somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প: অন্ধনথ

১৫ ই অক্টোবর, ২০০৯ রাত ২:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

শেষ পর্যন্ত রেণু উঠতে পেরেছে। এইটা বগিটা মাল টানে। অ›ধকার এবং অনেকটা ফাঁকা। রেললাইন আর চাকার ঘর্ষণে যে শব্দযজ্ঞ উঠানামা করছে এইসব আলো-আঁধারিতে-- তা অদ্ভুত এক নৈঃশব্দ্যের জন্ম দিচ্ছে তার চোখের ভিতর।


মধু ঘরে বউ এনেছে। তার কোনো উপায় ছিলো না।

বোনটাকে বিয়ে দিয়েছিলো মধু। দুইবছরের মাথায় ভাইয়ের কাছে ফিরতে হলো-- পোয়াতি।
স্বামী গঞ্জে দোকান দেবে, হাজার পঞ্চাশেক টাকার দরকার।
তো দাও না। আমাগো পোলার ভাগ্যে কইলাম ভালাই চলবো।
বউ, খালি ভাগ্যে যে কিচ্ছু অয় না। টেকার দরকার। তাই কইতাছিলাম। মানে ইয়ে...
কী, কও না আমতা আমতা করতাছো ক্যান তুমি?
কইতাছিলাম, তোমার ভাইয়ের কাছে গিয়া যদি...
কথা শেষ করলো না সে। সেতু হাসবে না কাঁদবে, বুঝতে পারছে না।
আমার ভাইয়ের কতা তুমি জানো না? কী কষ্ট কইরা আমারে বিয়া দিছে! একখান ক্ষেত আছিলো তাও বেইচ্চা চিছে। তার কাছে তুমি ক্যামনে যাইতে কও? তোমার দিলে কি...
সেতুকে কথা শেষ করতে দিলো না সে। চিৎকার করে উঠলো, থাম্। বেশি কতা হিক্ছস; কাইল বিয়ানে তোর ভাইয়ের কাছে যাবি, টেকা দিলে ফিরবি, না দিলে কুনোদিন ফিরনের কাম নাই।


মধু তিনরাত ঘুমোতে পারলো না। আকাশ-পাতাল ভাবলো। কোনো সমাধানে আসতে পারছে না সে। পরদিন ভোরে মাঠে যাচ্ছেÑ রহিমের সাথে দেখা। রহিম তার ব›ধু মানুষ। রহিমই ডাক দিলো। কী গো দোস্তো, দেইখাও না দেইখা চলি যাও। বিষয়ডা কী? তোমারে তো এমুন মুক আ›ধার বেখেয়াইল্লা দেহি না কুনোদিন!
মধু আর নিজের মধ্যে কথাগুলির ভার বইতে পারছিলো না।
লও বই, বইয়া কই।
সব শুনে রহিম বললো, দোস্তো, তুমি একখান বিয়া করো, বিয়া করলে আইজকাইল তো পঞ্চাইশষাইট হাজার না চাইতেই দ্যায়। আমার হাতে একখান মাইয়া আছে। সোন্দর-মোন্দর কম না, তয় একখান চক্ষে নাকি ইকটু কম দেহে। হুনছি পঞ্চাইশ হাজার টেকা দিবো।
মধু হা করে তাকিয়ে থাকে।
কী করবা না করবা হেইডা তোমার বিষয়। তোমার বইনের তো বাঁচন মরণের পরশনো। আর কুনো রাস্তাও তো দেহি না।
মধু দোটানায় পড়ে যায়। রেণুকে সে কথা দিয়েছে খুব তাড়াতাড়ি তাকে বিয়ে করে ঘরে তোলে নেবে। ঘরে ফিরে আরো একটা রাত মধু ঘুমোতে পারে না। বোনের চোখের জল সে সহ্য করতে পারবে না। মুয়াজ্জিনের আযানে সে বিছানা ছাড়ে। ঘর হতে বের হয়ে গোয়াল ঘরের দিকেই পা বাড়ায়। একটু সকাল সকাল মাঠে যেতে হবে, রহিমের আসার কথা।


রেণু মধুকে দেখে লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে গেলো। কানে সে উত্তাপ টের পেলো। সেদিনের কাশবনের সমস্ত লজ্জা যেনো তাকে আজো জড়িয়ে আছে, আকাশের নীলের মতন। সেইদিনের কথা এই মুহূর্তে বিজলির মতন একঝলক তার মনের জানালয় উকি দিয়ে গেলো। সেদিন মধুর সাথে তার কাকতালীয় ভাবে দেখা হয়ে গেলো নদীর চরে। সে পানি আনতে যাচ্ছিলো, মধু যাচ্ছিল গরু গোসল দিতে। দুজনের মুখে কোনো কথা নেই। রেণু জলের কথা, মধু গরুর কথা ভুলে গেলো। পাশে কাশবন, সহসা নড়ে উঠলো, দুজনেই চমকে তাকালো ওদিকে। একটা শালিক ছটফটাচ্ছে। ওরা এগিয়ে গেলো। রেণু পাখিটা যখন হাতে নিলো তখন টের পেলো সে কাশবনের মধ্যে। তার চারিধার কাশবফুলে ছেয়ে আছে; যেনো আকাশ নেমে এসেছে শরতের মেঘফুল নিয়ে। কেউ বোধহয় ঢিল ছুঁড়ে শালিকটার পা ভেঙে দিয়েছে। রক্ত বের হচ্ছে। রেণু ঘাসপাতা দিয়ে পা টা বেঁধে দিলো। তারপর তাতে ফুঁ দিলো। এবং মাথার উপর দুহাত তুলে সে পাখিটাকে উড়িয়ে দিলো। উড়ে গেলো সেটা। আকাশ হতে রেণু চোখ নামাতেই বুঝলো মধু তার পাশ জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে। অবাক চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। রেণুও মন্ত্রমুগ্ধের মতন হয়ে গেলো। তার অবাক চোখে আর কম্পমান ওষ্ঠাধরে যেনো জন্মের তৃষ্ণা। মধুও যেনো মরুচারী পথিক অবশেষে এসে থেমেছে মরূদ্যানে। মধু রেণুর কাঁধে হাত রেখে বসালো সমুখে। মুখোমুখি দুজন, নির্জন চারধার আর শুধু কাশবন। রেণু মধুর জন্যে সেই কাশবনে একসময় বিছিয়ে দিলো তার বুকের আঁচল। তারপর রেণু আর ভাবতে পারে না সেদিনের সেইসব কথা...
আনত চোখে তাকিয়ে মধুকে বলে, তোমার মুকখান এমুন আ›ধার ক্যান, কী অইছে তোমার? তিনচাইর মাস তোমার দেখা নাই। হগলদিন তোমার পথ চাইয়া থাকি। তুমি আসো না...
মধু হাঁটু গেড়ে রেণুর পায়ের কাছে বসে পড়ে। পা দুটি জড়িয়ে ধরে কেঁদে কেঁদে বলে, আমার কুনো উপায় ছিলো না; তুমি আমারে মাফ দেও, দিছো কও...
রেণু কিছুই বুঝতে পারে না। মধু তাকে বিয়ের কথা, সে কী কারণে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছে সব বলে চলে একে একে। রেণুু যেনো কিছুই শুনতে চায় না। সে মূর্তির মতন বসে আছে। তার ভিতরের আকাশটা আদিগন্ত ভেঙে পড়ছে কাচের মতন। তার দুচোখ দিয়ে বাঁধ ভেঙেছে যেনো পৃথিবীর সকল সমুদ্র। সে যে মা হতে চলেছে তার গর্ভের সন্তানের পিতা যে মধু, সে কথা আর মধুকে বলা হলো না। সে এই আনন্দের কথাটা কিভাবে বলবে মধুকে, কিছুক্ষণ আগেও তা ভেবে পাচ্ছিলো না। মধু বার বার তার হাঁটুতে মাথা ঠুকছে, কও, তুমি আমারে মাফ দিছো...
রেণুর হাতের আঙুল মধুর চুলে বিলি কাটে। সে যেনো ঘোরের মধ্যেই বলে, সব ঠিক অইয়া যাইবো...
মধু তখন বেরিয়ে গেছে। অথচ রেণু তখনও বলতে থাকে, সব ঠিক হইয়া যাইবো, সব ঠিক হইয়া...


রেণু ছুটছে ঝুমবৃষ্টির ভিতর। আকাশে শুক্লপক্ষের চাঁদ কৃষ্ণমেঘমালার আড়ে শুয়ে ঢালছে অ›ধকার জোছনা। সে ছুটছে। তার পেছনে পড়ে থাকছে বৃদ্ধপিতা, ঘর, ধর্ম, সমাজ, সংস্কার, সময়, কতোস্মৃতি, মাঠ-প্রান্তর...। নদীতে বান ডেকেছে। সে শুনতে পাচ্ছে স্রোতের বানভাসি শব্দ। তার নিঃশ্বাসের বাতাসে ভাসছে গভীর নদীর উন্মাতাল জলের ঘ্রাণ। ওইতো দেখা যাচ্ছে জল আর জল। আবার পাড় ভাঙলো কোথাও নদীর। পাড়ভাঙার শব্দের সাথে বিজলির আলোতে চমকে গেলো এইসব পরিবেশ। দূরে কোথাও বাজ পড়লো। তার কিছুই খেয়াল নেই। তাকে কেবল টানছে অদূরে নদীর জল। সহসা সে থমকে দাঁড়ালো। অস্ফুট অথচ স্পষ্ট সে শুনতে পেলো যেনো তার গভীর থেকে কেউ ডাকছে, মা-আ-আ-আ-আ...
রেণু আর নড়লো না। দাঁড়িয়েই থাকলো। পিচ্ছিল মাটিতে পায়ের নখ ফুটিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলো।
অদূরে ইস্টিশনে তখন বেজে গেলো শেষট্রেনের হুইশেল।


সর্বশেষ এডিট : ০২ রা অক্টোবর, ২০১১ দুপুর ১২:২৮
২৩টি মন্তব্য ২৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×