somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... "নির্বাসিতের আপনজন" বইটির ভূমিকা। কিভাবে এই বইটি লেখা হোল

মাঝে মাঝে আমাদের জীবনের একটি-দুটি মুহুর্ত আসে যেটির উপর ভর করে দেখা দেয় বিশাল কোন কিছু। তেমনি একটি দিন এসেছিল বছর দুয়েক আগে আমার জীবনে।
সামহোয়্যারইন নামের একটি বাংলা ব্লগসাইটে চোখ বুলাচ্ছিলাম কাজের ফাঁকে।
সেখানে ‘সর্বদা বেলায়েত’ নামের এক ব্লগারের পোস্ট চোখে পড়লো। তিনি লিখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে। লেখাটি পড়ে মনে পড়লো নিজের ছাত্রজীবনের কথা,মনে পড়লো বন্ধুদের কথা,মনে পড়লো শিক্ষকদের কথা। আনমনা হয়ে গিয়েছিলাম সেদিনের কথা ভাবতে ভাবতে। সামনে রাখা সাদা কাগজে আঁকিবুকি কাটতে কাটতে মনে হোল,আচ্ছা আমিও দু’কলম লিখে ফেলি না কেন? পরের মুহুর্তে আবার নিজেই হেসে ফেলেছিলাম। কেন লিখবো? কি লাভ? কে পড়বে? কেন পড়বে? আমি একজন আম-পাবলিক,আমার জীবনের কথা বা আমার আশপাশের মানুষের কথা শোনার সময় কোথায় অন্যলোকের?

পরক্ষণেই আর একটা চিন্তা মাথায় এলো। অনেক কিছুই আজকাল ভুলে যাচ্ছি। লিখে রাখলে জিনিসটা থাকলো। আমিই নিজেই না হয় একসময় পড়বো,যখন মাথার মধ্যে আর কোন কিছুই থাকবে না। বেভুল মানুষের মতই নিজের লেখা পড়ে হয়তো ভাববো,আহা কে এই মানুষটি?

সেই নিয়তেই 'নির্বাসিত' ছদ্মনামের আড়ালে বসে লেখা শুরু করলাম। ভেবেছিলাম টুকিটাকি কিছু স্মৃতিকে ধরে রাখি অল্প কিছু কথায়। কিন্তু লিখতে বসে দেখলাম অল্প কথায় সবার কাহিনী বলা যাচ্ছেনা। অগত্যা,কাহিনীর কলেবর বেড়ে গেল (যাকগে-আমাকে তো আর কাগজ-কালি কিনতে হচ্ছেনা)। কিন্তু ঝামেলা বাঁধলো অন্য জায়গায়।
খেয়াল করলাম যে কিছু কিছু ব্লগার আমার লেখালেখিকে তাদের নিয়মিত পড়ার তালিকায় রেখেছেন, এবং তারা আমাকে আরো উৎসাহ দিচ্ছেন আরো লেখার জন্য,এবং আরো দ্রুত লেখার জন্য। আমি এসেছিলাম মৃদুমন্দ পায়চারী করার গতিতে, তারা চাইলেন আমি যেন একই সাথে দ্রুত গতির স্প্রিন্টার এবং দীর্ঘ সময়ের ম্যারাথন রানার হই। এ আমি কিসের মধ্যে পড়লাম?

এনারা প্রথমে দিলেন উৎসাহ,পরে মৃদু অনুরোধ, তারপর দাবী,এবং এমনকি দু একজন আন্দোলন করবারও হুমকি দিয়েছিলেন। লেখা চাই,আরো লেখা চাই,আরো দ্রুত লেখা চাই।

আমি ঘুমের মধ্যে দুঃস্বপ্ন দেখা শুরু করলাম। বেশী বেশী টাইপ করার দরুন হাতের আঙ্গুলে ব্যথা করা শুরু করলো। যাই হোক-একদিন শেষ হোল সব কিছু। শেষ পর্বটি লিখে ফেললাম।

তারপর গোটা সিরিজটির দিকে তাকিয়ে তো আমার চোখ চড়কগাছ। এতগুলো পর্ব লিখে ফেলেছি আমি! কখন করলাম এত কিছু? আমি যে আলসে মানুষ,বাথরুমে টয়লেট পেপারের রোল বদলাতেই সাতদিন লাগে আমার। সেই আমি কিভাবে এতগুলো পর্ব লিখে ফেললাম? এটা নিশ্চয়ই কোন ষড়যন্ত্র, কেউ আমাকে দিয়ে কাজটি করিয়ে নিয়েছে।

কারা সেই দুর্বৃত্ত? কারা আমার অজ্ঞানতার সুযোগ নিয়ে আমাকে দিয়ে লিখিয়েছে এই সব? এরা হচ্ছেন মেহরাব শাহরিয়ার, ফারহান দাউদ, মুকুল, রাশেদ, বিবর্তনবাদী, অ্যামাটার, নরাধম, মোস্তফা মনির সৌরভ, ভাইটামিন বদি, মেন্টাল, লাল দরজা, রাগ ইমন, অলৌকিক হাসান, খোলাচিঠি, আলী, সাধারণ, বিহংগ, ৃৃমম, রাতুল, পজিটিভ, শফিউল আলম ইমন, মিরাজ, ফাহমিদুল হক, হাসিব,আবদুর রাজ্জাক শিপন, অমিত, আদনান, কালবেলা, না বলা কথা, নাদান, জ্বিনের বাদশা এবং আরো অনেক ব্লগার।

এদের কাউকেই চিনিনা আমি, অথচ তাদের ভালবাসা, উৎসাহ আর সমর্থন না থাকলে এই বইটিই লেখা হোত না।
এদের মত এত ভালবাসাময় মানুষ সমাজের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

যাকগে-লেখা যখন শেষ হোল, তখন দেখা দিল অন্য সমস্যা। বেশ কয়েকজনে আমার কানে একটি বই ছাপানোর কুমন্ত্রনা দেওয়া শুরু করলো। তার মধ্যে বন্ধু সৈয়দ ফারহাত আনোয়ার আর বন্ধুপত্নী নাজিয়া অন্যতম। কিন্তু সবচেয়ে বড় ক্ষ্যাপা হোল বন্ধু ইয়ারুল কবীর। তারই শ্রম,উৎসাহ আর অর্থানূকুল্যে ছাপা হোল বইটি।

এদের কাউকেই ধন্যবাদ দেবার সাহস নেই আমার। ঈশ্বর যে কেন আমাকে এতো শুভাকাঙ্খী দিয়েছেন এই জীবনে,সেটি আজও আমার কাছে একটি রহস্য হিসেবেই রয়ে গেল।

সেইসব আপনজনদের কথাই বলতে চেয়েছি এই বইটিতে।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/29103499 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/29103499 2010-02-22 23:28:03
"নির্বাসিতের আপনজন" সিরিজটি বই আকারে বেরিয়েছে।
বেশ কয়েকজনে তখন আমাকে সিরিজটিকে বই আকারে বের করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এরই মাঝে এগিয়ে এলো আমার এক পুরনো বন্ধু। তারই উৎসাহ এবং আর্থিক আনুকূল্যে অবশেষে বই হিসেবে বেরুলো সিরিজটি।

বইটির প্রকাশক পলল প্রকাশনী। বাংলা একাডেমীর বই মেলাতে তাদের স্টলে (স্টল নাম্বার ১৩৪) বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে বইটি। কারো যদি ইচ্ছে করে তাহলে সেখান থেকে কিনতে পারেন বইটি। সেখানে না পাওয়া গেলে বন্ধু প্রফেসর ইয়ারুল কবীরের সাথে যোগাযোগ (ফোনঃ ০১৭১০৩২৭৭১৬) করা যেতে পারে।

আশাকরি বইটি আপনাদের ভালো লাগবে।

ও ভালো কথা-বইটির লেখক হিসেবে আমি আমার "নির্বাসিত" নিকটি ব্যবহার করিনি। আমার পিতৃদত্ত নামটিই ব্যবহার করেছি (যেটি বই কিনলে জানতে পারবেন)।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/29101240 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/29101240 2010-02-19 22:34:53
ঘরে ফেরার ডায়েরী। শেষ পর্ব। স্থানঃ আমেরিকায় নিজ গৃহে। সময়ঃ ডিসেম্বর ১৩, গভীর রাত।

আগের একটি পর্বে লিখেছিলাম ‘তালগাছের আড়াই হাত’। লাইনটি লিখবার সময় বোধহয় ঈশ্বর মুচকি হেসেছিলেন, ‘আড়াই হাত কাহাকে বলে সেটা তোমাকে টের পাওয়াচ্ছি বাপধন।’

হংকং থেকে প্লেন ছাড়বার কথা ছিল বিকেল চারটেয়, সেটা ছাড়লো পাঁচটারও পরে। আমার গন্তব্য সানফ্রান্সিস্কো, সেখানে প্লেন বদলাতে হবে আমার শহরটিতে যাওয়ার জন্যে। তার জন্যে হাতে তিন ঘন্টা সময় রাখা ছিল, কিন্তু সেটা কমে এখন দাঁড়ালো দু ঘন্টায়।

আমি তাতে খুব বেশী দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হইনি। দুঘন্টায় প্লেন আগেও বদলেছি অনেকবার, ব্যাপার না।

পাইলট সাহেব অবশ্য বললেন যে পথে নাকি তিনি একটু টেনে প্লেন চালাবেন যাতে করে এই নষ্ট হওয়া ঘন্টার অন্ততঃ কিছুটা হলেও যেন উদ্ধার করা যায়। ভাল ভাল।

প্লেনের ভিতরে বসে অবশ্য প্লেন জোরে চলছে না আস্তে চলছে সেটা বোঝার কোন উপায় নেই। এতো আর গাড়ী না যে রাস্তার দুপাশের গাছপালার সরে যাওয়া দেখে গতি আন্দাজ করা যাবে। তার উপর বাইরে তখন অন্ধকার হয়ে আসছে।

সাধারণতঃ এজাতীয় ব্যাপার নিয়ে আমি খুব একটা দুশ্চিন্তাতাড়িত হইনা। প্রথমেই নিজেকে প্রশ্ন করি,‘এখানে কি আমার করবার মতো কিছু আছে?’ সে প্রশ্নের উত্তর যখন না-সূচক আসে, তখন গা এলিয়ে দেই। যা হবার হবে, তা নিয়ে খুব দুশ্চিন্তা করে লাভটাই বা কি?

অতএব আমি প্লেনে আমার কাজ-টাজেই ব্যস্ত থাকি। খাতা দেখি ঘাড় গুঁজে, সামনের ছোট পর্দায় ‘গেট স্মার্ট’ ছবিটি দেখতে হেসে উঠি (খুব বেশীবার না), আর তা না হলে ল্যাপটপে দু লাইন লিখবার চেষ্টা করি।

এর মধ্যেই পাইলট সাহেবের বাণী ভেসে আসে ইন্টারকমে। প্লেনের সামনে আজকে নাকি একট শক্তিশালী হেড-উইন্ড রয়েছে, এবং তাতে করে খুব বেশি জোরে প্লেন চালানো যাচ্ছেনা। ফল হিসেবে সানফ্রান্সিস্কোতে খুব বেশী আগে যাওয়া যাবে না।

আমি এ ঘোষণায় কান দেইনে তেমন। ওহি হোতা হ্যায়, যো মোনযুরে খোদা হোতা হ্যায়।

পূব দিকে উড়ছি বলে রাতটি বড় ছোট্ট। দেখতে দেখতে সূর্যদেব আবার দেখা দেন আকাশে। টুথব্রাশ হাতে লোকেরা বাথরুমের উদ্দেশ্যে হাঁটাহাঁটি শুরু করে দেয়। জুসের গেলাস হাতে দেখা দেয় বিমানসেবকেরা।

শেষমেশ ঘড়িতে যখন বেলা বারোটা (সানফ্রান্সিস্কো সময়) বাজে, তখন আবার ঘোষণা এলো যে আমরা প্যাসিফিক প্রায় পাড়ি দিয়ে ফেলেছি, এবং ঘন্টা খানেকের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাবো। ভাল, খুব ভালো।

আরও পয়তাল্লিশ মিনিট পর ঘোষণা এলো,‘সানফ্রান্সিস্কো বিমানবন্দর ঘন মেঘ এবং কুয়াশা দিয়ে ঢাকা, তাই কোন প্লেনই নামতে পারছেনা। আর দশটা অবতরনইচ্ছু প্লেনের মতোন আমরাও বিমানবন্দরের উপরে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আকাশ পরিষ্কার হলেই ঝুপ করে নেমে পড়বো।’

ঝুপ করে নেমে পড়ার আশায় আশায় কাটলো আরো মিনিট বিশেক। এর পর ঘোষণা আবারও,‘আমাদের প্লেনের জ্বালানী প্রায় শেষের দিকে। এইভাবে আমরা বেশীক্ষন উড়ে বেড়াতে পারবো না। তাই আমরা পাশের ওকল্যান্ড এয়ারপোর্টে নামছি, সেখানে তেল-টেল নিয়ে আবার আমরা ফিরে আসবো সান ফ্রান্সিস্কোতে। এবং তখন আমরা আর অনেকক্ষন ধরে আকাশে অপেক্ষা করতে পারবো।’

তাইই করা হোল। যাইহোক-শেষমেশ আমরা যখন সানফ্রানসিস্কোতে নামলাম, তখন ঘড়িতে বাজে তিনটে পনেরো। আমার কানেকটিং ফ্লাইটটি ততক্ষণে চলে গেছে। যাকগে-আমাকে তাহলে আর তাড়াহুড়া করতে হবে না।

ইমিগ্রশনের সামনে বেজায় লম্বা লাইন। সব সময়েই তাই হয়। আস্তে আস্তে কচ্ছপের গতিতে আমি এগোই। আমেরিকায় থাকবো, আর এই সব ঝামেলা সামলাবো না তা, কি করে হয়?

ইমিগ্রেশন অফিসারটি বেশ হাসিখুশি চেহারার। আমার সাথে বেশিক্ষন প্রশ্নোত্তর চালালেন না। হাতের ফর্মটিতে দ্রুত একটা সীল মেরে আমাকে চলে যেতে বললেন। যাক বাবা-পয়লা পুলসেরাত পার হ’লাম।

গেটের কাছে মুশকো চেহারা এক কালো আমেরিকান। সে আমার ফর্মটি দেখে হাত দিয়ে দেখালো হল ঘরের অন্যপ্রান্তকে। আমি ভ্যাবাচ্যাকা খাই।
‘কেনরে বাবা, আবার কি হোল?’
‘তুমি এখন ওই কোনার ঘরটিতে যাবে। সেখানে তোমাকে এবং তোমার কাগজপত্রকে আবার চেক করা হবে।’
‘কেন? একবারতো চেক করাই হোল? আবার চেক করার কি দরকার?’

কালু ভাই আমার কথার কোন উত্তর দেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেনা। সে শুধু নীরবে আবার কোণের ঘরটির দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়।

মনে মনে গজরাতে গজরাতে আমি হাতের মোটাসোটা ব্যাগটিকে টানতে টানতে রওনা দেই। শালার আমেরিকার গুষ্টি কিলাই!

ঘরটি ছোট, কিন্তু লোকে পরিপূর্ণ। সবদেশীয় লোকই এখানে আছে। ভারতীয়, চৈনিক, জাপানী, সাদা, মেক্সিকান। প্রথমে আমার একটা ধারণা হয়েছিল যে মুসলিম নামের কারণেই আমাকে দ্বিতীয়বার চেক করা হবে।

কিন্তু এঘরে এসে বুঝলাম যে আসলে ব্যাপারটি বোধহয় তা নয়। ওরা বোধহয় গোটা যাত্রীদের মাঝখান থেকে কিছু লোককে তুলে এনেছে। আমাদের সবার মধ্যে কোন জিনিসটি সমস্যার ছিল, তা জানিনে। হয়তো কিছুই ছিলনা।

হাতের কাগজপত্র জমা দিয়ে বসে আছি চুপচাপ। জ্ঞানী মানুষেরা বলেন যে আমেরিকাতে চুপচাপ থাকাটাই ভাল, খামাখা গ্যাঞ্জাম করে এনাদের বিরক্ত করে কোন লাভ নেই।

কিছুক্ষণ পরে খেয়াল করলাম যে কোন কিছু ঘটছেনা, সবাই চুপচাপ বসে আছে। একটি ভারতীয় দম্পতির বাচ্চাটি কান্না জুড়ে দিল, কিছুক্ষণ পরে তাতে যোগ দিল একটি জাপানী শিশু। সবাই একটু উসখুস করছে। কিন্তু কেউ কোন উচ্চবাচ্য করছে না। ঘহরের এক কোণায় বড় বড় করে লেখা ‘হোমল্যান্ড সিকিউরিটি’। বাবারে-বাবা, ওদেরকে ঘাঁটাবে কে?

একসময় একটি সাদা ভদ্রলোক উঠে দাঁড়ালেন। বোধহয় তার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে ততক্ষণে। কাউন্টারের পুলিশী পোষাক পরে থাকা লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন যে এত দেরী হবার কারণটি। তার কথা শুনে মনে হোল ভদ্রলোক ইউরোপীয় বংশউদ্ভুত।

কাউন্টারের লোকটি একটু আমতা আমতা করে জবাব দিল,‘আমাদের কম্পিউটরটি বর্তমানে ডাউন আছে। তাই আমরা কিছু করতে পারছিনা।’
‘তো তোমাদের ব্যাকআপ সিস্টেমটা ইউজ করছো না কেন?’
সে তখন আরো আমতা আমতা করে বললো,‘আমাদের আসলে কোন ব্যাক আপ সিষ্টেম নেই।’
সাদা ভদ্রলোক রাগে গরগর করে ওঠেন,‘হোয়াট? এত পয়সা খরচ করে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্ট খোলা হোল, এখন তাতে কোন ব্যাক আপ সিস্টেম নেই। এইই হচ্ছে আমাদের সিকিউরিটি সিস্টেম?’

কাউন্টারের লোকটি ম্লান হাসে শুধু।

আমি এসব কথায় খুব একটা কান দেইনা। ওহি হোতা হ্যায়, যো মনযুরে খোদা হোতা হ্যায়!

ঘন্টা দুয়েক পরে আমার ডাক আসে। গুটিগুটি পায়ে গেলাম কাউন্টারে। কি অপরাধ আমার?
কিছুই না, নীরবে আমার পাসপোর্ট আর অন্যান্য কাগজপত্র আমার হাতে তুলে দেওয়া হোল। ‘ওয়েলকাম টু দ্য ইউ এস এ।’
ওয়েলকামের গুষ্টি কিলাই!

ব্যাস-এখানেই গল্প শেষ! তারপর ঘরে ফিরেছি অনেক রাতে। সবাই দেখি জেগে আছে আমার জন্যে। হাতের মাল-সামান নামিয়ে আমি সোফায় গা এলিয়ে দেই। ওফ- গত কয়দিন যা গেলো আমার উপর দিয়ে।

এখনো জেটল্যাগ কাটেনি। ঘুমুচ্ছি অসময়ে, জেগে উঠছি গভীর রাতে।

এখন আমাদের এখানে রাত দেড়টা বাজে। বাইরে বরফ পড়ছে ঝুরঝুর করে। রেডিওতে বলছে তাপমাত্রা শূন্যের নীচে নেমে যাবে আজকে রাতে। কাল সকালে খুব দরকার না পড়লে রাস্তায় যেন না বেরুই।

ভাগ্য ভাল কাল রবিবার। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28882271 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28882271 2008-12-14 15:43:54
ঘরে ফেরার ডায়েরী। পর্ব-৭। স্থানঃ প্লেনের ভিতর, প্যাসিফিকের উপরে কোথাও। সময়ঃ এইতো পড়লাম ঝামেলায়, বাইরে রাত এটুকুই শুধু জানি।

প্রায় আড়াই ঘন্টা হয়েছে আমরা উড়ছি। এর মধ্যে একপ্রস্থ খাওয়া হয়ে গিয়েছে। এবারের খাবারটি তেমনটি সুবিধের ছিলনা, কিন্তু কি আর করা? প্লেনের ভিতর যা দেয় তাইই বিনা প্রশ্নে খেয়ে নেওয়া উচিৎ। তবে আমি একেবারে নিরস্ত্র নই। সাথের হাতব্যাগে এক প্যাকেট বোম্বে চানাচুর আছে। যদি অবস্থা খারাপ হয়, সেটাই খেয়ে নেবো।

যাত্রা শুরুর আগে এক বন্ধু উপদেশ দিয়েছিল যাওয়ার আগের রাতে না ঘুমোতে। তাহলে নাকি প্লেনের ভিতর ঘুমটা ভাল হয়। সেই উপদেশ মেনে গোটা পথটিই ঘুমোতে ঘুমোতে এসেছিলাম। এখন ফেরার সময়ে নিয়েছি ভিন্ন তরিকা। যেহেতু প্রতিবারেই আমেরিকায় ফিরবার পরে কমপক্ষে সাতদিন জেটল্যাগের ধকল থাকে, এবারে চিন্তা করেছি যে প্লেনে একদম ঘুমোবো না। দেখি কি হয়। দেখি এভাবে জেটল্যাগের ঝামেলাকে পোষ মানানো যায় কিনা।

প্ল্যান ছিল খাতা দেখার। কিন্তু সেটা করতে ইচ্ছে করছে না। ভাবছি একটু লিখি। আজকাল লিখবার সময় তো একদমই বলতে গেলে পাইনে। যদিও এই লেখাও লেখাও যা, না লেখাও তাই। লিখেও আমার কোন খ্যাতিবৃদ্ধি হচ্ছে না, আর পড়েও পাঠকের কোন বিশেষ জ্ঞানবৃদ্ধি হচ্ছেনা। সময় নষ্ট দু দিকেই। তবে ঘুমকে এড়ানোর জন্যে কিছু একটাতো করা দরকার। তাইই এই কী-বোর্ডের ঠকঠকানী।

প্লেনটি বোয়িং ৭৪৭ সিরিজের, কিন্তু এখানে একটি নতুন জিনিস খেয়াল করলাম। প্রতিটি আসনের সাথে ইলেক্ট্রিক আউটলেট আছে। অতএব ব্যাটারী পাওয়ার ফুরিয়ে গেলেও ভয় নেই। সেটাও একটা কারণ যে নির্ভয়ে লিখছি।

বাঙ্গালী চিরটা কাল মালপত্র বইতে বইতে জীবন কাটিয়ে দিল। আমাদেরও একই অবস্থা হয় প্রতিবার। কিন্তু এবারে যেহেতু আমি একা, তাও শতচেষ্টা করেও মালপত্রের পরিমানটি কমাতে পারলাম না। আসবার সময়ে স্ত্রী একটি লিস্টতো ধরিয়ে দিয়েছিলই, তার উপর নানান জনে আরো জিনিস গছিয়েছে। পারলে গোটা বাংলাদেশটিকেই উঠিয়ে আনতাম।

হাতের ব্যাগে রয়েছে নানান ধরনের জিনিস। আছে ইলেক্ট্রিক তানপুরা, আছে চার রকমের মিস্টি, আছে খুব ভাল কোয়ালিটির চার কেজি খেজুরের গুড়। এর সাথে আছে ল্যাপটপ, আছে পরীক্ষার খাতা, আছে মেয়েটির জন্যে তার নানীর দেওয়া হাতের ব্রেসলেট। চানাচুরের কথা তো বলেছিই। এখানেই শেষ নয়, আছে ক্যামেরা, আছে ওষুধপত্র। বলাই বাহুল্য, এদের ভারে আমার কাঁধ আর হাত দুটো প্রায় ছিঁড়ে যাবার জোগাড়।

এবারে একটু দেশের কথা বলি। চলে আসার ঠিক আগের দিনে সন্ধ্যেবেলা হীরা সাহেব ফোন দিলেন। ‘কিরে তোর কি অবস্থা?’
‘বিদেশযাত্রার আগের রাতে অবস্থা যেমন হয় তেমন। করুণ।’
‘শোন, তোর সাথে একটু দেখা করা দরকার। কখন সময় হবে তোর?’
‘আমার সময় তো নেই বললেই চলে। কি দরকার বল।’
‘কালকে তুই সাজিয়ার বই নেবার কথা বলেছিলি। সে কখানা বই আমার হাতে দিয়ে বলেছে যে এগুলো যেন তোর হাতে পৌছে দেওয়া হয়। আমার সন্ধ্যেবেলা ক্লাশ আছে, রাত ন’টায় সেটা শেষ হবে। তার পর তোর ওখানে আসি? তুই তো আর আসতে পারবিনে।’
‘শুধু বই দেবার জন্যে এতটা পথ আসবি? তারচেয়ে এক কাজ কর, ড্রাইভারকে দিয়ে পাঠিয়ে দে। আমি না থাকলেও পরে পেয়ে যাবো।’
‘না আমিই আসবো। সাড়ে ন’টার দিকে আসি?’
‘তুই আসার জন্যে এত বায়না ধরছিস কেন? বইটা ড্রাইভারকে দিয়ে পাঠিয়ে দে। খামাখা রাত-বিরেতে ঝামেলা করিস না।’

কিছুক্ষণ চুপ করে হীরা বললো,‘তোর সাথে বসে সেদিন ভাল করে গল্প করা হয়নি। আরো কথা বলতে ইচ্ছে করছে। তোর যদি অসুবিধে থাকে তাহলে অবশ্য অন্য কথা।’

কথাটি মাথার ভিতরে আঘাত করে। শেষ কবে কেউ এত আগ্রহ করে শুধু আমার সাথে কথা বলতে চেয়েছে, তা মনে পড়েনা। আমরা সবাই ব্যস্ত, কিন্তু শত ব্যস্ততার মাঝেও একজন অতিব্যস্ত মানুষ তার ক্লান্তিময় দিনের শেষে এতটা পথ আসবে শুধু আমার সাথে দু দন্ড সময় কাটাবার জন্যে।

সুটকেস গোছাতে গোছাতে ফোনে কথা বলছিলাম। আমি উঠে দাঁড়াই সুটকেস ফেলে। জাহান্নমে যাক কাজ, জাহান্নমে যাক বাক্স-প্যাঁটরা বাঁধা।
হীরাকে বললাম,‘তুই আয়। যখন খুশী। আমারও তোরা সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে।’

রাত দশটায় বেশীর ভাগ দোকানপাটই বন্ধ হয়ে যায়। বোধহয় ঈদ কাছাকাছি বলে কিছু দোকান খোলা। একটি কফিশপে গিয়ে বসি আমরা। কি এমন জরূরী কথা ছিল আমাদের। কিছুই না। সেই পুরনো দিনের একই কথা। বুঝি বয়েস বাড়ছে আমাদের। স্মৃতিতে আজকাল অনেককিছুই আর ভালকরে ধরা দেয়না। দুজনে দুজনের শূন্যস্থান পূরণ করে চলি ক্রমাগত। মনের ভিতরে খাপছাড়া গল্পগুলো পূর্ণতা পায় অবশেষে।

গল্প করতে করতে যখন উঁচু গলায় হেসে উঠি, তখন নিজেই অবাক হয়ে যাই। শেষবার এমনভাবে হেসেছিলাম কবে? মনে নেই।

এরই মাঝে সাজিয়া ফোন করলো একবার। ‘অ্যাল কাপোন ভাই-আপনার লেখাগুলো পড়েছি। এতসব গল্প বানালেন কিভাবে?’
‘আমি কোথায় গল্প বানালাম সাজিয়া? আর ওগুলো যে আমার লেখা তাইই বা তোমাকে কে বললো? ওগুলো লিখেছেন নির্বাসিত নামের একজন। সে আমি নই। আর তাছাড়া গল্প বানাবে তো তুমি। তুমি হচ্ছো গিয়ে বোনাফায়েড রাইটার।’
‘বাজে কথা বাদ দেন। এবারে আমাদের বাসায় এলেন না। আপনার সাথে দেখা হোলনা।’
’পরের বার সাজিয়া, পরের বার।’

এবারে বাংলাদেশে একটা জিনিসের অভাব বোধ করেছি নিয়মিত। তা হচ্ছে ভাল ব্রডব্যান্ডের অভাব। সব জায়গাতেই একই অবস্থা। এই কারণে আর ইন্টারনেটে যেতেও ইচ্ছে হয়নি খুব একটা। তবে ভাল হাইস্পীড ইন্টারনেট পেয়েছিলাম হোটেল শেরাটনে। সেখানে ব্রাউজিং করাটাকে উপভোগ করেছি রীতিমতো। তার মানে হচ্ছে যে সিস্টেমটি আছে, শুধু সবখানে পাওয়া যায় না।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28880158 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28880158 2008-12-08 18:19:35
ঘরে ফেরার ডায়েরী। পর্ব-৬। স্থানঃ হংকং এয়ারপোর্ট সময়ঃ ডিসেম্বর ৭, দুপুর দুটো।

রিকশা থেকে আই বি এ র সামনে নামতেই হইহই করে হীরা এগিয়ে এলো।
‘এটা তোর আসবার সময় হোল? আসবার কথা ছিল দশটায়, আর এখন বাজে প্রায় এগারোটা। সাড়ে বারোটায় আমার একটা মিটিং আছে।’
আচানক এমন তরো আক্রমনে আমি ঘাবড়ে যাই। কালকে কথা হয়েছিল, যে সকালের দিকে আমরা ক’জন হীরার ওখানে যাবো, তারপর কিঞ্চিত গল্প-গুজব হবে। ঢাকার অতিস্বল্প অবস্থানের ফলে হাতে আমার সময় এমনিতেই কম, তার উপর ঢাকার ট্র্যাফিক জ্যামের কথা ভুক্তভোগীরা তো জানেনই।
নাহয় আমার একটু দেরী হোলই বা। তাই বলে মিটিং এর কথা বলে আমাকে শাসানো!
‘কি সবাই কি এসে গেছে নাকি?’
‘আর কে কে আসবে তা নিয়ে তো আমি মাথা ঘামাচ্ছি না। আমি সেই সাড়ে নয়টা থেকে তোর জন্যে বসে আছি। কতকাল তোর সাথে বসে কথা বলা হয়নি।’
‘আমার আর নতুন কথা কি? সেই পুরনো কাসুন্দী, একই চাকরি, একই সংসার, একই রকম সবকিছু।’
‘চল আমার অফিসে চল। সেখানে গিয়ে তোকে ধোলাই দেবো।’

হীরা সাহেব এখন একটা নতুন প্রোগ্রামের কর্ণধার। চারতলাতে অফিস। কিন্তু সেখানে আমরা ঢুকলাম না।
‘চল, আমার বিশ্রামের ঘরে গিয়ে বসি।’
‘তোর আবার বিশ্রামের ঘর আছে নাকি?’
‘আছে আছে, আরো অনেক কিছুর ঘরই আছে হে।’
‘শালা বিহারী, তোকে সেই একাত্তর সালেই ঝেঁটিয়ে বার করা দরকার ছিল।’
হীরা হাসে।

কিছুক্ষন পরে আরো কয়েকজনে জমায়েত হয়। সিংগাপুর থেকে আসা ইফতিখার, শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের আমলা সজীব, কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টারী করা কবীর আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোয়ার। তারা গোল হয়ে আমাকে ঘিরে ধরে।
‘তোর আজকে খবর আছে। ডুবে ডুবে পানি খাও, না?’
‘আমি আবার কি করলাম?’
‘ও-তুমি এখন ভাজা মাছটাও উলটে খেতে পারোনা, তাই না?’
‘ভাইরে-আমি মাছই খাইনে। বিশ্বাস না হয়, আমার বৌকে জিজ্ঞেস কর।’
হীরা গম্ভীর গলায় বলে,‘চুপ করে বস। আমাদের কাছে পাকা খবর আছে। তুই আগড়ম বাগড়ম বকলেও কোন লাভ নেই।’
‘আরে ভাই-ব্যাপারটা কি তাইই তো এখনো পর্যন্ত জানলাম না।’
‘শোন, তুই নাকি ইন্টারনেটে কি কি সব লিখে বেড়াচ্ছিস আমাদের নামে?’
আমি আচানক বিষম খাই। কাশতে কাশতে বলি, ‘কি সব বাজে বকছিস? আমি আবার লিখলাম কোথায়?’
‘তুমি নিজেকে বড় চালাক ভাবো, তাই না? ভেবেছ নিজের নাম, আর আমাদের নাম বদলে দিলেই কেউ আর কোনকিছু টের পাবেনা।’
বুঝলাম অস্বীকার করে তেমন কোন লাভ নেই, বরঞ্চ চোট দেখানোই ভাল।
বুক ফুলিয়ে বললাম,‘হ্যাঁ লিখেছি তো কি হয়েছে। লেখকের স্বাধীনতায় তোরা হস্তক্ষেপ করবি নাকি? আমি আমার যা ইচ্ছে তাই লিখবো। তোদের আসল নামতো আর ব্যবহার করিনি। তোদের সমস্যা কোথায়?’
‘সমস্যা এখনো হয়নি, কিন্তু হ’তে কতক্ষণ?’
‘কি সমস্যা?’
‘মানলাম তুই এখনো পর্যন্ত আমাদের নামে খারাপ কিছু লিখিসনি, কিন্তু লিখতে কতক্ষণ? কোথায় কি কি অপকর্ম করেছি, তা তো তোর সবই জানা। কি লিখতে আবার কি লিখে দিবি, তখন হবে মহা ঝামেলা।’
আমি এবারে হাসি। ‘আরে সেটাই তো আমার প্ল্যান। লোকে লিখে পয়সা কামায়, আর আমি না লিখে কামাবো।’
‘তার মানে?’
‘মানে হচ্ছে এই যে তোরা তোদের কথা না লেখার জন্যে আমাকে পয়সা দিবি। খুবই সাধারণ ব্যাপার।’
‘আমাদের প্ল্যান হচ্ছে আমাদের নামে কোনকিছু আজেবাজে লিখলে আমরা তোকে ধোলাই দেবো। এটাও খুব সাধারণ ব্যাপার।’

আমি আর কথা বাড়াইনে। এই বয়সে ধোলাই খাওয়াটা পোষাবে না।

দুপুরে জম্পেশ খাওয়া হোল। আই বি এ র চারতলাতে একটি চমৎকার ঘর আছে, চারদিকে কাঁচ দিয়ে ঘেরা। পাশের গাছটি যখন বাতাসে দুলে ওঠে, তখন দৃষ্টিবিভ্রম হয়। মনে হয় যেন আমরাই দুলছি।

খাওয়ার পর হীরা চুপিচুপি একটা খবর দিল। ‘তোকে বলা হয়নি, সাজিয়ার কয়েকটা বই বার হয়েছে।’ সাজিয়া হীরার স্ত্রী।
’বলিস কি? এতো দারুন খবর। এতক্ষণ চেপে ছিলি উল্লুক!’
‘বাচ্চাদের বই দোস্ত।’
‘বইয়ের আবার বাচ্চা-বুড়ো কি? বইগুলো কিনতে চাই।’
‘ঠিক আছে, সাজিয়াকে বলে দেখবো।’
‘এতে আবার বলাবলির কি আছে? কোন দোকানে পাওয়া যায় বল, আমি কিনে নেবো।’
‘এসব জিনিস সাজিয়া জানে। আমি ওকে রাতের বেলা জিজ্ঞাসিব।’
‘বিহারীর মুখে শুদ্ধ বাংলা! কলিকালে কত কিই যে দেখবো।’

হাতে এত কম সময়। কার সাথে দেখা করবো ভেবে পাইনে। অমুক ফুপু, না তমুক চাচা, না চাচাশ্বশুর? সময় ভাগ করতে করতে ঘেমে উঠি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সময়ের অংশটুকু নিয়ে নেয় যাতায়াত। ঢাকাতে পয়েন্ট এ থেকে পয়েন্ট বি তে যেতে অনেকক্ষন সময় লাগে।

হঠাৎ করে মনে পড়লো শফিক স্যারের (নির্বাসিতের আপনজন, পর্ব-১৩) কথা। ভেবেছিলাম বিভাগীয় রিইউনিয়নে স্যারের সাথে দেখা হবে। কিন্তু স্যার সেখানে আসেননি। কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করলাম স্যারের কথা। তারা ভাল করে বলতে পারলো না।

এক রোদেলা দুপুরে তাই আমি স্যারের আস্তানায় হানা দিলাম।
স্যার যেন আমার অপেক্ষাতেই ছিলেন। সেই পরিচিত হাসিমুখ, সেই চিরতরুণ মুখখানি। মনেমনে দীর্ঘশ্বাস ফেলি। মাথার চুল পাতলা হয়ে আসা জায়গাটিতে আনমনে হাত বুলাই। আল্লাহ যারে দেয়----।
পা ছুঁয়ে সালাম করতে স্যার বুকে জড়িয়ে ধরেন। ‘তুমি আসাতে খুব খুশী হয়েছি আমি।’
সোফাতে বসতে না বসতেই স্যার বলেন, ‘কি খাবে? কফি?’
আকেলমন্দ কে লিয়ে ইশারাই কাফি। স্যারের ইংগিত পূর্ণ প্রশ্নে সাথে সাথেই উঠে দাঁড়াই। ‘জ্বি স্যার কফিই খাই তাহলে।’
স্যার হাসেন।‘তোমার মনে আছে তাহলে।’
আমিও হাসি। ‘ওই কফির কথা কি আর ভোলা যায়?’
স্যার ফç্যাটের দরজায় তালা লাগান। ‘চলো তাহলে।’

আবারো শরীরে ঢাকার রোদ, শব্দ আর গন্ধ মেখে আমরা পথ হাঁটি। গন্তব্য আজিজ সুপার মার্কেটের একটিই বিশেষ দোকান। স্যার হাঁটতে হাঁটতে কথা বলে চলেন। কতকিছু নিয়ে কথা বলেন স্যার। আমেরিকান রাজনীতি, ইকনমি, দেশের কথা, বিজ্ঞানের কথা, ছাত্র আর শিক্ষকদের কথা। সবকিছুতেই স্যার কি সাংঘাতিক পরিমানে আশাবাদী।

’জানো নারায়ণগঞ্জে তৈরী করা জাহাজ আজকে আমরা নরওয়েতে রফতানী করছি। ভাবতে পারো?’

আমি স্যারের কথা শুনিনা ভাল করে, শুধু তাঁর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি। কি আশ্চর্য্য রকমের প্রাণবান একজন মানুষ।

সেই দোকানটিতে আবার আমরা গিয়ে বসি। স্যার শুধু ইংগিত করেন। এসে যায় ভেজানো চিঁড়ে, দই-কলার অপূর্ব খাবারটি।
খেতে বসে ফাজলামো করি, ‘স্যার-গতবার যে বলেছিলেন এখানে কোথায় নাকি ত্রিশ টাকায় খিচুড়ী পাওয়া যায়? সেটার কি অবস্থা?’
স্যার উৎসাহিত হয়ে নড়েচড়ে বসেন। ‘তুমি যদি বিকেলের দিকে আসতে তাহলে তোমাকে আরো একটা ভাল জিনিস খাওয়াতাম। লুচি আর শব্জী। খেয়ে তুমি পাগল হয়ে যেতে।’
‘নেক্সট টাইম, স্যার।’
‘পরের বার কিন্তু ফ্যামিলিকে নিয়ে আসবে। তোমাদের সবাইকে দেখতে ইচ্ছে করে।’

এমন মায়া দিয়ে কথা বলেন উনি, যে চোখে পানি এসে যায়।

বিদায় নেবার সময় স্যার আবার বুকে জড়িয়ে ধরেন। ‘ভালো থেকো তোমরা সবাই। আমেরিকার ইকোনমির অবস্থা ভাল নয়। তোমরা যারা ওখানে আছো, তাদের জন্যে মাঝেমাঝেই বড় দুশ্চিন্তা হয়। আমার ছেলেটিও আছে সেখানে।’
‘একবার চলে আসেন স্যার। আপনাকে ওখানে দেখতে আমাদেরও বড় ইচ্ছে করে।’

স্যার সেকথার কোন জবাব দেননা। শুধু হাসেন।



(এতক্ষন ধরে হংকং এয়ারপোর্টে বসে আছি। একটি ছোট টেবিলের উপর পা তুলে ল্যাপটপে টাইপ করছিলাম। টেবিলের উপর চাইনিজ ভাষায় কি যেন লেখা। কি অর্থ কে জানে। একবার পা নামাবার সময়ে দেখলাম যে চাইনিজ লেখাটির ইংরেজী অনুবাদ পাশেই দেয়া আছে। এতক্ষন পায়ের আড়ালে ঢাকা পড়েছিল। বাংলায় অনুবাদ করলে তার অর্থ হয়, ‘দয়া করে টেবিলের উপর পা তুলিবেন না’।
আমি মনে মনে হাসলাম। ওই লেখা দিয়ে যদি আয়েশী বাঙ্গালীকে কব্জা করা যেতো, তাহলে তো হোতই।
পরের প্লেনের সময় হয়ে আসছে। উড়তে হবে বারো-তেরো ঘন্টা। ভাল থাকুন সবাই।)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28879653 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28879653 2008-12-07 14:07:29
ঘরে ফেরার ডায়েরী। পর্ব-৫। স্থানঃ হংকং এয়ারপোর্ট সময়ঃ ডিসেম্বর ৭, ভোর ছয়টা।

এখন ফিরে যাবার পর্ব। শেষ হয়ে গেল দেশে কাটানো ঝটিকা সফর। কেমন লেগেছিল সব মিলিয়ে? ভাল, খুব ভাল।

এবারই প্রথম একা একা এসেছিলাম দেশে। যেহেতু ভীষণ ব্যস্ততায় কেটেছিল দিনগুলো, তাই আমেরিকায় রেখে আসা পরিবারের মানুষজনদেরকে মিস করার সময় পাইনি, কিন্তু তবুও মাঝে মাঝে ঝিলিক দিয়ে গেছে ভয়াবহ শূন্যতাবোধ। যাকগে-আবার তো ফিরে যাচ্ছি ওদের কাছে, আবার চলে যাচ্ছি নির্বাসনের ভুবনে।

যে কনফারেনসটিতে এসেছিলাম, তার কথা অল্প একটু বলি। এটি সম্ভব হয়েছে অস্ট্রেলিয়াতে বসবাস করা একজন বিজ্ঞানীর উদ্যোগে। ভদ্রলোক বয়সী মানুষ, কিন্তু তার পরেও তার উদ্যম দেখে লজ্জা পাই। আমরা কিইই বা করছি তার তুলনায়। তারই প্রচেষ্টায় উড়ে এসেছিলেন দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বেশ কিছু মানুষ। তারা বললেন কত কিছু নিয়ে।

এবারের আলোচনার বিষয়বস্তু ঠিক বিজ্ঞান ছিলনা। জৈবপ্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে কি কি আইনগত সমস্যা আসতে পারে, তা নিয়েই ছিল এবারের কথোপকথন। সবাই বারেবারে বললেন একই কথা। সরকার যদি এই উদ্যোগকে সহায়তা না করে, তাহলে এর কিসসুই সফল হবে না।

বলা বাহুল্য সরকার কিছুই করছে না। তাদেরকে কি করতে হবে, এই প্রশ্নও উঠেছিল। সরকারকে লালফিতার দৌরাত্ম কমাতে হবে, সরকারকে সহজ সাপোর্টিভ আইন বানাতে হবে, সরকারকে বসতে হবে বিজ্ঞানীদের সাথে। দেশীয় বিজ্ঞানীরা বারবার এসে বলে গেলেন হতাশার কথা, বললেন কত সম্ভাবনাময় আমাদের দেশের জৈবপ্রযুক্তির ভবিষ্যত, কিন্তু কোনদিকেই এগোনো যাচ্ছেনা।

আমার প্রেজেন্টশনটি ছিল দ্বিতীয় দিন বিকেলে। দুপুরের দিকে ফোন এলো এক বন্ধুর।
‘কিরে ভয় লাগছে?’
‘কিসের ভয়?’
‘ওমা-আর ক’ঘন্টা পর তোকে বলতে হবে। ভয় লাগার বিষয়ই তো।’
‘আরে রাখ- কত লেকচার দিলাম এ পর্যন্ত। এসব এখন ডালভাত হয়ে গেছে।’
‘শোন-যে কারণে ফোন করলাম। ভয় পাসনে, আমরা আসছি।’
‘আসছি মানে?’
‘আসছি মানে কামিং। আরো দু তিন জনকে ফোন করেছি, তারাও এসে পড়বে। তোকে একটা মোর‌্যাল সাপোর্ট দিতে হবে না?’
‘এত কষ্ট করে এই এত ট্র্যাফিক জ্যামের ধকল সামলে এতদূর আসবার কোন দরকার আছে?’

টেলিফোনের তারে বন্ধুর কড়া ধমক ভেসে আসে। ‘তুই থামতো। তুই বলবি, আর আমরা থাকবো না তা কি হয়? আর তাছাড়া তুই যে পরিমাণে গর্ধভ তাতে একা একা তুই যে কি বলবি তার কোন ঠিক আছে? তোর নাহয় কোন মান সম্মান নেই, কিন্তু আমাদের তো আছে। ও শোন, ইফতিখারকেও নিয়ে আসছি। সে সিঙ্গাপুর থেকে মাত্র ক’দিনের জন্যে দেশে এসেছে, সেও তোর সাথে দেখা করতে চায়।’

বরাবরের মতো কৃতজ্ঞতায় আমার চোখে জল আসে। এইসব মানুষগুলোকে আমি কি দিয়ে আপ্যায়ন করি?

আমার বক্তব্যের কিছুক্ষন পর ঘাড়ে টোকা পড়ে। পিছনে বসে আছে তিন মূর্তি। ইফতিখারকে দেখে চিনতে পারিনে। এত পোংটা ছেলেটির এ কি অবস্থা। মুখে চাপদাড়ি, মাথায় সাদা টুপি, মুখে একটা সদাস্মিত হাসি। ছেলেটি কি পীর-টির হয়ে গেল নাকি? সে মুসাফাহ করার জন্য হাত বাড়ায়। তারপর কানের কাছে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে,‘ভাবী কেমন আছে?’
‘ওই শালা-আগে না আমার খবর নিবি? তারপর আমার বৌয়ের। পরের বৌয়ের ব্যাপারে এত উৎসাহ কেনরে?’
সে মিটিমিটি হাসে,‘বুঝিস না কেন? পুরনো অভ্যেস।’

স্টেজ থেকে সেশনের চেয়ারপার্সন আমাদের দিকে কটমট করে তাকাতে গিয়ে মুচকি হেসে ফেলেন। কেননা উনিও আমাদের শিক্ষক ছিলেন এককালে। আমাদের খাসলত উনার ভালই জানা আছে। এমনতরো কটমটে দৃষ্টিতে উনি আমাদের দিকে বহুদিন তাকিয়েছেন, তাতে খুব একটা কাজ হয়নি।

আমার প্রেজেন্টশনটা শেষ করেই আমরা বেরিয়ে পড়ি ঘর থেকে। রাস্তার পাশে দাড়িয়ে দাড়িয়ে চা খাই। আহা-সেইসব পুরনো দিনের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। সেই পুরনো দিনের সম্মানে আমরা সবাই চায়ের সাথে একটি করে কলাও খেয়ে ফেলি। এককালের আমাদের স্টেপল ফুড।

সিদ্ধান্ত হয় যে পরের দিন আমাকে কনফারেনস বাদ দিতে হবে। আমি আঁতকে উঠি।

’বলিস কি? উনারা আমাকে এত খাতির যত্ন করছেন, আমাকে কিনা শেরাটনে রাখছেন, ভালমন্দ খাওয়াচ্ছেন, আর আমি বেইমানের মতো কনফারেনস বাদ দেবো। কেন?’
‘কেননা আমরা সবাই হীরার অফিসে যাচ্ছি। ওখানে বসে দরজা বন্ধ করে গল্প হবে।’
‘কেন? দরজা বন্ধ কেন? দরজা খুলে গল্প করলে কি হবে?’
ওরা আমার দিকে কটমট করে তাকায়। ‘দরজা খোলা রাখলে সব আনন্দ উড়ে যাবে। এত প্রশ্নের তোর দরকার কি? তোকে আসতে বলেছি, আসবি। ব্যাস।’

বিবেকের তাড়নায় পরদিন শেরাটন থেকে বাক্স-প্যাটরা নিয়ে কেটে পড়ি। চেক-আউটের সময় কাউন্টারের ভদ্রলোকটি আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন।
‘আজই চলে যাচ্ছেন? আপনি কিন্তু আরো একদিন থাকতে পারতেন।’
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলি। ‘ভাইরে-আমার মতোন বন্ধু থাকলে আমার দুঃখ বুঝতেন।’]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28879516 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28879516 2008-12-07 07:22:10
ঘরে ফেরার ডায়েরী। পর্ব-৪। স্থানঃ প্লেনের ভিতর। সময়ঃ রাত দশটা-এগারোটা কিছু একটা হবে।

আবার প্লেন চলছে। শেষ অংশটুকু। ছেলেবেলায় একটা কথা শুনতাম বড়দের মুখে, ‘তাল গাছের আড়াই হাত’। এর মানে হচ্ছে তাল গাছের শেষ আড়াই হাত ওঠা বেশ কষ্টের। আমারও এখন তাই মনে হচ্ছে। আর মাত্র ঘন্টাদেড়েক বাকী ঢাকা পৌছুতে। ততক্ষণ কোনমতে টিকে থাকা আর কি?

হংকং এয়ারপোর্টের একটা ঘটনা বলি তার চেয়ে।

আমি চুপচাপ বসে টাইপ করছি। পাশে একটি বাঙ্গালী দম্পতি, সাথে ছোট একটি বাচ্চা মেয়ে। সে এদিক সেদিক দৌড়ে বেড়াচ্ছে। বাবাটি বললেন যে তিনি একটু বাথরুমে যাচ্ছেন। তার ফিরে আসতে একটু দেরী হল। সব মিলিয়ে মিনিট দশেক হবে হয়তো। এর মধ্যে বাচ্চা মেয়েটি বার দুয়েক প্রশ্ন করেছে, ‘আব্বু কোথায়?’
মহিলাটি প্রতিবারই একই উত্তর দিয়েছেন,‘বলেছি না আব্বুকে আব্বু বলে ডাকবে না, বলবে বাপি। আর তুমি কি কিছু খাবে?’
বাচ্চা মেয়েটি মাথা নাড়ে। সে খাবেনা, তার দৌড়ে বেড়ানোতেই মন বেশী। এতক্ষন প্লেনে আটকা থেকে সে বেচারী নিশ্চয়ই খুব কষ্ট পেয়েছে।

ভদ্রলোক ফিরে আসতেই দুম করে যেন একটা বিস্ফোরন ঘটলো।

‘কি ব্যাপার, তুমি এতক্ষণ কোথায় ছিলে? সারাক্ষন খালি ঘোরাঘুরি করো কেন এত? আমাদের সাথে বসতে ভাল লাগে না?’
ভদ্রলোক আমতা আমতা করেন,‘ঘোরাঘুরি করলাম কোথায়? তোমাকে না বলে গেলাম যে আমি বাথরুমে যাচ্ছি।’
‘বাথরুমে এতক্ষন? কি করো তুমি বাথরুমে?’
মনেমনে আমি প্রমাদ গুনলাম। বাথরুমে বসে একজন কি করে, তারও হিসেব-কিতেব দিতে হচ্ছে নাকি আজকাল?
ভদ্রলোক বলেন,‘না মানে বাথরুম থেকে বেরিয়ে একটু সিগারেট খাচ্ছিলাম আর কি।’
‘আবার সিগারেট? কিন্তু সিগারেট খাওয়ার ঘরটাতো এই এদিকে। সেখানে তো তোমাকে দেখলাম না আমি।’
‘বাথরুমের পাশে আর একটা ঘর আছে। সেখানে বসে সিগারেট খাচ্ছিলাম।’
‘সিগারেট খেতে এতক্ষণ লাগে? কয়টা সিগারেট খেয়েছো? দশটা?’
‘কি সব আজগুবী কথা বলো? দশটা সিগারেট কেউ একবারে খায় নাকি?’
‘একটা সিগারেট খেতে তো এতক্ষণ সময় লাগার কথা না।’
‘ওই ওখানে দেখা হোল একজনের সাথে। তার সাথে একটু কথা-টথা বলছিলাম আরকি।’
‘এই কথাটা প্রথমেই পরিষ্কার করে বললে কি হয়? তোমার কাছ থেকে কথা বের করা আর নারকেল ভেঙ্গে শাঁস বের করার মধ্যে কোন তফাত নেই।’
‘সমস্যাটা কি আমাকে একটু খুলে বলবে প্লিজ। এমন খটখট করে কথা বলছো কেন?’

মহিলার মুখভঙ্গি এবারে বদলে যায়। তিনি এবারে চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলেন,‘ঘটনা কি জানতে চাও? ঠিক আছে, তাহলে শোন। তুমি যে এখানে এই বিদেশ-বিভুই এসে বৌ-বাচ্চাকে ফেলে রেখে কার না কার সাথে বসে একসাথে বিড়ি-সিগারেট ফুঁকছো, এই জিনিসটা আমার মোটেই পছন্দ হচ্ছেনা। এদিকে তোমার মেয়েটি পানি খাবে বলে ছটফট করছে।’
‘তা তুমি ওকে পানি দিলেনা কেন? ব্যাগের ভিতরে পানির বোতল তো আছেই।’ ভদ্রলোক অবাক হন।
‘আমার হাতে পানি খেলেতো হতোই। উনি তার আব্বুরর কাছে ছাড়া অন্য কারো কাছে পানি খাবেন না।’
ছোট্ট মেয়েটি এই সময়ে খুট করে ভুল ধরিয়ে দেয়। ‘বলেছি না, আব্বু কে আব্বু বলে ডাকবে না। বাপি বলবে।’

মহিলাটি সে কথায় বাচ্চাটিকে একটি প্রবল ধমক দেন। ‘একদম চুপ। যেমন বাপ, তেমন মেয়ে।’

আমার মনটি খারাপ হয়ে যায়। কেন আমরা সবাই এত তুচ্ছ কারণে এত বেশী খ্যাচম্যাচ করি? কি দরকার ছিল মহিলাটির খামাখা মিথ্যে কথা বলার। আমি তো দেখেছি বাচ্চাটি একবারও পানি খেতে চায়নি।


স্থানঃ ঢাকা। তারিখঃ নভেম্বর ২৮ সময়ঃ সকাল সাতটা।

সকালে ঘুম ভেঙেছে সূর্য্য ওঠার আগেই। চুপচাপ জানালায় বসে দেখছিলাম বাইরের গাছপালা, সকালে হাঁটতে বেরোনো মানুষদের।

গতকাল প্লেনে ল্যাপটপের ব্যাটারী ফুরিয়ে গেছিল। তাই অত বেশী কিছু লেখা যায়নি। যাই হোক- ভাল ভাবেই দেশে নেমেছি গত রাতে। কালকে কাস্টমস পার হবার সময়ে একটা জিনিস খেয়াল করলাম। হাতের ফর্মটি জমা নিচ্ছিলেন একজন কর্মকর্তা। তার পাশে একটি বড় স্ক্যানার যন্ত্র। বেরুবার আগে সবাইকে ওটার ভিতর দিয়ে মালামাল পরীক্ষা করতে হবে, যদি কোন ট্যাক্সেবল জিনিসের কর ফাঁকি দিয়ে কেউ চলে যায়, তাহলে তাকে ধরে ফেলা হবে।

আমার ফর্মটি নেবার সময়ে কর্মকর্তা টি বললেন,‘আপনি কোথা থেকে আসছেন?’
যখন শুনলেন যে আমি আমেরিকা থেকে আসছি, তখন উনি একটু হেসে হাতের ইশারায় আমাকে চলে যেতে বললেন। আমি খালাশ, আমার মালসামান স্ক্যান করার কোন দরকার নেই। আমি খুশী হয়ে চলে গেলাম। ভাবলাম উনি নিশ্চয়ই আমাকে দেখে ভেবে নিয়েছেন আমি একজন সৎ লোক, ডিক্লেয়ার না করে মাল-পত্র আনবার লোক আমি নই। আর উপর যখন শুনলেন আমি আমেরিকা থেকে আসছি, তখন নিশ্চয়ই ভেবেছেন যে ওখানে থাকা লোকেরা ভাল লোক, ট্যাক্স ফাঁকি দেবেনা।

মনে মনে নিজের উপর বেশ খুশী হয়ে উঠেছিলাম। ভদ্রলোকের উপরও। যাক-সৎ মানুষের মূল্য তাহলে এখনও দেওয়া হয়।

দু কদম হাটঁবার পর আস্তে আস্তে ধারণাটি বদলাতে শুরু করলো। তখন মনে হোল, কারণটি বোধহয় অন্য। ভদ্রলোক আমেরিকা শুনেই নিশ্চয়ই মনে মনে বলেছেন, ভাই, থাকেনতো আমেরিকায়। ট্যাক্স আর অন্য জিনিসের খরচা মেটাতে মেটাতে আপনার জীবন যে কালি কালি, সেতো আমরা জানিইই। তার উপর এখন ওখানকার অর্থনৈতিক অবস্থার যে কথা শুনি তাতে সুটকেস ভর্তি করে টন-টন সোনা-রূপো আনবার মতো অবস্থায় আপনি নেই। যান-ভাই, আমরা জানিই আপনার সুটকেসে কি আছে। আছে ওয়াল মার্ট আর টার্গেট থেকে কেনা শার্ট-প্যান্ট (মেড-ইন বাংলাদেশ), আছে দুটো সস্তা পারফিউম, আছে সের দরে কেনা হ্যালুয়িন ক্যান্ডি (যা কিনা হ্যালুয়িনের পরের দিন পানির দরে বিকোয়)।

দু মিনিট আগের খুশী খুশী মনটাতে এবারে রাগের বন্যা বয়ে যায়। একবার ভাবলাম, ফিরে যাই। গিয়ে ভদ্রলোককে বলি,‘শুনুন, আমি হ্যালুয়িনের পরের দিন ক্যান্ডি কিনিনা। যদি বিশ্বাস না হয়, আপনি আমার সুটকেস চেক করে দেখতে পারেন।’

পরক্ষণেই নিজের চিন্তায় নিজেই হেসে ফেললাম। কি সব আগডুম-বা¦ডুম চিন্তা করছি! বুঝলাম, বয়েস হচ্ছে। সাথে সাথে আরো বুঝলাম যে আমেরিকায় রেখে আসা পরিবারের লোকদেরকে মিস করছি। ওরা সাথে থাকলে আরো অনেক বেশী ভাল লাগতো। একা একা দেশে আসাটা কেমন যেন পানসে, আর বিবর্ণ! বুঝলাম সংসারের শিকড় চলে গেছে অনেকখানি ভিতরে।

তারিখঃ ১লা ডিসেম্বর
স্থানঃ ঢাকা

মাঝখানে অনেকগুলো দিন পেরিয়ে গেল। ঘটনাবহুল। ভ্রমনবহুল। মানুষবহুল।
২৯ তারিখে ছিল আমাদের বিভাগের পঞ্চাশ-বছর পূর্তি আর রিইঊনিয়ন। ভোরবেলা গেলাম চীন-মৈত্রী মিলনায়তনে। সেখানেই হবে সবকিছু।

শুরুতেই দেখা হোল একজনের সাথে। প্রায় পচিশ বছর পর। যদিও সে আমেরিকাতেই থাকে কিন্তু আমাদের ভিতরে যোজন যোজন দূর এর ফারাক। মাঝেসাঝে ই-মেইল বিনিময় হয় বটে, কিন্তু সামনাসামনি বসে কথা বলা, কারণে অকারনে ঘর ফাটিয়ে হেসে ওঠা হয়নি কতকাল।
দেখা হলে মুহুর্তে ফিরে পাই সেই পুরনো দিনগুলোকে।

‘কি রে, তোর চুল-টুলের একি অবস্থা।’
‘আমার চুল নিয়ে তোর এত চিন্তা কেন? হেয়ার কাটিং এর দোকান খুলেছিস নাকি?’
‘তোর মতো এত কম চুলওয়ালা খদ্দের আরো ক’টা পেলে এতদিনে দোকান খুলে দিতাম। ঘন্টায় তোদের মতো পনেরো জনকে নামিয়ে দেয়া কোন ঘটনা না।’
‘সেটা আমার আগে থেকেই বোঝা উচিত ছিল যে পয়সা কামানো শিখতে গিয়ে তুই আরো অনেককিছু কামানোই শিখে গেছিস।’

দুজনেই হা হা করে হাসি। আশপাশের জুনিয়র ছেলেমেয়েরা কি আমাদের কথা শুনতে পেয়েছে? লজ্জার ব্যাপার তাহলে।

‘তুই কবে এলি?’
‘আমি এসেছি গত পরশু। তুই?’
‘আমি এসেছি চার দিন আগে, অবশ্য চলে যাবো আগামী কাল রাতে।’
‘এত জলদী?’
‘ক্লাস চলছে, থাকি কিভাবে?’
‘বুঝি। আমিও আজকাল সন্ধ্যেবেলা পড়ানো শুরু করেছি। আমার একই সমস্যা, তবে আমার একটা কনফারেনস আছে তিন-চারদিন পর। সেটা শেষ করে তারপর যাবো।’
‘তুইও পড়ানো শুরু করেছিস? খুব ভাল। মনে আছে যেদিন আমি আর তুই এখানে একসাথে মাস্টারীতে জয়েন করেছিলাম?’
‘কিভাবে ভুলি? আমার কাছে কলম ছিলনা, তোর কাছ থেকে কলম নিয়ে তারপর সাত কপি জয়েনিং লেটার লিখেছিলাম।’
‘মনে থাকবেনা কেন? সেদিন আমার কলমটা তুই আর ফেরত দিসনি। মেরে দিয়েছিলি। কি ভাল ছিল কলমটা।’
‘কি করবো? তখন তো আমার কলমচুরির বদভ্যাস ছিল। এখন ভাল হয়ে গেছি অবশ্য।’
‘হ্যাঁ- তুই আর ভাল হয়েছিস! কলমচুরি হয়তো বাদ দিয়েছিস, কিন্তু খোঁজ নিলে দেখা যাবে যে অন্যকিছু একটা চুরি করা শুরু করেছিস।’

দুজনে এদিক সেদিক তাকাই। কত অচেনা মুখ, কত অচেনা মানুষ। এরই মাঝে দু একটা শিক্ষকদের দেখতে পাই।


সময়ঃ ৩রা ডিসেম্বর, রাত সাড়ে বারোটা স্থানঃ ঢাকা শেরাটন

গত কয়েকটা দিন যেন ঝড়ের বেগে চলে গেল। রিইউনিয়ন সেরে রাতের বাস ধরে সোজা খুলনা, সেখানে দুদিন থাকলাম, তারপর মাকে সাথে নিয়ে আবার ঢাকায় ফেরা।
পথের মধ্যে মা আর আমি টুকটুক করে গল্প করছি, কিনে খেয়েছি ঝালমুড়ি। আমি একটু ভয় পাই, এসব খেয়ে আবার শরীর খারাপ করবে নাতো? মা হাসেন, ‘তুই এতো ভীতু হলি কবে থেকে?’
পথে সন্ধ্যে নামে। বাতাসে কি যেন একটা পোড়া পোড়া গন্ধ।
মাকে দেখাই পশ্চিম আকাশ। সেখানে দুটি উজ্জ্বল তারার মাঝে একফালি চাঁদ তৈরী করেছে একটি চমৎকার ত্রিভুজ। যেন আকাশের মাঝে একটি অনন্য হাসিমুখ।

এ কয়দিন সমস্যা ছিল নেটে ঢোকা নিয়ে। আজ শেরাটনে থাকার কারণে সে সমস্যের সমাধান হয়েছে। আগে জানতাম না এখানে নেটের স্পীড দারুন ভাল। বাংলাদেশে আছি বোঝাই যায় না। শেরাটনে আছি কনফারেনসের বক্তা বলে। ওইটুকু সুবিধে পেয়েই আমি মহাখুশী।

কনফারেনস খুব ভাল লাগছে। সবাই কি দারুন উৎসাহী। বাংলাদেশের ভবিষ্যত উন্নতির জন্যে কত সুন্দর সুন্দর আইডিয়া। আজকে আমার প্রেজেন্টশন ছিল বিকেলে। অন্যদের তুলনায় আমারটা তেমন ভাল হয়নি। কেমন ম্যাড়মেড়ে লেগেছে। দেখি কালকে কোন ফিডব্যক পাওয়া যায় কিনা।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28877989 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28877989 2008-12-04 04:06:56
ঘরে ফেরার ডায়েরী। পর্ব-৩। স্থানঃ প্লেনের ভিতর। সময়ঃ খোদা মালুম।

প্লেনে উঠেছি প্রায় চারঘন্টা হোল। এর মধ্যে একদফা ঘুম দিয়েছি, খাওয়া হয়েছে একপ্রস্থ। এখন তাই করার মতো কাজ তেমন নেই। অবশ্য নেই বলাটা পুরোপুরি ঠিক হোলনা। এয়ারপোর্ট থেকে জন গ্রিসামের নতুন বইটি কিনেছি। সেটি পড়তে পারি, কলেজের ছেলেপিলেদের খাতা দেখতে পারি, সিটের সাথে লাগানো ছোট পর্দায় সিনেমা দেখতে পারি, কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে গান শুনতে পারি, গল্প লেখার খাতা খুলে কিছু একটা লেখার চেষ্টা করতে পারি।
কিন্তু এগুলোর কোন কিছু না করে আমি ল্যাপটপ খুলে ঘরে ফেরার ডায়েরী লিখছি। কখন এই লেখা পোস্ট করতে পারবো জানিনে, তাও লিখেতো রাখি।
ভ্যাংকুভার থেকে দেশের ফ্লাইট ধরা এইই প্রথম আমার। ব্যাপারটা একটু আলাদা। কেন তা বলছি।
আমি যাচ্ছি ক্যাথে প্যাসিফিক এর প্লেনে করে। হংকং এর এই বিমান কোম্পানীটিতে করে এবারই প্রথম ভ্রমন আমার। যেহেতু ফ্লাইটটি হংকং এই যাচ্ছে, তাই সংগত কারণেই আমি ধরে নিয়েইলাম যে এই প্লেনে শুধু বোঁচারাই থাকবে। প্লেনে উঠে নিজের সিটে থিতু হয়ে বসে এদিক-ওদিক তাকাই। যেদিকে তাকাই সেদিকেই ভারতীয় টাইপের চেহারা। পাগড়ী পরা পাঞ্জাবী সর্দারজিদের সংখ্যাই বেশী। আস্তে আস্তে টের পেলাম যে এদের মাঝে বাংলাদেশীদের সংখ্যাও একেবারে ফেলনা নয়।

মাঝে মাঝেই মায়েরা বাচ্চাকে আদুরে গলায় বলছেন,‘ছি আব্বা-কাঁদে না। এই একটু পরেই আমরা বাড়ী পৌছে যাবো।’ (যদিও তখনও প্লেন টেকঅফও করেনি)
সে কথায় কাজ হয়না বলাই বাহুল্য। কেননা বাচ্চা ততক্ষনে টের পেয়ে গেছে যে এখানে বাবা-মা খুব একটা বেশী বকাঝকা (বা চড় থাপ্পড়) দিতে পারবে না। অতএব তার আগেকার ফিঁচফিঁচ কাঁদুনি এবারে বদলে গিয়ে আরও উচ্চকণ্ঠ হয়ে ওঠে। এবারে বাবার ভুরু কুঁচকে ওঠে। ‘কি হচ্ছে কি? থামাও ওকে।‘
তাতে ফল বিরূপ হয়। এবারে মা ও ঝাঁঝিয়ে ওঠেন। ‘ওর কি দোষ? এই রকম চাপাচাপি করে বসা যায়? মনে হয় যেন মুরগির খোপে বসে আছি। বাচ্চা মানুষ, ওর খারাপ লাগছে বলেই তো সেটা প্রকাশ করছে। ওকে দোষ দিয়ে লাভ কি? মুরোদ থাকলে আমাদেরকে ফাস্ট ক্লাশে বসিয়ে দেশে নিয়ে যেতে। ওখানে বসে দেখতে বাচ্চাটা কেমন খুশী হতো।’

এহেন আচমকা আক্রমনে বাবা ঘাবড়ে যান। তিনিতো জানেন যে আশেপাশে বাংলা শোনার কান আরও অনেক আছে। পরিস্থিতি আউত্বের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে তিনি বাচ্চাটিকে কোলে নেন। ‘দাও আমি ওকে থামাচ্ছি।’

মায়ের গজগজানী তাতে কমেনা। ‘তুমি সামলাবে না তো আর কে সামলাবে? ভাবখানা এমন যেন দশটা আয়া-খানসামা লাইন ধরে দাড়িয়ে আছে তোমার হুকুম শোনার জন্যে।’

এবারে চোখ কান অন্যদিকে দেই। একটু আগে শোনা মহিলার একটা কথা অবশ্য ঠিক। পুরো প্লেনই ভর্তি লোক দিয়ে, একটা সিটও ফাঁকা নেই।
গতরাতে কম ঘুমানোর ফল এবারে মনে হয় পেতে যাচ্ছি। আমার চোখে ঘুম নেমে আসে শ্রাবন মাসের বৃষ্টির মতো। আমার আর কোন কিছুই মনে থাকেনা।

ঘুম ভাঙে এয়ার হোস্টেস এর খোঁচা খেয়ে। আমি ধড়মর করে উঠি। কি ব্যাপার? আমি আবার কি করলাম? না তিনি আমার জন্যে খাবার নিয়ে এসেছেন কিনা তাই।


স্থানঃ হংকং এয়ারপোর্ট।
স্থানীয় সময়ঃ রাত দশটা।

একটা আগে এলাম। একটু পরে আবার উড়বো। হাতে সময় নেই বেশী। খবর পেলাম, বোম্বেতে একটা বড় হামলা হয়েছে। লোক মারা গেছে একশো জনের বেশী। ব্যাংকক এয়ারপোর্টে ঝামেলা হচ্ছে। আমার এক বন্ধু সেখানে আটকে আছে। ভেবেছিলাম ঢাকাতে তার সাথে দেখা হবে। এখন অনিশ্চিত।

এখানে অনেক বাঙালী বসে আছেন। এখানে বসে বাংলাতে টাইপ করতে ভাল লাগছে। কতকিছু এগিয়ে গেছে।

দেশে যেতে সবসময়ই ভাল লাগে। এবারে একটু ভয়ভয় লাগছে। হাতে সময় এত কম। সবকছু ঠিকমতো করতে পারবো তো? মন ভরবে না জানি। তার পরও দেশে যাচ্ছি। মায়ের সাথে দেখা হবে।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28875040 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28875040 2008-11-27 19:57:15
ঘরে ফেরার ডায়েরী। পর্ব-২। স্থানঃ ভ্যাংকুভার এয়ারপোর্ট।

এখন এখানে দুপুর বেলা। আকাশ বেজায় মেঘলা, তাই ঘড়ি না দেখে সময় বোঝা মুশকিল। কিছুক্ষণ আগেই এখানে এসে পৌছেছি, এবারে বড় অংশটুকু উড়তে হবে। এখানে থেকে সোজা হংকং। তেরঘন্টার মামলা।

দুশ্চিন্তা হচ্ছে। প্লেনের সবগুলো সিট ভর্তি। হাত-পা ছড়িয়ে বসার গুড়ে বালি। কি আর করা? কপালে যা আছে, তাই মেনে নেওয়া ছাড়া আর উপায় কি?

চাইনিজ (মানে হংকং আর কি) কোম্পানীর বিমান। তাই সংগত কারণেই বোঁচা পাবলিকের আনাগোনা বেশী। আমি সে সব নিয়ে মাথা ঘামাইনে।প্লেনের খাওয়াটা বেশী বাজে না হলেই আমি খুশী।

হাতের কাছে একগাদা পরীক্ষার খাতা। সেগুলো দেখতে দেখতে যাবো। তেত্রিশ হাজার ফিট উপরে গিয়েও মাস্টারের মাপ নেই।

গতরাতে মাত্র দুঘন্টা ঘুমিয়েছি। কাজের চাপে না, ইচ্ছে করেই। কেননা একজন বুদ্ধি দিয়েছে যে এতে করে নাকি প্লেনে ঘুমটা ভালই হয়। দেখা যাক, এই টোটকা পদ্ধতিতে কোন কাজ হয় কিনা। কতরকম ফন্দি যে আছে এই দুনিয়ায়। হিসেব করে দেখেছি যে ৬-৭ ঘন্টা যদি কোনভাবে ঘুমানো যায়, তাহলেই আমার দুশ্চিন্তা কমে।

যাকগে- থাকুক এটুকুই। প্লেনের লোকেরা ডাকাডাকি শুরু করবে একটু পরেই। খামাখা ওদের চটিয়ে লাভ কি?]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28874731 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28874731 2008-11-27 03:57:21
ঘরে ফেরার ডায়েরী। পর্ব-১। সময়ঃ যাওয়ার চার দিন আগে। স্থানঃ আমেরিকার একটি শহর।

দিন ঘনিয়ে আসছে দ্রুত পায়ে। অথচ একগাদা কাজ জমে আছে। জানি হয়তো শেষমেশ সবগুলোই সারা হবে, কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত তা হচ্ছে ততক্ষণ অবধি তারা গলার কাঁটা হয়ে সর্বক্ষণ তাগাদা দিচ্ছে। আর তাদের চাবুকের ভয়ে আমি দৌড়ে বেড়াই এদিক-ওদিক।

এবারের দেশে ফেরাটি একটু অন্যরকম। এর আগে যতবারই গিয়েছি, সেগুলো ছিল বেড়াতে যাওয়া। ওখানে গিয়ে কোন কাজ করা নেই, শুধু মাস খানেকের অবসর, এখানে সেখানে ঘোরাঘুরি আর শুধু খাওয়া-দাওয়া।

প্রতিবারেই আমেরিকাতে যখন ফিরে আসার সময় হয়, তখন চোখ বড় বড় করে খেয়াল করি যে কোমরে প্যান্টের বোতাম লাগছেনা। সারা শরীরে জমেছে আলস্যের ভার আর কাজের প্রতি প্রবল অনীহা। শুধু গল্প করতে ইচ্ছে করে, শুধু বই হাতে বিছানায় গড়াগড়ি করতে ইচ্ছে করে। বুঝি আমেরিকাতে ফিরে গিয়ে কষ্ট হবে আবার ঝাঁকের কইয়ের সাথে মিশে যেতে।

এবারে ব্যাপারটি ভিন্ন। এবারে কাজে যাচ্ছি, একা যাচ্ছি আর খুব অল্পদিনের জন্যে যাচ্ছি। মেরেকেটে সাত-আট দিন হয়তো থাকা হবে দেশে। আজকাল সন্ধ্যেবেলা বাড়ীর কাছের কলেজে পড়াই বলে তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে হবে। সেখানকার খাতা দেখতে হবে, গ্রেড দিতে হবে। তা না হলে হয়তো আরও দিন কয়েক বেশী থাকা যেতো।

দেশে এবারে একটি কনফারেনস হচ্ছে সামনের মাসে। কিভাবে যেন সেখানে একটি পেপার পড়বার আমন্ত্রন এলো। জানতাম ঝামেলা হবে, কিন্তু তারপরেও রাজি হয়ে গেলাম। এখন মনে হচ্ছে সে সময়ে না করে দেওয়াটাই উচিত ছিল, অল্প ক’টা দিনের জন্যে এত লম্বা ভ্রমন পোষায়না। কিন্তু এখন আর সে কথা লাভ কি? মরদ কা বাত, হাতী কি দাঁত। বলেছি যখন, তখন তো যেতেই হবে।

কনফারেনসের সাথে আরও একটা ব্যাপার আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার বিভাগটির এবারে পঞ্চাশপর্ষ পূর্তি উৎসব হচ্ছে একই সময়টিতে। সেখানেও একদিন যেতে হবে। পুরনো বন্ধুগুলোর সাথে দেখা হবে হয়তো,যদিও বেশীর ভাগেরাই এখন দেশের বাইরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তারা হয়তো আসতে পারবে না।

বুকের মধ্যে দুপদুপ করতে থাকে। পরিবারের সবাইকে এখানে রেখে আমি চলে যাচ্ছি, সেটা ভাল লাগছে না। একা একা ছুটি কাটানোর মতো যেন। ওতে কি আরাম হয়? দুশ্চিন্তায় মাথার পিছনটাতে কেমন যেন করতে থাকে। ওরা সবাই এ কয়দিন ভাল থাকবে তো? কোন ঝামেলা হবে নাতো? সপ্তাহের ট্র্যাশ মনে করে ফেলবে তো?

ভাবখানা এমন যেন আমি না থাকলে এদের দুনিয়া অন্ধকার হয়ে যাবে। আমরা সবাই বোধহয় নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হিসেবে ভাবতে ভালবাসি। আসলে কারো জন্যে কি কোন কিছু আটকে থাকে? এই পৃথিবী শূন্যস্থান পছন্দ করেনা, কিভাবে যেন সবকিছুই আবার আগের মতোই চলতে থাকে।

আজকাল কাজের ব্যস্ততা এতো বেড়েছে যে আর কোন কিছুই করা হয়না। ব্লগে লেখা তো দূরের কথা, আর দশ জনের লেখাটি পড়বার সময় পর্যন্ত পাইনে। হাওয়াই এর উপর লেখাটি মাঝপথে এসে ঝুলে রয়েছে। মাথার ভিতরে না লেখা কাহিনীগুলো মুখ গোমড়া করে বসে থাকে, আমাকে দেখে অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নেয়। শরীরে আমার হাজার ক্লান্তির ধূলো, কাজের ফিরিস্তির তালিকাটি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার ডুবে যাই কাজে। ব্লগে লিখে আর কিই বা হবে?

তারপরেও আজকে কিবোর্ডের সামনে বসলাম। এ যাবত তো আমি কেবলই দেশ ছাড়ার গল্প বলেছি। দেখি তো এবারে দেশে ফেরার গল্পটি বলা যায় কিনা। সাথে করে ল্যাপটপটি যদি নিয়ে যাই, তাহলে হয়তো পথের যাত্রা বিরতিতেও দু চার কলম লিখে সাথেসাথেই পোস্ট করে দেওয়া যাবে। আর তা না হলে কালি-কলম তো রয়েছেই।

এত কাজের মধ্যে তারপরেও ভাল লাগছে। দেশে ফেরাটাই বোধহয় এরকম। মার সাথে দেখা হবে। ছোট বোনটির মেয়েটি নাকি খুব পাকাপাকা কথা বলা শিখেছে, তাকে কোলে বসিয়ে আদর করা হবে। ছোট ভাইটি এখন মস্ত সরকারী আমলা হয়েছে, তার পাশে দাঁড়িয়ে গর্বে আমার বুক ফুলে উঠবে। মস্ত আমলা বলে নয়, একজন সৎ মানুষের সাথে দেখা হওয়ার আনন্দে।

জানি মা মৃদুস্বরে বলবেন,‘আর দুটো দিন বেশী কি থাকা যেতোনা? কতদিন পর তোকে আবার দেখলাম।’ ব্যর্থ মানুষের মতো আমি মাথা নীচু করে থাকবো। তখন মা হয়তো বলবেন,‘জানি তুই ব্যস্ত মানুষ, সবসময় দৌড়ের উপর থাকিস। শরীরের দিকে খেয়াল রাখিস কিন্তু।’

চোখের জল লুকোতে আমি হয়তো তাড়াতাড়ি অন্য ঘরে চলে যাবো।

আজ এটুকুই থাক। যে পেপারটি পড়তে হবে, তার অনেকগুলো স্লাইড তৈরী করা এখনো বাকী। হাতে সময় মোটে আর অল্প ক’টা দিন।

(চলবে)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28872772 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28872772 2008-11-22 22:43:49
কামেহামেহা, মানোয়া পাহাড় এবং আলোহা। পর্ব-৪(ঙ)। (আগের অংশটুকুর জন্যে এখান থেকে পড়ে আসতে হবে)

গুরুর অন্বেষণ এবং ভগবানের রক্তচক্ষু

পরের কয়েকটা দিন কাটলো অসহ্য দুশ্চিন্তায়। কি করবো এখন। এমন সময় একদিন হঠাৎ করে দেখা হয়ে গেল জিমের সাথে।

জিমের পুরোনাম জিম বার্কাস। সেও আমারই মতো একজন ছাত্র। আমার চেয়ে এক বছর আগে এসেছে এখানে। তার সাথে আমি একটি ক্লাশ নিয়েছিলাম একবার। খুব একটা দোস্তি তাই হয়নি তার সাথে।

ক্যাফেটেরিয়ার এক কোণে বসে জিম কি যেন লিখছিল। সেদিন পুরো ক্যাফেটেরিয়াই ভরতি, একটাও খালি চেয়ার নেই। শুধু জিমের সামনেরটি ছাড়া। বাধ্য হয়ে তাই সেখানেই বসেছিলাম সেদিন।

জিম লিখতে লিখতে মুখ তুলে তাকায় আমার দিকে। "তোমাকে আমি চিনি, রাইট?"
"হ্যাঁ- বায়োকেম সিক্স নাইনটিন কোর্সটি একসাথে নিয়েছিলাম আমরা।"
"ও হ্যাঁ। তা কেমন আছো তুমি, ভাল?"
"খুব একটা না। খুব দুশ্চিন্তায় আছি।"
"ঘটনা কি?"

সংক্ষেপে তাকে বললাম সবকিছু। জিম একটি প্রশ্নও না করে চুপচাপ শুনলো আমার কথা। তারপর সে আমাকে জিজ্ঞেস করলো,"তুমি কি কফি খাবে? তাহলে তোমার জন্যেও নিয়ে আসি এককাপ।"

আর কফি? আর কয়দিন পরেই আমার নামাজে জানাযা হবে। কথা না বলে মাথা দোলাই শুধু।

জিম কফি নিয়ে আয়েস করে বসলো। তারপর খুব শান্ত ভাবে সে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করা শুরু করলো।
"-- বাচ্চা ভগবান আর তার আশপাশের --বাচ্চা প্রফেসরগুলোর এইবার দফা রফা করা দরকার। এরা সব শুরু করেছে কি? যা ইচ্ছে তাই করবে?"

আমি হতভম্ব হয়ে বসে থাকি। জিম যে আমার এত হিতৈষী, তা তো আগে জানতাম না।

আরো মিনিট খানেক পর সে থামে। তারপর সে বললো তার কাহিনী। সেও আমারই মতো বিভাগের বাইরের একজনের সাথে কাজ করতে চায় এবং তাকেও ভগবান ওই একই রকম ভয় দেখিয়েছে। পরে শুনলাম যে আরো একটি মেয়ে আমাদেরই মতোন অন্য ল্যাবে কাজ করতে চায় কিন্তু ভগবানের হুমকির দাপটে সে সাহস পাচ্ছেনা।

জিম বললো,"তুমি কোন চিন্তা করোনা। আমি উইসকনসিনের ছেলে, আমি এর শেষ দেখে ছাড়বো।"

আমি ভয়ে ভয়ে বলি,"কি করতে চাও তুমি? ওকে মারবে-টারবে নাতো?"
জিম একটু অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকায়। "মারবো কেন? আমি ওর বিরুদ্ধে ডীনের কাছে নালিশ করবো। তখন ভগবান বুঝবে কত ধানে কত চাল।"
"আচ্ছা- এরকম করা যায় নাকি?"
"অবশ্যই। দেশে কি আইন-কানুন কিছু নেই নাকি?"

পরের কাহিনী সংক্ষিপ্ত। যথাসময়ে জিম এক বিশাল পাঁচপৃষ্ঠার দরখাস্ত মুসাবিদা করে ফেললো। তাতে ভগবান এবং আমাদের বিভাগের আরো কয়েকজন প্রফেসরের বিরুদ্ধে নানান রকম অভিযোগ এর বর্ণনা দেওয়া আছে। তা পড়ে তো আমার আক্কেল গুড়ুম। এই জিনিসে আমাকে সই করতে হবে? সর্বনাশ!

জিম হাসে। "কাউকেই সই করতে হবে না।"
"তার মানে?"
"অলরেডী ভগবানের কানে এই খবর চলে গেছে যে তার বিরুদ্ধে একটি দরখাস্ত ডীনের অফিসে যাচ্ছে। এই খবরেই সে ভয় পেয়ে যাবে, এবং আমার ধারণা সে এই বিষয়টাকে আর বাড়তে দেবে না। জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড সী!"

কার্যতঃ তাইই হোল। দু' দিন বাদে বিভাগের সেক্রেটারী আমাকে ফোন করে জানালো যে অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল আমাকে বিভাগের বাইরের ল্যাবে আমার পি এইচ ডির গবেষণা করার অনুমতি দিয়েছে। আমার যাবতীয় সমস্যার সমাধান হইলো।

মজার ব্যাপারটি হোল এই যে এ ঘটনার মাস খানেক পর জিমের সাথে দেখা হলে সে বললো যে সে মেডিক্যাল স্কুলে পড়ার চান্স পেয়েছে এবং সে হনলুলু ছেড়ে কেন্টাকি চলে যাচ্ছে। যদিও ব্যাপারটি সে কিছুটা আগে থেকে জানতো, তারপরেও সে এখানে নালিশ করার কাজটি করে গেছে।

এখন বুঝি যে সে না থাকলে আমার ওখানে পিএইচডি করাটাই দুঃসাধ্য হয়ে পড়তো। বরাবরের মতই এবারেও আমার বন্ধুরা আমাকে বাঁচিয়ে দিয়ে গেল।

ডঃ ভগবানের সাথে এরপরে আর খুব একটা দেখা সাক্ষাত হয়নি। ততদিনে আমার কোর্স-ওয়ার্ক শেষ বলে আর ডিপার্টমেন্টে যাইনা খুব একটা। শুধু মাঝেমাঝে দু এক বার দেখা হয়েছে ভগবানজীর সাথে। একটু হাত তুলে চলে গেছি যে যার মতো।

মনে মনে বলেছি,"এখন কেমন বুঝতাছেন ভাইজান? বাঙ্গালী পোলার সাথে বিটলামী? হু ইজ স্মাইলিং নাউ?"

শেষ ঘটনাটি ঘটলো আরো বছর কয়েক পর। তখন আমার পি এইচ ডি প্রায় শেষের দিকে। দেশে বেড়াতে গেছি। একবার গেলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার বিভাগে। এর ওর সাথে কথা বলছি, এমন সময় আমাদের একজন সিনিয়র প্রফেসর আমায় বললেন আমি যেন অবশ্যই তার অফিসে এসে একবার কথা বলে যাই। কি যেন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার আছে একটা।

গেলাম তার ঘরে। উনি কি যেন একটা লিখছিলেন। চোখের ইংগিতে আমায় বসতে বললেন। বুকটা দুরুদুরু করে উঠলো। নিশ্চয়ই সিরিয়াস কিছু একটা হবে।
লেখা শেষ করে উনি আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন, "তারপর তোমার গবেষণা কেমন চলছে ওখানে?"
"ভালই স্যার। প্রায় শেষ করে এনেছি কাজ। দু এক মাসের মধ্যেই থিসিস লেখা শুরু করবো।"
"ভাল-ভাল।"
"দোয়া করবেন স্যার।"
"নিশ্চয়ই-নিশ্চয়ই। যাকগে- যা বলার জন্যে তোমাকে ডেকেছি। মাস ছয়েক আগে আমি একটা ইন্টারন্যশনাল কনফারেনস এ্যাটেন্ড করতে গিয়েছিলাম টোকিওতে। সেখানে একজন লোক হঠাৎ করে যেচে এসে আমার সাথে কথা বললেন। বললেন উনি নাকি হনলুলুতে তোমার বিভাগের চেয়্যারম্যান। নামটা এই মুহুর্তে মনে পড়ছে না। হিন্দু কোন গড এর নাম। বিষ্ণু না কৃষ্ণ কি যেন একটা।"

আমার বুক ঠান্ডা হয়ে আসে। মনেমনে প্রমাদ গুনতে থাকি। মুখে বললাম, "ডঃ ভগবান।"
"হ্যাঁ-হ্যাঁ, ভগবান। উনি আমাকে তোমার সম্পর্কে অনেক কথা বললেন। বললেন উনি এই ব্যাপারে কথা বলার জন্যেই আমাকে খুঁজে বের করেছেন।"

সাত সমুদ্দুর তের নদী পাড়ি দিয়ে ভগবানের কালো হাত যে ঢাকা অবধি এসে পৌঁছেছে, তা জানা ছিলনা। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলি। অভাগা যেদিকে চায়, সাগর শুকায়ে যায়।

সিনিয়র প্রফেসরটি এবারে বললেন,"উনি তোমার খুব প্রশংসা করলেন। বললেন যে তুমি নাকি কোর্স-ওয়ার্কে খুব ভাল করেছো, আর এখন নাকি খুব এক্সাইটিং একটা রিসার্চ প্রজেক্টে কাজ করছো। উনি বললেন তোমার মতো সুবোধ ছাত্র নাকি রীতিমতো দুস্প্রাপ্য। উনি আরো বললেন যে আমাদের এখান থেকে আরো ভাল ভালো ছাত্র ওখানে পাঠাতে। বললেন যে আমাদের এই বিভাগ থেকে যেকোন ছাত্র অ্যাপ্লাই করলেই উনি তাকে অ্যাডমিশন দিয়ে দেবেন। তোমাদের কৃতিত্বের কথা শুনতে খুব ভাল লেগেছিল আমার। একবার ভেবেছিলাম তোমাকে একটা চিঠি লিখবো, পরে দেখলাম তোমাকে সামনা-সামনি বলাটাই ভালো হবে। আমরা সবাই তোমার জন্যে গর্বিত। তোমার সুনাম মানে আমাদেরও সুনাম। দোয়া করি তুমি আরো ভাল করো।"

গাধার মতোন হতভম্ব হয়ে উনার ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। বুঝলাম গ্র্যান্ডমাস্টার দাবাড়ুর মতো শেষ চালে কিস্তি মাত করলেন জনাব ভগবান। তার উপর রাগ করা উচিত নাকি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত, সেটা ভাল করে বুঝতে পারছিলাম না।

এতদিন পরেও ব্যাপারটা আমার কাছে পরিষ্কার হোলনা। ভগবানের বুদ্ধিদীপ্ত চালের রহস্য কিআর আমার মতো গাধারা বুঝতে পারে?

(এরপর নতুন পর্ব)

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28853164 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28853164 2008-10-10 22:26:11
কামেহামেহা, মানোয়া পাহাড় এবং আলোহা। পর্ব-৪(ঘ)। (আগের অংশটুকুর জন্যে এখান থেকে পড়ে আসতে হবে)

গুরুর অন্বেষণ এবং ভগবানের রক্তচক্ষু


কেটে যায় আরো কিছু দিন। তারপর একদিন এসে গেল যন্ত্রটি। বলা ভালো যন্ত্রসমষ্টি। শুধু কি মাইক্রো ইঞ্জেকটর? তার সাথে আছে খুব দামী মাইক্রোস্কোপ, আছে সিসিডি ক্যামেরা, আছে ইমেজ অ্যানালিসিস এর জন্য বিশালাকায় এক কম্পিউটর।

একটি আলাদা ঘরে বসানো হোল সবকিছু। পুরো জিনিসটি সেট-আপ করতে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে এক মোটকা ইঞ্জিনয়ার এলেন। এক সপ্তাহ ধরে আমাদেরকে ট্রেনিং দেওয়া হোল। কি করিলে কি হয় সব কিছু জানতে হবে না?

সেই ট্রেনিং এ গুরুজী গেলেন না। পাঠালেন আমাকে। মুখে বললেন,"ইউ আর দ্য ম্যান! আমার আর যাবার দরকার কি?"

বুঝলাম পরে যদি কোন সমস্যা হয় তাহলে তার কাছে সাহায্যের বা উপদেশের জন্য গিয়ে কোন লাভ হবে না। আরো বুঝলাম ব্যাটাচ্ছেলে বুদ্ধিমান লোক। আমার ঘাড়ে বন্দুক তো সে আগেই রেখেছে, এখন হাবেভাবে বুঝিয়ে দিল যে শিকারটিও আমাকেই করতে হবে।

আবার নতুন সেমেস্টার এসে পড়ে। আবার ভগবানের দ্বারস্থ হই। এবারে বোধহয় ভগবান সাহেব বুঝতে পারেন যে আমি খুব সম্ভবতঃ এই ল্যাবেই আমার মূল গবেষণার কাজটি করবো। তিনি এবার খুব একটা প্রশ্ন করলেন না আমাকে, শুধু একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,"আমি কিন্তু তোমাকে ওয়ার্নিং দিয়েছি অনেক বার, কিন্তু মনে হচ্ছে তুমি আমার কথাকে সিরিয়াসলি নিচ্ছো না। আমি আবারও বলছি, তোমাকে কিন্তু অ্যাকাডেমিক কাউনসিল পারমিশন দেবেনা। তখন তোমার পি এইচ ডি পাওয়া নিয়েই সমস্যা হবে।"

আমি একগুঁয়ে ছেলের মতো ঘাড় শক্ত করে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকি।

ভগবান আবার বলেন,"তুমি অন্য কোন প্রফেসরের সাথে কাজ করছো না কেন?"
আমি মাথা নীচু করে বলি, "ওই ল্যাবের কাজটি আমার কাছে খুব এক্সাইটিং লাগছে।"
"হুমম! পরে আমাকে আবার দোষ দিও না যেন।"

এর মধ্যে এক বছর পার হয়ে যায়। আবার সামার চলে আসে। সেই সামারে আমি দেশে গেলাম। কিভাবে কেটে গেল তিনটে মাস তা টেরও পেলাম না। সেই সামারেই কি করে যেন আমার কুমারজীবন চিরকালের তরে বিদায় নিল। আমার গলায় দড়ি পড়িল। আমি স্বামী হইলাম। বিয়ে হোল নদীর নামের একটি মেয়ের সাথে।

বিয়ের পর আমরা একসাথেই ফিরলাম হনলুলুতে। পরদিনে থেকে ল্যাবের দিনমজুরী। স্ত্রীর মুখ গম্ভীর হয়। তার আর দোষ কি? একজন অজানা মানুষের হাত ধরে সে সাত সমুদ্দুর পাড়ি দিয়ে উড়ে এসেছে এক অজানা দেশে। তারপরেও কিনা সে অজানা মানুষটি আবার গবেষণার নামে প্রতিদিন সকালে কাকডাকা ভোরে উধাও হয়।

তখন মনে হয়েছিল যে আমাদের প্রতিটি অবিবাহিত ছেলেমেয়েকে (বিশেষতঃ ছেলেদেরকে) বিবাহ-উত্তর জীবন কেমন হবে তার একটা শর্ট ট্রেনিং নেওয়া উচিত। তাতে প্রতিপদে বিস্মিত হতে হয় না। কত রকম নতুন জিনিস, কত রকম নিয়ম কানুন। বলা যায় এখনো শিখছি।

যাকগে-সেকথা। মূল গল্পে ফিরে আসি।

সপ্তাহখানেক পরে গুরুজী ডাকলেন তার ঘরে। "শোনো- তুমি যেহেতু আমার এখানেই কাজ করবে বলে মনস্থির করেছো, তাহলে ব্যাপারটা অফিসিয়াল করে ফেলা দরকার।"

একথায় বুকের মধ্যে গুরগুর করে উঠলো। মনে পড়লো ভগবানের চেহারা মুবারক। বুঝলাম-এইবার আমার খবর আছে।

প্রথমে গেলাম ডিপার্টমেন্টের সেক্রেটারীর কাছে। পি এইচ ডি র অ্যাডভাইসার ঠিক করার নিয়ম কানুন আগে জানা দরকার। সে আমাকে একটা লম্বা ফর্ম ধরিয়ে দিল।
"এ আবার কি জিনিস হে?"
"এটা আমাদের নিয়ম। প্রথমে তোমাকে সব প্রফেসরের সাথে কথা বলতে হবে। শুনতে হবে তাদের সবার রিসার্চের কথা, তাদের ওখানে কাজ করলে কি ধরনের রিসার্চ-প্রজেক্টে তুমি কাজ করতে পারবে সেগুলো শুনতে হবে। তারপর তুমি ঠিক করবে যে তুমি কার সাথে কাজ করবে।"
"কিন্তু আমি তো ইতিমধ্যে ঠিক করে ফেলেছি যে আমি কার সাথে কাজ করবো। তাহলে আর এদের সাথে কথা লাভ কি?"
"জাস্ট ফরম্যালিটি। এই ফর্মে সব প্রফেসরের দস্তখত নিয়ে আসবে তাদের সাথে কথা বলার পর।"

এই জাতীয় উদ্ভট নিয়মে আমি হাসবো না কাঁদবো তা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এতো দেখি এনগেজমেন্ট হয়ে যাওয়ার পর বিয়ের কনে দেখার কাজ শুরু করা। কিন্তু কি আর করা?

প্রফেসরদের সাথে কথা বলতে গিয়ে আর এক ঝামেলা হোল। প্রায় সবাইই চায় যে আমি যেন তাদের ল্যাবে কাজ করি। সবাই রীতিমত জমকালো সব রিসার্চ প্রজেক্ট হাজির করতে লাগলো আমার সামনে। আমি ঘাবড়ে যাই। এর রহস্য কি? এ কথা সত্যি যে আমি কয়েকটা কোর্সে ভাল গ্রেড পেয়েছে। কিন্তু তার মানে তো এই না যে আমি রিসার্চেও ভাল করবো। তবে কি তাহলে তাঁরা আমার মধ্যে বিরাট কোন বিজ্ঞানীর ছায়া দেখতে পেরেছেন?

গর্বে আমি বৌয়ের সামনে বুক ফুলিয়ে হাঁটাহাঁটি করি।

ক'দিন পরে বন্ধুবর সুজাত আলীর শরণাপন্ন হ'লাম। সে বুঝিয়ে দিল,"কারণটা খুবই সোজা। তুমি এদেশে এসেছো ফুল স্কলারশিপ নিয়ে, তাই তোমাকে তাদের কোন রকম পয়সাপাতি দিতে হবে না। ফ্রি ওয়ার্কার। তাইই সবার এতো উৎসাহ।"

গর্বের বেলুনে পড়ে বাস্তবতার আলপিন এর নির্দয় খোঁচা। চুপসে যাই সুজাতের কথায়। এতক্ষণে টের পাই আসল ঘটনা।

যাকগে-একদিন শেষ হোল দস্তখত নেবার পালা। এবারে আবার হাজির হই ভগবানের দরবারে।

সেদিন আকাশে মেঘের ঘনঘটা। সাগর ফুলে উঠছে। বাতাসে ঝড়ের আগাম বারতা। (আসলে এসবের কিছুই ছিলনা সেদিন, শুধুশুধু একটা গম্ভীর ভাব তৈরী করার জন্যে এসব লিখলাম)।

তবে ভগবানের মুখ সেদিন আসলেই গম্ভীর ছিল। আমি দুরুদুরু বুকে তার দিকে এগিয়ে দিলাম কাগজটি।
"কি এটা?" তার গলায় আমি সর্বনাশের ইঙ্গিত পাই।
"এটাতে সব প্রফেসরের সই নিয়েছি আমি। এখন আমি আমার অ্যাডভাইসর ঠিক করতে চাই।"
"তুমি তাহলে বার্ট্রামের সাথেই কাজ করবে? ফাইনাল ডিসিশান?"
"হ্যাঁ। সিদ্ধান্ত পাক্কা।"

ভগবান কাগজটি নিলেন আমার কাছ থেকে। "এই কাগজটি আমি যখন অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলে পেশ করবো, তখন তুমি কি জানো যে তারা এটাকে কি হিসেবে নেবে? যে তাদেরকে তুমি বলছো যে এই বিভাগের এত নামকরা শিক্ষকদের মধ্যে তোমার অ্যাডভাইসার হ'বার মত যোগ্য কেউ নেই।"
"সে কি? এমন কথা আমি কোথায় বললাম? আমার যেখানে কাজ করতে ভাল লাগছে, আমি সেখানেই কেবল কাজ করতে চাইছি। আমি একবারও বলিনি যে এনারা অযোগ্য।"
"তাদের কাছে মেসেজটা কিন্তু দাঁড়াচ্ছে অন্যরকম। ওনারা কিন্তু তাইই বুঝবেন, এবং তারা তোমাকে কখনোই পারমিশন দেবেন না। আমি তোমাকে গ্যারান্টি দিচ্ছি, যে তোমার রিকোয়েস্ট তারা শুনবেন না।"
"কিন্তু তুমি হচ্ছো বিভাগের চেয়ারম্যান। তুমি যদি ভাল করে বুঝিয়ে বলো তাহলে ওনারা নিশ্চয়ই তোমার কথা শুনবেন।"

ভগবান এবারে কেমন যেন বাঁকা করে হাসেন। "আচ্ছা-তাই নাকি? আমি চেয়ারম্যান বলে তাঁরা আমার কথা শুনবেন?"
"হ্যাঁ-নিশ্চয়ই শুনবেন। চেয়ারম্যানের কথা সবারই শোনা উচিৎ।"
গলার স্বরে একটি নতুন ধরণের কাঠিন্য এনে ভগবান চিবিয়ে চিবিয়ে বলেন,"তাহলে তুমি আমার এতবারের বারণ শুনলে না কেন? আমি তোমাকে প্রতিটি বার সতর্ক করেছি, প্রতিটি বার বলেছি যে এ জিনিস করে তুমি পার পাবেনা। অথচ তুমি দিব্যি আমার নিষেধ অগ্রাহ্য করে ওই ল্যাবেই কাজ করতে গিয়েছো। তোমার কি কোন ধারণা আছে যে আমি যখন কাউনসিলকে বলবো যে তুমি আমার বারণ শোননি, তখন তারা কি পরিমাণে রেগে যাবে?"

আমার পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। ভগবান কি বলছেন এসব?

"তাহলে আমি কি করবো এখন?"
"এই প্রশ্ন তুমি আমাকে এখন করছো কেন? যখন আমি তোমাকে বারবার বারণ করেছি, কই তখন তো তুমি আমার কাছে উপদেশ চাওনি। তুমি ভেবেছিলে যে তুমি মহা চালাক, আর আমরা সবাই ঘাসে মুখ দিয়ে চলি। তোমার চালাকি আমরা কেউ ধরতে পারবো না।"
"তাহলে কি হবে আমার? আমাকে তাহলে এখন অন্য কারোর ল্যাবে কাজ করতে হবে?"
ভগবান এবারে হাসেন। তবে সেটা বাঁকা হাসি।
"তোমাকে আমি ওয়ার্স্ট কেইস সিনারিও দেই। এমনও হতে পারে যে তোমাকে কেউই তাদের ল্যাবে নিতে চাইলো না। কেননা তুমি সবার চোখে একজন শিক্ষক অবমাননাকারী ছাড়া আর কিছুই না। এমন একজনকে ল্যাবে নিতে কেউ আগ্রহী নাও হতে পারে।"

আমার মাথা টলে ওঠে। কি হবে তাহলে এখন? আমি যদি এখানে পড়তে না পারি, তাহলে আমার স্কলারশিপের বারোটা বাজবে। আমাকে তাহলে ডিগ্রি না নিয়েই ফিরে যেতে হবে দেশে। সেখানে গিয়ে কি বলবো? টীচারদের সাথে বেয়াদবী করেছি বলে আমাকে তারা ফিরিয়ে দিয়েছে? সবার কাছে মুখ দেখাবো কি করে?

শুধু দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে ভিতর থেকে।

ডঃ ভগবান বলেন,"প্লিজ- এইসব ন্যাকামী করোনা। এখানে ওইসব অভিনয়ের কোন দাম নেই।"

ডর্মে ফিরে স্ত্রীকে বললাম,"আমাদের এখানকার পাট বোধহয় চুকলো। বাক্স-প্যাঁটরা গুছানোর আঞ্জাম করো।"

সে আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো শুধু।

(বাকী অংশ পরের পর্বে)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28852893 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28852893 2008-10-10 02:07:08
কামেহামেহা, মানোয়া পাহাড় এবং আলোহা। পর্ব-৪(গ)। (আগের অংশটুকুর জন্যে এখান থেকে পড়ে আসতে হবে)

গুরুর অন্বেষণ এবং ভগবানের রক্তচক্ষু

আগেই বলেছি যে জনাব ভগবান সাউথ ইন্ডিয়ার লোক। তার সাথে আমার বার দুয়েকের মতো মোলাকাত হয়েছে মাত্র। এমনিতে দেখে-টেখে তো ভালই বলে মনে হয়েছিল আমার কাছে। এখন পারমিশনের জন্য গেলে কি মূর্তি ধারণ করবে তা খোদা মালুম।

ভগবান মনে হয় আমাদের ডিপার্টমেন্টের আজীবন চেয়ারম্যান। সে দু একটা কোর্স পড়ায় বটে কিন্তু সেগুলো হচ্ছে ডাক্তারী যারা পড়ে তাদের জন্যে। বান্দা একখানি টেক্সটবুক লিখেছেন, এবং শুনেছি যে সেটি বেশ চালু। ফলে পয়সা-পাতির দিক দিয়ে সে ভালই করছে বলে মনে হয়। তার নিজের কোন রিসার্চ প্রোগ্রাম নেই বলে তার কোন ল্যাবও নেই, আর তার আন্ডারে কোন গ্রাজুয়েট স্টুডেন্টও নেই। সে আছে তার চেয়ারম্যানী করা নিয়ে।

বোধহয় এ কারণেই তাকেই বারবার চেয়ারম্যান বানানো হয়। সেও মনে হয় আপত্তি করেনা। ফ্রি ফ্রি মাতব্বরী করার সুযোগ পেলে কেইই বা আর ছাড়তে চায়?

দিন দুয়েক পর গেলাম তার সাথে দেখা করতে। হাজার হোক একই উপমহাদেশের লোক। পাড়াতুতো মুরুব্বী। তিনি আমাকে দেখে একগাল হাসেন।
"কি খবর তোমার? ক্লাশ নিয়ে ব্যস্ত মনে হয়। তোমাকে খুব একটা দেখিনা আজকাল।"
"এইই চলছে কোনরকম। পরীক্ষা-টরীক্ষা তো আছেই, তার উপর আরো কত রকম অ্যাসাইনমেন্ট আছে পাকে পাকে। নাকানি-চুবানি অবস্থা।
"এসব তো থাকবেই। তবে ভাল খবর হচ্ছে যে সেমেস্টার তো প্রায় শেষের দিকে। আর অল্প ক'টা দিন মাত্র, তারপরেই তো সামার চলে আসছে। তখন তুমি একটু বিশ্রাম পাবে। তা তোমার সামারের প্ল্যান কি? দেশে বেড়াতে যাবে নাকি এখানেই থাকবে?"

যাক- আমাকে আর সামারের কথাটা তুলতে হোলনা। সেইই নিজে থেকে তুলে ফেললো। আমিও ঝোপ বুঝে কোপ মারলাম।

"সামারের কথা আলাপ করতেই এলাম তোমার সাথে।"
ডঃ ভগবান সে কথায় নড়েচড়ে বসেন। "কি কথা? বলতো শুনি।"
"ভাবছি সামারে কারো সাথে রিসার্চ করবো।"
"বাহ- সেতো খুব ভাল কথা। আমাদের বিভাগের বেশ কয়েকজন প্রফেসর ভাল ভাল কাজ করছেন। তুমি চাইলে আমায় তাদেরকে অনুরোধ করে দেখতে পারি যেন তুমি তাদের ল্যাবে কাজ করার সুযোগ পাও। আমি বললে তারা না করতে পারবেন না আশাকরি। তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ যে আমি চাই তুমি একটা ভাল ল্যাবে কাজ করো।"

আমি এবার বোমাটাকে ড্রপ করলাম। "আমি চিন্তা করেছি যে এবারের সামারটা আমি ডঃ বার্ট্রামের সাথে কাজ করবো।"
সেকথায় জনাব ভগবানের মুখ আঁধার হয়ে আসে। "বার্ট্রাম? কোন বার্ট্রাম? আমাদের বিভাগে তো এই নামে কোন প্রফেসর নেই।"
"উনি ক্যান্সার সেন্টারে কাজ করেন।"
"ওহ- দ্য নিউ কামার ফেলাহ্‌। কিন্তু সে তো আমাদের ডিপার্টমেন্টের ফ্যাকাল্টি না। তুমি তার সাথে কাজ করবে কি ভাবে?"
"আমি শুনেছি যে উনি আমাদের বিভাগের অ্যাসোসিয়েট ফ্যাকাল্টি। আর ছাত্ররা তাদের সাথে কাজ করতে পারে অনুমতি নিয়ে। চেয়ারম্যানের অনুমতি নিয়ে।"

এতক্ষণে ভগবান সাহেব বুঝতে পারেন আমার অকস্মাৎ আগমনের উদ্দেশ্যটিকে।

"তুমি কি তাহলে আমার পারমিশন চাইতে এসেছো?"
আমি সম্মতিতে ঘাড় নাড়ি।
"তুমি কি ইতিমধ্যে বার্ট্রামের সাথে কথা বলেছো? তুমি কি জানো যে তুমি কি ধরণের কাজ করবে সেখানে?"
আমি আবারও ঘাড় নাড়ি। ডঃ ভগবান এবারে একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলেন।
"শোন তাহলে। তোমাকে আগে থেকে গোটা জিনিসটি খুলে বলি। তাহলে আর কোন কনফিউশন থাকবে না।"
আমি চোখ-কান খাড়া করে তার কথা শোনার প্রস্তুতি নেই।
‘আমাদের বিভাগের নিয়ম হচ্ছে যে কোন ছাত্র ইচ্ছা করলে সে অ্যাসোসিয়েট ফ্যাকালটির সাথে সাময়িক বেসিসে কাজ বা রিসার্চ করতে পারে। তবে তাকে এর জন্যে বিভাগের চেয়ারম্যানের অনুমতি নিতে হবে। এই নিয়মটি করা হয়েছিল যেন ছাত্ররা অন্যের ল্যাবে কাজ করে কিছু পয়সা আর্ন করতে পারে। তবে যেহেতু তুমি স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে এসেছ তোমার বেলায় কিন্তু এ নিয়ম কাজ করবে না। তবে যেহেতু তুমি আমার দেশের দিকের লোক, আর তুমি অনেক আশা করে আমার কাছে এসেছ, তাই তোমাকে আমি ওখানে কাজ করার পারমিশন দেবো এবারে। তবে এর সাথে আরও কিছু কথা আছে।"

আবার কি কথা? এ তো বেশ ঝামেলার জিনিস বলে মনে হচ্ছে!

"তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছো যে আমরা চাইনা যে আমাদের ছাত্ররা বাইরের কারো সাথে তাদের পি এইচ ডির রিসার্চটি করুক। তুমি যদি বার্ট্রামের ল্যাবে এক সেমেস্টার গবেষণা করতে চাও, সেটা খুব বেশী সমস্যার ব্যাপার না। কিন্তু ভয়ের জিনিস হচ্ছে যে তুমি যদি কিছুদিন পর সিদ্ধান্ত নাও যে ওই ল্যাবেই তুমি তোমার পি এইচ ডির থিসিসের কাজটি করবে, তাহলে।"
"কেন তাতেই বা সমস্যা কি?"
"সমস্যা হচ্ছে এই যে তখন ব্যাপারটি আর আমার হাতে থাকবে না, তখন বিভাগের অ্যাকাডেমিক কাউনসিলের পারমিশন লাগবে তোমার। এই প্রসংগে বলে রাখা ভাল যে এই সব ব্যাপারে অ্যাকাডেমিক কাউনসিল পারমিশন দেয়ই না বললে চলে। বরঞ্চ তারা আমাকে প্রশ্ন করতে পারে যে আমি তোমাকে ইনিশিয়ালি কেন ওখানে কাজ করতে অ্যালাউ করলাম। আমি যা বললাম তার সারমর্ম হচ্ছে এই যে তুমি ওখানে অল্প সময়ের জন্য কাজ করতে পারো, কিন্তু তোমার আসল গবেষণাটি বিভাগের কারো সাথে করতে হবে।"

ভগবানকে ধন্যবাদ জানিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসি। যাক-পারমিশন পাওয়া গেল তাহলে। ক'দিন কাজ করে দেখি কেমন লাগে। কোথায় কার সাথে পি এইচ ডির গবেষণা করবো তা পরে ভাবা যাবে।

পরদিন থেকেই লেগে গেলাম কাজে। প্রথম কয়দিন গেল সেখানকার লোকজন আর বিভিন্ন কেমিক্যালকে চিনতে। তার পর কয়েক সপ্তাহ গেল প্রাণীকোষ আবাদ করার পদ্ধতি শিখতে। আগে বুঝিনি যে এই কাজটি এত কঠিন। যতই সাবধানতা নেই না কেন, দুদিন পরেই দেখা যায় যে আমার আবাদ করা কোষগুলো ব্যকটেরিয়ার আক্রমনে খাবি খাচ্ছে। আবার ফির শুরুসে। ব্যাক টু স্কোয়্যার ওয়ান।

আমাদের ল্যাবে তখন নতুন একজন ল্যাব টেকনিশিয়ান এসেছে। সে ব্যাটা চাইনিজ। বয়সী লোক। বৌ, ছেলেকে চায়নাতে রেখে একাই এসেছে। পরে সময় সুযোগ পেলে তাদেরকে আনবে। তাকে একদিন তার নাম শুধোলাম। সে বললো, তার নাম হচ্ছে মিস্টার আউ। কারো নাম যে মিস্টার হতে পারে, তা জানা ছিলনা। পরে জানলাম যে তার পুরো নাম হচ্ছে পিং আউ। একে নিয়ে পরে আরো অনেক কিছু লেখা যাবে।

মাঝে মাঝেই শুনি যে মাইক্রো ইঞ্জেকটর যন্ত্রটি অলমোস্ট এসে গেলো বলে। এবং তার দাম নাকি এক লাখ ডলারের উপরে। একটু ঘাবড়ে যাই দাম শুনে। এত দামী জিনিস দিয়ে কাজ করবো। শেষে আমার পাল্লায় পড়ে যন্ত্রটির আবার বারোটা না বাজে। তেমন কিছু হলে আমার খবর আছে। থাকি আবার দ্বীপের মধ্যে। কোনদিকে যে পালিয়ে যাবো তারও কোন উপায় নেই। সাগরে ঝাঁপ দিলেও খুব একটা লাভ হবে না। কেননা আমি সাঁতার জানিনা।

এইভাবেই কোথা দিয়ে যে চলে গেল সামারটি। রিসার্চের তেমন কোন অগ্রগতি হয়নি। শুধু লাভের মধ্যে এইই হয়েছে যে আমি এখন নিখুঁত ভাবে প্রাণীকোষের আবাদ করতে পারি।

গুরুজী একদিন জিজ্ঞেস করলেন,"কিহে-আরও এক সেমেস্টার কাজ করবে নাকি?"
ততদিনে ওই ল্যাবের প্রেমে পড়ে গেছি। কাজ করবো মানে, আমি এখানেই আছি।

পরের সেমেস্টারের প্রথমে আবার যেতে হোল ভগবানের কাছে। পারমিশন চাই আবারো। মহানুভব এবারে ভুরু কোঁচকালেন আমাকে দেখে।
"তুমি ওখানে আবার কাজ করতে চাও? আমি তো ভেবেছিলাম শুধু এই একটা সামারেই ওখানে কাজ করবে।"
মিউ মিউ করে বলি,"না মানে- আসল কাজটিই করতে পারিনি এখনো। একটা খুব দামী যন্ত্র কেনা হচ্ছে ওখানে। সেটা এসে পৌছুলেই রিসার্চটি শুরু হবে। এতদিন কাজ করলাম, এখন তো মাঝপথে সরে আসার কোন মানে হয় না।"

গম্ভীরভাবে ফর্মটিতে দস্তখত করতে করতে ভগবান আমাকে বাণী দিলেন,"মনে রেখো-তুমি যদি ওই ল্যাবে তোমার পি এইচ ডির গবেষণা করতে চাও, তাহলে বিরাট সমস্যা হবে। এ জিনিসের পারমিশন এত সহজে পাবেনা তুমি। মাঝখান থেকে ওখানে কাটানো তোমার সময়টুকুই জলে যাবে।"

কিন্তু কে শোনে কার কথা?

(বাকী অংশ পরের পর্বে।)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28849500 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28849500 2008-09-30 00:37:54
কামেহামেহা, মানোয়া পাহাড় এবং আলোহা। পর্ব-৪(খ)। (আগের অংশটুকুর জন্যে এখান থেকে পড়ে আসতে হবে)

গুরুর অন্বেষণ এবং ভগবানের রক্তচক্ষু

সেদিনটির কথা আজো মনে আছে আমার।

দিনটি ছিল রোদেলা, সকাল দশটার যুবক সূর্য্যের আলোতে ঝলমল করছিল চারিদিক। সেটা এমন নতুন কিছু নয়, কেননা হনলুলুতে বছরের বেশীর ভাগ দিনই এইরকম। বাস ড্রাইভারকে আগেই বলে রেখেছিলাম। সে আমাকে একটি রাস্তার মোড়ে নামিয়ে দিয়ে হাত উঁচিয়ে দেখিয়ে দিল কোথায় আমাকে যেতে হবে।

রাস্তা পার হয়ে আমি ওপারে যাই। বিলডিংটির সামনে ছোটখাটো একটি সাইনবোর্ড লাগানো। ক্যান্সার রিসার্চ সেন্টার অফ হাওয়াই। পাঁচ-ছয় তলা হবে উচ্চতায়। দেখতেও খুব বেশী বড় না।

ভিতরে ঢুকে দেখা মেলে এক রিসেপশনিস্ট এর। সেই বললো, আমাকে তিন তলায় চলে যেতে। ডঃ বার্ট্রামের অফিসটি সেখানেই।

আগে থেকে ফোনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করা ছিল। বোধহয় সে কারণেই তিনি অফিসে ছিলেন। অফিসটি খুব বেশী বড় না, প্রায় পুরোটাই বই-পত্র দিয়ে ভরতি। খান দুয়েক চেয়ার আর একটা টেবিল ছাড়া আর সবখানেই কাগজপত্র দিয়ে ছড়ানো।

আমি সবচেয়ে অবাক হলাম তাঁকে দেখে। আমি ভেবেছিলাম যে তার বয়েস অনেক হবে। কিন্তু দেখে মনে হোল পয়তাল্লিশের বেশী না। ভদ্রলোক ব্রিটিশ, কিন্তু তার কথায় খুব বেশী ব্রিটিশ অ্যাকসেন্ট নেই। পরে জেনেছি যে হনলুলুতে মুভ করার আগে উনি অনেক বছর নিউ ইয়র্কে ছিলেন। বোধহয় সেখানেই আস্তে আস্তে ব্রিটিশ অ্যাকসেন্টের সমাধি হয়েছে।

আমাদের মধ্যে বেশ খোলামেলা আলোচনা হোল। উনি কাজ করেন অ্যান্টি-ক্যান্সার জিনিসপত্র নিয়ে। বর্তমানে তার ফোকাস, ভিটামিন এ।

কথা শেষের পরে উনি আমাকে তার ল্যাব দেখাতে নিয়ে গেলেন। ল্যাবটি দেখেই আমি সেটির প্রেমে পড়ে গেলাম। বেশ বড়সড় ঘরটি, সেখানে অনেকগুলো সারিসারি বেঞ্চে কাজ করছে কয়েকজনে। পুরো ল্যাবটাই একদম ঝকঝকে নতুন। দেয়ালের রং হাল্কা কমলা। যন্ত্রপাতিগুলোও চকচক করছে যেন।

সমস্যা একটাই, গোটা ল্যাবে কোন জানালা নেই। তাতে অবশ্য আমার কিছু যায় আসেনা। বরং ভালই আমার জন্যে। জানালা থাকলে হয়তোবা গালে হাত দিয়ে বাইরের জগতকে দেখেই সময় কাটিয়ে দেবো। গবেষণার গ ও হবেনা।

মূল ল্যাবের পাশে আরো একটি ঘরে ঢুকলাম আমরা। পুরো ঘরটিতে হালকা বেগুনী রং এর আলো জ্বলছে। কেমন একটা স্বপ্ন স্বপ্ন ভাব। আলো-আঁধারীর এই ঘরটিতে ঢুকেই আমার চোখে কেমন যেন ঘোর লাগে। ভরপেট খেয়ে এই ঘরটিতে ঢুকলে দু মিনিটের মধ্যেই যে কারোর চোখে ঘুম নামতে বাধ্য।

ডঃ বার্ট্রাম খুট করে দেয়ালের একটা সুইচ টেপেন। মুহুর্তের মধ্যে নিভে যায় মৃদু বেগুনী আলোটি। উজ্জ্বল আলোয় ভেসে যায় ঘরটি। আমার স্বপ্নটিও দুম করে উধাও হয়।

"এই ঘরটিতে আমরা প্রাণীকোষের আবাদ করি। এইযে এ পাশের সারিসারি আলমারীর মতো জিনিসগুলো দেখছো, এদের নাম ইনকিউবেটর। এদের ভিতরে বাড়ছে প্রাণীকোষেরা। এখানে তাপমাত্রা, কার্বন-ডাই-অক্সাইড আর জলীয়বাস্পের মাত্রা নিয়ন্ত্রিত যাতে করে কোষেরা ভালভাবে বাড়তে পারে।"

আমার দারুণ লাগে। বাহ-কি সুন্দর ব্যবস্থা!

"আর আমরা যে নীল আলোটি দেখেছিলাম প্রথমে, সেটি ছিল আলট্রা-ভায়োলেট রশ্মি। এই রশ্মি বাতাসে ভেসে থাকা ব্যাক্টেরিয়াদেরকে মেরে ফেলার জন্য যাতে করে ওরা আমাদের আবাদ করা প্রাণীকোষদের কোন ক্ষতি না করতে পারে। যাই হোক-তুমি কি কোষদেরকে দেখতে চাও?"

উত্তেজনায় আমার ভিতরটা কেঁপে ওঠে। মাথা নাড়ি সাথে সাথে। "নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই।"

ঘরের দরজার কাছেই একটি ছোট্ট সিংক। ডঃ বার্ট্রাম সেখানে গিয়ে ভাল করে হাত ধোয়া শুরু করেন, তারপর আমার দিকে লিকুইড সাবানের বোতলটি ঠেলে দিলেন।

‘ভাল করে হাত ধোও এই সাবানটি দিয়ে। অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল সোপ এটি। আমাদের হাতের চামড়াতে নানান রকমের জার্ম থাকে। সেগুলোকে ঠেকানোর ক্ষমতা আমাদের থাকলেও ওই কোষেদের নেই। তাইই যতদূর সম্ভব জার্ম-ফ্রি হয়ে তারপর ওই আলমারী খুলি আমরা।’

হাত ধোয়ার পালা শেষ হলে ড্রয়ার খুলে একজোড়া আনকোরা প্লাস্টিকের গ্লাভস বের করে দিলেন তিনি। "এগুলো পরো। সাবানে যদি সব ব্যাকটেরিয়া না মরে, তার জন্যে এই ব্যবস্থা।"

গ্লাভসজোড়া হাতে একটু বড় হোল। যাদের অভিজ্ঞতা আছে তারা জানেন যে ঢিলেঢালা গ্লাভস হাতে পরতে কি রকম অস্বস্থি লাগে। কিন্তু কি আর করা? যাকগে আমিতো আর কোন কিছুতে হাত দিচ্ছিনা।

এরপর আর একটা ড্রয়ার থেকে বেরোলো মুখে লাগানোর মাস্ক। মেয়েদের প্রসাধনের মাস্ক নয়, এই মাস্ক হচ্ছে গিয়ে মুখে লাগানোর মুখোশ। এ কি ঝামেলায় পড়লাম রে বাবা!

ডঃ বার্ট্রাম আবার ব্যাখ্যা করেন। " প্রাণীকোষদের নিয়ে কাজ করার এই এক ঝামেলা। সব সময় খুব কেয়ারফুল থাকতে হয়। কখন কোথা থেকে ব্যাকটেরিয়া ঢূকে পড়ে এই ভয়ে আমরা সব রকমের সাবধানতা অবলম্বন করি। তুমি জানোই যে আমাদের নিঃশ্বাস থেকেও ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস বেরিয়ে আসতে পারে।"

আমার তখন একটু বিরক্ত লাগছে এত বায়নাক্কা সামলাতে হবে। আগে জানলে এর মধ্যেই ঢুকতাম না। হাত ধোয়া,তারপর হাত ঢাকা, তারপর মুখ ঢাকা। এরপর কি? এই চোখ দিয়ে যেহেতু কোষদের দেখবো, তবে কি এখন চোখজোড়াও ঢাকতে হবে নাকি?

আমার মনের কথা যেন ডঃ বার্ট্রাম পড়তে পারলেন। তৃতীয় ড্রয়্যার খুলে এবারে তিনি বের করলেন একজোড়া ল্যাব গগলস। "এগুলো লাগাও চোখে।"
"এটা আবার কেন?" এবারে আমি একটু আপত্তি জানাই।
"জেনারেল ল্যাব প্র্যাকটিস। যেকোন সায়েন্স ল্যাবে কাজ করতে হলে এটা চোখে পরতেই হবে। তাওতো ভাগ্য ভাল যে তোমাকে এ্যাপ্রন পরতে বলিনি। কিন্তু যদি তুমি এখানে কাজ করবে বলে সিদ্ধান্ত নাও, তাহলে তোমার জন্যে একটা এ্যাপ্রনের অর্ডার দেবো। বায়োলজিক্যাল ল্যাবে কাজ করতে গেলে এইসব বায়নাক্কাতে অভ্যস্ত হয়ে যেতে হয়। তা না হলে দেখা যাবে তোমার আবাদ করা প্রাণীকোষেদেরকে ব্যাকটেরিয়া ধরাশায়ী করে ফেলেছে।"

হোয়াট এভার, আমি মনে মনে বলি।

ডঃ বার্ট্রাম এবারে একটি আলমারীর দরজা খোলেন। ভিতরে অনেকগুলো তাক। প্রত্যেকটি তাকে রয়েছে অনেকগুলো গোলগোল চ্যাপটা স্বচ্ছ পাত্র। অনেকটা দেখতে বৈয়ামের ঢাকনির মতো। তাদের ভিতরে লালচে রঙ্গ এর একটি দ্রবন।

আমি একটু নিরাশ হলাম। আমিতো ভেবেছিলাম মাংসপিন্ডের মতো কিছু একটা দেখতে পাবো।

"এগুলোকে বলে পেট্রিডিশ। কেন বলে জানো?"
আমি মাথা নাড়ি। আমি কিভাবে জানবো হে? তোমার জিনিশ তুমিই ব্যাখ্যা করো।
"এই জাতীয় ডিশ যিনি বার করেছিলেন তার নাম ছিল পেট্রি। সেই জন্যেই এর নাম পেট্রি ডিশ।"

খুব সাবধানে একটি ডিশ তিনি তাক থেকে তুলে আনেন। আমি তার কাঁধের উপর দিয়ে উকিঝুকি মারি। যদি কিছু একটা দেখা যায়। কিন্তু ডিশের ভিতরে লালচে রং এ দ্রবন ছাড়া আর কিছুই নজরে আসেনা।

ডিশ হাতে এবারে তিনি ঘরের অন্য কোনার দিকে এগোন। সেখানে বেশ একটি বড়সড় মাইক্রোস্কোপ দেখতে পেলাম। ডিশটিকে মাইক্রোস্কোপের লেন্সের নীচে বসান তিনি। তারপর চোখ লাগান মাইক্রোস্কোপে।

"এখানে কি জাতীয় কোষেরা আছে জানো? এখানে আছে ইঁদূরের কোষ, ফাইব্রোব্লাস্ট শ্রেণীর কোষ এখানে। এসো- এখানে এসে চোখ লাগাও।"

আমি আস্তে আস্তে মাইক্রোস্কোপে চোখ রাখি।
পাশাপাশি গা ঘেঁষাঘেঁষি করে আছে কোষগুলো। অনেকটা কব্‌ল্‌স্টোন এর মতো। বেশী ম্যাগনিফায়ইং লেন্সের ভিতর দিয়ে দেখলে পরিষ্কার দেখা যায় নিউক্লিয়াস। বই পড়ে জানি যে ওটাই হচ্ছে কোষের প্রাণকেন্দ্র। ওখানে থাকে ক্রোমোসোম যা কিনা সব জীনের সমষ্টি।

কানের পাশে ডঃ বার্ট্রামের গলা শুনতে পাই,"এগুলো হচ্ছে নরমাল কোষ। এরা সংখ্যায় বাড়তে বাড়তে যখন পুরো ডিশটা ভরে ফেলে তখন এরা আর সংখ্যায় বাড়েনা। খেয়াল করে দেখো, কোষেরা কিন্তু সবাই পাশাপাশি আছে, একটার উপর আর একটা কোষ দেখতে পাবে না তুমি। কিন্তু এই কোষেরাই যখন ক্যানসারাস হয়ে যায়, তখন এরাই পাগলের মতো সংখ্যায় বাড়তে থাকে। একের উপর আর একটা। এভাবেই আমাদের শরীরে তৈরী হয় টিউমার। আন-কন্ট্রোল্‌ড্‌ গ্রোথ অফ সেলস্‌।"

ল্যাব থেকে আবার ফিরে আসি ডঃ বার্ট্রামের অফিসে।

"তারপর? কেমন লাগলো তোমার সবকিছু? ইন্টারেস্টিং মনে হয়েছে? ভাল কথা-আমি সম্প্রতি একটা নতুন রিসার্চ গ্র্যান্ট পেয়েছি। তা দিয়ে নতুন একটা দামী যন্ত্র কিনবো ভাবছি। একে বলে মাইক্রো ইঞ্জেকটর। এটি দিয়ে তুমি একটি প্রাণীকোষের ভিতর কোন কিছু ঢুকাতে পারবে। তারপর দেখবো কোষটির কোন পরিবর্তন হোল কিনা। অনেক চমৎকার চমৎকার এক্সপেরিমেন্ট করার প্ল্যান আছে আমাদের। তুমি এলে তোমাকে দিয়েই করাবো তাহলে কাজগুলো। তোমার ভালই লাগবে কাজগুলো করতে।"

আমার সবকিছু মোহময় মনে হয়। কত ছোট একটি প্রাণীকোষ, খালি চোখে দেখা যায়না, আর আমি সেই কোষটির ভিতরে কিছু একটা ইঞ্জেক্ট করবো। তাহলে সেই সূঁইটি না জানি কত সূক্ষ্ম।

আমি মাথা নাড়লাম। কাজ করবো এখানেই।

ডঃ বার্ট্রাম খুশী হলেন। ইউ ওন্ট রিগ্রেট ইট, আই প্রমিস!
"তাহলে কবে থেকে শুরু করবো আমি?"
এ প্রশ্নে ডঃ বার্ট্রামের মুখ একটু গম্ভীর হয়ে আসে। "তুমিতো জানো যে আমি তোমাদের ডিপার্টমেন্টের একজন ডিরেক্ট ফ্যাকাল্টি নই। তাই তুমি যদি আমার ল্যাবে কাজ করতে চাও, তাহলে তোমাকে তোমাদের ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যানের পারমিশন নিয়ে আসতে হবে। আশাকরি তিনি কোন আপত্তি করবেন না।"

রোদেলা সেই দিনটিতে আবার আমি পথে নামলাম। এবারে দেখা করতে হবে আমাদের চেয়ারম্যানের সাথে। চেয়ারম্যান মানে ডঃ ভগবান।

গুরুর দেখাতো পেলাম, এবারে চাই ভগবানের সম্মতি।

(বাকী অংশ পরের পর্বে)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28843051 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28843051 2008-09-14 14:48:00
কামেহামেহা, মানোয়া পাহাড় এবং আলোহা। পর্ব-৪(ক)। গুরুর অন্বেষণ এবং ভগবানের রক্তচক্ষু

বাংলাদেশের লেখাপড়ার সিস্টেম নিয়ে অনেক গুণীজনে অনেক কথাই বলেছেন। সেখানে আমার আর নতুন করে কিছুই বলার নেই। তবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে দু চারটে জিনিস এখানে সংক্ষেপে বলতে চাই।

প্রথমেই বলে নেই (যদিও এই কথাটাই আগেও অনেকবার ইনিয়ে বিনিয়ে বলেছি) একটি গরীব দেশ হিসেবে বাংলাদেশের পড়াশুনার মান আমার কাছে যথেষ্ট উন্নত বলে মনে হয়েছে। তার উপর আমার শিক্ষকেরা যে পরিমাণে কষ্ট করে আমাদেরকে পড়িয়েছেন তার তুলনা মেলা ভার।

আমার সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়। বাংলাদেশের আমার গোটা ছাত্রজীবনে আমি যা যা পড়েছি তার কোনকিছুই আমি নিজে বেছে নেইনি। প্রত্যেক জায়গাতেই সিলেবাসে যে যে কোর্স ছিল তার সবগুলোই পড়তে হয়েছে আমাদের সবার। এটাকে একধরণের স্পুন-ফিডিংও বলা যেতে পারে।

সমস্যা হোল যখন বিদেশে গেলাম। প্রত্যেক সেমেস্টারের আগে মাথা গরম হয়ে যেতো কি কোর্স নেবো সেই চিন্তায়। ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রি নেবো, নাকি ফিজিওলজি? বায়োকেমিস্ট্রি নাকি অরগানিক কেমিস্ট্রি? কোনটার শিক্ষক খুব ভাল কিন্তু তার হাতে ভাল গ্রেড পাওয়া রীতিমত ভাগ্যের ব্যাপার। আবার কোনটার বিষয়বস্তু খুব ভাল কিন্তু তার শিক্ষক সাহেব নাকি একদম পড়াতেই পারেন না। এক দুই সেমেস্টার পরে অবশ্য কিছুটা সয়ে আসে। তখন কোর্স নিয়ে অতটা মাথা ঘামাইনে। কঠিন পড়াশুনা করতে হবে সবগুলোতেই, এটাই হচ্ছে ধ্রুব সত্য। বিরাট বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলি ঘনঘন। বড়ই কষ্টের জীবন।

আমেরিকায় এসেছি পি এইচ ডি করতে। শুনেছি ব্রিটেন বা জাপানে নাকি কোন রকম কোর্স-টোর্স নেবার বালাই নেই। প্রথম দিন থেকেই ঢুকে পড়তে হবে কোন একটি ল্যাবে। প্রথম দিন থেকেই শুরু হয়ে যায় রিসার্চের কাজ।

আমেরিকায় নিয়ম অন্য। আমাদের লাইনে প্রথম দু বছর শুধু কোর্সওয়ার্ক আর কোর্সওয়ার্ক। পরীক্ষা দিতে দিতে পেটের বাঁধন ছিড়ে যাবার জোগাড়। শুধু থিওরী ক্লাশ নিলেই হবেনা, এর সাথে সাথে নিতে হবে প্র্যাকটিক্যাল ক্লাশ। এর সাথে আছে সেমিনার কোর্স। তার জন্যে লাইব্রেরীতে বসে জার্নাল ঘেঁটে তৈরী করতে হবে প্রেজেন্টশন। তাতেও মাপ নেই, বক্তৃতা দেওয়া শেষ হলে অন্য ছাত্র আর টীচারদের প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।

কোর্সওয়ার্কের পালা শেষ হবার পর আসবে কম্প্রিহেনসিভ পরীক্ষা। যতই ভাল রেজালট থাকুক না কেন, এটাতে যদি কেউ পাশ না করে তাহলে গাটঠি-বোঁচকা বেঁধে এখানকার পড়াশুনার পাট চুকাতে হবে।

কম্প্রিহেনসিভ পরীক্ষার দুশ্চিন্তায় যখন মুখ শুকিয়ে আসে তখন মুরুব্বীরা বলেন, "আল্লাহ্‌র কাছে শুকুর করো।"
আমি বুঝিনা, "এই কঠিন পরীক্ষার জন্য শুকুর করবো? কি বলেন এইসব?"
তাঁরা হাসেন। "হ্যাঁ শুকুর করবে এই জন্যে যে তুমি ইকোনমিক্স এর ছাত্র না।"
"কেন তাদের আবার কি হলো?"
"ইকোনমিক্স এর ছাত্রদের সাতটা কম্প্রিহেনসিভ পরীক্ষা। এর মধ্যে যে কোন একটাতে ফেল মারলেই খেল খতম, পয়সা হজম।"
"বলেন কি? সাতটা পরীক্ষা?"
মুরুব্বী আবারো মিটিমিটি হাসেন। "আর তুমি কিনা একটা কম্প্রিহেনসিভ পরীক্ষার গল্প শুনাচ্ছো!"

কম্প্রিহেনসিভ পরীক্ষার পর আসবে থিসিস প্রপোজাল ডিফেন্স। সেখানে থিসিস কমিটি দেখবেন যে আমার থিসিস বিষয়ক প্ল্যানটি কেমন। তারপর শুরু হবে আসল গবেষণা। দীর্ঘ পথ। কি কুক্ষণে যে আমেরিকায় এসেছিলাম!

এর ভিতরে তলে তলে বাড়তে থাকে আর একটি দুশ্চিন্তা। কি নিয়ে গবেষণা করবো? এবং কে হবেন আমার গুরু? দেশে যখন ছাত্র ছিলাম তখন মনে মনে কত কি কল্পনা করেছি। বিরাট গবেষক হবো, যুগান্তকারী কোন কিছু আবিষ্কার করবো, নোবেল প্রাইজ পাবো। দেশ ওর দশের মুখ উজ্জ্বল করবো। কিন্তু একজ্যাক্টলি কি নিয়ে কাজ করবো তা কোনদিন চিন্তা করিনি।

তার পরের প্রশ্ন, কার সাথে কাজ করবো? মাঝে মাঝে একটা দুটো প্রফেসরের ল্যাবে হানা দেই। সেখানে কাজ করে এমন দু একজনের সাথে কথা বলি। কারো কথা শুনেই মনে উৎসাহ পাইনা।

এর মধ্যে কতিপয় মুরুব্বী উপদেশ দিলেন যে তাড়াতাড়ি যে কোন একটা ল্যাবে ঢুকে কিছু একটা কাজ শুরু করে দিতে। আমি অবাক হলাম।
"যাকে জানিনা শুনিনা, তার সাথে কাজ করবো কিভাবে? আর তার উপর আমার গবেষণার বিষয়টাওতো ঠিক করিনি এখনো।"
"আরে শোন-প্রফেসরকে জানবার জন্যেইতো তার ল্যাবে কাজ করবে। সামনেই সামার আসছে। সামারে কোন গ্রাজুয়েট লেভেল কোর্স অফার করা হয়না। কি করবে তাহলে? হালে মানোয়ায় শুয়ে শুয়ে ঘুমাবে নাক ডেকে? তার চেয়ে বরং যে কোন একটা ল্যাবে ঢুকে পড়ো সামারের জন্যে। ভাল না লাগলে পরের সেমেস্টারে অন্য ল্যাবে চলে যেও।"

বুদ্ধি মন্দ না। কিন্তু আবারও সেই আগের সমস্যা? কোন ল্যাবই তো ভাল লাগে না।

একদিন আমাদের ডিপার্টমেন্টের লাইব্রেরীতে বসে বসে জার্নাল পড়ছি। এমন সময় ঢুকলেন ডঃ হামফ্রিস বলে আমাদের একজন প্রফেসর। তিনি মলিকুলার বায়োলজি নিয়ে কাজ করেন।

"কি হে-কি খবর তোমার?"
"এই চলছে কোন রকম। সামনে একটা সেমিনার আছে। তার জন্যে মাল-মশলা রেডী করছি।"
"সামার তো চলে এলো প্রায়। তুমি কি থাকবে এখানে নাকি দেশে যাবে?"
"এখানেই থাকবো, কিন্তু কি করবো তাই খুজে পাচ্ছিনা। নেবার মতো কোর্সতো কিছু নেই সামারে।"
"সামারে কোর্স নেবে কেন? সামারে কাজ করবে কারো সাথে। এটাই তো সবচেয়ে ভাল সময়।"
এ কথায় আমার মুখ ভার হয়ে আসে।
"সেটাই তো সমস্যা। কার ল্যাবে কাজ করবো এটাই তো বুঝে উঠতে পারছিনা।"

ডঃ হামফ্রিস এবারে হাসেন। "আমি জানি তুমি কি বলতে চাচ্ছো। তুমি একটা কাজ করতে পারো।"
"বলো। আমি যেকোন সাজেশনই শুনতে প্রস্তুত।"
"সম্প্রতি এখানকার ক্যান্সার রিসার্চ সেন্টারে একজন নতুন গবেষক এসেছেন। জন বার্ট্রাম। উনি বেশ ইন্টারেস্টিং কাজ করেন। তুমি তার সাথে যেয়ে কথা বলে দেখতে পারো। আমার কেন জানি মনে হয় তুমি কাজকে পছন্দ করবে।"
"ক্যান্সার সেন্টার? সেটা আবার কোথায়। আমিতো ক্যাম্পাসে কোথাও এ জাতীয় কোন জিনিস দেখিনি।"
"হনলুলুর ক্যান্সার সেন্টারটি ক্যাম্পাসের বাইরে। প্রায় তিন মাইল দূরে। ড্রাইভ করে যেতে পাঁচ-সাত মিনিট লাগবে তোমার।"
আমি আমতা-আমতা করি। "আমি গাড়ী ড্রাইভ করতে পারিনে। আর তাছাড়া আমার কোন গাড়ীও নেই।"
"তাতে সমস্যা নেই। বাসে করেও তুমি ওখানে যেতে পারবে। সময় একটু বেশী লাগবে এই যা।"
"সে নাহয় হোল। কিন্তু উনি তো আমাদের ডিপার্টমেন্টের বাইরের লোক। আমার তো ধারণা ছিল যে কেবল বিভাগের শিক্ষকদের ল্যাবেই শুধু ছাত্ররা কাজ করতে পারে।"
"সেটা ঠিক কথা। তবে জন বার্ট্রাম আমাদের বিভাগের সাথে কিছুটা যুক্ত আছেন। তবে তার ওখানে কাজ করতে গেলে তোমাকে আমাদের চেয়ারম্যানের কাছ থেকে আগে পারমিশন নিতে হবে।"
"আমাদের বিভাগের চেয়ারম্যান?"
"ইয়েস। দি গ্রেট ডঃ ভগবান। তবে মনে হয়না সে কোন আপত্তি করবে।"

এক শুভদিনে আমি ম্যাপ-ট্যাপ দেখে বুকে ফুঁ দিয়ে বাসে উঠলাম। গন্তব্য তিন মাইল দূরে অবস্থিত ক্যান্সার রিসার্চ সেন্টার। জন বার্ট্রাম এর সাথে দেখা করবো বলে।

(বাকী অংশ পরের পর্বে)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28830323 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28830323 2008-08-13 04:41:39
কামেহামেহা, মানোয়া পাহাড় এবং আলোহা। পর্ব-৩(ঘ)। মোদোমাতাল ও নারীলিপ্সু


(আগের অংশটুকুর জন্য এখান থেকে পড়ে আসতে হবে)


সুজাত যখন হনলুলু ছেড়ে মিশিগানে চলে গেলো, তখন আমি আমার রিসার্চ নিয়ে বেজায় ব্যস্ত। ইতিমধ্যে আমার বিবাহ-পর্ব কমপ্লিট। নদীর নামের একটি মেয়ের সাথে। পুতুল খেলার মতো তার সাথে ঘর-সংসার করি।

প্রতিদিন ল্যাবে গিয়ে মাথা কুটি। ডেটা চাই, ডেটা। চলে নতুন এক্সপেরিমেন্টের সাধনা। এর সাথে পাল্লা দিয়ে সংসারে চলে নিত্য নতুন রান্নাবান্নার প্রচেষ্টা। অবশ্য সেখানে আমি গবেষক নই, সেখানে আমি গিনিপিগ। (এই রকম গিনিপিগ হতে পারাটা অবশ্য ভাগ্যের ব্যাপার। ফিসফিস করে বলি, আমার স্ত্রী একজন দুর্ধর্ষ রাঁধিয়ে।)

সুজাত মাঝেমাঝে ফোন করে। সে তখন পোস্ট-ডক্টোরাল রিসার্চ করছে একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানীতে। এই জিনিসটি একটু খাপছাড়া। সাধারণতঃ লোকেরা তাদের পোস্ট-ডক্টোরাল রিসার্চ এর কাজটি করে যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন প্রফেসরের আন্ডারে কেননা সেখানে তারা দ্রুত অনেকগুলো পেপার পাবলিশ করতে পারে। তখনকার আমলে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানীরা তাদের রিসার্চের ফলাফল একদমই পাবলিশ করতে চাইতোনা।

সুজাত কাজ করছিল আলৎসহাইমার রোগটির উপর। সে আমলে খুবই একটি দারুন বিষয় ছিল এটি। কিন্তু ওই যে বললাম সে তার কাজের কোন কিছুই পাবলিশ করতে পারছে না কোন জার্নালে। ব্যাপারটি নিয়ে সে বেশ মনোকষ্টে ছিল।

ইতিমধ্যে আমাদের ঘরে আমার স্বপ্নেদেখা মেয়েটির জন্ম হয়েছে। কাজ থেকে আমি বাসায় ফিরবার পরে তিনজনে মিলে সারাক্ষণ হুটোপুটি করি। সময় কেটে যায় পাখীর ডানায় ভর করে।

একদিন সুজাতের ফোন এলো।
"হ্যালো-কেমন আছ?"
"ভাল আছি সুজাত। থিসিসটাকে মোটামুটি বাগে এনে ফেলেছি। তোমার কি অবস্থা?"
"আমার অবস্থা ভালই। দুটো খবর আছে।"
"কহিয়ে জনাব।"
"নাম্বার ওয়ান- বিয়ে করেছি।"
"তাই নাকি! কোথায়? কবে? কাকে?"
"বৌয়ের নাম সালমা। ও আর আমি অনেক আগে একসাথে কলেজে পড়তাম। ও ইন্ডিয়া থেকে পি এইচ ডি করে এখানে এসেছে।"
"খুবই ভাল খবর। আমি তো মনে মনে ভয় পাচ্ছিলাম যে তুমি আবার কোন মিশিগান কন্যার চক্করে না পড়ে যাও। যাই হোক-আর দুই নম্বর খবরটি কি? বাচ্চা হবে সালমার?"
সুজাত এ কথায় খুবই আনন্দ পায়। সে হা হা করে হাসে।
"আরে না-না, কেবলই তো বিয়ে হোল। আমরা সামনের সপ্তাহে হানিমুনে যাচ্ছি।"
"তাতে আমার কি? হানিমুনে যাচ্ছো, যাও। হ্যাভ আ গুড টাইম।"
"হানিমুনে আমরা হাওয়াই আসছি। ইট উইল বী গুড টু সী ইউ।"

এতক্ষণে রহস্য পরিষ্কার হইলো।

পরের সপ্তাহেই সস্ত্রীক সুজাতের আগমন। ডিনার খেতে বাসায় ডেকেছিলাম। সেই আগের দিনের মতো আড্ডা চালাই আমরা দুজন। মহিলাবৃন্দও তাদের আলাপচারীতা চালিয়ে যান সমান তালে। সালমাও খুবই মিশুকে টাইপের মেয়ে।

সুজাতকে আড়ালে ডেকে বললাম, "তোমার ঘরে কি জ্যাক সাহেবের আনাগোনা এখনো চলছে?"
"জ্যাক সাহেব আবার কে? আমার বসের নামতো মাইকেল।"
"আরে আমি জ্যাক ড্যানিয়েলস এর কথা বলছি। তোমার প্রিয় হুইস্কি।"
"সুশশ।" সুজাত আমার মুখে হাত চাপা দেয়। "ওকথা বলা যাবে না।"
"সেকি? কেন?"
"ওসব ছেড়ে দিয়েছি বহু আগে। মিশিগানে যাবার পরপরই। সালমা ওসবের কিছু জানেওনা।"
"এখন একদম বন্ধ?"
"হ্যাঁ-একদম বন্ধ। তখন খুব একা একা লাগতো বলে নাইটক্লাবে যেয়ে ওসব খেতাম।"

শুনে ভালই লাগলো আমার। যাক, অন্ততঃ একটা মদখোর কমলো এই পৃথিবীতে।

তারপর কেটে গেছে বহুদিন। আমরা হনলুলু ছেড়ে চলে গেছি ক্যানাডাতে। সেখানে কয়েকটি বছর থাকবার পর আবার ফিরে আসি আমেরিকাতে। এর মধ্যে মাঝেসাঝে ফোনে কথা হয় সুজাতের সাথে। সেও তার চাকরি বদলেছে। এখন সে অন্য কোম্পানীতে চাকরি করে। রিসার্চেরই কাজ। একই জায়গাতে সালমারও চাকরি হয়েছে। একদিন খবর দিল যে তাদের মেয়ে হয়েছে একটা। চিঠিতে ছবিও পাঠালো গোটা কয়েক।

একবার আমি একটা কনফারেন্সে গেলাম সান ফ্রান্সিস্কো। সুজাতরা তখন ওই এলাকারই আশেপাশে কোথাও থাকে। আমার আসবার খবর শুনে বললো যে তাদের বাসায় যেতে হবে। হাতে সময় বেশী ছিলনা বলে সে প্রস্তাবে সাড়া দেওয়া হয়নি। তাকে বললাম, বরং তুমি একদিন সন্ধ্যেবেলা আমার হোটেলে এসো। আমরা কাছাকাছি কোন একটা জায়গাতে বসে কথা বলতে বলতে রাতের খাবার খেয়ে নেবো।

সন্ধ্যেবেলা সুজাত সাহেব এলেন। তাকে দেখে চমকে উঠি। এতদিন পরেও ব্যাটাচ্ছেলে দেখতে একদম আগের মতোনই আছে। বয়সের কোন ছাপই পড়েনি। কোন স্পেশাল তাবিজ-কবচের কেরামতি কিনা জিজ্ঞেস করলাম তাকে। সে একগাল হাসে। তার গাড়ীটাও ঝকঝকে নতুন। বুঝলাম সে ভালই আছে।

"কি জাতীয় খাবার খাবে?" সুজাত জিজ্ঞেস করে।
"দুদিন ধরে ভাত খাইনি, বার্গার আর স্যান্ডউইচের উপর আছি। কাছাকাছি কোথায় গিয়ে চারটে ভাত যদি খেতে পারতাম।"
"চলো, তাহলে কোন ইন্ডিয়ান আর না হলে থাই রেস্টুরেন্টে যাই।"

বেশীক্ষণ খুঁজতে হোলনা ভাগ্যক্রমে। মিনিট দশেক ড্রাইভ করেই মিলে গেল একটা "তাজমহল" মার্কা রেস্টুরেন্ট।

ভিতরে ঢুকে খাবার অর্ডার দেবার সময়ে সুজাত একটু মুখ কাঁচুমাচু করে বললো, "আমি কিন্তু কিছুই খাবোনা। তুমি শুধু তোমার নিজের জন্যে অর্ডার দাও।"
"মানে? তুমি কি দাম নিয়ে ভাবছো? নো চিন্তা ভাই- আমি খাওয়াচ্ছি তোমাকে। যা খুশী অর্ডার করো।"
"না না, দাম দেওয়া নিয়ে কোন সমস্যা নেই। আমি আসলে বাইরে কোথাও খাইনে একদম।"

হঠাৎ মনে পড়লো যে অনেকেই খাদ্যদ্রব্যের হালাল-হারাম নিয়ে খুঁতখুঁত করেন। হয়তো বা সুজাতও এখন বাইরের খাবার হালাল না হলে খায় না।

"তুমি যদি খাবার হালাল কিনা এই চিন্তায় থাকো, তাহলে তুমি বরং ভেজিটেরিয়ান কিছু একটা নাও।"
"না হালাল-হারাম নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা নেই। আমি বাইরে কোথাও খাইনা।"
"কেন? বাইরের খাবারের দোষটা কি?"
"বাইরের খাবার খাওয়া একদম বারন আমার জন্য।"
"কে বারণ করেছে? সালমা? আমাকে ফোনটা দাওতো। ওকে বলে দেই যে একদিন আমার সাথে খেলে এমন কোন মহাভারত অশুদ্ধ হবে না।"
"না সালমা বারণ করেনি।"
"তাহলে কে করেছে?"
"তুমি খাওনা আগে। আমি বলছি।"

ঘটনাটি খেতে খেতে শুনলাম।

বছরখানেক আগের কথা। সুজাত কাজে গেছে। ল্যাবে একটা গুরুত্বপূর্ণ এক্সপেরিমেন্ট চলছে। পাশে টেবিলের সহকর্মী বললো, "তোমার চোখ দুটো কেমন লাল মনে হচ্ছে। কাল রাতে বেশী টেনেছো নাকি?"
সুজাত বলে, "টানাটানির জীবন শেষ হয়েছে অনেক আগে।"
"চোখ তো অনেক লাল। ঘটনা কি? ইনফেকশন হতে পারে তাহলে। ডাক্তারের অফিস থেকে ঘুরে এসো নাহয়।"

সুজাতের তেমন কোন খারাপ লাগছিলনা, কিন্তু তারপরেও সহকর্মীর ঠেলায় পড়ে সে গেল ডাক্তারের কাছে। এখানে তো আবার ডাক্তার আসবার আগে আসে তার অ্যাসিস্টেন্ট। সে এসে পালস দেখে, তাপমাত্রা মাপে, ব্লাড-প্রেসার চেক করে। এসব শেষ করার পর রোগীদের বসে থাকতে হয় আরো মিনিট দশেক। তারপর আসে ডাক্তার।
সুজাতের ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম হোল। ডাক্তার মুহুর্তের মধ্যে এসে হাজির। সুজাততো মহা খুশী। বাহ-ক্লিনিকটি তো বেশ এফিসিয়েন্ট মনে হচ্ছে।

ডাক্তারের প্রথম প্রশ্ন ছিল, "তুমি ক্লিনিকে এসেছো কিভাবে?"
সুজাত অবাক। তার সাথে চোখ লালের কি সম্পর্ক? তারপরেও সে উত্তর দিল, "গাড়ীতে করে এসেছি আমি।"
ডাক্তারের পালটা প্রশ্ন, "কে ড্রাইভ করেছে? তুমি নাকি অন্য কেউ?"
আরে মর জ্বালা! একি ডাক্তার নাকি ড্রাইভিং লাইসেন্স অফিসের একজামিনার?
"আমিই গাড়ী চালিয়ে এসেছি।"
"বলো কি? কি সর্বনাশের কথা!" ডাক্তার ভিরমি খায় সুজাতের উত্তর শুনে।

সুজাতের এবার ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটে। "তুমি কি দয়া করে বলবে যে এই জাতীয় প্রশ্নের অর্থ কি?"

ডাক্তার গম্ভীর হয়ে বসে থাকেন কিছুক্ষণ, তারপর বলেন,"তোমার ব্লাড-প্রেসার ভয়াবহ রকমের বেশী। তোমার যে এখনো স্ট্রোক হয়নি, তাতেই আমি অবাক হচ্ছি। আবার যখন শুনলাম যে তুমি এই অবস্থায় নিজে গাড়ী চালিয়ে এসেছো, তখন আমি মনে মনে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিয়েছি যে রাস্তায় তুমি দু চারটে লোককে মেরে বসোনি।"

ব্লাড-প্রেসার, স্ট্রোক, এসব কি বলছে ডাক্তার? সুজাত ভ্যাবলার মতো বসে থাকে। তাদের পরিবারের কারোরই তো এরকম কোন রোগ-বালাই নেই। সুজাত নিজেই হাল্কা-পাতলা গড়নের মানুষ, তার উপর সে খুব একটা হাই-ফ্যাট খাবারও খায়না।

ডাক্তার কথা বলে আবার।"তোমাকে এই মুহুর্তে হসপিটালাইজ করা দরকার। তোমার অবস্থা খুবই খারাপ। এই মুহুর্তে যদি তোমার স্ট্রোক হয় তাহলে আমি মোটেও অবাক হবোনা। আমি নার্সকে এ্যাম্বুলেন্স ডাকতে বলেছি।"

সুজাতের মাথা ঝিম ঝিম করতে থাকে। তার চোখের সামনে ভাসতে থাকে তার তিন বছরের শিশুকন্যাটির মুখ।

হাসপাতালে গিয়ে সুজাতের আরো একগাদা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাঝখান দিয়ে যেতে হোল। তাতে ধরা পড়লো যে সুজাতের আসল সমস্যা হচ্ছে যে তার দুটো কিডনীই একদম শেষ। তাদের কাজ না করার কারণেই সুজাতের রক্ত নিয়মিত পরিষ্কার হচ্ছে না। এবং সে কারণেই তার ব্লাড-প্রেসার এইরকম আশংকাজনক রকম বেশী।

তাহলে এখন চিকিৎসা কি? পার্মানেন্ট চিকিৎসা হচ্ছে কিডনী ট্র্যান্সপ্ল্যান্ট, আর যতদিন সেটা না হয় ততদিন পর্যন্ত কিডনী ডায়ালিসিস।

এইপর্যন্ত বলে সুজাত একটু ম্লান হাসলো। আমার ততক্ষণে খাওয়া মাথায় উঠেছে। এসব কি বলছে সুজাত? এত অল্পবয়সে কিডনী নষ্ট হয়ে গেল ছেলেটির?

সুজাত মাথা নীচু করে একটি চামচ নিয়ে আনমনে নাড়াচাড়া করে। "এখন আমাকে সপ্তাহে দু দিন যেতে হয় ডায়ালিসিস করাতে। প্রতিবার সময় লাগে চার ঘন্টা করে। সপ্তাহে আটটি ঘন্টা আমি ক্লিনিকের বিছানায় শুয়ে থাকি চুপ করে। ভাবি হোয়াই মী? খাওয়া-দাওয়ার একগাদা রেস্ট্রিকশান, মাঝে মাঝে বড় অসহ্য লাগে। আমার সারাটা জীবনই বোধহয় এভাবেই কাটবে।"
"কেন? কিডনী ট্র্যান্সপ্ল্যান্ট করলে তো আর ডায়ালিসিস করতে হবে না।"
"কিডনী ট্র্যান্সপ্ল্যান্ট করার জন্য অনেক দিন দেরী করতে হয়। দশ-পনেরো বছর। আমার এই অবস্থায় অতখানি সময় আমি পাবো কিনা জানিনা।"

এ কথার কোন জবাব হয়না। আমি চুপ করে থাকি।

সুজাত এবারে একটু হাসে। "দেখেছো-আমি কি রকম গোটা পরিবেশটা বিষন্ন করে দিলাম। এই জন্যেই ওই সব কিছু বলিনি তোমাকে কোনদিন। ভাগ্যকে মানতে তো হবেই আমাদের সবার। তাওতো ভাল যে আমি আমেরিকাতে আছি, যদি ইন্ডিয়াতে থাকতাম তাহলে বোধহয় এতদিনে মারাই যেতাম। ডায়ালিসিস করার অত পয়সা কোথায় পেতাম আমি?"

হয়তো বা তাই।

"আমি খুব একটা কমপ্লেইন করিনা এ নিয়ে। শুধু একটা জিনিস খুউব খারাপ লাগে। ইন্ডিয়াতে আর কোনদিন বোধহয় যেতে পারবো না আমি। ওখানে ডায়ালিসিস সেন্টারগুলোর যা অবস্থা তাতে দুদিনেই ইনফেকশন হয়ে মারা যাবো। বাবা-মা, ছোট ভাই-বোনদেরকে দেখিনি বহুদিন। ব্যাপারটা কেমন না? একটা অসুখের জন্য আমি বোধহয় চিরকালের মতো আমার ফ্যামিলি থেকে আলাদা হয়ে গেলাম। আমার জন্যে সালমাও যেতে পারছেনা। সে আমাকে কিছু বলেনা, কিন্তু আমিতো বুঝি।"

সেই সন্ধ্যের পর সুজাতের সাথে আমার আর দেখা হয়নি। তারপর কেটে গেছে আরো অনেকগুলো বছর। আমি এবং সে দুজনেই কাজের জায়গা বদলেছি কয়েকবার। মাঝেসাঝে শুধু তার সাথে ফোনে কথা হোত। আমি বা সে কেউই সুজাতের শারিরীক অবস্থা নিয়ে কথা বলিনা। দুজনেই বুঝি।

শুধু একবার সে বলেছিল যে তার শারীরিক অবস্থা আরো একটু খারাপ হয়েছে। এখন তাকে সপ্তাহে তিন দিন যেতে হয় ডায়ালিসিস করানোর জন্যে।

এমনিই চলছিল। একদিন সন্ধ্যেবেলা ফোন এল। নাম্বার দেখে বুঝলাম সুজাতের বাড়ীর ফোন নাম্বার। ভয়ে ভয়ে ফোন তুলি।
"হ্যালো।"
"সুজাত বলছি।" আমার বুক থেকে একটি বড় ভার যেন নামে।
"কি খবর তোমার? অনেকদিন কথা হয়নি।"
"আজই বাসায় ফিরলাম হাসপাতাল থেকে।"
"সে কি? হাসপাতালে কেন? সালমার শরীর ভালতো?"
"আমার কিডনী ট্র্যান্সপ্ল্যান্টটা অবশেষে হোল এ মাসে। মনে হচ্ছে সাকসেসফুল। টিস্যু রিজেকশনের প্রাথমিক ভয়টা কেটে গেছে।"
"দ্যাটস সাচ আ গুড নিউজ, সুজাত।" আমি জোরে চেঁচিয়ে বলি।
ওপাশ থেকে সুজাতও হাসে। "জানতাম তুমি খুব খুশি হবে খবরটা পেয়ে।"
"আমার খুব ভাল লাগছে। তারপর এখন কি? সেলিব্রেশান কি ভাবে করবে?"
"আমি একটু আগে টিকিট কেটেছি। দেশে যাবার টিকিট। আমার মা আমার জন্যে পথ চেয়ে বসে আছে। তাকে আমি কতবছর দেখিনি।"

এ কথায় কেন যেন আমার চোখে জল আসে। আহা-ঈশ্বর তুমি তাড়াতাড়ি ছেলেটিকে তার মায়ের কাছে যেতে দাও। আমি যেন কল্পনায় দেখতে পাই দৃশ্যটি। সুজাতকে বুকে জড়িয়ে তার মা কাঁদছেন। সুজাত হাসছে, কিন্তু তার চোখ দিয়ে অবিরল পানি পড়ছে। সে কিছু বলছে না। চোখের পানির চেয়ে বড় ভাষা আর কিইবা হতে পারে?

(এরপর নতুন পর্ব)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28827750 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28827750 2008-08-05 22:03:55
কামেহামেহা, মানোয়া পাহাড় এবং আলোহা। পর্ব-৩(গ)। মোদোমাতাল ও নারীলিপ্সু


(আগের অংশটুকুর জন্য এখান থেকে পড়ে আসতে হবে)


গাড়ী চালানোর সময়ে নাঈম বেশ গম্ভীরই হয়ে থাকলো পুরোটা সময়। আমার বেশ মজাই লাগছিল তাকে দেখে।

নাইটক্লাবটি আসলেই বেশ অভিজাত কিসিমের। ভিতরে ঢোকার সময়েই দেখলাম বেশ অনেককেই দরজা থেকেই ফেরত আসতে হয়েছে কেননা তাদের পোশাক আপ টু দ্য স্ট্যান্ডার্ড ছিলনা। ভাগ্যিস সুজাতের কথামত ভদ্রগোছের পোশাক পরে এসেছিলাম।

ভিতরে ঢূকবার সময়ে বুক ধুকপুক করছিল। কেউ আবার দেখে ফেলবে নাতো? হাজার হোক গায়ে একটা 'ভাল ছেলে'র তকমা ততদিনে উঠেছে। সেটা কি আজ রাতেই উবে যাবে চিরকালের মতো? এই খবর যদি আমার পিতাজীর কাছে যায়, তাহলেই হয়েছে। তিনি যে কি চীজ, সেটা তো আগের সিরিজেই বিস্তারিত লিখেছি। উৎসাহী পাঠকেরা ইতিমধ্যে সেটা জানেন হয়তোবা।

কোন এক অজানা ভয়ে দুলে ওঠে বুক। কি এমন দরকার আমার এই নাইটক্লাবে যাওয়া? ভিতরে যেয়ে কি দেখবো সেই আতংকেই ঠান্ডা মেরে যাই কেমন যেন। পিছন থেকে সুজাত হাল্কা ধাক্কা দেয়।

"চলো। আমাদের পিছনে তো লোক জমে যাচ্ছে।"

ভিতরে ঢোকার সাথে সাথে প্রথমেই দুটো জিনিস নজরে এলো। এক নানান ধরণের আলোর ঝলকানি, আর সেই সাথে প্রচন্ড জোরে মিউজিক বাজছে। এর সাথে লোকজনদের চেঁচামেচি, সাথে সিগারেটের ধোঁয়া, আর কাঁচের গ্লাসের ঠুনঠুন শব্দ।

আস্তে আস্তে চোখ সয়ে এলো। বেশ বড় একটি হলঘর। মাঝখানে ড্যান্স ফ্লোর, সেখানে গানের তালে তালে ছেলে-মেয়েরা জোড়ায় জোড়ায় নাচছে। আর একটু ভাল করে দেখে বুঝলাম যে সেখানে মেয়ে-মেয়েও নাচছে, তবে তাদের সংখ্যা খুবই কম।

সুজাত বললো, " চলো, একপাশে গিয়ে বসি।"
সেইই যেহেতু লীডার, অতএব তাকেই অনুসরন করা ছাড়া আর গতি কি?

নাচের জায়গাটির চারপাশে ছোট ছোট টেবিল-চেয়ার পাতা। একটি টেবিল দখল করে বসলাম আমরা। বাজনার প্রচন্ড আওয়াজে কারো কথাই ভাল শোনা যাচ্ছেনা। বুঝলাম এখানে বেশীক্ষণ থাকলে আমার কানের বারোটা বাজবে।

নাঈম ইতিমধ্যে কিছুটা সহজ হয়ে এসেছে। দু চারটে কথাবার্তাও হচ্ছে আমাদের মধ্যে। বুঝলাম সে মাঝেমধ্যে এখানে আসে।
সুজাত চেঁচিয়ে ওয়েটারকে ডাকলো। ওয়েটার না বলে ওয়েট্রেস বলাই ভাল। কেননা একমাত্র বারের বারম্যান ছাড়া আর তাবত কর্মচারীই মহিলা।
"আমি চাই জ্যাক ড্যানিয়েলস।" সুজাত উঁচু গলায় বলে।
"উনি আবার কে?" আমি জিজ্ঞেস করি।
সুজাত আমার অজ্ঞতায় হাসে। "জ্যাক ড্যানিয়েলস হচ্ছে এক ধরণের হুইস্কি। আমার প্রিয় ব্র্যান্ড। একটু চেখে দেখবে নাকি?"
"নারে ভাই- আমার জন্যে কোকই ভাল।"
"নাঈম-তুমি কি খাবে? কোক না অন্যকিছু?"
"ডায়েট পেপসী।"

মিনিট খানেকের মধ্যেই আমাদের পানীয় এসে গেল। মাঝারী সাইজের গ্লাসের অর্ধেকের বেশীই ছিল বরফ। ওখানে আবার পানীয়ের দাম সাথে সাথেই টিপস সহ চুকিয়ে দেওয়াটাই রীতি। সুজাত দিল সাড়ে চার ডলার, আমার কোকের দাম পড়লো সোয়া তিন ডলার। আমার তো দাম শুনে মাথায় হাত। অর্ধেক গ্লাস কোকের দাম এতো? বাইরের দোকান থেকে কিনলে ওই পয়সায় গ্যালন গ্যালন কোক কেনা যায়। কিন্তু কি আর করা? এসেই যখন পড়েছি, তখন আর নালিশ করেই বা লাভ কি?

সুজাত বললো,"আস্তে আস্তে খাও। গ্লাস শেষ হয়ে গেলেই ওরা এসে আবার ড্রিংক কেনার জন্য ঝুলোঝুলি করবে।"

গ্লাসে আলতো চুমুক দিয়ে এবারে আশেপাশে তাকাই। নাচের ফ্লোরে বাজনা থামলো। নাচিয়েদের কিছু কিছু ফিরে আসছে, আবার নতুন কিছু নাচিয়েরাও এগিয়ে এলো নাচবার জন্যে।

"তুমি নাচো না সুজাত?" আমি জিজ্ঞেস করি।
"নাহ-আমার মেয়েদের কাছে গিয়ে নাচার জন্যে রিকোয়েস্ট করাটা একদম ভাল লাগেনা। তারপর তারা যদি আমাকে ফিরিয়ে দেয়, সেটাও বাজে লাগবে আমার।"
"এটা কোন একটা কথা হোল?" এতক্ষণে নাঈম মুখ খোলে।
"কি কথা?"
"এলাম নাইটক্লাবে। এখানে এসে ড্রিংকও করবোনা, আবার নাচবোও না, তাহলে কি জন্যে এলাম?"
"তুমি কি নাচতে চাও নাকি নাঈম?" আমি জিজ্ঞেস করি।
"আমি তো এলামই সেই জন্যে। তুমিও কি যাবে নাচতে?"
আমার কেন যেন হাসি পেল। হাসতে হাসতেই বললাম,"নারে ভাই-তুমিই যাও। আমি আর সুজাত বরং কথা বলি।"

নাঈম মুহুর্তের মধ্যে উধাও হোল লোকজনদের ভিতর। মিনিট খানেক পর দু পাশে দুই ললনাকে নিয়ে তার আবির্ভাব ঘটলো নাচের আসরে। আমি অবাক হ'লাম। ছোকরার তো এলেম আছে দেখছি।

সুজাত আর আমি বসে অল্প অল্প চুমুকে পানীয় খাই। কথা বলি টুকটাক। চারপাশের প্রচন্ড আওয়াজে কথোপকথন চালানো খুব মুশকিল। আশপাশের মানুষ দেখি। খেয়াল করি যে কেমন ভাবে একদম অপরিচিত একজোড়া মানুষ হাত ধরাধরি করে নাচতে চলে যাচ্ছে। এ্যালকোহলই কি এর কারণ? শুনেছি এ্যালকোহল আমাদের ভিতরের অনুশাসনটিকে কমিয়ে দেয়। অনেক সময় তাই মানুষ একটু টিপসী হলে সত্যি কথা বলা শুরু করে।

সুজাত আমার চেয়ে দ্রুত গতিতে তার গ্লাস শেষ করছে। ব্যাটাচ্ছেলের নার্ভ আসলেই শক্ত। সে দিব্যি স্বাভাবিক রয়েছে। আশ্চর্য্য-কি ভয়ানক রক্ষণশীল পরিবারের মধ্যে বেড়ে ওঠা এই মানুষটি কি অবলীলায় বসে গ্লাসের পর গ্লাস হার্ড লিকার নামিয়ে দিচ্ছে। তার চোখের পাতাও কাঁপছে না, গলার স্বরটিও স্বাভাবিক, কথাও বলছে নির্বিকার ভাবে।

নাচের ফ্লোরে এখন একটি ঢিমেতালের গান বাজছে। তার মানে এখনকার নাচটি হবে একটু অন্তরংগ ভাবে। নাঈমের দুই সংগীনির একজন উধাও। অন্যজন নাঈমের গায়ের সাথে লেপটে রয়েছে যেন। তার মাথাটি নামিয়ে দিয়েছে নাঈমের ঘাড়ে। নাঈমের হাত মেয়েটির কোমর জড়িয়ে ধরেছে।

হঠাৎ আমার মনে হয় চারপাশের এইযে উদ্দামতা, এই যে জীবনকে শুষে নেবার প্রচেষ্টা, এটাই বোধকরি পশ্চিমাজীবনের সারমর্ম। আজকেই যা পারো, উপভোগ করে নাও। কালকের কথা কালকে ভাবা যাবে। কে এই মেয়েটি যে নাঈমের সাথে এতোখানি অন্তরংগভাবে নাচছে? সে কি জানে যে নাঈম কে? নাঈম কি জানে যে মেয়েটি কে? এই পরিবেশ বলে, জানার দরকারটাই বা কি? তুমি কে তা জেনে আমার কি লাভ? তোমারও নাচতে ইচ্ছে করছে , আমারও নাচতে ইচ্ছে করছে, এইটুকু জানাই যথেষ্ট। কালকে তুমিও থাকবেনা, আমিও থাকবোনা। লেটস্‌ হ্যাভ আ গুড টাইম টুনাইট!

সুজাতও নাঈমের দিকে তাকিয়ে ছিল। "হি রিয়েলী লাইকস্‌ গার্লস।"
"এ্যান্ড গার্লস লাইক হিম।" আমি গলা মেলাই।

সেই রাতে আমরা ওখানে ঘন্টাখানেকের মতো ছিলাম। আমার কাছে নাইটক্লাব জিনিসটি খুব বোরিং মনে হচ্ছিল। মদ্যপান করলে বা নাচানাচি করলে হয়তোবা ভাল লাগতো। সুজাতের কাছেও ওখানে বসে থাকতে আর ভাল লাগছিলনা, কেননা আমরা কথাবার্তা একদমই বলতে পারছিলাম না বিকট শব্দের জন্যে।
এখান থেকে চলে যাবো তো ঠিকই, কিন্তু যাবো কিভাবে? এসেছি তো নাঈমের গাড়ীতে করে।
সুজাত গিয়ে নাচের ফ্লোর থেকে তাকে ডেকে নিয়ে এলো।
"ইউ গাইজ আর লীভীং?"
"ইয়েস।"
"ওকে-বাই।"
"আরে শালা-বাই মানে কি? তোমাকেও যেতে হবে।"

নাঈম গাঁইগুই করে। "আমি এখন যাবোনা। তোমরা বাস-টাস কিছু একটা ধরে ঘরে ফেরার বন্দোবস্ত করো।"
"এখন বাস-টাস কিচ্ছু নেই। তোমাকেই আমাদেরকে নামিয়ে দিয়ে আসতে হবে।"
"ওহ-কাম অন! লিন্ডার সাথে কেবল একটু জমে উঠেছে, এখন আমি যেতে পারবো না।"
"জমা-জমি পরে হবে। আগে আমাদের নামিয়ে দিয়ে আসতে হবে।"

আরো মিনিট পাঁচেক তুমুল বাহাসের পরে বেচারা নাঈমকে অবশেষে লিন্ডার সংগ ছেড়ে আসতে হয়েছিল। গোটা পথ সে আমাদের সাথে কোন কথা বলেনি। আমার ধারণা যে আমাদের নামিয়ে দিয়ে সে আবার নাইট ক্লাবটিতে ফিরে গিয়েছিল।

ঘটনাটির পর সুজাতের মুখে শুনেছি যে মাঝে মাঝে নাঈম সাহেব একটু একাকিত্বে ভোগেন এবং সে কারণে নারীসংগ পাবার উদ্দেশ্যে তিনি নাইটক্লাবে গমন করেন। যাকগে- আমার কি? তবে এর পর থেকে সে আর আমাকে কোনদিন মসজিদ নিয়ে ঘাঁটায়নি।

আমার নাইটক্লাব অভিজ্ঞতার ইতি হয়েছিল সে রাতেই। যে মানুষ নাচানাচি বা মদ্যপান করেনা তার কাছে এমন জায়গা জেলখানার মতোই দুর্বিসহ।

বছর খানেক পর পড়াশুনা শেষ করে নাঈম হাওয়াই ছেড়ে চলে যায়। তার সাথে আর কোনদিন আমার আর দেখা হয়নি।

সুজাতও তার পিএইচডি শেষ করে ফেলে আমার প্রায় বছর দেড়েক আগে। সে চলে যায় মিশিগানে একটি পোস্ট-ডক্টোরাল ফেলোশিপ নিয়ে। যাবার আগে আমাদের দুজনেরই চোখ ছলোছলো।

"গুডবাই, হয়তো আর কোনদিন দেখা হবে না। ভাল থেকো।"

তখনো আমি জানতাম না যে সে দেখাই আমাদের শেষ দেখা ছিলনা।

(বাকী অংশ পরের পর্বে)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28826121 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28826121 2008-07-31 23:27:19
কামেহামেহা, মানোয়া পাহাড় এবং আলোহা। পর্ব-৩(খ)। মোদোমাতাল ও নারীলিপ্সু

(আগের অংশটুকুর জন্য এখান থেকে পড়ে আসতে হবে)


নাঈমকে আমি প্রথম দেখি মসজিদে।

প্রতি শুক্রবার মসজিদে বেশ লোক সমাগম হয়। বেশীর ভাগ লোকেই অফিস বা ক্লাশ এর ফাঁকে এসে জুমা'র নামাজটি পড়ে যেতে চায়। সবাই থাকে তাড়াহুড়ার ভিতর।

হনলুলুর মসজিদটি আসলে একটি বাড়ি ছিল এককালে। একদম আবাসিক এলাকার মধ্যে এর অবস্থান হওয়াতে ছোট রাস্তার মধ্যে এতগুলো গাড়ি পার্ক করাটা এক ভ্যাজালের ব্যাপার। নাঈমকে আমি প্রথম দিন দেখি যে সে লোকজনকে তাদের গাড়িগুলো পার্ক করানোতে সাহায্য করছে।

তার চেহারা-সুরত আমাদের মতো দেখে প্রথমে ভেবেছিলাম যে সে পাকিস্তানীই হবে। ওরা আবার মসজিদের ব্যাপারে মহা উৎসাহী হয় সেটা জানতে পেরেছি ততদিনে।

কিছুদিন পর আর এক বাংলাদেশীর মাধ্যমে নাঈমের সাথে পরিচয় হোল। সে আসলে কেরালার লোক, মাস্টার্স করছে ইঞ্জিনিয়ারিংএ।

প্রথম আলাপেই সে অনুযোগের স্বরে বললো, "তোমাকে শুধু আমি জুমার দিনেই মসজিদে দেখি।"
"তাতে সমস্যা কি?"
"মসজিদ কি শুধু শুক্রবারের জন্যেই? না-মসজিদে সব সময়ে আসতে হবে।"
আমি এ ধরণের জংগী বক্তব্যে ঘাবড়ে যাই।

নাঈম কথা বলেই চলে, "তুমি কিছু মনে করোনা, তোমরা মানে বাংলাদেশের লোকেরা ধর্মটাকে বেশী সিরিয়াসলি নাওনা। কেমন যেন একটা দায়সারা ভাবে তোমরা মসজিদে আসো। টুপটাপ দুটো সেজদা দিয়ে সালাম ফিরাও, ব্যাস-তোমাদের কাজ শেষ। আমাদের নবী বলেছেন মসজিদে বসে সব কাজ করতে। আমি তো এখানে বসে বসেই আমার পরীক্ষার পড়াশুনা করি।"

আমি তখন পালাতে পারলে বাঁচি। এ আমি কার পাল্লায় পড়লাম রে বাবা?

নাঈম চলে যাওয়ার পর বাংলাদেশীটির দিকে তাকাতে সে হেসে বলে,"নাঈম মসজিদের ব্যাপারে একটু বেশি সিরিয়াস। নতুন লোক দেখলেই টানাটানি শুরু করে দেয়।"

এর পর থেকে নাঈমের মুখোমুখি হইনা তেমন। দূরে থেকে দেখলেই ক্যাম্পাসের গাছ-গাছালীর ভিতর লুকিয়ে পড়ি। কে জানে আবার কি নতুন ফতোয়া-টতোয়া দেয়া শুরু করবে।

শুক্রবারে তাকে দেখা যায় মহাব্যস্ত ভাবে গাড়ী পার্ক করানোতে। মাঝে মাঝে লোকজন না পাওয়া গেলে সে ছোটখাটো খুৎবাও দিয়ে ফেলে। মহা আলেম-টাইপের কোন বক্তৃতা না, ইসলাম নিয়ে আমাদের জানা বিষয়ের উপরই কিছু একটা বলা।

আস্তে আস্তে আমার মসজিদে যাওয়া কমে আসে। নাঈমের সাথে খুব একটা দেখা সাক্ষাৎ হয়না।

একদিন হঠাৎ সুজাত আমাকে বললো,"তুমি না বলেছিলে আমার সাথে একদিন নাইটক্লাবে যাবে?"
"বলেছিলাম নাকি?"
"হ্যাঁ বলেছিলে। আগামী কাল শুক্রবার। রাতে যাবে নাকি আমার সাথে?"
"খামাখা আমাকে নিয়ে টানাটানি কেন হে? আমিতো বলেইছি যে আমি মদ খাইনে, আর মেয়েদের সাথে নাচানাচি করার ইচ্ছে বা সাহস কোনটাই নেই আমার। তাহলে খামাখা সেখানে গিয়ে আমার ফায়দা কি?
সুজাত হাসে। "তুমি যাবে মজা দেখতে। দেখবে পেটে এ্যালকোহল পড়লে মানুষ কেমন বদলে যায়।"

আমি এ কথায় ঘাবড়ে যাই। "তুমি আবার ওখানে গিয়ে মাতলামী করবে নাকি?"
একথায় সুজাতের মনে হয় একটু আঁতে ঘা লাগে। "মাতলামী? আমি করবো মাতলামী? তুমি কি জানো আমার ল্যাবের লোকেরা আমাকে কি বলে?"
"নাহ-আমি কিভাবে জানবো যে তারা তোমাকে কি বলে?"
"তারা বলে যে সুজাত-ইউ ড্রিংক লাইক এ ফিশ।"
"তার মানে কি? আমি আবার ইংরেজী বুঝি কম।"
"তার মানে যে আমি অনেকখানি মদ খেতে পারি কোন রকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই। আমার এ্যালকোহল টলারেন্স লেভেল খুবই হাই। একদম হার্ড লিকার খাই আমি, তাতেও কিসসু হয় না।"
"আচ্ছা বুঝলাম যে তুমি মহা তালেবর লোক। কখন যাবে তাহলে বলো।"
"তুমি তৈরী হয়ে বসে থেকো। আমি ন’টা থেকে সোয়া ন’টার মধ্যে তোমাকে পিক করবো তোমার ডর্ম থেকে।"
"আমাকে পিক করবে মানে? কিভাবে পিক করবে? তোমার তো গাড়ী নেই। সাথে গাড়ী থাকলেই না লোকে পিক করার কথা বলে।"
"আমার সাথে আমার এক বন্ধুও যাবে। তারই গাড়ী। কাল রাতে আমরা একটা বিশেষ নাইটক্লাবে যাবো। একটু দূরে সেটা। একদম ওয়াইকিকি বীচের উপরে। একটা ফাইভ-স্টার হোটেলের পঁচিশ তলায়। নাইটক্লাবটি একটু ক্ল্যাসি। আজেবাজে লোকেরা যায়না সেখানে। কাভার চার্জও বেশ বেশী।"
"কাভার চার্জ আবার কি?"
সুজাত আমাকে সবক দেয়।"নাইট ক্লাবে ঢুকতে গেলে একটা ফি চার্জ করে ওরা। তাকেই বলে কাভার চার্জ। তবে তুমি যেহেতু প্রথম বারের মতো যাচ্ছ, তাই তোমার কাভার চার্জটি কালকে আমিই দিয়ে দেব। পরের বার নাহয় তুমি দিও।"
"পরের বার মানে?"
সুজাত হাসে। "কে জানে? তুমি হয়তো জায়গাটি পছন্দও করতে পারো। ইন দ্যাট কেইস, তুমি হয়তো পরে আবার ওখানে যেতে চাইবে।"

মনের মধ্যে কু-চিন্তা খেলে গেল। সুজাতের মতলবটা কি আসলে? ও কি আমাকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে কিছু খাইয়ে দেবে নাকি?

যাবার আগে সুজাত বলে গেলো, "ও ভালো কথা-যেহেতু এই নাইট ক্লাবটি খুবই ক্ল্যাসি, ভাল জামাকাপড় পরো কিন্তু। শর্টস আর স্যান্ডেল পরে গেলে ওরা কিন্তু ভিতরে ঢূকতে দেবে না।"

এখানে বলে রাখা ভাল যে হনলুলুতে লোকে খুবই ইনফরম্যাল জামাকাপড় পরে। শর্টস আর হাওয়াই চপ্পলই হচ্ছে বেশীর ভাগ লোকের পোশাক। শুধুমাত্র অল্পকিছু পেশার লোকেরাই নিয়মিত স্যুট-টাই পরে। এখানে যদি কেউ একটু ফরম্যাল পোশাক পরে তাহলে ধরেই নেওয়া হয় যে এই গাধা নিশ্চয়ই ট্যুরিস্ট। "কামাআইনা" (হাওয়াইয়ান ভাষায় এর অর্থ হচ্ছে স্থানীয় বা দেশী) হলে তো এই পোশাক পরার কথা না।

যাই হোক, ঘটনার দিন সন্ধ্যেবেলাতেই ডিনার খেয়ে নিলাম। তারপর স্যুটকেস খুঁজে একটু ভাল জামা-কাপড় পরলাম। তার মানে স্যুট-টাই নয় (অর ও জিনিস আমার ছিলোও না)। রেগুলার প্যান্ট-শার্টই।

ঘরে বসে টিভি দেখছি। ঠিক ন'টার সময় ফোন বাজলো। সুজাত।
"আমি ডর্মের নীচে আছি। নেমে এসো।"
"আসছি।"

সাধারণতঃ সুজাতকে আমি দেখেছি জীনস্‌ আর টীশার্ট পরা অবস্থায়। এখন তো দেখি বাবু বেশ মাঞ্জা মেরেছেন। অবশ্য খুব বেশী না। আমারই মতো জামা-কাপড়। তাতেই তাকে বেশ ভালই লাগছে।
"কই তোমার গাড়ীওয়ালা বন্ধু কই?"
"বাইরে রাস্তায় ওয়েট করছে। চলো যাই তাহলে।"
"চলো।"

ডর্মের সামনের রাস্তায় গাছটির নীচে একটি গা• রঙ্গের গাড়ী। সুজাত সামনে গিয়ে দরজা খুললো। গাড়ীর ভিতরের বাতিটি জ্বলে উঠলো সাথে সাথে। ড্রাইভিং সীটে বসে থাকা মানুষটি আমার দিকে ঘুরে তাকায়।

তাকে দেখে আমি ভূত দেখার মতো চমকে উঠি। মানুষটি আর কেউ না, আমাদের সবার অতি পরিচিত জনাব জংগী ফতোয়াবাজ নাঈম।

নাঈমও আমাকে দেখে একটু যেন ফ্যাকাশে হয়ে যায়।
আমিই আগে সামলে নেই। একটু হেসে বলি, "সালাম আলাইকুম, নাঈম। ইটস গুড টু সী ইউ।"
"ওয়ালাইকুম আস সালাম। এসো-ভিতরে এসো।"

সুজাত আমাদের কাজ-কারবার দেখে অবাক হয়। "ইউ গাইজ নো ইচ আদার?"
"হ্যাঁ-মসজিদে দেখা হয়েছে আমাদের।"

গাড়ী চলছে আস্তে আস্তে। আমরা সবাই চুপ করে আছি। কিছূক্ষণ পর অকস্মাৎ সুজাত হো হো করে হেসে ফেলে। আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকাই। কি হোল আবার?

সুজাত হাসতে হাসতে বলে, "ও-ইট ইজ সো ফানি। আমি দুই মসজিদ-পীপলকে নিয়ে নাইটক্লাবে যাচ্ছি। আমি শিউর উইল গো টু হেল ফর দিস।"

(বাকী অংশ পরের পর্বে)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28825126 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28825126 2008-07-29 00:46:10
কামেহামেহা, মানোয়া পাহাড় এবং আলোহা। পর্ব-৩(ক)। মোদোমাতাল ও নারীলিপ্সু

ওমর খৈয়াম এর বর্ণনায় স্বর্গের উপাদান হিসেবে যে কয়েকটি জিনিস থাকতে হবে তা হচ্ছে গাছের ছায়া, আহার্য্য, মদ, সাকী (প্রেমিকা) এবং পড়ার জন্যে বই। তার কবিতার বংগানুবাদটি অনেকটা এ রকম

"এইখানে এই তরুতলে
তোমায় আমায় কৌতূহলে
এই জীবনের আর ক'টা দিনে কাটিয়ে দেবো প্রিয়ে
সংগে রবে সুরার পাত্র
অল্পকিছু আহার মাত্র
আর একখানি ছন্দ-মধুর কাব্য হাতে নিয়ে।"

কেন ওমর খৈয়ামকে স্মরণ করছি, সে কথা বলছি পরে।

বিদেশে গেলেই নিজের দেশের প্রতি টানটি ভালভাবে অনুভব করা যায়।
আমার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। হাওয়াইতে যাবার পর থেকেই মনটা কেবলই হুহু করে। ভাগ্য ভাল যে হনলুলুর আবহাওয়াটা ট্রপিক্যাল হওয়াতে কেমন কেমন একটা দেশ-দেশ ভাব লাগে। সমুদ্রতীরের সারি সারি নারকেল গাছ যখন উত্তাল হাওয়ায় দুলে ওঠে, তখন মনে হয় কই বিদেশ, আমিতো সেই খুলনাতেই যেন আছি। অবশ্য সে ভুল ভাংতে বেশীক্ষন সময় লাগে না, তখন মেজাজটা আরো খারাপ হয়।

বাইরে যখন বেরুই, তখন চোখ কেবলই খুঁজে ফেরে আমাদের মতোন দেখতে এমন কাউকে। হোক না সে ভারতীয়, কিংবা নেপালী, বা ফিলিপিনো। দুধের সাধ ঘোলে মেটানো মতো এদেরকেই মনে হয় কাছের মানুষ।

ইতিমধ্যে ক্লাশ শুরু গেছে। গবেষণার কাজ শুরু করতে হবে কিছুদিন পর। কিন্তু কি নিয়ে কাজ করবো, কোথায় কাজ করবো, কার সাথে কাজ করবো, তার কিছুই জানিনা। আপাততঃ ক্লাশের পড়াশুনা নিয়েই খাবি খাচ্ছি।

জনৈক মুরুব্বী উপদেশ দিয়েছিলেন যে প্রথম সেমেস্টারে পরীক্ষায় ভাল গ্রেড পাওয়াটা খুবই দরকারী। প্রথমতঃ নিজের উপর বিশ্বাস অর্জন করা, দ্বিতীয়তঃ টীচাররাও জানলেন যে এই বান্দা অশিক্ষিত গর্ধভ নয়। সেই উপদেশ মেনে জান-প্রাণ দিয়ে লড়ে যাচ্ছি, ক্লাশে অন্য ছেলেপেলেরা সব সাদা, এবং তারা আমাকে কোন রকম পাত্তা দেয়না। কি আর করা? রাতের পর রাত বইয়ের খাতা খুলে জেগে থাকি, ভাল গ্রেড পেতেই হবে।

এমনি এক দিন হঠাৎ ক্লাশ শেষে বেরোনোর সময় সামনে পড়লো এক জনাব। চেহারাটি দেখতে আমাদের দিককারই মনে হয়। মুখখানি হাসি-হাসি। বয়েসও খুব বেশী মনে হয়না। আমাকে দেখেই সে হাত বাড়িয়ে দিল,"আমার নাম সুজাত। সুজাত আলী। তোমার সাথে পরিচয় করতে এলাম।"

ডিপার্টমেন্টের লাইব্রেরীতে বসে কোক খেতে খেতে তার সাথে কথা হোল অনেক। সুজাত এর বাড়ী ভারতের হায়দরাবাদে। সে আমার বিভাগেরই ছাত্র। পিএইচডি করছে এখন। সে শুধু দেখতেই কম বয়সী না, সে আসলেই কম বয়সী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজটের গ্যাঞ্জামে পড়ে যে কয়টি বছর হারিয়েছিলাম, তার জন্যে আবারো দুঃখ লাগলো। যাকগে-পুরনো জিনিস নিয়ে খামাখা হা হুতাশ করে কি লাভ?

সুজাত ভয়ানক হাসিখুশী টাইপের ছেলে। সে যখন জানতে পেরেছিল যে এবার বাংলাদেশ থেকে একজন আসছে পি এইচ ডি করতে, তখন থেকে সে মুখিয়ে ছিল আমার সাথে আলাপ করার জন্যে। সুজাত আমার এক বৎসর আগে এসেছে বলে সেও আমাকে বেশ কিছু উপদেশ-টুপদেশ দিল। কোন টীচার কড়া, কোন টীচার দয়ালু, ইত্যাদি ইত্যাদি।

যেহেতু সুজাত ইতিমধ্যেই তার গবেষণার কাজ শুরু করে দিয়েছে, তার ল্যাবে গেলেই তার দেখা মেলে। সে কাজ করছে রিল্যাক্সিন নামের একটি হরমোনের উপর।

একদিন জিজ্ঞেস করলাম,"এত কিছু জিনিস থাকতে রিল্যাক্সিন কেন?"
সে প্রশ্নে সুজাত ম্লান হাসে। "তোমার মতো কপাল নিয়ে তো আমি আসিনি।"
"এর মধ্যে আমি আবার কোথথেকে এলাম?"
"ভাইরে, গবেষণা-টবেষণা কিসসু না। টাকাটাই হচ্ছে আসল জিনিস।"
"কি রকম? খুলে কও দেখি।"
"থিসিসের বিষয় বড় ব্যাপার না। বড় ব্যাপার হচ্ছে কোন প্রফেসরের কাছে টাকা আছে, আর কোন প্রফেসর পাশ করার পর একটা চাকরি পেতে সাহায্য করবে। আমি যার ল্যাবে কাজ করি, তার একটা বড়সড় রিসার্চের ফান্ড আছে, তাই সে আমাকে একটা অ্যাসিসট্যান্টশিপ অফার করেছিল। তুমি এখানে এসেছো স্কলারশিপ নিয়ে, তোমার তো আর টাকা নিয়ে মাথা ঘামাতে হয়না। তুমি যে কারো সাথেই কাজ করতে পারবে। আমার তো সে কপাল নেই।"

ব্যাপারটা জানা ছিলনা। জেনে আরো খারাপ লাগলো। আমিতো ভেবেছিলাম বিদেশীরা সবাই আমার মতো কোন না কোন ভাবে কিছু একটা টাকার জোগাড় করেই তবে এখানে পড়তে আসে।

অবশ্য রিল্যাক্সিন নামের হরমোনটি নিয়ে কাজ করা কোন খারাপ কিছু না। প্রশ্ন হচ্ছে যে যদি সুজাতের অন্য কিছু নিয়ে কাজ করার ইচ্ছে থাকতো, তাহলে কি সে তা করতে পারতো? বোধহয় না।

সুজাতের সাথে মাঝে মাঝেই জোর আড্ডা হয়। একদিন শুনলাম যে সে খুব কনজারভেটিভ মুসলিম পরিবারের ছেলে।
"কি রকম কনজারভেটিভ শুনবে? আমার বোনেরা আমার হাফ-প্যান্ট আমলের বন্ধুদের সামনেও বের হয়না, এমন কনজারভেটিভ।"
"তাই নাকি? সাংঘাতিক তো তোমরা।"
সুজাত ম্লান হাসে। "আমাদের ওখানে মুসলিমরা সবাই বলতে গেলে এই রকমই।"
"নারে ভাই-আমাদের দেশে যে এইরকম রক্ষনশীল পরিবার নেই তা না, তবে তাদের সংখ্যা খুবই কম।"

এরই মধ্যে দু একবার স্থানীয় মসজিদে যাওয়ার সুযোগ ঘটেছে। প্রতি শুক্রবার হালে মানোয়া থেকে একটি ভ্যান মসজিদে যায়। ওই সময়টিতে আমার কোন ক্লাশ না থাকাতে মাঝে মাঝে আমিও যাই জুমা'র নামাজ পড়তে। সেখানে নানান দেশের লোক/মহিলা আসেন। তাদেরকে দেখে ভালই লাগে। আমাদের মধ্যে কতকিছু আলাদা, কিন্তু তাও আমরা সবাই একই ভাবে নামাজ পড়ছি, একই সুরা, একই রকম খুৎবা। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নামাজ পড়বার সময় মনে হয় যেন একটি মিনি-হজ্বের জমায়েত হচ্ছে এখানে।

মসজিদের ইমাম তাইওয়ানের লোক। নাম মুহাম্মদ আবদুর রহিম। বয়েস আশির কোঠায় হবে। নরম মানুষ। অসম্ভব নূরানী চেহারা। দেখলেই মনে সম্ভ্রম জাগে, শ্রদ্ধা জাগে। তিনি আরবীতে খুৎবা যখন দেন তখন তাকে খুবই এ্যানিমেটেড মনে হয়।

নামাজ শেষে প্রায় প্রতিদিনই কিছু না কিছু খাবার থাকে সবার জন্যে। কোন দয়াবান মুসলিমের কন্ট্রিবিউশন। তখন খিদেটিও বেশ জমে আসে। আয়েস করে খাই ভিনদেশী বিরিয়ানী, পরোটা-মাংস কিংবা বাক্লাভা।

একদিন হঠাৎ কথা বলতে বলতে মনে পড়লো, যে সুজাতকে কখনো মসজিদে দেখিনি আমি। আহা-বেচারা মনে হয় জানেওনা যে এখানে একটি মসজিদ আছে।

পরদিনই দিলাম তাকে খবরটা। "তুমি কি জানো যে এখানে একটা মসজিদ আছে?"
সে ঘাড় নাড়লো। "হ্যাঁ-শুনেছি যে মানোয়া ভ্যালীতে নাকি মসজিদ আছে একটা। কেন তুমি কি সেখানে যেতে চাও?"
"আরে-আমিতো প্রায় শুক্রবারেই যাই সেখানে। তোমাকে কখনো দেখিনি বলে ভাবলাম যে তুমি মসজিদের ব্যাপারটি জানো কিনা। যাই হোক- আমাদের ডর্ম থেকে একটা ভ্যান কিন্তু যায় সেখানে। ইচ্ছে করলে তুমিও আমাদের সাথের ভ্যানে করে যেতে পারো।"
সুজাত এবার ইতস্ততঃ করে। "তেমন সময় পাইনে আমি। দেখি যদি কখনো সময় পাই, তাহলে জানাবো তোমাকে।"
আমি আর বেশী জোর করিনে।

কয়েক দিন পরের কথা। একটা প্ল্যান করছি যে শনিবারে রান্নার বই দেখে একটা মোগলাই কোন কিছু রান্না করবো। সুজাতকে বললাম,"আগামী শনিবারে আমার ওখানে তোমার দাওয়াত।"
সে কাঁচুমাঁচু করে," শুক্র আর শনিবার রাতে আমি একটু ব্যস্ত থাকি সাধারণতঃ। আসতে পারবো না মনে হয়।"
"কি এমন রাজকাজ আছে হে তোমার যে ফ্রি খাবার খেতে আসতে পারবে না? স্বীকার করছি যে আমি নতুন রাঁধিয়ে, কিন্তু একেবারে অখাদ্য বানাবো না সেটা গ্যারান্টি।"
"না না-তোমার রান্না খেতে আমার কোনই আপত্তি নেই, বরং ডর্মের ডাইনিং হলের একঘেঁয়ে খাবার খেয়ে খেয়ে আমার পেটে চড়া পড়ে গেছে। কিন্ত ওই যে বললাম, শুক্র আর শনিবার রাতে আমি ব্যস্ত থাকি। আমি বরং রোববারে আসি?"
"কি কেইস বলো দেখি?"
সে আবারো মুখ কাঁচুমাঁচু করে, "আছে একটু কাজ।"
"কি কাজ সেটাই তো জানতে চাই।"
চাপের মুখে এবারে সে মুখ খোলে। "আসলে আমি ওই দুইদিন একটু নাইটক্লাবে যাই।"

বলে কি ছেলে? নাইটক্লাবে যায়?

"সেখানে গিয়ে তুমি কি করো? মেয়েদের সাথে নাচানাচি?"
সে মুখ নামিয়ে বলে,"না না- মেয়েদের ধারে কাছেও যাইনে আমি।"
"তাহলে?"
"আমি আসলে ওখানে যাই ড্রিংক করতে।"
"ড্রিংক? মানে মদ খেতে?"
"হ্যাঁ-হার্ড লিকার। হুইস্কি অন দ্য রক্‌স্‌ জাতীয়। আমি আবার বীয়ার-টীয়ার খেতে পারিনে একদম।"
"তুমি মদ খাও? তারপর মাতলামী করো?" আমি গোটা ব্যাপারটি কেমন যেন বুঝে উঠতে পারিনে। ভয়ানক কনজারভেটিভ মুসলিম পরিবারের সন্তান নিয়মিত উইক-এন্ডে নাইটক্লাবে গিয়ে মদ খাচ্ছে? তাও কিনা সুজাতের মতো একটা বাচ্চা ছেলে যার নাক টিপলে দুধ বেরোয়।

আমাকে কেউ যদি এই কথা বলতো, আমি তা কোনকালেই বিশ্বাস করতাম না।

সুজাত হেসে বলে,"যদি মন চায়, আমার সাথে যেতে পারো একদিন।"
আমি গম্ভীর সুরে বলি,"আমি মদ খাবোনা বলে প্রতিজ্ঞা করেছি।"
"কি মুশকিল! আমি কি তোমাকে মদ খেতে বলেছি? আমি তোমাকে আমার সাথে যেতে বলেছি শুধু। তুমি কোক-পেপসী কিছু একটা খেও।"
"আচ্ছা- সেটা নাহয় পরে দেখা যাবে।"

বুঝলাম ওমর খৈয়ামের স্বর্গের উপাদানের মধ্যে একটা যোগাড় করতে পেরেছে সুজাত।

এর ক'দিন পর আলাপ হোল নাইমের সাথে।

(বাকী অংশ পরের পর্বে)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28823504 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28823504 2008-07-23 23:38:26
কামেহামেহা, মানোয়া পাহাড় এবং আলোহা। পর্ব-২(গ)। স্বাগতিক ইঞ্জেকশন ও আলুথালু সহচরী


(আগের অংশটুকুর জন্যে এখান থেকে পড়ে আসতে হবে)


লাঞ্চের পর ভাবী তার কাজে চলে গেলেন। শুনলাম উনি ইউনিভার্সিটিতেই কোন অফিসে যেন কাজ করেন। আমি আর শামস ভাই চেয়ারে গা এলিয়ে দিলাম। অতিমাত্রায় খাওয়ার পর আমার আর নড়তে ইচ্ছে করছিল না।

শামস ভাই বললেন যে হনলুলুতে বাংলাদেশীদের সংখ্যা বেশী না। আর যারা আছে তারা প্রায় সবাই আমাদের মতো ছাত্র। সব মিলিয়ে দশ বারোটি পরিবার হবে হয়তো। আমাদের ডরমিটরীতেই আরো চার-পাঁচ জন ছাত্র আছেন বাংলাদেশের।

আরো শুনলাম যে এখানে প্রতিটি দেশের ছাত্রদেরই একটি সংগঠন আছে, বাংলাদেশেরও আছে। আর প্রতিবছরই স্বাধীনতা দিবস ইত্যাদি উপলক্ষে অনুষ্ঠান করে তারা। শুনে আমার কাছে ভালই লাগলো। যাক-তাহলে এখানে আরো কিছু দেশী ভাইবোনেরাও আছেন দেখা যাচ্ছে।

আমাদের কথার মাঝখানে হাজির হলেন আর এক বাংলাদেশী। তিনি পড়াশুনা করছেন পাবলিক হেলথে। তার বাচ্চাকাচ্চা আছে বলে তিনি হালে মানোয়ায় থাকেন না, বাইরে বাসা ভাড়া করে থাকেন। তিনি এসে দুটো খবর দিলেন। ভাল খবরটা হচ্ছে যে তিনদিন পর একটা বাংলাদেশী গেট-টুগেদার হবে। সেখানে সবার সাথে নতুন ছাত্রদের পরিচয় করিয়ে দেয়া হবে, এবং সেখানে আগামী বছরের স্টুডেন্ট এ্যাসোসিয়েশন এর প্রেসিডেন্ট ইত্যাদি ঠিক করা হবে।

খারাপ খবরটা হল এখানকার নিয়মই হচ্ছে যে নতুনরাই এসে স্টুডেন্ট এ্যাসোসিয়েশনটা চালায় এক বছরের জন্য। পরের বছর যখন আবার নতুন কেউ আসবে তখন তার হাতে (বা কাঁধে) চাপিয়ে দেয়া হবে স্টুডেন্ট এ্যাসোসিয়েশনের ভারটি।

কথাটি বলে তিনি আমার দিকে অর্থপূর্ণ ভাবে হাসলেন। ভাবখানা এই যে-প্রস্তুত হও। সামনে দায়িত্ব আসছে।

আমি কোনকথা না বলে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলাম, কিন্তু মনটি খুঁতখুঁত করতে থাকলো।

কথায় কথায় পড়াশুনার কথা উঠলো। আমি কঠিন বিজ্ঞানের ছাত্র এটা শুনে তারা বললেন যে সাধারণতঃ বাংলাদেশ থেকে হয় আর্টস বা ইঞ্জিয়ারিং এর ছাত্ররাই এখানে আসে। আমি যেহেতু কোন দলেই পড়িনা, তাই আমাকে কেইই বা তথ্য দিয়ে সাহায্য করবে?

এমন সময় শামস ভাই বললেন,"ভাল কথা, তোমার বাডির সাথে যোগাযোগ হয়েছে নাকি ইতিমধ্যে?"

এই প্রশ্নে মেজাজ খারাপ হোল আমার। প্রথমতঃ বাডি আবার কি জিনিস? খায় নাকি মাথায় দেয়? দ্বিতীয়তঃ আমি তো এখানে ল্যান্ড করার পর থেকেই আপনার সাথে আছি। যোগাযোগ করবো কখন?

শামস ভাই ব্যাখ্যা করেন। "প্রতিটি নতুন ছাত্রের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় একজন পুরনো ছাত্রকে ঠিক করে যে তাকে বিভিন্ন ইনফরমেশন দিয়ে সাহায্য করবে। তাকে বলা হয় বাডি। বাংলায় বলা যায় বন্ধু, সহচর।"
"এ তো মহা ঝামেলার কথা। এখন আমি বাডি খুঁজে পাবো কোথায়?"
"তোমাকে ঢোকার সময় দুটো ঢাউস ফাইল দেয়া হয়েছিল না? ওখানেই বলা আছে কে তোমার বাডি।"
"তাই নাকি? ঘরে গিয়ে তাহলে তো পড়তে হবে ফাইলগুলো।"

আস্তে আস্তে বিকেল গড়িয়ে এলো। শামস ভাই একপ্রস্থ চায়ের আঞ্জাম করলেন। দুধছাড়া চা। এই জিনিসটি আমার দু চোখের বিষ। চা ই যদি খাবো, তাহলে দুধ চিনি যা আছে সব দিয়েই খাবো। কিন্তু ওখানে কেইই বা আমার পছন্দ মতো চা বানাবে? দীর্ঘশ্বাসের ফেনায় ভরে ওঠে বুক। শালা, এমন বিদেশে কেউ আসে?

শামস ভাই হঠাৎ করে জিজ্ঞেস করলেন,"ও ভাল কথা-তোমাকে নিয়ে একটু দোকানে যাবো ভেবেছিলাম। চলো-এখনই তাহলে যাই।"
"দোকানে যাবেন? কেন?"
"তোমার তো কিছু জিনিসপত্র কেনা দরকার।"
"আমি আবার কি কিনবো? সব কিছু তো দেশ থেকে নিয়েই এসেছি।"
"আচ্ছা-তাই নাকি? তা কাল সকালে তুমি ব্রেকফাস্ট কি দিয়ে করবে? তোমার ঘরে কি কিছু আছে? এই যেমন দেশ থেকে আনা চিঁড়ে-মুড়ি?"
ও হ্যা- তাইতো। খাবার-দাবারের তো কোন বন্দোবস্ত করাই হয়নি। চিরটা কাল খিদে পেলে আশেপাশে কোন না কেন খাবার দোকান পেয়েই গেছি দু চার পায়ের মধ্যেই। এখানে তো আবার যে সুবিধে নেই।
"খাবারের কথা একদম ভুলে গিয়েছিলাম শামস ভাই।"
"শুধু খাবার না। এই ধরো তোমার যদি পানির পিপাসা পায়, তাহলে কিসে করে পানি খাবে? হাতের আঁজলায়? ভাত খাবে কিসে করে? প্লেট-জাতীয় আছে কিছু?"
"ও হ্যাঁ-তাইতো।"
"গোসল করবে কি দিয়ে? সাবান শ্যাম্পু আছে কিছু সাথে?"
"ও হ্যাঁ-তাইতো।"
"সাথে খাতা-কলম কিছু এনেছো? সেগুলো কিনতে হবে না?"
"ও হ্যাঁ-তাইতো।"
"চুল আঁচড়ানোর চিরুনী? দাড়ি কামানোর রেজর? শেভিং ক্রীম?"

এবারে আমি হাতজোড় করি। "শামস ভাই-আর লিস্ট দেওয়া লাগবে না। আই গট দ্য পয়েন্ট। এখন তাড়াতাড়ি চলেন, দোকানে যাই।"

গাড়িতে করে গেলাম, মিনিট সাতেক লাগলো যেতে। পাশাপাশি দুটো বড় দোকান। প্রথম দোকানটির নাম লংস ড্রাগস। পাশেরটির নাম সেইফওয়ে। শামস ভাই আমাকে ঢোকালেন পরেরটাতেই। "এখানেই তোমার সবকিছু মিলে যাবে।"

পয়লা পেটের চিন্তা। পাঁউরুটি। দাম দেড় ডলার। মাথার মধ্যে ক্যালকুলেটরটি সজীব হয়ে উঠলো। তার মানে বিয়াল্লিশ টাকা। ওরে সর্বনাশ। এক পাউন্ড রুটির দাম বিয়াল্লিশ টাকা। এতো দেখি গলাকাটা দাম (সে আমলে আমরা মামারুটি বলে একটি পাঁউরুটি খেতাম ঢাকাতে যার দাম ছিল দু টাকার মতো।)

আমার মুখের অবস্থা দেখে শামস জিজ্ঞেস করেন,"কি ব্যাপার? এনি সমস্যা?"
"বিরাট সমস্যা শামস ভাই। এখানে জিনিসের দামতো দেখি ভয়াবহ। না খেয়েই মারা যেতে হবে দেখছি। আগে জানলে দেশ থেকে চাল-ডাল সব নিয়ে আসতাম।"
শামস ভাই সবজান্তার মতো হাসেন। "বুঝেছি, তুমি ডলারকে মনে মনে টাকায় কনভার্ট করছো নিশ্চয়ই। আমেরিকায় থাকতে হলে কয়েকটা জিনিস শিখতে হবে। তার প্রথমটি হচ্ছে ডলারকে টাকায় কনভার্ট করা যাবে না। কাজটি কঠিন। তবে সমাধান হচ্ছে যে তুমি কখনো ডলার শব্দটি উচ্চারন করবে না। দাম মনে করবে টাকাতে। এই যেমন পাউরুটি হচ্ছে দেড় টাকা, জ্যাম একটাকা নব্বই, টীব্যাগের প্যাকেট হচ্ছে দুই টাকা। দেখবে তখন কোনকিছু কিনতে আর অত খারাপ লাগছে না।"

বলা সহজ, কিন্তু করা কঠিন। তবুও মনে মনে আওড়াই, রুটি দেড় টাকা, জ্যাম এক টাকা নব্বই।

আস্তে আস্তে কেনা হয় অনেক কিছুই। জিনিসপত্রের ভারে নুয়ে পড়ি। এতসব জিনিস লাগে মানুষের!

সন্ধ্যেবেলা নিজের ঘরে ফিরে আসি। টেবিলের উপর রেখে গিয়েছিলাম ঢাউস ফাইল দুটোকে। এবারে সেগুলো খুলি। দেখি কি তথ্য লুকিয়ে আছে এর ভিতরে।

কিছুক্ষণ পর তথ্যের ভারে কান গরম হয়ে যায়, মাথা ঝিমঝিম করে, বুক ধড়ফর করে। এতসব ইতিহাস পাতিহাস বয়ান করার কোন দরকার আছে? এর মধ্যেই অবশ্য খুঁজে পাই আমি যা খুঁজছিলাম। আমার বাডি, আমার সহচরী।

তার নাম এভেলিন কোয়ে, নামের পাশে ফোন নাম্বারটিও দেওয়া আছে। ঠিকানা দেখে বুঝলাম সে উনি হালে মানোয়াতেই থাকেন। যাক বাবা- এক ঝামেলা থেকে বাঁচা গেল। অফ ক্যাম্পাসে থাকলে তার সাথে দেখা করতে যেতাম কি করে।

আমার ঘরের বাইরেই একটি কমন ফোন রাখা আছে। শুধু মাত্র লোকাল কল করা যায় তাতে। সেটারই ডায়াল ঘুরাই দ্রুত।
"হ্যালো।" ওপাশের গলাটি কেমন যেন উদাস উদাস মনে হোল।
"হ্যালো, আমি কি এভেলিনের সাথে কথা বলতে পারি?"
"আমিই এভেলিন। তুমি কে?"
"আমি নির্বাসিত। আমি আজই এসেছি। আমাকে দেওয়া ফাইলে দেখলাম যে তুমি আমার বাডি। তাই তোমাকে ফোন করছি।"
মেয়েটি কেমন যেন অন্যমনস্ক গলায় বললো,"ও হ্যাঁ- আমাকে বলেছিল যে ওরা তোমাকে আমার নাম দিয়েছে। তা তুমি কি হনলুলুতে পৌছে গেছো?"
"হ্যাঁ, আমি এখন হালে মানোয়াতে আছি।"
"তাই নাকি! ভাল খুবই ভাল।"
"আমি ভাবছিলাম যে তোমার সাথে কথা বলতে বসবো।"
"ও হ্যাঁ-নিশ্চয়ই। কাল রাতের বেলাতে এসো।"

পরদিন সন্ধ্যেবেলায় হাজির হ'লাম তার ঘরের সামনে। একদম খালিহাতে যেতে নেই বলে দু ক্যান কোক সাথে নিয়েছিলাম। ডরমিটরীর নীচতলার ভেন্ডিং মেশিন থেকে সদ্য কেনা। বরফ-ঠান্ডা।

দরজায় টুকটুক করে নক করি। একটু পরে দরজা খুললো। সামনে দাঁড়িয়ে শ্রীমতী এভেলিন কোয়ে। আমার বাডি।

তাকে এবং তার ঘরের অবস্থা দেখে আমি মনে মনে শিউরে উঠলাম।

ঘরটি একটি ডাবলরুম। মানে আমার এক চিলতে ঘরের দ্বিগুণ। ঘরের দুপাশে দুটো বিছানা, দুটো পড়ার টেবিল। এর মধ্যেই আমি জেনেছি যে একবছর পর ছাত্ররা ডাবলরুম পায়। তখন একটু হাত-পা ছড়িয়ে থাকা যায়।

এভেলিনের ঘরের বিছানা এবং পড়ার টেবিলের উপর কোন ফাঁকা জায়গা নেই। ভর্তি বই, জার্নাল আর নানাবিধ কাগজ-পত্র দিয়ে। এমনকি ঘরের মেঝের অর্ধেকটাও ওই জাতীয় জিনিসে পূর্ণ। এই ঘরে ঢুকলে যে কোন সুস্থ মানুষের পাগল হ'তে মাত্র তিন মিনিট সময়ের বেশী লাগবে না।

ঘরের অবস্থা থেকে এবার চোখ ফিরাই আমার বাডির দিকে। যা মনে করেছিলাম, একদম তাই। এভেলিনকে দেখে কারো মনে কোন সন্দেহ থাকবে না যে মেয়েটির ভাবসাব স্বাভাবিক না। কথা-বার্তা এলোমেলো, চলাফেরার ভংগী আলুথালু, চোখের দৃষ্টি পাগলাটে।

কথায় কথায় জানলাম যে সে মালয়েশিয়ার মেয়ে। পিএইচডির থিসিস জমা দেবে মাস খানেকের মধ্যে। এখন থিসিস লেখার কাজ চলছে বলে তার ঘরের (এবং তার নিজের) এইরকম আলুথালু অবস্থা। আরো ভয়ের কথা হচ্ছে যে সে আমার ডিপার্টমেন্টেরই ছাত্রী। তার সাথে দু মিনিট কথা বলে আমার ভিতরটা আতংকে হিম হয়ে গেল। আমার অবস্থাও কি তাহলে এরকমই হবে? সর্বনাশ! এ আমি কোন দোজখে এসে পড়লাম রে বাবা!

আমি এভেলিনকে বললাম যে আমি তার বেশী সময় নেবো না, যদি সে কিছু তথ্য দিয়ে আমাকে সাহায্য করতে পারে তাহলে বড় বাধিত হই।
"তুমি ভ্যাগাব্যানের সাথে দেখা করেছো?" এভেলিন শুধোয় আমাকে।
"ভ্যাগাব্যান? সে কে?"
"ডঃ ভ্যাগাব্যান। আমাদের ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান। মাস্তান লোক, ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্ট্রির টেক্সট বই লিখেছে। তোমাদের ওদিককারই লোক।"

আস্তে আস্তে সে রহস্য পরিষ্কার হোল। যার কথা এভেলিন বলছিল উনার নাম ডঃ এন ভি ভগবান। সাউথ ইন্ডিয়ার লোক, বহুদিন থেকে ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান। একটি বেশ চালু টেক্সট বইয়ের লেখক।

"নাহ- আমার সাথে কারোরই দেখা হয়নি। আমি ডিপার্টমেন্টেই যাইনি এখনো।"
"গুড। তাহলে তোমাকে কয়েকটা কাজের কথা বলি। তোমার উপকার হবে।"
আমি আধা-পাগল বাডির দিকে তাকিয়ে থাকি।
"তুমি অফিসে গেলেই তার সাথে দেখা হবে। কি কি কোর্স নেবে তার সাথে কথা বলে ঠিক করে নিও।"
"এটা আবার ঠিক করার কি আছে? সবাই যা নেবে, আমিও তাই নেবো, নয়কি?"
"না-না, ব্যাপারটা তুমি তোমার দেশের নিয়মের সাথে গুলিয়ে ফেলছো। তোমাদের ওখানে বোধহয় সবাইকেই একই কোর্স নিতে হয়। এখানে তা নয়। এখানে তুমি ইচ্ছেমত কোর্সে রেজিস্ট্রেশন করতে পারো। তবে কোর্স নেবার আগে ভ্যাগাব্যান তোমাকে একটা পরীক্ষা দিতে বলবে।"
"পরীক্ষা? কিসের পরীক্ষা? আমিতো এখনো ক্লাশই করিনি, তার আগেই আবার কিসের পরীক্ষা?"

এভেলিন এবার একটু হাসে। "আমিও অবিকল তোমার মতই একই কথা ভেবেছিলাম। এই পরীক্ষার নাম প্লেসমেন্ট টেস্ট। ওরা জানতে চায় যে তোমার পড়াশুনার মান কতটুকু। যাই হোক- এই টেস্টের দুটো অংশ আছে। প্রথম পার্টটি বায়োকেমিস্ট্রি, পরেরটা ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রি। আমি চোখ বুজে বলে দিতে পারি যে দ্বিতীয় অংশে তুমি ফেল করবে, কেননা আমি যতটুকু জানি এই অংশে কেউ পাশ করেনা তা সে যতবড় মাস্তানই হোক না কেন।"

আমি আবারও ভয় খেয়ে যাই। পরীক্ষার আগেই এজাতীয় ফলাফল শুনে কার না ভয় লাগে?
"পরীক্ষায় ফেল করার পর ডঃ ভ্যাগাব্যান তোমাকে একট আন্ডারগ্রাজুয়েট লেভেলের ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রি কোর্স নিতে বলবে। কেম৩৫১, এই কোর্সটি পড়ান জিম ম্যাকডোনালড বলে একজন। অসম্ভব খচ্চর লোক, আর কোর্সটিও সাংঘাতিক কঠিন। বেশীর ভাগ ছেলেপেলেরাই একবারে পাশ করতে পারে না। দুই-তিন বার নিতে হয় কোর্সটি।"
এতক্ষণে আমার ভয়ের মাত্রা 'অধিক শোকে পাথর' পর্যায়ে চলে গেছে। আমি নির্বিকার ভাবে বসে তার কথা শুনি।
এভেলিন এইবার সবচেয়ে দামী কথাটি বলে,"তুমি কিন্তু আমার মতো ভুল করবে না। ডঃ ভ্যাগাব্যানকে বলবে যে যেহেতু এটাই তোমার প্রথম সেমেস্টার,আর তাই তুমি কোন একস্ট্রা কোর্স নিতে চাওনা। এই ভাবে টালটু-বালটু করে দুই সেমেস্টার কাটাতে পারলে সবাই ভুলে যাবে যে তোমার ওই কোর্সটি নেবার কথা ছিল। তোমাকে তাহলে আর কেম৩৫১ নিতে হবে না।"

এতক্ষণে জানে পানি আসে। যাক- কিছুটা হলেও আশার আলো দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। কথায় বলে এশিয়ান বুদ্ধি!

পরদিনই গেলাম ডিপার্টমেন্টে। এভেলিন যা যা বলেছিল, একদম ঠিক তাই তাই হোল (টেস্টের দ্বিতীয় অংশে ফেল করলাম, এবং ধানাইপানাই করে ডঃ ভগবানকে বুঝিয়ে দিলাম যে কেম৩৫১ কোর্সটি আমি পরে নেব)। বাছাই করলাম কি কি কোর্স নেব এই সেমেস্টারে।

এভেলিনের সাথে এর পর দু এক দিন এখানে সেখানে দেখা হয়েছিল। তেমন কোন কথা হয়নি। এর মাসখানেক পরেই সে তার থিসিস ডিফেন্ড করে তার দেশে ফিরে যায়। হয়তোবা সে এখনো মালয়েশিয়াতেই আছে। সে রাতে তার কাছ থেকে ঐ বুদ্ধিটি না পেলে আমার বোধহয় এখনো পর্যন্ত কেম৩৫১ ক্লাশটি পাশ করা হোতনা। আগেও বলেছি, ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রিকে আমি সাপের চেয়েও বেশী ভয় পাই।

দিন দশ-বারো পরে ক্লাশ শুরু হোল। আমি আবার শিং ভেঙ্গে ছাত্র হলাম। তখন কি আর জানতাম যে আমাকে আরো কতকিছু দেখতে হবে। জানলে বোধহয় পালিয়ে যেতাম পরদিনই।

(এরপর নতুন পর্ব।)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28821759 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28821759 2008-07-19 03:27:18
কামেহামেহা, মানোয়া পাহাড় এবং আলোহা। পর্ব-২(খ)। স্বাগতিক ইঞ্জেকশন ও আলুথালু সহচরী


(আগের অংশটুকুর জন্যে এখান থেকে পড়ে আসতে হবে)

নাদিমের বাড়ানো হাতে হাত মেলাই।
"থ্যাংক ইউ। আই অ্যাম ফ্রম বাংলাদেশ।"
নাদিম বাংলাদেশের কথা শুনে উল্লসিত হয়। পারলে প্রায় আমার ঘাড়ে হাত রাখে। "আরে ইয়ার। তুম তো মেরে ভাই হো। সালাম আলেকুম।"
সাত সমুদ্দুর তেরো নদী পার হয়ে একজন মুসলিম ভাইকে দেখে আমিও ভিতরে ভিতরে বেশ আনন্দবোধ করতে থাকি। "ওয়ালায়কুম আসসালাম।"
"তুমি কি জানো যে আমাদের এখানে একটা মসজিদ আছে?"
"আচ্ছা, তাই নাকি!"
নাদিম আরো কিছু বলতে উদ্যত হয়, কিন্তু শামস ভাই সামনে এগিয়ে আসেন। একটু কড়া স্বরে বলেন, "নাদিম, এইসব আলাপ পরে করলে হয়না? হি জাস্ট ল্যান্ডেড।"
নাদিম সেকথায় একটু থতোমতো খায়। "ইউ আর রাইট, শামস। আমি নাহয় পরে ওর সাথে কথা বলবো।"
শামস নীচু গলায় বললেন,"একদম কথা না বললেই খুশী হই।"

আমি মুখে কিছু না বললেও মনে মনে একটু অবাক হই। নাদিম ছেলেটিকে দেখেতো আমার কাছে ভালই লাগলো। নিজে থেকে এসে আমার সাথে আলাপ করলো, আমাকে জানালো যে এখানে একটি মসজিদ আছে (যদিও আমি খুব একটা নামাজ পড়িনা)। সে আমলে বাংলাদেশে বসে পাকিস্তানী বলতে আমরা পাকিস্তানে ক্রিকেট টীমকেই শুধু চিনতাম। সে টীমের তারকারা তখন বেশ জনপ্রিয় ছিল আমাদের মাঝে।

হ্যাঁ- একটা কথা সত্যি যে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানীরা আমাদের উপর অনেক নির্যাতন করেছে, কিন্তু তারা ছিল সৈন্য, তাদের কাজই ছিল মানুষ মারা। কিন্তু পাকিস্তানের সাধারণ মানুষেরা তো আর আমাদের মারেনি, আমি কেন খামাখা তাদের উপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবো?

পাকিস্তানী সাধারণ মানুষের সাথে আমার আগে কোনদিন চিন-পরিচয় হয়নি। তারাও নিশ্চয়ই আমার মতোনই একজন সুখ-দুঃখের মানুষ, তারাও আমাদের মতো একই ভাব হাসে, একই ভাবে কাঁদে। তাদের সাথে আমাদের বিরোধ কেন হবে। বর্বর সৈন্যরা যে কাজ করেছে, তার দায় আমি কেন নাদিমে নামের এই ছেলেটির উপর চাপাবো?

শামস ভাই বললেন,"মাল-সামান নামাও সবাই। হালে মানোয়ায় চেক-ইন করতে হবে।"

যদিও দীর্ঘদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থেকেছি, তারপরেও হালে মানোয়ায় ঢুকে থমকালাম। প্রথমেই দেখি হোটেলের মতো এক বিশাল কাউন্টারে বসে আছেন এক মহিলা। তাকে গিয়ে নাম-ধাম বলতে হোল। তিনি তখন উঠে গিয়ে ভেতর থেকে এক বিশাল ফাইল বার করে আনলেন, তার সাথে দুই সেট চাবি। তারপর একগাল হাসিতে মুখ ভরিয়ে বললেন,"ওয়েলকাম টু হালে মানোয়া। আশাকরি এখানে তোমার সময়টি আনন্দেই কাটবে।"
শামস ভাই বললেন,"তোমাকে দশতলায় রুম দিয়েছে।"

সাথের যাত্রীদেরকেও দশ তলাতেই জায়গা মিললো। শামস ভাই ব্যাখ্যা করলেন, "সাধারণতঃ সিঙ্গেল ছেলেদেরকে দশতলাতেই পাঠানো হয়।"

চাবি দিয়ে খুললাম মেইন দরজাটি। এরপর এলিভেটর নিয়ে উপরে উঠতে হবে। শামস ভাই বললেন,"চলো তোমাকে তোমার ঘর অবধি ছেড়ে দিয়ে আসি।"
এলিভেটরে ঢুকে দশতলার বোতাম চাপতে গিয়ে প্রথম ধাক্কা খেলাম। সেখানে মাত্র চারটে বোতাম, তিন, ছয়, নয় আর বারো। এ আবার কোনদেশী কারবার? এখন আমি দশতলায় যাবো কিভাবে? অসহায়ের মতো শামস ভাইয়ের দিকে তাকাই। তিনি দেখি খুব কষ্ট করে হাসি চাপবার চেষ্টা করছেন।

"ব্যাপার কি, শামস ভাই?"
শামস ভাই এবার হো হো করে হাসেন। "প্রতিবারই যখন কেউ প্রথমবারের মতো এই এলিভেটর ওঠে, সে তোমার মতোই এইভাবেই ঘাবড়ে যায়। তোমার চেহারাটা কেমন হয়, সেটা দেখবার জন্যই তোমার সাথে এলাম।"
"সে নাহয় হোল। কিন্তু এখন আমি দশতলায় যাবো কিভাবে?"
শামস ভাই এবারে ব্যাখ্যা করেন। "হালে মানোয়ার ডিজাইনটি একটু ভিন ধরণের। তিন, ছয়, নয় আর বারো তলায় কেউ থাকেনা। এই তলাগুলোতে রয়েছে নানা ধরনের কমন জিনিস। যেমন রান্নাঘর, লন্ড্রিরুম, টিভিরুম, আড্ডা-মারার লাউঞ্জ ইত্যাদি। এই তলাটি ব্যবহার করবে উপর তলা আর নীচ তলার লোকেরা। যেমন দোতলা আর চারতলার লোকেরা ব্যবহার করবে তিন তলাকে। পাঁচতলা আর সাততলার লোকেরা ব্যবহার করবে ছয়তলার কমন জিনিস। তুমি যেহেতু দশতলায় থাকবে, তোমাকে রান্না-বান্না করতে হবে নয়তলাতে গিয়ে।"
"রান্না করাতো অনেক পরের ব্যাপার। এখন বলেন, দশতলায় যাবো কিভাবে?"
"খুবই সহজ। এলিভেটরে করে নয়তলা অবধি যাবে। সেখান থেকে সিঁড়ি দিয়ে দশ তলায় উঠবে।"
ঘাম দিয়ে যেন জ্বর ছাড়লো। বাপরে-বাপ!

নয়তলায় এলিভেটর থামলো। আমি সুটকেস নিয়ে বেরোলাম। শামস ভাই আর বেরোলেন না। "তুমি এবার নিজেই তোমার ঘরে চলে যেতে পারবে। ঘর গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে একটু ফ্রেশ হও। তারপর নীচে নেমে এসো বিশ মিনিটের মধ্যে। তোমাকে নিয়ে কয়েকটা কুইক কাজ সারতে হবে। তারপর আমার সাথে তুমি লাঞ্চ খাবে।"
"কি কাজ?"
"সেটা দেখা হলেই বলবো। আমি তাহলে যাই।"
"কিন্তু আপনিই বা যাচ্ছেন কোথায়?"
"আমি আমার ঘরে যাই। সেই সকাল থেকে এয়ারপোর্টে ডিউটি মারছি।"
"আপনার ঘরও কি এখানেই নাকি?"
"হ্যাঁ-আমরা থাকি সবচেয়ে উপরের তেরতলায়। এরা বলে পেন্টহাউস।"
"আমরা মানে?"
"আমি আর তোমার ভাবী। সে কাজ করতে গেছে। লাঞ্চের সময় আসবে, তখন তোমার সাথে তার পরিচয় করিয়ে দেবো।"

সুটকেস টানতে টানতে সামনে এগোই। বিশাল লম্বা টানা বারান্দাতে মাঝে মাঝেই তীরচিহ্ন দিয়ে বিভিন্ন রুমনাম্বার লেখা আছে। সেটা দেখতে দেখতেই সামনে চলতে থাকি। এমন সময় নাকে এলো তীব্র গন্ধ। বুঝতে পারলাম, রান্নাঘর আসছে সামনে।

একটু পরেই দেখা গেল রান্নাঘরটিকে। বেশ বড়সড় লম্বাটে একটা ঘর। সামনে পিছনে দুটো দরজা থাকাতে এয়ার সার্কুলেশনের ভালই বন্দোবস্ত। দুপাশের দেয়াল ঘেঁষে সারিসারি বেশ কয়েকটা কুকিং রেঞ্জ। দুটো বোঁচা টাইপের লোক আর একজন বুঁচি মহিলা মহা সমারোহে কিছু একটা রান্নার চেষ্টায় ব্যস্ত। রান্নার পাত্র থেকে বেশ ধোঁয়া-টোয়া উড়ছে, এবং সেটিই ভয়াবহ রকমের গন্ধের উৎস। রান্নাঘরের অন্যকোণে দাঁড়িয়ে থাকা একজন দাড়িওয়ালা ককেশিয়ান মুখে একটা বেচারা-বেচারা ভাব নিয়ে অসহায়ের মতোন এদিক-সেদিক তাকাচ্ছে।

আমার এই দৃশ্য দেখে আতংকিত হওয়াই উচিত ছিল, কিন্তু কেন জানিনে আমার হাসি পেল। বাহ-রান্নাঘর জায়গাটা বেশ মজারই হবে বলে মনে হচ্ছে।

আমার ঘরে ওঠবার সিঁড়িটি রান্নাঘরের পাশ ঘেঁষেই। হাতে ব্যথা লাগলেও ভারী স্যুটকেশটি কোনমতে টেনেটুনে উপরে তুললাম।

চাবি দিয়ে দরজা খুলে ঘরে ঢুকেই আমার মনে এতক্ষণ ধরে জমে ওঠা একটি ভয় দূর হয়ে গেল। যেহেতু ঢাকার হলগুলোতে এক রুমে বেশ কয়েকজন মিলে থাকতে হোত, আমার মনে একটা আশংকা উঁকি দিচ্ছিল যে এখানেও আবার সেই ধরণের সিস্টেম কিনা। কে জানে হয়তো আমার রুমমেট হিসেবে কোন এক মদখোর রগচটা বিশালদেহী সামোয়ান এসে হাজির হোল, তখন কি হবে?

ঘরটি এক চিলতে ধরণের। একপাশে একটি সিংগেল বেড, জানালার দিকে রয়েছে পড়ার ডেস্ক আর চেয়ার। খুবই সাদাসিদে ঘরটি। বুঝলাম ঘরটিতে আমি একাই থাকবো। ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লো। যাক বাবা- মুশকো সামোয়ানের হাত থেকে যে রক্ষা পেয়েছি এতেই আমি খুশী।

জানালার পর্দা খুলতেই হনলুলু আমার সামনে দেখা দিল। সোজা তাকালেই দেখা যাচ্ছে মৃত আগ্নেয়গিরি ডায়মন্ড হেড। নীল আকাশের পটভূমিতে তাকে ভালই লাগছে এখন দেখতে। আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আরো অনেক বাড়িঘর। সুন্দর, খুব সুন্দর। এই ঘরটিতে বসে এমনি ভাবে বাইরের দিকে তাকিয়েই ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেওয়া যায়।

দেশ ছাড়বার আগে এক বিজ্ঞজন উপদেশ দিয়েছিলেন,"যেখানেই যাওনা কেন, প্রথমেই খেয়াল করবে যে বাথরুমটি কোথায়। কে জানে কখন প্রয়োজন পড়ে।"
সে আপ্তবাক্য স্মরণ পড়ায় ঘর থেকে বেরলাম বাথরুমের সন্ধানে। আর তা ছাড়া হাত মুখও ধোয়া দরকার।

বাথরুমটি কমন এবং আমার ঘরের কাছেই। দুটো করে সবকিছু সেখানে। সিংকে দাঁড়িয়ে হাতমুখ ধুচ্ছি, এমন সময় গোসল সেরে বেরিয়ে এক বিশাল দেহী আমেরিকান। কোমরে তোয়ালে জড়ানো, খালি গা। সে আমাকে দেখে একগাল হেসে তার হাতটি সামনে বাড়িয়ে দিল।
"হ্যালো-আমার নাম ব্রুস। আমি তোমার পাশের ঘরেই থাকি। কোনকিছুর দরকার পড়লে অবশ্যই আমাকে জানাবে।"

ব্রুসের হাসিটি দেখে মনটি আরো ভাল হয়ে গেল। সবাই কি দারুণ ফ্রেন্ডলি! এর মধ্যেই কত অপরিচিত লোকের সাথে পরিচয় হয়ে গেল।

নীচে নেমে দেখলাম শামস ভাই ইতিমধ্যেই এসে পড়েছেন। উনি একটা চেয়ারে বসে খবরের কাগজ জাতীয় কিছু একটা পড়ছিলেন। আমাকে দেখে উঠে দাঁড়ালেন, "চলো- তোমাকে কয়েকটা দরকারী জিনিস দেখিয়ে দেই।"

হালে মানোয়া থেকে বাইরে বেরোতেই আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো রোদের আলো। কিন্তু তার পরেও খুব বেশী গরম লাগলো না। ভারী সুন্দর একটা মৃদু হাওয়া বয়ে যাওয়ার কারণেই বোধহয়।
আমরা দুজন হাঁটতে হাঁটতে পাশেরই একটা বড় বিলডিং এ ঢুকলাম।
"এখানে প্রতিদিন না হলেও এক দু দিন পর পর আসতে হয় সবাইকে।"
"কেন?"
"আমাদের সবার মেইলবক্সগুলো এখানেই। তোমার নামে যদি কোন চিঠি আসে, তাহলে সেটা এই মেইলবক্সেই আসবে। আর তুমি নিশ্চয়ই আজকালের মধ্যেই দেশে চিঠি লিখবে, তাদেরকে তুমি অবশ্যই তোমার মেইলবক্স নাম্বারটি জানিয়ে দেবে।"

মেইলরুমে সারিসারি মেইলবক্স। মেইলরুমের কর্মচারীটি আমার মেইলবক্সের নাম্বার একটা কাগজে লিখে দিল। মেইলবক্সের তালাটি হচ্ছে কম্বিনেশন লক। উপরের ডায়ালটি একবার বা দিকে ঘোরাতে হয়, একবার ডানদিকে ঘোরাতে হয়। নির্দেশ মেনে বারকয়েক চেষ্টা করেও দেখি মেইল বক্স খোলেনা।
শামস ভাই হাসেন আমার দুরবস্থায়। "শোনো- এই মেইল বক্স খোলা রীতিমতো এলেমের ব্যাপার। আমরা কেউই তাই মেইলবক্সের তালা লাগাই না। একবার কষ্ট করে খুলতে পারলেই হোল।"
মিনিট বিশেক ধস্তাধস্তি করার পর তালাটির হূদয়ে বোধকরি মায়ার সঞ্চার হয়। তিনি এবার উন্মুক্ত হন। আমি বড় একটা নিঃশ্বাস নেই। এমন সিকিউরিটি তো বোধহয় হোয়াইট হাউসেও আছে কিনা সন্দেহ।

মেইলবক্সের ভিতরে একগাদা কাগজপত্র। আমি অবাক হই, আবার খুশী খুশীও লাগে। বাহ-এরাতো দেখি আমাকে একদম সাদর সম্বর্ধনা দিচ্ছে।
শামস ভাই আস্তে করে বলেন,"এবার তোমাকে একটা কাজের কথা বলি। আমেরিকাতে প্রায় প্রত্যেককেই প্রতিদিন একতাড়া করে অকাজের মেইল পায়। সেগুলোকে বলা হয় জাংক মেইল। দেখতে পাচ্ছি যে তুমিও বেশ কিছু জাংক মেইল পেয়েছো। এগুলো পড়বার কোন দরকার নেই, সোজা গার্বেজে ফেলে দেবে। এগুলো পড়তে গেলে তোমার হাতে আর কোন কিছু করার সময় থাকবে না।"

বলাই বাহুল্য- একথায় আমার খুশীর বেলুনটি চুপসে যায়। এগুলো সব জাংক মেইল? তা হোক। আমি ঘরে গিয়ে পড়বো।

মেইলরুম থেকে আবার বেরোলাম। মেইন রাস্তার উপরে দাঁড়িয়ে শামস ভাই আমাকে দূরের একটি বিলডিং দেখালেন। সেটি দেখতে একটু অন্যরকম। মনে হয় যেন একটা সূঁচালো হ্যাট পরে আছে।
"ওইটি হচ্ছে বায়োমেডিক্যাল বিলডিং। ওখানেই তোমার ডিপার্টমেন্ট। কাল-পরশু গিয়ে খোঁজ নিয়ে এসো যে রেজিসট্রেশন কবে করতে হবে আর কি কি কোর্স তুমি নিতে চাও। ব্যস্ত হবার কোন দরকার নেই, তোমার হাতে এখনো আট-দশ দিন সময় আছে। ক্লাস শুরু হবে আজ থেকে ঠিক এগারো দিন পর। তার আগে রেজিস্ট্রেশন করলেই হবে।"

শামস ভাইয়ের এই কথাতে আমার বুকের ভেতর আরো একটি বেলুন ফাটে। এতক্ষণ ধরে বেশ একটা ভ্যাকেশন মুডে ছিলাম। হাজার মাইল ধরে উড়ে আসা, তারপর স্বপ্নের দেশটিতে পা রাখা, নানান রকম মানুষের সাথে হাত মেলানো, সবই আমাকে একটা ভালোলাগায় ভরিয়ে রেখেছিল। এইবার আসল কথাটি মনে পড়লো।

আমি এখানে ফুর্তি করতে আসিনি। আমি এখানে পড়াশুনা করতে এসেছি। পড়াশুনা মানে হচ্ছে রাতের পর রাত নির্ঘুম চোখে বইয়ের পাতায় ডুবে থাকা, পরীক্ষার পর পরীক্ষা দেওয়া, গবেষণা করা, সেমিনারে লেকচার শোনা। তার উপর দেশে যেহেতু রেজাল্ট কিঞ্চিত্ উন্নত শ্রেণীর ছিল, অতএব এখানে ভাল রেজালট করতে হবে। তা না হলে মান-সম্মান নিয়ে টানাটানি।

তারপর আমার খাওয়া-দাওয়ারই বা কি হবে? ঢাকাতে নাহয় একশো গন্ডা খাবারের দোকান ছিল, এখানে তো মনে হচ্ছে নিজেকে রান্নাবান্নাটাও সামলাতে হবে। তারমানে হচ্ছে বাজার-ঘাটও আমাকেই করতে হবে। জিন্দেগীতে কোনদিন বাজারে যাইনি। এখানে দোকানদারেরা কেমন? তারা কি আমাকে বিদেশী পেয়ে ঠকিয়ে দেবে? আমিতো আবার দরদাম করাতে একদম অপটু। তার মানে কি আমাকে ঠকিয়ে দেবে তারা?

এই সব কথা চিন্তা করে আমার মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে। ভিতরে একটু কান্না কান্না ভাবও চলে আসে। আমার অবস্থা যে পুরো কেরাসিন, তা আমি হাড়ে হাড়ে বুঝতে থাকি।

শামস ভাই ঝট করে দাঁড়িয়ে পড়েন। "এবারে আমরা এখানে যাবো।"
সামনের বিল্ডিংটির গায়ে বড় বড় করে লেখা "মেডিক্যাল সেন্টার।"

আমি অবাক হই। "আপনার কি শরীর খারাপ নাকি, শামস ভাই? ছি ছি - আমাকে বলবেন তো সে কথা। এই রকম অসুস্থ শরীরে আবার আপনি আমার জন্যে রোদের মধ্যে ঘুরছেন। চলেন চলেন, তাড়াতাড়ি চলেন। দেখি ডাক্তার কি বলে।"
শামস ভাই আমার ব্যস্ততা দেখে হাসেন। "আমার শরীর ঠিকই আছে মাশাল্লাহ। এখানে এসেছি তোমার জন্যে।"
"কেন? আমার শরীরতো খারাপ হয়নি।"
"শরীর খারাপের জন্য আসিনি। এসেছি তোমাকে একটা ইঞ্জেকশন দেওয়াতে।"
আমি থমকে যাই। "ইঞ্জেকশন কেন? আমি তো দেশ থেকে টীকা-ফীকা নিয়েই এসেছি।"
"এটা হচ্ছে টিবি বা যক্ষ্মার একটা টেস্ট। আজকে তোমার হাতে একটা ইঞ্জেকশন দেবে, আর তুমি তিন দিন পর এসে ওদেরকে হাতটি দেখিয়ে যাবে যে ইঞ্জেকশনের জায়গাটি ফুলেছে কিনা। যদি না ফোলে বা অল্প ফোলে, তাহলে তুমি টিবি মুক্ত। আর যদি বেশী ফুলে যায়, তাহলে তুমি টিবি পজিটিভ। তখন তোমাকে গিয়ে চেস্ট এক্স-রে করতে হবে। এই টেস্টে পাশ না করলে তুমি রেজিস্ট্রেশন করতে পারবে না।"
"ইঞ্জেকশনটা কি আজকে না দিলেই নয়। আমি আগে থেকে জানলে তো আপনার সাথে আসতামই না।"
শামস ভাই মাথা দুলিয়ে বলেন,"একজ্যাক্টলি ওই কারণেই তোমাকে আমি ইঞ্জেকশনের কথাটা আগে বলিনি। নিতে যখন হবেই তখন আজই নিয়ে নাও। আমরা এটার নাম দিয়েছি আলোহা ইঞ্জেকশন। বাংলায় বলতে পারো স্বাগতিক ইঞ্জেকশন। চলো- এবার ভিতরে যাই। তাড়াতাড়ি কাজটা সেরে ফিরতে হবে। লাঞ্চ খেতে হবে না?"

আর লাঞ্চ? ইঞ্জেকশনের সূঁইয়ের খোঁচার কথা চিন্তা করে আমার খিদে-টিদে সব কোথায় উধাও হয়েছে ততক্ষণে। কিন্তু করার আর কিইবা আছে? পড়েছি মোগলের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে। পা ঘষটাতে ঘষটাতে আমি সামনে এগোই।

জাপানী চেহারার নার্স-জাতীয় মহিলা আমাকে দেখে যেন বড়ই আনন্দিত হয়। শামস ভাই পিছন থেকে বলেন,"ওর একটা টিবি টেস্ট করা দরকার।"
সেকথায় মহিলা যেন পুলকে গলে গলে পড়ে। আতংকে আমার বুকের ভেতর গুরগুর করা শুরু হয়ে যায়। কত মোটা সুঁই দিয়ে ইঞ্জেকশন দেবে আমাকে?

শেষ পর্যন্ত অবশ্য ইঞ্জেকশন জিনিসটা তেমন খারাপ ছিলনা। আমার সাথে কথা বলতে বলতে কোন ফাঁকে যে মহিলা সূঁই দাবিয়ে দিলো, তা ঠিক টের পেলাম না। ব্যথা যে একেবারে লাগেনি তা নয়, তবে ততক্ষণে আমি ভয়ে প্রায় আধমরা হওয়াতে বোধবুদ্ধিও বোধহয় কমে গিয়েছিল অনেক।

মেডিক্যাল সেন্টার থেকে বেরিয়ে শামস ভাই বললেন, "চলো এখন বরঞ্চ ফিরেই যাই। খিদে লাগছে। লাঞ্চের পর নাহয় আবার বেরোনো যাবে।"

শামস ভাইয়ের পিছন পিছন গেলাম বারোতলার কিচেনে। কিচেনের পাশের বারান্দায় অনেক গুলো টেবিল চেয়ার পাতা আছে। বুঝলাম এখানেই বসে সবাই তাদের খাবার খায়। কিন্তু এদের মধ্যে একটা টেবিলে বেশ সুন্দর করে একটা টেবিল ক্লথ পাতা। সেটা দেখেই শামস ভাই বললেন,"ও বোধহয় এসে গেছে।"

বারান্দার এক পাশে আর একটা জিনিস দেখেও খুব মজা লাগলো। সারি সারি অনেকগুলো রাইস কুকার

রান্নাঘরের এক কোনায় খাবার গরম করছিলেন এক মহিলা। আমাদেরকে দেখে হাসলেন অল্প। আমি আদাব-সালাম দিয়ে একটা চেয়ারে বসলাম।

খেতে বসে আমিতো অবাক। শামস ভাই আর ভাবী মিলে বেশ কয়েকটা ডিশ রান্না করেছেন। দীর্ঘ জার্নির পর আমি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম বাঙ্গালী খাবার কি জিনিস। এখন পরিচিত খাবারগুলোকে দেখে প্রথমে মনটা আনন্দে ভরে গেল, তারপর চোখে পানি এলো এবং সবশেষ যেটা এলো সেটা হোল পেটভরা খিদে। মনে হোল কতযুগ ধরে আমি না খেয়ে আছি।

সার্টের হাতা গুটিয়ে আমি খাবারের মধ্যে ডুব দিলাম।

(বাকী অংশ পরের পর্বে)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28821092 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28821092 2008-07-16 23:53:45
কামেহামেহা, মানোয়া পাহাড় এবং আলোহা। পর্ব-২(ক)। স্বাগতিক ইঞ্জেকশন ও আলুথালু সহচরী

"হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে জেগে ওঠা একগুচ্ছ দ্বীপমালার সমষ্টি। বই-পত্তর খুললে জানা যাবে যে এই দ্বীপপুঞ্জটি প্রায় ১৫০০ মাইল লম্বা, আর ঠিকমতো গুনলে দেখা যাবে যে ১৩২টি দ্বীপ নিয়ে তৈরী হয়েছে দ্বীপপুঞ্জটি। অবশ্য এর মধ্যে বেশীর ভাগই খুব ছোট আর সেগুলো জনবসতিশূন্য। আকার হিসেব করলে বড় দ্বীপ হচ্ছে আটটি। হাওয়াই, মাউই, ওয়াহু, কাওয়াই, মোলোকাই, লানাই, নিইহাউ আর কাহুলাভে।

দ্বীপপুঞ্জটির ম্যাপ দেখলে আরো একটা জিনিস চোখে পড়বে। গোটা দ্বীপপুঞ্জটি একটি সরলরেখার আকারে সৃষ্টি হয়েছে। এর কারণ হিসেবে বলা হয় যে দ্বীপপুঞ্জটি তৈরী হয়েছে আগ্নেয়গিরির লাভা জমে জমে। পানির মধ্যে আবার আগ্নেয়গিরি কোথা থেকে এলো? বিজ্ঞানীরা বলেন যে প্রশান্ত মহাসাগরের নীচের প্যাসিফিক টেকটোনিক প্লেটের 'হটস্পট' দিয়ে পৃথিবীর গভীর (ম্যান্টল্‌) থেকে উঠে আসা লাভা ক্রমান্নয়ে জমতে জমতে একসময় পানির উপরে মাথা তুলেছে। যেহেতু হটস্পটটি প্রতি বছর তিন ইঞ্চি করে পূবের দিকে সরছে, দ্বীপগুলো তাই একের পর এক সৃষ্টি হয়ে চলেছে পূবের দিকে।

এই থিওরী অনুযায়ী একদম পূবের হাওয়াই দ্বীপটি সবচেয়ে নতুন। বয়েস মাত্র সাড়ে চার লাখ বছর। এরও পূবে পানির নীচে চলছে নতুন দ্বীপ তৈরীর কাজকর্ম। সেখানে পানির নীচে লোইহি নামের আগ্নেয়গিরি অক্লান্ত ভাবে লাভা ঢেলে চলেছে, আস্তে আস্তে উঁচু হচ্ছে ভূমি। হয়তো আর লাখদুয়েক বছর পরে নতুন একটি দ্বীপ মাথা তুলবে পানির উপর।

হনলুলু শহরটি ওয়াহু দ্বীপে। এই দ্বীপটি আকারে মাঝারী আর এর অবস্থানও মাঝের দিকেই। কিন্তু গুরুত্বের দিক দিয়ে ওয়াহুর স্থান অনেক উঁচুতে। হাওয়াই অঙ্গরাজ্যের রাজধানী হনলুলু ব্যবসা-বাণিজ্যের দিকে দিয়েও গুরুত্বপূর্ণ। এখানেই রয়েছে বিশ্ববিখ্যাত ওয়াইকিকি সমুদ্র-সৈকতটি। স্টেটের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়টিও এখানে, এছাড়া নানান ধরণের ট্যুরিস্ট-প্রিয় জিনিসপত্রও এই দ্বীপেই।"

গাড়িতে করে যেতে যেতে শামস ভাইয়ের কথা শুনছি। এয়ারপোর্ট থেকে মাল-সামান নিয়ে বের হয়েছি একটু আগে। শামস ভাই শুধু আমাকেই আনতে যাননি, আমার সাথে ওই একই ফ্লাইটে আসা আরো তিনজন স্টুডেন্ট উঠেছে আমাদের সাথে এক গাড়ীতে। তাদের সাথে হাত মেলানো পর্ব শেষ হয়েছে একটু আগে।

প্রথম জন এসেছে ইন্ডিয়া থেকে। একটু সিরিয়াস টাইপের চেহারা। সে চিরাচরিত খটোমটো করে বললো, "মাই নেম ইজ অশোওয়াথথা নারায়ণ রাও মঞ্জুনাথ।"
ওরে বাব্বা! আমি নিজের নামটি মিন মিন করে বলে তারপর শুধোই, "তোমাকে কি আমি অশোওয়াথথা বলে ডাকবো?"
সে গম্ভীর ভাবে বললো, "নো। ওটা আমার বাবার নাম।"
আমি বেজায় ঘাবড়ে গিয়ে বলি, "সে কি? তুমি যে একটু আগে বললে তোমার নাম ওইটাই।"
"আমার নাম মঞ্জুনাথ। আমার বাড়ী কর্ণাটকে, আমাদের ওখানে লাস্ট নেমটাই একজনের আসল নাম। নামের প্রথম অংশটুকু আসে বাবার নাম থেকে।"
এই ব্যাখ্যায় একটু হলেও খুশী হলাম। অশোওয়াথথার চেয়ে মঞ্জুনাথ উচ্চারন করা সহজ।

পরের জন নিকষ কালো, নাদুশ-নুদুশ। সর্বক্ষণই মুখে হাসি। হাতটি জড়িয়ে ধরে বললো, "আই অ্যাম ফ্রম শ্রীলাংকা। আর আমার নাম হচ্ছে ------।"
তার নামটি ভয়াবহ রকমের দীর্ঘ এবং উচ্চারণের অযোগ্য। আমি হতাশ হয়ে পড়ি। এদের নাম মুখস্থ করতে করতেই তো দেখি আমার গোটা ছাত্রজীবন চলে যাবে।
ছেলেটি আমার অবস্থা দেখে হাসে। তারপর বললো, "বাট ফ্রেন্ডস কল মি তিসা। আমি এখানে এসেছি তুলনামূলক ধর্মশাস্ত্র পড়বার জন্যে।"
জানে পানি এলো আমার। "হ্যালো তিসা। তোমার সাথে পরিচিত হয়ে খুবই খুশী হলাম। তুমি কি কোন প্রিস্ট-ট্রিস্ট নাকি?"
তিসা আমার কথায় হাসে। "না-না, আমি কলম্বো বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টারী করি।"

তৃতীয় জন নেপালী। লম্বা-একহারা চেহারা, তিসার মতো এর মুখেও খুব ফ্রেন্ডলি একটা ভাব।
"আমি টি জে। পুরো নাম টি জে শ্রেষ্ঠা।"
"টি জে মানে কি ভাই?"
"আমার পুরো নাম হচ্ছে তিমিলা জুজু শ্রেষ্ঠা। টি জে হচ্ছে এর শর্টকাট।"
"আলোহা টি জে! আমি নির্বাসিত। ফ্রম বাংলাদেশ।"

দেশী ভাই বলে শামস ভাইয়ের পাশের সিটটি পেয়েছি গাড়ীতে। বাকী তিনজন পিছনের সিটে বসে গুনগুন করে কথা বলছে। শামস ভাই এসেছেন ইকোনমিক্স এ পিএইচডি করতে। তিনি আমাদেরকে একদম টুরিস্টগাইডের মতো করে বলছেন হাওয়াইয়ের ইতিহাস। সবকথা ঠিকমতো বুঝছিনা, সবকথা কানেও ঢুকছেনা। আমি দেখছি রোদে ঝলমল হনলুলুকে, তার ঝকঝকে নীল আকাশ আর আকাশের বুকে ভেসে বেড়ানো সাদা মেঘের গুচ্ছকে।

আগেই জেনেছি হনলুলু এয়ারপোর্ট বিশ্ববিদ্যালয় আট-নয় মাইল দূরে। সে হিসেবে পনেরো মিনিটের ড্রাইভ। চওড়া রাস্তা দিয়ে গাড়ী চলছে অনেকগুলো। যে যার লেইন দিয়েই যাচ্ছে, কেউ কারো পথে গাড়ীর নাক ঢুকাচ্ছে না। একটা জিনিস খেয়াল করলাম, যে রাস্তায় কোন ট্র্যাফিক লাইট নেই, এবং এই রাস্তাকে আর কোন রাস্তা ক্রস করছে না।

শামস ভাই বললেন,"এগুলোকে বলে ফ্রিওয়ে। এখানে ফ্রি ভাবে লোকে গাড়ী চালাতে পারে। কোন থামাথামি নেই।"

বাহ্‌-বেশ ভাল সিস্টেম তো!

আরো একটা জিনিস চোখে পড়লো। শামস ভাইয়ের গাড়ীতে (পুরনো ঢাউস আমেরিকান গাড়ী) কোন ক্লাচ নেই। তারমানে, কথায় কথায় গিয়ার নিয়ে টানাটানি করা নেই। গাড়ী চালাতে হলে একসিলেটর দাবাও, থামাতে হলে ব্রেক কষো। দেশ ছাড়ার আগে আমি একবার বাসার গাড়ীতে করে গাড়ী চালানোর প্রচেষ্টা চালিয়েছিলাম। সে এক করুন কাহিনী। অল্পের জন্যে আমি মানুষ-হত্যার দায় থেকে বেঁচে গিয়েছিলাম সেদিন। সে থেকেই ক্লাচ জিনিসটির প্রতি আমার ভয়ানক ভয়।

শামস ভাই বললেন, "এটা অটোমেটিক গাড়ী। গতি বাড়ার সাথে সাথে গিয়ার আপনা-আপনিই বদলে যায়। ড্রাইভারকে কোন কিছু করতে হয়না। এখানকার প্রায় সব গাড়ীই এরকম। মাঝে মাঝে দু একজনে শখ করে স্টিক-শিফট মানে ক্লাচ-ওয়ালা গাড়ী কেনে।"

মানুষের কত রকমের শখ! কষ্ট করে গাড়ী চালানোর কোন মানে হয়!

জানতাম হনলুলু পাহাড়ী জায়গা। রাস্তা থেকে দেখা যায় ছোটবড় কত পাহাড়। শামস ভাই বললেন, যে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসটিও একটি পাহাড়ের কোলে। পাহাড়টির নাম মানোয়া। সেই নামে ক্যাম্পাসটির নাম দেয়া হয়েছে, ইউনিভার্সিটি অফ হাওয়াই অ্যাট মানোয়া। মানোয়া পাহাড়ের কোলের মধ্যেই তাহলে কাটাতে হবে বেশ কিছুদিন।

চিরকাল ধরে সমতলে বেড়ে ওঠা এই আমার সামনে হনলুলুর পাহাড়গুলোকে সেই প্রথম দিন থেকেই ভাল লেগে গেল। সেই ভাল লাগা আজও অবধি আছে। পাহাড়ের মধ্যে থাকতে ভাল লাগে আমার। এখন যেখানে থাকি সে জায়গাটিকেও মোটামুটি পাহাড়ীই বলা যায়।

হনলুলুর রোদ এবারে মনে হয় একটু গায়ে লাগছে। শুনেছিলাম বিদেশ মানে ঠান্ডা জায়গা, ভারী ভারী ওভারকোট পরে চলাফেরা করতে হয়। এখানে তো দেখি ঠিক উলটো। গরমই লাগছে মনে হয়। সে কথা শুনে শামস ভাই হাসেন, "লোকে ঠান্ডার হাত থেকে বাঁচার জন্যে হনলুলু বেড়াতে আসে, আর তুমি জিজ্ঞেস করছ এখানে ওভারকোট পরতে হয় কিনা। এখানে সোয়েটারও লাগেনা।"
"বলেন কি? সোয়েটারও লাগবেনা? এমনকি শীতকালেও না?"
"শীতকাল? কিসের শীতকাল? সারা বছর জুড়েই তো একই রকম আবহাওয়া। গরম-শীত বলে কিছু নেই এখানে।"
তখন মনে পড়লো যে ছেলেবেলায় পড়েছিলাম, হাওয়াই হচ্ছে চিরবসন্তের দেশ।

সাথে সাথে আরো মনে পড়লো যে সুটকেশে আসবার সময়ে মা একটা হাতে বোনা সোয়েটার দিয়ে দিয়েছিলেন। সেটার বোধহয় আর প্রয়োজন হবেনা যতদিন এখানে থাকি।

ফ্রিওয়ে একটা বাঁক নিলো। হঠাৎ করেই দেখা দিল একটি বিশাল পাহাড়। মনে হয় কাছাকাছিই। পাহাড়টি দেখতে একটু অদ্ভুত। অন্যান্য পাহাড় যেমন উপরের দিকে সরু হয়ে গেছে এটি তেমন নয়। দেখে মনে হয় যেন উপরের অংশটুকুকে কেউ কেটে বাদ দিয়ে দিয়েছে।
"এই পাহাড়ের নাম কি শামস ভাই?"
"এটি হনলুলুর একটি বিশেষ ল্যান্ডমার্ক। নাম ডায়মন্ড হেড।"
"এর আকৃতিটা কেমন যেন অন্যরকম।"
"এটা একটা আগ্নেয়গিরি তাই এর উপরের অংশটুকু গায়েব হয়ে গিয়েছে।"
"আগ্নেয়গিরি? মানে ভলক্যানো? কি সর্বনাশের কথা! আমি তো জানতাম যে হনলুলু শহরে কোন ভলক্যানো নেই।"
শামস ভাই হেসে বলেন, "ভলক্যানো, তবে ডরম্যান্ট মানে সুপ্ত। কে জানে এতদিনে হয়তো মারাও যেতে পারে ব্যাটা। অতএব ভয় পাবার কোন কারণ নেই তোমার।"

বড় করে নিঃশ্বাস নেই একটা। যাক-বাবা, বাঁচা গেল। চোখের সামনে এই রকম একটা আগ্নেয়গিরি নিয়ে বেশীদিন থাকতে পারতাম না এখানে। দু দিনেই ভয়ে হার্ট অ্যাটাক হয়ে যেতো নির্ঘাত।

সাঁই করে গাড়ী ঘোরান শামস ভাই। উনি ফ্রিওয়ে থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন।
"আমরা অলমোস্ট এসে গেছি।"

তিন চারটে সিগন্যাল লাইট পেরিয়েই শামস ভাই আবার গাড়ী ঘোরান। এবার চোখের সামনে দেখা দেয় বিশাল আকৃতির আর একটা পাহাড়, তার নীচে সমতলভূমি।

"এটাই আমাদের ক্যাম্পাস। মানোয়া ক্যাম্পাস। পিছনের পাহাড়টির নামই মানোয়া পাহাড়।"

কেন জানিনে মানোয়া পাহাড়টিকে দেখে খুব ভাল লাগলো। গাঢ় সবুজ রং দেখে বোঝা যায় যে পাহাড়টিতে জীবন চলমান। ডায়মন্ড হেড দেখতে ছিল রুক্ষ, লালচে রঙ্গের। কেমন যেন রাগী রাগী ভাব। আর মানোয়াকে দেখে মনে হয় যেন স্নেহশীলা কোন মা। সন্তানের শিয়রে জেগে আছেন নিশিদিন।

গাড়ী এসে থামলো একটি উঁচু বিল্ডিং এর সামনে।

শামস ভাই বললেন,"এটাই আমাদের থাকবার জায়গা। নামো, আমরা এসে গেছি।"

ভবনটির সামনে সেটির নাম লেখা 'হালে মানোয়া'। পরে জেনেছি হাওয়াইয়ান ভাষায় 'হালে' শব্দটির অর্থ 'হাউস' বা 'রেসিডেন্স'। তার মানে 'হালে মানোয়া'র অর্থ হচ্ছে 'হাউস ওফ মানোয়া'। মানোয়া পাহাড়ের গৃহ।

হালে মানোয়ার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটি ছেলে। চেহারা-সুরত দেখে মনে হোল আমাদের দিককারই লোক হবে। তাকে দেখে শামস ভাই মুখ ঈষৎ বিকৃত করেন। বিড়বিড় করে বলেন, "ঠিকই দেখো এখানে এসে দাঁড়িয়ে আছে। এই শালার হাত থেকে কবে যে রক্ষা পাবো।"

আমরা গাড়ী থেকে বেরোই। দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটি হাত বাড়িয়ে দেয় করমর্দনের জন্যে।

"হ্যালো-ওয়েলকাম টু হনলুলু। আই অ্যাম নাদিম। নাদিম ফ্রম পাকিস্তান।"

(বাকী অংশ পরের পর্বে)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28819053 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28819053 2008-07-11 03:15:00
কামেহামেহা, মানোয়া পাহাড় এবং আলোহা। পর্ব-১(ঘ)। ব্যাংককে একটি রাত এবং মধ্য আকাশের থাই খালাম্মা


(আগের অংশটুকু জন্যে এখান থেকে পড়ে আসতে হবে।)

প্লেন চলছে নির্বিঘ্নে। তেমন কোন ঝাঁকি-টাকি দিচ্ছে না। এখন ভালই লাগছে।
ভ্যাজাল শুধু একটাই। পিছনের সারির খালা আর খালাতো বোনেদের একনাগাড়ে নন-স্টপ কিচির-মিচির।

আমার সিট জানালার কাছে হলে ভাল হোত। নীচের সমুদ্র কিংবা কোন নাম না জানা ভূমিখন্ডের দিকে তাকিয়ে সময় কাটিয়ে দেয়া যেতো। কিন্তু সে গুড়ে বালি। সিট পড়েছে মাঝখানে। তবে ভাল জিনিস একটাই, যে পাশের সিটটি ফাঁকা। এতে করে একটু হাত-পা ছড়িয়ে বসতে পারছি।

থাই এয়ারওয়েজের খাতির-যত্নের অভাব নেই। কিছুক্ষণ পর পরই এসে শুধোয়, কিছু লাগবে কিনা। আমি মুফতে শুধু কোক খাচ্ছি। দেশে থাকতে কারো বিয়ে-টিয়ের দাওয়াতে গেলেই কোক-ফান্টা খাওয়া যেতো। প্লেনের ভিতরে বড় পর্দায় ছবি দেখাবে একটু পরেই। সেটা দেখে হয়তো কিছুটা সময় কাটবে। কিন্তু আর কি করা যায়?
ভাবতে ভাবতে মনে এলো যে এই সময়টা চিঠি লিখে কাটালে কেমন হয়। যা ঘটছে, তাইই লিখে ফেলি ঝটপট। দেশে বন্ধুদের কাছে পাঠালে ওরা পড়ে মজা পাবে হয়তো।

বেল টিপে এয়ারহোস্টেসকে ডাকি। "আমাকে কি একটু চিঠি লেখার কাগজ দেওয়া যাবে?"
সে গাল ভরে হাসে। "নিশ্চয়ই। আমি তোমাকে এক্ষুণি এনে দিচ্ছি।"

কিছুক্ষণ পরে সে এসে আমাকে খান তিনেক থাই এয়ারওয়েজের লেটারহেডওয়ালা চিঠি লেখার কাগজ এনে দেয়। কি সুন্দর কাগজ! ভারী ঝকঝকে। আসবার সময় বন্ধুরা আমাকে একটা খুব সুন্দর কলম উপহার দিয়েছিল। ব্রীফকেস খুলে সেটাই বার করি। এত সুন্দর কাগজের উপর তো আর যেন তেন কলম দিয়ে লেখা যায়না।

সেই সময়টির কথা আমার আজো বেশ ভাল মনে আছে। সামনের সিটের সাথে লাগানো ট্রে টিকে পুরো বিছিয়ে আমি খুব মনোযোগের সাথে লিখছি। খুব সাবধানে লিখছি, যেন হাতের লেখা বাঁকা না হয়, যেন অসাবধানে বানান ভুল না হয়। এত সুন্দর একটা কাগজে লিখছি। সেখানে ভুল বানান বা অসুন্দর লেখা বড্ড বেমানান হবে।

ঢাকা ছেড়েছিলাম বারো তারিখে বিকেলের দিকে। এখন তেরো তারিখ। হাতঘড়িতে সময় দেখে লাভ নেই। সময় বদলে যাচ্ছে ওড়ার সাথে সাথে। একোতু পরে তো বোধহয় দিন-তারিখও বদলে যাবে।
সামনের ট্রের এক কোণায় রয়েছে বুদবুদময় ঠান্ডা কোক। লিখতে লিখতে থামছি কিছুক্ষণ পর পর। এক চুমুক কোক খাই। মাথা জ্যাম হয়ে গেলে একটা সিগারেট ধরাই। বাঁ হাতের আ-ুলে পুড়তে থাকে সিগারেট। আমি আনমনে লিখে চলি।

দেশ ছেড়েছি খুব বেশীক্ষণ হয়নি। এইটুকু সময়ের মধ্যে কতরকমের অভিজ্ঞতা হোল (তার এক-দশমাংশও আজ মনে নেই)। সেগুলোকেই লিখি রসিয়ে রসিয়ে। বন্ধুরা পড়বে এই চিঠি। তারা কি হাসবে আমার আনন্দে? বিষন্ন হবে আমার বেদনায়?
কে জানে? আমি তার তোয়াক্কা করিনে। আমার লিখতে ইচ্ছে করছে, তাই লিখছি।

এরই মাঝে দু'বার খাবার দিয়ে গেল এয়ার হোস্টেস। এবারের খাবারগুলো খেতে অতটা খারাপ লাগলো না। সেটা খাবারের গুণও হতে পারে, আবার আমার ক্রমান্বয়ে খারাপ খাবারে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়াও হতে পারে। সে যাকগে- খেতে যে পারছি এইই বেশী। আমার অতিমাত্রায় কোক-প্রীতি দেখে এয়ার হোস্টেসরা আমাকে আর কোন কিছু জিজ্ঞেস করেনা, চুপচাপ গ্লাসে কোক ঢেলে বিদেয় হয়।

ঘন্টা চারেক কেটে গেছে ইতিমধ্যে। একবার একটু ঘুমানোর চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু তাতে শুধু ঘাড়ে ব্যথাই শুধু হয়েছে, ঘুমের দেখা মেলেনি। বাইরে দিনের আলো কমে আসছে। যদিও ঘড়ির সময় বলছে এখন দুপুর। জাপান এসে পড়বে কিছুক্ষণ পরেই।

একজন এয়ার হোস্টেস হাতে একতাড়া কাগজ নিয়ে আমার সিটের পাশে এসে দাঁড়ায়। কি যেন জিজ্ঞেস করে সে। প্রথমে না বুঝলেও পরে বুঝলাম যে সে আমাকে জিজ্ঞেস করছে যে আমি জাপানেই নেমে যাবো কিনা। আমি ঘাড় নাড়লাম। নাহ্‌-আমাকে আরো বহুদূর যেতে হবে। বুঝলাম যেসব যাত্রীরা জাপানে যাচ্ছে তাদেরকে সে জাপানের ইমিগ্রেশন ফর্ম বিলি করছে।

আমি আবার লেখায় মন দিলাম। কিন্তু পিছন থেকে এবার একটু উঁচু গলায় কিচির-মিচির কানে এলো। কি হোল আবার থাই খালাম্মার?

ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি যে থাই খালাম্মা আর এয়ার হোস্টেস বাক্যালাপ করছেন। থাই ভাষায় কথা হচ্ছে বলে কিছুই বুঝবার উপায় নেই। তবে দেখলাম আলাপের মধ্যেই খালা ব্যাগ থেকে তাদের পাসপোর্ট ইত্যাদি বের করে এয়ার হোস্টেসকে দিচ্ছেন। কেইসটা কি?

খানিক পরে বুঝলাম ব্যাপারটা। খালাম্মা ইংরেজীর কিছুই জানেননা, তার কন্যাদ্বয়ও একই রকম। এখন তারা ইংরেজী ভাষায় লেখা ইমিগ্রেশন ফর্ম কিভাবে ফিল-আপ করবেন? এয়ার হোস্টেস মেয়েটি ভাল ছিল। সে কয়েক সিট পরে বসা একজন থাই ভদ্রলোককে অনুরোধ করলো যেন তিনি খালা এবং তার পরিবারের জন্য ফর্মগুলো পূরণ করে দেন।

তাদের থাই কথোপকথন শুনে আরো একটা জিনিস মনে হোল। থাই ভাষাটিতে "খ" অক্ষরটির খুবই প্রাদুর্ভাব। সর্বক্ষণই যেন তারা "খা-খা" করছে। অনেকটা কাক যেমন "কা-কা" করে সেই রকম।

আমি একটু হেসে লেখায় মন দেই আবার। এক অক্ষর ইংরেজী না জেনেও কি নির্ভাবনার সাথে খালা সাত সমুদ্দুর তের নদী পাড়ি দিচ্ছেন! কি সাহস!

আমি ইতিমধ্যেই তিন-চার পাতা ভরিয়ে ফেলেছি চিঠি লিখে। সে আমলে আমাদের প্রচুর লিখতে হোত বলে একটানা অনেকক্ষণ লেখার অভ্যাস ছিল। আজকাল হাতে লেখাটা আর হয়ে ওঠেনা বলে যদি কখনো কিছু লিখতে হয় তাহলে দু-চার লাইনের পরেই হাতে ব্যথা করে, আংগুলে টান লাগে। হাতের লেখা বাঁকাচোরা হয়ে যায়। অথচ এককালে যাদের হাতের লেখা সুন্দর ছিল, তারাতো রীতিমতো শিল্পীর মর্যাদা পেতেন। এখন ডিজিট্যাল যুগ। কম্পিউটরের বোতাম টিপেই সব লেখালিখির কাজ চালানো। যুতসই কোন ফন্টের কল্যাণে অতি বাজে হস্তাক্ষর-ওয়ালা লোকের লেখাও হয়ে ওঠে দৃষ্টিনন্দন।

লেখা কাগজগুলোকে একসাথে করে সাজিয়ে রাখি। সে কাজ করতে গিয়ে একটি ছোট্ট অঘটন ঘটে। আমার কলমের ক্যাপটি হাত থেকে নীচে পড়ে গেল। কার্পেটের উপর বারদুয়েক গড়িয়ে সেটা আমার সিটের নীচের দিকে কোথায় যেন চলে গেল।

হায়-হায়, এখন কি হবে? একেতো খুব সুন্দর এই কলমটি, তায় এটা বন্ধুদের উপহার। সেই কলমের ক্যাপ যদি হারানো যায়, তাহলে তো মহা ক্ষতি। সিটের নীচে যতদূর পারি ঘাড় নামিয়েও দেখতে পেলাম না সেটিকে।

তার মানে হচ্ছে উনি গড়িয়ে-টড়িয়ে আরো দূরে কোথায় চলে গেছেন পিছনে। তার মানে উনি আমার পিছনের সারির সিটের আশপাশে কোথাও ল্যান্ড করেছেন। তার মানে উনি আমার থাই খালাম্মার এলাকায় চলে গিয়েছেন।

এখন উপায় একটাই। খাই খালামার সাহায্য দরকার। কিন্তু তখন মনে পড়লো যে খালা ইংরেজী জানেন না। জানেন শুধু থাই ভাষা। আর আমি জানি বাংলা আর কাজ চালানোর মতোন ইংরেজী। আর এদুটোই খালার কাছে সমান দুর্বোধ্য। তাহলে উপায়? উপায় হচ্ছে আকার-ইংগিতে কথা বলা।

আবার চিন্তা করলাম যে খালা যখন বাংলা-ইংরেজীর কোনটাইই জানেননা, তখন তার সাথে বাংলায় বাতচিত করাও যা ইংরেজীতেও কথা বলাও তা। অতএব খামাখা ইংরেজী বলার কোনই প্রয়োজন নেই। বাংলাই সই।

উঠে দাঁড়িয়ে একটু গলা খাঁকারী দিলাম। খালা মাথা নামিয়ে একটা ছবিওয়ালা বই দেখছিলেন। আমার গলার আওয়াজে মুখ তুলে চাইলেন।
আমি একগাল হাসি দিয়ে খাঁটি বাংলায় বললাম,"খালাম্মা-ভাল আছেন?"
খালাও হাসেন আমার হাসি দেখে। মাথা নেড়ে সোৎসাহে বলেন, "খা-খা।" (বা ওই জাতীয় কিছু একটা।) আমার কাছে তার অর্থ দাঁড়ায়,"ভাল আছি, বাবা। শুধু এই পোড়ার বাতের ব্যথাটা ছাড়া আর কোনই সমস্যা নেই।"
আমি মুখে একটু সহানুভূতি ফুটিয়ে তুলি,"আহা- তাহলে তো একনাগাড়ে প্লেনে বসে আপনার বেশ কষ্ট হচ্ছে।"
"খা-খা। (তাতো একটু হচ্ছেই, তা আর কি আর করা বলো। প্লেনে উঠলে এইটুকু ঝামেলা তো সহ্য করতেই হবে।)"
"টোকিও পৌছাতে আর বেশী দেরী নেই খালা। প্লেন থেকে নামবার পর আপনার কষ্ট শেষ।"
"খা-খা। (এই বয়সে কষ্টের কি আর শেষ আছে বাবা? একটা যায় তো আর একটা আসে।)"
"এ কি কথা বললেন খালা? আপনার বয়েস আর কিইবা এমন হোল?"
খালা হাসেন আবার। "খা-খা। (থাক, আমার কথা থাক। তোমার কি অবস্থা?)"

এইই সুযোগ। কলমটি উঁচিয়ে ধরি। মুখে একটা কান্না-কান্না ভাব এনে বলি,"আমার অবস্থা কেরাসিন, খালা। দেখেছেন আমার কলমের অবস্থা?"
খালা ব্যাপারটি ঠিক বোঝেননা। "খা-খা। (কেন, কলমের আবার কি হোল?)"
"কলমের ক্যাপটা খুঁজে পাচ্ছিনা, খালা। টুক করে আমার সিটের নীচে পড়লো, সেটা দেখলাম। কিন্তু তারপর ক্যাপটা যে কোথায় গড়িয়ে চলে গেল। আর খুঁজে পাচ্ছিনা। বন্ধুদের উপহারের জিনিস এটা।"
খালাও বেশ হাহাকার করে ওঠেন। "খা-খা। (আহারে-এত সুন্দর কলমের ক্যাপটা হারিয়ে গেল। কি ভয়ানক দুঃখের ব্যাপার।)"
"ক্যাপটা মনে হয় খালা আপনাদের দিকেই গিয়েছে। যদি একটু কষ্ট করে খুঁজে দেখতেন।"
খালা এবার একটু রেগেই যান মনে হয়। "খা-খা-খা। (কষ্ট? কষ্টের কথা আবার কোথথেকে এলো? তোমার জিনিসটি খোঁজার কাজ কষ্ট হবে কেন? তুমি কি আমার পর? এতবড় কথা তুমি তোমার খালাকে বলতে পারলে?)"

আমি একটু দেঁতো হাসি দেই। থাই খালা আমার কথায় রেগে যাবেন ভাবিনি।

আমার থাই খালাতো বোনেরা এতক্ষণ চোখ বড় বড় করে আমাদের আলাপ শুনছিল, আর বোধহয় ভাবছিল যে বাংলা আর থাই ভাষার কথোপকথন এতক্ষণ ধরে কিভাবে চলছে। তাদের সে আনন্দে হঠাত্ বাধা পড়লো। কেননা আমার থাই খালা তাদেরকে চোখের ইংগিতে কলমের ক্যাপটিকে খুঁজতে বলেছেন। তারা দুবোন মুহুর্তের মধ্যে সিট থেকে নেমে হামাগুড়ি দিয়ে ক্যাপটি খোঁজার কাজ শুরু করে দিল।

কিছুক্ষণ পরে একজন বিজয়ীর বেশে আবির্ভূত হোল আমাদের সামনে। তার হাতে আমার হারিয়ে ফেলা বস্তুটি।

আমার চেয়ে খালাই যেন খুশী হন বেশী। "খা-খা। (কি এবার খুশী?)"
আমিও একগাল হাসি। "খুব খুশী খালা, খুব খুশী। থ্যাংক ইউ খালা।"
এবারে খালা আদেশ করেন। "খা-খা। (তাহলে এবার চুপ করে নিজের সিটে বসে পড়ো। সিটবেল্ট বাঁধার বাতি জ্বলছে কিন্তু। এয়ার-হোস্টেস দেখতে পেলে বকা দেবে। আমরা বোধহয় টোকিও এসে পড়লাম)।"

টোকিওতে নেমে যান আমার থাই খালাম্মা। আমার হাতে সময় কম বলে কোনমতে "খোদা হাফেজ" ছুট লাগালাম। পরের প্লেনটি ধরতে হবে। হাতে সময় মাত্র পঁচিশ মিনিট।

সে আমলে টোকিও এয়ারপোর্ট খুবই কঠিন জায়গা ছিল। কেউ ইংরেজী বোঝেনা, বলতে পারাতো দূরের কথা। কোনমতে টিভি স্ক্রীনে সাইন দেখে-টেখে দৌড় লাগালাম। যখন এসে প্যান-এ্যামের কাউন্টারে পৌছুলাম, তখন তারা প্রায় প্লেনের দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে। বাবা- ভাগ্যিস ফ্লাইটটা মিস হয়নি। নিজের সিটে বসে লম্বা নিঃশ্বাস নেই। বিদেশযাত্রার যে এত ঝামেলা তাতো আগে জানতাম না।

প্লেন টেকঅফ করার একটু পরেই সন্ধ্যা নেমে এলো বাইরে। এবারে আমরা প্যাসিফিক পাড়ি দিচ্ছি। প্রায় আট-ন' ঘন্টার ফ্লাইট। ঘুমানো উচিত, কিন্তু ঘুম আসবেনা মনে হয়। আবার চিঠি লেখাতেই ফিরে যাওয়া ঠিক করি। কিন্তু ইতিমধ্যে থাই এয়ারওয়েজের দেওয়া কাগজ শেষ। বেল টিপে ডাকলাম এয়ারহোস্টেসকে।
সে এলো দশ মিনিট পর। তার চোখেমুখে বিরক্তি। "কি চাও?"
আমি থতোমতো খেয়ে যাই। একি ব্যবহার? মিনমিন করে বলি,"একটু লেখার কাগজ পাওয়া যাবে?"
তিনি মুখ ঝামটা দিলেন। "না, কাগজ-টাগজ নেই কিছু।"
বুঝলাম আমেরিকান প্লেন কোম্পানীর সার্ভিস খুবই বাজে। (আজো আমার সেই ধারণার পরিবর্তন হয়নি।) ব্রীফকেস হাতড়ে কাগজ খুঁজি বাধ্য হয়ে।

কিছুক্ষণ পরে বুঝতে পারি যে বাইরের নেমে আসা অন্ধকারের মতোন আমার শরীরেও নেমে আসছে ক্লান্তি। প্লেনের ভিতরের বাতি নিভিয়ে দেয়া হয়েছে ইতিমধ্যে। সবাই ঘুমানোর আঞ্জামে ব্যস্ত। আমিও চোখ বন্ধ করে ফেলি। নিদ্রাদেবী বোধহয় আমার সিটের পিছনেই ঘাপটি মেরে বসে ছিলেন। আমার চোখ দুটি বন্ধ হতেই তিনি আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন।

যখন ঘুম ভাংলো, তখন দেখি বাইরে সুর্য্যের আলো। সকাল হয়ে গেছে। এরই মধ্যে রাত শেষ হয়ে গেল?

স্পীকারে ঘোষণা হোল যে আমরা কিছুক্ষণ পরেই নামবো হনলুলু এয়ারপোর্টে। নীচে তাকিয়ে দেখি কোথাও কোন মাটির চিহ্ন নেই, শুধু পানি আর পানি। এই বিশাল প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে কোথাও বিন্দুর মতো জেগে আছে হাওয়াই দ্বীপমালা। আমাদের পাইলট সাহেব হনলুলু খুঁজে পাবেনতো এই দিগন্ত-বিস্তৃত জলরাশির মধ্যে?

ব্যাংকক ছেড়েছিলাম তেরো তারিখ সকালে। হনলুলু নামবোও তেরো তারিখ সকালে, কোথায় গেল মাঝের একটি দিন? যে দিনটির স্মৃতি আজো উজ্জ্বল হয়ে আছে মনে। আমার নাম-না-জানা থাই খালাম্মার স্মৃতি। কলমটি আজ আর নেই। আরো দশটি জিনিসের মতোই কোথায়, কখন যেন হারিয়ে গেছে সেটি।

এর পরের কথাগুলো আজ অত ভাল মনে নেই। কেমন যেন ঘোরের মধ্যেই প্লেনটি নামলো, আমি ইমিগ্রেশন আর কাষ্টমস পার হলাম। বাইরে এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে অনেক লোকের ভিড়, তারা তাদের প্রিয়জনকে রিসিভ করতে এসেছে। সেদিকে তাকাইনা। আমার তো প্রিয়জন নেই এখানে।

হঠাত্ মনে হয়, যে আমি তাহলে এখন আমেরিকায়। কতকালের স্বপ্ন ছিল এখানে আসার, শেষমেশ এখানে এসে পৌছুলাম তাহলে! কিন্তু যে রকম খুশী লাগবে ভেবেছিলাম, তার এক কণাও খুশী লাগছেনা।

কাঁধে কে যেন হাত রাখলো। আমি ফিরে তাকাই। একজন দীর্ঘকায় ভদ্রলোক। গায়ের রং দেখে মনে হচ্ছে উনি আমাদের দিকের লোকই হবেন।
"তুমিই নির্বাসিত?"
অনেক দিন পর যেন বাংলা শুনলাম। কানে মধুর হয়ে বাজলো কথাগুলো।
"হ্যাঁ- আমিই সেই লোক।"
"আমার নাম শামস। আমি তোমাকে নিতে এসেছি। তোমাকে যারা স্কলারশিপটি দিয়েছে, আমিও সেই প্রতিষ্ঠানে আছি।"

ঘাম দিয়ে যে জ্বর ছাড়লো। "সালাম-আলাইকুম, শামস ভাই। আপনাকে দেখে আমার খুব ভাল লাগছে।"
শামস ভাই হাসেন। "আমি জানি। তিন বছর আগে আমিও একদিন তোমার মতো এমনি ভাবেই নেমেছিলাম এখানে। ওয়েলকাম টু হাওয়াই। আলোহা।"
"আলোহা জিনিসটা কি শামস ভাই?"
"আলোহা একটা হাওয়াইয়ান শব্দ। মানে ওয়েলকাম। আবার এর অন্য মানে হচ্ছে গুডবাই।"

বাহ-একই শব্দের দুই মানে। কেন জানিনে আমার কাছে মনে হোল শব্দটি বড়ই যথার্থ আমার জন্যে। মনে মনে বললাম, "আলোহা বাংলাদেশ। বিদায় আমার জন্মভূমি।"

সেই মুহুর্ত থেকে নীলরঙ্গা জলরাশি বেষ্টিত একটি দ্বীপে আমার নির্বাসনের কাল শুরু হোল।

(এরপর নতুন পর্ব)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28815970 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28815970 2008-07-02 05:21:49
কামেহামেহা, মানোয়া পাহাড় এবং আলোহা। পর্ব-১(গ)। ব্যাংককে একটি রাত এবং মধ্য আকাশের থাই খালাম্মা


(আগের অংশটুকু জন্যে এখান থেকে পড়ে আসতে হবে।)

আমি ভয়ে সিঁটিয়ে থাকি। সে ডাকে সাড়া দিই না।
মেয়েটি আবার ডাকে,"এক্সকিউজ মি স্যার, আপনি কি জেগে আছেন?"
বুঝলাম নাছোড়বান্দার হাতে পড়েছি। সাড়া দিতেই হোল। "কি ব্যাপার?"
"আমি তোমার ফ্রিজটা পরীক্ষা করতে এসেছি।"

আমি এর কিছুই বুঝতে পারিনা। আমি আবার ফ্রিজ পাবো কোথায়? আচ্ছা-তর্কের খাতিরে নাহয় মেনে নিলাম যে আমার একটা ফ্রিজ আছে, কিন্তু সেটা পরীক্ষা করার দরকারটাই বা কি? এমনিতেই সবকিছু ছেঁড়েছুড়ে এসেছি, মেজাজ খারাপ। তার উপর যদি এই ধরণের ধোঁয়াশা আলাপ করতে হয় তাহলে মাথা গরম হবারই কথা।

"কিসের ফ্রিজ?" বিরক্ত গলায় আমি শুধোই।
মেয়েটি ঘরের এক কোণার দিকে অংগুলিনির্দেশ করে। সেদিকে তাকিয়ে দেখি সাদা চৌকোণা কি একটি জিনিস ঘরের মধ্যে রয়েছে বটে। ওটা কি ফ্রিজ নাকি? খেয়ালই করিনি আগে।

কথা না বাড়িয়ে ঘাড় কাত করি। ওটা তো তোদেরই ফ্রিজ, খামাখা আমাকে জিজ্ঞেস করছিস কেন বাপু? যত পরীক্ষা করতে চাস কর।

মেয়েটি ফ্রিজ খুলে কিসব খুটখাট করে, তারপরে "থ্যাংক ইউ" বলে উধাও হয়। আমারও জানে পানি আসে। বিদেশযাত্রার পয়লা রাতেই ঘরে যদি মেয়েমানুষ ঢোকে, তাহলে পরে যে আরো কি সব হবে তা চিন্তা করেই মনে মনে শিউরে উঠি। এ আমি কিসের মধ্যে এসে পড়লাম?

ঝনঝন করে ঘড়ির এ্যালার্ম বাজে। সে শব্দে চমকে উঠি। একই সাথে বিকট আওয়াজে বেজে ওঠে ফোনটিও। আবারও চমকাই। বুঝি হোটেলের লোকেরা আমার ঘুম ভাঙ্গাতে ফোন করেছে। আর শুয়ে থাকার কোন মানে হয়না।

জানালার পর্দা সরাতেই সকালের আলোয় ভরে যায় ঘরটি। আমি বাইরে তাকাই। দিনের আলোয় এইই প্রথম আমার বিদেশ দেখা।

আমাদের বিরাট হোটেলের পাশেই একটি দোতলা বড় বাড়ী। সাইনবোর্ড দেখে বুঝলাম যে সেটি একটি পোস্ট অফিস। অত ভোর বলে তখনো খোলেনি অফিসটি। অফিসটির বারান্দায় একটি ছোট পরিবার। বাচ্চা-বুড়ো মিলিয়ে জনা ছয়েক হবে। ছোট বাটিতে করে তার স্যুপ জাতীয় কোন কিছু চুমুক দিয়ে খাচ্ছে। আশেপাশে পোটলা-পুঁটলি দেখে বুঝলাম যে তারা রাতে এখানেই ঘুমায়।

একটা বড় ভুল ধারণা ভাংলো সেই মুহুর্তে। বিদেশ মানেই সব সময় ভাল জীবন নয়। বিদেশেও গরীব মানুষ আছে। তারাও আমাদের মতোন আশ্রয়হীন জীবন কাটায়। শেওলার মতোন তারাও পথে পথে ঘুরে বেড়ায়। পরে আমেরিকার যে কটি শহরে আমি গিয়েছি তার প্রতিটিতেই এই জিনিসের দেখা মিলেছে।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালার কাছ থেকে সরে আসি। হাতে সময় নেই বেশী। গোসল করতে হবে, জামাকাপড় পরতে হবে, নীচে গিয়ে নাস্তা খেতে হবে এবং তারপর পৌঁছুতে হবে এয়ারপোর্টে। একটু আগেভাগে যাওয়াই ভাল, আমার শেষমুহুর্তে দৌড়ঝাঁপ করতে ভাল লাগেনা।

হোটেলের নাস্তাটা অবশ্য ভালই ছিল। মাখন লাগানো রুটি, সাথে ডিম, ফলের রস আর আরো বেশ কয়েক রকম স্বাদের খাবার। আবার প্লেনে গিয়ে কপালে খাবার বলতে কি জোটে তারতো কোন ঠিক-ঠিকানা নেই, অতএব যতটা পারি খেয়ে নিলাম। সিদ্ধ বরবটির ভয়ে আমি এমনিতেই সিঁটিয়ে আছি।

হোটেল থেকে চেক আউট করতে গিয়ে মনে পড়লো সকালের ঘটনাটি। ভাবলাম জিজ্ঞেস করা দরকার কেন আমার ঘরে মেয়েটি ঢুকেছিল।

হোটেলের ক্লার্ক তো আমার কথা শুনে আকাশ থেকে পড়লো। "বলো কি? তোমার ঘরে আমাদের হোটেলের মেয়ে কেন ঢুকবে? আর তাছাড়া ঢুকবেই বা কেমন করে? তোমার ঘরের দরজায় নিশ্চয়ই ডেডবোল্ট লাগানো ছিল। তাহলে বাইরে থেকে দরজা খুলতে পারার কথা না। তুমি ভিতর থেকে না খুললে কারো কাছে ঘরের চাবি থাকলেও তো সে দরজা খুলতে পারবে না।"

ডেডবোল্ট আবার কোন জিনিস হে? পরে বুঝলাম যে সে ছিটকিনির কথা বলছে। এটা অবশ্য ঠিক যে আমি সে রাতে ছিটকিনি লাগাইনি দরজায়। কিন্তু তাতে কি? ছিটকিনি না লাগালেই বা আমার ঘরে সুবেহ-সাদেকের সময় মেয়েমানুষ ঢুকবে কেন? আর ঘরের ফ্রিজটিই বা কেন সে চেক করছিল?

এ প্রশ্নে ক্লার্কটি আমতা-আমতা করতে থাকে। "আসলে ব্যাপারটি হচ্ছে কি যে আমাদের হোটেলে প্রতিটি ঘরেই একটি ছোট্ট ফ্রিজ থাকে, সেখান নানারকমের পানীয় বা হাল্কা খাবার-দাবার থাকে। অতিথীরা চেক-আউট করার আগে আমরা ফ্রিজটি চেক করে নিই যে কে কত টুকু খাবার খেয়েছে সেখান থেকে, এবং তার দামটুকু বিলের সাথে যোগ করে দেই। কিন্তু সাধারণতঃ ফ্রিজ চেকাররা ঘরে না বলে ঢোকে না। হয়তোবা মেয়েটি নতুন ছিল, বা দরজায় ডেডবোল্ট লাগানো ছিলনা বলে ভেবেছে ঘরে কেউ নেই। কিন্তু তার পরেও এটা তার করা উচিত হয়নি। আমি নিশ্চয়ই তোমার কমপ্লেইনটি ম্যানেজমেন্টের কাছে জানিয়ে দেবো। আমি কি তোমার এই অসুবিধে লাঘব করার জন্যে কোন কিছু করতে পারি?"

আমি ঘাড় নাড়ি। কিই আর করবি তোরা? যাক- তবু ব্যাপারটা জানা হোল।

আগের দিন ব্যাংকক এয়ারপোর্টে পৌছেছিলাম রাতের বেলা। তার উপর তাড়াহুড়া করে বেরিয়ে গিয়েছিলাম বলে ভাল করে দেখা হয়নি এই বিশাল এয়ারপোর্টটিকে। এবার দিনের আলোয় ভালকরে ডেখলাম। ঢাকার এয়ারপোর্টের তুলনায় অনেক বড়। কত দোকানপাট, কত লোকজন। আমি ভ্যাবলার মতো হাঁ করে তাকিয়ে থাকি।

আমার পরবর্তী গন্তব্য টোকিও। যাবো আবার সেই আগের থাই এয়ারওয়েজে। ছ' ঘন্টার ফ্লাইট। টোকিওতে প্লেন বদলাতে হবে। থাই ছেড়ে প্যান-অ্যাম। এই এয়ারলাইনটি এখন আর নেই। টোকিওতে হাতে সময় থাকবে খুবই কম। মাত্র পয়তাল্লিশ মিনিট। এর মধ্যেই এক প্লেন থেকে নেমে অন্য প্লেনে উঠতে হবে। বুকের মধ্য হাল্কা গুরুগুরু করা শুরু করে দিল। ঠিকমতো পারবো তো?

টিকিট হাতে অন্য যাত্রীদের সাথে লাইনে দাঁড়াই। বোর্ডিং-কার্ডটি হাতে পেয়ে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। এবার নিশ্চিন্ত মনে ঘোরাঘুরি করা যায়।

পকেটে হাত ঢুকিয়ে সিগারেট খুঁজি। পকেট ফাঁকা, তার মানে ঢাকার বন্ধুরা যে ক'টি সিগারেট কিনে দিয়েছিল, তা আমি ইতিমধ্যেই ফুঁকে দিয়েছি। ভাগ্য ভাল যে প্লেন ওঠার আগেই ব্যাপারটা ধরা পড়লো। তাড়াতাড়ি সিগারেট কিনে ফেলা দরকার।

গুটিগুটি পায়ে ডিউটিফ্রি দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াই। ঝকঝকে দোকানের ভিতর শেলফে সাজানো কতরকম সিগারেটের কার্টন, নানানরঙ্গা মদের বোতল।

কয়টা সিগারেট কিনবো? ঢাকাতে তো চিরটাকাল তিন-চার শলা করে সিগারেট কিনতাম। গোটা প্যাকেট তো কোনদিন কিনেছি বলে মনে পড়েনা। কোন প্রয়োজন ছিলনা আসলে। সবসময়েই হাতের কাছে কোন না কোন দোকান ছিলই। পকেটের সিগারেট ফুরিয়ে গেলেই আবার কিনতাম। আর তাছাড়া ধূমপায়ী বন্ধুদের অভাবও ছিলনা। ঠেকায়-বেঠেকায় তারাতো ছিলই। কিন্তু আজকে মনে হয় গোটা একটা প্যাকেটই কিনতে হবে। কম কিনলে পথে কোথায় আবার ফুরিয়ে যাবে, তখন হবে আর এক নতুন ঝামেলা।

সামনে হাসি হাসি মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটিকে বলি,"আমি কি এক প্যাকেট ডানহিল সিগারেট কিনতে পারি?"
লোকটি কি এক অজানা কারণে থতোমতো খায়। তারপরেও সে হাসিমুখেই উত্তর দেয়," আমি কি তোমাকে এক কার্টন ডানহিল দিতে পারি?"
দেখেছি ব্যাটার কান্ড! সিগারেট বেচার জন্যে একদম হাঁ করে বসে আছে। আমি চাইলাম এক প্যাকেট, আর সে কিনা আমাকে সরল-সোজা গাঁইয়া পেয়ে পুরো এক কার্টন গছাতে চাইছে।

কিন্তু হুঁ হুঁ বাবা- আমিও বাংলাদেশী ছেলে। অত সহজে কাবু হইনে। একটা কিছু ভক্কিচক্কি দিয়ে আমাকে বোঝানো যাবেনা।

এবার একটু শক্ত গলায় বলি,"না-এক কার্টন না, আমি মাত্র একপ্যাকেট ডানহিল সিগারেট কিনতে চাই।"
লোকটির মুখ থেকে এবার হাসিটি উধাও হয়। কে জানে হয়তো এক কার্টন বেচতে না পারা দুঃখেই হয়তোবা।
"আমি তোমার কথাটি ঠিক বুঝতে পারলাম না।"
এতে না বোঝার কি আছে হে, উজবুক? আমি এক প্যাকেট ডানহিল কিনতে চাই। সেটা দিয়ে দে, আমি দাম চুকিয়ে চলে যাই।
"আমি এক প্যাকেট ডানহিল কিনতে চাই।"
"স্যার-" লোকটির গলাও এবার একটু কঠিন মনে হয়। "আপনি বোধহয় ভুল করছেন। এটি ব্যাংকক শহরের কোন খুচরো দোকান নয়। আমরা খুচরো সিগারেট বেচিনা। কিনতে হলে কার্টন ধরেই কিনতে হবে।"

এবারে আমার হাঁ হবার পালা। বলে কি? আমাকে কি এখন গোটা কার্টনটাই কিনতে হবে নাকি? আমি সারা জীবনে একটা গোটা প্যাকেট কোনদিন কিনিনি, আর এখন কিনা আমাকে পুরো এক কার্টন কিনতে হবে?

কিন্তু কি আর করা? নেশার জিনিস বলে কথা। ভাতের পয়সা না থাকলেও নেশার জিনিসের পয়সা তো যোগাতেই হবে।

বেজার মুখে জিজ্ঞেস করলাম,"ঠিক আছে। এক কার্টনই সই। তা দাম কতো?"
"নয় ডলার।"
ওরে সর্বনাশ! পকেটে আমার সাকুল্যে আছে দেড়শো ডলার, তার থেকে নয় ডলার দিয়ে সিগারেট কিনবো? নয় ডলারকে দেশি টাকায় কনভার্ট করে রীতিমতো শিউরে উঠি। এত টাকা দিয়ে সিগারেট কেনাটা কি ঠিক হবে?

একবার ভাবলাম দামাদামি করি। কিন্তু ব্যাটাচ্ছেলের ওই রকম কঠিন মুখ দেখে আর সে পথ মাড়ালাম না।

অতএব মনে মনে কষে গালি দিলাম ব্যাটাচ্ছেলেকে। মনে মনে কষে গালি দিলাম ব্যাংকক এয়ারপোর্টকে। শালা এখন বুঝলাম কার পয়সা চুষে তোমরা এতো আলো ঝলমল করেছো জায়গাটিকে। একবার যদি তোদের ঢাকায় পেতাম তাহলে দেখিয়ে দিতাম কত ধানে কত চাল।

(পরে অবশ্য বুঝতে পেরেছি যে পৃথিবীর যাবতীয় ডিউটিফ্রি দোকানেই সিগারেট কার্টন ধরেই বিক্রি হয়। আমিই গাধা বলে সেদিন বুঝতে পারিনি।)

অনেকক্ষণ বাদে একরাশ সিগারেট হাতে পেয়ে দেদারসে ধূমপান করি। তারপর একসময় প্লেনের ডাক আসে। বিদায় ব্যাংকক শহর। আবার কোনদিন দেখা হবে হয়তো বা।

প্লেনে উঠে সিট পেলাম একদম পিছনের দিকে। সে আমলে ধূমপায়ীদের জন্যে সে রকমই ব্যবস্থা ছিল। তাতে অসুবিধে নেই, কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এই যে আমার পিছনে বসেছে একজন থাই মহিলা। বয়েস পঞ্চাশের ঘরে। সাথে দুই কন্যা সম্ভতঃ। তারা তাদের নিজেদের ভাষায় প্রচন্ড কিচির-মিচির করছে, আর এক-দুই সেকেন্ড পর পর হিহি করে হেসে এ ওর গায়ে লুটিয়ে পড়ছে। বুঝতে পারলাম যে গোটা পথটি এরা আমার কানের পোকা বার করে দেবে।

কিন্তু এক রহস্যময় কারণে তাদের উপর আমার রাগ হচ্ছিল না। কেননা বয়সী মহিলাটিকে দেখে আমার বারবার মিনু খালার কথা মনে পড়ছিল।

মিনু খালা আমার মায়ের গ্রামতুতো বোন। আমরা নানাবাড়ীতে গেলেই তিনি দেখা করতে আসতেন আর সাথে আনতেন তার দুই যমজ কন্যাদুটিকে। এবং ঠিক এরকম ভাবেই মিনু খালা আর তার দুই মেয়ে কথায় কথায় হেসে উঠতো।

দেশ ছেড়ে চলে আসার দুঃখটা এদের দেখে কিছুটা কমলো যেন। মনে মনে বললাম, "থাই খালাম্মা, ভালো আছেন? শরীর কেমন?"

(বাকী অংশ পরের পর্বে)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28813793 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28813793 2008-06-26 04:02:14
কামেহামেহা, মানোয়া পাহাড় এবং আলোহা। পর্ব-১(খ)। ব্যাংককে একটি রাত এবং মধ্য আকাশের থাই খালাম্মা


(আগের অংশটুকু জন্যে এখান থেকে পড়ে আসতে হবে।)

প্লেন চলছে। টেকঅফ করার প্রায় ঘন্টাখানেক পার হয়েছে। এই গোটা সময়টিই আমি বাইরের দিকে তাকিয়ে চুপ করে বসে আছি।

এয়ারহোস্টেস এসে প্রশ্ন করেছে, তার দিকে না তাকিয়েই উত্তর দিয়েছি আমি। মেয়েটি হয়তো অবাক হয়েছে, বিরক্ত হয়েছে। ভেবেছে আমি অভদ্র। কেউ হয়তো প্রশ্ন করতে পারে, কি এমন আকর্ষনীয় দেখার জিনিস ছিল বাইরে? একটানা আকাশ দেখতে কি আমার ক্লান্তি আসেনি?

আমি বাইরে তাকিয়ে ছিলাম কোনকিছু দেখার জন্য নয়। আসলে আমি আমার কান্নায় লাল হয়ে আসা চোখদুটোকে লুকাতে চেয়েছিলাম। কেউ যেন আমার কান্না না দেখতে পায়।

যেহেতু সব শোকেরই মাত্রা সময়ের সাথে সাথে কমে আসে, আমার ভিতরের শূন্যতাও আস্তে আস্তে কমে আসছিল। বুকের মাঝে কেমন একটা ভোঁতা অনুভূতি। তাকে বর্ণনা করা মুশকিল। যে জানে সেইই জানে কেবল।

বিমানবালা খাবার নামিয়ে রেখে গেছে কখন তা খেয়াল করিনি। ঢাকনা খুলে দেখি কি সুন্দর করে সাজানো রয়েছে কতকিছু। এর মধ্যে একটি জিনিস আমার বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। বরবটি দিয়ে রান্না করা কি যেন একটা ডিশ। বরবটি আমার মহা প্রিয়। আগস্ট মাসের এরা বরবটি কোথায় পেলো। আমি যতদূর জানতাম এটি শীতের সব্জি।

মরা বাড়ীর লোকেরাও একসময় উঠে বসে, তারাও কথা বলে, আয়নাতে মুখ দেখে, মাথায় ঘষে সুগন্ধী তেল। আমারও কেমন যেন খিদে খিদে লাগতে থাকে। সেকি ওই বরবটি দেখেই? কি জানি হতেও পারে।
কাঁটা চামচ দিয়ে অনভ্যস্ত হাতে তুলে নেই এক টুকরো বরবটি। মুখে দিয়েই বুঝতে পারি এটি আমার পরিচিত জিনিসটি নয়। কোথায় গেল সেই সুস্বাদ? কোথায় গেল সেই মাটির গন্ধ? এতো কাগজের মতো স্বাদহীন। এতো মৃত মানুষের মতো, যার কোন পরিচয় নেই, যার সাথে বন্ধুত্ব করা যায়না।

বিদেশ যাত্রার শুরুতেই এমন ছন্দপতনে আমি মুষড়ে পড়ি।

কাঁটা চামচটি নীরবে নামিয়ে রাখি। মনে পড়ে যায় খানিক আগের শোনা কথাগুলো। "আজ থেকে তুই নির্বাসিত।"

বুক ভেঙে বেরিয়ে আসে দীর্ঘশ্বাস। শুকনো রুটিতে অল্প মাখন লাগিয়ে তাইই চিবুই। জেলখানার কয়েদীদের মত জীবন। সেখানে কোন ভাল কিছু আশা করাটাই বোকামী।

ব্যাংকক পৌঁছুলাম ঠিক সন্ধ্যেবেলা। ক্যাব নিয়ে চলে গেলাম আগে থেকে ঠিক করে রাখা হোটেলে। নাম এয়ারপোর্ট হোটেল। বলাই বাহুল্য খুবই সুন্দর। যে ঘরটি আমাকে দেয়া হোল, সেটাও আয়তনে প্রকান্ড। অনায়াসে চার-পাঁচ জনে আরামসে থাকতে পারবে। সেটাই প্রথম আমার কোন পাঁচতারা হোটেলে রাত কাটানো (প্রকৃতপক্ষে সেটাই ছিল আমার যে কোন তারাবিশিষ্ট হোটেলে কাটানো প্রথম রাত। এর আগেশুধু একবার বরিশালে একটি হোটেলে একরাত কাটিয়েছিলাম। বাথরুমে কোন পানি ছিলনা সে হোটেলে। ভয়াবহ সে রাতটির কথা আজো মনে আছে)।

হোটেলে ঘরের সাথে খাওয়া-দাওয়াও ফ্রি ছিল। পরদিন সকালে উঠতে হবে দেখে ভাবলাম তাড়াতাড়িই খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়বো।

একতলায় বিশাল ডাইনিং হল। বুঝলাম আজ কপালে দুঃখ আছে। কেননা এখানে কি জাতীয় খাবার পাওয়া যায়, তার কোন ধারণা নেই আমার। আর সেই আমলে ঢাকাতেও কোন থাই রেস্টুরেন্ট ছিল কিনা তা আজ মনে পড়ছেনা। শুধু কিছু কিছু চাইনিজ রেস্টুরেন্ট "থাই স্যুপ" নামের একটি তরল মিশ্রন পাওয়া যেতো যা আমি কখনো খাইনি। অতএব থাই খাবার যে কি জাতীয় পদার্থ সেই চিন্তাতেই মাথা গরম হবার যোগাড়। তার উপর শুনেছি বিদেশে নাকি সবকিছুতেই পোর্ক, হ্যাম ইত্যাদি সুকৌশলে মেশানো থাকে (যাতে আমাদের ধর্মনষ্ট হয়)।

দুরুদুরু বুক নিয়ে কোণার একটা টেবিলে বসলাম। আমাকে দেখে এগিয়ে এলো একজন হাসিমুখ ওয়েটার। সে আমাকে শুধোল কিছু একটা। আমি তার মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছি দেখে সে হাসলো আরো একটু। ভাবখানা এমন যে, "বুঝেছি তুই ব্যাটা অশিক্ষিত। ইংরেজী বুঝিস না। তারপরেও কেন যে বাপু তোমরা এইসব খানদানী হোটেলে ঢোকো।"

আমি যখন তাকে মোটামুটি স্পষ্ট ইংরেজীতে বললাম যে আমি তার কথা কিছুই বুঝতে পারছিনা, তখন ব্যাটাচ্ছেলে একটু থমকে গেল। মুখের হাসিটিকে একটু ম্লান মনে হোল। মনে হয় সে বুঝতে পেরেছিল যে সমস্যাটি তার ইংরেজী উচ্চারনের, আমার বোঝার সীমাবদ্ধতা নয়। সে এবার একটু থেমে থেমে স্পষ্ট করে যা বললো, তার অর্থ হচ্ছে যে আমি মেন্যু থেকে খাবার অর্ডারও করতে পারি, আবার বুফে সেকশনে গিয়ে পছন্দসই খাবারগুলো বেছে নিতে পারি।

আমাকে একটার বেশী অপশন দিলেই আমি ঘাবড়ে যাই। বুফে, না মেন্যূ? শেষমেশ বুফেতেই রাজী হয়ে যাই। কেননা, বুফেতে অন্ততঃ পক্ষে খাবারগুলো নেবার আগে চোখে দেখা যাবে, আর তাছাড়া সামনে দাঁড়ানো এই ওয়েটার বাবাজীকে অর্ডার ঠিকমতো বুঝাতে আমা যে কালোঘাম ছুটে যাবে, তাতে কোন সন্দেহ ছিলনা আমার।

বুফের হলটি পাশের ঘরে। হাঁটিহাঁটি পা পা করে এগুলাম সেদিকে। ও বাবা-একি দেখছি! বিশাল কাউন্টার ভর্তি শুধু খাবার আর খাবার। যা খুশী বেছে নাও, যত পারো খাও।

ওই মুহুর্তে আনন্দের চেয়ে আমার মনে দুঃখের ছায়াটিই নেমে এলো। কেন জানিনে, ছোট ভাইটির কথা মনে হোল। সে বরাবরই খাওয়া-পাগল। আমাদের বাড়ীতে তাই মাছের মাথা জাতীয় বিশেষ খাবারগুলো তার প্লেটেই যায় সচরাচর। আমাকে ওই খাবার দিয়ে কোন লাভ নেই। আমি ওর কদর বুঝিনি কোনকালেই।

মনে মনে কল্পনা করি, এইখানে আজ যদি আমার পাশে আমার ভাইটি দাঁড়িয়ে থাকতো, তাহলে তার কেমন লাগতো? কি করতো সে? নিশ্চয়ই তার মুখটি আনন্দে জ্বলজ্বল করে উঠতো।

নিশ্চয়ই সে আমাকে বলতো, "দাদা-আজকে কিন্তু অনেক খাবো। ঠিক আছে?"
আমি হয়তো হাসতাম তার কথা শুনে। হয়তো বলতাম,"খাবিইতো। যত ইচ্ছে খাবি, যত পারিস খাবি। কথা কম, কাজ বেশী।"

মাথা নীচু করে আমি চোখ মুছি। সেদিন থেকে আমার কথায় কথায় চোখ ভিজে আসার অসুখটি শুরু হোল। কোন দাওয়াইতেই কোন কাজ হয়নি।

কিছুক্ষণ আগেও বেশ খিদে ছিল। এখন আর কোন খিদে নেই। একবার ইচ্ছে হোল শুধু একগ্লাস পানি খেয়ে আবার রুমে ফিরে যাই।

সাত-পাঁচ ভেবে একটি প্লেট তুলে নেই হাতে। সামনে কত রকম খাবার। অল্প একটু সাদা ভাত নেই, সাথে একটু শব্জী, অল্প একটু মুরগী। প্লেট হাতে ফিরে আসি টেবিলে। আগেকার ওয়েটারটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। আমাকে দেখে হাসলো। "ড্রিংক দেবো কিছু?"
আমি মাথা নাড়লাম। নাহ-লাগবে না।
আমার প্লেটের খাবারের পরিমান দেখে সে আমাকে কি যেন একটা জিজ্ঞেস করলো। আমি ভাল বুঝলাম না। শুধু কানে এলো, "বেজিতারিয়ান" শব্দটি।

আমি খাওয়া শুরু করি। খাবার অতিমাত্রায় বিস্বাদ। প্লেনের খাবারের পর বুঝে গেছি যে সামনে কঠিন দিন আসছে। জিভটিকে পোষ মানাতে হবে। ভুলে যেতে হবে কতনা মজার স্বাদু খাবারের কথা। যেখানে যাচ্ছি, সেখানেও তো মানুষ থাকে, তারাও তো খাওয়া-দাওয়া করে। ওরা যদি পারে তাহলে আমিই বা পারবো না কেন? দেশ ছাড়ার যন্ত্রণাটি প্রতি মুহুর্তেই টের পেতে থাকি। দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কিইই বা আছে করার?

টেবিলের পাশে খুটখাট শব্দে মুখ তুলে তাকাই। দেখি সেই ওয়েটারটি ফিরে এসেছে। তার হাতে একটি বড় প্লেট, তাতে অনেক রকমের ফল। বুঝলাম সে ভেবেছে যে আমি হয়তো নিরামিষাশী এক বেচারা , এজন্যেই এত কম খাবার নিয়েছি। আমার জন্যে তাই সে ফল নিয়ে এসেছে। একটু আগেই তাকে দেখে রাগে গা জ্বলে যাচ্ছিল, কিন্তু এখন তার মায়াময় হূদয়টিকে বড় ভাল লাগলো। আমার জন্যে এটা সে না করলেও পারতো।

ওইদিনে আমার আর একটি শিক্ষা হয়েছিল। পৃথিবীতে এখনো ভাল মানুষের সংখ্যা প্রচুর। তাইই বোধহয় এখনো সূর্য্য ওঠে, এখনো টিকে আছি আমরা সবাই। জীবনের প্রতিটি পথের বাঁকে দেখা মিলেছে এমনতরো আরো অনেক সহূদয় জনের।

প্লেটের ফলগুলো সব আস্ত আস্ত। কলা, কমলা, আপেল ইত্যাদি চেনা ফলের পাশাপাশি একটি ফল আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। সেটি দেখতে অনেকটা লিচুর মতো, সাইজে অতটুকু বড়ই হবে। কিন্তু ফলটির গায়ে চুলদাড়ির মতো লম্বা লম্বা কি যেন বেরিয়ে এসেছে। এ আবার কি ফল হে বাপু?

ওয়েটারের দিকে প্রশ্নের দৃষ্টিতে তাকাই। সে একগাল হেসে বলে, "জুজুপ।"
জুজুপ! জুজুপ কি? সেটা কি এই ফলটির নাম? আবার জিজ্ঞেস করি তাকে। সে আবারো বলে,"জুজুপ।"

তাহলে এই ফলটির নাম জুজুপ হবে বোধকরি। যাকগে-সেটার চেহারা বিশেষতঃ ফলটির চুল-দাড়ি দেখে আর খেতে ইচ্ছে করলোনা সেদিন। প্লেট থেকে একটা আপেল আর একটা কলা নিয়ে নিলাম। পরে জেনেছি এই কিম্ভুতকিমাকার ফলটির নাম রামবুতান। ফলটি বোধহয় এখন বাংলাদেশেও পাওয়া যায়। খেতে ভারী চমৎকার। শুধু দেখতে না, স্বাদেও লিচুর কাছাকাছি মনে হয়েছে আমার কাছে।

খাওয়া ততক্ষণে শেষ। ভাবলাম দুটি ফল হাতে নিয়ে আমি আমার ঘরে ফিরে যাই। কিন্তু আবার একই সাথে মনে হোল এইই প্রথম দেশের বাইরে এলাম। এই যে আমি এই ব্যাংকক শহরটিতে এলাম, আমি কি এর কিছুই দেখবোনা? এটুকু জানতাম যে আমি এয়ারপোর্টের কাছেরই একটা হোটেলে আছি (কেননা হোটেলটির নাম ছিল এয়ারপোর্ট হোটেল), তার মানে হচ্ছে যে আসল ব্যাংকক শহর বেশ দূরে। রাতের বেলা একা একা সম্পূর্ণ অপরিচিত একটি শহরে ঘুরে বেড়ানোর মত সাহস ছিলনা আমার। কিন্তু নিদেনপক্ষে পায়ে হেঁটে হোটেলের আশপাশেও তো ঘুরতে পারি।

ফল দুটোকে পকেটে পুরে আমি হোটেলের বাইরে এসে দাঁড়ালাম।
এতক্ষণ টের পাইনি, এবারে টের পেলাম। ব্যাংকক এর আবহাওয়া ভয়ানক রকমের বাজে। ভ্যাপসা গরম। দু মিনিট দাঁড়ালেই কুলকুল ঘামে ভরে যাবে শরীর। সেটায় দমিয়ে দিলো আমাকে পঞ্চাশ ভাগ। তার উপর রাস্তায় দেখলাম প্রচড জোরে এবং বেপরোয়াভাবে মটর সাইকেল চালাচ্ছে লোকেরা। তারা রাস্তায় আটকে থাকা গাড়ীর মাঝখান দিয়ে বাউলি কেটে বেরিয়ে যাচ্ছে অবলীলায়।

পরে জেনেছি যে ওই বেপরোয়া মটর সাইকেল আরোহীরা নাকি ক্যুরিয়ার সার্ভিস এর লোক। ব্যাংককে ট্র্যাফিক এত বেশী জমে যায় যে ওরাই তখন একমাত্র ভরসা। মানুষ থেকে শুরু করে যেকোন কিছুই তারা নিয়ে যায় শহরের এক মাথা থেকে অন্য মাথায়।

ভেতো বাঙ্গালী আবার আস্তে আস্তে হোটেলের ভিতর ঢুকে পড়লো। যাই বাবা- ঘরেই ফিরে যাই বরং। শেষমেশ বিদেশ-বিভুঁইয়ে মটর সাইকেল চাপা পড়ে পৈত্রিক প্রাণটি হারানোর কোন মানে হয়না।

নিজের ঘরে ফিরে এসে মনটা কেমন যেন বিষন্ন হয়ে গেল আবারও। বুঝলাম আমার এতদিনের চেনা মানুষগুলো আর আমার কাছে নেই। এখন থেকে আমার যথার্থ একাকী জীবনের শুরু হোল। কেউ নেই সাহায্য করবার, কারো কাছে যেয়ে পাবোনা কোন সহানুভূতি বা পরামর্শ। এমন কেউ নেই যে আমার কাঁধে হাত রেখে বলবে, "এত চিন্তা করছিস কেন? সন কিছু ঠিক হয়ে যাবে।"

টিভিতে কিসব দেখাচ্ছে। ভিন্ন ভাষা, অপরিচিত সবকিছু। ভাল লাগলোনা। টিভি বন্ধ করে দিলাম।

পরদিন সকাল দশটায় আমার ফ্লাইট। তার মানে সকাল আটটার মধ্যে এয়ারপোর্টে গিয়ে পৌছালে ভাল হয়। তার মানে ভোর ছ'টার দিকে ঘুম থেকে ওঠা উচিত। অত ভোরে কি উঠতে পারবো? ঘুম কি ভাংবে আমার?

বিছানার পাশের টেবিলে ছোট্ট একটি ক্লক রেডিও। সেটায় এ্যালার্ম সেট করলাম ছ'টায়। কিন্তু এই পুঁচকে ঘড়ির আওয়াজে যদি ঘুম না ভাঙে?
ফোন তুলে কল করলাম হোটেলের রিসেপশনে। তাদেরকে বলে দিলাম আমাকে ভোর ছ'টায় ফোন করে জাগিয়ে দিতে।

এইবার কিছুটা নিশ্চিন্ত হ'লাম। ঘড়ির আওয়াজে যদি না উঠি, তাহলে হোটেলের লোকেরা তো আমাকে উঠিয়ে দেবে। কিন্তু মাথায় আবার দুশ্চিন্তা এলো। যদি আমি তাদের ফোনের আওয়াজ না শুনি? তাহলে? তাহলে কি হবে?

সিদ্ধান্ত নিলাম যে এইসব যন্ত্রপাতি বা অন্যলোকদের উপর ভরসা করে লাভ নেই। নিজের সমস্যা নিজেকেই মেটাতে হবে।

অতএব আজকের রাতে আমার ঘুমানো ঠিক হবে না। যদি আমি না ঘুমাই, তাহলে তো আর জাগার কোন সমস্যা থাকবেনা।

পোশাক বদলে বিছানার কম্বলের তলায় ঢুকে গেলাম। বাতি নিভিয়ে দিলাম বড় বড় চোখ মেলে তাকিয়ে থাকলাম ছাদের দিকে। এইভাবে থাকতে থাকতে কোন সময়ে যে ঘুমিয়ে গেছি তা নিজেও জানিনা।

হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। কোথায় যেন একটা খুট করে শব্দ হোল। ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর কিছুক্ষণ সময় লাগে সব কিছু বুঝে উঠতে। কোথায় আছি আমি?

এমন সময় হঠাৎ চোখের কোণা দিয়ে খেয়াল করলাম যে আমার ঘরের দরজায় ক্যাঁচ করে একটা শব্দ হোল। আস্তে আস্তে খুলছে দরজাটা। কেউ আমার ঘরে ঢুকছে। কে? চোর? ভয়ে আমার বুক হিম হয়ে গেল।

একসময় দরজাটা বেশ হাট করে খুলে গেল। কম্বলের তলা থেকে আমি দেখছি কে ঢুকছে আমার ঘরে? আড়চোখ সময় দেখলাম। ভোর সাড়ে পাঁচটা। এত ভোরে আমার ঘরে কে ঢুকছে?

ঘিরে আধো আলোয় দেখলাম, আমার ঘরে ঢুকেছে একটি মেয়ে। ও আল্লাহ্‌- এ আমি কি দেখছি? আমার ঘরে মেয়েমানুষ কেন? তখন মনে পড়লো কোথায় যেন পড়েছিলাম, প্রসটিটিউশনে ব্যাংককের কুখ্যাতি দুনিয়াজোড়া। তবে কি আমার ঘরে প্রসটিটিউট ঢুকেছে?

এখন আমি কি করবো?
ভয়ে আর আতংকে আমার বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল।

মেয়েটি আমার বিছানার কাছে এগিয়ে আসে। কোন এক ক্ষমতাবলে সে টের পেয়েছে যে আমি জেগে আছি।
আমার বিছানার খুব কাছাকাছি এসে মেয়েটি মৃদুস্বরে বলে, "এক্সকিউজ মি স্যার, আপনি কি জেগে আছেন?"

(বাকী অংশ পরের পর্বে)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28791205 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28791205 2008-04-25 22:59:28
কামেহামেহা, মানোয়া পাহাড় এবং আলোহা। পর্ব-১(ক)। ব্যাংককে একটি রাত এবং মধ্য আকাশের থাই খালাম্মা


আশির দশকের মাঝামাঝি। অগাস্ট মাসের একটি রোদে ঝলমল করা দুপুর।

ঢাকা এয়ারপোর্টে নানা লোকের ভিড়। কেউবা টিকিট কাউন্টারের সামনে, লাগেজের ওজন বেশী হওয়াতে কারো মেজাজ খারাপ, স্বামীকে বিদায় জানাতে এসে বৌটির কান্নায় লাল দুচোখ, কেউবা একাকী চেয়ারে বসে অলস দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বাইরের দিকে, কেউবা প্লেনে পড়ার জন্য ব্যস্ত হাতে কিনছে বই এবং পত্রিকা।

বিভিন্ন ধরনের লোক, বিচিত্র তাদের অবস্থা। অন্য সময় হলে আমি এদেরকে দেখে দিব্যি ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিতে পারতাম অনায়াসে। মনে মনে বানাতে পারতাম কত রকম মজাদার গল্প।

কিন্তু অগাস্টের বিশেষ দিনের ওই দুপুরটিতে এসবের কোনকিছুই আমার নজরে আসছিল না। আশপাশের মানুষের কোলাহল, তাদের আচার-আচরণ কিংবা এয়ারপোর্টের ঝকঝকে মেঝেতে অকস্মাৎ পা পিছলে পড়ে যাওয়া শিশুটিকে দেখে আমার মুখভাবের বা মনোভাবের কোনটারই তেমন কোন উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হচ্ছিল না।

সত্যিকথা বলতে কি আমার ভয়ানক বিরক্ত লাগছিল। আর একঘন্টা পর আমার ফ্লাইট। আমি দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছি আমেরিকাতে। শুধু আমেরিকা বললে পুরোটা বলা হবেনা। আমি আমেরিকার যে কোন জায়গায় যাচ্ছি না। আমি যাচ্ছি হাওয়াই দ্বীপে।
আমার সেদিন আর তর সইছিলনা। কখন উঠবো প্লেনে? কখন পৌছাবো আমার বহুবার স্বপ্নে দেখা সেই দেশটিতে? বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার সময়ে সব সময়ে চিন্তা করতাম এই দিনটির কথা। আজ সেই দিনটি এসে হাজির হয়েছে দোরগোড়ায়। তাই আমার আর কোন রকম দেরী সহ্য হচ্ছিল না।

এরই মধ্যে তিনবার আমি জিজ্ঞেস করেছি এয়ারলাইনের লোকদেরকে। "ভাই-প্লেনটা ঠিক সময়ে ছাড়বে তো?" ফ্লাইটটি ছিল থাই এয়ারলাইন্সের। তাদের লোকজনের ব্যবহার ভাল। তারা প্রতিবারই মিষ্টি হেসে বলেছে, "চিন্তা করবেন না। ফ্লাইট ঠিক সময়েই ছাড়বে।"
দেশী এয়ারলাইনসের লোক হলে আমাকে নির্ঘাত দু চারটে কটুবাক্য হজম করতে হোত এতবার তাদেরকে জ্বালানোর জন্যে।

সে আমলে এয়ারপোর্টের ভিতরে যাত্রীকে বিদায় জানানোর জন্যে যে কেউই ঢুকতে পারতো। তাই আমাকে ঘিরে ভিড় করে আছে আমার পরিবারের লোকজন। আমার তাতে আরো বেশী বিরক্ত লাগছে। আরে বাবা-এত ভ্যাজালের কি দরকার? নাহয় আমি বিদেশ যাচ্ছিই, তার জন্যে সবাইকে এয়ারপোর্টে আসবার দরকার টা কি? বাড়ীতে বসে গুডবাই বললে কি আমি মন খারাপ করতাম? তোমাদেরকে এই এয়ারপোর্টে না দেখলে আমি ঝরঝর করে কেঁদে ফেলতাম?

নো, নো-তোমাদের বোঝার বিরাট ভুল হয়েছে। তোমরা ভাবছো যে দেশ ছেড়ে বাইরে চলে আসছি বলে আমার ভীষণ মন খারাপ? তোমরা ভাবছো যে তোমাদেরকে আর দেখতে পাবোনা বলে আমার মনে কষ্ট হচ্ছে? তোমরা ভাবছো যে আমি হাওয়াই নামের এক জেলখানাতে যাচ্ছি বলে আমার ভিতরটা ভয়ে সিঁটিয়ে আছে?

ওয়েল-ইউ অল আর এ্যাবসলুটলি রং।

আমেরিকা হচ্ছে গিয়ে আমার স্বপ্নের দেশ, মোটেও সেটা জেলখানা নয়। আমি যাচ্ছি যেখানে যাবার জন্য প্রতিবছর বাংলাদেশের কোটি কোটি লোক ওপি-ওয়ান আর ডিভি ভিসা পাবার জন্য আবেদন করে। আমি যাচ্ছি সেই দেশের হাওয়াই দ্বীপে। হাওয়াই দ্বীপের নাম শুনেছো নিশ্চয়ই? মনে নেই-জেনারেল নলেজের বইতে প্রশ্ন থাকতো "কোন স্থানে সাপ নাই?", আর তার উত্তর থাকতো, "হাওয়াই দ্বীপে সাপ নাই"।
সেই হাওয়াই দ্বীপে যাচ্ছি আমি। এখানে যাবার জন্যে আমি মনখারাপ করবো কেন? আমি খুশী, খুবই খুশী। শুধু তোমাদের সামনে মুখে মুখে একটা দুঃখী দুঃখী ভাব এনে রেখেছি, যাতে তোমরা আবার আমাকে নিষ্ঠুর না ভাবো।

মনের কথাগুলো বলতে পারছিনা বলে আরো খারাপ লাগছিল। তার উপর আমি অনেকক্ষণ সিগারেট খাইনি। পেটের মধ্যে একটা কেমন খালি খালি ভাব। মুখ বিস্বাদ। কোথাও কি গিয়ে দ্রুত একটান সিগারেট খাওয়া যায়না? আমি এদিক-ওদিক তাকাই জুতমতো একটা জায়গার সন্ধানে।

মা জিজ্ঞেস করলেন,"তুই এতো উসখুস করছিস কেন? খারাপ লাগছে নাকি? দেখিতো তোর কপাল গরম হয়েছে কিনা?"

মা আমার কপাল স্পর্শ করেন। মায়ের হাতের ছোঁয়াটিও কেমন যেন ভাল লাগেনা। আমি কি ছোট বাচ্চা নাকি যে কপালে হাত দিয়ে দেখতে হবে। আমি এখন বড় হয়েছি, একটু পরেই এই দেশ ছেড়ে চলে যাবো বহুদূরের একটা সুন্দর জায়গায়। আচ্ছা ভালো কথা- প্লেনে কি আমাকে কোন খাবার দেবে? কি রকম হবে সেই খাবার? আমি কোনদিন প্লেনে করে দেশের বাইরে যাইনি। ডোমেস্টিক ফ্লাইটে তো কিছুই দেয়না। শুধু দু একটা টফি ছাড়া। ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটে নিশ্চয়ই ভাল কিছু বিদেশী খাবার দেবে।

বাবা একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এবার তিনি কাছিয়ে এলেন। নাহ-এরা সবাই তো দেখি কান্নাকাটির ধুম বসিয়ে দেবে দেখা যাচ্ছে। কি করে বোঝাই যে আমি আসলে মহা আনন্দে আছি।

বাবার পিছনে দুটি পরিচিত মুখ দেখা গেল। জারিফ আর শফিউল। আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্স-সহপাঠী।
"কিরে তোরা এখানে?"
"তোকে গুডবাই বলতে এলাম।"
"তোরা এতো ফরম্যাল হ’লি কবে থেকে? যাকগে- এসেছিস ভালই হয়েছে। একটা ছোটখাট সমস্যা মিটানো দরকার।"
"কি সমস্যা?"
ওদের কাঁধে হাত রেখে একটু দূরে সরে দাঁড়াই। "সিগারেট খাইনি অনেকক্ষণ। ভিতরটা খালি খালি লাগছে।"
জারিফ হাসে। "সিগারেটটা ছেড়ে দেয়া যায়না? আর কত রেলগাড়ির মতো ফুস ফুস করবি?"
আমি বিরক্ত হই। "তোর মহা অমৃতবাণী শোনার মত সময় নেই আমার। কিছু করতে পারলে কর, নাহলে দূর হ'।"
এবার শফিউলও হাসে। "এত রাগ কেন বাবু? আচ্ছা-শোন, পাঁচমিনিট পর তুই আর জারিফ ওই কোণের দোকানটাতে আয়। বলবি যে তুই পথে পড়ার জন্য কয়েকটা পত্রিকা কিনতে যাচ্ছিস। আমি সিগারেট কিনে রাখবো। তুই ওখানে আসার পরে আমি আর জারিফ তোকে আড়াল করে রাখবো, আর তুই যত তাড়াতাড়ি পারিস কয়েকটা টান দিয়ে চলে আসিস। নেশাখোর বন্ধুর জন্য এটুকু যদি করতে না পারি, তাহলে আর আমরা কিসের বন্ধু?"

রাগে গা জ্বলে গেলেও কিছু করার নেই। সিগারেট খেতে গেলে এই দুই বান্দার মিচকে হাসি সহ্য করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। শফিউলের কথামতোই গেলাম কোণার দোকানে। আমি সেখানে যেতেই শফিউল আর জারিফ আমাকে আড়াল করে দাঁড়ালো। আমি দ্রুত হাতে সিগারেট ধরাই। সে আমলে যত্রতত্র সিগারেট খাওয়া জায়েজ ছিল (এমনকি প্লেনের ভিতরেও দেদারসে ধূমপান করা যেতো)। (আহা-কোথায় গেল সেইসব সুখের দিনগুলো।)

যাকগে-কেবল দুটো লম্বা টান দিয়েছি, অমনি কানের পাশে শফিউল বললো,"তাড়াতাড়ি কর।"
"কেন এখন আবার কি হোল?"
"তোর ছোট ভাইটা এদিকেই আসছে। মনে হয় তোকে খুঁজতে।"

নাহ- দুনিয়ায় আমার জন্য এক মুহুর্তেরও শান্তি নেই। তাড়তাড়ি আরো দুই টান দিয়ে ফেলে দেই সিগারেটটা। শালা-বেনসন এর আসল আরামই হচ্ছে শেষের ক'টা সুখটানে। এযাত্রায় সেটা আর হোলনা।

ভাইটি আমাদের কাছে এসে বললো, "দাদা- চলো তোমার প্লেনের লোকেরা উঠতে শুরু করেছে। বাবা তোমাকে আসতে বললো।"

যেন আমার হাতে ঘড়ি নেই, যেন আমি জানিনা কখন আমাকে প্লেনে উঠতে হবে। বাপ-মা জিনিসটাই খারাপ। এদের কাছে ছেলেমেয়েদের কখনো বয়েস বাড়েনা। এদের কাছে সবসময়ে বাচ্চার মত ট্রিটমেন্ট পেতে হয়। ভালই হয়েছে যে চলে যাচ্ছি। এই দেশে লোক থাকে! চব্বিশ ঘন্টা শুধু শাসন আর শাসন। আর উপদেশ। এটা করবে না, সেটা করবেনা। মাথা খারাপ হতে দুদিনও লাগবে না।

শফিউল আমার হাতে কয়েকটা পত্রিকা তুলে দেয়। "নে-পথে পড়িস। আর এটাও রাখ।" একটা ছোট্ট প্যাকেটও দেয় সে আমার হাতে।
"কি এটা?"
"দশ শলা বেনসন। এক প্যাকেট কিনতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আর পয়সা নেই। এটা দিয়েই পথের কাজ সেরে নিস।"
"ওয়াও-দশ শলা বেনসন। আমিতো জীবনে কোনদিন তিন-চার শলার বেশী সিগারেট একসাথে কিনেছি কিনা তা মনে পড়ছে না।"
"যাক-বিদেশ যাচ্ছিস। পথে আবার কোথায় সিগারেট পাস কিনা তার ঠিক নেই, দশ শলা দিয়ে অন্ততঃ কিছুটা পথ নিশ্চিন্তে থাকতে পারবি। দশ শলা পকেটে আছে বলে আবার ফুস ফুস করে সবগুলো একবারেই শেষ করে দিওনা।"

ফিরে এসে দেখি ইতিমধ্যেই গ্রুপের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। আরো জনা দুয়েক আত্মীয়ের চেহারা দেখা যাচ্ছে। বুঝলাম, বিদায় নেবার পালা এবার।

বাবা বরাবরের মতো ভুরু কুঁচকে আছেন। মা চিরকালের মতোই শান্ত। আমি হাতঘড়িতে সময় দেখলাম। বেশী সময় নেই আসলে। ছোট ব্রীফকেস আর ব্যাগটা তুলে নেই। বাবা-মায়ের দিকে তাকিয়ে একটু হাসি। যেতে হয় এখন।

বাবা জিজ্ঞেস করলেন, "তোর পাসপোর্ট টিকিট সব ঠিক আছেতো?"
"হ্যাঁ।"
"কই দেখি।"
আমি অবাক হই। "কি দেখবে?"
"তোর পাসপোর্ট আর টিকিট।"
নাহ- এদের জ্বালায় তো দেখি আমাকে দেশান্তরী হতে হবে (যদিও তাইই হচ্ছি)। প্যান্টের পকেট থেকে বার করি জিনিস দুটোকে। বাবা বলেন,"প্যান্টের পকেটে পাসপোর্ট না রাখাই ভাল, ঘামে ভিজে পাসপোর্টের বারোটা বাজতে পারে। বাংলাদেশী জিনিস, তেমন সুবিধার তো আর না।"
আমি আর কথা বাড়াই না।
"আমি যাই তাহলে।"
"ভাল ভাবে যেও। ফি আমানিল্লাহ।"

মা কিছুই বলেন না আমাকে। শুধু অল্প হাসেন একটু। তার মানে, ভাল থেকো। মায়েদের এটাই চিরকালের কথা। যতসব মিডল-ক্লাস আদিখ্যেতা!

আমি আর কথা বাড়াই না। ব্যাগ-ব্রীফকেস বগলদাবা করে রওনা দেই। প্যাসেজের শেষ মাথায় পৌঁছে আমি ফিরে তাকাই। দেখতে পাই যে সবাই কেমন গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে আছে একসাথে। যেন এই দুঃখের দুঃসহ ভার তারা একা একা নিতে পারবেনা।

আমার আবারও হাসি পায়। কিসের দুঃখ? আমি চলে যাছি বলে? আরে-আমি যাচ্ছি হাওয়াই। সেখানে তো কোন দুঃখ নেই, শুনেছি সেখানে লোকেরা কেবলই হাসে, সেখানে সাগরে জল এত নীল যে বোঝা যায় না এটা পানি নাকি তরল আকাশ। আমার জন্য দুঃখ করোনা।

আমি মুখে একগাল হাসি এনে হাত নাড়ি সবার উদ্দেশ্যে। বাই বাই-আমি চললাম! তোমরাও ভাল থেকো।

প্লেনের ভিতরে ঢুকেই কয়েকটা ধাক্কা খাই। প্রথমেই নাকে আসে একটি চমৎকার সুগন্ধ। নিশ্চয়ই কোন দামী এয়ার ফ্রেশনার হবে। সুগন্ধের সাথেসাথে আসে এয়ারকন্ডিশনারের শীতল বাতাস। আহা- শরীর জুড়িয়ে যায় যেন। দরজার ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছে একজন সুশ্রী এয়ারহোস্টেস। টিপিক্যাল বোঁচা বোঁচা থাই চেহারা, কিন্তু গালভর্তি হাসিটির কল্যাণে তার যাবত ত্রুটি ঢাকা পড়ে যায়। ঠিক কি বলে আমাকে স্বাগত জানিয়েছিল, তা ঠিক তখন বুঝতে পারিনি। (আমি ইংরেজী এমনিতেই কম বুঝি, আর থাই অ্যাকসেন্টের ইংরেজী বোঝারতো প্রশ্নই আসেনা।) তবে সে পাশের ট্রে থেকে আমার হাতে তুলে দিয়েছিল একটি ছোট্ট উপহারের ব্যাগ, ব্যাগটির উপরে পিন দিয়ে আঁটা একটি তাজা অর্কিড।

হ্যাঁ-একেই বলে ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইট! প্লেনের যেদিকেই তাকাই সেখানটাই যেন ঝকঝক করছে। থাই এয়ারওয়েজের অতিথীসেবার সুনাম রয়েছে জগৎ জুড়ে। সেদিন প্রথম বুঝতে পেরেছিলাম যে কেন এই সুনাম। প্লেনের লোকেরা যাত্রীদেরকে মহা সমাদরে যার যার আসনের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। হাসিমুখে শুনছে যাত্রীদের শত আবদার। এই প্রসংগে বলে নেই যে প্লেনে উঠে উদ্ভট আবদার করায় আমাদের জুড়ি নেই। যথাসময়ে তার কয়েকটা উদাহরন দেয়া হবে।

আমার আসনটি ছিল জানালার পাশেই। হাতের এবং কাঁধের পোটলাপুঁটলি জায়গামতো রেখে ভালকরে আয়েশ করে বসলাম। সে আমলে খুব বেশি লোক দেশের বাইরে যেতো না (মধ্যপ্রাচ্যযাত্রীরা বাদে অবশ্য), তাই প্লেনে অনেক আসনই ফাঁকা থাকতো। আমার পাশের সিটদুটিও ফাঁকা ছিল সেদিন। যাক- একটু হাত-পা ছড়িয়ে যাওয়া যাবে।

কোমরে সিটবেল্ট লাগাতে গিয়ে হাসি পেলো হঠাৎ। বহুকাল আগে পড়া (খুব সম্ভবতঃ শংকরের লেখা) একটি বইয়ে পড়েছিলাম একটি নারীসঙ্গলিপ্সু যুবকের কথা যে প্লেনে উঠে কখনোই সিটবেল্ট বাঁধতো না। ফলে এয়ারহোস্টেস এসে তার সিটবেল্টটি বেঁধে দিতো। সেই সুযোগে যুবকটি এয়ারহোস্টেসের সাথে আলাপ জমিয়ে ফেলতো। কতলোকের কত রকম স্টাইল।

প্লেনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই। রোদে ঝলমল করছে রানওয়েটি। এয়ারপোর্টে বহু লোকের ভিড়, তারা হাত নাড়ছে প্লেনের উদ্দেশ্যে।
আর কতক্ষণ বাকী রে বাবা? যদিও প্লেনের ভিতরের ঠান্ডা বাতাসে শরীর জুড়িয়ে এসেছে ইতিমধ্যে, তবুও টেক অফ না করা পর্যন্ত যেন কোন কিছুতেই মন বসাতে পারছিনা।

ও পাইলট ভাই-নোঙ্গরটা তোলেন না! চলেন যাই।

আমার মনের কথাটিতে সায় দিয়েই যেন নড়ে ওঠে প্লেনটি। আস্তে আস্তে সে গড়ানো শুরু করে। যাক-বাবা রওনা দিলাম তাহলে। ঢাকা থেকে আমি যাচ্ছি ব্যাংকক এ। সেখানে রাতটি থাকবো একটি হোটেলে। পরদিন সকাল বেলায় আবারো থাই এয়ারওয়েজ এ উড়বো। ব্যাংকক থেকে টোকিও। সেখানে প্লেন বদল হবে। এবারের উঠবো প্যান-অ্যাম এর প্লেনে। এই এয়ারলাইনটি এখন আর নেই (তাহলে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন কত আগের কথা বলছি)। টোকিও থেকে একটানে হনলুলু। হাওয়াই এর রাজধানী। আমার শেষ গন্তব্যস্থল।

প্লেনটি এবার বোধহয় দৌড়াবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। চুপ করে একটু দাঁড়িয়ে যেন দম নিচ্ছে। কোন এক জমাট বাঁধা শক্তির বলে থরথর করে কাঁপছে প্লেনটি। আমি আমার আসনের হাতলটি জোরে চেপে ধরি। এইবার প্লেনটি ছুটতে শুরু করলো।

জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। দ্রুত সরে যাচ্ছে সবকিছু। গাছপালা, বাড়িঘর, গাড়ি, মানুষ সবকিছু। আমার মজা লাগতে থাকে।

এমন সময় কেমন যেন হালকা হয়ে যায় সবকিছু। প্লেনটি উড়াল দিলো।

হঠাৎ নাভিমূলে টান লাগে। বুঝতে পারি কি যেন একটা কিছু ছিঁড়ে গেল। দেশের সাথে বাঁধা-পড়া নাড়িটি কে যেন হ্যাঁচকা টানে সরিয়ে দিল।

মুহুর্তের মধ্যে বুকের ভিতর হু হু করে কেঁদে ওঠে কোন এক মানুষ। এ তুই কি করলি? দেশকে পর করে দিলি? যে মা তোকে এত স্নেহে, এত মায়ায় ঘিরে রেখেছিল, তাকে তুই আজ ত্যাগ করলি? এতই লোভ তোর? এতই উচ্চাশা?

কান্নাকে ছাপিয়ে গর্জে ওঠে আরো একজন। সে বলে,"তবে শুনে রাখ বিশ্বাসঘাতক- ভাল করে শুনে রাখ। এই পবিত্র মাটির কসম, তুই আর কোনদিন দেখবি না সুখের মুখ, দেখবি না কোনদিন স্বস্থির চেহারা। তোর মধ্যে লুকিয়ে আছে ভয়াবহ একজন যে তোকে শুধু অন্যের দুয়ারে নিয়ে যাবে। ঘরের পথ তুই ভুলে যাবি, এই মাটির গন্ধ তুই খুঁজে ফিরবি, মায়ের মুখটি তোকে আজীবন তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াবে।"

আমি চমকে উঠি। কে কথা কইছে আমার ভিতর? স্বরটির জলদগম্ভীর গলাটি আবার শোনা যায়, "এই মাটি তোকে অভিশাপ দিচ্ছে। আজ থেকে তোর নির্বাসন শুরু হোল। আজ থেকে তুই নির্বাসিত।"

আমি দু'হাতে মুখ ঢেকে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলি।

চোখের পানিতে অস্পষ্ট হয়ে যায় সবকিছু। প্লেনের ঝকঝকে অবয়ব, জানালার বাইরের সুনীল আকাশ, সুদৃশ্য বিমানবালা। সব সবকিছু ঝাপসা মনে হয়। মিলিয়ে যায় সব আনন্দ, সব উত্তেজনা।

বুকের ভিতর শুধু অবশিষ্ট থাকে একটি হাহাকার।

"এ আমি কি করলাম! এ আমি কি করলাম!"


(বাকী অংশ পরের পর্বে)


(নতুন সিরিজটি লেখা শুরু করলাম। আশাকরি আপনাদেরকে সাথে পাবো এই যাত্রায়ও। যেমনটি পেয়েছিলাম আগের সিরিজের সময়। তবে এবারে ব্যক্তিগত ব্যস্ততার মাত্রা অনেক বেশী বলে পর্বগুলো পোস্ট করতে হয়তো কিছুটা দেরী হবে। তার জন্যে আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28789930 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28789930 2008-04-21 22:25:55
অণুগল্প-১। হিসেব-কিতেব। এই নিয়ে ছয় বার গোণা হোল। প্রতিবারেই তিরাশি। তার মানে গোণার ভুল হয়নি।

টাকাটা পকেটে ভাল করে গুঁজে রাখেন নীলরতন সেনশর্মা। লোকে ডাকে নীলু মাস্টার। সাত বছর আগে রিটায়ার করলেও নামটি এখনো তার পিছু ছাড়েনি।

একশো টাকা পকেটে নিয়ে সন্ধ্যেবেলা বাজারে মনোজ সাঁপুইয়ের দোকানে ঢুকেছিলেন। কয়েকটা স্পোক কেনার জন্যে। সাইকেলটা ক'দিন ধরে টাল খাচ্ছে একদিকে। এখন মেরামত না করলে কখন আবার কি হয় কে জানে। স্পোকগুলোর দাম আট ন' টাকার বেশী হবে না। বাকী টাকা ছোট নোটে ফেরত দিয়েছিল মনোজ।
"বড় নোট নেই মাস্টারমশাই। টাকাগুলো ভাল করে গুনে নিন।"
"কি যে তুমি বলোনা মনোজ। তুমিতো গুনেছোই একবার। ওতেই হবে।"

এখন মনে হচ্ছে তখন গুণে নেওয়াই উচিত ছিল। নীলু মাস্টার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
বৌ সত্যবতী বলতো,"তুমি এতো বিশ্বাস করো কেন সবাইকে? সবাই তোমাকে ঠকাবে একদিন।"
"কি বলছো তুমি, সত্য? বিশ্বাস না করলে চলে? শরত্ চন্দ্র একবার লিখেছিলেন, অবিশ্বাস করিয়া জিতিবার চাইতে বিশ্বাস করিয়া হারাও ভাল।"
"তোমার কপালে তাহলে হারাই আছে।"

কথাটা কিন্তু সত্যবতী ঠিকই বলেছিল। আলাভোলা, বোকাসোকা মানুষ নীলু মাস্টারকে ঠকায়নি এমন লোক এ তল্লাটে নেই। বাপ-দাদার জমি ভাগের সময় দু বিঘে জমি কম পেলেন। কথা থাকলেও প্রমোশনটা শেষ পর্যন্ত আর মেলেনি তার। প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা তোলার সময় কিভাবে যেন একগাদা টাকা ওরা কেটে নিল। ছেলে সুবল বিয়ে করে আলাদা থাকছে, সবকিছু করছে ঠিকমতো, শুধু বাবাকে মাঝে মাঝে টাকাটাই পাঠানো হয়না তার।

আজ সত্যবতী থাকলে হেসে হেসে নিশ্চয়ই বলতো," এবার আমার কথা বিশ্বাস হয়েছে তোমার?"

মনোজের দোকান থেকে বেরিয়ে গিয়ে বসেছিলেন খলিলের চায়ের দোকানে। পুরনো ছাত্র খলিল, গেলেই যত্ন করে চা-সিংগাড়া খাওয়ায়। দু'দিনের বাসী খবরের কাগজটাও নাড়াচাড়া করা যায়।

সেখানে আজ দেখা হয়েছিল কলেজের প্রফেসর তিমির নন্দীর সাথে। আর এক পুরনো ছাত্র। ভালই জমেছিল আলাপ।
"বুঝলেন মাস্টারমশাই- একটা বই পড়ছি, ভারী অদ্ভুত কথা লিখেছেন ভদ্রলোক।"
"কি রকম?"
"ভদ্রলোক মনে হয় নাস্তিক, কিন্তু তার কথায় এক ধরণের অদৃষ্টবাদিতার সুর। তার মতে আমাদের যাবতীয় হিসেবকিতেব এই পৃথিবীতেই মিটিয়ে ফেলা হয়। যেমন ধরুন আপনি যদি কারো মনে দুঃখ দেন তাহলে কোন না কোন এক সময় তেমনি দুঃখ আপনাকেও পেতে হবে। উপকার করলে উপকার পাবেন। কোন কিছু হারালে তাতে দুঃখ করবেননা। সেগুলো সব জমা হচ্ছে কোথাও। এক সময় আবার ফেরত পাবেন। আমাদের প্রত্যেকেরই এ্যাকাউন্ট ঠিক ঠিক মিলিয়ে দেওয়া হবে একদিন। বুঝলেন না- আমাদেরকে ঠকানোর নতুন ফন্দী। আমরা যেন নালিশ না করি।"

বাজার থেকে বেরোতে রাত হয়ে গেল অনেকটা। তাতে কি? কেউ তো আর বাড়ীতে তার জন্যে বসে নেই। এক সময় বাড়ীতে ফিরলেই হোল।

শীত পড়বো পড়বো করছে। গায়ের চাদরটা ভাল করে জড়িয়ে সাইকেলে উঠে পড়েন তিনি।

ভালই কুয়াশা পড়েছে। চাঁদের আলোটি ম্লান। সাইকেল চালাতে চালাতে নীলু মাস্টার ভাবছিলেন তিমিরের বলা কথাগুলো।

সব হিসেব মিলে যাবে একদিন। বাহ-এমনটি হলে মন্দ হয়না। কত কিছু হারিয়েছেন এ জীবনে। মনে আছে পড়ার নাম করে কত লোকে তার বইগুলো নিয়ে গেছে, আর ফিরিয়ে দেয়নি। আবার ফিরে আসবে বইগুলো? আবার ফিরে পাবেন দু বিঘে জমি? মনোজের মেরে দেওয়া সাত টাকা? এ্যাসিসট্যান্ট হেডমাস্টারের চাকরি?

নীলু মাস্টারের ভাবতে ভালই লাগে। বিশ্বাস করেও তাহলে জেতা যায়? যা কিছু হারিয়েছেন সব জমা হচ্ছে কোন একখানে। একদিন সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো সবকিছুকে পায়ের কাছে নামিয়ে দেবে।

সব কিছূ? এমনকি সত্যবতীকেও?

বিয়ের পাঁচ বছর পর উত্তরপাড়ার নিখিলের সাথে চলে গিয়েছিল সত্যবতী। আর কোনদিন ফেরেনি।

তবে কি সেও ফিরে আসবে? আহা-ওই ঢলোঢলো সুন্দর মুখটি কতদিন দেখেননি তিনি।

একমুখ হাসি নিয়ে কুয়াশার মধ্যে সাইকেলের প্যাডেল মারেন নীলু মাস্টার। মনোজ সাঁপুই এর সাত টাকা মেরে দেওয়ার দুঃখ তিনি ভুলে গিয়েছেন ইতিমধ্যেই।

(ব্যস্ততার জন্য নতুন কিছু লেখা হচ্ছেনা বলে পুরনো জিনিস আবার চালিয়ে দিলাম।)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28786436 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28786436 2008-04-09 21:55:22
ছোটগল্পঃ নক্ষত্রের আলো। (লেখকের স্বীকারোক্তিঃ নতুন লেখা তৈরী হতে দেরী হচ্ছে দেখে পুরনো মদটিকেই পরিবেশন করলাম। আশাকরি লেখাটি পড়তে আপনাদের ধৈর্য্যচ্যুতি হবে না।)


শিশুটি হঠাৎ কেঁদে উঠলো।

এই অকস্মাৎ কান্নায় মিরির চমক ভাঙ্গে। বইয়ের পাতা থেকে সে মুখ তুলে তাকায় শিশুটির দিকে। একটু আগেও সে চুপচাপ শুয়ে খেলছিল আপন মনে।
মিরি শিশুটিকে বুকে তুলে নিয়ে আদর করে। গালে গাল ঘষে দেহের গন্ধ নেয়। পরিচিত স্পর্শ পেয়ে শিশুটি ক্রমে শান্ত হয়ে আসে। বোঝা গেল আসলে মায়ের ছোঁয়া পাওয়ার জন্যে কেঁদেছিল সে।

মিরি অল্প হাসে, "তুমি খুব দুষ্টু হয়েছ আজকাল। শুধু আমাকে জ্বালাও।"
মায়ের মুখে হাসি দেখে শিশুটিও আহ্লাদিত হয়। এমনটিই বোধহয় তার ইচ্ছে ছিল। সে তার ছোট ছোট হাত পা নেড়ে অস্ফুট ধ্বনি করে। মিরি মুখ নেড়ে নেড়ে জিজ্ঞেস করে, "এখন হাসছো কেন আমাকে দেখে? আমি কি সার্কাসের ক্লাউন যে আমাকে দেখলেই হাসতে হবে?"

কথা বলার সাথে সাথে মিরি চোখমুখ পাকিয়ে মজার ভংগী করে। শিশুটি তা দেখে আরো মজা পায়। সে এবার খিল খিল করে হাসে।
মিরি অপার ভালবাসায় শিশুটিকে শক্ত করে বুকের মধ্যে জড়িয়ে রাখে। ফিস ফিস করে বলে, "তুমি আমার সোনাবাচ্চা, তুই আমার হানিবেবী।"

শিশুটি ভালবাসার এই প্রবল প্রকাশকে পছন্দ করেনা। সে রাগে ফোঁসফোঁস করতে থাকে।

শিশুটির বয়েস আটমাস। মিরির বিয়ের দুই বছরের মাথায় সে পেটে আসে। অন্তঃসত্ত্বা হবার খবরটি প্রথমে শাহেদই পেয়েছিল। সে তার কাজ থেকে ডাক্তারের অফিসে ইউরিন টেস্টের খবর নেবার জন্যে ফোন করেছিল। খবরটি জানবার পরেও সে মিরিকে বলেনি কিছুই। বিকেলে বাসায় ফিরেছিল একটা অর্কিডের মালা হাতে করে। মিরির গলায় পরিয়ে বলেছিল, "সাধ্য থাকলে ফুলের বদলে হীরের মালা নিয়ে আসতাম। এমন একটা আনন্দের দিনে মানিব্যাগটাই ঝামেলায় ফেলে দিল।"
দেশে থাকলে অন্তঃসত্ত্বা হবার সংবাদটি বড় লজ্জাদায়ক। আশপাশের মানুষেরা সংবাদ শুনে কেমন যেন মিটিমিটি হাসে। ভাবখানা যেন, তলে তলে এইসব চলছে তাহলে!
বিদেশে ব্যাপারটা তেমন নয়, এখানে গর্ভধারণের খবরটি গর্বের সাথেই প্রচার করা হয়। মিরির তাও লজ্জা লেগেছিল, ছি ছি দেশের সবাই কি ভাববে এখন।
শাহেদ তাকে কাছে টেনে নিয়ে বলেছিল,"আমার আজকে খুব আনন্দ লাগছে। তুমি কি খুশী হয়েছো?"
মিরির মুখে সেদিন কোন কথা ফোটেনি, সে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেছিল। গভীর সুখে অথবা প্রগাঢ় বিষাদে তার চোখে সবসময় পানি আসে। এই স্বভাবের জন্যে মাঝেমাঝে মিরির ফোলা চোখ দেখে শাহেদ ঠিক ঠাহর করতে পারেনা যে কান্নাটি কোন অনুভূতির প্রকাশ।

দরজায় টুং টুং করে ডোরবেলটি বাজে। মিরির কানে সেই শব্দটি সংগীতের মতো মনে হয়।
দিনের এই সময়টি মিরির বড় প্রিয়। এই সময়ে শাহেদ সাধারণতঃ বাসায় ফেরে। যদিও তার পকেটে ঘরের চাবি থাকে, তবুও সে প্রতিদিন ডোরবেলটি বাজায়। এর অর্থ হছে মিরিকে গিয়ে দরজা খুলতে হবে। সে নিজে কোনদিনও চাবি দিয়ে দরজা খুলবেনা। কয়েকদিন মিরি বাথরুমে ছিল আর শাহেদকে মিনিট দশেক অপেক্ষা করতে হয়েছে। তবুও সে শান্ত ভাবে দাঁড়িয়ে থেকেছে বারান্দায় কখন মিরি এসে দরজা খুলবে সেই আশায়।

একদিন মিরি তাকে বলেছিল, "তুমি হচ্ছো বৌ খাটানো স্বামী। নিজে একদিন দরজা খুললে কি হয়? সবসময় কি আমাকেই এসে দরজা খুলতে হবে?"
শাহেদ বলেছিল, "দরজা খুলে তোমাকেই প্রথম দেখতে চাই যে।"
"একদিন না দেখলে কি হবে?"
"মন খারাপ লাগবে।"
"এটা কোন একটা কথা হোল?"
"একদম সত্যি কথা।"

ডোরবেলটি আবার বাজে। শিশুটিকে কোলে নিয়ে মিরি দরজা খোলে। বারান্দার এক কোণে দাঁড়িয়ে শাহেদ ছাতাটি বন্ধ করার চেষ্টা করছে।
সিয়াটলের বৃষ্টির দুর্নাম আছে গোটা আমেরিকায়। অক্টোবর থেকেই মেঘেরা স্থায়ী আসন গেড়ে বসে। সপ্তাহ ধরে সূর্য্যের দেখা মেলেনা। তাও বাংলাদেশের মতো মেঘ গর্জনে, বিদ্যুত্ চমকে, ঝুমঝুম করে বৃষ্টি নামলেও হোত। সিয়াটলের বৃষ্টি নিরামিষ প্রকৃতির, গুঁড়ি গুঁড়ি পানির বিন্দুতে কোন সৌন্দর্য্য নেই বলার মতো। বরং এই আবহাওয়ায় মানুষের ডিপ্রেশন বাড়ে।

মিরির অবশ্য মেঘলা আকাশ দেখতে ভালই লাগে। তাদের ছোট্ট এক বেডরুমের অ্যাপার্টমেন্টের শোবার ঘরের জানালাটি প্রকান্ড। বিছানায় শুয়েই অনেকখানি আকাশ দেখা যায়। মাঝে মাঝে যখন বড় বড় পানির ফোঁটা পড়তে থাকে, মিরি তখন জানালার পাল্লা খুলে দেয়। বাইরে হাত বাড়িয়ে দেয় জলের স্পর্শ পাওয়ার জন্য। লম্বা করে নিঃশ্বাস নেয়। কে জানে হয়তো এই মেঘটি পেছনে ফেলে আসা দেশ থেকে উড়ে এসেছে। হয়তো দেশের গন্ধ পাওয়া যাবে বৃষ্টির মধ্যে।

শাহেদ বারকয়েক চেষ্টা করেও ছাতাটি বন্ধ করতে পারলো না। শেষে "দুত্তোর" বলে ছাতাটি মাটিতে ছুঁড়ে মারলো। ছাতাটির বয়েস হয়েছে, তার উপর এটি হালকা ফোলডিং ছাতা। এই অকস্মাত্ গলাধাক্কায় সে কঁকিয়ে ওঠে। বোঝা যায় তার আয়ু ফুরিয়েছে।

ঘরের ভিতরে এসে শাহেদ কাঁধের ব্যাগটি টেবিলে নামিয়ে রাখলো। সে আজ বেশ ভিজেছে। এই জন্যে সে একটু বিরক্ত।
মিরি লুকিয়ে হাসলো। শাহেদ সিয়াটলের বৃষ্টি দুচোখে দেখতে পারেনা। অবশ্য তাকে খুব বেশী দোষও দেওয়া যায়না।

ইউনিভার্সিটি থেকে বাসায় ফিরতে প্রতিদিন তাকে প্রায় আধা ঘন্টার মত হাঁটতে হয়। তার উপর ছাতা কাজ না করলে মেজাজ খারাপ হবারই কথা। একটা গাড়ী থাকলে বেচারাকে আর রোজ রোজ হাঁটতে হোতনা।

"তুমি তো দেখি একদম ভিজে গেছ। সোজা বাথরুমে চলে যাও। আমি তোমার কাপড় নিয়ে আসছি।"
"শালার ছাতাটা আজকে বোধহয় একেবারেই গেছে। খোলার সময়ে খোলেনা, বন্ধ করার সময় বন্ধ হয়না। মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেছে। এখন আর একটা ছাতা কিনতে হবে।"
মিরি গোপনে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে।

আমেরিকায় ছাত্র হবার ঝামেলা অনেক। স্কলারশিপের গোনা পয়সায় বৌ-বাচ্চা নিয়ে সংসার চালানো চাট্টিখানি ব্যাপার না। বাচ্চা ছোট হলে তার জন্যে দুধ আর ডায়াপার কিনতেই কত গুলো পয়সা বেরিয়ে যায়। একটা ছাতার দাম বেশী না, কিন্তু টানাটানির সংসারে হিসেবের বাইরে পয়সা খরচ করতে ভালো লাগে না। বিয়ের আগে মিরি কোনদিন পয়সার টানাটানি দেখেনি। এখানে সে মাঝে মাঝে হাঁপিয়ে ওঠে।

এখানে সব ছাত্রেরই একই অবস্থা। এদের মধ্যে কয়েকজনের স্ত্রীরা লুকিয়ে একটা-দুটো বেবী সিটিং করে। তাতে পয়সার একটু সাশ্রয় হয়। মিরিও করতে চেয়েছিল। শাহেদ রাজী হয়নি।
"তোমার এখানে কাজ করবার অনুমতি নেই, মিরি। বেআইনি অল্প কয়টা পয়সার জন্য দুশ্চিন্তায় আমার রাতের ঘুম হারাম হয়ে যাবে।"
"এখানে অনেকেই তো করছে। তাদেরতো কিছু হছেনা। আমি করলেই দোষ।"
শাহেদ ম্লান হেসে বলেছিল,"সবাই করলেই একটা বে আইনি জিনিস জায়েজ হয়ে যায় না। আমি জানি পয়সার টানাটানি করে সংসার চালাতে হয় তোমাকে। কিন্তু জেনেশুনে কিভাবে আইন ভাঙি বলো? তার চেয়ে বরং সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিছি।"
এই কথা বলার পরেই সে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ মুখে ঘনঘন সিগারেট খায় বারান্দায় পায়চারী করতে করতে। প্রসংগ ওখানেই শেষ।

"খুব খিদে লেগেছে আজকে। তুমি ভাত চড়িয়ে দাও। আমি একেবারে গোসল করে আসছি।"
শাহেদ দ্রুতপায়ে বাথরুমের দিকে চলে যায়। কোলের মধ্যে শিশুটি এতক্ষন চুপ করে গুটিসুটি মেরে ছিল। বাবাকে সে সব সময়ই বড় বড় চোখ মেলে দেখে।
মিরি শিশুটিকে লিভিং রুমের কার্পেটে নামিয়ে রাখে। তারপর ভাত রান্নার আয়োজন করে দ্রুত হাতে।
বাথরুমের দরজা অল্প খুলে শাহেদ মাথা বের করে। তার চুল থেকে পানি পড়ছে টপটপ করে। বোঝা যাছে যে সে গোসল করতে করতে বার হয়ে এসেছে।
সে উঁচু গলায় বললো,"মিরি, তোমাকে একটা কথা বলতে ভুলে গিয়েছি। কাল রাতে আমি নাঈমকে আমাদের এখানে খেতে বলেছি।"

----XXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXX----

শাহেদ সাধারণতঃ সকাল ন'টার দিকে বেরিয়ে যায়। তার ক্লাশ থাকেনা আজকাল। এখন সে তার পিএইচডির রিসার্চ নিয়েই বেশী ব্যস্ত। মাঝে মাঝে তাকে ছুটির দিনেও কাজ করতে হয়।
আজ শুক্রবার, সপ্তাহের শেষদিন। সবারই মুখে একটা হাসি হাসি ভাব থাকে, উইক এন্ড আসছে।
সকালে নাস্তা শেষ করে কফি খেতে খেতে শাহেদ আড়মোড়া ভাঙ্গে। মিরি সকালে দেরী করে খায় বলে শাহেদ একা একাই নাস্তা খায়।
"আজকে কি রান্না করবে মিরি বেগম?"
মিরি সিংকে প্লেট ধুচ্ছিল। সে মাথা ঘুরিয়ে বললো," দেখি ফ্রিজে কি আছে।"
"গতবার নাঈম তোমার লাউ-চিংড়ি খেয়ে খুব প্রশংসা করেছিল। ওটা করতে পারো আজকে।"
"সেবার তো তাড়াতাড়ি করে যা হাতের কাছে ছিল, তাইই রান্না করেছিলাম। আজকে তো আর সেটা করলে হবেনা। আজকে ভাবছি পোলাও-কোর্মা জাতীয় কিছু একটা করবো।"
ভাল খাবারের কথায় শাহেদের মুখটা আলোকিত হয়ে ওঠে। আমেরিকায় খাবার-দাবারের দামটা বেশ সস্তা। খুব কম পয়সাতেই ভাল ভাল মোগলাই খাবার তৈরী করে ফেলা যায়। বাংলাদেশে বসে তা খেতে গেলে অনেক পয়সা লাগে।
কিন্তু এই আনন্দের আড়ালে একটি কষ্টের ব্যাপারও আছে। গোটা রান্নাটাই নিজের হাতে সামলাতে হয়। কোটা-বাছা থেকে শুরু করে মসলা বাটা, ধোয়াধুয়ি, মোছামুছি সব। দেশের মত কাজের লোকের বিলাসিতা এখানে নেই। কষ্ট হলেও মিরির খারাপ লাগেনা। সবাই যখন তৃপ্তি করে খায়, তখন ভালই লাগে।

"এতো অতি আনন্দের কথা সুন্দরী। এই সুন্দর হাতের পোলাও-কোর্মা না জানি কত সুস্বাদু হবে।"
মিরি হাসে। "তোমার ভাব দেখে মনে হচ্ছে আমি তোমাকে না খাইয়ে রাখছি। পোলাও-কোর্মা খাওয়াইনি কোনদিন। যাও- এখন ভাগো। আমার কাজ আছে অনেক। তোমার সন্তানের ঘুম ভাংলে খবর আছে। তিনি আবার অতিশয় অ্যাটেনশন প্রিয়।"
শাহেদ উঠে পড়ে। "তোমার অসুবিধার কারণ হবোনা সুন্দরী। আমি এই মুহুর্তেই প্রস্থান করছি। সান্ধ্যক্ষনে আবার দেখা হবে প্রিয়ে।"

মিরির বাবা সিরাজুদ্দিন সাহেব ভোজনরসিক ছিলেন। খাবারের টেবিলে ভাল ভাল খাবার না থাকলে তার মুখ বাংলার পাঁচের মত হয়ে যেত। আবার যেদিন পছন্দের খাবার থাকতো, সেদিন তিনি বড় আয়েশ করে টেবিলে বসতেন। দুপাশে দুই মেয়েকে বসাতেন। তাদের প্লেটে তুলে দিতেন মাংসের বড় টুকরো অথবা মাছের বড় পেটি।
মা জাহানারা বেগম হাঁহাঁ করে উঠতেন, "একি! সব ভাল ভাল জিনিসই তো তুমি ওদেরকে দিয়ে দিচ্ছ।"
সিরাজুদ্দিন সাহেব উঁচু গলায় হাসতেন। "ভাল ভাল জিনিস খাওয়ার অভিজ্ঞতা না হলে ওরা তো ভাল রান্না শিখবে না কোনদিন। শেষে পরের ঘরে যেয়ে তোমার বদনাম হবে যে তুমি ওদের ভাল রান্না শেখাওনি। আগে জিভটাকে তৈরী করে নেই, পরে সেই জিভের জন্যেই ওদেরকে বাধ্য হয়ে ভাল রান্না শিখতে হবে।"
"ওরা আবার রান্না শিখবে? কুটোটা পর্যন্ত নাড়তে চায়না, ওরা করবে রান্না।"
"সময় হলে সবই হবে মিরির মা। আমার মিরি মায়ের রান্না খেয়ে সবাই একদম অবাক হয়ে যাবে।"

মিরির বিয়ের সময়ে সিরাজুদ্দিন সাহেব কেমন যেন বোকা বোকা হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি যেন ভাল করে ব্যাপারটা বুঝতে পারেননি যে বিয়ে মানে মেয়ে ঘর ছেড়ে চলে যাবে। তাও কিনা সাত সমদ্দুর পাড়ি দিয়ে দুরের দেশ আমেরিকায়! বিদায় নেবার সময় তিনি কোন কথা বলতে পারেননি। শুধু শাহেদের মাথায় সস্নেহে হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন। কিছু বোধহয় বলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু কোন ভাষা খুঁজে পাননি।

শাহেদের মনে আছে ব্যাপারটা। সে মাঝে মাঝেই ডাঁট মারে। "তুমি আমাকে পাত্তা না দিলে কি হবে, আমি আমার শ্বশুরের সবচেয়ে প্রিয় জামাই।"

ভাল কোন কিছু রান্না করবার সময় প্রতিবারই বাবার কথা মনে পড়ে। মিরি রান্না শিখেছে আমেরিকাতে আসবার পর। এখানে আসবার পর প্রথম কয়েকদিন শাহেদই তাকে রান্না করে খাইয়েছে। মিরিকে বিয়ে করার আগে সে দু বছর একা ছিল আমেরিকাতে এবং সে কারণে কয়েকটা ডিশ রান্না করা শিখেছিল। কিন্তু তার রান্না বেশ খারাপ আর উদ্ভট প্রকৃতির। একেতো দেশ, বাবা-মা ছেড়ে আসার দুঃখ, তার উপর বাজে খাবার। প্রাণ বাঁচানোর জন্যেই দু'দিন পরেই মিরি রান্নাঘরে ঢুকতে বাধ্য হয়েছিল।

প্রথম দিন সে রান্না করেছিল সিদ্ধ ডিমের তরকারী। তাই খেয়ে শাহেদের কি আনন্দ। খাওয়া শেষ করে "আল্লাহ্‌ তোমাকে দীর্ঘজীবী করুন" বলে হাত তুলে দোয়াও করেছিল।

মিরি এখন বোঝে বাবা ঠিকই বলেছিলেন। ভাল রাঁধুনী হওয়ার জন্য সর্বপ্রথমে ভাল জিভ দরকার। মিরির রান্না এখন প্রথম শ্রেনীর, সিয়াটলের বাঙালী মহলে তার রান্নার রীতিমত সুখ্যাতি আছে।

সিরাজুদ্দিন সাহেব দেখলে নিশ্চয়ই খুব অবাক হতেন। নিশ্চয়ই স্ত্রীকে ডেকে বলতেন,"দ্যাখো, দ্যাখো, মিরির মা। কি আমি বলেছিলাম না যে আমার মিরি মায়ের রান্নার খুব সুনাম হবে। আমার ফুটফুটে ছোট্ট মেয়েটা আজকে দ্যাখো কি সুন্দর করে সংসার করছে। কার মেয়ে দেখতে হবে তো।"

মিরির আমেরিকায় আসবার চার বছর হয়ে গেল প্রায়। এরমধ্যে আর দেশে যাওয়া হয়নি। সবসময়ই বাবা মায়ের কথা, ছোট বোন বুড়ির কথা মনে হয়। সিরাজুদ্দিন সাহেব কি এখনো গভীর রাতে বারান্দায় বসে উত্তর আকাশে তাকিয়ে প্রিয় নক্ষত্র দেখেন? মা কি প্রতিদিন দুপুর বেলায় জানালার পাশে বসে আগের মতোন "গল্পগুচ্ছ" পড়েন? বুড়ি কত বড় হয়েছে? সে কি দেখতে খুব সুন্দর হয়েছে? মিরির প্লেনে ওঠার দিন তাকে এয়ারপোর্টে আনা হয়নি খুব কাঁদবে বলে। মিরির চোখ ভিজে আসে।

ফ্রাইপ্যান থেকে ধোঁয়া উঠছে। মিরির চমক ভাংলো। শামীকাবাব ভাজার জন্য চুলোয় তেল গরম করতে দিয়েছিল সে। সেই তেল থেকে ধোঁয়া উঠছে। লক্ষন খারাপ। এর মানে তেল বেশী গরম করে হয়ে গেছে, এখন ভাজতে গেলে কাবাবগুলো সব পুড়ে কয়লা হয়ে যাবে। আঁচলে চোখ মুছে মিরি চুলোর আঁচ কমিয়ে দিল।

এখন দুপুর একটা বাজে। বাইরের দিকে তাকালে বোঝার উপায় নেই। সিয়াটলের মেঘলা আকাশে সূর্য্য বন্দী হয়ে আছে। অনেকটা মিরির মতোনই। এমনিভাবে বিষন্নতার মাঝে দিনটি কেটে যায়।
মিরির দম বন্ধ হয়ে আসে।

এমনিভাবেই কি তার জীবনটিও কেটে যাবে? আবার কবে বাবা-মায়ের সাথে দেখা হবে? প্লেনের ভাড়া অনেক। মিরি লুকিয়ে কিছু পয়সা জমাতে চেষ্টা করে। এই কাজটিতে সে বেশী অভ্যস্ত না। দুই মাস জমানোর পর তৃতীয় মাসে বাজেট ঘাটতি হয়। সঞ্চয়ের ঝাঁপি মুহুর্তে ফাঁকা হয়ে যায় সে ঘাটতি মেটাতে।

সারা দিনের মধ্যে দুপুর বেলাটি মিরির নিজের সময়। এই সময়টিতে তার শিশুটি ঘুমায়। মিরিও তার মায়ের মতো বইয়ের পাতায় চোখ বুলায়। তার এই স্বভাবের কথা জেনে শাহেদ একদিন তাকে সাথে করে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরীতে নিয়ে গিয়েছিল। মিরি আগে কোনদিন কোন লাইব্রেরীতে যায়নি। সে অবাক হয়ে দেখছিল বিশাল হলঘরে হাজার হাজার বই। তার মধ্যে চার-পাঁচ সেলফ ভর্তি বাংলা বইও সাজানো আছে।
সেদিনটি বড় আনন্দের ছিল। তিনটি মোটা মোটা বই নিয়ে ঘরে ফিরবার সময় তার হাসিমুখ দেখে শাহেদ ঠাট্টা করেছিল,"এবার কি আর আমার কথা থাকবে তোমার?"

দেশের লোকেরা পয়সা আর সময়ের অভাবে কত সুন্দর সুন্দর বই পড়তে পারেনা। এখানে বিনা পয়সাতেই কত ভাল ভাল বই পাওয়া যায় লাইব্রেরীতে। প্রতিদিন দুপুরে বই পড়বার সময়ে মনে হয়, আহা - যদি মাকে এই লাইব্রেরীটিতে নেওয়া যেত। মায়ের নিশ্চয়ই খুশীতে কথা বন্ধ হয়ে যেত। মিরির বই পড়তে পড়তে দেশের কথা মনে পড়ে।

একদিন একটি বর্ষনমুখর দুপুরে সে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা পড়লো,
"যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অংগুরী ছোঁয়াবো
আমি বিষপান করে মরে যাবো।
বিষন্ন আলোয় এই বাংলাদেশ
নদীর শিয়রে ঝুঁকে পড়া মেঘ
প্রান্তরে দিগন্ত নির্নিমেষ
এ আমারই সাড়ে তিন হাত ভূমি
যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অংগুরী ছোঁয়াবো
আমি বিষপান করে মরে যাবো।"

সেদিন মিরি সারা দুপুর কেঁদেছিল। কেমন করে কবিরা মানুষের মনের গভীরতম দুঃখটিকে এমন সুন্দর করে বলতে পারেন? তিনিও কি এমনই একটি বিদেশী জানালার পাশে বসে কেঁদেছিলেন মিরির মতো? তিনিও কি ভেবেছিলেন প্রবাসের বাতায়নে যে আকাশের টুকরোটি ধরা দেয় সেই আকাশটি কোনভাবেই দেশের মতো নয়।

চুলোর উপরে চাপানো পাত্রে তেলের আঁচ কমে এসেছে। মিরি শামীকাবাব বানানোর প্রস্তুতি নেয়। আজকে সে রীতিমত রাজকীয় রান্নার আয়োজন করেছে। এতটা না করলেও পারতো। নাঈম খুব মারাত্মক ভোজনরসিক না, আর তার উপর সে ব্যাচেলর মানুষ। তার কাছে যে কোন রান্নাই খুব সমাদর পায়। আসলে মিরির নিজেরও কয়েকদিন থেকে একটু ভাল খাবার খেতে ইচ্ছে করছিল। শাহেদ এইসব ব্যাপারে খুব উদাসীন, মিরির কাছে কোন কিছু স্পেশাল রান্নার আবদার করেনি। মিরি বোঝে যে শাহেদের ভিতরে এক ধরনের অপরাধবোধ কাজ করে। মিরির একাকীত্বের জন্য সে নিজেকে দায়ী করে।

আজকে রান্নার ঝামেলায় আর বই পড়া হয়নি তার। এখন সে পড়ছে মির্চা এলিয়াদের "লা নুই বেঙ্গলী"র বাংলা অনুবাদ। এর কাউন্টারপার্ট মৈত্রেয়ী দেবীর "ন হন্যতে" তার আগেই পড়া আছে। একই প্রেম কাহিনীর দুই পক্ষের বর্ণনা। মিরির কাছে "ন হন্যতে" টাই বেশী ভাল লেগেছিল। একটি ছোট্ট সংস্কৃত শ্লোক আছে বইটির প্রথমে। মিরি নিঃশব্দে উচারন করে,
"অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরাণো
ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে"।

এর অর্থ মনে নেই মিরির। নিশ্চয়ই সুন্দর কিছু একটা হবে।

শিশুটির জেগে ওঠার সময় হয়ে এলো প্রায়। সে আজকাল মায়ের বড় ন্যাওটা হয়েছে। চোখের সামনে মিরিকে না দেখলে সে গাল ফুলিয়ে কেঁদে ওঠে। রান্না করতে করতে মিরি নিজের মনে হাসে। শিশুটির মুখের মধ্যে সিরাজুদ্দীন সাহেবের কিছুটা আদল আছে। তাকে মাঝে মাঝে বুকের মধ্যে নিয়ে মিরি মনে মনে বলে,"বাবা, তুমি আমাকে দূরে পাঠালেও আমি ঠিকই তোমাকে আমার কাছে নিয়ে এসেছি।"
শিশুটি বলাই বাহুল্য এই আদরের কারণ বোঝেনা। সে প্রতিবারের মতোই রাগে ফোঁস ফোঁস করে।

শিশুটি উঠে পড়ার আগেই যতটা সম্ভব রান্না শেষ করে ফেলতে হবে। মিরি দ্রুত হাতে পোলাওয়ের চাল ধোয়, বেরেস্তার জন্যে পেঁয়াজ কুচোয়। তাতে শেষ রক্ষা হয়না অবশ্য। একটু পরেই শোবার ঘর থেকে শিশুটির তীক্ষ্ন গলার আওয়াজ পাওয়া যায়।

------XXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXX-----

মিরি ভেবেছিল নাঈম সাতটার দিকে আসবে। কিন্তু সে আর শাহেদ একই সাথে এলো বিকেল পাঁচটার সময়ে। দোষ শাহেদেরই, সেইই নাঈমকে ধরে নিয়ে এসেছে।
"এটাকে সাথে করে না নিয়ে আসলে ও হয়তো ভুলেই যেত যে আজকে ওর আমাদের সাথে খাবার কথা। দেখা যেত যে ও হয়তো ভেন্ডিং মেশিনের ফ্রোজেন পিত্জা চিবোচ্ছে ঘরে বসে।"

নাঈমের সাথে শাহেদের পরিচয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়বার সময়ে। দুজনের বিষয় আলাদা। নাঈম পড়েছে ইকোনমিক্স আর শাহেদের সাবজেক্ট ফিজিক্স। সিয়াটলে আসবার পর দুজনের ঘনিষ্টতা বেড়েছে বেশী।
কিন্তু তার পরেও নাঈম খুব একটা আসেনা এ বাসায়। কারণ একটাই, নাঈম ব্যাচেলর। বৌ না থাকার কারণে ব্যাচেলরদের সাথে বিবাহিতদের পারিবারিক লেভেলে খুব বেশী ঘনিষ্টতা হয়না। দুজন পুরুষ যখন কথা বলে, তখন মহিলাটি একা একা বসে কি করবে? মিরি মাঝে মাঝে ওদের আলোচনায় যোগ দেয়, কিন্তু ওরা বেশীর ভাগ সময় কথা বলে রাজনীতি আর বাংলাদেশের দুরবস্থা নিয়ে।
মিরির ভাল লাগেনা এই নিয়ে কথা বলতে। মিরি তখন শোবার ঘরে চলে যায়। শিশুটির সাথে খেলা করে।

"তুই কি হাত মুখ ধুবি এখন? তাহলে সোজা বাথরুমে চলে যা। আমি তাহলে চায়ের পানি বসাই।"
শাহেদের এই প্রশ্নে নাঈম একটু ইতস্তত করে। "গোসল করতে পারলে ভাল হোত।"
শাহেদ শোবার ঘর থেকে লুঙ্গী-তোয়ালে নিয়ে আসে। "এই নে। এটা হছে গেস্ট লুঙ্গী, আমাদের সব গেস্টরাই এই লুঙ্গী ব্যবহার করে থাকে। বাথরুমে একটা হলুদ রঙ্গের টুথব্রাশ আছে, ওটা ব্যবহার করতে পারিস। ওটা গেস্ট টুথব্রাশ, সব গেস্টরাই ওই টুথব্রাশ ইউজ করে।"
নাঈম এই কথায় গলা ফাটিয়ে হাসে।"অনেকদিন পর ফজলুল হক হলের জোকটা শুনলাম রে।"
শাহেদ হাসেনা, সে সিরিয়াস গলায় বলে,"এটা কোন জোক না। এটা সত্যিই আমাদের গেস্ট লুঙ্গী।"
নাঈম হাসতে হাসতে বাথরুমে চলে গেল। মিরি শাহেদকে বলে,"তোমার এই কথার মানে কি? গেস্ট লুঙ্গী, গেস্ট টুথব্রাশ, এইসব কি কথা?"
শাহেদ হাসে। "এটা নিয়ে লম্বা একটা গল্প আছে, তোমাকে পরে বলবো। শুনলে হাসতে হাসতে তোমার পেট ফেটে যাবে।"

ডিনার শেষ করতে করতে রাত আটটা বাজলো। খাওয়া শেষ করে হাত ধুয়ে নাঈম সোফায় ধপ করে বসে পড়ে। "আজকের খাওয়াটা ভীষন জমকালো ধরনের হয়েছে। এখন এই পেটে সহ্য হলে হয়।"
মিরি তৃতীয় দফা চায়ের আয়োজন করছিল। "আপনার একটা বৌ দরকার নাঈম ভাই। একা একা তো অনেকদিন হোল।"
এই কথাটি নাঈমকে বোধহয় প্রায়ই শুনতে হয়। সে একটা মারফতী মার্কা হাসি হাসে। এই জাতীয় হাসির কোন মানে হয়না। প্রশ্নকারীরা তাদের ইচ্ছেমত অর্থ করে নেয়।

শাহেদের কোলে শিশুটি শান্ত হয়ে বসে আছে। এই দৃশ্যটি মিরির সব সময়ই বড় ভাল লাগে। এই সময়টিতে শিশুটি আশ্চর্য্য রকম চুপচাপ থাকে। মাঝে মাঝে শুধু ঘাড় ঘুরিয়ে বাবাকে দেখে সে।
"তোর সাথে একটা কথা ছিল শাহেদ।" নাঈম চোখ বন্ধ করে কথা বলে।
"কি কথা?"
"তুই কি একটা জিনিস খেয়াল করেছিস যে দেশে আজকাল ভাল বই-টই একদম বের হছেনা?"
শাহেদ হাসে। "আদার ব্যাপারীর কাছে জাহাজের গল্প করছিস কেন? বইয়ের কথা বলবি মিরিকে। আমি বইয়ের কি জানি?"
"আমি গল্প-উপন্যাসের কথা বলছি না গাধা। এগুলো তো চিরকালই থাকবে। আমি বলছি ভাল বইয়ের কথা।"
"কি রকম বইয়ের কথা বলছিস তুই?"
"এই যেমন ধর বিজ্ঞানের বই বা বায়োগ্রাফী। তোর মনে আছে আমাদের ছেলেবেলায় কত সুন্দর সুন্দর বাচ্চাদের বই বেরোত, পত্রিকা বেরোত। তাতে কত জানার বিষয় থাকতো। এখনকার বাচারা কি ওই ধরনের কোন বই পায়? বা বড়দের পড়বার মত ভাল বই এমন কিই বা বেরোচ্ছে?"
"তোর এই ব্যাপার নিয়ে এত মাথাব্যথার কারণটা কি?"
"আমাদের মত লোকদের উচিত বই লেখা।"
শাহেদ চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ। "তোর কথাটা আমি পুরো বুঝতে পারলাম না। তুই কি আমাকে বই লিখতে বলছিস?"
"হ্যাঁ, আমার মনে হয় যে আমরা যারা শিক্ষিত, আমাদের উচিত আমাদের জ্ঞানকে বই আকারে বার করা।"
"তুই কি আমার সাথে ঠাট্টা করছিস?"
নাঈম সোজা হয়ে বসে। "নাহ্‌, আমি মোটেও ঠাট্টা করছি না। আমি মনে করি, যে আমরা নতুন যদি কিছু শিখে থাকি, তাহলে সেটা নিয়ে আমাদের লেখা উচিত্। তাতে দেশের কিছু লোকে হলেও পড়তে পারবে।"
"আমি কি নিয়ে বই লিখবো?"
"তুই ফিজিক্স এর লোক। নতুন যা বার হয়েছে, তাদের কিছু একটা নিয়ে লেখ। যেমন সেদিন আমি খবরের কাগজে পড়ছিলাম যে এখন স্ট্রিং থিওরী নিয়ে নাকি তোরা খুব নাচানাচি করছিস। সেটা নিয়েই লেখ তাহলে। আমাদের মত লে-ম্যান দের জন্য সাদামাটা করে লেখ যেন পড়ে বুঝতে পারি।"
"হুঁ, আর তুই কি নিয়ে লিখবি তাহলে?"
"চার-পাঁচ বছর আগে জ্যাক মেন্ডেলসন বলে একজন নোবেল প্রাইজ পেয়েছিলেন অর্থনীতিতে। পুরস্কার নেবার সময় একটা বক্তৃতা দিয়েছিলেন তিনি তৃতীয় বিশ্বের উন্নতির উপর। অসম্ভব সুন্দর অনেক কথা বলেছিলেন তিনি। সেই বক্তৃতাটা বাংলায় অনুবাদ করবো ভাবছি। আমাদের দেশের দু একজন উপকৃত হলেও ভাল লাগবে।"
"হঠাত্ তোর মাথায় এই চিন্তা এলো কেন?"
"ক'দিন আগে আমি নিউটনের উপর একটা বই পড়ছিলাম। নিউটন একবার বলেছিলেন, "If I have seen further than most men, it is because I stood on the shoulders of giants"। মানুষের একটা বিশেষত্ব কি জানিস? সেটা হচ্ছে যে সে তার অর্জিত জ্ঞানকে পরের জেনারেশনকে দিয়ে যায়। নতুন জেনারেশন তার উপর ভিত্তি করে জ্ঞানকে আরো সামনে নিয়ে যায়। এভাবেই আজকে আমরা এখানে এসেছি। সেটা না হলে প্রত্যেক জেনারেশনকে আলাদা আলাদা করে আগুন আবিষ্কার করতে হোত।"
"দ্যাট্‌স ট্রু।"
"আজকাল বাংলায় এসব জ্ঞানের বই খুব কম লেখা হচ্ছে। যা কিছু আছে তা ইংরেজীতে। সেগুলো পড়ছে কারা? বড়লোকের বাচ্চারা, যারা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ে। সাধারণ ঘরের ছেলেমেয়েরা আস্তে আস্তে পিছিয়ে পড়ছে। তুই, আমি কিন্তু ওইরকম ঘর থেকেই এসেছি। আমাদের উচিত আমাদের পরের প্রজন্মের জন্য কিছু একটা করে যাওয়া। তুই তো বিয়ে করেছিস, বাচ্চা হয়েছে, এইসব কথা তুই আমার চেয়ে ভাল বুঝবি।"
"হুঁম।"
"মনে রাখিস আমাদের সন্তানদেরকে সব ব্যাপারে সবকিছু জানিয়ে যাওয়া আমাদের কর্তব্য।"

মিরি পাশের ঘরে শিশুটিকে ঘুম পাড়াছিল। আজকে শিশুটি অতিথীকে দেখে ঘুমাতে চাইছে না। মিরি আধশোয়া হয়ে তাকে বুকের কাছে টেনে নেয়।
শিশুটি সন্দেহের চোখে মায়ের দিকে তাকায়। সে মায়ের আদরের ভংগীটি পছন্দ করেনা। সে আপত্তি তোলে,"অ্যাঁও!"
মিরি হেসে ফেলে।
নাঈমের গলার স্বর শোনা যায় আবার,"তুই ব্যাপারটা ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে দ্যাখ। আমরা যদি কাজটা না করি তাহলে করবার মতো আর কেউ নেই। কে জানে হয়তো তোর লেখা পড়েই জন্ম নেবে ভবিষ্যতের সত্যেন বোস, জগদীশ চন্দ্র। আমাদের সমস্ত জ্ঞানের উপর আমাদের পরের প্রজন্মের দাবী আছে।
আবারো বলছি, আমাদের সন্তানদেরকে সব ব্যাপারে সবকিছু জানিয়ে যাওয়া আমাদের কর্তব্য।"
"সবকিছু?"
"হ্যাঁ-সবকিছু।"

রাত নিঝুম। গোটা সিয়াটল শহর ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু মিরির ঘুম আসেনি। সে বিছানায় এপাশ ওপাশ করেছে অনেকক্ষন। একসময় সে বিছানা থেকে উঠে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।
আকাশ এখন পরিষ্কার। কোন চাঁদের আলো নেই, হয়তো ডুবে গেছে আগে। বা হয়তো এখনো ওঠেনি। চাঁদের অবর্তমানে আকাশে এখন নক্ষত্রদের মেলা।

সিরাজুদ্দিন সাহেব মাঝে মাঝে তাদেরকে বারান্দায় ডেকে নিয়ে আকাশের তারা দেখাতেন। এই সময়টাতে তিনি একটু অন্যমনস্ক হয়ে যেতেন। চোখেমুখে এক ধরনের ঘোর নেমে আসতো। উত্তর আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি দেখাতেন ধ্রুবতারাটিকে।
"এই তারাটি হাজার বছর ধরে এই একই জায়গায় দেখা দেয় বলে এর নাম ধ্রুবতারা। আগেকার আমলের নাবিকদের দিক নির্নয়ের কাজে এর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।"

ছোট বোন বুড়ি এই সময়ে "খুব ঘুম পাচ্ছে" বলে কেটে পড়তো। তার কাছে তারা দেখার চাইতে অংক কষাও নাকি ভাল। মিরি বাবার কাছটিতে গুটিসুটি মেরে বসতো।
"ও বাবা, আমাকে সাত ঋষির তারাটা দেখাও না।"

সিরাজুদ্দিন সাহেব মৃদু হাসতেন। এই মেয়েটি স্বভাবে তার মতো হয়েছে।
"দেখাচ্ছি মা। ওই দ্যাখ, ধ্রুবতারার একটু উপরে তাকিয়ে দ্যাখ। ওখানে সাতটি তারা মিলে তৈরী করেছে এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন।
প্রকৃতি মানুষের কাছে সব সময়েই অমনি একটি প্রশ্নচিহ্ন। প্রাচীন ভারতীয়রা বলতো, সাতজন ঋষি মৃত্যুর পর আকাশে তারা হয়ে ফুটেছেন। এদের নাম কি জানিস? এরা হচ্ছেন মরীচি, অত্রি, অঙ্গিরা, পুলস্ত্য, পুলহ, ক্রতু আর বশিষ্ঠ। তারপর ওই দিকে দ্যাখ, ওই উজ্জ্বল নক্ষত্রমন্ডলীর নাম কি জানিস? একে বলে উত্তর ফাল্গুনী, আর তার বাম দিকে আছেন মৃগশিরা। আর একটু উপরে ডান দিকে তাকালে ওই একগুচ্ছ তারার নাম আর্দ্রা।"

তারাদের নামগুলো ভারী সুন্দর। রোহিণী, ভরিণি, কৃত্তিকা, অশ্বিনী, বিশাখা, চিত্রা, মঘা। মিরি মন্ত্রমুগ্ধের মত বসে কথা শুনতো। কত তারা আছে আকাশে?
সিরাজুদ্দিন সাহেবের আঙ্গুল আকাশের এমাথা থেকে ওমাথায় হেঁটে বেড়ায়। সবশেষে তিনি নির্দেশ করেন একটি লালচে রঙ্গের তারার দিকে।
"এই তারাটির নাম স্বাতী। আমার সবচেয়ে প্রিয় নক্ষত্র। কেন জানিস? একটা খুব সুন্দর গল্প আছে এই তারাটিকে নিয়ে। গল্পটি হোল, যখন বর্ষাকালে আকাশে স্বাতী নক্ষত্র ওঠে, তখন পানির নীচ থেকে উপরে উঠে আসে সহস্র ঝিনুক। ডালা খুলে তারা প্রতীক্ষা করে একটি জলবিন্দুর। এই সময়ে বৃষ্টির জলে মিশে থাকে স্বাতী নক্ষত্রের আলো। সেই বৃষ্টির ফোঁটা যদি কোন ঝিনুকের ভিতরে যায়, তবে তা থেকে তৈরী হয় একটি মুক্তো। স্বাতী নক্ষত্রের আলোর কারণে মুক্তোটি হয় নিখুঁত। আকাশের হাজার নক্ষত্রের ভিতরে এই একটি তারাই কেবল তার আলোকে দান করে পৃথিবীর মানুষের জন্যে।"

জানালা দিয়ে মিরি স্বাতীকে খুঁজলো আকাশে। সহস্র তারার ভিড়ে সিয়াটলের আকাশে স্বাতী নক্ষত্রকে খুঁজে পাওয়া যায়না। আজকের বৃষ্টি কি তবে নিস্ফলা? তাহলে হাজার ঝিনুকের প্রতীক্ষা ব্যর্থ হয়ে যাবে।

আস্তে আস্তে মিরি ফিরে এলো বিছানার পাশে। শাহেদ নাক ডেকে ঘুমাছে। বিছানার পাশে ছোট্ট ক্রিবের ভিতর শিশুটিও গভীর ঘুমে মগ্ন। ক্ষুদে হাতটি দিয়ে সে তার কান চেপে ধরে আছে।
মিরি অল্প হাসলো দৃশ্যটি দেখে। ক্রিবের পাশে দাড়িয়ে খুব সাবধানে সে শিশুটিকে কোলে তুলে নিলো। মায়ের শরীরের গন্ধ পেয়ে শিশুটি জেগে ওঠে। চোখ বড় বড় করে সে মাকে দেখে আর গাল ভরে হাসে।

মিরি শিশুটিকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে। তার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলে,"আমি তোমাকে আজ একটা দেশের গল্প বলবো। তুমি কি সে গল্পটি শুনতে চাও?"
শিশুটি এই রহস্যময় আলো আঁধারী পরিবেশে বেশ মজা পায়। সে আনন্দে চোখ মিট মিট করে।
মিরি কথা বলে চলে,"এখান থেকে বহুদুরের একটা দেশ। ভারী সুন্দর সেই দেশ, যে একবার সে দেশ দেখেছে সে আর কোনদিন ভুলতে পারেনা। সেই দেশের আকাশ, বাতাস, পানি, গাছপালা, সব কিছু সুন্দর। কিন্তু সবচেয়ে বেশী সুন্দর হছে সেই দেশের মানুষগুলো। তাদের গায়ে জামা নেই, পায়ে জুতো নেই, পেটে ভাত নেই, রোদের তাপে তাদের মুখের চামড়া কুঁচকে গেছে। তবুও তারা খুব সুন্দর। অনেক কষ্ট বুকে নিয়েও তারা হেসে ওঠে, ধনুকের মত শরীর বাঁকা করে গুন টানতে টানতে তারা গান গায়, আকাশে একটি চিলকে উড়তে দেখে তারা কবিতা লেখে। সেই দেশের একটা কবিতা শুনবে তুমি?"

মিরির চোখ অশ্রুজলে ভরে আসে। কান্নায় তার গলা আটকে যায়, তবুও মন্ত্রোচারনের মত সে আবৃত্তি করে,
"আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি
তাঁর করতলে পলিমাটির সৌরভ ছিল
তাঁর পিঠে রক্তজবার মত ক্ষত ছিল।"

মিরির চোখের অশ্রুকণা চিকচিক করতে থাকে মৃদু আলোতে। স্বাতী নক্ষত্রের আলো। শিশুটি অপার বিস্ময়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকে।

(রচনাটি উত্তর আমেরিকা থেকে প্রকাশিত একটি বাংলা পত্রিকায় আগে ছাপা হয়েছিল।)
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28783296 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28783296 2008-03-28 22:57:23
জনৈক জ্ঞানী মানুষের সাথে কথোপকথন এবং কিছু সিদ্ধান্ত।
"আপনার সাথে কথা আছে কিছু। একটু সময় দিতে হবে।" আমি মিনমিন করে বলি।
"তোমার সাথে কথা বলতে গেলেই তো আমার প্রেসার বেড়ে যায়। তোমার সাথে কোন রকম আলাপ করা ব্যাপারে ডাক্তারের বারণ আছে।"
"কেন, আমি আবার কি করলাম?"
"তুমি তো করোনা কিছুই। শুধু কিছুদিন পর পর একগাদা উদ্ভট আইডিয়া নিয়ে আমার কাছে আসো। সেগুলো শুনে আমার রক্তচাপ বেড়ে যায়।"
"আজকে সে রকম কিছু বলবোনা আমি। কথা দিচ্ছি।"
"তোমার কথা যদি আমি সব বিশ্বাস করতাম, তাহলে এখন আমাকে রেলস্টেশনে গিয়ে ভিক্ষা করতে হোত। যাকগে-কি বলবে, তাড়াতাড়ি বলো।"
আমি একটু ঢোঁক গিলি। উনার সামনে গেলেই ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে যায়। জ্ঞানী মানুষ বলে কথা।
"আমি ইদানিং একটু লেখালেখি করছি।"
"কি রকম?"
"এই মানে যা মনে আসে তাই লিখি।"
"গুড। মনের ভাবটিকে লিখে রাখতে অনেকেই বলেন। খুবই থেরাপিউটিক। মনের ভার লাঘব হয় তাতে। তবে বেশী কাগজ নষ্ট করবে না কিন্তু। কাগজের দুপাশেই লিখবে, আর ছোটছোট করে লিখবে যেন একটা কাগজেই অনেক লেখা যায়। ও হ্যাঁ- লেখার পর কাগজটাকে কুচিকুচি করে ছিঁড়ে তারপর আগুনে পুড়িয়ে ফেলবে। বলা তো যায়না এ লেখা আবার কখন কার হাতে পড়ে। শেষমেশ দেখা যাবে তোমার নামে হয়তো কেউ মানহানীর মামলা ঠুকে দিয়েছে। থেরাপী করতে গিয়ে নিজের বাড়ীঘর খোয়াবে শেষপর্যন্ত।" তিনি হা হা করে হাসেন।

আমিও হাসি। জ্ঞানী লোকদের চিন্তা-ভাবনাই আলাদা। হাজার বছর সময় দিলেও আমার মাথা থেকে মানহানীর সম্ভাবনাটির কথা বেরোত না। এই জন্যেই তো আমি বারবার উনার কাছে ছুটে আসি।

বুক ফুলিয়ে বলি, "সে ভয় নেই আমার। আমি কাগজ-কলমে লিখছি না আজকাল। একেবারে সোজা কম্পিউটরেই লিখি। আর ফাইলটিকেও পাস-ওয়ার্ড প্রটেক্টেড করে রেখেছি যেন আর কেউ পড়তে না পারে।"
"বাহ-তুমি তো দেখি আজকাল ভালই বুদ্ধিমান এর মতো কথা বলছো।"
"তবে লেখাগুলোকে আমি ইতিমধ্যে একটা বাংলা ব্লগসাইটে প্রকাশ করেছি।"
এবার তিনি একটু থমকালেন। "হুমম-প্রকাশও করে ফেলেছো অলরেডী। তা যাক-তোমার ওই ছাইপাঁশ লেখা কেইই বা আর পড়বে?"
"না মানে- কিছু লোকে লেখাগুলোকে পড়েছেও।"
"ও-লোকে তোমার লেখা পড়েও ফেলেছে। তা কেউ কি তোমাকে গালি বা মামলা করার হুমকি-টুমকি দিয়েছে নাকি?"
"না-তা দেয়নি, তবে তারা নিয়মিত লেখা না পোস্ট করলে খুব বকাঝকা করে, দু একজন আন্দোলন করারও হুমকি দিয়েছে।"
"বলো কি? এতো মহা সর্বনাশের কথা। তুমি কি পুলিশকে ফোন করে জানিয়েছো এসব? শেষে ওইসব হুলিগানেরা আবার তোমার বাড়ীর সামনে এসে হাজির না হয়।"
আমি এবার মিটিমিটি হাসি। "আমি কি আর আগের সেই মানুষ আছি? এখন আমার মাথায় অনেক বুদ্ধি। এসব চিন্তা আমি আগেই করে রেখেছি।"
"কি রকম?"
"আমি কি ওখানে নিজের নামে লিখি? আমি লিখি ছদ্মনামে।"
এবার তিনি মুগ্ধ হন। "বা-বা - তুমিতো দেখি বুদ্ধির জাহাজ হে। তা কি ছদ্মনাম নিলে?"
"নির্বাসিত।"
"বাহ-ভালই নাম নিয়েছো। তা এখন সমস্যাটা কি?"
"সমস্যা হচ্ছে যে কিছু কিছু পাঠক আমাকে খোঁচাচ্ছে যেন আমি ওই লেখাগুলোকে একসাথে করে একটা বই বের করে ফেলি।"
"কারা এরা বলোতো? থাকে কোথায়?"
"ওরাওতো আমারই মতোন। ছদ্মনামে লেখে।"
"তা তো লিখবেই। যে বুদ্ধি তোমার মতো গাধার মাথায় এসেছে, সেটা কি আর অন্য দশজনের মাথায় আসবে না?"

জ্ঞানী লোকের দেওয়া অপমান গায়ে মাখতে নেই। আমি চুপ করে থাকি।

তিনি আবার বলেন,"তা তোমার লেখা সিরিজটির নাম কি?"
"ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।"
"সেখানে কি তুমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে কিছু লিখেছ নাকি? সামথিং ঐতিহাসিক?"
"না-না, আমি শুধু আমার বন্ধু-বান্ধব, টিচার আর বাবা-মায়ের কথা লিখেছি সিরিজটিতে।"
"হুমম-কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন। কিসের মধ্যে কি, পান্তাভাতে ঘি। এ নাম তো চলবে না। লোকেতো এই নাম দেখেই ভাববে যে তুমি বইটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে লিখেছো।"
"তাহলে কি আপনিও বলছেন বই বের করতে?"
তিনি এবার বিরক্ত হন। "সেটা আমি কখন বললাম? আমি বলছি যে যদি তুমি বই বের করো, তাহলে সিরিজটির নাম বদলাতে হবে। দাঁড়াও-তোমাকে জম্পেশ নাম দেই। হাউ এ্যাবাউট 'নির্বাসিত মানুষের আপনজন'?"
নামটা শুনেই আমি মুগ্ধ হয়ে যাই। বাহ-কি চমৎকার নাম! এককথায় সবকিছুই বলা হয়ে যাচ্ছে।
"তুমি আজকেই ব্লগ সাইটে গিয়ে সিরিজের নাম বদলে ফেলবে, বুঝেছো?"
আমি ঘাড় নাড়ি। "আচ্ছা।"
"বইয়ের নামটা তো গেল। এখন সমস্যা তোমার নাম নিয়ে। তুমি কি বইটা নিজের নামেই ছাপবে? নাকি ছদ্মনামে?"
"সেটা তো ঠিক করিনি।"
"আচ্ছা- সেটা নাহয় পরে দেখা যাবে। এখন বলো, যারা তোমাকে বই বের করতে বলছে তারা কি তোমার বই কিনবে? নাকি গাছে তুলে মই কাড়বে?"
"বলছে তো কিনবে।"
"তারা মোট কত জন হবে?"
"তা তো ঠিক গুনিনি। তবে আট-দশ জন তো হবেই।"

জ্ঞানী মানুষটি আমার দিকে বড় বড় চোখ মেলে তাকিয়ে থাকলেন। একেই কি অধিক শোকে পাথর হয়ে যাওয়া বলে?

"তুমি কি বললে? আট-দশ জনের কথায় তুমি নাচছো? আর সেই কথা তুমি আমাকে বলতে এসেছো? ভাগ্যিস, আমি কোন প্রকাশক না। প্রকাশক হলে তোমাকে এক্ষুণি ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাড়ী থেকে বার করে দিতাম।"
আমি আর কি জবাব দেবো? চুপ করে থাকি।

জ্ঞানী মানুষটি এবার ক্লান্তভাবে সোফায় গা এলিয়ে দেন। হাতের ইশারায় আমাকে চলে যেতে বলেন। বুঝি তার ব্লাডপ্রেসার বেড়েছে আবার। বরাবরের মতো এবারও দায়ী আমি। যত নষ্টের গোড়া।

এইই হচ্ছে ঘটনা।

যাই হোক- কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

(ক) সিরিজটির নাম বদলে "নির্বাসিত মানুষের আপনজন" রেখেছি। শিরোনাম বদলের কাজ চলছে।

(খ) নিজের নামটি এই মুহুর্তে প্রকাশ করছি না। বই যদি কোনদিন বেরোয়, তখন সিদ্ধান্ত নেবো।

(গ) নতুন একটি সিরিজ লেখার পরিকল্পনা করছি। সিরিজটির নাম "কামেহামেহা, মানোয়া পাহাড় এবং আলোহা" রাখবো ঠিক করেছি। বুদ্ধিমানেরা হয়তো এর থেকেই বুঝে নেবেন আমি কি নিয়ে লিখবো এখানে। আপাততঃ সূচীপত্র তৈরীর কাজ চলছে।

(ঘ) হঠাৎ করে একটা পার্ট-টাইম মাস্টারীর চাকরি শুরু করবো এপ্রিলের প্রথম থেকে। সে জন্য লেখা পোস্ট করতে হয়তো দেরী হবে মাঝেমাঝে। (আন্দোলনের হুমকি দিয়ে লাভ নেই।) আশা করছি বিদেশীদের পড়াতে পড়াতে নতুন কিছু লেখার জিনিস পেয়ে যাবো ফাঁকতালে।

(ঙ) বই প্রকাশের ব্যাপারটা নিয়ে অল্পস্বল্প ভাবছি। যদি জানতে পারতাম কতজন তাদের (বা তাদের বাবা-মায়ের) কষ্টার্জিত পয়সা দিয়ে এ বই কিনতে আগ্রহী তাহলে হয়তো একটা ধারণা পাওয়া যেতো।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28781151 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28781151 2008-03-21 11:36:30
এদের আশু বিচার হওয়া প্রয়োজন।
সর্বদাবেলায়েত লিখিত একটি পোস্ট চোখে পড়লো। তিনি লিখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে। লেখাটি পড়ে মনে পড়লো নিজের ছাত্রজীবনের কথা, মনে পড়লো বন্ধুদের কথা, মনে পড়লো শিক্ষকদের কথা। আনমনা হয়ে গিয়েছিলাম সেদিনের কথা ভাবতে ভাবতে। সামনে রাখা সাদা কাগজে আঁকিবুকি কাটতে কাটতে মনে হোল, আচ্ছা আমিও দু কলম লিখে ফেলি না কেন? পরের মুহুর্তে আবার নিজেই হেসে ফেলেছিলাম। কেন লিখবো? কি লাভ? কে পড়বে? কেন পড়বে? আমি একজন আম-পাবলিক, আমার জীবনের কথা বা আমার আশপাশের মানুষের কথা শোনার সময় কোথায় অন্যলোকের?

পরক্ষণেই আর একটা চিন্তা মাথায় এলো। অনেক কিছুই আজকাল ভুলে যাচ্ছি। লিখে রাখলে জিনিসটা থাকলো। আমিই না হয় একসময় পড়বো, যখন মাথার মধ্যে আর কোন কিছুই থাকবে না। বেভুল মানুষের মতই নিজের লেখা পড়ে হয়তো ভাববো, আহা কে এই মানুষটি?

সেই নিয়তেই কি-বোর্ডের সামনে বসেছিলাম। ভেবেছিলাম টুকিটাকি কিছু স্মৃতিকে ধরে রাখি অল্প কিছু কথায়। কিন্তু লিখতে বসে দেখলাম অল্প কথায় সবার কাহিনী বলা যাচ্ছেনা। অগত্যা, কাহিনীর কলেবর বেড়ে গেল (যাকগে-আমাকে তো আর কাগজ-কালি কিনতে হচ্ছেনা)। কিন্তু ঝামেলা বাঁধলো অন্য জায়গায়।

খেয়াল করলাম যে কিছু কিছু ব্লগার আমার লেখালেখিকে তাদের নিয়মিত পড়ার তালিকায় রেখেছেন, এবং তারা আমাকে আরো উৎসাহ দিচ্ছেন আরো লেখার জন্য, এবং আরো দ্রুত লেখার জন্য। আমি এসেছিলাম মৃদুমন্দ পায়চারী করার গতিতে, তারা চাইলেন আমি যেন একই সাথে দ্রুত গতির স্প্রিন্টার এবং দীর্ঘ সময়ের ম্যারাথন রানার হই। এ আমি কিসের মধ্যে পড়লাম?

আপনারা যদি জানতে চান কারা আমাকে নিয়মিত চাপের মধ্যে রেখেছিল, তবে বলি এরা হচ্ছেন মেহরাব শাহরিয়ার, ফারহান দাউদ, মুকুল, রাশেদ, বিবর্তনবাদী, অ্যামাটার, নরাধম, মোস্তফা মনির সৌরভ, ভাইটামিন বদি, মেন্টাল, লাল দরজা, রাগ ইমন, অলৌকিক হাসান, খোলাচিঠি, আলী, সাধারণ, বিহংগ, ৃৃমম, রাতুল, পজিটিভ, শফিউল আলম ইমন, মিরাজ, ফাহমিদুল হক, হাসিব, আবদুর রাজ্জাক শিপন, অমিত, আদনান, কালবেলা, না বলা কথা, নাদান, জ্বিনের বাদশা এবং আরো অনেকে।

এনারা প্রথমে দিলেন উৎসাহ, পরে মৃদু অনুরোধ, তারপর দাবী, এবং এমনকি দু একজন আন্দোলন করবারও হুমকি দিয়েছিলেন। লেখা চাই, আরো লেখা চাই, আরো দ্রুত লেখা চাই।

আমি ঘুমের মধ্যে দুঃস্বপ্ন দেখা শুরু করলাম। বেশী বেশী টাইপ করার দরুন হাতের আঙ্গুলে ব্যথা করা শুরু করলো। যাই হোক- একদিন শেষ হোল সব কিছু। শেষ পর্বটি লিখে ফেললাম।

তারপর গোটা সিরিজটির দিকে তাকিয়ে তো আমার চোখ চড়কগাছ। কুড়ি পর্ব লিখে ফেলেছি আমি! কখন করলাম এত কিছু? আমি যে আলসে মানুষ, বাথরুমে টয়লেট পেপারের রোল বদলাতেই সাতদিন লাগে আমার। আমি কিভাবে এতগুলো পর্ব লিখে ফেললাম? এটা নিশ্চয়ই কোন ষড়যন্ত্র, কেউ আমাকে দিয়ে কাজটি করিয়ে নিয়েছে।

কারা সেই দুর্বৃত্ত? কারা আমার অজ্ঞানতার সুযোগ নিয়ে আমাকে দিয়ে লিখিয়েছে এই সব? এদের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেওয়া দরকার। আসামীদের তালিকা উপরে রয়েছে। এদের নামে অভিযোগ গুরুতর। অভিযোগের প্রাথমিক খসড়া তালিকা নিচে দেওয়া হোল।

(ক) এরা "নির্বাসিত" নামের একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষকে এবং তার লেখাকে ভালবেসেছে।
(খ) সেই ভালবাসার দাবীতে তারা ছলে-বলে-কৌশলে নির্বাসিতকে এইসব ছাইপাঁশ লিখতে বাধ্য করেছে।
(গ) এদের দাবী মানতে গিয়ে নির্বাসিতের বহুপুরানো 'অলস' এবং 'গুড ফর নাথিং' সুনামগুলি আজ বিলুপ্তির মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।
(ঘ) এদের দাবীর জন্যে নির্বাসিতকে কাজকাম বাদ দিয়ে বসে বসে পুরনো দিনের ঘটনা চিন্তা করতে হয়েছে।
(ঙ) লেখা পোস্ট করতে দেরী হলে এরা বিভিন্ন ভাবে চেঁচামেচি করেছে।
(চ) সিরিজটি শেষ হবার পরে তারা বই আকারে সিরিজটি প্রকাশ করার জন্য নতুন বায়না ধরেছে।
(ছ) সিরিজটি শেষ হবার পরে তারা নতুন সিরিজ লেখার জন্য আবদার জুড়েছে।

এদের আশু বিচার হওয়া প্রয়োজন।

এদের মত এত ভালবাসাময় মানুষ সমাজের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28780704 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28780704 2008-03-20 03:16:54