somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... ঘরে ফেরার ডায়েরী। পর্ব-১। সময়ঃ যাওয়ার চার দিন আগে।
স্থানঃ আমেরিকার একটি শহর।

দিন ঘনিয়ে আসছে দ্রুত পায়ে। অথচ একগাদা কাজ জমে আছে। জানি হয়তো শেষমেশ সবগুলোই সারা হবে, কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত তা হচ্ছে ততক্ষণ অবধি তারা গলার কাঁটা হয়ে সর্বক্ষণ তাগাদা দিচ্ছে। আর তাদের চাবুকের ভয়ে আমি দৌড়ে বেড়াই এদিক-ওদিক।

এবারের দেশে ফেরাটি একটু অন্যরকম। এর আগে যতবারই গিয়েছি, সেগুলো ছিল বেড়াতে যাওয়া। ওখানে গিয়ে কোন কাজ করা নেই, শুধু মাস খানেকের অবসর, এখানে সেখানে ঘোরাঘুরি আর শুধু খাওয়া-দাওয়া।

প্রতিবারেই আমেরিকাতে যখন ফিরে আসার সময় হয়, তখন চোখ বড় বড় করে খেয়াল করি যে কোমরে প্যান্টের বোতাম লাগছেনা। সারা শরীরে জমেছে আলস্যের ভার আর কাজের প্রতি প্রবল অনীহা। শুধু গল্প করতে ইচ্ছে করে, শুধু বই হাতে বিছানায় গড়াগড়ি করতে ইচ্ছে করে। বুঝি আমেরিকাতে ফিরে গিয়ে কষ্ট হবে আবার ঝাঁকের কইয়ের সাথে মিশে যেতে।

এবারে ব্যাপারটি ভিন্ন। এবারে কাজে যাচ্ছি, একা যাচ্ছি আর খুব অল্পদিনের জন্যে যাচ্ছি। মেরেকেটে সাত-আট দিন হয়তো থাকা হবে দেশে। আজকাল সন্ধ্যেবেলা বাড়ীর কাছের কলেজে পড়াই বলে তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে হবে। সেখানকার খাতা দেখতে হবে, গ্রেড দিতে হবে। তা না হলে হয়তো আরও দিন কয়েক বেশী থাকা যেতো।

দেশে এবারে একটি কনফারেনস হচ্ছে সামনের মাসে। কিভাবে যেন সেখানে একটি পেপার পড়বার আমন্ত্রন এলো। জানতাম ঝামেলা হবে, কিন্তু তারপরেও রাজি হয়ে গেলাম। এখন মনে হচ্ছে সে সময়ে না করে দেওয়াটাই উচিত ছিল, অল্প ক’টা দিনের জন্যে এত লম্বা ভ্রমন পোষায়না। কিন্তু এখন আর সে কথা লাভ কি? মরদ কা বাত, হাতী কি দাঁত। বলেছি যখন, তখন তো যেতেই হবে।

কনফারেনসের সাথে আরও একটা ব্যাপার আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার বিভাগটির এবারে পঞ্চাশপর্ষ পূর্তি উৎসব হচ্ছে একই সময়টিতে। সেখানেও একদিন যেতে হবে। পুরনো বন্ধুগুলোর সাথে দেখা হবে হয়তো,যদিও বেশীর ভাগেরাই এখন দেশের বাইরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তারা হয়তো আসতে পারবে না।

বুকের মধ্যে দুপদুপ করতে থাকে। পরিবারের সবাইকে এখানে রেখে আমি চলে যাচ্ছি, সেটা ভাল লাগছে না। একা একা ছুটি কাটানোর মতো যেন। ওতে কি আরাম হয়? দুশ্চিন্তায় মাথার পিছনটাতে কেমন যেন করতে থাকে। ওরা সবাই এ কয়দিন ভাল থাকবে তো? কোন ঝামেলা হবে নাতো? সপ্তাহের ট্র্যাশ মনে করে ফেলবে তো?

ভাবখানা এমন যেন আমি না থাকলে এদের দুনিয়া অন্ধকার হয়ে যাবে। আমরা সবাই বোধহয় নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হিসেবে ভাবতে ভালবাসি। আসলে কারো জন্যে কি কোন কিছু আটকে থাকে? এই পৃথিবী শূন্যস্থান পছন্দ করেনা, কিভাবে যেন সবকিছুই আবার আগের মতোই চলতে থাকে।

আজকাল কাজের ব্যস্ততা এতো বেড়েছে যে আর কোন কিছুই করা হয়না। ব্লগে লেখা তো দূরের কথা, আর দশ জনের লেখাটি পড়বার সময় পর্যন্ত পাইনে। হাওয়াই এর উপর লেখাটি মাঝপথে এসে ঝুলে রয়েছে। মাথার ভিতরে না লেখা কাহিনীগুলো মুখ গোমড়া করে বসে থাকে, আমাকে দেখে অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নেয়। শরীরে আমার হাজার ক্লান্তির ধূলো, কাজের ফিরিস্তির তালিকাটি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার ডুবে যাই কাজে। ব্লগে লিখে আর কিই বা হবে?

তারপরেও আজকে কিবোর্ডের সামনে বসলাম। এ যাবত তো আমি কেবলই দেশ ছাড়ার গল্প বলেছি। দেখি তো এবারে দেশে ফেরার গল্পটি বলা যায় কিনা। সাথে করে ল্যাপটপটি যদি নিয়ে যাই, তাহলে হয়তো পথের যাত্রা বিরতিতেও দু চার কলম লিখে সাথেসাথেই পোস্ট করে দেওয়া যাবে। আর তা না হলে কালি-কলম তো রয়েছেই।

এত কাজের মধ্যে তারপরেও ভাল লাগছে। দেশে ফেরাটাই বোধহয় এরকম। মার সাথে দেখা হবে। ছোট বোনটির মেয়েটি নাকি খুব পাকাপাকা কথা বলা শিখেছে, তাকে কোলে বসিয়ে আদর করা হবে। ছোট ভাইটি এখন মস্ত সরকারী আমলা হয়েছে, তার পাশে দাঁড়িয়ে গর্বে আমার বুক ফুলে উঠবে। মস্ত আমলা বলে নয়, একজন সৎ মানুষের সাথে দেখা হওয়ার আনন্দে।

জানি মা মৃদুস্বরে বলবেন,‘আর দুটো দিন বেশী কি থাকা যেতোনা? কতদিন পর তোকে আবার দেখলাম।’ ব্যর্থ মানুষের মতো আমি মাথা নীচু করে থাকবো। তখন মা হয়তো বলবেন,‘জানি তুই ব্যস্ত মানুষ, সবসময় দৌড়ের উপর থাকিস। শরীরের দিকে খেয়াল রাখিস কিন্তু।’

চোখের জল লুকোতে আমি হয়তো তাড়াতাড়ি অন্য ঘরে চলে যাবো।

আজ এটুকুই থাক। যে পেপারটি পড়তে হবে, তার অনেকগুলো স্লাইড তৈরী করা এখনো বাকী। হাতে সময় মোটে আর অল্প ক’টা দিন।

(চলবে)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28872772 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28872772 2008-11-22 22:43:49
কামেহামেহা, মানোয়া পাহাড় এবং আলোহা। পর্ব-৪(ঙ)। (আগের অংশটুকুর জন্যে এখান থেকে পড়ে আসতে হবে)

গুরুর অন্বেষণ এবং ভগবানের রক্তচক্ষু

পরের কয়েকটা দিন কাটলো অসহ্য দুশ্চিন্তায়। কি করবো এখন। এমন সময় একদিন হঠাৎ করে দেখা হয়ে গেল জিমের সাথে।

জিমের পুরোনাম জিম বার্কাস। সেও আমারই মতো একজন ছাত্র। আমার চেয়ে এক বছর আগে এসেছে এখানে। তার সাথে আমি একটি ক্লাশ নিয়েছিলাম একবার। খুব একটা দোস্তি তাই হয়নি তার সাথে।

ক্যাফেটেরিয়ার এক কোণে বসে জিম কি যেন লিখছিল। সেদিন পুরো ক্যাফেটেরিয়াই ভরতি, একটাও খালি চেয়ার নেই। শুধু জিমের সামনেরটি ছাড়া। বাধ্য হয়ে তাই সেখানেই বসেছিলাম সেদিন।

জিম লিখতে লিখতে মুখ তুলে তাকায় আমার দিকে। "তোমাকে আমি চিনি, রাইট?"
"হ্যাঁ- বায়োকেম সিক্স নাইনটিন কোর্সটি একসাথে নিয়েছিলাম আমরা।"
"ও হ্যাঁ। তা কেমন আছো তুমি, ভাল?"
"খুব একটা না। খুব দুশ্চিন্তায় আছি।"
"ঘটনা কি?"

সংক্ষেপে তাকে বললাম সবকিছু। জিম একটি প্রশ্নও না করে চুপচাপ শুনলো আমার কথা। তারপর সে আমাকে জিজ্ঞেস করলো,"তুমি কি কফি খাবে? তাহলে তোমার জন্যেও নিয়ে আসি এককাপ।"

আর কফি? আর কয়দিন পরেই আমার নামাজে জানাযা হবে। কথা না বলে মাথা দোলাই শুধু।

জিম কফি নিয়ে আয়েস করে বসলো। তারপর খুব শান্ত ভাবে সে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করা শুরু করলো।
"-- বাচ্চা ভগবান আর তার আশপাশের --বাচ্চা প্রফেসরগুলোর এইবার দফা রফা করা দরকার। এরা সব শুরু করেছে কি? যা ইচ্ছে তাই করবে?"

আমি হতভম্ব হয়ে বসে থাকি। জিম যে আমার এত হিতৈষী, তা তো আগে জানতাম না।

আরো মিনিট খানেক পর সে থামে। তারপর সে বললো তার কাহিনী। সেও আমারই মতো বিভাগের বাইরের একজনের সাথে কাজ করতে চায় এবং তাকেও ভগবান ওই একই রকম ভয় দেখিয়েছে। পরে শুনলাম যে আরো একটি মেয়ে আমাদেরই মতোন অন্য ল্যাবে কাজ করতে চায় কিন্তু ভগবানের হুমকির দাপটে সে সাহস পাচ্ছেনা।

জিম বললো,"তুমি কোন চিন্তা করোনা। আমি উইসকনসিনের ছেলে, আমি এর শেষ দেখে ছাড়বো।"

আমি ভয়ে ভয়ে বলি,"কি করতে চাও তুমি? ওকে মারবে-টারবে নাতো?"
জিম একটু অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকায়। "মারবো কেন? আমি ওর বিরুদ্ধে ডীনের কাছে নালিশ করবো। তখন ভগবান বুঝবে কত ধানে কত চাল।"
"আচ্ছা- এরকম করা যায় নাকি?"
"অবশ্যই। দেশে কি আইন-কানুন কিছু নেই নাকি?"

পরের কাহিনী সংক্ষিপ্ত। যথাসময়ে জিম এক বিশাল পাঁচপৃষ্ঠার দরখাস্ত মুসাবিদা করে ফেললো। তাতে ভগবান এবং আমাদের বিভাগের আরো কয়েকজন প্রফেসরের বিরুদ্ধে নানান রকম অভিযোগ এর বর্ণনা দেওয়া আছে। তা পড়ে তো আমার আক্কেল গুড়ুম। এই জিনিসে আমাকে সই করতে হবে? সর্বনাশ!

জিম হাসে। "কাউকেই সই করতে হবে না।"
"তার মানে?"
"অলরেডী ভগবানের কানে এই খবর চলে গেছে যে তার বিরুদ্ধে একটি দরখাস্ত ডীনের অফিসে যাচ্ছে। এই খবরেই সে ভয় পেয়ে যাবে, এবং আমার ধারণা সে এই বিষয়টাকে আর বাড়তে দেবে না। জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড সী!"

কার্যতঃ তাইই হোল। দু' দিন বাদে বিভাগের সেক্রেটারী আমাকে ফোন করে জানালো যে অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল আমাকে বিভাগের বাইরের ল্যাবে আমার পি এইচ ডির গবেষণা করার অনুমতি দিয়েছে। আমার যাবতীয় সমস্যার সমাধান হইলো।

মজার ব্যাপারটি হোল এই যে এ ঘটনার মাস খানেক পর জিমের সাথে দেখা হলে সে বললো যে সে মেডিক্যাল স্কুলে পড়ার চান্স পেয়েছে এবং সে হনলুলু ছেড়ে কেন্টাকি চলে যাচ্ছে। যদিও ব্যাপারটি সে কিছুটা আগে থেকে জানতো, তারপরেও সে এখানে নালিশ করার কাজটি করে গেছে।

এখন বুঝি যে সে না থাকলে আমার ওখানে পিএইচডি করাটাই দুঃসাধ্য হয়ে পড়তো। বরাবরের মতই এবারেও আমার বন্ধুরা আমাকে বাঁচিয়ে দিয়ে গেল।

ডঃ ভগবানের সাথে এরপরে আর খুব একটা দেখা সাক্ষাত হয়নি। ততদিনে আমার কোর্স-ওয়ার্ক শেষ বলে আর ডিপার্টমেন্টে যাইনা খুব একটা। শুধু মাঝেমাঝে দু এক বার দেখা হয়েছে ভগবানজীর সাথে। একটু হাত তুলে চলে গেছি যে যার মতো।

মনে মনে বলেছি,"এখন কেমন বুঝতাছেন ভাইজান? বাঙ্গালী পোলার সাথে বিটলামী? হু ইজ স্মাইলিং নাউ?"

শেষ ঘটনাটি ঘটলো আরো বছর কয়েক পর। তখন আমার পি এইচ ডি প্রায় শেষের দিকে। দেশে বেড়াতে গেছি। একবার গেলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার বিভাগে। এর ওর সাথে কথা বলছি, এমন সময় আমাদের একজন সিনিয়র প্রফেসর আমায় বললেন আমি যেন অবশ্যই তার অফিসে এসে একবার কথা বলে যাই। কি যেন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার আছে একটা।

গেলাম তার ঘরে। উনি কি যেন একটা লিখছিলেন। চোখের ইংগিতে আমায় বসতে বললেন। বুকটা দুরুদুরু করে উঠলো। নিশ্চয়ই সিরিয়াস কিছু একটা হবে।
লেখা শেষ করে উনি আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন, "তারপর তোমার গবেষণা কেমন চলছে ওখানে?"
"ভালই স্যার। প্রায় শেষ করে এনেছি কাজ। দু এক মাসের মধ্যেই থিসিস লেখা শুরু করবো।"
"ভাল-ভাল।"
"দোয়া করবেন স্যার।"
"নিশ্চয়ই-নিশ্চয়ই। যাকগে- যা বলার জন্যে তোমাকে ডেকেছি। মাস ছয়েক আগে আমি একটা ইন্টারন্যশনাল কনফারেনস এ্যাটেন্ড করতে গিয়েছিলাম টোকিওতে। সেখানে একজন লোক হঠাৎ করে যেচে এসে আমার সাথে কথা বললেন। বললেন উনি নাকি হনলুলুতে তোমার বিভাগের চেয়্যারম্যান। নামটা এই মুহুর্তে মনে পড়ছে না। হিন্দু কোন গড এর নাম। বিষ্ণু না কৃষ্ণ কি যেন একটা।"

আমার বুক ঠান্ডা হয়ে আসে। মনেমনে প্রমাদ গুনতে থাকি। মুখে বললাম, "ডঃ ভগবান।"
"হ্যাঁ-হ্যাঁ, ভগবান। উনি আমাকে তোমার সম্পর্কে অনেক কথা বললেন। বললেন উনি এই ব্যাপারে কথা বলার জন্যেই আমাকে খুঁজে বের করেছেন।"

সাত সমুদ্দুর তের নদী পাড়ি দিয়ে ভগবানের কালো হাত যে ঢাকা অবধি এসে পৌঁছেছে, তা জানা ছিলনা। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলি। অভাগা যেদিকে চায়, সাগর শুকায়ে যায়।

সিনিয়র প্রফেসরটি এবারে বললেন,"উনি তোমার খুব প্রশংসা করলেন। বললেন যে তুমি নাকি কোর্স-ওয়ার্কে খুব ভাল করেছো, আর এখন নাকি খুব এক্সাইটিং একটা রিসার্চ প্রজেক্টে কাজ করছো। উনি বললেন তোমার মতো সুবোধ ছাত্র নাকি রীতিমতো দুস্প্রাপ্য। উনি আরো বললেন যে আমাদের এখান থেকে আরো ভাল ভালো ছাত্র ওখানে পাঠাতে। বললেন যে আমাদের এই বিভাগ থেকে যেকোন ছাত্র অ্যাপ্লাই করলেই উনি তাকে অ্যাডমিশন দিয়ে দেবেন। তোমাদের কৃতিত্বের কথা শুনতে খুব ভাল লেগেছিল আমার। একবার ভেবেছিলাম তোমাকে একটা চিঠি লিখবো, পরে দেখলাম তোমাকে সামনা-সামনি বলাটাই ভালো হবে। আমরা সবাই তোমার জন্যে গর্বিত। তোমার সুনাম মানে আমাদেরও সুনাম। দোয়া করি তুমি আরো ভাল করো।"

গাধার মতোন হতভম্ব হয়ে উনার ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। বুঝলাম গ্র্যান্ডমাস্টার দাবাড়ুর মতো শেষ চালে কিস্তি মাত করলেন জনাব ভগবান। তার উপর রাগ করা উচিত নাকি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত, সেটা ভাল করে বুঝতে পারছিলাম না।

এতদিন পরেও ব্যাপারটা আমার কাছে পরিষ্কার হোলনা। ভগবানের বুদ্ধিদীপ্ত চালের রহস্য কিআর আমার মতো গাধারা বুঝতে পারে?

(এরপর নতুন পর্ব)

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28853164 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28853164 2008-10-10 22:26:11
কামেহামেহা, মানোয়া পাহাড় এবং আলোহা। পর্ব-৪(ঘ)। (আগের অংশটুকুর জন্যে এখান থেকে পড়ে আসতে হবে)

গুরুর অন্বেষণ এবং ভগবানের রক্তচক্ষু


কেটে যায় আরো কিছু দিন। তারপর একদিন এসে গেল যন্ত্রটি। বলা ভালো যন্ত্রসমষ্টি। শুধু কি মাইক্রো ইঞ্জেকটর? তার সাথে আছে খুব দামী মাইক্রোস্কোপ, আছে সিসিডি ক্যামেরা, আছে ইমেজ অ্যানালিসিস এর জন্য বিশালাকায় এক কম্পিউটর।

একটি আলাদা ঘরে বসানো হোল সবকিছু। পুরো জিনিসটি সেট-আপ করতে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে এক মোটকা ইঞ্জিনয়ার এলেন। এক সপ্তাহ ধরে আমাদেরকে ট্রেনিং দেওয়া হোল। কি করিলে কি হয় সব কিছু জানতে হবে না?

সেই ট্রেনিং এ গুরুজী গেলেন না। পাঠালেন আমাকে। মুখে বললেন,"ইউ আর দ্য ম্যান! আমার আর যাবার দরকার কি?"

বুঝলাম পরে যদি কোন সমস্যা হয় তাহলে তার কাছে সাহায্যের বা উপদেশের জন্য গিয়ে কোন লাভ হবে না। আরো বুঝলাম ব্যাটাচ্ছেলে বুদ্ধিমান লোক। আমার ঘাড়ে বন্দুক তো সে আগেই রেখেছে, এখন হাবেভাবে বুঝিয়ে দিল যে শিকারটিও আমাকেই করতে হবে।

আবার নতুন সেমেস্টার এসে পড়ে। আবার ভগবানের দ্বারস্থ হই। এবারে বোধহয় ভগবান সাহেব বুঝতে পারেন যে আমি খুব সম্ভবতঃ এই ল্যাবেই আমার মূল গবেষণার কাজটি করবো। তিনি এবার খুব একটা প্রশ্ন করলেন না আমাকে, শুধু একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,"আমি কিন্তু তোমাকে ওয়ার্নিং দিয়েছি অনেক বার, কিন্তু মনে হচ্ছে তুমি আমার কথাকে সিরিয়াসলি নিচ্ছো না। আমি আবারও বলছি, তোমাকে কিন্তু অ্যাকাডেমিক কাউনসিল পারমিশন দেবেনা। তখন তোমার পি এইচ ডি পাওয়া নিয়েই সমস্যা হবে।"

আমি একগুঁয়ে ছেলের মতো ঘাড় শক্ত করে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকি।

ভগবান আবার বলেন,"তুমি অন্য কোন প্রফেসরের সাথে কাজ করছো না কেন?"
আমি মাথা নীচু করে বলি, "ওই ল্যাবের কাজটি আমার কাছে খুব এক্সাইটিং লাগছে।"
"হুমম! পরে আমাকে আবার দোষ দিও না যেন।"

এর মধ্যে এক বছর পার হয়ে যায়। আবার সামার চলে আসে। সেই সামারে আমি দেশে গেলাম। কিভাবে কেটে গেল তিনটে মাস তা টেরও পেলাম না। সেই সামারেই কি করে যেন আমার কুমারজীবন চিরকালের তরে বিদায় নিল। আমার গলায় দড়ি পড়িল। আমি স্বামী হইলাম। বিয়ে হোল নদীর নামের একটি মেয়ের সাথে।

বিয়ের পর আমরা একসাথেই ফিরলাম হনলুলুতে। পরদিনে থেকে ল্যাবের দিনমজুরী। স্ত্রীর মুখ গম্ভীর হয়। তার আর দোষ কি? একজন অজানা মানুষের হাত ধরে সে সাত সমুদ্দুর পাড়ি দিয়ে উড়ে এসেছে এক অজানা দেশে। তারপরেও কিনা সে অজানা মানুষটি আবার গবেষণার নামে প্রতিদিন সকালে কাকডাকা ভোরে উধাও হয়।

তখন মনে হয়েছিল যে আমাদের প্রতিটি অবিবাহিত ছেলেমেয়েকে (বিশেষতঃ ছেলেদেরকে) বিবাহ-উত্তর জীবন কেমন হবে তার একটা শর্ট ট্রেনিং নেওয়া উচিত। তাতে প্রতিপদে বিস্মিত হতে হয় না। কত রকম নতুন জিনিস, কত রকম নিয়ম কানুন। বলা যায় এখনো শিখছি।

যাকগে-সেকথা। মূল গল্পে ফিরে আসি।

সপ্তাহখানেক পরে গুরুজী ডাকলেন তার ঘরে। "শোনো- তুমি যেহেতু আমার এখানেই কাজ করবে বলে মনস্থির করেছো, তাহলে ব্যাপারটা অফিসিয়াল করে ফেলা দরকার।"

একথায় বুকের মধ্যে গুরগুর করে উঠলো। মনে পড়লো ভগবানের চেহারা মুবারক। বুঝলাম-এইবার আমার খবর আছে।

প্রথমে গেলাম ডিপার্টমেন্টের সেক্রেটারীর কাছে। পি এইচ ডি র অ্যাডভাইসার ঠিক করার নিয়ম কানুন আগে জানা দরকার। সে আমাকে একটা লম্বা ফর্ম ধরিয়ে দিল।
"এ আবার কি জিনিস হে?"
"এটা আমাদের নিয়ম। প্রথমে তোমাকে সব প্রফেসরের সাথে কথা বলতে হবে। শুনতে হবে তাদের সবার রিসার্চের কথা, তাদের ওখানে কাজ করলে কি ধরনের রিসার্চ-প্রজেক্টে তুমি কাজ করতে পারবে সেগুলো শুনতে হবে। তারপর তুমি ঠিক করবে যে তুমি কার সাথে কাজ করবে।"
"কিন্তু আমি তো ইতিমধ্যে ঠিক করে ফেলেছি যে আমি কার সাথে কাজ করবো। তাহলে আর এদের সাথে কথা লাভ কি?"
"জাস্ট ফরম্যালিটি। এই ফর্মে সব প্রফেসরের দস্তখত নিয়ে আসবে তাদের সাথে কথা বলার পর।"

এই জাতীয় উদ্ভট নিয়মে আমি হাসবো না কাঁদবো তা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এতো দেখি এনগেজমেন্ট হয়ে যাওয়ার পর বিয়ের কনে দেখার কাজ শুরু করা। কিন্তু কি আর করা?

প্রফেসরদের সাথে কথা বলতে গিয়ে আর এক ঝামেলা হোল। প্রায় সবাইই চায় যে আমি যেন তাদের ল্যাবে কাজ করি। সবাই রীতিমত জমকালো সব রিসার্চ প্রজেক্ট হাজির করতে লাগলো আমার সামনে। আমি ঘাবড়ে যাই। এর রহস্য কি? এ কথা সত্যি যে আমি কয়েকটা কোর্সে ভাল গ্রেড পেয়েছে। কিন্তু তার মানে তো এই না যে আমি রিসার্চেও ভাল করবো। তবে কি তাহলে তাঁরা আমার মধ্যে বিরাট কোন বিজ্ঞানীর ছায়া দেখতে পেরেছেন?

গর্বে আমি বৌয়ের সামনে বুক ফুলিয়ে হাঁটাহাঁটি করি।

ক'দিন পরে বন্ধুবর সুজাত আলীর শরণাপন্ন হ'লাম। সে বুঝিয়ে দিল,"কারণটা খুবই সোজা। তুমি এদেশে এসেছো ফুল স্কলারশিপ নিয়ে, তাই তোমাকে তাদের কোন রকম পয়সাপাতি দিতে হবে না। ফ্রি ওয়ার্কার। তাইই সবার এতো উৎসাহ।"

গর্বের বেলুনে পড়ে বাস্তবতার আলপিন এর নির্দয় খোঁচা। চুপসে যাই সুজাতের কথায়। এতক্ষণে টের পাই আসল ঘটনা।

যাকগে-একদিন শেষ হোল দস্তখত নেবার পালা। এবারে আবার হাজির হই ভগবানের দরবারে।

সেদিন আকাশে মেঘের ঘনঘটা। সাগর ফুলে উঠছে। বাতাসে ঝড়ের আগাম বারতা। (আসলে এসবের কিছুই ছিলনা সেদিন, শুধুশুধু একটা গম্ভীর ভাব তৈরী করার জন্যে এসব লিখলাম)।

তবে ভগবানের মুখ সেদিন আসলেই গম্ভীর ছিল। আমি দুরুদুরু বুকে তার দিকে এগিয়ে দিলাম কাগজটি।
"কি এটা?" তার গলায় আমি সর্বনাশের ইঙ্গিত পাই।
"এটাতে সব প্রফেসরের সই নিয়েছি আমি। এখন আমি আমার অ্যাডভাইসর ঠিক করতে চাই।"
"তুমি তাহলে বার্ট্রামের সাথেই কাজ করবে? ফাইনাল ডিসিশান?"
"হ্যাঁ। সিদ্ধান্ত পাক্কা।"

ভগবান কাগজটি নিলেন আমার কাছ থেকে। "এই কাগজটি আমি যখন অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলে পেশ করবো, তখন তুমি কি জানো যে তারা এটাকে কি হিসেবে নেবে? যে তাদেরকে তুমি বলছো যে এই বিভাগের এত নামকরা শিক্ষকদের মধ্যে তোমার অ্যাডভাইসার হ'বার মত যোগ্য কেউ নেই।"
"সে কি? এমন কথা আমি কোথায় বললাম? আমার যেখানে কাজ করতে ভাল লাগছে, আমি সেখানেই কেবল কাজ করতে চাইছি। আমি একবারও বলিনি যে এনারা অযোগ্য।"
"তাদের কাছে মেসেজটা কিন্তু দাঁড়াচ্ছে অন্যরকম। ওনারা কিন্তু তাইই বুঝবেন, এবং তারা তোমাকে কখনোই পারমিশন দেবেন না। আমি তোমাকে গ্যারান্টি দিচ্ছি, যে তোমার রিকোয়েস্ট তারা শুনবেন না।"
"কিন্তু তুমি হচ্ছো বিভাগের চেয়ারম্যান। তুমি যদি ভাল করে বুঝিয়ে বলো তাহলে ওনারা নিশ্চয়ই তোমার কথা শুনবেন।"

ভগবান এবারে কেমন যেন বাঁকা করে হাসেন। "আচ্ছা-তাই নাকি? আমি চেয়ারম্যান বলে তাঁরা আমার কথা শুনবেন?"
"হ্যাঁ-নিশ্চয়ই শুনবেন। চেয়ারম্যানের কথা সবারই শোনা উচিৎ।"
গলার স্বরে একটি নতুন ধরণের কাঠিন্য এনে ভগবান চিবিয়ে চিবিয়ে বলেন,"তাহলে তুমি আমার এতবারের বারণ শুনলে না কেন? আমি তোমাকে প্রতিটি বার সতর্ক করেছি, প্রতিটি বার বলেছি যে এ জিনিস করে তুমি পার পাবেনা। অথচ তুমি দিব্যি আমার নিষেধ অগ্রাহ্য করে ওই ল্যাবেই কাজ করতে গিয়েছো। তোমার কি কোন ধারণা আছে যে আমি যখন কাউনসিলকে বলবো যে তুমি আমার বারণ শোননি, তখন তারা কি পরিমাণে রেগে যাবে?"

আমার পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। ভগবান কি বলছেন এসব?

"তাহলে আমি কি করবো এখন?"
"এই প্রশ্ন তুমি আমাকে এখন করছো কেন? যখন আমি তোমাকে বারবার বারণ করেছি, কই তখন তো তুমি আমার কাছে উপদেশ চাওনি। তুমি ভেবেছিলে যে তুমি মহা চালাক, আর আমরা সবাই ঘাসে মুখ দিয়ে চলি। তোমার চালাকি আমরা কেউ ধরতে পারবো না।"
"তাহলে কি হবে আমার? আমাকে তাহলে এখন অন্য কারোর ল্যাবে কাজ করতে হবে?"
ভগবান এবারে হাসেন। তবে সেটা বাঁকা হাসি।
"তোমাকে আমি ওয়ার্স্ট কেইস সিনারিও দেই। এমনও হতে পারে যে তোমাকে কেউই তাদের ল্যাবে নিতে চাইলো না। কেননা তুমি সবার চোখে একজন শিক্ষক অবমাননাকারী ছাড়া আর কিছুই না। এমন একজনকে ল্যাবে নিতে কেউ আগ্রহী নাও হতে পারে।"

আমার মাথা টলে ওঠে। কি হবে তাহলে এখন? আমি যদি এখানে পড়তে না পারি, তাহলে আমার স্কলারশিপের বারোটা বাজবে। আমাকে তাহলে ডিগ্রি না নিয়েই ফিরে যেতে হবে দেশে। সেখানে গিয়ে কি বলবো? টীচারদের সাথে বেয়াদবী করেছি বলে আমাকে তারা ফিরিয়ে দিয়েছে? সবার কাছে মুখ দেখাবো কি করে?

শুধু দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে ভিতর থেকে।

ডঃ ভগবান বলেন,"প্লিজ- এইসব ন্যাকামী করোনা। এখানে ওইসব অভিনয়ের কোন দাম নেই।"

ডর্মে ফিরে স্ত্রীকে বললাম,"আমাদের এখানকার পাট বোধহয় চুকলো। বাক্স-প্যাঁটরা গুছানোর আঞ্জাম করো।"

সে আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো শুধু।

(বাকী অংশ পরের পর্বে)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28852893 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28852893 2008-10-10 02:07:08
কামেহামেহা, মানোয়া পাহাড় এবং আলোহা। পর্ব-৪(গ)। (আগের অংশটুকুর জন্যে এখান থেকে পড়ে আসতে হবে)

গুরুর অন্বেষণ এবং ভগবানের রক্তচক্ষু

আগেই বলেছি যে জনাব ভগবান সাউথ ইন্ডিয়ার লোক। তার সাথে আমার বার দুয়েকের মতো মোলাকাত হয়েছে মাত্র। এমনিতে দেখে-টেখে তো ভালই বলে মনে হয়েছিল আমার কাছে। এখন পারমিশনের জন্য গেলে কি মূর্তি ধারণ করবে তা খোদা মালুম।

ভগবান মনে হয় আমাদের ডিপার্টমেন্টের আজীবন চেয়ারম্যান। সে দু একটা কোর্স পড়ায় বটে কিন্তু সেগুলো হচ্ছে ডাক্তারী যারা পড়ে তাদের জন্যে। বান্দা একখানি টেক্সটবুক লিখেছেন, এবং শুনেছি যে সেটি বেশ চালু। ফলে পয়সা-পাতির দিক দিয়ে সে ভালই করছে বলে মনে হয়। তার নিজের কোন রিসার্চ প্রোগ্রাম নেই বলে তার কোন ল্যাবও নেই, আর তার আন্ডারে কোন গ্রাজুয়েট স্টুডেন্টও নেই। সে আছে তার চেয়ারম্যানী করা নিয়ে।

বোধহয় এ কারণেই তাকেই বারবার চেয়ারম্যান বানানো হয়। সেও মনে হয় আপত্তি করেনা। ফ্রি ফ্রি মাতব্বরী করার সুযোগ পেলে কেইই বা আর ছাড়তে চায়?

দিন দুয়েক পর গেলাম তার সাথে দেখা করতে। হাজার হোক একই উপমহাদেশের লোক। পাড়াতুতো মুরুব্বী। তিনি আমাকে দেখে একগাল হাসেন।
"কি খবর তোমার? ক্লাশ নিয়ে ব্যস্ত মনে হয়। তোমাকে খুব একটা দেখিনা আজকাল।"
"এইই চলছে কোনরকম। পরীক্ষা-টরীক্ষা তো আছেই, তার উপর আরো কত রকম অ্যাসাইনমেন্ট আছে পাকে পাকে। নাকানি-চুবানি অবস্থা।
"এসব তো থাকবেই। তবে ভাল খবর হচ্ছে যে সেমেস্টার তো প্রায় শেষের দিকে। আর অল্প ক'টা দিন মাত্র, তারপরেই তো সামার চলে আসছে। তখন তুমি একটু বিশ্রাম পাবে। তা তোমার সামারের প্ল্যান কি? দেশে বেড়াতে যাবে নাকি এখানেই থাকবে?"

যাক- আমাকে আর সামারের কথাটা তুলতে হোলনা। সেইই নিজে থেকে তুলে ফেললো। আমিও ঝোপ বুঝে কোপ মারলাম।

"সামারের কথা আলাপ করতেই এলাম তোমার সাথে।"
ডঃ ভগবান সে কথায় নড়েচড়ে বসেন। "কি কথা? বলতো শুনি।"
"ভাবছি সামারে কারো সাথে রিসার্চ করবো।"
"বাহ- সেতো খুব ভাল কথা। আমাদের বিভাগের বেশ কয়েকজন প্রফেসর ভাল ভাল কাজ করছেন। তুমি চাইলে আমায় তাদেরকে অনুরোধ করে দেখতে পারি যেন তুমি তাদের ল্যাবে কাজ করার সুযোগ পাও। আমি বললে তারা না করতে পারবেন না আশাকরি। তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ যে আমি চাই তুমি একটা ভাল ল্যাবে কাজ করো।"

আমি এবার বোমাটাকে ড্রপ করলাম। "আমি চিন্তা করেছি যে এবারের সামারটা আমি ডঃ বার্ট্রামের সাথে কাজ করবো।"
সেকথায় জনাব ভগবানের মুখ আঁধার হয়ে আসে। "বার্ট্রাম? কোন বার্ট্রাম? আমাদের বিভাগে তো এই নামে কোন প্রফেসর নেই।"
"উনি ক্যান্সার সেন্টারে কাজ করেন।"
"ওহ- দ্য নিউ কামার ফেলাহ্‌। কিন্তু সে তো আমাদের ডিপার্টমেন্টের ফ্যাকাল্টি না। তুমি তার সাথে কাজ করবে কি ভাবে?"
"আমি শুনেছি যে উনি আমাদের বিভাগের অ্যাসোসিয়েট ফ্যাকাল্টি। আর ছাত্ররা তাদের সাথে কাজ করতে পারে অনুমতি নিয়ে। চেয়ারম্যানের অনুমতি নিয়ে।"

এতক্ষণে ভগবান সাহেব বুঝতে পারেন আমার অকস্মাৎ আগমনের উদ্দেশ্যটিকে।

"তুমি কি তাহলে আমার পারমিশন চাইতে এসেছো?"
আমি সম্মতিতে ঘাড় নাড়ি।
"তুমি কি ইতিমধ্যে বার্ট্রামের সাথে কথা বলেছো? তুমি কি জানো যে তুমি কি ধরণের কাজ করবে সেখানে?"
আমি আবারও ঘাড় নাড়ি। ডঃ ভগবান এবারে একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলেন।
"শোন তাহলে। তোমাকে আগে থেকে গোটা জিনিসটি খুলে বলি। তাহলে আর কোন কনফিউশন থাকবে না।"
আমি চোখ-কান খাড়া করে তার কথা শোনার প্রস্তুতি নেই।
‘আমাদের বিভাগের নিয়ম হচ্ছে যে কোন ছাত্র ইচ্ছা করলে সে অ্যাসোসিয়েট ফ্যাকালটির সাথে সাময়িক বেসিসে কাজ বা রিসার্চ করতে পারে। তবে তাকে এর জন্যে বিভাগের চেয়ারম্যানের অনুমতি নিতে হবে। এই নিয়মটি করা হয়েছিল যেন ছাত্ররা অন্যের ল্যাবে কাজ করে কিছু পয়সা আর্ন করতে পারে। তবে যেহেতু তুমি স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে এসেছ তোমার বেলায় কিন্তু এ নিয়ম কাজ করবে না। তবে যেহেতু তুমি আমার দেশের দিকের লোক, আর তুমি অনেক আশা করে আমার কাছে এসেছ, তাই তোমাকে আমি ওখানে কাজ করার পারমিশন দেবো এবারে। তবে এর সাথে আরও কিছু কথা আছে।"

আবার কি কথা? এ তো বেশ ঝামেলার জিনিস বলে মনে হচ্ছে!

"তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছো যে আমরা চাইনা যে আমাদের ছাত্ররা বাইরের কারো সাথে তাদের পি এইচ ডির রিসার্চটি করুক। তুমি যদি বার্ট্রামের ল্যাবে এক সেমেস্টার গবেষণা করতে চাও, সেটা খুব বেশী সমস্যার ব্যাপার না। কিন্তু ভয়ের জিনিস হচ্ছে যে তুমি যদি কিছুদিন পর সিদ্ধান্ত নাও যে ওই ল্যাবেই তুমি তোমার পি এইচ ডির থিসিসের কাজটি করবে, তাহলে।"
"কেন তাতেই বা সমস্যা কি?"
"সমস্যা হচ্ছে এই যে তখন ব্যাপারটি আর আমার হাতে থাকবে না, তখন বিভাগের অ্যাকাডেমিক কাউনসিলের পারমিশন লাগবে তোমার। এই প্রসংগে বলে রাখা ভাল যে এই সব ব্যাপারে অ্যাকাডেমিক কাউনসিল পারমিশন দেয়ই না বললে চলে। বরঞ্চ তারা আমাকে প্রশ্ন করতে পারে যে আমি তোমাকে ইনিশিয়ালি কেন ওখানে কাজ করতে অ্যালাউ করলাম। আমি যা বললাম তার সারমর্ম হচ্ছে এই যে তুমি ওখানে অল্প সময়ের জন্য কাজ করতে পারো, কিন্তু তোমার আসল গবেষণাটি বিভাগের কারো সাথে করতে হবে।"

ভগবানকে ধন্যবাদ জানিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসি। যাক-পারমিশন পাওয়া গেল তাহলে। ক'দিন কাজ করে দেখি কেমন লাগে। কোথায় কার সাথে পি এইচ ডির গবেষণা করবো তা পরে ভাবা যাবে।

পরদিন থেকেই লেগে গেলাম কাজে। প্রথম কয়দিন গেল সেখানকার লোকজন আর বিভিন্ন কেমিক্যালকে চিনতে। তার পর কয়েক সপ্তাহ গেল প্রাণীকোষ আবাদ করার পদ্ধতি শিখতে। আগে বুঝিনি যে এই কাজটি এত কঠিন। যতই সাবধানতা নেই না কেন, দুদিন পরেই দেখা যায় যে আমার আবাদ করা কোষগুলো ব্যকটেরিয়ার আক্রমনে খাবি খাচ্ছে। আবার ফির শুরুসে। ব্যাক টু স্কোয়্যার ওয়ান।

আমাদের ল্যাবে তখন নতুন একজন ল্যাব টেকনিশিয়ান এসেছে। সে ব্যাটা চাইনিজ। বয়সী লোক। বৌ, ছেলেকে চায়নাতে রেখে একাই এসেছে। পরে সময় সুযোগ পেলে তাদেরকে আনবে। তাকে একদিন তার নাম শুধোলাম। সে বললো, তার নাম হচ্ছে মিস্টার আউ। কারো নাম যে মিস্টার হতে পারে, তা জানা ছিলনা। পরে জানলাম যে তার পুরো নাম হচ্ছে পিং আউ। একে নিয়ে পরে আরো অনেক কিছু লেখা যাবে।

মাঝে মাঝেই শুনি যে মাইক্রো ইঞ্জেকটর যন্ত্রটি অলমোস্ট এসে গেলো বলে। এবং তার দাম নাকি এক লাখ ডলারের উপরে। একটু ঘাবড়ে যাই দাম শুনে। এত দামী জিনিস দিয়ে কাজ করবো। শেষে আমার পাল্লায় পড়ে যন্ত্রটির আবার বারোটা না বাজে। তেমন কিছু হলে আমার খবর আছে। থাকি আবার দ্বীপের মধ্যে। কোনদিকে যে পালিয়ে যাবো তারও কোন উপায় নেই। সাগরে ঝাঁপ দিলেও খুব একটা লাভ হবে না। কেননা আমি সাঁতার জানিনা।

এইভাবেই কোথা দিয়ে যে চলে গেল সামারটি। রিসার্চের তেমন কোন অগ্রগতি হয়নি। শুধু লাভের মধ্যে এইই হয়েছে যে আমি এখন নিখুঁত ভাবে প্রাণীকোষের আবাদ করতে পারি।

গুরুজী একদিন জিজ্ঞেস করলেন,"কিহে-আরও এক সেমেস্টার কাজ করবে নাকি?"
ততদিনে ওই ল্যাবের প্রেমে পড়ে গেছি। কাজ করবো মানে, আমি এখানেই আছি।

পরের সেমেস্টারের প্রথমে আবার যেতে হোল ভগবানের কাছে। পারমিশন চাই আবারো। মহানুভব এবারে ভুরু কোঁচকালেন আমাকে দেখে।
"তুমি ওখানে আবার কাজ করতে চাও? আমি তো ভেবেছিলাম শুধু এই একটা সামারেই ওখানে কাজ করবে।"
মিউ মিউ করে বলি,"না মানে- আসল কাজটিই করতে পারিনি এখনো। একটা খুব দামী যন্ত্র কেনা হচ্ছে ওখানে। সেটা এসে পৌছুলেই রিসার্চটি শুরু হবে। এতদিন কাজ করলাম, এখন তো মাঝপথে সরে আসার কোন মানে হয় না।"

গম্ভীরভাবে ফর্মটিতে দস্তখত করতে করতে ভগবান আমাকে বাণী দিলেন,"মনে রেখো-তুমি যদি ওই ল্যাবে তোমার পি এইচ ডির গবেষণা করতে চাও, তাহলে বিরাট সমস্যা হবে। এ জিনিসের পারমিশন এত সহজে পাবেনা তুমি। মাঝখান থেকে ওখানে কাটানো তোমার সময়টুকুই জলে যাবে।"

কিন্তু কে শোনে কার কথা?

(বাকী অংশ পরের পর্বে।)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28849500 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28849500 2008-09-30 00:37:54
কামেহামেহা, মানোয়া পাহাড় এবং আলোহা। পর্ব-৪(খ)। (আগের অংশটুকুর জন্যে এখান থেকে পড়ে আসতে হবে)

গুরুর অন্বেষণ এবং ভগবানের রক্তচক্ষু

সেদিনটির কথা আজো মনে আছে আমার।

দিনটি ছিল রোদেলা, সকাল দশটার যুবক সূর্য্যের আলোতে ঝলমল করছিল চারিদিক। সেটা এমন নতুন কিছু নয়, কেননা হনলুলুতে বছরের বেশীর ভাগ দিনই এইরকম। বাস ড্রাইভারকে আগেই বলে রেখেছিলাম। সে আমাকে একটি রাস্তার মোড়ে নামিয়ে দিয়ে হাত উঁচিয়ে দেখিয়ে দিল কোথায় আমাকে যেতে হবে।

রাস্তা পার হয়ে আমি ওপারে যাই। বিলডিংটির সামনে ছোটখাটো একটি সাইনবোর্ড লাগানো। ক্যান্সার রিসার্চ সেন্টার অফ হাওয়াই। পাঁচ-ছয় তলা হবে উচ্চতায়। দেখতেও খুব বেশী বড় না।

ভিতরে ঢুকে দেখা মেলে এক রিসেপশনিস্ট এর। সেই বললো, আমাকে তিন তলায় চলে যেতে। ডঃ বার্ট্রামের অফিসটি সেখানেই।

আগে থেকে ফোনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করা ছিল। বোধহয় সে কারণেই তিনি অফিসে ছিলেন। অফিসটি খুব বেশী বড় না, প্রায় পুরোটাই বই-পত্র দিয়ে ভরতি। খান দুয়েক চেয়ার আর একটা টেবিল ছাড়া আর সবখানেই কাগজপত্র দিয়ে ছড়ানো।

আমি সবচেয়ে অবাক হলাম তাঁকে দেখে। আমি ভেবেছিলাম যে তার বয়েস অনেক হবে। কিন্তু দেখে মনে হোল পয়তাল্লিশের বেশী না। ভদ্রলোক ব্রিটিশ, কিন্তু তার কথায় খুব বেশী ব্রিটিশ অ্যাকসেন্ট নেই। পরে জেনেছি যে হনলুলুতে মুভ করার আগে উনি অনেক বছর নিউ ইয়র্কে ছিলেন। বোধহয় সেখানেই আস্তে আস্তে ব্রিটিশ অ্যাকসেন্টের সমাধি হয়েছে।

আমাদের মধ্যে বেশ খোলামেলা আলোচনা হোল। উনি কাজ করেন অ্যান্টি-ক্যান্সার জিনিসপত্র নিয়ে। বর্তমানে তার ফোকাস, ভিটামিন এ।

কথা শেষের পরে উনি আমাকে তার ল্যাব দেখাতে নিয়ে গেলেন। ল্যাবটি দেখেই আমি সেটির প্রেমে পড়ে গেলাম। বেশ বড়সড় ঘরটি, সেখানে অনেকগুলো সারিসারি বেঞ্চে কাজ করছে কয়েকজনে। পুরো ল্যাবটাই একদম ঝকঝকে নতুন। দেয়ালের রং হাল্কা কমলা। যন্ত্রপাতিগুলোও চকচক করছে যেন।

সমস্যা একটাই, গোটা ল্যাবে কোন জানালা নেই। তাতে অবশ্য আমার কিছু যায় আসেনা। বরং ভালই আমার জন্যে। জানালা থাকলে হয়তোবা গালে হাত দিয়ে বাইরের জগতকে দেখেই সময় কাটিয়ে দেবো। গবেষণার গ ও হবেনা।

মূল ল্যাবের পাশে আরো একটি ঘরে ঢুকলাম আমরা। পুরো ঘরটিতে হালকা বেগুনী রং এর আলো জ্বলছে। কেমন একটা স্বপ্ন স্বপ্ন ভাব। আলো-আঁধারীর এই ঘরটিতে ঢুকেই আমার চোখে কেমন যেন ঘোর লাগে। ভরপেট খেয়ে এই ঘরটিতে ঢুকলে দু মিনিটের মধ্যেই যে কারোর চোখে ঘুম নামতে বাধ্য।

ডঃ বার্ট্রাম খুট করে দেয়ালের একটা সুইচ টেপেন। মুহুর্তের মধ্যে নিভে যায় মৃদু বেগুনী আলোটি। উজ্জ্বল আলোয় ভেসে যায় ঘরটি। আমার স্বপ্নটিও দুম করে উধাও হয়।

"এই ঘরটিতে আমরা প্রাণীকোষের আবাদ করি। এইযে এ পাশের সারিসারি আলমারীর মতো জিনিসগুলো দেখছো, এদের নাম ইনকিউবেটর। এদের ভিতরে বাড়ছে প্রাণীকোষেরা। এখানে তাপমাত্রা, কার্বন-ডাই-অক্সাইড আর জলীয়বাস্পের মাত্রা নিয়ন্ত্রিত যাতে করে কোষেরা ভালভাবে বাড়তে পারে।"

আমার দারুণ লাগে। বাহ-কি সুন্দর ব্যবস্থা!

"আর আমরা যে নীল আলোটি দেখেছিলাম প্রথমে, সেটি ছিল আলট্রা-ভায়োলেট রশ্মি। এই রশ্মি বাতাসে ভেসে থাকা ব্যাক্টেরিয়াদেরকে মেরে ফেলার জন্য যাতে করে ওরা আমাদের আবাদ করা প্রাণীকোষদের কোন ক্ষতি না করতে পারে। যাই হোক-তুমি কি কোষদেরকে দেখতে চাও?"

উত্তেজনায় আমার ভিতরটা কেঁপে ওঠে। মাথা নাড়ি সাথে সাথে। "নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই।"

ঘরের দরজার কাছেই একটি ছোট্ট সিংক। ডঃ বার্ট্রাম সেখানে গিয়ে ভাল করে হাত ধোয়া শুরু করেন, তারপর আমার দিকে লিকুইড সাবানের বোতলটি ঠেলে দিলেন।

‘ভাল করে হাত ধোও এই সাবানটি দিয়ে। অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল সোপ এটি। আমাদের হাতের চামড়াতে নানান রকমের জার্ম থাকে। সেগুলোকে ঠেকানোর ক্ষমতা আমাদের থাকলেও ওই কোষেদের নেই। তাইই যতদূর সম্ভব জার্ম-ফ্রি হয়ে তারপর ওই আলমারী খুলি আমরা।’

হাত ধোয়ার পালা শেষ হলে ড্রয়ার খুলে একজোড়া আনকোরা প্লাস্টিকের গ্লাভস বের করে দিলেন তিনি। "এগুলো পরো। সাবানে যদি সব ব্যাকটেরিয়া না মরে, তার জন্যে এই ব্যবস্থা।"

গ্লাভসজোড়া হাতে একটু বড় হোল। যাদের অভিজ্ঞতা আছে তারা জানেন যে ঢিলেঢালা গ্লাভস হাতে পরতে কি রকম অস্বস্থি লাগে। কিন্তু কি আর করা? যাকগে আমিতো আর কোন কিছুতে হাত দিচ্ছিনা।

এরপর আর একটা ড্রয়ার থেকে বেরোলো মুখে লাগানোর মাস্ক। মেয়েদের প্রসাধনের মাস্ক নয়, এই মাস্ক হচ্ছে গিয়ে মুখে লাগানোর মুখোশ। এ কি ঝামেলায় পড়লাম রে বাবা!

ডঃ বার্ট্রাম আবার ব্যাখ্যা করেন। " প্রাণীকোষদের নিয়ে কাজ করার এই এক ঝামেলা। সব সময় খুব কেয়ারফুল থাকতে হয়। কখন কোথা থেকে ব্যাকটেরিয়া ঢূকে পড়ে এই ভয়ে আমরা সব রকমের সাবধানতা অবলম্বন করি। তুমি জানোই যে আমাদের নিঃশ্বাস থেকেও ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস বেরিয়ে আসতে পারে।"

আমার তখন একটু বিরক্ত লাগছে এত বায়নাক্কা সামলাতে হবে। আগে জানলে এর মধ্যেই ঢুকতাম না। হাত ধোয়া,তারপর হাত ঢাকা, তারপর মুখ ঢাকা। এরপর কি? এই চোখ দিয়ে যেহেতু কোষদের দেখবো, তবে কি এখন চোখজোড়াও ঢাকতে হবে নাকি?

আমার মনের কথা যেন ডঃ বার্ট্রাম পড়তে পারলেন। তৃতীয় ড্রয়্যার খুলে এবারে তিনি বের করলেন একজোড়া ল্যাব গগলস। "এগুলো লাগাও চোখে।"
"এটা আবার কেন?" এবারে আমি একটু আপত্তি জানাই।
"জেনারেল ল্যাব প্র্যাকটিস। যেকোন সায়েন্স ল্যাবে কাজ করতে হলে এটা চোখে পরতেই হবে। তাওতো ভাগ্য ভাল যে তোমাকে এ্যাপ্রন পরতে বলিনি। কিন্তু যদি তুমি এখানে কাজ করবে বলে সিদ্ধান্ত নাও, তাহলে তোমার জন্যে একটা এ্যাপ্রনের অর্ডার দেবো। বায়োলজিক্যাল ল্যাবে কাজ করতে গেলে এইসব বায়নাক্কাতে অভ্যস্ত হয়ে যেতে হয়। তা না হলে দেখা যাবে তোমার আবাদ করা প্রাণীকোষেদেরকে ব্যাকটেরিয়া ধরাশায়ী করে ফেলেছে।"

হোয়াট এভার, আমি মনে মনে বলি।

ডঃ বার্ট্রাম এবারে একটি আলমারীর দরজা খোলেন। ভিতরে অনেকগুলো তাক। প্রত্যেকটি তাকে রয়েছে অনেকগুলো গোলগোল চ্যাপটা স্বচ্ছ পাত্র। অনেকটা দেখতে বৈয়ামের ঢাকনির মতো। তাদের ভিতরে লালচে রঙ্গ এর একটি দ্রবন।

আমি একটু নিরাশ হলাম। আমিতো ভেবেছিলাম মাংসপিন্ডের মতো কিছু একটা দেখতে পাবো।

"এগুলোকে বলে পেট্রিডিশ। কেন বলে জানো?"
আমি মাথা নাড়ি। আমি কিভাবে জানবো হে? তোমার জিনিশ তুমিই ব্যাখ্যা করো।
"এই জাতীয় ডিশ যিনি বার করেছিলেন তার নাম ছিল পেট্রি। সেই জন্যেই এর নাম পেট্রি ডিশ।"

খুব সাবধানে একটি ডিশ তিনি তাক থেকে তুলে আনেন। আমি তার কাঁধের উপর দিয়ে উকিঝুকি মারি। যদি কিছু একটা দেখা যায়। কিন্তু ডিশের ভিতরে লালচে রং এ দ্রবন ছাড়া আর কিছুই নজরে আসেনা।

ডিশ হাতে এবারে তিনি ঘরের অন্য কোনার দিকে এগোন। সেখানে বেশ একটি বড়সড় মাইক্রোস্কোপ দেখতে পেলাম। ডিশটিকে মাইক্রোস্কোপের লেন্সের নীচে বসান তিনি। তারপর চোখ লাগান মাইক্রোস্কোপে।

"এখানে কি জাতীয় কোষেরা আছে জানো? এখানে আছে ইঁদূরের কোষ, ফাইব্রোব্লাস্ট শ্রেণীর কোষ এখানে। এসো- এখানে এসে চোখ লাগাও।"

আমি আস্তে আস্তে মাইক্রোস্কোপে চোখ রাখি।
পাশাপাশি গা ঘেঁষাঘেঁষি করে আছে কোষগুলো। অনেকটা কব্‌ল্‌স্টোন এর মতো। বেশী ম্যাগনিফায়ইং লেন্সের ভিতর দিয়ে দেখলে পরিষ্কার দেখা যায় নিউক্লিয়াস। বই পড়ে জানি যে ওটাই হচ্ছে কোষের প্রাণকেন্দ্র। ওখানে থাকে ক্রোমোসোম যা কিনা সব জীনের সমষ্টি।

কানের পাশে ডঃ বার্ট্রামের গলা শুনতে পাই,"এগুলো হচ্ছে নরমাল কোষ। এরা সংখ্যায় বাড়তে বাড়তে যখন পুরো ডিশটা ভরে ফেলে তখন এরা আর সংখ্যায় বাড়েনা। খেয়াল করে দেখো, কোষেরা কিন্তু সবাই পাশাপাশি আছে, একটার উপর আর একটা কোষ দেখতে পাবে না তুমি। কিন্তু এই কোষেরাই যখন ক্যানসারাস হয়ে যায়, তখন এরাই পাগলের মতো সংখ্যায় বাড়তে থাকে। একের উপর আর একটা। এভাবেই আমাদের শরীরে তৈরী হয় টিউমার। আন-কন্ট্রোল্‌ড্‌ গ্রোথ অফ সেলস্‌।"

ল্যাব থেকে আবার ফিরে আসি ডঃ বার্ট্রামের অফিসে।

"তারপর? কেমন লাগলো তোমার সবকিছু? ইন্টারেস্টিং মনে হয়েছে? ভাল কথা-আমি সম্প্রতি একটা নতুন রিসার্চ গ্র্যান্ট পেয়েছি। তা দিয়ে নতুন একটা দামী যন্ত্র কিনবো ভাবছি। একে বলে মাইক্রো ইঞ্জেকটর। এটি দিয়ে তুমি একটি প্রাণীকোষের ভিতর কোন কিছু ঢুকাতে পারবে। তারপর দেখবো কোষটির কোন পরিবর্তন হোল কিনা। অনেক চমৎকার চমৎকার এক্সপেরিমেন্ট করার প্ল্যান আছে আমাদের। তুমি এলে তোমাকে দিয়েই করাবো তাহলে কাজগুলো। তোমার ভালই লাগবে কাজগুলো করতে।"

আমার সবকিছু মোহময় মনে হয়। কত ছোট একটি প্রাণীকোষ, খালি চোখে দেখা যায়না, আর আমি সেই কোষটির ভিতরে কিছু একটা ইঞ্জেক্ট করবো। তাহলে সেই সূঁইটি না জানি কত সূক্ষ্ম।

আমি মাথা নাড়লাম। কাজ করবো এখানেই।

ডঃ বার্ট্রাম খুশী হলেন। ইউ ওন্ট রিগ্রেট ইট, আই প্রমিস!
"তাহলে কবে থেকে শুরু করবো আমি?"
এ প্রশ্নে ডঃ বার্ট্রামের মুখ একটু গম্ভীর হয়ে আসে। "তুমিতো জানো যে আমি তোমাদের ডিপার্টমেন্টের একজন ডিরেক্ট ফ্যাকাল্টি নই। তাই তুমি যদি আমার ল্যাবে কাজ করতে চাও, তাহলে তোমাকে তোমাদের ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যানের পারমিশন নিয়ে আসতে হবে। আশাকরি তিনি কোন আপত্তি করবেন না।"

রোদেলা সেই দিনটিতে আবার আমি পথে নামলাম। এবারে দেখা করতে হবে আমাদের চেয়ারম্যানের সাথে। চেয়ারম্যান মানে ডঃ ভগবান।

গুরুর দেখাতো পেলাম, এবারে চাই ভগবানের সম্মতি।

(বাকী অংশ পরের পর্বে)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28843051 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28843051 2008-09-14 14:48:00
কামেহামেহা, মানোয়া পাহাড় এবং আলোহা। পর্ব-৪(ক)। গুরুর অন্বেষণ এবং ভগবানের রক্তচক্ষু

বাংলাদেশের লেখাপড়ার সিস্টেম নিয়ে অনেক গুণীজনে অনেক কথাই বলেছেন। সেখানে আমার আর নতুন করে কিছুই বলার নেই। তবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে দু চারটে জিনিস এখানে সংক্ষেপে বলতে চাই।

প্রথমেই বলে নেই (যদিও এই কথাটাই আগেও অনেকবার ইনিয়ে বিনিয়ে বলেছি) একটি গরীব দেশ হিসেবে বাংলাদেশের পড়াশুনার মান আমার কাছে যথেষ্ট উন্নত বলে মনে হয়েছে। তার উপর আমার শিক্ষকেরা যে পরিমাণে কষ্ট করে আমাদেরকে পড়িয়েছেন তার তুলনা মেলা ভার।

আমার সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়। বাংলাদেশের আমার গোটা ছাত্রজীবনে আমি যা যা পড়েছি তার কোনকিছুই আমি নিজে বেছে নেইনি। প্রত্যেক জায়গাতেই সিলেবাসে যে যে কোর্স ছিল তার সবগুলোই পড়তে হয়েছে আমাদের সবার। এটাকে একধরণের স্পুন-ফিডিংও বলা যেতে পারে।

সমস্যা হোল যখন বিদেশে গেলাম। প্রত্যেক সেমেস্টারের আগে মাথা গরম হয়ে যেতো কি কোর্স নেবো সেই চিন্তায়। ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রি নেবো, নাকি ফিজিওলজি? বায়োকেমিস্ট্রি নাকি অরগানিক কেমিস্ট্রি? কোনটার শিক্ষক খুব ভাল কিন্তু তার হাতে ভাল গ্রেড পাওয়া রীতিমত ভাগ্যের ব্যাপার। আবার কোনটার বিষয়বস্তু খুব ভাল কিন্তু তার শিক্ষক সাহেব নাকি একদম পড়াতেই পারেন না। এক দুই সেমেস্টার পরে অবশ্য কিছুটা সয়ে আসে। তখন কোর্স নিয়ে অতটা মাথা ঘামাইনে। কঠিন পড়াশুনা করতে হবে সবগুলোতেই, এটাই হচ্ছে ধ্রুব সত্য। বিরাট বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলি ঘনঘন। বড়ই কষ্টের জীবন।

আমেরিকায় এসেছি পি এইচ ডি করতে। শুনেছি ব্রিটেন বা জাপানে নাকি কোন রকম কোর্স-টোর্স নেবার বালাই নেই। প্রথম দিন থেকেই ঢুকে পড়তে হবে কোন একটি ল্যাবে। প্রথম দিন থেকেই শুরু হয়ে যায় রিসার্চের কাজ।

আমেরিকায় নিয়ম অন্য। আমাদের লাইনে প্রথম দু বছর শুধু কোর্সওয়ার্ক আর কোর্সওয়ার্ক। পরীক্ষা দিতে দিতে পেটের বাঁধন ছিড়ে যাবার জোগাড়। শুধু থিওরী ক্লাশ নিলেই হবেনা, এর সাথে সাথে নিতে হবে প্র্যাকটিক্যাল ক্লাশ। এর সাথে আছে সেমিনার কোর্স। তার জন্যে লাইব্রেরীতে বসে জার্নাল ঘেঁটে তৈরী করতে হবে প্রেজেন্টশন। তাতেও মাপ নেই, বক্তৃতা দেওয়া শেষ হলে অন্য ছাত্র আর টীচারদের প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।

কোর্সওয়ার্কের পালা শেষ হবার পর আসবে কম্প্রিহেনসিভ পরীক্ষা। যতই ভাল রেজালট থাকুক না কেন, এটাতে যদি কেউ পাশ না করে তাহলে গাটঠি-বোঁচকা বেঁধে এখানকার পড়াশুনার পাট চুকাতে হবে।

কম্প্রিহেনসিভ পরীক্ষার দুশ্চিন্তায় যখন মুখ শুকিয়ে আসে তখন মুরুব্বীরা বলেন, "আল্লাহ্‌র কাছে শুকুর করো।"
আমি বুঝিনা, "এই কঠিন পরীক্ষার জন্য শুকুর করবো? কি বলেন এইসব?"
তাঁরা হাসেন। "হ্যাঁ শুকুর করবে এই জন্যে যে তুমি ইকোনমিক্স এর ছাত্র না।"
"কেন তাদের আবার কি হলো?"
"ইকোনমিক্স এর ছাত্রদের সাতটা কম্প্রিহেনসিভ পরীক্ষা। এর মধ্যে যে কোন একটাতে ফেল মারলেই খেল খতম, পয়সা হজম।"
"বলেন কি? সাতটা পরীক্ষা?"
মুরুব্বী আবারো মিটিমিটি হাসেন। "আর তুমি কিনা একটা কম্প্রিহেনসিভ পরীক্ষার গল্প শুনাচ্ছো!"

কম্প্রিহেনসিভ পরীক্ষার পর আসবে থিসিস প্রপোজাল ডিফেন্স। সেখানে থিসিস কমিটি দেখবেন যে আমার থিসিস বিষয়ক প্ল্যানটি কেমন। তারপর শুরু হবে আসল গবেষণা। দীর্ঘ পথ। কি কুক্ষণে যে আমেরিকায় এসেছিলাম!

এর ভিতরে তলে তলে বাড়তে থাকে আর একটি দুশ্চিন্তা। কি নিয়ে গবেষণা করবো? এবং কে হবেন আমার গুরু? দেশে যখন ছাত্র ছিলাম তখন মনে মনে কত কি কল্পনা করেছি। বিরাট গবেষক হবো, যুগান্তকারী কোন কিছু আবিষ্কার করবো, নোবেল প্রাইজ পাবো। দেশ ওর দশের মুখ উজ্জ্বল করবো। কিন্তু একজ্যাক্টলি কি নিয়ে কাজ করবো তা কোনদিন চিন্তা করিনি।

তার পরের প্রশ্ন, কার সাথে কাজ করবো? মাঝে মাঝে একটা দুটো প্রফেসরের ল্যাবে হানা দেই। সেখানে কাজ করে এমন দু একজনের সাথে কথা বলি। কারো কথা শুনেই মনে উৎসাহ পাইনা।

এর মধ্যে কতিপয় মুরুব্বী উপদেশ দিলেন যে তাড়াতাড়ি যে কোন একটা ল্যাবে ঢুকে কিছু একটা কাজ শুরু করে দিতে। আমি অবাক হলাম।
"যাকে জানিনা শুনিনা, তার সাথে কাজ করবো কিভাবে? আর তার উপর আমার গবেষণার বিষয়টাওতো ঠিক করিনি এখনো।"
"আরে শোন-প্রফেসরকে জানবার জন্যেইতো তার ল্যাবে কাজ করবে। সামনেই সামার আসছে। সামারে কোন গ্রাজুয়েট লেভেল কোর্স অফার করা হয়না। কি করবে তাহলে? হালে মানোয়ায় শুয়ে শুয়ে ঘুমাবে নাক ডেকে? তার চেয়ে বরং যে কোন একটা ল্যাবে ঢুকে পড়ো সামারের জন্যে। ভাল না লাগলে পরের সেমেস্টারে অন্য ল্যাবে চলে যেও।"

বুদ্ধি মন্দ না। কিন্তু আবারও সেই আগের সমস্যা? কোন ল্যাবই তো ভাল লাগে না।

একদিন আমাদের ডিপার্টমেন্টের লাইব্রেরীতে বসে বসে জার্নাল পড়ছি। এমন সময় ঢুকলেন ডঃ হামফ্রিস বলে আমাদের একজন প্রফেসর। তিনি মলিকুলার বায়োলজি নিয়ে কাজ করেন।

"কি হে-কি খবর তোমার?"
"এই চলছে কোন রকম। সামনে একটা সেমিনার আছে। তার জন্যে মাল-মশলা রেডী করছি।"
"সামার তো চলে এলো প্রায়। তুমি কি থাকবে এখানে নাকি দেশে যাবে?"
"এখানেই থাকবো, কিন্তু কি করবো তাই খুজে পাচ্ছিনা। নেবার মতো কোর্সতো কিছু নেই সামারে।"
"সামারে কোর্স নেবে কেন? সামারে কাজ করবে কারো সাথে। এটাই তো সবচেয়ে ভাল সময়।"
এ কথায় আমার মুখ ভার হয়ে আসে।
"সেটাই তো সমস্যা। কার ল্যাবে কাজ করবো এটাই তো বুঝে উঠতে পারছিনা।"

ডঃ হামফ্রিস এবারে হাসেন। "আমি জানি তুমি কি বলতে চাচ্ছো। তুমি একটা কাজ করতে পারো।"
"বলো। আমি যেকোন সাজেশনই শুনতে প্রস্তুত।"
"সম্প্রতি এখানকার ক্যান্সার রিসার্চ সেন্টারে একজন নতুন গবেষক এসেছেন। জন বার্ট্রাম। উনি বেশ ইন্টারেস্টিং কাজ করেন। তুমি তার সাথে যেয়ে কথা বলে দেখতে পারো। আমার কেন জানি মনে হয় তুমি কাজকে পছন্দ করবে।"
"ক্যান্সার সেন্টার? সেটা আবার কোথায়। আমিতো ক্যাম্পাসে কোথাও এ জাতীয় কোন জিনিস দেখিনি।"
"হনলুলুর ক্যান্সার সেন্টারটি ক্যাম্পাসের বাইরে। প্রায় তিন মাইল দূরে। ড্রাইভ করে যেতে পাঁচ-সাত মিনিট লাগবে তোমার।"
আমি আমতা-আমতা করি। "আমি গাড়ী ড্রাইভ করতে পারিনে। আর তাছাড়া আমার কোন গাড়ীও নেই।"
"তাতে সমস্যা নেই। বাসে করেও তুমি ওখানে যেতে পারবে। সময় একটু বেশী লাগবে এই যা।"
"সে নাহয় হোল। কিন্তু উনি তো আমাদের ডিপার্টমেন্টের বাইরের লোক। আমার তো ধারণা ছিল যে কেবল বিভাগের শিক্ষকদের ল্যাবেই শুধু ছাত্ররা কাজ করতে পারে।"
"সেটা ঠিক কথা। তবে জন বার্ট্রাম আমাদের বিভাগের সাথে কিছুটা যুক্ত আছেন। তবে তার ওখানে কাজ করতে গেলে তোমাকে আমাদের চেয়ারম্যানের কাছ থেকে আগে পারমিশন নিতে হবে।"
"আমাদের বিভাগের চেয়ারম্যান?"
"ইয়েস। দি গ্রেট ডঃ ভগবান। তবে মনে হয়না সে কোন আপত্তি করবে।"

এক শুভদিনে আমি ম্যাপ-ট্যাপ দেখে বুকে ফুঁ দিয়ে বাসে উঠলাম। গন্তব্য তিন মাইল দূরে অবস্থিত ক্যান্সার রিসার্চ সেন্টার। জন বার্ট্রাম এর সাথে দেখা করবো বলে।

(বাকী অংশ পরের পর্বে)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28830323 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28830323 2008-08-13 04:41:39
কামেহামেহা, মানোয়া পাহাড় এবং আলোহা। পর্ব-৩(ঘ)। মোদোমাতাল ও নারীলিপ্সু


(আগের অংশটুকুর জন্য এখান থেকে পড়ে আসতে হবে)


সুজাত যখন হনলুলু ছেড়ে মিশিগানে চলে গেলো, তখন আমি আমার রিসার্চ নিয়ে বেজায় ব্যস্ত। ইতিমধ্যে আমার বিবাহ-পর্ব কমপ্লিট। নদীর নামের একটি মেয়ের সাথে। পুতুল খেলার মতো তার সাথে ঘর-সংসার করি।

প্রতিদিন ল্যাবে গিয়ে মাথা কুটি। ডেটা চাই, ডেটা। চলে নতুন এক্সপেরিমেন্টের সাধনা। এর সাথে পাল্লা দিয়ে সংসারে চলে নিত্য নতুন রান্নাবান্নার প্রচেষ্টা। অবশ্য সেখানে আমি গবেষক নই, সেখানে আমি গিনিপিগ। (এই রকম গিনিপিগ হতে পারাটা অবশ্য ভাগ্যের ব্যাপার। ফিসফিস করে বলি, আমার স্ত্রী একজন দুর্ধর্ষ রাঁধিয়ে।)

সুজাত মাঝেমাঝে ফোন করে। সে তখন পোস্ট-ডক্টোরাল রিসার্চ করছে একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানীতে। এই জিনিসটি একটু খাপছাড়া। সাধারণতঃ লোকেরা তাদের পোস্ট-ডক্টোরাল রিসার্চ এর কাজটি করে যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন প্রফেসরের আন্ডারে কেননা সেখানে তারা দ্রুত অনেকগুলো পেপার পাবলিশ করতে পারে। তখনকার আমলে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানীরা তাদের রিসার্চের ফলাফল একদমই পাবলিশ করতে চাইতোনা।

সুজাত কাজ করছিল আলৎসহাইমার রোগটির উপর। সে আমলে খুবই একটি দারুন বিষয় ছিল এটি। কিন্তু ওই যে বললাম সে তার কাজের কোন কিছুই পাবলিশ করতে পারছে না কোন জার্নালে। ব্যাপারটি নিয়ে সে বেশ মনোকষ্টে ছিল।

ইতিমধ্যে আমাদের ঘরে আমার স্বপ্নেদেখা মেয়েটির জন্ম হয়েছে। কাজ থেকে আমি বাসায় ফিরবার পরে তিনজনে মিলে সারাক্ষণ হুটোপুটি করি। সময় কেটে যায় পাখীর ডানায় ভর করে।

একদিন সুজাতের ফোন এলো।
"হ্যালো-কেমন আছ?"
"ভাল আছি সুজাত। থিসিসটাকে মোটামুটি বাগে এনে ফেলেছি। তোমার কি অবস্থা?"
"আমার অবস্থা ভালই। দুটো খবর আছে।"
"কহিয়ে জনাব।"
"নাম্বার ওয়ান- বিয়ে করেছি।"
"তাই নাকি! কোথায়? কবে? কাকে?"
"বৌয়ের নাম সালমা। ও আর আমি অনেক আগে একসাথে কলেজে পড়তাম। ও ইন্ডিয়া থেকে পি এইচ ডি করে এখানে এসেছে।"
"খুবই ভাল খবর। আমি তো মনে মনে ভয় পাচ্ছিলাম যে তুমি আবার কোন মিশিগান কন্যার চক্করে না পড়ে যাও। যাই হোক-আর দুই নম্বর খবরটি কি? বাচ্চা হবে সালমার?"
সুজাত এ কথায় খুবই আনন্দ পায়। সে হা হা করে হাসে।
"আরে না-না, কেবলই তো বিয়ে হোল। আমরা সামনের সপ্তাহে হানিমুনে যাচ্ছি।"
"তাতে আমার কি? হানিমুনে যাচ্ছো, যাও। হ্যাভ আ গুড টাইম।"
"হানিমুনে আমরা হাওয়াই আসছি। ইট উইল বী গুড টু সী ইউ।"

এতক্ষণে রহস্য পরিষ্কার হইলো।

পরের সপ্তাহেই সস্ত্রীক সুজাতের আগমন। ডিনার খেতে বাসায় ডেকেছিলাম। সেই আগের দিনের মতো আড্ডা চালাই আমরা দুজন। মহিলাবৃন্দও তাদের আলাপচারীতা চালিয়ে যান সমান তালে। সালমাও খুবই মিশুকে টাইপের মেয়ে।

সুজাতকে আড়ালে ডেকে বললাম, "তোমার ঘরে কি জ্যাক সাহেবের আনাগোনা এখনো চলছে?"
"জ্যাক সাহেব আবার কে? আমার বসের নামতো মাইকেল।"
"আরে আমি জ্যাক ড্যানিয়েলস এর কথা বলছি। তোমার প্রিয় হুইস্কি।"
"সুশশ।" সুজাত আমার মুখে হাত চাপা দেয়। "ওকথা বলা যাবে না।"
"সেকি? কেন?"
"ওসব ছেড়ে দিয়েছি বহু আগে। মিশিগানে যাবার পরপরই। সালমা ওসবের কিছু জানেওনা।"
"এখন একদম বন্ধ?"
"হ্যাঁ-একদম বন্ধ। তখন খুব একা একা লাগতো বলে নাইটক্লাবে যেয়ে ওসব খেতাম।"

শুনে ভালই লাগলো আমার। যাক, অন্ততঃ একটা মদখোর কমলো এই পৃথিবীতে।

তারপর কেটে গেছে বহুদিন। আমরা হনলুলু ছেড়ে চলে গেছি ক্যানাডাতে। সেখানে কয়েকটি বছর থাকবার পর আবার ফিরে আসি আমেরিকাতে। এর মধ্যে মাঝেসাঝে ফোনে কথা হয় সুজাতের সাথে। সেও তার চাকরি বদলেছে। এখন সে অন্য কোম্পানীতে চাকরি করে। রিসার্চেরই কাজ। একই জায়গাতে সালমারও চাকরি হয়েছে। একদিন খবর দিল যে তাদের মেয়ে হয়েছে একটা। চিঠিতে ছবিও পাঠালো গোটা কয়েক।

একবার আমি একটা কনফারেন্সে গেলাম সান ফ্রান্সিস্কো। সুজাতরা তখন ওই এলাকারই আশেপাশে কোথাও থাকে। আমার আসবার খবর শুনে বললো যে তাদের বাসায় যেতে হবে। হাতে সময় বেশী ছিলনা বলে সে প্রস্তাবে সাড়া দেওয়া হয়নি। তাকে বললাম, বরং তুমি একদিন সন্ধ্যেবেলা আমার হোটেলে এসো। আমরা কাছাকাছি কোন একটা জায়গাতে বসে কথা বলতে বলতে রাতের খাবার খেয়ে নেবো।

সন্ধ্যেবেলা সুজাত সাহেব এলেন। তাকে দেখে চমকে উঠি। এতদিন পরেও ব্যাটাচ্ছেলে দেখতে একদম আগের মতোনই আছে। বয়সের কোন ছাপই পড়েনি। কোন স্পেশাল তাবিজ-কবচের কেরামতি কিনা জিজ্ঞেস করলাম তাকে। সে একগাল হাসে। তার গাড়ীটাও ঝকঝকে নতুন। বুঝলাম সে ভালই আছে।

"কি জাতীয় খাবার খাবে?" সুজাত জিজ্ঞেস করে।
"দুদিন ধরে ভাত খাইনি, বার্গার আর স্যান্ডউইচের উপর আছি। কাছাকাছি কোথায় গিয়ে চারটে ভাত যদি খেতে পারতাম।"
"চলো, তাহলে কোন ইন্ডিয়ান আর না হলে থাই রেস্টুরেন্টে যাই।"

বেশীক্ষণ খুঁজতে হোলনা ভাগ্যক্রমে। মিনিট দশেক ড্রাইভ করেই মিলে গেল একটা "তাজমহল" মার্কা রেস্টুরেন্ট।

ভিতরে ঢুকে খাবার অর্ডার দেবার সময়ে সুজাত একটু মুখ কাঁচুমাচু করে বললো, "আমি কিন্তু কিছুই খাবোনা। তুমি শুধু তোমার নিজের জন্যে অর্ডার দাও।"
"মানে? তুমি কি দাম নিয়ে ভাবছো? নো চিন্তা ভাই- আমি খাওয়াচ্ছি তোমাকে। যা খুশী অর্ডার করো।"
"না না, দাম দেওয়া নিয়ে কোন সমস্যা নেই। আমি আসলে বাইরে কোথাও খাইনে একদম।"

হঠাৎ মনে পড়লো যে অনেকেই খাদ্যদ্রব্যের হালাল-হারাম নিয়ে খুঁতখুঁত করেন। হয়তো বা সুজাতও এখন বাইরের খাবার হালাল না হলে খায় না।

"তুমি যদি খাবার হালাল কিনা এই চিন্তায় থাকো, তাহলে তুমি বরং ভেজিটেরিয়ান কিছু একটা নাও।"
"না হালাল-হারাম নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা নেই। আমি বাইরে কোথাও খাইনা।"
"কেন? বাইরের খাবারের দোষটা কি?"
"বাইরের খাবার খাওয়া একদম বারন আমার জন্য।"
"কে বারণ করেছে? সালমা? আমাকে ফোনটা দাওতো। ওকে বলে দেই যে একদিন আমার সাথে খেলে এমন কোন মহাভারত অশুদ্ধ হবে না।"
"না সালমা বারণ করেনি।"
"তাহলে কে করেছে?"
"তুমি খাওনা আগে। আমি বলছি।"

ঘটনাটি খেতে খেতে শুনলাম।

বছরখানেক আগের কথা। সুজাত কাজে গেছে। ল্যাবে একটা গুরুত্বপূর্ণ এক্সপেরিমেন্ট চলছে। পাশে টেবিলের সহকর্মী বললো, "তোমার চোখ দুটো কেমন লাল মনে হচ্ছে। কাল রাতে বেশী টেনেছো নাকি?"
সুজাত বলে, "টানাটানির জীবন শেষ হয়েছে অনেক আগে।"
"চোখ তো অনেক লাল। ঘটনা কি? ইনফেকশন হতে পারে তাহলে। ডাক্তারের অফিস থেকে ঘুরে এসো নাহয়।"

সুজাতের তেমন কোন খারাপ লাগছিলনা, কিন্তু তারপরেও সহকর্মীর ঠেলায় পড়ে সে গেল ডাক্তারের কাছে। এখানে তো আবার ডাক্তার আসবার আগে আসে তার অ্যাসিস্টেন্ট। সে এসে পালস দেখে, তাপমাত্রা মাপে, ব্লাড-প্রেসার চেক করে। এসব শেষ করার পর রোগীদের বসে থাকতে হয় আরো মিনিট দশেক। তারপর আসে ডাক্তার।
সুজাতের ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম হোল। ডাক্তার মুহুর্তের মধ্যে এসে হাজির। সুজাততো মহা খুশী। বাহ-ক্লিনিকটি তো বেশ এফিসিয়েন্ট মনে হচ্ছে।

ডাক্তারের প্রথম প্রশ্ন ছিল, "তুমি ক্লিনিকে এসেছো কিভাবে?"
সুজাত অবাক। তার সাথে চোখ লালের কি সম্পর্ক? তারপরেও সে উত্তর দিল, "গাড়ীতে করে এসেছি আমি।"
ডাক্তারের পালটা প্রশ্ন, "কে ড্রাইভ করেছে? তুমি নাকি অন্য কেউ?"
আরে মর জ্বালা! একি ডাক্তার নাকি ড্রাইভিং লাইসেন্স অফিসের একজামিনার?
"আমিই গাড়ী চালিয়ে এসেছি।"
"বলো কি? কি সর্বনাশের কথা!" ডাক্তার ভিরমি খায় সুজাতের উত্তর শুনে।

সুজাতের এবার ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটে। "তুমি কি দয়া করে বলবে যে এই জাতীয় প্রশ্নের অর্থ কি?"

ডাক্তার গম্ভীর হয়ে বসে থাকেন কিছুক্ষণ, তারপর বলেন,"তোমার ব্লাড-প্রেসার ভয়াবহ রকমের বেশী। তোমার যে এখনো স্ট্রোক হয়নি, তাতেই আমি অবাক হচ্ছি। আবার যখন শুনলাম যে তুমি এই অবস্থায় নিজে গাড়ী চালিয়ে এসেছো, তখন আমি মনে মনে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিয়েছি যে রাস্তায় তুমি দু চারটে লোককে মেরে বসোনি।"

ব্লাড-প্রেসার, স্ট্রোক, এসব কি বলছে ডাক্তার? সুজাত ভ্যাবলার মতো বসে থাকে। তাদের পরিবারের কারোরই তো এরকম কোন রোগ-বালাই নেই। সুজাত নিজেই হাল্কা-পাতলা গড়নের মানুষ, তার উপর সে খুব একটা হাই-ফ্যাট খাবারও খায়না।

ডাক্তার কথা বলে আবার।"তোমাকে এই মুহুর্তে হসপিটালাইজ করা দরকার। তোমার অবস্থা খুবই খারাপ। এই মুহুর্তে যদি তোমার স্ট্রোক হয় তাহলে আমি মোটেও অবাক হবোনা। আমি নার্সকে এ্যাম্বুলেন্স ডাকতে বলেছি।"

সুজাতের মাথা ঝিম ঝিম করতে থাকে। তার চোখের সামনে ভাসতে থাকে তার তিন বছরের শিশুকন্যাটির মুখ।

হাসপাতালে গিয়ে সুজাতের আরো একগাদা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাঝখান দিয়ে যেতে হোল। তাতে ধরা পড়লো যে সুজাতের আসল সমস্যা হচ্ছে যে তার দুটো কিডনীই একদম শেষ। তাদের কাজ না করার কারণেই সুজাতের রক্ত নিয়মিত পরিষ্কার হচ্ছে না। এবং সে কারণেই তার ব্লাড-প্রেসার এইরকম আশংকাজনক রকম বেশী।

তাহলে এখন চিকিৎসা কি? পার্মানেন্ট চিকিৎসা হচ্ছে কিডনী ট্র্যান্সপ্ল্যান্ট, আর যতদিন সেটা না হয় ততদিন পর্যন্ত কিডনী ডায়ালিসিস।

এইপর্যন্ত বলে সুজাত একটু ম্লান হাসলো। আমার ততক্ষণে খাওয়া মাথায় উঠেছে। এসব কি বলছে সুজাত? এত অল্পবয়সে কিডনী নষ্ট হয়ে গেল ছেলেটির?

সুজাত মাথা নীচু করে একটি চামচ নিয়ে আনমনে নাড়াচাড়া করে। "এখন আমাকে সপ্তাহে দু দিন যেতে হয় ডায়ালিসিস করাতে। প্রতিবার সময় লাগে চার ঘন্টা করে। সপ্তাহে আটটি ঘন্টা আমি ক্লিনিকের বিছানায় শুয়ে থাকি চুপ করে। ভাবি হোয়াই মী? খাওয়া-দাওয়ার একগাদা রেস্ট্রিকশান, মাঝে মাঝে বড় অসহ্য লাগে। আমার সারাটা জীবনই বোধহয় এভাবেই কাটবে।"
"কেন? কিডনী ট্র্যান্সপ্ল্যান্ট করলে তো আর ডায়ালিসিস করতে হবে না।"
"কিডনী ট্র্যান্সপ্ল্যান্ট করার জন্য অনেক দিন দেরী করতে হয়। দশ-পনেরো বছর। আমার এই অবস্থায় অতখানি সময় আমি পাবো কিনা জানিনা।"

এ কথার কোন জবাব হয়না। আমি চুপ করে থাকি।

সুজাত এবারে একটু হাসে। "দেখেছো-আমি কি রকম গোটা পরিবেশটা বিষন্ন করে দিলাম। এই জন্যেই ওই সব কিছু বলিনি তোমাকে কোনদিন। ভাগ্যকে মানতে তো হবেই আমাদের সবার। তাওতো ভাল যে আমি আমেরিকাতে আছি, যদি ইন্ডিয়াতে থাকতাম তাহলে বোধহয় এতদিনে মারাই যেতাম। ডায়ালিসিস করার অত পয়সা কোথায় পেতাম আমি?"

হয়তো বা তাই।

"আমি খুব একটা কমপ্লেইন করিনা এ নিয়ে। শুধু একটা জিনিস খুউব খারাপ লাগে। ইন্ডিয়াতে আর কোনদিন বোধহয় যেতে পারবো না আমি। ওখানে ডায়ালিসিস সেন্টারগুলোর যা অবস্থা তাতে দুদিনেই ইনফেকশন হয়ে মারা যাবো। বাবা-মা, ছোট ভাই-বোনদেরকে দেখিনি বহুদিন। ব্যাপারটা কেমন না? একটা অসুখের জন্য আমি বোধহয় চিরকালের মতো আমার ফ্যামিলি থেকে আলাদা হয়ে গেলাম। আমার জন্যে সালমাও যেতে পারছেনা। সে আমাকে কিছু বলেনা, কিন্তু আমিতো বুঝি।"

সেই সন্ধ্যের পর সুজাতের সাথে আমার আর দেখা হয়নি। তারপর কেটে গেছে আরো অনেকগুলো বছর। আমি এবং সে দুজনেই কাজের জায়গা বদলেছি কয়েকবার। মাঝেসাঝে শুধু তার সাথে ফোনে কথা হোত। আমি বা সে কেউই সুজাতের শারিরীক অবস্থা নিয়ে কথা বলিনা। দুজনেই বুঝি।

শুধু একবার সে বলেছিল যে তার শারীরিক অবস্থা আরো একটু খারাপ হয়েছে। এখন তাকে সপ্তাহে তিন দিন যেতে হয় ডায়ালিসিস করানোর জন্যে।

এমনিই চলছিল। একদিন সন্ধ্যেবেলা ফোন এল। নাম্বার দেখে বুঝলাম সুজাতের বাড়ীর ফোন নাম্বার। ভয়ে ভয়ে ফোন তুলি।
"হ্যালো।"
"সুজাত বলছি।" আমার বুক থেকে একটি বড় ভার যেন নামে।
"কি খবর তোমার? অনেকদিন কথা হয়নি।"
"আজই বাসায় ফিরলাম হাসপাতাল থেকে।"
"সে কি? হাসপাতালে কেন? সালমার শরীর ভালতো?"
"আমার কিডনী ট্র্যান্সপ্ল্যান্টটা অবশেষে হোল এ মাসে। মনে হচ্ছে সাকসেসফুল। টিস্যু রিজেকশনের প্রাথমিক ভয়টা কেটে গেছে।"
"দ্যাটস সাচ আ গুড নিউজ, সুজাত।" আমি জোরে চেঁচিয়ে বলি।
ওপাশ থেকে সুজাতও হাসে। "জানতাম তুমি খুব খুশি হবে খবরটা পেয়ে।"
"আমার খুব ভাল লাগছে। তারপর এখন কি? সেলিব্রেশান কি ভাবে করবে?"
"আমি একটু আগে টিকিট কেটেছি। দেশে যাবার টিকিট। আমার মা আমার জন্যে পথ চেয়ে বসে আছে। তাকে আমি কতবছর দেখিনি।"

এ কথায় কেন যেন আমার চোখে জল আসে। আহা-ঈশ্বর তুমি তাড়াতাড়ি ছেলেটিকে তার মায়ের কাছে যেতে দাও। আমি যেন কল্পনায় দেখতে পাই দৃশ্যটি। সুজাতকে বুকে জড়িয়ে তার মা কাঁদছেন। সুজাত হাসছে, কিন্তু তার চোখ দিয়ে অবিরল পানি পড়ছে। সে কিছু বলছে না। চোখের পানির চেয়ে বড় ভাষা আর কিইবা হতে পারে?

(এরপর নতুন পর্ব)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28827750 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirbasitoblog/28827750 2008-08-05 22:03:55
কামেহামেহা, মানোয়া পাহাড় এবং আলোহা। পর্ব-৩(গ)। মোদোমাতাল ও নারীলিপ্সু


(আগের অংশটুকুর জন্য এখান থেকে পড়ে আসতে হবে)


গাড়ী চালানোর সময়ে নাঈম বেশ গম্ভীরই হয়ে থাকলো পুরোটা সময়। আমার বেশ মজাই লাগছিল তাকে দেখে।

নাইটক্লাবটি আসলেই বেশ অভিজাত কিসিমের। ভিতরে ঢোকার সময়েই দেখলাম বেশ অনেককেই দরজা থেকেই ফেরত আসতে হয়েছে কেননা তাদের পোশাক আপ টু দ্য স্ট্যান্ডার্ড ছিলনা। ভাগ্যিস সুজাতের কথামত ভদ্রগোছের পোশাক পরে এসেছিলাম।

ভিতরে ঢূকবার সময়ে বুক ধুকপুক করছিল। কেউ আবার দেখে ফেলবে নাতো? হাজার হোক গায়ে একটা 'ভাল ছেলে'র তকমা ততদিনে উঠেছে। সেটা কি আজ রাতেই উবে যাবে চিরকালের মতো? এই খবর যদি আমার পিতাজীর কাছে যায়, তাহলেই হয়েছে। তিনি যে কি চীজ, সেটা তো আগের সিরিজেই বিস্তারিত লিখেছি। উৎসাহী পাঠকেরা ইতিমধ্যে সেটা জানেন হয়তোবা।

কোন এক অজানা ভয়ে দুলে ওঠে বুক। কি এমন দরকার আমার এই নাইটক্লাবে যাওয়া? ভিতরে যেয়ে কি দেখবো সেই আতংকেই ঠান্ডা মেরে যাই কেমন যেন। পিছন থেকে সুজাত হাল্কা ধাক্কা দেয়।

"চলো। আমাদের পিছনে তো লোক জমে যাচ্ছে।"

ভিতরে ঢোকার সাথে সাথে প্রথমেই দুটো জিনিস নজরে এলো। এক নানান ধরণের আলোর ঝলকানি, আর সেই সাথে প্রচন্ড জোরে মিউজিক বাজছে। এর সাথে লোকজনদের চেঁচামেচি, সাথে সিগারেটের ধোঁয়া, আর কাঁচের গ্লাসের ঠুনঠুন শব্দ।

আস্তে আস্তে চোখ সয়ে এলো। বেশ বড় একটি হলঘর। মাঝখানে ড্যান্স ফ্লোর, সেখানে গানের তালে তালে ছেলে-মেয়েরা জোড়ায় জোড়ায় নাচছে। আর একটু ভাল করে দেখে বুঝলাম যে সেখানে মেয়ে-মেয়েও নাচছে, তবে তাদের সংখ্যা খুবই কম।

সুজাত বললো, " চলো, একপাশে গিয়ে বসি।"
সেইই যেহেতু লীডার, অতএব তাকেই অনুসরন করা ছাড়া আর গতি কি?

নাচের জায়গাটির চারপাশে ছোট ছোট টেবিল-চেয়ার পাতা। একটি টেবিল দখল করে বসলাম আমরা। বাজনার প্রচন্ড আওয়াজে কারো কথাই ভাল শোনা যাচ্ছেনা। বুঝলাম এখানে বেশীক্ষণ থাকলে আমার কানের বারোটা বাজবে।

নাঈম ইতিমধ্যে কিছুটা সহজ হয়ে এসেছে। দু চারটে কথাবার্তাও হচ্ছে আমাদের মধ্যে। বুঝলাম সে মাঝেমধ্যে এখানে আসে।
সুজাত চেঁচিয়ে ওয়েটারকে ডাকলো। ওয়েটার না বলে ওয়েট্রেস বলাই ভাল। কেননা একমাত্র বারের বারম্যান ছাড়া আর তাবত কর্মচারীই মহিলা।
"আমি চাই জ্যাক ড্যানিয়েলস।" সুজাত উঁচু গলায় বলে।
"উনি আবার কে?" আমি জিজ্ঞেস করি।
সুজাত আমার অজ্ঞতায় হাসে। "জ্যাক ড্যানিয়েলস হচ্ছে এক ধরণের হুইস্কি। আমার প্রিয় ব্র্যান্ড। একটু চেখে দেখবে নাকি?"
"নারে ভাই- আমার জন্যে কোকই ভাল।"
"নাঈম-তুমি কি খাবে? কোক না অন্যকিছু?"
"ডায়েট পেপসী।"

মিনিট খানেকের মধ্যেই আমাদের পানীয় এসে গেল। মাঝারী সাইজের গ্লাসের অর্ধেকের বেশীই ছিল বরফ। ওখানে আবার পানীয়ের দাম সাথে সাথেই টিপস সহ চুকিয়ে দেওয়াটাই রীতি। সুজাত দিল সাড়ে চার ডলার, আমার কোকের দাম পড়লো সোয়া তিন ডলার। আমার তো দাম শুনে মাথায় হাত। অর্ধেক গ্লাস কোকে