তখনও সেই অভিজ্ঞতাটা আমার হয় নি। আমি ভাবছিলাম আকাশের রঙ কেমন করে নীল হয়, কেমন করে উদ্ভিদ। অথবা কেমন করে, কেন বা ফণা তোলে দেহের ধনেশ। তাকে বলতেই সে বললো, তবে চল যাই।
অবাক হলাম। সে কি তৈরি ছিলো? আমি স্কেচখাতাটা সঙ্গে নিলাম।
ওটা আবার কেনো?
তারপরও আমার মূল কাজ তো ছবি আঁকা, তাই না?
সে হাসলো।
আমরা একটা ইঞ্জিনবোটে চড়লাম। আর ঢেউগুলি কাঁপছিলো জলের সাথে। কেমন এক অস্থিরতা কাজ করছিলো আমার ভিতর...
ঘাটে নেমে আমার বুকে ভিতর ধক্ ধক্ করতে লাগলো।
চল্, হেঁটেই যাই।
কেনো? রিকশায় গেলে ক্ষতি কী?
না, রিকশা নেয়া যাবে না। সে হাঁটতে হাঁটতে কথা বলছিলো।
কাহিনিটা কী, বলতো।
রিকশা নিলে রিকশাঅলা সোজা নিজের ঘরে নিয়ে যাবে...
তার কথা শেষ না হতেই আচমকা কথাটা আমি বুঝতে পারলাম। কেনো জানি আমার সমস্ত শরীর কেঁপে উঠলো।
চল্ ফিরে যাই, আর যাবো না।
আরে! চল্ চল্, বেশি দূর না, আর মাইলখানেক গেলেই হবে।
না দোস্ত, সেজন্যে নয়, আমার যেতে ইচ্ছে করছে না আর।
কেনো, অভিজ্ঞতার দরকার আছে না!
ভালো লাগছে না।
আচ্ছা, তোর অভিজ্ঞতার দরকার নাই। খাতা নিয়েছিস সাথে, গোটাকয়েক স্কেচ কিংবা ড্রইং তো করতে পারবি।
আমি আর কিছু বললাম না। চুপিচাপ হাঁটছি। সূর্যটা মাথার উপর হতে নেমে যাচ্ছে। আমাদের ছায়াগুলি ক্রমশ শরীর থেকে নামছে রাস্তায়। আমি ভাবছি এখানকার রিকশাঅলাদের কথা।
আমরা হাঁটছি। হাঁটতে হাঁটতে পার করছি ধূলি, কাদা, ভাঙা-রেললাইন, বাঁশবন, মসজিদ, মন্দির, কাঁটাঝোপ, মানুষজন...
একটা সাঁকোর মুখে এসে দাঁড়ালাম আমরা দুজন।
দোস্ত, পুলসেরাত আইসা গ্যাছে।
আমি বাঁশের সাঁকোটার দিকে তাকিয়ে আনমনা ছিলাম।
পুলসেরাত মানে? বলে নিচের মরা খালটার দিকে তাকালাম।
হ্যা তো, দ্যাখ! অইপারে বেহেস্ত... বলেই সে হা হা করে হাসলো।
আমি সাঁকোর ওপারে অনতিদূরে পাড়াটার দিকে তাকালাম। সারি সারি দোচালা ঘর, টিনের, বেড়া বাঁশের। চালের উপর গোটাপঞ্চাশেক এন্টেনা, টেলিভিশনের। মনে হচ্ছে হাট বসেছে। লোকজন গমগম করছে।
আমরা সাঁকোটা পার হলাম। সাঁকোর মুখে টোলবাকশো নিয়ে একজন বসেছিলো। সে দুজনের কাছ থেকে পনেরো পনেরো মোট তিরিশ টাকা নিলো।
এই শেষ, আর দিতে হবে না?
নারে দোস্ত, সবে শুরু...
আমরা পাড়ায় ঢুকলাম। আমার সহসা কুরবানির হাটের কথা মনে হলো।
বাঁশের ঘরগুলির মতোই মেয়েরা দাঁড়িয়ে আছে, হাসছে, দুলছে, কথা বলছে...। চৌদ্দ থেকে চুয়াল্লিশের মধ্যে সব বয়সের মেয়েই আছে। বয়স্কদের পরনে শাড়ি আর অন্যদের পরনে সালোয়ার-কামিজ। কড়া সাজগোজ কারোর মধ্যেই নেই।
দোস্ত, তুই দাঁড়া, আমি কথা বলে আসি। সে সামনে এগিয়ে গেলো। মাঝবয়েসি একজন মহিলার সাথে কী যেনো বললো। মহিলা আমার দিকে এগিয়ে এলো। আমার অসুস্থ লাগছে। কেমন অস্থির লাগছে। মাথার দুপাশের শিরা দপ্ দপ্ করছে।
মহিলাটি হাত ধরে আমাকে একটা ঘরে ঢুকিয়ে দিলো। বললো, যাও ভাই, তুমিও নতুন, মাইয়াডাও নতুন; তয় একটু দেমাগি আছে মাগি। বলে সে চলে গেলো। আমি দরজাটা ভিজিয়ে দিলাম শুধু, কেনো জানি খিলটা লাগালাম না। আমার হাত কাঁপছিলো তখনো। ঘরের আসবাব বলতে একটামাত্র বঙ্খাট। ঘরের এককোণায় একটা টেলিভিশন, সাথে একটা ডিভিডি প্লেয়ার। জানলাটা দক্ষিণের বেড়ায়, এবং ব›ধ। আমার ঝাপসা চোখ ঘুরে এসে পুনরায় মেয়েটির উপর স্থির হলো। এইবার ভালোভাবে খেয়াল করলাম তাকে। খাটের এককোণায় হাঁটুতে মুখ গুজে বসে আছে। দেহটা মাঝে মাঝে কেঁপে কেঁপে উঠছে। সে কি কাঁদছে? এই কথাটা আমার মাথায় আসতেই আমার সমস্ত অস্থিরতা, সংকোচ, কামনা, ভয় মুহূর্তেই নিভে গেলো। তার জায়গায় একধরনের সরল আলো এসে আমাকে ভরিয়ে দিলো। আমি জানলাটার কাছে গেলাম। জানলার খিলটাতে জং ধরে গেছে। অনেকদিন খুলে নি কেউ এই জানলা, হয়তো কোনোদিন, একদিনও না। আমি অনেক কষ্টে যে-ই জানলার কপাট খুলেছি, যে-ই এক পশলা বাতাস এসে ভরিয়ে দিলো ঘরের শূন্যতাÑ মেয়েটি অকস্মাৎ মুখ তুলে হাহাকার করে উঠলো, না... না...
আমি তার সমুখে গিয়ে দাঁড়ালাম।
ভয় পেয়ো না। আমি তোমার সাথে এমন কোনো আচরণ করবো না, যা তোমার জন্যে অপমানকর, যাতে তুমি লজ্জা পাবে...
আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি আমার ভিতরের পশুটিকে হত্যা করে মানুষটি উঠে দাঁড়িয়েছে।
মেয়েটি আমার দিকে অবাক-বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে কথাগুলি শুনে। তার বিস্ফারিত চোখে যেনো থেমে গেছে মহাসমুদ্রের বিশাল ঢেউগুলি। বাতাসে এখনো কাঁপছে তার একপাশের চুল। শ্যামল গড়ন কেমন ভাসা ভাসা চোখ! তাকে কেনো জানি বোনের মতন মনে হলো। ইচ্ছে হলো তার চুলে হাত রেখে আদর করে দিই। বয়স চৌদ্দ-পনেরোর বেশি হবে না। একটা বাদামি রঙ তাঁতের শাড়ি কোনো রকমে শীর্ণদেহে পেঁচিয়ে রেখেছে। ফোলাচোখ দেখে মনে হলো অনেকক্ষণ ধরে কেঁদেছে।
পরিবেশটা হালকা করার জন্যেই আমি তার মুখোমুখি গিয়ে বসলাম। হেসে বললাম, আসো, আমরা কথা বলি।
কিছুটা সহজ যেনো হলো সে। বললো, আমার নাম...
আমি তো তোমার নাম জানতে চাই নি!
সবাই তো শুধু নামই জিজ্ঞেস করে।
সবাই?
না, কেউ কেউ। অনেকে কিছু জিজ্ঞেসও করে না...
তার শুদ্ধ উচ্চারণ আমি অবাক হলাম না।
আমি বললাম, তোমার নদীর নাম কী?
মেয়েটা প্রথমে অবাক হলো। বললো, এটা আবার কেমন প্রশ্ন?
বললাম, কেনো, তোমাদের গ্রামে কোনো নদী নেই?
মেয়েটি সঙ্গে সঙ্গে তার নদীর নাম বললো, তিতাস।
নদীর নামটি যেনো প্রাণের অতলান্ত কোনো গহ্বর থেকে সে বলতে চাইলো। তারপর বললো, আপনি বুদ্ধিমান। তবে সরাসরি জানতে চাইলেও বলতাম আমার গ্রামের বাড়ি কোথায়। আমি এখনো মিথ্যা বলতে শিখি নি!
আমি মোটেও অপ্রস্তুত হলাম না; কেনো না তার সাথে আসলেই আমি চালাকি করি নি। আমি সত্যি সত্যি তার নদীটির নামই জানতে চেয়েছি-- যে-নদীটির চরে, উপকূলে ফেলে এসেছে সে সোনালি শৈশব, জলাঞ্জলি দিয়েছে কৈশোর।
আমি এইবার বললাম, তিতাস একটি নদীর নাম।
সে এখন খুব সহজ। সাথে সাথে বললো, অদ্বৈত মল্ল বর্মণ।
পড়েছো তুমি?
হ্যাঁ তো! আমাদের পাঠ্য ছিলো।
তা না হলে পড়তে না?
কেনো পড়তাম না? আমি তো অনেক বই পড়ি। কথাটা বলেই তার মুখে মলিন একটা ছায়া নামলো। আর বললো, না, পড়ি না, একদিন পড়তাম।
কার কার লেখা পড়েছো?
শরৎ আমার প্রিয়। তাছাড়া আরো অনেকের। বাবার তো ঘরভর্তি বই ছিলো।
রবিনাথ পড়েছো?
সাধারণ মেয়ে...
আর?
সমরেশের সাতকাহন পড়ার ইচ্ছা ছিলো অনেকদিন।
এখন নেই?
সে কোনো উত্তর করলো না। বললাম, কবিতা?
রূপসী বাংলা আমার অনেক প্রিয়। বাবার ঘরে জীবনানন্দ সমগ্র ছিলো।
আচ্ছা, তুমি সবকিছু ছিলো বলছো কেনো, এখন নেই?
এবারও সে উত্তর করলো না কেনো; তার চোখে পুনর্বার ছায়া পড়লো। চুপিচাপ বসে থাকলো খানিকক্ষণ নতমুখে। তারপর চোখ তুলে সরাসরি আমার চোখের ভিতর তাকালো; আমি ভিতরে কেঁপে উঠলাম। বললো, আপনি কী চান বলুন তো?
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করলাম। তার কথার জবাব কী দেবো খুঁজে পেলাম না। কিছু না ভেবেই বললাম, আমরা খুব ব›ধু আজকে থেকে। হ্যাঁ?
তার বিস্মিত-চোখের ভিতর তাকিয়ে আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না। ডানহাতটা তার মাথায় রাখলাম মুহূর্তের জন্যে। তারপর পকেট থেকে একশোটাকার দুইটা নোট বের করে তার সামনে বিছানায় রেখে ঘর হতে বেরিয়ে এলাম।
গত দেড়মাসে কম করে হলেও তার কাছে আমি আটবার গিয়েছি। না, এখনো সেই অভিজ্ঞতা আমার হয় নি। কেনো না আমার ভিতর যে-মানুষটা বাস করে-- সে আমাকে বলে, এতো সহজ নয়, সহজকথা...। আমার কাছে যাকিছু ভালোবাসাহীন-- সমস্তই পাশব। এখনো তার জন্যে আমার মায়া হয়। আর তা কেবল তার কাছে গেলেই। ভালোবাসলে তার জন্যে আমি কষ্ট পেতাম-- তার কথা মনে হলেই।
তার কাছে যাই, দুয়েকটা ড্রইং করি, কবিতার কথা বলি, ছবির কথা বলি... নদীর গল্প করি। এর মধ্যে বেশ কয়েকটা বই আমি তাকে কিনে দিয়েছি। সে তার অনেকগুলিই রাতজেগে পড়ে শেষ করে ফেলেছে। শেষবার বইটি তাকে দিয়েছি সেটা সাতকাহন নয়, হুমায়ূন আজাদের নারী। সাতকাহন দিই নি কারণ দীপাবলি শেষপর্যন্ত তার জীবনের মানুষ হওয়ার সমস্ত সংগ্রাম জলাঞ্জলি দেয় তার ঠাকুর মা’র বুকে ঝাপিয়ে পড়ে-- নারী হয়ে।
তাকে মনে পড়ে, তাকে মনে পড়ে, তাকে মনে পড়ে।
আমি তাকে তার নাম ধরে ডাকি নি একদিনও। ডেকেছি নিজের দেয়া নামে। একটা গোপন নামে তাকে আমি ডাকি।
তাকে মনে পড়ছে। ভাবছি, আজ বিকেলে রোদটা দিঘির বুকের মতো কোমল হলে তার কাছে আমি যাবো...
দরজাটা ভেজানো ছিলো। আমি আলতো হাতে একটি কপাট খুলে ঘরে ঢুকলাম। ঘরভর্তি অ›ধকার। বাতিটা জ্বালালাম। প্রথমে চোখ গেলো জানলার দিকে। ওটা বড় বড় পেরেক দিয়ে আটকানো। আর তাকে দেখে বুকের ভিতর প্রচণ্ড ধাক্কা খেলাম। আমার মাথায় এইসব ছিলো না। আমার ভয়ানক যন্ত্রণা হলো। তার বিছানার ধবধবে চাদরটা মাঝখানে যেনো রক্তে ভেসে গেছে। খাটের একপাশে বেড়ার সাথে হেলান দিয়ে সে বসে আছে। দুইপা ছড়ানো। দুইচোখ বোজা। ক্ষণে ক্ষণে তার বুকটা ফুলে ফুলে উঠছে। তার গালে, গলায় ক্ষত। তার পরনের শাড়ি এলোমেলো, রক্তাক্ত; যেনো এখানে সেখানে ফুটে আছে রক্তজবা।
আমি তার কাছটায় গিয়ে বসলাম। আমার এমন কষ্ট হবে ভাবি নি একদিনও। অনেক কষ্টে অস্ফুট অথচ গাঢ় স্বরে তাকে ডাকলাম, গোপন!
সে চোখ খুললো। প্রথমে আমাকে চিনতে পারলো না বোধহয়। আমি তার মাথায় হাতটা রাখলাম আস্তে করে। সে দুহাতে আমার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলো। খুব শক্ত করে। তারপর চোখ বুজলো। যেনো উন্মাতাল ঝড়ের ভিতর বড় একটা গাছের শক্ত-মোটা একটা ডাল সে ধরে আছে পরম নির্ভরতায়; ডালটা যে তার মাথায় যে-কোনো মুহুর্তে ভেঙে পড়তে পারেÑ সে ভাবনাও নেই।
আমার নিজেকে খুব অসহায় মনে হলো।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা অক্টোবর, ২০১১ দুপুর ১২:২২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


