(আগের অংশটুকুর জন্যে এখান থেকে পড়ে আসতে হবে)
নাদিমের বাড়ানো হাতে হাত মেলাই।
"থ্যাংক ইউ। আই অ্যাম ফ্রম বাংলাদেশ।"
নাদিম বাংলাদেশের কথা শুনে উল্লসিত হয়। পারলে প্রায় আমার ঘাড়ে হাত রাখে। "আরে ইয়ার। তুম তো মেরে ভাই হো। সালাম আলেকুম।"
সাত সমুদ্দুর তেরো নদী পার হয়ে একজন মুসলিম ভাইকে দেখে আমিও ভিতরে ভিতরে বেশ আনন্দবোধ করতে থাকি। "ওয়ালায়কুম আসসালাম।"
"তুমি কি জানো যে আমাদের এখানে একটা মসজিদ আছে?"
"আচ্ছা, তাই নাকি!"
নাদিম আরো কিছু বলতে উদ্যত হয়, কিন্তু শামস ভাই সামনে এগিয়ে আসেন। একটু কড়া স্বরে বলেন, "নাদিম, এইসব আলাপ পরে করলে হয়না? হি জাস্ট ল্যান্ডেড।"
নাদিম সেকথায় একটু থতোমতো খায়। "ইউ আর রাইট, শামস। আমি নাহয় পরে ওর সাথে কথা বলবো।"
শামস নীচু গলায় বললেন,"একদম কথা না বললেই খুশী হই।"
আমি মুখে কিছু না বললেও মনে মনে একটু অবাক হই। নাদিম ছেলেটিকে দেখেতো আমার কাছে ভালই লাগলো। নিজে থেকে এসে আমার সাথে আলাপ করলো, আমাকে জানালো যে এখানে একটি মসজিদ আছে (যদিও আমি খুব একটা নামাজ পড়িনা)। সে আমলে বাংলাদেশে বসে পাকিস্তানী বলতে আমরা পাকিস্তানে ক্রিকেট টীমকেই শুধু চিনতাম। সে টীমের তারকারা তখন বেশ জনপ্রিয় ছিল আমাদের মাঝে।
হ্যাঁ- একটা কথা সত্যি যে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানীরা আমাদের উপর অনেক নির্যাতন করেছে, কিন্তু তারা ছিল সৈন্য, তাদের কাজই ছিল মানুষ মারা। কিন্তু পাকিস্তানের সাধারণ মানুষেরা তো আর আমাদের মারেনি, আমি কেন খামাখা তাদের উপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবো?
পাকিস্তানী সাধারণ মানুষের সাথে আমার আগে কোনদিন চিন-পরিচয় হয়নি। তারাও নিশ্চয়ই আমার মতোনই একজন সুখ-দুঃখের মানুষ, তারাও আমাদের মতো একই ভাব হাসে, একই ভাবে কাঁদে। তাদের সাথে আমাদের বিরোধ কেন হবে। বর্বর সৈন্যরা যে কাজ করেছে, তার দায় আমি কেন নাদিমে নামের এই ছেলেটির উপর চাপাবো?
শামস ভাই বললেন,"মাল-সামান নামাও সবাই। হালে মানোয়ায় চেক-ইন করতে হবে।"
যদিও দীর্ঘদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থেকেছি, তারপরেও হালে মানোয়ায় ঢুকে থমকালাম। প্রথমেই দেখি হোটেলের মতো এক বিশাল কাউন্টারে বসে আছেন এক মহিলা। তাকে গিয়ে নাম-ধাম বলতে হোল। তিনি তখন উঠে গিয়ে ভেতর থেকে এক বিশাল ফাইল বার করে আনলেন, তার সাথে দুই সেট চাবি। তারপর একগাল হাসিতে মুখ ভরিয়ে বললেন,"ওয়েলকাম টু হালে মানোয়া। আশাকরি এখানে তোমার সময়টি আনন্দেই কাটবে।"
শামস ভাই বললেন,"তোমাকে দশতলায় রুম দিয়েছে।"
সাথের যাত্রীদেরকেও দশ তলাতেই জায়গা মিললো। শামস ভাই ব্যাখ্যা করলেন, "সাধারণতঃ সিঙ্গেল ছেলেদেরকে দশতলাতেই পাঠানো হয়।"
চাবি দিয়ে খুললাম মেইন দরজাটি। এরপর এলিভেটর নিয়ে উপরে উঠতে হবে। শামস ভাই বললেন,"চলো তোমাকে তোমার ঘর অবধি ছেড়ে দিয়ে আসি।"
এলিভেটরে ঢুকে দশতলার বোতাম চাপতে গিয়ে প্রথম ধাক্কা খেলাম। সেখানে মাত্র চারটে বোতাম, তিন, ছয়, নয় আর বারো। এ আবার কোনদেশী কারবার? এখন আমি দশতলায় যাবো কিভাবে? অসহায়ের মতো শামস ভাইয়ের দিকে তাকাই। তিনি দেখি খুব কষ্ট করে হাসি চাপবার চেষ্টা করছেন।
"ব্যাপার কি, শামস ভাই?"
শামস ভাই এবার হো হো করে হাসেন। "প্রতিবারই যখন কেউ প্রথমবারের মতো এই এলিভেটর ওঠে, সে তোমার মতোই এইভাবেই ঘাবড়ে যায়। তোমার চেহারাটা কেমন হয়, সেটা দেখবার জন্যই তোমার সাথে এলাম।"
"সে নাহয় হোল। কিন্তু এখন আমি দশতলায় যাবো কিভাবে?"
শামস ভাই এবারে ব্যাখ্যা করেন। "হালে মানোয়ার ডিজাইনটি একটু ভিন ধরণের। তিন, ছয়, নয় আর বারো তলায় কেউ থাকেনা। এই তলাগুলোতে রয়েছে নানা ধরনের কমন জিনিস। যেমন রান্নাঘর, লন্ড্রিরুম, টিভিরুম, আড্ডা-মারার লাউঞ্জ ইত্যাদি। এই তলাটি ব্যবহার করবে উপর তলা আর নীচ তলার লোকেরা। যেমন দোতলা আর চারতলার লোকেরা ব্যবহার করবে তিন তলাকে। পাঁচতলা আর সাততলার লোকেরা ব্যবহার করবে ছয়তলার কমন জিনিস। তুমি যেহেতু দশতলায় থাকবে, তোমাকে রান্না-বান্না করতে হবে নয়তলাতে গিয়ে।"
"রান্না করাতো অনেক পরের ব্যাপার। এখন বলেন, দশতলায় যাবো কিভাবে?"
"খুবই সহজ। এলিভেটরে করে নয়তলা অবধি যাবে। সেখান থেকে সিঁড়ি দিয়ে দশ তলায় উঠবে।"
ঘাম দিয়ে যেন জ্বর ছাড়লো। বাপরে-বাপ!
নয়তলায় এলিভেটর থামলো। আমি সুটকেস নিয়ে বেরোলাম। শামস ভাই আর বেরোলেন না। "তুমি এবার নিজেই তোমার ঘরে চলে যেতে পারবে। ঘর গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে একটু ফ্রেশ হও। তারপর নীচে নেমে এসো বিশ মিনিটের মধ্যে। তোমাকে নিয়ে কয়েকটা কুইক কাজ সারতে হবে। তারপর আমার সাথে তুমি লাঞ্চ খাবে।"
"কি কাজ?"
"সেটা দেখা হলেই বলবো। আমি তাহলে যাই।"
"কিন্তু আপনিই বা যাচ্ছেন কোথায়?"
"আমি আমার ঘরে যাই। সেই সকাল থেকে এয়ারপোর্টে ডিউটি মারছি।"
"আপনার ঘরও কি এখানেই নাকি?"
"হ্যাঁ-আমরা থাকি সবচেয়ে উপরের তেরতলায়। এরা বলে পেন্টহাউস।"
"আমরা মানে?"
"আমি আর তোমার ভাবী। সে কাজ করতে গেছে। লাঞ্চের সময় আসবে, তখন তোমার সাথে তার পরিচয় করিয়ে দেবো।"
সুটকেস টানতে টানতে সামনে এগোই। বিশাল লম্বা টানা বারান্দাতে মাঝে মাঝেই তীরচিহ্ন দিয়ে বিভিন্ন রুমনাম্বার লেখা আছে। সেটা দেখতে দেখতেই সামনে চলতে থাকি। এমন সময় নাকে এলো তীব্র গন্ধ। বুঝতে পারলাম, রান্নাঘর আসছে সামনে।
একটু পরেই দেখা গেল রান্নাঘরটিকে। বেশ বড়সড় লম্বাটে একটা ঘর। সামনে পিছনে দুটো দরজা থাকাতে এয়ার সার্কুলেশনের ভালই বন্দোবস্ত। দুপাশের দেয়াল ঘেঁষে সারিসারি বেশ কয়েকটা কুকিং রেঞ্জ। দুটো বোঁচা টাইপের লোক আর একজন বুঁচি মহিলা মহা সমারোহে কিছু একটা রান্নার চেষ্টায় ব্যস্ত। রান্নার পাত্র থেকে বেশ ধোঁয়া-টোয়া উড়ছে, এবং সেটিই ভয়াবহ রকমের গন্ধের উৎস। রান্নাঘরের অন্যকোণে দাঁড়িয়ে থাকা একজন দাড়িওয়ালা ককেশিয়ান মুখে একটা বেচারা-বেচারা ভাব নিয়ে অসহায়ের মতোন এদিক-সেদিক তাকাচ্ছে।
আমার এই দৃশ্য দেখে আতংকিত হওয়াই উচিত ছিল, কিন্তু কেন জানিনে আমার হাসি পেল। বাহ-রান্নাঘর জায়গাটা বেশ মজারই হবে বলে মনে হচ্ছে।
আমার ঘরে ওঠবার সিঁড়িটি রান্নাঘরের পাশ ঘেঁষেই। হাতে ব্যথা লাগলেও ভারী স্যুটকেশটি কোনমতে টেনেটুনে উপরে তুললাম।
চাবি দিয়ে দরজা খুলে ঘরে ঢুকেই আমার মনে এতক্ষণ ধরে জমে ওঠা একটি ভয় দূর হয়ে গেল। যেহেতু ঢাকার হলগুলোতে এক রুমে বেশ কয়েকজন মিলে থাকতে হোত, আমার মনে একটা আশংকা উঁকি দিচ্ছিল যে এখানেও আবার সেই ধরণের সিস্টেম কিনা। কে জানে হয়তো আমার রুমমেট হিসেবে কোন এক মদখোর রগচটা বিশালদেহী সামোয়ান এসে হাজির হোল, তখন কি হবে?
ঘরটি এক চিলতে ধরণের। একপাশে একটি সিংগেল বেড, জানালার দিকে রয়েছে পড়ার ডেস্ক আর চেয়ার। খুবই সাদাসিদে ঘরটি। বুঝলাম ঘরটিতে আমি একাই থাকবো। ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লো। যাক বাবা- মুশকো সামোয়ানের হাত থেকে যে রক্ষা পেয়েছি এতেই আমি খুশী।
জানালার পর্দা খুলতেই হনলুলু আমার সামনে দেখা দিল। সোজা তাকালেই দেখা যাচ্ছে মৃত আগ্নেয়গিরি ডায়মন্ড হেড। নীল আকাশের পটভূমিতে তাকে ভালই লাগছে এখন দেখতে। আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আরো অনেক বাড়িঘর। সুন্দর, খুব সুন্দর। এই ঘরটিতে বসে এমনি ভাবে বাইরের দিকে তাকিয়েই ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেওয়া যায়।
দেশ ছাড়বার আগে এক বিজ্ঞজন উপদেশ দিয়েছিলেন,"যেখানেই যাওনা কেন, প্রথমেই খেয়াল করবে যে বাথরুমটি কোথায়। কে জানে কখন প্রয়োজন পড়ে।"
সে আপ্তবাক্য স্মরণ পড়ায় ঘর থেকে বেরলাম বাথরুমের সন্ধানে। আর তা ছাড়া হাত মুখও ধোয়া দরকার।
বাথরুমটি কমন এবং আমার ঘরের কাছেই। দুটো করে সবকিছু সেখানে। সিংকে দাঁড়িয়ে হাতমুখ ধুচ্ছি, এমন সময় গোসল সেরে বেরিয়ে এক বিশাল দেহী আমেরিকান। কোমরে তোয়ালে জড়ানো, খালি গা। সে আমাকে দেখে একগাল হেসে তার হাতটি সামনে বাড়িয়ে দিল।
"হ্যালো-আমার নাম ব্রুস। আমি তোমার পাশের ঘরেই থাকি। কোনকিছুর দরকার পড়লে অবশ্যই আমাকে জানাবে।"
ব্রুসের হাসিটি দেখে মনটি আরো ভাল হয়ে গেল। সবাই কি দারুণ ফ্রেন্ডলি! এর মধ্যেই কত অপরিচিত লোকের সাথে পরিচয় হয়ে গেল।
নীচে নেমে দেখলাম শামস ভাই ইতিমধ্যেই এসে পড়েছেন। উনি একটা চেয়ারে বসে খবরের কাগজ জাতীয় কিছু একটা পড়ছিলেন। আমাকে দেখে উঠে দাঁড়ালেন, "চলো- তোমাকে কয়েকটা দরকারী জিনিস দেখিয়ে দেই।"
হালে মানোয়া থেকে বাইরে বেরোতেই আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো রোদের আলো। কিন্তু তার পরেও খুব বেশী গরম লাগলো না। ভারী সুন্দর একটা মৃদু হাওয়া বয়ে যাওয়ার কারণেই বোধহয়।
আমরা দুজন হাঁটতে হাঁটতে পাশেরই একটা বড় বিলডিং এ ঢুকলাম।
"এখানে প্রতিদিন না হলেও এক দু দিন পর পর আসতে হয় সবাইকে।"
"কেন?"
"আমাদের সবার মেইলবক্সগুলো এখানেই। তোমার নামে যদি কোন চিঠি আসে, তাহলে সেটা এই মেইলবক্সেই আসবে। আর তুমি নিশ্চয়ই আজকালের মধ্যেই দেশে চিঠি লিখবে, তাদেরকে তুমি অবশ্যই তোমার মেইলবক্স নাম্বারটি জানিয়ে দেবে।"
মেইলরুমে সারিসারি মেইলবক্স। মেইলরুমের কর্মচারীটি আমার মেইলবক্সের নাম্বার একটা কাগজে লিখে দিল। মেইলবক্সের তালাটি হচ্ছে কম্বিনেশন লক। উপরের ডায়ালটি একবার বা দিকে ঘোরাতে হয়, একবার ডানদিকে ঘোরাতে হয়। নির্দেশ মেনে বারকয়েক চেষ্টা করেও দেখি মেইল বক্স খোলেনা।
শামস ভাই হাসেন আমার দুরবস্থায়। "শোনো- এই মেইল বক্স খোলা রীতিমতো এলেমের ব্যাপার। আমরা কেউই তাই মেইলবক্সের তালা লাগাই না। একবার কষ্ট করে খুলতে পারলেই হোল।"
মিনিট বিশেক ধস্তাধস্তি করার পর তালাটির হূদয়ে বোধকরি মায়ার সঞ্চার হয়। তিনি এবার উন্মুক্ত হন। আমি বড় একটা নিঃশ্বাস নেই। এমন সিকিউরিটি তো বোধহয় হোয়াইট হাউসেও আছে কিনা সন্দেহ।
মেইলবক্সের ভিতরে একগাদা কাগজপত্র। আমি অবাক হই, আবার খুশী খুশীও লাগে। বাহ-এরাতো দেখি আমাকে একদম সাদর সম্বর্ধনা দিচ্ছে।
শামস ভাই আস্তে করে বলেন,"এবার তোমাকে একটা কাজের কথা বলি। আমেরিকাতে প্রায় প্রত্যেককেই প্রতিদিন একতাড়া করে অকাজের মেইল পায়। সেগুলোকে বলা হয় জাংক মেইল। দেখতে পাচ্ছি যে তুমিও বেশ কিছু জাংক মেইল পেয়েছো। এগুলো পড়বার কোন দরকার নেই, সোজা গার্বেজে ফেলে দেবে। এগুলো পড়তে গেলে তোমার হাতে আর কোন কিছু করার সময় থাকবে না।"
বলাই বাহুল্য- একথায় আমার খুশীর বেলুনটি চুপসে যায়। এগুলো সব জাংক মেইল? তা হোক। আমি ঘরে গিয়ে পড়বো।
মেইলরুম থেকে আবার বেরোলাম। মেইন রাস্তার উপরে দাঁড়িয়ে শামস ভাই আমাকে দূরের একটি বিলডিং দেখালেন। সেটি দেখতে একটু অন্যরকম। মনে হয় যেন একটা সূঁচালো হ্যাট পরে আছে।
"ওইটি হচ্ছে বায়োমেডিক্যাল বিলডিং। ওখানেই তোমার ডিপার্টমেন্ট। কাল-পরশু গিয়ে খোঁজ নিয়ে এসো যে রেজিসট্রেশন কবে করতে হবে আর কি কি কোর্স তুমি নিতে চাও। ব্যস্ত হবার কোন দরকার নেই, তোমার হাতে এখনো আট-দশ দিন সময় আছে। ক্লাস শুরু হবে আজ থেকে ঠিক এগারো দিন পর। তার আগে রেজিস্ট্রেশন করলেই হবে।"
শামস ভাইয়ের এই কথাতে আমার বুকের ভেতর আরো একটি বেলুন ফাটে। এতক্ষণ ধরে বেশ একটা ভ্যাকেশন মুডে ছিলাম। হাজার মাইল ধরে উড়ে আসা, তারপর স্বপ্নের দেশটিতে পা রাখা, নানান রকম মানুষের সাথে হাত মেলানো, সবই আমাকে একটা ভালোলাগায় ভরিয়ে রেখেছিল। এইবার আসল কথাটি মনে পড়লো।
আমি এখানে ফুর্তি করতে আসিনি। আমি এখানে পড়াশুনা করতে এসেছি। পড়াশুনা মানে হচ্ছে রাতের পর রাত নির্ঘুম চোখে বইয়ের পাতায় ডুবে থাকা, পরীক্ষার পর পরীক্ষা দেওয়া, গবেষণা করা, সেমিনারে লেকচার শোনা। তার উপর দেশে যেহেতু রেজাল্ট কিঞ্চিত্ উন্নত শ্রেণীর ছিল, অতএব এখানে ভাল রেজালট করতে হবে। তা না হলে মান-সম্মান নিয়ে টানাটানি।
তারপর আমার খাওয়া-দাওয়ারই বা কি হবে? ঢাকাতে নাহয় একশো গন্ডা খাবারের দোকান ছিল, এখানে তো মনে হচ্ছে নিজেকে রান্নাবান্নাটাও সামলাতে হবে। তারমানে হচ্ছে বাজার-ঘাটও আমাকেই করতে হবে। জিন্দেগীতে কোনদিন বাজারে যাইনি। এখানে দোকানদারেরা কেমন? তারা কি আমাকে বিদেশী পেয়ে ঠকিয়ে দেবে? আমিতো আবার দরদাম করাতে একদম অপটু। তার মানে কি আমাকে ঠকিয়ে দেবে তারা?
এই সব কথা চিন্তা করে আমার মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে। ভিতরে একটু কান্না কান্না ভাবও চলে আসে। আমার অবস্থা যে পুরো কেরাসিন, তা আমি হাড়ে হাড়ে বুঝতে থাকি।
শামস ভাই ঝট করে দাঁড়িয়ে পড়েন। "এবারে আমরা এখানে যাবো।"
সামনের বিল্ডিংটির গায়ে বড় বড় করে লেখা "মেডিক্যাল সেন্টার।"
আমি অবাক হই। "আপনার কি শরীর খারাপ নাকি, শামস ভাই? ছি ছি - আমাকে বলবেন তো সে কথা। এই রকম অসুস্থ শরীরে আবার আপনি আমার জন্যে রোদের মধ্যে ঘুরছেন। চলেন চলেন, তাড়াতাড়ি চলেন। দেখি ডাক্তার কি বলে।"
শামস ভাই আমার ব্যস্ততা দেখে হাসেন। "আমার শরীর ঠিকই আছে মাশাল্লাহ। এখানে এসেছি তোমার জন্যে।"
"কেন? আমার শরীরতো খারাপ হয়নি।"
"শরীর খারাপের জন্য আসিনি। এসেছি তোমাকে একটা ইঞ্জেকশন দেওয়াতে।"
আমি থমকে যাই। "ইঞ্জেকশন কেন? আমি তো দেশ থেকে টীকা-ফীকা নিয়েই এসেছি।"
"এটা হচ্ছে টিবি বা যক্ষ্মার একটা টেস্ট। আজকে তোমার হাতে একটা ইঞ্জেকশন দেবে, আর তুমি তিন দিন পর এসে ওদেরকে হাতটি দেখিয়ে যাবে যে ইঞ্জেকশনের জায়গাটি ফুলেছে কিনা। যদি না ফোলে বা অল্প ফোলে, তাহলে তুমি টিবি মুক্ত। আর যদি বেশী ফুলে যায়, তাহলে তুমি টিবি পজিটিভ। তখন তোমাকে গিয়ে চেস্ট এক্স-রে করতে হবে। এই টেস্টে পাশ না করলে তুমি রেজিস্ট্রেশন করতে পারবে না।"
"ইঞ্জেকশনটা কি আজকে না দিলেই নয়। আমি আগে থেকে জানলে তো আপনার সাথে আসতামই না।"
শামস ভাই মাথা দুলিয়ে বলেন,"একজ্যাক্টলি ওই কারণেই তোমাকে আমি ইঞ্জেকশনের কথাটা আগে বলিনি। নিতে যখন হবেই তখন আজই নিয়ে নাও। আমরা এটার নাম দিয়েছি আলোহা ইঞ্জেকশন। বাংলায় বলতে পারো স্বাগতিক ইঞ্জেকশন। চলো- এবার ভিতরে যাই। তাড়াতাড়ি কাজটা সেরে ফিরতে হবে। লাঞ্চ খেতে হবে না?"
আর লাঞ্চ? ইঞ্জেকশনের সূঁইয়ের খোঁচার কথা চিন্তা করে আমার খিদে-টিদে সব কোথায় উধাও হয়েছে ততক্ষণে। কিন্তু করার আর কিইবা আছে? পড়েছি মোগলের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে। পা ঘষটাতে ঘষটাতে আমি সামনে এগোই।
জাপানী চেহারার নার্স-জাতীয় মহিলা আমাকে দেখে যেন বড়ই আনন্দিত হয়। শামস ভাই পিছন থেকে বলেন,"ওর একটা টিবি টেস্ট করা দরকার।"
সেকথায় মহিলা যেন পুলকে গলে গলে পড়ে। আতংকে আমার বুকের ভেতর গুরগুর করা শুরু হয়ে যায়। কত মোটা সুঁই দিয়ে ইঞ্জেকশন দেবে আমাকে?
শেষ পর্যন্ত অবশ্য ইঞ্জেকশন জিনিসটা তেমন খারাপ ছিলনা। আমার সাথে কথা বলতে বলতে কোন ফাঁকে যে মহিলা সূঁই দাবিয়ে দিলো, তা ঠিক টের পেলাম না। ব্যথা যে একেবারে লাগেনি তা নয়, তবে ততক্ষণে আমি ভয়ে প্রায় আধমরা হওয়াতে বোধবুদ্ধিও বোধহয় কমে গিয়েছিল অনেক।
মেডিক্যাল সেন্টার থেকে বেরিয়ে শামস ভাই বললেন, "চলো এখন বরঞ্চ ফিরেই যাই। খিদে লাগছে। লাঞ্চের পর নাহয় আবার বেরোনো যাবে।"
শামস ভাইয়ের পিছন পিছন গেলাম বারোতলার কিচেনে। কিচেনের পাশের বারান্দায় অনেক গুলো টেবিল চেয়ার পাতা আছে। বুঝলাম এখানেই বসে সবাই তাদের খাবার খায়। কিন্তু এদের মধ্যে একটা টেবিলে বেশ সুন্দর করে একটা টেবিল ক্লথ পাতা। সেটা দেখেই শামস ভাই বললেন,"ও বোধহয় এসে গেছে।"
বারান্দার এক পাশে আর একটা জিনিস দেখেও খুব মজা লাগলো। সারি সারি অনেকগুলো রাইস কুকার।
রান্নাঘরের এক কোনায় খাবার গরম করছিলেন এক মহিলা। আমাদেরকে দেখে হাসলেন অল্প। আমি আদাব-সালাম দিয়ে একটা চেয়ারে বসলাম।
খেতে বসে আমিতো অবাক। শামস ভাই আর ভাবী মিলে বেশ কয়েকটা ডিশ রান্না করেছেন। দীর্ঘ জার্নির পর আমি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম বাঙ্গালী খাবার কি জিনিস। এখন পরিচিত খাবারগুলোকে দেখে প্রথমে মনটা আনন্দে ভরে গেল, তারপর চোখে পানি এলো এবং সবশেষ যেটা এলো সেটা হোল পেটভরা খিদে। মনে হোল কতযুগ ধরে আমি না খেয়ে আছি।
সার্টের হাতা গুটিয়ে আমি খাবারের মধ্যে ডুব দিলাম।
(বাকী অংশ পরের পর্বে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

