somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অণুগল্প-১। হিসেব-কিতেব।

০৯ ই এপ্রিল, ২০০৮ রাত ৯:৫৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

"একাশি, বিরাশি, তেরাশি।"
এই নিয়ে ছয় বার গোণা হোল। প্রতিবারেই তিরাশি। তার মানে গোণার ভুল হয়নি।

টাকাটা পকেটে ভাল করে গুঁজে রাখেন নীলরতন সেনশর্মা। লোকে ডাকে নীলু মাস্টার। সাত বছর আগে রিটায়ার করলেও নামটি এখনো তার পিছু ছাড়েনি।

একশো টাকা পকেটে নিয়ে সন্ধ্যেবেলা বাজারে মনোজ সাঁপুইয়ের দোকানে ঢুকেছিলেন। কয়েকটা স্পোক কেনার জন্যে। সাইকেলটা ক'দিন ধরে টাল খাচ্ছে একদিকে। এখন মেরামত না করলে কখন আবার কি হয় কে জানে। স্পোকগুলোর দাম আট ন' টাকার বেশী হবে না। বাকী টাকা ছোট নোটে ফেরত দিয়েছিল মনোজ।
"বড় নোট নেই মাস্টারমশাই। টাকাগুলো ভাল করে গুনে নিন।"
"কি যে তুমি বলোনা মনোজ। তুমিতো গুনেছোই একবার। ওতেই হবে।"

এখন মনে হচ্ছে তখন গুণে নেওয়াই উচিত ছিল। নীলু মাস্টার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
বৌ সত্যবতী বলতো,"তুমি এতো বিশ্বাস করো কেন সবাইকে? সবাই তোমাকে ঠকাবে একদিন।"
"কি বলছো তুমি, সত্য? বিশ্বাস না করলে চলে? শরত্ চন্দ্র একবার লিখেছিলেন, অবিশ্বাস করিয়া জিতিবার চাইতে বিশ্বাস করিয়া হারাও ভাল।"
"তোমার কপালে তাহলে হারাই আছে।"

কথাটা কিন্তু সত্যবতী ঠিকই বলেছিল। আলাভোলা, বোকাসোকা মানুষ নীলু মাস্টারকে ঠকায়নি এমন লোক এ তল্লাটে নেই। বাপ-দাদার জমি ভাগের সময় দু বিঘে জমি কম পেলেন। কথা থাকলেও প্রমোশনটা শেষ পর্যন্ত আর মেলেনি তার। প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা তোলার সময় কিভাবে যেন একগাদা টাকা ওরা কেটে নিল। ছেলে সুবল বিয়ে করে আলাদা থাকছে, সবকিছু করছে ঠিকমতো, শুধু বাবাকে মাঝে মাঝে টাকাটাই পাঠানো হয়না তার।

আজ সত্যবতী থাকলে হেসে হেসে নিশ্চয়ই বলতো," এবার আমার কথা বিশ্বাস হয়েছে তোমার?"

মনোজের দোকান থেকে বেরিয়ে গিয়ে বসেছিলেন খলিলের চায়ের দোকানে। পুরনো ছাত্র খলিল, গেলেই যত্ন করে চা-সিংগাড়া খাওয়ায়। দু'দিনের বাসী খবরের কাগজটাও নাড়াচাড়া করা যায়।

সেখানে আজ দেখা হয়েছিল কলেজের প্রফেসর তিমির নন্দীর সাথে। আর এক পুরনো ছাত্র। ভালই জমেছিল আলাপ।
"বুঝলেন মাস্টারমশাই- একটা বই পড়ছি, ভারী অদ্ভুত কথা লিখেছেন ভদ্রলোক।"
"কি রকম?"
"ভদ্রলোক মনে হয় নাস্তিক, কিন্তু তার কথায় এক ধরণের অদৃষ্টবাদিতার সুর। তার মতে আমাদের যাবতীয় হিসেবকিতেব এই পৃথিবীতেই মিটিয়ে ফেলা হয়। যেমন ধরুন আপনি যদি কারো মনে দুঃখ দেন তাহলে কোন না কোন এক সময় তেমনি দুঃখ আপনাকেও পেতে হবে। উপকার করলে উপকার পাবেন। কোন কিছু হারালে তাতে দুঃখ করবেননা। সেগুলো সব জমা হচ্ছে কোথাও। এক সময় আবার ফেরত পাবেন। আমাদের প্রত্যেকেরই এ্যাকাউন্ট ঠিক ঠিক মিলিয়ে দেওয়া হবে একদিন। বুঝলেন না- আমাদেরকে ঠকানোর নতুন ফন্দী। আমরা যেন নালিশ না করি।"

বাজার থেকে বেরোতে রাত হয়ে গেল অনেকটা। তাতে কি? কেউ তো আর বাড়ীতে তার জন্যে বসে নেই। এক সময় বাড়ীতে ফিরলেই হোল।

শীত পড়বো পড়বো করছে। গায়ের চাদরটা ভাল করে জড়িয়ে সাইকেলে উঠে পড়েন তিনি।

ভালই কুয়াশা পড়েছে। চাঁদের আলোটি ম্লান। সাইকেল চালাতে চালাতে নীলু মাস্টার ভাবছিলেন তিমিরের বলা কথাগুলো।

সব হিসেব মিলে যাবে একদিন। বাহ-এমনটি হলে মন্দ হয়না। কত কিছু হারিয়েছেন এ জীবনে। মনে আছে পড়ার নাম করে কত লোকে তার বইগুলো নিয়ে গেছে, আর ফিরিয়ে দেয়নি। আবার ফিরে আসবে বইগুলো? আবার ফিরে পাবেন দু বিঘে জমি? মনোজের মেরে দেওয়া সাত টাকা? এ্যাসিসট্যান্ট হেডমাস্টারের চাকরি?

নীলু মাস্টারের ভাবতে ভালই লাগে। বিশ্বাস করেও তাহলে জেতা যায়? যা কিছু হারিয়েছেন সব জমা হচ্ছে কোন একখানে। একদিন সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো সবকিছুকে পায়ের কাছে নামিয়ে দেবে।

সব কিছূ? এমনকি সত্যবতীকেও?

বিয়ের পাঁচ বছর পর উত্তরপাড়ার নিখিলের সাথে চলে গিয়েছিল সত্যবতী। আর কোনদিন ফেরেনি।

তবে কি সেও ফিরে আসবে? আহা-ওই ঢলোঢলো সুন্দর মুখটি কতদিন দেখেননি তিনি।

একমুখ হাসি নিয়ে কুয়াশার মধ্যে সাইকেলের প্যাডেল মারেন নীলু মাস্টার। মনোজ সাঁপুই এর সাত টাকা মেরে দেওয়ার দুঃখ তিনি ভুলে গিয়েছেন ইতিমধ্যেই।

(ব্যস্ততার জন্য নতুন কিছু লেখা হচ্ছেনা বলে পুরনো জিনিস আবার চালিয়ে দিলাম।)
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই এপ্রিল, ২০০৮ রাত ১০:৫১
১৯টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×