somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কর্নেল জাফর ইমামের স্মৃতিতে ৩ নভেম্বর

০৩ রা নভেম্বর, ২০১০ রাত ৮:৩০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



[ কপি - পেস্ট ]
Click This Link



ঢাকা সেনানিবাসে জেনারেল জিয়াকে অঘোষিতভাবে নিরাপত্তার অজুহাতে গৃহবন্দী রাখা হয়। বাসার টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় ক্যাপ্টেন হাফিজ উল্লাহর নেতৃত্বে একদল সেনাসদস্য। অন্যদিকে বঙ্গভবনে তখন জমে ওঠে মূল নাটক। চতুর্থ বেঙ্গল থেকে বঙ্গভবনের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার আগেই আমরা কয়েকজন পেঁৗছে যাই বঙ্গভবনে।

বঙ্গভবনে মন্ত্রিপরিষদ কক্ষে তখন মোশতাক, তার মন্ত্রিপরিষদ ও ওসমানীর মধ্যে খালেদের নানা প্রশ্নে তুমুল বিতর্ক চলছিল। কক্ষের বাইরে সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ উল্লাহ পায়চারী করছিলেন ও হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে কাঁদছিলেন। আমার সঙ্গের একজন তাকে জিজ্ঞেস করল, আপনাকে এমন বিষণ্ন, ভীত ও হতাশাগ্রস্ত দেখাচ্ছে কেন? উত্তরে তিনি বললেন, 'কী হয়ে গেল, কী হলে গেল!' ইতিমধ্যেই সাফায়াত জামিলের নেতৃত্বে সন্ধ্যার পর চতুর্থ বেঙ্গল থেকে কর্নেল গাফফার, ক্যাপ্টেন তাজ, হাফিজ, ক্যাপ্টেন হুমায়ুন, মেজর হাফিজউদ্দিন, মেজর ইকবাল প্রমুখ মন্ত্রিপরিষদের সভাকক্ষে। প্রায় সবার হাতেই স্টেনগান, পিস্তল। তারা তেড়ে গেলেন মোশতাক ও মন্ত্রীদের দিকে। অনেক অফিসার চিৎকার করে বললেন, 'ইউ হ্যাভ সিন ডালিম। ইউ হ্যাভ নট সিন ফাদারস অব ডালিম!' আবার কেউ বললেন, 'ইউ ব্লাডি কিলারস। উই শ্যাল নট স্পেয়ার ইউ।' কয়েকজন বললেন, 'কিসের সমঝোতা, কোনো সমঝোতা চলবে না। জেলহত্যার ব্যাপারে এ মুহূর্তে আমরা জানতে চাই এবং এর দায়দায়িত্ব কাউকে না কাউকে নিতে হবে।' মোশতাক চেয়ারে বসেছিলেন, তার চারপাশে বসা মন্ত্রীদের অধিকাংশই চেয়ার ছেড়ে সামনের টেবিলের নিচে গিয়ে চিৎকারে করে বলছিলেন, 'আমরা নই, আমরা নই। আমরা কিছু জানি না। জেলহত্যার প্রতিবাদে আমরা পতদ্যাগপত্র দিয়েছি। ওই দেখেন। এগুলো মোশতাক সাহেবের সামনে আছে।' ওই সময় মোশতাকের সামনের টেবিলের ওপর কিছু দরখাস্ত ছিল। জেনারেল ওসমানী দিগ্বিদিক ছুটোছুটি করছিলেন এবং আগত অফিসারদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করছিলেন। কারণ কক্ষজুড়ে হইচই ও উত্তপ্ত বাক্য ছোড়া হচ্ছিল একতরফাভাবে। অনেকে আবার স্টেনগান কক করে গুলি করার উদ্যোগ নিচ্ছিলেন। কক্ষের ভেতর চলছিল অফিসারদের একতরফা হুমকি ও গালিগালাজ। একপর্যায়ে জেলহত্যা সম্পর্কে মোশতাককে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হলো। তিনি স্বীকার করলেন, দু-দুবার জেল কর্তৃপক্ষের কাছে তিনি টেলিফোন করেছিলেন এবং পুরো ব্যাপারটি সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন। তখন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জেলার ছিলেন ফরিদপুরের আমিনুর রহমান মিন্টু। ওই মিন্টু এখন জেলহত্যা মামলার সাক্ষী। অথচ খুনিচক্র যখন চার নেতাকে হত্যার পর কারাগার থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক ওই সময় তাদের পুনরায় কারাগারে ডেকে নেন এই মিন্টু। ওই সময় তিনি তাদের বলেন, চারজনের মধ্যে এখনো একজন জীবিত। ওই সময় অর্ধমৃত অবস্থায় ছিলেন ক্যাপ্টেন মুনসুর আলী। মিন্টুর ডাকে সাড়া দিয়ে খুনিচক্র পুনরায় তাকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে কারাগার ত্যাগ করে। রাত আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে। কয়েকটি সিদ্ধান্ত মোটামুটি চূড়ান্ত হয়। খালেদকে পদোন্নতি দিয়ে সেনাপ্রধান করা হলো। মোশতাককে বঙ্গভবনের ওপর তলার একটি কক্ষে গৃহবন্দী রাখার সিদ্ধান্ত হলো। আমাকে ও ক্যাপ্টেন দীপককে দায়িত্ব দেওয়া হলো মোশতাককে এসকর্টসহ ওই কক্ষে নিয়ে যাওয়ার। আমি ও ক্যাপ্টেন দীপক তা-ই করলাম। মোশতাককে কক্ষে রেখে ক্যাপ্টেন দীপককে দায়িত্ব দিয়ে আমি ওই স্থান ত্যাগ করার আগে মোশতাককে জিজ্ঞেস করেছিলাম, 'এখন আপনার চিন্তা ভাবনা কী?' মোশতাক বিচলিত না হয়ে ঠান্ডা মাথায় আমাকে উত্তর দিলেন, 'ওয়েট অ্যান্ড সি।' তখন বুঝলাম, এই লোকটি কোনো সহজ ব্যক্তি নন। মনে হচ্ছিল, তার ষড়যন্ত্র তখনো শেষ হয়নি। আমি নিচে নেমে এলাম। সভাকক্ষে তখন মোশতাকের মন্ত্রীদের পরবর্তী সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে বলা হলো। আমরা কয়েকজন অফিসার খালেদকে রেডিও বন্ধ না রাখার পরামর্শ দিলাম। এও বলা হলো, 'ড্রাফট তৈরি আছে। আপনি জাতির উদ্দেশে কিছু বলতে পারেন। কিংবা আপনার পক্ষ থেকে আমাদের একজন রেডিওতে ঘোষণা পাঠ করতে পারে।' উত্তরে খালেদ মোশাররফ বললেন, 'ইউ ওয়ান্ট টু বি অ্যানাদার ডালিম।' তিনি আরো বললেন, 'বিচারপতি সায়েমের ব্যাপারে আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি দায়িত্ব দেওয়ার জন্য। সায়েম অথবা তার জায়গায় নতুন যিনি দায়িত্বে আসবেন, তিনিই দেশবাসীর উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। অপেক্ষা করো সব ঠিক হয়ে যাবে।' ওই রাতে বিচারপতি সায়েম দায়িত্ব নিতে সম্মতি জানালেন। প্রায় সারা রাত সবাই বঙ্গভবনে ছিল। অনেক রাজনীতিবিদ, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা ওই রাতে বঙ্গভবনে খালেদের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করছিলেন। খালেদ খুব ঠান্ডা মাথায় সবকিছু মোকাবিলা করলেন। ৩ নভেম্বরের এই অভ্যুত্থানের পেছনে কোনো রাজনৈতিক সমর্থন আছে কি না, নাকি নতুন করে সমর্থন প্রয়োজন, নিজের কর্মকাণ্ড ও পদক্ষেপগুলোতে এ ধরনের আভাস যাতে না থাকে সে ব্যাপারে খালেদ খুব সতর্ক ছিলেন এবং অন্যদেরও সতর্ক করে দিয়েছিলেন। কারণ তা না হলে সেনাবাহিনীর ভেতরে ও বাইরে ভুল-বোঝাবুঝির সৃষ্টি হতে পারে। খালেদ ব্যক্তিগতভাবে বঙ্গবন্ধুর ভক্ত ছিলেন এবং আওয়ামী লীগের প্রতি তার কিছুটা দুর্বলতা ছিল। আওয়ামী লীগের অনেক নেতার সঙ্গে তার সুসম্পর্ক ছিল। এ জন্য তিনি আরও বেশি সতর্কতা অবলম্বন করছিলেন। খালেদ যদি টিকে যেতেন এবং দেশে যদি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হতো, সে অবস্থায় আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে অবশিষ্ট ষড়যন্ত্রকারীরা (যারা পরে পর্যায়ক্রমে দল ছেড়ে গেলেন) কোণঠাসা হয়ে পড়তেন এবং শেখ সাহেবের বিশেষ অনুগত নেতা-কর্মীরা আবার নতুনভাবে সুসংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেতেন। তখন এদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হতো জাসদ, ন্যাপ ও বামপন্থীরা। ৪ নভেম্বর বঙ্গভবনে প্রায় শেষরাতে সিদ্ধান্ত হলো মঞ্জু ও তাহের ঠাকুরকে বঙ্গভবন থেকে সরাসরি জেলে পাঠানো হবে। বাকিদের নিজ নিজ বাসায় ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হলো। তবে শর্ত ছিল, কেউ বাসা ছেড়ে যেতে পারবে না। এ ব্যাপারে সরকারেরও নজর থাকবে। রাত শেষ হয়ে গেল। নতুন দিনের আলো উঁকি দিল। সবাই ফিরে গেল নিজ নিজ অবস্থানে।
৪টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×