somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আঁধারের নীলিমায় (রিপোস্ট)

০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ রাত ১২:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

(লেখাটায় টুকটাক কিছু ঠিক করে রিপোস্ট দিতে হলো বলে আন্তরিক ভাবে দুঃখিত)

এক.
আজও কি আসবে ছেলেটা?
বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছুতেই তানিয়ার মনে প্রশ্নটা উঁকি দিয়ে যায়।

হ্যাঁ,ওই তো সে ।সেই আ্যাপ্রন হাতে ; সেই পরিচিত দাঁড়াবার ভঙ্গি। মুখটা ছাড়া তানিয়া আর কিছুই চেনে না,কিছু জানেও না।অথচ মনে হয় যেন কতদিনের চেনা!

মনে পড়ে-প্রতিদিনকার মতো সেদিনও তানিয়া বাসের জন্য ওয়েট করছিল ।হঠাৎ দেখতে পেল,কিছুটা দূরে একটা ছেলে দাঁড়িয়ে,এর আগে কখনো দেখেনি;হাতে আ্যাপ্রন। দেখেই বোঝা যায় মেডিকেলের স্টুডেন্ট।মেডিকেলের স্টুডেন্টদের প্রতি তানিয়ার বরাবরই একটা ঈর্ষা কাজ করে।যদিও এখন ঢাবি-তে পড়ছে ফিজিক্স নিয়ে,তবু মেডিকেলে চান্স না পাবার দুঃখটা সে আজো ভুলতে পারে না।
কিন্তু এই ছেলের ব্যাপারটা অন্যরকম। প্রথম দেখাতেই কেন জানে না,তানিয়ার মনে হয়েছিল মেডিক্যালের আ্যাপ্রন শুধু এর হাতেই মানায়। তারপর থেকে প্রতিদিন ভালোলাগাটা বেড়েই যাচ্ছে. . . . .।

দুই.
টিক টিক,টিক টিক. . . .রাত দুটো।
তানিয়ার ঘুম আসছে না কিছুতেই। ঘুরে-ফিরে সেই ছেলেটার মুখ ভেসে উঠছে চোখের সামনে। কিন্তু এমনটা তো হবার কথা নয়! প্রেম-ভালোবাসা থেকে তানিয়া যতটা পারে সবসময় দূরে দূরেই থেকেছে।
তবে কি নিজের অজান্তেই সে অচেনা ছেলেটাকে নিয়ে কল্পনার দিগন্তে ভেসেছে?
কখনও পড়ন্ত বিকেলে হাতে হাত ধরে,কখনও বা কোন জমজমাট আড্ডায় গিটারের সুরে. . . . .কখনও আবার দু’জনের সংসারে ছোট্ট সুখের নীড়ে!

যাহ্! এসব কি ভাবছি আমি!-হেসে ফেলল তানিয়া।
এটাই কি ভালোবাসা? হয়তো বা!

তিন.
১৪ ফেব্র“য়ারি।
তানিয়া ঠিক করেছে আজ ছেলেটার সাথে কথা বলবেই বলবে।
আচ্ছা,ছেলেটা কি কখনও বুঝতে পেরেছে আমার মনের নীরব ঝড়? বুঝবে কেমন করে? তার কি আর সময় আছে আমাকে নিয়ে ভাববার?-তানিয়া ভাবে ।

কিন্তু এ কি? ছেলেটা কোথায়?তানিয়া এদিক-ওদিক তাকালো।নাহ্!কোথাও নেই।কখনও তো ছেলেটাকে দেরি করতে দেখেনি সে!
তবে কি,ছেলেটা তার গার্লফ্রেন্ডের সাথে . . . . . .মনটাই খারাপ হয়ে গেল ওর।
পরক্ষণেই ভাবল,ধুর!আমিও যেমন! মানুষের কি দেরি হতে পারে না? কিংবা কোন জরুরি কাজ থাকতে পারে না?আর যদি ছেলেটার কোন ভালোবাসার মানুষ থেকেই থাকে,তাতেই বা আমার কি আসে যায়! না থাকাটাই তো বরং অস্বাভাবিক।
সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে ঘন্টা পেরিয়ে যায়। ছেলেটা আসে না।তানিয়া ভার্সিটিতে না গিয়েই বাড়ি ফিরে আসে।ভাবে, আজ দেখা হয় নি,কাল হবে। কাল না হলে পরশু হবে ; এতে মন খারাপ করার কি আছে!-নিজেই যেন নিজেকে বোঝায়।

চার.
পরেরদিন।
সেই বাসস্ট্যান্ড। সেই তানিয়া, সেই উৎসুক চাহনি. . . . .শুধু ছেলেটা নেই।
তারপর-
একদিন
দুইদিন
তিনদিন. . . .পেরিয়ে যায় সপ্তাহ,মাস. . . . .এক এক করে কেটে যায় দুটো বছর।
তানিয়া আর ছেলেটার দেখা পায়নি।
এ দু'বছরে তানিয়া অনার্স কমপ্লিট করেছে।মাস্টার্সও শেষের দিকে। এরই মাঝে জয়েন করেছে একটা স্কুলে। তবু ভুলতে পারে নি আ্যাপ্রন হাতে দাঁড়ানো সেই চেনা মুখটাকে।

পাঁচ.
বারান্দার ইজি চেয়ারটায় বসে আছে তানিয়া।স্মৃতি হাতড়ে জীবনের পাওয়া-না পাওয়ার হিসেব মেলাতে চাইছে,কিন্তু পারছে না। পাশের ঘরে ছোটমামা কথা বলছেন মা'র সাথে-ওর বিয়ের ব্যাপারে।

ছেলে ইঞ্জিনিয়ার,বুয়েট থেকে পাশ করেছে।স্কলারশিপ নিয়ে আগামী মাসেই দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে।
ফ্যামিলিতে মা আর ছেলে ছাড়া কেউ নেই।তাই ওরা চাইছে মেয়েপক্ষ রাজি থাকলে আগামী শুক্রবারেই বিয়ে পড়িয়ে বৌ ঘরে তুলে ফেলবে।

তানিয়ার এসব আলোচনা শুনতে মোটেও ভাল্লাগছিলো না।

ছয়.
আজ তানিয়া আর সায়েমের বিয়ে পড়ানো হলো।
কিভাবে যে এ ক'টা দিন কেটে গেছে,তানিয়া বুঝতেই পারে নি। শ্বশুরবাড়িতে এসেছে বেশ কিছুণ আগে। কেমন লাগছে-এখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। সায়েম অবশ্য যতটা পারছে ওর খেয়াল রাখছে। তানিয়া এখন বসে আছে ওদের ঘরে।
হঠাৎ দেয়ালে টাঙানো একটা ছবির দিকে চোখ পড়তেই ওর চারপাশের সমস্ত দুনিয়া টলে উঠল। মাথাটা ঝিমঝিম করতে লাগল। মনে হলো যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে।

-'কি ব্যাপার শরীর খারাপ লাগছে তোমার?'
সায়েমের প্রশ্নে নিজেকে কোনরকমে সামলে নেয় তানিয়া। জিজ্ঞেস করে-'আচ্ছা,ওই ছবিটা কার?'

সায়েমের চেহারায় একটা কষ্টের ছাপ ফুটে ওঠে।বলে-

-'আমার বড় ভাই-সাইফ।আমরা দু’ভাই ছিলাম দেড় বছরের ছোট-বড়,একজন আরেকজনের সবচাইতে ভালো বন্ধু।এমন কিছু ছিল না যা আমরা দু'ভাইয়ে শেয়ার করতাম না।খুব ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট ছিল ও।পড়তো ঢাকা মেডিকেলে-'

'পড়তো মানে? এখন কি করেন উনি?'সায়েমের কথার মাঝেই প্রশ্ন করে তানিয়া।

'নেই।'

'নেই মানে?'তানিয়া চমকে উঠে।

'আজ থেকে দু'বছর আগে,১৪ ফেব্রুয়ারি ভাইয়া রোড আ্যাকসিডেন্টে মারা যায়।
ভাইয়া যে মেয়েকে পছন্দ করতো,ওইদিনই তার সাথে প্রথম কথা বলবে বলে ও ঠিক করেছিল।কিন্তু তার আগেই সব শেষ। জানো,ভাইয়ার সাথে মেয়েটার প্রায়ই দেখা হতো বাসস্ট্যান্ডে। মেয়েটা আড়চোখে ভাইয়াকে দেখতো,ভাইয়া অবশ্য তা বুঝতে পারতো। ভাইয়াও চুপি চুপি দেখতো মেয়েটাকে। অথচ কেউ কারো সাথে কোনদিন কথা বলে নি,এমনকি কেউ কারো নাম পর্যন্ত জানতো না!
মাঝে মাঝে খুব জানতে ইচ্ছে করে,কে সেই মেয়ে? মেয়েটা কি ভাইয়াকে কোনদিন একটু ণের জন্যও ভালোবেসেছিল,একটু খানি হলেও??’

'একটুখানি নয় সায়েম,অনেক বেশি ভালোবাসতো,এখনও বাসে. . . .তাকে ভালোবেসেই তো মেয়েটা জেনেছে, ভালোবাসা কি?'-কথাগুলো বলতে গিয়েও থেমে যায় তানিয়া।
অচেনা মানুষটার হারানো ভালোবাসাকে সে ভুলতে পারে নি এক মুহূর্তের জন্যও,কিন্তু তাই বলে কি কখনও চেয়েছে এভাবে ফিরে পেতে????
-উত্তর খোঁজে তানিয়া ; গোপন কান্নার জল লুকায় আঁধারের নীলিমায় -

বি.দ্র.-আমার লেখা এ গল্পটা সাপ্তাহিক ২০০০-এর এবারের ভালোবাসা সংখ্যায় সেরা ৫০ গল্পের একটি হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে।
এই গল্পটিকে সেরা ২০-এ আনতে আপনার মোবাইলের মেসেজ অপশনে গিয়ে টাইপ করুন
VG(space)18 এবং সেন্ড করুন 2323 নম্বরে।
উল্লেখ্য আমাদের ব্লগার সালাহউদ্দীন মুহম্মদ সুমন ভাইয়ের লেখা 'নবনীতার প্রেম' গল্পটিও ছাপা হয়েছে।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ রাত ৯:২৮
২৩টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×