আস্তিকদের প্রাত্যাশাটা আসলে কি? পৃথিবীর সবাই আস্তিক হোক? ঠিক আছে , এটাই যদি চাওয়া হয় তাহলে আগে এটা তো ঠিক করতে হবে যে কোন আস্তিক এবং কেন সেটাই পৃথিবীর মানুষ হবে?
মুসলমানরা চাইবে মুসলিম আস্তিক, খৃষ্টানরা চাইবে তাদের মতের আস্তিক। আবার যারা বহু ঈশ্বরে বিশ্বাসী তারাও তো আস্তিক। কিন্তু অন্যান্য গ্রুপ তাদের আস্তিকতাকে বাতিল করে দিয়েছে। আবার একেশ্বরবাদীরা একে অপরের আস্তিকতাকে গ্রহণযোগ্য মনে করছেনা।
তাদের চাওয়া শুধু নিজের আস্তিক দলের সংখ্যা বৃদ্ধি। অন্য আস্তিক দলের বিনাশ। সুতরাং শুধু আস্তিক না, সে যে ঘরানার আস্তিক, তার প্রত্যাশা সেই ঘরানার আস্তিকের সংখ্যা বৃদ্ধি। সব আস্তিকের কাছেই তার নিজের পথটাই সত্যের পথ, বাকিদেরটা ভুল।
মন্তব্যের ঘর থেকে সংকলিত
************************************
সমমতের বা কাছাকাছি মতের মানুষ দেখতে ঈশ্বর অবিশ্বাসীদেরও খারাপ লাগার কথা না। কিন্তু তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টা “যেকোন উপায়ে সংখ্যা বৃদ্ধি” টাইপের কি হয়? উপস্থাপিত তথ্য যুক্তি যার ঠিক মনে হবে, ঈশ্বরে অবিশ্বাসী হয়ে যেতে পারে সে । তাতে ঈশ্বরে অবিশ্বাসীর সংখ্যাও বাড়বে। কারো যদি পরে মনে হয় যে সে আগে ভুল ছিলো, এখন সে ঈশ্বরে বিশ্বাস করবে, তাতে নাস্তিক থেকে যাওয়াদের তরফ থেকে কোন প্রতিশোধের বিধান তো নেই দল ছোট হয়ে যাওয়ার ক্ষোভে!
ঈশ্বরে অবিশ্বাসীর সংখ্যা বাড়াবার চেষ্টা কি কোনভাবে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভীতি প্রয়োগে হয়? সেটা কি নাস্তিকের সন্তান হিসেবে জন্ম নিলেই হয়? সেটা কি টাকার লোভেও হয়?
আমার কাছে মনে হয় উপস্থাপিত বক্তব্যে প্রভাবিত হয়ে ঈশ্বরে অবিশ্বাসী হওয়ার ব্যাপারটা নাস্তিকদের মত প্রকাশিত হওয়ার একটা আফটার ইফেক্ট, ডাইরেক্ট গোল না। ঈশ্বরে অবিশ্বাসী তার দিক থেকে ঈশ্বর নামের আইডিয়াটার ব্যাপারে তার মত জানায় জাস্ট। সবার জন্যই তার বক্তব্য মেনে নেয়াটা আবশ্যিক এমন কোন নির্দেশ থাকেনা।
**************************************************
১. “নাস্তিকতা ছাড়া অন্য মতবাদগুলো বিশ্বাস করি” - সেটা একান্তই আপনার ব্যক্তিগত উদারনৈতিক ধর্মচিন্তার প্রকাশ। আপনার ধর্ম আপনাকে এই ধরণের বিশ্বাসের অনুমতি দেয়না।
২. তিনি যেমন একক তেমনি বহু। - আপনার ধর্ম এই মতের তীব্র বিরোধীতা করে।
৩. “ কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা বলে সবাই তর্ক করার আগেই তালগাছটা নিজের কাছে রেখে দেয়। এসব তর্ক সচরাচর অর্থহীন“ - তাল গাছটা যে তাৎক্ষণিক কেউ দিয়ে দেয়না, এটা প্রায় ঠিক। কিন্তু আমার কাছে সচরাচর অর্থহীন নয় বরং ফলপ্রসূই মনে হয় আলাপচারিতাগুলোকে। ঠিক ঐ পোস্টে বা ঐ মুখোমুখি তর্কে কেউ হয়তো নিজের অবস্থান ছেড়ে দেয়না। কিন্তু অবশ্যই প্রভাব পড়ে চিন্তায়। একে অপরের চিন্তার সাথে পরিচিত হওয়ার লাভ অনেক। আলাপচারিতার ভেতর দিয়ে যেমন নতুন তথ্য উঠে আসে, ঠিক তেমন উঠে আসে চিন্তার ভিন্নদিক। নিজের ভুল চিন্তাগুলো চিহ্নিত করা যায়। সরাসরি হয়তো কেউ শেষে বলে যায়না যে তাল গাছটা দিয়ে গেলাম কিন্তু যে জোরের সাথে তাল গাছের একক মালিকানার দাবী সে করতো, পরবর্তীতে অত গোয়ারের মত সেই দাবী সে করেনা, সে যে পক্ষেরই হোক না কেন।
৪. “যদি পৃথিবীর আইন অনুযায়ী কিছু মানুষ অন্যায় করেও ভাল থেকে যায়- আর কিছু মানুষ ভাল কাজ করার পরেও- ধরুন আপনার মত নির্লোভ হবার পরেও অবিচারের শিকার হয় তাহলে এসব আইন কানুন অর্থহীন হয়ে যায় কিনা বলুন।“ - তারপরও পৃথিবীতে অবিচারের অস্তিত্ব কিভাবে মৃত্যুর পরে সুবিচার থাকাটার নিশ্চয়তা দেয় তা বোঝা গেলনা। এটা বোঝা গেল যে পৃথিবীতে অবিচার আছে বলে মৃত্যুর পরে সুবিচার আছে টাইপের একটা স্বান্তনা থাকা উচিত বলে আপনি মনে করেন।
৫. “ পৃথিবীর কম মানুষই অসাধারণ হয়- যারা নিজের ভিতরগত প্রেরণায় মানুষের জন্য কাজ করেন। বেশীরভাগ মানুষের লোভ থাকে, কামনা থাকে বাসনা থাকে। তাদেরকে দিয়ে ভাল কাজ করাতে হলে তাদেরকে ভাল কাজের পুরস্কারের আশ্বাস দিতে হবে।“ - তাহলেই দেখুন, ভেতরগত প্রেরণায় মানুষের জন্য কাজ করলে আর মৃত্যু পরের বিচারের যে ধারণা, তার দরকার হয়না!!! যেহেতু মানুষ প্রমিত আচরণের বাইরে চলে যায় তাই তাকে কল্পিত শাস্তি বা কল্পিত সুখের আশ্বাস দিয়ে ভাল কাজের দিকে রাখার জন্যই মৃত্যুর পরের বিচারের দার্শনিক ধারণার প্রস্তবিত হয়েছে!!! কল্পিত সুখের লোভে কিছু মানুষ হয়তো ভালর দিকে থাকবে কিন্তু সেই সাথে এটাও ঠিক – যে লোভে সে ভাল কাজ করেছিলো তা শুধুই তাকে ভাল পথে রাখার জন্য মিথ্যা আশ্বাস! মানুষ ভাল কাজের যত সক্রিয়ভাবে প্রশংসা করবে আর যত সক্রিয়ভাবে খারাপ কাজের নিন্দা করবে ততই কল্পিত শাস্তি বা কল্পিত পুরস্কারের প্রস্তাবনার অর্থহীনতা সামনে আসবে।
৬. “নাস্ক্যিবাদে আমি বিশ্বাস করি না- তবে এটা বিশ্বাস করি কিছু মানুষ যে নাস্তিক সেটা ঈশ্বরের ইচ্ছেতেই হয়। সুতরাং ঈশ্বরের ইচ্ছের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকেই তাদের প্রতি আমি বিদ্বেষ পোষণ করি না। তবে ভিন্নমত জানাতে কার্পণ্যও করি না” – আমার বিনম্র শ্রদ্ধা নিন।
৭. “ছোট ধর্মগুলো মূলত কিছু মানুষের বিচ্ছিন্ন চিন্তার ফসল - সেগুলো কখনো সত্যিকারের ধর্মের মর্জাদা পায়নি বলেই সেগুলো ছোট ধর্ম।“ - সব ধর্মই মানুষের দার্শনিক চিন্তার ফসল। কোন কোনটা ব্যপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, কোন কোনটা পারেনি। “সত্যিকারের ধর্মের মর্যাদা” কিভাবে আসে? অনুসারীর সংখ্যার কম বেশিই কি সত্যাসত্য নির্ধারণ করে?!
৮. “আমার বিশ্বাস বুদ্ধও একজন প্রেরিত পুরুষ ছিলেন” - আপনার উদারতা প্রশংসারযোগ্য! বুদ্ধ নিজেকে কখনো প্রেরিত পুরুষ বলে দাবী করেননি। বৌদ্ধ ধর্মে ঈশ্বর নেই। ঈশ্বরের তৈরী পরকালও নেই।
৯. “দেখুন সব ধর্মপ্রচারকরাই কিন্তু প্রচলিত অবিচারগুলোর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে মানুষকে সৎ পথে আনার জন্যই ধর্ম প্রচার করেছেন। তাদের অনুসারীরা এক পর্যায়ে বিভ্রান্ত হয়েছেন” - ঠিক এভাবে এই মত কি “সর্বশেষ” ধর্মের বেলাতেও খাটেনা? “সনাতন” ধর্মের বেলাতেও খাটেনা? অন্যগুলোর ক্ষেত্রেও কি খাটেনা? তাহলে বিভ্রান্তি কন্টিনিউ না করে ঈমাম মাহদী এবং ঈশা(আঃ) এর জন্য অপেক্ষা করাই কি শ্রেয় নয়? (সব আস্তিকেদের ধারনার গলদগুলো সমতায় আনার জন্য একদিন ঈমাম মাহদী এবং ঈশা(আঃ) আবির্ভুত হবেন- এটা আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাস।)।
*********************************************************
১. একেশ্বরবাদী ধর্ম একেশ্বরবাদী বলেই তা বহু ঈশ্বরের ধারণা সমর্থন করেনা। সুতরাং আপনার পক্ষেও ব্যক্তিগত উদারনৈতিক ধর্মচিন্তা ছাড়া “নাস্তিকতাবাদে আর সব কিছু”র প্রতি বিশ্বাস আনা সম্ভব না।
২.[/sb সবাই বলেছেন তার তার ঈশ্বরের কথা। বুদ্ধ বলেননি। তারপরও আপনি মনে করে নিচ্ছেন যে ঈশ্বরের মত কেন্দ্রীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রকে বুদ্ধ আলোচনায় আনেননি জাস্ট অনুসারীদের বিভ্রান্তি যাতে না হয় সেজন্য? বিভ্রান্তি নিরসন করার জন্যই তো তার ঈশ্বরের অপার ক্ষমতার পরিচয় দেয়ার কথা যেমনটা আর সব ধর্মে রয়েছে। বুদ্ধকে ঈশ্বর ধারণার প্রস্তাবক করে দেয়াটা খুবই কষ্ট কল্পনা।
৩. যেখানে বলে দেয়া হয়েছে, “তিনি এক ও অদ্বিতীয়” সেখানে আপনি তার নিজেকে নিজেদের করে ব্যক্ত করার যে তথ্য দিলেন তাকে ইসলামী তরিকায় বহু ঈশ্বরের অস্তিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হয়না। বরং বহুর পক্ষে কথা বলা একজন হিসেবেই দেখা হয়।
৪. আমার ১০ টা ক্লোন করা হলে অবশ্যই সেই দশজনই আমি না। তারা দশটি ভিন্ন ভিন্ন স্বত্ত্বা।
৫. "তারা মুখে আস্তিক অন্তরে নয়” - No True Scotsman !
৬. ধর্মগুলোর উৎস এবং তাদের বিভ্রান্তিগুলো বোঝার চেষ্টার সাথে সাথে কোন একটা একেশ্বরবাদী দর্শনের অনুগত থাকাটা পরস্পরবিরোধী হয়ে যায়। কারণ এখনো বিভ্রান্তি নিরসন হয়নি বলেই ঈমাম মাহদী এবং ঈশা(আঃ) আসবেন বলে ধারণা করা হয় বিভ্রান্তিগুলোরই সমাধান করার জন্য।
৭. অনুসারীর সংখ্যা কোন ধর্মের সত্যাসত্য নির্ধারণ করেনা। তাই যদি করে তাহলে বর্তমানে সবচেয়ে বড় সংখ্যার অনুসারীর ধর্ম হিসেবে খৃষ্টধর্মই সত্য। সুতরাং কত মানুষ কি ভাবে কোন ধর্মে গিয়েছে বা বাই ডিফল্ট কোন একটা ধর্মে আছে বলে চিহ্নিত হয়েছে তা দিয়ে কোন ধর্ম সত্য কিনা তা নির্ধারণ করা যায়না। সেহেতু বেশি সংখ্যক অনুসারী আছে বলে কোন একটি ধর্ম সত্য এবং ডিভাইন আর কম অনুসারী থাকা কোন ধর্ম মানুষের বিচ্ছিন্ন চিন্তার ফসল – এই সিদ্ধান্তে আসা যায়না।
৮. অবশ্যই মৃত্যুর পরের বিচার না থাকলে পৃথিবীর সব আইন কানুন ব্যর্থ হয়ে যায়না। আইনের প্রয়োগ কখনো কখনো যথাযথ হয়না, তার মানে এই না যে সেই ব্যর্থতা মৃত্যুর পরের বিচারের অস্তিত্বের নিশ্চিয়তা দেয়।
৯. ঈশ্বরচিন্তার আলোচনায় বাম রাজনৈতিকতার ভাল মন্দের উপস্থাপনা নিতান্তই অরাজকতা।
১০. “ইসলাম বলে- নামাজ-রোজা জাতীয় ধর্মীয় আইন বিধি না মানলে আল্লাহ ইচ্ছা করলে ক্ষমা করে দিতে পারেন/ কিন্তু কোন মানুষকে প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করলে- সেই মানুষটি ছাড়া আল্লাহ ক্ষমা করবেন না।“ এই বাক্যের অন্তর্নিহিত বক্তব্যের প্রেক্ষিতে আমি তালগাছটির মালিকানা আপনার সাথে শেয়ার করলাম। যাপিত জীবনের কর্মকান্ডে ন্যায়ানুগ থাকাটা মূলত সবারই চাওয়া - ধর্মেরও, নঞ ধর্মেরও। কিন্তু ধর্ম বলতে তো আর শুধু যাপিত জীবনের কর্মকান্ডে ন্যায়ানুগ থাকাটাই বোঝায়না, সেই সাথে ঈশ্বর উপাসনামূলক কর্মকান্ডকেও বোঝায় যেটার দার্শনিক সঙ্গা, বাস্তনায়নের কর্মপন্থার পরস্পর বিবাদমান বিভিন্ন স্বঘোষিত সর্ব-সক্ষম শুদ্ধপন্থার আগ্রাসী শ্রেষ্ঠত্বের দাবীই, ঈশ্বরের ধারণাকে অগ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে অক্টোবর, ২০০৯ রাত ১০:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


