এই উপন্যাস এর সকল চরিত্র, সংলাপ ও কথোপকথোন কাল্পনিক। বাশ্তব কোনও চরিত্রের সাথে এর কোনও মিল যদি থেকেও থাকে তা নিতান্তই কাকতালীও । উপন্যাস এর স্থান সমুহগুলি বাশ্তব ।
পর্ব-১
.................... ২১.১২.০৭
সময়টা ১৯৫৬ এর মাঝামাঝি । তাতানো রোদ্দুর নৌকার ছই এর ভেতর চলে এসেছে । বছরের এই সময় পুব দিক থেকে খুব একটা বাতাস আসে না, কিন্ত অবাক হওয়ার মতই ব্যাপার যে এখন নৌকার ভেতর পুবদিকের থেকে একটু ঠান্ডা বাতাস আসছে । জামান এর একটু ঠান্ডা মতন লাগছিল কিন্ত ছই এর ভেতর রোদের তাপ আসায় ভাললাগতে শুরু করেছে ।
গতকাল পর্যন্ত তার মনের ভেতর একটা শঙ্কা কাজ করছিল । জামানের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল বাবা কখনও রাজি হবেন না তার ঢাকায় পড়ার ব্যাপারে। এন্ট্রান্স পরিক্ষায় দেশের সমগ্র মেধা তালিকায় দ্বিতীয় স্থান পেয়েছিল সে এবং সেই সুবাদে বাড়িতে তার একটা অন্যরকম অবস্থান হয়ে যায়। আই-কম পরিক্ষায়ও তার ফলাফল খুব ভাল হয়। গনিতে তার দখল এত ভাল যে শিক্ষকরা বরাবরই তার প্রসংসায় পঞ্চমুখ । এন্ট্রান্স এর পর থেকেই জামান এর ভীষন ইচ্ছা ঢাকায় পড়বে । পত্রিকায় আই-কম পারিক্ষার ফলাফল প্রকাশ হবার পর সে সিদ্ধান্ত নেয় বাবাকে ঢাকায় যাবার কথা বলবে । যদিও তার ধারনা ছিল বাড়ির কেঊ রাজি হবে না কিন্ত ওর ধারনা মিথ্যা প্রমান করে বাবা রাজি হয়ে যায় ।
জামানের চিন্তা থেমে যায় কারন নৌকা ঘাটের কাছাকাছি চলে এসেছে । সবাই এখন নামার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে । ছোটখাট ঘাটের কাছে বেশ লম্বা একটা ভিড়। গোয়ালন্দ ঘাটের থেকে আরো প্রায় মাইল সাতেক দক্ষিনের এই ঘাট দিয়ে প্রতিদিন চারটা গ্রামের লোকজন আসাযাওয়া করে। মধুমতি নদির ওই পারের প্রথম গ্রামটা চাপাইল, পরেরটা মুলাশ্রি । জামানরা মুলাশ্রি গ্রামেই থাকে । বাড়ি থেকে চাপাইল ঘাট পর্যন্ত হেটে আসতে মিনিট বিশেক সময় লাগে।
নৌকা ঘাটে ভেড়ার সাথে সাথে জামান লাফ দিয়ে নামে । ত্রশ্ত পায়ে হাটা শুরু করে গোপালগঞ্জের দিকে । দিনের এই সময়টায় রিকশা পাওয়া খুব কঠিন । তাই রিকশার জন্য অপেক্ষা না করে হাটার সিদ্ধান্ত নেয় জামান। মিনিট বিশেক হাটার পরেই ওদের বাংলাবাড়ি পাওয়া যাবে । বাজার এর শুরুতেই লম্বা দালানটা ওদের । দোতলার মোট বারটা কামরার দশটা ভাড়া দেওয়া আবাসিক হোটেল হিসাবে, নিচের তলার সব কামরাগুলো ব্যাপারিদের কাছে ভাড়া দেওয়া দোকান হিসাবে। দোতলার বাকি দুইটা কামরা নিজেদের থাকার জন্য। বাড়ি থেকে কেঊ শহরে এলে এখানেই থাকে। ব্যাবসার কাজে বাবা, বড় চাচা প্রায়ই এখানে এসে থাকে। আজ রাত জামান এখানেই থাকবে।
নিচের তলার একটা কামরায় নিবারন কাকার হোমিওপ্যাথির দোকান । ওখানে সবসময় লোকের ভীড় লেগেই থাকে কিন্ত দুপুরের দিকে কাকা এক ঘন্টার জন্য বিশ্রাম নেন। রোগিরা আসতে আরো মিনিট বিশেক বাকি আছে । এই ফাকে কাকাকে খবরটা দিতে হবে । দোতলার সিড়ির দিকে না যেয়ে জামান সরাসরি নিবারন কাকার ঘরের দরজায় দাড়ায়। দুপুরের খাবার এর পর নিবারন কাকা চেয়ারে বসে একটু ঝিমিয়ে নেন । জামান এর পায়ের শব্দে চোখ মেলে তাকান।
আরে জামান যে ! এসো এসো । তুমিতো অনেক দিন হলো এইদিকে খুব একটা আসো না। তোমার রেজাল্ট এর খবরটা পেলাম কাল রাতের বেলায় । কংগ্রাচুলেশন্স মাই বয়। তা এখন তোমার প্লান কিগো বাবা?
এই জন্যই তো আপনার সাথে আলাপ করতে এলাম কাকা। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সিদ্দান্ত নিয়েছি । আপানার কাছে পরামর্শ করতে এলাম কোন বিষয়ে পড়া উচিত। আমার অবশ্য হিসাববিজ্ঞান এর প্রতি ঝোক বেশি।
গনিতে তো তোমার দারুন মাথা ! আমার তো মনে হয় ভাল সিদ্ধান্তই নিয়েছ। তা তোমার বাবার সাথে কথা বলেছ তো ?
জী, কাকা। কাল রাতেই বাবা জানাল আমি ঢাকায় যেয়ে পড়লে তার কোনও আপত্তি নাই।
তাহলে তো হয়েই গেল ! তা কবে নাগাদ ঢাকা যাচ্ছগো বাবা? তোমার বড়দা আমান তো ঢাকাতেই পড়ছে। তোমার বরং সুবিধাই হবে।
জী, কাকা।
নিবারন কাকার ঘর থেকে বের হয়েই জামার উপরে চলে এলো । দোতলার একদম পশ্চিম দিকের ঘর দুটো ওদের থাকার জন্য রাখা। ঘরের ভেতর ক্যামন ভ্যাপসা একরকম গরম । দোতলার দুই দিকে দুটো বাথরুম আর গোসলখানা। অনেক হাটাহাটির কারনে গা-হাত পা একদম ঘেমে গেছে। জানালাটা খুলে রেখে জামান ঠান্ডা পানিতে গোসল করে এল। এখন একটু আরাম লাগছে ।
ব্যাংকপট্টি এলাকাটা এখান থেকে বেশি দূর নয়। বাংলাবাড়িটা বাজারের শুরুতে থাকায় সবসময় রিকশা পাওয়া যায়। নিচে নেমেই একটা রিকশা নিয়ে জামান চলে এলো ব্যাংকপট্টিতে। ঢাকায় যাবার আগে অনেক কাজ। প্রথম কাজ পোষ্ট অফিসে যেয়ে বড়দাকে একটা চিঠি পাঠানো। কাল রাতেই চিঠিটা লিখে রেখেছিল। এরপর ভালকিছু জামাকাপড়, জুতা কেনা। তারপর একটা ভাল দুইটা ব্যাগ কিনতে হবে, একটা ছোট, অন্যটা বড়। ঢাকা শহরে তার এই প্রথম যাওয়া । ওখানে কোথায় কোনটা পাওয়া যাবে ওর জানা নাই। সুতরাং এখান থেকেই সব কিনে নেবে যা যা লাগবে।
..........................২৮.১২.০৭
সব শেষ করতে জামান এর প্রায় রাত ন’টা বেজে গেল । ছোটখাট দুই একটা জিনিস এখনও কেনা বাকি রয়ে গেল। তবে সেগুলো খুব বেশি জরুরি নয় । জামান এর কেনাকাটার লিস্টটা তিন ভাগে ভাগ করা । অবশ্যই কিনতে হবে জিনিসগুলো প্রথমে, তারপর মোটামুটি জরুরিগুলো আর সবশেষে ‘না কিনলে ক্ষতি নেই’ জিনিসগুলো । এইসব ব্যাপারে জামান বরাবরই খুব গোছালো আর সচেতন । জামানরা তিন ভাই-ই এই ব্যাপারে একই রকম । বাবার কাছে শুনেছে যে ওদের দাদাও এই রকম গোছালো আর প্রতিটি ব্যাপারে খুব সচেতন ছিল।
বাজারের এই দোকানটায় সব ধরনের ব্যাগ, স্যান্ডেল, জুতা পাওয়া যায় । দোকানটা বাজারের মোটামুটি প্রথম দিকেই। জামান মোট তিনটি ব্যাগ কিনলো । সবচেয়ে বড় ব্যাগটায় ওর সমস্ত কাপড় চোপড়, কিছু বইপত্র, জুতা, স্যান্ডেল ও অন্যান্য সবকিছু নেবে। কাল রঙের এই সুটকেসটা ওর খুব পছন্দ হয়েছে কারন এটা খুব মজবুত । জামান তখনও জানত না যে এই সুটকেসটা অনেকদিন ওর সাথে থাকবে । দিতীয় ব্যগটাও কাল কিন্ত ভিশন নরম কারন ওটা চামড়ার । জামান এখনই ঠিক করে ফেলল যে এই ব্যাগটা নিয়েই সবসময় ছুটিতে বাড়ি যাওয়া আসা করবে। আর ছোট ব্যাগটা ঢাকায় নিয়মিত ব্যবহার এর জন্য । সমস্ত জিনিসপত্র সুটকেসের ভিতর ভরে জামান দোকান থেকে বের হয়ে এল ।
এখান থেকে বাংলাবাড়ি খুব একটা দূর নয় । হেটে গেলে খুব বেশি হলে দশ মিনিট সময় লাগতে পারে কিন্ত সাথে জিনিপত্র থাকায় একটা রিকশা নিয়ে নিল জামান । মিনিট তিনেকের মতন সময় লাগল বাংলাবাড়ি পৌছাতে । রিকশাওয়ালা ওর সুটকেসটা উপরে এনে দিল । ভাড়া মিটিয়ে জামান আবার নিচে নেমে এল ।
ওদের নিচের তলার একটা ঘর খাবার হোটেল । মোট ছটা টেবিল আর দু’পাশে বেঞ্চ, একপাশে দুটা আলামারির মতন । ওখানে সবসময় মিস্টি, দই, বুন্দিয়া আর ছানা সাজানো থাকে । বুন্দিয়া ওর খুব ভাল লাগে । সকাল বেলায় লুচি দিয়ে বুন্দিয়ার কোনো তুলনায় হয় না । ভাবতেই জামান এর জিবে পানি চলে আসে । ছোটখাট হলেও বাজারের সবচেয়ে ভাল হোটেল এটা । বিহারির হোটেল বলেই সবাই চেনে । কবে ও কেন এটার নাম বিহারির হোটেল হল তা’ জামানের জানা নেই । তবে এটার মালিক দিবেন্দু কাকা । ভদ্রলোক খাটি হিন্দু হলেও তার এখানে সব ধর্মের লোকজন আসে । তার বাবুর্চি মুসলমান এবং মুরগি, গরু, খাসি সব কিছুই তিনি মুসলমান দোকান থেকে আনান । গরু বিক্রি হয় বলে অনেক হিন্দুই তার হোটেলের ত্রিসিমানায় আসে না । দিবেন্দু কাকার ধর্মধারনা একটু ভিন্ন ধরনের । গরু খাওয়া নিষেধ বলে গরু বিক্রি করা যাবে না, এ তিনি মানেন না । মুসলমান খেয়েছে বলে সেই পাত্রে আর খাওয়া যাবে না, তাও তিনি মানেন না। তার মতে ধর্ম মানুষকে বড় হতে শেখায় । এইসব বিধিনিষেধ তার হিন্দুত্তকে ছোট করে এবং তার ধারনা ধর্মের সাথে এই সব বিধিনিষেধ এর কোনো সম্পর্ক নেই ।
জামান এর সাথে দিবেন্দু কাকার খুব ভাল সম্পর্ক । কাকার এইসব ধ্যনধারনার সবই তার জানা । সবসময় দেখে এসেছে রাত এগারটা পর্যন্ত হোটেল খোলা থাকে। সুতরাং আরাম করেই জামান এখন খেতে পারবে । কোনো তাড়াহুড়া করা লাগবে না। অবশ্য কি কি খাবে বলে গেলে উপরে খাবার পাঠিয়ে দেয় কাকা। কিন্ত আজ ওর ইচ্ছা করছে হোটেলে বসে খেতে । জামান অনেকদিন পর গোপালগঞ্জ এল । বড় ভাই আমানকে ও বরাবরই দাদা ডাকে । দাদা ঢাকায় যাবার আগে জামান প্রায় এখানে আসত । কলেজে পড়ার সময় গোয়ালন্দ ঘাট হয়ে যেতে হত কারন কলেজটা শহরের উত্তর দিকে । তাই এদিকটা আসার ইচ্ছা থাকলেও আসা হত না।
খুব তৃপ্তি করে খেল জামান । জানে অনেকদিন পর হয়ত এই হোটেলে আবার খেতে পারবে। খাওয়া শেষ করে জামান অপেক্ষা করছে দিবেন্দু কাকার জন্য । পিছনের রান্নাঘরের পাশে অল্প একটু জায়গায় কাকার ছোট্ট একটা টেবিল আছে । ওখানে বসেই কাকা তার সব হিসাবপত্তর করে। কেউ একজন গিয়ে খবর দিয়েছে জামানের খাওয়া শেষ । এখন মাত্র দুইজন কাজ করছে হোটেলে । তাদের কেউ একজন হবে হয়ত । জামান ছানার সন্দেশ আর রসগোল্লার কথা বলতেই দিয়ে গেল । এদের মিস্টির খুব সুনাম আছে । বাড়ি থেকে কেউ এলেই মিস্টি নিয়ে যায় এখান থেকে। জামান এর বাবা মিস্টি নিতে কখনই ভুল করেন না। মিস্টি খেতে শুরু করতেই দিবেন্দু কাকা চলে এল। পান ভরতি মুখে একগাল হাসি নিয়ে কাকা এসে বসল ওর সামনে ।
তুমি নাকি ঢাকা যাচ্ছ ? নিবারন এর সাথে দেখা হয়েছিল বিকাল বেলায়, ওর কাছেই শুনলাম সব।
ঠিকই শুনেছেন কাকা।
তা’ কবে যাবা বলে ঠিক করলে ? আবার আসবা কবে ?
আজতো বুধবার ! কাল বাদ দিয়ে পরশুদিন শুক্রবার যাব বলে ঠিক করেছি । ঢাকায় যাবার পর বিশ্যবিদ্যালয়ে ভর্তি, বইপত্র, থাকার ব্যবস্থা সবকিছু ঠিক করার পর একবার আসবো কাকা। তখন যদি এদিকে আসি তখন দেখা হবে ।
ঢাকা গেলে কি আর কাকার এই হোটেল এর খাবার আর ভাললাগবে ! শুনেছি ওখানে সব কিছু খুব সুন্দর ।
আপনার হোটেল এর খাবার এর কথা কি ভোলা যায়? ঢাকর হোটেলগুলো যতই সুন্দর হোক না কেন, আপানার হোটেল এর খাবার এর যে ঘ্রান তা কি আর ওখানে পাব?
তা ঠিক আছে বাবা, যাও । ভাল থেকো, নিযের যত্ন আত্তি নিও। ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি তুমি যে কাজে যাচ্ছ তাতে সফল হও ।
জি কাকা। আপনিও ভাল থাকবেন । বাড়ি এলে এদিকে একবারতো আসা হবেই । তখন আপনার সাথে দেখা করে যাব। বিশেষ করে আপনার হোটেলের খাবারতো খাবই।
জামান এর তখনও কোনো ধারনা ছিল না যে দিবেন্দু, নিবারন কাকাদের সাথে ওর আর কোনোদিনই দেখা হবে না। কোনোদিনই ওর আর আসা হবে না এই শহরএ। ওকে যদি কেউ তখন ভাগ্যের কথা বলত, ভবিষ্যতের আভাস দিত তাহলেও জামান তা’ বিশাস করত না। কারন এইসবের প্রতি তার কোনো বিশেষ আস্থা নেই ।
হোটেল থেকে বেরিয়ে সোজা উপরে উঠে আসে জামান। খুব ঘুম পেয়েছে তার। ওর এই এক অভ্যাস । খাবার পেটে পরলেই কেমন যেন ঘুম-ঘুম পায় । মশারি টাংগিয়ে এখন ঘুমাতে হবে। এই কাজটা জামান খুব ভালভাবেই করে। ঘরটা খুব সৌখিন আসবাব দিয়ে সাজানো । এই ঘরটা বাবার জন্য আর অন্যটা বড় চাচার। জামানের বাবা আর চাচা, দুই ভাই-ই খুব সৌখিন ধরনের মানুষ । তাছাড়া ওদের কাঠের ব্যবসা দার্জিলিং, আসাম এর সাথে । ওদের বেশিরভাগ সব আসবাবপত্র গুলো আসাম থেকে আনা। ঘরের পুব দিকের কোনায় কালচে ধরনের বিশাল একটা আলমারি । একদম নিচের ড্রয়ার খুললে পাওয়া যাবে মশারি, কাথা, লেপ, চাদর। বিছানায় অবশ্যি চাদর আর বালিশ পাতা আছে। এগুলো সব ধোয়া । মশারি বের করে জামান চার কোনা ঠিক মতন বেধে দিল। দড়িগুলো ঠিক মাপমতন করে লাগানো আছে, তাই মশারিটা একদম টানটান হয়ে গেল ।
জামান এর সমস্ত সত্তা জুড়ে এখন ঢাকার কথা ঘুরছে। মনে হছে ঢাকার লাটিমটা তার মাথায় তীব্র গতিতে ঘুরছে । থামানোর কোনো উপায় তার জানা নেই। এই গতিতে একটা আবেশ আছে । জামান এর খুব ভাললাগছে । চোখে ঘুম থাকায় ব্যাপারটা একটু নেশার মতই লাগছে ওর কাছে । তারপর কখন যেন চোখ জুড়ে ঘুম নেমে এল । ঘুমাবার সময় ভাবল সকালে দিবেন্দু কাকার হোটেল থেকে লুচি আর বুন্দিয়া দিয়ে নাশ্তা সেরে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেবে ।
……………………২৯।১২।০৭
রাত প্রায় এগারটার মতন বাজে । বাড়ির পূব দিকে একটা মাঝারি আকারের পুকুর আছে । তার পূবপাড় ঘেষে শুরু হয়েছে ক্ষেতী ফসলের সারি। পুকুর আর ক্ষেত এর মাঝ দিয়ে লম্বা আইল ধরে কয়েকটা বড় তালগাছ আর কিছু বুনো গাছ। রাতে এদিক দিয়ে বেশ ঠান্ডা হাওয়া বয়ে যায় বাড়ির দিকে। পুকুর এর পশ্চিম পাড় দিয়ে বাড়ির উঠানের দিকে উঠে গেছে নারকেল গাছের গুড়ি দিয়ে বানানো ঘাট। তলি বাশ দিয়ে বানান দুটো বেঞ্চ দুইপাশে । দিক্ষন দিকের বেঞ্চে জাম গাছের নিচে বসে আছে কালান সিকদার । সাদা পাঞ্জাবি পরে থাকায় অন্ধকারেও তাকে স্পস্ট দেখা যাচ্ছে । ভাবনায় নিমগ্ন মাথাটা নুয়ে আছে বুকের দিকে ।
বছর পাচেক আগেও এখানে এই পুকুর ঘিরে থাকত জংলা । বসতবাড়ি বলতে কোনো কিছু ছিল না । সশ্তা টিনের চাল আর সারালো তাল কাঠ দিয়ে বানানো তিনটে ঘর নিয়ে শুধু লম্বা একটা কাঠামো ছিল । দূর সম্পর্কের এক চাচাত ভাই আর রাখাল এখানে থাকত । বছর তিনেক হল কালান সিকদার সপরিবারে এখানে এসে উঠেছে ।
ঘটনাটা ভাষা আন্দোলনের পরের বছরের । ১৯৫৩ সালের মার্চ মাসের তিন তারিখ । রাত আটটার দিকে বড় ভাই সোলান সিকদার এর সাথে তার কথা কাটাকাটি হয় । এক পর্যায়ে তা তীব্র ঝগড়ায় পরিনত হয় । তখন তারা থাকত বিশাল এক দালান বাড়িতে । নীচ তলায় সে ও তার পরিবার, উপর তলায় বড় ভাই, তার পরিবার ও মা । বাবার রেখে যাওয়া বিশাল সম্পত্তির সমভাগ দু’জনের। এই দালানে তাদের দুই ভাইএর জন্ম । এখানেই তাদের বড় হয়ে উঠা । এই বাড়িটাও তাদের দুই ভাই এর নামে। বাবার রেখে যাওয়া কাঠের ব্যবসাটাও তাদের দুই ভাই এর। বাবার মৃত্যুর পর দুই ভাই মিলেই ব্যবসা ও সম্পত্তি দেখেশুনে রাখত। বছর দশেক হল বড় ভাই নিজে থেকেই সব কিছু একাই সামাল দিচ্ছে । ধীরে ধীরে কালানকে শুধুমাত্র ছোটখাট কাজ গুলোই দেয় সোলান । ব্যবসার হিসাবপত্র সব সোলান-ই সামাল দেওয়া শুরু করে। বেশ কয়েকবার কালান এই ব্যাপারে বড় ভাই এর কাছে জানতে চাইলে তাকে শুধে বলা হয়েছে ‘বড় ভাই এর উপর কি তোর বিশাস নেই ?’ শুনে কালান চুপ হয়ে গেছে। কারন বড়ভাইকে সে আসলেই খুব বিশাস করে। তাই মাঝে মধ্যে যখন বিভিন্ন কাগজপত্রে সই দেবার জন্য বড় ভাই ডেকে পাঠাত, বিনাবাক্যে কালান তাতে সই করেছে।
গতমাসের শেষদিকে সে জানতে পারে বড়ভাই তার চরম সর্বনাশ করেছে। খবরটা শোনার পর ও একদম বিশাস করেনি । তাই এ ব্যাপারে খবর নেওয়ার কোনো প্রয়োজন মনে করেনি। কিন্ত গতসপ্তাহের হাটে যেয়ে লোকজনের কানাঘুষায় ওর সন্দেহ হয় । লোক লাগিয়ে ওর সর্বনাশের সত্যতা জানতে পারে । বিগত দশ বছর যাবত বড় ভাই তাদের সম্পত্তির নব্বুই শতাংশ আর ব্যবসার সম্পুর্নটাই নিজের নামে করিয়ে নিয়েছে। দালান বাড়ির পুরোটাই বড়ভাই এর নামে এখন।
ক্ষোভে দুঃখে অভিমানে কালান বাকরুদ্ধ । তার সমস্ত বোধবুদ্ধি উবে গেছে নিমেষে। কালান বরাবরই সহজ সরল ধরনের মানুষ । সামান্য কস্ট সহ্য করার ক্ষমতা যার নেই তার জন্য এমন একটি বিষয় হজম করা অকল্পনিয়। কিন্ত ভাগ্যের পরিহাস কে উপেক্ষা করতে পারে? তার তীব্র অভিমানের বিষ্ফোরন ঘটে মার্চ মাসের তিন তারিখ, মঙ্গলবার।
...............০১।০১।২০০৮
কালান ওই রাতেই এক কাপড়ে সপরিবারে দালানবাড়ি ত্যাগ করে বুক ভরা অভিমান নিয়ে । কালান এর স্ত্রী সুরাইয়ার অবশ্য এতে কোনো সমস্যা হয়নি। ভেতরে ভেতরে সে যদিও ব্যাপারটা মেনে নিতে পারেনি কিন্ত তার এই ব্যাপারে কিছুই করার ছিল না। সুরাইয়া অসম্ভব আত্মকেন্দ্রিক একজন মানুষ। সংসার এর এইসব ঘটনাগুলো নিয়ে সে কখনই মাথা ঘামাইনি। যদিও সম্পত্তির ব্যাপারে সে বরাবরই সচেতন কিন্ত কেন যেন এই সময় সে একদমই চুপ ছিল। কারন জানে তার বড় ভাসুর অসম্ভব বুদ্দি সম্পন্ন একজন মানুষ, সুতরাং সে যখন কিছু করে আটঘাট বেধেই করে। জামান এর বাবার মতন অত সহজ সরল সে নয়। তাই জানে ভাসুর এর এই অন্যায় এর বিরুদ্ধে কিছু করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।
দুর্ভগ্যক্রমে কালান এর দিতীয় স্ত্রী জুবেরা তখন বয়সে অনেক ছোট। কালান এর দিতীয় বিবাহের কারন ওর প্রথম স্ত্রী । সুরাইয়া কোনোদিনও ঘর সংসার এর কাজ করতে পারবে না। তাছাড়া জমির ফসলফলাদি যা বর্গীরা দিয়ে যায় তাও তার পক্ষে দেখা সম্ভব নয় বলে সে ঘোষনা দিয়েছে। এবং সুরাইয়ার গ্রামেরই অভাবগ্রশ্ত ঘরের মেয়ে জুবেরাকে বিয়ে করার জন্য সে তার সোয়ামিকে চাপ সৃষ্টি করে। কালান অবশ্য এতে মনে মনে খুশিই হয়েছে। সুরাইয়া অসম্ভব সুন্দরী আর জুবেরা তার সৌন্দর্যের ধারেকাছেও নেই কিন্ত সংসারের কাজে জুবেরার কোনো তুলনা নেই।
রাত বাড়ছে । কিন্ত কালান এর ভাবনার কোনো শেষ নেই। গভীর মনযোগ দিয়ে প্রতিরাতে পুকুর ঘাটের এই বেঞ্চীতে বসে সে নানারকম এইসব ভাবনা ভাবে। তার প্রতিরাতের ভাবনা একই বিষয় নিয়ে এবং প্রতিবারই তার ধারনা হয় এইসব সে এই প্রথমবারের মতই ভাবছে। এই ব্যাপারটা অবশ্য বাড়ির কেউই জানে না। তারা শুধু জানে সে বসে বসে ভাবে, ঠিক কি ভাবে আর কতবার ধরে একই ভাবনা ভাবে তা’ তাদের জানা নেই।
পুকুরে সম্ভবত বড় কোনো মাছ উপরে উঠে আবার ডুব দিল। সেই শব্দও কালান এর ভাবনায় কোনো ছন্দপতন ঘটাইনি। একই ভাবে তার মাথা নুয়ে আছে বুকের দিকে, ভাবনায় মগ্ন।
সুরাইয়ার ঘরে তার ছয় সন্তান, তিনটি ছেলে আর তিনটি মেয়ে। জুবেরার ঘরে তার সাত সন্তান, পাচটি ছেলে আর দুটি মেয়ে। বিশাল পরিবার নিয়ে কালান তিন কামরার এই টিনের বাড়িতে এসে উঠে। অবশ্য কিছু পরেই সুরাইয়ার ছোট ভাই সালাম এসে তার বড় বোন আর তার ছেলেমেয়েগুলোকে তার বাড়িতে নিয়ে যায়। যতদিন পর্যন্ত এখানে ভাল কোনো ব্যবস্থা করা না যায় ততদিন ওরা ওই বাড়িতেই থাকবে বলে সিদ্ধান্ত হয়।
ওই ঘটনার এগারদিনের মাথায় কালানের মা মারা যায়। তার অনেক বয়স হয়েছিল আর নানারকম অসুখেও ভুগছিল। বাকশক্তি বলে তার কিছু ছিল না। তবে গ্রামের লোকের ধারনা এইরকম একটা ঘটনা সহ্য করতে পারেনি বলেই তার মৃত্যু হয়। কালান এরও একই ধারনা।
দুই মাসের মধ্যেই কালান তিন কামরার এই বাড়িটাকে পাচ কামরার বাড়িতে পরিনত করে। মোট দশ বিঘার এই জায়গায় উত্তর দিকে আরো একটা বাড়ি সে বানায়। কাঠ, টিন আর মাটির ভিটা। ছোট বউ জুবেরা ও তার সন্তান্দের ওই বাড়ি আর সুরাইয়া সহ তার সন্তান্দের জন্য পুরান বাড়িটা বরাদ্দ করা হয়।
এই পর্যন্ত এসে কালান এর ভাবনা থেমে যায়। ধীর পায়ে সে ঘরের দিকে পা বাড়ায়। ছেলেমেয়েরা সবাই ঘুমিয়ে গেছে। সুরাইয়া হয়ত এখনো নামাজের পাটিতেই আছে। বাড়িতে একটা অলিখিত নিয়ম হয়ে গেছে সবাই রাত দশটার মধ্যে খেয়ে নেয়। বিছনায় যেয়ে কালান অনেক্ষন জেগে থাকে। বড় ছেলে আমান আজ প্রায় তিন বছর হল ঢাকায় থেকে পড়াশুনা করে। গত তিন বছরে সে একবার মাত্র বাড়িতে এসেছে, তবে চিঠিতে যোগাযোগ হয় মাঝেমাঝে। দুদিন পরে জামানও চলে যাবে ঢাকায়। ওর পড়াশুনার খরচ নিয়ে অবশ্য খুব না ভাবলেও চলবে কারন ভাল রেজাল্ট করার জন্য সরকারি স্কলারশিপ পাবে। তারপরও কিছু খরচতো দিতেই হবে। কালান সিদ্ধান্ত নিয়েছে কিছু জমি বন্দক রাখতে হবে ওদের পড়াশুনার জন্য। এইসব ভাবতে ভাবতে একসময় সে ঘুমিয়ে পড়ে।
আজ শুক্রবার, জুম্মার দিন। এম্নিতেই বাড়ির সবাই খুব ভোরে উঠে। কিন্ত সূর্য উঠার আগেই আজ সবাইকে উঠতে হয়েছে। আগের রাতেই জামান তার ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছিল, তাই সকালে কোনো তাড়াহুড়া নেই তার। সবার মনেই একটা উতসবের ভাব শুধু বাবা আর হাসান বাদে। বাবা বরাবরই হাশিখুশি ধরনের মানুষ ছিলেন কিন্ত ওই ঘটনার পর থেকেই বাবা একদম উদাসিন এবং চুপচাপ হয়ে গেছেন। তবে রাতে ওকে ডেকে কিছু টাকাপয়সা দিয়েছেন। বিশেষ কোনো উপদেশ তিনি দেননি শুধু বলেছেন ‘আমার কিছু হলে তুই ওদের দেখে রাখিস’ । জামান হ্যা সুচক কিছু বলেনি তবে মাথা নেড়েছে। কালান জানেন তার এই ছেলেটা অসম্ভব আত্মবিশাসি আর দুরদৃস্টি সম্পন্ন। তার তিন ছেলেরই অসম্ভব মেধা।
হাসান এর বয়স মাত্র চোদ্দ বছর। অসম্ভব কর্মঠ আর মেধাবী। কিন্ত পড়াশুনার ব্যপারে খুব ফাকিবাজ। তারপরও তার রেজাল্ট সবসময় খুব ভাল। এখনও পর্যন্ত জামান এর সামনে সে আসেনি। তার ছোট্ট মনে একটা সংকা কাজ করছে। তার মেজদা চলে যাচ্ছে অথচ সে কাউকে বোঝাতে পারছে না তার ক্যামন লাগছে। বুকের মধ্যে একরকম কষ্ট হচ্ছে । শুধু মনে হচ্ছে মেজদা বোধহয় আর বাড়ি ফিরবে না। ঢাকা যেয়ে সাহেব হয়ে যাবে আর তখন ওদের ভুলে যাবে।
দেখতে দেখতে জামান এর যাবার সময় হয়ে এল। রাখাল সাথে যাবে ওকে নৌকা পর্যন্ত তুলে দিতে। মুলাশ্রির পশ্চিম দিকে বাবুডাঙ্গা গ্রাম। খাল পার হয়ে মিনিট দশেক হাটার পর বড় মাঠ। মাঠের পরই বাবুদাঙ্গা গ্রাম আর দুই গ্রামের মাঝখানে হাট। খালটা এসে এখানে আঠারবাকি নদীর সাথে মিলেছে। হাটের দুই মাথায় নদীর দিকে দুটো ঘাট। আগে থেকেই নৌকা ঠিক করা ছিল। জামানকে ফকিরহাট পর্যন্ত নিয়ে যাবে। ওখান থেকে বাসে করে বাগেরহাট তারপর আবার অন্য বাসে করে ঢাকা । খুলনার দৌলতপুর ঘাট থেকে অবশ্য লঞ্চে করে ঢাকা যাওয়া যায় তবে তাতে অনেক সময় লাগবে বলে জামান বাসে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়।
খালটা যেখানে এসে নদীর সাথে মিলেছে তার পুব পাশে একটা রয়াল গাছ। রয়াল ফলটা অনেকটা আমলকির মতই তবে আকারে অনেক ছোট আর বেশ হলদেটে ধরনের। এই গাছটা হাসান এর খুব প্রিয়। প্রায়ই স্কুল ফাকি দিয়ে এখানে আসে ও। আজা রয়াল গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে হাসান মেজদার চলে যাওয়া দেখছে। ওর ছোট্ট বুকের অনেক ভেতর থেকে কস্ট দলা পাকিয়ে উঠে আসছে। দুইচোখ বেয়ে রাজ্যের পানি। জামান বাড়ি ছেড়ে আসার আগে অনেকবার হাসানকে খুজেছে। কিন্ত কোথাও ওর এই ছোট ভাইএর দেখা পায়নি। ঘাট থেকে নৌকা ছাড়ার কিছু পরেই জামান দেখতে পেল রয়াল গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে রয়েছে হাসান। ওর দিকে তাকিয়ে একটু হাসল জামান। হাত নেড়ে বলল চিঠি দিস আমাকে। আমি ঢাকা যেয়েই তোকে চিঠি লিখব সব জানিয়ে। হাসান কোনো কথা বলতে পারল না। শুধু হাত নেড়ে গেল। আঠারবাকি নদীর মোট আঠারটা বাক, তাই এই নদীর নাম এরকম। গ্রাম ছেড়ে নৌকা যখন বাক ঘুরে গেল তখনও হাসান গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে। হয়ত আরো অনেক্ষন সে ওখানে থাকবে।
.................................... ৬-ই মে, ২০০৮
বিষন্ন চোখে দুরের কোনো গ্রামের দিকে তাকিয়ে থাকে সে বহুক্ষন । কখন বেলা গড়িয়ে দুপুর হয়ে এল ও’র খেয়াল নেই। কষ্টের একটা তীব্র স্রোত ওর শিরা উপশিরায় ছড়িয়ে রয়েছে । একসময় ধীর পায়ে হাসান বাড়ির দিকে হাটতে শুরু করে। এদিকে বাড়ির সবাই চিন্তায় অস্থীর হয়ে আছে । পথেই রাখাল এর সাথে দেখা, দক্ষিনপাড়ার পুল পাড়ের কাছে।
বাড়িতে ফিরে হাসান একদম চুপচাপ হয়ে গেল । রাতের একটা বিশেষ সময় বাবার পুকুর পাড়ে বসে থাকার ব্যাপারটা ও জানে আর তাই এটা ওকে খুব বিচলিত করে। বাবার যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে ওর জানা নাই ও কি করবে। দাদাতো আগেই ঢাকা চলে গেছে, এখন মেজদাও চলে গেল। বাবার মাথা প্রায়ই ঠিক থাকে না।
বিছানায় শুয়ে হাসান আদ্যপান্ত অনেক কিছুই ভাবে। বুকের অনেক ভেতর থেকে দলা পাকানো কিছু কষ্ট চতুর্ভজ চক্রের মতন বিলবিল করে মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে। জীবনে আগে কখনো হাসান এতটা বিষন্ন বোধ করেনি। নিজেকে ভীষন একা মনে হতে লাগে। হাসান অনেক ভেবেও বুঝে পায় না বাবার কিছু হলে ও একা কি করে সব সামলাবে । চাচা ওর বাবাকে যে নির্মমভাবে ঠকালো, তার পরতো আর তার কাছ থেকে কোনো সাহায্য পাওয়া যাবে না। ছোট্ট হাসান ভেবেই পায় না পৃথিবীটা কেন এত জটিল আর ভয়াবহ। কষ্টের বিশবাস্পে ভরা মনে সে আরো অনেক রাত জেগে থাকে । দক্ষিন দিকের বাশ ঝাড় থেকে ভেসে আসে শুধু শিয়াল এর করুন আকুতি গুলো ।
শীতের সকাল, ১৯৫৯ সাল । জানুয়ারী মাসের এই সময় বাড়িটা ভরে থাকত কিছুকাল আগেও । রসের পিঠা, তাজা সব্জির গরম ভাজি, তাওয়ায় সেকা গরম রুটি, ভাপউঠা গরম ভাত, ডিম ভাজি, মুড়ি, খেজুরের গুড় - সবই থাকত নাস্তার সময়। সকালে ঘুম থেকে উঠে সবাই লাইন দিয়ে পুকুর ঘাটে চলে যেত। বেশ ভাললাগত হাসান এর। গরম ভাত ঘি আর ডিম ভাজি দিয়ে খেতে কি যে অসম্ভব ভাললাগে হাসান এর। সব ভাইবোনদের নিয়ে একসাথে বসে খেতে ওর একরকম অপার্থীব আনন্দ হয়। যেদিন বাবা এসে ওদের সাথে বসেন, সেদিন হাসান এর ঈদ এর মতন খুশি লাগে। প্রতিদিন বাবা একটু আগেই খেয়ে নেন। তারপর কোথায় যে বাবা ঘুরে ঘুরে বেড়ান। একদিন হাসান বাবার পিছন নিয়েছিল দেখার জন্য। ওইদিন হাসান জানল বাবা হাটতে হাটতে অনেক দূর চলে যান, ওদের গ্রাম ছেড়ে বাবুডাঙ্গা, তারপর পুহরডাঙ্গা, তারপরও বাবা হাটতে থাকেন। তারপর একসময় মধুমতির কাছে চলে যান। ওখানে ঘাট থেকে অনেক দূরে একটা পড়ো ঘর আছে। একসময় ওখানে ঘাটের টোল তোলা হত। বাবা ওই ঘরটায় একা একা বসে বিষন্ন চোখে তাকিয়ে থাকেন পানির দিকে। হাসান এর ওইদিন বড্ড মায়া হল বাবার জন্য। হাসান বুঝতে পারে বাবার মন কতটা খারাপ থাকে। দালান বাড়ি থেকে চলে আসার পর থেকেই বাবার এই অবস্থা। দিনে এখানে আর রাতে বাড়ির পুকুর পারে বসে থাকেন। দিন দিন বাবার সাস্থ্য খুব খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
জামান ঢাকা চলে যাবার দুই বছর পরের ঘটনা। রান্নাঘরে খাবার ঢাকা থাকে, সকাল বেলায় যে যার মতন খেয়ে নেয়। হাসান এর পরে কালান সিকদার এর তিনটি মেয়ে বড় বউ এর ঘরে। রোজা, আফ্রো, জাকি। হাসান তার বোনগুলোকে খুব ভালবাসে। হাসান এর চেয়ে রোজা দুই বছর এর ছোট, তার আরো দু’বছর এর ছোট আফ্রো। ওদের সবার ছোট জাকি। এখন মাত্র ৬ বছর বয়স জাকির।
হাসান আর জাকি খেতে বসেছে। খেতে খেতে জাকি প্রশ্ন করে, আচ্ছা ছোটভাই, তোমার কি মেজভাই এর জন্য কান্না পায়?
জাকির ভারিক্কি চালে প্রশ্ন করা দেখে হাসান ফিক করে হেসে ফেলল। কিন্ত ওর ঠিক যা মনে হয় তাই বলল জাকিকে। বলতে বলতে হাসান এর চোখ হয়ত একটু ভেজা ভেজা হয়ে ওঠে। ছোট্ট জাকি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে ভাইএর দিকে। কিন্ত হাসান এর অনেক কথাই জাকি বুঝতে পারে না।
কিন্ত সে অবাক হয়ে ভাবে তার এই ভাইটা অন্যদের চেয়ে অন্যরকম। ওর শুধূ মনে হয় ছোট ভাই এর শরীর মায়ায় ভরা। খেলতে খেলতে ও যদি ব্যাথা পায়, ছোটভাই তখন অস্থির হয়ে ওঠে। বহুবার জাকি দেখেছে এই ব্যাপারটা। একবার ঝিনুক কেটে ওর পা কেটে গেল। গলগল করে রক্ত বের বেরিয়ে গেল বেশ অনেকটা। এইসময় বড়ভাইজান পাশ দিয়ে যাচ্ছিল আর ওর পায়ের রক্ত দেখে একটা থাপ্পর মেরে বলল সাবধানে খেলতে পারিস না! জাকির খুব কান্না পাচ্ছিল, যতটা না পা কাটার জন্য তারচেয়েও অনেক বেশি বড়ভাইজানের থাপ্পর এর জন্য। ও যখন খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাটছিল বাড়ির দিকে তখন ছোটভাই কোথা থেকে এসে ওকে কোলে তুলে নিল। তারপর অনেক যত্ন করে ওর পা পরিস্কার করে ওখানে কাপড় দিয়ে ব্যান্ডেজ বেধে দিল। জাকির তখন খুশিতে চোখে পানি চলে এল। জাকি আবার খাওয়ায় মন দেয়।
ইদানিং হাসান প্রায়ই জাকির সাথে বসে খায়। বাড়ির সবাই ক্যামন যেন হয়ে যাছে দিন দিন। হাসান বুঝতে পারে যে সবকিছু আর আগের মতন নেই। বড়দা আর মেজদা চলে যাবার পর থেকে বাবা আরো বেশি অসহায় বোধ করে। বাবার চোখের দিকে তাকালে হাসান স্পস্ট দেখতে পায় সেখানে কোনও এক অজানা ভয়। নাকি ওর চোখের ভুল? মাঝে মাঝে ও ভাবে এটা কি সে একাই দেখতে পায় নাকি মা কিংবা ছোটমা এরাও দেখতে পায়? মার কথা আলাদা, কারন হাসান জানে তিনি তার নিজস্ব গন্ডির বাইরের কোনো কিছু নিয়ে মাথা ঘামাননা। সারাদিন নামাজ আর নিজের গোসল খাওয়া এইসব নিয়েই তিনি ব্যাস্ত। মাঝে মাঝে অবশ্য শুধু বড়ভাই আর মেজভাই এর কথা জানতে চান, তাদের কোনো চিঠি এসেছে কিনা তা জানতে চান। সংসার এর ভবিষ্যত নিয়ে মা আদৌ কোনও কিছু ভাবেন কিনা তাতে হাসান এর যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
তবে হাসান খুব একটা অবাক হয় না তাতে। ছোটবেলা থেকেই ও জানে মা এমনই। আর এজন্যই বাবাকে আবার বিয়ে করতে হয় সংসারের হাল ঠিক রাখবার জন্য। তাতে অবশ্য সংসার নামের নৌকার এর হাল ঠিক হয়েছে নাকি ভার বেড়ে নৌকা তলিয়ে যাবার উপক্রম হয়েছে তা নিয়ে প্রায়ই হাসান একটা টানাপোড়েন এর মধ্যে ভোগে।
খাওয়া শেষ করে হাসান স্কুলে যাবার জন্য তৈরি হয়। বছরের এই সময় খাল মোটামুটি পানিশুন্য থাকে। কিন্ত কাদার জন্য দক্ষিনের পুল হয়ে যেতে হয়। এই পুলের গোড়া পেছনে রেখে একটু সামনে গেলেই আঠারবাকি নদির পাড় যেখানে বিশাল রয়াল গাছটা দাঁড়িয়ে। স্কুলে যাবার আগে প্রায়দিনই হাসান গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে থাকে অনেকসময়। এখান থেকে নদীর ঢেঊগুলো বেশ লাগে দেখতে। ওপারের সারিসারি বাবলা গাছগুলোর ছায়া যখন ঢেঊগুলোর উপর পড়ে তখন মনে হয় গাছগুলো একেবেকে ঢেঊএর উপর সওয়ার হয়ে চলছে। নদীর ঘোলা পানির উপর কালো ছায়াগুলো ভীষন অদ্ভুত লাগে দেখতে।
ওখান থেকে নেমে হাসান পা বাড়ায় স্কুলের দিকে। স্কুল বলতে লম্বা সারিসারি ঘর, মাথার উপর কটকটে দিনের চালা, মাটির মেঝে, কাঠের খুটি আর একটানা লম্বা বারান্দা আর সামনে একেবারে নদীরে পাড় পর্যন্ত মাঠ। এই মাঠের ধার ঘেষে নদীর পাড়ের দিকে প্রত্যেক সপ্তাহে দুইবার হাট হয়। হাটবার গুলো হাসান এর খুব ভাললাগে। কতরকম জিনিসযে হাটে আসে তা গুনে শেষ করা যাবে না। লাল-নীল রঙের প্যাচানো প্যাচানো গজা, ধবধবে সাদা বাতাসা, হাওয়াই মিঠা, ঝাল মুড়ি মাখা, বিট লবন দিয়ে মাখানো কাচা আমড়া – এ সবই হাসান খুব প্রিয়। এক সময় ছিল যখন হাসান বাবার সাথে হাটে যেত আর ওর এইসব প্রিয় খাবার খেয়ে নিত হাটের দিন। ভীষন মনে পড়ে হাসান এর সেইসব দিনগুলির কথা। বাজার শেষে যখন নৌকাভরে সব নিয়ে বাড়ির দিকে যেত তখন আরো অনেক রকম ভাললাগা ছিল। কাকা আর ওদের মিলিয়ে তখন অনেক বাজার হত। বাজার এর কাজ করার অনেক লোক থাকলেও বাবা এই কাজটা নিজে হাতে করত। বাজার করতে বাবা ভীষন পছন্দ করত আর হাসানও এই কাজটা ভীষন পছন্দ করে।
বাবার সাথে হাসান তার ভীষন কিছু মিল খুজে পায় আর তাই ইদানিং হাসান এর খুব ভয় হয়ত তার জীবনও বাবার মতন হবে। কোনো একসময় ভাইরা হয়ত ওর সাথে এমন করবে। হয়ত ওকে সারাজীবন এই গ্রামেই থাকতে হবে, জমির দেখাশুনা করার জন্য, মা আর বোনদের দিকে খেয়াল রাখার জন্য।
কিছুদিন আগে মেজদার একটা চিটি পেয়েছে হাসান, ওর নামেই লেখা ওটা। হাসান প্রথমে ভীষন খুশি হয়েছিল। দুইদিন চিঠিটা পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে। মেজভাই এর প্রতি কৃতজ্ঞতায় ওর মনটা ভরে উঠেছিল। কিন্ত চিঠিটা পড়বার পর ওটার সারমর্ম বুঝতে পেরে হাসান এর পায়ের নিচে ভুমিকম্প হয়ে যায়। এখনো চিঠিটার প্রতিটা লাইন হাসান এর হুবহু মনে আছে, আর মনে থাকবে না-ই বা কেন? এমন একটা চিঠি ভোলা যায় না। হাসান কারো সাথে এই চিঠির ব্যাপারে এখনো কথা বলেনি। কিন্ত ওর মন ঠিক সায় দিচ্ছে না ব্যাপারটা বাবার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতে। কারন হাসান জানে বাবার মানসিক অবস্থা এখন ক্যামন আর এই রকম একটা চিঠি বাবার হাতে পড়লে সর্বনাশ হতে আর কিছু বাকি থাকবে না। তাই হাসান এখনো সিদ্দান্ত নিতে পারছে না ওর ঠিক কি করা উচিত!
এই দুই বছরে মেজদা’র কাছ থেকে মাত্র দুইটা চিঠি পেয়েছে হাসান। প্রথম চিঠির বক্তব্য খুব বেশি কিছু ছিল-না। ঢাকায় যেয়ে কোথায় উঠেছে, কি করছে, এইসব লিখেছিল। সেখানে বাবা, মা, রোজা, আফ্রো, জাকি এদের কথা কিছুই লেখা ছিল না। ওরা ক্যামন আছে তা-ও জানতে চায়নি মেজদা। শুধে বড়দা ক্যমান আছে তা লিখেছিল। ওই চিঠিতেই হাসান জানতে পারে বড়দার পড়া প্রায় শেষের দিকে এবং একটা চাকরিও নাকি জোগাড় হয়ে আছে। তা-ও প্রায় দুইবছর আগের কথা কিন্ত এর মধ্যে বড়দার কাছ থেকে কোনো চিঠি সে পায়নি। বড়দা বাবাকে-ও কিছু জানায়নি তার চাকরির ব্যপারে। মনে মনে হাসান নিজেকে বহুবার প্রশ্ন করেছে কেন বড়দা বাড়িতে কাঊকা জানাচ্ছেনা তার চাকরির কথা? তাহলে কি এখনো চাকরিটা হয়নি?
............ চলবে
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই মে, ২০০৮ রাত ৯:৫৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



