দূর্বাদল কী যে বাজাচ্ছে, কী যে বাজাচ্ছে! দুইদিন ধরে আমি শুধু কদমফুলের ঘ্রাণ পাচ্ছি। অথচ এইখানে ধারে কাছে কোথাও নীপবন নেই, নীপবনে আষাঢ় নেই। কুয়াশার শাদায় স›ধ্যা আড়ষ্ট হয়ে থাকে। বুকের ভিতর টের পাচ্ছি মাইল মাইল দীর্ঘ গানের কান্না।
আমি সমতট পার হয়ে যাই, আমি তারাদের গ্রামখানি বাঁপাশে রেখে নদীপথে হারিয়ে আসি সকালের যাকিছু রঙ।
স›ধ্যাটা ছিলো ছাইমাখা। সেই অ›ধকারের ছিপছিপে আড়াল হতে টের পাচ্ছিলাম একটি হলুদ হাতছানি। সবগান ভালো লাগছিলো না। তবে লোকটা নাচাতে পারে ভালো। আমি নিজের সাথেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। কেনো দাঁড়িয়ে ছিলাম? গান ভালো লাগছিলো বলে? না। প্রকৃত অর্থে আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম একটি কণ্টকসুন্দর হাতছানির মায়ায়, সেই ইন্দ্রজালে আমি জড়িয়ে গিয়েছিলাম আষ্টেপৃষ্ঠে। একটা বৃত্তের ভিতরই ঘুরছিলাম আমার সকল সহজ অস্থিরতা নিয়ে। সেই বৃত্তটির কেন্দ্র একটি সরল হাতছানি। বৃত্ত থেকে বের হবার সাধ্য আমার ছিলো না, সাধও ছিলো না।
আমি নিজের সাথেই দাঁড়িয়ে ছিলাম একটি হিজলের তলে।
একজন এসে বললো, কী, তোমাকে নাচাতে পারছে না?
বললাম, না।
আমি নিশানাথের দোকানের পেছনের ঘরে একদিন সকাল সাড়ে দশটায় হারিয়ে ফেলি আমার কৌমার্য। সে আমার বুকপকেটে তিনটা ভাঙা চুড়ি রেখে চুপিচাপ বেরিয়ে যায়। তার এগারোটা দশে ক্লাস। চণ্ডিদাস। আমি চুলটা ঠিক করে বের হই। দেখি নিশানাথের মেয়েটি রোদের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে চায়ের কাপ।
তোমার নাম কী?
অরু।
অরু মানে কী, তরু জাতীয় কিছু নাকি?
না গো দাদা, অরু›ধতী।
অরু›ধতী!
কী হলো, দাদা।
তুমি কি জানো স্বাহা একমাত্র অরু›ধতীর বেশ নিতে পারে নি?
স্বাহা?
স্বাহা অগ্নির প্রেমে উন্মত্ত ছিলো। তাহলে তুমি অরু›ধতী?
দাদা, এই আপনার চা, দুধ ঠিক আছে কিনা দেখেন।
দুধ!
আমি চায়ের কাপে চুমুক দিলাম।
দাদা, বসি?
হুম!
অরু আমার সামনে বসলো।
অগ্নিস্বাহার কাহিনিটা শুনতে ইচ্ছে করছে।
অগ্নি সপ্তর্ষির স্ত্রীদের প্রেমে মত্ত ছিলো। প্রতিদিন চুরি করে দেখতো তাদের স্নান। আর স্বাহা ছিলো অগ্নির প্রেমে পাগল। তো, স্বাহা করলো কী, একে একে সপ্তর্ষির ছয়জন স্ত্রীর রূপ ধরে অগ্নির কাছে গেলো। এবং মিলিত হলো, অগ্নি ঘুনাক্ষরেও বুঝতে পারলো না। সপ্ত ঋষির একজন ঋষি ছিলেন বশিষ্ট। তার স্ত্রী ছিলেন অরু›ধতীÑ সবচেয়ে রূপবতী এবং পুণ্যবতী। স্বাহা তার বেশ ধরতে গিয়ে পারলো না...
দাদা আরেক কাপ চা দিই।
আচ্ছা, দাও। দুধচিনি বেশি।
রাত তখন তিনটা পাঁচ।
ফোনটা রিসিভ করলাম।
হ্যালো!
...
তুমি ভালো আছো?
....
কী বলছো?
...
আচ্ছা।
আমি লাইন কেটে দিলাম। এবং পাথর হয়ে গেলাম।
দুইদিন পর ঝুপড়িতে গিয়েই তার সাথে দেখা। হলুদ জামা। সমুখে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। আর চায়ের কাপে ধোঁয়া। সেই ছাইমাখা স›ধ্যাটা যেনো ফিরে এলো।
ভালো আছো?
তুমি ভালো আছো?
যাই।
আচ্ছা দেখা হবে।
আমি ঝর্ণার ধারে চলে এলাম। জলে নেমে একঘণ্টা দাঁড়িয়ে রইলাম।
এককাপ চা বলে আমি নিশানাথের দোকানে ঝিম মেরে বসে আছি। আমি বসে আছি। অথবা দূরে তাকিয়ে আছি। অথবা পাতা ঝরে যাচ্ছে।
চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া এসে লাগলো মুখে। কাপের দিকে তাকাতে দেখি একটি হাতের সাথে সরে যাচ্ছে আঙুলগুলি। কী যে দেখলাম! কী যে দেখলাম! কেমন করে বলি?
ইদানীং নিশানাথের দোকানেই সারাক্ষণ বসে থাকি। ক্লাসের দিকে আগে দুয়েকবার যেতাম এখন তাও যাই না। অরু মাঝখানে দুইদিন বাইরে কোথাও ছিলো। তারপরও বসেছিলাম।
অরু, আরেক কাপ চা।
দিচ্ছি দাদা।
অরু হাতের কাজ সেরে চা রেখে চলে গেলো। আর চায়ের কাপের মধ্যে রেখে গেলো তার দুটি চোখ।
কদিন ধরে ঘুমোতে পারছি না একটুও। বিকেলে একটু ঘুম হয় ছেঁড়া ছেঁড়া। কেবলই কি কৌতূহল ছিলো? আমারও তো ছিলো।
বাইরে অ›ধকার। আমার ক্লান্তি ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে। এই শীতে বুকের ভিতর যেনো গলে যাচ্ছে অনন্ত বরফের চাই। আমি তার বিবসন বুকের ভাঁজে চোখ ডুবিয়ে কাঁদছি, অরু অরু...
আর সে ক্রমশ পাথর। আমার চুলের বনে ডুবিয়ে দিচ্ছে কঠিন আঙুল।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা অক্টোবর, ২০১১ সকাল ১১:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


