শ্রাবণ। । আমার দূরের শ্রাবণ। কেননা আমি থাকি চট্টগ্রাম, আর সে ঢাকায়। বিয়ে এবং পাশ করার পর সে ওখানেই চলে যায়। এখনও ঢাকাতেই আছে, তবে ইস্কাটন গার্ডেনের ওর একরত্তি স্বর্গে (ওর ভাষায়। ও ছোট্ট বাসাটাকে ওভাবেই গুছিয়েছিলো) নয়, আছে স্কয়ার হাসপাতালে, ইনটেনসিভ কেয়ারে; সে বেঁচে আছে বাঁচার সুতীব্র আকাঙ্ক্ষায়। সে আবার আমাদের মাঝে প্রাণ-চঞ্চল আর উচ্ছ্বল হয়ে গীত হবে। কেননা সে জীবনকে ভালোবাসে।
আমি চাকসু থেকে বেরিয়ে আসছিলাম। ওরা বসেছিলো গেটে, বিশ্ববিদ্যালয় আবৃত্তি মঞ্চের প্রকাশনা এবং কর্মশালার ফর্ম বিক্রি করছিলো।
পেছন থেকে ও আমাকে ডাকলো, এক্সকিউজ মি!
আমি ঘুরে দাঁড়ালাম।
আপনি কি নির্ঝর নৈঃশব্দ্য? আমি শাওন, শ্রাবণী সেন।
আমি দুহাত জোড় করে বুকের কাছে এনে বললাম, নমষ্কার; আমি তো আপনাকে চিনি, আপনি নন্দিতার বন্ধু।
ও বললো, আমি আপনার কবিতা পড়েছি।
তখনো জানতাম না শ্রাবণ তখন আবৃত্তি মঞ্চের সভাপতি এবং কবিতা লেখে। তারপর থেকে দেখা হলেই কথা হতো, ও আমাকে তুমি করে বলতো, আমি বলতাম আপনি। কয়েকদিনের মধ্যেই আমাদের বন্ধুতা হলো, আমরা পরস্পর তুই করে বলি। এটা সম্ভব হয়েছিলো কেবল ওর কারণে। ওর মধ্যে ছিলো মানুষকে আপন করে নেয়ার অনেক সুন্দর ক্ষমতা। আমরা পরস্পর নিজেদের কবিতা পড়তাম, ও আমার খাতা নিয়ে যেতো, আমি ওর খাতা নিয়ে আসতাম। ও ছোটো ছোটো পংক্তিতে অনেকের চেয়ে ভালো কবিতা লিখতো।
তার মধ্যে আছে সুখি হওয়ার আশ্চর্য প্রবণতা। সে অতি সহজেই সবকিছুর সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে অথবা পরিবেশটাকেই নিজের মতো করে গড়ে নিতে পারে। পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ থাকে যাদের সাথে দেখা হলেই মন ভালো হয়ে যায়। আমার শ্রাবণ তেমনই একজন, সে নিজেই মূর্তিমান আনন্দ।
আমাকে নিয়ে সে শনিবারের ম্যাগাজিনে লিখেছিলো। সেটা যেদিন ছাপা হলো সেদিন আমাকে ফোন করেছিলো। ও তখন সিলেটে, শ্বশুরবাড়িতে, বিছনায় শুয়ে আছে হলুদ, দেহে ওর ভয়ানক জন্ডিস। সেটা সত্তুর-আশিদিন মাস আগের কথা। আমি কি তখন জানতাম ওকে নিয়ে এমন করে আমাকে লিখতে হবে?
সে শেষ (শেষ মানে ওটার পর এখনো আর পাঠায় নি, তবে সুস্থ হলে অবশ্যই পাঠাবে) চিঠি (আমরা এসএমএস কে চিঠি বলি) টা আমার কাছে পাঠিয়েছে ৩০. অকটোবর. ০৭. রাত ০২:২৯:৫৯ এ; তখন সে হাসপাতালের বেডে, হয়তো কোনো কারণে ঘুম ভেঙে গিয়েছিলো; লিখেছে, আমি মাদ্রাজ যাচ্ছি। সুস্থ হবো কিনা জানি না। আমি আগের মতো হাসতে চাই; তোদের হারাতে চাই না। তোরা আমার পাশে সারাজীবন নৈঃশব্দ্যের মতো থাকবি তো নির্ঝর? নন্দিতা ফোন করেছিলো।
না, শ্রাবণকে মাদ্রাজ নিয়ে যাওয়া যায় নি। কারণ ওর শরীরের অবস্থা এতো খারাপ যে নড়াচড়া করানোটাই ঝুঁকিপূণ। তবে ডাক্তাররা বলেছেন ওকে বাঁচানো সম্ভব; কিন্তু অনেক টাকা লাগবে।
আমার শ্রাবণ মরবে না; কেননা সে হিজল চেনে না এখনো। আমি তাকে বলেছিলাম চিনিয়ে দেবো; তখন আমি জানতাম আমাদের ক্যাম্পাসে একটা মাত্র হিজলের গাছ। এখন আমি আরো তিনটা হিজল খুঁজে পেয়েছি। পুকুরপাড়ে হিজলের গাছ থাকলে হিজলফুল পুকুরের জলে ঝরে ঝরে যে দৃশ্যচিত্র তৈরি করে তা সে স্বপ্নে দেখেছে অথবা কল্পনা করেছে, সত্যি সত্যি দেখে নি।
বর্ষায় হিজলের শীর্ণ শাখা বেয়ে যে বৃষ্টি নামে মাটিতে তাও তো একদিনও দেখে নি শ্রাবণ; তাহলে...
শ্রাবণের অবস্থা ভয়ানক খারাপ। নন্দিতা হয়তো এখন কাঁচের ভিতর দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। কতিপয় ছাতাকে অস্বীকার আমি ঠায় দাঁড়িয়ে আছি একটি হিজলগাছের পাশে। তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে। রোদও হচ্ছে। আমার ছায়া পায়ের তলায় নেমে গেলে আমি নন্দিতাকে ফোন দিবো।
নভেম্বর ২০০৭
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা অক্টোবর, ২০১১ দুপুর ১২:০৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


