উপালিছায়া
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
সমুদ্র ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে সে-- পায়ে তার জরির মোজা। বালিরঙ আকাশ তাকে ডাকছে নিঃসঙ্গ। মাঘের ছায়ায় ঢেকে আছে ঢেউতারা। আহা, চিন্তার ঘোড়া খাড়ি পার হয়ে চোরাখালে স্রোত হয়ে গেছে। দুধ আর রক্তের স্মৃতি জমাট প্রবাল। খানিকটা প্রত্নগন্ধ নুনেও বর্তমান। মায়াময় স্কার্ফ টনসিল ঢেকে নীলাভ কুসুম। এটা কোনো সাধারণ ফুল নয়। পতনের আগে দেখা বেনারশি রঙ। ট্রাংকের ভাঁজে বিবর্ণ গেরুয়া। গেরুয়া আকাশ ঢাকে নিস্তরঙ্গ সমুদ্রে। তারপর মাথার ভিতর ভাঙে ঢেউ। ভাঙে পর্বত। ভাঙে লাভা ও কাঞ্চন। আর সপ্ততারে বাজে সপ্তক গোলাকার শঙ্খের রূপ। অনতিদূর জঞ্জালে পড়ে থাকে গভীর বয়স।
কে উপালি? মরে গিয়ে আর ফিরবো না এই বৃষ্টিবনতলে, লৌকিকতার অমল ভুলে আর ফিরবো না কখনো। কালিন্দীকাল ঝুলে আছে স্বপ্নের বিবাগী দিগন্তে আমারই জন্যে। সেখানেই আমার ফেরা, সীমন্তিনী অধর ওইখানে আমার প্রতীক্ষা করে থাকে চিরদিন ঋত অনুরাগে। উপালি পথের ধারে বসে আছে। সাজিয়ে রেখেছে শরীর। বুদ্ধ তার চোখের ভিতর তাকালো এবং মাথায় হাত রাখলো। চোরা কুসুমের ভাঁজে তাকে দেখছি, যেভাবে কথা আসছে-- সেই ভাবেই তাকে লিখছি। পুনর্বার ফিরবে না এই আমার মৃন্ময়দেহ, এইসব মৃত্তিকামাঝে পৃথিবীর গান গেয়ে কোনোদিন। মৃত্তিকা মানে মা। স্বপ্নের দেশে আমি বারবার হবো জাতিস্মর। কেনো কোন ভয়ে জানি না। কোন ভয় পৃথিবীর, তাড়ায় গোপনে! অন্ধকার ফিরে গেছে চিরনম্র ফসলের দেশে। সেই দেশে গন্ধ আর গন্ধকের ছায়া পাশাপাশি নাব্যিক। নাব্যিক নদী ও রথের মেলা। আমি ছিলাম হরিণের ভাই। হরিণ নিহত হলে তার রক্তের স্রোতে ফুল ফুটে। ফুলের নাম বনজ্যোৎস্না। এটা তার আঙুলের মতো নরোম।
বিলাসী বিভ্রমে রাত জাগে নিতুই। নিতুই মানে নিত্য, মানে পরম। পরম মানে অপর। ভূপালি ভুবন কাঁপে জান্তব বোধে। এইখানে গান নেই-- অযাচিত বাজে কেবল কুহেলি আযান, নিশাবসানে ধূলিঝড় উঠে চৌরাস্তার মোড়ে; চোখে লেগে যায় ধূলির সুর্মা, ধূপ পোড়ে দিনমান-- ধূপছায়া উতল। আর কেয়াবনে রেণু ঝরে অগোচরে। কতো বাঁশবনে হেঁটেছি জন্মাবধি! কেনো আমার মনে হলো না বাঁশঝাড় ঝাকড়া চুলের কোনো মেয়ে ইত্যাদি? শুধু কবিতায় একবার বলেছিলাম, কেউ জানবে না বাঁশবন আমার মাথার চুল। আমিও রক্তের স্রোতে ডাকছি আকাশ, আকাশের ছায়া গাঢ় লাল। লালের এতো স্তর আগে দেখি নি। শিরার ভিতর যে যন্ত্রণা জ্বলে, তার নাম কী, কী তার রঙ? একটা হাতি আসে, হাতির পুচ্ছে মাছ। হাতির কি পুচ্ছ থাকে? হাতির থাকে শুর। তিনি দ্রাক্ষাবনে কাজ করেন, বন নয় বাগানে। তাহার গায়ের রঙ কৃষ্ণ। তিনি কবি ও প্রেমিক। জ্ঞানী সলোমন তার গান সব তাকে নিয়ে রচনা করেছিলেন। হাতির দাঁতের মিনার এর সাথে তুলনা করেছিলেন তার গলার বাঁক। দ্রাক্ষা থেকে যে কিসমিস, যে মদ হয় তার রঙ গাঢ় খয়েরি। তা একদা গেরুয়া ছিলো বৈকি। তখন তার ক্ষণে লীলা এনে ভুলেছিলাম গতকাল। আমি যে চিৎকার করি নিঃশব্দে-- আমার ভিতর যে হাহাকার আছে-- তার উত্তরাধিকার এই মদ। মাৎসর্যের কালে আমিও মাছ ছিলাম, গজদন্ত মিনারে উঠে ডেকেছিলাম ভোরের প্রথম আযানে।
উপালিছায়ায় কাটে মানুষের কাল। ধূলিছায়াতলে যারা ধায় পালে পালে-- তাহাদের আর উপালি মেলে না কোনো। জন্মান্ধজীবন মানুষ বুঝে না, অন্ধকারের খোঁজে ঘনায় যাপন, মাড়িয়ে আলো আলেয়াকে করে আপন। বৃক্ষ! পাতা ঝরার দিনে কি তুমি কাঁদো; মর্মরে কি বাজে না সুর, বেদনার? পান্থপবন উড়ায় যখন ঝরাপাতাদের-- তখন তুমিও কি ভাসাও তোমার বিশাখাপেখম ধূপমায়ায়? এই ভূমিতল ছড়িয়ে আঁচল কভু ছাড়ে না তোমাকে জেনো; তুমিও সমূল আঁকড়ে থাকো চিরমৃন্ময় হরিৎ।
শ্যামল বৃক্ষ, পাতা ঝরে গেলে বুঝি তোমার কান্নার জলে জাগে আবার অথৈ সবুজ, কানায় কানায়? তুমি যদি পৃথিবীর-- ঠায় দাঁড়িয়ে থাকো-- তাই দেখো না এইখানে সুখেরা কয়, গন্ধমুষিকেরা খেয়ে যায় সময়। এমন অনেক ভাঙন আছে পাল্টে ফেলে উৎস ও রঙ। রৌদ্রের কান্নায় পাতারা ঝরে যায় সকলে, বৃক্ষেরা তাকায় নীচে-- যেখানে মর্মম বাজে কী অবিরত! রোদেরা ঝরে, ঝরে পত্রসম্ভার। পাতারা কাঁদে, বৃক্ষেরা কাঁদে-- মাটিও কাঁদে সকাতরে তবু ঈশ্বর কাঁদে না। সে কাঁদে অবেলায়-- মেঘেরা বিষাদ হলে-- তখন ঝরে না রোদের বিষ কিছুই। আর উপালি বুদ্ধকে অনুসরণ করলো শরীরকে পথের ধারে রেখে।
আমার ইকারুসের কথা মনে হলো। ইকারুস সূর্যের দিকে যাচ্ছে উড়ে। আর গলে গলে পড়ছে তার মোমের পাখা। আসলে তো সে কাঁদে না, কাঁদে যে-- সে আমাদের ঈশ্বরী এক, নারী যে রোদ্দুরের গান-- তাকে সে ঈর্ষা করে কাঁদে। দিনের মরণে তাই একটু বেশি রহস্যময় এইখানে মানুষ আর পতঙ্গের কাছে। পতঙ্গের নাম কখনো প্রজাপ্রতি, কখনো বা ঘাসফড়িং।
আমি রেখাচিত্রের ভিতর সারাদিন খুঁজি গন্তব্য। গন্তব্যের কী নাম? এই রেখা কোথা হতে আসে, চিত্র বানায়। আমার কলম কার ইশারায় এই সব আঁকে? আঁকে সে বৃহন্নলা ময়ূর, দন্তহীন গজ, পালকহীন ঘুঘু, শিংবিহীন মহিষ, ডানারহিত প্রজাপ্রতি, স্তনহীন নারী, আরো অনেক মোটর-কার, ডানাঅলা পাইলট, ধূপের গন্ধ ইত্যাদি । কেনো আঁকে? কোন চরে লুকিয়ে আছে মাইল মাইল বাদামের বীজ। সেই বালি রঙ হলদে হয়ে আসে। নৌকোর পালে ফুটো। নদী তীরে কাশ, কাশবনে বক, আমাদের ছোটোনদী চলে আঁকে বাঁকে, আশ্বিন মাসে বাঘ গাছে বসে থাকে, পার হয়ে যায় গরু, পার হয় গাধা, দুইপাড় উচা তার-- পাড়ে তার কাদা। এই কাদা একদিন ধূলিকণা ছিলো, ঝড়ের আনন্দ সারথি। ঝড় আর বাঘের সম্পর্ক যতোটা না গতির তারচে’ হিংস্রতার। আমি বাঘ কিংবা ঝড় হলে সিনেমার নায়কের মতো মানুষের দেহ ছেনে নির্যাস তুলে আতর বানাতাম। আর উপালি এসে বলতো, নির্বাণ কাপুরুষের সাধনা, প্রিয়।
৭টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
দ্য ড্রাগ কিং

সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।
খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন
সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে
আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন
ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।
শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন
মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪
মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।
মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।