তুমি কি মনে করতে পারছ আব্বু কত বছর তুমি তোমার ছেলে মেয়েদের দেখ না? তোমার সন্তানরা কতদিন তাদের বাবাকে বাবা বলে ডাকতে পারেনা? সেই যে ১৯৮৮ সালের মাঝামাঝিতে তুমি কোথায় যে চলে গেলে আর তোমাকে ফিরে পেলাম না আমাদের মাঝে । দেখতো ২১টা বছর পার হয়ে গেছে। তোমার সেই ছোট্ট মেয়েটা আজ কারও ঘরের বউ, বড় মেয়েটার একটা পাকনা মেয়ে হয়েছে। সারা দিন শুধু নানী নানী করে। তুমি থাকলে সাথে নানা নানা ও ডাকতে পারত। আর তোমার দুটো ছেলে জীবন সংগ্রামের এক সীমাহীন পথে সংগ্রাম করে যাচ্ছে। আজ তারা নিজের পায়ে প্রতিষ্ঠিত। শুধু প্রতিষ্ঠিত বললে ভুল হবে, তারা আজ এমন অবস্থানে আছে হয়তো তুমিও তাদের এই অবস্থানে পৌছাতে সমর্থ হতে না। কিন্তু তারা স্রোতের বিপরীতে যুদ্ধ করে, মায়ের চোখের পানির দিকে চেয়ে নিজেদের এমন ভাবে গড়ে তুলেছেন কেউ তাদের দিকে আঙুল তোলে বলতে পারবেনা এরা তোমার সন্তান। আজ তাদের তোমার পরিচয়ের প্রয়োজন নেই, নিজেরদের গুণে আজ সবার কাছে পরিচিত। তারা তাদের মায়ের যোগ্য সন্তান হয়েছে। মায়ের চোখের পানির মূল্যদিতে শিখেছে।
হ্যাঁ আমরা আমার মায়ের সন্তান। তোমার পরিচয়ে নিজেকে পরিচিত করতে চাইনা। কি দিয়েছ তুমি আমাদের ? তোমার নামের কোন অংশটুকুও নিজের নামের ব্যবহার করতে পারিনা। তুমি আমাদের ফেলে চলে গেলে একবারও ভাবলে না এই চারটা সন্তানকে নিয়ে তাদের মা কিভাবে কি করবে? তোমার বড় মেয়েটার বয়স মাত্র ১২ বছর আর ছোট মেয়েটা ১০ মাসের( যে তোমার কোন কিছু পায়নি) । বড় ছেলেটা ৯ বছর আর ছোট ছেলেটা ৩ বছরের। তুমি কি জানো কিভাবে তোমার স্ত্রী এদের মুখে খাবার তুলে দিয়েছে? তুমি খুব ভালো ভাবেই জানো তোমার বাড়ির মানুষ কত নিচু প্রকৃতির। তারা তোমার স্ত্রীর অসহায় অবস্থার সু্যোগ নিতে চাইতো। গ্রামের সব অসহায়রা যখন সরকারী রিলিফ এর গম পেত কিন্তু তোমার বুড়ি মাকে চেয়ারম্যান রিলিফ দেয়নি, তার নাতিদের মুখে একবেলার খাবার তুলে দিতে। বলে দিয়েছে তোমার স্ত্রীকে যেতে। কিন্তু তোমার স্ত্রী পশুদের সাথে আপোষ করেনি, তাদের কাছে নত হয়নি। তার পাশে এসে দাড়িয়ে ছিল তার বাবা মা, কলেজ পড়ুয়া ভাইয়েরা। টিউশনি করে বোনের সন্তানদের আহারের ব্যবস্থা করেছে। ভাগ্নে ভাগ্নীদের জন্য মামারা ২০ মাইল হেটে মাথায় করে মায়ের দেয়া খাবার বোনের বাড়ি এনে দিত। তারা বার বার তাদের বোনকে নিজেদের কাছে নিয়ে ্যেতে চেয়েছে কিন্তু আমাদের মা তোমার পথ চেয়ে তোমার সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে সকল কষ্ট মুখ বুজে সয়ে গেছে।
তুমি জানো তোমার বড় সন্তান একদিন বাড়িতে এসে কাদতে কাদতে তার মায়ের কাছে কি বলেছিল " মাগো কাকা দোকান থেকে আমাদের চাল দিতে না করে দিয়েছে। আমরা কি খাবো?"। সরকারী চাকরী জীবি ছোট ভাই তোমার সংসারের জন্য মাসে ২০ কেজি চাল এর খরচ ও দিতে অপারগতা জানায়। তোমার অসহায়া স্ত্রী আর তোমার মায়ের কান্নায় সেদিন গাছের পাতা গুলোও নিরবে কেদেঁছিল। তোমার কোন আত্বীয় স্বজন সেদিন আমাদের পাশে দাড়ায় নি। দাড়িয়ে ছিল আমাদের নানা। তিনি তার মেয়ে আর নাতীদের নিয়ে আসেন নিজের কাছে। তোমার মায়ের আহাজারী আর বুক ফাটা কান্না দেখে তোমার বড় ছেলে থেকে যায় দাদীর সাথে। সেই সাথে নিজের জীবন থেকে শিক্ষার আলো আসার সব টুকু পথ বন্ধ করে।
তোমার বড় মেয়ে আর ছোট ছেলে নানা বাড়িতে থেকে লেখা পড়ে শুরু করে এবং তারা তাদের প্রচেষ্টার সব টুকু ঢেলে দেয় নিজেদের গড়তে। পড়ালেখায় তারা এলাকায় সুনামের সৃষ্টি করে তাদের নাম এখনো তাদের স্কুলে, কলেজে সম্মানের সাথে মনে করে। এক সময় তোমার মা বুঝতে পারে নাতিকে তার কাছে রেখে সে কিছুই করতে পারবেনা। পাঠিয়ে দেয় নানা বাড়ি। কিন্তু ততদিনে সময় অনেক পেরিয়ে গেছে । নানা বাড়ি এসে মামাদের ব্যবসায় হাত লাগায় তোমার বড় ছেলে। একসময় মামারা ও বুঝতে পারে ওদের জীবন গড়তে আরও কিছু করা দরকার পাঠিয়ে দেয় তোমার ছেলেকে ইউরোপে। ১০ বছরের পরিশ্রমে আজ সে সেখানে প্রতিস্ঠিত । যারা এক সময় একমুঠো আহারের জন্য হাহাকার করেছে শুধু তোমার কারণে তারা আজ টাকা পয়সা,বাড়ি গাড়ি সব কিছুরই মালিক হয়েছে। অভাবের কাছে পরাজিত না হয়ে অভাবকে পারাজিত করছে। কিন্তু তুমি কি জানো তোমার সন্তানরা আজো তাদের মায়ের মায়ের কাদতে কাদতে ক্ষয় হয়ে যাওয়া চোখের দিকে তাকিয়ে তোমায় অভিশাপ দেয়। তোমার ছোট মেয়েটা যে কোন দিন বাবা বল ডাকতে পারেনি আজো কাউকে তার মেয়ে আদর করতে দেখলে কেদে বুক ভাসায়। তোমার ছোট ছেলেটা যে কখনোই কারো কাছে নিজের কষ্ট গুলো প্রকাশ করে না সেও তোমাকে একবার বাবা বলে ডাকার জন্য পথ চেয়ে থাকে।
তুমি কি একবারও পারলে না আড়াল করে একটু খবর নিতে কেমন আছে তোমারা সন্তানরা? আমরা জানি তুমি দূর থেকে দেখছ আজ আমরা কেমন আছি। তোমার কি দেখতে ইচ্ছে করেনা, অভাবে ছুড়ে দেওয়া মুখ গুলো কেমন করে মলিন হাসি দেয়?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

