এক.
বাবার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে বাড়ী ছুটে চলেছে মুক্তি মন্ডল। মনটা বিষন্নতায় ছেয়ে আছে। বুকের ভেতর থেকে হু হু করে ঠেলে বেড়িয়ে আসতে চাইছে কান্না।....... আহারে, বাপটা মইরাই গেল! কিছুই করা গেলনা! ...অনেকদিন থেকেই রোগে ভুগছিল তাঁর বাবা। গেল মাসেই বাবার জন্য এক ডজন কমলা আর একটা নতুন লুঙ্গী নিয়ে বাড়ী গেছিল মুক্তি। সাধ্যমত কবিরাজ-বৈদ্যি দিয়ে চেষ্টা করেছে। কিন্তু এর বেশী কি-ই বা সাধ্য ছিল তাঁর?! ......সদরের ডাক্তারকেও দেখাইছি একবার। গ্যস্ট্রিকের ব্যারাম...পেটের ব্যমো! পেটের ব্যাথায় সারারাত কোঁকাইতো। ডাক্তার কইছিল ঢাকায় নিয়া চিকিৎসা করাইতে। ইচ্ছা আছিল...ঢাকায় আইনা বড় ডাক্তার দেখামু, টাকার অভাবে কুলাইয়া উঠতে পারি নাই।। আহারে, বাপ আমার.....সে সুযোগ আর দিলানা!
অস্বচ্ছল সংসারে লেখাপড়া করা হয়নি মুক্তির। বাবা শখ করে বড় ছেলের নাম রেখেছিল মুক্তি মন্ডল। শুধু নামটা স্বাক্ষর করা শিখেছে সে। গ্রামের স্কুলের অষ্টম শ্রেণী পাশ একটা সার্টিফিকেট জোগাড় করেছে। এক পরিচিত লোকের সহায়তায় ঢাকায় একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীতে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরী জোগাড় করা গেছে। মাস গেলে ৪০০০ টাকা মাইনে। সেই দিয়েই কোনমতে চলতে হয়...বাড়ীতে টাকা পাঠাতে হয়। স্ত্রী হনুফা-কে শখ করে একটা ভাল শাড়ীও কিনে দিতে পারেনি কখনও।..... একসময় চওড়া পাড়ের একখান গরদের শাড়ীর বড় শখ আছিল হনুফার!
দুই.
তাজু মন্ডল, মুক্তি মন্ডলের বাবা।...... কি জোয়ান তাগড়া আছিল একসময়! গতর খাটায়েই খাইত সে। ভিটে ছাড়াও একান্ন পরিবারের সামান্য কিছু চাষের জমিও আছিল সেইসময়। চওড়া কাঁন্ধের কালো পেটা গতর! গাঙ পাড়ি দিত সাঁতরায়ে..... আড়াই মনি বস্তা মাথায় তুইলা নিয়া যাইত হাটে! রক্ত গরম আছিল বাপজানের। ... টেরনিং নিছিল... যুদ্ধে গেছিল। যুদ্ধে একটা পা হরাইছে বাপ আমার। তাও কোন আক্ষেপ আছিল না...... দেশতো স্বাধীন হইছে!
তারপর যে কিসের থেকে কি হয়ে গেল! ভাইয়েরা সব আলাদা হলো। এতগুলো ছেলে মেয়ে নিয়ে আর স্বচ্ছলতার মুখ দেখেনি তাজু মন্ডল। এক এক কইরা জমিগুলান গেছে...দেনা বাড়ছে। শেষে ধরলো গ্যাস্ট্রিকের ব্যারাম। কিছু খাইতে পারতোনা! আহারে... শেষে সদরের হাসপাতালের বারিন্দায় পইড়া থাইকা বিনা চিকিৎসায় মইরাই গেল বাপজান!
তিন.
বাসের বাম পাশের জানালার ধারে বসে আছে মুক্তি মন্ডল। কড়া রোদ পড়েছে চোখে, কিন্তু কোন ভ্রুক্ষেপ নাই। .....বাপটা সারা জীবন কষ্ট কইরাই গেল! একবার চেয়ারম্যানের কাছে গেছিল..একটা কার্ড করনের লাইগা। যুদ্ধের সার্টিফিকেট দেখাইল, তা-ও চেয়ারম্যান কার্ড দেয় নাই। কার্ডটা পাইলে মাসে মাসে সরকার থেইকা কিছু টাকা পাইত, কিছু সাহায্য সুবিধা পাইত। মনের ভিতর একটা অস্থিরতা অনুভব করতে লাগলো মুক্তি..... বাসটা আরও জোড়ে চলেনা ক্যান?....মরা বাপটা আমার... খাটিয়ায় শুইয়া আছে....আহারে, বাপটা বড় ভালা আছিল। ছুডবেলায় আমারে নিয়া গাঙে যাইত...ক্ষ্যাতে যাইত। দেশের কথা কইতো.... মানুষের কথা কইতো... যুদ্ধের কথা কইতো! ... ঝাপসা চোখে বাবার কথা ভাবতে থাকে মুক্তি মন্ডল।
চার.
বাড়ী পৌঁছেই অবাক হয়ে যায় মুক্তি মন্ডল। বাড়ীতে পুলিশ, থানার দারোগা.... আরও আছে সরকারী লোকজন, আছে সাংবাদিক। বিষয়টা ঠাওর করতে পারেনা মুক্তি। খাটিয়ায় শুয়ে আছে বাবার লাশ.... লাল সবুজ পতাকা দিয়ে ঢাকা।
''বাহিনী সোজা হবে....... সোজা হও। বীর মুক্তিযোদ্ধাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাবে.... শ্রদ্ধা জানাও।'' ঠকাঠক করে শব্দ তোলে পুলিশের জুতা, আর বন্দুকের বাঁটে পটাপট চাঁটি...... সবগুলি বন্দুকের নল একসাথে সামনের দিকে ঝুঁকে যায়। একসাথে স্যালুট ঠোকে দুই সারিতে দাঁড়ানো ১৪জন পুলিশ...রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধা নিবেদন। পিনপতন নিস্তব্ধতা! কিছুই বুঝতে পারেনা মুক্তি মন্ডল।.... বাপজান কি তাইলে কোন বড় মানুষ আছিল!? কোনদিন-তো টের পাই নাই! .... নিরবে পুলিশের পাশে দাঁড়িয়ে সেও স্যালুট দ্যায়, মুখ লুকিয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে..... বাপটা মরনের আগে এরা আছিল কই?!? ... অসহায় ফ্যাল ফ্যাল চেয়ে থাকে আকাশপানে.... দূর্বোধ্য লাগে এই জগৎ সংসার..... কষ্ট-টা বেড়ে যায় বহুগুণে......!
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে মে, ২০১১ রাত ১:৩৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



