somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ক্ষমতাসীনরা অসত্যের পাহাড় বানাচ্ছেন : বিপদ বাড়ছে গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বের

০১ লা জানুয়ারি, ২০১০ রাত ১০:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


যাদের এক কান কাটা তারা নাকি রাস্তার একদিক দিয়ে হাঁটে। অন্যদিকে কান যাদের দুটিই কাটা, তারা হাঁটে রাস্তার মাঝখান দিয়ে। কারণ, ‘পাছে লোকে কিছু বলে’র ভয় তাদের থাকে না। কথাটা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন ক্ষমতাসীনরা। দিব্যি তারা মিথ্যার পর মিথ্যা বলে চলেছেন, জনগণকে অসত্য জানাচ্ছেন। আবার ধরা পড়ে যাওয়ার মতো অবস্খায় পড়লে তারাই আবার নিতান্ত ‘খোকা’ আর ‘খুকী’ সেজে বসছেন। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী থেকে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী পর্যন্ত সবাই সমান তালে, কখনো একে অন্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে চলেছেন। চলেছেনও ক্ষমতায় যাওয়ার পর প্রাথমিক দিনগুলো থেকেই। আওয়ামী লীগ নেতা-নেত্রীদের স্বভাব-চরিত্রই আসলে এ রকম। উদাহরণ দিতে হলে যে কাউকে থমকে পড়তে হবে। কাকে রেখে কার উদাহরণ দেবেন আপনি?

প্রথমে প্রধানমন্ত্রীর কথাই উল্লেখ করা যাক, যার সর্বশেষ কিছু কথা শুনে জাতিকে আরো একবার তাজ্জব হতে হয়েছে। ২৯ ডিসেম্বর রাজধানীর বসিলায় শহীদ বুদ্ধিজীবী সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলে বসেছেন, চার দলীয় জোটই নাকি ‘ষড়যন্ত্র’ করে ও সংঘাত বাধিয়ে ১/১১ ঘটিয়েছিল! এ এক সম্পূর্ণ নতুন এবং আজব তথ্যই বটে! কারণ, এতদিন জানা গেছে এবং একথা প্রমাণিতও হয়েছে, উদ্দিন সাহেবদের অসাংবিধানিক সরকারকে শেখ হাসিনারাই এনেছিলেন। নিয়ে আসার তথা ১/১১-কে অনিবার্য করার আসল কারণও লুকিয়ে রাখা যায়নি।

চার দলীয় জোট সরকারের পাঁচ বছরে বিরোধী দলের নেত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা কোনো ব্যাপারেই জনগণের স্বার্থে সামান্য অবদান রাখতে পারেননি। তাকে সব সময় শুধু সরকারের ‘পতন’ ঘটানোর কাজেই ব্যস্ত দেখা গেছে। ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারেননি বলেই শেখ হাসিনা জনগণের আস্খা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। নিজেদের এবং ‘বন্ধুরাষ্ট্রের’ গোয়েন্দা সংস্খার জরিপেও দেখা গিয়েছিল, আওয়ামী লীগ অন্তত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যেতে পারবে না। শেখ হাসিনাও দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। মূলত এই হতাশা থেকেই শুরু হয়েছিল লগি-বৈঠার তাণ্ডব, যা শেষ পর্যন্ত ১/১১-কে অনিবার্য করেছে। এটা যে সুপরিকল্পিত এক আয়োজন ছিল সে ব্যাপারে স্বয়ং শেখ হাসিনাই জানান দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, উদ্দিন সাহেবদের সরকারকে তারাই এনেছেন। প্রধানমন্ত্রী ভাবতেই পারেন কিন্তু জনগণ অবশ্যই লগি-বৈঠার তাণ্ডবের কথা ভুলে যায়নি, ভুলে যাবেও না। কারণ, নির্বাচনে অংশ নেয়ার সামান্য ইচ্ছা থাকলেও আওয়ামী লীগের তখন নির্বাচনী কার্যক্রমে নেমে পড়া উচিত ছিল। অন্যদিকে প্রকাশ্যে মানুষ হত্যার পাশাপাশি দাবির পর দাবি তুলে আওয়ামী লীগ এবং তার সঙ্গি-সাথীরা শুধু ঝামেলা বাড়িয়েছে, নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করেছে। অথচ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রাথমিক দিনগুলোতে এমন কোনো বড় দাবির কথা বলা যাবে না যা পূরণ করা হয়নি। কিন্তু অযৌক্তিক ও ব্যক্তি কেন্দ্রিক প্রতিটি দাবি পূরণ করার পরও আওয়ামী লীগ ও তার জোট ঘাড় বাঁকিয়ে রেখেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সকল উদ্যোগকেই তারা প্রত্যাখ্যান করেছে এবং ব্যর্থ করে দিয়েছে।

আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সেই সঙ্গে বঙ্গভবন অবরোধ করার এবং বঙ্গভবনের ‘অক্সিজেন’ বìধ করার হুমকি দেয়া হয়েছিল। আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল গৃহযুদ্ধেরও ভয় দেখিয়েছিলেন। সব মিলিয়েই আওয়ামী জোটের উদ্যোগে পরিস্খিতিকে বিপজ্জনক করে তোলা হয়েছিল। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করা উদ্দেশ্য হলে আর যা-ই হোক তারা নিশ্চয়ই মানুষ মারার মতো নিষ্ঠুর কর্মকাণ্ড চালাতেন না। দাবির পর দাবি তুলে ঝামেলাও পাকাতেন না। এসবই প্রতিষ্ঠিত এবং প্রমাণিত হয়েছে। এ ব্যাপারে শেখ হাসিনাই যে কারো চাইতে অনেক বেশি জানেন। সুতরাং এতদিন পর তার অস্বীকৃতিতে বা হাজির করা নতুন তথ্যে কিছুই যায়-আসে না।



২৯ ডিসেম্বরের ওই ভাষণেও প্রধানমন্ত্রী যথারীতি জোট সরকারের দুর্নীতির কথা তুলে ধরেছেন­ যদিও অন্য সব উপলক্ষের মতো এবারও কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্যের উল্লেখ করতে পারেননি। পারেননি বলার কারণ, সুযোগ ছাড়ার মতো নেত্রী তিনি নন এবং তার ‘ভান্ডারে’ তেমন কোনো তথ্য থাকলে তা তিনি অবশ্যই ‘উগড়ে’ দিতেন। অন্যদিকে সত্য হলো, তাদের নিয়ে আসা উদ্দিন সাহেবরা দু’ বছর ধরে মাইক্রোস্কোপ দিয়ে খুঁজে দেখেছেন। কিন্তু জোট সরকারের দুর্নীতির কোনো তথ্য বের করতে পারেননি। শেখ হাসিনার সরকারও এ পর্যন্ত চেষ্টায় কোনো ত্রুটি করেনি। কিন্তু দুর্নীতির কোনো হদিস পায়নি। এতেই আসলে মাথা খারাপ হয়ে গেছে প্রধানমন্ত্রীর। কারণ আজকাল উল্টো তাদের সম্পর্কেই ‘এটা-ওটা’ শোনা যাচ্ছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর গুণধর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ও নাকি ঘুষ বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সে খবর প্রকাশিত হওয়ার পর একটি দৈনিকের বিরুদ্ধে ‘আদা-জল’ খেয়ে নেমে পড়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী নিজেও নতুন করে কথিত দুর্নীতির সেই ভাঙা রেকর্ড বাজাতে শুরু করেছেন। তবে মজার ব্যাপার হলো, এই একটি ক্ষেত্রে উদ্দিন সাহেবদের মতো প্রধানমন্ত্রীও জনগণকে বোকা বানাতে সফল হননি। জনগণ বরং উল্টো কথাই বলছে।

প্রধানমন্ত্রী একা নন, তার মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরাও কম দেখাচ্ছেন না। শোনাচ্ছেনও তারা নেত্রীর স্টাইলেই। অন্য কারো দিকে দৃষ্টি ফেরানোর পরিবর্তে এখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুনের লেটেস্ট কিছু ‘বয়ানের’ উল্লেখ করা যেতে পারে। সম্প্রতি ভারতের কমান্ডো বাহিনীর ঢাকায় আসা নিয়ে সারাদেশে তোলপাড় চলছে। প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, এই কমান্ডোরা ঢাকাস্খ ভারতীয় হাই কমিশনের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব পালন করবে। তাছাড়া ভারতের কোনো ভিআইপি বাংলাদেশ সফরে এলে তাদের সঙ্গেও ঘুরে বেড়াবে কমান্ডোরা। এই কমান্ডোদের ব্যাপারে ভারত আওয়ামী লীগ সরকারের অনুমোদন নেয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। কমান্ডোরা ইতিমধ্যে ঢাকায় এসেও গেছে। কিন্তু স্যাটেলাইট টিভিতে যখন কমান্ডোদের দেখানো হচ্ছে এবং সংবাদপত্রে যখন সে ছবি প্রকাশিত হচ্ছে তখনও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিব্যি বলে বসেছেন, তিনি নাকি কিছুই জানেন না! কথাটা একবার নয়, পর পর দুদিনে তিনি দু’বার বলেছেন। প্রথমে ২৮ ডিসেম্বর এবং পরে ৩০ ডিসেম্বর। বলতে গিয়ে তাকে অবশ্য বারবার হোঁচট খেতে দেখা গেছে। ঠিক গুছিয়ে বলতে পারেননি। পারার কথাও নয়। প্রতিষ্ঠিত ও প্রমাণিত কোনো বিষয়ে সাধারণত কারো পক্ষেই মিথ্যা বলা সহজ হয় না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে তাই কোনোভাবে ‘ওয়েট অ্যান্ড সী’ বলে সাংবাদিকদের সামনে থেকে সরে পড়তে হয়েছে। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরে পড়লেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি নি:সন্দেহে গুরুতর।

উল্লেখ্য, এবারই প্রথম নয়। আরো কিছু উপলক্ষেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে একইভাবে ‘খুকী’ সাজতে দেখা গেছে। একটি উদাহরণ হিসেবে এখানে অরবিন্দ রাজখোয়া, শশধর চৌধুরী ও চিত্রাবন হাজারিকাসহ আসামের স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র যুদ্ধে নিয়োজিত উলফা নেতাদের গ্রেফতারের ঘটনা উল্লেখ করা যায়। পৃথক পৃথক অভিযানে তাদের ঢাকায় গ্রেফতার করা হয়েছে। ভারত সরকার দাবি করেছে, উলফার নেতারা নাকি সীমান্তে গিয়ে বিএসএফের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। অন্যদিকে বন্দি নেতারা সে দেশের আদালতে জানিয়েছেন, প্রত্যেককে ঢাকায় গ্রেফতার করা হয়েছে এবং ধরে নিয়ে গেছে সাদা পোশাকধারীরা। দুটি উপলক্ষেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন একেবারে খুকীটি সেজে বলেছেন, তিনি নাকি ‘কিছুই জানেন না’! অথচ পরে প্রমাণিত হয়েছে, ভারতের গোয়েন্দা সংস্খা ‘র’-এর লোকজন ঢাকায় এসে উলফা নেতাদের গ্রেফতার করে নিয়ে গেছে। অন্য কোনো দেশে আসতে হলে যে সে দেশের সরকারের অনুমতি লাগে, অন্তত সরকারকে জানাতে হয়­ এ কথাটুকুও সাহারা খাতুন লক্ষ্য করেননি। অর্থাৎ ‘র’-এর লোকজন আসা থেকে উলফা নেতাদের গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত কর্মকাণ্ডের সবকিছুতেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে সাহারা খাতুন জড়িত ছিলেন। তার নাকের ডগাতেই ঘটেছে সবকিছু। কিন্তু সে কথা স্বীকার করতে লজ্জা লেগেছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর। তিনি বলে বসেছেন, উলফা নেতাদের গ্রেফতারের বিষয়ে ‘কিছুই জানেন না’ তিনি!

সমগ্র এ প্রেক্ষাপটেই প্রশ্ন উঠেছে, অমন একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব আদৌ নিরাপদ কি না। কারণ, তার আমলেই একদিকে ‘র’-এর লোকজন কম-বেশি প্রকাশ্যে তৎপরতা চালাচ্ছে, অন্যদিকে দূতাবাস ও ভারতীয় ভিআইপিদের নিরাপত্তা বিধানের নামে ঢাকায় ঢুকে পড়েছে ভারতের কমান্ডোরা। এসবের আগে পিলখানায় সেনা অফিসারদের হত্যা করা হয়েছে। তখনও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।

এটুকুই সব নয়। সারাদেশে প্রতিদিন গড়ে যখন পাঁচজনের বেশি ক্রসফায়ারে নিহত হচ্ছে, বিরোধী দলের নেতা-কর্মি-সমর্থকদের ওপর যখন আওয়ামী লীগের গুন্ডা-সন্ত্রাসীরা আক্রমণ চালাচ্ছে, তখনও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলে চলেছেন, দেশে নাকি পরিস্খিতি ‘স্বাভাবিক’ আছে এবং ক্রসফায়ার বলে নাকি ‘কিছু নেই’! এ ধরনের কথা শোনানোর মধ্যদিয়ে সাহারা খাতুন প্রকৃতপক্ষে ইতিহাসই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। সংক্ষেপে সে ইতিহাস হলো, স্বাধীনতা-পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একদিকে হাজারের হিসাবে বিরোধী দলের নেতা-কর্মিদের হত্যা ও গুম করা হয়েছিল, অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ‘লাল ঘোড়া দাবড়ায়া’ দেয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। লক্ষ্যণীয় যে, সেবারের মতো এবারও হত্যা-সন্ত্রাসকে প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে প্রথম থেকেই। দেয়াও হচ্ছে আবার ‘জানান’ দিয়ে। পার্থক্য হলো, শেখ মুজিব যেখানে ‘লাল ঘোড়া দাবড়ায়া’ দেয়ার হুমকি উচ্চারণ করেছিলেন, সাহারা খাতুনরা সেখানে ‘খুকী’ সাজার অভিনয় করে চলেছেন। কাজে-কম্মে তারা কিন্তু নেতাকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

এখানে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর থেকে হাওয়া হয়ে যাওয়া স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তানজিম আহমদ সোহেল তাজের একটি ঘোষণার কথাও স্মরণ করা দরকার। ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার তদন্ত প্রসঙ্গে সোহেল তাজ বলেছিলেন, প্রয়োজন হলে তিনি আকাশের ওপরে যতো উঁচুতেই উঠতে হয় উঠবেন, যাবেন সমুদ্রের যতো নিচে যেতে হয় ততো নিচে, তবু শেষ না দেখে ছাড়বেন না! অর্থাৎ ১০ ট্রাক অস্ত্রের পেছনে কারা রয়েছে সে রহস্য উদ্ঘাটন করবেনই তিনি! সে কষ্ট অবশ্য সোহেল তাজকে করতে হয়নি। তার আগেই তিনি বিদায় নিয়েছেন, দেশ থেকেই কেটে পড়েছেন। কিন্তু সোহেল তাজ না থাকলে কি হবে, তাকে অনুসরণ করছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। নিজের সাবেক প্রতিমন্ত্রীর সুরে সাহারা খাতুনও সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন, তিনি নাকি ‘গর্তের’ ভেতর থেকে জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের ধরে আনবেন! প্রশ্ন উঠেছে, তিনি কি তাহলে সাপুড়ে-বেদেনী হয়ে গেলেন? জঙ্গি-সন্ত্রাসীরা কি তাহলে ‘গর্তে’ লুকিয়ে থাকে? প্রশ্ন ওঠার কারণ সম্পর্কে সম্ভবত কথা বাড়ানোর প্রয়োজন পড়ে না। সোহেল তাজ শুনিয়ে গেছেন, জঙ্গি-সন্ত্রাসীরা নাকি আকাশে ও সমুদ্রের তলদেশে বসবাস করে!

এদিকে শেখ হাসিনার আইন প্রতিমন্ত্রীও যথেষ্ট শোরগোল তুলেছেন। আইনের মানুষ হলেও একের পর এক তিনি অসত্য বলে চলেছেন। আক্রমণ করছেন এমনকি সুপ্রিম কোর্টের মাননীয় বিচারপতিকেও। পাঠকদের মনে পড়তে পারে, সিনিয়র বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী সম্প্রতি এক সেমিনারে বলেছিলেন, জনগণের মঙ্গলের জন্য আইন তৈরি করা সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব। আইনের খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে বিতর্ক করাও তাদের দায়িত্ব। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, পাস হওয়ার আগে অনেক সদস্য আইনটি পড়েও দেখেন না। কেরানীরা আইনের ড্রাফট তৈরি করে আনবে আর সংসদ সদস্যরা হো হো করে ও তালি বাজিয়ে তা পাস করে দেবেন এটা উচিত নয়। এর প্রতিক্রিয়ায় আইন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম টুকু রীতিমতো যুদ্ধংদেহী মনোভাবের পরিচয় দিয়েছেন। বলেছেন, সংসদ সদস্যদের ব্যাপারে ‘অশালীন’ মন্তব্য করে বিচারপতি চৌধুরী নাকি ‘ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ’ এবং ‘গর্হিত অন্যায়’ করেছেন। এটা কোনো অবস্খাতেই ‘বরদাশ্ত’ এবং ‘ক্ষমা’ করা হবে না।

একই আইন প্রতিমন্ত্রী এরপর হঠাৎ ইসলামের পেছনে লেগেছেন। ইসলামকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম করায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ২৬ ডিসেম্বর এক অনুষ্ঠানে অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম টুকু বলেছেন, বিশ্বের কোথাও নাকি ধর্মভিত্তিক কোনো রাষ্ট্র নেই! কোনো দেশে নাকি রাষ্ট্রধর্ম বলে কিছু নেই! কথাটার মধ্য দিয়ে আইন প্রতিমন্ত্রীর জ্ঞানের ‘বহর’ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেছে। কারণ, বাংলাদেশ ছাড়াও এত বেশি দেশে ইসলাম রাষ্ট্রধর্মের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত রয়েছে যে, নাম ও সংখ্যা শুনলে আইন প্রতিমন্ত্রীকে লজ্জায় পড়তে হবে­ যদিও লজ্জা আবার সবাই সমানভাবে পান না! সউদী আরব, বাহরাইন, ব্রুনেই, মিসর, ইরান, ইরাক, জর্ডান, ওমান, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, তিউনিশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইয়েমেন, আলজিরিয়া, লিবিয়া, মরক্কো­ কত দেশের নাম শুনতে চান অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম টুকু? (কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, তার নিজের নামের মধ্যেও ‘ইসলাম’ই রয়েছে!) শুধু ইসলামের কথাই বা বলা কেন? বিশ্বে হিন্দু, বৌদ্ধ, ইহুদী ও খ্রিস্টান ধর্মও (ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট) রয়েছে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে। যেমন নেপাল একটি হিন্দুরাষ্ট্র। ইসরাইল ইহুদী রাষ্ট্র। রাষ্ট্রধর্ম রোমান ক্যাথলিক এমন দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া, চেকোস্লাভাকিয়া, কোস্টারিকা, এল সালভেদর ও মাল্টা। সবার ওপরে রয়েছে ভ্যাটিকান সিটি। ডেনমার্ক, নরওয়ের মতো কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রধর্ম লুথেরান চার্চ। ব্রিটেনের রাষ্ট্রধর্ম প্রোটেস্ট্যান্টিজম­ খ্রিস্টান ধর্ম। ভুটান, থাইল্যান্ড প্রভৃতি দেশের রাষ্ট্রধর্ম বৌদ্ধ ধর্ম। কথা শুধু এটুকুই নয়। এত যে ধর্মনিরপেক্ষ ও আধুনিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সে দেশের প্রেসিডেন্টকেও শপথ নেয়ার সময় বাইবেল হাতে নিতে হয়।

অন্যদিকে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হলেও এবং ৯০ শতাংশ মানুষ মুসলমান হলেও বাংলাদেশে কিন্তু রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী থেকে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও এমপিসহ কাউকেই পবিত্র কোরআন ছুঁয়ে শপথবাক্য পাঠ করতে হয় না। কিন্তু তা সত্ত্বেও অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম টুকুদের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। তারা বোঝাতে চাচ্ছেন যেন বিশ্বে শুধু বাংলাদেশেই রাষ্ট্রধর্ম রয়েছে!
বলা দরকার, কামরুল ইসলাম টুকুই মন্ত্রিসভার একমাত্র সদস্য নন। অন্য দু’-চারজনও ইসলাম ও মুসলমানদের ব্যাপারে মাথা ঠিক রাখতে পারেন না। যেমন পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী তার উপস্খিতিতে কোনো অনুষ্ঠানে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করতে দেন না। ঘোষণা দিয়ে তেলাওয়াত বìধ করান। ওদিকে অ্যাডভোকেট টুকুর ফুলমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ ধারাবাহিকভাবে লেগে আছেন মসজিদ ও মাদরাসার বিরুদ্ধে। কিছুদিন আগেও তিনি বলেছেন, দেশের কওমী মাদরাসাগুলো নাকি জঙ্গিদের ‘প্রজনন কেন্দ্রে’ পরিণত হয়েছে! এসব কওমী মাদরাসায় যে শিক্ষা দেয়া হয় তা নাকি কুপমন্ডুকতার সৃষ্টি করছে। তিনি ‘দু:খের সঙ্গে’ বলেছেন, মসজিদের ইমাম সাহেবরা নাকি কেবল বেহেশতে যাওয়ার শিক্ষা দেন! কত তাড়াতাড়ি বেহেশতে যাওয়া যায়, মসজিদ-মাদরাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নাকি সেসব শিক্ষাই দেয়া হচ্ছে! ‘সত্য কথা বলতে হবে। অন্যের সম্পত্তি গ্রাস করা যাবে না’­ এ ধরনের শিক্ষা নাকি সেখানে দেয়া হয় না। আইনমন্ত্রী আরো বলেছেন, কওমী মাদরাসাকে কেন্দ্র করেই বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের বিস্তার ঘটেছে।

এমন অবস্খার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেছেন, ১৯৭৫-পরবর্তীকালে বিভিন্ন সংশোধনী এনে ১৯৭২-এর সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতার চেতনাকে নস্যাৎ করায় এবং ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণার ফলেই নাকি ধর্মের নামে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়েছে! লক্ষ্য করলে দেখা দেখা যাবে, ইসলাম ও মুসলমানদের বিরোধিতার একই উদ্দেশ্য থেকেই আইন প্রতিমন্ত্রীও হঠাৎ রাষ্ট্রধর্ম প্রসঙ্গে শোরগোল তুলেছেন। অসত্য বলেছেন।

এভাবেই বয়ানের প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাচ্ছেন ক্ষমতাসীনরা। তা তারা চালাতেই পারেন। কিন্তু আপত্তি ওঠে যখন কথায় কথায় তারা অসত্য বলেন এবং প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য মিথ্যার পাহাড় তৈরি করে বসেন। ধরা পড়ে যাওয়া মাত্র অবুঝ ‘খুকী’ সেজে বসার বিষয়টিও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়। উদ্বেগের কারণ হলো, ক্ষমতাসীনদের বয়ান ও কর্মকান্ডে একদিকে গণতন্ত্রের পাশাপাশি ইসলাম ও মুসলমানরা বিপন্ন ও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে ঝুঁকি বাড়ছে দেশের সার্বভৌমত্বের। (সোনার বাংলা)
৭টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×