somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... পিএইচডি কোয়াল
আমার ডেক্স থেকে ২২৬ নম্বর রুম হচ্ছে ঠিক ২২ দশমিক ৬ সেকেন্ডের হাঁটা পথ। এইটুকু সময়ের মধ্যে মনে মনে শেষ মুহুর্তের স্ট্র্যাটেজি ঠিক করে নিলাম। কোন কিছু না পারলে বোর্ডে প্রশ্নটা লিখে ছবি-টবি এঁকে ভাব দেখাতে হবে আমি ব্যাপারটা জানি কিন্তু ভাষায় প্রকাশ করতে পারছিনা। ভিনদেশি ছাত্র বলে ভাষায় সমস্যা হচ্ছে কিন্তু কনসেপ্টে আমার কোন সমস্যা নেই। খুব কঠিন টেকনিক, কিন্তু এটা ছাড়া আজকে আর উপায় নেই। ঠিক সাড়ে চারটায় ২২৬ নম্বর রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। দরজায় কী স্ট্যাইলে টোকা দেব সেটা নিয়ে কনফিউজড থাকা অবস্থায় এক মহিলার গলার আওয়াজ পেলামঃ 'ইউ ক্যান কাম ইন'। মহিলা আর কেউ নয়, ডিপার্টমেন্ট হেড প্রফেসর ম্যারি লু সোফা।

ভাইভা রুমটাকে বেশ ছোট বলা চলে। চাপাচাপি করে বিশজন বসতে পারবে এমন একটা লম্বা কনফারেন্স টেবিল পুরো রুমটার সিংহভাগ জায়গা দখল করে নিয়েছে। সেই টেবিলের দু-পাশে দুজন দুজন করে চারজন প্রফেসর কাগজ কলম নিয়ে বসে আছে। পাঁচজনের জায়গায় চারজনকে দেখে প্রথমে একটু খুশি হলাম। ভাবলাম এক্ষুণি জানতে পারব যে দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রফেসর অমুক আজকে আসতে না পারায় তোমাকে একটি বিষয়ে কোন প্রশ্ন না করেই বেনিফিট অফ ডাউটের ভিত্তিতে পাস করিয়ে দেয়া হলো। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই জানতে পারি ব্যাপারটি তা নয়। আমি হোয়াইট বোর্ডকে পেছনে আর ভাইভা বোর্ডকে সামনে রেখে কনফিডেন্ট একটা ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করছি কিন্তু হচ্ছেনা। সবাই চুপ, নিস্তব্ধ একটা পরিবেশ। আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম যে রুমে পিনড্রপ সাইলেন্স বিরাজ করছে নাকি আমার আবার কানে শোনা বন্ধ হয়ে গেছে ভাইভার টেনশনে? এমনই সময় প্রফেসর অ্যান্ড্রু গ্রিমশ নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে বলতে লাগলেনঃ 'শাহরিয়ার নির্জন, ভাইভা বোর্ডের পক্ষ থেকে আমি আপনাকে স্বাগত জানাই। আপনি বোর্ডের সদস্যদের সাথে পূর্ব পরিচিত থাকলেও আমি সৌজন্যের খাতিরে সবার সাথে আবারো পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। আপনার বামপাশে রয়েছেন প্রফেসর ম্যারি লু সোফা ও প্রফেসর সুধানভা গুরুমূর্তি আর ডানপাশে রয়েছেন প্রফেসর ওয়েসলি উইমার ও আমি অ্যান্ড্রু গ্রিমশ। আমরা চারজন পালাক্রমে দশমিনিট করে আপনাকে প্রোগ্রামিং ল্যাংগুয়েজ ও কম্পাইলার, আর্কিটেকচার, থিওরি এবং অপারেটিং সিস্টেমস নিয়ে প্রশ্ন করব। প্রফেসর উইমার এক্সট্রা দশমিনিট অ্যালগোরিদম নিয়ে প্রশ্ন করবেন। আপনি একটুও দুশ্চিন্তা করবেন না, আমরা সবাই চাই আপনি কোয়ালিফায়ার এক্সামে সাফল্যমণ্ডিত ভাবে পাশ করুন। আপনি আমাদের সবাইকে পুরোটা সময় যথেষ্ট সহায়ক ভূমিকায় পাবেন বলে আমি আশা করি।' তার লেকচার শেষ হলে বোর্ডের সবার দিকে একবার করে তাকিয়ে সৌজন্যমূলক হাসি দিলাম। কারো চেহারাতেই সহায়ক ভূমিকার কোন লক্ষণ অবশ্য দেখতে পেলাম না।

প্রথম প্রশ্নটা আসলো প্রফেসর ম্যারি-লু-সোফার কাছ থেকে। এই ভদ্রমহিলাকে নিয়ে আমার নিজের আইডিয়া খুবই কনফিউজিং। একেক সময় একে একেক রকম মনে হয়। অবশ্য এটা বোধহয় পৃথিবীর সকল নারীর ক্ষেত্রেই প্রজয্যো। যেমনঃ তার সেমিনার টক গুলো খুবই সুন্দর হয়। কথার ফাঁকে ফাঁকে বিকারহীন চেহারায় সুন্দর করে জোকস ঢুকিয়ে দেন। তার উপদেশ গুলোও খুব সুন্দর হয়। এসব ক্ষেত্রে তাকে বেশ ভালো মনে হয়। কিন্তু কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে এবং সেটা তার পছন্দ না হলে এমন ঝারি দিয়ে উত্তর দেন যে তাৎক্ষণিকভাবে আমার বুয়েটের সাইদূর রহমান স্যারের কথা মনে পড়ে যায়। আজকে যেমন শুরুতেই জিজ্ঞাসা করলেনঃ 'তুমি পড়াশোনার বাইরে কি করতে পছন্দ কর?' আমি উত্তর দিলামঃ 'ব্লগিং'। উনি পাল্টা জিজ্ঞাসা করলেনঃ 'কী নিয়ে লেখ?' আমি বললামঃ 'ইউভিএ'। উল্লসিত হয়ে ম্যারি লু বললঃ 'দারুণ, তোমাকে আমার আর জিজ্ঞেস করার কিছুই নেই আজকের ভাইভায়। তুমি পাশ।' আমি হতচকিত হয়ে গেলেও পরক্ষণেই বুঝতে পারলাম এটা তার একটা জোকস ছিল। অবশ্য এটাও বুঝতে পারলাম, তার মেজাজ ভালো। ইউভিএ নিয়ে লিখি এটা বলাতে খেলার শুরুতেই এক-শূন্য গোলে এগিয়ে গিয়েছি। এরপর অবশ্য আমার উপর এ্যাটাক শুরু হলো। সে আমাকে কম্পাইলারের প্রতিটি ধাপে যা যা ঘটে সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞাসা করলো। 'এটা কেন, সেটা কেন, অন্য রকম হলে কি হত?' এইসব নানান মারপ্যাঁচের প্রশ্নোত্তরের এক পর্যায়ে গ্রিমশ আমাদের থামিয়ে দিয়ে বলল, 'আই অ্যাম সরি টু ইন্টরাপ্ট দ্য নাইস ডিসকাশন, বাট টাইম’স আপ। এখন প্রফেসর সুধানভার পালা।'

মারিলুর পর সুধানভা গুরুমূর্তির পালা। ভদ্রলোক আর্কিটেকচারের ওপর প্রশ্ন করবেন। ইউভিএর একমাত্র ইন্ডিয়ান প্রফেসর ইনি। প্রতিবেশি দেশের লোক, আশা করেছিলাম আমার ওপর সদয় হবেন। সে আশায় গুড়েবালি। হিন্দি ছবির ভিলেইন গুলশান গ্রোভারের ভঙ্গিতে সে মাল্টি প্রসেসর আর্কিটেকচার নিয়ে বিশাল আলোচনা শুরু করে দিল। এক পর্যায়ে এসে প্রশ্ন করে বসলঃ 'বল দেখি, মাল্টিপ্রসেসর সিস্টেমের ক্যাশ কোহেরেন্সি আর ক্যাশ কনসিসটেন্সির মধ্য কি কি পার্থক্য আছে?' আমার কাছে এ দুটোর পার্থক্য জলের মত পরিষ্কার – ক্যাশ কোহেরেন্সি আমি হাল্কা হাল্কা পারি আর ক্যাশ কনসিসটেন্সি আমি এক ফোঁটাও পড়ে আসিনি। সারা বইয়ের হাজার হাজার টপিক থাকতে ভদ্রলোক ধাপে ধাপে প্রশ্ন করতে করতে আমাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে আসলো যে এক পর্যায়ে আমি স্বীকার করতে বাধ্য হলাম এই বিষয়ে এতটা পড়াশোনা নেই। মনে হল, এতে সে শেষ পর্যন্ত শান্ত হলো এবং ততক্ষণে কো-অর্ডিনেটর প্রফেসর গ্রিমশও জানালেন সময় শেষ। ঠিক যেন- আমি কোন হিন্দি ছবিতে অভিনয় করছি যেখানে আমাকে একটা হাতল-ওয়ালা কাঠের চেয়ারের সাথে নাইলনের রশি দিয়ে টাইট করে বেঁধে ভিলেইন গুলশান গ্রোভার বিভিন্ন ভাবে মারধোর করছে আর জিজ্ঞাসা করছে- 'বল ব্যাটা, কোথায় আছে ‘ক্যাশ’, কী করেছিস তুই ‘রেজিস্টার’, কোথায় লুকিয়ে রেখেছিস ‘কাউন্টার’- বল, বল।' আমি অসহায়ের মত মার খেয়ে যাচ্ছি কিন্তু তাও এসবের হদিস দিচ্ছিনা। শেষপর্যন্ত সিনেমার ডিরেক্টর গ্রিমশ ‘কাট, এক্সেলেন্ট শট’ বলার পর আমাদের যুদ্ধ থামলো।

এরপর থিওরি। প্রশ্নকর্তা ওয়েসলি উইমার। তার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সে প্রায় সাইরেনের স্পীডে ইংরেজিতে কথা বলে, যার শতকরা ষাট ভাগ কথা আমি বুঝিনা। ক্লাসে সে সবসময় চকলেটের প্যাকেট নিয়ে আসে। ছাত্র-ছাত্রীরা ক্লাসে যে কোন প্রশ্ন করলেই তাকে সে চকলেট ছুঁড়ে মারে। ফিগার সচেতন ছাত্রীদের জন্য আবার থাকে সুগার-ফ্রী চকলেট। ক্লাসকে ইন্টারএ্যাকটিভ করার এটা দারুণ একটা পদ্ধতি। কিন্তু আজকে তার কাছে কোন চকলেট নেই। আজকে সে চকলেটের বদলে বোমা নিয়ে এসেছে বলে আমার ধারণা। একটার পর একটা বোমা মারবে যতক্ষণ না আমি আত্মসমর্পণ করছি। আমি ডানহাতে মার্কার পেন শক্ত করে চেপে ধরে ডিফেন্সের জন্য প্রস্তুত। মনে মনে একবার অ্যালগোরিদম বইয়ের পাতাগুলো মনে করার চেষ্টা করলেম। দেখলাম পৃষ্ঠাগুলো মাথায় ঠিক ঠাক আছে। কোরম্যানের অ্যালগোরিদম বই বুয়েটে ঢোকার পর থেকে অসংখ্যবার পড়তে পড়তে ও পড়াতে পড়াতে ঝালা ঝালা হয়ে গেছে। দীর্ঘক্ষণ ধরে ভাইভা রুমে কথাবার্তার ওপর আছি বলে শুরুর দিকের আঢ়ষ্টতাও কেটে গেছে। আমি অপেক্ষায় আছি ওয়েসলির বেস্ট শটের। খুব মন দিয়ে প্রশ্ন শুনতে হবে। প্রশ্ন শুনে বুঝতে পারার পার্টটাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সে আমাকে জিজ্ঞাসা করলঃ 'পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন অর্ডারের পাঁচটি অ্যালগোরিদমের নাম বল দেখি'। প্রশ্ন শুনে মনে মনে আমার মুখ বিস্তৃত হাসি- মামা, এটা তোমার বেস্ট শট? এই প্রশ্ন আমাকে না করে বুয়েটে আমার ওয়ান-ওয়ানের ক্লাসের ছাত্রদের করলেও দেখা যাবে চার-পাঁচটা আঁতেল ছাত্র হাত উঠিয়েছে, আর এই প্রশ্ন আমাকে করছ পিএইচডির ভাইভায়! তারপরও আমি মাথা ঠান্ডা রাখলাম। কেননা ১৯৯৯ সালের ক্রিকেট ওয়ার্ল্ডকাপে হার্সাল গীবস ঠিক এমনই আনন্দের আতিশয্যে স্টিভ ওয়াহর সহজ ক্যাচটি ফেলে দেয়াতেই ক্রিকেটের ইতিহাসটা পালটে যায়। আমি কোয়ালের ইতিহাস পাল্টাতে আগ্রহী নই বিধায় ঠান্ডা মাথায় অতি সহজ পাঁচটা অ্যালগোরিদমের নাম বোর্ডে লিখলাম। সবচেয়ে সহজ কিছু উদাহরণ বেছে নেয়ায় ওয়েসলি বুঝলো তার প্রশ্নকে আমি সামান্য কটাক্ষ করেছি। বুঝতে পেরে সরাসরি সে কম্পিউটেশনাল কমপ্লেক্সিটি, এন-পি কমপ্লিটনেস এসব কিম্ভুতকিমাকার তত্ত্ব থেকে একের পর এক বোমা বর্ষণ করতে লাগল। বেশ খানেক বছর আগে বুয়েটের সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্র থাকাকালীন পড়া জ্ঞানের সাথে বিগত কয়েক দিনের হাল্কা রিভিশন মেলানো সম্বল দিয়েই অনেকক্ষণ লড়াই করলাম। তবে আশ্চর্যের সাথে লক্ষ্য করলাম যে, পাঁচ-ছয় বছর আগে শ্রদ্ধেয় কাসেম স্যারের প্রচন্ড কড়া গ্রেডিংয়ের ভয়ে শেখা থিওরির জ্ঞান গুলোই শুধু এখন মনে পড়ছে। গত কয়দিনে বই-পুস্তক-উইকিপিডিয়া ঘেঁটে যা শেখার চেষ্টা করেছি তার কিছুই এখন মাথায় নেই। ভাবতেই ভয় লাগছে যদি ওই সময়ে স্যারের ভয়ে কিছুই না শিখতাম তবে আজ আমার কী হতো! বুয়েটের স্যারদের যতই ভাল-মন্দ বলি না কেন, তারা যদি এভাবে প্রেসার না দিতেন হয়ত কিছুই শেখা হতোনা।

টানা চল্লিশ মিনিট ভাইভা দিয়ে আমি ক্লান্ত। কথা বলতে বলতে কেমন যেন একটা ফ্লোয়ের মত তৈরি হয়েছে যেটা ভালো না মন্দ বোঝা যাচ্ছে না। ওরা যা যা জিজ্ঞাসা করছে সেটা নিয়ে যা কিছু মনে পড়ছে সেটাই বলে দিচ্ছি। ঠিক-ভুল কিছুই কেয়ার করছি না। উদাহরণ স্বরূপ, প্রফেসর গ্রিমশ এখন যদি আমাকে 'আখরোট ফল কী?' এটা জিজ্ঞাসা করে, তবে এই মুহুর্তে আমার শুধু মনে পড়বে শাহরুখ খানের 'বাদশা' মুভির কথা কেননা এই ফল ওই মুভি ছাড়া আমি আমার লাইফে কখনও চোখে দেখিনি এবং মনে পড়ছে ওই মুভিতে এটার একটি বিশেষ ভূমিকার কথা। আমি বলব, 'আখরোট একটি বিচিত্র ফল যেটাকে খাওয়ার আগে যে কোন একটি আয়নার দিকে তাক করে, কায়দা করে ঢিল মারতে হয় এবং এতে আয়না ভাংতেও পারে আবার নাও পারে। ভাঙ্গাভাঙ্গির বিষয়টা পুরোটা নির্ভর করছে নিক্ষেপকারীর হৃদয়ের অবস্থার ওপর। এই রুমে একমাত্র আপনার চশমাটা আমার কাছে কাঁচের মনে হচ্ছে। আপনার কাছে কোন আখরোট ফল থাকলে আমাকে দয়া করে এনে দেবেন কী, আমি আমার হৃদয়ের অবস্থাটা একবার একটু পরীক্ষা করে দেখতে খুবই আগ্রহী। প্লিজ।' বাস্তবে গ্রিমশ আখরোট ফল কী জিজ্ঞাসা না করলেও প্রশ্ন করল রিমোট প্রসিডিউর কল ও তার খুঁটিনাটি নিয়ে। আমি বুঝলাম না অপারেটিং সিস্টেমস-এ এত্ত কিছু থাকতে এই ভদ্রলোক কেন এই জিনিস আমাকে জিজ্ঞাসা করল। আমি আমার মাথার অদৃশ্য সার্চ বাটনে ক্লিক করে যা যা পেলাম তা-ই বললাম। ভদ্রলোক আমার জ্ঞানে মুগ্ধ হয়ে অপারেটিং সিস্টেম থেকে যাত্রা শুরু করে কিভাবে কিভাবে কথা বলতে বলতে নেটওয়ার্কিং এ চলে গেল। তারপরও তার জানার আগ্রহ শেষ হয়না। আমি ত্যক্ত, বিরক্ত, ক্ষুধার্ত, আর্ত হওয়া সত্ত্বেও তার জ্ঞান পিপাসা মেটানোর কাজে নিজেকে বাধ্য হয়ে নিয়োজিত রাখলাম।

পঞ্চাশ মিনিটের ভাইভা পঞ্চাশ মিনিটেই শেষ হলো। ভালো হয়েছে না খারাপ হয়েছে সেটা চিন্তা করতে আর ইচ্ছা করছিল না। ভাইভা শেষে দুটো গুরুত্বপূ্ণ বিষয় আবিষ্কার করলাম। (এক) আমার সদ্য সেভ করা দাড়ি অজ্ঞাত কারণে আবার গজিয়ে বেশ খানিকটা বড় হয়ে গেছে, এবং (দুই) ওলসন হল থেকে বেরিয়ে দেখি ঝির ঝির বৃষ্টি। মনে হলো, বাহ, এটাই তো দরকার ছিল আজকে। আজকে এই বৃষ্টিতেই হাটতে হাটতে বাড়ি যাব।

------------------------------------------------------------------------------

সাত দিন পরের ঘটনাঃ চিৎকার করে গান গাইতে গাইতে বাথরুমে গোসল করছি। হঠাৎ শুনি এনামুল আরো জোরে চিৎকার করছে, বাথরুমের দরজায় ধাক্কাধাক্কি করছে আর বলছে- ‘নির্জন ভাই, আমরা পাশ করছি, আমরা পাশ’। আর্কিমেডিস নই আমি। তাই পুরো গোসল শেষ করেই বেরোলাম। জানলাম ভাইভায় সব লেভেল মিলিয়ে অনেকেই পাশ করেছে এবার। অবশ্য প্রথম বর্ষের পঁচিশজন গ্র্যাড-স্টুডেন্টদের মধ্যে মাত্র তিনজন এ যাত্রায় পাশ করতে পেরেছে। এ তিনজনের মধ্যে আবার দুইজন বাংলাদেশি! তনিমা বাংলাদেশে বেড়াতে না গিয়ে থাকলে আর মুনির পেপার সাবমিশন নিয়ে ব্যস্ত না থাকলে এই সংখ্যা ‘পাঁচ জনের মধ্যে চারজন’ এমনটা হতে পারতো।

ফলোআপঃ

(১) তারপরও ডিপার্টমেন্টে আমাদের এখন রমরমা অবস্থা। ছাত্র-প্রফেসরদের সবারই বাংলাদেশ নিয়ে বিস্ময়। এরা দেশটার নামই জানতনা কিছুদিন আগেও। এখন নাম মুখে নিতে নিতে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। কিছুটা বিপদও হয়েছে এ জন্য। প্রফেসরদের এক্সপেক্টেশন অনেক বেড়ে গেছে। এসব পূরণ করতে হলে মহাসমস্যা। আমার ক্ষীণ বিশ্বাসঃ আওয়ামীলীগ কিংবা বিএনপির কোন পলাতক ছাত্রনেতা আজকে যদি ইউভিএর কম্পিউটার সায়েন্স ডিপার্টমেন্টে এসে বলে, ভাই আমি বাংলাদেশ থেকে ভিজিটে এসছি- আমার ধারণা বেশ কিছু প্রফেসর তাকে ডেকে-ধরে রুমে বসিয়ে ঘটা করে নিজস্ব রিসার্চের বিষয়ে আলোচনা দেবে। বর্ষীয়ান কেউ হলে অনারারি ডক্টরেট ডিগ্রীও দিয়ে দেয়া হতে পারে।

(২) কোয়ালিফায়ার পাশ করাতে আমার বেতন মাসে ১০০ ডলার বেড়েছে। একশ ডলার বেতন বাড়ার খুশিতে মাসে প্রায় তিনশ ডলার খরচ বেড়ে গেছে। যেমনঃ বড় দেখে নিজস্ব এ্যাপার্টমেন্ট নিয়েছি যেটাতে ভাড়া বেড়েছে একশ, একটা গাড়িও কিনে ফেলেছি যেটাতে ইন্সুরেন্স আর তেল মিলিয়ে খরচ বাড়লো একশ, ঘরে এখন ক্যাবল লাইন সহ পার্সোনাল টিভি আছে যেটা অবশ্য অ্যাপার্টমেন্টের সাথে ফ্রী, নতুন হাচ দেয়া একটা সুন্দর ডেস্ক, বুক সেলফ কিনেছি, শুধু বাথরুমের পাপশ আর পর্দা কিনতে গেছে আরো একশ, একটা ম্যাকবুক আর একটা আইফোনও নেব নেব ভাবছি। পিএইচডি কোয়ালিফাই বলে কথা!

(৩) আগের লেখায় হ্যাংচ্যাং এর কথা বলেছিলাম। হ্যাংচ্যাং এবারও পিএইচডি কোয়ালিফাই করতে পারেনি। তবে সে এটা নিয়ে মোটেও চিন্তিত নয়। ইউভিএ থেকে তাকে বের করে দেওয়া হবে এটাতে তাকে মনে হলো বেশ খুশি। আজকাল সে মাইক্রোসফট-গুগোলে ম্যারাথন ইন্টারভ্যূ দিয়ে বেড়াচ্ছে। অবশ্য কোয়ালিফায়ার এক্সামে ছাত্র-ছাত্রীদের ভোগান্তির কথা চিন্তা করে ডিপার্টমেন্ট কোয়ালিফায়ার এক্সাম পদ্ধতিকে পাল্টানোর ঘোষণা দিয়েছে। নতুন পদ্ধতি চালু হলে পাসের হার ব্যাপকভাবে বাড়বে বলে আশা করা যাচ্ছে। হ্যাংচ্যাং হয়ত নতুন পদ্ধতিতে সুইচ করে ফেলবে খুব শিগ্রী। (শেষ)

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/29136706 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/29136706 2010-04-17 19:37:47
আর মাত্র পঞ্চাশ মিনিট বাকি

ডিপার্টমেন্ট থেকে বাড়ি ফেরার পথটা বেশ নির্জন। ধীরে হাঁটলেও মিনিট পনেরর মত লাগে বাড়ি পৌঁছাতে। হাঁটতে হাঁটতে নিবিষ্ট মনে জীবনঘনিষ্ঠ অনেক কিছু চিন্তা করা যায় এসময়। যেমনঃ ‘বাড়ি গিয়ে কী খাব?’, ‘বাসন মাজার ডেট কি আমার?’ ‘কতদিন ধরে না ধুয়েই একি কাপড়ে চলছে?’ এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে শুরু করে ‘সামনে ক’টা পরীক্ষা?’, ‘কত বড় সিলেবাস?’, ‘পিএইচডি করে আদৌ কী লাভ?’ এধরণের তুচ্ছ বিষয়াদি নিয়ে নিজের সাথে গভীর আলোচনার সুযোগ পাওয়া যায় এসময়। আজকে কেন যেন এসবের কোন কিছুই মাথায় আসছেনা। বার বার বরং মনে হচ্ছে আমি এখনো কনফারেন্স রুমের হোয়াইট বোর্ডের সামনে কালো মার্কার পেন নিয়ে অসহায়ের মত দাঁড়িয়ে আছি আর আমার সামনের টেবিলে প্রফেসর ম্যারিলুসোফা, প্রফেসর উইমার, প্রফেসর গ্রিমশ আর প্রফেসর গুরুমূর্তি রুক্ষমূর্তি হয়ে বসে আছেন। সদ্য বিগত পঞ্চাশ মিনিটের পিএইচডি কোয়ালিফায়ার ভাইভায় এরা চারজন মিলে আমাকে যার পর নাই ধুয়ে ফেলেছে। তাদের জ্ঞানগর্ভ প্রশ্নের উত্তরে আধাভাঙ্গা ইংরেজি আর হাত-পায়ের বিচিত্র অংগভঙ্গি দিয়ে নানা কৌশলে যা পারি তা বোঝানোর চেষ্টা করেছি। তবুও মনে হচ্ছে, ওরালটা কি আদৌ পাশ হবে?

রাস্তা এখন ডানে বাঁক নেবে। এরপর মিনিট পাঁচেকের মত পাহাড়ের ঢাল বেয়ে সোজা নামতে হবে। পথ থেকে মন সরিয়ে নিয়ে নিরপেক্ষভাবে আজকের পুরো ঘটনাটা এখনই বিশ্লেষণ করা দরকার। যত দেরি করব ততই দ্রুত সবকিছু ভুলে যাব আর এবার যদি সত্যিই ফেইল করি তবে এই মূহুর্তের পর্যালোচনা পরবর্তিতে বেশ কাজে আসবে। চিন্তা শুরু করলাম প্রিপারেশনে কি কি কমতি ছিল সেটা থেকে।

প্রথম কমতি হলো ‘সময়’। রিটেনে ফেল করব ধরে নিয়ে ওরালের জন্য আগে থেকে কোন প্রিপারেশন নিইনি। আবার যখন জানতে পারলাম রিটেনে পাশ করেছি তখন আর ওরালের প্রিপারেশন নেবার কোন সময় ছিলনা। তারপরও আমার অ্যাডভাইজার শ্রদ্ধেয় প্রফেসর স্ট্যানকোভিকের উৎসাহে ভাইভা দিতে রাজি হয়ে গেলাম। তার উপদেশ ছিল, ভাইভা দিতে তো কোন দোষ নেই, এক্সপেরিয়েন্স কাউন্টস। সে বলেছিল, আমি বিশ্বাস করি তুমি পাশ করবে। আমি মনে মনে বলেছিলাম, মামা, তুমি বিশ্বাস করলে তো হবেনা, কোন জনমে কি কি সব বুঝে-না বুঝে পড়েছিলাম এসব জিনিস এখন কি করে মনে করব? সে অবশ্য আমাকে পার্সোনাল ইউকলি মিটিংয়ে ভাইভা দেয়ার বেশ কিছু টেকনিক শিখিয়ে দিয়েছিল। দু-একটা টেকনিক পয়েন্ট আকারে এখনো মনে আছেঃ (১) ভাইভায় কিছু না পারলে সরাসরি ‘পারিনা’ বলা যাবেনা। দরকার পড়লে মার্কার পেন দিয়ে বোর্ডে প্রশ্নটাই ছবি এঁকে এক্সপ্লেইন করতে হবে। তারপর ছবিটা দেখিয়ে এ বিষয়ে যদি অন্য কোন কিছুও জানা থাকে তবে সেটা বলা শুরু করতে হবে। এরপর এক সময় স্বীকার করে নিতে হবে যে, আমি পারছি না। (২) ভুল কোন কিছু বলা যাবেনা। যদি নিজের অজান্তে কোন প্রশ্নের উত্তরে ভুল কিছু বলে ফেলার পর পরবর্তিতে বুঝতে পারি যে আমি ভুল বলেছি, তবে সাথে সাথে সেটা স্বীকার করে নিতে হবে। এটাতে নাকি ভাইভা বোর্ড বুঝতে পারে যে ছেলেটা চিন্তা করতে সক্ষম। (৩) সবসময় উদাহরণ দিয়ে এক্সপ্লেইন করতে হবে। উদাহরণ হতে হবে সহজ এবং যেটা আমার নাগালের মধ্যে। ভাইভা বোর্ড সবসময় সম্পূরক প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত থাকে। তাই আগাগোড়া জানা আছে এধরণের সহজ উদাহরণ না হলে নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনার সম্ভাবনা আছে। এসবের সাথে সাথে সে বইপুস্তক পড়ার পাশাপাশি প্রাকটিস ভাইভার (মক ভাইভা) কথা বলল। ডিপার্টমেন্টে নাকি সিনিয়র ছাত্রদের উদ্যোগে মক ভাইভার সেশন হয়। সে আমাকে তার অন্যতম প্রিয় ছাত্র ও বেশ কয়েকবার ভাইভায় ফেল করা ‘হ্যাংচ্যাং’ এর সাথে কথা বলার পরামর্শ দিল। হ্যাংচ্যাং চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। তার জন্য এবারই ভাইভায় পাস করার শেষ সুযোগ। এবার ফেল করলে তাকে ইউনিভার্সিটি থেকে বের করে দেয়া হবে। জানলাম, সে নাকি এ সেমিস্টারে কোন কোর্সওয়ার্ক বা রিসার্চওয়ার্ক নেয়নি ওরালের প্রিপারেশন নেবার জন্য।

স্যান্ডেল খুলে হাতে নিয়েছি। খালিপায়ে হাঁটা শুরু হয়েছে। বৃষ্টিটাও মনে হলো কমে এসেছে। পেছন থেকে একটা মেয়ে খুব দ্রুত জগিং করতে করতে আমাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। এ্যাথলেটিক পোষাক পরে ঢালু ফুটপাতে মেয়েটার দ্রুত ও ছন্দময় জগিং দেখে মনে হলো যেন ম্যারাথন দিচ্ছে। আমেরিকার পথে ঘাটে এই দৃশ্য খুবই কমন। দিন-রাত চব্বিশ ঘন্টাই এরা মর্নিংওয়াক করে। একে দেখে থিওরীর প্রফেসর গেইব রবিন্সের একটা কথা মনে পড়ল। গেইব একবার ক্লাসে বলেছিল, হুট করে কেউ ম্যারাথন রেস জিততে পারেনা, এর জন্য দিনের পর দিন প্রাকটিস করতে হয়। ভাইভাটাও নাকি সেরকম বিষয়। এনসাইক্লোপিডিয়া পুরোটা মুখস্থ থাকলেও ভাইভার সময় হাত-পাঁ কাঁপাকাঁপি করবেনা এরকম মানুষ নেই। সেই তুলনায় আমার প্রিপারেশন ছিল আজকে শূন্যের কোঠায়। খুব বেশি হলে পাঁচদিন সময় হাতে পেয়েছিলাম। ভাইভা দেব কি দেবনা এটা ঠিক করতেই প্রথম দুদিন চলে যায়। বই-পুস্তক দেখেই মাথা ঘোরা শুরু করে। হতাশ হয়ে একপর্যায়ে ঠিক করি যে, কিচ্ছু পড়াশোনা করব না। প্রথমবার ভাইভায় ফেইল করতে আপত্তি নাই। আরো দুবছর তো চান্স আছেই। এসব ভাবতে ভাবতে একদিন বিকেলে কফি হাতে এ্যাপার্টমেন্টের লিভিং রুমের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি। কোত্থেকে এনামুল এসে অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকেই বলল, ‘ভাইয়া, এটা জানেন নাকি- কোয়াল পাস করলে যে বেতন বাড়ে?’ আমি এরকম একটা কথা আগে কোথায় যেন শুনেছিলাম। ওর কথা শুনে তাৎক্ষণিক ইউনিভার্সিটির ওয়েবসাইট ঘেটে আবিষ্কার করলাম কথা সত্য। কোয়ালিফায়ার পাস করতে না পারলে কি হবে এটা নিয়ে ছাত্ররা এত শঙ্কিত থাকে যে এটা পাস করলে যে কোন প্রাপ্তি থাকতে পারে কেউ অতটা তলিয়ে দেখেনা। ওয়েবসাইট ঘেটে জানলাম, পাস করতে পারলে প্রতি মাসে ১০০ ডলার বেতন বাড়বে। আল্লাহর দয়ায় থাকা খাওয়ার খরচের তুলনায় ভার্জিনিয়ার স্কলারশিপের পরিমাণ কম নয়। তারপরও আমার মত গ্রাজুয়েট স্টুডেন্টের কাছে শ’ডলার বেতন বাড়ার হাতছানিটা বেশ লোভনীয়। প্রথমবারের মত মনে হলো, কঠিন একটা ট্রাই দিতে হবে মনে হচ্ছে।

সিলেবাস বলতে গেলে সম্পূর্ণ ওপেন। পাঁচ সাবজেক্ট থেকে প্রশ্ন করবে বলা হলেও এসবের কোন গ্যারান্টি নেই। ক্যান্ডিডেটকে কম্পিউটার বিজ্ঞানের সবকিছুই জানতে হবে। তিনদিন এত্ত এত্ত সাবজেক্টের বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতেই চলে যাবে, তাই কী পদ্ধতিতে রিভিশান দেয়া যায় বুদ্ধি বের করা শুরু করলাম। অনুমান করে বের করলাম ‘আটলান্টার কোক পদ্ধতি’ এক্ষেত্রে কাজে দিতে পারে। কম সময়ে অনেক কাজ করার জন্য এটা আমার আবিষ্কৃত এক পদ্ধতি। পদ্ধতির উৎপত্তিস্থল হচ্ছে জর্জিয়ার আটলান্টা শহর, সেজন্যই এই নামকরণ। আমেরিকার শত শত বড় বড় শহরের মাঝে যেসব শহর একটু বেশি বড়, আটলান্টা তাদের একটি। রিসার্চের প্রয়োজনে আমাকে একবার আটলান্টার জর্জিয়াটেক ইউনিভার্সিটিতে যেতে হয়। গ্রাম থেকে ঢাকায় আসলে সবাই যেমন মিরপুরের চিড়িয়াখানাটা দেখেই যায়, আটলান্টায় আসলেও তেমনি বিশ্ববিখ্যাত কোকাকোলা কম্পানির বিল্ডিংটায় একবার সবাই ঢু-মারেই। আমিও তিরিশ ডলারের টিকিট কেটে বোকার মত ঢুকে পড়লাম। কোকাকোলা বিল্ডিংটি সত্যিকার অর্থেই এক আজব জায়গা। পুরো বিল্ডিংটাকে এরা মিউজিয়াম বানিয়ে রেখেছে। ভেতরে ঢুকলে চোখে পড়ে সাদা পোলার বেয়ারের নাচানাচি, শত বছর আগের কোকাকোলার ইতিহাস, কোকাকোলার বোতলের বিবর্তনের কাহিনী, মিনি কোকাকোলা ফ্যাক্টরি, বিশ্বের সব দেশের কোকাকোলার অ্যাড ও মডেলদের ছবি ও ভিডিও, কোক নিয়ে ফোর-ডি এ্যানিমেশন মুভি ইত্যাদি। এসবের মধ্যে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হচ্ছে ৮৮টি ভিন্ন স্বাদের কোকাকোলা ফ্রী-তে চেখে দেখার সুযোগ। কোক-স্প্রাইটের যে এত ভার্সন আছে এটায় আমি বেশ অবাক হলাম। পণ করলাম আজকে এই সবগুলো স্বাদের কোক আমি খেয়েই তারপর যাব। তিরিশ ডলার দিয়ে টিকিট কেটেছি, কম পক্ষে তিরিশ বোতল কোক তো খেতেই হবে আমাকে। বিভিন্ন মহাদেশের জন্য আলাদা আলাদা সেকশানে আলাদা আলাদা কোকের ট্যাঙ্কি রাখা আছে। আমি ইউরোপের দিকে গেলাম। খোদ ইউরোপেই কোক-স্প্রাইট মিলিয়ে এক ডজনের মত ফ্লেভার। দুটি ফ্লেভারের দু-গ্লাস কোক খাবার পর তৃতীয় গ্লাসে চুমুক দিতে গিয়ে বুঝলাম আর তো পারছিনা। এখনও আশির ওপর ফ্লেভার বাকি। ঠিক তখনই মাথায় বুদ্ধিটা আসলো। একটা গ্লাস নিয়ে সেটাতেই সব ফ্লেভারের কোক অল্প অল্প করে নিতে থাকলাম। এভাবে করে সব গুলো ফ্লেভার মিলে এক গ্লাসের মত হলো। তারপর এক ঢোকে পুরোটা খেয়ে নিলাম। ব্যস, এখন শান্তি। খেতে খুব একটা ভালো না লাগলেও, দুনিয়ার সবরকম কোক এখন আমার পেটে আছে, এটা ভেবেই শান্তি। কোয়ালের ভাইভার প্রিপারেশানও এই একই ভাবে নিতে হবে। সবগুলো বইয়ের সবগুলো চ্যাপ্টারের ভেতরে বোল্ড অক্ষরে যত সংজ্ঞা আছে আর যত ডায়াগ্রাম টাইপ জিনিস আছে সেগুলো পড়া শুরু করলাম। টানা তিনদিন একাজ করার পর যখন নিজেকে একটু জ্ঞানী জ্ঞানী লাগতে শুরু করলো, তখন বুঝলাম ভাইভার আর মাত্র এক ঘন্টা বাকি।

(বাকি রইলঃ ভাইভা রুমের ঘটনাবলী আর কিছু ব্লুপারস)


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/29053046 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/29053046 2009-12-03 20:26:46
পঁচিশ ঘন্টা পঞ্চাশ মিনিট
থিওরি পরীক্ষা শেষে মনে হলো কোনমতে উৎরে গেছি। বেশিরভাগ প্রশ্নই বইয়ের বাইরে হলেও প্রশ্নগুলো বেশ মজার ছিল। যেমন, একটা প্রশ্ন ছিল, দুটো ট্রেন আর একটা পাখি নিয়ে। ট্রেন দুটো একে অন্যের দিকে ছুটে আসছে, আর পাখিটা তাদের মাঝে ছুটোছুটি করছে। এখন প্রশ্ন হলো, ট্রেনদুটো সংঘর্ষের সময় পাখিটা কতটুকু দূরত্ব উড়বে? খুবই সহজ অঙ্ক। ক্লাস ফাইভের একটা বাচ্চারও এটা পারার কথা। কিন্তু আমি পড়ে গেলাম চিন্তায়। এত সহজ অঙ্ক পিএইচডি কোয়ালিফায়ারে আসতে পারেনা এটা ভেবে প্রশ্নের প্রতিটি বাক্য বার বার পড়তে লাগলাম। শেষমেশ যতভাবে এটাকে সমাধান করা সম্ভব সবরকম ভাবে করে দিয়ে আসলাম অঙ্কটা। পরীক্ষা শেষে বেরিয়ে শুনতে পাই কমবেশি সবাই প্রশ্নটায় অবাক হয়েছে। মুনির বলল, সে রিকারসিভ ফর্মুলা বের করে একটা সি-প্রোগ্রামও লিখে দিয়ে এসেছে! এনামুল আরও সুন্দর কাজ করেছে। সে দু-তিন পৃষ্ঠা জুড়ে ট্রেন, পাখি, ইত্যাদি এঁকে প্রতি মুহূর্তে কে কতটুকু যাচ্ছে এভাবে করে উত্তর বের করেছে। আবার অনেকে শুনলাম, কনফিউজড হয়ে অঙ্কটা করেইনি! আমি হয়ত ব্যাপারটা বোঝাতে পারছিনা সবাই কেন এমন বিচিত্র বিচিত্র কাজ করেছে। ব্যাপারটা বোঝার জন্য একটা থট এক্সপেরিমেন্ট করা যেতে পারে। যেমনঃ বুয়েটের টার্ম ফাইনাল পরীক্ষায় যদি পুরো পঁয়ত্রিশ মার্কের একটা প্রশ্ন দেয়া হয়ঃ ২ + ২ = কত? তবে আমার ধারণা, শতকরা একশভাগ ছাত্র-ছাত্রী এটাতে কনফিউজড হয়ে একই রকম বিচিত্র বিচিত্র কাজ করবে। কিছু ছাত্র হয়ত সঠিক উত্তর হিসেবে ২+২=৪ লিখবে। কিন্তু তারপরও পুরো পরীক্ষা জুড়ে বিষয়টা তাকে বিব্রত করবে এবং সে অন্য প্রশ্নোত্তর রেখে বার বার এটার দিকে তাকাবে ও অনেক সময় নষ্ট করবে। হয়ত আমাদের ক্ষেত্রেও প্রফেসর আভিশেলাত এই মজাটাই করেছেন। সত্যি বলতে কি, আমি বাসায় ফিরেও এটা নিয়ে বেশ সময় নষ্ট করেছি এবং শেষমেষ ইন্টারনেট ঘেঁটে আবিষ্কার করেছি প্রশ্নটা মাইক্রোসফটের ইন্টারভ্যূতে একবার ক্যান্ডিডেটদেরকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল শুধুই তাদেরকে ভড়কে দেয়ার জন্য। আমার হাইপোথিসিস যে, আভিশেলাত ওই ইন্টারভ্যুতে ফেল মেরে বিষয়টা এখন আমাদের ওপর অ্যাপ্লাই করছে।

আরেকটা মজার প্রশ্নের কথা না বললে মনটা খচ খচ করছে। এটা পাঠকদের জন্য একটা ধাঁধাঁ বলা যেতে পারে। প্রশ্নটা হচ্ছে দুটো কম্পিউটার প্রোগ্রাম নিয়ে। সাধারণ দুটো প্রোগ্রাম- কোন ইনপুট আউটপুট নেই। শুধু একটাই ব্যাপার যে প্রোগ্রাম দুটোর একটা কম্পিউটেশন শেষে থামে (হল্ট করে), আর আরেকটা কখনই থামেনা (হল্ট করেনা); এখন আপনাকে একটা পদ্ধতি (অ্যালগোরিদম) বলতে হবে যেটা দিয়ে সবসময়ই ডিটেক্ট করা যাবে কোন প্রোগ্রামটি থামে আর কোনটি থামেনা, অথবা প্রমাণ করতে হবে যে এধরনের কোন অ্যালগোরিদম থাকা সম্ভব নয়। আমার খচ খচ ভাবটা এখন পাঠকের মনের ভেতর ঢুকিয়ে বেশ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছি। বাকি পরীক্ষাগুলোর দিকে এখন একটু নজর দেয়া যায়।

সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং পরীক্ষায় হাতে উল্কি আঁকা আমেরিকান কৃষ্ণাঙ্গ জেসন এসেছে পরীক্ষা দিতে। তার বোধহয় এই একটা পরীক্ষাই বাকি। এই পরীক্ষার সিলেবাস এত বেশি বড় যে ছাত্ররা সাহসই পায়না এই পরীক্ষায় বসতে। একটা ছোট্ট রুমে ডাইনিং টেবিলের সাইজের একটা টেবিলে গোল করে আমরা জনা দশেক পরীক্ষার্থি বসেছি। আমার ঠিক বাম পাশেই জেসন। ছেলেটার বৈশিষ্ট্য, সে তার প্রতিটি কথার শেষেই অদ্ভূত একটা অট্টহাসি জুড়ে দেয়। এনামুলের ভাষ্যমতে, মন খারাপ থাকলে এই ছেলেটার সাথে পাঁচ মিনিট কথা বলা উচিত। ওর অট্টহাসিতে নাকি যে কারো মন ভালো হয়ে যাবে। সেদিন আমারও টেনশনে মনটন ভালো নেই। খামাখা পাঁচ ঘন্টা সময় নষ্ট করার জন্য পরীক্ষা দিতে এসেছি। ফার্স্ট ইয়ারের বোধহয় শুধু আমিই গেছি পরীক্ষা দিতে। আমাকে দেখে জেসন আমার সাহসের বেশ প্রশংসা করল এবং একই সাথে পাস করতে পারবনা বলে আগাম সমবেদনাও জানাতে লাগলো। প্রশ্নপত্র দেখে আমার মধ্যেও সে ধারণা বদ্ধমূল হলো। খাতা-কলম গুটিয়ে উঠে যাওয়াটা ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারছিলাম না। দামি কোন রেস্টুরেন্টে প্রথমবারের মত ঢুকে খাবারের মেন্যুতে দাম দেখে যে অনুভূতিটা হয়, আমার সেটা হতে লাগলো। এসব ক্ষেত্রে বেরিয়ে আসার সময় রেস্টুরেন্টের বেয়ারারা যে একটা হাল্কা হাসি উপহার দেয়, সেটা হজম করা খুবই কষ্টকর। এখন পরীক্ষা ছেড়ে উঠে গেলে সবাই আমার দিকে রেস্টুরেন্টের বেয়ারার মত তাকিয়ে মুচকি হাসি দেবে। এই ভয়ে আমি আর উঠতে পারলাম না। নিরুপায় হয়ে গোড়া থেকে প্রশ্নগুলো পড়তে লাগলাম। প্রথম প্রশ্নে লেখা- ‘ব্রুকসের মতে কন্সেপচুয়াল ইন্টিগ্রিটি একটি গুরূত্বপূর্ণ বিষয়, কিন্তু আজকের ওপেন সোর্সের যুগে এই ব্যাপারটি কী করে সম্ভব ...’- এধরনের একটি প্রশ্ন। বিড় বিড় করে চিন্তা করতে লাগলাম, কন্সেপচুয়াল ইন্টিগ্রিটি তো পরের জিনিস, এই ব্রুকস ব্যক্তিটা যে কে ছিল সেটাই মাথায় আসছে না। আমার কথা জেসন শুনে ফেলেছে। শোনামাত্রই সে হো হো করে হাসতে হাসতে সবাইকে জানাতে লাগলো, ব্রুকসকে চেনেনা এরকম একজন এসেছে আজকে পরীক্ষার হলে। আমাকে সে এক প্যাকেট বিস্কিট এগিয়ে দিয়ে বলল, এটা খেতে থাক, পরীক্ষা শেষে বুঝিয়ে দেব ব্রুকস কে। বেয়ারার হাসির ভয়েই হোক, আর বিস্কিটের লোভেই হোক, টানা পাঁচ ঘন্টা দাঁতে দাঁত চেপে ইনিয়ে বিনিয়ে নানান প্রশ্নের উত্তর করব বলে মনস্থির করলাম। এটা হচ্ছে প্রশ্নকর্তার প্রতি আমার এক ধরনের প্রতিশোধ। সে যেমন বিভিন্ন খুঁটিনাটি প্রশ্ন করে আমাকে বিব্রত করার চেষ্টা করেছে, আমিও তেমনি ঝাপসা ঝাপসা আনসার করে তাকে দুশ্চিন্তার মধ্যে ফেলে দেয়ায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হলাম। পারি আর না পারি, যতক্ষণ কলমে কালি আছে ততক্ষণ কিছু না কিছু লিখতে থাকলাম। টানা চার ঘন্টা লেখার পর এক পর্যায়ে বুঝলাম হাত দিয়ে আর কলম ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছেনা। খাতার আকৃতি দেখলাম সেটা বেশ হৃষ্টপুষ্ট হয়েছে। আল্লাহর নাম নিয়ে হলুদ খামের ভেতর পৃষ্ঠাগুলো ভরে প্রফেসর ডেভিডসনের রুমের দিকে ছুটলাম। পূর্ব নির্দেশ অনুযায়ী তার রুমের দরজার নিচে দিয়ে খামটি ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে আশ্বস্ত হলাম, যাক, আরেকটা পরীক্ষা শেষ।

দেব কী দেব না, যাব কী যাব না, এরকম নানান টালবাহানা করতে করতে বাকি পরীক্ষা গুলোতেও উপস্থিত হলাম। সত্যি বলতে কি, প্রতিটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র এমন ছিল যে, বেশিরভাগ প্রশ্নের উত্তরেই কিছু না কিছু লেখা সম্ভব। হয়ত পুরোটা সঠিক হবেনা কিন্তু বেনিফিট অফ ডাউটের ভিত্তিতে কিছু নম্বর পাওয়া যাবে- এ ধারণাটা বদ্ধমূল হয়ে গেছে ততদিনে। এর সাথে সাথে কিছু টেকনিকও বের করে ফেলেছিলাম যা কিনা সব পরীক্ষাতেই কাজে লাগছিল। যেমন, প্রশ্নে যা-ই জানতে চাওয়া হোক না কেন, শুরুতেই প্রশ্নের ভেতরের বিভিন্ন কী-ওয়ার্ড গুলোর সংজ্ঞাসহ উদাহরণ দেয়া শুরু করতে হবে। ধরাযাক, প্রশ্নকর্তা জানতে চেয়েছে, ‘খেজুরের রস কী করে তৈরি হয়?’ এর উত্তরে প্রথমেই সুন্দর করে খেজুরের সংজ্ঞা দিতে হবে। এরপর প্রয়োজনে একছড়া খেজুর এঁকে লেবেলিং করে বিভিন্ন পার্টস দেখিয়ে দিয়ে হবে। তারপর ‘রস’ জিনিসটা কী সেটাকে এক্সপ্লেইন করতে হবে। ফাইনালি, সঠিক উত্তর যদি জানা না থাকে, তবে অন্য কোন ফলের রস কী করে তৈরি হয় সেটার আদলে পুরো প্রসিডিউরটা লিখে দিতে হবে। এই পদ্ধতি সম্পূর্ণ পরীক্ষিত। নেহায়েত কট্টর কোন শিক্ষক না হলে এই পদ্ধতিতে যে কোন প্রশ্নে শতকরা ষাট থেকে আশি ভাগ নম্বর পাওয়া সম্ভব। প্রোগ্রামিং ল্যাংগুয়েজ ও কম্পাইলার পরীক্ষায় এই ‘খেজুর পদ্ধতি’ আমার বেশ কাজে লেগেছিল। আমি বুয়েটের ছাত্র বিধায় কম্পিউটার সায়েন্সে আমার মাতৃভাষা হচ্ছে ‘সি’ প্রোগ্রামিং ল্যাংগুয়েজ। কিন্তু কোয়ালিফায়ার এক্সাম যে বইটির ওপর সেটাতে লেখক প্রায় শ’খানেক প্রোগ্রামিং ল্যাংগুয়েজ ব্যবহার করেছেন। এই পরীক্ষায় তাই যে প্রশ্নই আসুক না কেন আমি সবকিছুর আনসার করছিলাম সি এর জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে। উদাহরণ স্বরূপ, ‘মেমরি’ নিয়ে কোন একটা সমস্যার কথা প্রশ্ন করা হলে, আমি বসে বসে চিন্তা করে বের করতাম সি-প্রোগ্রামিংয়ে মেমরি নিয়ে কি কি ঘটে, ইত্যাদি। তারপর সেটার উপর ভিত্তি করে আন্দাজ করার চেষ্টা করতাম প্রশ্নে যেটার কথা জানতে চাওয়া হয়েছে তাতে জিনিসটা কেমন হতে পারে। এরপর একটা কিছু লিখলে দেখা যেত শতকরা আশিভাগ ক্ষেত্রে আন্দাজ সঠিক হয়েছে! এই পদ্ধতি কাজ করার মূল রহস্য হচ্ছে, সব প্রোগ্রামিং ল্যাংগুয়েজেরই ভেতরকার থিওরেটিক্যাল স্ট্রাকচার মূলতঃ একি। সবগুলোই ঘুরে ফিরে সেই আমাদের মত মানুষেরই তৈরি। … বৈচিত্র্যময় প্রকৃতির সবকিছুর মাঝের নিখুঁত মিল থেকেও কিন্তু এরকম কিছুর অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়। বুদ্ধিমান মানুষেরা সহজেই সেটা বুঝার কথা। মাথায় ঘিলু না থাকলে বোঝাটা একটু মুশকিলই বৈকি।

পরীক্ষার দিনগুলো বিভিষিকার মত আসলেও, সুন্দর কিছু স্মৃতি দিয়ে বিদেয় নিল। নতুন নতুন অনেকের সাথে এই পরীক্ষার দিনগুলোতে পরিচয় হলো। পাঁচ ঘন্টার পাঁচটি পরীক্ষায় প্রতিদিনই অনেক কিছু জানলাম ও শিখলাম। সবচেয়ে বড় অর্জন হলো নিজের জ্ঞান কতটা সীমিত এটা বুঝতে পারা। সব পরীক্ষাতেই কিছু না কিছু লিখে এসেছি। তারপরও পাশ হয়ত হবেনা। ঘাগু ঘাগু সব প্রফেসররা খাতার মূল্যায়ন করবে। প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর অন্তত তিনজন ফ্যাকাল্টি আলাদাভাবে মার্কিং করবে। তিনজনই পাশমার্ক দিলে একটা প্রশ্নে পাশ পাওয়া যাবে। এভাবে করে প্রতিটি বিষয়ের সবকটি প্রশ্নে আলাদা আলাদা পাশ করতে হবে। আমাদের অনেকেই দু-দফায় (ফল ও স্প্রিং সেমিস্টার) পাঁচটি পরীক্ষাই দিয়ে দিয়েছে। সবারই আশা, যদি একটা পরীক্ষাতেও পাশ হয় তবুও কম না। পরের বছর তাহলে সেটা নিয়ে আর চুল ছিড়তে হবেনা। রেজাল্টের দিন যতই এগোতে লাগলো আমার নিজেকে নিয়ে আশঙ্কা বাড়তে লাগল। জন্ম থেকে মাথার শোভা বর্ধনকারী শখের চুলগুলো বোধ হয় আর একটাও আস্ত থাকবে না আগামীবছর।

সপ্তাহ দুই পরের কথা। সেদিন শুক্রবার। কোয়ালিফায়ার এক্সামের রেজাল্ট দেয়া হবে। রুদ্ধদ্বার ফ্যাকাল্টি মিটিং চলছে। মিটিং শেষে প্রত্যেক স্টুডেন্টকে তার অ্যাডভাইজার পার্সোনালি রেজাল্ট জানাবে। অ্যাডভাইজাররা নিজেরাও টেনশনে আছেন। কেননা নিজের কোন স্টুডেন্ট ফেল করলে তাদের নিজেদেরকেও ফ্যাকাল্টি মিটিংয়ে ছাত্রের সপক্ষে বা বিপক্ষে জবাবদিহি করতে হয়। ছেলেপুলে পরীক্ষায় পাশ করলে বাবা-মা যেমন খুশি হয়, মিস্টি পাঠিয়ে পাশের বাসাগুলোতে সেটা স্বগর্বে জানান দিতে হয়- প্রফেসরদের মাঝেও এখানে একই রকম অবস্থা। কখন কি সংবাদ শুনব, সেটা নিয়ে সকাল থেকে আমরা টেনশনে আছি। ঠিক দুপুর একটায় আমার অ্যাডভাইজার প্রফেসর জ্যাক স্ট্যানকোভিকের একটা ইমেইল পেলাম। ইমেইলে শুধু দুটো শব্দঃ ‘সী মী’; জুম্মার নামাযের আগে দোটানায় পড়ে গেলাম, কই যাই? মসজিদ না ডিপার্টমেন্ট? চিন্তা করে ঠিক করলাম পরীক্ষার রেজাল্ট তো জানিই, দুনিয়া-আখিরাতের মধ্যে অন্তত একটা ভালো হোক আজকে- এটা মাথায় নিয়ে মসজিদের দিকেই ছুটলাম। এখানে নামাযের শেষে আমাদের দেশের মত হাত তুলে মুনাজাত পড়া হয়না। আজকের দিনে আমার দুআ’র খুবই দরকার। সত্যি সত্যি এত তাড়াতাড়ি যে রেজাল্ট দেবে ভাবিনি। বুঝতে পারলে অ্যাডভান্স কিছু দুআ করে রাখা যেত। বার বার মনে হতে লাগল, আমার মা কী জানেন আজকে তার ছেলের সবচাইতে বড় পরীক্ষার রেজাল্ট? অযথা টেনশন করবেন বিধায় তাকে জানতে দিইনি পরীক্ষার কথা। এখন মনে হচ্ছে বিশাল ভুল হয়ে গেছে।

ইউনিভার্সিটির নীল বাসে করে যত দ্রুত সম্ভব ডিপার্টমেন্টের দিকে ছুটলাম। আমার সাথে আছে মুনির। তাকেও স্ট্যানকোভিক একই ইমেইল পাঠিয়েছে। ইমেইলের হেডার দেখে বুঝতে পেরেছিলাম এক সাথে কয়েকজনকে জ্যাক একই ইমেইল করেছে। ইমেইলে ছিল দুটো শব্দঃ ‘সী মী’- এটার মানে কী হতে পারে দুজন মিলে এনালাইসিস করা শুরু করলাম। মুনিরের বক্তব্য, ‘আমরা গেছি। আমাদের কোন আশা নেই। পাশ করলে জানাতো কনগ্রাচুলেশন। কিন্তু মেইলে লেখা- দেখা কর। এর মানে আজকে কঠিন ঝাড়ি আছে কপালে। তার মধ্যে আমরা আবার লেইট…’ মুনিরকে সমবেদনা জানাবো নাকি নিজেকে সমবেদনা জানাবো কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না। বাস থেকে নামতে নামতে মনে মনে নিজেকে বোঝালাম, পরাজয়ে ডরেনা বীর। আজকের দিনে নিজেকে কষ্ট করে একটু বীর ভাবতে হবে। ব্যস, তাহলেই হলো।

করিডোরে আমরা দুজন স্ট্যানকোভিকের মুখোমুখি। তার পিছে এনামুলকেও দেখা যাচ্ছে। এনামুলের মুখবিস্তৃত হাসি। এই ধরনের হাসি সে দুই ক্ষেত্রে দেয়- (এক) অবস্থা খুব ভালো, (দুই) অবস্থা খুবই হতাশাব্যঞ্জক। বেশিরভাগ সময়েই দ্বিতীয় কারণটাই সঠিক হয়। আজকের হাসিটা দেখে আমি একটু কনফিউজড। রান্নার ঠিক আগ মূহুর্তে এনামুল সচারচর যেমন হাসি হাসি মুখে বলে, ‘ভাইয়া, পিয়াজ কিন্তু একটাও নাই’ এই টাইপ হাসি। আরও কনফিউজড স্ট্যানকোভিকের মুখেও সেই হাসি দেখে। ভালো-মন্দ কিছু বুঝে ওঠার আগেই জ্যাক বলল, ‘কনগ্রাচুলেশান্স! ইউ গাইজ ডিড আ ওয়ান্ডারফুল জব। নাউ, ইউ শুড ওয়ার্ক টুগেদার ফর ও’রালস।’ আমি ঘটনাটা বুঝে ফেললাম। আমরা তিনজনই পাশ! মনে মনে মনে হল অজ্ঞান হয়ে যাব আনন্দে, কিন্তু জ্যাকের সামনে ভাব দেখালাম এসব আসলে কোন ব্যাপারই না আমাদের জন্য। পাশ তো করবো মাস্ট, পরীক্ষা দেয়াটা শুধুই ফরমালিটি ছিল আমাদের জন্য- এরকম একটা ভাব নিলাম তিনজন। জ্যাক আমাদের ‘হ্যাপি উইকএন্ড’ জানিয়ে বিদেয় নিল। সে নিরাপদ দূরত্বে সরে গেলে আমরা হৈচৈ শুরু করে দিলাম। এনামুলের কাছে জানতে পারলাম এবার আমাদের ফার্স্ট ইয়ারের কেবলমাত্র চারজন ছাত্র পাশ করেছে কোয়ালিফাইয়িং এ। আমরা তিনজন ছাড়া আরেকজন হচ্ছে লুথার। ফ্যাকাল্টি মিটিংয়ে নিশ্চয়ই এটা নিয়ে আলাপ হয়েছে যে চারজনের মাঝে এবার তিনজনই বাংলাদেশি! আমরা এ ব্যাপারটিকে বেশ উপভোগ করছিলাম। ডিপার্টমেন্টে এখন বাংলাদেশের ছাত্রদের আলাদা চোখে দেখবে সবাই। সতীর্থরা শুনলে নিশ্চয়ই ঈর্ষায় মারা যাবে। কিন্তু এর সাথে সাথে নতুন এক আশঙ্কাও ভর করল। রিটেনে পাশ করলেও ভাইভা এখনও বাকি। আমি ভাইভাতে সবসময়ই খারাপ। ভাইভার জন্য জ্যাকের কথা অনুযায়ী একসাথে প্রাকটিস করতে হবে। এনামুলকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমাদের হাতে সময় আছে কয়দিন। এনামুল হাসতে লাগল। ওর এই হাসিটা আমি চিনি। এর অর্থ, ‘খবর সুবিধার না’; বলল, নেক্সট ইউকেই নাকি ভাইভা। এক চিন্তা দূর হতেই নতুন এক দুশ্চিন্তার উদয় হওয়ায় একটু দমে গেলাম। প্রথম পঁচিশ ঘন্টা তো কোনমতে পেরিয়ে গেছি। কিন্তু এখনও বাকি ভয়ঙ্কর পঞ্চাশ মিনিট। কী আছে কপালে কে জানে। আমার মনের কথাটা মুনির বেশ জোরে জোরেই বলতে লাগল, ‘কী দরকার এসব ভাইভার, খালিখালি, ধূর!’ ওর কথা ডিপার্টমেন্টের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এল। আমরা জানি, এই করিডোরে শত শত বছর ধরে অগনিত পিএইচডি প্রার্থী এই একই আক্ষেপ করে এসেছে। হয়ত অনেকেই টিকতে না পেরে ঝরে গেছে। কিন্তু সেই শত বছরের পুরোনো রীতি এখনও টিকে আছে নিজস্ব দাপট নিয়ে।




]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/29018323 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/29018323 2009-09-30 23:11:10
পঁচিশ ঘন্টা পঞ্চাশ মিনিট
পিএইচডি কথাটি ‘ডক্টর অফ ফিলোসোফির’ সংক্ষিপ্ত রূপ। এটাকে সংক্ষেপ করার পর কেন উল্টো করা হল তা আমার জানা নেই। যতটুকু জানি পড়াশোনা করে অর্জন করা যেতে পারে এধরনের ডিগ্রির মাঝে এটাই সবার শেষ ডিগ্রি। এরপর আর কোন পড়ালেখা করতে হবেনা, আপাতত এটাই আমার কাছে পিএইচডি করার নেপথ্যে মূল মোটিভেশন। আমেরিকা আসার আগে আমার ধারণা ছিল দিন-রাত ল্যাবে শুয়ে-বসে বিভিন্ন এক্সপেরিমেন্ট করে যুগান্তকারী কোনকিছু আবিষ্কার করাটাই বোধহয় পিএইচডি। এখানে আসার পর প্রতিদিনই ধারণা একটু একটু করে পাল্টাচ্ছে। শুরুর দিকের দু-তিন সেমিস্টারেরে সাথে বুয়েটের রেগুলার সেমিস্টারগুলোর তেমন কোন পার্থক্য পাইনি। ক্লাস, প্রজেক্ট, প্রেজেন্টেশন, হোমওয়ার্ক, ফাইনাল সবই চলেছে রুটিনমত। এরসাথে শুধুমাত্র যোগ হয়েছে নিজের প্রফেসরের সাথে কিছু রিসার্চ মিটিং আর বিয়োগ হয়েছে পিএল, চোথা সংগ্রহ, পরীক্ষা পেছানোর আন্দোলন ইত্যাদি। ভেবেছিলাম এভাবেই চার-পাঁচ বছর চলবে, অতঃপর একসময় একটা ডক্টরেট ডিগ্রি বগলদাবা করে ঢাকার প্লেনে বাড়ি ফিরে আসব। কিন্তু সাদামাটা এই কাহিনীতে টুইস্ট এসে গেল যখন জানতে পারলাম ‘কোয়াল’ নামধারী এক বিভিষিকার কথা।

আমেরিকায় পিএইচডি স্টুডেন্টদের এ্যাডমিশন হয় আন্ডারগ্র্যাডের রেজাল্ট, টোফেল-জিআরই, শিক্ষকদের রেকমেন্ডেশন লেটার এসবের ভিত্তিতে। একবার অ্যাডমিশন হয়ে গেলেই কেল্লাফতে- অনেকের মত আমারও এই একই ধারণা ছিল শুরুতে। কিন্তু আসার পর থেকেই শুনতে পাচ্ছিলাম ইউভিএ’র সর্বনিকৃষ্ট কোয়ালিফায়ার (সংক্ষেপে ‘কোয়াল’) এক্সামের কথা। নানান ভুক্তভোগী নানান ভাষায় এটার যত দূর্ণাম করা শুরু করল তাতে একদিন অতিষ্ট হয়ে ঠিক করলাম আমার তখনকার টেম্পরারি একাডেমিক এ্যাডভাইজার, প্রফেসর হোয়াইটহাউসের সাথে দেখা করে বিষয়টা পরিষ্কার হওয়া দরকার। এ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে তার সাথে দেখা করতে গেলাম কোন এক বিকেল বেলা। চ্যাংড়া মত এই আধা-চায়নীজ, আধা-আমেরিকান প্রফেসরকে দেখে যে কেউ আন্ডারগ্র্যাডের কোন ছাত্র ভাববে। আমি অবশ্য আমার কল্পনাশক্তির সদ্ব্যবহার করে আবিষ্কার করলাম, একে একটা লাল হাওয়াই শার্ট আর একটা প্রিন্টের লুঙ্গি পরিয়ে দিলে ঠিক ঠিক একটা রঙ-মিস্ত্রির মত মনে হবে। কুশল বিনিময় শেষে নানান কথাবার্তা বলতে বলতে এক পর্যায়ে জানতে চাইলাম, কোয়ালিফায়ারের ঘটনাটা আসলে কী? রঙমিস্ত্রি যা বলল, তার সারমর্ম এই যে, এটি এমন এক মহাপরীক্ষা, যা সকল পিএইচডি স্টুডেন্টকেই নিজ যোগ্যতা প্রমাণ করতে বাধ্যতামূলকভাবে পাস করতে হবে। যে পারবেনা তাকে যথাযোগ্য সম্মান দেখিয়ে চিরতরে বিদেয় করে দেয়া হবে। পরীক্ষায় কম্পিউটার সায়েন্সের পাঁচটি মূল বিষয়ের ওপর পাঁচ ঘন্টার পাঁচটি রিটেন এক্সাম নেয়া হবে। কোত্থেকে কোয়েশ্চেন করা হবে সেটা একমাত্র আল্লাহ মালুম। একটা রিডিং লিস্ট অবশ্য আছে, যেটা দেখে মনে হলো, যে রেটে আমি পড়াশোনা করি তাতে পুরোটা একবার রিডিং পড়ে শেষ করতেও আমার পাঁচ বছরের ভিসা শেষ হয়ে যাবে। মৃদু টেনশন নিয়ে তাকে প্রশ্ন করলাম, এসব পরীক্ষার জন্য সর্বোচ্চ কয়বার চান্স পাওয়া যায়? হোয়াইটহাউস তার সাদা দুইপাটি দাঁত বের করে বলল, থার্ডইয়ার হচ্ছে অফিসিয়াল লিমিট, কিন্তু এক-দুইবার দিয়ে যদি কেউ পাস না করতে পারে, তাহলে তাকে আজীবন সুযোগ দিলেও সে আসলে পাস করতে পারবেনা। বছরে মাত্র দুবার এই পরীক্ষা নেয়া হয়। কেউ যদি বাইচান্স পাঁচটি রিটেনেই পাস করে যায়, তবে তাকে পাঁচজন প্রফেসরের সামনে পঞ্চাশ মিনিটের একটি ভাইভায় অংশ নিতে দেয়া হবে। সেটাতে যদি সব প্রফেসর আলাদা আলাদা ভাবে মত দেন যে, ছাত্রটি পিএইচডি করার যোগ্য, তখনই কেবলমাত্র তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে পিএইচডি ছাত্র হিসেবে নথিভুক্ত করা হবে, অন্যথায় সসম্মানে বিদায়। নিশ্বাস বন্ধ করে তার কথা শুনছিলাম। কথাগুলো শোনা শেষে বুঝতে পারছিলাম না এখন কি আমার নিশ্বাস ছাড়ার কথা, নাকি নিশ্বাস নেবার কথা? কোনটা রেখে কোনটা করা উচিত কিছুই ঠাওর করতে পারছি না। পাঁচ ঘন্টার পাঁচটা রিটেন পরীক্ষা, তাতে হয় পঁচিশ ঘন্টা, আর এর সাথে পঞ্চাশ মিনিটের ভাইভা, সবমিলিয়ে পঁচিশ ঘন্টা পঞ্চাশ মিনিট। বুঝতে পারলাম, এই পঁচিশ ঘন্টা পঞ্চাশ মিনিট পার না করা পর্যন্ত যতবার নিশ্বাসই নিই না কেন, একবারও প্রাণ ভরবেনা।

মহাচিন্তায় পড়ে গেলাম ‘কোয়াল’ নিয়ে। বাংলাদেশ থেকে আমি কোন বই-পুস্তক আনিনি। তেইশ কেজি ওজনের দুটো লাগেজ ব্যাগই আমার মা হাড়ি-পাতিল, মসলা-আঁচার, কম্বল-কোলবালিশ এসব দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছিলেন। বই নেবার কোন উপায় ছিলনা। আমেরিকায় নীলক্ষেতও নেই। অ্যামাজন থেকে অর্ডার করলে বইপিছু প্রায় পঞ্চাশ ডলার (সাড়ে তিনহাজার টাকা) খরচ পড়বে। এত টাকা খরচ করে বই কিনে পরীক্ষায় ফেল করলে পুরোটাই লস। রিডিংলিস্টের প্রতিটি বই তাই বিভিন্নভাবে জোগাড় করতে হলো। কোনটা লাইব্রেরি থেকে, কোনটা সিনিয়র কারো থেকে, কোনটা নেট থেকে সফটকপি নামিয়ে প্রিন্ট, এভাবে নানান পন্থায় কিছু দিনের মাঝেই পড়ার টেবিল বই দিয়ে বোঝাই করে ফেললাম। সবগুলো বই মিলিয়ে সর্বমোট কত পৃষ্ঠা পড়তে হবে তার একটা হিসেব করে দেখলাম সংখ্যাটি আট-হাজারের সামান্য কিছু কম-বেশি হবে। আমি খুব ধীর গতির পাঠক। পড়াশোনার বই একপৃষ্ঠা পড়তে আমার প্রায় মিনিট দশেকের মত লাগে। এছাড়া একনাগাড়ে একঘন্টা পড়াশোনা করা আমার পক্ষে প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। সুবিশাল এই সিলেবাস সুন্দরমত পড়া শেষ করে আমি একদিন পরীক্ষার হলে গিয়ে পরীক্ষা দিচ্ছি- এই দৃশ্য খুব একটা বাস্তব সম্মত বলে মনে হলনা। ভেবেচিন্তে দুটো সমাধান বের করলাম। এক, মানসম্মান নিয়ে বাংলাদেশ পলায়ন। কিন্তু এটার ফলাফল শুভ বলে মনে হলনা। দেশে ফিরে কী করব সেটা একটা দুশ্চিন্তার বিষয়। ভাবতে বসলেই ঘুরে ফিরে কেন যেন বার বার মনে হতে লাগল, লাল একটা হাওয়াই শার্ট আর একটা প্রিন্টের লুঙ্গি পড়ে আমি ঢাকার হাইরাইজ বিল্ডিংগুলো মনের সুখে রঙ করছি। দ্বিতীয় সমাধান হলো, অনেকের মত আমেরিকাতেই কোন একটা চাকরি-বাকরি যোগাড় করে দিনতিপাত করা। আর কেউ যদি জিজ্ঞাসা করে তবে বলল, ‘পিএইচডি করে আসলে ভাই কোন লাভ নেই। পিএইচডিদের চাইতে আজকাল মাস্টার্সেরই জব মার্কেটে ডিমান্ড বেশি। পাঁচবছর সময় নষ্ট করে কি লাভ বলেন? এরচেয়ে পাঁচ বছরে আমি অনেক টাকা ইনকাম করে ফেলতে পারব।‘ এই সমাধানটা খারাপ না। লোকজন এটাকে অনায়াসে মেনে নেবে। কিন্তু সমস্যা হলো নিজেকে নিয়ে। নিজের কাছে ছোট হয়ে, বড় হবার স্বপ্ন দেখাটা সত্যিই হাস্যকর। ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দেব সূচ্যগ্র মেদিনী’- কথাটা বারবার মনের মধ্যে খোঁচাতে লাগলো। অনেক খোঁচা খেয়েও ‘সূচ্যগ্র মেদিনী’ জিনিসটা কী ছিল সেটা কিছুতেই মনে করতে পারলাম না। এই মেমরি নিয়ে কী করে পরীক্ষা দেব কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না।

মাথা-ঠান্ডা করে প্ল্যান মত কাজ করতে হবে। ‘জো জিতা ওহি সিকান্দার’ মুভিতে আমির খান যেভাবে গানের তালে তালে ব্যায়াম-ট্যায়াম করে সাইকেল রেসের জন্য প্রস্তুত হয়েছিল, সে রকম একটা প্ল্যান করতে হবে। ঠিক করলাম প্রতিদিন ভোর ছটায় উঠে পড়াশোনা শুরু করবো। এর জন্য প্রথমে রাত তিনটায় ঘুমোতে যাবার অভ্যাসটা বদলানো শুরু করলাম। ফলশ্রূতিতে যা হল, সপ্তাহ খানেক পর আবিষ্কার করলাম, প্রতিদিন রাত ন’টায় ঘুমোতে যাচ্ছি আর উঠছি সেই দুপুর বারোটায়। এরপর আবার খাওয়াদাওয়া ও দুপুরের ঘুম শেষে সন্ধ্যায় মাত্র এক ঘন্টা পড়াশোনার জন্য অবশিষ্ট রইল। সেই এক ঘন্টা সময়ে কোন সাবজেক্ট পড়ব, মিনিটে কত পৃষ্ঠা পড়ব, এসব হিসেব করতে করতে আর বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টোতে উল্টোতেই চলে যেতে লাগল। বোঝা গেল, এই প্ল্যানে কাজ হবেনা। নতুন করে প্ল্যান করা হলো। এবারে ঠিক করলাম বইয়ের চ্যাপ্টারগুলো পুরোটা না পড়ে প্রত্যেক চ্যাপ্টারের প্রথম দু-তিনটি সেকশন পড়ব। এ পদ্ধতি কিছুদিন ভালোমত চলল। মোটামুটি একটা কনফিডেন্স এসে গেল যে, আর্কিটেকচার আর থিওরি এই দুটো সাবজেক্টে পাস হচ্ছেই। কনফিডেন্স দৃঢ় করতে বিগত বছরের কোয়ালের প্রশ্নপত্র যোগাড় করলাম। ডিপার্টমেন্টে বিগত বছরগুলোর প্রশ্নের সফটপকপি আর্কাইভ করা আছে, একথা শুনেছিলাম। একটা ইমেইল করে আমার প্রয়োজন জানাতেই, দশ মিনিটের মাঝে আমাকে শত শত প্রশ্নপত্র পাঠিয়ে দিল ইউনিভার্সিটি অফিস থেকে। ভ্রু-কুচকে, সময় নিয়ে বিগত বছরের প্রশ্নপত্রগুলো দেখলাম। কোচকানো ভ্রু আর সোজা করতে পারলাম না। কোন বছরেরই কোন প্রশ্নের উত্তর আমার জানা আছে বলে মনে হলনা। প্রশ্নগুলো এমন যে, এগুলো কেউ বই পড়ে, শিখে, প্র্যাকটিস করে এসে উত্তর করতে পারবেনা। সবগুলোই চিন্তামূলক ও কঠিন প্যাঁচ-মারা প্রশ্ন। কিছু কিছু প্রশ্নের আদৌ সমাধান আছে কিনা সেটাও আমার সন্দেহ হতে লাগলো। সত্যি বলতে কী, প্রশ্ন গুলো দেখে ভয় পাবার বদলে আমি আনন্দ পেতে শুরু করলাম। কারণ, আমি বুঝে ফেলেছি, বই পড়ে এখানে এক বিন্দুও লাভ নেই। কারো ভেতর যদি ‘কম্পিউটার সায়েন্স’ বিষয়টি সত্যি সত্যি থাকে, তবেই একমাত্র সে এই পরীক্ষায় পাস করবে। বুয়েটের চার বছরের কোর্স প্রায় ছয় বছর সময় নিয়ে, ধীরে ধীরে, মন দিয়ে পড়েছি। এত দীর্ঘ সময়ে যদি অল্প-একটু কম্পুটার সায়েন্স, কোন এক অসাবধানতার মূহুর্তেও মাথার ভেতর ঢুকে থাকে, তবেই এখন রক্ষে। (বাকিটা নেক্সট উইক)
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/29003287 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/29003287 2009-09-02 03:50:38
প্রেজেন্টেশন (২)
খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে দুটো সেলে আটকে রেখে ইম্পেরিয়াল এক্সাম নেয়া হচ্ছে। হিউওম্যান রাইটস বিবেচনা করে তাদের বেঁধে না রেখে বরং এসিওয়ালা ঘরে ল্যাপটপ সহকারে বসিয়ে দেয়া হয়েছে। সিস্টেমস রিলেটেড রিসার্চে ইউনিভার্সিটি অফ ভার্জিনিয়ার খ্যাতনামা প্রফেসর জ্যাক স্ট্যানকোভিককে দেয়া হয়েছে পুরো পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণের ভার।

জ্যাক তার অন্যতম প্রিয় একজন বাংলাদেশি ছাত্রকে ডেকে বললেন, দেখ, তোমার দেশের সবচেয়ে মেধাবী দুজন মানুষের মাঝে কে সবচেয়ে মেধাবী ও দেশপ্রেমিক তাকে আজ বাছাই করা হবে। ইসন্ট ইট ইক্সাইটিং?

ছাত্র বলল, ইয়া ইয়া।

জ্যাক বর্ণনা করছে, এই পরীক্ষা পদ্ধতিতে সারা দেশের সকল মানুষের হৃদয়ের চাওয়া-পাওয়াকে আমাদের সাইবার ফিজিক্যাল সিস্টেমস দিয়ে ক্যাচ করা হবে। তারপর সেগুলিকে ক্লাসিফাই করে তৈরি করা হবে সর্বকালের সেরা একটি প্রশ্নপত্র, যেটাতে সারাদেশের মানুষের সকল জিজ্ঞাসার নিখুঁত প্রতিফলন থাকবে।

ছাত্রের অভিব্যক্তি, ইয়া ইয়া।

এরপর একটার পর একটা প্রশ্ন দুই নেত্রীর সামনের স্ক্রিনে আসবে ইন্টারনেটের মাধ্যমে। সেলের দেয়ালে লাগানো কোটি কোটি সেন্সর ডিভাইস তাদের মস্তিষ্কের প্রতিটি নিউরণকে মনিটর করবে। দেশবাসীর প্রশ্ন শুনে তাদের ব্রেইনে যে অনুরণন হবে, তোমার লেখা ব্রেইন মেজারমেন্ট প্রোগ্রাম দিয়ে সেই ডাটা বিশ্লেষণ করে আমরা জেনে যাব কার ব্রেইন কত শক্তিশালী। পুরো কম্পিউটেশন পলিনোমিয়াল টাইমে শেষ হতে বাধ্য। আর সেটার অর্থ কী সেটা তুমি জানো। কম্পিউটার বিজ্ঞানের ফান্ডামেন্টাল প্রশ্নের উত্তরটি নিয়ে আমাদের অনেকদিনের ক্লেইম আজকে প্রমাণ হয়ে যাবে। আমি হব চিরস্মরণীয় ও মহান। তুমি পাবে তোমার ডিগ্রি।

ছাত্র জোরে মাথা নেড়ে বলল, ইয়া ইয়া।

এক্সপেরিমেন্ট শুরু হয়ে গেছে। দেশবাসীর অগণিত আকুতি ক্লাসিফাই হয়ে শেষপর্যন্ত একটা মাত্র প্রশ্নে কনভার্জ করেছে- ‘তোরা কবে যাবি?’

জ্যাক বাংলা জানেনা, সে শুধু মন্তব্য করল, বাহ সারাদেশের লোকজনের দারুণ ঐক্য, এত ডাটা থেকে মাত্র একটি প্রশ্ন? উত্তরটা মাত্র এক বাইটেই আমরা স্টোর করতে পারব মনে হচ্ছে।

ছাত্র বলল, ইয়া ইয়া।

এরপর দুই নেত্রীকে তাক করে একসাথে সমস্ত সেন্সর ফায়ার করল। কগনেটিভ হাইপার এক্সরে সেন্সরের সমস্ত ফ্রিকোয়েন্সি দিয়ে ব্রেইনের সব সেল তন্ন তন্ন করে উত্তর খোঁজা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে যেখানে এক পিকো সেকেন্ডে উত্তর চলে আসে, সেখানে পুরো এক মিনিট পার হয়ে গেলেও কোন উত্তর নেই। স্ট্যানকোভিকের নিজের ব্রেইনের ক্ষেত্রে লেগেছিল ছাপ্পান্ন সেকেন্ড। স্ট্যানকোভিক তাই মুগ্ধ হয়ে মন্তব্য করল, অ্যামেজিং, আনবিলিভেবলি ট্যালেন্ডেড লেডিস। মিনিট খানেক পেরিয়ে গেল কিন্তু কোন রেজাল্ট নেই। ফেমটোপ্রসেসরের প্রসেসিং পাওয়ার শেষ হয়ে আসছে, সারা আমেরিকার সকল ব্যাকআপ স্টেশন দিয়ে আর হয়ত মিনিট দশেক টিকিয়ে রাখা যাবে কম্পিউটেশন। উত্তেজনায় আর আশঙ্কায় জ্যাকের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। শুধুমাত্র একটা সিগন্যাল ধরতে পারলেই সেটা এই মূহুর্তে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও সফল কম্পিউটেশনের অবিস্মরণীয় রেকর্ডে পরিণত হবে।

হঠাৎ দপ করে সব যন্ত্রপাতি বন্ধ হয়ে গেল। গোটা আমেরিকা অন্ধকারে নিমজ্জিত। বিশাল বপু জ্যাক হতাশা আর দুঃখে ছোট্ট শিশুর মত কাঁদতে লাগল। বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল এই প্রজেক্ট, অব্যর্থ একটি সিস্টেম, যা কিনা সমগ্র বিশ্বের যে কোন মানুষের ব্রেইনসেলের তথ্য পলিনোমিয়াল টাইমে পড়ে আনতে পারে বলে সে দাবী করে আসছিল, আজ তা ভুল প্রমাণ করে দিয়েছে প্রত্যন্ত বাংলাদেশের অসাধারণ মেধা সম্পন্ন দুজন মহীয়সী নারী। তাদের মস্তিষ্কের রেজোনেন্স ডিফেন্স পাওয়ার এত শক্তিশালী যে, বিলিয়ন বিলিয়ন ব্রেইন সেলের একটিও হার মানেনি জ্যাকের ডিভাইসের কাছে। অন্ধকার ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে জ্যাক ছাত্রের হাতে পিএইচডি ডিগ্রির রেকোমেন্ডেশন পেপার দিয়ে বলল, আমি হার মেনেছি। কাল থেকে আমার জায়গায় তুমিই এই ল্যাবের নতুন কর্ণধার। পারলে নতুন কোন বিষয়ে নতুন কিছু নিয়ে গবেষণা করো। আজ থেকে আমার ছুটি। বাকি জীবনটা আমি বাংলাদেশে কাটাতে চাই। তোমাদের আলো-বাতাসে কিছু একটা আছে, যেটায় আমার কমতি আছে। সেটা কী আমি শুধু একবার জানতে চাই। ওহ জিসাস, অ্যামেজিং, আনবিলিভেবলি ট্যালেন্ডেড লেডিস।

ছাত্র আস্তে আস্তে বলল, ইয়া ইয়া।

ক্লান্ত ভঙ্গিতে হাঁটতে হাঁটতে এক সময় জ্যাক চলে গেল ওলসন ল্যাব ছেড়ে। ডিগ্রি হাতে ছাত্র বেশ কিছুক্ষণ তার পথের দিকে তাকিয়ে থাকলো। বেশ খানিকক্ষণ পর নিথর হয়ে থাকা ফেমটোপ্রসেসরের সামনে গিয়ে সে দাঁড়াল। এরপর প্যান্টের বাম পকেট থেকে বাংলাদেশ থেকে আনা চান্দা ব্যাটারিটি বের করল। পাওয়ার আউটের এ আশঙ্কা তার আগেই হয়েছিল, আর তাই আগে থেকেই সে সতর্কতা নিয়ে রেখেছিল। ফেমটোপ্রসেসরের ব্যাটারি হোলে চান্দা ব্যাটারি ঢুকিয়ে নিমিষেই যন্ত্রটিকে সে আবার সচল করে ফেলল। প্রসেসরের কম্পিউটেশন বন্ধ হবার ঠিক আগ মুহূর্তে সেটি যেন মেমরি ডাম্প করে রাখে সে ব্যবস্থা সে আগেই নিয়ে রেখেছিল। প্রোগ্রাম ঠিকমত কাজ করে থাকলে মেমরি ফুটপ্রিন্ট দেখে বের করে ফেলা সম্ভব কী কারণে প্রসেসর এত সময় নিচ্ছিল। ক্র্যাশ করলেও লগ ডিভাইসে সব এক্সেপশন মেসেজ সেইভ থাকার কথা। তিলে তিলে একবাইট একবাইট করে লিখেছে সে পুরো প্রোগ্রামটি। ঠিক কততম বাইটে সেই মেসেজ থাকবে সেটা সে ছাড়া আর কেউ জানেনা। একটা একটা করে লগ মেসেজের প্রতিটি বাইট সে পড়ে ফেললো। এরপর সেগুলোকে সাজিয়ে ক্যারেকটারে কনভার্ট করে উদ্ধার করে আনল ফেমটোপ্রসেসরের এক্সেপশন মেসেজটি- ‘এক্সেপশন ৮৮০২- ডিভাইড বাই জিরো এক্সেপশন, নো নিউরণ ফাউন্ড ইন ব্রেইন, প্লিজ ইনপুট এ হিউম্যান ব্রেইন।‘ ছাত্রের মুখে হাসির আভা, সে জানে ডিভাইস নিখুঁতভাবে কাজ করছে। শুধু ইনপুট নেবার সময় একটা নতুন কনডিশান যোগ করতে হবে মাত্র। চান্দা ব্যাটারির পাওয়ার শেষ। ডিভাইস বিপ বিপ করে জানাতে লাগল সে আবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মুচকি হেসে সে মনে মনে বলল, ইয়া ইয়া।

বারিটোর সুদীর্ঘ ক্লাসে ডজন খানেক পূর্ণদৈর্ঘ্য দিবাস্বপ্ন দেখেও সময় কাটানো কখনো কখনো মুশকিল হয়ে যায়। আজকে আর নতুন কিছু চিন্তা শুরু করা যাবেনা। কারণ, একটু পর আমার নিজের প্রেজেন্টেশনের পালা।

আমি এতক্ষণ অন্যান্যদের প্রেজেন্টেশন শুনছিলাম আর মজার কিছু পেলে টুকেও রাখছিলাম। মিস বারিটো সবার শেষের সিটে বসে প্রেজেন্টেশন গ্রেডিং করছে। সে আগেই বলে রেখেছিল, কারো কথা যদি স্পষ্ট শোনা না যায় তবে তাকে পেছন থেকে চেয়ার ছুঁড়ে মারবেন। আমাকে নোট টুকতে দেখে কখন আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন সেটা খেয়াল করিনি। একপর্যায়ে যখন পিঠ চাপড়ে জিজ্ঞেস করলেন, হ্যাভিং ফান? আমি ভয় পেয়ে চমকে উঠে বললাম, ইয়া ইয়া। দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে হাসি দিয়ে বারিটো বলল, ইয়র টার্ন নেক্সট।

পেনড্রাইভ থেকে আমার প্রেজেন্টেশনের কপিটা ডেক্সটপ মেশিনে কপি করে পাওয়ার পয়েন্ট খুলে আমি রেডি। শত শত ছাত্রছাত্রীর সামনে অসংখ্য ক্লাস নিয়েছি ঢাকায়। ইংরেজিতে প্রেজেন্টেশনও করেছি দু-একবার জীবনে। তারপরও কেন যেন গলা শুকিয়ে যেতে শুরু করল। মুখের হাসিহাসি ভাবটাও ধরে রাখাটা কষ্টকর হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে। সামনে বসা সবার চেহারা কেমন যেন অস্পষ্ট। বাংলাদেশের কোন এক ওয়ানডে ক্রিকেটের কমেন্ট্রিতে গাভাস্কারকে একবার বলতে শুনেছিলাম, ক্রিজে গিয়ে টেনশন হলে ব্যাটসম্যানের উচিত দু-তিনবার লম্বা লম্বা শ্বাস নেয়া। সেই উপদেশ কাজে লাগানোর চেষ্টা করলাম। তিনবারে কাজ হলো না। সাত-আটবার পর সামনে বসা সবার চেহারা একটু একটু করে পরিষ্কার হতে লাগলো। পেছনে চোখ পড়তেই খেয়াল করলাম, মিস বারিটো শুরু করার জন্য বার বার ইশারা করছে। শীতকালে ঠান্ডা পানিতে যারা গোছল করেছেন তারা জানেন যে প্রথম মগ পানি গায়ে ঢালাটাই সমস্যা, এরপর বাকিটুকু খুব দ্রুত শেষ হয়ে যায়। একই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে যা থাকে কপালে বলে এফ-ফাইভ চাপ দিলাম। গাঁঢ় নীল ব্যাক-গ্রাউন্ডে সবার সামনে বড় হয়ে ভেসে উঠল আমার সাদামাটা স্লাইড। বোম ফাটানো কিছু নেই সেখানে। শুধু ছোট্ট একটি প্রশ্ন- ‘আপনার দেশে নিজের ভাষায় কথা বলতে কত দাম দিতে হয়?’

সবাই চিন্তায় পড়ে গেল। সবাই বলাবলি করতে লাগল- মানে? কিসের দাম? কথা বলতে আবার টাকা কেন? ও-তুমি মোবাইল ফোনের কথা বলছ? চায়নায় মাসে ২০, ইন্ডিয়ায় মিনিটে ১ রুপি, বাংলাদেশে কত দিতে হয়? আমি বললাম, এখন পুরো ফ্রী, তবে ইনিশিয়ালি কিছু খরচ ছিল। ইউনিভার্সিটিতে পড়ুয়া আমাদের মতই কিছু তরুণকে প্রাণ দিতে হয়েছে, রাজপথ একটু নোংরা করতে হয়েছিল বুকের উষ্ণ রক্তে- ব্যস, তাতেই কাজ হয়ে গেল। তাদেরকে একে একে পরিচয় করিয়ে দিলাম উপমহাদেশের মানচিত্রের সাথে, জিন্নাহ আর লিয়াকত আলীর সাথে, কলাভবনের সাথে, মিছিলের সাথে, বন্দুকের গুলির সাথে, মৃত্যুর সাথে আর স্বাধীনতার সাথে।

প্রেজেন্টেশন শেষে সবার মাঝেই কৌতুহল- এটাও কি সম্ভব? নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে ইন্ডিয়ার ছেলেটা প্রথম প্রশ্ন করল, এই ঘটনা ১৯৫২ সালের, এর সাথে কী ১৯৭১ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের কোন সম্পর্ক আছে? আমি প্রথমে বুঝিনি, পরে ব্যাপারটা বোঝার পর মনে হচ্ছিল ব্যাটাকে সবার সামনে একটা চটকানা লাগাই। সে বোঝাতে চাচ্ছিল, ৪৭-এর পর থেকেই পাকিস্তানের সাথে ভারতের টানাপোড়েন চলছিল বাংলাদেশ নিয়ে। ৭১ সালের ডিসেম্বরে পাক-ভারত যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। চল্লিশ বছর পর আজকে এই কথা শুনছি দেখে আমার তো আক্কেলগুড়ুম। তাকে জানালাম, আঙ্কেল, যুদ্ধ হয়েছিল বাংলাদেশ-পাকিস্তানের মধ্যে টানা নয় মাস। খেলা জেতার পর লাস্ট মোমেন্টে ইন্ডিয়া আসে ক্রেডিট নিতে। এই কোর্সে আমরা তিনজন বাংলাদেশের আর ইন্ডিয়ার সে একা। এনামুল আর তনিমাও লেগে গেল ওর সাথে তর্ক যুদ্ধে। আমাদের সাথে না পেরে সে চুপ মেরে গেল। বারিটো প্রশ্ন করলেন, তোমাদের যুদ্ধ কী এখনকার পাকিস্তান-আফগানিস্তানের মাঝে যে মতানৈক্য আছে এটার মত কিছু, নাকি কাশ্মীরের মত কিছু? ওকে বুঝিয়ে বললাম, আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক সব কারণ। আমার একা সমস্যা হচ্ছিল বুঝতে পেরে এনামুলও লেগে গেল ব্যাখ্যায়। সে ঠিকঠাক মতই অনেক কিছু বলল, কিন্তু আমার হাসি পেল নাইন-টেনের পাঠ্যপুস্তকে যেভাবে পয়েন্টগুলো লেখা ছিল হুবহু সেটাকেই অনুবাদ করে করে বলার ধরণ দেখে। তার কথা শেষ হতেই ইন্ডিয়ান ছেলে এবার কাশ্মীরের কাহিনী ব্যাখ্যা শুরু করলো। কাশ্মীর নাকি ইন্ডিয়ারই ছিল শুরুর দিন থেকে। কিন্তু ইন্ডিয়ান গভর্ণমেন্ট কাশ্মীরকে নিজেদের বলে স্বীকৃতি দিয়েছে এই খবর কাশ্মীর পর্যন্ত পৌঁছাতে একদিন দেরি হয়। এর মাঝেই নাকি সুযোগ বুঝে পাকিস্তান কাশ্মীরকে নিজেদের বলে স্বীকৃতি দিয়ে দেয়। সেই থেকেই কেউ এটাকে পাকিস্তানের, আর কেউ ইন্ডিয়ার দাবি করে। তার কথায় আমি বুঝলাম, বেশির ভাগ ইন্ডিয়ানরাই বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই একই ধারণা পোষণ করে। ইন্ডিয়ানদের ধারণা বাংলাদেশ তাদের অংশ ছিল, কিন্তু পাকিস্তান এটাকে কব্জা করে রাখে অনেকদিন। এরপর ইন্ডিয়াই বাংলাদেশকে রক্ষা করে তাদের হাত থেকে। তখন একবার প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করেছিল, বাংলাদেশ স্বাধীন হলে ইন্ডিয়ার কী? সময় আর সেটার অনুমতি দিল না। জমে ওঠা তর্ক ঘড়ির কাটার নির্মম আঘাতে নিমেষেই মিলিয়ে গেল।

স্প্রিং শেষ হয়ে গেছে। শারলোটসভিলের গাছপালা আবারো সবুজ পাতায় পাতায় ভরে গেছে। বারিটোর প্রশংসামাখা স্কোর রিপোর্টটাও অ্যাডভাইজারের টেবিলে পৌঁছে গেছে। মজায় মজায় একটা কোর্স শেষ হয়ে গেল, কিন্তু সত্যিই কি কিছু শিখেছি? আমার তো কিছু মনে হয়না। আচ্ছা একটু পর্যালোচনা করে দেখা যাক-

ব্লুপারসঃ

(১) তৃতীয়বর্ষের আন্ডারগ্র্যাড এরিকের সেদিন মাইক্রোসফটে ফোন ইন্টারভ্যূ। প্রোগ্রামিং কনটেস্টের বদৌলতে আমার সাথে তার পরিচয়। আমাকে বলছে, কী করা যায়? তাকে বেশ কিছুক্ষণ তালিম দিলাম ডাটাস্ট্রাকচার, লিঙ্কলিস্ট উল্টানো, টেস্টিং এসব নিয়ে। যাবার আগে বলে গেল, ইওর ইংলিশ ইস মাচ বেটার নাউ! সবকিছু দারূণ করে বোঝালে। ইন্টারভ্যূতে এখন এসব তোমার মত করে গুছিয়ে বলতে পারলেই হয়।

(২) মেইনটেনেন্সের নিগ্রো লোকটা এসেছে। তাকে দিয়ে দেয়ালে টিউবলাইট লাগাবো কারণ বাল্বের লাল আলোতে আমি পড়তে পারিনা। সে এসে তর্ক জুড়ে দিল, দেয়ালে ফুটা করে কিছুতেই সে লাইট লাগাবে না। ঘরে এত বাল্ব থাকতে আবার কেন টিউবলাইট? এত বেশি লাইট-ফ্যান চালাই কেন? সারাদিন এসি চললে তো অচিরেই নষ্ট হবে। ওকে বললাম, তোমার কাজ তুমি কর। বিল তো আমার নিজের পকেট থেকে দিই। আমি সারাদিন কেন, সারা জীবন এসি চালাবো। আমেরিকা ছেড়ে বাংলাদেশ গেলেও এই এসি সারাদিন চলবে, তাতে তোমার কী? অনেক তর্ক করেও কাজটা করিয়ে নিতে পারলাম না। যুক্তির ওপর যুক্তি, কথার ওপর কথা। চলে গেলে ভাবলাম, বাহ, ইংরেজিতে তুমুল ঝগড়া করছি, বেশ উন্নতি!

(৩) ঝোঁকের মাথায় পিএইচডি কোয়ালিফায়ারের রিটেন এক্সাম দিয়ে পাসও করে ফেলেছি আমরা অনেকে। রিটেন পরীক্ষার রেজাল্টের দুদিন পরেই পঞ্চাশ মিনিটের ভয়ঙ্করতম ভাইভা। কিছু পারবো তো? বোঝা এক জিনিস, বোঝানো আরেক জিনিস, অন্য ভাষায় বোঝানো আরো ভিন্ন জিনিস। এই শেষটাতেই তো ধরা! ডিপার্টমেন্টের সাপ্তাহিক টী-পার্টিতে এই আশঙ্কার কথা আলাপ করছিলাম সিনিওর পিএইচডি স্টুডেন্ট টিমোথি, তামিম আর এ্যান্থোনির সাথে। আমার সাথে এনামুল আর মুনিরও ভাইভা দিচ্ছে। পিৎজা খেতে খেতে টিম বেশ কিছুক্ষণ তার স্বভাবজাত ভঙ্গিতে আমাদের কিছু টিপিকাল ভাইভার প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করল। আমাদের সলিড ডিফেন্স দেখে বলল, ইমপ্রেসিভ। তামিম যোগ করল, তোমাদের কারো সেই সমস্যা আর নেই।

(৪) ভাইভা দিতে যাব। ঠিক বিকেল সাড়ে পাঁচটায় আমার টাইম। আর মাত্র দু’মিনিট আছে। সময় বাঁচাতে প্রিন্টিং রুমের মাঝ দিয়ে সর্টকাট একটা গলি বেছে নিলাম এক্সাম রুমে ঢোকার জন্য। হঠাৎ একটা মেয়ের গলার শব্দ- এক্সকিউজ মি, আমাকে একটু শিখিয়ে দেবেন কী করে স্ক্যান করতে হয়। ছেলে হলে ইগনোর করে চলে যেতাম, মেয়েটাকে আর পারলাম না। মেয়েটা আমাদের এখান থেকে মাস্টার্স করে এখন বার্কেলিতে পিএইচডি করছে। দীর্ঘদিন পর বিশেষ আমন্ত্রণে ইউভিএ এসেছে আগের রিসার্চ গ্রুপের সাথে দেখা করতে। আগের অনেক কিছুই তাই ভুলে গেছে। তাকে যথাযোগ্য সম্মান দেখিয়ে স্ক্যান করার বিষয়টি (যেটা আমি নিজেও ঠিকমত পারিনা) শিখিয়ে দিলাম। সে শুনে বলল, এভাবেই তো অনেকক্ষণ ধরে চেষ্টা করছি, তাও হচ্ছে না। তার কাছে জানতে চাইলাম সে কী উপায়ে চেষ্টা করেছে। আবিষ্কার করলাম স্ক্যান করার সময় এই মেশিনে নিজের আইডি দু’বার ইনপুট দিতে হয়, সেটা সে জানেনা। সে জিজ্ঞাসা করল, দু’বার আইডি দেবার কী কারণ থাকতে পারে? চিন্তা করে বললাম, হয়ত তুমি নিজের একাউন্ট দিয়ে লগিন করে আবার অন্যের একাউন্টে স্ক্যান করা কাগজ পাঠিয়ে দিতে পারবে, তাই এ ব্যবস্থা। আমার যুক্তি তার মনে ধরেছে বলে মনে হল। আমি বললাম, আমার হাতে সময় নেই। আবার এক ঘন্টা পর এই পথ দিয়ে যখন ফেরত যাব, তখনও যদি দেখি তুমি আটকে আছ, তবে তোমার কাজ করে দিয়ে যাব। আমার রসিকতা সে বুঝতে পেরেছে। সরি, থ্যাঙ্কস, বেস্ট-অফ-লাক বলে আমাকে বিদেয় দিল। ঘড়ি দেখলাম। পাক্কা দুমিনিট এক নাগাড়ে কথা বলে গেলাম বিদেশিনীর সাথে! অপূর্ব।

(৫) বাইরে খেতে যাচ্ছি গাড়ি নিয়ে আমরা সবাই। দোকানের নাম জানলেও লোকেশন জানা নেই। জিপিএস যন্ত্র বোকার মত একই পথে ঘোরাচ্ছে আমাদের। তানিয়া আপা গাড়ি চালাতে চালাতে বললেন, কাউকে ফোন করে বলতে হবে ইন্টারনেটে সার্চ করে সে যেন আমাদেরকে দোকানের ফোন নাম্বারটা দেয়। এরপর দোকানে ফোন করে সঠিক ঠিকানাটা জেনে নেব আমরা। এনামুল ফোন করল কীর্তিকে। কীর্তি ইন্ডিয়ান ছাত্র- প্রায় সারাক্ষণই ডিপার্টমেন্টে পিসির সামনে বসে কাজ করে। আমাদের ঘটনা তাকে বুঝিয়ে বলার পর তার কাছ থেকে এনামুল দোকানের ফোন নাম্বারটা নিল। তনিমা সাথে সাথেই দোকানে ফোন করে জানতে চাইলো তারা কোথায় তাদের দোকান লুকিয়ে রেখেছে? আমরা কেন জিপিএস দিয়ে সেটাকে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও পাচ্ছিনা?

মাস খানেক আগেও যারা কিনা ফোনে কথা বলার কথা শুনলেই একে অপরকে ঠেলাঠেলি করত, আজ মনে হয় তারা নিজেরাই আগ্রহ নিয়ে কথা বলছে! প্রয়োজনে ঠাট্টা করছে, অপ্রয়োজনে গালিও দিচ্ছে! একটু কি অবাক হওয়া উচিত?

বারিটোর কোর্সে আমরা কিছুই শেখার চেষ্টা করিনি। শেখার মত তেমন কিছু আসলে ছিলও না। সে শুধু আমাদের সাহস দিয়েছ, আর ভয়টা ভেঙ্গে গেছে আমাদের।

বারিটো সার্থক।


(বারিটোর ক্লাস-প্রেজেন্টেশনটির একটি কপি)

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/28962692 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/28962692 2009-06-10 13:33:35
প্রেজেন্টেশন
আরেকটি প্রেজেন্টেশন হলো কী করে ক্লাস কন্ট্রোল করতে হবে সেটার ওপর। খানিকক্ষণ প্রারম্ভিক কথাবার্তা শোনার পর যখন মনে হচ্ছিল শেষতক লেকচারটি বেশ একঘেয়ে হবে, ঠিক তখনি পুরো ব্যাপারটা অন্য দিকে মোড় নিল। ইন্সট্রাকটরের নির্দেশে আমাদের সবাইকে পাঁচজন পাঁচজন করে এক একটি গ্রুপে ভাগ করে ফেলা হলো। এরপর প্রতিটি গ্রুপকে একটি করে ক্লাসরুম সিনারিও দিয়ে বলা হলো সমস্যাটা অভিনয় করে দেখাও। আমি আমার জীবনে কোনদিন অভিনয় করিনি কিন্তু আমাকে যে পার্ট দেয়া হলো সেটা কমন পড়ে যাওয়াতে আমার কোন সমস্যা হলনা। আমাদের গ্রুপের দায়িত্ব ক্লাসে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে ছাত্র-ছাত্রীরা টেক্সট মেসেজ আদান-প্রদান করছে কিংবা গেম খেলছে এই পরিস্থিতি অভিনয় করে দেখানো। আমি হচ্ছি একজন দুষ্ট ছাত্র, যে কিনা আরেকজন ঘাগু দুষ্টের দেখাদেখি ক্লাসে মোবাইল ম্যাসেজিং শুরু করে। অভিনয় শেষে বাকিরা বলবে পরিস্থিতিটি কী ছিল এবং এই পরিস্থিতিতে ক্লাস টিচার হিসেবে করণীয় কি? প্রতিটি গ্রুপ খুব সুন্দর করে অভিনয় করে দেখালো। প্রত্যেকেই মাস্টার্স কিংবা পিএইচডি করতে আসা সিরিয়াস প্রজাতির প্রাণী হলেও, নিজেকে উজার করে হাস্যকর ভাবে অভিনয় করছিল বলে পুরো সময়টা সবাই বেশ উপভোগ করলাম। দু-একজনের অভিনয় সত্যিই খুব প্রানবন্ত হয়েছিল। একটা রাশিয়ান মেয়ে পরীক্ষায় খারাপ করে শিক্ষকের সাথে দেখা করতে আসার অভিনয় এত সুন্দর করে করেছিল যে আমরা সবাই অভিনয় দেখে যার পর নাই মুগ্ধ! পরে তার কাছে জানতে পারলাম সে বাস্তবিকই একজন অভিনেত্রী। রাশিয়ায় থাকাকালীন স্টেজ ড্রামাতে সে নাকি বেশ কয়েকবার অভিনয় করেছে। আমি বাংলাদেশি ড্রামাতে কখনও অভিনয় না করলেও সেদিনের পারফরমেন্স খুব একটা খারাপ ছিলনা!

টিচিংয়ের ওপর এধরনেরই একটি প্রশিক্ষণ আমি বুয়েটেও করে এসেছি। বুয়েটে যারা শিক্ষক হিসেবে নতুন যোগদান করে তাদেরকেও টিচিংয়ের ওপর দু-দিনের একটি অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স করতে হয়। সেই কোর্সে বুয়েটের বাঘা বাঘা সব টিচাররা একটার পর একটা লেকচার দিয়ে যান। এই কোর্সে শেখানো হয়- ব্ল্যাকবুক আর ব্লু-বুকের নিয়মাদি, শিক্ষকদের কোড অফ কন্ডাক্ট কেমন হবে, তাদের কথা-বার্তা কেমন হবে, তাদের পোশাক-আশাক কেমন হবে, তাদেরকে ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে নূ্ন্যতম কতটুকু দূরত্ব বজায় রাখা আবশ্যক, তাদেরকে কিভাবে হাঁটতে হবে, ক্যাম্পাসের কোন কোন স্থান এখন থেকে তাদের জন্য নিষিদ্ধ ইত্যাদি ইত্যাদি। মোটকথা একজন সদ্য বিএসসি পাশ করা ছাত্রকে পুরোদস্তুর শিক্ষকে পরিণত করতে যাবতীয় যত মন্ত্র আছে তা পাঠ করা হয় এ অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্সে। ফলশ্রূতিতে কেউ কেউ হয় মন্ত্রমুগ্ধ, আর কেউ কেউ হয় বিরক্ত। বুয়েটের টিচারদের লেকচার আমাকে কোন কালেই আকর্ষণ করত না, তবে আমার মনে আছে দুদিনের সে কোর্সে (বেশির ভাগ লেকচারে গভীর ঘুম পেলেও) সিভিল ও মেকানিকালের কিছু কিছু বর্ষিয়ান টিচারের প্রাঞ্জল বক্তব্য আমাকে বেশ আকৃষ্ট করেছিল। ঘন্টা জুড়ে তারা নানান মারপ্যাঁচের জিনিস শেখালেও, তাদের বিষয়বস্তু আর উপস্থাপনা এত চমৎকার ছিল যে আমার মত সর্বনিম্ন স্তরের অমনযোগী ছাত্রও (শিক্ষকও) সেদিন ক্ষণিকের জন্য তন্ময় হয়ে কথাগুলো শুনছিল। একজন ভালো শিক্ষকের সাথে একজন পাতি লেকচারের এখানেই পার্থক্য। তাঁরা জানেন, কি করে শিক্ষকতা করতে হয়। দুর্ভাগ্যজনক যে, এধরনের শিক্ষকের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অল্প। আর একারনেই ভোর আটটা বাজতে না বাজতেই ঘুম থেকে উঠে একলাফে ক্লাসে পৌঁছে আবার সাড়ে আটটা বাজার আগেই দ্বিতীয় দফা ঘুমের প্রস্তুতি শুরু করে দেয় বুয়েটের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। সেই শান্তির ঘুমের দিনগুলির কথা মনে পড়লে আজও আফসোস হয়।

লেকচার বা প্রেজেন্টেশন যত ছোটই হোক আর যত দীর্ঘই হোক, যারা শুনছে তারা যদি একবার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, তবেই সব পন্ড। ভালো বক্তারা শুরুতেই বোম-ফাটানো কোন কিছু দিয়ে শ্রোতাকে উৎসাহী করে তোলে। এরপর বক্তব্য যতই এগোতে থাকে, শ্রোতাদের আগ্রহ ততই বাড়তে থাকে। বক্তব্য শেষ হবার পর যদি সকলের মনে হতে থাকে কেন এত তাড়াতাড়ি শেষ হল, এ প্রশ্নের কী উত্তর, ওটা আরেকটু বুঝিয়ে বললে ভালো হতো-- তবেই বক্তা 'পাশ'। এ বিষয়টির অনুশীলন আমি এখানকার প্রায় প্রতিটি লেকচারেই দেখে থাকি। এ পর্যায়ে প্রফেসর স্ট্যানকোভিকের কী-নোট স্পিচের উদাহরণটি আমি আর না দিয়ে থাকতে পারছি না। তার আগে স্ট্যানকোভিকের একটি ছোট্ট ভূমিকা দেয়া প্রয়োজন। জন স্ট্যানকোভিক হচ্ছে ইউভিএর নামিদামী প্রফেসরদের একজন, ইংরেজিতে বলতে গেলে- 'হট কেক'। অসংখ্য প্রফেসরদেরও প্রফেসর। সে যত ছাত্রের পিএইচডি অ্যাডভাইজার, আমার বয়স সেই সংখ্যার সমান হতে হলে এখনও এক যুগ বাকি। দীর্ঘদিন রিয়েলটাইম কম্পিউটিং, কন্ট্রোল-থিওরী, সেন্সর নেটওয়ার্ক ইত্যাদিতে রিসার্চ করে সে এখন 'সাইবার ফিজিকাল সিস্টেমস' নামক নতুন এক ধারার জন্ম দেয়ার চেষ্টা করছে। ঘটনাক্রমে এই জন্মদান প্রক্রিয়ায় স্ট্যানকোভিকের সুবিশাল রিসার্চ গ্রুপের অনেকের সাথে আমাকেও সাপোর্টিং রোলে থাকতে হচ্ছে। কারণ, সে আমারও শিক্ষক, আমার পিএইচডি অ্যাডভাইজার, আমার অ্যাকাডেমিক ফাদার, বিনা কারণে পছন্দ হয়ে যাবার মত একজন মানুষ। সবাই তাকে প্রফেসর স্ট্যানকোভিক, বিপি আমেরিকা প্রফেসর, বিগম্যান, গড ইত্যাদি ডাকলেও, আমি তাকে ডাকি ‘জ্যাক’। জ্যাক ওর ডাকনাম। ইংরেজিতে সব বড় বড় নামের ছোট ছোট রূপ আছে। রবার্টসনের ডাকনাম ‘রব’, ডেভিডসনের ডাকনাম ‘ডেভ’, মাইকেলের ডাকনাম ‘মাইক’, তেমনি জনের ডাকনাম ‘জ্যাক’। এভাবে দিয়ে চিন্তা করলে ‘জ্যাক’ ডাকনামটি ব্যাতিক্রম, কেননা এখানে ডাকনামটি দৈর্ঘে মূল নাম ‘জন’ এর সমান সমান। এই তথ্যটি আমাদেরকে জ্যাক নিজেই দিয়েছিল। একবার তার লেখা একটি লেকচার নোট কারেকশন করতে গিয়ে সেখানে ‘জন স্ট্যানকোভিকের’ জায়গায় ‘জ্যাক স্ট্যানকোভিক’ লেখা দেখে এনামুল খুব গর্বিত ভঙ্গিতে তাকে জানাতে গেছে- লেকচার নোট তো দেখলাম সব ঠিকঠাক আছে, কিন্তু তোমার নামের বানানই তো ভুল লেখা। এর উত্তরে জ্যাক আমাদের সেদিন আমেরিকান ডাকনামের এই কাহিনী শোনায়। আমরা তখনও ইউভিএ-তে নতুন। এত বিশাল ও ব্যস্ত একজন মানুষের আমাদের মত কতিপয় নিতান্ত ফার্স্টইয়ার গ্র্যাডকে এত ছোট একটি বিষয় এতটা ধৈর্য্য নিয়ে বোঝানো দেখে সেদিনই বুঝতে পারলাম তার নামের মত সে নিজেও ব্যতিক্রমধর্মী একজন মানুষ। বিধাতা যেখানে তার নামকে গোটা রিসার্চ ওয়ার্ল্ডে এত বড় করেছেন, আমেরিকান কথ্যভাষা হয়ত তাই সেটাকে একটুও ছোট করতে পারেনি।

জ্যাক প্রায়শই বড় বড় রিসার্চ সেমিনারে কী-নোট স্পীচ দিয়ে থাকে। কী-নোট স্পিচ হচ্ছে বিশেষ উদ্বোধনী বক্তৃতা যেটা যেন তেন প্রফেসর না হলে দেয়া যায়না। জ্যাক শুরু করে এভাবে, আজকে আমি আপনাদের সবাইকে সাইবার ফিজিকাল সিস্টেমস সম্বন্ধে ধারণা দিচ্ছি। আপনারা কি কেউ জানেন বিষয়টি কী বা এটা নিয়ে আমি কেন এত রিসার্চ করি? আমরা যারা তার ছাত্র তারা জানি যে, সাইবার ওয়ার্ল্ড আর ফিজিক্যাল ওয়ার্ল্ডের ফিউশনে সাইবার ফিজিকাল সিস্টেমসের সৃষ্টি। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, ভবিষ্যতের বুদ্ধিমান যন্ত্রগুলো প্রকৃতি থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য সংগ্রহ করে সেটাকে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রসেসিং করে আবার প্রকৃতিকেই নিয়ন্ত্রণ করবে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা রিসার্চারদের অনেকেই বিষয়টির নামও শোনেনি। সবাই তাই চুপচাপ থাকে বা একটু আধটু গুনগুন করলেও এতবড় প্রফেসরের সামনে কেউ কিছু বলতে সাহস পায়না। জ্যাক তখন পরের স্ল্যাইডে যায়। সেখানে একটি সুপারম্যানের ছবি। সুপারম্যান বডিবিল্ডিং করছে আর সুপারম্যানের মাথার জায়গায় জ্যাকের নিজের মাথা বসানো। সে বলতে থাকে, আমি সাইবার ফিজিকাল সিস্টেমস নিয়ে রিসার্চ করি, কারণ এটা আমাকে প্রতিদিন ভালো সেক্স করতে সাহায্য করে। তার কথা শুনে দেশ-বিদেশ থেকে আগত শত শত রিসার্চারের আক্কেলগুড়ুম- একী বলছে জ্যাক? তারা কি ভুল শুনছে? লোকটা পাগল হয়ে গেল নাকি? নাকি আবার জিনিসটা সত্যি? ইত্যাদি। তাদের গুঞ্জন থামলে জ্যাক ব্যাখ্যা করে বলে, এটা একটা জোকস ছিল। এবার সঠিক জিনিসটা বলছি- সাইবার ওয়ার্ল্ড আর ফিজিক্যাল ওয়ার্ল্ডের সমন্বয়ে সাইবার ফিজিক্যাল সিস্টেমস---। কোন সন্দেহ নেই এধরনের একটি ভূমিকার পর সবাই আগ্রহ নিয়ে পুরো লেকচারটি শুনবে এবং বিষয়টা সবার মনে দাগ কাটবেই। একবার তার লেকচার শেষে অন্য ইউনিভার্সিটির একজন প্রফেসর মন্তব্য করেছিল- দেখ, তোমার এই লেকচারটা আমি আগেও শুনেছি বলে মনে পড়ছে, যদিও সেটার কথা আমার কিছুই মনে নেই, তবে সেক্সের ব্যাপারটা যে তুমি বলেছিলে সেটা আমার এখনও খেয়াল আছে।

মিস বারিটোর অধিনে আমাদেরকে যে ল্যাংগুয়েজ ক্লাস করতে হচ্ছে সেখানেও আমাদের প্রত্যেককে একটি করে প্রেজেন্টেশন করতে হয়েছে ট্রেনিংয়ের অংশ হিসেবে। সেমিস্টারের শেষের দিকে একদিন বারিটো আমাদের সবাইকে নিজ নিজ কালচারের সাথে মানানসই কিছু একটা প্রেজেন্ট করতে হবে ঘোষনা করলেন। ক্লাস করতে মজা, কিন্তু হোমওয়ার্ক মানেই ঝামেলা। তারপরও কদিন খেঁটে খুঁটে কিছু একটা দাঁড় করালাম। নির্ধারিত দিনে আমরা সবাই যার যার স্লাইড নিয়ে হাজির। কে কি বানিয়েছে সেটা নিয়ে সবার মাঝেই কৌতূহল। প্রথমে এক চায়নিজ শুরু করল তার প্রেজেন্টেশন। শুরুতে খানিকক্ষণ সময় লাগল এটা ঠাওর করতে যে সে চায়নীজ বলছে নাকি ইংরেজি। তার ইংরেজি শুনে সত্যি বলতে আমার কান্না পাচ্ছিল। অনেক কষ্টে একসময় বুঝতে পারলাম, সে 'মাটির পুষ্টি' বিষয়ক কিছু একটা প্রেজেন্ট করছে। এমনিতেই যে ইংরেজির বাহার, তার ওপর সবাই আশা করছিলাম চায়নিজ কালচারের কোন একটা কিছু তার কাছে শুনব, তাই প্রথমে বুঝতেই পারিনি সে আসলে কি বলতে চাচ্ছে। প্রেজেন্টেশন শেষে সে বারিটোর কাছে একটা ঝারি খেল কেন এই টপিক বেছে নিয়েছে সেজন্য। আমাদেরও একই প্রশ্ন। আমরা সবাই আমাদের নিজেদের কালচারের ওপর প্রেজেন্টেশন নিয়ে এসেছি। সে কেন ‘মাটির পুষ্টি’ নিয়ে প্রেজেন্টেশন বানিয়েছে এটা আমরা কেউ বুঝতে পারলাম না। বাসায় এসে খাবার টেবিলে খেতে বসে যখন মুনিরকে এ গল্প বলছি, তখন মুনির জিজ্ঞাসা করল, মাটি থেকে বেশি পানি-টানি শুষে নেয় এই টাইপ গাছের উদাহরণ ছিল স্লাইডে? আমি একটু বিস্মিত হয়ে বললাম, হ্যাঁ। বিস্ময়ের কারণ, মুনিরের এই জিনিস কোনভাবেই জানার কথা না। সে গত সেমিস্টারেই কোর্সটি করে ফেলেছে, এবার সে এই কোর্সে নেই। মুনির বলতে লাগল, এটা নির্ঘাৎ চোথা। গত সেমিস্টারে আমাদের সাথেও এক চায়নিজ ছাত্র একই কাজ করে। আমি সিওর- এটা সেই চোথা। এ পর্যায়ে আমি নির্বাক।

দ্বিতীয় যে চায়নিজ ছেলেটা প্রেজেন্টশন করল, তার টপিকটা অবশ্য বেশ মজার। সে আমাদের চায়নিজ বর্ণমালা সম্বন্ধে ধারণা দিল। চায়নিজ বর্ণমালায় কিছু কিছু বর্ণ আছে যাদেরকে বলা হয়- 'পিক্টোগ্রাম'। এগুলো ছোট ছোট ছবির মত। যেমন, 'গাছ' বোঝাতে হলে আঁকতে হবে মূল-কান্ড বিশিষ্ট গাছের ন্যায় দেখতে একটি সিম্বল। 'বন-জঙ্গল' বোঝাতে হলে এরকম দুটো গাছ আঁকতে হবে পাশাপাশি। একটা মানুষ দু'হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে আছে- এটা দ্বারা বোঝায় 'বড়'। 'চাঁদ' বোঝাতে ইংরেজি 'ডি' এর মত সিম্বল, আর 'বৃষ্টি' বোঝাতে তিনটি পানির ধারা। 'ছেলে' বোঝাতে মানুষের মত একটা সিম্বল, আর 'মেয়ে' বোঝাতে হলে সে সিম্বলটাকেই আরেকটু পেঁচিয়ে জটিল করে দিতে হয়। এরকম বাস্তববাদী বর্ণমালা দেখে বেশ মজাই লাগল। প্রেজেন্টেশন শেষে আমি প্রশ্ন করি- এ ধরনের সিম্বল আঁকতে তোমাদের কষ্ট হয়না? সে উত্তর দিল, এরকম একটা বা দুটো সিম্বল দিয়েই ওরা অনেক বড় বড় কথা বুঝিয়ে ফেলতে পারে, এতেই নাকি কষ্ট বরং কম হয়। আমার মনে হলে লাগল, ব্লগিংটা যদি বাংলার বদলে চায়নিজে শুরু করি তাহলে খাটনি অনেক কমে যাবে। ল্যাংগুয়েজ ক্লাসটিকে নিয়ে ব্লগ লেখার জন্য খুব বেশি সিম্বল হয়ত লাগবে না- দশটি মানুষ (ছয়টি সহজ ও চারটি জটিল মানুষের সিম্বল), একটি বুড়ি (মহা জটিল সিম্বল), বড় একটি ক্লাসরুম (বড় বোঝাতে প্রসারিত হাত মানুষ সিম্বল ও ক্লাসরুমের জন্য আমার ধারণা এখানে একটা বিল্ডিং আঁকলেই হবে)- ব্যস শেষ।

আমাদের মধ্যে প্রথমে তনিমা গেল প্রেজেন্ট করতে। তার টপিক- 'জামদানি শাড়ি'। শাড়ির প্রতি দেখলাম চায়নিজ মেয়েদের দারুন আগ্রহ। প্রেজেন্টেশনের পরতে পরতে প্রশ্ন। এটা কি করে পরে? এর দাম কত? এরকম একটা শাড়ি কতদিন লাগে বানাতে? আমাদের এনে দিতে পারবে?- এরকম হাজারো প্রশ্নবাণে মেয়েগুলি তনিমাকে জর্জরিত করে ফেলল। আমি মনে মনে বললাম, হে চীনদেশীয় মেয়েসকল, তোমরা যতই শাড়ি পরিধান কর, বাঙ্গালি নারীর সৌন্দর্য্য কোনদিনও অর্জন করতে পাবেনা। তোমাদের কাজ হাফপ্যান্ট পরে অলিম্পিক গেমসে স্বর্ণজয় করা- তোমরা সেই কাজেই যথাযথ মনোনিবেশ কর। তনিমার এই প্রেজেন্টেশনে আমিও অনেক কিছু শিখলাম। জামদানী শাড়ির নাম হাজার বার শুনলেও আগে কখনও চিন্তা করে দেখিনি এর মাঝে এত বিশেষত্ব থাকতে পারে। আমার ধারণা মেয়েদেরকে যে কোন শাড়িতেই সুন্দর দেখায়, শাড়ির টাইপের সাথে সৌন্দর্য্য কম-বেশি হয় কিনা এটা এখন একটা পর্যবেক্ষণের বিষয়। কিন্তু এই মার্কিন মূল্লুকে জামদানী শাড়ি পরিহিতা রমণী আমি কোথায় পাই? আনমনে কারো কথা মনে পড়ে যাবার সম্ভাবনা দেখা দিতেই নিজেকে নিজেই ঝারি দিলাম, ক্লাসে মনযোগ দাও।

তনিমার পর এনামুলের পালা। বাংলাদেশের অকল্পনীয় সুন্দর ও রোমান্টিক প্রাকৃতিক বেলাভূমি কক্সবাজারকে সে অকল্পনীয় সাদামাটা ও সহজাত আন-রোমান্টিক ভঙ্গিতে প্রেজেন্ট করল। আমি আশা করেছিলাম কক্সবাজারের সুন্দর সুন্দর অনেক ছবি থাকবে প্রেজেন্টেশনে। কিন্তু দেখা গেল বেশিরভাগ স্লাইডই টেক্সট দিয়ে ভরা। শুধুমাত্র শেষ স্লাইডটিতে সমূদ্র সৈকতের একটি ছবি, তাও আবার ঝাপসা। আরেকটু হতাশ হলাম কুয়াকাটা, সেন্টমার্টিন্স, ছেড়াদ্বীপ এসবের উল্লেখ থাকলেও, কোন ছবি নেই। প্রেজেন্টেশন চলাকালে সে অবশ্য আকারে-ইঙ্গিতে বিভিন্নভাবে বোঝানোর চেষ্টা করছিল কক্সবাজারের সাথে কুয়াকাটা বা সেন্টমার্টিন্সের পার্থক্য- কুয়াকাটায় পানিতেই সূর্য উঠে কিভাবে পানিতেই অস্ত যায়, কক্সবাজারে সূর্য না উঠেই কিভাবে শুধু অস্ত যায়, সেন্টমার্টিন্সে কেন কোন ডাইরেক্ট বাস নেই ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি জায়গাতেই গিয়েছি, তাই আমি বুঝতে পারছিলাম সে কী বোঝাবার চেষ্টা করছে। কিন্তু যারা বাংলাদেশের নামই শোনেনি তাদেরকে শুধু তথ্য আর টেক্সট দিয়ে এসব বোঝানো কঠিন। আমার ধারণা, আমাদের দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য কিংবা আমাদের সংস্কৃতির বিষয়াদি নিয়ে অনলাইনে তেমন ভালো আর্কাইভ নেই যেখান থেকে কোন একজন এ সম্বন্ধে জানতে পারবে বা অন্যকে জানাতে পারবে। এনামুলের প্রেজেন্টেশন এই সত্যটাকেই আমার সামনে তুলে ধরল।

চায়নিজ মেয়ে লু-য়ের পালা। ছিমছাম সুন্দর একটি মেয়ে। তিনজন চায়নিজ মেয়ের মাঝে একে নিয়েই যা একটু আগ্রহ ছিল, প্রেজেন্টেশনের বিষয় দেখার পর সেটা এক মূহুর্তে গায়েব। তার প্রেজেন্টেশনের বিষয় ‘চায়নিজ বিয়ে’। লু- তার নিজের বিয়ের সব ছবি দিয়ে সুন্দর করে প্রেজেন্টেশনটি সাজিয়েছে। এখানকার চায়নিজ স্টুডেন্টদের লাইফস্টাইল দেখে আমার ধারণা হয়েছিল এদের কালচারে বোধহয় বিয়ে বিষয়টি নেই। আমাকে ভুল প্রমাণ করে সে চায়নিজ কালচারের বিয়ের সবগুলি ধাপ একটা একটা করে বর্ণনা করল। বিয়ে শুরু হবে কোন একদিন সকালবেলা কনের বাড়িতে বরের আগমনের মাধ্যমে। কনে এবং তার সখীরা দরজা খুলবেনা, যতক্ষণ না পর্যন্ত বর ও তার সাথীরা বিভিন্ন বিষয়ে প্রমিস করে। এরপর দরজা খোলার পর বর-কনে মিলে বয়জৈষ্ঠ্যদের আশীর্বাদ নেবে। এই স্টেপটিতে একটা ফাঁক আছে মনে হলো। যেমন, কলেমা পড়ানো বা হিন্দুদের সাত পাক টাইপ কোন ধর্মীয় রীতির ব্যাপার আমি দেখলাম না। চায়নিজদের আসলে কোন ধর্ম-টর্ম নেই। এরা যা ইচ্ছা কিছু একটাকে নিয়ম বানিয়ে ফলো করছে বলে মনে হলো। বিয়ের রাতে বর ও কনের পরিবারের যৌথ উদ্যোগে বিশাল একটা খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করা হয়। গিফটের ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং। অতিথিরা যার যা সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু টাকা (ইয়েন) একটা লাল কাপড়ে মুড়ে বর বা কনের হাতে দিয়ে যায়। খাওয়া-দাওয়ার পর্ব শেষ হলে বাচ্চা-বুড়োদের বিদেয় দিয়ে, শুধু বন্ধু বা পড়শিরা, বর ও কনেকে ঘিরে ধরে। এরপর ট্রুথ অর ডেয়ার টাইপ একটা খেলা খেলা হয়। সবাই সন্তুষ্ট হয়ে বিদেয় হলেই কেবল বর ও কনে একটু একা হতে পারে। এরপর হ্যাপিস-এন্ডিংস।

বাকিদের প্রেজেন্টেশন নিয়ে বলার তেমন কিছু নেই। ইন্ডিয়ান ছেলেটা বসন্ত উৎসব নিয়ে প্রেজেন্ট করল। এটা মনে হলো আমাদের দেশের পহেলা ফাল্গুনেরই ইন্ডিয়ান সংস্করণ। চায়নিজ মেয়ে লিউ প্রেজেন্ট করল চায়নীজ একটি রেসিপি। যা তৈরি হলো শেষ পর্যন্ত সেটার চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে জিনিসটা একটা অখাদ্য। চায়নিজ রান্নার সাথে আমি সামান্য পরিচিত। ডায়নিং হল বন্ধ থাকায় আমার তাইওয়ানের বন্ধু চি-হাউ একবার বেশ বিপদে পড়ে যায়। সে ডর্মে থাকে এবং ডায়নিং রুমে খাওয়া দাওয়া করে। সেমিস্টার ব্রেকে ডায়নিং বন্ধ থাকায় তার খাওয়া দাওয়ার সমস্যা। আমেরিকায় যে কোন জায়গায় লাঞ্চ বা ডিনার করতে গেলে ১০ ডলারের কমে ভালো কিছু পাওয়া যায়না। তার ওপর এসব খাবার পর পর দুদিন কারো ভালো লাগার কথা না। আমি একবার তার ডর্মে বেড়াতে গিয়ে এই সংবাদ শুনলাম। প্রস্তাব করলাম চলো আজকে তোমাকে রান্না করে খাওয়াই। সে রাজি। আমাকে সে নিচের কমন কিচেন দেখিয়ে দিল। আমি ম্যাকগাইভার স্টাইলে রান্নাঘরের ভেতরে চারপাশে তাকিয়ে কি দিয়ে কি রান্না করা যায় চিন্তা শুরু করে দিলাম। ফ্রিজে আছে আস্ত ব্রকলি (ফুলকপি টাইপ সবুজ সবজি) আর ডিম। কোন মসলা নেই। আমি হাল ছেড়ে দিয়ে বললাম তোমরা রান্না কর কি দিয়ে? সে যা বলল তাতে বুঝলাম, রান্না শব্দের অর্থ পানি দিয়ে কোন কিছু সিদ্ধ করা। কোন কিছু যদি সস আর তেল দিয়ে ভাজি করা হয়, তবে তা হচ্ছে অমৃত। আমি বললাম, আমার মসলা চাই। সে অনেক খোঁজাখুঁজি করে অন্য একজনের কাবার্ড থেকে কিছু মসলা জোগাড় করল। তখন আমেরিকায় আসার মাত্র মাস তিনেক হয়েছে। রান্নার মধ্যে পারতাম শুধু মুরগি আর ডাল। চিন্তা করে দেখলাম মুরগির রেসিপি দিয়েই কাজ হয়ে যাবার কথা। মসলা মাখিয়ে, তেল-পেয়াজ দিয়ে ভেজে, পানি দিয়ে বসিয়ে দিলেই শেষ। শুধু মুরগির জায়গায় থাকবে ব্রকলি- এইটুকুই পার্থক্য। কাজ শুরু করে মাঝপথে আবিষ্কার করলাম- পেঁয়াজ নেই। আমি পেঁয়াজ চাইলে সে বলে, সেটা আবার কী? আমি চিন্তায় পড়লাম, পেঁয়াজ এখন আমি একে কিভাবে চেনাই। আকার ইঙ্গিতে বোঝানোর পর সে বলল, ওহ, তুমি গারলিকের কথা বলছ? ওটার একটা সস আছে আমার কাছে। গারলিক হচ্ছে রসূন। তাইওয়ানের সব রান্না নাকি রসূন দিয়ে করা হয়। ওরা পেঁয়াজ ব্যবহার করেনা। আমাকে জিজ্ঞাসা করল, তোমরা কি দিয়ে রান্না কর? পেঁয়াজ নাকি রসূন? আমি বললাম, সব। বাংলাদেশি তরকারিতে ব্যবহার হয়না এরকম কোন কিছু এখনো আবিষ্কার হয়নি। শুধু অ্যালকোহলের ব্যবহার আমাদের ধর্মে নিষেধ। আমি তাকে আমাদের দেশীয় পদ্ধতিতে সিদ্দিকা কবীরস রেসিপি প্রোগ্রামের মত করে প্রতিটি স্টেপ দেখিয়ে রিয়েল লাইফ লেসন দিয়ে দিলাম কি করে যে কোন কিছু রান্না করা যেতে পারে। আমার প্রেজেন্টেশনে সে মুগ্ধ। রান্না শেষে আমি সেই তরকারি এক চামচ খেয়ে বিব্রত হলেও চি-হাউ সেটার স্বাদ ও গন্ধে মুগ্ধ। খাওয়া শেষে আমাদের দেশীয় রান্নাবান্না নিয়ে তার চরম আগ্রহ দেখে বুঝলাম, আমি এযাত্রায় ভালোভাবে পাশ। মিস বারিটোর ক্লাসে মিস লিউ-কে আমি মনে মনে ফেইল মার্কস দিলেও অনেকেই দেখলাম প্রেজেন্টেশন শেষে তার ইমেইল অ্যাড্রেস চাইছে রেসিপিটা পাবার জন্য। রেসিপি কিংবা মিস লিউ- কারো প্রতিই বিন্দুমাত্র আকর্ষণ না থাকায় আমি আর সেটাতে আগ্রহ দেখালাম না। (বাকীটুকু একটু বাকি)
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/28962195 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/28962195 2009-06-09 13:01:29
এইংলিশ, এইংলিশ, এইংলিশ (২) আগের লেখাটিতে চায়নিজদের ইংরেজির বেহাল দশার কথা বলছিলাম। এবারে অন্যান্য কিছু দেশ ঘুরে আসা যাক। দেখতে চায়নিজদের মত হলেও কোরিয়ানদের কথাবার্তা আরও ইন্টারেস্টিং। কোরিয়ানরা সব কথাই উচ্চারণ করে দু-ঠোঁট প্রায় বন্ধ করে। এদের কথা শুনলে মনে হবে কথাগুলো মুখ দিয়ে না বেরিয়ে বরং উল্টো মুখের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। ডিপার্টমেন্টে আমার পাশের ডেস্কে বসত জিয়ান লু নামের এক কোরীয়ান। বর্তমানে সে মাইক্রোসফটে কাজ করছে। তার সাথে কথা বলার সময় হঠাৎ করে আমি বুঝতাম না আওয়াজ কোত্থেকে আসছে! মাইক্রোসফটের ইন্টারভিউ সে কী করে অ্তিক্রম করল এটার হিসেব আমি এখনও মেলাতে পারিনা। (মাইক্রোসফটেও মিস বারিটোর মত ল্যাংগুয়েজ ইন্সট্রাকটর আছে কিনা কে জানে?) চায়নীজ-কোরিয়ানদের তুলনায় ইন্ডিয়ানদের উচ্চারণ অবশ্য অনেক ভাল। তারপরও এদের উচ্চারণে ইন্ডিয়ান আঞ্চলিকতাটা স্পষ্ট বোঝা যায়, যেটা আমাদের অনেকের কাছেই শুনে বেশ বিরক্তি লাগে। বিশেষত যারা তামিল ভাষায় কথা বলে, তারা ইংরেজি বললেও মনে হয় যেন তামিল শুনছি। এছাড়া বেশিরভাগ ইন্ডিয়ানদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য যে এরা কথা বলার সময় খুব জোরে জোরে মাথা নাড়াতে থাকে। আমি বুঝি না এরকম দুটো চক্কর দেবার পরই তো মাথা ব্যাথা শুরু হবার কথা, অথচ ওরা দিব্যি সারাদিন চক্কর দিয়ে যাচ্ছে। এটা আমি আগে খেয়াল করিনি, আমাকে পরিচিত একজন জিনিসটা বলার পর থেকে আমি খেয়াল করে দেখেছি বিষয়টা সত্য।

আমেরিকানদের সবার উচ্চারণও যে খুব শ্রুতিমধুর তা নয়। দু-একজন আছে যাদের কথা শুনলে মনে হয় ইচ্ছে করেই তারা আমাদের সাথে এমন ভাবে কথা বলে যেন বুঝতে গিয়ে আমাদেরকে বেশ বেগ পেতে হয়। এখন আমরা এসবে অভ্যস্ত হয়ে গেছি বিধায় কোন সমস্যা হয়না, তবে খুব শুরুর দিকে এদের কথা শুনে মনে হত ক্যাসেট প্লেয়ারের ফিতে বেশ জোরে ফরওয়ার্ড করলে যে এক ধরনের নয়েজ হয়, অমন করে কিছু বলছে। তখন ওরা অনেকক্ষণ কথা বলার পর কিছু জিজ্ঞাসা করলে আমরা শুধু তাকিয়ে থেকে হাসতাম, আর 'ইয়া, হুমম, ইয়েস, ওওও, আহা, নাইস'- এসব উত্তর দিতাম যেটার মানে হ্যাঁ-না সবকিছুই হতে পারে। কেউ কিছু বলছে, যেটা আমার বোঝার কথা অথচ আমি কিছুই বুঝতে পারছি না- এটা যে কি দুঃসহ একটা পরিস্থিতি সেটা এই পরিস্থিতিতে না পড়লে বোঝা অসম্ভব। কেউ যদি মনে করে থাকে যে, সে ইংরেজিতে অনেক বেশি স্মার্ট- ঢাকার বড় বড় ফাস্ট ফুডের দোকানে খুব ভাব নিয়ে ইংরেজিতে অর্ডার করেছি কত্ত, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে তো ইংলিশ ছাড়া আমি কঠাই বলিনা, হাফপ্যান্ট পড়েই তো আমি শপিংয়ে বেরোই সবসময়, মেটাল-রক-গোথিক এসব আমার লাইফ-- এখানকার আসল আমেরিকান লাইফ দেখলে তাদের সব লাফালাফি একবারেই বন্ধ হয়ে যাবে। প্রয়োগের অভাবে হয়ত আমাদের দেশের বেশিরভাগ ছেলেমেয়েরা ইংরেজিতে একটু 'কাঁচা' হয়ে থাকে, কিন্তু যাদের মাঝে 'আঁটি'ই নেই তাদের এসব ভাব নেয়া যে কত্ত বিশাল গাধামি সেটা তারা বুঝলে আমাদের দেশের তারুণ্য আজ অনেক সুন্দর হত।

নেটিভদের মাঝে আরেক প্রজাতি হচ্ছে- 'কালো'। আমেরিকায় 'ব্ল্যাক' বা 'নিগ্রো' এধরণের শব্দ উচ্চারণ করা আইনত নিষিদ্ধ। এ যুগে হয়ত সাদা-কালো বিভেদ স্পষ্টভাবে কোথাও নেই, তবে কালচারে এ-দুজাতের বিশাল পার্থক্য। ভাষার ক্ষেত্রেও উচ্চারণেও আছে অনেক তফাৎ। এরা আধো কথা মুখে রাখে আর আধো কথা উচ্চারণ করে। আমি খেয়াল করে দেখেছি এরা প্রতিটি শব্দের ঠিক অর্ধেকটুকু উচ্চারণ করে এবং বাকি অর্ধেক উহ্য রাখে। ইউভিএ-তে কালো স্টুডেন্টদের সংখ্যা অনেক কম। এখানে কালোরা মূলত শ্রমজীবি বা বলা যায় শ্রমজীবিরা মূলত কালো। দোকান-পাট, কন্সট্রাকশনের কাজ, সিটিবাস, ক্লিনিং, মেইনটেনেন্স- এসব কাজেই আমি প্রধানত কালোদের দেখেছি। এদের 'আধো কথা' না বুঝলে যদি বলি- 'সরি, আমি বুঝতে পারিনি, আবার বলবেন?', সে ক্ষেত্রে ওরা আবার বলবে, যতবার বলি ততবার বলবে, কিন্তু তাও একবারও সুন্দর করে বলবে না। 'সৌন্দর্য্য' বিষয়টি এদের বেশিরভাগের মাঝেই অনুপস্থিত। দীর্ঘদিন শেতাংগদের অন্যায়ের সাথে লড়াই করে কোনমতে টিকে থাকতে থাকতে এদের অনেকের মাঝেই বোধহয় সৌন্দয্য, কোমলতা এসব জিনিস বিকশিত হতে পারেনি।

প্রতি মূহুর্তে এসব হরেকদেশের হরেকরকম ইংরেজি শুনে-বুঝে-কথা বলে- ক্লান্ত হয়ে যখন এনামুল-তনিমা-মুনির অথবা তানিয়া আপার ডেস্কে গিয়ে দু-বাক্য বাংলা বলতে পারি তখন মনে হয় প্রাণে বুঝি একটু স্বস্তি এসেছে।

ইংরেজি ক্লাসে আমাদের অনেক বিচিত্র বিচিত্র কাজ করতে হচ্ছে। কিছু আছে খুব বাচ্চাদের কাজ আবার কিছু আছে সত্যিই বেশ দরকারি। মজার মজার অনেক কিছুও এসময় জানা যায়। যেমনঃ উচ্চারণে পার্থক্যের কারণে যে অর্থ কত বদলে যেতে পারে সেটার উদাহরণ হিসেবে মিস বারিটো একদিন চায়নীজ ভাষায় 'মা' শব্দটির কথা বললেন। চায়নিজ ভাষায় 'মা' কথাটির অর্থ নাকি 'মা', 'দড়ি', 'অভিশাপ' কিংবা 'ঘোড়া' যে কোন কিছু হতে পারে। বারিটোর অনুরোধে একজন চায়নিজ ছাত্র একদিন চারটি উচ্চারণই আমাদেরকে করে শোনায়। আমরা কেউ প্রথম তিনটিতে কোন পার্থক্য বুঝলাম না, কেবল 'ঘোড়া' বোঝানোর সময় ঘোড়ার ডাকের মত করে কাঁপা গলায় 'মা--' উচ্চারণ করাতে আমরা সেটা বুঝতে পারলাম। বুয়েটের হিসেবে এই ছেলের নাম এখন থেকে 'ঘোড়া' হয়ে যাবার কথা। কিন্তু এখনও কেন হয়নি সেটা বুঝে উঠতে পারছিনা।

দরকারি জিনিসে আমার আগ্রহ কম হওয়া সত্ত্বেও আমি বেশ কিছু ভালো জিনিস শিখেছি এই কোর্সে। যেমনঃ লেখায় রেফারেন্স যুক্ত করার যে এত স্ট্যান্ডার্ড থাকতে পারে তা আমার জানা ছিলনা। অনেক সময় বইতে কোন থিওরাম কিংবা কাজের কথা উল্লেখ করতে লেখকের নাম ও নামের পাশে একটা সন ব্রাকেটের ভেতরে লেখা থাকে, যেমনঃ (নিউটন ১৬৬৬)। আমি এতদিন এটাকে লেখকের জন্মসাল ভাবতাম। এই ক্লাসে এসে জানতে পারি যে এটা আসলে কত সালে লেখাটি ছাপা হয় সেটা বুঝাচ্ছে। এছাড়াও এক ক্লাসে আমাদেরকে শেখানো হলো অনলাইনে কি করে ইউভিএ'র লাইব্রেরি থেকে বই, জার্নাল, থিসিস ইত্যাদি সার্চ করে ইস্যু করা যায়। এসব আমরা আগে থেকে জানলেও নতুন জানতে পারলাম ইউভিএ লাইব্রেরির স্পেশাল রাইটস এর কথা, যার বদৌলতে বিশ্বের যে কোন লাইব্রেরি বা জার্নাল থেকে আমি বই, আর্টিকেল ইত্যাদি ইস্যু করতে পারি এবং ইউভিএ কতৃপক্ষ সেটার সফট কপি তিনদিনের মাঝে এবং যে কোন হার্ডকপি দু-সপ্তাহের মধ্য এনে দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এ কথা বাসায় এসে মুনিরকে শোনানো মাত্র মুনির বলতে থাকে- 'হায় হায়, তাইলে তো আমরা হুমায়ূন আহমেদের সব নতুন বই অর্ডার দিতে পারি এখন থেকে! বইমেলাতে বই বের হলেই সাথে সাথে আমরা দিব অর্ডার।' আমি অবশ্য এ ব্যাপারে তাকে কোন আশ্বাস দিতে পারলাম না। চিন্তায় পড়ে গেলাম, আমি কি 'বিশ্বের যে কোন লাইব্রেরি' শুনেছি নাকি 'আমেরিকার যে কোন লাইব্রেরি' শুনেছি। তখন মনে হলো আমার এ প্রশ্নের উত্তর একমাত্র স্বর্ণকেশী, বাকপটু, অমায়িক, প্রতিভাময়ী, কো-অর্ডিনেটর অফ ব্রাউন লাইব্রেরি ক্যাথরিন-ডি-স্যুলেই সঠিকভাবে দিতে পারবে। ইস, মানুষ কার্ড দিলে সেটা সাথে সাথে ফেলে দেবার অভ্যাসটা যে কেন করেছি!

ইংরেজিতে কথাবলার পাশাপাশি প্রফেশনাল লাইফে আরেকটি জিনিস খুব গুরুত্বপূর্ণ, সেটা হলো প্রেজেন্টেশন। বুয়েটে পড়ার সময় আট সেমিস্টার মিলিয়ে বড় জোর দু-তিনটি প্রেজেন্টেশন করতে হয়েছে। আমরা এটাকে খুবই অপছন্দ করতাম এবং সেসব স্যাররা প্রেজেন্টেশনের কথা বলতেন তাদেরকে আমরা অহেতুক ঝামেলা সৃষ্টিকারী টিচার মনে করতাম। এখানে এসে যেটা দেখি চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে সব প্রফেসরই খুব সিরিয়াসলি জিনিসটাকে দেখেন এবং আমাদেরকে উৎসাহ দেন আরও সুন্দর করে প্রেজেন্ট করার প্রতি। আমাদের হেড অফ দ্য ডিপার্টমেন্ট মিস ম্যারি একবার খুব সুন্দর একটি কথা বলেছিলেন। তার ভাষ্য মতে, একজন রিসার্চারের নিজস্ব রিসার্চের বিষয়ের ওপর চার রকমের স্পীচ সবসময় তৈরি রাখতে হবেঃ দুই-মিনিট স্পীচ, পাঁচ-মিনিট স্পীচ, পনের-মিনিট স্পীচ ও এক ঘন্টার স্পীচ। দুই-মিনিটের স্পীচ হচ্ছে 'এলিভেটর স্পীচ', অর্থাৎ আপনি কারো সাথে লিফটে করে যাচ্ছেন এবং সে জিজ্ঞাসা করল- 'ভাই, আপনি কি নিয়ে কাজ করেন?'। তখন তাকে দিতে হবে দু-মিনিটের একটি এলিভেটর স্পীচ। পাঁচ-মিনিটের স্পীচ হচ্ছে কোন পার্টিতে যখন দুজন রিসার্চারের দেখা হবে তখন পান-পাত্রে চুমুক দিতে দিতে তাকে দিতে হবে পাঁচ-মিনিটের 'পার্টি স্পীচ'। পনের মিনিটের 'কনফারেন্স স্পীচ' হচ্ছে নিজের গবেষণা পত্র কোন কনফারেন্সে উপস্থাপনের জন্য। আর এক ঘন্টার স্পীচ হচ্ছে পিএইচডি ছাত্রদের জন্য ভয়াবহ 'ডিফেন্স স্পীচ' যেটার পাস-ফেলের ওপরই আপনার সবকিছু নির্ভর করছে। (আরেকটু বাকি)
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/28932172 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/28932172 2009-04-01 12:24:56
এইংলিশ, এইংলিশ, এইংলিশ
এটা আমেরিকান ইউনিভার্সিটিগুলোর বৈশিষ্ট্যও হতে পারে, আবার ইউনিভার্সিটি অফ ভার্জিনিয়ার অগণিত উচ্চাকাঙ্খার একটিও হতে পারে- কোনটা সঠিক সেটা বলতে পারছি না- তবে বিষয়টি হচ্ছে, ইউভিএ চায় তার একজন ছাত্র যখন কথা বলবে বা যখন কিছু লিখবে, তখন যেন তার কথা শুনে বা তার লেখা পড়ে বোঝা না যায় সে কি নেটিভ আমেরিকান, নাকি বাইরের কেউ। ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টদের পুরোদস্তুর আমেরিকান বানানোর এ মহাপ্রয়াশ যত মহৎ-ই হোক না কেন, গ্র্যাডস্কুলের ঠাসা কোর্স সিডিউল আর নানান রিসার্চ গ্রুপের সাথে বেলা-অবেলার মিটিংগুলোর ভীড়ে বাড়তি একটি কোর্স যোগ হওয়াতে একটু আক্ষেপই হতে লাগল। ব্যস্ততার মাত্রা বোঝাতে উদাহরণ হিসেবে প্রায়দিনের একটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে- চুলোয় মাংস চড়িয়ে দিয়ে বসে আছি রান্না শেষ হবার জন্য, এদিকে ক্লাসের আগে ডিপার্টমেন্টে পৌঁছাবার শেষ বাসটি আসবে ঠিক ১৮ মিনিট পর। বাসা থেকে নেমে বাসস্ট্যান্ড যেতে লাগবে বড়জোর ২ মিনিট। তাই মাংস সেদ্ধ হোক আর না হোক, আমাকে ১৪ মিনিট পর সেটাকে নামিয়ে ২ মিনিটে খেয়ে দৌড় দিতে হবে। এরচেয়েও ভয়াবহ দিন আসছে আন্দাজ করেই মনে মনে একটু দমে গেলাম। তার ওপর যখন এনামুল এসে তার নির্দয় হাসি সহকারে বলতে লাগল- ''ভাইয়া, আপনিও চিঠি পাইছেন--হাঃ হাঃ হাঃ"- তখন মনে হতে লাগল, এই দিন দেখার জন্য বেঁচে আছি?

প্রতি সোমবার বেলা বারোটায় ক্লাস। এর অর্থ এখন থেকে আমাদের সপ্তাহ শুরু হবে ইংরেজি শিক্ষার আসরের মাধ্যমে। একখানা রুলটানা খাতা হাতে নিয়ে বিরস মনে প্রথমদিন ক্লাসে গেলাম। (এখানে উল্লেখ্য যে আমেরিকায় সব খাতাই রুলটানা হয়ে থাকে। আমি এখানে এসে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও পুরো সাদা পেইজের খাতা কোন দোকানে পাইনি। খাতাগুলোর আকৃতিও ডিমাই সাইজের চেয়ে অনেক ছোট, আর বাম পাশের মার্জিনের বাইরে পাঞ্চমেশিন দিয়ে তিনটি ছিদ্র করা থাকে।) স্কুলের বাচ্চাদের মত রুলটানা খাতা নিয়ে ক্লাস করতে যাচ্ছি- ভাবতে মোটেও ভালো লাগছিল না। ক্লাসে ঢুকেই বুঝতে পারলাম আমি একা নই- আমার সাথে আরও বেশকিছু সৌভাগ্যবান ছাত্র-ছাত্রী আছে। গুনে দেখলাম- এই ব্যাচে আমরা সর্বসমেত দশজন। চারজন মেয়ে ও ছয়জন ছেলে। আমার সাথে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছে- তনিমা এবং এনামুল। এছাড়া ইন্ডিয়ান ছেলে আছে একজন এবং বাকি ছয়জন চায়নিজ। চায়নিজদের মাঝে তিনজন ছেলে এবং বাকি তিনজন মেয়ে। মেয়ে তিনটির দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বোঝার চেষ্টা করলাম ওদের চেহারার মাঝে পার্থক্য কোথায়? ইউভিএ'তে প্রচুর চায়নিজ ও কোরিয়ান ছাত্র-ছাত্রী পড়াশুনা করে। আমেরিকায় আসার পর প্রথম প্রথম এদের সবাইকে আমার কাছে একই মানুষ মনে হতো। এখন অবশ্য আমি এদের মাঝে কোনটা ছেলে আর কোনটা মেয়ে- এইটুকু বুঝতে পারি। এছাড়াও পরিচিতদেরকে কাছে থেকে দেখলে হয়ত চিনতে পারি। ছেলেদের মাঝে তবুও কিছুটা পার্থক্য বের করা সম্ভব, কিন্তু মেয়েদের চেহারায় পার্থক্য করার ক্ষমতা আমি এখনও অর্জন করতে পারিনি।

ঠিক বারোটায় ক্লাসে প্রবেশ করলেন আমাদের ল্যাংগুয়েজ ইন্সট্রাক্টর মিস বারিটো। প্রথমে নিজের পরিচয় দিলেন এবং আমাদের সবার সাথে সবার পরিচয় করিয়ে দিলেন। উনি জাতিতে ফরাসি কিন্তু দীর্ঘদিন যাবত ইউভিএ'তে আছেন। আমরা বাংলাদেশের স্টুডেন্ট শুনে উনি খুব খুশি হলেন। কম্পিউটার সায়েন্স ডিপার্টমেন্টের হেড মিস ম্যারির একজন ঘনিষ্ট বন্ধু হওয়ায় সম্ভবত বাংলাদেশের ছাত্র-ছাত্রীদের প্রশংসা আগে থেকেই শুনে থাকবেন, সেকারণেই আমাদেরকে নিয়ে তার এই আবেগ। পরিচয় পর্ব শেষে প্রথম 'সবক' হিসেবে উনি আমাদের সবাইকে দিয়ে 'এ' থেকে 'জেড' পর্যন্ত বলিয়ে নিলেন! আমরা সেদিন শিখলাম- স্বরবর্ণ কাকে বলে, ব্যাঞ্জনবর্ণ কাকে বলে, কত প্রকার, কয়টি ও কি কি। এরপর আমাদেরকে দিয়ে ইংরেজি ছোট ছোট তিন অক্ষরের শব্দগুলো উচ্চারণ করানো শুরু করলেন- ক্যাট, স্যাট, প্যাড ইত্যাদি। এসব শব্দ উচ্চারণ করার সময় মুখের ভেতরের বিভিন্ন অংগপ্রত্যংগ কিভাবে নড়াচড়া করবে তা প্রত্যেকের কাছে গিয়ে মিস বারিটো বিশাল হা-করে দেখাতে লাগলেন। এই লেখাটি যারা পড়ছেন তারা হয়ত একটু বিরক্ত হচ্ছেন, কিন্তু যদি একটু কল্পনা করার চেষ্টা করেন যে, একটি ক্লাসরুমে পঁচিশ থেকে সাতাশ বছর বয়েসী দশজন মানুষ (যারা প্রত্যেকেই কোন না কোন বিষয়ে পিএইচডি করছে), একজন আশিতীপর বৃদ্ধার নেতৃত্বে সমস্বরে 'এ-বি-সি-ডি' পড়ছে এবং বৃদ্ধা তাদের ভুল ধরিয়ে দিচ্ছে, তবে ব্যাপারটা ইন্টরেস্টিং লাগার কথা। শুরুতে আমাদের সকলের বিরক্তি লাগলেও আস্তে আস্তে ব্যাপারটা বেশ মজা লাগতে শুরু করল। বিরক্তি মাত্রা অতিক্রম করে হাসিতে পরিণত হচ্ছে, তারপরও সবাই হাসি লুকিয়ে ভদ্রতার খাতিরে খুব গভীর মনোযোগ দিয়ে 'এ-বি-সি-ডি' পড়ে যাচ্ছে। আমি হাসি আটকাতে পারিনা, তাই একবার হেসে ফেললাম। এরপর পুরো ক্লাসে হাসির রোগ ছড়িয়ে পড়তে আর সময় লাগল না। শেষমেশ মিস বারিটোও যখন হাসতে লাগলেন তখন আর কেউ কোন রাখঢাক করল না। ক্লাস শেষে আমরা যেই নিজেদের মাঝে বাংলায় কথা বলা শুরু করেছি, বারিটো একটা আদর মেশানো হুংকার দিয়ে বলে উঠলো- "এইংলিশ, এইংলিশ, এইংলিশ"। আমরা সবাই হাসি দিয়ে সেটার প্রত্তুত্তর করলাম। বারিটোকে শুরুতে কট্টর মনে হলেও, আস্তে আস্তে বুঝতে পারলাম ওতটা খারাপ হবেনা। কেন যেন মনে হতে লাগল, সারা সপ্তাহের পরিশ্রমের মাঝে এরকম একটা ক্লাস থাকাটা বোধহয় খুব একটা মন্দ নয়!

ইংরেজি উচ্চারণ শেখাটা আমার দৃষ্টিতে আমেরিকায় বসবাসকারী প্রত্যেকের জন্যই খুব জরুরী। আমরা অনেকেই ইংরেজিতে কথা বলে যাই অথচ আমার কথা বুঝতে শ্রোতার কতটুকু কষ্ট হচ্ছে সেটা একটুও খেয়াল করিনা। আবার কেউ যখন ইংরেজিতে কথা বলতে আসে তখন তার বলার ধরণ বুঝতে না পারলে নিজেরা আবার ঠিকই তার ওপর বিরক্ত হই। একটা ব্যাপার আমি বুঝতে পেরেছি যে আমরা বাঙ্গালিরা আমাদের একটি নিজস্ব স্ট্যাইলে ইংরেজি বলে থাকি যেটাতে নেটিভরা অভ্যস্ত নয়। যেমনঃ আমি যদি বলি- 'আই ক্যান ডু দ্যাট', তবে শতকরা পঞ্চাশভাগ আমেরিকান বুঝতে পারবে না আমি 'ক্যান' বলেছি নাকি 'ক্যান্ট' বলছি। কিন্তু যদি একটু সময় নিয়ে টান দিয়ে বলি- 'আই কিয়ান ডু দ্যাট' তখন তারা সহজে বুঝতে পারে। আমেরিকান লাইফ অনেক ফাস্ট হতে পারে, ভাষার দিক দিয়ে বাংলা অনেক বেশি ফাস্ট। একারণে ইংরেজি শব্দগুলো সুন্দর করে উচ্চারণ করতে হলে আমাদেরকে একটু সময় ব্যয় করে শব্দের মাঝে যথাস্থানে মাত্রানুযায়ী টান দিয়েই উচ্চারণ করতে হবে। বুয়েটে ওয়ান-ওয়ানে পড়ার সময় একজন ম্যাডাম আমাদের ইংরেজি উচ্চারণ শেখাতেন। উনি প্রথমদিনের ক্লাসে আমাদের বলেছিলেন 'বেবী' শব্দটার সঠিক উচ্চারণ হবে 'বেইবী'। এরপর থেকে সেই ম্যাডামের নামই হয়ে যায় 'বেইবী ম্যাডাম' (ম্যাডাম আমি ক্ষমাপ্রার্থী)। উনি যা শেখানোর চেষ্টা করতেন সেটা তখন হাস্যকর মনে হলেও এখন মনে হচ্ছে যে ওটার দরকার ছিল। তবে আশার কথা যে বাংলাদেশের ছাত্র-ছাত্রীদের ইংরেজিতে অভ্যস্ত হতে খুব বেশি সময় লাগেনা। আমাদের বাংলা বর্ণমালা এত বেশি সমৃদ্ধ যে আমরা আসলে ইচ্ছে করলেই যে কোন শব্দ খুব সহজেই উচ্চারণ করতে পারি।

আশ্চর্যের ব্যাপার যে চায়নিজ বর্ণমালায় হাজার হাজার বর্ণ থাকা সত্ত্বেও ওরাই ইংরেজি উচ্চারণে সবচেয়ে বেশি কাঁচা। যেমনঃ ওরা 'থ' উচ্চারণ করতে পারেনা। ওরা 'আই থিঙ্ক' এর বদলে বলবে 'আই সিঙ্ক', 'থিসিস' এর বদলে বলবে 'সিসিস', 'পাথ' এর বদলে 'পাস', 'থ্যাঙ্ক ইউ' এর বদলে 'স্যাঙ্ক ইউ' ইত্যাদি। আমি অনেক চায়নীজ গ্রাজুয়েটের সাসে কাজ করেছি যারা অন্তত দু-তিন বছর যাবৎ ইউভিএ'তে পড়ছে অসচ এখনও সিক মত 'থ' উচ্চারণ শিখেনি। চায়নিজদের ইংরেজির বেহাল অবস্থার কথা অবশ্য তারা নিজেরাই স্বীকার করে থাকে। তৃতীয় বর্ষের গ্র্যাডস্টুডেন্ট মিং ম্যাও-কে আমি একদিন বলি- 'তোমার কম্পাইলার বইটা আমি কিছুদিনের জন্য নিতে চাই'। সে আমাকে বই খুলে দেখালো বইটির বাইরের কাভার একই হলেও ভেতরে পুরো বই চায়নিজ ভাষায় অনুবাদ করা। তার কাছে শুনে আরও অবাক হলাম যে সে আন্ডারগ্রাড লেভেলে কম্পিউটার সায়েন্সের সব বইয়েরই চায়নীজ অনুবাদ পড়েছে, আর একারণে এখনও ইংরেজি বই পড়তে গিয়ে তার বুঝতে কষ্ট হয়। (বাকিটুকু আসছে)

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/28929655 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/28929655 2009-03-26 13:19:51
থ্যাঙ্কস গিভিং ডিনার, ব্ল্যাক ফ্রাইডে
'থ্যাঙ্কসগিভিং কী, এটা কি কেউ জানো?- বহু বছর আগে প্রথম যখন ইউরোপীয়ানরা এদেশে 'বেড়াতে' আসে, তখন তারা এখানকার চাষ-বাস, শস্য উৎপাদন এসব কি করে করতে হয় তার কিছুই জানতো না। একবার এই 'ভিজিটররা' খাদ্যের অভাবে পড়ে মারা যেতে শুরু করল। তখন নেটিভ রেড ইন্ডিয়ানরা তাদেরকে শেখায় কি করে জমিতে শস্য আবাদ করতে হয়, ফসল ফলাতে হয়। নেটিভদের সহায়তায় ভিজিটররা সেবার প্রচুর শস্য উৎপাদন করে এবং সে যাত্রায় বেঁচে যায়। নেটিভদের সেই অবদানকে স্বীকার করে ভিজিটররা এক বিশাল 'থ্যাঙ্কসগিভিং' এর আয়োজন করে। থ্যাঙ্কসগিভিংয়ের সেই প্রথা আজও আমেরিকা এবং কানাডায় প্রচলিত রয়েছে।' খুব উৎসাহ নিয়ে হুইট আমাদেরকে এই পর্যন্ত বলে থামল। মনে হল, সারাদিন বেশ কয়েকবার প্রাকটিস করে শেষ পর্যন্ত আমাদেরকে কথাগুলো বলতে পেরে একটা দায়িত্ব শেষের আনন্দ এখন তার চোখে-মুখে। থ্যাঙ্কসগিভিংকে নিয়ে গত কয়েক দিনে আমরা বোধহয় ডজন খানেকের মত ভিন্ন ভিন্ন ইতিহাস শুনেছি, তাই এবার আর খুব বেশি মনযোগ দিতে ইচ্ছে করছিলনা। আরেকটা কারণে বরং একটু বেশি চিন্তিত ছিলাম। ঢোকার সময় মার্থা খুব আদিখ্যেতা করে আমাদের ওভারকোট খুলে নিয়ে কই যে গেল, আর আসছেনা। এটাই বঙ্গবাজার থেকে ৮০০ টাকায় কেনা একমাত্র ওভারকোট, এটা হারালে এই হাড়কাপানো শীতে আমার আর রক্ষা নেই।

মার্থা ফিরে এলে, স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে একে একে পরিবারের সবার সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিল। আগেই বলেছি, ওদের চার মেয়ে- লিলিয়ান, মীয়া, গ্রেচেন এবং ম্যাডেলিন। বড়মেয়ে লিলিয়ান একজন আর্কিওলজিস্ট, ওর সাথে ওর বয়ফ্রেণ্ডকেও দেখা গেল। বয়ফ্রেণ্ডটাও আর্কিওলজিস্ট এবং ভাবসাব দেখে মনে হলো ছেলেটা এই বাসাতেই থাকে। বিয়ে-শাদী না করেও একত্রে আছে, এমন দম্পতি প্রথমবারের মত লাইভ দেখলাম। দ্বিতীয় মেয়ের নাম মীয়া। মীয়া একজন ফাইনআর্টস গ্রাজুয়েট। সে এখন অটিস্টিক শিশুদের একটা স্কুলে চাকরী করছে। তৃতীয়জনের নাম গ্রেচেন। গ্রেচেন একজন এ্যাসপাইরিং জার্নালিস্ট আর সর্বকনিষ্ঠ ম্যাডেলিন এখন কলেজ পাস করে ইউনিভার্সিটিতে ঢোকার চেষ্টা করছে। ওর পছন্দ ইউভিএ। খেয়াল করে দেখেছি, এখানে ইউভিএ'র বেশ কদর। আমাদের দেশে যেমন বুয়েটে পড়ার জন্য সবাই একরকম পাগল থাকে, এখানে অনেকটা সেরকম। আমেরিকার 'পাবলিক' ইউনিভার্সিটি গুলোর মাঝে ইউভিএ'র র‌্যাংকিং বর্তমানে দ্বিতীয় স্থানে (ক্যালিফোর্নিয়া বার্কেলি এক নম্বর হলেও প্রায়শই আমাদের হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট নিজেদেরকে যৌথভাবে একনম্বর দাবী করেন)। পড়াশোনার দিক থেকে পাবলিক-প্রাইভেট কোন ভেদাভেদ এখানে না থাকলেও, আমার ধারনা নেটিভ সিটিজেনরা এসব পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে পড়তে চাইলে বিশেষ কিছু সুবিধা পায়। সেজন্য তাদের পছন্দের তালিকায় ইউভিএ থাকেই। এছাড়াও যারা কাছে থেকে একবার এর ক্যাম্পাস দেখেছে, খুব বেশী খুঁতখুঁতে না হলে তারা আর অন্য কোথাও পড়ার কথা চিন্তা করবেনা।

পরিবারের মানুষদের সাথে পরিচয় পর্ব শেষ হলে জন্তু জানোয়ারের সাথে পরিচয় শুরু হলো। (এদের কাছে মানুষের মত জীব-জন্তুও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, সুপারমার্কেট স্টোরগুলোতে কুকুর-বেড়ালের খাবার-দাবার সহ নিত্য প্রয়োজনীয় সকল জিনিসের আলাদা সেকশন থাকবেই। পাখিদের ঘুমের অসুবিধা যেন না হয় সেজন্য অনেক রাস্তাতেই রাতে কোন স্ট্রিটলাইট দেয়া হয়না ইত্যাদি।) ওদের দুটো কুকুর, বেশ কিছু খরগোশ, আস্তাবলে কিছু ঘোড়া, গরু এবং কিছু হাঁসও আছে। কুকুর গুলো ওদের সাথেই গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। একটার নাম 'অস্কার' আর আরেকটার নাম 'আভি'। ওদেরকে জানালাম এই নামে আমাদের ইউনিভার্সিটিতে থিওরীর একজন প্রফেসর আছে। মনে হলো এটা শোনার পর নিজেদের কুকুরকে নিয়ে তারা বেশ গর্বিত। হুইট দূর থেকে আস্তাবলের ঘোড়াগুলোকে দেখালো। শিসের মত বিশেষ একটা আওয়াজ করতেই একটা ঘোড়া আস্তাবল থেকে একটু বেরিয়ে এল। বিশেষ আহামরি কোন ঘোড়া মনে হলনা। পুরানো ঢাকার রাস্তায় যে ঘোড়াগুলো দেখা যায়, ওগুলোকে একটু সাবান ডলে পরিষ্কার করলেই এরকম মনে হবে। তারপরও আমরা বিস্ময় প্রকাশ করলাম যেন এই জীবনে এই টাইপ ঘোড়া কখনও দেখিনি। আমেরিকায় আসার পর এই একটা জিনিস শিখে ফেলেছি- কেউ আগ্রহ নিয়ে কিছু দেখালে প্রচণ্ড অবাক হবার ভান করা কিংবা কেউ মজার কিছু বলার বা করার চেষ্টা করলে খুব মজা পেলাম এমন একটা ভান করা। এদের হিউমার কালচার আমাদের তুলনায় অনেক বেশি নিম্নমানের। এদের সাথে তাল মেলাতে নিজের লেভেলটাকে যথেষ্ট নিচে নামিয়ে আনতে হয়। আমাদের সাধারণ মানের রসিকতা সচরাচর এরা ঠিক বুঝে উঠতে পারেনা, তারপরও বুঝতে পারলে বেশ অবাক টাইপ মুগ্ধ হয়।

মানুষ এবং পশুপাখির পর গাছপালা পর্ব শুরু হলো। বাড়ির চারপাশে বিভিন্ন জায়গায় গ্রীনহাউজ বসানো। সেখানে রাজ্যের সব গাছগাছালির চাষ হচ্ছে। বাড়িটার অবস্থান মূল শহর থেকে এত বেশি দূরে যে, চাষ-বাস ছাড়া এমার্জেন্সিতে এদের আসলে কোন উপায় নেই। দুই একবার নাকি এমন হয়েছে যে, বরফ পড়ে রাস্তা বন্ধ হয়ে তারা বেশ কয়েকদিনের জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে মূল শহর থেকে। এধরনের ক্ষেত্রে সিটি গভর্ণমেন্টও নাকি দু-তিন দিনের আগে বরফ সরানোর কাজ করেনা। মনে মনে চিন্তা করলাম, বুদ্ধি তাহলে ভালোই। এধরনের কেইসে একটা ঘোড়া জবাই করে গ্রীনহাউজের শাক-সব্জি দিয়ে দিব্যি সপ্তাহ খানেক চালানো সম্ভব। মার্থা যখন গ্রীনহাউজ দেখাচ্ছিল, তাকে বললাম, ঢাকায় আমাদের নিজেদের বাড়ির ছাদে আমার বাবার করা বাগানে এধরনের শাক-সবজি চাষ হয়। পেয়ারা-আংগুর থেকে শুরু করে লাল-শাক, পালংশাক সবই সেখানে হয়। আমার কথা সে ঠিক বুঝে উঠতে পারলনা। গ্রীন হাউজ ছাড়া শাক-সবজি হচ্ছে এটা সে চিন্তা করতে পারছিলনা। আরেকটা কারণ হতে পারে, ছাদে চাষবাস বিষয়টা বোধহয় এদের কাছে অজানা। চিন্তা করে দেখলাম, এদেশের সব বাড়ির ছাদই ঢালু চালা দেয়া টাইপ। শীতের দিনে বরফ পড়লে যেন জমে না থাকে, তার জন্যেই এই ব্যবস্থা। বাড়ির ছাদে ওঠার কোন অপশন এখানে নেই। কেউ একজন ছাদে উঠে শাক-সবজি লাগাচ্ছে এটা কল্পনা করতে পারাটা তাই এদের কাছে অসম্ভব।

পরিবেশ পরিচিতি শেষ হতে আরও একধাপ বাকি। লিলিয়ান এবং মীয়া আমাদেরকে তাদের বাড়ির প্রতিটি ঘর ঘুরে ঘুরে দেখাল। বাসাটা তিনতলা (ট্রিপ্লেক্স)। নিচের তলায় বাবা-মা থাকে, মাঝের তলার একপাশে বড় মেয়ে লিলিয়ানের 'সংসার' আর একপাশে ড্রয়িং-ডাইনিং-কিচেন। সবার ওপরের তলায় বাকি তিনমেয়ের রুম। এদের দাদা এই বাড়িটা অনেক বুদ্ধি করে বানিয়েছিলেন নিজের থাকার জন্য। ফায়ারপ্লেস, এয়ারপাথ, ওয়াটারফ্লো, সোলারপ্যানেল- সবকিছু এমন ভাবে ডিজাইন করা যে, বর্ণনা শুনে মনে হলো শীত-গ্রীষ্ম কোন ঋতুতেই এদের ইলেকট্রিসিটি তেমন ব্যবহার করতে হয়না। পুরো বাড়িটা সত্যিই দেখার মত একটা জিনিস। প্রকৃতি থেকে যতভাবে সম্ভব সুবিধা নিয়ে পাওয়ার কনসাম্পশন একেবারে মিনিমাম বানিয়ে ফেলেছে। বাসাটা সাজিয়েছেও একদম ছবির মত সুন্দর করে। এ পর্যায়ে, নিজেদের বাসার অবস্থা চিন্তা করে মনে মনে একটু দুঃখই পেলাম। নিজেকে সান্ত্বনা দেবার জন্য ভাবলাম, আমাদের অ্যাপার্টমেন্টটাও 'ছবির' মতই বলা চলে- কত ধরনের আর্টিস্টই তো থাকতে পারে, তাই নয় কি?

মূল খাওয়া-দাওয়ার আগে এপিটাইজার পর্ব। কিচেনের সামনে টেবিলের মত অংশে সারি সারি থালায় থরে থরে অনেক ধরনের খাবার সাজানো। আমাদের যার যেটা পছন্দ, তাকে সেটা নিয়ে খেতে অনুরোধ করল। আমেরিকায় কেউ কাউকে প্লেটে তুলে খাওয়ায় না। যার যা পছন্দ নিয়ে খাবে। আমি বাছাই করা শুরু করলাম কি খাওয়া যায়। এখানে গ্রিডি মেথডে এগোলে চলবে না, ডাইনামিক এ্যালগোরিদম লাগবে। কারণ, অন্য আরেক টেবিলে মূল খাবারের আয়োজনের আভাস দেখা যাচ্ছে। অবশ্য এপিটাইজার যা দেখলাম, তাতে আর কোন এ্যালগোরিদমের দরকার নেই। একটা প্লেটে দিয়েছে ছয়-সাত রকমের কপি- সাদা ফুলকপি, হলুদ ফুলকপি, সবুজ ব্রকলি, কমলা গাজর, পেয়াজের ডাটা, বীচিহীন শিম ইত্যাদি। মুখে নিয়ে মনে হলো ঠিকমত সেদ্ধ হয়নি। জিজ্ঞাসা করাতে বলল, এগুলো সরাসরি বাগান থেকে আনা ফ্রেস সালাদ- তার অর্থ এগুলো কাঁচা। শোনার পর আর দেরি নয়, চাবানো বন্ধ করে কোৎ করে গিলে ফেললাম। এরপর থেকে সাবধান হয়ে গেলাম। আরেকটা প্লেটে নিমকি টাইপ কি যেন দেখলাম, সেটা খেতে ভালো, সেটাই একটু খেলাম। পাশেই তিন চার রকমের স্যুপ- লাউ/পাম্পকিন আর কি কি যেন দিয়ে তৈরি। আমি পেট ভরে গেছে এমন একটা ভাব করে সরে আসলাম। বোঝাগেল, এনামুলের কথায় রাজি হয়ে দুপুরে না খেয়ে আসলে কপালে দুঃখই ছিল।

ততক্ষণে ডিনার রেডি। হুইট আমাদের সবাইকে ডিনার টেবিলে আমন্ত্রণ জানালো। সুন্দর করে সাজানো টেবিলটায় দশটা চেয়ারে দশজনের বসার জায়গা। ক্রিস সহ বাড়িতে মোট আটজন বাসিন্দা, এরসাথে অতিথি দুজন -এনামুল এবং আমি। যে যার মত বসে পড়লাম। শুরুতে গৃহকর্তার দায়িত্বের অংশ হিসেবে হুইট ছোট একটা বক্তব্য রাখল। এরপর আমাদেরকে অনুরোধ করল প্রত্যেকের দুপাশের দুজনের হাতে হাত রাখতে এবং চোখ বন্ধ করে রাখতে। সে এখন কোন এক বিশেষ প্রার্থনা করবে এবং সেটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের সবাইকে এই পজিশনে থাকতে হবে। প্রার্থনা শেষ হলে সে তার ডানপাশের জনের হাত একটু চাপ দেবে এবং সেই সিগন্যাল পাওয়া মাত্র ডানপাশের জন একই কাজের পুনরাবৃত্তি করবে তার ডানপাশের ব্যক্তির সাথে। এভাবে পুরো একটা সাইকেল শেষ হলে প্রার্থনা শেষ। নিঁখুত প্রটোকল। বিষয়টা নতুন হলেও আমার কেন যেন পরিচিত পরিচিত লাগছিল। চিন্তা করে বের করলাম, আমাদের দেশের মানববন্ধন কর্মসূচির সাথে এটার মিল পাওয়া যাচ্ছে। সরকার কিংবা অন্য কোন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে খুব বেশি ঝামেলা না করে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে এটার ব্যবহার আমাদের দেশে বর্তমানে বেশ জনপ্রিয়। খাবার টেবিলে কার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা হলো সেটা অবশ্য বোঝা গেলনা। তবে মাথায় আইডিয়া আসল, এটা আমরা বাংলাদেশেও চালু করতে পারি। যেমন, খেতে বসে দেখা গেল তরকারিতে লবন মাত্রাতিরিক্ত বেশি, ব্যস, সাথে সাথে সবাই একটা মানব বন্ধন তৈরি করে বাড়ির গৃহিনীর বিরুদ্ধে ছোট খাট মোক্ষম একটা প্রতিবাদ করে ফেলা যেতে পারে এই পদ্ধতিতে।

খাবারের আইটেমগুলো বরাবরের মতই খুব বেশি আমেরিকান। যেমন, শুধু পানিতে সেদ্ধ করে লবন মেশানো বরবটির মত একটা সবজি। মীয়া জিজ্ঞাসা করল, কেমন হয়েছে খেতে? বোধহয় সে নিজে রেঁধেছে তাই নিজের প্রশংসা শোনার জন্যে জিজ্ঞাসা করল। আমি জিনিসটা মুখে নিতে চাচ্ছিলাম না, কিন্তু মেয়েটা চরম আগ্রহ নিয়ে আমার অভিব্যক্তির জন্য অপেক্ষা করছে বিধায় একটু মুখে দিতে হল। সে আবারও প্রম্পট করল, 'কেমন?', আমি বললাম, 'স্পাইসলেস, তুমি কি মসলা দিতে ভুলে গেছ?' সে সাথে সাথে রেগে গিয়ে কিচেন থেকে তিন বৈয়াম শুকনা মরিচের গুড়া নিয়ে এসে বলল- 'খাও'। আমি সত্যি সত্যি এবার সামনের ডিশ থেকে এক চামচ 'পটেটো ম্যাশ' নিয়ে শুকনা মরিচ দিয়ে মেখে খেতে লাগলাম। পটেটো ম্যাশ এদেশে আরেকটি জনপ্রিয় খাবার। সেদ্ধ আলুর সাথে মাখন/চিজ মিশিয়ে এটাকে বানানো হয়। এটাকে আমাদের দেশের আলুভর্তার আমেরিকান ভার্সন বলা চলে। পার্থক্য হলো এটাতে কোন ঝাল কিছু দেয়া হয়না। আমার কাণ্ড দেখে মনে হলো লিলিয়ান বেশ খুশি হয়েছে। আমার দেখাদেখি সে এবং তার দেখাদেখি ক্রিসও শুকনো মরিচ মেখে পটেটো ম্যাশ খেতে শুরু করল। মীয়া একবার খালি আস্তে করে বলল, 'আই লাইক কম্পিউটার সায়েন্স গাইস'।

খাবার টেবিলে বসে অনেক আলাপ হলো। আমরা যে বাংলাদেশ থেকে এসেছি সেটা তারা আগে থেকেই জানত। ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন আগেই আমাদের পরিচিতি তাদেরকে দিয়ে রেখেছিল। বাংলাদেশ কোথায়, কেমন,এত দূর থেকে অন্য কালচারে এসে কেমন 'শক' খাচ্ছি এসব জিজ্ঞাসা করল। এখানে আসার আগে আমরা কে কি করতাম জিজ্ঞাসা করল। আমরা দুজনেই শিক্ষক ছিলাম জানতে পেরে তারা বেশ খুশি হলো। বিশেষত মীয়া ও মার্থা, কারণ তারা নিজেরাও শিক্ষকতা করছে। বিপাকে পড়লাম যখন আমাদেরকে বেতন কত পেতাম জিজ্ঞাসা করল। বুয়েটের ১৩,৬৭৮ টাকাকে এখন ৭০ দিয়ে ভাগ করে ডলার বানিয়ে বলতে হবে। হিসেবের সুবিধার্থে ১৪০০০ ধরে দেখি মাত্র ২০০ ডলার হয়। উত্তর দিতে গিয়ে আমি নিজেই চিন্তায় পড়ে গেলাম। ২০০ ডলারের চাকরি করলাম এতদিন, নাকি ভাগ অঙ্কে ভুল হচ্ছে? ২০০০ ডলার নাকি? নাহ, তাহলে তো একটু বেশিই হয়ে যায়। এনামুল ততক্ষণে উত্তর দিয়ে দিয়েছে। ওরা জিজ্ঞাসা করল, এই টাকায় একজনের ফ্যামিলি চলে? আমরা বললাম, 'আমাদের তো টাকা খরচ করতে হয়না, বাবা-মা আছে বিধায়, অন্যদের হয়ত 'সামান্য' একটু কষ্ট হয়।' লুকোনোর চেষ্টা করে কোন লাভ হলনা, আমাদের দৈন্যতা যে বুঝে ফেলেছে, সেটা আস্তে আস্তে সান্ত্বনাসূচক মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিল। এরপর আমাদের বাবা-মা ভাই-বোন কি করে সেটা জানতে চাইল। এনামুলকে জিজ্ঞাসা করল, তোমার বোন আছে কিনা? এনামুল হ্যাঁ সূচক জবাব দিলে জানতে চাইল, সে কি কখনো স্কুলে গিয়েছে কিনা? এই প্রশ্ন শুনে আমি বুঝতে পারলাম ঘটনা কোথায়। এরা ধরে রেখেছে বাংলাদেশ মানেই বোধহয় দূর্যোগ, দুর্ভিক্ষ, অশিক্ষা আর কুসংষ্কার। তাদের ধারণা আমাদের দেশের সামান্য কিছু মানুষ শিক্ষিত, আর মেয়েদের তো শিক্ষার কোন সুযোগই নেই। এনামুল যখন উত্তর দিল যে তার বোন ব্যাচেলরস কমপ্লিট করে এখন মাস্টার্স করার চেষ্টা করছে, মার্থার চেহারা দেখে তখন মনে হলো, কোন একটা হিসেব সে মেলাতে পারছে না। আমাকে একই প্রশ্ন করাতে জানিয়ে দিলাম- বাবা ইঞ্জিনিয়ার প্লাস যুগ্ম সচিব, মা বিএ, ভাই ফ্লোরিডায় পিএইচডি করছে, বোন নাই। এবার প্রশ্নকারিনী পুরোপুরি চুপ। আমি মোটামুটি নিশ্চিত, এখন থেকে বাংলাদেশি কোন মানুষ দেখলে কথা বলার আগে এরা একটু চিন্তা করবে। ১৯০৮ সালের বাংলাদেশ আর ২০০৮ সালের বাংলাদেশ যে এক নয় এটা বোধহয় তারা জানেনা। অবশ্য ওদের দোষই বা দিই কি করে। আমাদের মধ্যেই এক শ্রেণীর মানুষ দেশটার এধরনের একটি রূপ ওদের সামনে তুলে ধরে কোটি কোটি ডলার হাতিয়ে নেয়। ইউটিউবে মান্না দে'র 'কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই' গানের ভিডিও যারা দেখেছেন তারা জানেন, ভিডিও'র শুরুতেই এ্যাড দেখানো হয়, 'সেভ বাংলাদেশ', 'ডোনেট ওনলি ২৫ সেন্ট' ইত্যাদি। এই টাকা কই যায়, কে খোঁজ নিয়ে দেখেছে।

এবার টার্কির পালা। থ্যাঙ্কসগিভিং ডিনারের প্রধান আকর্ষণ হলো টার্কি। আলাদা একটা টেবিলে আস্ত এক টার্কি রোস্ট করে রাখা হয়েছে। চার বোন মিলে চিৎকার চেচামেচি করে বলা শুরু করল সেটাকে কিভাবে তারা কিনেছে, কিভাবে স্লটার হাউসে গিয়ে সেটাকে প্রসেস করেছে এবং এসব করতে গিয়ে তারা কে কি বোকামি করেছে তার পুক্ষানুপুংখ বর্ণনা দিতে লাগল। তারা নিজেরাই এটাকে জবাই করেছে বলে খুব বড়াই করছিল। আমাদের জিজ্ঞাসা করল তোমরা কখনও কোন পশু জবাই করেছ? এনামুল বলল- 'চিকেন'। আমি বললাম, 'গরু'। প্রতি কুরবানীর ঈদেই ইমামের সাথে আমিও একটু ছুরিটা ধরি। সে ঘটনাই বললাম, শুধু ইমাম সাহেবের অংশটুকু বাদ দিয়ে। তারা সবাই একথা শুনে চোখ বড় বড় করে এমনভাবে তাকালো, যেটাকে ভাষায় প্রকাশ করে বাংলায় ট্রান্সলেট করলে শোনাবে- 'খাইসে'। সবকিছুর মত টার্কিটাতেও কোন টেস্ট নেই। শুধু পানিতে সেদ্ধ করা জিনিস খাওয়ার মত আমেরিকান এখনও হতে পারিনি। এক সেন্টিমিটার সাইজের সামান্য একটা পিস গলা দিয়ে নামাতে আমার যথেষ্ট বেগ পেতে হলো। শেষ পর্যন্ত ব্রেড আর অ্যাপেল জুস দিয়েই ডিনার শেষ করলাম।

খাওয়ার পর এবার বিনোদন পর্ব। এ পর্বের শুরু থেকেই লিলিয়ানের বয়ফ্রেণ্ড হাওয়ার্ডকে বেশ সপ্রতিভ মনে হলো। সে তার সদ্য কেনা গীটার নিয়ে আসর বসিয়ে বিভিন্ন গানের সুর তোলা শুরু করল। গানগুলো বেশ পরিচিত হবার কথা, কেননা সবাই বেশ উপভোগ করছে, কিন্তু আমার স্বল্প জ্ঞানের দরূন একটা গানও চিনতে পারলাম না। গ্রেচেন কোত্থেকে একটা বাঁশ নিয়ে এসে সেটাকে ফুঁ দিয়ে দিয়ে বীকট আওয়াজ করা শুরু করলো। সেটি স্পষ্টতঃই আনুমানিক চার-পাঁচ ফিট সাইজের একটি বাঁশ। এটাকে কোন একটা মিউজিক ইন্সট্রুমেন্ট হিসেবে মেনে নিতে আপত্তি জানালে, সে আমাকে তাৎক্ষণিক ইউটিউবের এক ভিডিও বের করে দেখিয়ে দিল এধরনের যন্ত্রে ফুঁ দিয়ে একজন বিখ্যাত কোন মিউজিশিয়ান বাদ্য বাজাচ্ছে। আমি নিশ্চিত, এটা আমেরিকায় বিরল কোন বাদ্যযন্ত্র হিসেবে পরিচিত এবং এর দাম এখানে হাজার ডলারের কম হবার কথা নয়। চিন্তা করে দেখলাম, আমাদের গ্রামের বাড়ির ঝাড়-জঙ্গল কেটে এই সাইজের কিছু বাঁশ আমেরিকায় এক্সপোর্ট করতে পারলে ইউভিএতে পিএইচডি করার জন্য আমার বোধহয় আর কোন স্কলারশিপের দরকার পড়তোনা। আমরা সমানে তাদের বাজনার প্রশংসা করে যাচ্ছি দেখে ম্যাডিলিনও একটা ভায়োলিন নিয়ে এসে সেটাতে করুণ সুর বাজানোর চেষ্টা শুরু করল। সুরটি বাস্তবিক ভাবেই আমাদের কাছে বেশ করুণ মনে হল। একটু পর ওদের বাবা হুইট একটা ঝুনঝুনি ওয়ালা তবলা জাতীয় বাদ্য বাজানো আরম্ভ করল। উপায়ান্তর না দেখে, নিজেদের অসহায়ত্ব চেপে, অথচ চোখে-মুখে উৎসাহ নিয়ে, আমরা একসাথে অনেকগুলো বাদ্যযন্ত্রের কর্কশ কোরাস হজম করলাম। মনে হল, এটা যখন হজম হয়েছে, আমরা এখন সবকিছুই হজম করতে পারব। ক্রিস যখন তাই- 'কে কে পিকশনারিতে আগ্রহী' বলে সবার মতামত চাইল, আমি তখন কোন উচ্চবাচ্য না করে কিছু না বুঝেই রাজি হয়ে গেলাম।

পিকশনারী হচ্ছে এক ধরনের বোর্ড গেম। খেলাটা মোটামুটি এরকম- একজন প্লেয়ার এক প্যাকেট কার্ড থেকে একটা কার্ড ড্র করবে এবং সেখানে যে শব্দটি লেখা আছে, সেটা একটা কাগজে আঁকা শুরু করবে। বাকিদের মাঝে যে সবার প্রথমে বলতে পারবে সে কি আঁকছে, সে হবে সেই রাউণ্ডের বিজয়ী। সাথে একটা বোর্ড আছে যেটাতে ছক্কা মেরে গুটি চালার মাধ্যমে কে নেক্সট রাউন্ডে আঁকাআঁকি করবে সেটা নির্ধারণ করা হয়। ছোট বাচ্চাদেরকে শব্দ এবং ড্রয়িং শেখানোর জন্য ভাল একটি খেলা, অথচ এই বয়সে এটাকে খেলতে হচ্ছে। কোন সমস্যা নেই আমার, আমি এখন কাঁচা টার্কিও হজম করতে পারব, আর এ তো ছেলেখেলা। খেলা শুরু হলো। সবার প্রথমে মার্থা কোন একটা পাখি আঁকলো, যেটা আমি চিনতে পারলাম না। পরে বোঝা গেল উটপাখি। এরপর লিলিয়ান কিছু একটা আঁকা শুরু করতেই চিৎকার করে গ্রেচেন উত্তর বলে দিল, কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই। তৃতীয়বার হুইটের আঁকাবার পালা। এবারে আমি মহা সিরিয়াস, কিছুতেই মিস হতে দেব না। হুইট একটা হৃদয়ের ছবি আঁকতেই- কেউ হার্ট, কেউ ভালোবাসা, কেউ হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট, কেউ হার্ট এ্যাটাক বলে চিৎকার শুরু করলো। সাদা কাগজে হুইটের আঁকা হৃদয়টার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা মনে পড়ে গেল। এরপর আর কিছুতেই খেলায় মন বসাতে পারলাম না।

রাত প্রায় দশটার মত বেজে গেছে। আমরা যাব যাব ভাব করছি। কিন্তু ডেজার্ট পর্ব তখনও বাকি। খুব সংক্ষেপে সেটাকে শেষ করা হলো। প্রায় দশ-বারো রকমের 'পাই' তৈরি করেছে আমাদের জন্য। আমেরিকানদের বোধহয় সবচেয়ে পছন্দের জিনিস এই 'পাই'। এগুলো খেতে খুব বেশি মিস্টি। কারো কারো কাছে সহ্যের অতিরিক্ত মিস্টি মনে হতে পারে। হাল্কা একচিমটি খেয়ে বুঝতে পারলাম আমি এখনও সেই দলেই আছি। এখানে একটা প্রবচন আছে- 'এ্যজ অ্যামেরিকান এ্যজ এ্যাপল পাই'। অর্থটা ঠিক সিওর না হলেও অনেকটা এরকম- 'কে কতটুকু আমেরিকান সেটা বুঝতে হলে, তাকে এ্যাপল পাই খাইয়ে দিয়ে তার মুখের অভিব্যক্তি দেখে নির্ণয় করা যেতে পারে'। আমার আরো হাজার বছর লাগবে সেই পর্যায়ে যেতে। আপাতত হাতে অত বেশি সময় নেই। রাত বারোটার আগেই বাড়ি ফিরতে হবে। কারণ এখনও রাতের অভিযান বাকি। অভিযানের ব্যাপারটা পরে ব্যাখ্যা করা হবে। এখন বিদায় দৃশ্যের সামান্য বর্ণনা না হলেই নয়।

ক্রিসকে ইশারা করতেই সে বলল, 'চালো'। ক্রিস বেশ কিছুদিন ইণ্ডিয়ায় ছিল, তাই কিছু কিছু হিন্দি শব্দ সে জানে। সে এই বাড়িতে প্রায়ই আসে। আজকে তার দায়িত্ব ছিল আমাদের ডিনারে নিয়ে আসা এবং আবার বাড়ি পৌঁছে দেয়া। পরিবারের সবার কাছ থেকে আমরা একে একে বিদায় নিলাম। 'খুব ভালো লাগলো', 'আবার আসবেন', 'অবশ্যই আসব', 'মনে থাকবে'- এধরনের অনেক প্রতিশ্রুতি বিনিময় হলো। মার্থা ভেতর থেকে আমাদের ওভার কোট এনে দিলে বুকের ভেতর থেকে একটা টেনশন দূর হয়ে গেল। যাবার আগে হোস্টদেরকে গিফট দেবার নিয়ম। এদেশে সামান্য কিছু দিতে গেলেই দশ-বিশ ডলার খরচ হয়ে যায়। তাই বুদ্ধি করে বাংলাদেশ থেকেই আমি বেশ কিছু গিফট এনেছিলাম। আজ সেগুলো কাজে লাগছে। বিদেয় বেলায় চার মেয়ে এবং তাদের মাকে বাংলাদেশ থেকে আনা পাঁচটি রঙ-বেরঙের 'গামছা' উপহার দিলাম। গামছাগুলো পেয়ে তারা তাদের আনন্দ প্রকাশের ভাষা হারিয়ে ফেলল। ছোট তিন মেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে গামছাগুলোকে পরার তিনটি ভিন্ন ভিন্ন স্টাইল বের করে ফেলল। তাদের দেখে আমার কেন জানি মনে হতে লাগল, আজ থেকে বছর খানেক পর আমেরিকায় যদি কখনও গামছা ফ্যাশনের প্রচলন হয়, তবে সেটার সাথে আজকে রাতের এই ঘটনার যোগসূত্র থাকার সম্ভাবনা শত ভাগের কাছাকাছি।

আর দেরি না করে বেরিয়ে পড়লাম আমাদের নিজেদের পথে। আসার সময় ক্রিসের সাথে অনেক গল্প হলো। সে হারভার্ড ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার সায়েন্সে সিকিউরিটির ওপর পিএইচডি করছে। ব্লগ লিখে সে টাকা উপার্জন করে এবং নিজের টাকায় দেশ বিদেশে ঘুরে বেড়ায়। কথার এক ফাঁকে জানতে পারলাম, সিনেট ডট কমের সিকিউরিটি বিভাগে যে বিখ্যাত ফ্রী-ল্যান্স ব্লগার 'ক্রিস্টোফারের' আর্টিক্যাল আমরা পড়ি, সে-ই হচ্ছে এই ক্রিস। আমি যে নিজেও ব্লগিং করি, সেটা চান্স পেয়ে তাকে একটু শুনিয়ে দিলাম। ক্রিসকে মনে হলো বেশ ঝানু ব্যক্তি। আসার পথে সারারাস্তায় সে আমাদের নানান বিষয়ে হরেক রকম তথ্য দিল। যেমন, কোন পদ্ধতিতে কি করে টাকা বাঁচানো যায়, এক ডলার খরচ করে কি করে অন্য শহরে যেতে পারি, বিনে পয়সায় সে কিভাবে আগামীকাল ইন্দোনেশিয়া যাচ্ছে, গাড়ি না কিনে কি করে কাজ চালানো যায়, ফ্রী খাবার কি করে পেতে হয়, সুপারভাইজারকে কি করে 'নো' বলতে হয়- সব সে বুঝিয়ে দিল। আধা ঘন্টার রাস্তা, অথচ জ্যামের কারণে সিগন্যালে সিগন্যালে আমরা আটকে পড়ছি বারবার। আমেরিকার রাস্তায় জ্যাম শুনে অনেকেই অবাক হতে পারে, কিন্তু ছোট-খাট ট্রাফিক শারলোটস ভিলের ব্যস্ত রাস্তায় হরদমই থাকে। তারপরও সে রাতের ব্যাপারটা কেমন যেন একটু অস্বাভাবিক লাগছিল। মনে হচ্ছিল, গাড়ির পরিমাণ রাস্তায় যেন একটু বেশি-ই। ক্রিসকে কথাটা বলাতে সে বলল, 'আজ রাতে যে ব্ল্যাক ফ্রাইডে সেটা জানোনা?' আমরা হালকা জানলেও পুরোটা ঠিকমত শোনার উদ্দেশ্যে তাকে না-সূচক জবাব দিলাম। সে বলল, 'ব্ল্যাক ফ্রাইডে হচ্ছে আমেরিকায় কেনাকাটার জন্য সবচেয়ে মোক্ষম দিন। এ রাতে ঠিক বারোটার পর থেকে বড় বড় শপিং মলে নামমাত্র মূল্যে জিনিসপত্র বিক্রি করা হয়।' কারণ জিজ্ঞাসা করাতে সে বলল, 'ব্যবসায় লালবাতি কথাটা তো শুনেছ নিশ্চয়ই। ব্যবসার বেলায় 'লাল' হচ্ছে নেগেটিভ, আর 'কালো' হচ্ছে পজিটিভ। ব্ল্যাক ফ্রাইডে হচ্ছে ক্রিসমাসের আনুমানিক এক মাস আগের একটি শুক্রবার রাত, যেদিন থেকে সবাই কেনাকাটা শুরু করবে এবং ক্রিসমাসের আগ পর্যন্ত জমজমাট ব্যবসা হবে। এটার শুরুতে 'কিকঅফ'-টা যেন ভালোমত হয় তার জন্যই এ আয়োজন।' ক্রিস আমাদেরকে পরামর্শ দিল, আজকে রাতেই যা যা পার কিনে নেবার, জলের দামে সব পাওয়া যাবে। তবে বুদ্ধি করে সব করতে হবে। রাত বারোটায় অনলাইনে প্রথমেই যা যা পারা যাবে কিনে ফেলতে হবে, এরপর বাকি জিনিস স্টোরে গিয়ে কিনতে হবে। বিভিন্ন স্টোর সাধারণতঃ রাতের বিভিন্ন টাইমে ওপেন হবে। ওয়েবসাইটে গিয়ে সেসব লিস্ট করে দোকান খোলার অন্তত এক ঘন্টা আগে গিয়ে লাইন দিতে হবে। যেসব দোকানে খুব বেশি আকর্ষণীয় সেল থাকে, সেখানকার লাইনে মারামারি-ফাটাফাটি হতে পারে, তাই সেটার জন্যেও প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দিল সে। ক্রিসের কাছে পুরোটা শোনার পর আজ রাতে যে আমরা 'যাচ্ছি' সেটাতে আর কোন সন্দেহ রইল না। 'কিন্তু এত রাতে যাব কি করে?'- প্রশ্নটা যেমন একই সাথে আমার এবং এনামুলের দু'জনেরই মাথায় এসেছে, উত্তরটাও তেমনি একই সাথেই দু'জনের মুখ থেকেই বেরোল- 'তানিয়া আপা'। (চলবে)


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/28886369 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/28886369 2008-12-22 21:04:12
আমেরিকায় পড়ি
ইউনিভার্সিটি অফ ভার্জিনিয়া-- দু-চোখ শীতল করে দেবার মত সুন্দর এক ইউনিভার্সিটি। শারলোটসভিল শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত, আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জেফারসনের নিজ হাতে গড়া স্বপ্নের ইউনিভার্সিটি হচ্ছে আমাদের ইউভিএ। আমেরিকার রাজধানী ওয়াশিংটনের কাছাকাছি হওয়াতে এতে যেমন এক দিকে রয়েছে আধুনিকতার স্পর্শ, অন্যদিকে রয়েছে পাহাড়ি প্রকৃতি ও বর্ণিল গাছগাছালির মোহনীয় স্নিগ্ধতা। এর সৌন্দর্য্য নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করা আমার পক্ষে দুঃসাধ্য, তবে একটা সহজ উদাহরণ দিয়ে বলা যেতে পারে- কেউ যদি শারলোটসভিল শহরের যে কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে দু থেকে তিন মেগাপিক্সেলের মাঝারি মানের একটি ক্যামেরা দিয়ে র‌্যান্ডম এক ডজন ছবি তোলে, তবে সেই ছবি গুলো দিয়েই নতুন সালের জন্য অসাধারণ একটি ক্যালেন্ডার তৈরি করা যাবে। আমি অবশ্য একশ চব্বিশ ডলার খরচ করে ইতিমধ্যে একটি ক্যামেরা কিনে ফেলেছি-- এই মুহূর্তে ছবি তোলার কাজ পূর্ণদ্যমে চলছে।

একটু আগে যার কথা বলছিলাম তিনি প্রফেসর গ্যাব্রিয়াল রবিনস। আমরা তাকে ডাকি 'গেইব'। এখানে আমেরিকায় এ ব্যাপারটি খুবই অদ্ভুত যে, প্রফেসরদেরকে ছাত্ররা সবাই নাম ধরে ডাকে। যারা উপমহাদেশ থেকে এখানে আসে, প্রথম প্রথম তাদের সবারই এটাতে অভ্যস্ত হতে বেশ সময় লাগে। অবশ্য কিছুদিন পর এটাকেই স্বাভাবিক বলে মনে হয়। গেইব আমাদের অ্যাডভান্সড থিওরী অফ কম্প্যুটেশন ক্লাস নেয়। তার বৈশিষ্ট্য- সে সব সময় একটা কালো হাফ হাতা টী-শার্ট, কালো প্যান্ট আর কালো স্পঞ্জের স্যান্ডেল পড়ে ক্লাসে আসে। আমি তার এই ড্রেসের কোন ব্যাতিক্রম দেখিনি। শুধুমাত্র একদিন বোধহয় তার গায়ে একটা কালো চাদর ছিল। তার স্বভাব হলো ক্লাসে এসেই সে সবাইকে কার্টুন আঁকা একটা করে পেইজ দেবে। এরপর ট্রান্সপারেন্ট শিটে প্রিন্ট করা স্লাইডগুলো প্রজেক্টরে ঢুকিয়ে অতি উচ্চমার্গের থিওরেটিকাল কথাবার্তা শুরু করবে। লোকটা থিওরীতে এত বেশি স্ট্রং যে আমরা যারা বাংলাদেশের ছাত্র তাদেরও মাঝে মাঝে ভ্রু কুচকে তাকাতে হয় সে কি বলল সেটা বোঝার জন্য। এখানে প্রসংগত উল্লেখ্য যে, এখানকার চায়নীজ, ইন্ডিয়ান এমনকি আমেরিকান ছাত্রদের দেখে আমার মনে হয়েছে- থিওরেটিক্যাল কম্পিউটার সায়েন্সে আমরা বাংলাদেশের ছাত্ররা অন্যান্য দেশের ছাত্রদের তুলনায় বেশ স্ট্রং। আমাদের দেশের আন্ডারগ্রাজুয়েট লেভেলের পড়াশোনার মান যে আসলেই অন্যান্য দেশের চেয়ে ভালো এটা এখানে এসে আমরা প্রতিনিয়ত বুঝতে পারছি এবং মনে মনে নিজেদেরকে ধন্য মনে করছি। গেইব অবশ্য কিছু কিছু জিনিস আলোচনা করতে করতে মাঝে মাঝে এত গভীরে চলে যায় যে, কি নিয়ে যে কথা হচ্ছিল সেটা সেও ভুলে গেছে, আমরাও ভুলে গেছি। সবাই বলে গেইব একটা পাগল, এর মাথা পুরো খারাপ হয়ে গেছে। আমার কাছে কিন্তু তাকে বেশ ভালো লাগে। শুনেছি সে নাকি একটা মেয়েকে খুব ভালোবাসত, তারপর কিছু একটা হয়েছে- গেইব আর শেষ পর্যন্ত বিয়েই করেনি। আমার ধারণা সেই ব্যথা ভুলে থাকার জন্যই সে জটিল জটিল থিওরী প্রব্লেম নিয়ে সারাক্ষণ চিন্তায় ডুবে থাকে। ভীষণ জানতে ইচ্ছে করে, গেইবকে এভাবে রেখে মেয়েটা কি এখন খুব সুখে আছে?

প্রফেসরদের নাম ধরে ডাকার মতই আরেকটি অদ্ভূত ব্যাপার হচ্ছে যে,এখানে ক্লাসে ছাত্ররা অনেকটা যা খুশি তাই করতে পারে। যেমন, কেউ ট্রে ভর্তি করে বার্গার, স্যান্ডুইচ, কফি নিয়ে এসে খাচ্ছে, কেউ বেঞ্চের ওপর পা তুলে বসে আছে, কেউ মনযোগ সহকারে তার ল্যাপটপ নিয়ে চ্যাটিংয়ে ব্যস্ত- অথচ প্রফেসররা তাদের কাউকে একটা কিছুও বলবেনা। এখানে লজিক হচ্ছে, কেউ ক্লাস ফলো না করলে সেটা তার নিজের ব্যাপার, প্রফেসরের সেটাতে কোন কিছু যায় আসে না। আমি কল্পনা করার চেষ্টা করছি, বুয়েটের একটা ক্লাসরুমে কোন এক ছাত্র ঠোঙ্গাভর্তি সিঙ্গারা খেতে খেতে সাইদূর রহমান স্যারের ক্লাস করছে, স্যারকে দেখে নাম ধরে ডেকে বলছে- 'হেই, হোয়াটস আপ?'- তাহলে কি ঘটনা ঘটতে পারে? এটা কল্পনাতে আনতে কষ্ট হলেও আমেরিকায় এটা খুবই স্বাভাবিক। এমনকি এটা যে অস্বাভাবিক কিছু হতে পারে সেটাই এখানকার কাউকে রাতদিন চেষ্টা করেও বোঝানো যাবেনা।

এখানকার পড়াশোনায় যে বিষয়টি আমার কাছে চোখে পড়েছে তা হচ্ছে - 'ফ্লেক্সিবিলিটি'। যেমন, আন্ডারগ্রাজুয়েট লেভেলে এখানে ছাত্রদের কোন নির্দিষ্ট ডিপার্টমেন্ট নেই। যার যে কোর্স নিতে ইচ্ছে করে সে সেটাই নিতে পারে। কোন একজন ছাত্রের কোর্স লিস্টে একই সাথে সাহিত্য, ইলেকট্রনিক্স, নৃত্য-সংগীত, জাভা প্রোগ্রামিং, বাণিজ্য সবকিছুই থাকতে পারে। অবশ্য পড়াশোনার একটা পর্যায়ে গিয়ে তাকে কোন একটা 'মেজর' বেছে নিতে হয়। মূল ব্যাপারটা হচ্ছে, এখানে একজন ছাত্র দেখে-শুনে-বুঝে নিজের বুদ্ধিতে নিজের ভবিষ্যতকে গড়তে পারে। আমাদের দেশের মত ভাবগম্ভীর পরিবেশে এ্যাডমিশন টেস্ট নিয়ে, ছাত্রের ইচ্ছা-অনিচ্ছার তোয়াক্কা না করে, জোর করে তাকে কোন এক ডিপার্টমেন্টে বসিয়ে দেয়া হয়না। শিক্ষকতা করতে গিয়ে আমি বুয়েটে এমনটা অনেক শুনেছি- 'স্যার, ইলেক্ট্রিক্যাল পড়ছি, কিন্তু আমার তো প্রোগ্রামিং করতেই বেশী ভালো লাগে।' আবার আমার ডিপার্টমেন্টের খুব মেধাবী স্টুডেন্টকেও অভিযোগ করতে শুনেছি- 'আমি কম্পিউটার পড়তেই চাইনি, আর্কিটেকচারের মেরিট লিস্টে অষ্টম ছিলাম, আমাকে জোর করে বাসা থেকে কম্পিউটার পড়তে দিয়েছে।' এই ছোট্ট একটা জিনিস যদি আমাদের দেশের ইউনিভার্সিটিগুলো অনুকরণ করে, তাহলেই কিন্তু আমাদের ছাত্রদের মাঝের হতাশা একদম কেটে যাবে। চার-পাঁচ বছর আগে না বুঝে নেয়া একটা দুর্বল সিদ্ধান্তের জন্য আজীবন আর কাউকে আফসোস করতে হবেনা। এই পরিবর্তন যারা করতে সক্ষম, তাদের কেউ কি আমার কথা শুনতে পারছে?

আমেরিকানদের কাছে সবকিছুর মত পড়াশোনাটাও একটা আনন্দের বিষয়, ওদের ভাষায়- 'ফান'। এই ফানি ছাত্রদের 'ফান' আমাকে প্রতিদিনই খুব কাছে থেকে দেখতে হচ্ছে। আমার পিএইচডির পুরো খরচ ইউনিভার্সিট বহন করলেও বিনিময়ে আমাকে কোন একজন প্রফেসরকে আন্ডারগ্রাজুয়েট কোর্সে কিছুটা সাহায্য করতে হয়। এই সেমিস্টারে আমার দায়িত্বের মাঝে পড়েছে আন্ডারগ্রাজুয়েট ছাত্রদের জাভা এবং কম্পিউটার আর্কিটেকচার ল্যাব গুলো নেয়া। 'বুয়েটের শত শত ছাত্রের কত কোর্স নিয়েছি, এসব ল্যাব তো ডাল-ভাত'- প্রথমে এটা মনে করলেও পরে বুঝতে পেরেছি এখানকার ডাল এবং ভাত দুটোই ভিন্ন। প্রথমদিন ক্লাসে ঢুকে ছাত্র-ছাত্রীদের দেখেই আমার বিচিত্র এক অনুভূতি হলো। পোশাক-আশাক দেখে দু-একজনকে মনে হলো বাথরুম থেকে বের হয়ে প্যান্ট-শার্ট না পড়েই ক্লাসে চলে এসেছে। দুএকটা ছেলে জিন্সের প্যান্ট এত নিঁচু করে পরা, মনে হলো একটু অসাবধান হলেই বোধহয় সেটা খুলে পড়ে যাবে। কানে দুল দেয়া ছাত্র আমি বাংলাদেশেও দেখেছি, কিন্তু ঠোঁট ফুটা করে সেখানে দুল পরতে আমি সেদিন প্রথম কাউকে দেখলাম। পরবর্তি ধাক্কাটা খেলাম যখন একজন ছাত্র আমাকে দেখে বলল- 'হেই, হাউ ইউ ডুইং'। আমি বিস্ময় চেপে, অমায়িক ভাবে একটু হেসে, স্পষ্ট বাংলায় তাকে বললাম- 'কেমন ডুইং এটা তোরে আমি গ্রেড দেয়ার সময় বুঝায় দিব'। ছেলেটা কিছু না বুঝেই খুব শব্দ করে হাসতে লাগল। ক্লাসের মাঝে এদের হাসি, আনন্দ, একে অন্যের সাথে লাফিয়ে উঠে হাই-ফাইভ করা- এসব দেখে মাঝে মাঝে কি করা উচিত বুঝে উঠতে পারিনা। বুয়েটের মত ভাবগম্ভীর পরিবেশ থেকে এমন খুব বেশী খোলামেলা পরিবেশে এসে নিজেকে মাঝে মাঝে বোকা মনে হয়। কম্পিউটার আর্কিটেকচার ল্যাবে আমার সাথে আরেকজন টিএ হচ্ছে- এনামুল। ব্যাপারটা কাকতালীয় যে, এরা আমাদের মত আনকোরা দুজন বাংলাদেশি গ্রাজুয়েটকে আশি জন আমেরিকান ছাত্র-ছাত্রীকে পড়ানোর দায়িত্ব দিয়েছে এবং ঘটনাক্রমে আমরা দুজনই বুয়েটে শিক্ষকতা করেছি একসাথে। একবার আমি আর এনামুল এই ল্যাব ক্লাসে বসে বসে আলাপ করছি। সেদিন একটা ছাত্র মাথার চুল সম্পূর্ণ কমলা রঙ করে ক্লাসে এসেছে। অনেকদিন হয়ে যাওয়াতে এসব এখন আমরা দেখেও না দেখার ভান করি। হঠাৎ দেখলাম ছেলেটা আমাদের বেশ কাছাকাছি (আনুমানিক তিন ফিট দূরে) এসে দাঁড়াল। এরপর আমাদের সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নাচতে শুরু করল। ছেলেটা কোন একটা নাচের স্টেপ প্রাক্টিস করছে যেটাতে কিছুক্ষণ বাতাসে দুই পা ছোঁড়াছুঁড়ি করে, জায়গায় দাঁড়িয়ে ভার্টিকাল এক্সিস বরাবর কয়েক চক্কর ঘুরতে হয়। পুরো ব্যাপারটা প্রায় মিনিট দুয়েকের বেশি সময় ধরে নিঁখুত না হওয়া পর্যন্ত সে করতে লাগল, এবং আমরা দু'জন হতবাক হয়ে পুরো সময়টা তাকে দেখলাম। ছেলেটা আবার তার সিটে চলে গেলে আমি আর এনামুল একে অন্যের দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম। এনামুল শেষ পর্যন্ত নীরবতা ভেঙ্গে বলল,- 'কি করবেন ভাইয়া?'

পড়াশোনার মত এদেশে গ্রেডিং পদ্ধতিও বেশ ফ্লেক্সিবল। আমাদের মতো ছক বাঁধা নিয়মে গ্রেডিং করা হয়না। পরীক্ষার খাতা দেখার পর, সবার পরীক্ষার নম্বরকে সর্ট করে, সেই নম্বর গুলোর কার্ভ এঁকে দেখা হয় কত পারসেন্টকে এ+, কত পারসেন্টকে বি+ ইত্যাদি ধরা হবে। পুরো সেমিস্টারে পরীক্ষাও মাত্র দুটো- একটা মিডটার্ম ও একটা ফাইনাল, এবং দুটোর সিলেবাসও আলাদা। এছাড়া মিডটার্মে কেউ খারাপ করলে সে ইচ্ছে করলে সেই কোর্স ড্রপ করতে পারে, এবং এতে তাকে কোন পেনাল্টিও দিতে হবেনা। এখানে ক্লাসটেস্টেরও কোন বালাই নেই, তবে এর বদলে বেশ কঠিন কঠিন কিছু হোমওয়ার্ক করতে হয়। এছাড়া প্রায় প্রতিটি কোর্সের সাথেই একটি করে ল্যাবক্লাস থাকে এবং এই ল্যাবগুলোতে সচরাচর আলাদা করে গ্রেডিং করা হয়না। ল্যাবে ছাত্ররা আসে থিওরীতে যা শেখে সেটাকেই একবার হাতে কলমে করে দেখার জন্য। কিছু কিছু কোর্সে ছাত্রদের প্রজেক্টও করতে হয়। কিন্তু সেটার জন্যও তারা ল্যাবে আসে এবং টিচারের উপস্থিতিতেই পুরো কাজটা করে। মোটকথা, স্কুলের পড়াশোনা স্কুলে শিখে, স্কুলেই হাতে কলমে প্রাকটিস করে বাড়িতে গিয়ে হৈচৈ করো- এটাই হচ্ছে এখানকার পড়াশোনার মূলনীতি। এখানকার পড়াশোনার পদ্ধতি, সুযোগ-সুবিধা, অবকাঠামো- সবকিছু কাছে থেকে দেখে আমার মনে হয়েছে, আমাদের দেশের যেসকল মেধাবী শিক্ষার্থীরা চরম বৈরী পরিবেশেও শুধু মনের জোরে টিকে আছে (এবং এমনকি ভালোও করছে), তাদেরকে যদি এর সিকি অংশ সুযোগ-সুবিধাও দেয়া হতো তবে আমাদের ছেলে-মেয়েরা আরও অনেক বেশি ভালো করত।

এখানকার পড়াশোনার কথা, ছাত্র-ছাত্রীদের কথা, প্রফেসরদের কথা, ইউনিভার্সিটির কথা কোনটাই একবারে বলে বা লিখে শেষ করা যাবেনা। 'আমেরিকায় পড়ি' এই শিরোনামে সত্যিকার অর্থে কয়েক ডজন লেখা লেখা সম্ভব। সময় পেলে ভবিষ্যতে আবার লিখব, তবে আজকের লেখাটা এখানেই শেষ করতে চাই। লেখাটা শুরু করেছিলাম আমার প্রিয় প্রফেসর গেইবকে দিয়ে, তাই শেষটাও করতে চাই তাকে দিয়ে। গেইব আমাদেরকে ক্লাসে একবার একটা মজার প্রশ্ন করেছিল। আমি সেই প্রশ্নটাই বাংলায় লিখছি- 'ধরাযাক, কোন এক হোটেলে অসীম সংখ্যক রুম আছে, অথচ সবগুলো রুমই গেস্ট দিয়ে ভর্তি। এখন একজন নতুন গেস্ট আসলে তাকে এই হোটেলে আমরা কি করে একটা রুম দেব?' ব্যাপারটা কি আসলেই সম্ভব, নাকি অসম্ভব? সমস্যাটির একটি ম্যাথমেটিকাল অথচ সহজ সমাধান আছে। কিন্তু, সেটা কি?







]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/28868780 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/28868780 2008-11-13 22:55:35
আমেরিকান রোজা, এবং আমেরিকান ঈদ
আমাদের দেশের মত আকাশে চাঁদ দেখে আমেরিকায় রোজা কিংবা ঈদ পালন করা হয়না। 'ইসনা' নামে এদের একটা কমিটি আছে যেটা আগে ভাগেই ঘোষনা দিয়ে রাখে অমুক দিন থেকে রোজা শুরু। এরা এখানে নামায, রোজা, কিবলা সব কিছুরই তালিকা বানিয়ে রেখেছে, যার দরকার ইন্টারনেটে রুটিন দেখে ধর্ম-কর্ম করবে। আমি অবশ্য এই তালিকার হিসেব-নিকেষ কি করে করা তা এখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি। যেমন, ওয়ার্ল্ডম্যাপে আমেরিকা থেকে সৌদি আরব আমার কাছে অনেকটা দক্ষিণ-পূর্ব দিকে মনে হলেও, 'ইসনা'র তালিকায় উত্তর-পূর্ব দিকে মুখ করে নামায পড়ার কথা লেখা আছে, এবং আমেরিকার সবাই উত্তর-পূর্ব দিক কেই কেবলা ধরে। চাঁদ দেখা নিয়ে আমরা নতুনেরা প্রথমে উচ্চবাচ্য করলেও পরে চিন্তা করে দেখলাম, একদিন বেশি রোজা রাখলে তো কোন ক্ষতি নেই, বরং লাভ, কারণ দিনের বেলা রান্নাবান্নার ঝামেলাটা অন্তত আর থাকছেনা। এছাড়া শুনেছি আমেরিকার প্রায় প্রতিটি ভার্সিটিতেই মুসলিম স্টুডেন্ট এ্যাসোসিয়েশন থাকে, যারা ছাত্রদের জন্য প্রতি রোজায় ফ্রী ইফতারের ব্যবস্থা করে। খুব দ্রুত ইউভিএর মুসলিম স্টুডেন্ট এ্যাসোসিয়েশন খুঁজে বের করে অতি আনন্দের সাথে সেটার মেম্বার হয়ে গেলাম। এভাবেই রাতের খাবারের চিন্তা থেকে ঠিক এক মাসের জন্য মুক্ত হয়ে গেলাম।

আমি যেখানে থাকি সেখানে সেপ্টেম্বর মাসে সূর্যদয় হয় ভোর সাড়ে পাঁচটায় আর সূর্যাস্ত হয় রা্ত পৌণে আটটায়। শেষের দিকে আস্তে আস্তে সূর্যাস্তের সময় এগিয়ে আসলেও দিনের দৈর্ঘ্য খুব একটা কমেনি। গড়ে তাই প্রায় সাড়ে চৌদ্দ ঘন্টা রোজা রাখতে হয়েছে। এত দীর্ঘ সময় রোজা রাখার অভিজ্ঞতা খুব একটা আনন্দময় না। আমার একটা প্রশ্ন, পৃথিবীর এত দেশের এত মানুষ রোজা রাখে- কেউ কেউ দশ ঘন্টা, কেউ বারো, কেউ চৌদ্দ, কেউ বিশ! এদের সবাই কি একই পরিমাণ পূণ্য পায়, নাকি পূণ্যের পরিমাণ রোজার দৈর্ঘ্যের সাথে সমানুপাতিক? প্রশ্নটা অবশ্য 'ইসনা'র কাছেও করা যায়, তবে বলা যায়না, সে ক্ষেত্রে তারা হয়তো আগামী বছর থেকে মাগরিবের বদলে আসরের সময় ইফতারের নিয়ম করে ফেলতে পারে! আমেরিকায় সবই সম্ভব।

বাংলাদেশে রোজার দিনে স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালতে মহা সুবিধা। বুয়েটে রোজার দিনে ক্লাস শুরু হতো দেরিতে, শেষ হতো তাড়াতাড়ি, আবার ১ ঘন্টার ক্লাসগুলি ৩৫ মিনিট হবার কারণে স্যারদের বিরক্তিকর লেকচার গুলোও খুব দ্রুত পার হয়ে যেত। আমেরিকায় সে খাতির নেই। পিএইচডি স্টুডেন্টদের রিসার্চের জন্য ধরাবাঁধা কোন রুটিন তো নেইই, বরং হুট করে ছোট্ট একটা ইমেল দেবে- 'ইক্ষুনি এসো, নতুন আইডিয়া পাওয়া গেছে, আলোচনা আবশ্যক।' সবাই মিলে তখন কোন একটা সমস্যার সমাধানের জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা আলোচনার টেবিলে বসে গবেষণা করতে হবে। কখনো কখনো এসব মিটিংয়ে সুস্বাদু খাবার দাবারের ব্যবস্থাও থাকে। কিন্তু, রোজার মাসে এই খাবার গুলোর দিকে লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কোন কিছুই করার ছিলনা। সবাই খেতে খেতে কাজ করছে, আর আমি খাবারের প্রতি কোন আগ্রহ দেখাচ্ছিনা বলে সবাই আমাকে একজন নিবেদিত প্রাণ রিসার্চার মনে করত। তাদের ভুল আমি কখনও ভাঙ্গাতে যাইনি।

সারাদিন পড়াশোনা, গবেষণা, আর অনুশোচনা শেষে ইফতারের সময় হলেই ইউনিভার্সিটির কাছেই মসজিদে চলে যেতাম। সেখানে মাগরিবের পর জম্পেস খাওয়া দাওয়া হয়। প্রতিদিনের মেনুতে পোলাউ, রোস্ট, ভেজিটেবল, সালাদ এসব কমন। খাবারের পর ডেজার্টের জন্য কেক, পেস্ট্রি এসব তো আছেই। এখানে একেকদিন একেকটা ফ্যামিলি ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য ইফতারের ব্যবস্থা করে। কোনদিন তাই আরবী, কোনদিন আমেরিকান, কোনদিন বাংলাদেশি- এককথায় সব ধরনের ইফতারিই খেয়েছি। পরিবেশটাও বেশ সুন্দর- মসজিদের একটাই ঘর, ঠিক মাঝখানে কয়েকটা লম্বা টেবিলে খাবার সাজানো থাকে, ছেলেরা একপাশ থেকে আর মেয়েরা অন্য পাশ থেকে পছন্দ মত খাবার তুলে নিয়ে বুফে সিস্টেমে খাওয়া-দাওয়া করে। এভাবে সবাই একসাথে বসে খাবার মাঝে একটা আনন্দ আছে। এখানেই পরিচয় হলো বাংলাদেশী মুহাইমিন, পাকিস্তানী ওমর, ইন্ডিয়ান আলী, আফগানী শাহেদ, লেবাননের সামির, জামাইকার আবু বকর, আহমেদ সহ আরো অনেকের সাথে। মেয়েদের মাঝে শুধু ইজিপ্টের মেয়ে লুশেইনার নামটা মনে আছে। লুশেইনা সাইকোলজির ছাত্রী, মানুষের সাথে কথা বলে তাদের মনস্তত্ত্ব বোঝা তার হবি। আমাকে দেখে তার বোধহয় মানসিক রোগী মনে হয়, নচেৎ নিজে থেকে কোন রূপসী তরুণীর আমার সাথে কথা বলার আমি কোন কারণ দেখিনা। লুশেইনা ছাড়া পাকিস্তানী একটা মেয়ে ও সিরিয়ার একটা মেয়ে প্রায়ই আমাদের সাথে তানিয়া আপার গাড়িতে মসজিদ থেকে ইউনিভার্সিটি যাবার পথে লিফট নিত। এক সাথে এত যাওয়া আসা করলেও আফসোসের বিষয় যে, তাদের নামটাও কখনও জিজ্ঞাসা করা হয়নি। আগামী রমজানের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া এখন আর কোন গত্যন্তর নেই।

প্রতিদিন যে এমন স্বাদের ইফতার কপালে জুটেছে তা নয়। হিসেব করে দেখা যাবে এবার বিচিত্র বিচিত্র জায়গায় ইফতার করতে হয়েছে। যেদিন এসিএম প্রোগ্রামিং কনটেস্ট এর মিটিং থাকত, সেদিন ইফতার করতে হতো ফ্রী পিৎজা দিয়ে। এখানে প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতার প্রতি কোন স্টুডেন্টেরই বিন্দুমাত্র কোন আকর্ষণ নেই। সবাই মূলত ফ্রী পিৎজা খেতেই আসে। আমি এখানে আসার পরই এসিএমের সাথে জড়িয়ে পড়ি। পরে দেখা গেল কাজটাতে বেশ লাভই হয়েছে। আমেরিকার "ফ্রী" পিৎজা গুলো আসলেই বেশ সুস্বাদু, টাকা দিয়ে খেতে এত্ত মজা লাগেনা। কোন কোন দিন আবার ইফতার করেছি শপিং মল গুলোতে। প্ল্যান ছিল শপিং শেষে মসজিদের ডিনারে যোগ দেব, কিন্তু আমেরিকার শপিং সেন্টার বলে কথা- একবার ঢুকলে শুধু পুরোটা একচক্কর ঘুরতেই দু'ঘন্টা পেরিয়ে যায়। এভাবে প্রায় বেশ কিছু উইক এন্ডে শপিং সেন্টারে ইফতার করতে হয়েছে- কোনদিন কেক, কোনদিন জাভালাঞ্চে, কোনদিন ফ্রাপাচিনো, আবার কোনদিন শুধু পানি খেয়ে। ফ্রাপাচিনোটা আমার খুব দারুণ লেগেছে। এটা একধরনের ঠান্ডা কফি, যেটার ভেতর আইসক্রীম, কফি, ফোম এই কি কি যেন থাকে। জিনিসটা এত ঠান্ডা যে, এক চুমুক খেলেই মাথার খুলি পুরোটা ঠান্ডায় জমে যায়। বিশ্বাস করানো মুশকিল, তবে বাংলাদেশে এটা বানানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের এটসেট্রার কফি ওয়ার্ল্ডে এর কাছাকছি একটা পানীয় পাওয়া যায়। সেটাকে ডীপ ফ্রিজে রেখে একমাস পর বের করে সাথে সাথে খেলে হয়ত ফ্রাপাচিনোর স্বাদ পাওয়া যেতে পারে।

রোজা কি জিনিস এটা এখানকার অনেকেই জানেনা। আমার বিচিত্র খাদ্যাভ্যাস তাদের অনেককেই তাই অবাক করেছে। আমার অফিসরুমে পাশের কিউবিকলে তাইওয়ানের একটা ছেলে বসে। ওর নাম 'চিহাউ'। আমার মতই সে একজন ফার্স্টইয়ার গ্রাজুয়েট স্টুডেন্ট। একই রুমে থাকায় তার সাথে আমার বেশ ভাব হয়ে গেছে। সে প্রায়ই আমাকে তার এ্যালগোরিদম কোর্সের নানান সমস্যা সমাধানের জন্য দেয়। চ্যালেঞ্জ রক্ষার্থে প্রায় প্রতিবারই কোন না কোন একটা সমাধান দিয়ে তাকে অবাক করে দিই। রোজার মাঝে একদিন দুপুর বারোটায় আমাকে সে বলল- নির্জন, চলো লাঞ্চ করে আসি। আমি বললাম, আমি আজকে যেতে পারছিনা। আমাকে সে ইতিমধ্যে একটু হলেও চিনে ফেলেছে। ফ্রী খাদ্য, অথচ আমি যেতে চাচ্ছিনা, এটা ওকে খুব অবাক করল। সে বুঝে উঠতে পারছিলনা, আমার কি হয়েছে। পরে বাধ্য হয়ে আমাকে বলতে হলো, 'আমি রোজা। আজকের দিনে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কিছু খাওয়া আমাদের ধর্মে নিষেধ আছে।' ওকে ভয় পাইয়ে দেবার জন্য এটাও যোগ করলাম, 'গোটা সেপ্টেম্বর মাসেই আমি দিনের বেলা কিছু খাব না।' সে অতি মাত্রায় অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, 'সারাদিন কি করে একটা মানুষ না খেয়ে থাকবে? আমি তো একবেলা না খেয়ে থাকলেই মরে যাব।' আমি তাকে বললাম, ' আমাদের দেশে কোটি কোটি মানুষ সারা বছরই না খেয়ে থাকে, এক মাস তো আমাদের জন্য কোন ব্যাপারই না।' সে যাবার সময় বলতে লাগল, 'সারা বছর? ভেরী ইন্টারেস্টিং- এটা কেমন রীতি? আমি পুরো কাহিনী তোমার কাছে শুনতে চাই।' ... সেদিন বেশ তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে আসলাম। চিহাউ-এর এবারের প্রশ্নটা আমার জন্য বেশ কঠিন হয়ে গেছে। এর উত্তর যারা জানেন, তাদের জন্যও বোধহয় চিহাউকে বুঝিয়ে বলা বেশ শক্ত।


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/28854919 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/28854919 2008-10-15 11:37:41
ইউনিভার্সিটি অফ ভার্জিনিয়া- আমার ইউনিভার্সিটি
পরদিন সকালবেলা ঘুম থেকে ওঠার পর একে একে সবাই আসা শুরু করল। প্রথমে তনিমা, তারপর জোয়েল, তারপর টিম, এবং সবার শেষে তানিয়া আপা আসলেন। বিছানা, লাগেজ, রান্নাঘর সবকিছুই ওলট-পালট হয়ে আছে। ফ্রিজ খালি, খাবার-দাবার কিছুই নেই। সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে তানিয়া আপা ডিক্লেয়ার করলেন, 'তোমরা এক্ষুণি আমার সাথে দোকানে চলো- অনেক কিছু কিনতে হবে'। আমরা শর্ত দিলাম, আসার সময় ডিপার্টমেন্টে নিয়ে যেতেই হবে। খুব সহজ শর্ত, তাই সবাই রাজি। খুশি মনে হৈ চৈ করতে করতে আমরা পাঁচ বাঙ্গালী তানিয়া আপার গাড়িতে চড়ে রওনা দিলাম। উনি জিজ্ঞাসা করলেন- তোমরা কোথায় যেতে চাও- স্যামস ক্লাব, ওয়ালমার্ট নাকি ক্রোগারস? নাম শুনে আমরা আর কি বুঝব, বললাম- জিনিসপত্রের দাম যেখানে কম, সেখানে নিয়ে যান। আপা হাসতে হাসতে বললেন, শুরুতে তিনিও এমনটা চিন্তা করতেন, আস্তে আস্তে নাকি ২০-৩০ ডলারও কিছু মনে হবেনা। জিনিসপত্রের দাম ৭০ দিয়ে গুন করতে নিষেধ করে দিলেন। ঢাকা থেকে মুনির একটা বাংলা গানের সিডি নিয়ে এসেছিল। গায়িকার নাম অনিন্দিতা দাস। শুনলাম গায়িকা তানিয়া আপার উল্লেখযোগ্য বান্ধবী এবং আমাদের বুয়েটেরই একজন প্রাক্তন ছাত্রী। গায়িকা বর্তমানে আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়াতে থাকেন এবং এটাই তার প্রথম সিডি। গানের কথাগুলি খুব সুন্দর। গান শুনেতে শুনতে আর দীর্ঘ-প্রশস্ত রাস্তার দুপাশে ছবির মত সুন্দর শহরটাকে দেখতে দেখতে আমরা একসময় স্যামস ক্লাবে পৌঁছালাম।

স্যামস ক্লাব দেখে আমার হতভম্ব অবস্থা। একটা দোকান কি করে এত বড় হতে পারে আমার ধারণা ছিলনা। আগে থেকে না জানলে আমি নিশ্চিত ভাবে এটাকে চিটাগাং পোর্টের মত কিছু মনে করতাম। বাংলাদেশে যেমন আগোরা কিংবা বিডিআর সপ গুলি আছে সেগুলোরই বড় সংস্করণ হচ্ছে স্যামস ক্লাব। বিশাল বিশাল একেকটা র‌্যাকে জিনিসপত্র সাজিয়ে রাখা আছে। র‌্যাকগুলি এত্ত বড় যে, ইচ্ছে করলে ওখানটায় ওরা টয়োটা কার সাইজের গাড়িও একটার ওপর একটা সাজিয়ে রাখতে পারবে। খাট-পালঙ্ক থেকে শুরু করে খাবার-দাবার, তরি-তরকারি, কাগজ-পত্র, পোশাক-আশাক, প্রসাধন সামগ্রী, ইলেকট্রনিক্স ইত্যাদি সহ একটা মানুষের ইহজীবনে যা কিছু লাগতে পারে তার সবকিছু পাওয়া যায় এখানে। আমার একসময় মনে হচ্ছিল, এখানে যত জিনিস আমি দেখছি শুধু সেটুকু যদি গোটা ঢাকা শহরের মানুষকে সুষমভাবে বন্টন করা হয়, তবে একেক জনের ভাগে প্রতিটা জিনিস অন্তত পাঁচ কপি করে থাকবে। প্রত্যেকে একটা করে শপিংকার্ট নিয়ে কেনাকাটায় ঝাপিয়ে পড়লাম।

যা দেখছি তাতেই অবাক হচ্ছি সবাই। মনে হচ্ছে সবকিছু কিনে ফেলি। সারি সারি র‌্যাকে থরে থরে জিনিস সাজানো। প্রতিটা জিনিসের ওপরে র‌্যাকের গায়ে জিনিসের দাম লেখা আছে। কিছু কিছু জিনিসের দাম দেখে আমরা অবাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছি। যেমন, সবচেয়ে সস্তা একটা জিন্সের প্যান্টের দাম লেখা আছে ৪৯ ডলার, তার মানে ৩৪৩০ টাকা! আমরা সবাই এই একই জিনিস ঢাকার নিউমার্কেট থেকে ২৫০ টাকায় কিনেছি। একটা সানগ্লাসের দাম লেখা ৪২ ডলার। এনামুল তার দরাজ গলায় বলল, ভাইয়া এই জিনিসতো ঢাকায় ৪২ টাকায় বিক্রি হয় দেখছি। সিডি-ডিভিডির দাম দেখে আমেরিকার প্রতি আমাদের করুণাই হলো। স্পাইডারম্যানের চারপর্বের ডিভিডির দাম লিখে রেখেছে ২৮ ডলার। আমি গত কয় বছরে টোটাল ২৮ ডলারের সিডি কিনেছি সেটা কাউন্ট করে বের করতে পারলাম না। জিনিস দেখেই কিনতে ইচ্ছে করছে, আর দাম দেখেই আঁতকে উঠছি। তানিয়া আপা এবার বললেন, এসব রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র যা আছে সেগুলি আগে কিনি। দাম নিয়ে চিন্তা তিনি পুরোপুরি বন্ধ করতে বললেন।

নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস বলতে এতদিন আমার ধারণা ছিল- একটা কম্পিউটার, একটা ইন্টারনেট লাইন, কিছু বই/কাগজ-পত্র আর একটা মোবাইল ফোন। কিন্তু, তানিয়া আপা যখন আমাদেরকে স্যামসক্লাবের আলু-পেঁয়াজের সেকশনে নিয়ে আসলেন, তখন বুঝলাম জীবনের আরো অনেক দিক আছে। আমাদের খেয়াল হলো, স্যামসক্লাবের এই সুবিশাল আলু-পেঁয়াজ দিয়ে আমাদেরকেই আগামী কয়েক বছর তরকারি রাঁধতে হবে, সেটাকে খেতে হবে এবং বেঁচেও থাকতে হবে। তিনটা কাজই আমাদের জন্যে কঠিন হলেও আপাতত কেনাকাটার সময় আর ওসব নিয়ে টেনশন করতে চাইনা। আমরা শপিং কার্ট ভর্তি করে মহা উৎসবে সওদা-পাতি কেনাকাটা করতে লাগলাম।

বাংলাদেশে যা পাওয়া যায় এখানে প্রায় সবকিছুই আছে, তবে সবকিছুই মনে হয় সাইজে অন্তত ছয়গুন বড়। একেকটা আলু-পেয়াজের যা সাইজ তাতে মনে হতে লাগল দেশ থেকে আনা রান্নার রেসিপি গুলো সব আবার নতুন করে লিখতে হবে। যেমন, দুই মুঠ ডাল রান্নার জন্য আম্মা লিখে দিয়েছেন দুটা পেঁয়াজ কেটে দিতে; এখন মনে হচ্ছে এই পেঁয়াজের যে সাইজ তাতে দুটা পেঁয়াজ ২ মুঠ ডালের মধ্যে দিলে রান্নার পর ডালের বদলে সেটা পেঁয়াজের স্যুপে পরিণত হতে বাধ্য। কাঁচা মরিচের সাইজে আমরা সত্যিই মুগ্ধ। এগুলি অবশ্য ঠিক কাঁচামরিচ না- এগুলি ক্যাপসিকাম। আমাদের রামপুরার নিজেদের বাড়ির ছাদে আব্বার লাগানো ক্যাপসিকামের গাছের বদৌলতে আমি জিনিসটা চিনি। কিন্তু, এটার সাইজও এক্কেবারে পেঁপের মত! আমরা এসব বিশাল বিশাল সাইজের সবজি দিয়ে আমাদের সবকটা শপিং কার্ট ভর্তি করে ফেললাম।

মজার মজার আরো কিছু আইটেম দেখলাম। কেক-পেস্ট্রির সেকশনে এসে একেবারে লোভ লেগে গেল। আমার মতে আমেরিকা একটা জিনিসে নির্দ্বিধায় বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হবার যোগ্য, এবং সেটা হচ্ছে- কেক। এদের কেক এত নরম আর এত মজা হয় যে, কেউ একবার খাওয়া শুরু করলে তাকে আর থামানো যাবেনা। আমার খুব ইচ্ছে করছে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষকে আমি এক পিস করে হলেও এই কেক খাওয়াই। না খেলে কখনও কেউ বুঝতে পারবে না আমি কেন এটা নিয়ে এত কথা বলছি। সেদিন ছিল এনামুলের জন্মদিন। আমরা তাই ওর জন্য একটা কেক কিনে নিলাম। সেই কেক প্রায় বিশ দিন আমাদের ফ্রিজে ছিল। আমরা প্রতিদিন একটু একটু করে খেতাম। কেকটার এক্সপাইরি ডেট ওভার হয়ে যাবার পরও আমরা সেটাকে ফেলিনি। শেষমেশ আমাদের ইন্ডিয়ান এক সহপাঠি, বিদ্যাভূষণ সেটাকে খুব মজা করে খেয়েছে। এই লেখা লিখবার মুহূর্ত পর্যন্ত আমি ঠিক নিশ্চিত না- বিদ্যাভূষণের পেটের কি অবস্থা।

কি কিনছি, কেন কিনছি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। তারপরও বেশ মজা লাগছিল। শপিংকার্ট নিয়ে দোকানের মধ্যে ঘোরাঘুরি করতেই বেশ ভালো লাগছিল। আরেকটা জিনিস খেয়াল করলাম, এখানে সবাই আমাদেরকে দেখেই দন্ত বিকশিত করে 'হাই-হেলো' করছে। অচেনা অজানা সবাই দেখা মাত্রই খুব বেশি খুশি হয়ে উঠছে। আমাদের শপিংকার্টের সামনে কেউ চলে আসলেই সাথে সাথে খুবই আন্তরিকতার সাথে 'সরি, সরি' করছে। আমি ভাবতে লাগলাম, ব্যাপারটা কি? তানিয়া আপা কি মাত্র এক বছরে এত বেশি বিখ্যাত হয়ে গেলেন যে, শপিং করতে আসা সবাই তাকে চিনে ফেলছে, আর সেজন্যই আমাদের এত সম্মান দেখাচ্ছে? আপাকে জিজ্ঞাসা করাতে উনি হাসতে হাসতে বললেন, এটাই নাকি এদেশের কার্টেসি। কারো সাথে দেখা হলেই, সে যত অপরিচিতই হোক না কেন, এরা হাসি মুখে কথা বলে। ব্যাপারটা আমার বেশ ভালো লাগল। আমাদের দেশে আমরা পরিচিত লোকজনের সাথে হঠাৎ দেখা হয়ে গেলে চিন্তা করি কি করে না চেনার ভান করে থাকা যায়, আর এরা উল্টো অপরিচিত লোকদের দেখে কুশল বিনিময় করছে! দেশটার উন্নতির পেছনে যে সকল কারণ আছে তার একটা বোধ হয় আমার কাছে পরিষ্কার হতে লাগল।

অনেককিছু কেনার পর আমরা সবাই হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। আর পা চলছিল না, বেলাও অনেক হয়েছে। আমরা টাকা পয়সা দিয়ে বেরিয়ে আসলাম। আমরা তিনজনে মিলে প্রায় চারশ ডলারের মত বাজার করলাম। তনিমা ওর টাকা আলাদা দিল। তানিয়া আপাও নিজস্ব যা কিনেছেন সেটার দাম আলাদা পরিশোধ করলেন। খেয়াল করলাম, এরা বিল যত হয়েছে ঠিক তত টাকাই রাখল। যেমন, যদি কারো বিল হয় ৩৯৯.৯৯ ডলার, তবে ৪০০ ডলার দিলে তারা তাকে ১ সেন্টও ফেরত দেবে। আমাদের দেশ হলে আমরা কেউ ওই ১ সেন্ট আশাও করতাম না। হয়ত ওদের মুদ্রার দাম বেশি বলেই ওরা এক সেন্টকেও মূল্য দেয়। আবার এমনটাও হতে পারে, ওরা এক সেন্টকেও মূল্য দেয় বলেই ওদের মুদ্রার মূল্যটা আজ এত বেশি।

ফেরার পথে ডিপার্টমেন্টে যাওয়ার কথাটা মনে করিয়ে দিলাম। তখন প্রায় ছয়টা বাজলেও মনে হচ্ছিল দুপুর দুটা কিংবা বড় জোর তিনটা। শুনলাম আমেরিকায় নাকি রাত আটটায় সূর্য ডোবে। এখনও তাই হাতে অনেক সময়। স্যামস ক্লাব থেকে ড্রাইভ করে প্রায় মিনিট বিশেকের পথ পাড়ি দিয়ে আমরা ইউনিভার্সিটি এলাকায় প্রবেশ করলাম। গোটা শারলোটসভিল শহরের সবকিছুই আসলে ইউনিভার্সিটি কেন্দ্রীক। পথে ঘাটে সর্বত্রই ইউনিভার্সিটির একটা ছোঁয়া আছেই। ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের কাছাকাছি আসতেই চোখে পড়া শুরু করল বড় বড় করে টাঙ্গানো 'ওয়েলকাম নিউ স্টুডেন্ট' লেখা ব্যানার। বুঝলাম, নতুন ছাত্রদেরকে গ্রাউন্ডসে স্বাগতম জানানোর প্রস্তুতি এরা ভালোভাবেই নিয়েছে। এখানে ক্যাম্পাসকে এরা 'গ্রাউন্ডস' বলে। গ্রাউন্ডসের সবগুলো বিল্ডিংই কোন না কোন বিখ্যাত ব্যাক্তির নামে নাম করা। যেমন, থরটন হল, ক্যাবেল হল, ব্রুকস হল, ব্রায়ান হল ইত্যাদি। আমি অবশ্য এদের কাউকেই চিনতে পারলাম না। উইকিপিডিয়া পড়ে শুধু এইটুকু জানি যে, ইউভিএ ইউনিভার্সিটিটি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসনের নিজের হাতে গড়া। শুরুতে যে বিল্ডিংটি ইউনিভার্সিটির মূল ভবন ছিল, সেটাকে বলা হয় 'রোটুন্ডা'। এই রোটুন্ডার নকশা নাকি থমাস জেফারসন নিজে করেছিলেন। লেখার শুরুতে যে ছবি, সেটা রোটুন্ডার। রোটুন্ডার সামনে যে সবুজ লন আছে, সেটা নাকি তার নিজের তৈরি। সবাই বলে, রোটুন্ডার বারান্দায় শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকলে নাকি সমুদ্র দেখা যায়। তবে এটা সত্যি সত্যি কেউ দেখেছে কিনা আমি জানিনা। আমাকে যে ছেলেটা এই তথ্য দেয়, আমি তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তুমি কি নিজে দেখেছ? সে আমাকে জানায়, তার প্রেমিকাকে নিয়ে সে একবার সেখানে গিয়েছিল। তার প্রেমিকা নাকি স্পষ্ট দেখেছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তুমি দেখনি কেন তাহলে? সে বলল, আমি তো তখন 'ওকে' দেখছিলাম।

কম্পিউটার সায়েন্স ডিপার্টমেন্ট যে বিল্ডিংয়ে তার নাম ওলসন হল। এটি অপেক্ষাকৃত নতুন বিল্ডিং হলেও, এখানকার প্রতিটি বিল্ডিংয়ের মত এটার ডিজাইনেও রোটুন্ডাকে ফলো করা হয়েছে। ইউভিএর প্রতিটি বিল্ডিংই আসলে এই একই ধাঁচে তৈরি। আমি প্রথম দেখায় অবাক হচ্ছিলাম যে, মাত্র একতলা একেকটা বিল্ডিংয়ে একেকটা ডিপার্টমেন্ট কি করে থাকতে পারে? পরে জানতে পেরেছি, বিল্ডিংগুলো সব আসলে চার তলা। এর মাঝে আমরা শুধু ওপরের অংশ দেখতে পাই, মাটির নিচেও বেশ কিছু তলা আছে। রোটুন্ডার সাথে মিল রাখতে গিয়েই বুঝি এমনটা করতে হয়েছে। ছুটির দিন হলেও ওলসন হল সবসময়ই খোলা থাকে। আমরা সবাই রুদ্ধশ্বাসে একে একে মূল দরজা দিয়ে ঢুকে পড়লাম।

ডিপার্টমেন্টটা চতুর্ভূজ আকৃতির এবং সিমেট্রিক। একদম মাঝে কিছু রুম, তাদের চারপাশ দিয়ে করিডোর, আবার করিডোরের অন্যপাশে চারদিক ঘিরে আরো কিছু রুম। বন্ধের দিন বিধায় বেশিরভাগ রুমই বন্ধ। আমরা করিডরের চারপাশ দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে দেয়ালে টাঙ্গানো বড় বড় বাঁধাই করা পোস্টার গুলো দেখতে লাগলাম। একটা পোস্টার দেখে আমাদের গর্বে বুক ভরে উঠল- সেটার কথায় পরে আসছি। বাকি পোস্টারগুলোও ইন্টারেস্টিং। প্রতিটি প্রফেসর যে সকল প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করছেন বা করেছেন তার সারাংশ নিয়ে কিছু পোস্টার টাঙ্গানো। আবার একখানে দেখলাম একটা বোর্ডে বিখ্যাত বিখ্যাত সায়েন্টিস্টদের সাথে লেখা গবেষণাপত্রগুলো আলপিন দিয়ে সারিবদ্ধভাবে ঝোলানো। এছাড়াও বিভিন্ন সালের সকল গ্রাজুয়েট স্টুডেন্টদের ছবি টাঙ্গানো আছে দেয়ালে। ২০০৭ সালের ফল সেমিস্টারের ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে তানিয়া আপার ছবি দেখতে পেলাম। তার ভূতের মত ছবিটা নিয়ে আমরা হাসাহাসি করছিলাম আর তিনি বারবার বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন, কেন তার ছবি সেদিন খারাপ উঠেছিল। মর্তুজা ভাইয়ের ছবিও দেখলাম। উনি অবশ্য এখন আর ইউভিএতে নেই, মাস্টার্স শেষ করে এখন উনি মাইক্রোসফটে চাকরি করছেন। আমরা একে অপরকে বিখ্যাত কবিতার সুরে বললাম, 'দেখিস- একদিন আমরাও'।

ঘুরতে ঘুরতে আমরা ডিপার্টমেন্টের টী-রুমে পৌঁছালাম। এখানে সবার জন্য চা-কফি, স্ন্যাক্সের সবরকম ব্যবস্থা আছে। যার দরকার সে খাওয়ার পর একটা নির্ধারিত বক্সে দাম দিয়ে বেরিয়ে যাবে। কেউ যদি টাকা না দেয়, কারো কিছু করার নেই। তারপরও সবাই টাকা দেবে। এখানে সবাই জেন্টলম্যান, পুরো ব্যাপারটাই বিশ্বস্ততার ভিত্তিতে বছরের পর বছর ধরে চলছে। আমি শুনেছি এখানে ছাত্রদের বিশ্বস্ততার ওপর এত বেশি আস্থা যে, পরীক্ষার হলে কখনও কোন গার্ড থাকেনা। ছাত্ররা চাইলে পরীক্ষার খাতা বাসায় নিয়ে পরীক্ষা দিয়ে আবার সময় শেষ হবার আগে খাতা জমা দিতে পারে। একজন ছাত্র নিজের আত্মসম্মান থেকেই কখনও অন্যকিছু করবেনা, এটাই নাকি স্বাভাবিক। আমি অবাক হব, নাকি মুগ্ধ হব, ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না।

করিডর দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে আবার সেই আগের জায়গায় এসে দাঁড়ালাম যেখানটায় আমাদেরকে মুগ্ধ করা সেই পোস্টারটি টাঙ্গানো। এবছর সারাবিশ্ব থেকে যে পঁচিশজন ছাত্র-ছাত্রী এই ডিপার্টমেন্টে পিএইচডি করতে আসছে তাদের প্রত্যেকের নাম এই বোর্ডে টাঙ্গানো। না, নিজের নাম দেখে আমরা কেউ মুগ্ধ হইনি- মুগ্ধ হয়েছি বোর্ডটাতে টাঙ্গানো বিশ্বের মানচিত্রটি দেখে। গোটা বিশ্বের যেসকল শহর থেকে এবার কেউ না কেউ এই ডিপার্টমেন্টে পিএইচডি করতে আসছে, সেই সেই শহরের ওপর সুন্দর করে এক একটা আলপিন বসানো। আমেরিকা, চায়না, ভারত, ইরান, ব্রাজিল, তাইওয়ানের মত আমাদের ছোট্ট বাংলাদেশের মাঝে আরও ছোট্ট ঢাকা শহরের ওপর একটা সুন্দর আলপিন বসানো। খুব সামান্য একটা ব্যাপার- কিন্তু এই সামান্য জিনিস আমাদের সবার মন জয় করে নিল। অনেক দূর থেকে আমরা এসেছি অজানা এক শহরের অচেনা এক পরিবেশে। নিজদেশ ছেড়ে অন্য দেশের অন্য এক প্রতিষ্ঠানকে আপন মনে করা তাই এতটা সহজ না। ইউভিএ সেটা জানে, আর জানে বলেই খুব সহজভাবে বুঝিয়ে দিল এই ইউনিভার্সিটি কোন দেশের বা কোন জাতির একার নয়, এটা আমাদের সবার। মনে মনে ভাবতে শুরু করলাম, ইউনিভার্সিটি অফ ভার্জিনিয়া- আমার ইউনিভার্সিটি।











]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/28840105 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/28840105 2008-09-07 23:37:10
ভার্জিনিয়ার পথে
আমরা তিনজন একসাথে ভার্জিনিয়া যাচ্ছি- এনামুল, মুনির এবং আমি। তিনজনই কম্পিউটার সায়েন্সে পিএইচডি করতে যাচ্ছি। ওরা দুজন আমার এক বছরের জুনিয়র- বুয়েটের হিসেবে এক সেমিস্টার ছোট। প্লেনে আমরা কে কোন সিটে বসব সেটা আগেরদিন রাতেই ইন্টারনেটে বুক করে রেখেছিলাম। সিট খুঁজে পেতে তেমন কোন অসুবিধা হলনা, কিন্তু প্লেনটা যতটা বড় হবে এবং সিটগুলো যতটা স্পেস নিয়ে থাকবে ভেবেছিলাম, বাস্তবে দেখা গেল তেমন নয়। সিটগুলো খুবই কাছাকাছি আর প্লেনটাও খুব একটা বড় নয়। হয়তোবা এমিরেটসের খুব বেশি প্রশংসা শুনেছি বলেই চাক্ষুষ দেখার পর কল্পনার সাথে মিল না থাকায় একটু হতাশ হলাম। তবে আনুষঙ্গিক অন্যান্য জিনিস বেশ ভালোই মনে হলো। প্রতিটি সিটের সাথেই একটা করে মনিটর লাগানো আছে যেটাতে প্রায় ৫০০ টি চ্যানেল দেখা যায়- এর কোনটাতে ইংলিশ সিরিয়াল, কোনটাতে ইংলিশ/হিন্দি মুভি চলছে, আবার কোনটাতে গেম খেলারও অপশন আছে। প্রত্যেক যাত্রীকে একটা করে বালিশ আর একটা করে কম্বল দিয়ে গেছে। সিটের সাথে একটা টেলিফোন টাইপ যন্ত্র লাগানো আছে যেটা একই সাথে রিমোট কন্ট্রোলের কাজ করছে, আবার ওটা দিয়ে ক্রেডিট কার্ড থাকলে যে কোন জায়গায় ফোনও করা যায়। ফোন দেখেই একটা জিনিস মাথায় আসলো। প্লেন যেহেতু এখনও এয়ারপোর্টেই আছে, আমি টেস্ট পারপাস আমার মোবাইল দিয়ে আব্বার মোবাইলে কল করলাম। মোবাইলে ৫ টাকা ছিল, আমার লক্ষ্য সেটাকে কথা বলে এখানেই শেষ করে দিই। আমেরিকায় ওটাকে নিয়ে যাচ্ছি শুধুই ফোনবুক আর এলার্ম দেয়া ঘড়ি হিসেবে ব্যবহারের জন্যে। আব্বাকে পাওয়া গেল, কিছুক্ষণ কথা বলে আমার বর্তমান স্ট্যাটাস জানিয়ে দিলাম। আম্মার সাথেও কথা হলো, মনে হলো কান্নাকাটি কিছুটা কমে গেছে। আবার শুরু হবার আগেই ফোনে বিদায় নিলাম। এরপর একটা টেক্সট মেসেজ পাঠালাম, পৌঁছালো কিনা বুঝা গেল না। তারপরও মনে হয় অন্তত ১ টাকা বাকি থাকলো। আশাকরি নেক্সট টাইম বাংলাদেশে আসার পথে ওটা খরচ করবো।

যথা সময়ে প্লেন আকাশে উড়াল দিলো। প্লেনের আকাশে ওড়ার স্টাইলটা আমার কাছে বেশ রাজকীয় মনে হলো। আস্তে আস্তে রান ওয়ের শেষ মাথায় গিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে তারপর জোরে একটা দৌড় দেয় এবং এক সময় সাঁই করে আকাশে উড়াল দেয়। পুরো ব্যাপারটা নিজ চোখে দেখে নিলাম আমার সামনের মনিটরে। এমিরেটসের একটা সুন্দর সিস্টেম যে, প্লেনের সামনে এবং নিচে দুটো ক্যামেরা লাগানো আছে, কেউ ইচ্ছে করলেই তাই সামনের মনিটরে প্লেনের আশপাশের পুরো দৃশ্য দেখতে পারে। প্লেন আকাশে উড়লে জানালা দিয়ে তাকিয়ে ওপর থেকে আলো ঝলমল রাতের ঢাকাকে দেখতে বেশ মোহনীয় লাগছিল। আস্তে আস্তে সব আলো দৃষ্টির অগোচরে চলে গেল। প্রথম বারের মত দেশের জন্য খুব খারাপ লাগতে লাগল।

প্লেনের যাত্রীরা সবাই যাচ্ছে দুবাই। সেখান থেকে আমাদের মত কেউ কেউ হয়ত কানেক্টিং ফ্লাইটে অন্য কোথাও যাবে। আমাদের রুট হলো- ঢাকা->দুবাই->লন্ডন->আটলান্টা->শারলোটসভিল। আমাদের তিনজনের সিট পাশাপাশি। এনামুল জানালার দিকের সিটে আর মুনির আমাদের মাঝে বসেছিল। তিনজনেই যেভাবে পারি যেভাবে সামনের টাচ স্ক্রীন মনিটরে টিপাটিপি শুরু করলাম। কিভাবে কোন চ্যানেল দেখা যায় তিনজন মিলে একসময় সবকিছু আবিষ্কার করে ফেললাম। এরপর প্রথম কিছুক্ষণ খুব উৎসাহ নিয়ে 'ফ্রেন্ডস' সিরিয়াল দেখলাম। সবই দেখা পর্ব, তারপরও আকাশে উড়তে উড়তে টিভি দেখতে কেমন লাগে এটা একটা নতুন অভিজ্ঞতা। র‌্যাচেল-মনিকার বাসা বদলের পর্বগুলি বসে বসে আবার দেখতে মন্দ লাগল না।

রাত হতেই প্লেনে খাবার দাবার দেয়া শুরু হয়ে গেল। ট্রেতে করে নানান রকমের খাবার দিয়ে গেল একজন এয়ারহোস্টেস। খাবার গুলি প্রতিটিই দেখতে সুন্দর, কিন্তু মুখে নিয়েই আমাদেরকে থু-করে সব ফেলে দিতে হলো। মসলা ছাড়া মুরগি, ইটের মত শক্ত বনরুটি, জঘন্য পাসতা- কোনটাই আমরা চেষ্টা করেও মুখ থেকে পেট পর্যন্ত নামাতে পারলাম না। শুধুমাত্র পানি আর ফলের জুস খেয়ে ক্ষুধা মেটালাম। মনে মনে আম্মাকে ধন্যবাদ দিলাম আসার আগে জোর করে খিচুরী খাইয়ে দেবার জন্য। বুঝে ফেললাম, দুই দিনের জার্নিতে ওই আধা প্লেট খিচুরীই আমার সম্বল।

আমার ধারণা ছিল এয়ারহোস্টেস মানেই কোন একজন মেয়ে, কিন্তু আমার ধারণা ভুল প্রমাণ করে এক পুরুষ এয়ারহোস্টেস(!) এসে সবাইকে ওয়াইন অফার করতে লাগল। এমিরেটসের মত ইসলামিক এয়ারলাইন্সে ফ্রী ওয়াইন খাওয়ানোর ব্যাপারটি দেখে আমি একটু হতাশ হলাম। আমি ভেবেছিলাম যাত্রীরা হয়ত কেউ নেবেনা, কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে আমার আশেপাশে যে ভদ্রলোক প্রথম হাত তুলে ওয়াইন ওয়ালাকে কাছে ডাকলো সে আমাদের মতই এক বাঙ্গালী। শুধু তাই-না, তার পরনে প্যান্ট-শার্ট হলেও মাথায় টুপি! বাসা থেকে হয়ত সবাইকে দেখিয়ে টুপি পরে দুবাই রওনা দিয়েছে, অথচ দেশের সীমানা না পেরোতেই এমন পরিবর্তন দেখে আমি রীতিমত ভয় পেয়ে গেলাম। এই ফ্লাইটগুলোতেই তো আমাদের দেশের সেরা সেরা সন্তানরা বিদেশ যাচ্ছে। তারাও কি এমন করবে? আমি নিজেও কি একদিন এমন হব? নিশ্চয়ই না। খোদা আমাদের রক্ষা করুন। চাষা আছি, চাষাই থাকবো- ভালো হবার আমার দরকার নাই। মন টন খারাপ করে সিনেমা দেখতে শুরু করলাম। মেনু থেকে চয়েস করে একটা ভূতের সিনেমা চালু করলাম। জাপানী একটা মেয়ে মৃত্যুর পর তার বিশ্বাসঘাতক ফটোগ্রাফার প্রেমিকের ওপর ভূত সেজে প্রতিশোধ নিচ্ছে। জাপানী মেয়েটা এত ভয়ঙ্কর অভিনয় করেছে যে আমি সত্যিই ভয় পেয়ে গেলাম। প্লেনে তখন অন্ধকার। আশেপাশের কোন সিটে কোন জাপানী মেয়ে বসেছে কিনা নিশ্চিত হয়ে দেখার পর নিজের সিটে গা এলিয়ে দিলাম। আধো ঘুম, আধো জেগে থাকা অবস্থায় বেশ কয়েক ঘন্টা থাকার পর এক সময় এনাউন্সমেন্ট শুনতে পেলাম, আমরা দুবাই পৌঁছে গেছি।

দুবাই এয়ারপোর্টটা দূর থেকে লম্বা একটা টানেলের মত মনে হলো। সেখানে প্রবেশের সময় শুরুতেই বেল্ট, জুতা, কোট- সবকিছু খুলে এমনভাবে আমাদের চেক করা হলো যেন আমরা সবাই জেল-খাটা দাগী আসামী। সবার চোখে-মুখে তখন স্পষ্ট ক্লান্তি আর বিরক্তির ছাপ। আমরাও কম টায়ার্ড না, তারপরও অবাক হয়ে দুবাই এয়ারপোর্ট দেখছি। যা দেখছি তাতেই অবাক হচ্ছি। দু-পাশে সারি সারি দোকান আর মাঝে হাঁটার সুবিধার্থে এস্কেলেটর। এয়ারপোর্টের পুরোটা দামী কার্পেটে মোড়া। সাদা-কালো, আরবি-ইংলিশ সহ সকল জাতের অসংখ্য যাত্রীতে পুরো এয়ারপোর্ট গিজগিজ করেছে। যে যেখানে পেরেছে যেখানেই শুয়ে-বসে আছে। দোকান গুলো সব ডিউটি ফ্রী- অর্থাৎ ট্যাক্স দিতে হবেনা। অগনিত এসকল ডিউটি ফ্রী সপ গুলিতে পাওয়া যায়না এমন কিছু বোধহয় নাই। রেস্টুরেন্ট, পোশাক-আশাক, কসমেটিক্স, ইলেক্ট্রনিক্স- সব কিছুর দোকানই আছে। আমাদের হাতে সময় কম, তাই আমরা শুধু বাংলাদেশে টেলিফোন করার জন্য ফোন-বুথ খোঁজা শুরু করলাম। খোঁজ করতে করতে একটা জায়গায় দেখতে পেলাম ফ্রী ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধা। সেখানে ছয়টার মত কম্পিউটার আছে যার মধ্যে শুধু তিনটা কাজ করে। সেই তিনটাতেই মানুষের লাইন। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর আমরা চান্স পেলাম। ইয়াহু ম্যাসেঞ্জারে লগইন করতেই আব্বাকে পেয়ে গেলাম। আব্বাকে বলে দিলাম বাকি দুজনের বাসায় ফোন করে খবর দিতে যে আমরা এখনও সহি সালামতে আছি। দৌঁড় দিয়ে এরপর লন্ডনে যাবার লাইনে গিয়ে দাঁড়ালাম। সেখানে আসলে কোন লাইনই ছিল না। আমরা তিনজন কাউন্টারে দাঁড়িয়ে ছিলাম, আমাদের দেখেই বাকিরা আমাদের পেছনে এসে দাঁড়ায়। দেখতে দেখতে আমাদের পিছেই একটা লাইন হয়ে যায়। লাইনে একটা পিচ্চি বাচ্চা মেয়ে কান্নাকাটি করছিল। আমাদের সাথে এই ফ্যামিলিটিও ঢাকা থেকে এসেছে। কাঁদতে কাঁদতেই মেয়েটি বমি করে দিল। বুঝতে পারলাম, এমিরেটসের অখাদ্য তার পেটেও সহ্য হয়নি। কিছুক্ষণ ওয়েটিং রুমে বসার পর এমিরেটসের হিথ্রোগামী প্লেনে উঠে পড়লাম। একই রকম প্লেনে একই রকম আতিথিয়তা, একই রকম অখাদ্য এবং একই রকম সব ব্যবস্থা- নতুন কিছুই তাই আর বলার নেই। সিটে বসে বসে '৮৮ মিনিট' নামক একটা মুভি দেখে ফেললাম। মুভিটি একটা কুইজ শো নিয়ে, যেখানে প্রতিটি প্রতিযোগীকে রাশিয়ান রুলেট খেলে মৃত্যু কিংবা মিলিয়ন ডলারের মাঝে একটিকে মেনে নিতে হয়। রোমহর্ষক ছবিটি দেখে ঘুম পুরোপুরি ছুটে গেল। এরপর মনিটরে তাকিয়ে দেখলাম হিথ্রো পৌঁছাতে আরো ঘন্টাখানেকের মত বাকি। কি করব বুঝতে না পেরে আরেকটা মুভি দেখার সিদ্ধান্ত নিলাম। এবারের মুভির নাম '২১'। এটাতে একজন অতিমাত্রায় বুদ্ধিমান ইউনিভার্সিটির ছাত্র তার প্রফেসরের প্ররোচণায় প্রোবাবিলিটি থিওরির হিসাব নিকাশের মাধ্যমে ক্যাসিনোতে একের পর এক জুয়া খেলায় জিততে থাকে। কাহিনীটি প্রায় জমে উঠেছে, এমন সময় পাইলটের এনাউন্সমেন্টে ছবি দেখায় ব্যাঘাত ঘটলো। জানতে পারলাম আমরা খুব শিঘ্রই লন্ডনের মাটিতে অবতরণ করবো। লন্ডনে তখন সকাল। প্লেনের জানালা দিয়ে লন্ডনকে চমৎকার দেখা যেতে লাগলো। এত সুন্দর প্ল্যান করে বানানো শহরকে ওপর দেখতে খুব সুন্দর লাগছিলো। আমরা জানালা দিয়ে লন্ডনের বাড়ি-ঘর, রাস্তাঘাট, নদী- সবকিছু মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগলাম। সবচেয়ে বেশি মজা পেলাম আকাশের ওপর থেকে ক্রিকেট খেলার স্টেডিয়াম গুলো দেখে। লন্ডনে মনে হলো কম করে হলেও ডজন খানেক স্টেডিয়াম আছে। হিথ্রোতে যখন নামলাম তখন খুব সম্ভবত সকাল সাড়ে আটটা।

লন্ডনে আমাদের আট ঘন্টা যাত্রা বিরতি। এই আট ঘন্টায় কি করব সেটা নিয়ে আমরা তিনজনই চিন্তায় ছিলাম। কিন্তু পরে মনে হয়েছে এই আট ঘন্টা সময়ও হিথ্রোর জন্য যথেষ্ট নয়। দুবাইয়ের মত হিথ্রোতেও বেল্ট, জুতা, কোট সব খুলে চেক করা হলো আমাদের। এরপর আমাদের কাজ হলো আটলান্টাগামী প্লেনের গেটের সামনে অপেক্ষা করা। ইলেকট্রনিক ডিসপ্লে বোর্ডে দেখলাম ডেল্টা এয়ারলাইন্সের প্লেন ছাড়বে টার্মিনাল-৪ থেকে। ডিরেকশন দেখে দেখে টার্মিনাল-৪ খুঁজতে গিয়ে জানতে পারলাম সেটা মোটেও এই এয়ারপোর্ট প্রিমাইসে না। আমাদেরকে একটা বাসে করে মিনিট দশেকের জার্নি করে বেশ দূরে অন্য জায়গায় যেতে হলো। সেখানেও অনেক হাঁটার পর টার্মিনাল-৪ এর মাথায় এসে কৃষ্ণাংগ একজন মহিলা কর্মীকে বললাম, আমরা আটলান্টা যেতে চাই। সে দাবী করল, এই টার্মিনাল থেকে কোন প্লেন আটলান্টা যাচ্ছেনা, কেনিয়াগামী প্লেন আছে, আমরা চাইলে নাইরোবি যেতে পারি। আমাদের বোর্ডিং পাসের একখানে '৫' লেখা আছে দেখে বলল, তোমরা টার্মিনাল-৫ এ যাও। তাকে বিশ্বাস করে আবার অন্য একটা বাসে উঠে আবার মিনিট দশেকের পথ পাড়ি দিয়ে অন্য আরেক প্রিমাইসে গিয়ে নামলাম। এবার টার্মিনাল-৫ এ এসে একজন শ্বেতাংগ মহিলা কর্মীকে জিজ্ঞাসা করতেই বলল যে, এটা ব্রিটিশ এয়ার ওয়েজের টার্মিনাল, ডেল্টা এয়ারলাইন্স শুধু টার্মিনাল-৪ থেকেই প্লেন ছাড়ে। আমরা তাকে বোর্ডিং পাস দেখিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে, আপা- এই জায়গায় তো '৫' লিখা আছে। সে বলল, লেখা যাই থাকুক আমরা ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ, অন্য কোন এয়ারলাইন্স হলে ইলেকট্রনিক ডিসপ্লে বোর্ডে সেটার টার্মিনাল নম্বর দেখ। এবার আমরা পড়লাম মহা বিপদে। কৃষ্ণাংগ আর শ্বেতাংগ দুই মহিলা আমাদের প্যাঁচে ফেলে দিল। কার কথা বিশ্বাস করবো বুঝতে পারছিলাম না, এদিকে প্রায় ঘন্টা দুয়েক পার হয়ে গেছে। আমরা আবার টার্মিনাল-৪ এর দিকে রওনা হলাম। বাসে উঠে মনে হতে লাগলো আমরা এভাবেই এয়ারপোর্টের বিভিন্ন টার্মিনালে ঘুরতে ঘুরতে প্লেন মিস করবো। একবার তো সন্দেহ হতে শুরু করলো যে, আমাদের ভূয়া টিকিট দিয়ে আমেরিকার বদলে লন্ডনে যাবার টিকিট দিয়েছে কিনা! টার্মিনাল-৪ এ এবার আর কোন কথা না বলে চেক ইন করা শুরু করলাম। চেকিংয়ের ব্যাপারে হিথ্রোতে আরও এক ডিগ্রী বেশী কড়াকড়ি মনে হলো। আবারও ঘড়ি, বেল্ট, জুতা, কোট সব খুলে চেক করা হলো আমাদের। মুনির পর পর দুবার এমন হওয়াতে বেল্ট আগেই খুলে ব্যাগে রেখে দিয়েছে। ল্যাপটপের ব্যাগ থেকে ল্যাপটপটাও বের করে ভালোভাবে স্ক্যান করলো। এইসব বাড়াবাড়ি সহ্য করে আমরা সর্বশেষে ডেল্টা এয়ারওয়েজের কাউন্টারে পৌঁছে গেলাম। সেখানেই জানতে পারলাম আমাদের প্লেন ৩০ মিনিট লেট। আমাদেরকে এখন প্রায় ছয় ঘন্টা টার্মিনাল-৪ এর ভেতর বসে থাকতে হবে।

ছয় ঘন্টা খুবই লম্বা সময়। কি করা যায় ভাবতে লাগলাম। যে গেট থেকে আমাদের প্লেন ছাড়বে প্রথমেই সেটাকে চিনে রাখলাম। গেটের কাছেই এক সারি বেঞ্চে একটা আস্তানা গড়ে ফেললাম। সব হ্যান্ড লাগেজ একসাথে নামিয়ে রেখে আমরা পালাক্রমে পাহারা দেব। একজন পাহারা দেবে, আর বাকি দুজন ঘুরে বেড়াবে- নিজেদের মাঝে এমন একটা চুক্তি করে নিলাম। প্রথমেই এনামুল আর আমি বেড়িয়ে পড়লাম টার্মিনালটা ঘুরে দেখতে। আমি এবার হাতে নোটবুকটা নিয়ে নিয়েছি- ভালোকিছু চোখে পড়লেই নোট করে নেব বলে। লিখে রাখার মত অনেক কিছুই আছে। দুবাই এয়ারপোর্ট দেখেছিলাম রাতের বেলা, তাও আবার অল্প কিছুক্ষণ, আর এবার তো অফুরন্ত সময়। একটা একটা করে টার্মিনালের প্রতিটি ডিউটি ফ্রী শপ ঘুরে দেখতে লাগলাম। প্রতিটি মানুষকে আগ্রহ নিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলাম।

এয়ারপোর্টে মনে হচ্ছিল সারা পৃথিবীর সকল জাতের মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে। সাদা-কালো, মোটা-চিকন, ইন্ডিয়ান-ইংলিশ, বাচ্চা-বুড়ো- সব টাইপ মানুষই আছে। কেউ হাঁটছে, কেউ কেনাকাটা করছে, কেউ খাচ্ছে, কেউ ছুটোছুটি করছে, আবার কেউ ঘুমোচ্ছে। বাচ্চাগুলিকে খুব কিউট লাগছিল। এত বিদেশী মানুষ আমি একসাথে কখনও দেখিনি। তাদের ভাষা, পোশাক-আশাক সবকিছুই ভিন্ন। বেশীর ভাগ ছেলে-মেয়েই টী-শার্ট আর প্যান্ট পরা। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার হাফ প্যান্ট পরেছে। এই হাফ প্যান্ট আর টী-শার্ট পরাদের মাঝে অনেক মেয়েও আছে। তাদের দেখে আমি লজ্জা পেলেও তারা এটাতে পুরোদস্তুর অভ্যস্ত বলেই জানি। তারপরও সামনা সামনি দেখে ব্যাপারটিকে মেনে নিতে আমার একটু সময়ই লাগলো। আরো কত কিছু যে মেনে নিতে হবে তার কথা চিন্তা করতে করতে দোকানগুলোতে ঘুরতে লাগলাম।

আমরা যেখানে ডেরা বেঁধেছি তার কাছেই একটা মদের দোকান। আগে কখনও মদের দোকান দেখিনি। দোকান তো দূরের কথা, মদ ভর্তি বোতলই কখনো দেখিনি। তাই আগ্রহ নিয়ে সারি বদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখা বোতলগুলোকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলাম। চারটি পৃথক পৃথক আলমারিতে চার রকম ট্যাগ লাগানো- হুইস্কি, শ্যাম্পেইন, ওয়াইন ও স্পিরিট। আমি দাম সহ নাম গুলি খাতায় নোট করে নিচ্ছিলাম। আমাকে লিখতে দেখে দোকানের মেয়েটি সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাকাতে লাগলো। তারই ইশারাতে (কিংবা ফোন কলে) একজন মধ্যবয়সী লোক ছুটে আমার কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল- আপনাকে আমি কি করে সাহায্য করতে পারি? আমি বলতে চাইছিলাম যে, আপনি এই বোতল গুলি ভেংগে ফেলার মাধ্যমে এবং আপনার ফাজিল মহিলা সহযোগীকে একটা চটকানা মারার মাধ্যমে আমাকে সাহায্য করতে পারেন। কিন্তু তা আর বললাম না। ওরা হয়ত আমার নোট করার ধরন দেখে আমাকে সন্দেহ করেছে। আমি স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললাম, আমি কখনও এত ধরনের মদ দেখিনি, আমাকে একটু এগুলির পার্থক্য বুঝিয়ে দেবেন কি? লোকটা হাসি দিয়ে বলল, পার্থক্য হলো উপাদান এবং বানানোর কায়দায়। হুইস্কি নাকি তৈরি হয় হুইট দিয়ে আর শ্যাম্পেইন তৈরি হয় আঙ্গুর দিয়ে ইত্যাদি। লোকটা এরপর আমাকে 'পিম' নামক তাদের দোকানের সেরা এক প্রকার মদ ফ্রী পান করার অনুমতি দিল। আমি 'দরকার নাই' বলে একটা হাসি দিয়ে সেখান থেকে অন্য দোকানে চলে গেলাম।

দ্বিতীয় এই দোকানটিও মদের, তবে এটাতে শুধু হুইস্কি পাওয়া যায়। দোকানের নামও তাই- 'ওয়ার্ল্ড অফ হুইস্কি'। সেখানে কথা হলো চীনা মেয়ে দোকানী জিই ডেং এর সাথে। আমি তার কাছে তার দোকানের সবচেয়ে পুরাতন মদ কোনটি তা জানতে চাইলাম। সে ১৯৬০ সালের ব্যাল্ভেনি নামের একটি বোতল দেখিয়ে দিল। এটার দাম ৬০০০ পাউন্ড। আমি দাম শুনে অবাক হলে সে জানালো যে, এগুলি নন-ব্লেন্ডেড তাই দাম বেশি। ব্লেন্ডেড হুইস্কি নাকি কম দাম হয়। আমি তথ্যগুলি মনে রাখতে পারছিলাম না বলে খাতায় টুকে নিলাম, এবং সেই সাথে তার নামটাও শুনে নিলাম। এবার সে আমার প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করলো। ইশারায় কাউকে না ডেকে সরাসরি আমাকে আমার পরিচয় জিজ্ঞাসা করল। আমি বললাম, আমি একজন লেখক। সে আমাকে ভালোকরে দেখে কি একটা নাম করে বলল, তুমি কি সেই লেখক? আমি বললাম যে, আমি অত বিখ্যাত কেউ না যে তুমি চিনতে পারবে। আমার কথা মেয়েটির বিশ্বাস হলো না। আমি বাধ্য হয়ে আমার পাসপোর্ট দেখালাম তাকে। এই প্রথম নিজেকে কারো কাছে লেখক বলে পরিচয় দিলাম। বলতে নিজের কাছে বেশ ভালোই লাগলো।

এসব নিষিদ্ধ জিনিসের দোকানে ঢুকে আমার বেশ অ্যাডভেঞ্চার অ্যাডভেঞ্চার ভাব চলে এসেছিল। এবার তাই একটা দোকানে ঢুকলাম যেখানে শুধু সিগার বিক্রি হয়। এক বৃদ্ধ মতন লোক শেলফে সিগারগুলি সাজিয়ে রাখছিল। আমি ভাব নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, সবচেয়ে ক্ল্যাসিক কি আছে তোমার কাছে? সে আরও বেশী ভাব সহকারে উত্তর দিল, সিগার জিনিসটাই ক্ল্যাসিক। আমি তারপর সেখানে বলিভার, হামিডর এসব বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ডের সিগার দেখতে পেলাম যেগুলির কথা গল্পের বইতে পরেছি। দোকান থেকে বেরোবার পথে দেখলাম, দরজায় সতর্কতা বাণী টাঙ্গানো যে, কেউ যেন এই সিগার নিয়ে আমেরিকায় প্রবেশ না করে, কেননা আমেরিকায় এটা নিষিদ্ধ। আমি অবাক হলাম, আমেরিকাতেও এসব জিনিস কি করে নিষিদ্ধ হতে পারে? দোকানদারকে নোটিশটি দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ব্যাপারটা কি? সে বলল, এই সব সিগার আসে হাভানা (কিউবা) থেকে। ১৯৬২ সালের পর থেকে নাকি এসবকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আমি অবাক হলাম যে, সেই ১৯৬২ সালের কোল্ড ওয়ারের সময়কার আমেরিকা ও কিউবার মধ্যকার মন-কষাকষি এখনও দুই দেশের মাঝে রয়েই গেছে।

ডেল্টা এয়ারলাইন্সের আটলান্টাগামী ফ্লাইটটি যখন ছাড়ল, লন্ডনে তখন ভর দুপুর। এবারে আমরা তিনজন আর একত্রে সিট পেলাম না, তিনজন আলাদা আলাদা ভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে সিট পেলাম। ঘটনাক্রমে আমার পাশেই এক বাঙ্গালি ভদ্রলোক তার স্ত্রী ও কন্যা সহ এসে বসলেন। তাদের মুখে বাংলা শুনে আমি আগেই বুঝতে পেরেছিলাম যে তারা বাংলাদেশি, কিন্তু আমি আমার পরিচয় না দিয়ে চুপচাপ আছি। বেশিক্ষণ পরিচয় গোপন করে থাকতে পারলাম না। ফর্ম ফিলাপের সময় আমার হাতে বাংলাদেশের পাসপোর্ট দেখেই ভদ্রলোক আমার সাথে আলাপ শুরু করে দিলেন। আমি কে, কি করি, এসব শুনে তিনি আরো বেশী আগ্রহী হয়ে উঠলেন। আগ্রহের কারণ কিছুক্ষণ পরেই স্পষ্ট হয়ে উঠল। ভদ্রলোক আটলান্টা থাকেন প্রায় ২০ বছর ধরে। সম্প্রতি তার মেয়ের বিয়ে ঠিক করেছেন আমাদেরই বুয়েটের সিএসই বিভাগের ২০০২ ব্যাচের কোন এক ছাত্রের সংগে। আমি বুয়েটের টিচার শুনে আমার কাছে ছেলে সম্বন্ধে জানতে চাইলেন। আমি নাম শুনে ছেলেটিকে চিনতে পারলাম না। আমার কাছে তিনি বারবার জানতে চাইলেন যে, তার হবু জামাই স্কলারশিপ সহ আমেরিকায় পড়তে আসতে পারবে কি না? আমি তাদেরকে আশ্বস্ত করলাম এই বলে যে, এটা কোন ব্যাপারই না, এ্যাপ্লাই করলেই ফুল ফান্ড সহ চান্স নিশ্চিত। আমার কথা শুনে তারা তাদের হবু জামাইয়ের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের চোখ ধাঁধানো আলো দেখতে পেলেন বলেই মনে হলো। সারা রাস্তা ভদ্রলোক আমাকে নানান রকম উপদেশ দিতে থাকলেন। আমি প্লেনে দেয়া টার্কির মাংস খাচ্ছিনা বলে আমাকে অভিনয় করে দেখাতে লাগলেন টার্কি দেখতে কেমন হয়। খাবারের মাঝে লেটুস পাতা ও ঘাস টাইপ কিছু সালাদ ছিল, যেগুলি নাকি আমেরিকানদের প্রিয় খাদ্য। আমাকে তিনি পরামর্শ দিলেন, মাংস না খেলে এসব ঘাস খেয়েও দিব্যি চাঙ্গা থাকা সম্ভব। প্লেনে দেয়া বিস্বাদ পিজা খাচ্ছিনা দেখে উনি বলতে লাগলেন- বাবা, এটার নাম পিজা, আমেরিকানদের খুবই প্রিয়। অনেক স্বাদের পিজা আছে, এটা ভেজিটেবল দেয়া একদম হালাল- এগুলো তো খাওয়া তোমাকে শিখতেই হবে। আমি ঢাকার মোটামুটি সব দোকানের পিজা খেয়েছি, তাও এমন ভাব করলাম যে আজকেই প্রথম আমি এই মহান আমেরিকান খাদ্য দর্শন করেছি এবং ভদ্রলোক আমার সাথে মাননীয় পিজার পরিচয় করিয়ে দেয়াতে আমি যার পর নাই ধন্য। কোক-পেপসির ট্রলি আসলে সেখানেও আমাকে শিখতে হলো, এগুলির নাম সফট ড্রিংকস। ড্রিংকস মানেই খারাপ না- আমেরিকায় যেকোন পার্টিতে গেলে দুই ধরনের ড্রিংকসই থাকবে, ইত্যাদি। আমি খুব আগ্রহী শ্রোতার মত বিস্ময় নিয়ে কিছুক্ষণ এসব শুনে ড্রিংকস খেতে খেতে একসময় চোখ বন্ধ করে সিটে হেলান দিয়ে শুয়ে পড়লাম। আবিষ্কার করলাম যে, আমি চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকলেই কেবল উনি কোন কথা বলেন না, আর চোখ খুললেই শুরু হয়ে যায় তার উপদেশ বিতরণ পর্ব। প্লেনের বাকি সময়টা তাই একরকম চোখ বন্ধ করেই কাটালাম।

আমেরিকায় যখন পৌঁছি তখন বিকেল প্রায় শেষ। আটলান্টায় আমাদের হাতে সময় মাত্র ২ ঘন্টা। এর মাঝেই কাস্টমস শেষ করে, লাগেজ কালেক্ট করে আবার শারলোটসভিলের প্লেনে চেকইন করতে হবে। লন্ডনে শুধু টার্মিনাল চেঞ্জ করতেই ৩ ঘন্টা লেগেছিল, তাই আমরা মোটামুটি নিশ্চিত যে, এবারে আমাদের প্লেন মিস হচ্ছেই। তারমধ্যে আমাদের প্লেন অলরেডি ৩০ মিনিট লেট করে আটলান্টা পৌঁছেছে। প্রবল বেগে দৌঁড়ে গিয়েও দেখি কাস্টমস এর লাইনে আমাদের আগেই অনেকে পৌঁছে গেছে। আমরা দড়ির নিচ দিয়ে একবার পার হয়ে আগে পৌঁছার চেষ্টা করতেই একজন কর্মকর্তা আমাদের নিষেধ করলেন। আমাদের প্লেন ছেড়ে দিচ্ছে- এসব বলেও কোন লাভ হলোনা। একরকম সবার শেষেই আমাদের কাস্টমস হলো। অবশ্য বেশ কিছু লাইন থাকাতে পুরো কাজটায় খুব বেশি সময় লাগলোনা। আমরা এরপর লাগেজ কালেক্ট করলাম। আমাদের তিনজনের সব লাগেজ আসলো বোধহয় সবার পরে। সেখান থেকে দৌঁড় দিয়ে ডেল্টা এয়ারলাইন্সের শারলোটসভিলের লাইনে গিয়ে যখন দাঁড়ালাম ততক্ষণে থিওরেটিকালি প্লেন ছেড়ে দেবার কথা। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই জানতে পারলাম প্লেন আধাঘন্টা লেট। আমাদেরকে আধাঘন্টা দেরী করতে হবে শারলোটসভিলের প্লেনের জন্যে।

আধাঘন্টার জায়গায় প্লেন আসলো প্রায় দেড় ঘন্টা পর। তারপর মনে হলো জোর করে একজন পাইলট আর একজন কেবিন ক্রু ধরে আনার চেষ্টা করছে তারা। এদের ধরে আনতে আরও কিছু সময় লেগে গেল ডেল্টার কর্মকর্তাদের। এতক্ষণ পর আমরা আসলে বুঝতে পারছিলাম মানুষ কেন এমিরেটসকে ভালো বলে। কোয়ালিটি অফ সার্ভিস বলে যে একটা বিষয় আছে সেটা এমিরেটস ছাড়া বোধহয় আর কেউ চিন্তা করেনা। প্লেন যখন ছাড়বে আমাদের তখন হেঁটে হেঁটে রানওয়েতে দাঁড়িয়ে থাকা টেম্পুর সাইজের একটা প্লেনে ওঠানো হলো। প্লেনটি এতই ছোট যে, আমার কেবিন ব্যাগটিও কেবিনে জায়গা হলোনা বলে লাগেজে দিতে হলো। বাচ্চা পাখি যেমন প্রথম প্রথম উড়তে গিয়ে মাটিতে পড়ে যায়, আমার মনে
হতে লাগলো এই পিচ্চি প্লেন আকাশে উড়তে গিয়ে ঠাস করে পড়ে যাবার চান্স আছে। প্লেনে আমার পাশে বসেছিল হাফ-প্যান্ট আর কমলা টী-শার্ট পরা হাইস্কুল পড়ুয়া এক আমেরিকান ছেলে। তার সাথে হাল্কা আলাপ জমানোর চেষ্টা করলাম। আমার পরনে কালো কোট দেখে সে আমাকে জিজ্ঞাসা করল, আমি কি লইয়ার মানে উকিল কিনা। আমি তাকে জানালাম যে, আমি ইউভিএ তে নতুন গ্রাজুয়েট স্টুডেন্ট। সে চোখ-মুখে মুগ্ধতার ভঙ্গি করে বলল, ইউভিএ নাকি তার স্বপ্নের স্কুল, আমি সেখানকার ছাত্র বলে সে আমাকে যারপর নাই শ্রদ্ধা করা শুরু করল। আমি নতুন, তাই আমাকে সেখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য, গ্রাউন্ডস এর মনোরম দৃশ্য- এ সব হাত-পা নাড়িয়ে বর্ণনা করতে শুরু করল। তার বর্ণনা শুনতে ভালোই লাগছিল, কিন্তু আমার চেয়ে প্রায় চারগুণ স্বাস্থ্য বিশিষ্ট এই ছেলে যেভাবে হাত-পা নাড়াচ্ছিল তাতে আমি একটাই ভয় করছিলাম যে, ছোট্ট প্লেনটা আবার ওর নড়াচড়ায় ভেঙ্গে না পড়ে। আমাকে ভুল প্রমাণ করে পিচ্চি প্লেন ঠিকঠাক মত শারলোটসভিল এয়ারপোর্টে পৌঁছে গেল।

এয়ারপোর্টে নেমেই তানিয়া আপাকে দেখতে পেলাম। এর কিছুক্ষণ পর আমার মেন্টর জোয়েল কফম্যানকে দেখলাম। জোয়েল তার কথা মত কমলা কালারের টী-শার্ট পরে এসেছে। ইমেইলে কমলা টী-শার্টের কথা থাকলেও হাফ-প্যান্টের কথা ছিলনা। একটু পর মুনিরের মেন্টর টিমোথিও এসে পড়ল তার পিকআপ ভ্যান নিয়ে। টিমোথির সাথে তার স্ত্রীও এসেছে আমাদের রিসিভ করতে। আমরা তখনও লাগেজের জন্য অপেক্ষা করছি। মুনিরের দুটো লাগেজই পাওয়া গেছে, আমি আর এনামুল একটা করে পেয়েছি, এমন সময় এয়ারপোর্টের কর্মকর্তা জানালো, আর কোন লাগেজ নাই। আমাদের তো মাথায় হাত। আমরা ডেল্টা এয়ালাইন্সের কাউন্টারে লাগেজ হারানোর ব্যাপারটি রিপোর্ট করলাম। সেখানে দেখলাম আমাদের মত আরও অনেক লাগেজ হারানো যাত্রী লাইন করে দাঁড়িয়ে আছে। বুঝতে পারলাম, লাগেজ হারানোটা ডেল্টার একটা সহজাত বৈশিষ্ট্য। আমাদেরকে কাউন্টার থেকে জানানো হলো, আগামীকাল বিকেলের মাঝেই পরবর্তি ফ্লাইটে লাগেজ আসলে সেগুলি আমাদের এ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছে দেবে। আমরা এ্যাপার্টমেন্টের ঠিকানা লিখে একটা ফর্ম ফিলাপ করে এয়ারপোর্টের কর্মকার্তার হাতে দিলাম। এরপর আমি, এনামুল ও মুনির যথাক্রমে জোয়েল, টিমোথি ও তানিয়া আপার গাড়িতে করে আমাদের এ্যাপার্টমেন্ট শ্যামরক গার্ডেনের দিকে রওনা করলাম।

রাতের বেলা খুব সুন্দর ঠান্ডা হাওয়া বইছিল। ঠিক যে টেম্পারেচারটায় মানুষ সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, শারলোটসভিলে সেটাই নরমাল টেম্পারেচার। জোয়েল আমাকে গাড়িতে ওঠার অনুরোধ করলে আমি অবাক হলাম যে, সে আমাকে ড্রাইভিং সিটে বসতে বলছে। আমি মাথামন্ডু কিছু বুঝতে পারছিলাম না। পরক্ষণেই খেয়াল করলাম, আমেরিকায় গাড়ি গুলো সব লেফটহ্যান্ড ড্রাইভ, ব্যাপারটা জানা থাকলেও নিজ চোখে প্রথম দেখলাম। জোয়েলকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিতেই সে হেসে বলল, সে নিজেও অবাক হচ্ছিল তার বদলে আমি ড্রাইভিং সিটের দিকে বসতে যাচ্ছি এটা দেখে। গাড়িতে আসতে আসতে জোয়েলের সাথে এখানকার পরিবেশ, ইউনিভার্সিটি, রিসার্চসহ ব্যাক্তিগত আরও অনেক কিছু নিয়ে আলাপ হলো। জোয়েলের প্রতিটি কথা যে আমি বুঝতে পারছিলাম তা নয়। তার নেটিভ আমেরিকান উচ্চারণে কষ্ট হলেও আন্দাজে অনেককিছু বুঝে নিচ্ছিলাম। আমার প্রশ্নের উত্তরে সে কিছু বললে, আমি সেটার সম্ভাব্য উত্তর জানা থাকায় আন্দাজ করতে সমস্যা হচ্ছিলোনা। তবে সে কিছু জিজ্ঞাসা করলে, বুঝতে পারলে উত্তর দিচ্ছিলাম আর না বুঝতে পারলে একটা হাসি দিচ্ছিলাম, যার মানে সে যা ইচ্ছা একটা কিছু মনে করে নিক। এভাবে মিনিট বিশেকের মত ড্রাইভ শেষে আমরা আমাদের এ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছে গেলাম।

টানা দুদিন না ঘুমিয়ে আমরা তিনজনই খুব ক্লান্ত। তানিয়া আপা কোত্থেকে যেন রান্নাকরা এক বিস্বাদ মুরগীর মাংস কিনে এনেছেন। রাইস কুকারের ভাত আর রান্না করা ফ্রোজেন ভেজিটেবিলের সাথে ওই বিস্বাদ মুরগী খেয়েই ক্ষুধা মেটালাম। তানিয়া আপাকে বিদায় জানিয়ে ক্লান্ত শরীরে নিজের বিছানায় শুয়ে পড়লাম। সবাই ঘুমিয়ে পড়লেও, আমার ঘুম আসছিল না। খুব বেশি ক্লান্ত থাকায় বোধহয় ঘুমোবার অনুভূতিও হারিয়ে ফেলেছি। আশেপাশের পরিবেশ, মানুষ, বাড়িঘর, গাছপালা, রাস্তাঘাট সবকিছু কত সুন্দর, অথচ কেমন যেন খুব অচেনা। দেখলাম, আমার বিছানার পাশের জানালা দিয়ে আকাশ দেখা যাচ্ছে অনেকটুকু। শুধুমাত্র ওই আকাশটা দেখেই চেনা চেনা মনে হলো। হবে না কেন, এটাতো সেই একই আকাশ যেটা আমার বাংলাদেশ থেকে দেখা যেত। পৃথিবীর একেবারে উল্টো প্রান্তেও প্রতিরাতের মত সে আমাকে ঠিকই সঙ্গ দিচ্ছে। জাত-বিজাত মারামারি করে আমরা গোটা পৃথিবীটাকে ভাগ ভাগ করে ফেললেও, ভাগ্যিস আকাশটাকে এখনও পারিনি।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/28835083 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/28835083 2008-08-26 10:49:02
আমার লাস্ট লেকচার
আমাদের বুয়েটের ছেলেমেয়েরা প্রতিটি টার্মেই অন্তত একটি করে প্রজেক্ট করে থাকে। একেবারে 'শূন্য' নলেজ নিয়ে তারা প্রতি টার্মের শুরুতেই একটি করে প্রজেক্টের কাজ শুরু করে। তাদের সাথে একজন শিক্ষক অ্যাডভাইজার হিসেবে থাকেন, যিনি বস্তুত রিকুয়্যারমেন্টস গুলি ঠিকঠাক করে দেন। কাজটার পুরো কৃতিত্ব সন্দেহাতীত ভাবে ছাত্রের নিজের। চোথাবাজি করার সুযোগ থাকলেও আমাদের ছেলে-মেয়েরা এই একটা ক্ষেত্রে সবাই জানপ্রাণ দিয়ে কাজ করে। অন্তত আমি যাদের নিয়ে কাজ করেছি তার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি যে, এরা সত্যিই একেকটা জিনিয়াস।

সেদিন ০৭ ব্যাচের স্টুডেন্টদের চেহারা দেখে মনে হলো তারা সবাই কম বেশি চিন্তিত। সকাল আটটার সময় গোটা ক্লাস হাজির। লেকচার শুরু করলাম ঠিক সাড়ে আটটায় ৫০২ নম্বর রুমে। ৫০২ এর একটি মাহাত্ম্য আছে আমার কাছে। এই ক্লাসরুমটিতেই ছাত্রাবস্থায় বেশিরভাগ ক্লাস করেছি, টিচার হিসেবে শেষ লেকচারটিও এই রুমেই দিতে চেয়েছি তাই। লেকচারের বিষয়বস্তু ছিল- ভিজ্যুয়াল সি ব্যবহার করে কি করে গ্রাফিক্যাল জিনিসপত্র আঁকাআঁকি করা যায় সেটার ওপর। ভিজ্যুয়াল সি ব্যবহার করে খুব একটা সহজে আঁকাআঁকির কাজ করা যায়না, অনেককিছু শিখতে হয় তার জন্য। অন্যদিকে, আমি আমার ছাত্র-ছাত্রীদের মান্ধাত্যার আমলের টারবো-সি এর গ্রাফিক্স ব্যবহার করতে দিতে চাইনা, যেটা গোটা পৃথিবী থেকে কয়েক দশক আগে উঠে গেলেও অনেকদিন যাবত আমাদের বুয়েটে টিকে ছিল। তাই সমাধান কল্পে, প্রয়োজনীয় কিছু আঁকাআঁকির ফাংশন লিখে ওদেরকে একটা টুলস বানিয়ে দিয়েছি। ওটা ব্যবহার করে ওরা তাদের প্রোজেক্ট করবে ভিজ্যুয়াল সি তে। স্টুডেন্টদের পাশাপাশি বেশ কয়েকজন কোর্সটিচারও আমার লেকচারটি মন দিয়ে শুনল কারণ, আমি তাদের বলে রেখেছিলাম যে, তোমাদের কিছু শেখার থাকলে এক্ষুনি ছাত্রদের সাথে একসাথে বসে শিখতে হবে, আমি আমেরিকা চলে যাবার পর ইমেইল করে কান্নাকাটি করে কোন লাভ হবেনা

শুরুতে ওদের কিছুক্ষণ মাউস আর কী-বোর্ড কে প্রোগ্রামিং করে কি করে কন্ট্রোল করা যায় তা শেখালাম। বুঝলাম, ব্যাপারটা তাদের কাছে তেমন ইন্টারেস্টিং কিছু মনে হলনা। সবাই যেন ব্যাপারটিকে খুব সাধারণ ভাবেই নিল। অথচ কী-বোর্ডের সবকটি কী প্রোগ্রামেবল করার জন্যে আমার এ্যাসেম্বলি, ওপেনজিএল সবকিছু ঘাঁটাঘাঁটি করতে হয়েছিল। যাক গে, আমি এবার পরবর্তি চাল চাললাম- ওদের এখন ড্রয়িং ফাংশন গুলো দেখাবো। একে একে বাংলাদেশের পতাকা, রঙবেরংয়ের ফুল, সুন্দর সুন্দর ছবি আর টেক্সট বসানো শেখালাম। এবার মনে হলো সবাই একটু মজা পাচ্ছে। এরপর শুরু করলাম এনিমেশনের কাজ। একটা ছোট্ট সাদা বল এঁকে সেটাকে নড়াচড়ার কোড লিখে দিলাম। প্রোগ্রাম রান করাতেই হল ভর্তি ছাত্র-ছাত্রীরা হাততালি দেয়া শুরু করল। বলটি সরতে সরতে কিছুক্ষণ পর স্ক্রীণের বাইরে চলে যাচ্ছিল, ওদের অনুরোধে সেটাকে স্ক্রীণে আটকে রাখার ব্যবস্থা করলাম। স্পীড একটু বাড়িয়ে দিতেই ছোট্ট সাদা বলটি মাঝারি সাইজের একটা উইন্ডোর ভেতরে ছুটোছুটি করতে লাগলো। এক প্রান্ত থেকে বাড়ি খেয়ে বলটি যখন আবার নিজে থেকেই দিক পরিবর্তন করে অন্যদিকে যাচ্ছিল, তখন অপলক দৃষ্টিতে সবাই সেটার দিকে তাকিয়ে। ২০-২১ বছরের ৬০-৭০ জন যুবক-যুবতী একটা বলের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে হাততালি দিচ্ছে, ব্যাপারটা নিজের চোখে না দেখলে কাউকে বোঝানো যাবেনা।

এই মুগ্ধতাটাই ছিল আমার পাওনা। এটা থেকেই ওদের মাঝে সৃষ্টি হবে কাজ করার প্রেরণা, ওরাও চাইবে তাদের কাজ দিয়ে অন্যকে মুগ্ধ করে দিতে। আমি জানি যে, আর ঠিক ১০ সপ্তাহ পর তারা প্রত্যেকে এমন এমন কাজ করে সাবমিট করবে যে, সেটা দেখে ডিপার্টমেন্টের ছাত্র-শিক্ষক প্রত্যেকে অভিভূত হয়ে যাবে। সেই মুহূর্তটায় আমি তাদের মাঝে থাকবোনা- ভাবতেই মনটা খারাপ লাগছে।







]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/28829931 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/28829931 2008-08-12 01:08:58
আজ ছিল নুহার জন্মদিন।
নুহার বাবার নাম 'তরুন'। পুরোনাম জহিরুল হক তরুন। আমার ছেলেবেলার বন্ধু। আমরা সবাই ডাকি 'জহিরুল' নামে। ক্লাস ওয়ান থেকে একসাথে পড়েছি। স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি সব সেইম। ও হচ্ছে আমাদের বন্ধুদের মাঝে সবচেয়ে প্রাকটিকাল একটা ছেলে। সেই স্কুলবেলা থেকে আমার যে কোন প্রাকটিকাল ব্যাপারে সমস্যা হলে তার পরামর্শ নিই, আর বিনিময়ে ওর কখনো কোন অ্যাকাডেমিক সমস্যা হলে সে আমার পরামর্শ নিতে আসে। দুজন দুদিকে এক্সপার্ট। আমি যে বয়সে মাস্টার্স শেষ করে পি,এইচ,ডি করার মাধ্যমে নতুন নতুন বিদ্যার জন্ম দেয়ার চেষ্টা করছি, জহিরুল সে বয়সে বিয়ে শাদি করে নতুন নতুন বাচ্চার জন্ম দিচ্ছে। আজ ছিল তার একমাত্র কন্যা 'নুহার' প্রথম জন্মদিন।

বছর খানেক আগে, আমরা যখন বুয়েটে ফোর্থ ইয়ারে পড়ি তখনকার কথা। অনেকদিন পর, একদিন রাত ১১টার দিকে আজিমপুরে আমার বাসায় এসে হাজির হয় জহিরুল। তার সি++ কোর্সে ল্যাগ ছিল। টিচার তাকে ১০-১৫ টা প্রোগ্রাম লিখতে দিয়েছে। আমার বাড়িতে আগমনের কারণ আমাকে এই রাতেই তাকে সবকটি প্রোগ্রাম করে দিতে হবে। শুধু তাই না, প্রোগ্রাম গুলো হতে হবে এমন যেন, দেখে মনে হয় কাঁচা হাতের কাজ। আমি আমার পাকা হাতকে যতটা সম্ভব কাঁচা বানিয়ে ঘন্টা দুয়েকের মাঝেই সবকটা প্রোগ্রাম করে দিলাম। তারপর সবগুলো তাকে বোঝাতে গিয়ে আরও সময় লাগলো। ওর বাসা হাতিরপুল হলেও, তখন রাত প্রায় ২ টার কাছাকাছি। আমি বললাম, 'যাবি কি করে এখন? থেকে যা আজকে।' দেখি সে হাসছে। বলল, বাসায় যেতে তার কোন সময় লাগবে না, সে এখন আমার প্রতিবেশী। ব্যাপারটা বুঝে উঠতে পারলাম না। সে কিছুক্ষণ ইতস্তত করে জানালো, কাউকে না জানিয়ে গত মাসে সে বিয়ে করে ফেলেছে। বউ নিয়ে আমাদের বাড়ির উলটো দিকের বাসাটাতে সাবলেটে উঠেছে। সেখানে সে একমাস ধরে আছে। তার বাসার কেউ জানেনা, ব্যাপারটা এখনো গোপন। আমি খুব বেশী অবাক হইনি কারণ, আমাদের মাঝে কেউ যদি এমন কিছু করতে পারে, তবে সেটা একমাত্র জহিরুলের পক্ষেই সম্ভব। আমি হালকা চিৎকার করে বলে উঠলাম, 'কোনটা এটা? বোরকা পড়া যেটাকে দেখেছি সেটা?'। ও বলল, 'এটা-সেটা বলবি না, উনি কিংবা ভাবী বল'। আমি নিজের কাছে নিজেই লজ্জিত হলাম।

নুহাটা খুব সুন্দর হয়েছে। ওকে আমি খুব পছন্দ করি। এর অবশ্য আরেকটা কারণও আছে। ওর নামটা আমার রাখা। নাম রাখার সময় জহিরুল বলেছিল, 'নামটা তোকেই রাখতে হবে। যত ডিকশনারী আছে সব পড়ে ২ দিনের মাঝে আমাকে নাম দিবি।' তার কথা মত অনেক খাঁটা খাঁটনি করে নামটা পছন্দ করে বের করি। 'নুহা' শব্দটি আরবী। এর অর্থ- জ্ঞানের আলোতে আলোকিত। ও যেন সত্যিকার অর্থেই জ্ঞানের আলোতে আলোকিত হয়, আজকের দিনে এটাই ওর জন্য আমার প্রার্থনা।









]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/28828607 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/28828607 2008-08-08 02:19:16
ডলার, জোড়াপাতা পাসপোর্ট- সমস্যার কি শেষ আছে?
আজকে কপাল ভালো আছে মনে হলো। চেক দিয়ে টাকা তোলার কাজটা মাত্র ১ টা অ্যাপ্লিকেশন আর হাফ ডজনের মত সাইন দেবার পর শেষ হয়ে গেল। ম্যানেজারের কাছ থেকে বিদায় নেবার সময় সিভিলের বসুনিয়া স্যারের সাথে দেখা হলো। আমাকে উনি ব্রাক্ষ্ণণ হবার পরামর্শ দিলেন। তার ভাষায় আমেরিকায় দুই জাতের বাঙ্গালি পড়তে যায়। এর মাঝে যারা বুয়েটের ছাত্র তারা ব্রাক্ষ্ণণ, মানে জাতে শ্রেয়। স্যারের মেয়ে জামাই ব্রাক্ষ্ণণ নয়- আমাকে কথাটা বলার পর স্যারের মাঝে সামান্য একটু আক্ষেপের সুর অনুভব করলাম। (আমি ব্যাক্তিগত ভাবে এটাকে সমর্থন করিনা। বুয়েটের বাইরের যারা বিদেশে যাচ্ছে পড়তে, তারা বরং নিজ যোগ্যতায় যাচ্ছে, ইউনিভার্সিটির ইমেজকে তাদের কাজে লাগাতে হচ্ছেনা।)

যাই হোক, স্যারের কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে গাড়ি ছুটিয়ে ইস্টার্ণ ব্যাংকে হাজির হলাম। পাসপোর্টে সব ব্যাংক ডলার এন্ডোর্স করতে চায়না। ইস্টার্ণ ব্যাংকের সাথে আগেই কথাবার্তা বলে তাদেরকে রাজি করিয়েছিলাম যে আমাকে যে করেই হোক হাজার খানেকের মত ডলার দিতে হবে, কারণ আমেরিকার ইউনিভার্সিটিগুলো পি,এইচ,ডি ছাত্রদের ফুল ফান্ডিং দিলেও স্টাইপেন্ডের প্রথম কিস্তি দেয় মাস তিনেক পর। বাসাভাড়া, কেনাকাটা এসবের জন্য অন্তত দুই হাজার ডলার আমাকে নিয়ে আসতে বলা হয়েছে। আমি ইচ্ছে করলে পকেটে করে যে কোন পরিমাণ ডলার নিয়ে যেতেই পারি, কিন্তু কাজটা বেআইনি এবং একই সাথে রিস্কি। লোকাল লোকজনের কাছ থেকে ডলার কিনে নিয়ে তারপর আমেরিকায় গিয়ে আবিষ্কার করলাম যে সব ডলারই নকল, তখন পি,এইচ,ডির প্রথম কয়েক সেমিস্টার হয়ত আবু গারিব কারাগারে কাটাতে হতে পারে।

ইস্টার্ণ ব্যাংকে এ্যাকাউন্ট খুললাম। বেশ চিন্তা বিবেচনার পর তারা আমাকে ২০০০ ডলার ক্যাশ আর ১০০০ ডলার ট্রাভেলার্স চেক দিতে রাজি হল। এ্যাকাউন্ট খোলার জন্য মনে হলো প্রায় ডজন খানেক স্বাক্ষর দিলাম। ৩০০০ ডলারের সম পরিমাণ টাকা ডিপোজিট করার পর ভাবলাম আমাকে এখন ডলার দিয়ে দেবে। কিন্তু না, ডলার এন্ডোর্স করার জন্য এখন নাকি আমাকে 'স্টুডেন্ট ফাইল' খুলতে হবে। তার জন্যে ম্যাট্রিক, ইন্টারমিডিয়েট ও বুয়েটের সব সার্টিফিকেট ও মার্কশিট, ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার, পাসপোর্টের ফটোকপি, ছবি এসব চাইল। আমার কাছে কিছুই নাই, তাই আবার এগুলো নিয়ে ঘন্টা খানেক পর গেলাম। আজকে এর শেষ দেখেই ছাড়ব।

সব কাগজ পেয়ে মনে হলো ব্যাংকার সন্তুষ্ট। নিজেদের ফটোকপি মেশিনে আমার কাগজপত্র ফটোকপি করা শুরু করলো। ফটোকপি শেষ হলে একহাতে কাগজপত্র দেব আর অন্য হাতে ডলার পাব- এমনটা ভাবছি। বিধি অলওয়েজ বাম। পাসপোর্টের দুটো পৃষ্ঠা প্রচন্ড ভালোবাসা নিয়ে একে অপরের সাথে আটকে গেছে। আমার ছবি ও স্বাক্ষর যেই পেজে, ওটাতেই সমস্যা। এত নিখুঁত ভাবে দুটো পৃষ্ঠা আটকে আছে যে, পেজ নম্বর না থাকলে কেউ ধারণাই করতে পারবে না যে ওখানে দুটো পেজ আছে। আমি এখন কি করি? ডলার তো ছাই, আমার বোধহয় আর আমেরিকাই যাওয়া হচ্ছেনা। আমি মনে মনে ঠিকও করে ফেলছিলাম এবারতো বাদ হয়েই গেল, নেক্সট টাইমে আবার কোথায় এ্যাপ্লাই করব, ভাগ্যিস চাকরিটা এখনও রিজাইন দিইনি, এবার তাহলে বিয়েটা করেই যাব ইত্যাদি। নানান লোক নানান বুদ্ধি দিতে লাগলো- 'চাক্কু দিয়ে টান দিলেই হবে', 'ভাই, পাসপোর্ট অফিসে যান', 'ফ্লাইট তো দেরি আছে আরেকটা করিয়ে ফেলেন'- ইত্যাদি। একজনের বুদ্ধিটা ভালো লাগলো- 'নীলক্ষেতে একবার খোঁজ নিয়ে দেখেন- ওরা পারতে পারে।'

মাথায় সীমাহীন দুশ্চিন্তা বোঝাই করে নীলক্ষেতে এসে পাসপোর্ট দেখিয়ে দেখিয়ে খোঁজ করতে লাগলাম। সবাই বলল- 'স্বদেশ ফটোস্ট্যাট'। বিদেশে যাবার আশা আমার এই স্বদেশই পূরণ করতে পারবে। গিয়ে পাসপোর্টটা দেখাতেই স্বদেশের লোকটা বলল- 'কইতে হইবো না- ১০০ টাকা দিবেন'। আমি ১০০ ডলার চাইলেও আজকে রাজি। আমার হাত থেকে পাসপোর্ট ছোঁ মেরে নিয়ে গেল অন্য আরেক দোকানে। আমি পেছন পেছন দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে সেখানে হাজির। গিয়ে দেখি লোকটা একটা গরম ইস্ত্রি দিয়ে কিছুক্ষণ ওটাকে ডলাডলি করে একটা সূঁচ টাইপ জিনিস ঢুকিয়ে ৫ মিনিটে কার্যসিদ্ধি করে ফেলল। আমি এবং পেজদুটোর মাঝে আটকে থাকা আমার পাসপোর্ট সাইজ ছবি দুজনেই একি সাথে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। এটা নাকি খুবই কমন একটা প্রবলেম। লোকটা আমাকে স্ট্যাটিস্টিক্স সহকারে বলল যে, শতকরা ৯৯ জনের পাসপোর্ট নাকি এই সমস্যা যুক্ত।

শেষমেশ ডলার হাতে পেয়েছি। ব্যাগ ভর্তি টাকা জমা দেবার পর এই টুকুন ডলার দেখে মনটা একটু খারাপ লাগলো। হবে না কেন? আমেরিকা যে আমাদের চেয়ে ৭০ গুন বেশী ধনী। তবে একটা দিকে আমাদের দেশ সেরা। সেটা হলো- নীলক্ষেত। আমেরিকায় গিয়ে আমার প্রথম প্রায়োরিটির কাজ হবে সেখানে নীলক্ষেতের বিকল্প খুঁজ়েবের করা।



















]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/28826096 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/28826096 2008-07-31 22:00:21
জোয়েল কফম্যান- আমার মেন্টর
জোয়েলকে আমিই প্রথম এক লাইনের একটি ইমেইল পাঠাই। তার একদিন পর সে আমাকে বিশাল এক রিপ্লাইতে প্রথমে তার নিজের সম্পর্কে এবং পরে আমার সম্পর্কে সে যা যা জানে তা লিখে পাঠায়। ছেলেটা জাতে আমেরিকান। সাউথ ক্যারোলিনাতে বড় হয়েছে এবং সেখানেই আন্ডারগ্রাড করেছে। ভার্জিনিয়াতে সেও নতুন। মাত্র গত বছর পি,এইচ,ডি শুরু করেছে। আমাকে অত্যন্ত বিনয়ী ভাষায় সে যা জানাল তার অর্থ একটাই- পি,এইচ,ডি করতে গিয়ে তার জান বেরিয়ে আসছে। ইউ,ভি,এ- এর লেখাপড়া তার কাছে খুবই কঠিন মনে হচ্ছে এবং সে এখনও আন্ডারগ্রাড ও গ্রাড লাইফের মাঝে সামঞ্জস্য করতে পারছেনা। ফল ও স্প্রিং সেমিস্টারের মিডটার্ম ও টার্মফাইনাল তার কাছে এক রকম দুঃস্বপ্ন মনে হয়েছে। তার কাছে সবচাইতে ভয়ঙ্কর মনে হয়েছে টার্ম প্রজেক্ট গুলোকে। এই সামারেও সে রেহাই পায়নি তার সুপারভাইজারের কাছ থেকে। অগাস্টের প্রথম সপ্তাহে কোন এক জার্নালে তার গবেষণাপত্র পাঠাবার কাজে সে রাত-দিন খাঁটাখাঁটনি করছে। আমার ওয়েব সাইট দেখে আমার সম্বন্ধে জানতে পেরেছে যে, আমি বুয়েট নামক এক ইউনিভার্সিটির শিক্ষক। সে আমাকে আমার জীবনের সর্বশেষ আরাম দায়ক সামারটিকে 'এনজয়' করার পরামর্শ দিল। ভার্জিনিয়া আসলে আমার সাথে দেখা হবে এসব কথা বলে তার চিঠিটি সমাপ্ত করলো।

আমি শুনেছি ইউ,ভি,এ তে অনেক পি,এইচ,ডি ছাত্র আছে যারা পড়াশোনার চাপে সারা সপ্তাহ শুধুমাত্র 'কাপ নুডুলস' নামক কি যেন একটা খাবার খেয়ে বেঁচে থাকে। এধরনের ছাত্রদের জন্য প্রতি শুক্রবার বিকেলে একটা টী-পার্টির ব্যবস্থা করা হয় যাতে করে তারা সুস্বাদু খাবার বলতে কি বোঝায় ব্যাপারটা যেন একেবারে ভুলে না যায়। আমার ধারনা জোয়েলের সাথে ওখানেই আমার পরবর্তিতে নিয়মিত দেখা সাক্ষাত হবে।
































]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/28824222 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/28824222 2008-07-26 02:14:11
আজ থেকে আমি আর শুধুমাত্র ব্যাচেলর নই
বেলা ১১টা ছিল ডিফেন্সের জন্য নির্ধারিত সময়। মাসখানেক পর তাই আজ আমাকে ভোর সাড়ে ৯ টায় ঘুম থেকে উঠতে হয়েছে। ল্যাপটপটাকে বগলদাবা করে ঠিক ১০ টায় ৫০২ নম্বর রুমে গিয়ে হাজির। আমাকে মাসুদ হাসান স্যার বেশ ভালোভাবে জানেন, তাই অন্তত ২ ঘন্টা আগে উপস্থিত হতে বলেছিলেন। রুমে গিয়ে লাইট, ফ্যান, পর্দা, প্রজেক্টর সবকিছু টেস্ট করে দেখলাম। প্রজেক্টর যথারীতি আমার ল্যাপটপকে দেখে স্ট্রাইক ঘোষণা করেছে। কিছুতেই ডিসপ্লে আসছেনা। ল্যাব এ্যাটেনন্ডেন্ট সালেহ ভাই নেটওয়ার্ক ল্যাব থেকে ছুটে এসে আমার চেয়েও তিনগুন বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে সেটার সাথে যুদ্ধ করতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর তার সাথে এসে যোগ দিলেন মোস্তাফিজ ভাই। কোন এক অজ্ঞাত কারণে আমাকে বুয়েটের যাবতীয় সকল স্টাফই খুব স্নেহ করে থাকে। আমার ডিফেন্সের দিন তাই তাদের টেনশন বেশি। দুজন মিলে প্রাণপণ চেষ্টা করে পৌণে ১১টার মধ্যে আমার ল্যাপটপের এক্সটেনশন কর্ডের সকেটটা ভেঙ্গে ফেললেন। অবশেষে নতুন এক্সটেনশন বোর্ড নিয়ে এসে সব সমস্যার সমাধান করা হলো। ১১টা বাজতে তখন কয়েক মিনিট বাকি।

ঠিক ১১টায় আমার সুপারভাইজার, শ্রদ্ধেয় ডক্টর মাসুদ হাসান স্যার এসে জানালেন- 'নির্জন, এক্সটারনাল স্যার আসতে দেরি করছেন। মনে হচ্ছে সাড়ে ১১টার আগে শুরু করা যাবেনা'। উল্লেখ্য যে, বুয়েটের সি,এস,ই তে মাস্টার্সটাকে কোয়ালিটি রক্ষার্থে অনেক বেশি কঠিন করা হয়েছে। দুই দফা (প্রোপোজাল ও প্রি-ডিফেন্স) প্রেজেন্টেশন আর ভাইভার পর একজন ছাত্র ডিফেন্স দেবার জন্য অনুমতি লাভ করে। এরপর একটা নির্দিষ্ট দিনে একজন এক্সটারনাল সহ পাঁচজন ডক্টরেট করা সিনিয়র টিচারের উপস্থিতিতে ছাত্রকে তার থিসিস ডিফেন্ড করতে হয়। আমার ক্ষেত্রে এক্সটারনাল হলেন ঢাকা ইউনিভার্সিটির শ্রদ্ধেয় ডক্টর হায়দার আলী স্যার। মাসুদ স্যার ছাড়া ইন্টার্নাল বাকি তিনজন টিচার হলেন- ডক্টর মোস্তফা আকবর, ডক্টর মাহমুদা নাজনীন ও হেড অফ দ্যা ডিপার্টমেন্ট ডক্টর সাইদূর রহমান। এক্সটারনাল স্যার যখন ডিপার্টমেন্টে আসলেন তখন বেলা সোয়া ১২ টা। ঠিক তখনই জানা গেল সাইদূর স্যার নিখোঁজ। প্রায় আধা ঘন্টা পর তাকে লোকেট করা সম্ভব হলো। ডিফেন্স শুরু হল বেলা পৌণে ১টায়

৫০২ নম্বর রুমে অনেক ক্লাস নিয়েছি। সেখানে সাধারণত ৫০/৬০ জন ছোট ছোট হবু ইঞ্জিনিয়াররা থাকে যাদের সাথে পড়ার ফাঁকে ফাঁকে মজা করতে করতে কখন ঘন্টা পার হয়ে যায়, টের পাওয়া যায়না। আজকের ঘটনা সম্পূর্ণ আলাদা। প্রেজেন্টেশন শুরু করেছি, কিন্তু এক এক মিনিটকে এক এক যুগ মনে হচ্ছে। টানা ৪৫ মিনিট ধরে ননস্টপ লেকচারের পর যখন থামলাম তখন মনে হলো এই গলা দিয়ে আগামী ৪৫ ঘন্টা আর কোন কথা বলতে জান বেরিয়ে যাবে। তবে শ্রোতাদের অভিব্যক্তি ভালোই মনে হলো। সবাই বেশ ক্লান্ত, প্রশ্নত্তোর পর্বে মনে হচ্ছে কেউ আগ্রহী হবে না- এই অর্থে ভালো। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে একে একে সবাই মনের খায়েশ মিটিয়ে প্রশ্ন করা আরম্ভ করল। এক্সটার্নাল স্যার তো একরকম বলেই বসলেন যে, থিসিসের টাইটেলটাই নাকি ভুল। 'নাইস প্রজেকশন' কথাটা তার কাছে মনে হচ্ছে সম্পূর্ণ মিসলিডিং। আমি বিনয়ের সাথে তার সব যুক্তি মেনে নিলাম। এরপর শুরু করলেন মোস্তফা আকবর স্যার। তাঁকে প্রেজেন্টশনের সময় তেমন মনযোগী মনে না হলেও দেখা গেল তিনি তার প্রশ্নগুলো অতি যত্ন করে খাতায় লিখে রেখেছেন। লিস্ট দেখে দেখে তিনি প্রতিটি প্রশ্ন করলেন আর আমিও ভাঙ্গা গলায় ভুল-শুদ্ধ মিশিয়ে উত্তর করে তাকে মোটামুটি সন্তুষ্ট করে ফেললাম। এরপর ম্যাডাম তার স্বভাব সুলভ হাসি দিয়ে যা জিজ্ঞাসা করলেন তাতে মনে হলো তিনি প্রেজেন্টেশনে অলরেডি মুগ্ধ, তাই আমাকে আর বেশি কিছু বলার নেই। অতঃপর সাইদূর স্যার আমার থিসিসের লিমিটেশন নিয়ে একটা প্রশ্ন করেই ছেড়ে দিলেন। কাকতালীয় ব্যাপার কিনা জানিনা, আমার কেন যেন সবসময় মনে হতো 'লাইন সেগমেন্টের অর্ডারিং' নিয়ে আমাকে কেউ না কেউ প্রশ্ন করেবেই। আগেই প্রস্তুত থাকায় উত্তর দিতে গিয়ে তাই আর কোন সমস্যা হলনা।

বেলা ২ টার সময় আমাকে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে বলা হলো। এরপর টানা ১৫ মিনিট তারা নিজেদের মাঝে আলোচনা পর্যালোচনা করলেন এটা ঠিক করতে যে, এহেন একজন ছাত্রকে মাস্টার্স ডিগ্রি দেয়া হলে তা কম্পিউটার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং এর কতটুকু ক্ষতি হবার সম্ভাবনা আছে। আলোচনার পর রুম থেকে মাসুদ স্যার বেরিয়ে এসে দূর থেকে আমাকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখাতে লাগলেন। আমি সেটার মানে বুঝে উঠতে পারছিলাম না- এটা কি তিনি আমাকে কাঁচকলা দেখাচ্ছেন, নাকি এটা পাস করেছি তার শুভ সংকেত? ভয়ে ভয়ে রুমে ঢুকলাম। আমাকে দেখে এক্সটার্নাল স্যার দন্ত বিকশিত করার চেষ্টা করে ছেড়ে দিয়ে দরাজ গলায় ঘোষনা করলেন- 'শাহরিয়ার, অন বিহাফ অফ দিস বোর্ড অফ এক্সামিনারস, আই ডিক্লেয়ার দ্যাট- ইউ হ্যাভ সাক্সেসফুললি কম্পলিটেড দ্যা রিকুয়ারমেন্টস ফর ইওর এম,এস,সি ইঞ্জিঃ ডিগ্রি- কংগ্রাচুলেশন'। আমি তাৎক্ষণিক ভাবে সবগুলি দাঁত বের করে তাদের প্রতি অন্তর থেকে আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম। মনে মনে নিজেকে বললাম, দীর্ঘ এক মাস পর আজ রাতে আমি একটু ঘুমোতে চাই।

(আমার ডিফেন্সের প্রেজেন্টেশনটি আমার নিজস্ব সাইটে পাওয়া যাবে। মূল থিসিসটি স্যারের অনুমতি নিয়ে পরবর্তিতে আপলোড করা হবে।)




















































]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/28823518 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/28823518 2008-07-24 00:34:54
ব্রুস অলমাইটি





]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/28822083 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/28822083 2008-07-20 02:50:09
আর কত কেনাকাটা?





]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/28821561 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/28821561 2008-07-18 13:04:39
আমার প্রথম লেখা
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/28821089 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirjon_buet/28821089 2008-07-16 23:44:56