somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প: বটফুল

২৪ শে জুলাই, ২০০৯ রাত ১:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কোথাকার কোন সরোবরে উদ্ভিন্ন সংবাহন! স্বপ্নে দেখা বটফুল। উজ্জীবিত দিনের পদভারে নত স›ধ্যার দেহ। মোমের ভদ্র গম্ভীর সলতে; তার জ্বলতে থাকা কোমল অহঙ্কার-- প্রভাবিত করে কারো অনন্তর পিছিয়ে পড়া। সে হয়তো উত্তীর্ণ হতে পারে। অথবা পতন নিশ্চিত জেনেই ভাবনাতাড়িত ব্যঞ্জনাকে ধরে মোমের সলতে হয়ে যায় শূন্যতার সংবাহে। একদা সে বটফুল স্বপ্নে দেখেছিলো।

ওই নদীপথে হাঁটতে হাঁটতে ঝিমঝিম স›ধ্যা নেমে আসে। নদীটা একটা পাহাড়ের পায়ে নূপুরের মতো রিনরিন শব্দ তুলে ঘুরেটুরে কোথায় গেছে সে জানে না।

সে হাঁটছিলো। নদীটা সরু আর পাথুরে। কুয়াশা নেমে আসছে দশদিগন্তে। সে নদী ছেড়ে নাড়াবিধুর জমিতে পা রাখলো। তারপর বাড়িঘর, বাঁশবন, শালবন, জলপাইগাছগুলি পেরিয়ে সে যে-বাড়িতে ঢুকলো-- ওইখানে একটা জানলাবিহীন ঘরে সে থাকে।

তার মনে হলো জলপাইয়ের পাতা রূপবতী; এবং ঝরার আগে পাতাগুলি নয়নার মতো।


সে দুহাত দুপাশে মেলে দৌড়াচ্ছিলো লাফিয়ে লাফিয়েÑ একটা বনপথে। তার মনে হচ্ছিলো দুপাশের গাছগুলি ডানা মেলে আকাশের পাখি হচ্ছে এক একটা; আর গাছের জায়গায় একটা করে চারাগাছ ক্রমশ বড় হচ্ছে, মাটিতে অঙ্কুরোদ্গম হচ্ছে, ফুলগুলি সব প্রজাপতি হচ্ছে আর কুঁড়িগুলি ফুল। তার নিজেকে মনে হচ্ছিলো চিলপাখি। তারপর সে উঠে এসেছে একটা চারতলা বাড়ির ছাতে। শুয়ে আছে, নিবিড় শুয়ে আছে চিৎ হয়ে। এই ছাত মাঠের বিস্তার নিয়ে আছে। এটা রাজীবদের বাড়ি। এতো বড় বাড়ি ওরা কবে করলো সে ভাবতে পারছে না।

সে শুয়ে আছে। সে চোখের দুইটি পাখি উড়িয়ে দিয়েছে আকাশে। ওরা বটপাতাদের ফাঁক গলে আকাশে উড়ছে। আকাশের মেঘেরো বুঝি সব রামগিরি থেকে অলকায় যাচ্ছে। তাদের নীলধূলি পথে অবাধ চলাচল।


সে কতোক্ষণ শুয়ে আছে মনে নেই। হাওয়া খেলছিলো এখানে ওখানে মখমল ছায়া। হাওয়াটা এখন বাতাস হয়ে গেছে। বাতাস ক্রমশ ঝড় হচ্ছে। গুড়িগুড়ি বৃৃষ্টি যেমন হবে ঝুম-ঝুম, ঝুম-ঝুম।

সে শুয়ে আছে তেমনি। সকাল কিংবা দুপুর অথবা দিনেরই একটা উজ্জ্বল সময়। ছাতটার অনেক উপরে বটগাছটা মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে, ছড়িয়ে আছে। এতো উঁচু, এতো বিস্তৃত বটগাছ পৃথিবীতে কিভাবে হয়! গাছটিতে যতো পাতা ততো ফুল। বটফুল সে কখনো কোনোদিনও দেখে নি। বটফল দেখেছেÑ গাঢ় কমলা। নাকি লাল? কিন্তু এইগাছে সব ফুল-- ফলের রঙ।


প্রচণ্ড ঝড় শুরু হয়ে গেছে। সে আগের মতোই। ঝড়ের ঝাপটায় তার চুলে, বুকে, মুখে, চোখে, নাকে, হাতের আঙুলে, সমস্ত দেহে ঝুর ঝুর করে ঝরে পড়ছে বটের ফুল। আশ্চর্য সুন্দর। ঝড় থামছে ধীরে ধীরে আর বৃষ্টি বাড়ছে। আয় বৃষ্টি ঝেঁপে...

ঝুম ঝুম ঝুমঝুম বৃষ্টি হচ্ছে এখন। এখনো বটফুলগুলি ঝড়ছে বৃষ্টির ফোঁটার সাথে তার সারাটা দেহে। এমন আশ্চর্য সুন্দর অনুভূতি সে কাকে দেখাবে, কার কাছে করবে এমন বিশুদ্ধ প্রকাশ? অকস্মাৎ নয়নার কথা মনে হলো তার। সে শোয়া থেকে উঠলো এবং দ্রুত সিঁড়ি ভেঙে নামলো।

সে নয়নার একটা হাত নিজের মুঠোর মধ্যে নিলো। আর তাকে নিয়ে এলো চারতলার ছাদে। কিন্তু খেয়াল করলো নয়নাকে সে কিছু বলার আগেই তার চোখ আটকে গেছে অনেকদূরের পাহাড়টার ওপারে। ততোক্ষণে ঝড় বৃষ্টি সমস্ত ঝরে গেছে বটফুলের মতো, পায়ের কাছে, যেনো বা আধফোটা চাঁপাফুল।

নয়না দেখছে একটা কালো ঘুড়ি উড়ছে পাহাড়ের ওপারে। নয়না নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিলো তার মুঠোর ভিতর থেকে। এবং ঘুড়িটার উদ্দেশ্যে হাত তুললো। আর ওটার দিকে হেঁটে চলে গেলো। সে দেখলো ছাদে কোনো বাউন্ডারি নেই।

নয়না নেই। দূরের ঘুড়িটাও নেই। কেবল কালোচাদিয়ালের পাহাড়ের পায়ে পেঁচিয়ে আছে নূপুরের মতো একটা পাথুরে নদী, রূপা রঙ, ভীষণ স্তব্ধ। আর সে জমে পাাথর হয়ে গেলো এইসব দেখতে দেখতে। শুনতে পেলো পেছন থেকে তার নাম ধরে কেউ ডাকছে অবিরত।


তার শিয়রে মা বসে। মা তার জানলাবিহীন ঘরের মুহূর্তের জানলা।
কী স্বপ্ন দেখছিলি, বাবা?
জানি না।
সে দুহাতে মায়ের কোমর পেঁচিয়ে ধরে আবার চোখ বুজলো।


সে বনটা পার হচ্ছে আস্তে আস্তে। গাছগুলি বিবর্ণ। পাতারা ঝরে যাচ্ছে ক্রমে। সে তার আশ্চর্য সুন্দর চোখে স্বপ্নটাকে জুড়ে দিলো এইসব গাছে গাছে। বন পার হয়ে নদীটা পার হলো অনেকক্ষণ নদীপথে হেঁটে। তারপর স্কুলটা, স্কুলের মাঠ পার হলে একচিলতে ফিতের মতো মাটির রাস্তা। এই রাস্তা ধরে প্রতিদিন দুপুরের পর নয়না বাড়ি ফেরে। নয়না তাকে এখনো চেনে না। তবু সে আজো নিয়ে এসেছে কোচড়ভরা বকুল। আজো সে পথের একটা জায়গায় ফুলের একটা বাঁধ তৈরি করলো, সরু। এইবাঁধ পার হয়ে নয়না বাড়ি ফিরবে।
সে মাঠে বসে আছে। দেখলো নয়না প্রতিদিনের মতোই ফুলগুলিকে মাড়িয়ে গেলো। তার দিকে একবারও তাকালো না।
সে তাকিয়ে আছে চলে যাওয়া নয়নার দিকে। দূরত্ব যতো বাড়ছেÑ নয়নার আকার ক্রমশ ছোটো হচ্ছিলো।
জলপাই গাছটার নিচে গিয়ে দাঁড়ালো নয়না। জলপাই গাছের ঝরার আগের পাতাগুলি লাল হয়ে বুঝি নয়নার দিকেই তাকিয়ে আছে।
আর সে একজনও মাঠে বসে তাকিয়ে আছে, তাকিয়ে আছে।
খানিকক্ষণ পর পরীর মতো একটা ছেলে এসে দাঁড়ালো নয়নার পাশে।

ছেলেটার হাতে বিশাল কালোঘুড়ি।


কুয়াশার হাত ধরে ঝিমঝিম স›ধ্যা নামছে। সে বনটা পার হতে হতে সহসা দেখলো পাহাড়টাতে আগুন জ্বলছে। আগুনের লেলিহান জিব ছুঁয়ে দিচ্ছে উত্তরের মেঘগুলি।

এখন জুমচাষের সময়।




সর্বশেষ এডিট : ০২ রা অক্টোবর, ২০১১ দুপুর ১২:২৬
৩৭টি মন্তব্য ৪০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×