আমেরিকান দলিলে শেখ সাহেবের জমানার চিত্র
মিজানুর রহমান খান গত কয়েক বছর ধরেই শেখ সাহেবের মৃত্যু সংক্রান্ত গবেষণা চালিয়া যাচ্ছেন। আমরা তার এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। তাঁর গবেষনার মূল লক্ষ্য হলো সেনাবাহিনীর সেই সব লোকজন, যারা শেখ সাহেবের মৃত্যুর সাথে জড়িত। এদের একজন যদি জেনারেল জিয়া হয়ে থাকেন, তা হলে আরো কয়েকজনের মধ্যে পড়বেন মেজর জেনারেল শফিউল্লাহ, ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশারফ এবং কর্নেল শওকত। তবে এখন পর্যন্ত যা যা জনাব খান লিখেছেন, তা পড়ে মনে হয় যে উনি জেনারেল জিয়ার উপরে যতখানি ‘চটিত’, উল্লেখিত ব্যক্তিদের উপরে অতখানি ‘চটিতং’ নন।
একটা কারন হতে পারে এই যে রাশেদ মোশারফ [ খালেদ মোশারফের ভাই ] আওয়ামী লীগ করেন এবং প্রাক্তন মন্ত্রী, শওকত সাহেব বর্তমানে ডেপুটি স্পিকার, শফিউল্লাহ সাহেব এখন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য [ প্রথম আলো-তে সংবিধান লঙ্ঘন করে লেখা হয় ‘সাংসদ’ ]।
জনাব খানের মতই আমাদেরও প্রশ্ন, কেন শেখ সাহেবকে এমন অকালে, নিষ্ঠুর ভাবে, এত অপবাদ নিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হল? কেনো হত্যাকারীরা শিশু রাসেল-কে হত্যা করার সময়ে বলেছিল ‘কেউটে সাপের বংশও বাঁচিয়ে রাখতে নেই’? কিংবা সে সময়ে বিদেশ সফররত স্পিকার আব্দুল মালেক উকিল কেনো বলেছিলেন ‘ফেরাউনের হাত থেকে দেশ বাঁচল’?
মিজানুর রহমান খান আরেকটি বড় কাজ করেছেন। তিনি আমেরিকা সরকারের অবমুক্ত করা দলিল দেখে বের করতে চাচ্ছেন যে আমেরিকা সরকার এবং সি আই এ শেখ সাহেবের মৃত্যুর পেছনে একটি পক্ষ হিসাবে কাজ করেছে। আমাদের স্বাভাবিক ও সাধারন জ্ঞানে এইটুকু বলতে পারি যে কেউ নিজেদের অপকর্মের দলিল রক্ষনাবেক্ষন করে না। এমন কি আওয়ামী লীগ-ও তাদের সৃষ্ট ‘রক্ষী বাহিনী’ সমন্ধে কোন কথাই বলে না, সেখানে ঘাঘু আমেরিকানরা কেন শেখ সাহেবের মৃত্যুতে তাদের হাত আছে আমন দলিল যত্ন করে রেখে দেবে?
আমি জনাব খানের লেহা থেকেই এমন কিছু উল্লেখ করতে চাই যেগুলো ইন্ডিকেট করে যে শেখ সাহেব সে সময় কেমন ছিলেন। এই লেখাগুলো ১৫, ১৬ ও ১৭ আগস্ট ২০১০ তারিখে প্রথম-আলো পত্রিকায় মিজানুর রহমান খানের লেখা থেকে নেয়া হয়েছে। এ জন্য আমরা উনার কাছে কৃতজ্ঞ।
এক/
স্টুয়ার্ট কেনেডি: আপনি যখন বাংলাদেশে ছিলেন, তখন একাধিক অভ্যুত্থান হয়। মুজিব নিহত হন। বাংলাদেশে তখন কী ঘটেছিল?
বোস্টার: সেটা এক ভয়ংকর বিয়োগান্তক ঘটনা। সেনাবাহিনীর লোকেরা তাঁর বাসভবনে আসেন। সেই বাড়িটি আমাদের বাসভবন থেকে খুব বেশি দূরে নয়। কিছু নারী ছুরির আঘাতে হত্যার শিকার হন বলে জানা যায়। মুজিবসহ বহু লোককে হত্যা করা হয়। তাঁরা মুজিব পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করেছিলেন। সেটা ছিল নিষ্ঠুর। ভবিষ্যতে যাতে মুজিব পরিবারের কেউ ক্ষমতার উত্তরাধিকারী হতে না পারেন, সে উদ্দেশ্যেই তাঁরা অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিলেন বলে প্রতীয়মান হয়।
দুই/
‘নৈতিক দায়িত্ব’
আইজেনব্রাউন: ...পঁচাত্তরের গ্রীষ্মে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের স্বনিয়োজিত রাষ্ট্রপতি। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় বীর। পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে বাঙালিদের প্রতিরোধের প্রতীক। যদিও তিনি যুদ্ধকালে পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী ছিলেন। বাহাত্তরের গোড়ায় যখন তিনি স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশে ফিরে এলেন, তখন তাঁকে বীরোচিত সংবর্ধনা দেওয়া হয়। তিনি হলেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু তিনি দক্ষ প্রশাসক ছিলেন না, যা বাংলাদেশের জন্য খুবই দরকারি ছিল। তিনি সব ক্ষমতা নিজের হাতে কুক্ষিগত করলেন। বাংলাদেশ নিপতিত হলো একটি স্বৈরতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থায়। আমি অনুমান করতে পারি, বাংলাদেশের রাস্তায় পঁচাত্তরের গ্রীষ্মে দাঁড়ানো ছিল সত্যি ভয়ংকর। মুজিব তাঁর নিজস্ব ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী গড়ে তোলেন। সেই বাহিনী ভিন্নমত দমনে ব্যবহূত হতো। মুজিবের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনীর নাম ছিল রক্ষী বাহিনী। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছিল বাংলাদেশের সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনীকে অপমানিত করে গঠিত হলো রক্ষী বাহিনী। সুতরাং এর পরিণাম হিসেবে অভ্যুত্থানের নীলনকশা তৈরি হতে থাকল। এমনকি মুজিবের জীবনের প্রতিও এল হুমকি। বাংলাদেশের লোকজন এ নিয়ে দূতাবাসকে বলাবলি শুরু করল। ওয়াশিংটনে এ ব্যাপারে প্রতিবেদন আসতে থাকল এবং সেটা ছিল এতটাই তীব্র যে কিছুদিনের মধ্যে স্পষ্ট হলো, এসব কথাবার্তা নিতান্তই খোশগল্প নয়। শেখ মুজিবের জীবন সংকটাপন্ন বলেই প্রতীয়মান হলো। আমি স্মরণ করতে পারি যে ওই সময়ে পররাষ্ট্র দপ্তরে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বলা হয়েছে, শেখ মুজিবের জীবন যে বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, সে বিষয়ে তাঁকে সতর্ক করে দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে কি না। আলোচনায় মত এসেছে, হ্যাঁ, এ বিষয়ে আমাদের দায়দায়িত্ব রয়েছে এবং আমাদের রাষ্ট্রদূত সেটা পালন করেছিলেন।
তিন/
আইজেনব্রাউন: … আমরা অভ্যুত্থান সংঘটনের নানা হুমকির কথা শুনতে পাচ্ছি। এবং শুনতে পাচ্ছি আপনার (মুজিব) বিরুদ্ধে অনেক হিংসাত্মক পরিকল্পনার কথাও। তবে কারা এর সঙ্গে জড়িত, বোস্টার তাদের নাম বলেননি। তিনি শুধুই সতর্কতা অবলম্বনের জন্য মুজিবকে সতর্ক করেছিলেন। আমি যত দূর স্মরণ করতে পারি, মুজিব সে বিষয়ে তেমন গুরুত্ব দেননি। দায়সারা ভাব নিয়েছিলেন। মুজিব এমনকি বোস্টারকেও বলেছিলেন, ‘দেখুন, উদ্বিগ্ন হবেন না। আমি আমার লোকদের চিনি। তারা আমাকে ভালোবাসে এবং সবকিছুই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।’
চার/
স্টুয়ার্ট কেনেডি: আমি আসলে মুজিব পরিবারের কথা ভাবছিলাম। আমি বলতে চেয়েছি—
আইজেনব্রাউন: না। এটা কিন্তু সংস্কৃতিতে নেই। স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে অভ্যুত্থানকারীরা প্রত্যেককে হত্যা করেছে। এই হত্যাকাণ্ডটা ১৯১৮ সালে রাশিয়ার রাজকীয় পরিবারের হত্যাকাণ্ডের থেকে তেমন আলাদা নয়। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বাংলাদেশিরা যতটা বিস্মিত হয়েছে, প্রায় ততটাই হতবাক হয়েছে মার্কিনরা। … ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ ডেস্কে একজন কর্মরত ব্যক্তি হিসেবে আমি বলতে পারি, যুক্তরাষ্ট্র শেখ মুজিবকে সতর্ক করে দিয়েছিল। যার বিবরণ আমি আগেই দিয়েছি। …
পাঁচ/
স্টুয়ার্ট কেনেডি: শেখ মুজিব কি তখন জনপ্রিয় ছিলেন? আমি বলতে চাইছি যে তিনি কি এমন পর্যায়ে গিয়েছিলেন যে আমরা চাইছিলাম যে তিনি বিদায় নিলেই ভালো হয়? কিংবা অন্যভাবে বলা যায়, সেই সময়ে তাঁর সম্পর্কে আমাদের ধারণা কেমন ছিল?
আইজেনব্রাউন: হ্যাঁ, শেখ মুজিবের তখন কোনো প্রশাসনিক সামর্থ্য ছিল না। এবং তখন তিনি কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে উঠেছিলেন। তিনি বাংলাদেশকে একটি স্বৈরতন্ত্রে রূপান্তর করেছিলেন এবং ভয়ানক হয়ে ওঠা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সমস্যার দিকে নজর দিচ্ছিলেন না।
ছয়/
স্টুয়ার্ট কেনেডি: তা আমরা তাঁর প্রতি কেমন মনোভাব পোষণ করেছিলাম। আমি বোঝাতে চাইছি, কাউকে প্রলুব্ধ করা কিংবা আমরা আশা করছিলাম যে সেখানে অন্য কেউ এসে পড়বে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেবে? আমি আসলে বোঝাতে চাইছি, সেই সময়ে আমেরিকার অনুভূতিটা কী ছিল, সেটা আমি উপলব্ধি করতে চাইছি।
আইজেনব্রাউন: রাষ্ট্রদূত বোস্টার যুক্তরাষ্ট্রকে তাঁর কাছ থেকে কিছুটা তফাতে রাখতে চাইছিলেন। কারণ, মুজিব ক্রমাগতভাবে কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠেছিলেন। মৌলিক অধিকার স্থগিত করেছিলেন। এবং বাস্তবে তিনি তাঁর নিজস্ব ব্যক্তিগত আর্মি গড়ে তুলছিলেন। . . . তবে ওই সময় আমরা অর্থনৈতিক সহায়তা এবং রাজনৈতিক বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করেছিলাম। মুজিব সোভিয়েতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে আগ্রহী ছিলেন। এবং সোভিয়েতদের ব্যাপক উপস্থিতি ছিল বাংলাদেশে। তিনি সমাজতন্ত্রের কথা বলতেন, যা ওয়াশিংটন সুনজরে দেখত না। তবে সমাজতন্ত্র বিষয়ে তিনি যা বলতেন, তা ছিল অবশ্যই বাগাড়ম্বরপূর্ণ। আমি এমন কিছুই জানি না যে তিনি নির্দিষ্টভাবে এমন কোনো নীতির বাস্তবায়ন করেছিলেন, যাকে সমাজতান্ত্রিক বলতে পারেন। তাঁর সরকারের কাঠামোতে সমাজতন্ত্রের কোনো ছাপ ছিল না। . . .
সাত/
স্টুয়ার্ট কেনেডি: ১৯৯৬-তে আপনি যখন বাংলাদেশে গেলেন, তখন সেখানে পরিস্থিতি কেমন ছিল?
আইজেনব্রাউন: . . . যেমনটা আমি বলছিলাম, ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ডের পরে আওয়ামী লীগ নিন্দিত হয়েছিল। এবং বহু বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর তেমন ভূমিকা অনুভূত হয়নি। শেখ হাসিনা দেশের বাইরে ছিলেন। দেশে থাকলে তিনিও হত্যার শিকার হতেন। . . .
শেখ হাসিনা তাঁর জ্ঞান হওয়ার পর থেকে বিশ্বাস পোষণ করেন যে তাঁর পিতার হত্যাকাণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের হাত ছিল কিংবা আসন্ন অভ্যুত্থান সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র জানত। কিন্তু তাঁর পিতাকে হুঁশিয়ার করে দিতে যুক্তরাষ্ট্র কোনো ভূমিকা রাখেনি। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তাঁর মনে থেকে যায় তীব্র অসন্তোষ। যেমনটা আমি আগেই বলেছি, আমরা শেখ মুজিবকে সতর্ক করেছিলাম যে তাঁর হত্যাকাণ্ড আসন্ন। কিন্তু তিনি তা উড়িয়ে দিয়েছিলেন। আমরা অবশ্যই তাঁর হত্যাকাণ্ডে কোনো ভূমিকা পালন করিনি।
আট/
চার্লস স্টুয়ার্ট কেনেডি প্রশ্ন করেন, শেখ মুজিব সম্পর্কে আপনার অনুভূতি কী ছিল?
বোস্টার বলেন, তিনি খুবই ক্যারিশমেটিক বা আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি এক বিস্ময়কর লোক। আপনি শুধু তাঁর দিকে তাকানোমাত্রই তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে পছন্দ করবেন। অভিভূত না হয়ে আপনার উপায় থাকবে না। আপনি যদি তাঁকে দেখতে যান, তাহলে আপনি দেখবেন অবাক দৃশ্য। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা লোকজন তাঁকে দেখতে ভিড় করে আছে। আমি নিজে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে অভিভূত হয়েছি। . . . তিনি এমন একজন ব্যক্তি বাংলাদেশের ইতিহাসে, যার একটি বিশিষ্ট অবস্থান রয়েছে। তিনি হলেন বাংলাদেশের জর্জ ওয়াশিংটন, যিনি বাংলাদেশকে স্বাধীনতা দিয়েছেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় বিষয় কীভাবে পরিচালনা করতে হয়, ব্যবস্থাপনাগত সেই মেধা তাঁর ছিল না। অধিকতর ব্যবস্থাপনাগত মেধাবী ব্যক্তিদের দরকার ছিল। মুজিব ছিলেন একটি রাজনৈতিক সাফল্য এবং একটি ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা।
বোস্টার অবশ্য মুজিবের বাকশাল গঠনের পর ঢাকা থেকে প্রেরিত একটি বার্তায় মন্তব্য করেছিলেন, তিনি (মুজিব) স্বৈরশাসকের চিরায়ত বৈকল্যে ভুগতে শুরু করেছেন।
নয়/
বোস্টার স্টুয়ার্ট কেনেডিকে বলেন, ‘যে-ই আসুক না কেন, মুজিব হত্যার পরের নতুন সরকারকে স্বীকৃতি দিতে হয়েছিল। কিসিঞ্জার মোশতাক সরকারকে দ্রুত স্বীকৃতি দিতে সংকল্পবদ্ধ ছিলেন। খুনিদের প্রতি যথেষ্ট সহানুভূতি দেখান তিনি। ফারুক রহমানরা সে কারণে ব্যাংককে গিয়েও মার্কিন কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন’।
শেষ কথাঃ
সব লেখারই একটা উসংহার থাকা লাগে। আমাদের সেই উপসংহারটি লেখা দরকার এ জন্য যে, প্রথমে আমরা ধন্যবাদ দিতে চাই মিজানুর রহমান খান-কে, তিনি শ্রম সাধ্য এই কাজটি করেছেন। আমাদের কারো এত ধৈর্য্য নেই যে ইন্টারনেট ঘেঁটে এইসব বের করব। [ অবশ্য আমাদের অন্য কাজও আছে যে কারনে সময় বের করতে পারি না ]।
শেখ সাহেবের শাসন কাল নিয়ে আমাদের মধ্যে একটা উৎসুক্য কাজ করে। আমরা জানতে চাচ্ছিলাম শেখ সাহেবের শাসন আমল সমন্ধে আমরা যা যা শুনে এসেছি, তা কতখানি সত্য। জনাব খান তার লেখাতে শেখ সাহেবের শাসন কাল নিয়ে অপ্রিয় কথাগুলো এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন। কিন্তু তার চেপে যাওয়ার চেষ্টার পরেও প্রকাশিত দলিল থেকে সে সময়ের কিছু চিত্র বের হয়ে এসেছে।
তাই উনার লেখা আর প্রকাশিত দলিলে ছিটে ফোঁটা বের হয়ে আসা আমাদের ইতিহাসের ১৯৭২-১৯৭৫ সময়কালের নোংরা কাহিনীগুলো কি জনাব খান নিরপেক্ষ ভাবে তুলে ধরবেন আমাদের সামনে, এই প্রশ্ন মনে চলে আসে।
উপরের সামান্য লেখা থেকে দেখা যাচ্ছে যে সেখ সাহেবের আমলে এমন কিছু ঘটেছিল যা কিনা সবার পক্ষে ভাল হয় নাই। রক্ষীবাহিনীর কথা এসেছে, তারা কি করে নাই, তার যে সব বিবরণ আমরা পড়েছি, তাতে এই একটি কারনেই শেখ সাহেবের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হয়ে যায়। কিন্তু এর সাথে যুক্ত হয়েছিল তাঁর সোনার ছেলেদের [ যথা কামাল ] কীর্তিসমুহ। এখন শেখ কামালের বোন যত কিছুই বলুন না কেন, কামাল কেমন ছিল তা ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়ে গেছে।
আমার একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এখানে উল্লেখ করতে চাই। সেটা ১৯৯৫ সালের কথা। শেখ সাহেবের বাড়ি তখন কেবল যাদুঘর হিসাবে খোলা হয়েছে। আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে সেখানে বেড়াতে গিয়েছিলাম। স্পষ্ট খেয়াল আছে, কামালের বাথরুমের দেওয়ালে উলংগ মডেলদের চিত্রসহ ১৯৭৫ সালের ক্যালেন্ডার ঝুলছে। প্রেসিডেন্টের ছেলের বাথরুমে তো এমন ক্যালেন্ডার তো থাকতেই পারে, তাই না?
শেখ সাহেব একজন মানুষ ছিলেন। তাঁর অনেক ত্রুটি ছিল। সে ত্রুটিগুল যখন অনেক বড় মাপ্রে হয়ে দেখা দিল, তিনি সমাজের বিভিন্ন স্তরে বিরক্তি উৎপাদন করেলেন, কেউ কেউ রেগে গেল। ফলাফল এমনই হোত, খালি একটু আগে আর পিছে। সে সময়ের বাস্তবতায় যা ঘটেছিল, তার জন্য শেখ সাহেবের অমন পতন হয়েছিল।
এর চৌত্রিশ বছর পরে তাঁর খুনীদের ফাঁসী হয়েছে।
বাংলার মানুষের উপরে অত্যাচার করে যারা এক সময় জনগণের বিরাগভাজন হয়েছিলেন, তারা মারা গেছেন অপঘাতে। সেটা ছিল একটা প্রতিশোধ। আবার যারা ওই হত্যাকান্ড ঘটিয়েছিলেন, তাদেরকেও মৃত্যু বরন করতে হয়েছে। পরকালে কি বিচার হয় আমরা জানি না, কিন্তু সৃষ্টিকর্তা পৃথিবীর বুকেই বিচার অনেকখানি সেরে রাখেন, তা শেখ সাহেবের মৃত্যু আর তার খুনীদের ফাঁসী কার্যকরের ঘটনায় প্রমানিত হল।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই আগস্ট, ২০১০ রাত ৮:১৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


