেতর কে ছিল, জন্মে দুনিয়ায় এসে কি দেখলাম?

ডিম্বাকার- ঈশ্বরের রুপকল্প, সৃষ্টির পূর্বে সৃষ্টিকর্তা যেসব রুপে থাকেন সেগুলো হল অন্ধকার, ধন্ধকার, কুয়াকার, আকার, সাকার, ডিম্বাকার, নিরাকার, শূন্যাকার, হাহাকার, হুহুকার, নৈরাকার - এই হল মোট এগারোকার আর চারকার গোপন। এই যে ডিম্বাকার থেকে সাকার হয়ে প্রকৃতির ফান্দে পড়ে বাহিরটাকে বাস্তব ভাবছি, এটা যে বুঝতে পারবে তার সঠিক জ্ঞান হবে, না হলে দিনকানা। ডিম্বাকারে ভেসে ভেসে যখন মায়ের গর্ভে তখন তিনিই নিজেকে বাস্তবতার মায়ার জালে বন্দী করেন, কোরাণে সূরা হুদে (আয়াত ৭) উল্লেখ আছে, " যখন তাঁর আরশ পানির ওপর ছিল তখন তিনিই আকাশ ও পৃথিবী ছয়দিনে সৃষ্টি করেন"। মাকড়সা মাতৃগর্ভ থেকে বেরিয়ে নিজের ছড়ানো জালে জড়িয়ে পড়ে, তেমনি মায়ের গর্ভ থেকে বেরিয়ে মায়ার বশে নিজেরি সৃষ্টি দুনিয়ায় সকল জীব আবদ্ধ হয়। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29383182 http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29383182 2011-05-18 12:04:04
লালনের গান : জাত গেলো জাত গেলো বলে
জাত গেলো জাত গেলো বলে
একী আজব কারখানা।
সত্যকাজে কেউ নয় রাজি
সব দেখি তা না না না । ।

যখন তুমি ভবে এলে
তখন তুমি কি জাত ছিলে
যাবার বেলায় কী জাত নিলে
একথা ভেবে বলো না। ।

ব্রাক্ষ্মণ চন্ডাল চামার মুচি
এক জলে সকলেই শুচি
দেখে শুনে হয় না রুচি
যমে তো কাউকে ছাড়বে না। ।

গোপনে যে বেশ্যার ভাত খায়
তাতে ধর্মের কি ক্ষতি হয়
লালন বলে জাত কারে কয়
এই ভ্রম তো গেল না। ।

লালন প্রশ্ন করছেন, দুনিয়ায় আসার সময় আমাদের কোন জাত-গোত্র-বংশ-পরিচয় এসব কিছু থাকে না, থাকে শুধু মানুষ পরিচয়। আবার মরে যাবার সময়ও কোন পরিচয় থাকে না। তাহলে মাঝে যে সময়টা আমরা বেঁচে থাকি তখন কেন ব্রাক্ষ্মণ-চন্ডাল, আশরাফ-আতরাফ এসব পরিচয় বড় হয়ে ওঠে?

জাতবিচারের অসারতা বুঝাতে লালন বলছেন, এক পানির দ্বারাই সকলের জীবনধারণ, একই পানিতেই সবাই শুচি-শুদ্ধ হয়, তারপরেও কিসের এত অহংকার? এছাড়া যমের হাত থেকে যেহেতু কেউই মুক্ত নয়, তাই জাতপাতের এসব বিচার লালনের কাছে বড্ড অরুচিকর।

সামাজিক এসব অনাচারের যে কোন ভিত্তি নাই সেটাও লালন উপমা দিয়ে বুঝাচ্ছেন। কেউ 'বেশ্যার বাড়িতে খাবার' খেয়ে আসলে সে সমাজে পতিত হয়, সমাজ তার নিন্দা করে কিন্তু গোপনে কেউ খেয়ে আসলে সমাজ কিভাবে তার প্রতিকার করে? অর্থাৎ সবকিছু চাপিয়ে দেয়া যায় না, ধর্মবিশ্বাস বা আচরণ মানুষের খুবই ব্যক্তিগত, এর মধ্যে জাতপাত এসব কিভাবে আসল সেটাই আশ্চর্যের।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29382969 http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29382969 2011-05-17 22:55:27
লালন গীতি: খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কম্‌নে আসে যায়
খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কমনে আসে যায়।
ধরতে পারলে মনোবেড়ি
দিতাম পাখির পায়।।

আট কুঠুরী নয় দরজা আঁটা
মধ্যে মধ্যে ঝরকা কাটা
তার উপরে সদর কোঠা
আয়না-মহল তায়।।

কপালে মোর নইলে কি আর
পাখিটির এমন ব্যবহার
খাঁচা খুলে পাখি আমার
কোন বনে পালায়।।

মন, তুই রইলি খাঁচার আশে
খাঁচা যে তোর তৈরী কাঁচা বাঁশে
কোনদিন খাঁচা পড়বে খসে
লালন কেঁদে কয়।।

সাধকের দৃষ্টিতে শরীরে আটটি কুঠুরি এবং নয়টা দরজা। এরমধ্যে সবার উপরে যে কোঠা, চিলেকোঠা, বা সদরকোঠা তাকে বলা হয় আয়নামহল, যা প্রকারান্তরে আমাদের মস্তিষ্ক। নয়দরজা হল শরীরের নয়টা ছিদ্র, লিঙ্গ, গুহ্য, নাভি,মুখ,নাক ,কান ও চোখে।

কপালের দোষ নাহলে কি পাখি আমার সাথে এমন ব্যবহার করে, এতকাছে থেকেও পাখি কেমন কোন বরণ জানি না, আমায় ছেড়ে বনে বনে পালায়।

লালন মনকে সতর্ক করছেন, যে মন শুধু দেহ নিয়েই পড়ে রইল, কিন্তু এ দেহ যে পলকা। কাঁচা বাঁশে যেমন বাসা বাঁধলে তাড়াতাড়ি ঘুনে ধরে যায়, আমাদের শরীরও তেমনি অস্হায়ী। কখন যে এ দেহের পতন ঘনিয়ে আসবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29382832 http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29382832 2011-05-17 18:46:40
লালনগীতি: বাড়ির কাছে আরশীনগর
বাড়ির কাছে আরশীনগর
সেথায় এক পড়শী বসত করে
আমি একদিনও না দেখিলাম তাঁরে।।
গেরাম বেড়ে অগাধ পানি
নাই কিনারা নাই তরণী পারে,
বাঞ্ছা করি দেখব তারে
কমনে সে গাঁয় যাই রে।।
কি বলব সে পড়শীর কথা,
হস্তপদ স্কন্ধমাথা নাইরে
ক্ষণেক ভাসে শূন্যের উপর
ক্ষণেক ভাসে নীরে।।
পড়শী যদি আমায় ছুঁতো,
যম যাতনা সকল যেতো দূরে।
সে আর লালন একখানে রয়
লক্ষ যোজন ফাঁক রে।।

ফকির লালন আক্ষেপ করছেন, তিনি একদিনও এ পড়শীর দেখা পেলেন না। রবীন্দ্রনাথের সোনার তরী কবিতার মত লালনও অকূল পাথারের তীরে বসে আছেন, ইচ্ছা ভবসিন্ধু পাড়ি দিয়ে পড়শীর সাথে সাক্ষাৎ করবেন।

পড়শীর বর্ণনায় লালন বলছেন, তাঁর হাত-পা, মাথা-মুন্ড কিছু নেই, সে কিছুক্ষণ আমাদের দেহরসে ভাসে আবার কিছুক্ষণ ভাসে শুন্যে। দুঃখ-যাতনা বিনাশী, মৃত্যুহরা এ পড়শী যাকে ছোঁয় বা দেখা দেয় সে অমৃতত্ব লাভ করে। কিন্তু আমাদের মাঝে থেকেও অন্তরতম এ পড়শী যেন লক্ষ যোজন দূরে। আমাদের সবার ভেতরে পড়শী আছেন, প্রশ্ন হল আমরা তার ভেতরে আছি কি না?


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29382553 http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29382553 2011-05-17 10:20:16
লালন গীতি: মিলন হবে কত দিনে আমার মনের মানুষের সনে।।
চাতক প্রায় অহর্নিশি
চেয়ে আছি কালো শশী
হব বলে চরণ দাসী,
ও তা হয় না কপাল গুণে।।
মেঘের বিদ্যুৎ মেঘে যেমন
লুকালে না পায় অন্বেষণ,
কালারে হারায়ে তেমন
ঐ রূপ হেরি এ দর্পণে।।
যখন ও-রূপ স্মরণ হয়,
থাকে না লোকলজ্জার ভয়
লালন ফকির ভেবে বলে সদাই
ও প্রেম যে করে সেই জানে।।

চাতক পাখি নাকি নবঘন অর্থাৎ বৃষ্টির পানি না হলে পান করে না, তাই সবসময় আকাশপানে চেয়ে থাকে কখন বৃষ্টি হবে তারপরে পানি পাবে। সেরকম ভাবে ফকির লালনও সাগ্রহে চেয়ে আছেন কখন তাঁর ভিতরের কৃষ্ণ 'কালাচাঁদ', যাকে বলা হয় 'মনের মানুষ' তাঁর সাথে দেখা হবে। কারণ 'কৃষ্ণ কৃপা বিনা জীবে কৃষ্ণ নাহি পায়', কপালগুণে কারও প্রতি তাঁর কৃপা হলে তিনি দেখা দেন।

মেঘের ভেতরে যেমন মেঘের বিদ্যুত লুকিয়ে থাকে কিন্তু বুঝা যায় না, শ্রী কালারে হারায়ে এখন লালন সর্বভূতে কৃষ্ণ হেরে, আকার-সাকারে দর্পণে সেরুপই দেখা যায়। ঐ রুপ যে দেখেছে তার লোকলজ্জার ভয় থাকে না, স্মরণ হওয়ামাত্র সে রুপে ঐ বিভোর হয়ে থাকে, প্রেমিকমাত্রেরই তা জানা আছে।
এ প্রসঙ্গে একটা গল্প মনে পড়ল, মাওলানা রুমী বা গাজ্জালি এদের কেউ একজন হবেন, একবার বাগানে চোখ বুঁজে বসে নিরাকার স্রষ্টার ধ্যানে মশগুল হয়ে বসেছিলেন। ঐ সময় সেখানে প্রেমিক যুগল নিরালায় প্রোমালাপ সারতে এল, বৃদ্ধ সুফীকে দেখে তাদের একজন মন্তব্য করল, ঐ বুডডাটাকে দেখএরকম সুন্দর ফুল বাগানে বেসে কিনা ঝিমাচ্ছে ? কিছুক্ষণ পরে ধ্যানশেষে চলে যাবার সময় বৃদ্ধ বলে গেল, বাছারা আমি চোখ বন্ধ করে যা দেখি তা যদি তোমরা দেখতে তবে আমি তো মাঝে মাঝে দুনিয়া দেখার জন্য চোখ খুলি তোমরা তাও করতে না।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29382440 http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29382440 2011-05-17 01:54:01
লালন গীতি : প্রেম রসিকা হব কেমনে
প্রেম রসিকা হব কেমনে
করি মানা কাম ছাড়ে না মদনে!!
এই দেহেতে মদন রাজা করে কাচারি
কর আদায় করে লয়ে যায় হুজুরি
মদনতো দু্‌ষ্টু ভারি তারে দেয় তহশিলদারি
করে সে মুনসীগিরি গোপনে।

চোর দিয়ে চোর ধরাধরি একি কারখানা
আমি তাই জিজ্ঞাসিলে তুমি তো বল না
সাধু সব চেতন থাকে চোর সব পালায় ডরে
লয়ে যায় শূন্য ভরে কোনখানে।

অধীন লালন বিনয় করে সিরাজ সাঁইর পায়
স্বামী মারিলে নালিশ জানাব কোথায়
তুমি মোর প্রাণ পতি কি দিয়ে রাখবো রতি
কেমনে হব সতী চরণে।

দুনিয়াতে কামের পেছনে, ভোগের পেছনে ছুটে মানুষ সব হারায়। কামের প্রভাবে মানুষ মদনরসে মগ্ন হয়ে জীবন-যৌবন শেষ করে। কারণ কামকে জয় করে কামের শক্তিকে প্রেমে রুপান্তরিত করতে না পারলে সত্যিকারের প্রেমরসিক হওয়া যায় না। আর সর্বভাবে প্রেম না ফুটলে ভাগবত দর্শন হয় না।

অনবরত কামের দেবতা মদনের শরেবিদ্ধ এ নশ্বর শরীরে কাল তার চিহ্ন রেখে যায়, সময়ই হল কর, মদনের মোহে মানুষ জীবনের সেরা সম্পদ সময় এবং সৌন্দর্য হারায়। ফলে মানব জীবনের মূললক্ষ্য যে বিধাতার সাথে সাক্ষাত তাতে ফের পড়ে। লালন তাই বিধাতার কাছে জানতে চাচ্ছেন কেন এই চোর ধরাধরি সিস্টেম চালু আছে, যার কারণে মানুষের মুক্তি হচ্ছে না। কিন্তু বিধাতা নিরুত্তর!

লালনের আর্জি তুমি আমাদের স্বামী, প্রভু, তুমি মারলে আমরা নালিশ জানাব কার কাছে। তাই হে প্রাণের পতি কেমনে সৎ থাকব, প্রাননাথ কেমনে তোমাতে সংলগ্ন, তোমাতে রত হয়ে থাকব তা জানিয়ে দাও




এই পিচ্চি এসবের কি বুঝে ?

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29381304 http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29381304 2011-05-15 06:22:32
লালনগীতি: পাপ পূণ্যের কথা আমি কারে বা শুধাই একদেশে যা পাপ গণ্য
অন্য দেশে পূণ্য তাই।

তিব্বত নিয়ম অনুসারে, এক নারী বহু পতি ধরে
এই দেশে তা হলে পরে
ব্যভিচারী দণ্ড হয়।

শুকর গরু দুইটি পশু, খাইতে বলেছেন যীশু
তবে কেন মুসলমান হিন্দু
পিছেতে হঠায়।

দেশ সমস্যা অনুসারে, ভিন্ন বিধান হতেও পারে
সূক্ষ্ণ জ্ঞানের বিচার করলে
পাপপূণ্যের নাই বালাই।

পাপ হলে ভবে আসি, পূণ্য হলে স্বর্গবাসী
লালন বলে নাম উর্বশী
নিত্য নিত্য তাঁর প্রমাণ পাই।

মোদ্দাকথা পাপ বলে কিছু নাই, এগুলো সামাজিক সংস্কার। আমাদের দেশের কথাতেই আছে, একদেশে যা বুলি, অন্যদেশে তা গালি। লালন যেমন উদাহরণ দিয়েছেন, তিব্বতে মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্হায় একজন নারীর চারজন পর্যন্ত স্বামী থাকতে পারে, অথচ একই কাজ বাংলাদেশে কোন নারী করলে তাকে মোল্লারা ফতোয়া দিয়ে জ্যান্ত পুঁতে ফেলবে।

একইভাবে খ্রীস্টানরা গরু, শুকর দুইটাই খায়, কিন্তু মুসলমান, হিন্দু তাদের সাথে তাল মিলাতে পারছে না। শুকর খেলে মুসলমান পতিত হয়, আবার হিন্দুর গরু ভগবান,এ নিয়ে ইতিহাসে কতকিছু হয়ে গেল। লালন বলেন, এসব বাহ্য,ধর্মের সাথে এদের কোন সম্পর্ক নেই। হিন্দুদের ব্যাপারটা নতুন, আগেও ভারতে গরুর মাংশ খেত,কিন্তু কৃষিভিত্তিক সমাজে গরু হল সম্পদ তাই চাষবাসের সুবিধার জন্য গরু নিধন বন্ধ করা হয়।

মুসলমানদের শুয়োরের মাংশ না খাওয়ার জন্য কোরানের নির্দেশ আছে (২:১৭৩), তবে বাধ্য বা নিরুপায় হলে খাওয়া যাবে। কিন্তু ঠিক কি জন্যে তা স্পষ্ট নয়, কারণ শুয়োরের মাংস খেয়ে দুনিয়ার অন্যসব জাতি বহাল তবিয়তে দীর্ঘায়ু নিয়ে বেঁচে থাকছে। খ্রীস্টান ধর্মের প্রসারের সময় সাধু পল দেখলেন শুয়োরের মাংস খাওয়া এপ্রুভ না করলে খাদ্য অপ্রতুল ইউরোপের ধর্মের পালে হাওয়া লাগবে না। ফলে পল অথবা যীশুর অনুসারীরা শুয়োরের মাংস খেতে বাধা নেই, এতে আমরা আবারও ধর্মীয় বিধানে স্হানীয় কৃষ্টির প্রভাব দেখতে পাই।

দেশ সমস্যা অনুসারে বিধান বা নিয়ম ভিন্ন হতে পারে। এটা মেনে নিলে আজকের দুনিয়ায় উদ্ভূত অনেক সমস্যার নিজে থেকে সমাধান হয়ে যায়। যারা দেশের বাইরে থাকেন তারা জানেন নতুন সমাজে প্রতিনিয়ত তাদের সামাজিক, ধর্মীয় আচরণ কিভাবে মানিয়ে নিতে হয়।

সূক্ষভাবে বিচার করতে গেলে সর্বজনীন পাপের কোন সংজ্ঞা দেয়া যায় না। পাপ কি ? কার কাছে পাপ ? উর্দু একটা শের মনে পড়ল যার মানে হল, "ও কোনজন যার পূণ্য করার ফুরসত মিলে, আমি তো পাপ করেই শেষ করতে পারলাম না"।

পাপ করলে আমরা দুনিয়ায় আসি আদমের পাপে আমরা পৃথিবীতে, আবার পূণ্য করলে আমার স্বর্গলাভ হয়। স্বর্গ-নরক রুপকে আত্মিক শান্তি বা অশান্তি বুঝায়, এর অবস্হান এ দুনিয়াতেই টের পাওয়া যায়। 'লালন বলে নাম উর্বশী নিত্য নিত্য তাঁর প্রমাণ পাই', অর্থাৎ পাপের অনুভূতি থাকলে দুনিয়াতে আমাদের নরকবাস হয়, অপরদিকে অপাপবিদ্ধ শরীরে স্বর্গীয় সৌন্দর্যের যে অনুভূতি হয় তার নাম 'উর্বশী'।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29381256 http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29381256 2011-05-15 01:12:38
লালনগীতি: আগে জানলে তোর ভাঙা নৌকায় চড়তাম না। লিন্ক

আগে জানলে তোর ভাঙ্গা নৌকায় চড়তাম না।
ওরে দূরদেশে পাড়ি ধরতাম না ।।

ছিলো সোনার দাঁড় একখানা
পবনের বৈঠা ময়ুরপঙ্খী নাওখানা
গলুইতে ছিলো ফুল তোলা গহনা
চন্দ্র-সূর্য তার জোস্না। ।

ছমছম কলকল দরিয়াতে ওঠে ঢেউ
ঐ মাতঙ্গ তুফান দেখে কেউ
দিও না পাড়ি কারণ্য দরিয়ায়
নাও ডুবিলে উপায় কি জানো না । ।

একটা ছিদ্র ছিলো বুঝি নায়ের মাঝখানে
ওঠলো পানি ভরে নায়ে তুফানে তুফানে
যদি যেতো জানা নায়ের ছিদ্র আছে গোপনে
লালন বলে তা হলে নায়ে চড়তাম না। ।

খুবই জনপ্রিয় এ গান রুনা লায়লা, ফেরদৌসী মজুমদার এরা গেয়েছেন তবে আমার কাছে আব্বাস উদ্দিনের গাওয়াটা ভাল লাগে। উদ্দীন বলে ফেভারিটিজম না ! লিরিক যে কোনটা সঠিক, ইউটিউবে দেখা যায় এটি পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের সংগৃহীত গান, সেখানে লালনের নাম নেই। গানে 'কইরা', 'ধইরা', 'ও আমার দরদী' ধুয়া তোলা শব্দ হয়ত বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে, লবঙ্গ লতিকা দেশটাও ফোকেরই ইঙ্গিত দেয়। সেক্ষেত্রেও ভাবের দিক দিয়ে গানের কোন অমিল নেই, লিরিকেও অসম্ভব মিল, তাই আসল কথায় আসি।

এসব নৌকা ফৌকা কিছু না, দেহটাই এখানে নৌকা। কোন অচিনদেশ থেকে এ শরীর রুপ নৌকায় ভর করে আমরা সবাই ভবের সাগর পার হচ্ছি। লালনের ভাষায় সোনার দাঁড় হল আমাদের মেরুদন্ড, পবনের বৈঠা অর্থাৎ বাতাসে এ নৌকা চলে, বাতাস ছাড়া আমরা বেঁচে থাকতে পারি না। ময়ুরপঙ্খী নাওয়ের মত, নৌকার আগাতে মানে মানুষের মাথাতেই সব সৌন্দর্য, কারুকার্য। গলুইতে ফুলতোলা গহনা, চন্দ্র-সূর্য, আর টলটলে জোস্না আসলে এ নৌকা বয়ে যাবার পেছনে যে উদ্দীপনা, জীবনীশক্তি দরকার , শরীরের জননেন্দ্রিয়াঞ্চলে এর আধার।

এরকম অবস্হায় ভবপারাপারের এই ঘাটে দাঁড়িয়ে তুফানের বহর দেখে লালন আমাদের সাবধান হতে বলছেন, কারণ তরী ডুবলে উপায় কি হবে তা কারো জানা নেই।

খুব সহজ কথাবার্তার এ গানটি লালনের 'সাধক' পর্যায়ের গান, ফলে এরকম গানে আধ্যাত্মিক মান-অভিমানের পালা দেখা যায়। লালন অনুযোগ করছেন, নায়ের মাঝখানে একটা ছিদ্র ছিল, তাই তো তুফানে পানি ওঠে, আগে যদি জানতাম ব্যবস্হা করা আছে, তাহলে দয়াল তোর নৌকায় চড়তাম না। বাস্তবিকই মানুষের শরীরের আগাগোড়া শক্ত কিন্তু মাঝখানটাই দূর্বল, মাঝখানের এ ছিদ্র ভরাট করতেই মানুষের দেহ নৌকা ডুবে যাচ্ছে।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29381182 http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29381182 2011-05-14 22:42:34
লালনগীতি: ও যার আপন খবর আপনার হয় না।
সবার আগে লালনের প্রবর্ত্যদেশের গান 'ও যার আপন খবর আপনার হয় না ' দিয়ে শুরু করা যাক। ছোটবেলায় রেডিওতে আব্দুল আলীমের কন্ঠে এ গানটা এত শুনেছি কখনও লিরিকস খেয়াল করিনি।

ও যার আপন খবর আপনার হয় না
একবার আপনারে চিনতে পারলে যে,
যাবে অচেনারে চেনা।।

সাঁই নিকট থেকে দূরে দেখায়,
যেমন কেঁশের আড়ে পাহাড় লুকায় দেখ না
আমি ঘুরে এলাম সারা জগৎ রে,
আমার মনের ঘোর তো যায় না।।

আত্মরূপে কর্তা হরি,
মনে নিষ্ঠা হলে মিলবে তার ঠিকানা
ও তুই বেদ - বেদান্ত, পড়বি যত রে,
ও তোর বাড়বে তত লগ্না।।

আমি আমি কে বলে মন,
যে জানে তার চরণ শরণ লও না
ফকির লালন বলে মনের ঘোরে রে,
হলাম চোখ থাকিতে কানা।।

ও সে অমৃত সাগরের সুধা,
সুধা খাইলে জীবের ক্ষুধা তৃষ্ণা হয় না
ফকির লালন মরল জল পিপাসায় রে,
কাছে থাকতে নদী মেঘনা।।

সক্রেটিসের মত ফকির লালনও নিজেকে জানার উপর জোর দিয়েছেন, কারণ নিজেকে জানলেই তবে অজানাকে অচেনাকে জানা যায়। আমাদের জানার বৃত্তে প্রচলিত কথার বিপরীতে আসলে জ্ঞানেরই সীমা আছে, অজ্ঞানতার কোন সীমা-পরিসীমা নেই।

এ অজান জগতের হদিস আমাদের খুবই নিকটে। আমাদের অভ্যন্তরীণ সত্তা যার অবস্হান আমাদের মস্তিষ্কে সেখানেই সাঁইয়ের অধীষ্ঠান। লালন তাই রুপকের মাধ্যমে বলছেন, ' যেমন কেশের আড়ে পাহাড় লুকায় দেখ না'। কিন্তু না বুঝে, মনের ঘোরে আমরা তাঁকে পাহাড়ে-পর্বতে, নদী-নালায়, চরাচরে অর্থাৎ বাইরে খুঁজে বেড়াই।

লালনের মতে আত্মরুপে কর্তা ভজলে তবে তাকে জানা যায়, তাঁকে খুজতে বেদ-বেদান্ত পড়ে শুধু সময় নষ্ট। এই যে আমরা 'আমি', 'আমি' বলছি, এ আমিটা কে? তা যদি জানা না থাকে তবে মানুষ গুরুর শরণাপন্ন হওয়া যেতে পারে।

এ রসের সুধা পান করলে মানুষের মন জৈবিকভূমি থেকে উর্ধ্বে আরোহন করে ফলে ক্ষুধা-তৃষ্ণার নিবারণ হয়। মনের মানুষের সাথে মিলন পিয়াসী মনের আকুল তিয়াসা থেকে লালনের আক্ষেপ,'ফকির লালন মরল জল পিপাসায় রে, কাছে থাকতে নদী মেঘনা'।

ইংরেজিতে ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29380789 http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29380789 2011-05-14 11:10:13
টরন্টো শহরের দিনলিপি।
যাহোক, সময়ের এ রঙ্গমঞ্চে আমার অবস্হান এখন কানাডার টরন্টো শহরে, বাঙালিদের আখড়া ড্যানফোর্থ ভিক্টোরিয়া এলাকায়। এখানে কোন কোন সময়ে রাস্তাঘাটে বঙ্গপুঙবদের সরব উপস্থিতি দেখে না বুঝবার উপায় নাই যে আপনি বাঙালি এলাকায় চলে এসেছেন। অফিস, দোকান-পাট, ব্যাংকে বাঙ্গালরা ভালই কাজ চালাচ্চে, দেখে ভাল লাগে এখানকার বাঙালি মেয়েরা খুব স্বচ্ছন্দে কর্মপরিবিশে মানিয়ে নিয়েছে , দেশে থাকলে হয়ত এরা কোন কাজ করত না, দরকার হত না বলে। বিদেশে টিকে থাকবার জন্যে ,সময় কাটাতে বা নিজেকে নতুন করে খুজে পেতে এরা কাজে মন দেয়। পাশ্চাত্যের 'উইম্যান ফ্রেন্ডলি' রাস্তাঘাট এবং কর্মপরিবেশই এটা সম্ভবপর করেছে, আমরা তো এখনও ইভটিজিংয়ের উর্ধে উঠতে পারলাম না, ভাবা যায় না, বাংলাদেশে ইভটিজিংয়ের জন্য এখনও শিক্ষককে প্রাণ দিয়ে বীরত্ব দেখাতে হয়।

বিদেশে বাঙালিদের সুনামই বেশি, স্বভাবগতভাবেই ইংরেজ অনুকরণপ্রিয় বাঙালিরা সাহেবদের সাথে কোন ভেজালে যায় না। তারা আড্ডাবাজি করে সময় নষ্ট করে না, আড্ডা না দিয়ে ঐ সময়টা কাজ করলে 'আওয়ার' পাওয়া যাবে। আমি কিন্তু শুধু নিম্ন-মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্তদের কথা বলছি, এরাই এ সমাজের 'লোয়ার ক্লাস'। এ বিদেশেও মানুষ শ্রেণীবিভক্ত, বড়লোকেরা থাকেন অন্যপাড়ায়, সে পাড়ার হদিস আমার জানা নেই।

কতরকমের শ্রেণী যে আছে, সেই শ্রেণীভিত্তিক সহজাত অহংকারও বাঙালিসংঘাতে সমানে দেখা এবং শোনা যায়। যেমন, টরন্টোর যে কোন বাংলাদেশীকে বাংলাদেশে তাঁর বাড়ি কোথায় জানতে চাইলে অবলীলায় সবাই বলে ঢাকায় বা ঢাকায় সেটল্ড। কথা হয়ত সত্য, এখানে গরীব হলেও বাংলাদেশে এরাই মধ্যবিত্ত বা ধনী, অথবা বিদেশে থাকার সুবাধে ঢাকায় একটা বাড়ি বা নিদেনপক্ষে ফ্লাট বা প্লটের মালিক। আসল কথা হল, এরা সবাই নিজের অরিজিন লুকাতে চায়, আইডেন্টিটি নিয়ে কমপ্লেক্স আছে।

আমার মতে দুইটা শ্রেণী খুব বেশি প্রকট, শিক্ষিত আর অশিক্ষিত। এখনকার যুগে যত দুনিয়ায় যত ঝুট-ঝামেলা লেগে আছে, তার জন্য মানুষের মধ্যে যারা শিক্ষিত তারাই দায়ী, কিন্তু শিক্ষিতরা তার জন্য দায়িত্ব নিবে না, উল্টে যারা অশিক্ষিত তাদের যেভাবে পারবে শোষণ করবে। বাঙালিরা এমনিতে নিজেদের আলাদা করে রাখে, বেশিরভাগই কাউকে পাত্তা দিতে চায় না, আমার মতে এটা খারাপ কোন গুণ না, এত পাত্তা দেয়ার কি আছে ,তবে বিনয়ের অভাব সব সময়ই দৃষ্টিকটু। এরমধ্যে যারা অল্পবিস্তর টাকা কামায় বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বেশি তাদের গুমোরই আলাদা, এরা সংখ্যায় খুব ছোট, 'আইসোলেটেড সাবার্বিয়ান মিডল ক্লাস'। এরা না পারে মেজরিটি বাঙালীদের সাথে মিশতে, ঈমাণের ভয়ে এরা শাদাদের ককটেল পার্টিতে যায় না, কালোরা তাদের কাছে কাউল্লা, পাকিরা শরাবী । ভালটা কে ?

আজকে এখানেই থামি, পরে আরেকদিন লিখব।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29375483 http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29375483 2011-05-05 08:10:29
মানুষের মানুষ হয়ে ওঠা। 'দেবদেবতাগন করে আরাধন জন্ম নিতে মানবে'।

সরীসৃপ মস্তিষ্কঃ



সময়ের সাথে প্রকৃতিতে খাপ খাওয়ানোর জন্য মানুষের মস্তিষ্ক বিবর্তিত হয়েছে, এ মস্তিষ্কের সবচেয়ে পুরাতন এবং ভেতরের অংশ সরীসৃপ মস্তিষ্ক। বিবর্তন প্রক্রিয়ায় এর তেমন কোন পরিবর্তন হয়নি, অন্যান্য মেরুদন্ডী প্রাণির মত শ্বাস-প্রশ্বাস এবং শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে আমাদের মস্তিষ্কের এ অংশ কাজ করে। সরীসৃপরা শীতল রক্তের প্রাণি, সূর্যের আলো থেকে এরা তাপ গ্রহণ করে এবং অন্ধকারে কম নড়াচড়া করে শক্তি সঞ্চয় করে। মানুষ এখনও সরীসৃপের উত্তরাধিকার বহন করে চলছে,দিনের বেলা কাজ করে এবং রাতে বিশ্রাম নেয়। বিবর্তনের সরীসৃপ পর্যায়ে প্রজাতির আচরণের বিশাল অংশ জুড়ে বংশবৃদ্ধি এবং টিকে থাকার কৌশল। জোর জবরদস্তি করে এলাকা দখল এবং তা ধরে রাখা সরীসৃপ পর্যায়ের বৈশিষ্ট্য। মানুষের মধ্যে যারা এখন মাস্তান, ভূমি দখলকারী, এলাকাভিত্তিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী তাদের মধ্যে আদিম সরীসৃপ মগজের ব্যবহার বেশি করে। জোর যার মুল্লুক তার।

স্তন্যপায়ী মস্তিষ্কঃ


মস্তিষ্কের বিবর্তনের এরপরের ধাপে আসছে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের পর্যায়, সরীসৃপ থেকে স্তন্যপায়ীতে রুপান্তরের সময় মস্তিষ্কের বিশাল পরিবর্তন হয়।
শরীরের তাপমাত্রা এখন আর সূর্যের উপর নির্ভরশীল নয়, স্তন্যপায়ীরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এছাড়া পরিপাক, রক্তচাপ, শরীরের অন্যান্য তরলের স্হিতাবস্হা নিয়ে প্রাণিকে আর মাথা ঘামাতে হয় না।
নতুন অভিজ্ঞতা এবং অভিজ্ঞতাসন্জাত স্মৃতি সঞ্চয় করে রাখার পদ্ধতিও এ জাতীয় ব্রেইনে দেখা যায়(হিপোক্যাম্পাস)। অভিজ্ঞতা থেকে বিপদ বুঝতে পারা এবং তদনুযায়ী সাড়া দেয়ার ব্যবস্হাও এ জাতীয় মস্তিষ্কে দেখা যায় (এমিগডালা)।

এজন্য পরিবেশের সাথে স্তন্যপায়ীদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। কোটি কোটি স্নায়ু সরীসৃপ মস্তিষ্কের সাথে হিপোক্যাম্পাল এবং এমিগডালার মধ্যে সংযোগের কারণে এ ধরণের প্রাণির আচরণ ইনস্টিংট দ্বারা কম পরিচালিত হয়। গোত্রপ্রীতি, রাগ এবং ভয়ের অনুভূতি আসলে এ জাতীয় মস্তিষ্কের অধিকারীদের ঝগড়া-বিবাদ, পলায়ন বা সহানুভূতি জাতীয় আচরণের প্রকাশ।

মানব মস্তিষ্কঃ


স্তন্যপায়ীদের মস্তিষ্কে বিশাল বড় ধুসর মস্তিষ্ক (গ্রে ম্যাটার) যোগ করে সৃষ্টি হয়েছে মানব মস্তিষ্ক। ধুসর অংশ আদিম সরীসৃপ এবং স্তন্যপায়ী মস্তিষ্ককে ঢেকে রাখে এবং মস্তিষ্কের মোট ভরের প্রায় ৮৫ ভাগ।
এর মোট দুটি ভাগ যা বহিরাবরণ দ্বারা সংযুক্ত এবং অসংখ্য স্নায়ু দিয়ে যোগাযোগ রক্ষা করে। ধুসর মস্তিষ্কের বাম অংশ শরীরের ডান অংশের নড়চড়া এবং অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করে অপরদিকে ডান অংশ শরীরের বাম অংশ নিয়ন্ত্রণ করে।

মানব মস্তিষ্কের এ দু' অংশের মাঝে খুবই সুন্দরভাবে দায়িত্ব বন্টন করা আছে। পারস্পরিক সহযোগীতা এবং যোগাযোগের মাধ্যমে তারা এসব দায়িত্ব পালন করে থাকে। মোটের উপর বাম অংশের কাজ শব্দের মাধ্যমে যোগাযোগ করা, বিশাল শব্দভান্ডার এবং তা প্রকাশের যোগ্যতা, যুক্তি নির্ভরতা গোছানো এবং যেকোন বস্তুকে তার নিজস্বতায় গ্রহণ করার ক্ষমতা।

ডান অংশ সাধারণত ছবির মাধ্যমে যোগাযোগ করে, কল্পনা এবং প্রজ্ঞার ক্ষমতা , আবেগ অনুভূতির সাথে সম্পর্কিত। আদিম মস্তিষ্কের সাথে এর সংযোগ থাকায় ছবির মাধ্যমে শরীরের আদিম অবচেতন অবস্হার সাথে যোগাযোগ করতে পারে। ছবির মাধ্যমে খুব দ্রুত চিন্তা করা যায় এবং অনেক জটিল বিষয়াবলী খুব দ্রুত সারা যায়। কিন্তু ছবির পূর্ণাঙ্গ বর্ণনা করতে হলে বাম অংশের সাহায্য দরকার।

আমরা দেখেছি স্তন্যপায়ী মস্তিষ্ক রাগ, দুঃখ, ক্ষোভের আবেগের প্রকাশ করে। আর মানুষের আবেগীয় ব্যাপার নিয়ন্ত্রিত হয় মানব মস্তিষ্কের ডান অংশের মাধ্যমে যা স্নায়ুর মাধ্যমে স্তন্যপায়ী মস্তিষ্কের সাথে যুক্ত, একই ভাবে স্তন্যপায়ী মস্তিষ্ক আরও পুরাতন সরীসৃপ মস্তিষ্কের সাথে যুক্ত।

তবে মানব মস্তিস্কের সবচেয়ে বড় ক্ষমতা হল ভাষার ব্যবহার, লিখিত, কথ্য এবং ছবির ভাষা। ভাষার এসব মাধ্যম ছবি, দৃশ্য এবং স্মৃতির উপর নির্ভরশীল যা সারা মস্তিষ্কে ছড়িয়ে আছে। আরেকটা উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল কোন কিছুর মানে বুঝতে পারা, যেমন কোন বাক্যের মানে বুঝতে পারা, যার জন্য দরকার অত্যন্ত উচুঁমানের প্রসেসর।

মানুষের আজকের এ অবস্হানে আসার পেছনে মানব মস্তিষ্কের অবদান সবচেয়ে বেশি, এর মাধ্যমে আমরা অন্য স্তন্যপায়ী এবং সরীসৃপদের থেকে পৃথক বৈশিষ্ট্য অর্জন করে প্রকৃ্তিতে নিজেদের প্রাধান্য এনেছি। কিন্তু তাই বলে মস্তিষ্কের সরীসৃপ এবং স্তন্যপায়ী অংশকে একেবারে ফেলে দেইনি, টিকে থাকার জন্য সেগুলো এখনও দরকার। যেমন ছোটবেলায় সরীসৃপ মস্তিষ্ক খুব কাজে আসে বলে ধারণা করা যায়, যারা বড় হয়েও এসব সরীসৃপীয় দখলদারী, স্বার্থপর ধরণের বৈশিষ্ট্যের প্রয়োগ ঘটায় মানব সমাজে তারা ঘৃণিত।

একইভাবে শিশুর বেড়ে ওঠায় বাবা-মা এবং আত্মীয়-স্বজনের ভূমিকায় স্তন্যপায়ী মস্তিষ্কের অবদান আছে বলে ভাবা যায়। এছাড়া গোত্র,সমাজ, জাতীয়তাবাদী চিন্তায়, বন্ধু-বান্ধব, ধর্ম এ জাতীয় সামাজিক অনুসঙ্গে স্তন্যপায়ী মস্তিষ্ক কাজ করে।

কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ মানব মস্তিষ্ক বা গ্রে ম্যাটার, যার রয়েছে অসীম ক্ষমতা এবং সম্ভাবনা। একমাত্র এ অংশের মাধ্যমেই মানুষের মানবিক আচরণ ব্যাখ্যা করা যায়। মৃত্যুমুখে দাঁড়িয়ে নিজের বিপদ জেনেও মানুষ যখন অপরকে সাহায্য করে, কোন আদর্শের জন্য জীবন দেয়, ক্ষুদ্র স্বার্থের চেয়ে মানুষ যখন বৃহৎ স্বার্থের জন্য কাজ করে তখন এ মানব মস্তিষ্ককেই বাহবা দিতে হয়। জ্ঞান-বিজ্ঞানে, সৃষ্টিশীলতায় মানুষের ক্রমাগত উন্নতির পেছনেও এ গ্রে ম্যাটার।

কিন্তু এতবড় মস্তিষ্ক পাওয়ার জন্য আমাদের কম মূল্য দিতে হয়নি। বিশাল মস্তিষ্কের খাবার যোগাতে প্রতিদিন আমাদের প্রায় ১২০ গ্রামের মত শর্করা দরকার। একসময় যখন খাদ্য অপ্রতুল ছিল তখন এটি খুবই চ্যালেন্জিং ছিল, কিন্তু এ মস্তিষ্কই তার সমাধানে এগিয়ে এসেছিল,তাই মানবতার জয়গান মানেই হল ধুসর মস্তিষ্কের জয়গান। মার্ক্স বলেছিলেন, মানুষের ইতিহাস এখনও শুরু হয়নি, আসলেই তাই । মানুষকে আরও মানুষ হয়ে হয়ে উঠতে হলে দরকার বেশি বেশি মানব মস্তিষ্কের ব্যবহার। শুরু হোক মাথা ঘামানোর দিন ।


দায় স্বীকার
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29178600 http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29178600 2010-06-17 04:33:29
বিস্মৃতিপরায়ণ হোমো স্যাপিয়েন্স স্যাপিয়েন্স।
মানুষের আবির্ভাব হয়েছে, তাও বেশিক্ষণ হয়নি, ঘন্টাদুয়েক আগে সে প্রথম সোজা হয়ে হাঁটতে শুরু করেছে, মিলিয়ন বছর কসমিক ক্যালেন্ডারে প্রায় ঘন্টার সমান। এরপরে কয়েকটা বরফযুগ পেরিয়ে, ভূপৃষ্ঠের জৈববৈচিত্রের নানা বিবর্তনের পর মানুষ আজকের অবস্হানে এসে পৌঁছেছে।

তারপরে শেষ মিনিটে এসে মানুষ লিখতে শেখে, গুহাচিত্র আঁকে, নিজেকে প্রকাশ করার আকাংখা তীব্র হয়,সেসবই এখনও টিকে আছে। এ ঘটনাগুলো যখন ঘটেছে তা কিন্তু বেশিদিন আগের কথা নয়,মহাবিশ্বের হিসেবে চোখের পলক ফেলার মত সময়।

বাঙালীকে মানুষ ইতিহাস অসচেতন, বিস্মৃতিপরায়ণ বলে। আমার মনে হয় সারা দুনিয়ার মানুষই তাদের নিজেদের ইতিহাস নিয়ে বিস্মৃতিপরায়ণ, বছরের শেষদিনের শেষ মিনিটের ঘটনার উত্তেজনা সামলাতে পারছে না। বর্তমানে এমনভাবে মজে আছে যে এদের ঘুম ভাঙাবে কার সাধ্য? লিখিত ইতিহাস আসার পরে মানুষ তার অতীত ভুলে গেছে, বেশিদিন আগের কথা না অথচ বরফযুগ, বরফযুগপূর্ব স্মৃতি আজ তার মনে আর উঁকি দেয় না। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29122700 http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/29122700 2010-03-24 22:20:03
আমার পছন্দের পোস্টসমূহ। ঈমান জোরদার করার জন্য বিভিন্ন ব্লগ হইতে সংগৃহিত ক্লাসিক লেখা
আল্লাহ, মুহম্মদ সা এবং আল-কোরআন বিষয়ক কিছু আলোচনার জবাবে....
বাংলা একাডেমী প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম
ব্লগারদের পছন্দের সেরা কিছু রোমান্টিক বাংলা গান
Living to tell the Tale ঃ নিষিদ্ধপল্লীতে ভ্রমন এবং আরো কিছু জানা অজানা অভিজ্ঞতা
খলিল জিব্রান
জৈন কারা?
যুক্তির ফ্যালাসি, কুযুক্তি বা নষ্টামিসমূহ
প্রজ্ঞাপারমিতা
"আবে, কোন মামদির পো সামনে খাড়া? যা কিনার"
ব্লক করুন অনাকাংখিত সাইট
গল্পঃ বাথরুমে গণতন্ত্রের পতনে শ্যাওড়াপাড়ার মানুষেরা যা করে
যুক্তরাষ্ট্রে ফান্ডিং নিয়ে পড়তে আসুন
পার্কজুড়ে কেবলই ব্যবহৃত কনডমের খোসা
হুলিয়া ।। নির্মলেন্দু গুণ
সূর্যকে কেন্দ্র করে জ্যোতিষ্ক মন্ডলী ঘোরে
আমাদের পাঠশালা'র নববর্ষ র‌্যালী
পাঁচ-কুড়ি-এক বাছাই বচন
বেহুলা - লক্ষিন্দরের বাসর ঘর
রবীন্দ্রনাথের অসাধারণ এক কবিতা, না পড়লে জীবন বৃথা!! -১
প্রতিবেশি লেখার খাতা
গণজাগরণের শিল্পী : শাহ আবদুল করিম
সংস্কৃতি সতত, সর্বত্র সমাজ-মানুষের জনক-জন্য
স্মৃতি হাতড়ে......পড়া বইয়ের তালিকা...
আর রেখোনা আঁধারে আমায়; দেখতে দাও... (প্রসঙ্গঃ আরজ আলী মাতুব্বর-এর ধর্মদর্শন)
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গনহত্যার ভিডিও দেখুন
পরীক্ষাগারে বিগ ব্যাং: উত্তর মিলবে অনেক প্রশ্নের
বাংলা বই এর সাইট
যে বই গুলো পড়া দরকার
অনলাইনেই কনভার্ট করুন
সারা দুনিয়ার মানুষকে মুসলমান বানায়া ফেলবো যদি ফজলে এলাহি কোরান অনুযায়ী আবিষ্কারটা করেন
কিভাবে পোস্টে ইউটিউব ভিডিও যোগ করবেন?
আপনি কেমন আছেন কবি দাউদ হায়দার!
হুমায়ুন আজাদ যেখানে জিতে গেছেন
চার্লস বুকস্কির ছায়া কবিতা
আন্দালিফের দূর্বল গদ্য
জয়নাল অনুসন্ধান।
আন্দালিফ-বৈকালিক ভাবনা। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/28965723 http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/28965723 2009-06-17 07:31:02
মুসলিম বাঙালী
কেন বলছি? সম্প্রতি এক বন্ধু দাওয়াত খেতে গিয়ে দেখে সব আইটেমেই গরুর মাংস মেশানো, এমনকি পোলাও পর্যন্ত। মেজবান হয়ত খেয়াল করেনি যে অতিথিদের মধ্যে একজন হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক আছেন, ভেবেছিলেন সবাই হয়ত তার মত 'গরু খাওয়া মুসলমান'। বাই দ্য ওয়ে, এই 'গরু খাওয়া মুসলমান' কথাটা কেন আসল? হিন্দুদের চাইতে পৃথক বুঝাবার জন্যে, না , আমজনতার মাঝে ধর্মের কোন সিম্বল দেখা যায় না, শুধু গরু খাওয়ার ব্যাপার আসলে বুঝা যায় কে মুসলিম , কে হিন্দু?

তো সে মিস্টান্ন খেয়ে কোনমতে সে যাত্রা রক্ষা পেল। মজার ব্যাপার হল অতিথিদের অনেকে জানত সে গরুর মাংস খায় না, কিন্তু কেউ লক্ষ্য করেনি এবং কিছু বলেওনি। টেকনোক্র্যাট তৈরি হচ্ছে সব।


এই একই লোক ঈদের পার্টিতে গেসল। একজন জানতে চাইল, কি খবর ভাই, ঈদের জামাতে দেখলাম না?

দোষের কিছু নাই, কেউ জানতে চাইতেই পারে। ভয় লাগে শুধু তখনই, যখন আমরা ধরেই নিই যে সবাই মুসলমান বা ধর্মানুসারী। সমাজে যার প্রভাব আস্তে আস্তে বাড়তেছে।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/28855208 http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/28855208 2008-10-15 22:55:09
সিদ্ধার্থ, নির্বাণের পথ (সিরাতুল মোস্তাকিম) নিজেকেই খুঁজে নিতে হয়। সিদ্ধার্থ আর গোবিন্দ। দুজনে ব্রাক্ষ্মণ সন্তান,ছোটবেলা থেকে বন্ধু, একই পাঠশালায় যায়, একসাথে বেড়ে ওঠে। গোবিন্দ সাধাসিধে, সবসময় সিদ্ধার্থকে অনুসরণ করে, নিজের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা কম।

আর সিদ্ধার্থ সব দিকে সেরা,বাবা মায়ের গর্ব । বাবার ধারণা সে একদিন নামকরা পন্ডিত হবে । কিন্তু সিদ্ধার্থের ভেতরে সেই অজানা অচেনা বোধ, 'অন্তর্গত বিস্ময়' কাজ করে। নিছক পান্ডিত্যে তার মন ভরে না। সে জগতের মানে জানতে চায়, বন্ধন থেকে মুক্তি চায় সবার উপরে নির্বাণ লাভ করতে চায়।

একদিন শহরে সন্যাসীদের আগমণ ঘটল। তারা পথে-প্রান্তরে ঘুরে বেড়ায়, রোগ-শোক, জরা-তাপে তাদের কিছু হয় না। জগতের কোন কিছুতে তাদের আকর্ষণ নেই।

সিদ্ধার্থ সিদ্ধান্ত নিল সে ওদের সাথে যোগ দিবে। পন্ডিত বাবার কাছে অনুমতি নিয়ে সে পথে বেরিয়ে পড়ল। সাথে যোগ দিল বশংবদ বন্ধু গোবিন্দ।

সন্যাসীদের সাথে কিছুদিন থেকে সিদ্ধার্থ তাদের ধ্যানের কৌশল জেনে নিল। হিপনোটাইজ করার সব কৌশল তার আয়ত্তে চলে আসল। কিছুদিনের মধ্যে সে সন্যাসবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে উঠল। অতঃপর প্রধান সন্ন্যাসীকে মোহাচ্ছন্ন করে সে একদিন বিদায় নিল। এদের কাছ থেকে তার আর কিছু শেখার নেই, এরা নিজেরাই পথ খুঁজছে।

এরমধ্যে খবর এল অনতিদূর শহরে গৌতম বুদ্ধ এসেছেন। দলে দলে লোকজন সেদিকে চলছে। সিদ্ধার্থও গেল ঐ শহরে। তারা বুদ্ধের বাণী শুনল, কিভাবে অজ্ঞতা দূর করে নির্বাণ লাভ করতে হয়। দলে দলে লোক বুদ্ধের শরণ নিল, তার সাথে যোগ দিল। বন্ধু গোবিন্ধও তাই করল। কিন্তু সিদ্ধার্থ দেখল এত লোক বুদ্ধের অনুসরণ করলেও একমাত্র বুদ্ধই নির্বাণ লাভ করেছেন। বুদ্ধের দেখানো পথে অন্যেরা নির্বাণ হয়নি। তাই সে সিদ্ধান্ত নিল বুদ্ধ নির্বাণের পথ দেখাতে পারে, কিন্তু অপরকে বুদ্ধত্ব দিতে পারে না। বুদ্ধত্ব লাভের পথ, নির্বাণের পন্হা নিজেকেই খুঁজে নিতে হয়। গোবিন্দের মত লোকেদের জন্যে বুদ্ধের সন্নিকটে তার নির্দেশিত পথে থাকাটাই মঙ্গলজনক, কিন্তু সিদ্ধার্থকে তার নিজের পথ খুঁজে নিতে হবে।

বন্ধু গোবিন্দকে বিদায় জানিয়ে, গৌতম বুদ্ধকে পেছনে ফেলে আবার পথে নামল সিদ্ধার্থ। অনেক পথশ্রমের পরে ক্ষুধা-নিদ্রায় কাতর গোবিন্দ এক শহরে পৌছাল। শহরে ঢোকার মুখে সে দেখল অপূর্ব সুন্দরী বাঈজী কমলার শোভাযাত্রা। কমলাকে দেখে সে ভাবল একে তার চাই। কথায় বলে না 'পাপ না করলে পূণ্যে টানে না'। মলিন বেশভূষা নিয়ে সে কমলার প্রাসাদে তার সাথে দেখা করতে গেল। কমলা হেসে খুন, সন্ন্যাসী তাকে কামনা করছে। পয়সা ছাড়া সে কারো বাহুলগ্না হয় না।

কাজের সন্ধানে কমলার দেয়া ঠিকানা অনুযায়ী সে গেল ব্যবসায়ী কামস্বামীর মোকামে। এখানটা খুবই মজার, না বলার লোভ সামলাতে পারছি না । কামস্বামী জানতে চাইল তার কি যোগ্যতা? জবাবে সিদ্ধার্থ বলল, আমি হিসাব জানি, আমি অপেক্ষা করতে জানি, আমি উপোস থাকতে পারি। কামস্বামী বুঝতে পারল না এসব কিভাবে ব্যবসায় কাজে লাগতে পারে। সিদ্ধার্থ তখন বলল, দেখুন আমি যদি অপেক্ষা করতে না জানি তাহলে ঠকার সম্ভাবনা বেশি, আপনার যেকোন অফার গ্রহণ করে ফেলব। আবার যদি ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে না পারতাম তাহলে এতক্ষণে অন্য সবার মত যেকোন একটা ছোট কাজ শুরু করে দিতাম। কিন্তু আমি ক্ষুধাকে জয় করেছি, তাই অস্হির হই না, ঠান্ডামাথায় ভাবতে পারি।


কামস্বামীর ব্যবসায় সিদ্ধার্থ কাজে লেগে গেল। দিনের বেলা কাজ করে রাতে কমলার কাছে কামকলা শিখতে যায়। কিছুদিনের মধ্যে সে দুটোতেই পারদর্শী হয়ে উঠল, তেলচিক্কণ চেহারায় সন্ন্যাসজীবনের চিন্হ পর্যন্ত নেই। রেশমের কাপড়, দামী জুতো, রোশনাই সুবাস লাগিয়ে সে যখন কমলার কাছে যায় তখন কেউ বলতে পারবে না এ লোক সন্ন্যাসী ছিল। ব্যবসায় সে উন্নতি করতে থাকে নিজস্ব ব্যবসা, জমিজমা, ধন-দৌলত নিয়ে সে অতীত জীবন ভুলে যায়। কমলার কোমল বাহুতে সে নিজেকে সমর্পণ করে। কমলাও তাকে জীবনের সবচেয়ে বেশী আপন করে নেয়।

এরমধ্যে একদিন সে জানতে পারে কমলা গর্ভবতী, তার সন্তানের মা হতে যাচ্ছে। সেই রাতে তার আহার-নিদ্রা বন্ধ হয়ে যায়। ' অর্থ নয়, বিত্ত নয়, কোন এক অন্তর্গত বিস্ময় ' তার রক্তে খেলা করে। রাতের আঁধারে আবার সব ছেড়ে সে পালায়।

যেতে যেতে অনেক দূরে এসে সে এক খেয়া ঘাটে উপস্হিত হয়। এক বুড়ো মাঝি নৌকা করে যাত্রী পারাপার করে। সে ঐ নৌকায় উঠে বসে। মাঝির কাছে জানতে চায় সে কতদিন ধরে খেয়া পার করছে, তার কাছে কি একঘেঁয়ে মনে হয় না? মাঝি জবাবে বলল, না একঘেঁয়ে মনে হবে কেন? সে পানির কথা বুঝতে পারে, শুধু পানির স্রোতের দিকে তাকিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা পার করে দিতে পারে। পানি জীবনের কথা বলে, জগতের সব খবর সে পানির দিকে একনিষ্ঠ ভাবে তাকিয়ে থেকে বলে দিতে পারে।

সিদ্ধার্থের আর কোথাও যাওয়া হয় না। সে মাঝির সাথে থাকা শুরু করে। দুজনে একসাথে খেয়া পার করে, রাতের বেলা নিঃশব্দে পানির দিকে তাকিয়ে থাকে। সিদ্ধার্থের এ এক গভীর আনন্দ, শুধু পানির দিকে তাকিয়ে এত আনন্দ পাওয়া যায় তার জানা ছিল না। দিনরাত কত লোক নদী পার হয়, তাদের কত তাড়া, কত ভিন্নরকমের জীবন। কিন্তু নদী তাকে সব বলে দেয়, জগত সংসারের কোনকিছু তার কাছে গোপন নয়।

এদিকে কমলা একটা ছেলে সন্তানের জন্ম দেয়। বছরকয়েক পরে সে মরণরোগে আক্রান্ত হয়। বালক ছেলেকে নিয়ে সে সিদ্ধার্থের খোঁজে বের হয়। সিদ্ধার্থের কাছে এসে ছেলেকে তার কাছে সঁপে দিয়ে সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

সিদ্ধার্থ নতুন কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে, ছেলেকে বড় করে তোলা। অন্যধরণের অভিজ্ঞতা হয় তার । মাঝে মাঝে ক্রোধ হলেও, স্নেহ-মায়া তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। একসময় সন্ন্যাসী গোবিন্দ এসে যোগ দেয়, বেশভূষা ছাড়া তার কোন পরিবর্তন হয়নি। নদীতীরে সে আবার সবকিছু ফিরে পায়। নদীই তাকে জীবনকে দেখতে শেখায়, বুঝতে শেখায়।









বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে বইটি বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে। ১৯৭২ সালে এর চলচ্চিত্র রুপায়ন হয় । শশী কাপুর, সিদ্ধার্থের এবং সিমি গাড়েয়াল, কমলার ভূমিকায় অভিনয় করেন। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/28812584 http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/28812584 2008-06-22 22:02:01
নাস্তিক্যবাদী প্রবচন।
একটা সময় ছিল যখন ধর্ম দুনিয়া শাসন করেছে,
ঐ সময়টা অন্ধকার যুগ নামে পরিচিত। ----- রুথ গ্রীন

ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আমি এখনও একজন নাস্তিক। ---- লুই বুনুয়েল

গীর্জার মতে দুনিয়া চ্যাপ্টা,কিন্তু আমি জানি এটা গোল, কারণ আমি চাঁদে এর ছায়া
পড়তে দেখেছি। এবং আমার গীর্জার চাইতে ছায়ার উপরে বেশি বিশ্বাস। --- ফার্ডিনান্ড ম্যাগেলান

ধর্ম গরীব মানুষকে ধনীদের খুন করা থেকে বিরত রাখে। ---- নেপোলিয়ন

একজন বিশ্বাসীকে তুমি কিছুতেই কোন বিষয়ে কনভিন্স করাতে পারবে না,
কারণ তার বিশ্বাস প্রমাণের উপর নির্ভরশীল নয়, ওটা প্রয়োজনের উপর নির্ভরশীল। --- কার্ল সাগান

নিজেকে প্রতারিত করো না, মহত্ বুদ্ধিজীবিরা সংশয়বাদী ছিল। --- নিতসে

একবার মিরাকল বা বুজুর্কিকে মেনে নিলে , সকল বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাই অবান্তর। ----- জোহানস কেপলার

ঈশ্বর খুবই ভংগুর বস্তু, বিজ্ঞানের এক চাবুক অথবা এক ডোজ কমন সেন্সই একে মারতে যথেষ্ট। ---- চ্যাপম্যান কোহেন

আমি খুবই গভীরভাবে ধর্মে অবিশ্বাসী..... , এটা এক নতুন ধরণের ধর্ম। ---- আইনস্টাইন

ঈশ্বর না থাকলে নাস্তিক ও থাকত না। --- চেস্টারটন

ধর্ম শান্তি নিয়ে আসে, ধর্মের কারণে যে অস্হিরতা সৃষ্টি করে তার জন্যে। ---- বায়রন]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/28765509 http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/28765509 2008-01-30 10:04:11
নীরবতা হীরন্ময়।
ধারণা করা হয় সৃষ্টির শুরু হয়েছে শব্দের মাধ্যমে। 'ওঁ','কুন' বা 'ব্যাঙ্গ্‌' ধ্বনির পরে সব সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু তা হল স্রষ্টার/প্রকৃতির লীলাখেলা। মানুষ কি শব্দের এ শক্তিকে আয়ত্ব করতে পারবে?

শব্দের শক্তি অসীম। আবার অতি তুচ্ছার্থেও শব্দের ব্যবহার হয়। প্রতিদিন আমরা কত কথা ,প্রতিশ্রুতির ফুলজুরি ছড়াই। অর্থহীন কত কথা বলি। এর সবই কি শক্তির অপচয়? না এসব কথার কোন দাম নেই?

এ জিনিসটা আমাকে প্রায় ভাবায়। আমার মনে হয় , নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সীতে শব্দ উত্পাদন করতে পারলে অনেক কিছু সম্ভব। অনেকেই 'টিন ড্রাম' মুভিতে দেখেছেন নায়ক অস্কার কিভাবে হাই-পীচ্‌ড শব্দ দিয়ে ক্লাস টীচারের চশমা ভেঙ্গে ফেলে। মেডিক্যাল সায়েন্সেও নাকি এর প্রমাণ আছে। আবার অনেক রাসায়নিক বিক্রিয়ায় শব্দ অনুঘটকের কাজ করে। হয়ত নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সী না জানার কারণে আমরা শব্দ দিয়ে ম্যাজিক দেখাতে পারি না।

সংগীতেও একই জিনিস । শব্দের হারমনি তৈরি করতে পারলে তা মানুষকে আনন্দ দেয়। আবার বেসুরো হলে মানুষের বিরক্তি উত্পাদন করে।

শব্দ আমাদের শারীরিক- মানসিক পরিবর্তন আনতে পারে, হৃদকম্পন বাড়িয়ে দিতে পারে। হরর মুভিতে জাস্ট মিউজিক দিয়ে মানুষকে ভয় দেখানো হয়। যেমন, একটা লোক আলো-আঁধারে একা হাঁটছে। ক্লোজ-আপ পিকচার, সাসপেন্সফুল মিউজিক। দড়াম করে ড্রামে বাড়ি, হঠাত একটা লোমশ হাত তাকে পিছন থেকে আঁকড়ে ধরল। দর্শক ভয়ে কাদা, হৃদপিন্ড দূর্বল হলে মাইল্ড স্ট্রোকও অস্বাভাবিক নয়।

শব্দের সাথে আমাদের আবেগ-অনুভূতি জড়িত। দেশ, মুক্তিযুদ্ধ, একুশ এগুলো বিশেষ অর্থ ব হন করে। এসব শব্দ আমাদের আচ্ছন্ন করে, একতাবদ্ধ করে, আবার অনৈক্যও সৃষ্টি করে। সাধারণ দৃষ্টিতে আমরা দেখি, সমাজ -সংস্কৃতি, ইতিহাস ঐতিহ্য শব্দের অর্থ বা উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে।যেমন, 'রাজাকার' শব্দটা আদিতে ভাল হলেও সমকালীন বাংলাদেশে এটি গালির সমার্থক। ১৯৭১ এর আগে হয়ত এরকম ছিল না। কজনই বা জানত রাজাকার মানে কি?


কিছু শব্দ আমরা আবার আড়ালে রাখতে চাই। এসব শব্দের অস্তিত্ব সবারই জানা। কিন্তু এ যেন লোকসমক্ষে প্রকাশের অযোগ্য। যোনি, যৌনতা রিলেটেড শব্দগুলো অশ্পৃশ্য, নোংরা শুয়োর। হয়ত অনেকটা ভাসুরের মত। সবাই জানে আছে কিন্তু নাম নেয়া যাবে না। ট্যাবু। এতে কি ঐসব শব্দের শক্তি বাড়ে না কমে?

কিছু শব্দ পারিবারিকভাবে অনুচ্চারিত থেকে যায়। পরিবারের কেউ ঘুষখোর, দূর্নীতিবাজ হলেও তা নিয়ে কেউ টুঁ শব্দটিও করে না। দূর্নীতিবাজের ছেলে-মেয়ে ঠিকই জানে তার বাবা'র উপার্জন অসত্পথে। কিন্তু বলা হয় না। পাতলা আবরণে ঢাকা থাকে। অনুচ্চারিত শব্দগুলো শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে। নীরবতার মধ্য দিয়েও তারা শক্তির প্রকাশ করে। এমন সময় নিশ্চয়ই আসে যখন নীরবতা ভারী হয়ে আসে। নীরবতাকেই তখন ভয় হয়।




]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/28749649 http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/28749649 2007-12-06 01:36:28
মাহাবুব মোর্শেদের বই 'ব্যক্তিগত বসন্তদিন'।
সংকলণের 'জিসম' গল্পটি আমার পড়া ছিল। ব্লগেই পড়েছিলাম এবং পড়ামাত্র প্রিয়পোস্টে যোগ করেছিলাম। আমি জানতাম না যে গল্পটি বই আকারে বের হয়েছে। পত্রিকায় চেনাগল্পের সমালোচনা দেখে ভাল লাগল। বই আকারে প্রকাশিত হয়ে গল্পগুলো আরও বেশি পাঠকের জন্যে উম্মুক্ত হল।

মাহাবুব মোর্শেদের প্রতি অনুরোধ, আপনি বইয়ের অন্য ল্পগুলো যদি ব্লগে দিতেন তাহলে আমরা পড়তে পারতাম। সময় সুযোগ মত অবশ্যই বইটা কেনার চেষ্টা করব।

সংরক্ষণে রাখার জন্যে পুরো রিভ্যুটা এখানে তুলে দিলাম।


ব্যক্তিগত বসন্ত দিন, মাহবুব মুর্শেদ, কাগজ প্রকাশনী, প্রচ্ছদ : সব্যসাচী, মূল্য : ১০০ টাকা

একবিংশ শতাব্দীতে এসে প্রতিনিয়ত রাষ্ট্রের বহুবিধ পরিবর্তনের ফলে নতুন নতুন সমস্যা সূচিত হচ্ছে, নিত্য নতুন অভিব্যক্তির ফলে সময়ের আবর্তনে অনিবার্যভাবেই তা রূপান্তরিত হতে বাধ্য। ফলে সময় অনুষঙ্গকে ধারণ করে এখনকার গল্প হয়ে উঠছে রূপকাশ্রীত জীবনের ভিন্ন ভুবন। প্রথমেই বলে নেয়া প্রয়োজন লেখকের মেধা, মনন, পঠন-পাঠন, অভিজ্ঞতা, দর্শন ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে আলোচনার বিষয়গুলো একরৈখিক না-ও হতে পারে। আবার অনুসন্ধানী দৃষ্টির ফলে ভালোলাগার বিষয়গুলোও হতে পারে ভিন্ন। গল্পে ভাষা প্রয়োগে আধুনিকতা, বিষয়ে চমৎকারিত্ব, বর্ণনায় কৌশল অবলম্বন, বাক্যবিন্যাসে শব্দের সুন্দর মেলবন্ধন ইত্যাদির সমন্বয়েই একটা আখ্যান হয়ে উঠতে পারে একটা গল্প।

পাঠপরবর্তীতে বহুমুখী প্রশ্ন ও আত্ম জিজ্ঞাসার জন্ম দেয়। আধুনিক ছোটগল্পকে যদি যুগযন্ত্রণার ফসল হিসেবে চিহ্নিত করা হয় তো গল্পটি তারই প্রতীক। আসলে আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে প্রতিবন্ধকতা তা যেন ঠিক বনসাই শিল্পের মতোই। বনসাই যেমন পর্যাপ্ত আলো বাতাসের অভাবে তাদের পূর্ণ স্বাধীনতায় পর্যাপ্তভাবে বেড়ে উঠতে পারে না আজকের সমাজ ঠিক তাই। উঁচুস্তরের মাথামোটা বৈজ্ঞানিকদের স্বল্প আলোয় স্বাধীনচেতা মানুষেরা প্রতিভা বিকাশে বাধাগ্রস্ত। ইচ্ছে করলেই তারা সেই সুপ্ত প্রতিভার স্ফূরণ ঘটাতে পারে না। সমাজের ল্যাংড়া, খোঁড়া, লুলাকে যেমন বনসাইয়ের সঙ্গে প্রতিতুলনা করেছেন- তা শুধু সম্ভব হয়েছে লেখকের তীক্ষ¦ দৃষ্টি এবং দর্শনের গভীরতার ফলে। সীমাবদ্ধতার মধ্যে বেড়ে ওঠা যেন আমাদের সবকিছুই, শুধুমাত্র সাংবাদিকই এর ব্যতিক্রম। খুব চতুরতার সঙ্গেই তা উপস্থাপন করেছেন লেখক। কিন্তু আর সবাই যেন সাঁচে গড়ানো শিল্প। এবং ব্যাঙ্গাত্মকভাবে দেখিয়ে দিয়েছেন আমাদের প্রশাসনিক কর্মদক্ষতার সীমাবদ্ধতার কথা। চলমান সময়টাই যেন একটা বনসাই শিল্প, যেখানে আশার আলো দেখা নিরর্থক। গল্পটি পাঠে সত্যিই নতুন এক বোধের জন্ম দেয়।

কিশোরবেলার স্কুল জীবনের স্মৃতিকথা ভিন্ন চরিত্রের মাধ্যমে উপস্থাপন করার চেষ্টা। ভাষার চমৎকারিত্ব আর উপস্থাপনার জটিল বিন্যাস দেখিয়েই একটা গল্পকে সুখপাঠ্য করা যায়। স্বপ্ন আর স্মৃতিকথার মিশ্রণ গল্পকে অনেকটা ছন্দপতন ঘটিয়েছে। গল্পের সংলাপ, বর্ণনা, কাহিনী ঝুলে থাকবে মস্তিষ্কে- কখনো কখনো তো মনে হবে এ-তো আমারই ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনার বিন্যাস। সময়ের দৃষ্টিভঙ্গিগত দিক থেকে পাঠকদের একটা চাহিদা তো থাকেই। পরাপাঠ্যে প্রত্যাশা পূরণে লেখক কতটুকু সার্থক অন্যসকল পাঠকদের উপরই অর্পিত হোক।

আজকের এই আধুনিক সময়ে সবকিছুকেই অতিক্রম করার একটা প্রয়াস লক্ষ করা যায়। জিসম গল্পে কোনো গল্প না থাকলেও আছে অধিবাস্তবতা। যৌবনকে উদ্দীপিত করার মতো কিছু আবেগতাড়িত বাক্য- যা অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে। গল্পটির পরতে পরতে যৌনাকাঙক্ষার ঘটনাগুলোর বর্ণনা পাশ্চাত্যদেশীয় ঢংয়েরই যেন উপস্থাপনা। শোষিত আর শাসক শ্রেণীর মধ্যে যে বৈষম্য- অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধে যৌনাকাঙক্ষার মাধ্যমে হয়তোবা তারই নীরব প্রতিবাদ জানানোর চেষ্টা। সৈয়দের দীর্ঘ দশ বছর পর জেল থেকে বের হয়ে ব্যর্থ জীবনে প্রতিবাদের ভাষা খুব একটা খারাট লাগে না। সৈয়দের মৃত্যুপূর্ব দৃশ্য অনেকের কাছেই আরোপিত মনে হতে পারে কিন্তু সে-দৃশ্য যৌনতার বহিঃপ্রকাশ না ঘটিয়ে বরং প্রতিবাদেরই এক মুখ্য বিষয় হিসেবে দৃশ্যায়িত হয়েছে। বিষয়বৈচিত্রে নতুনত্ব, সময়ের বিবর্তনে অনিবার্যভাবেই যৌনাকাঙক্ষা প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে দাবি রাখে এবং তা গল্পে যেন নতুন দ্বার উন্মোচিত করেছে।

হ্যাঁ গল্পটির প্রথমদিকে আগোছালা, কাটখোট্টা, কাটা কাটা বাক্যে সূচনা করলেও গল্পের কৌশল চমৎকার। ভিন্ন আঙ্গিকের একটা গল্প। দেহকে পুঁজি করে যারা বেঁচে থাকে তাদের আখ্যান উঠে এসেছে- যা দূরদর্শী এবং বিনির্মাণের নব কৌশল বলেই প্রতীয়মান হয়। উপেন সরকারের তিন কন্যার মৃত্যু একই সূত্রে গাঁথা পড়লেও মৃত্যুগুলো কি শুধুই দেহের অবসান? না তা নয়। আসলে দেহকে পুঁজি করে বেঁচে থাকা সে তো মৃত্যুরই সমান। সাধারণ একটা ঘটনাকে সূক্ষ্ম, ইষ্যৎ জটিল বা বিশ্লেষণধর্মী করে উপস্থাপনের যে চেষ্টা তাতে সাধুবাদ না জানিয়ে উপায় নেই। গতানুগতিকতার ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে পতিতাপল্লীর সাথে সংযোগরক্ষাকারীর যে বর্ণনা তা দূরদর্শিতারই পরিচয় বহন করে।

যে গল্পে কোনো চরিত্র নেই, নেই কোনো ঘটনাপ্রবাহের টানাপড়েন। তাহলে সেটা গল্প হয় কী করে? হ্যাঁ সেটাও গল্প। ভাষার খেলাটাই সেখানে গল্পের প্রাণ। গল্পটি পাঠের শুরুতেই মনে পড়ে যায় আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কথা। গল্প বলার ভিন্ন ভিন্ন কৌশলের যে প্রয়োগ দেখানোর চেষ্টা করেছেন তা যে শুধু পর্যবেক্ষণের পর্যায়েই পড়ে তা কিন্তু নয়। একথাতো বলাই যায় যে- এক. পাঠক : যারা শুধু পাঠ করেন লেখালেখির সাথে সম্পৃক্ত নন, দুই. লেখকপাঠক : যারা পাঠ করেন আবার লেখালেখিও করেন। হয়তো গল্পটা কথাকার জন্যেই হিতোপদেশ। দৈনন্দিনতার মাঝে গল্প নেই, একটি প্রবহমানতার সংকলিত অংশবিশেষই হলো গল্প একথা বলে তাহলে লেখক কি বোঝাতে চাচ্ছেন- শিল্পীরা আজ যাকে সংজ্ঞা হিসেবে দাঁড় করতে চান, কাল সেই সাঁচে ফেলানো সংজ্ঞাকে না-ও মেনে নিতে পারেন! তবে এক্সপেরিমেন্টের নামে ধোয়া তুলসীপাতার মতো গল্প লিখে পার পেয়ে যাবেন এ প্রত্যাশা অবান্তর।

একটা সুন্দর আখ্যানের নান্দনিকভাবে বর্ণনাই গল্পটির মূল বৈশিষ্ট্য। সর্পরাজের গল্প পাঠের পর কথাশিল্পী শহীদুল জহিরের ডুমুর খেকো মানুষ গল্পটির কথা অভিনিবেশী পাঠকের স্মৃতিতে তো ভেসেই ওঠে। রাস্তার ক্যানভাসারদের নিয়ে বিষয়টা এক হলেও দুজনার গল্প বলার ধারাক্রম ভিন্ন। তো মাহবুব মোর্শেদ তার গল্প বুননের যে ক্ষেত্র তৈরি করেন তা শুধু প্রশংসার যোগ্যই না- বিষয় হিসেবে যে অতীত ঐতিহ্যকে বেছে নিয়েছেন তা সত্যিই এক ইতিহাস হয়ে থাকার রচনা।

সাদামাটা ঘটনা, অসাধারণ উপস্থাপন যা পাঠকের মননে স্থায়ী আসন লাভে সক্ষম হবে বলে ধারণা করা যায়। গল্প শোনার জন্য প্রলুব্ধ করা এমন কল্পকাহিনী ফাঁদা স্তব্দ করে দেবার মতো মেধাবী কণ্ঠস্বর। যেসব বিষয়কে অনুষঙ্গ করে বেড়ে উঠেছে গল্প তা সত্যিই প্রাঞ্জল এবং সাধারণ পাঠককে মোহমুগ্ধ করে রাখবে তাতে দ্বিমত নেই।

গ্রন্থের নাম যেহেতু ব্যক্তিগত বসন্তদিন সেহেতু গ্রন্থের গল্পগুলোতে কিশোরবেলার অনেক ঘটনাই বিধৃত হয়েছে। কিন্তু এই গল্পে লেখকের কিশোরবেলাই চিত্রার্পিত হয়েছে। যার মধ্যে যাদু, বায়েস্কোপ, শহরের হলে সিমেনা দেখা কিছুই বাদ যায়নি। কিশোর বেলার পরিশ্রুত রূপ ছাড়া আর কী-বা বলা যেতে পারে। গল্পটির মূল বৈশিষ্ট্য কী? কী বিশিষ্টতা দান করেছে, কেন এ ধরনের একটা কাহিনীকে গল্প বলবো। কাহিনী, বক্তব্যের ভিন্ন উপস্থাপনা কিংবা নতুন কোনো কৌশল অবলম্বন করেছেন কি লেখক? এ ধরনের আত্মকথা যারা গ্রামে বাস করে তাদের সবারই আছে। সাদামাটা ঘটনাও একটা পরিপূর্ণ গল্প হয়ে ওঠে যার বাক্যবিন্যাসে থাকে নতুন পথে সন্ধান। গল্পটি ভাবান্তরের জায়গাকে স্পর্শ করে না বা প্রশ্নের জন্ম দেয় না। সমাজের সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে একজন লেখকের দৃষ্টিভঙ্গির যে পার্থক্য থাকে তার বিকাশ দেখতে পাই না। ফলে গল্পটি একজন সাধারণ কিশোরের মুখের ভাষ্যই প্রতীয়মান হয়েছে।

ওভারকোট : মাটিবর্তী মানুষের মায়াবী কথন

একেবারেই নিখাঁদ গ্রামের মাটিবর্তী নিরেট সত্য উন্মোচিত হয়েছে গল্পে। যে গল্পে আরোপিত করে বলবার চেষ্টা নেই। গল্পের প্যারায় প্যারায় লেখকেরই স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে। পাঠ শেষে গল্পের আদি উৎসেই ফিরে যেতে হয়। মাঝে মাঝে আঞ্চলিক সংলাপগুলো বেশ প্রাঞ্জলই মনে হয়েছে। গল্পের শেষে শীতকে নিবারণের মোক্ষম এক উপায় জিটি আর বিশুর দাদুর ওভারকোট। দাদুর মৃত্যুর পর সেই ওভারকোটটিই দুই নাতির মনকে ভারি করে তোলে। দাদুর মৃত্যুর পর কোটটি দুজনে নিজের করে ভাবতে থাকলে ধর্ম এসে বাধ সাধে- মৃতদের কাপড়চোপড় জিনিসপত্র নাকি ব্যবহার করতে নেই। জিটির দাদার মৃত্যুর পর আবেগের যে তাড়না তাতে নেই কোনো নতুন দৃষ্টিভঙ্গির শাখা-প্রশাখা। তবুও বলা যায়- এ তো কোনো না কোনো সময়কেই নির্ধারণ।

দু’মলাটের ভেতরে মুদ্রিত রচনায় যদি কিছু না থাকে তাহলে র‌্যাকে একটা বোবা বইকে সাজিয়ে কী লাভ? আর যদি প্রডাকশন নিুমানের হয়েও লেখাগুলো সবার মুখে মুখে ভেসে বেড়ায় তবে র‌্যাকে সাজানো বোবা বইটির চেয়ে উত্তম নয় কি? গল্পে তিনি সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছেন এবং সেই উত্তরের জন্যে অপেক্ষা করতে হবে সময়ের কাছে।

অরণ্য প্রভা
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/28748476 http://www.somewhereinblog.net/blog/nazimblog/28748476 2007-11-30 06:26:55