লোকটার নাম কি কেউ বলতে পারবে?? না.....লোকটার নাম কেউই জানে না। কয়েকজন জানতে চেষ্টা করেছিলো। কিন্তু কোনভাবেই জানতে পারেনি। ঢাকার বিভিন্ন রাস্তায় সবসময় লোকটিকে দেখা যায়। রাস্তায় দাড়িয়ে প্রবল উৎসাহে ট্রাফিক কন্ট্রোল করতে থাকে। বলতে চাচ্ছি ধরুন আপনি রাস্তা পার হবেন। কিন্তু অতিরিক্ত গাড়ির চাপে ভরসা পাচ্ছেন না। যদি এই লোকটি সেই সময়ে সেই রাস্তায় থাকে তাহলে আপনাকে নিজ থেকে আর কিছু বলতে হবে না। একদম নিজ দায়িত্বে সে আপনাকে রাস্তা পার করিয়ে দিবে। কিন্তু কেন জানি আপনি উনার সাথে কথা বলতে গেলে কোন লাভ হবে না। আপনার কোন কথার জবাব লোকটি দিবে না। আপনাকে রাস্তা পার করে দেবার পরই তার দায়িত্ব শেষ। এরপর হয়তো সে আরেকজনকে সাহায্য করতে যাবে। অথবা রাস্তার পাশে চুপচাপ দাড়িয়ে থাকবে।
কিন্তু এই লোকটির একটা অদ্ভূত ব্যাপার আছে। অনেককেই সেটা অবাক করে আবার অনেককেই সেটা ভয় পাইয়ে দেয় আবার অনেকে এর জন্য লোকটিকে পাগল বলে মনে করে। ধরুন লোকটি একটি রাস্তায় আছে। মানুষদেরকে রাস্তা পার করে দিতে সাহায্য করছে। হঠাৎ করে বৃষ্টি পরা শুরু করলো।
লোকটির তখন কি যেন হয়ে যায়!!!! চিৎকার করে কেদে উঠে সে। মুহূর্তেই ভয়ংকর হয়ে উঠে লোকটির চেহারা। যেন প্রচন্ড কষ্টে সে মারা যাচ্ছে। রাস্তায় এদিক উদিক ছুটোছুটি করতে থাকে। প্রচন্ড চিৎকারের সেই কান্না খুব খারাপভাবে তখন বুকে লাগে। রাস্তায় যদি সেই সময় কোন বাস যায় তাহলে লোকটি সেই বাসটিকে ধাওয়া করে। রাস্তা থেকে ইট-পাথর তুলে বাসটির দিকে ছুড়ে মারে। তার গলার স্বরের শব্দ শুধুমাত্র সেই সময়েই শুনা যায়। আর আশেপাশের মানুষ বা রাস্তার মানুষ তখন অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। লোকটির জন্য তখন কারো খারাপ লাগে...কেউ বা বিরক্ত হয়......আবার কেউ বা ভয় পেয়ে কিছু বলে না।
যাই হোক এক রাস্তায় কিন্তু লোকটিকে সবসময় দেখা যায় না। পুরো শহরেই সে ঘুরতে থাকে....আর রাস্তা পারাপারে মানুষকে সাহায্য করতে থাকে........শুধু বৃষ্টির দিন ছাড়া।
লোকটির নাম হলো আসাদ। বেশ কয়েকবছর আগের ঘটনা মনে হয়। আসাদের সাথে একটি মেয়ে ছিলো। মেয়েটির নাম হলো রুবা। দুজনে সেদিন রিকশায় ছিলো।
রুবা: আজ কোথায় যাবে??
আসাদ: এখনো ঠিক করতে পারছি না। চলো আগে কতক্ষণ রিকশায় ঘুরে নেই। তারপর কোন একটা ভালো রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসা যাবে।
রুবা: আমার আজকে ভালো লাগছে না। আজকে আমাকে বাসায় নামিয়ে দাও না!!!
আসাদ: আরে না!!! কতক্ষণ থাকো। সব ঠিক হয়ে যাবে।
অনেকক্ষণ রিকশায় ঘুরে তারা তাদের প্রিয় একটি রেস্টুরেন্টের কাছে এসে রিকশা থামালো। রেস্টুরেন্ট রাস্তার ওপারে। রাস্তা পার হতে হবে।
সেদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছিলো। দুজনে রাস্তা পার হতে লাগলো। রাস্তার অর্ধেক পার হয়ে গেলো। রুবা আবার রাস্তা পার হতে খুব ভয় পায়। আসাদ মাঝে মাঝে এটি নিয়ে দুষ্টামি করতে ছাড়েনা। রাস্তা অর্ধেক পার হবার পরই আসাদ দৌড়ে রুবাকে ফেলেই ওইপারে চলে যায়। তারপর রুবার দিকে তাকিয়ে হাসতে থাকে।
রুবার মেজাজ খারাপ। মাঝে মাঝে আসাদের উপর এমন বিরক্ত লাগে!!! দরকার নাই তার। সে একাই আজ রাস্তা পার হবে। রুবা সামনের দিকে পা বাড়ায়।
চোখের সামনে আসাদ দেখতে পেল একটি দ্রুত গতির বাস এইদিকেই ছুটে আসছে। রুবাও সামনে এগুচ্ছে। কিছু বলা বা করার আগেই বাসটি রুবাকে..................
চোখের সামনে রুবাকে মারা যেতে দেখলো আসাদ। খুব বৃষ্টি হচ্ছিলো সেদিন।
কি!! লোকটির জন্য খুব খারাপ লাগছে??? লাগারই কথা। যাই হোক আমরা আবার বর্তমানে ফিরে আসি।
আজকে হলো রবিবার। আকাশটা সকাল থেকেই মেঘলা। বলা যায়না!!! যেকোন সময় বৃষ্টি নেমে যেতে পারে। ঢাকা শহরের একটি ব্যস্ত্ব রাস্তা। আসাদ নামের সেই লোকটি রাস্তায় দাড়িয়ে আছে। এক অন্ধ লোক হঠাৎ করে রাস্তা পার হবার জন্য সামনে আসলো। কিন্তু এত গাড়ির শব্দ শুনে ভরসা পাচ্ছে না।
আমাদের আসাদ অন্ধ সেই লোকটির কাছে ছুটে আসলো। অন্ধ লোকটি কিছু একটা বললো কিন্তু জবাব না পেয়ে আর কথা বাড়ালো না। আসাদের হাত ধরে রাস্তা পার হতে লাগলো।
অর্ধেক রাস্তা পার করা হয়েছে কি হয় নাই.....এমন সময় তুমুল বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো।
আসাদ থমকে দাড়িয়ে গেলো!!! অন্ধ লোকটির হাত হ্যাচকা টান দিয়ে ছাড়িয়ে নিলো। ভয়ংকর রাগে আকাশের দিকে তাকালো। তারপর প্রচন্ড গায়ে শিউড়ে উঠার মতো চিৎকার দিয়ে কাদতে শুরু করলো। অন্ধ লোকটি তখনও রাস্তার মাঝখানে দাড়িয়ে এদিক-ওদিক ইতস্ত্বত করছে। কান্নার শব্দের বেচারা ভড়কে গেছে। হঠাৎ সামনে হাত বাড়ানোর একজন লোকের শরীরের ছোয়া পেল। এ ছিলো আমাদের আসাদের শরীর। চিৎকার করে অমানুষিক কষ্টে বিলাপ করে যাচ্ছে সে। ওইতো সামনে একটা বাস আসতে দেখা যাচ্ছে!!! আসাদ অন্ধ লোকটিকে আবার ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে ইট-পাথর খোঁজতে লাগলো।
আশেপাশের দোকান-বাসাবাড়ির মানুষ তখন দাড়িয়ে দাড়িয়ে ঘটনাটি দেখছিলো। কিন্তু একজন অসহায় অন্ধ মানুষকে রাস্তা পার করে দেবার থেকে তারা বৃষ্টির হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করা ভালো মনে করলো।......কিন্তু......একটু পরের দৃশ্য দেখে সব মানুষ শিউড়ে উঠলো। তারা দেখলো প্রচন্ডভাবে কাদতে থাকা একটি লোক অন্ধ সেই লোকটিকে ধাক্কা দিয়ে অন্যদিকে ফেলে দিয়েছে। সেই সময়...রাস্তার ওপর পাশ থেকে আসা একটি দ্রুতগতির গাড়ি অন্ধ লোকটির উপর দিয়ে..........মানুষগুলোর এবার হুশ হলো। সবাই ‘হায় হায়’ করতে করতে দৌড়ে গেলো।
এদিকে আমাদের আসাদ তখন একটি বাস পেয়ে তার পিছনে দৌড়ে যাচ্ছে আর ইট ছুড়ে মারছে। কান্না কিন্তু থেমে নেই।
পরদিন একটি দৈনিক পত্রিকার খবর
রাস্তা পার হতে গিয়ে পাগল ছদ্মবেশী ছিনতাইকারীর আক্রমণে আহত হয়ে একজন অসহায় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী লোকের গাড়ির তলায় পিষ্ট হয়ে নির্মম মৃত্যু। স্হানীয় মানুষ সেই ছিনতাইকারীকে পাকড়াও করে এবং গণপিটুনী দেয়। পুলিশ এসে জনগণের রোশানল থেকে লোকটিকে উদ্ধার করতে চেষ্টা করে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে। প্রচন্ড গণপিটুনীতে আহত হয়ে সেই পাগল ছদ্মবেশী ছিনতাইকারীটি সেখানেই মৃত্যুবরণ করে। পুলিশ পরে তার লাশ উদ্ধার করে নিয়ে যায়।
হায় রে আসাদ!!! তোর জন্য খারাপই লাগছে। কি অসহায় পরিণতি হলো তোর!!!!
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই ডিসেম্বর, ২০১২ সন্ধ্যা ৬:২৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



