"হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে জেগে ওঠা একগুচ্ছ দ্বীপমালার সমষ্টি। বই-পত্তর খুললে জানা যাবে যে এই দ্বীপপুঞ্জটি প্রায় ১৫০০ মাইল লম্বা, আর ঠিকমতো গুনলে দেখা যাবে যে ১৩২টি দ্বীপ নিয়ে তৈরী হয়েছে দ্বীপপুঞ্জটি। অবশ্য এর মধ্যে বেশীর ভাগই খুব ছোট আর সেগুলো জনবসতিশূন্য। আকার হিসেব করলে বড় দ্বীপ হচ্ছে আটটি। হাওয়াই, মাউই, ওয়াহু, কাওয়াই, মোলোকাই, লানাই, নিইহাউ আর কাহুলাভে।
দ্বীপপুঞ্জটির ম্যাপ দেখলে আরো একটা জিনিস চোখে পড়বে। গোটা দ্বীপপুঞ্জটি একটি সরলরেখার আকারে সৃষ্টি হয়েছে। এর কারণ হিসেবে বলা হয় যে দ্বীপপুঞ্জটি তৈরী হয়েছে আগ্নেয়গিরির লাভা জমে জমে। পানির মধ্যে আবার আগ্নেয়গিরি কোথা থেকে এলো? বিজ্ঞানীরা বলেন যে প্রশান্ত মহাসাগরের নীচের প্যাসিফিক টেকটোনিক প্লেটের 'হটস্পট' দিয়ে পৃথিবীর গভীর (ম্যান্টল্) থেকে উঠে আসা লাভা ক্রমান্নয়ে জমতে জমতে একসময় পানির উপরে মাথা তুলেছে। যেহেতু হটস্পটটি প্রতি বছর তিন ইঞ্চি করে পূবের দিকে সরছে, দ্বীপগুলো তাই একের পর এক সৃষ্টি হয়ে চলেছে পূবের দিকে।
এই থিওরী অনুযায়ী একদম পূবের হাওয়াই দ্বীপটি সবচেয়ে নতুন। বয়েস মাত্র সাড়ে চার লাখ বছর। এরও পূবে পানির নীচে চলছে নতুন দ্বীপ তৈরীর কাজকর্ম। সেখানে পানির নীচে লোইহি নামের আগ্নেয়গিরি অক্লান্ত ভাবে লাভা ঢেলে চলেছে, আস্তে আস্তে উঁচু হচ্ছে ভূমি। হয়তো আর লাখদুয়েক বছর পরে নতুন একটি দ্বীপ মাথা তুলবে পানির উপর।
হনলুলু শহরটি ওয়াহু দ্বীপে। এই দ্বীপটি আকারে মাঝারী আর এর অবস্থানও মাঝের দিকেই। কিন্তু গুরুত্বের দিক দিয়ে ওয়াহুর স্থান অনেক উঁচুতে। হাওয়াই অঙ্গরাজ্যের রাজধানী হনলুলু ব্যবসা-বাণিজ্যের দিকে দিয়েও গুরুত্বপূর্ণ। এখানেই রয়েছে বিশ্ববিখ্যাত ওয়াইকিকি সমুদ্র-সৈকতটি। স্টেটের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়টিও এখানে, এছাড়া নানান ধরণের ট্যুরিস্ট-প্রিয় জিনিসপত্রও এই দ্বীপেই।"
গাড়িতে করে যেতে যেতে শামস ভাইয়ের কথা শুনছি। এয়ারপোর্ট থেকে মাল-সামান নিয়ে বের হয়েছি একটু আগে। শামস ভাই শুধু আমাকেই আনতে যাননি, আমার সাথে ওই একই ফ্লাইটে আসা আরো তিনজন স্টুডেন্ট উঠেছে আমাদের সাথে এক গাড়ীতে। তাদের সাথে হাত মেলানো পর্ব শেষ হয়েছে একটু আগে।
প্রথম জন এসেছে ইন্ডিয়া থেকে। একটু সিরিয়াস টাইপের চেহারা। সে চিরাচরিত খটোমটো করে বললো, "মাই নেম ইজ অশোওয়াথথা নারায়ণ রাও মঞ্জুনাথ।"
ওরে বাব্বা! আমি নিজের নামটি মিন মিন করে বলে তারপর শুধোই, "তোমাকে কি আমি অশোওয়াথথা বলে ডাকবো?"
সে গম্ভীর ভাবে বললো, "নো। ওটা আমার বাবার নাম।"
আমি বেজায় ঘাবড়ে গিয়ে বলি, "সে কি? তুমি যে একটু আগে বললে তোমার নাম ওইটাই।"
"আমার নাম মঞ্জুনাথ। আমার বাড়ী কর্ণাটকে, আমাদের ওখানে লাস্ট নেমটাই একজনের আসল নাম। নামের প্রথম অংশটুকু আসে বাবার নাম থেকে।"
এই ব্যাখ্যায় একটু হলেও খুশী হলাম। অশোওয়াথথার চেয়ে মঞ্জুনাথ উচ্চারন করা সহজ।
পরের জন নিকষ কালো, নাদুশ-নুদুশ। সর্বক্ষণই মুখে হাসি। হাতটি জড়িয়ে ধরে বললো, "আই অ্যাম ফ্রম শ্রীলাংকা। আর আমার নাম হচ্ছে ------।"
তার নামটি ভয়াবহ রকমের দীর্ঘ এবং উচ্চারণের অযোগ্য। আমি হতাশ হয়ে পড়ি। এদের নাম মুখস্থ করতে করতেই তো দেখি আমার গোটা ছাত্রজীবন চলে যাবে।
ছেলেটি আমার অবস্থা দেখে হাসে। তারপর বললো, "বাট ফ্রেন্ডস কল মি তিসা। আমি এখানে এসেছি তুলনামূলক ধর্মশাস্ত্র পড়বার জন্যে।"
জানে পানি এলো আমার। "হ্যালো তিসা। তোমার সাথে পরিচিত হয়ে খুবই খুশী হলাম। তুমি কি কোন প্রিস্ট-ট্রিস্ট নাকি?"
তিসা আমার কথায় হাসে। "না-না, আমি কলম্বো বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টারী করি।"
তৃতীয় জন নেপালী। লম্বা-একহারা চেহারা, তিসার মতো এর মুখেও খুব ফ্রেন্ডলি একটা ভাব।
"আমি টি জে। পুরো নাম টি জে শ্রেষ্ঠা।"
"টি জে মানে কি ভাই?"
"আমার পুরো নাম হচ্ছে তিমিলা জুজু শ্রেষ্ঠা। টি জে হচ্ছে এর শর্টকাট।"
"আলোহা টি জে! আমি নির্বাসিত। ফ্রম বাংলাদেশ।"
দেশী ভাই বলে শামস ভাইয়ের পাশের সিটটি পেয়েছি গাড়ীতে। বাকী তিনজন পিছনের সিটে বসে গুনগুন করে কথা বলছে। শামস ভাই এসেছেন ইকোনমিক্স এ পিএইচডি করতে। তিনি আমাদেরকে একদম টুরিস্টগাইডের মতো করে বলছেন হাওয়াইয়ের ইতিহাস। সবকথা ঠিকমতো বুঝছিনা, সবকথা কানেও ঢুকছেনা। আমি দেখছি রোদে ঝলমল হনলুলুকে, তার ঝকঝকে নীল আকাশ আর আকাশের বুকে ভেসে বেড়ানো সাদা মেঘের গুচ্ছকে।
আগেই জেনেছি হনলুলু এয়ারপোর্ট বিশ্ববিদ্যালয় আট-নয় মাইল দূরে। সে হিসেবে পনেরো মিনিটের ড্রাইভ। চওড়া রাস্তা দিয়ে গাড়ী চলছে অনেকগুলো। যে যার লেইন দিয়েই যাচ্ছে, কেউ কারো পথে গাড়ীর নাক ঢুকাচ্ছে না। একটা জিনিস খেয়াল করলাম, যে রাস্তায় কোন ট্র্যাফিক লাইট নেই, এবং এই রাস্তাকে আর কোন রাস্তা ক্রস করছে না।
শামস ভাই বললেন,"এগুলোকে বলে ফ্রিওয়ে। এখানে ফ্রি ভাবে লোকে গাড়ী চালাতে পারে। কোন থামাথামি নেই।"
বাহ্-বেশ ভাল সিস্টেম তো!
আরো একটা জিনিস চোখে পড়লো। শামস ভাইয়ের গাড়ীতে (পুরনো ঢাউস আমেরিকান গাড়ী) কোন ক্লাচ নেই। তারমানে, কথায় কথায় গিয়ার নিয়ে টানাটানি করা নেই। গাড়ী চালাতে হলে একসিলেটর দাবাও, থামাতে হলে ব্রেক কষো। দেশ ছাড়ার আগে আমি একবার বাসার গাড়ীতে করে গাড়ী চালানোর প্রচেষ্টা চালিয়েছিলাম। সে এক করুন কাহিনী। অল্পের জন্যে আমি মানুষ-হত্যার দায় থেকে বেঁচে গিয়েছিলাম সেদিন। সে থেকেই ক্লাচ জিনিসটির প্রতি আমার ভয়ানক ভয়।
শামস ভাই বললেন, "এটা অটোমেটিক গাড়ী। গতি বাড়ার সাথে সাথে গিয়ার আপনা-আপনিই বদলে যায়। ড্রাইভারকে কোন কিছু করতে হয়না। এখানকার প্রায় সব গাড়ীই এরকম। মাঝে মাঝে দু একজনে শখ করে স্টিক-শিফট মানে ক্লাচ-ওয়ালা গাড়ী কেনে।"
মানুষের কত রকমের শখ! কষ্ট করে গাড়ী চালানোর কোন মানে হয়!
জানতাম হনলুলু পাহাড়ী জায়গা। রাস্তা থেকে দেখা যায় ছোটবড় কত পাহাড়। শামস ভাই বললেন, যে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসটিও একটি পাহাড়ের কোলে। পাহাড়টির নাম মানোয়া। সেই নামে ক্যাম্পাসটির নাম দেয়া হয়েছে, ইউনিভার্সিটি অফ হাওয়াই অ্যাট মানোয়া। মানোয়া পাহাড়ের কোলের মধ্যেই তাহলে কাটাতে হবে বেশ কিছুদিন।
চিরকাল ধরে সমতলে বেড়ে ওঠা এই আমার সামনে হনলুলুর পাহাড়গুলোকে সেই প্রথম দিন থেকেই ভাল লেগে গেল। সেই ভাল লাগা আজও অবধি আছে। পাহাড়ের মধ্যে থাকতে ভাল লাগে আমার। এখন যেখানে থাকি সে জায়গাটিকেও মোটামুটি পাহাড়ীই বলা যায়।
হনলুলুর রোদ এবারে মনে হয় একটু গায়ে লাগছে। শুনেছিলাম বিদেশ মানে ঠান্ডা জায়গা, ভারী ভারী ওভারকোট পরে চলাফেরা করতে হয়। এখানে তো দেখি ঠিক উলটো। গরমই লাগছে মনে হয়। সে কথা শুনে শামস ভাই হাসেন, "লোকে ঠান্ডার হাত থেকে বাঁচার জন্যে হনলুলু বেড়াতে আসে, আর তুমি জিজ্ঞেস করছ এখানে ওভারকোট পরতে হয় কিনা। এখানে সোয়েটারও লাগেনা।"
"বলেন কি? সোয়েটারও লাগবেনা? এমনকি শীতকালেও না?"
"শীতকাল? কিসের শীতকাল? সারা বছর জুড়েই তো একই রকম আবহাওয়া। গরম-শীত বলে কিছু নেই এখানে।"
তখন মনে পড়লো যে ছেলেবেলায় পড়েছিলাম, হাওয়াই হচ্ছে চিরবসন্তের দেশ।
সাথে সাথে আরো মনে পড়লো যে সুটকেশে আসবার সময়ে মা একটা হাতে বোনা সোয়েটার দিয়ে দিয়েছিলেন। সেটার বোধহয় আর প্রয়োজন হবেনা যতদিন এখানে থাকি।
ফ্রিওয়ে একটা বাঁক নিলো। হঠাৎ করেই দেখা দিল একটি বিশাল পাহাড়। মনে হয় কাছাকাছিই। পাহাড়টি দেখতে একটু অদ্ভুত। অন্যান্য পাহাড় যেমন উপরের দিকে সরু হয়ে গেছে এটি তেমন নয়। দেখে মনে হয় যেন উপরের অংশটুকুকে কেউ কেটে বাদ দিয়ে দিয়েছে।
"এই পাহাড়ের নাম কি শামস ভাই?"
"এটি হনলুলুর একটি বিশেষ ল্যান্ডমার্ক। নাম ডায়মন্ড হেড।"
"এর আকৃতিটা কেমন যেন অন্যরকম।"
"এটা একটা আগ্নেয়গিরি তাই এর উপরের অংশটুকু গায়েব হয়ে গিয়েছে।"
"আগ্নেয়গিরি? মানে ভলক্যানো? কি সর্বনাশের কথা! আমি তো জানতাম যে হনলুলু শহরে কোন ভলক্যানো নেই।"
শামস ভাই হেসে বলেন, "ভলক্যানো, তবে ডরম্যান্ট মানে সুপ্ত। কে জানে এতদিনে হয়তো মারাও যেতে পারে ব্যাটা। অতএব ভয় পাবার কোন কারণ নেই তোমার।"
বড় করে নিঃশ্বাস নেই একটা। যাক-বাবা, বাঁচা গেল। চোখের সামনে এই রকম একটা আগ্নেয়গিরি নিয়ে বেশীদিন থাকতে পারতাম না এখানে। দু দিনেই ভয়ে হার্ট অ্যাটাক হয়ে যেতো নির্ঘাত।
সাঁই করে গাড়ী ঘোরান শামস ভাই। উনি ফ্রিওয়ে থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন।
"আমরা অলমোস্ট এসে গেছি।"
তিন চারটে সিগন্যাল লাইট পেরিয়েই শামস ভাই আবার গাড়ী ঘোরান। এবার চোখের সামনে দেখা দেয় বিশাল আকৃতির আর একটা পাহাড়, তার নীচে সমতলভূমি।
"এটাই আমাদের ক্যাম্পাস। মানোয়া ক্যাম্পাস। পিছনের পাহাড়টির নামই মানোয়া পাহাড়।"
কেন জানিনে মানোয়া পাহাড়টিকে দেখে খুব ভাল লাগলো। গাঢ় সবুজ রং দেখে বোঝা যায় যে পাহাড়টিতে জীবন চলমান। ডায়মন্ড হেড দেখতে ছিল রুক্ষ, লালচে রঙ্গের। কেমন যেন রাগী রাগী ভাব। আর মানোয়াকে দেখে মনে হয় যেন স্নেহশীলা কোন মা। সন্তানের শিয়রে জেগে আছেন নিশিদিন।
গাড়ী এসে থামলো একটি উঁচু বিল্ডিং এর সামনে।
শামস ভাই বললেন,"এটাই আমাদের থাকবার জায়গা। নামো, আমরা এসে গেছি।"
ভবনটির সামনে সেটির নাম লেখা 'হালে মানোয়া'। পরে জেনেছি হাওয়াইয়ান ভাষায় 'হালে' শব্দটির অর্থ 'হাউস' বা 'রেসিডেন্স'। তার মানে 'হালে মানোয়া'র অর্থ হচ্ছে 'হাউস ওফ মানোয়া'। মানোয়া পাহাড়ের গৃহ।
হালে মানোয়ার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটি ছেলে। চেহারা-সুরত দেখে মনে হোল আমাদের দিককারই লোক হবে। তাকে দেখে শামস ভাই মুখ ঈষৎ বিকৃত করেন। বিড়বিড় করে বলেন, "ঠিকই দেখো এখানে এসে দাঁড়িয়ে আছে। এই শালার হাত থেকে কবে যে রক্ষা পাবো।"
আমরা গাড়ী থেকে বেরোই। দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটি হাত বাড়িয়ে দেয় করমর্দনের জন্যে।
"হ্যালো-ওয়েলকাম টু হনলুলু। আই অ্যাম নাদিম। নাদিম ফ্রম পাকিস্তান।"
(বাকী অংশ পরের পর্বে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

