
০১.
বিকেলের কোল থেকে ঝুপ করে যখন নিস্তব্ধ সন্ধ্যাটা নেমে আসে চোখের পাতায় আমি তখন টানা বারান্দায় দুই পা মেলে স্থির হয়ে বসে চক্ষু মুদে বাঁশি বাজাই। সব সন্ধ্যার আকাশের রং আমাকে ছুঁতে পারে না। আমাকে ছোঁয় সাদা, ছোঁয় কালো আর ছোঁয় আলো। কখনো দূর থেকে ঝাপসা চোখে ছোপ ছোপ আলো দেখতে পাওয়া যায় কিছু পতঙ্গের শরীরে - তাদের নাম জোনাকি। কাছে গেলেই সে আলো উধাও। অনির্বাণ আলোর মশাল দেখতে পাওয়া দুরূহ। অন্ধকারের ভেতর দিনরাত্রির পালাবদলে আমার চোখ তাই অন্ধকারেই সমাহিত। অন্ধকারের রং কালো। এক হাজার একটা রাত্রি নিঃশব্দে জাগরণের কালে আমি রাতের আঁধারের বুক থেকে ছিনিয়ে নেই এক টুকরো জোনাক আলো আর তাকে বেঁধে রাখি চোখের কোটরে। সেই আলোয় আমি আঁধার দেখি,আঁধার চিনি,আঁধারকে ভালবাসি.........
শুধু তাকে ছুঁই না!
০২.
কেউ কেউ বলে তাদের চোখের ভেতর বাসা বেঁধে থাকে স্বপ্ন। আমি স্বপ্ন দেখতে পারি না। আমার চোখের ভাঁজে তারা বাসা বাঁধেনি কখনো। আমি শুধু কিছু চিত্রকল্প দেখি বা আঁকি। শরত আকাশের শাদা মেঘ থেকে কিছু শুভ্রতা আমি চুরি করে আনি তাদের গায়ে মাখাব বলে। তাদের গায়ে জলের দাগ থাকে না,থাকে না রাতচেরা অন্ধকার অথবা কোনো হিমশীতল বায়ুপ্রকোষ্ঠ। ধীরে ধীরে জন্ম নেয় এক আলোক অভিসারী সূর্য - আমি তাকে টাঙিয়ে দেই চেতনার শূন্য দেয়ালে, সেখানে সে ঝুলে থাকে অবিনাশী রাত জাগা নক্ষত্র হয়ে। নক্ষত্রেরও যেমন আছে মৃত্যু - তেমনি তাদের মৃত্যু হলে আমি ঘুম ঘুম চোখে জলের দাগ মুছে ফেনিল সাগরে ডুব দিয়ে তুলে আনি একরাশ মুক্তোবিহীন শামুক। শামুকের পিঠে লিখে রাখি স্মৃতিভ্রষ্টের তন্দ্রালিপি..........আর রংধনুর স্লেট থেকে মুছে দেই সব পটে আঁকা ছবি.........
০৩.
সবাই জানে পরমের অস্তিত্ব অনুপস্থিত পৃথিবীতে। মানে না প্রায় কেউই। পরমকে ভালবাসে সবাই এবং হতে চায় পরম - শুধু ভুলে গিয়ে যে আমরা জন্ম থেকেই এক একটি আপেক্ষিক উপাদান। এবং আপেক্ষিক আমাদের পৃথিবীও। যা নেই তার প্রতি মানুষের আকর্ষণ স্বাভাবিক এবং তা দুর্নিবার। সুতরাং আমরা ভ্রান্তিতে ডুব দিয়ে কল্পনার বেনোজল থেকে অবাক জলপান করতে ভালবাসি। অবশেষে মরীচিকার কাচের দেয়ালে সশব্দে ধাক্কা খাবার পর আমরা অদৃষ্টকে অভিসম্পাত করে প্রমান করতে চাই - আমাদের পরম জীবন্ত ছিল।
মানুষ সবচাইতে ভ্রমগ্রস্থ প্রাণী।
আমি তা জানি।
তবু আমি মানুষ হয়ে রইলাম.......এবং আমরা মানুষই হয়ে রইলাম.......
০৪.
আমার হাতে তিনটে ঘুড়ি ছিল। সবুজ, শাদা ও নীল। আমি জানতাম আমি নাটাই ধরে রাখতে জানি শক্ত করে আর ঘুড়িগুলো সব উড়িয়ে দেই মুক্ত আকাশে ঝিলমিল তারার মত। ঘুড়িদের রং বদলানো আমার চোখে দুঃসহ তবু ঘরে ফেরার পর একদিন দেখি সবুজ ঘুড়ির রং কালো, শাদা ঘুড়ি বেগুনি আর নীল ঘুড়ি ফ্যাকাশে। আমি চেয়েছিলাম আমার শাদা ঘুড়ি হোক শাদা ,সবুজ ঘুড়ি সবুজ ও নীল ঘুড়ি নীল। আমার রঙের বাক্স হারিয়ে গিয়েছিল চিরতরে .....তাকে আমি আর খুঁজে পাইনি কখনো।
অতঃপর আমি নাটাই ফেলে ঘুড়িগুলো একে একে ছিঁড়ে চিরদিনের মত উড়িয়ে দিয়েছি আকাশে.........কেননা রং বদলানো ঘুড়ির নাটাই কখনো ধরে রাখতে নেই........তারা অভিশাপ হয়ে সর্পের মত দংশন করে!
এখন আমার হাতে ঘুড়ি নেই কোনো।
ঘুড়ি ছেঁড়ার দিনকে আমি ভয় করি।
কেননা দিনগুলি একফালি শিরীষের মত আমার সমস্ত রং নিংড়ে নিয়ে আমাকে নিঃশেষ করে রেখে গেছে শিউলিফুলের বনে..........
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে জুন, ২০১০ সকাল ১০:৩১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


