somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... গল্প: হেল্পিংহ্যান্ড
বেলের শব্দে মানিক সাহেবের ভাবনাজাল ছিঁড়ে গেলো। তিনি নড়ে চড়ে বসলেন। এখন বারো নাম্বার সিরিয়াল ঢুকলো। এর পরেই তার ডাক পড়বে। তিনি কাগজের বিজ্ঞাপনটাতে আরেক বার চোখ বুলালেন। অস্ফুটে বললেন, হেল্পিংহ্যান্ড।


কী নাম?
মানিক।
ভালো নাম?
মনজুর হোসেন চৌধুরী।
জন্ম?
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১।
বাহ্! আপনার নাম তো মানিক না হয়ে স্বাধীন হওয়া উচিত ছিলো। কই, কাগজপত্র দেখি।

মানিক সাহেব সামনে বসা ভারিক্কি চেহারার লোকটিকে হাতের ফাইলটি এগিয়ে দিলেন। লোকটি ফাইল খুলে কাগজপত্র এলোমেলো করে ফাইল বন্ধ করলেন।
পড়াশোনা?
কমার্স গ্রাজুয়েট।
এই চাকরি নিতে আসছেন কেনো?
দরকার, স্যার।
পাহাড়ে উঠার অভিজ্ঞতা আছে?
জি, স্যার।
কতোবার উঠেছেন?
স্যার, কতোবার হিশেব নাই। আমার জন্ম তো স্যার পাহাড়ে...
ইন্টারেস্টিং তো! কিভাবে?
আমার বাবা স্যার ফরেস্টে চাকরি করতেন।
গুড! তাহলে তো আপনার জন্যে কাজ করা সহজ হবে।
জি, স্যার।
ঠিক আছে যান। কাজে লেগে পড়েন। এখন থেকেই পারবেন তো।
জি স্যার।
ওকে, গুড।
স্যার কাজটা কী বুঝতে পারছি না।
না বুঝেই চলেই এসেছেন?
মানিক সাহেব নম্রভাবে হাসলেন, বিজ্ঞপ্তিতে লেখা ছিলো আপনাদের একজন হেল্পিংহ্যান্ড দরকার।
হ্যা, হ্যাল্পিংহ্যান্ড। আপনার কাজ একমাসের। একমাসের কাজ একদিনে শেষ করলেও পুরো পেমেন্ট পাবেন। এক সপ্তাহে পারলেও তা, একমাসেও তা। তবে মনে রাখবেন একমাসের মধ্যেই শেষ করতে। এর পরে আপনাকে আর দরকার হবে না।
কাজটা কী, স্যার?
পাশের রুমে যান। আমার সেক্রেটারি আপনাকে কাজ বুঝিয়ে দেবে।


মানিক সাহেব ভেবেছিলেন সেক্রেটারি সুন্দরি কোনো মেয়ে হবে। সিনেমার ভিলেন টাইপ একটা লোক তাকে বসতে বললেন। মানিক সাহেব বসলেন। বসেই মেঝেতে চোখ আটকে গেলো, দশবারোটা ভাঙা গ্লাস পড়ে আছে। মেঝেতে ভাঙা গ্লাস কেনো তিনি ভেবে বের করতে পারছেন না।

তিরিশমিনিট মতো হয়ে গেলো সেক্রেটারি লোকটা তার দিকে একবার তাকিয়েও দেখে নি। কম্পিউটারে ঘটরঘটর করে কী যেনো কাজ করছে। হঠাৎ করে লোকটা তার দিকে চোখ তুলে তাকালো। এবং মৃদু হাসলো। লোকটার হাসি সুন্দর। লোকটা টেবিলের কোণায় রাখা ফ্লাক্স থেকে একটা গ্লাস পূর্ণ করে তার দিকে এগিয়ে দিলেন। বললেন, নেন ভাই, কফি পান করেন।

মানিক সাহেব কফির কাপ হাতে নিতে নিতে নম্রভাবে জানতে চাইলেন, ভাই, আমার কাজটা যদি বুঝিয়ে দিতেন!

সেক্রেটারি লোকটা সহজ ভঙ্গিতে বললেন, আপনাকে একটা খুন করতে হবে।

মানিক সাহেবের হাত থেকে কফির গ্লাস পড়ে ভেঙে গেলো।


এই পাহাড়টা সমতল ভূমি থেকে চারহাজার ফিট উঁচু। হাত দিলেই মেঘ ছোঁয়া যায়। কালোমেঘ, শাদামেঘ, ছাইমেঘ, লালচেমেঘ আরো কতো কতো মেঘ! রামধনুর হাতল ধরে রঙের চাকাও চাইলে হয়তো ঘুরানো যায়। মানিক সাহেবের এখনো তা করতে ইচ্ছে করে নি। তিনি পাহাড়ের প্রান্তে দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। তার মন কী এক প্রশান্তিতে ডুবে আছে। সে জানে তার চাকরির মেয়াদ আগামীকাল তিনসপ্তাহ পূর্ণ হবে। তারমানে এই পাহাড়ের উপর মেঘদূত রিসোর্ট এ তারা আছেন তিনসপ্তাহ ধরে। কিন্তু তার এখনো কাজের কোনো অগ্রগতি হলো না। এই নিয়ে অবশ্য তার ভাবনা নেই। সে ভাবছে অন্যকিছু। কেমন করে এইসব মেঘের উপর পা রেখে রেখে দূরের পাহাড়টার কাছে যাওয়া যায়। তিনি ঘোরলাগা চোখে দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। তার মনে হচ্ছে অনেক দূর থেকে তার নাম ধরে কেউ ডাকছে। তার ঘোর কেটে গেলো। তিনি পেছন ফিরে তাকালেন। আরিফ তাকে ডাকছে।
মানিকদা, আপনি এইখানে! সেই কখন থেকে খুঁজছি আপনাকে।
সরি। কিছু লাগবে?
হ্যাঁ তো! আসেন, ঘরে আসেন, আমাকে কবিতা পড়ে শোনান।
আরিফ মানিক সাহেবকে ঘরে ডেকে নিজেই হুইলচেয়ারের চাকা ঘুরিয়ে তার কাছে চলে এলো। মানিকদা, আপনি বলছিলেন মেঘের উপর হেঁটে একদিন দূর পাহাড়ে চলে যাবেন। আমি কেমন করে যাবো? আমিতো হাঁটতে পারি না।
প্রত্যুত্তরে মানিক সাহেব কী বলবেন ভেবে পেলেন না। শুধু মৃদু স্বরে বললেন, আমি তো পারি।


যে প্ররোচনায় আমি খুলেছি অক্লেশে
আমি খুলেছি শিকড়ের অতল শিকল
আমি খুলেছি শাদামেঘের ভস্ম বাকল
আমি খুলেছি নদীমুখি রাতের করাত
আমি খুলেছি কারো চোখের কাজল
আমি খুলেছি সপ্তগ›ধ তারার হাসি ও কান্না

আমার হাত আঙুলবিহীন
শিকড় খুলে বুঝেছি কিভাবে গাছবন
বাকল খুলে বুঝেছি মেঘের শুদ্ধতা
করাত খুলে বুঝেছি ঘাতকের যন্ত্রণা...

আজ শ্রাবণের পূর্ণিমা। সকাল থেকে বৃষ্টি হচ্ছিলো। ঘণ্টাখানেক আগে বৃষ্টি থেমে গেছে। এখন কতো রাত কেউ জানে না। আশেপাশে শাদাকালো মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। কখনো চুল ছুঁয়ে যাচ্ছে। ছুঁয়ে যাচ্ছে চিবুক। আরিফ মুগ্ধ হয়ে মানিক সাহেবের আবৃত্তি শুনছে। এই লোকটা চাঁদের আলোতে কবিতা পড়ছে। খাতা দেখে। তার নিজের লেখা কবিতা। অদ্ভুত!

যখন কাজল খুলেছি
কাজল হয়েছে দীঘল রাত্রির অভিমান
অভিমানের অধরে নক্ষত্রের ক্ষত
আর সে রাত্রির দীর্ঘশ্বাস

যে প্ররোচিত করেছিলো
সে কার ছিলো বলে নি তখনো...

শুনতে শুনতে আরিফ অন্যমনস্ক হয়ে গেলো। তার ভাবনার ভিতর ঢুকে গেলো কালো ছাত আর লাল শরীরের একটা গাড়ি, সমুদ্র, বৃষ্টির ভিতর ছুটে আসা একটা বাস, হাসপাতাল, অষুধের গ›ধ এইসব। সে ভালো করেই জানে মানিক সাহেবের সাথে তাকে এইখানে কেনো পাঠানো হয়েছে, কোন কাজে পাঠানো হয়েছে। সে জানে মানিক সাহেব কাজটা করতে পারবেন না। কিন্তু লোকটাকে কেনো জানি তার খুব সাহায্য করতে মন চাইছে। আরিফ জানে, কোনো হাওয়াবদল নয়। সব ঠাণ্ডামাথায় পরিকল্পিত। এই পরিকল্পনা তার চাচার মাথায় ঘুরছে বছরসাতেক আগে থেকেÑ তাও সে জানে। সেদিন গাড়িতে তারা সমুদ্রে যাচ্ছিলো, সে, মা, বাবা। বৃষ্টি হচ্ছিলো। আর সামনে থেকে একটা... আহ্, মা!

কী হলো!
কিছু না, মানিকদা। আমাকে একটা শাল এনে দেবেন। বড্ড শীত লাগছে।
মানিক সাহেব উঠে ঘরের দিকে গেলেন।
শাদাটা মানিকদা।


মানিক সাহেব শালটা হাতে বের হয়ে দেখেন হুইলচেয়ারটা ফাঁকা। তার বুকের ভিতর ধক্ করে উঠলো। তারপর এক অভাবনীয় দৃশ্যের মুখোমুখি হলেন তিনি। তিনি দেখলেন, আরিফ শাদা শাদা মেঘের উপর পা রেখে হেঁটে যাচ্ছে দূরে। দূর পাহাড়ের দেশে। মানিক সাহেব ঘোরের ভিতর চলে গেলেন। এবং নিঃশব্দে আরিফকে অনুসরণ করলেন।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29458674 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29458674 2011-10-02 11:41:48
তারা রক্তের রঙ পাল্টে ধুয়ে দিচ্ছে স্বপ্নের বর্জ্য
তারা বললো আমাকে পাওয়া গিয়েছিলো হরিণের চোখের ভিতর, ভয়ার্ত। জ্যোতিশ্চক্র শুদ্ধতায় উপড়ে আসে শীত। খুব দ্রুত এবং খামারের পাশের খড়ের গাদায় কাঁপন। সৌকর্যের অবিদ্য পানশালা। তারা এসেছিলো। তারা এসেছিলো জ্বরের ঘনক। আর আমি দণ্ডায়মান ভূমির সরোজ, কখনো পদ্মপাতায় টলোমল।

কেউ গোর ভাঙছে, ঘুম ছিঁড়ছে কিংবা অন্ধকারে চুষে খাচ্ছে আপন ঠোঁটের ক্ষয়। আর বিকলাঙ্গ বাসনা ঝরে পড়ছে ঝড়ের ফাঁক গলে, ঘনায়মান জ্বর। এই ডুবোজ্বর বানালো আমার গল্পের শরীর। তারা বাইশটি করাত দাঁতহীন করে একটি অরণ্যের কাছে পুজো দিলে আমি নিশ্চুপারতি। তারাবাতি ধীরে মুঠোর ভিতর ভস্মহিমালয়। আঁখিঠার কাঙাল কুহু, শার্টের পকেটে শুকিয়ে যাওয়া তিনটি দোয়েল, ঘ্রাণবহ। নির্জন স্বরমণ্ডলে ডুবে যাওয়া আঙুল ভুলিয়ে দিলে নারী ও মদ-- কাউকে খুঁজি না গীতবিতানে। কেউ ঘুরছে। খুলে দিচ্ছে সর্বোচ্চ গীতবিতান, রবিনাথের ললিত বৈকল্য।

তারা বললো আমাকে পাওয়া গিয়েছিলো বুড়ি পিথিয়ার ভাঁজপড়া চোখের কোলে, নিষ্পলক। আমি আনন্দিত-- অ্যাপোলোর অহম ও অবিমৃষ্য খেলা। আমি কাজল নই, তারপরও কেউ আকাশ ঘেটে তছনছ করে আষাঢ়ের তৃতীয় দিবস। তারা রক্তের রঙ পাল্টে ধুয়ে দিচ্ছে স্বপ্নের বর্জ্য এবং লালা।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29363631 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29363631 2011-04-16 12:13:52
জেনেছি গহ্বরের মানে ও একটি জেনেছি গহ্বরের মানে ও একটি ১৬১২১০

কখনো আমরা সবাই গিয়েছিলাম
সবাই ফিরেছিলো
আমি থেকে গিয়েছিলাম
সে এক তীব্র সুড়ঙ্গপথ ছিলো
শৈশব উড়িয়ে ফিরতে গিয়ে শাখাগহ্বর
নখের পাঁকে লেগেছিলো লালচেমাটি
মাটিরঙ নৈসঙ্গ
জামার পকেটে উদগ্র পিছুটান
ইচ্ছেও ছিলো
গহ্বর রেখে দিলো আরো শবছর
অবিশ্রাম ছলনৃত্য
তীর্থের হাড়গোর লবঙ্গের কাঁটা ও ভাঁজ
পতঙ্গের ললিত চঞ্চু
মসলিন চুম্বনের ছায়ায় ব্যাকুল ফাটল
বুক কেমন করা উরুর প্রতিমাকল্প
ম্যামথের কঙ্কালপ্রমাদ
বাৎসায়নের গোপনকলম
পাঁচখানি শিকিপাখা অমৃত কলঙ্ক
নয়টি বাঁশের কঞ্চি শিমের পাতা
তিনটি ফাউন্টেন পেনে রাতের কালিমা
একটি ঝর্ণাকলমে রাখা চোখের কাজল
আমার ছখানি ছোঁয়া প্রত্নস্তনে
হিপপকেটে সুতীব্র পিছুটান
দুখানি গানের ইচ্ছে হলে থেকে গিয়েছিলাম

ফিরে যাওয়া তারা স্মৃতিশব
কখনো সবাই গিয়েছিলাম
তারা জানে না বলেই আমি জেনেছি
জেনেছি গহ্বরের মানে ও একটি প্রমাণ ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29290916 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29290916 2010-12-16 19:19:42
মুক্তগদ্য: পুরুষপাখি
ইথারের ভাষা কী? হালকা কম্পন। যে বাদক অবিশ্রাম বাজায়Ñ যে বাদক জন্মা›ধÑ তার নখের আয়নায় কি জেগে থাকে কোনো দ্বীপদেশের অভাবনীয় রেখাচিত্র? আমরা কাদার ভাষা জানি না। যে-কাদা মাছের গায়ে আঁশ হয়ে লেগে থাকেÑ তার প্রয়োজনীয়তা দুর্বোধ্য রোদের অক্ষরে খরার খবর বলে নিÑ এইকথা বলা যাবে না। সন্ন্যাসেরও প্রকার থাকে। যেমন কাদা ও মাছের পারস্পরিক সন্ন্যাস। একজন অন্যজনের সাথে একা হয়ে থাকা। একজন জড়জীবনÑ অন্যে অবাধ সন্তরণ বা সাঁতার। সাওতাল পরগনায় ধুয়ে গেছে বিলাস এবং বিদ্যুতের রাহিত্য আদিকালে খুবি স্বাভাবিক একটা বিষয়। বিষয়বিষাদ আজ আমাদের শেখরের খোঁজে ছড়িয়ে পালক। কখনো অস্ট্রিক, নিষাদ, কখনো অনার্য দ্রাবিড় উপবন।

পাখি আর পাপ তার দীনতার নাম। সূর্যাস্তের পাড়ায় শাহরিক মুগ্ধতা ও ক্লান্তি নিয়ে সে তাকিয়ে একটি শোকযাত্রার অলৌকিক জামা পরে। যেমন আছে প্রেমিকা ও সহোদরার মৃত্যুর বিশদ বিবরণ। মলাটে নদী নেই, পিকাসোর রেখাচিত্র। বালিকার হাতে দোলে অব্যক্ত অভিমান। ইদানীং অভিমান ঠাকুর ঘরে বিনোদিনীর পদতলে ছড়ানো সিঁদূর। যেখান ফল্গুলতা, উজ্জ্বল গ্রাম, ত্বকের মসৃণতা, পেলব পাথরের যকৃতে লুকোনো বীজাণু। তারপরও সে সব কথা আমাকে বলেÑ তার পাহাড় ও পাতালের কথা। ঘুড়ির দেশের রঙ ও সুতোর কথা। সুতো কাচের গুড়ো মাখানোর অবিশ্রান্ত কথা সে আমাকে বলে। আমি শুনতে চাই না। পুরনো দর্জির দোকানে গিয়ে কান সেলাই করি। আর সে নতুন করে আমার কান তৈরি করে তাতে ঢেলে দেয় কথার পাথর। এক একদিন সে শুধু মৃতদের কথাই বলে। আর বলে বাদকের ডাক নাম অ›ধকার। তার ঘরের একটা পেইন্টিং এ দুটো গাছ আমার কাছে প্লাস্টিকের মনে হয়। অনেকটা নৃশংস।

বন্যার কথা ভাবি। একবার বন্যা হয়েছিলো পাহাড়ের দেশে। বনজ-মানুষ বন্যাকে উপহাস করে বন্যার স্রোতে শাল এবং সেগুনের জোড়া জোড়া পাতা ভাসায় রাত তৃতীয়প্রহরে, পাতার উপর হালকা মাটির প্রদীপ। আমি শাল বনে হারিয়ে যাই শূন্যতার হাত ধরে। শূন্যতা আমাকে বাদামি এবং কালো বিষয়ে কিছু কথা বলে। বন্যার তরল আরেকটু গাড় হলেই শুকনো পাতারঙ। সে তারপরও থামে না এক একদিন সেজেগুজে আসে। আমি তাকে বকাবকি করি, দূরে নগ্ন বকপাখি আর কাক দেখাই। কাকপাখির বাসায় রূপার নথের কথা বলি। সে রাগ করে শান্ত হয়ে উবু হয়ে বসে মাঠের ঘাসে। ঘাসের জ্বরজ্বর শরীর, তাতে সিনেমার ক্লান্তি। ছায়াছবি যেদিন সিনেমা হলোÑ সেদিন আমরা হারালাম শ্যাওলার মন কেমন করা রঙগ›ধ।

আমি তার ডায়েরি অনুবাদ করতে গিয়ে পেলাম প্রজাপতির কাছে লেখা তার দুটি চিঠি। চিঠিতে হরিদার এবং নিকট আশ্রমের কথা আছে। শ্যাওলার রঙ আমাদের পুকুরে গাঢ় হলে তার কথা ভাবি। সে খুব ভালো ছবি আঁকতে পারতো না। অন্যদের জলরঙের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতো। আমি দৃশ্যখাদকের চোখে ঘুমটুম সব ভাঁজ করে রেখে একটা গুইসাপের দিকে তাকিয়ে থাকি। গুইসাপ মুগ্ধ হয়ে আমাকে দেখে। কেননা আমিই প্রথম জেনেছি, পাখিদের মধ্যে পুরুষরাই নর্তক হয়।

আমিও তার মতো থাকি জেগে শাহরিক মুগ্ধতা ও ক্লান্তিÑ আমি অবিশ্রাম বাদক, আমি মৌনপাখি, আমি অ›ধকার। আমি নিদারুণ পাপ এবং সুন্দর।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29274972 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29274972 2010-11-20 20:24:38
মুক্তগদ্য: নিঝুমশৃঙ্গার
তুমি পোড়াকাঠের হিশেব চেয়েছিলেÑ আর আমি দিনের পর দিন নাম না জানা পতঙ্গের মিছিল ভেঙে গিয়েছি বনে বনে; ওই বনে দাবানল ছিলো কে বলেছে তোমাকে; আমি কি তবে জ্বালাতে পারি না সরল আগুন উৎসবের দ্বিমাত্রিক বাসনা। এই বাসনা পুড়ে যায় একটি গানের ভিতর। বহুদূর তুমি ভুলে গেছে আতপের চিরতপ্ত পথঘাট। বিড়ি-সিগারেটের দোকান, তামাকের বন আছে একটু দূরে। শাহরিক ধুলো আর বালি যখন ধূলি ধূলি পথে হারিয়ে যায়, কারো সিঁথির ফাঁদে আকটে যায় চিরলোলুপ চাঁদ আর চন্দ্রের অনিদ্রাবিহারÑ আমার মনে পড়ে বিনোদিনী বালা, হরমতি, পার্বতী, জাহ্নবী ছায়া যে তটে পড়ে আছে বনাঞ্চল, বিক্ষত শর আর পাঞ্চালির আঁচলের চুলি।

আমি এই কোণে আমাদের উজ্জ্বল ভাইদের দেখি। বিবাহ একটি স্বপ্ন-- সেটি দ্বিতীয় দিন ছিল। এবং তৃতীয়। তারা এখন একত্রে চালায়; একটি হঠাৎ করে মানুষ এবং নারী দেখে। সে কেনো যে অচেনা লোকদের ভয় পায়। ঠক শব্দে তার ঘুম ছুটে গেলো। সে রান্নাঘর থেকে একটা বটি নিয়ে বারান্দায় বের হলোএবং দেখলো একটি শিমপাতা গাঢ় সবুজ প্রজাপতি হয়ে দরজার কড়ায় বসে আছে। কিন্তু একটা প্রজাপতির পক্ষে কি দরজার কড়া নাড়া সম্ভব? হোক দুইশো চারবার সে বিবাহের দেবতা। ইদানীং তার খুব মন খারাপ। দীর্ঘশ্বাসে পোড়া বাতাস এসে ঘিরে থাকে পলক; দৃশ্যের ভিতর সত্য যতোটুকু থাকেÑ থাকে কিনা সে ভাবছে। আর সান্তিয়াগোর হাঙর ডুবো ডুবো ঝিলে কঙ্কাল হয়ে জানান দিচ্ছে সমুদ্রের সমুদ্রের অস্তিত্ব।

আপনি শালা কবি। সে আপনার ত্বক অনুসরণ করে। আপনি ত্বকে শুনেন। আপনার ত্বক এইই খুলবে এবং নিজেকে হারাবে; তারপর হাড়, তারপর আপনার চোখ, আপনার স্মৃতি মেলে দেখতে পারেন। আজরাত চরের শেষ। সে একটি আলোর ঔরষে গর্ভবতী হয়েছিলো। যে তাকে উড়াউড়ি করতে ডানা দিয়েছিলো-- সেই প্রথম এটি দাবী করেছিল। দেবসভায় কে নাচে তবে কবন্ধহাঁসের মতো। সে কি বেহুলা? বেহুলা বেকার। নৃত্যের বেকার কারিগর। নখিন্দরের দেহ আর ফিরে পায় না প্রাণ। শিবা শুয়ে থাকে সন্ধ্যার ইজিচেয়ারে। তার কাঁচুলিতে জাফরান রঙ; চোখে কিসের বিষাদ? সে নিজেকে নারী ভাবছে। হয়, হয়। সবি সম্ভব। সে শতরূপা বিভা। আর আমার মনে হয় তিলোত্তমার প্রেম বিশ্বকর্মার প্রতি। সবিই তবে ভোগে লাগে! আহা ভোগ! ঝড় আর অরণ্য নিজস্ব বৈঠক সেরে প্রথমে চরাচর তারপরে খেচর হয়ে যায়।

আপনি কবি। আপনার জামার পকেটে লুকিয়ে থাকবে ঝড়। আপনি দুআঙুলে তুলে নিয়ে বানাবেন ঝড়ের ওমলেট। প্রেমিকার নিমন্ত্রণে সাড়া না নিয়ে হারিয়ে যাবেন বটের পাতায়। জমিনের আইলে বেতরে কাঁটায় আঁকবেন ললিত সর্বনাশ। আমি আর আপনিÑ পরস্পরের পার্থক্য এইই আমি ভাঙা আয়নায় মুখ দেখে নিজেকে খুঁজি। আর আপনার কোনো আয়না নেই। ফলত আপনার কোনো জ্বালা নেই। আপনার টেবিলে পাতার পিরিচে ঢাকা ঝড়ের ওমলেট বড় উপাদেয়। আপনার হিপপকেটে প্রেমিকার জন্যে কেনা লিপস্টিক। ওটা বের করুন, লিপস্টিকে আপনার পাশের দেয়ালে একটা কবিতা লেখা যাবে। কাল রাতে শীত ছিলো মশারির ভিতর। আমি শালা মশারির বিজ্ঞাপন লিখে লিখে সারা। ওটা নাকি অষুধ মাখানো। মার্কিন।

আজ রাতে রাত হলে আমি এস্রাজের ছবি দেখে মনে মনে শুনে নেবো অতিপুরাতন কোনো রাগ। ধরেন, হতে পারে তিলক কামোদ। এটা কি পুরাতন? রাত্রি দ্বিপ্রহর। এতে কি শৃঙ্গার রস পর্যাপ্ত বিদ্যমানতা? পানিসারেগাসা, রেমাপাধামাপাসা... তারপর নামে সাপাধামাগা ইতি আদি। রাত গড়িয়ে যায়, গড়িয়ে যায়... তুমি কবি হয়েছো বলে বুকের ভিতর হাহাকার নিয়ে আমার কাছে আসো নি এবং যে কারণে আমি তোমার কাছে। ওপাশে অনতিদূরে যুদ্ধ আছে। যুদ্ধের নাম বিনোদন।



]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29272978 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29272978 2010-11-16 01:09:47
গদ্য: অরূপ রাহী গায়িত লালন
০১.
অরূপ রাহীকে যখন আমি দেখি নি-- তখনও তাকে খানিকটাই চিনতাম তার কবিতা বা লিরিক কখনো পড়া হয় নি কিংবা গান শোনা হয় নি। বন্ধুদের কাছ থেকে শুনেছি তিনি ভালো গান করেন। তার গানে কীর্তন অথবা বৈষ্ণবপদাবলির গন্ধ পাওয়া যায়। কারো কাছে শুনেছি তিনি ভালো ইংরিজি জানেন... ওই পর্যন্তই; ভেবেছিলাম, আমাদেরই বয়েসি কেউ হবেটবে, এই যা। খবরের কাগজে এককবার চেহারাও মনে হয় দেখেছি দাড়িঅলা বড়চুল, বিনোদনপাতায়। তারপর মনে হলো বয়স মনে হয় আমাদের চাইতে একটু বেশিই হবে।

০২.
ঢাকায় আসার পর বইমেলায় লিটলম্যাগ চত্বরে এক লোকরে দেখলাম বড় বড় দাড়িঅলা, চুলবড়; লুঙ্গিপইরা দিব্যি বেল্ট দিয়া কোমরে মোবাইল ফোন বাইন্ধা থুইছে। মনে হইতেছিলো তার একলার শোডাউন চলতাছে। যাই হোক, মনে মনে বললাম, বেটা ভাব মারাস না ( প্রকৃত অর্থে ছাপার অযোগ্য একটা গালিই দিছিলাম সেইদিন)। এরপরও দেখেছি আজিজ মার্কেটে। এবং চিনতে পেরেছি লোকটা অরূপ রাহী। তখনও চান্দি গরম হইয়া যাইতো।

০৩.
সেদিন মোল্লার দোকানো সন্ধ্যার পর অরূপ রাহীকে দেখলাম। না, তাকে দেখে আমার কোনোভাবেই মেজাজ খারাপ হয় নি। কারণ এর মধ্যে আমার শোনা হয়ে গেছে তার গাওয়া লালনের গান। এবং এখনো শুনছি। লালনকে নতুন করে ফিরিয়ে দেয়ার কৃতিত্ব একা অরূপ রাহীর। ইচ্ছে হচ্ছিলো তাকে গিয়ে বলি এইসব কথা। কিন্তু ইচ্ছেটাকে জিইয়ে রাখতে চাই বলেই যাই নি।
http://www.youtube.com/watch?v=ewhY2bL-f6E
০৪.
আমাদের ছোটো বেলায় বাড়িতে ক্যাসেটে লালনের গান বাজতো। গাইতেন ফরিদা পারভীন, মিলন হবে কতো দিনে, খাঁচার ভিতর অচিনপাখি এইসব। তারপর বড়ো হয়ে আরো অনেকের কণ্ঠে লালন শোনা হয়েছে। এপার বাঙলার লালন আর ওপার বাঙলার লালনের সুরের তারতম্যও দেখেছি। এর মধ্যে লালন সম্পর্কে বেশকিছু পড়াশোনাও হয়েছে আমার। সম্ভবত ফরিদা ইয়াসমিনের কণ্ঠে লালন শোনার পর ভালো লেগেছিলো টুনটুন বাউলের কণ্ঠে। এরপর লালন নিয়মিত শোনা হয় নি। বড়জোড় মাসে তিনমাসে একবার দুবার এইরূপ। এখন প্রতিদিনই শুনি।

০৫.
একদিন ফরিদা পারভীনের এক স্টেজশো তে লালনের জ্ঞান শুনতে গিয়ে রীতিমতো বিরক্ত হয়ে বের হয়ে এসেছি। এতো অত্যাধুনিক যন্ত্রের শব্দযন্ত্রণার ভিড়ে লালনের চাপা পড়ে মরি মরি দশা। আমার মাথায় ঢুকে না কেনো বাউল গান অথবা লোকায়ত গানে শিল্পিরা অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে। আমার খালিগলায় রবিনাথের গান ভালো লাগে, আর কেবল একতারায় ভালো লাগে লালন।

০৬.
আমার একবন্ধু আরিফ ফেনী থেকে সপ্তাহের ছুটিতে মধ্যে মধ্যে ঢাকা আসে কেবল বই, মিউজিক আর মুভি কেনার জন্যে। আমার সাথে তার দেখা হয়। এবারে সে এসে জানালো অরূপ রাহীর লালনের কথা। আজিজ মার্কেটে একটা দোকানে পেলাম। সব দোকানে শেষ। বাসায় এসে শুনলাম লালন। অবাক হলাম। অনেকবার শুনলাম। একটানা শুনলাম। এখনো শুনছি। ইদানীং কতিপয় কাজের মধ্যে আমার একটা কাজ হলো বন্ধুদের কাছে অরূপ রাহীর লালন শুনতে দেয়া।

০৭.
অরূপ রাহীর লালন ভালো লাগার প্রধান কারণ তার যন্ত্রের ব্যবহার। তিনি আধুনিক কোনো যন্ত্র ব্যবহার করেন নি। সব লোকজ যন্ত্র। আমার মনে হয়েছে গানের অনুষঙ্গ হিশেবে তিনি মূলত একতারা, বাঁশি, দোতারা, মন্দিরা, খোল, রসমন্দিরা ইত্যাদি যন্ত্র ব্যবহার করেছেন। দ্বিতীয় কারণ হলো তার গান নির্বাচন। সাধারণত লালনের গান বলতে আমজনতা যে দশবারোটা গানের কথা লালনের গানের তথাকথিত গায়ক-গায়িকাদের কাছ থেকে জানতে পারে, সেইকটা গানের বাইরে গিয়ে তিনি গান বাছাই করেছেন। ফলত অনেকদিন পর লালন যেনো ধরা দিয়েছেন নতুন রূপে।
ভালোলাগার তৃতীয় কারণ, তার গায়কি। যেনো ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়ার শিল্পিদের কণ্ঠেই তার গান।


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29266453 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29266453 2010-11-04 00:21:25
মুক্তগদ্য: গলায় তার মন্দিরা, আমি তো মন্দিরার টুংটাং শুনতেই গিয়েছিলাম আমাকে ভাবতে বলা হয়েছিলো। আমি চোখ বন্ধ করে সান্তিয়াগোর হাঙরের কথা ভেবেছিলাম-- তীরে এসে যে একফালি কঙ্কাল হয়ে লবণের সাথে সঙ্গম করে কাঠের মতো। সান্তিয়াগোর চোখে ঘুমের ক্লান্তি। তার স্রষ্টা বলেছিলেন, ভাঙবে তবু মচকাবে না। এই বলে আত্মহত্যা করলে আমি জানতে পারি জীবন মৃত্যুর চেয়ে আপত্তিকর।
আমি সেই ছেলেটা ছিলাম যে সৈকতে দাঁড়িয়ে চিৎকার করেছিলো, সা-ন্তি-য়া-গো.. আর ঢেউয়ের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে আমার কণ্ঠস্বর ইকো হয়ে আমার কাছেই ফিরেছিলো।
আমি নার্সিসাস হতে পারি নি। নার্সিসাস আকাঙ্ক্ষাতেই সুন্দর।

০২.
ল্যুসুনের কাব্যনাটক দ্য পাসার বাই পড়ে আমার ডাকঘরের কথা মনে হয়েছে। রবিনাথ সবখানে বিচরণ করেন। তার জন্যে কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই।
লোরকার ব্লাড ওয়েডিং আমার ভালো লাগে। তোমার কেমন লাগে? অশ্ব আর রক্তের মধ্যে মনে হয় একটা সম্পর্ক আছে। লোরকা লিরিকের ভিতরে রক্তবীজ বুনে দিয়ে হারিয়ে যায়। তার চোখ বাঁধা। হাত বাঁধা। লোরকা গুলিবিদ্ধ কবিতা।

০৩.
প্রবচন লেখা অনেক ঝামেলা এবং জটিলকাজ বলে আমার মনে হয়েছে। অনেকেই অবশ্য প্রবচনকে প্রবাদের সাথে গুলিয়ে ফেলেন। আমি অস্কার ওয়াইল্দের এপিগ্রাম পড়েছিলাম। তারপর পড়েছি হুমায়ুন আজাদের প্রবচন, যিনি ছিলেন বাঙলাদেশের কয়েকজন শিক্ষিতদের অন্যতম। তার প্রবচন পড়ে ভাবলাম নিজেও কয়েকটা লিখি। তাই এই অপচেষ্টা। আমার একটি প্রবচন নিচে দেয়া হলো।
বাঙালি হিউমার জানে না, জানে ভাঁড়ামি। বাঙলাদেশের একশ্রেণির স্ক্রিন-প্লে অথবা টিভি নাটক দেখলে আমার তাই-ই মনে হয়।

০৪.
চুল আর নখ তাড়াতাড়ি বাড়লে আয়ু কম হয়। আমার এমন হয়। হয়তো আর সাড়ে পাঁচবছর বাঁচবো। এক পামিষ্ট আমাকে এইসব বলেছে। আমার হাতের আয়ুরেখা মাঝখান থেকে কাটা। এটা সত্যও হতে পারে। সম্রাট নেপোলিয়ানের হাতের আয়ুরেখাও মাঝখান থেকে কাটা ছিলো। তিনি ছুরি দিয়ে টান দিয়ে কাটারেখা জোড়া লাগান। কিন্তু নিয়তি পাল্টাতে পারেন নি। জ্যোতিষির বলে দেয়া সময়ে নিহত হন।
ইশ্কুলে থাকতে একটা মেয়েকে বলেছিলাম তুমি আমার নিয়তি। সে আমার নিয়তি হয় নি।

০৫.
ইমানুয়েল কান্তের আলোকায়ন শাদা-কালো বাইনারি অপোজিশনের জন্ম দেয় নি কথাটা অসত্য নাও হতে পারে।
রবিনসোন ক্রুশো অচেনা দ্বীপে প্রথম নিয়োগ করে একজন চাকর। যে কিনা কৃষ্ণাঙ্গ এবং আদিবাসী। মানে দানিয়ালের নায়ক ক্রুশো শাদাপ্রভু আর তার চাকর কালো অসভ্য নিগার।
ইমানুয়েলকে দেখে লোকজন ঘড়ির কাঁটা ঠিক করে নিতেন।

০৬.
পাথরের মধ্যে ক্ষয়ে যাওয়ার উপাদান লুকিয়ে ছিলো। সে পর্বতের গায়ে দেয়াল হয়ে ছিলো বহুদিন। তারপর য়ে গেলো মাটি নদী আর কাদা হয়ে। একটি গাছ জন্মালো। গাছের নাম জানি না। আমি বিস্ময় ও শূন্যতার পাশে দাঁড়িয়ে লোপাট।
আমাকে নাও, সমূলে বপন করো নদীতে।

০৭.
কর্মসম্পাদন করে দুটি বৃক্ষ গাছ থেকে কাঠে পরিণত হয়। এমিবা ছিলো আদিম জোলা। সেই থেকে কবির। সন্ত অথবা বাউল। তাঁত বুনে। গাছের বাকল। লালনের সাথে তার গানের শিকল। রবিনাথও বাউল ছিলেন বৈকি। তবে আচারে নয়, গানে।

০৮.
গলায় তার মন্দিরা। আমি মন্দিরার টুংটাং শুনতেই গিয়েছিলাম। আলো অন্ধকারে আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম তিনকুড়ি বছর। কেবল গোলাপি আমার প্রিয় নয়, কচিলেবুপাতার বসনে সে সূর্যের সহোদর। আমাকে গান শেখায়। কবিতা এলে একফোঁটা ধূলি ভেঙে বলি, কাদা হও, সভ্যতার ধূম্রলিপি হারিয়ে যাক।

০৯.
কখনো ভাবি নি নদীর অধিকার ছেড়ে দেবো। অনেকদিন আসি নি, অনেকদিন যাই নি সেখানেও। তথাপি পুষ্প কী কারণে কুসুমিত হইয়া ঝরিয়া পড়িলো বুঝিলো না একদা কমলা ঝরিয়া। তার কীর্তনে আজো লেগে আছে চির বিভক্তি। নদী আর খেয়া পারাপার। কৃষ্ণ তো চোখের দিকেই তাকিয়ে ছিলেন। বসনে কী বা যায় আসে?

১০.
সে ঝাঁকুনি দিয়েছিলো। আমি বাড়ির অন্যান্য ঘর থেকে পর্যবেক্ষণ করেছিলাম এবং গাছের ধারে তাদেরকে ভালোবেসেছিলাম। তাদেরকে এখনও ভালোবাসি।
সে খুব কালো করেছিলো, কিন্তু এটি হয়তো নৌকো ছিলো, সুতরাং তাকে দেখা যাচ্ছিলো না। নৌকোর পূর্বে কাজ করতে একটি গাছ এসে মাঝি হয়েছিলো। আমি এর কোণে আমাদের উজ্জ্বল ভাইটিকে দেখি।

১১.
বহুদূর মানে আসলে কতোদূর? আমি মাতাল, আমি কোনটা মিথ্যা বুঝতে পারি। তাকে যদি স্বত্ব ছেড়ে দিই তাতে কী আর এমন হবে? তালগাছ সে দাঁড়িয়েই রবে। অনেকদিন আসি না বলে আমাকে দেখে জানলার কপাট বাতাসে কাঁপলো না। আমি বললাম, আমিই তোকে খুলেছিলাম...
সে অদ্ভুত চোখে তাকালো।

১২.
তোমাকে আমি কখনো ফুল্লুরার কথা কি বলেছিলাম; অথবা চণ্ডিমঙ্গল? হাত কাঁপে। আমরা পরস্পরের দিকে বেলুন ছুঁড়ে দিয়ে একটা করে শব্দ ছুঁড়ে দিই সাথে। আমি ছুঁড়ে দিই ছুরি। আমি ছুঁড়ে দিই চোখ... তুমি কবিতার খাতা হারিয়ে কাঁদো। কেননা, তোমার খাতায় লেখা অসম্পন্ন কবিতার শেষটা পাঠক জানতে পারবে না।

১৩.
আমার অসুখ নেই বলার পরও তুমি সন্দেহের চোখে তাকাও। তুমি আয়নার ভিতর সারাদিন সন্দেহ।
কবিতা লিখতে না পারার যন্ত্রণা তোমাকে বাঁচিয়ে রাখবে। তুমি জ্ঞানী সলোমনের গানের কাছে ফিরে যাবে, আঙুর বাগানের রোদে পোড়ে পোড়ে বালি রঙ বালিকা, তোমার গ্রীবা গজদন্তমিনার।
যিশু একটা টাওয়ারে উঠে ইশ্বরের হাতে একটা রুটি দিলেন। ওটা ছিলো টাওয়ার অব বেবেল। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29249596 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29249596 2010-10-05 00:19:32
সবুজ ছিলো নদীতলে ডুবুরি আলো অরণ্য মানে বনাঞ্চল খানিকটা জঙ্গল
ঢেউ তোলে ঢেউকালী
কালীর জিবে জননী আততায়ী

পাজামার পাড়ে চোরকাঁটা সবুজ
সজারুর ডালপালা সবুজ ছিলো একদা
সেই সবুজ কালীর কোমরের বিছা
নরমুণ্ডের অমলিন বিন্যাস

জঙ্গলে সবুজের মড়ক
পুরনো দেয়ালে বিস্তারিত ছত্রাক
রবিনাথের দাড়ির অতলে ত্বকজুড়ে

ডিহি মানে হয়তো কোনো স্থান
মহাস্থানগড় জেনেছিলো হরপ্পার টানেল
জেনেছিলো নর্দমায় মাছের উচ্চাঙ্গ বিকাশ

আমরা নলবনের উদ্বাস্তু খেলোয়াড়
প্লেবয়ের কাভারে স্তনবতী টর্সো
একদিন হাতমাথাপা সবি ছিলো
সবুজ ছিলো নদীতলে ডুবুরি আলো

এখন বনে সবুজের আরণ্যক মহামারি
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29236348 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29236348 2010-09-07 02:27:44
আমার প্রবচনসমূহ: পর্ব-১ পাশ্চাত্যের আরিস্ততল যদি নিজেকে নবী হিশেবে দাবী করতেন তবে প্রাচ্যের নবীদের ডালপালা বিস্তার করার কোনো পথই থাকতো না।
আরিস্ততল জানতেন আলো আর অন্ধকারের বিভেদ।

০২.
এখানে লোকাল-বাসে ভ্রমন করলে বাঙালির প্রকৃত চরিত্র উন্মোচিত হয়।

০৩.
এখন বিষ্ঠাকেই পশ্চিমারা ইশ্বরের আসনে বসিয়েছে। কারণ কোনো সমস্যায় পড়লেই তাদের মুখে প্রথম যে শব্দটি উচ্চারিত হয় তা হলো, শিট!
বেশ কয়েকবছর হয়ে গেলো আমরা পশ্চিমাদের অনুকরণ করছি।

০৪.
কবিতা লিখতে হয় উপুড় হয়ে, আর পড়তে হয় চিৎ হয়ে। কিন্তু অধিকাংশ কবিতালেখক এখনো টেবিলেই পড়ে আছেন। কারণ তারা কবিতাকে এখনো দয়িতা ভাবতে শিখেন নি।

০৫.
এক অর্থে গণতন্ত্র মানে হলো জনগণের স্বার্থে সর্বেক্ষেত্রে আপোষ করা। যে দেশে একজন আপোষহীন নেত্রী থাকেন সে দেশে গণতন্ত্র ইউটোপিয়া।

০৬.
বাঙলাদেশ রেলওয়ের ট্রেনগুলি ছারপোকায় সয়লাব। কর্তৃপক্ষ ছারপোকা মারার জন্যে ট্রেনের সিটে কীটনাশক ছিটায়। ছারপোকা মরে না, কিন্তু যাত্রীরা কীটনাশকের গন্ধে অতিষ্ঠ এবং কখনো অসুস্থ হয়ে পড়ে।
দেশের সকল দমন এবং বমন কমিশনও এইরূপে বিস্তারিত।

০৭.
সৃজনশীল মানুষ চমকপ্রদ কাজ করে না, চমকপ্রদ কাজ করে গণিকা, ভাঁড় এবং যাদুকর। এবং তা স্রেফ পেটের তাগিদে।
সৃজনশীল মানুষ গভীরতর কাজ করে এবং মানুষ তা পরে আবিস্কার করে।

০৮.
দোয়েলচত্বরের পাশের ফুটপাথে আমি একটি মহিলাপীরের মাজার দেখেছি। আগে কখনো দেখি নি। আশা রাখছি আগামী কয়েকবছরে দেশে এইরকম মাজারের জঙ্গল হয়ে যাবে।

-----------------------------------------------------------------------------

উৎসর্গপত্রিকা: হুমায়ুন আজাদ, বাঙলাদেশের কয়েকজন শিক্ষিতদের অন্যতম।

___________________________________________
সংযুক্তি:
সামইন কর্তৃপক্ষের কাছে বাঙলা-তারিখ সংযোজনের প্রস্তাব ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29235663 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29235663 2010-09-05 20:41:35
গল্প: চাকাচক্র
গাড়ি চলছিলো। গাড়ি চলছিলো। গাড়ি চলছিলো। মাটির রাস্তা। রাস্তায় ধূলি। বাতাসে রোদ আর রোদ। খণ্ড খণ্ড রোদে গড়িয়ে গেলো অনতিদূরের রাস্তায় মায়ানদী, আমরা ফুরফুরে বাতাসে জড়োসড়ো চুপিচাপ। আমি মা আর বাবা। দুইবলদে টানা গাড়িকে আমরা গরুর গাড়ি বলি।


গাড়ি চলছিলো। গাড়ি চলছিলো। একটি স্মৃতির পাখায় রেশমি-ফ্রক। আমার না-গজানো বুকে কিশলয় গান। আমার বালিকা আঙুলে অঙ্গুরীয়। অঙ্গুরীয় মানে আংটি। কে দিয়েছিলো?
এটা অভিজ্ঞান হবে না জানি, হতেও পারে। শকুন্তপাখির খোঁজে যদি মৃগয়ায় অন্য কোনো দুষ্মন্ত আসে একেলা-- তবে আমি হতেও পারি শকুন্তলা।


আমার শৈশব কেবল নারিকেল পাতার ঘড়ি আর চশমা নয়, শৈশবে একটি ঝড় এসে বললো ঝড়ের গোপন। আমি আঙুলের কড়া গুনে গুনে মনে মনে দেয়াল ভেঙে ভেঙে একটা অরণ্যের সন্ধান করলাম। বনজ্যোৎস্নার ঝোপ ভেঙে অরণ্য দেখালো আরাত্রি কণ্টকবনাঞ্চল।


গাড়ি চলছিলো। আমার চুল বড় হলো। আমার নখ বড় হলো। আমার দাঁত শক্ত হলো। আমার চুলকে বাড়তে দিলাম। শক্তদাঁতে নখ কেটে কেটে পথে পথে ছড়িয়ে দিলাম। আমার ফ্রক ছিঁড়ে গেলো। নতুন গজানো বুকে যখন টনটন করে উঠলো সন্ধ্যা এবং রাত্রির চিরন্তন বেদনা-- মা আমার দিকে তাকালো। তার পরনের শাড়ি আমাকে পরিয়ে দিয়ে হারিয়ে গেলো। হারিয়ে গেলো কোথাও।
বাবা তখনো পাশে বসে ছিলো। বাবার ঠোঁটে পুড়ছিলো পুরনো তামাক। বাবার চোখে তখনো জোনাকবাগান। আর আকাশে কয়েকটি তারা কেবল বাতাসে কাঁপছিলো থর থর।


গাড়ি চলছিলো। গাড়োয়ান কৃষ্ণবর্ণ। দেহাতি হাতে তার খড়ের চাবুক। বাবা গাড়ির দুপাশে ঝাপি ফেলে হারিয়ে গেলো রাতের হাত ধরে। আমি কি তখনো ঘুমপাড়ানিয়া গান, আমি কি তখনো না-দেখা ইশ্কুলঘরে ঝুমবৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া অংকখাতা?
মা! তুমি কই? আমার পরনে তোমার তেরোহাত উত্তরাধিকার।
বাবা! তুমিও হারালে! আমার চারপাশে তোমার চারদেয়াল উত্তরাধিকার।

এই গাড়ি ধূলি ধূলি পথ ভেঙে যেই গাঁয়ে যাবে-- সেই গাঁয়ে বুঝি রূপার খাঁচায় পোষা হয় কাক আর কাকলি।


প্রচণ্ড শব্দে ভোর ভেঙে গেলো। ভেঙে গেলো দুইহাতে পরা দুইডজন চুড়ি। একহাতে নীল। আর হাতে লাল। শব্দের উৎস সন্ধানে তাকাই পাশ ফিরে। এই শব্দ ওঙ্কার হতেও পারে। শব্দের উৎস সন্ধান করতে গিয়ে গোলকধাঁধার মতো পাকখাওয়া মাইল মাইল যন্ত্রণা টের পাই আমার শরীরের কোথাও।
নীলচুড়ি ভেঙে গুড়ো হয়ে ঢুকে গেলো আমার চোখে। আমি তখন নীলনয়ন। লালচুড়ি তরল হয়ে শুয়ে আছে বিছানার শাদা চাদরে।

সেই লাল আমাকে জানালো শব্দ এবং যন্ত্রণার উৎস।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29232501 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29232501 2010-08-30 19:27:07
গল্প: উল্টাটান
ইদানীং প্রায় রাতে সে এইসব হিজিবিজি স্বপ্ন দেখে। রাতে ঘুম হয় না। তন্দ্রামতো হয়। সে বিছানায় পড়ে আছে প্রায় দুইবছর হতে চললো। এবং প্রতিদিনই বাইরে ভোর হয়।


নদীতে নতুন চর জেগেছিলো সেবছর। মানিকের পাল্লায় পড়ে সেও চর দখলে গিয়েছিলো। এই চরের মারা পড়েছে দুইজন। সবচে বড় লাঠিয়াল হাসমত। আর তার সাগরেদ মানিক।

লাঠির আঘাতে তার ডান পা থেতলে গিয়েছিলো। ওরা হাসমত আর মানিকের লাশের সাথে তাকেও উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো। হাসমতের লাশের কী হলো সে জানে না। মানিকের লাশ যখন টুকরো টুকরো করে কেটে ভুষি আর খড়ের সাথে গরুকে খাইয়ে দিলো তখনও সে নির্বিকার, কেবল একটু বমি বমি ভাব হয়েছিলো। যখন সাড়ে তিনদিন পর ওরা তার কাছে এসে বললো, অ মিয়া! এমুন ভাঙা পাডি দিয়া তুমার কাম কী? এইডা হইলো বুঝা... বলেই ভুজালির কোপে হাঁটুর উপর থেকে তার থেতলানো ফোলা ডান পাটা কেটে ফেললো তখনও তেমন ব্যথা পেলো না। ওই পায়ে কোনো চেতনা ছিলো না। মনে হলো শরীর ভারমুক্ত হলো। তার অবাক লাগলো। কিন্তু যখন তার পাটা তার সামনেই টুকরো টুকরো করে কেটে ভুষি আর খড়ের সাথে গরুকে খাইয়ে দিলো তার বমি হলো, এবং সে বমি করতে করতে অজ্ঞান হয়ে গেলো। তার জ্ঞান ফিরলো তার ঘরের বিছানায়। তার মুখের ওপর জরিনার নিলির্প্ত মুখ। জরিনা তাকে কিছু বলে নি। পরে শুনেছিলো তার অজ্ঞানদেহ চরে পড়েছিলো। লালু তাকে প্রথম আবিস্কার করে। এবং চরে জানাজানি হয়। সেবছর এইচরের লোকজন নতুনচর দখল করতে পারে নি।


জরিনার হাসির শব্দ শুনে সে। ভাবে, মাগী কি রফিক্যার লগে হাসে, হের লগে কী চলতাছে? ভাবে, মাগীডা খায় কী, দিন দিন এমুন সোন্দর হয় কেমতে? তার সবকিছু অসহ্য লাগে সে মাথার উপর বালিশ চেপে ধরে বিছানায় গড়াগড়ি খায়।

দিন পাল্টে গেছে। এখন সেই প্রেম আর নেই। অভাব আর পঙ্গুত্ব সব কেড়ে নিয়েছে তার জীবন থেকে। এই দুইতিনবছরে জরিনা তার বিছানায় দুইয়েকবারও আসে নি। সে এখন শাশুড়ির ঘরে থাকে। শাশুড়ির মরার পর থেকেই জরিনা ওইঘরে থাকে ছেলেটাকে নিয়ে। এখন একা থাকে। ছেলেটার যখন চারবছর বয়স তখন তাকে রফিকের হাফেজখানায় রেখে আসে। ওখানে আরো ছেলেরা থাকে খোঁপখোঁপ ঘরে। জরিনা দুইদিন পরপর গিয়ে দেখে আসে।

তার শরীর দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে। আরেকটা পাও নীল হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। এখন শুধু খিটিমিটি লাগে। সে কারণে অকারণে জরিনাকে ডাক দিয়ে অশ্রাব্যভাষায় গালিগালাজ করে। জরিনা চুপ করে শোনে।


দরজায় ঠক ঠক শব্দ হয়। দরজা ভেজানো তারপরও শব্দ। সে কথা বলে না। অসহায় চোখে দরজার দিকে তাকায়। সে বাতাসকে মনে মনে বাপান্ত করে। তারপর তার মনে পড়ে লালুর কথা। ভাবে, লালু নাতো! এ কুকুরটা তার কাছে মাঝে মাঝে আসে, মানুষের মতো তার সাথে কথা বলে, প্রথমে সে অবাক হয়ে ভাবতো, কুত্তা কেমতে কথা কয়? তারপর মনে হলো, সবডি আল্লার খেল...। যখন থেকে সে ঘরে একা একা থাকেÑ একদিন লালু এলো। কুকুরটাকে দেখে তার ভালো লাগে এটা বলতে গেলে তার প্রাণ রক্ষা করেছিলো। সে ভাবে, আল্লার অছিলা। দরজা ঠেলে লালু ঢুকে ঘরে, মিয়াভাইয়ের শইলডা কেমুন?
ভালা নারে! তুই খাইছোস কিছু?
আমারে নিয়া ভাবতে অইবো না। আমার খাওনের অভাব নাই।
আইজগা কী খবর লইয়া আইলি?
মিয়াভাই চরে লাখে লাখে পিঁপড়া ঢুকতাছে। এইডা ভালা লক্ষণ না।
হ। আমি কদিন ধইরা খারাপ খোয়াব দেখতাছি।
তুমার শইলতো শুকাইয়া যাইতাছে শুটকি মাছের লাহান।
হ।

তার কান্না পায়। সে গোঁ গোঁ করে কাঁদে আর বিছানায় গড়াগড়ি করে। লালু দরজা ঠেলে বের হয়ে যায়।


ভরদুপুর। জরিনা ভাবে, রফিকভাইজান না থাইকলে যে কী অইতো? সে একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে। সে ভাবে, সারাজীবন মানুষডা আর বিয়াও করলো না। আমার লগে বিয়া হইলে তো... সে আর ভাবতে পারে না, একটু লজ্জাও পায়।

সারাদিন কিভাবে কেটে যায় জরিনা বুঝতেও পারে না। সারাদিন কাজ করতে হয় এ বাড়িতে। অনেক বড় বাড়ি। নদী পার হয়ে প্রতিদিন এই বাড়িতে আসে সে। স্বামী পঙ্গু হওয়ার পর থেকেই সে বাড়ি বাড়ি কাজ করে। এবাড়িতে কাজ করছে তাও আটনয়মাস হয়ে গেছে। করিমের বয়স সাড়ে চারবছর। আপাতত করিমকে হাফেজখানায় দিয়ে দিয়েছে। অইখানে সে থাকে। কোনো টাকা পয়সা দেয়া লাগে না, হাফেজখানাটা রফিক চালায়। সে জরিনার দূর স¤পর্কের ভাই। বছরদেড়েক হলো সে এই চরে এসেছে। জরিনার স্বপ্ন ছেলেকে ভালো স্কুলে পড়াবে, শহরে পাঠাবে। সে ভাবে, করিমের বাপের পাডা ভালা থাইকলে তার আর চিন্তা থাইকতো না। এইসব কথা মনে হতেই তার চোখ ফেটে পানি আসে। সে আঁচল চোখে চেপে ধরে।

এই বাড়িতে জরিনা সারাদিন গরুর জন্যে খড়বিচালি কুটে, ভুষি মাখায়। গোয়াল ঘরে এগারোটা গরু। দুইটা গরু গাভীন। সে কাজ করতে করতে হঠাৎ তার গোয়াল ঘরের একটা কড়ি কাঠের দিকে চোখ যায়। একটা পেরেকে ঘুনষির সাথে ঝুলতে থাকা একটা মাদুলির দেখতে পায়। খুব পরিচিত লাগে। সে হাতে নেয়। সে চিনতে পারে চর দখলের ঘটনার আগেও এটা স্বামীর কোমরে বাঁধা ছিলো। হঠাৎ করে তার কী যেনো হয়ে যায়, সে কাঁদে না, চোখ দিয়ে তার আগুন বের হতে চায়। সে গাভীন দুইটা গরুকে পাশ থেকে একটা চেলাকাঠ তুলে নিয়ে নিঃশব্দে পেঠাতে থাকে। সে যেনো বোবা হয়ে যায়। বাতাস ভেসে বেড়ায় কেবল হাম্বা হাম্বা চিৎকার।


তার ঘুম ভেঙে গেলো। সে ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসতে গেলো পারলো না। তার শীর্ণকায় পঙ্গু শরীর দোলে উঠলো। একপাশ ভিজে গেলো। চৌকিটা কাত হয়ে ডুবে যেতে গিয়েও আবার ভেসে উঠলো। শেষবার যখন চৌকিটার একপাশ ভাঙলো তখন জরিনা দুইপাশে দুইটা বাঁশ বেঁধে দিয়েছিলো বলে আজ রক্ষা। একটা ঢোরাসাপ তার কাটা পায়ের কাছে কুণ্ডলি পাকিয়ে চুপিচাপ শুয়ে থাকে। সে শক্ত হাতে চালটা আঁকড়ে ধরে থাকে। কিন্তু সহসা প্রচণ্ড দমকা বাতাস এসে চালটা উড়িয়ে নিয়ে যায়। সে আকাশের দিকে দিকে তাকিয়ে থাকে, সে ভাসতে থাকে জলস্রোতে। সে ভাবে, এমুন ঢল বাপজানের দাদার আমলেও হয় নাই। তয় হুজুরে কইছিলো নুহনবীর আমলে চল্লিশদিন ঢল অইছিলো দুনিয়ায়। সে তার চৌকিটাকে নুহের নৌকা মনে করে স্বস্তি পায়। কিন্তু তার সেই দুঃস্বপ্নের কথা মনে পড়ে যায়...


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29227195 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29227195 2010-08-21 21:00:16
আমি অশরীরী সবকিছু জেনে ড্রয়ারে লুকিয়ে রেখেছি খাম
রাত বারোটা উনচল্লিশ
জীবন্ত বলতে এইঘরে আমি আর সিলিংফ্যান চক্রমন
ছয়তলার গ্রিলে তেলাপোকা গন্ধ রেখে উড়ে গেছে
কাল তার গায়ে কদমফুল গন্ধ ছিলো আশ্চর্য
আমি ক্ষুধার মুখে হাতের আঙুল রেখে পাশ ফিরি
লোকালয় আছে নিঝুম হরিহর পাতাল

তার বাবুটা অদ্ভুত উজ্জ্বল
চোখের ভিতর লুকিয়ে রেখেছে কচুপাতার বনাঞ্চল
এই রাতে শ্রাবণ শেষ হয়ে যেতেও পারে
আমার বিছানারা চাদর এলোমেলো হয়ে আছে বহুদিন
আমি ঘষে ঘষে তুলে ফেলেছি চাদরের নকশা

রাত বারোটা উনপঞ্চাশ
জানলার কাচে কেউ ধাক্কা দিচ্ছে
আমি অশরীরী সবকিছু জেনে ড্রয়ারে লুকিয়ে রেখেছি খাম
তার বাবুটার বয়স সাড়েতিন
পাতাপরীর রূপ
সে আমাকে চেনে না অথবা আমি তাকে
একটা পুতুল দোকানের শোকেসে কাঁদে নাকিকান্না
এই স্মৃতিরও বয়স হলো
নখ আর চুল বাড়ে প্রতি বিষুদবারে
মনে মনে কচুপাতার বনে বাদলযাপন
এই চিলেকোঠার গ্রিলে ক্ষয়রোগ
অনতিদূরে মসজিদের মিনারে আটকে গেছে রাতের কপাট
এখনো রাত বারোটা উনষাট

রাত ১:০০
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29216689 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29216689 2010-08-07 01:07:22
পাহাড়েই আটকে গেছে সবুজ তৃষ্ণাসকল চক্ষে আমার তৃষ্ণা, ওগো তৃষ্ণা আমার বক্ষ জুড়ে -- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
০৫০৮১০

পাহাড়ে গিয়েছিলাম
একটি সঙ্গীত ছিঁড়ে নেমে পড়েছিলো তাল
যন্ত্রণার খানিক পরে ফেরা
আমার সবুজ পায়ের পাতা উদ্ভিদ হবে না
এই জেনে দিনশেষে চিৎকার করেছিলাম
প্রার্থনার ধ্বংসাবশেষে দীর্ঘশ্বাস আমাকে চেনে
কেনো পরিচয়
কী বহন করে হারিয়ে যায় পাড়ার শৈত্যপ্রহর
বুড়ির ইচ্ছাপাখির শোক
ত্বকে ত্বকে নড়ে উঠে রেখাধীর উপকূল
একবার সুচিত্রা সেনকে দেখে ভুলতে পারি না
পাহাড়ে যাই

ভাঁজ করা লণ্ঠনে পাশফেরা ঢং
বাতি জ্বালালেই ক্ষয়
কখনো নায়ক হতে ইচ্ছে হলে জ্বালাই
হলুদ আলোর বিপরীতে দেয়ালে ছায়াছবি
আমি যাই

বাসের টিকিটে গন্তব্য লেখা ধুলো হয়ে যায়
সম্পর্কের জাল ঘন হয়ে ছিন্ন হলে ধুলো উড়াই
পাহাড়ে গিয়েছিলাম
পাহাড়ে বন নেই বনের চিহ্ন আছে
খুঁজেছি আঙুর লতা বনের দুপাশে

শৌচাগারে কাঠের চৌবাচ্চায় খুঁজেছি পুকুর
সে এক রাত্রি ছিলো দূরাগত রাতের দেহ
গভীর দুপুরে রোদমাখা পানিতে সাঁতার
যাত্রাপালার রাখাইন বালিকা হাতে বাঁধে রাখি
মনে মনে ছিন্ন করি

পাহাড়ে গিয়েছিলাম
পাহাড়েই আটকে গেছে সবুজ তৃষ্ণাসকল

------------------------------------------------
রাত ১১:৫৩]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29215938 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29215938 2010-08-05 23:53:22
ধরাশায়ী হবে বলে রাতখেকো জোছনায় সে আসে

২৮০৭১০

ধরাশায়ী হবে বলে রাতখেকো জোছনায় সে আসে
বুকে হাত বেঁধে দাঁড়ায় আপাদগ্রীবা আশঙ্ক
মাছিদের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া পতঙ্গ জেনেছে তাকে
কবন্ধের স্মৃতি প্রতারক খিলানে ভুল নক্শার খাঁজ
কেউ জেনেছিলো কিছু তার নামধাম লোকাচার

কড়িকাঠে আরোহী ভূমিতল
বাসগুলি জানলার কাচে মেঘদলসহ শহর ছেড়ে গেছে
শাহরিক কলতলায় দৃশ্যমতি হলো না পূর্ণিমার কলুষ
এ শহর তোমাদের জ্বর
ছয়তলা ছাতের ঘরে কবন্ধ চিত্রকর
ধরাশায়ী হবে বলে রাতখেকো জোছনায় সে আসে
বুকে হাত বেঁধে দাঁড়ায় খেলা খেলা বইপাঠে ঋষি
কবন্ধের স্মৃতি দেয়ালের পলেস্তরায় খসে কেঁচো

বাসগুলি জানলার কাচে মেঘদলসহ শহর ছেড়ে গেছে

রাত ১টা ১৮]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29209106 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29209106 2010-07-28 01:20:05
তুমি কিছু জানতে না রূপজীবার গোপনগোলাপ
তুমি কেবল একটি ফুল ছাতের টবে হাপুস বর্ষায়
আমি তোমার মুখে সাবলিল ঠেসে ধরি জান্তব নগর
তোমার পাঁচটি পাপড়ি এলোমেলো করি
ওই যে ভিনদেশী পতাকা উড়ে কালো কালো
ওই যে ইজিপশিয়ান পারফিউম গোপন বাকশে

রূপজীবার লাশ পড়ে থাকে শীতল মর্গে
মার্গীয় সঙ্গীত বেজে উঠে পশ্চিমের চাতালে
আমি কেটে ফেলি তোমার আজানুলম্বিত চুলের নল
আহা নলবন আহা কাশকাশ ঢেউ
রূপজীবার পায়ের আঁচিলে অচেনা বন্দর সংবিধিবদ্ধ
অদ্য মৃত শরীরে দুইফালি আঁচড় আমাকে চেনে না
আমি কমলাকান্তের মধুকর মদ্য চিনে ভাসাই খোল
তরবারি কাটে প্রাচীন নক্ষত্রের পঞ্চঝিলিক
তুমি কেবলই পাঁচপাপড়ির কোমল মৃত্তিকাসুধা
তুমি মৃত্যু নও
মৃত্যু মৃত্যু ভান করে ছড়াও ত্রাস

ওই ভিনদেশী শকুনের জিবে ঝিনুকের ফাঁদ
তার গ্রীবার নিষ্পালক মন্দ্রে গূঢ় শব্দের কাঁপন
এই শব্দাবলি ইথারের ভাষা
তুমি জানো আবেষ্টনে কিছু ক্ষয় হবে না রাত্রিঘাত
বেজে যাবে অনামী ওঙ্কার

তুমি কিছু জানতে না রূপজীবার গোপনগোলাপ

--------------------------------------------------------
সন্ধ্যা ৬:২৮ ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29206513 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29206513 2010-07-24 18:32:01
অণুগল্প: রাস্তার ঘাম বাবু কহিলেন, বুঝেছো উপেন, এ রাস্তা লইবো কিনে।
কিন্তু বাবু এই রাস্তা তো আমার না।
তোর না তো কী হয়েছে! এ রাস্তা তোর বাপের।
শ্রীযুক্ত বাবুর কথা শুনে তারপর উপেনের মতিভ্রম কেটে যায়। রাস্তাটা দুহাতে বুকের সাথে ধরতে চেয়ে সে শুয়ে থাকে। রাস্তা সমতল বলে সে দুহাতে চেপে ধরতে পারে না। পিচে নখ ফুটিয়ে রাখতে চায়। এইভাবে থাকে সে, এইভাবে থাকে।
শ্রীযুক্ত বাবু ভাবলেন ব্যাটা তো নচ্ছার। এইটার উপর গাড়ি চালিয়ে দিই। কিন্তু মুহূর্তে সিদ্ধান্ত পাল্টে ফেলেন। ভাবেন, এই রাস্তায় যে একদিন মাষকলাই ক্ষেত ছিলো আর তা যে উপেনের পিতামহের অধিকারে ছিলো তা আজ এই ভরা দুপুরের রোদের ভিতর উপেন বুঝে গেছে। ফলত উপেন পিতৃপুরুষের ভূমি ছেড়ে আর যাবে না।
শ্রীযুক্ত বাবু উপেনের কানে কানে বলিলেন, উপু! তুই এই জমির দখল নে। এই জমি তোর...
উপেন গোঁ গোঁ করে কাঁদে। তার কান্নায় মরীচিকা নদী হয়।


উপেনের ভিটেবাড়ি নতুন। শ্রীযুক্ত বাবু ওখানে মাষকলাই চাষ করেন মনে মনে। তার চিবুকে ঘাম চোখে তৃপ্তি।


আহা!
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29204883 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29204883 2010-07-22 01:02:55
মুক্তগদ্য: যে বৃষ্টির ভিতর তুমি, সে অথবা তারা এবং আমি প্রতিদিনই হারিয়ে যাই এই বলে তুমি হারিয়ে গেলে শাদা বৃষ্টির ভিতর। তোমার চোখে রাগ আর চোখের ভিতরে আরক্ত অভিমান। তারপর বৃষ্টি শেষে আমি পথের মাঝে পড়েছিলাম বৃষ্টিদগ্ধ লেবুপাতা। আমার স্মৃতিতে ছিলো ঝড়ের স্পর্শ, বৃষ্টির আগে যে ঝড় এসে রাঙিয়ে দিয়েছিলো ধূলির অরণ্য। তুমিও ছিলে না, আমি একাই পান করেছি অ›ধকার দিবসের সকাতর কুয়াশা। বুকের একপাশে ঝড়-বিজলি আর বৃষ্টি ছিলো। আর পাশে যে তুমি ছিলে তা বলতে পারি না। শূন্যতার অন্যনাম যদি তুমি, তবে ছিলে।

বৃষ্টির আঘাতে বকুলেরা যেদিন কেঁদেছিলো তোমাদের দালানগুলির সামনের রাস্তায়Ñ সেদিন আমিও ছিলাম। তাদের কান্নার আনন্দে আমি কাঁদতে পারি নি ঠিকইÑ আমি তাদের কান্না হয়েই ছিলাম। আর চারতলার জানলার শার্সিতে চোখ রেখে তুমি বাষ্পখাতা। দেয়ালের ওধারে মাঠ ছিলো একফালি। আনন্দ ছিলো ওখানে শূন্যতার সহোদর ভাই। শ্যামল রঙের ছায়া এক ঘিরে থাকে মাঠের পাঁজর। মাঠ ভাবে বিকেল এনে দেবে অবিশ্রান্ত বৃষ্টির স›ধ্যা। দুইশোকোটি পাতা ঝড়ের মুখে। ওরা উড়ে যায় মিছিলের মতো। তারপরও প্রান্তরটিকে ছুঁয়ে যায় না। প্রান্তরের চোখ তখন মাছের চোখ। আর বুকের অতলে উথল জল ছিলো দ্বিধায় পাথর। কম্পমান শিশিরেরা নিমেষের ঘোরকে হত্যা করে একটা প্রান্ত খুঁজে। একটি অধর কাঁপে; তারপর কাঁপে ওষ্ঠাধর। একটি হাত ছিলোÑ ঢেকেছিলো চোখ। এখন হাতখানি একটি গাছের সবচে’ কনিষ্ঠ ডাল।

অতঃপর উ™£ান্ত কালের পক্ষাঘাতে পাঁজর ভাঙে মাঠের শরীর। আমি যদি মাঠ হইÑ তুমি আনন্দিত, আনন্দিত সেও। শুধু একজন আমার জন্যে নিরানন্দের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাদল হবে। তাকে চিনি না, চিনবো না একদিনও।

ধূপের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন জায়গাটি। শটটি নেয়া হবে এমন ভাবে দেখে মনে হবে ধূপের গ›ধ নাকে এসে লাগছে। মিনিটখানেক ক্যামেরার চোখ হেঁটে যাবে ধোঁয়াধূসর পথে। তারপর একফালি ভূমি। কংক্রিটের। তারপর ইঞ্চিদুই জলের পরত। সেই জলে বিস্রস্ত রাশি রাশি বৃষ্টিবকুল। ক্যামেরার চোখ ধীরে উড়ে থামলো দুইজোড়া নগ্নপায়ে। ওরা দুইজন একটি ছাদের রেলিঙে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো। মেয়েটির কণ্ঠে গান, মেয়েটি তখন গীতবিতান। গানটি দিগন্ত ছুঁয়ে পুনর্বার ফিরছিলো ওই ঝুমবৃষ্টির ইঁদারায়। ছেলেটি তাকিয়ে আছে মেয়েটির বিপরীতে যেখানে দিগন্তে পাহাড়ের সারি ধূসরনীল সমুদ্রের রেখা হয়ে কাঁপছে বৃষ্টির ভিতর। মেয়েটি কণ্ঠে গান ধরেই তাকায় আকাশে। বৃষ্টির ফোঁটা নামে তার চোখের ভিতর। তার চোখে একটি ক্লোজ শট। ক্যামেরার চোখ আকাশের দিকে; ফলত বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা স্পষ্ট। ক্রমে থামে গান। তারপর ধূপের আঁধার ঝড়ের মুখে।
সর্বসাকুল্যে তিনচার মিনিটের বিস্তার। এইভাবে একটি চিত্রনাট্যের খসড়া তার কাছে মোটামুটি বর্ণনা করে সমস্যাটি বললাম, মেয়েটির চোখে ততোখানি শূন্যতা থাকতে হবে-- ঠিক যতোটা শূন্যতা গানটির একটি মাত্র লাইনে আছে। ফরিদ মজুমদার ক্যামেরা নিয়ে এসেছে; ঝুমবৃষ্টি নামলে আজই শট নিতে চাই। সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে অদ্ভুত নিষ্পলক। প্রাণের গভীর থেকে তাকে বললাম, আমার সাথে তবে কেনো তুমি বৃষ্টিতে ভিজবে না, গীতবিতান?
প্রত্যুত্তরে সে কী বলেছিলো আমার সত্যিই মনে নেই। ক্ষমা করো প্রার্থনা. ক্ষমা করো...
গুড়িবৃষ্টির তলে ফরিদের সাথে দেখা হলে শুধু বললাম, নতুন চিত্রনাট্য ভাবছি। তুই রেডি থাকিস।

আমার হাতের অঞ্জলিভর্তি বকুলের মালা, তাকে দেখালাম। তার প্রশ্নবোধক চোখ কী ছিলো বুঝি নি। বললাম, মালাটা তোমাকে দেবো না, গ›ধটা তোমাকে দিলাম, নাও।
সে আমার অঞ্জলিতে মুখ ডুবিয়ে বকুলের সমস্ত গ›ধ নিয়ে নিলো। আর আমি যে কেঁপে কেঁপে নিঃস্ব হলামÑ তা একটুও টের পেলো না। সেদিন বৃষ্টি হচ্ছিলো। তাকে ডেকে শুধালাম, বৃষ্টিতে ভিজবে না?
অভিমান বললো, না।
কেনো?
যার সাথে ভিজবো সে যে নেই।
আমি তাকে বলেছি কিনা মনে নেই, মানুষ জন্মাবধি নিজের সাথেই বসবাস করে। বৃষ্টিতে আমার মতন একা একাই ভিজতে হয় ইত্যাদি। তার চোখে সেদিনও তৃষ্ণা ছিলো। আজও আছে। আর তৃষ্ণার রঙ আমি বুঝতে পারি নি। তার মানে আমি ছবি আঁকতে পারি না জলের।

আজকে আমরা যাই নি ওখানেÑ অন্তত আমি। আমার খরায় নেমেছিলো চাঁদের কাজল। তৃষ্ণা ছিলো আষাঢ়ের তীব্র রোদের দিন। আমি আর সে বসেছিলাম পাশাপাশি। তার বিমূর্ত দুটি হাত আবেষ্টন করে রেখেছিলো আমার আবিষ্ট ডানহাত। আর বামহাতে বাতাসের সিঞ্চনÑ কব›ধ সৌন্দর্যের শূন্যতা। একজন এগিয়ে আসছিলো আমাকে লক্ষ্য করে। প্রকৃত অর্থে আমি হয়তো লক্ষ্য নই। ঝুপড়ির অদূরে একটি পাথরে বসেছিলাম। তাই আমার এই বিভ্রম নিজের ভালোলাগার জন্যে ছাড়া নয়। তার নাম জানতাম বৃষ্টি। সে আসতে আসতে হাসলো। বললো, কেমন আছেন?
আপনি কি আমার সাথে কথা বলবেন?
এইতো বললাম।
আপনি সময় করে নামতে পারেন না, বৃষ্টি? এই যে রোদে পুড়ে যাচ্ছি।
সে হাসলো।
পারলে তো নামতাম...
এইবার চুপিচাপ। তারপর বললাম, এই যে আমরা দুজন বসে আছিÑ আমরা কিন্তু বৃষ্টিতে ভিজি না, নিরন্তর পুড়ে যাই।
সে আমার পাশে কাউকেই বসা দেখতে পেলো না। খানিক অবাক হলো। আমার কথার ভুল অর্থ করলো বুঝতে পারলাম। খানিক অস্বস্তি নিয়ে দাঁড়ালো কয়েক সেকেন্ড। সে চলে যাওয়ার জন্যে পা বাড়ানোর আগেই বললাম, ঠিক আছে, যান।

একটা পাহাড় পেরিয়ে আমার কণ্ঠস্বর যখন আমার কাছেই ফিরে এলোÑ তখনো বুঝতে পারি নি পাহাড়ের ওপারে কোন দেয়াল। চমকে উঠলাম অবিশ্রান্ত বৃষ্টিপাতে। যেদিন উড়ে গেলো একঝাঁক রাঙা হরিণÑ তাদের চোখে কেবলি মায়া ছিলো ছায়াময়, কাজলপুকুর। কল্পনা ছিলো দুইটি ডানাÑ দিয়েছিলো বকুলবনের একজন নিঝুম প্রজাপতি। আমার নিজের কণ্ঠ বৃষ্টির মধ্যেÑ প্রজাপতির গুনগুন গানেÑ হরিণের কান্নায়। না, ওধারে দেয়াল ছিলো না বালিয়াড়ি প্রাচুর্য নিয়ে। অলৌকিক বিকাশের পথ ধরে নতুন অসহায় ফুল ঝরে পড়ার শঙ্কায় কাতর হওয়ার আগেই শোভা পেয়েছিলো সেইদিন পৃথিবীর একজন চুলবতীর গাভীন খোঁপায়। সেই আনন্দে ফুল হয়েছে উত্তরোত্তর ফুল। আমার ওঙ্কার কেনো ফিরেছিলো দুইটি চোখের কূলে। দুইটি বাদামপাতায় ছিলো শ্যামলচুম্বনের সাবলিল গ›ধ। অ›ধপ্লাবন তারপরও ঘোলাটে করে দেয় আদিগন্ত পৃথিবী। কোনো দেয়াল থাকার কথাই ছিলো না। তারপরও অথৈ শ্রাবণ। তারপরও কাজলপুকুর। তারপরও বেদনায় থরথর আনন্দ। তারপরও দেয়াল এবং দেয়ালের বিভ্রম।

আমি তোমাকে বলি নি বৃষ্টি হবে। তারপরও তুমি মেঘের শাড়ি পরে নেমেছিলে শহরের ব্যস্ত এক রাস্তায়। ঝুমবৃষ্টি নামলে ধূলির নূপুরগুলি সব পলাতক, কাদাজলে। তুমি সেই কাদার আলতা পরে নেচেছিলে বৃষ্টিদগ্ধ স›ধ্যায়, আমারি মতন। তোমার হাতে ছিলো আমার দেয়া বাঁশিটি। রঙ তার কালো। আমার খুব প্রিয় ছিলো ওটা। তোমার দিদির হাতে বাঁশিটি দিয়ে বলেছিলাম, অনিন্দ্যকে বলো এই বাঁশিতে ভরে দিয়েছি আমার দীর্ঘশ্বাস। মৃন্ময়ী বললো, ও ছোটোমানুষ, বুঝবে না তোমার এইসব কথা।
না বুঝলেও ওর মনে তো থাকবে! একদিন বুঝবে।
দিনের শেষে তুমি বৃষ্টির ভিতর ডুবে কেঁদেছিলে। তোমার কান্নার জলে আমি জন্মাবধি নির্ঝর, তা তো জানতে পারো নি কিছুই; কেবলি ছেড়ে গেছো। পুনর্বার ছেড়ে যাও। তারপরও আমার বাঁশিতেই বাজবে তোমার কণ্ঠের সুর।

শাটলট্রেনের জানলার ধারে বসেছিলাম। একজন আমার বামপাশে। ঝুমবৃষ্টিটা নামলে আমি শাটার নামাই নি। আমি ভিজে গেলাম দৃশ্যত। মূলত বৃষ্টিতে আমি নিরন্তর পুড়ে যাই।
সে বললো, তুমি আমাকে ভিজিয়ে দিলে?
বললাম, তাতে কী! আমি তো কেবল তোমার ডানপাশটাই ভেজাতে পেরেছি।

শ্রাবণকে সাথে নিয়ে তুই অবশেষে একা হয়ে গেলি। আর একজন তোর সিঁথিতে আগুন দেখে বিস্ফারিত চোখে নিভিয়েছে বৃষ্টি। তোর চোখেও সমুদ্র নিভে গেছে। এখন লবণের মাঠে খরা। জমেছে বিষাদের সুতীব্র ভাঙন। তুই আনন্দিত। সেদিনও সে তোর নামে অনুযোগ করেছে একটা সবুজ প্রজাপতির কাছে; বলেছে, দ্যাখো, দ্যাখো, গায়ত্রীটা কতো বড় হয়ে গেছে!
গায়ত্রী! তুইও ছেড়ে গেলি সকলের মতো। তারপরও সে ঝরছে অবিরত।

বৃষ্টি জারুলবনে নেমে দাঁড়িয়েছে ঘাসে ঘাসে। বাতাসে ভাসে তার পায়ের পাতা। দুটি পা তার রোদের শরীর হলে তার নাম মেঘ হয় না; হয় সোনালি আগুন। আগুনের আঁচে চোখ পুড়ে যায়; চোখপোড়া ঘ্রাণে থমকে থাকে এলোকেশী বৈশাখ। বুক পুড়ে যায়; বুকপোড়া ঘ্রাণে থমকে থাকে আষাঢ়ের আলোছায়া। তার কাঁধে ব্যাগভর্তি বিজলি। বিজলি আছে নিবিড় রামধনুর জন্যে। তার চোখে রঙের চশমা মেলেছে ফাঁদ অমর অসুখের। সেই অসুখের নামে জল কাঁপে জলের শরীরে। অতঃপর অন্যকথা লেখা হয়Ñ যার জন্যে সে আগন্তুক।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29204037 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29204037 2010-07-20 16:43:35
গান: কেউ এসে মুছে দেয় চোখের ইশারা কেউ এসে মুছে দেয় চোখের ইশারা

একটি ময়ূর ভুলে গেলে প্রিয় নাচ
একটি সজারু হারালে দেহের কাঁটা
একটি মুষিক ধানের ক্ষেতে মাটিচোর
একটি শকুন গ্রীবার পালক হারা
কেউ এসে মুছে দেয় চোখের ইশারা

একটি ঘুঘু আলো আলো ডেকে যায়
একটি সন্ধ্যা নর্তকী হয়ে আসে
একটি বালিকা ঘুমঘুম আগুনের ধারে
একটি পাতা সারারাত দেয় পাহারা
কেউ এসে মুছে দেয় চোখের ইশারা ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29203580 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29203580 2010-07-19 23:02:19
we've to make an other sky
we're going to the slaughter camp
সরাইখানা ভেবে ভুল করেছি
চানাচুরের স্বাদ জিবে নুয়ে পড়েছি নয়মাইল
আমাদের পদভারে বন্দরের হল্লা
we've got a red ship made by air
how far we've to go
ভেঙে যাবে সুরাপাত্র সমদ আঁখিঠার
পাতাবনে হারিয়ে যাবে পাতাপরী ঝিরি
ship is blooming
blooming lights
light is running
running kites
না আসলে চিল আর ঘুড়ি যমজ ভাইবোন
বোন যদি ঘুড়ি
চিল তবে ভাই
we've to make an other sky

রাত ৩টা ৫]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29201523 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29201523 2010-07-17 03:07:34
মুক্তগদ্য: বজ্রপাত থেকে যে ফুল কুসুমিত হয়, তার নাম মনে মনে ভাবি ম্যাগনোলিয়া নয় আমি কারো সামনে ছবি আঁকতে পারতাম না। ফলত ক্লাস ছেড়ে সবাই বাইরে গেলে, টিফিন আওয়ারে ছবি আঁকা ধরতাম। এতোক্ষণ হয় অন্যদের বিরক্ত করতাম, নাহয় বাইরে বাইরে ঘুরতাম। এখন কেউ না থাকলেও ছবি আঁকতে পারি না। আমি ছবি আঁকা ভুলে গেছি। তবে মনে মনে সারাক্ষণ ছবি আঁকি। শরতের শাদা শাদা মেঘের গায়ে ওয়াটার কালার। তখন আমার কাছে শুধু একটাই রঙ থাকে কোবাল্ট-ব্লু। আকাশের পাশে আরেকটা আকাশ আঁকার চেষ্টা। অবশ্য শরতের আকাশ ঠিক কোবাল্ট ব্লু নয়, অনেকটা ফ্রেঞ্চ আল্ট্রামেরিন।

০২.
প্রতিদিন কে এসে দিবসকে হত্যা করে? একটি বই দেখে আমার টেবিলকে মনে পড়ে। সেইসব বছর মনে পড়ে, যেখানে পাঠকেরা সমবেত হয়েছিলো। টারমাইট ভেঙে পড়ছে যখন তারা দেখছিলো। এবং পরবর্তী দৃষ্টিপাত যে ছেড়ে চলে গিয়েছিলো-- তা ভবিষ্যতের পিছনে গিয়েছিলো।

০৩.
দীর্ঘ দৃষ্টিপাত একটি উজ্জ্বল বলয় তৈরি করে। কারণ কেউ যদি দেখা করতে যেতে চায় রাস্তায় বসন্তকালে-- গ্রীষ্মকাল আসে শহরের সৌন্দর্যে এবং পরিশেষে ম্যাগনোলিয়া! একটি গাছে গ্রীষ্মকাল বজ্রপাত থেকে তৈরি করে এই ফুল।
ঝড় আমার সবচেয়ে প্রিয়।

০৪.
বন্দনার গান গীত হলে সন্ধ্যা আসে। শিরীষের গাছের পাতায় ঝুলে থাকে সূর্যের নিঃশ্বাস। পাতা ঘুমায় তন্দ্রার একটু পরে। আমি ভাবি একটি নৌকো, ক্ষুদ্র এবং যথেষ্ট বড়-- ভাঙে না। এইটা কী প্রকারের নৌকো জানে না মাঝিও। আমার অনেকদিন আগে একটি নৌকোয় উঠে ভেসে যাওয়ার কথা মনে পড়ে। আমি কি মৃত্যুর দিকে যাচ্ছিলাম?
আমার হাতে ছিলো একটা কাগজের প্লেন।

০৫.
জ্ঞানীরা মনে করেন বাবুইপাখি কেবল তালগাছেই বাসা বুনে। কথা ঠিক নয়। আমাদের বাড়িতে সারি সারি নারিকেল গাছে ঝুলে আছে বাবুই পাখির নীড়। একটা দুইটা পড়ে গেলে আমি ঝুলিয়ে রাখতাম আমার অন্ধকার ঘরের ভিতর। সকাল বেলা আলো আঁধারিততে বেড়ার ফাঁক গলে বাবুই আসতো না, আসতো চড়ুই।
আমার জানলাবিহীন ঘরে বাতাস আসতো ভাঙাবেড়ার ফাঁক গলে, এই বাতাসের নাম দিয়েছিলাম চড়ুই-হাওয়া।

০৬.
আমি কাজের চিরন্তনতা অনুভব করি না। একটি গাছে কোনো একজন সাহায্যের জন্যে আমাকে ডাক দেয়ে। আমি সেই ঋতুটি পর্যন্ত যাই এবং তাকে সমূলে ভেঙে ফেলি। তারপর একটি লাইন লিখে সমস্ত রাত্রি কাজ করি। আমি অন্য একটি বাতিঘরে, অন্যান্য কামরায় অনেকে প্রথম দিন ছিলো। সঠিক মুহূর্তে আমি কিছু জিনিশের কথা ভাবি। যেমন, ম্যানিলার আঁশ।

০৭.
সাঁঝবাতির রূপকথা এসে আমাকে বললো, তুই মর, মরে বৃক্ষ হ...। আমি প্রতি সন্ধ্যায় একবার করে মরে যাওয়ার কথা ভাবি। আর নিজেকে অসহায় মনে হয়। মরতে পারি না। জীবনের প্রতি লোভ আর মরতে নাপারার কষ্ট ভয়ানক যন্ত্রণা হয়ে চারপাশে ঘূর্ণি তৈরি করে। যেমন, অমিত ছেলেটা অপ্টিমিস্ট। সারাদিন রোদে রোদে ঘুরে শহরের দেয়ালে শূন্যতা এঁকে দিতে পারে, আমি তাও পারি না। অপ্টিমিস্ট শব্দের সঠিক বাঙলা কী হবে ভাবছি, মাথায় আসছে না। ইচ্ছাবাদী টাইপ কিছু হতে পারে।

০৮.
স্বাতী, অনেকদিন ধরে তোমাকে দেখতে অনেক মন চাইছে। তোমাকে মনে পড়ে, তুমি একবার দেখা দিয়ে হারিয়ে গেলে আমি ছবি আঁকা ভুলে গিয়ে হয়ে যাই অন্ধ-শামুক। আমার মুখ আর কেউ দেখে না। তুমি এলোমেলো বলেছিলে বলেই আজো এলোমেলো হয়ে থাকি রাস্তায়। কখনো যদি জানলা খোলো দেখবে আমগাছটির গায়ে সবুজাভ ছত্রাক হয়ে তাকিয়ে আছি তোমার জানলায়। তোমার জানলায় অর্থহীন রোদ আমার ভালো লাগে না। বাতাসে অষুধের গন্ধ। তুমি কি বাতাসে কিটোকোনাজল মিশিয়ে দিয়েছো? তাতে কী!
স্বাতী, আমি হলুদ হবো। বাদামি আর কালো হবো। তারপরও আমগাছের গায়ে চিহ্ন হয়ে রাতের মৃত্যু কামনা করবো।
তুমি বসে আছো যে অন্ধকারে-- আমি সেই অন্ধকার। আমি নিজেকে ভালোবাসি।

০৯.
ছোটোবেলায় মনে হতো আমাদের বাড়ি থেকে সমুদ্রের শব্দ শোনা যায়। আমরা একেকটা এলুমিনিয়ামের গ্লাস কানে চেপে ধরতাম, আর সমুদ্র ডাকতো আয় আয় আয়... তখন গ্লাসের মাধ্যমেই সমুদ্রের সাথে আমাদের টেলিযোগাযোগ।
সমুদ্রে যখন গেলাম, সৈকতে দাঁড়ালাম যখন ঢেউ এসে পায়ের তলা থেকে টেনে নিয়ে গেলো বালি-- পড়ে গেলাম। পরের বার আর পড়লাম না, এটাকে একধরনের খেলা মনে হলো। এরপর যতোবার সমুদ্রে গেছি ঢেউয়ের ফণায় লাফ দিয়েছি, একটা ঢেউ টেনে নিয়ে গেলে আরেকটা ঢেউ ঠেলে দিতো চরে। আমি সাঁতার পারি না-- তবু সমুদ্রে ভয় পেতাম না। এখন পাই কিনা জানি না। অনেকদিন সমুদ্রে যাওয়া হয় না।

১০.
ইদানীং খুব পাগল পাগল লাগে নিজেকে। হঠাৎ করে বদ্ধপাগল টাইপ কিছু হয়ে গিয়ে রাস্তায় নেমে গেলে কেউ জানতেও পারবে না। আমি কখনো কাছ থেকে জিরাফ দেখি নি। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিতে দেখেছি। আমি আর অসীম একবার জিরাফ দেখার জন্যে চিড়িয়াখানায় গিয়েছিলাম। গিয়ে জানতে পারলাম রোববারে চিড়িয়াখানা ছুটি। চিড়িয়ারা বিদেশ থেকে এসে বন্দী হয়ে আছে এই কারণে বোধহয় তাদের ছুটিও বিদেশী নিয়মে। সানডে ছুটির দিন। যাইহোক আমরা বাঁশবাগানে দুইজোড়া প্রেম দেখে ফিরে এলাম।
তারপর একদিন রাতে স্বপ্নে দেখলাম, আমি একটি জিরাফ কাঁধে নিয়ে কোথাও যাচ্ছি। জিরাফটি চোখ বন্ধ করে হাসছে। জিরাফের হাসি সুন্দর, জিরাফের গ্রীবার মতো।

১১.
স্বাতী একদিন তার কানের একটি দুল খুঁজে পাচ্ছিলো না। অনেক খোঁজাখুঁজির পর। তার এ্যাকুরিয়ামের ভিতর সোনালি একটি মাছের কানকোয় দুলটি সে আবিষ্কার করলো। সে ভাবলো মাছটিকে জিজ্ঞেস করবে কিনা। মাছটি তার দিকে তাকিয়ে বুদ বুদ ছাড়লো পানিতে। স্বাতী আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না, একটা দুল পরে অফিসে চলে গেলো।
স্বাতী, একটা দুল পরার দরকার কি? ওটা আমার কাছে দুইটাকার খামে ভরে পাঠিয়ে দাও। অনেক দিন কোনো চিঠি পাই না খামভর্তি।

১২.
অস্তিত্বই অস্তিত্বের প্রমাণ। মহাত্মা দেকার্ত যেমন বলেন, 'কজিতো আর্গু সাম'।
আমার মনে হয়, অস্তিত্ব উর্ধ্ব কিংবা নিম্নমুখী নয়, অস্তিত্ব অন্তর্মুখী-- প্রথমে আত্মা এবং পরে পরম চিদাত্মার দিকে পরিণত হয়। আর বিশ্বাস হলো ওর ত্বকজাত পরিমণ্ডল যা বোধগম্য আকারকে দৃশ্যসকাশ করে।
এইসব কথা মধ্যে যখন মাথার ভিতর ঘুরে নিজেকে আরো অসহায় লাগে। আর বজ্রপাত থেকে যে ফুল কুসুমিত হয়, তার নাম মনে মনে ভাবি ম্যাগনোলিয়া নয়।

১৩.
ম্যানিলা গাছের আঁশ থেকে ফাঁসির দড়ি তৈরি হয়। এই দড়ি শক্ত কিন্তু নরোম। গলায় দাগ পড়ে না। এটা আসে ফরাসি দেশ থেকে। কিন্তু সবখানে পাওয়া যায় না। কেবল জেলখানায় আসে। সবখানে পাওয়া গেলে ভালো হতো।
ভাবছি, এইবার বাড়ি গিয়ে একটি ম্যানিলাগাছ লাগাবো।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29198188 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29198188 2010-07-12 20:57:56
অনুবাদ: F.S. Flint এর Eau-Forte এফ.এস. ফ্লিন্ট(F.S. Flint): পুরো নাম ফ্রাঙ্ক স্টুয়ার্ট ফ্লিন্ট। জন্ম ১৯. ডিসেম্বর, ১৮৮৫. লন্ডন, ইংল্যান্ড। মৃত্যু ২৮. ফেব্রুয়ারি, ১৯৬০. একজন ইংরেজ কবি এবং অনুবাদক। তিনি একজন ইমেজিস্ট ছিলেন।
----------------------------------------------------------------------------

অনুবাদ:
ছাপচিত্র

কালো পাতাহীন গাছগুলির মাথায় বাসি ননী-চাঁদ
ঝুলছে লাশ, এবং টক করে দিচ্ছে অস্ফূট মুকুল।
দুটি বুড়ো ঘোড়া, বেঁকে গেছে হাঁটু, ঝুকিয়ে মাথা
ক্লান্ত-শ্রান্ত টেনে নিয়ে যাচ্ছে একটি পুরনো ট্রাম।
গুমোট ধোঁয়া, কটুগন্ধ কুয়াশায় ভরে গেছে আঁধার;
এবং মোড়টি ঘুরে আসছে ছয়টি বৃষ।
খোঁড়া ধূলিমলিন গরুব্যাপারি ওদের তাড়িয়ে নিচ্ছে
তাদের খুরধ্বনি মৃত্যু এবং গ্লানি অভিমুখে।

----------------------------------------------------------------------------

মূল:
Eau-Forte

On black bare trees a stale cream moon
hangs dead, and sours the unborn buds.
Two gaunt old hacks, knees bent, heads low,
tug, tired and spent, an old horse tram.
Damp smoke, rank mists fill the dark square;
and round the bend six bullocks come.
A hobbling, dirt-grimed drover guides
their clattering feet to death and shame. ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29195516 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29195516 2010-07-09 01:20:35
কে এঁকে দেয় আকুপাঙ্চার
কে এঁকে দিয়েছিলো
ঘাড়ের দুইইঞ্চি নিচে আকুপাঙ্চার
এখন আল্ট্রামেরিন উড়ে যাচ্ছে উল্কি
নিঃশ্বাসের অমরতা

কে এঁকে দেয় হেমন্ত
এলএসডি ভোর জ্বলে উঠে ছাই
শুধু চীনাবাদাম আছে ড্রয়ারে
পূর্ণ করেছে একপাশ
স্তনে তিল আর চিবুকে কাটাদাগ
কে এঁকে দেয় পুষ্পক

একটা সুই আঙুলের ফাঁকে বেকার
এচিং প্লেট ক্ষয়ে গেছে তালার ওপারে
কে এঁকে দেয় আকুপাঙ্চার
উল্কি উড়ে যাচ্ছে কারো চোখ

রাত ১টা ৩৫]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29193347 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29193347 2010-07-06 01:39:19
মুক্তগদ্য: প্রিয়তম অসুখ, গডোর জন্যে বসে থাকা এবং অন্তহীন বিকেলের গান কেউ তো জানে না কিছু, হাওয়ার ওপাশে কে আসে ভেসে; কে আসে ঝিরিঝির ঝিরিঝির...
বেকেটকে অ্যাবসার্ড বলার মানে নাই; প্রকৃত অর্থে আমরা প্রত্যেকেই গডোর জন্যে প্রতীক্ষা করি।

০২.
যেমন ধরেন, এক বিকেলে যে কোনো যেটি একটি পদ্ধতির দিকে যাবে অথবা প্রমাণের অসমতল সরঞ্জামের সঙ্গে পরিচালনা করে একটি ধারণার দিকে শব্দ, বিশেষভাবে একটিতে একটি যে জীবন্ত এবং মতাশালী, সাময়িক রচনার আকার একটি রৈখিক, লাগাতার প্রেরিত দাবীর সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু জিনিশ উপযুক্ত মনে হয়েছিলো।
এমন দীর্ঘবাক্য অনেকেই লিখেছেন। কমলকুমার মজুমদারের একবাক্যে লেখা একটা উপন্যাস আছে।

০৩.
কবি অমিত চক্রবর্তীর বিকেল বিয়ষক কবিতা পড়তে গিয়ে মনে হলো বিকেল আমার কাছে গডোর জন্যে অন্তহীন প্রতীক্ষা ক্ষমাহীন প্রার্থনা, স্বপ্নের ভিতর ইফেলটাওয়ারের আকাশছোঁয়া ক্যাফেতে বসে এক কাপ ব্ল্যাক কফির স্বাদ। বিকেল আমার কাছে অর্থহীন রুমালের পাড়ে স্মৃতির বিষণ্ন ফুটো, উঁকি দেয় শঙ্খের নানাবিদ অস্থি আর অস্থিরতা পরম, ভিনেগারে ডুবে থাকে জলপাইবিতান আর কাজুবাদাম; মালাইকার আর স্যাকরার দোকানের পাশে পাশে হেঁটে পুড়ে যাওয়া অভিমান। বিকেল একটি জিরাফের দীঘলশ্বাস উড়িয়ে নেয় লেখার সমস্ত অরপাপ। এবং বিকেল আমার কাছে ছয়টি তারের মীড়ে কেটে যাওয়া আঙুলের গতি।

বিকেল মানে ছাতের আকাশে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকে অমৃত কবি অমিত চক্রবর্তী।

০৪.
চাঁপাদিদি তার অপছন্দের মানুষদের একখানি তালিকা প্রস্তুত করেছে। তালিকায় আমি দৃশ্যমান। দিদি আমার নামের পরে লিখিছে, সে কোনো মানুষ কিনা আমার সন্দেহ আছে...। দেখলেই মন চায় গুলি করে দিতে... টিশিয়া... টিশিয়া...
দিদির সাথে কখনো মুখোমুখি বসি নি। তার খাতায় গিয়ে আমি চুপিচাপ লিখে দিয়ে এসেছি, হ! আমি কোনা মানুষ না, আমি হইলাম ভূত। ভূতুম!

০৫.
তার দুইটা কাঁথা ছিলো। আমার গায়ে দেয়ার কিছু ছিলো না বলে সে একটি কাঁথা আমাকে দিয়ে দেয়। নক্শিকাঁথা নয়, এমনিতেই শাদামাটা একটা কাঁথা। শুধু কাঁথার গায়ে রোদ রোদ একটা ব্যাপার ছিলো, এই যা।
তুই ভিলানেল খরা হলে কেউ মন্দাক্রান্তা বর্ষণ। কে আসে?

০৬.
বিকেল ঘনিয়ে আসে পাড়ার ছাদে। মেয়ে! আমি তোর দেয়া কাঁথাটা জড়িয়ে শুয়েছি। দেখছি বাহিরে বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি থেমে গেলে মেঘ উড়ে যাচ্ছে বৃষ্টিদগ্ধ আকাশের তলে। ওরা বিরামহীন। সিক্ত শীতল হাওয়া আগুন হয়ে আসে। তোর কাঁথাটা আমাকে যেনো বা দীঘল নদীর বাঁকে।
তুই যেদিন কেঁদেছিলি সেদিন মেঘ ছিলো না কোথাও। তারপরও মেঘহীন বৃষ্টিপাতে ধূলিরা রামধনু হলো। তুই জানিস না।
মুহূর্তের সুখের তলে হাহাকারে অতলান্ত যন্ত্রণা। তাও কি জানিস?
তোর কাঁথাটা জড়িয়ে শুয়েছি। মাঝে মাঝে এভাবেই হয়ে যায়, হয়ে যায়...

০৭.
বৃষ্টি নামে, রোদ উড়ে, মেঘচিল ডানা ঝাপটায় দিনে অথবা রাতে। যদিও এইখানে নগ্ন আগুন নিঃশ্বাস রাখে এক চুমুক তৃষ্ণা-- মেয়ে, তোর কাঁথার ভাঁজে আমি। মধ্যে মধ্যে কাঁথাটা বুটিদার হয়ে উঠে; কখনো ধীরে কোমল, ননীর মতো, অথবা প্লাবনরে মতো; ভাসায় না-- কেবল জড়িয়ে রাখে। তোর চিন্ময় স্তনের নিত্যতা...
মেয়ে, তোর দেয়া কাঁথাটির ভাঁজে আমি কাঁপি পৃথিবীর প্রথম পুরুষ।

০৮.
কবিতাকে কেবলি মন্ময় মনে করা কি ভুল? কবিকে হয়ে উঠতে হবে মাধ্যম, পরম ব্রহ্মার প্রতিনিধি, যিনি কবির ঠোঁট ব্যবহার করেন নিজেকে খোলার জন্যে?
দৃশ্যসকল অতিক্রম করার সাহস দেখাতে হবে কবিকে?
র্যাঁবো, তুমি আমার প্রশ্নের জবাব দিয়ে ভের্লেনের বুকে গুলি চালাও, এর আগে নয়।

০৯.
ইকারুসের ছিলো সূর্যপ্রেম। তাই ডানার মায়া তাকে আচ্ছন্ন করতে পারে না। ডানা তার কাছে কেবলই মোম এবং সূর্যের স্পর্শ পাওয়ার সিঁড়ি। কোনো একটির জন্যে একটি প্রদত্ত। এইটিতে বিশ্লেষণ করে ভাগাভাগি করে; সব কিছু তার অভিপ্রায়, প্রদর্শন করা সহজ সুরলোক।
একদিন যদি ইকারুস হতে পারি পতনের আগে সূর্যকে ছুঁয়ে দেবো ঠিক।

১০.
বিশ্বের অনেক জিনিশের নামকরণ করা হয় নি; এবং অনেক জিনিশ, এমনকি যদিও তাদের নামকরণ করা হয়েছে, কখনও বর্ণনা করা হয় নি।
এটি মুদ্রণের দিকে ভেঙেছে। এ সম্বন্ধে কথা বলে যদি আত্মহারা করা যায়, এটি তার জন্যে যোগান দেবে অথবা সংঘাত এর মর্যাদা স্থির সংকল্প করে। নিজের জন্য, আমি, এবং আমার একটি সংঘাতে আমাকে দৃঢ়ভাবে আঁকা হয়, এবং এর মধ্যে দৃঢ়ভাবে এর সম্বন্ধে কথা বলতে চাই।
আমরা পাতার বাচালতায় মুগ্ধ হয়ে ভুলে যাই বাতাসের নীরঙ আচরণ।

১১.
কারো ইতিহাস আঁকতে একটি নাম গভীর প্রয়োজন বোধ করে পরিবর্তন আনে। যদিও আমি সম্বন্ধে কেবল কথা বলছি-- একটি এর সম্বন্ধে এবং যে অন্যান্য জিনিশের মধ্যে গুরুতর রূপান্তর দেখে। এগুলি বেশীরভাগ শুদ্ধভাবে সেই রহস্যময় আকর্ষণগুলিকে শ্রেষ্ঠত্বের অধীনে আনা হয়। যেমন, জীবনানন্দের ডাক নাম মিলু। আর বিনয় মজুমদারের ছেলের নাম কেলো।

১২.
কিছুই না, আরও বেশি চূড়ান্ত আবেগে দৃষ্টিগোচর স্বাদ এবং আইন আছে। মেধা, ভালো হিশেবে স্বাদের একটি ধরন সত্যি: চিন্তাসমূহে স্বাদ হতে ঘটনার একটি খুব বিকশিত রূপ মূল্যবিচার প্রবণ হয়। এটি বিরল যে একই পদ্ধতি একটি যুক্তির মতো; যেটি একটি নিশ্চিত স্বাদকে বৃদ্ধি হতে দেয়। যেমন, বৃষ্টির স্বাদ নোনতা নয়, কিন্তু চোখের জলের লাবণ্য ঠিকই ধরা দেয় নিবিড় চুম্বনের কালে।

১৩.
প্রিয়তম অসুখ এসে শাদা করে দিয়ে যাক বিছানার মলিন চাদর। চোখে নামুক উজ্জ্বলতার দুপুর। দুপুরের হলুদ বাগানে জ্বরাক্রান্ত পেয়ারা পরে আছে সবুজপাতা; আমি তার সহচর হবো।
আমি উড়াই সুতোছেঁড়া সুখের ঘুড়ি; লাটাই আছে সুতোও আছে। শুধু সংযোগহীন তৃপ্তি। সে বুঝি আমাকে উড়ায়, নাকি আমি।
চন্দনের ঘ্রাণে রাত আরো নিঝুম আর প্রগাঢ় হলে ছায়াহীন হরিণেরা আসে। তবে তো অভিমান ভেঙে গেলো জলোচ্ছ্বাসে একাকার, বাসুকীজলের তলে দেখা হলে আবার পেয়ারার বনে শীতকাল বিবসন, বর্ষার ছায়ায় ঘনাবে গাঢ় হনন...

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29190833 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29190833 2010-07-03 01:51:13
অনুবাদ: আমেরিকান কবি H.D. এর Heat এইচ. ডি. একজন আমেরিকান কবি। জন্ম ১০. সেপ্টেম্বর ১৮৮৬ তে পেনসিলভানিয়ায়। তার পুরো নাম হিল্ডা ডুলিটল। তিনি একজন ইমেজিস্ট। ১৯১১ সনে লন্ডনে যান। তিনি বাইসেক্সুয়াল ছিলেন। ২৭, সেপ্টেম্বর , ১৯৬১ সনে সুইতজারল্যান্ডের জুরিখে মৃত্যুবরণ করেন।
-----------------------------------------------------------------------

অনুবাদ:
উত্তাপ

ঝড়, বিদীর্ণ করো এই উত্তাপ,
কেটে দীর্ণ করো এই উত্তাপ,
বিদীর্ণ করো।
এই সঘন হাওয়ার মাঝখান দিয়ে
ফল ঝরে পড়তে পারে না--
উত্তাপের মধ্যে ফল পড়তে পারে না
এটা নাশপাতির ধারগুলিকে
চেপে চেপে ভোঁতা করে
আঙুরগুলিকে পিষে ফেলে।

কেটে ফেলো এই তাপ--
মাঝ বরাবর চষে দাও
তোমার পথের দুধারে ঠেলে
সরিয়ে দাও।


মূল:
Heat

O wind, rend open the heat,
cut apart the heat,
rend it to tatters.

Fruit cannot drop
through this thick air--
fruit cannot fall into heat
that presses up and blunts
the points of pears
and rounds the grapes.

Cut the heat--
plough through it,
turning it on either side
of your path.


-------------------------------------------------------
H.D.
http://en.wikipedia.org/wiki/H.D. ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29189610 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29189610 2010-07-01 17:25:26
ভয়ানক নৈসঙ্গের ভিতর পাওয়া কাব্যগুলি-২ ভূমিকা:
এমন হয় কখনো। সেদিনো আমাকে ভয়ানক নৈসঙ্গ পেয়ে বসেছিলো। ইচ্ছে হচ্ছিলো ঘরের দেয়াল বুকে চেপে ধরি। সম্ভব হলো না। ঘোর এলো। নিজেকে পেলাম কোথাও কোনো মরুভূমির ভিতর। কবিতা লুকিয়ে ছিলো কোথাও। সহসা তাকে পেলাম। আমার প্রাণ এবং নৈসঙ্গ নিঃশব্দে তার কাছে সঁপে দিলাম।
সেদিন ছিলো ৩. মার্চ,২০১০। সকাল ১০ টা ৫৫ মিনিট থেকে রাত ১১টা ৪১ মিনিট পর্যন্ত কবিতার ভিতর। এই ১৩ ঘণ্টায় ৫০টা কবিতা এলো রক্ত এবং নৈসঙ্গ ছিঁড়ে। কিছু হলো কিনা জানি না।
কিন্তু একটা কিছু হতে না-পারার কষ্ট নিয়েই কোনো দিন চলে যাবো জানি।
-------------------------------------------------------------------------------

০১.
বাতাস একা গিট খুলে শঙ্খশাড়ির
উপকথার নেউল বিশদশরীরে দাঁড়ায়
দুপুর ভয়ানক বিভ্রম সূর্যের নৃত্যে
স্তব্ধ মৃত্যুর কুসুম উদ্গত চক্রমন
এরপর বালিঝড়ে ঝরে যায় ঝরে যায়
আঘাত আর প্রতিঘাত পরস্পর
মাঝখানে শূন্যতা
দুপুরগুলি ছাই ছাই উড়ে শঙ্খশাড়ি

০২.
একজনকে দেখা যায় ছিন্নঝুড়ি হাতে
একজন তার যকৃত ধরে আপন হাতে
এটা মন্দ নয়
এর রঙ নীলাভ কখনো দিগন্তরেখা
এটা তিতকুটে আর বিষাদ
এটা তারই ছিলো বুকের ডানপাশে
একটি নিষ্পালক খরগোশ পরিক্রমা
সূর্যাস্ত বিকেল
বাতাসের শরীরে বালিখেলা বালিকা

০৩.
চারপাশেই দূরে দেখা যায়
দিগন্তরেখা স্পষ্ট বোঝা যায়
ক্লান্তি ছিলো না
খুরধ্বনি ছিলো না কখনো
অশ্ব ছিলো ক্ষিপ্র সব ঘোড়া
তাদের কালো বসন আমারও
তাদের শাদা বসন আমারও
মাথায় র্ঝণার কারুকাজ
পথজুড়ে শেয়াল দাঁড়িয়ে

০৪.
এটা কোনো অনাথ আশ্রম নয়
পুরাতনকালেও ছিলো না
ছিলো না বিস্ময়
একটি পানশালা এখন কঙ্কাল
সরাইখানার রাত টিকটিকি সহবাস
কোমরে বাঁধা ঝড় এবং পানীয়
তার গন্তব্য দিগ্বিদিক
পায়ে লোহার জুতো ক্রমে ভারি
এটা কোনো অনাথ আশ্রম নয়

০৫.
প্রাচীন সমুদ্রের গন্ধ প্রতুলতা
তৃষ্ণাতুর বালিকণ্ঠে নামকীর্তন ক্ষয়
স্বপ্ন আছে সমুদ্রসঙ্গম
পরস্পর ভিন্ন বিভিন্ন
সে নুনসহ বয়ে যায় জলজ স্মৃতি
কেউ তার গন্ধ ধরে শুষ্ক বিস্মৃতি
কাঁটাগুল্ম হাসে কণ্টকলাবণ্য

০৬.
বালিয়াড়ি পাড়ে নারীরা বৃত্তাকার
করজোড় চক্রমন ঘনায়মান
মধ্যে উলম্ব বৃক্ষ বালি দিয়ে গড়া
একা বৃক্ষ গাছ হতে চায়
বৃরে আকার শিশ্নের আদল
গল্পশেষে চোখে ডোরাকাটা শকুন
নখ আর আচারসহ পতন
নারীরা ছিন্ন বক্ষবন্ধনী সজ্জা
তলে লুকিয়ে রাখে মায়াবী আরক
তলপেটে শিশুদের কোলাহল

০৭.
শ্বাসকে গ্রহণ করি মৃত্যুর আগে
সোনাস্পর্শে জেগে ক্ষয় করি সূর্য
সূর্যচুলে ক্ষয় হয় হরিদাভ বাদক
বীণা দেহরেখা টেনে নিকট ভোর
বালিতে কাচের সকল সম্ভব দুপুর
দুপুর তপ্ত মরীচিকার শাড়িসুর

কেউ পিতামহের হাত ধরে কেকা
খচ্চরটি তাকে নিয়ে গেছে একা

০৮.
সে আগে আগুন ধরায় বৃত্তের বাহিরে
সারারাত জ্বলে সহমরণ পতঙ্গ
সারারাত তারা জ্বলে জ্বলে উল্কা
সারারাত চাঁদ জ্বলে জ্বলে জোছনা
সারারাত শিয়ালের চোখ জ্বলে ধূর্ত
শিয়াল আর সে নির্ঘুম ত্রস্ত
বুকের হাড়ে একটি ফুটো হয়
ফুটো দিয়ে বেরিয়ে যায় সুদীর্ঘ ভয়
ভোরবেলা হাওয়া ঘুরে আগুনের ছাইয়ে
শিয়াল আর সে পরস্পর বৃত্তের বাহিরে

০৯.
নির্জনছায়ার নৃত্য দেখে ফিরে গেছি পাথরে
পাথরে পায়ের ছাপ চিহ্নের অতীত
কে কাকে বয়ে বেড়ায় রাতভর দিনভর
কণ্টকের ফুলে কান্না আছে গীতগন্ধ সন্ধ্যার পাশ
বারংবার ফেরাফেরি ভিন্ন চূড়ায়
বিস্তারিত ছিলাম জন্মাবধি

আদিম সন্ধান ফিরে যাবে উল্টোরথে

১০.
একটি হাওয়া ছিন্ন করি নিঃশ্বাসের থেকে
একটি হাওয়া জুড়ে দিই চুলের অক্ষরে
বন্দনা ক্লান্তি দিলে কৌণিক রেখা
নির্বাস এসেছে পায়ের পাতা ধরে বহুদিন
ফিরে যাওয়ার পথ জানা নেই কিছু
গন্তব্যের মান সবসময়ই শূন্য

যে আমাকে শূন্য করে রেখেছে আকাশে
আমিও শূন্যতা এঁকে রাখি

১১.
কাউকে বুঝাই না না ঘৃণারতি
বিকেলের প্রান্তে শোধ
ভাঙো জাদু দুবেলা
ভাঙো নিঃশ্বাস
দুইপ্রস্থ বালিখাতা অনুবাদ করি
ভাবি হাহাকার জেনেছি
এ তারও দীর্ঘ
হিরন্ময় অসুখ
বিকেল আসে দুপুরের কাছে
চায় যৌবন

দুপুর গলে বিকেল হয়ে যায়

১২.
মাঝখানে অনুষঙ্গ ছিলো শাদা চাঁদের খুলি
খুলিতে মদ আর বিভ্রম একাকার
রূপকথা ভেবে আঙুলের নখে দেখি বন্দরের মুখ
বালিরেখা কেঁপে যায় গুহামূলের স্মৃতি
হলুদরঙ উদ্ভিদ শীতল স্পর্শ দিলে ভাবি তৃষ্ণা

হলুদের নাম অপরূপা মেন্ডোলিন

১৩.
নিবিড় কুণ্ডলে শুয়ে থাকি
শুয়ে থাকি
দূরাগত অরণ্য মুখে ঝাপটা দেয় শীতল
শীতলতা গ্রামের নাম নেয় দুইবার
তারপর মাইল মাইল প্রস্থান
পানির বোতলে জমা হয় ঘাম
দুহাতে চিরে ফেলি বৈতাল দুপুর
আমি তখন ক্ষিপ্র সেন্টর

সূর্যে লক্ষ্যস্থির করি

১৪.
পাথরের ভাঁজে কখনো বৃষ্টির স্মৃতি
আমি আঙুলে খোদাই করি র্ঝণা
উষ্ণতা হরণ করি
ভাবি দূর বন
দূর সুর
দূর মাছ
আর প্রতারিত আষাঢ়

সে বন্দনা নিলে আমি সুর
সে ফিরিয়ে দিলে আমি তৃষ্ণাদুপুর

১৫.
নিজেকে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছি
একটা ছক এঁকে নিয়েছি পরিক্রমা
বাঘবন্দী ছক

বহুদূরে একটি গাছের অসুখ
যেতে চাই অসুখের দেশে
অসুখ এমন আছে চোখের নিচে
ছক কেটে প্রলম্বিত করি পথ
রেখা হয় শুধু পথের রেখা
দড়ির উপর হেঁটে ক্ষয় চোখের ভ্রূন

পতন নিশ্চিত জানি
বাঘবন্দী ছকের ভিতর

১৬.
দেখি আকাশ রঙহীন উড়ছে গড়ুর
দেখি মাথার অনেক উপর দুলছে
মাটি নেই
চারপাশে দিগন্ত আছে একা
মাঝখানে একজন শূন্যতার সুর
আমার ছায়া আছে সন্ধ্যার আগে
তারপরও ছায়া বানাই ছায়ার জাদুকর
তারপর শরীর বুনি চিলের উড়াল

রাত জেগে ভুলে থাকি রাত

১৭.
রাত গাঢ় হলে পরে নেয় চুল
হাত থেকে খুলে রাখে শৈশব আর ফুল
পরে নেয় দুপাটি বুটিদার নাম
পথের পাখায় কদাকার আতরের দাগ
বাড়ন্ত কেশের মূলে মৃত কম্পন
লাল হতে গিয়ে কালো
জোছনার শব পড়ে থাকে বালির মাঠে
মাঠের কিনার ধরে বহে কলেপড়া গান

গান তোর যন্ত্রণা রঙিন

১৮.
পুনশ্চ পাতা উল্টালেই বেতাল শহর
শহরে তপ্ত বাতাস
বাতাসের নাম নেই রঙ অন্ধ
ঘুমোলেই ফুরিয়ে যায় অন্ধকার
নির্বাসে ঘুম রেখে বাতাবিনেবুর বন
ডানা মেলে বাতাস কখন
শহরের উজানে কেউ একজন
মাঝখানে দোটানায় একা একাকার

জরাসন্ধ প্রকার

১৯.
সরোজিনী ছাই হয়ে আছে সুর্মাদানি
তার চোখের পাড়ে কালির তৃষ্ণা আঁকা
ভুলের উদ্যান হতে ছিঁড়ে এনে বেনি
পাশের পাথরে মৃতফুলের পাশে অলক

সরোজিনী ছায়া ছিলো কিছুকাল আগে
এখনো তার নৃত্যছল চোখে লেগে আছে

২০.
অর্ধেক নেমে গেছে শাড়ি
অর্ধেক পেঁচিয়ে রেখেছে পোড়োবাড়ি
দুপুরের কাল ভুল মনে পড়ে
ভুলের গায়ে শামুকের রূপ
দিন এসে কড়া নাড়ে বন্ধ দরজায়
দরজার ওপারে তালা
শামুক দেখে দিনের চোখ নেই
শাড়ি নিজেকে গুটিয়ে দরজায় পাহারা
কেঊ আসবে না তারা

২১.
পুষ্প পতঙ্গ হলে ভস্ম থেকে নীল
পতঙ্গ প্রজাপতি হলে পুষ্প বকুল
জড় আর অজড়ের সহবাস পরিণত
ভূত তার শরীর খুলে দাঁড়ায়
শরীরের দুইটি হাড়ে যন্ত্রণার চিহ্ন

প্রজাপতির সাথে বকুলের শীৎকার

২২.
হাওয়া আসছে হাওয়ার জমজ
কোন হাওয়া বোঝা যাচ্ছে না
আমি দিক নির্ণয় জানি না কখনো
জানলার ব্যাপার নেই
দেয়ালও নেই
দূরে অনেক দূরে শুয়ে থাকি
পাশে শুয়ে ক্লান্ত শিয়াল
আকাশে শুয়ে থাকে বৃহন্নলা চাঁদ

আমি তাকিয়ে দেখি না

২৩.
তিনি বললেন যুদ্ধের চিহ্ন আছে
আমি খুঁড়লাম চিহ্নের অতীত
অতি প্রাচীন শর ও বল্লমের হাড়
খুরের নৈরব ও মৃত্যু
দালিমের দানায় রঙের উৎসার
খেচরের ছায়াসংগঠন

তিনি বললেন প্রণয়ের চিহ্ন নেই
আমি না খুঁড়তেই পেলাম উপবন

২৪.
সে একজন একটি শকটে উপবিষ্ট
কাঠের চাকায় জরিদার পাড়
রাস্তায় বিদ্যুৎ আঁকে কাঠের চাকা
এশিরীয়রা এনে গড়িয়ে দিয়েছিলো
তার নাকছাবিতে ঝুলে সাইমুম
তার নাকছাবিতে উটের তিয়াস
তার বুকের দুইটি চিল উড্ডীন

সে প্রথমেই অস্বীকার করে আভরণ

২৫.
রাতে দূরে আগুন দেখা যায়
ছুটে গিয়ে কাছে গেলে কিছু নাই
বাতাসের ফিসফাস
কচ্ছপের প্রতিকৃত
জেব্রার পেটের নক্শা
তরমুজের বুকের অনলে গড়ায়
মদের নির্দিষ্ট কোনো রঙ নাই
চোখের নির্দিষ্ট কোনো রঙ নাই
তারপরও চোখ পান করি
দৃশ্য পান করি না

২৬.
টোটেম কথা বলে উঠে
ঘিয়ের গন্ধে ধসে পড়ে সূর্যস্বর
সূর্যের চোখ মলিন হিলিয়াম
পাথরের বনে একটি উদ্ভিদ
তিনি বেড়ে উঠেন
তার পায়ের আঙুল গাঢ় রাতুল

টোটেম হাত তোলে
তার হাতে সাতটি আঙুল

উদ্ভিদ ক্রমে উত্থিত তরঙ্গ

২৭.
আমি জ্বলতে থাকি
ধোঁয়া আর পোড়া গন্ধে ভিজে আকাশ
একটি প্রাচীন বৃক্ষ ছুটে আসে
আমাকে ভিজিয়ে দেয়
ত্বক ভিজে শুধু
বৃষ্টির খেলা সূর্য সহ্য করে না

আমার হাসি পায়

২৮.
একজোড়া শকুন উড়ে
ঘুরে ঘুরে উড়ে দুইজনে একা
নিচে মৃতদেহ স্মৃতিহত
নিজের চোখের কোটরে পুরে দিই রোদ
বের করে আনি অন্ধকার

অন্ধকার শকুনের খাদ্য হোক

২৯.
সে উনুনের পাশে বালিতে গর্ত করে চারহাত
একটা ছুরি আর দুইটা কদবেল পুতে রাখে
তারপর সারা বিকেল কাঁদে
তার কান্না একটি নিঃসঙ্গ খেচর হয়ে যায়
তাকে সঙ্গ দেয় না
উড়ে চলে যায়
মৃত ঘোড়াটি পেছনে পড়ে থাকে
বাতাসে তখনো ইকো হয়ে ভাসে হ্রেসা
মৃত বোতলটি জলশূন্য
বাতাসে তখনো জলের গন্ধ হাহাকার
সে অদূরে ছুটে গিয়ে পান করে মায়ানদী

তার ঠোঁট পুড়ে কয়লা

৩০.
ক্যাকটাস প্রকার ভেদে পাল তোলে সকণ্টক
হলুদ আর বেগুনি ফুল পড়ে থাকে
ফুলগুলি ছাই হলে জন্ম নেয় নতুন কাণ্ড
ফুলগুলি পরিণতির অপো
ক্যাকটাস উড়ে চলে
ক্যাকটাস ইথার ভিন্ন করতে পারে না
ফিরতেও পারে না

এমতাবস্থায় ঝুলে থাকে

৩১.
অবশেষে বালি অভিযোজন জানে
বালির প্রাণ নশ্বর নয়
একটি গোলাপ সহসা কাঁটাঝোপে ফোটে
গোলাপের রঙ শাদা
তিন টুকরো পাথর ক্রমশ এপিটাফ
একটি ঝড় আছে এখনো তেরোশো মাইল দূরে
একটি অন্ধকার ঝড়ের মুখে দাঁড়িয়ে এখনো

গোলাপ রঙিন হয়

৩২.
লাল লেজের বাজপাখিটি ঝাপ দেয়
মার্চের তপ্ত হাওয়ায় কীসের গন্ধ
আমি লক্ষ্যচ্যুত হয়ে যাই
আমার শ্যেনদৃষ্টিতে পরাহত সকাল
দিবসকে পরিমাপ করি
কুড়িয়ে আনি ক্যাঙগারুর নখ ও থলি

কোন দৃশ্যটিকে আমি অস্বীকার করি

৩৩.
তুমি আমাকে জানাতে চাইছো কিছু
চাইছো তোমাকে পিছমোড়া করে বাঁধি
চাইছো তোমার পায়ে পরাই শিকল
তুমি একটি বালিচর উটপাখি
তুমি কেনো আগুন দেখে ভয় পাবে
তার চেয়ে তোমার দুডানা কেটে দিই
ডানা তো তোমার ভার
তোমাকে উড়াতে পারে না
কেনো বহন করছো তাদের

৩৪.
কে বললো মরুভূমি কাঁদে দুবেলা নীল
নদীভ্রম আছে একটু দূরে দূরে
পাখিগুলি উড়ে মানে অদূরে সমুদ্র
পাখির আকার দেখে দূরত্বের পরিমাপ
হরিণের তৃষ্ণা সমুদ্র করে না বারণ
তারপর এসো আমরা তৃষ্ণা মেঠাই
কলেপড়া হরিণের রক্ত ও স্বেদ আছে

৩৫.
বৃষ্টি না পেয়ে তুমি ঈশ্বরের কাছে গেলে
হাহ্ তোমার ঝুলিতে একতাল সোনা
পাথরের ভার নিয়ে ঘুরো
তোর আনন্দ দূরত্ব মাপে
ঈশ্বর এক প্রকার সব্জির কথা বললেন
শাদা লম্বা এবং গোলাকার
তোর খুরে লেগে আছে উদ্যানের কালি

কালিকে সহসা রঙিন মনে হলো তোমার

৩৬.
ইহা স্বর্গ আর নরকের মাঝামাঝি কিছু
হতে পারে
গুনে গুনে ফুল উঠে
গুনে গুনে পাখি উড়ে দূরে
উদ্ভিদের ভিতর কষ আছে পতঙ্গভুক
কদাকার রোদের বিপরীতে তপ্তরাত
জল নেই আছে জলের ইশারা

কে তোকে এইখানে বপন করে

৩৭.
চোখের সামনে দস্যুদল ডাকাতি হয়ে যায়
উট ছেড়ে দেয় তার জমানো সমস্ত জল
জলে ছিলো না কোনো কুয়োর স্মৃতি
শুষে নিলো বালি
আমি পরপর তেরোটি পাথরকে অনুবাদ করি
ছুঁড়ে দিই আকাশে
কুকুরের ডাকে ভোর
জ্বলন্ত দিগন্তে হেঁটে হেঁটে দিবস হনন

এভাবে নাকি সূর্যকে অতিক্রম করা যায়

৩৮.
নৃত্যরত বালি তপ্ত এটা সহজবোধ্য
আমার ছিলো নৃত্যের স্মৃতি
হাওয়ার মুদ্রা মেনে নেচে যায় বালি
একবার দেখে চোখ বুজে তাকিয়ে থাকি
বুকের ভিতর অরণ্য ছুঁয়ে যায়
উষ্ণ ঝর্ণা ঠেলে খুঁজে নিই ললিত জল

আমি চোখ বুজেই থাকি

৩৯.
সূর্যাস্তের বিপরীতে কল্পনা ভাঁজ করি
দিবাস্বপ্নগুলি ভাঁজ করে রাখি
ক্যাকটাসের ঝাড়ে হাওয়া শীতলতা
ছায়াগুলি শিয়ালকণ্ঠে ডাকে
ছায়াগুলি কুকুরকণ্ঠে ডাকে
ছায়াগুলি আমার কণ্ঠে ডাকে
নিজের শরীরটাকে খুঁজি

পাই না কোথাও

৪০.
একটি উপত্যকা আছে দৃশ্যবতী
ছিলো না কোনোদিন ম্যাপলপাতায় লেখা
এটা দেখতে একটি প্রাচীন মুদ্রা
প্রাচীর মুদ্রার আকার ভেবে নিলাম
মুদ্রার গায়ে ইতিহাস জীবাশ্ম
অচেনা পুষ্পের দূরাগত গন্ধ চুম্বন
চোখের পাতা কেঁপে গেলে পেছন ফিরি
বালি খুঁড়ে বের করে আনি প্রশ্রবন
প্রশ্রবনে জলের প্রকার দুই

৪১.
বালিকে বালিকা ভেবে দূরত্ব ক্ষয়
ভয়ানক রাতে দাঁড়িয়ে থাকে রাত
পদচিহ্নের গোর খুঁজে চলে পা
পায়ের পাখায় স্বপ্নের স্রোত সমুখগামী
সে আর সে তারা দুইজন
একটা সাপ আর গিরগিটি আসে
রোদের চেয়ারে বসে থাকিয়ে থাকে
তাদের জিবেও কাঁদে তৃষ্ণা এবং লোল

জানা যায় বালিকা বিবসন সত্য

৪২.
কোথাও বড় গাছ আর বৃরো লুকিয়ে আছে
সে জানে সপ্তবর্ণ অষ্টবর্ণ ডালপালার বিস্তার
কতোটা নিচে
কতোটা বালিতে ডুব দিলে পাওয়া যায় নিঝুম গাছবন
একটি কোমল আঙুলের ছায়া
সে সাঁতরে ডুব দেয় অলিখিত অর
দুই চোখ খুলে রেখে যায় গোধূলির গ্লাসে

৪৩.
একটি নারী এখানে সূর্যকে গিলে খেতে পারে
হতে পারে ঝর্ণা ও ছায়াময় সে ভাবে

সে প্রার্থনা করে
সে হাঁটু গেড়ে প্রার্থনার ভাষা

একটি নারীর সাথে তার দেখা হয়
হাতে তার একটি নাশপাতি বক্ষলগ্ন অসুখ
এবং তার ত্বক দগ্ধ আর কদাকার

সে পুনরায় প্রার্থনায় নত হয়

৪৪.
যে সাথে থাকে সে সত্য অর্থে থাকে না
খসে পড়ে সন্ধ্যা উষ্ণ
কোনোদিন ছুটে ছুটে ঋদ্ধ কুকুর
অদূরে শায়িত চিরযাচিত উদ্যান
তিনটি হলুদ প্রজাপতি তার ব্যাপক পাখা
দুইটি মৌচাক দুলে টসটসে লাল
যারা গিয়েছিলো যারা যায় কেউ ফেরে না
সন্ধ্যার ভিতর ডাকে প্রজাপতি ফুল
মৌমাছি পাহারা দেয় মধু আর মোম

সে ধীরে ছত্রাক

৪৫.
সে তন্দ্রার ভিতর পাশ ফিরে শোয়
পাশে মৃত কুকুরটি পাশ ফিরে না
একদল লোক ঘিরে আসে কবন্ধ
প্রত্যেকের হাতে দুগ্ধপূর্ণ স্তন
তার প্রবল তৃষ্ণা জাগে
তার তৃষ্ণা ফুরিয়ে যায়
তারপর সে কবন্ধের মুখোশ বানায়
কবন্ধের দল তাকে দুগ্ধস্নানে আবিষ্ট করে
তার তন্দ্রা ছুসে গেলে দেখে কুকুর হাসছে

৪৬.
মৃত্যুচেতনার বাহিরে কিছু থাকে নাকি
পাশে নন্দন ঢেউ ভাঙে
বালিঢেউ বালুময়
তাকে কুরে কুরে খায়
যে চেতনার ভিতর ডুব দিয়ে ডুমো মাছি
যে চেতনার ভিতরে হয়ে গেছে হাতপাখা
সে নিজের কাছে কিভাবে ফিরে
একটা সুরের যন্ত্রণা তাকে পোড়ায়
ছিঁড়ে খুঁড়ে একাকার করে
সে মৃত্যুচেতনার বাহিরে দেখে চাঁদের স্খলন

৪৭.
দশহাত হেঁটে এগারো হাত পেছনে আসে
তার অতীত তাকে টেনে নিয়ে যেতে চায়
তার শিকড় তাকে ছাড়ে না
প্রতি একহাত সে হিশেব করে
দশমাইল গেলে সে দাঁড়ায়
সে মনে করার চেষ্টা করে দৌড় এবং উল্লম্ফন
সে পদাহত পাথর বুকপকেটে নেয়
তারপর ছুঁড়ে ফেলে
তার সব মনে পড়ে যায়

৪৮.
মৃত আর অমৃত একই কঙ্কালের জমজ
ছায়া ঘুরে উঠে সূর্যের নিচে
ফণিমনসার অহঙ্কার কাঁপে উত্তাপে
একটা প্রাণী আসে
ঘোঁত ঘোঁত শব্দে ডোরাকাটা করে প্রতিবেশ
সে অমৃত পান করে
কঙ্কালের গায়ে পরিয়ে দেয় ত্বকমাংস
কঙ্কাল প্রাণ পায় এবং তাকে অস্বীকার করে

৪৯.
তীরে যেতে যেতে হারিয়ে যায় পেছনের পথ
সমুদ্রের চিৎকারে উড়ে যায় মেটেরঙ কাক
কাক কার উত্তরাধিকার
বেলপাতা মনে পড়ে সবুজগন্ধের বন
একটি সুতির চাদর
তিনটি হলুদ চোখ তাকে গ্রাস করে নির্বিষ
পাথরের পাহাড়ে পঞ্চমুখ ফাটল

তাকে বলে দেয় পূর্বজন্ম

৫০.
অনেক রেখা দৃশ্য হয়ে আছে
অনেক রেখা দৃশ্যের অতীত
পরস্পর অতিক্রান্ত কোণ
তার কৌণিক আকার
বুকে হেঁটে ভাগ হয় ধরন
পরস্পর ভিন্ন পরস্পর
সমান্তরাল পা আমলকীর রূপ

অনেক রেখা শেষে দৃশ্যের অতীত


-----------------------------------------------------------
ভয়ানক নৈসঙ্গের ভিতর পাওয়া কাব্যগুলি-১
Click This Link

উৎসর্গপত্রিকা:
আমাদের সময়ের দুইজন শক্তিমান সম্ভাবনাময় কবি অমিত চক্রবর্তী এবং শিরীষ, কল্যাণীয়েষু।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29184520 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29184520 2010-06-25 02:01:08
গের্নিকার রেখায় ধসে প্রতিবন্ধী বালিকার কৌমার্য
রামধনুর ভিতর আটকে গেছে আষাঢ়ের মেঘ
আটকে গেছে সি আর বি ব্লকের উচা দুইটা দালান
সিগন্যাল টাওয়ার আর জনাকয়েক কাক
বালিকাকাব্য এখনো ফুটপাথে আতুর নাভীশ্বাস
তার স্মৃতি ক্ষতচিহ্নের
তুমি যদি রাঙাতে চাও দেহাতি হাতের শিরা
তুমি যদি মাছির পাখনায় দেখো রঙ
মাছি উড়ে আসে কোথা হতে
উৎপত্তি ঘেঁটে আঙিনার ভাঙন জেনে যাবে সে বহুদূর
পরাজিত শোকের শৈত্যে ডুবে আছে ঝড়
ঝড়ের পিঠে দারুণ সর্বনাশ
আমি তার দিকে পিঠ পেতে আছি
রামধনু আর ভাঙে না অর্ধবৃত্ত সুখ
পাঁকে পাঁকে নৃত্য গেঁথে দিলে ফুটবে না পদ্মশিশু
অনেকদূর ভেঙে যাবে গ্রামোফোন দিন
বোতলে বাষ্প রেখে জল উধাও
এখনো রাত্রি নামে শোকেসের কাচে ম্লান অন্ধকার
পিকাসোর প্রেমিকার গালে সিগারেটের পোড়া দাগ
গের্নিকার রেখায় ধসে প্রতিবন্ধী বালিকার কৌমার্য
আমি তোর দাদা নই চুলের নিভৃত অক্ষর
কে ছিলো তবে আমাকে দেখেছিলে দণ্ডকবন
হায় ডুবে গেছি মাইল মাইল সাঁতার
একটাও রেখা নেই জরাসন্ধ ভাগ
অভিন্ন ধোঁয়ার ভিতর নির্বাণে ভিন্ন
আমি কী তবে তরঙ্গের ভাঁজে ছিলাম হাঙর
দাঁতের ফলায় চিরে গেছি জলজপাহাড় গুহারূঢ় ঘোর

----------------------------------------------------------------
রাত ১০টা ২৭ ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29182968 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29182968 2010-06-22 22:29:13
একই বিষয়ে দুই কবিতা: একটি আমার মতো করে লেখা, অন্যটা তাহাদের আমার মতো করে লেখা:

০৪০৬১০-০২

পাগলটি সিনেমার পোস্টারে উদ্ভিদ
দাঁতের ফাঁকে ফাঁকে উদ্ভট সূর্যদল
চোখের কোটরে চকচকে দুপুর
সিটি কলেজের বাদামি দেয়াল
নায়কের হাতে খেলনা মেশিনগান
নায়িকার বুক উরু মাংসের দোকান

পাগলটির হাত অবরোহী নেউল
পাগলটির হাত পাগল এবং অন্ধ
পাগলটির মুঠোর ভাঁজে লাল আনন্দ


----------------------------------------------------------------------

তাহাদের মতো করে লেখা:

পাগলটারে দ্যাখলাম বাঙলা ছিনেমার পোস্টারের দিকে তাকাইয়া রইছে
বত্রিশটা দাঁত কেলাইয়া নিঃশব্দে হাসতাছে খিখিখিখিখিখিখিখিখিখি
তার জুলজুল চখের ভিত্রে খাড়া দুপুরবেলা খেলতেছে রইদের খেলা
সিটি কলেজের বাদামি দেয়ালের পিন্দনে ছিনেমার পোস্টার জ্বলজ্বলে
নায়ক আলেকের হাতে কামান সাইজের একটা খেলনা বন্দুক হাহাহাহাহা
নায়িকা ময়ুরীর রানে আর দুধে গোস্তের দোকান খান খান খান তুফান

পাগলটার হাত দেহি নিচের দিকে নামতাছে বেজির লাহান
পাগলটার হাতও দেহি পাগল আর আন্ধা হইয়া যায়
বেজিটার লগে একটা ফনা তোলা গোখরাসর্পের দেখা হয়
পাগলটা আরামছে হাত মারে আআআআআআআআআআআআআআআআ
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29181499 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29181499 2010-06-20 23:59:44
গল্প: প্রিয়তম দুঃখ

সে চোখে মুখে অনেকক্ষণ পানি দিলো; পানিটা ছিলো তখন জল। ভোরবেলা সমস্ত পানিই জল। সে বালিকাবেলার মতো মুখে জল নিয়ে সূর্যের দিকে মুখ করে কুলকুচি করলো; তার কুলকুচির জল হলো রামধনু। আর সে হলো সূর্যমুখী। বেগুনি-নীল-আকাশী-সবুজ-হলুদ-কমলা-লাল রঙে পরিণত ভোর। একটু পরেই ভোর ধরলো সকালের আধকোমল হাত (মধ্যে মধ্যে তাকে আমার সকাল নামেও ডাকতে ইচ্ছে করে)।


সকাল তাকে নিয়ে এলো একটি ধূসরগেরুয়া রঙ ইস্টিশনে; ওখানে রথের মতো ছাড়ে স্বপ্নযান, কিন্তু সে স্বপ্নযানে না উঠে ভিড় টেলে উঠে পড়ে একখানি ট্রেনে। ইহা শাটলট্রেন নামে আমাদের এবং তাহাদের কিংবা সকলের কাছে পরিগণিত। এই ট্রেন তাকে রোজ পৌছে দেয় একটি বেগুনি অরণ্যে। তারপর তার চলাচল। তারপর সে চরাচর।


সে মানে সে। সে মানে তুমি। তার কথা, তোমার কথা এইসব ভেবে রোদ নামে আকাশের রূপবতী স্বেদ। সে তোমাকে চেনে, তার রঙ তোমার দেহের রঙ। সে শরীরে ধারণ করেছে স্বর্ণচাপা। তুমি নির্বাসন, আমি নির্বাসিত; জানতে পারো নি কিছুই। তুমি অভিমান, আমি নতজানু প্রণয়Ñ এইসব প্রণয় প্রলাপ শুনতে পাও না। তুমি টগরÑ শাদাফুল। তুমি আমাকে বলেছিলে, শাদা ফুল নিজের ইচ্ছায় ফোটে। আর রঙিন ফুলসব ফোটে অন্যের ইচ্ছায়।
আচ্ছা, প্রজাপতি তোমার এতো প্রিয় কেনো? তুমি শুধালে।
প্রজাপতি আমার ভালো লাগে, হাজার হাজার হলুদ প্রজাপতি। এইসব কথা আমি তোমাকে বলেছি বেগুনি অরণ্যে। এই অরণ্য বর্ষার গ›েধ বেগুনি হয়, বৃষ্টির দংশনে সারাটি বর্ষা বেগুনি থাকে। জারুল বৃষ্টির কাছে মর্ষকাম সুন্দর।
আমি কেউ নই নিজের কাছে, আমি কেউই নই তোমার কাছে। আমার স্মৃতি আছে রোমন্থনের জন্যে; সবার আছে, আছে তোমারও।


তোমার স্মৃতি আমি জানি না, সায়ন্তনীল স›ধ্যা।
এখানে বেশ কয়েকটা পানকৌড়ি ছিলো আগে, ইদানীং দেখা যায় না।
এই কথা তুমি শাটলট্রেনের দরজায় আমার পাশে বসে বলেছিলে। তখনো আমি পানকৌড়ি চিনি না, সত্যি। তারপর একদিন চিড়িয়াখানায় পাখির খাঁচার সামনে ঘুরে ঘুরে পানকৌড়ি চিনেছি; সলিম আলির কাছে জেনেছি পানকৌড়ি পাখিটির আদি অন্ত সুন্দর। এবং পুনর্বার ভুলে গেছি। তুমি আমাকে চিনিয়ে দাও, আমি আর কখনো ভুলবো না।
তুমি আমাকে একটা লেবুপাতা দিয়েছিলো একদিন শূন্য দুপুরবেলা, মনে আছে; ওটা আমি গীতবিতানের দুইশো এগারোপৃষ্ঠায় রেখে দিয়েছি।
আমাদের আলোকবর্ষগুলি এখন পার হয়ে যায় বুকের মধ্যে। তুমি প্রতিদিন পাথরের ভূমিকায় অভিনয় করো, কিন্তু পাথর হতে পারো না। তুমি হচ্ছো সে, সে হচ্ছে তুমি, তুমি দুঃখ, প্রিয়তম দুঃখ।
আমরা আগে কেনো কথা বলি নি?
এই কথা বলে তোমার দুটি চোখ প্রশ্ন হয়ে ছিলো। আমরা পরস্পরকে চিনতাম কিন্তু কথা বলতাম না।
প্রিয়তম দুঃখ, এইসব কথা তুমি আমাকে বলেছো, আমি মনে রেখেছি। তুমি বলে ফেলেছো। ফেলেছো মানে ফেলে দিয়েছো। রেখেছি মানে আমি রেখে দিয়েছি। বুকের তোরঙ্গে রেখেছি বিনীত অরণ্য, স্মৃতিসত্য কুসুম।


তুমি মানে সে। সে সুখের সারাৎসার ঘেঁটে উঠে আসে দুর্বিনীত দুঃখ। সে কাটাপাহাড় ধরে হেঁটে আসে আমার পাশাপাশি। আমরা কথা বলি। আমাদের কথাগুলি ছড়িয়ে পড়ে বাতাসে।
ওটা নীলকান্তপাখি।
সে তাকায় এবং অস্বীকার করে। আমি তাকে একটা কল্কি বের করে দিই, হাতির দাঁতের। আমি তাকে একটা কল্কি বের করে দিই, পোড়ামাটির। ওইসব এখন ডেকোরেশনের কাজে ব্যবহৃত হয়। সে হাত পেতে নেয়।
যতœ করে রাখতে হবে। আনমনে সে বলে। এবং কল্কি দুইটি ব্যাগে রাখে। আমরা দেয়ালের উপর বসি। সে গান করে, দোলে পলাশের নোলক... ইহা শচীন কর্তা।
পলাশের নোলক দেখতে কেমন?
জানি না।
এটাই তোমার দুধশাদা জামা?
না। তোমার হাতে ভগবদ গীতা!
গীতা সবাই পড়তে পারে।
খেয়েছো?
খেতে চাই।
মান্দার গাছে যে ফুল ফোটে, রক্তের মতো, ওটা পারিজাত। মেঘদূতে লেখা আছে। স্বর্গে মান্দারের নাম পারিজাত।
আমি যা নিজে করি না, তা অন্যকে করতে বলি না।
যথারীতি বৃষ্টি হয় বনাঞ্চলে...
তোমার জন্যে আমার মায়া হয়।
মায়া মানে করুণার ভদ্র নাম, প্রেম যেমন কামের...
তোমাকে আমি করুণা করি?
আমি করুণা চাই না, আমি ছুঁতে চাই সরক্ত।
সে উঠে চলে যায়। আমি উঠে চলে যাই। সে মানে তুমি; আমি মানে আমিÑ ইদানীং সত্যের মতো সুন্দরের রূপ পরিগ্রহ করি... আর বাঁশিতে বাজে বিলম্বিত লয় বসন্ত।


স্যালাইন বানাবে?
কথাটা তুমি মন থেকেই বলো, কিন্তু নিতে পারো না, সাথে। তুমি যেহেতেু সে। আর যেজন সেÑ তার একটা পরিচিতি এবং সৌজন্যিক পরিমণ্ডল আছে ধূসর প্রতিবেশের মতো, ওখানে আমি বড় বেশি বেমানান, অযাচিত ইত্যাদি। তোমার কাছে প্রধান কথা বন্যার্তদের স্যালাইন দরকার। আর আমার কাছে প্রধান কথা তোমার সঙ্গ দরকার। কিন্তু নৈসঙ্গকে ধারণ করে ছায়ার সাথে কথা বলি জারুলের বনে। আমি পাশ কাটিয়ে চলে গেলে ডাক দিয়ে বলো, অ্যাই! চোখ নেই? দেখতে পাও না!
আমি তোমাকে দেখে আমার দৃষ্টি ফিরে পাই আর তুমি দৃষ্টি হারাও; পাশ কেটে চলে যাও অন্যকাজে। তেইশহাজার ব্যাগ স্যালাইন বানানো দরকার; দেবীদ্বারে পাঠাতে হবে, ওখানে পৃথিবী ভেসে যাচ্ছে...
তারপর এসে বসো মুখোমুখি, চা নাও। আমি আর তুমি গরম চা খেতে পারি না, আমি চায়ের কাপ সামনে রেখে তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি, তখন দুপুর। তোমাদের টি কিংবা টিফিন ব্রেক।
কী দ্যাখো?
তোমাকে। না, তোমাকে দেখি না। কী দেখি জানি না।
অস্বস্তিকর।
আমি চুপচাপ। সে আবার অরণ্যে মুভিটার কথা বলে, পুতুলটার মধ্যে ছিলো ইলমাসের প্রাণ...
তার মানে তোমার হাতে ছিলো ঘাসফুল। আমি তাকালাম তৃষ্ণার্ত। তুমি বললে, নট ফর য়্যু।
চাই না।
তার হাতে একদিন একটা গোলাপ ছিলো সূর্য। সে বললো, নেবে?
না, আমি ফুল নিই না। মনে মনে বললাম, আমার কাছে ফুল রাখার জায়গা নেই।
সে চলে গেলো। তারপর কোনো এক রাজকুমারের বিচ্ছিরি নাকের কাছে ফুলটা গ›ধহীন কুসুম। হাহাহাহাহাহাহাহাহাহাহাহাহাহাহাহ...


অন্য আরেকদিন আসে। সেইদিন পৃথিবী যেনো টগরের মতোই শাদা। সে এসে বসে সমুখে।
আমার কাছে একটা টগরফুল আছে।
কই, দেখি!
তুমি বললে, না, দেখাবো না।
তখনো আমি কোনোদিন টগর চোখে দেখি নি। জেনেছি টগর শাদারঙ ফুল, তোমার হাতের মতো শাদা।
আমি তোমার কাছে একটা চিঠি লিখেছি।

সে নিঃশব্দে হাত পাতলো।


অনেকদিন সে আসে না। অনেকদিন আমি আসি। আর তার স্পর্শ যেখানে যেখানে আছে আমি যাই, ছুঁয়ে দেখি; প্রতিটি কিছু আমাকে তার মতো করে বলে তারই কথাগুলি। আমার কানে বাজে, তোমার চিঠি পড়েছি খুব মনোযোগ দিয়ে... অথবা আমার জিনিশ কই... অথবা ছি! নিজের জিনিশ অন্যের হাতে পাঠাতে লজ্জা লাগে না!... অথবা আমি ওরকম হবো না... অথবা কাজ না করে আমি থাকতে পারি না... অথবা কাজ না করলে আমার ক্লান্তি লাগে... অথবা পরশু তোমার সাথে দেখা হয় নি... ইত্যাদি। আমি পরশুর কথা ভাবতে থাকি। আমার ঘর নেই। আমার খড়ও নেই। শুধু চঞ্চু আছে।
তোমার কাছে চাঁপাফুল?
না, আমার শরীরে তো অন্য এক গ›ধ থাকার কথা...
আমি বিমুগ্ধ বসেছিলাম তার সামনে।
সারাদিন খালি ঘোরাঘুরি রোদে রোদে, খাওয়া-দাওয়া করার দরকার নেই?
আমি চুপিচাপ শুনতে থাকি তার কথা।
অনিয়ম করবে না।
আচ্ছা।
তোমাকে আমি সংস্কৃত ছন্দ শেখাবো।
কখন?
আগে আমি শিখে নিই; তারপর।
সে বলেছিলো এইসব কথা। তার কথা আমার চারপাশে হাওয়ায় ঘুরে ঘুরে কুসুমিত। সে নেই; তার কথা আমার নিঃশ্বাসের বাতাসÑ আমার শিরায়, উপশিরায়, অলিন্দে রক্তের নদে স্রোতের উপর গান হয়ে বাজে।


একদিন তার মুখোমুখি বসেছিলাম। শাটলট্রেন চলছিলো স›ধ্যার দিকে। স›ধ্যার রঙ হরিতকীর ফুল। আর সমস্ত কথা আমাকেই শুরু করতে হয়।
তো, কী প্ল্যান তোমার?
মানে!
ভবিষ্যতে কী করবে ঠিক করলে?
একা থাকবো।
তার এই কথা আমি রক্তের ভিতর শুনতে পাই। আমার শূন্যতার আধার হতে ইচ্ছে করে।
একটা কলেজে মাস্টারি করবো।
আমি শুনতে থাকি। আমার একটা কলেজ হতে ইচ্ছা করে।
সমুদ্রের দিকে কোথাও চলে যাবো...
আমার সূর্যাস্ত এবং সূর্যোদয় হতে ইচ্ছা করে। আমি বলি, তার কথা বলো।
ব্যাপারটা হচ্ছে, সেও আমার জন্যে কষ্ট পায়।
আমি মনে মনে বলি, না, প্রিয় দুঃখ, সে তোমার জন্যে কষ্ট পায় না। তবে তোমার সঙ্গ তার ভালো লাগে। যখন তার প্রেমিকা থাকে না সাথে তখন সে তোমার সাথে সময় কাটায়। তুমি ব্যবহৃত হও, না জেনে। আমিও যেমন ব্যবহৃত হই। তবে আমি বুঝতে পারি।
আমার এইসব কথা সে শুনতে পায় না। সে চুপ করে থাকে কিছুকাল। তারপর বলে, আর আমি শুধু শুধু কষ্ট পাই। সে যেনো নিজের সাথেই কথা বলে।

তোমার সমস্ত ভালো না লাগা নিয়ে বাজি আমি অন্তহীন বাঁশি, তুমি ভালো থেকো। তার জন্যে আমার খুব কষ্ট হয়, ভীষণ কষ্ট। সে দুখানি পা আমার পাশে সিটের উপর রেখে সামনের সিটে বসে আছে। না, একদিন বসেছিলো। ইচ্ছে হলো তার পা ছুঁয়ে দিই। কিন্তু পারি না। তবে মনে মনে ছুঁয়ে দিই ঠিকই। সে টের পায় না।
আমি লিখে দিতে পারি, তোমার মায়ের আগে তুমি মরে যাবে।


এমন কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা আমার নেই। তাই তার কাছে যাই।
সে বলেছিলো।
তাকে আর খুঁজে পাই না। একদিন তার ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালাম। দরজা খুলে গেলো হাওয়ার ধাক্কায়, কেউ নেই ঘরে। তখন স›ধ্যা ছিলো। স›ধ্যারতির সময় ধূপের গ›েধ বিহ্বল চারপাশ।
তার মা বললো, সে চলে গেছে।
আমি ফিরে এলাম। দুইদিন পর আবার গেলাম, ভোরবেলা। মা বললো, সে চলে গেছে।
মা যেনো পাথরের ভূমিকায় অভিনয় করছে তারই মতো। তারপরও আমি বারংবার ওর ঘরের অদূরে গিয়ে বালির উপর বসে থেকেছি। মাথার উপর ছায়া মেলে ছিলো সীমাহীন রোদের আকাশ: আমার কল্পনার ভীষণ ছাতিমগাছ। ওর ঘর সমুদ্রের পাড়ে। ঘরের উঠান পার হলেই হাতের বামপাশে কবর, কবরের উপর বকুলের গাছ। কবরের পাশে ঠাকুরঘর, জীবাত্মা আর পরমাত্মার সঙ্গমের ঘ্রাণ ওই ঘরে; সে কখনো ওই ঘ্রাণ পায় নি...


প্রতিদিন আমার দিনগুলি কেটে যায় জল, নুন, ফুল, ঠাকুরঘর, কবর, স্মৃতি এইসবের গ›ধ মেখে মেখে। সে আসে না। সে চলে গেছে হয়তো। ওর মা আমাকে দেখে প্রতিদিনই, কিন্তু ডাকে না। আমার একান্নতম দিনে ঠিক করলাম রাতটাও কাটাবো এইখানে। রাত তখন এগারোটা তেরো। মা ঠাকুর ঘরের সিঁড়িতে পা রেখেই আমাকে দেখলো বসে আছি জোছনাপ্লাবিত অ›ধকারে। হাতের ইশারায় আমাকে ডাকলো। আমি প্রণাম করলাম। মায়ের পায়ে চাঁপাবনের গ›ধ পেলাম।
সে আর ফিরবে না। এই কথা বলে মা আমার মাথায় হাত রেখে হিজিবিজি চুলগুলি আরো এলোমেলো করে দিলো। পুনর্বার বললো, সে আর ফিরবে না; তুইই ফিরে যা।
আমি শুনলাম চাঁপাবনের কণ্ঠস্বর মায়ের কণ্ঠে। কিন্তু আমি ফিরবো কার কাছে। আমার তো ঘর নেই।


একদিন ভোরবেলা আমি লঞ্চঘাটে গিয়ে একটি বিশালাকার ইস্টিমারে উঠে পড়ি। তিরিশঘণ্টা ধরে ডেকের উপর চিৎ হয়ে শুয়ে শুয়ে আকাশের সকল তারা, চাঁদ, মেঘ, সপ্ত আকাশ সমস্ত গুনে ফেলেছি, মেঘের ভাঁজে ভাঁজে রাস্তাগুলি জনাকীর্ণ পৃথিবীর মতো মনে হয়েছে। রামধনু গুনেছিÑ বৃষ্টি বিরতির রাঙা পোস্টার। সেদিন আমাকে ঘিরে আমার চোখে, মুখে, চুলে, বুকে, আঙুলে, নখে সমস্ত সবিশদ শরীরে যতোটা বৃষ্টির ফোঁটা পড়েছে ঝরে, ঠিক ততোটাই চুল গুনেছিলাম একদিন তার মাথার এলোমেলো মেঘে। এটা কি তবে কাকতাল? তারপর আকাশে নদীর প্রতিচ্ছদ দেখে গুনেছি এক একটি জল, তার চোখের মতন সরল, আমার চোখের মতন সরল। এইভাবে কেটেছে নদীর সময়, জলের বিহার আমার। তার চোখের তলে আমি দেখতাম একটা সমুদ্র প্রশান্ত, চোখের জলের মতো। কিন্তু তাকে আমি একদিনও বলি নি, প্রিয়তম দুঃখ, তোমার চোখে জল...


শেষবার ওর সমুখে গিয়ে বসেছি।
চা খাবে?
বললাম, খাবো। আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছি।
কী দ্যাখো?
আমি চুপিচাপ তাকিয়ে থাকি শূন্যতা।
আমার সত্যিই অস্বস্তি লাগে।
তুমি যখন পথ দিয়ে হেঁটে যাওÑ গাছপালা, ফুল-পাখি, লতা-গুল্ম, ধূলি-কাকর, বালি যে তোমার দিকে তাকিয়ে থাকে তখন অস্বস্তি লাগে না?
বিশ্বাস করো, এইসব ভাবের কথা আমি সত্যিই বুঝি না।

আমি তার পায়ের তাকিয়ে থাকি নতমুখ দুপুর। সেও গরম চা খেতে পারে না, আমিও পারি নাÑ এতোক্ষণে চায়ের কাপে ঠোঁট ছোঁয়াই।
অভিমান, তুমি সত্যিই দেয়ালের ওপাশে থাকো, স্ফটিক দেয়াল। তোমাকে ঝুঝি না চিলের ডানার অন্তর্গত অস্থিরতা। এইসব মনে মনে বলে তারপর বলি, আমরা এইখানে আর দুইতিনবছর আছি।
হ্যাঁ।
তারপর কী করবে?
এনজিওতে কাজ করার ইচ্ছা আছে।
কিন্তু তুমি তো এনজিওর বিপক্ষে।
কেনো? কিছু এনজিওতো ভালো লাগে।
তুমি ব্যবসা করলে মানাবে। যেমন, প্রকাশনা ব্যবসা।
ব্যবসা করতে টাকা লাগে।
না, তুমি ব্যবসা করলে তো আমাকে একটা চাকরি দিতে পারবে।
চাকরি করবে কেনো? তুমি তো আমার পার্টনার হবে।
কিন্তু আমার তো টাকা নাই।
আমি দেবো। পরে লাভ থেকে কেটে রাখবো। কিংবা না দিলেও চলবে।
আমি মুগ্ধচোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকি। সে হাসে ভোরের প্রথম রোদ।
তাহলে আমি তোমার মুখের দিকে আর তাকাবো না, শুধু পায়ের দিকে তাকিয়ে থাকবো।
আমার পা কাঁথা দিয়ে ঢেকে রাখবো।
কাঁথা মুড়ি দিয়ে শোয়ার পরও মশা যেমন করে কাঁথার ওপর দিয়ে কান খুঁজে বের করেÑ তেমনি আমার চোখও তোমার পা খুঁজে নেবে...
একটা মোমবাতি নিমিঝিমি, চায়ের দোকানে; একসময় দোকানের সমস্ত চা শেষ হয়ে যায়। সে উঠে পড়ে। আমি উঠে পড়ি। হাওয়া উড়ে জারুলের বনে।


আমি ইস্টিমার থেকে নেমে তাকে খুঁজলাম অভিমানÑ মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। তাকে খুঁজলাম টগরÑ শাদাফুল। তাকে খুঁজলাম নির্বাসনÑ আলোকবর্ষের পথ। তাকে খুঁজলাম দুঃখÑ প্রিয়তম; খুঁজলাম চাঁপাবনÑ গ›ধবহ। তাকে খুঁজলাম সকাল...

এইসব পথ জলের গ›েধ মোহন যাপন। আমি প্রতিদিন হেঁটে হেঁটে তাকে খুঁজে ফিরি শিরীষের ডালে, পাতায় পাতায়, গোলপাতার বনে, কেয়া-নিশিন্দার কাঁটায়, নারিকেলের ছায়ায়, খুঁজে ফিরি ডাহুক, শালিক, কাক, ঘুঘু, মরাল, হরিয়াল, কানাকুয়া, হাঁস আর চিলের উড়ালে, খুঁজে ফিরি শিশিরে, মাঠে, ধানক্ষেতে চিরদিন বাতাসে...
পাই না তাকে, পাই না কিছুই।

অবশেষে তাকে না পেয়ে আমি নিজেই হয়ে যাই শিরীষ, গোলপাতা, কেয়া, নিশিন্দা, ফুল, পাখি, মাঠ, শিশির, অভিমান অথবা আলোকবর্ষের সুদূরতম পথরেখা...

গোপন তোমাকে খুঁজে ফিরি; পাই না কিছুই।

আমি তখন সমুদ্রের পায়ের কাছে কেয়া-নিশিন্দার বন; আমার উদ্ভিদজন্মে নিজেকে চিনতে চিনতে আমার কাঁটায় খুন হয়েছে প্রজাপতিদল, ফড়িং, ছোটোপাখি, ছোটোপাখি...

একদিন জোয়ারের বেলা ভেসে আসে বকুল, গাছসহ। আমি চমকে উঠিÑ বকুলের গ›েধ। না, বকুলের গ›েধ নয়; বকুলে আছে চাঁপার গ›ধ।
তোমার কাছে কি চাঁপা ফুল?
মনে আছে বকুলগাছটা ছিলো তাদের কবরের উপর। আর কবর ছিলো অনিবার্য ঘর।
এইবার আমি তাকে বলেই ফেলি, প্রিয়তম দুঃখ, তোমার চোখে জলের কাজল।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29179876 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29179876 2010-06-18 19:50:34
আষাঢ়াষ্য প্রথম দিবসে একঝাঁক বৃষ্টিকাব্য
মেঘাচ্ছন্ন দরোজাগুলি সব এখানে
একটি পথ খুলছে হাজারপথের শুরু
আমি আগন্তুক
ভাসছি পৃথিবীতে
আমি যেনো একটি সাঁকো
ঝুলে আছি খালের উপর
কান্নাবতী পাহাড় একটি ঝর্ণার গানে
ছোট্ট স্বপ্ন ঘিরে রেখেছে আমাকে
এই আমি হয়তো রৌদ্রালোকিত বন

হাঁটছি একটি বৃষ্টিক্লান্ত নদীর পাশে


--------------------------------------------------------------

১১০৩০৫

ঝড় তুমি ঝরাপাতাদের সুদিন
যাও স্বপ্নের কাছে যাও
পালকে তোমার রঙিন রঙিন
যাও বৃষ্টি মাড়িয়ে যাও
উল্লাস সাজাও খানিক
টানে টানে ঘূর্ণি অধীর
উজানে অস্থিরতা
ঝরাপাতা তোর বুকের খাতা
বুক উড়ে
তোর স্তনে ভুল
তোমার চুল নিঝুম ঘাসফুল
তোর খোলাপায়ে আলতারাতি
উড়নায় বাঁধা স্বপন রঙিন

ঝড় এলো
আহা সুদিন

--------------------------------------------------------


১৫০৩০৫

আমিই তাকে প্ররোচিত করেছি
সে বৃষ্টির গন্ধ চুরি করে এনেছিলো আমাদের দেশে
সে বৃষ্টি হয়ে ঝরছে এখন
সে আমার দরোজায় দিয়েছে তালা
আর
জানলাটা খুলে দিয়েছে আমার চোখের সামনে


----------------------------------------------------------------

১৭০৩০৫

এইটুকু বৃষ্টি লিখে ক্লান্ত হয়েছি
এইটুকু গন্ধ ছুঁয়ে কুসুম
পুষ্পের মৃত্যুতে কেঁদেছে ফুলারণ্য
তুমি অন্যঘরে
বসত অদূরে ঝিলমিল
শাখাপ্রশাখায় পাতারা অস্থির

আমি এইটুকু বৃষ্টি লিখেই ক্লান্ত হয়েছি
এই ক্লান্তি নিয়ে তোমাকে কতোখানি ছোঁয়া যায়


--------------------------------------------------------------


৩০০৪০৫-৪

দিনভর বৃষ্টি হলে একটা কাক আর ভিজতে পারে না
চুল খুলে টাঙিয়ে রাখে উনুনের ধারে

উনুন একটা বৃষ্টিদগ্ধ সূর্যমুখি

---------------------------------------------------------


০৯০৫০৫-৩

ঘিরে এসো বৃষ্টিদল
ঘিরে এসো মহাজল
ঘিরে এসো বহতা সুন্দর
এ সকল ঘিরে পুনর্বার জন্মাও
নাও
জমাও
এ সময় উৎসবে অক্ষয়
এ কাব্য ভাসায় পাথর
পাল্টে যাক ঘরখড়
বলো নীল চোখে শ্যামল
জানলার দোহাই
ভেঙে চলো দরজার গরাদ
ঘনাবে না রাত
ঘিরে এসো
আর
ধরো এই হাত
ছাড়ো এই হাত


------------------------------------------------------------------


০৯০৫০৫-৫

রিনরিনে চোখের ঘেরে কেউ টেনেছে কাজল

কাজল তোর ঘরে জল করে চিরদিন ছল
তোর বর্ষা তো বৈশাখে খটখটে খরাকাঠ
তোর ঘাসে আদিগন্ত হলুদ পড়ে আছে মাঠ

কাজল তোর ঘর চিরদিন করে তোকে পর
কার চোখের পরে তবে তার কেঁপেছে অধর


------------------------------------------------------------

১৩০৬০৫

ওইখানে যাবো না
ওইখানে অবিশ্রান্তবৃষ্টি ফুল হয়ে ফুটছে
বনে বনে
বনের গন্ধ আসছে এইখানে
আমি যাবো না
আমার স্যাঁতসেতে বিছানায়
কালিঝুলি কাঁথার নিচে ওম নেবো ক্লান্তির
যদি ধীরে ধীরে মঙ্গলের গান উঠে বাতাসে
শুনবো চুপিচাপ
কান্নারত নদী দূরে বয়ে যাক
আমি তার অশ্রু হবো না
দূরের পথের রেখা যে পদচিহ্নের আশে
থেমেছে বাঁশবনে
বাঁশবন আমার মাথার চুল
নিবিড় শুয়ে আছে আমার সাথে
আমি যেতে পারি না



-----------------------------------------------------------

২৪০৬০৫

বসো রাত মুখোমুখি রাত্রি যেমন
বসো ঘুম
চোখজুড়ে বসো স্বপ্নের গোপন
বৃষ্টি বসো
ভিজিয়ে দাও বামপাশে খরা আকাশ
ঝড় এসো ছুঁয়ে যাও রাত
ছুঁয়ে থাকো প্রভাত
কাঁপো দিগ্বিদিক
ঝড় এসো জানলায় হানো
ঝড় এসো দরজায় টানো
খুলে যাক দ্বার অবারিত পথ

এসো রাত মুখোমুখি বসি
রাত্রি হও তারপর
খোলো চপলহরিণ শরীরের
ক্লান্তি তুমি ঘামের গন্ধে এসো
এই বিষবাষ্পে বাঁধো ভোর

শুধু বিষাদ আসে আনন্দের পাশে
আনন্দ জুয়াচোর


---------------------------------------------------------

০২০৭০৫

বৃষ্টি হয় কচুপাতার বনে
বৃষ্টি হয় তোমাদের মনে
তবু এ চাতকজন্ম তোমাকে দেবো না প্রিয়
কোকিলের কাছে গিয়ে ক্লান্তি সেরে নিও



-------------------------------------------------------------------

২৬০৭০৫

তিনটি বৃষ্টিপাতের পর আর ইচ্ছে করে না
মেঘগুলি ঢেকে দিই ক্লান্তরোদের বাকলে
তারপর ঘেমে উঠি অর্থহীন অভিমানে

আমার অভিমান তিনটি বকুলের বদলে
একদিন কিনেছিলো তিনটি বৃষ্টিপাত
ওটাই নিজস্ব বলে ঘটাই
বাকিটা আমার নয় জেনে পুড়ে যাই অর্ধেক
বাকিটা পড়ে থাকে বিছানার মৌন চাদরে
আমাকে টানে না তা


---------------------------------------------------------------

২৫১২০৫

প্রথমবৃষ্টির দিন তাকে শুধাই ঝড়
তার পরনে কলাপাতা শাড়ি
ভস্ম তার পাড়
পাড় ঘেঁষে অলক্তরাগ চরণ

মিছিলের পরিমাপে সাজানো জীবন
মেঘের পরতে ভাসে রোদের অবাধ্যভূমি
কারো অধর ছুঁয়ে চোখের উড্ডিনতা মেপে ফেলা
দাবীদাওয়া বুকপকেটের লেখা
স্মারকলিপিতে কালো অর যন্ত্রণা
তোমার কাঁপন দেখে ভুলে যাওয়া অভিমান
অচেনা বাগানের মতো মনে হওয়া বন
বনডাহুকের সবুজচিৎকারে থেমে যাওয়া ধ্যান
অবশেষে ভেঙে পড়ে ছাতিমপাতার ছায়া

ক্রমশ অরণ্য হয়ে উঠে আমলকীর বন
ঝড়ের উন্মাতাল প্রতীক্ষায়


------------------------------------------------------------

০৩০১০৬-১

রোদে বোনা দিনে ছাইঘরে অন্ধকার জ্বেলে বসি
আমি ধ্যানমগ্নরাত
তাঁতরঙশ্যাওলার গায়ে আর্দ্রতা হয়ে থাকে দুপুর
একটাকার শ্রাবণ কিনে কেঁদে ফেলি ঘনবর্ষায়
নদী আর সমুদ্রের সঙ্গমে খণ্ডিতজল দুলে কোথাও
রাত আসে দিনের বৈমাত্রেয়বোন
সঘন অন্ধকারে বাঁশবনে ঝরে ঘুমঘুম তারাগুলি
হাওয়াগন্ধে ঘুম এলে পতনের শব্দে জাগি
জেগে থাকি আতপ্তশৈশব
যেইখানে আটকে ছিলো শাদাঘুড়ি দুখস্বপ্নের দিন

কখনো পেটের খিদে দেহকে ঢেকে দেয়
মনকে বানায় চুপসে যাওয়া বেলুন
তারপরও জেগে থাকে জেগে থাকে সমুদ্র আর নুন


----------------------------------------------------------------------------

০৮০১০৬

কেনো না আমি বৃষ্টির গন্ধ চিনে শীতের কাছে এসেছি
যাকিছু শূন্যতা আছে আমার রক্তের ভিতর
কম্পমান সমুদ্র হয়ে দুলছো পূর্ণতার প্রতুলতায়
সুন্দরতা তুমি অন্ধ অসুখের দেশ হতে এসে ঝিরিঝির
শয্যা জ্বেলে আমাকে রোপন করলে আরোগ্য প্রান্তরে
সঘনসন্ধ্যা অস্থির আর শীতার্ত প্রতিবেশকে পরিতাপ দিলো
তোর হাতে ছিলো উষ্ণতার খড়কুটো বৈভব
তুমি চুপিচাপ ধরে রেখো চৈত্রের রাত
হয়তো আমি গ্রাস করতেও পারি


----------------------------------------------------------------------------


২৩০২০৬-২

এইখানে বৃষ্টি নামুক
লেবুপাতায় ফুরিয়ে যাক দিনের উত্তাপ

কারো চোখের তীরে শাদাফুল ফুটে উঠবে
কান্নার রাতগুলি বর্ষায় মিশে যাবে
সমুদ্রের ঢেউয়ের ফনায় নাচবে দুলে দুলে

তুমি আসবে
তুমি আসবে
তুমি আসবে
বাতাস কেঁপে উঠবে
কেঁপে যাবো সুতীব্র শরীর


--------------------------------------------------------------

২৫০২০৬-১

খুব ইচ্ছে করে নিশ্চিত ভোরের আকাল
ইচ্ছেটা দানা বাঁধুক
ফুরাক গতকাল
সিলিংফ্যানটা ঘুরছে শুধু চারদেয়ালের মাঝে
ইচ্ছেটা তার পাখায় উড়ছে অনাকাজে
অনাকাজ ঘোর পড়ে থাকে ফাঁকা মেঝে
মেঝেতে রঙপ্রাণ
চোখ উড়ে রঙকানা রাতে
রাতভর বর্ষণে খাক হবো একলা শরীর
ইচ্ছেটা দুলে উঠে স্বমেহনে হয় অবলীঢ়


--------------------------------------------------------------

৩০০৪০৬

বৃষ্টি হয়েছিলো সন্ধ্যার পর
বৃষ্টির আগে ঝড়
কদমের দুইটি ডাল ভেঙে গেছে ঝড়ে
ঝড়ের টানে মেঘ সরে গেলে জেগেছিলো সন্ধ্যাতারা
তারাটি ভিজে গেলো আমি দেখলাম

কোনোদিন ভীষণরাতে বৃষ্টি হবে
আকাশের তারাগুলি বৃষ্টিতে ভিজে যাবে
হবে আমার চোখের মতন সহজ
তুমি কি সেদিন আকাশ দেখতে আসবে না
প্রিয়তম চিল


--------------------------------------------------------------------



২৭০৫০৬

বৃষ্টিতে ভিজে গেছে স্মৃতিমাখা ধনুকের বিষ
বিষ অমরতার চিহ্ন ধরে এসেছিলো কাছে
হায় মায়া মহিমা
তোমার উত্তরপাড়ে অশ্রুতনু লাভাকুসুম ফোটে
আমি যাবো যেখানে উৎস
তীরন্দাজ বাসা বেঁধে আছে ছায়াময় আলোয়

আমার বৃষ্টি দুইফোঁটা আদিমপাপ
সৌন্দর্য ধারন করে আছে
যে কাছে আসে আমার চুম্বন প্রোথিত হয়
তার দেহের ললিত সর্বনাশে
ওইখানেই বিষ অমরত্বকে বিগ্রহ করে



----------------------------------------------------------------------


০৩০৬০৬

তাহার চিঠি পড়েছিলাম তেতুলপাতায় লেখা
তাহার মনের কথা বৃষ্টি ঝরেছিলো তেতুলখাতায়
তাহাকে পড়তে গিয়ে হলাম বৃষ্টির পাঠক
আর সে বৃষ্টির মধ্যে কাঁপে অচিনবাতাস

ইদানীং তেতুলের বন ঝিমিঝিম ডাকঘর
প্রিয়তম হাওয়া তুমি হও এইখানে অবিনাশি ঝড়


---------------------------------------------------------------------

২৪০৬০৬

ছাইমাখা
বর্ষায় পরিণত কীটের কাল দগ্ধ
রামধনু নিমন্ত্রণে
নিত্য ছুঁয়ে যায় অচিন উড্ডিনতা
যাহা একটু দূরে
ঘুড়িকাল তার বিশালতাকে প্রহসন বানায়
অবলীলায়
বাঁকাপথের আয়োজন কাউকে ভাসালে
কেউ দাঁড়িয়ে থাকেন কাকতাড়ুয়া

আমি কাকতাড়ুয়া নই
আচানক রামধনু

-----------------------------------------------------------


২৪০৭০৬-২

নদীতে বৃষ্টি এলে জলের তলের মাছ উড়ুক্কু
রূপবতীবৃষ্টির মোহ মাছেদের
এইবর্ষণ রাত্রিকে দেয় সমাহিতরূপ
যাকে আমি চিনি তার পথচলার গল্প অনুরূপ


------------------------------------------------------------------


১১০৮০৬

একটি মাছের কালবেলা জলচোখ দীপ্র
জলঘরে বৃষ্টি এলে রোদের আকাল
বুঝে না জলজমলিন
নির্ঘুমসন্ধ্যার কোলে ছড়ানো ফুলগন্ধ
জলের অতলে খুঁজে ফেরে মাছ

দীনতার উঠানে রোদ নামে
দীনতার জল রোদ পান করে
একটিমাছ সাঁতরে বেড়ায় একই জলে



--------------------------------------------------------------

১৯০৮০৬

অমলবৃষ্টির রাতে আমিও ছিলাম
মনখারাপ নিশ্চুপসুন্দর
এতো হংসমিথুন সাঁতার ওইধারে জলের উপর
আমি টের পাই নি বিদেহি বাতাসে
অ›ধকারের গন্ধ চিনে স্তব্ধভোর নিজেরই মধ্যে

হারানো সৌরভের খোঁজে কেউ বসে থাকে না
ক্লান্তিহীন পথের নৈর্ঋতে
আমি থাকি
এইসব জড়তা কোন ধ্যানের পল্লবিত বিস্তার
জন্মান্ধজোছনা বসে থাকি
হেঁটে বেড়াই বাঁশফুল মুগ্ধতায়


-----------------------------------------------------------------

২৯০৮০৬

আমার বিশেষ বাদলাদিনের প্রান্তে
তোমাকে খুঁজি নি অলিখিতসুর
তুমি বসেছিলে বহুদূর
প্রসন্ন উত্তরে শুয়েথাকা চিল
ঝিলমিল রঙ রৌদ্রে
অমিলভুলের অপরূপমিছিল

আমার সন্ধান ঝরে যায় স্মৃতি
আমার বৃষ্টি আঁকে বিস্মৃতি

------------------------------------------------------------------

৩১০৮০৬

আকাশভর্তি শরৎকাল ছিলো শাদা
তারপরও বৃষ্টি এলো সকালে
সেটাও কারণ নয়
কেনো বাহিরে যাই নি জানি না
দিনটা বড় দীর্ঘ হয়ে গেলো
এইগ্রামে থাকি শহরশেষে

দিন তুমি সন্ধ্যার পর আমাকে শহরে নামিয়ে দিও
ডাক্তারের কাছে যেতে হবে

------------------------------------------------------------------

২০০৪০৭-৩

বৃষ্টির দাগ লুকিয়ে রেখেছি বাঁশবনের একটি পাতায়
একটিপাতায় কাঁপে চিরদিন জল
জলের ইঁদারায় ধূপের গ্রামখানি ঝিমধরা মুহূর্তের দেয়াল
আটকে রাখে অহমিকা আর জন্মান্তর
তিনপ্রান্তরের তিনটি শাদাফুলে অনাবৃষ্টির চিহ্ন
চিহ্ন কেবলি বাঁশবনের প্রতীক্ষায় রত
আমার আরতি লুকিয়ে থাকে চিরদিন বাঁশের ফুল
তেপান্তর জানবে না বাঁশবন আমার মাথার চুল

-----------------------------------------------------------------


০৫০৫০৭

আহা চাঁদটা বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে
একটা চাদর দিয়ে ঢেকে দাও তাকে
বিমূর্ত বাতাসে উৎসবের করতাল
জোছনায় চমকে উঠে আকাশের বিদ্যুৎ
শেষরাত সমাপন করেছে কোন আয়োজন
সমস্ত নদীচরে সিলিকন জ্বলে
সমস্ত গাছের ডালে জ্বলে অন্ধকার
একটি প্লাবন গায় বন্যার গান
চাঁদটাকে ঢেকে দাও
চাঁদে ডাকছে বান


----------------------------------------------------------------

২৭১২০৭-৪

কাদা আর বৃষ্টিপাত
উতল সঙ্গম
শরীর ঘূর্ণি
ঘূর্ণি ভাষা বুঝে ছিন্নমূল পত্রালিকা
ভুলে যাওয়া ব্যথা
এখনো অনির্মিত আছে কেউ
ধীরে অস্ফুটে বলা কথা
দিগন্তের কানে ঝুলে আছে


-----------------------------------------------------------------

১৯০৭০৭

আমরা একদিন বৃষ্টির ভিতর ঘুমিয়ে পড়েছিলাম
তুমুল বৃষ্টি হচ্ছিলো সেদিন
বৃষ্টির রঙ শ্মশান
বৃষ্টির ফোঁটাগুলি ক্রমে ঘাসপাতায় রূপ নিচ্ছিলো
আমি ডুবে যাচ্ছিলাম সবুজের ভিতর
আমি ডুবে যাচ্ছিলাম ছাইয়ের ভিতর
গতজন্মের শ্যাওলা শরীরে জেগে দেখি বৃষ্টি নেই
বৃষ্টিসকল বন্যার কাজল
আকাশে নিবিড় রোদের মেঘ


----------------------------------------------------------------

২৪০৭০৭

আরেক বেদনা আছে বৃষ্টিদাহে
কোনোদিন সন্ধিকালে দুপাড় ভেঙে পুড়ে আসে সুর
বহুদূরছায়াতলে পড়ে থাকে পদচ্ছাপ ম্রিয়মান
যেখানে উৎসবের খরা উড়ে
বনষ্পতির উত্তরীয় লুটিয়ে থাকে
উত্তরীয় প্রাণ নিয়ে থাকে নিষ্প্রাণ



--------------------------------------------------------------------


০৪০৮০৭

বিলাসীবৃষ্টির মোহে কেটে গেছে রাত
এইযে ভূপালী বেজে চলেছে
এইযে কিশোরীর কণ্ঠে ঠুমরি
জলের উঠানামা নামহীন নদীজলে
সেইযে লিথি বয়ে গেলো ওপারের মরুভূমিতে
আমার লেখা কাগজের পর কাগজ
কাগজগুলিকে আগুন গ্রহণ করেছিলো
সে করে নি
কেউ করে নি ধারণ
ধারণে সম নয় বলে ওগুলি চিঠি নয়
এইযে কিশোরী গাইছেন ভূপালী
এইযে নদীর শরীরে জলের উঠানামা
এইরাত আর লিথিকে চেনে না
আমার সাথে যেমন সমাপ্তির আর দেখা হয় না


------------------------------------------------------------------------

১৭০৮০৭

আজরাতে গভীররাতে জেগে থাকি
জেগে থাকি গভীর বৃষ্টির শব্দে
ছাদের শীতলচর এইশব্দাঘাত ধরে
এইবৃষ্টি সর্বনাশ আনে
তারপরও কোথাও ভিতরে জাগি
জেগে জেগে দাঁড়িয়ে থাকি কম্পমান
দাঁড়িয়ে থাকি সর্বনাশের আরতিতে
আরতিতে রত রতিরক্তমদ
কারো সৌন্দর্য হরণ করে সুন্দর হই
নখরে মাখি আকাশের নীল
সকলি কালো

আজরাতে গভীররাতে বৃষ্টির প্রণয়
প্রতিটিফোঁটায় সাজানো সর্বনাশ
আমাকে উন্মাতাল করে
হাওয়ার উরুমঙ্গলে জুড়ে দেয় সূর্য
জেগে থাকি গভীরশব্দে
রাত্রি আর বৃষ্টি অথই
বৃষ্টি ছিঁড়ে আমি সুন্দর হই

-------------------------------------------------------------

১৯০৩০৯

একটি কান্না ছড়িয়ে রেখেছি মেঘে
একটি কান্না জমালাম আবেগে
বাদল নামো
বাদল নামো দূর বৈশাখে

আমাদের হাতে তিনটি জোনাকবাতি
আমাদের হাত তো দুইটি হাতই ছিলো
আমাদের আর একটি জোনাক ছিলো
বাদল নেমে তার পরিণাম বলো

কখনো কেউ রক্তের যন্ত্রণা চিরে
একটি গান তো মরে যায় মরে যায়
পাতালের ছায়া ডেকে ডেকে একাকার
আমার তোকে নিয়ে গেলো কোনখানে
তুই কি কখনো শুনেছিলি স্বরলিপি
আমার কাঁদন স্বরলিপি হয়ে গেছে
তানপুরাটার ভারি তারটিতে সে
এখন তো রোজ বাদলের গান করে
বাদল নামো বাদল নামো

দূর মন্দিরে কীর্তনীয়ার বাঁশি
কার কীর্তন বাজে সে বাঁশির দেহে
একলা ঘুমে শুয়েছে জলপাই বন
লালপাতা তার কান্না লুকোয় শিরায়
আমার কান্না বহুদূর মেঘে মেঘে
বাদল নামো বাদল নামো
বাদল নামো এলোকেশে




------------------------------------------------------------
[সকল কবিতা পূর্বে প্রকাশিত এবং পুরনো]]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29177311 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29177311 2010-06-15 12:57:16
অনুবাদ: হার্ট ক্রেন এর মেলভিলের সমাধিতে তিনি এই কারণে গুরুত্বপূর্ণ যে আধুনিক মার্কিন কবিতায় তার প্রভাব বিস্তারিত।

অনুবাদ:

মেলভিলের সমাধিতে

মধ্যে মধ্যে ঢেউয়ের তলে এইসব পাহাড় হতে দূরে
সে দেখছিলো ডুবে যাওয়া মানুষের হাড়ের ঘুঁটি
দূতাচারে লিপ্ত। সে দেখলো যখন-- ধূলিধূসর তীরে
আছড়ে পড়ে পড়ে তারা ঝাপসা হয়ে গেছে।

আর নিঃশব্দে ছেড়ে গেছে ঝড়ে বিনষ্ট জাহাজ
অকৃপণ ফিরিয়ে দিয়ে গেছে মৃত্যুবসন
একটি এলোমেলো অধ্যায়, ভস্মনীল চিত্রলিপি,
শঙ্খের করিডোরে অশুভ আঘাত।

তারপর একটি বিশালাকার কুণ্ডলের শান্ত ঘুরপথে,
ইহার মোহন প্রহার এবং অবশেষে দ্বেষের অবসান,
ওখানে তুষারঢাকা চোখ তোলে পুজোর বেদী;
এবং নীরব উত্তরগুলি চুপিচাপ পেরিয়ে যায় নক্ষত্রদল।

কম্পাস, কোয়াড্রান্ট, সেক্সট্যান্ট আর প্রকৌশল
করে না স্রোত... গাঢ়নীল তরঙ্গচূড়ায়
শোকের মাতম জাগাবে না নাবিকটাকে।
এই অপার্থিব ছায়াকে কেবল সমুদ্র ধরে রাখে।

---------------------------------------------------------------

মূল:

At Melville’s Tomb

Often beneath the wave, wide from this ledge
The dice of drowned men’s bones he saw bequeath
An embassy. Their numbers as he watched,
Beat on the dusty shore and were obscured.

And wrecks passed without sound of bells,
The calyx of death’s bounty giving back
A scattered chapter, livid hieroglyph,
The portent wound in corridors of shells.

Then in the circuit calm of one vast coil,
Its lashings charmed and malice reconciled,
Frosted eyes there were that lifted altars;
And silent answers crept across the stars.

Compass, quadrant and sextant contrive
No farther tides ... High in the azure steeps
Monody shall not wake the mariner.
This fabulous shadow only the sea keeps.

------------------------------------------------------

Hart Crane:
http://en.wikipedia.org/wiki/Hart_Crane
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29170515 http://www.somewhereinblog.net/blog/nirzharblog/29170515 2010-06-05 09:17:34