men are so necessarily mad that not to be mad would amount to another form of madness.
--michel foucault
০১.
কখন যে বলেছিলাম শূন্যতার জয় হোক! সেই থেকে শূন্যতা অবিনাশী সুর হয় পরিব্যাপ্ত করে আছে আমার সমস্ত সকল। আমি একটা নিঝুম পাগলের গানে পরিণত হচ্ছি ক্রমশ। একদিন চক্রমন হয়ে ঝড় হবো তোমাদের পৃথিবীর এপার ওপার।
০২.
সবার অন্ধকার থাকে না, অথবা অন্ধকার প্রিয় নয়। তাই সবাই কবিতা পড়তে পারে না, কবিতা পড়ার জন্য চোখের ভিতর সমুদ্র এবং বুকের ভিতর আদিগন্ত ধূ ধূ প্রান্তর লাগে।
০৩.
আত্মবিনাশীকবির লেখায় মনে হয়, সবসময় আত্মবিনাশ থাকে না। থাকে স্বপ্ন এবং সৌন্দর্যের কথা।
পরিকল্পনা, প্রতিক্রিয়া এবং দায় থেকে লেখাকে আমি কবিতা মনে করি না। কবিতা আমার কাছে প্রথমে স্বতঃস্ফূর্ত। আর কবিতা চর্চারও বিষয়, কবিতা যেমন শব্দের খেলা নয়, ধর্ম-দর্শন-বিজ্ঞান-আধ্যাত্মবাদ কিংবা রাজনীতিও নয়। রক্ত খুঁড়ে যে সুর বের করে আনি, তা-ই কবিতা কিংবা
কবিতা হচ্ছে চোখের জলের সবচেয়ে বিনম্রফোঁটাটি যেটি নদীর মতো গড়িয়ে এসে ঠোঁটের কোণায় শেষ হয়।
সত্যিকার কবিতার ঘোর বাহুল্যবর্জিত স্বতঃস্ফূর্ততায় কবিতাকে মূর্তিরূপ দেয়। শ্লোগান যেমন কবিতা নয়, চটুলতাও কবিতা নয়।
আর শুধু কবিতা নয় সাহিত্যের সকলশাখায় যেকোনো বিদেশি শব্দের( যেগুলি অজস্রবছর ধরে বাঙলাভাষার সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে এবং যেগুলি প্রয়োগে বাক্যের তাল কেটে যায় না অথবা ভারসাম্য রক্ষা পায় এবং যে সকল বিদেশি শব্দের বাঙলা বিকল্প নেই ওগুলি বাদ দিয়ে) বিপক্ষে।
০৪.
এইবার আসি দুটি অতিচল শব্দজোড়ের কাছে। একটি মুঠোফোন, অন্যটি মেঘবালিকা। এইদুইটির বহুল ব্যবহার বিলবোর্ড থেকে শুরু করে আপনার গানে কবিতায় সেই কবে থেকে দেখছি! আপনি হঠাৎ করে রৌদ্রের গন্ধ ছেড়ে মুঠোফোন এবং মেঘবালিকার চর্চক হয়ে গেলেন! কেনো দাদা?
কবিতা বিষয়ে আরো কথা আছে, এবং অবশ্যই আরো অনেক বেশি পড়ার এবং জানার আছে। কবিতার জন্ম হোক, কবিতার জয় হোক...
০৫.
পারি কিনা কিংবা পারবো কিনা জানি না, তবে স্বপ্ন আছে আমি লিখবো নদীর ওপারের কথা। যেপার আমি চিনি না, কেমন জানি না, ভাবি অইপার বুঝি সুন্দর, আমি সেখানে যাবো। স্বপ্নময় কোথাও যাওয়ার কথা ভাবা মানে নিজের অবস্থানকে অস্বীকার করা। আমি কেনো ওপারের স্বপ্ন দেখি, কেনো না, এইবার বসবাসের অযোগ্য। ওপারের সৌন্দর্য বর্ণনা করলেই এপারের কদর্যতা বোঝা যায়। এই যে এইখানে এতো নোংরামি কদাচার, ডাস্টবিন খুন রক্ত ধর্ষণ এইসবতো খবরের কাগজ খুললেই কিংবা রাস্তায় নামলেই দেখা যায়, রাস্তায় নামলেই নর্দমা এগিয়ে আসে লেলিহান জিহ্বা নিয়ে, একশো তেরোটা কুকুর আসে নখরা পায়ে, মাংসাশি দাঁতে। এইসব রাস্তায় দাঁড়িয়ে পায়ে মাড়ানোর বিষয়। এইসব লেখার বা আঁকার বিষয় নয়। এইসব কেনো আমি লিখবো, বা আঁকবো? আমি লিখবো/আঁকবো আমার স্বপ্নকে। এইটা হলো বিনির্মাণ। একটা জরাজীর্ণ বাড়ি ছেড়ে একটা নতুন সুন্দর বাড়িতে বসবাস করতে শুরু করলে জারাজীর্ণ বাড়িটি খসে পড়ে স্বনিয়মে।
চমক তৈরিতে দ্রুত পরিচিত এবং আলোচিত হওয়া যায়। কিন্তু মহৎ শিল্প অবিমিশ্র একটা পুরো জীবন দাবী করে।
০৬.
আমি আমার স্বপ্নের কথা লিখেছিলাম। বলি নাই ওভাবেই লিখতে হবে। আমিও তো পারি না। কদর্য প্রতিবেশ চলেই আসে।
ধর্ষণ শব্দটা লিখলেই সবকিছু বোঝা যায়। কারণ এই শব্দের অর্থটা ব্যাপ্ত। কিন্তু ধর্ষণের বর্ণনা দিলে, শরীরের বিশেষ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বর্ণনা দিলে সতেরোবছরের কিশোরীকে পুনর্বার ধর্ষণ করা হয়। একজন লেখক কেবল ইঙ্গিত দিবে, পাঠক ভেবে নিবে, এইটুকু জানি।
আমি ভালো লেখক নই। তবে ভালো পাঠক। পাঠক হিশেবে যদি দেখি আমার অতিপ্রিয় কোনো লেখকও ধর্ষণের বর্ণনা লিখছেন, তাতেও আপত্তি করবো।
যেমন কুকুর বললেই কুকুরের চরিত্র আমরা বুঝতে পারি। ঠিক গুছিয়ে লিখতে পারলাম না।
একজন পাঠক ঢোকার মুখেই যদি একটা শিশ্ন কিংবা যোনির মুখোমুখি হয়, শেষপর্যন্ত শিশ্ন কিংবা যোনিই তাকে ঘিরে থাকে। শব্দ খুবি ভয়ানক জিনিশ। খুব সাবধানে না খেললে সমস্ত শেষ। কী বলতে পারলাম জানি না।
০৭.
দরজাটা ভেজানো ছিলো। আমি আলতো হাতে একটি কপাট খুলে ঘরে ঢুকলাম। ঘরভর্তি অন্ধকার। বাতিটা জ্বালালাম। প্রথমে চোখ গেলো জানলার দিকে। ওটা বড় বড় পেরেক দিয়ে আটকানো। আর তাকে দেখে বুকের ভিতর প্রচণ্ড ধাক্কা খেলাম। আমার মাথায় এইসব ছিলো না। আমার ভয়ানক যন্ত্রণা হলো। তার বিছানার ধবধবে চাদরটা মাঝখানে যেনো রক্তে ভেসে গেছে। খাটের একপাশে বেড়ার সাথে হেলান দিয়ে সে বসে আছে। দুইপা ছড়ানো। দুইচোখ বোজা। ক্ষণে ক্ষণে তার বুক ফুলে উঠছে। তার গালে, গলায় ক্ষত। তার পরনের শাড়ি এলোমেলো, রক্তাক্ত...
আমি তার কাছটায় গিয়ে বসলাম। আমার এমন কষ্ট হবে ভাবি নি একদিনও। অনেক কষ্টে অস্ফুট অথচ গাঢ় স্বরে তাকে ডাকলাম, গোপন!
০৮.
সেই থেকে হাঁটছি আর হাঁটছি। তার দেখা নেই। শ্মশানের পাশ দিয়ে যেতে যেতে গোঙ্গানির শব্দ শুনলাম। দেখি, জনাকয়েক ডোম একজনের উপর ঝাপিয়ে পড়েছে। একটা শাদাশাড়ি লুটাচ্ছে কাদাজলে। আমি চমকে উঠলাম। এই তো সে! দেখলাম একজনের হাতে ঝলসে উঠছে ছুরি। আমার মুখ থেকে চিৎকার বের হলো নিজের অজান্তে। দুইজন বল্লম হাতে আমার দিকে তেড়ে এলো। ভয়ে আমি কেঁপে উঠলাম।
০৯.
লুসিফার শব্দের আভিধানিক অর্থ আলোক আনয়নকারী। লুসিফারকে শয়তান চরিত্রে এনেছিলো ধর্মান্ধ ক্যাথলিক এবং পিউরিটানরা। যে সাহিত্যে লুসিফার শয়তান হিশেবে প্রতিষ্ঠিত অই সাহিত্য বুর্জোয়া, শাসকশ্রেণি এবং ধর্মান্ধদের হাতে তৈরি। যেমন শাদাকালো প্যারাডক্স শেতাঙ্গ শোষকশ্রেণি তৈরি করেছে। শাদা ভালো, কালো খারাপ। এই ব্যাপরটা আমি মানি না।
১০.
বাঙলা একাডেমিতে কিছু অসচেতন লোক ছিলো এবং থাকবে।
যেমন এইযে আমি একাডেমি লিখলাম, এদের নিয়মে এটাই শুদ্ধ। অথচ ওরা নিজেরাই লিখে 'একাডেমী'।
এইরূপে সংসদে আইন পাশ করে সংবিধান সহ অন্যান্য নথিপত্রে ঠিক করতে হবে বলেই ভুল বানানটা মানে 'বাংলাদেশ' বানান অভিধানে রাখা হয়েছে। সংসদে কতো বড় আইন পাল্টে যাচ্ছে-- আর এইটুকু তারা করতে পারে না।
বাঙলা একাডেমির অভিধানে 'বাঙলা' এই বানানটি আছে। কিন্তু 'বাঙলাদেশ' বানানটি নেই। বাঙলা শব্দের সাথে দেশ জুড়ে দিলে 'ঙ' হয়ে যাবে 'ং' এমন যুক্তি ঠিক হবে কেনো?
সুতরাং 'বাংলাদেশ' বানানটি শুদ্ধ নয়। 'বাঙলাদেশ' বানানটিই শুদ্ধ।
আমি বাঙলাদেশ লেখার পক্ষে। যেহেতু 'বাংগালি/বাঙ্গালী' বানান অশুদ্ধ, 'বাংলি' বানানও হবার নয়, শুদ্ধ হচ্ছে বাঙালি।
সিকোয়েন্সটা এই রকম, বাঙালি-বাঙলা-বাঙলাদেশ। এখন আপনি ঠিক করুন আপনি কোনটা লিখবেন।
'ঙ' বর্ণে হলন্তের দরকার হয় না। যেমন রঙ, সঙ অথবা ব্যাঙ লিখলে রঙ্গ, সঙ্গ কিংবা ব্যাঙ্গ উচ্চারিত হয় না।
'ঙ' দিয়ে বাঙলাদেশ লিখলেই শুদ্ধ। 'বাঙলা' বানানই ঠিক আছে।
বঙ্গ তৎসম শব্দ, এটা থেকে বঙ্গীয়, বাঙ্গাল, বাঙ্গালী, বাঙ্গলাদেশ এইসব শব্দ হয়, আর বাঙালি সেইখান থেকেই মানে তৎসমজাত।
আর তৎসমজাত যেসব শব্দ সন্ধিযুক্ত নয় সেইসব শব্দে অনুস্বার ং হবে না।
'বাঙলা' শব্দটির সন্ধি নাই। তাই বাঙলা শব্দটি ং দিয়ে হবে না।
সংবাদ=সম+বাদ, এটি তৎসম, এটার সন্ধি হয় বলেই এটাতে অনুস্বার হবে।
আর 'বাঙলা' আর 'বাংলা'র মধ্যে ধ্বনিগত মানে উচ্চরণগত কোনো পার্থক্য বা কোমলতার বিষয় নাই।
দুটোই একই শোনায়। এবং একাডেমির অলসতার কারণে 'বাঙলাদেশ' শব্দটি এখনো 'বাংলাদেশ' আছে।
১১.
হুমায়ুন আজাদ আমাদের দেশের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ব্যাকরণবিদদের একজন, তিনি লিখতেন 'বাঙলাদেশ' এই বানান। আর তাছাড়া ১৯৯৩ সনে বাঙলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত 'বাংলা একাডেমী সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান' এর ভূমিকায় সম্পাদক আহমদ শরীফ 'বাঙলা' শব্দটিই ব্যবহার করেছেন। তিনি কোথাও 'বাংলা' ব্যবহার করেন নি।
দেশের উক্ত দুই মহান পণ্ডিত কি লোকদেখানোর জন্যে 'বাঙলাদেশ' বানানটি লিখতেন? না, এইভাবে লিখলে শুদ্ধ, তাই লিখতেন।
হুমায়ুন আজাদ ১০খণ্ড ব্যাকরণ রচনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন একাডেমির কাছে সেই ৮০ দশকে। কিন্তু একাডেমি তাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। কারণ তিনি সত্য কথা বলতে কাউকেই ছাড়েন না।
বাঙলা একাডেমি যদি হুমায়ুন আজাদের প্রস্তাবে সম্মত হতেন আজ আমরা একটি পূর্ণাঙ্গ এবং আধুনিক ব্যাকরণ পেতাম।
১২.
সংবিধানের এর মধ্যে অনেক সংশোধনী হয়ে গেছে। যদি সরকার ভাষা এবং বানান সচেতন হতো, বাংলাদেশ বানানটি ঠিক করে সংবিধানে তার স্থলে বাঙলাদেশই লেখা হতো।
এই সত্য জেনে সংবিধানে আছে (অলসতা এবং গুরুত্বপূর্ণ মনে না করার কারণে এখনো এই বানান বর্তমান) বলে আমি যদি ভুল বানান লিখি তাহলে আমার কুড়িবছর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আর কী দাম রইলো?
১৩.
স্বাতী, ইদানীং তেমন লিখতে পারছি না। তুমি তো জানো জ্বরের ভিতর মানুষ ভুল স্বপ্ন দেখে কিনা। আমরা ঠিক করেছিলাম তেরো তারিখেই সব হবে। এইরূপে তেরো তারিখে আমরা সমুদ্র। তারপর তেরো তারিখে আমরা ঘর এবং ছায়ার বাগান। তারপর তেরো তারিখেই আমরা বিভিন্ন। এবং তেরোতেই আমরা গভীর ক্রন্দনের পরকীয়া ভাই।
স্বাতী, তুমি ভালো থেকো না।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১০ রাত ১:১৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


