ট্রিনিটিতে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম প্রথমত ক্যাম্পাস দেখে, সম্ভবত সবাই হয় তা না হলে বছরে দশ লক্ষের উপরে পর্যটক একটা বিশ্ববিদ্যালয় দেখতে আসতো না এবং দ্বিতীয়ত ট্রিনিটির মেয়েদের দেখে। এরকম বেহায়ার মত একটা স্বীকারোক্তি কিছুটা চরিত্রহীনের মত শোনায় বটে, তবে সততার সাথে বলছি, আমি সত্যই তাদের দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। নজরুলের লেখা জীবনের প্রথম প্রবন্ধ ছিল "তুর্কি মেয়ের ঘোমটা খোলা" যেখানে নজরুল তুরষ্কের মেয়েদের রুপের অগুনের তিব্রতা বর্ননা করেছিল। সেটা যেহেতু চরিত্রহীনতার দায়ে অক্রান্ত হয়নি, অতএব আমার এই ছেলেমানুষী ব্লগটাও সেই দোষে দোষী হবে না আশা করছি।
মূল প্রসঙ্গ থেকে সরে গিয়েছি অনেকটা। ফিরে আসার চেষ্টা করা যাক। ট্রিনিটির মেয়েদের কথা বলছিলাম। আসলে ট্রিনিটির মেয়ে বললে ভুল বলা হবে বরং আইরিশ মেয়ে বলাই ভালো, আরও ভালো যাদি বলা হয় ব্ল্যাক আইরিশ। ইউরোপের মেয়েদের দেখলে প্রথম আমার যে অনুভুতিটা কাজ করে সেটা হলো - লিলিপুটের দেশে গালিভার যাবার পরিবর্তে, গালিভারের দেশে লিলিপুট চলে এসেছে। এমনিতেই আমি যথেষ্ট খাটো তার উপর ছয় ফুটের উপরে যাদের উচ্চতা তাদের দেখলে এরকম অনুভুতি না আসাটাই সম্ভবত অস্বাভাবিক। কিন্তু আয়ারল্যান্ড যেন এর ব্যতিক্রম। আইরিশ মেয়েরা বাঙালী মেয়েদের মতই খাটো এবং বেশ স্লিম। তার উপর তাদের কালো চুল আর কালো ভ্রু যেন ফর্সা মুখে অপূর্ব এক কালো - সাদার কম্পোজিশন। বলাইবাহুল্য তাদের এই ব্যতিক্রমী কালো চুলের জন্য তারা পৃথিবী বিখ্যাত এবং ব্ল্যাক আইরিশ শব্দের উৎপত্তিও এ কারনেই। আয়ারল্যান্ড দ্বীপ ছেড়ে ৪৫ মিনিটের একটা ছোট্ট ফেরী ভ্রমন শেষে যদি পাশের গ্রেট ব্রিটেন দ্বীপে যাওয়া হয় তাহলেই সব যেন আকাশ পাতাল মনে হবে। ছয় ফুট লম্বা এবং ক্ষেত্রবিশেষে সেরকমই চওড়া ব্রিটিশ মেয়েদের দেখলে দ্বিতীয়বার আর তাকাতে ইচ্ছে করবে না। যেহেতু আমি ট্রিনিটির ছাত্র, তাই আইরিশ মেয়ে দেখার যেটুকু সুযোগ হয় তার প্রায় সবই ট্রিনিটির মেয়ে, তাই তাদের সে নামেই ডাকছি এই ব্লগে।
এই ট্রিনিটির মেয়েদের আরেক বিশেষত্ব হচ্ছে তাদের মিনি স্কার্টগুলো, যেগুলোকে মিনি কেন বলা হয় এবং মাইক্রো কেন বলা হয় না, এটা আইরিশ পার্লামেন্টে যদি সাধারন প্রশ্ন হিসেবে উত্থাপিত হয়, তবে আমার মতে সেটা যৌক্তিকই হবে। একটা ছোট্ট উদাহরন দিচ্ছি। স্টুডেন্ট ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট ইলেকশনের সময় এক প্রার্থী তার সমর্থকদের জন্য বিশেষ টি-শার্ট বানিয়ে ছিল যেটা পড়ে ছেলে-মেয়েরা রাস্তায় প্রচারনা করছিল। তাদের মাঝে একটা মেয়ে ছিল যে মিনি স্কার্ট (আপাতত, একটু পরে একে মাইক্রো বলে আপনিও স্বীকার করবেন) পরে ছিল। মেয়েটা তার টপস্ এর উপরে টি-শার্টটা পড়লো এবং সাথে সাথে তার মিনি স্কার্টটা গায়েব হয়ে গেল। যাদু দেখাতে যে সব সময় ডেভিড কপারফিল্ড হতে হয় না, তারই যেন এক প্রমান! বুদ্ধিমান পাঠকের সেই মেয়ের মিনি স্কার্টের দৈঘ্য কল্পনা করে নিতে আর অসুবিধা হবার কথা নয়। এতো শুধু এটা বিচ্ছিন্ন উদাহরন। এরকম শতশত উদাহরন প্রতিদিন চোখের সামনে ঘোরাঘোরি করছে। তার উপর সামার আগত। পরওয়ারদিগারই ভালো বলতে পারবেন আদৌ এই বস্তু তাদের শরীরে থাকবে কিনা মে মাসে।
মুদ্রার উল্টা পিঠের মত সব কিছুরই একটা দ্বিতীয় রুপ থাকে এবং ট্রিনিটিও এর ব্যতিক্রম নয়। যেহেতু আয়ারল্যান্ড এখন একটা কসমোপলিটন রাষ্ট্রে পরিনত হয়েছে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ধর্মের মানুষের অপূর্ব মিলন মেলা দেখতে পাওয়া যায় এখানে। ট্রিনিটি এদের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায়, বিভিন্ন সমাজের ছেলে-মেয়েরা পড়তে আসে; মুসলিম মেয়েরাও। মিনি স্কার্ট দেখার পর যখন মুসলিম মেয়েদের দেখি তখন কেমন যেন একটু অদ্ভুত লাগে। এক দিকে শরীরের ক্ষুদ্র দুটি অংশকে ঢেকে রেখে (তাও না ঢাকার মতই) অন্য অংশগুলো কত ভাবে উন্মুক্ত করা যায় তার প্রতিযোগিতা, অন্য দিকে এই মুসলিম মেয়েদের ভদ্র এবং শালিন পোশাক যেন চুম্বকের দুই মেরুর কথা মনে করিয়ে দেয়।
গতকাল এক মেয়েকে দেখলাম জিন্স এবং একটা বড় টপস পড়েছে। বুঝতে অসুবিধা হয় না টপস-এর দৈঘ্য ইচ্ছে করেই একটু বড় রাখা হয়েছে এবং সেটা কেন। উপরে সুন্দর করে হিজাব পড়ায় দেখতে বেশ ভালোই লাগছিল। সাথে সাথে মনে হলো, আচ্ছা, ফ্যাশন সচেতন হওয়া মানে কি কেবল কাপড় কমানো? তাতো নয়। এই মেয়েকে দেখেতো বেশ ভালোই লাগলো। কিন্তু সেতো সেই মিনি স্কার্ট আর সি-থ্রু টপস পড়েনি। আজ একটু আগে কোন এক রিসার্চগ্রুপ থেকে বের হয়ে সিড়ি দিয়ে নামতে দেখলাম আরেকটা মুসলিম মেয়েকে। জিন্স আর বেশ লম্বা, হাটুর নীচ পর্যন্ত নেমে যাওয়া, একটা চমৎকার গাউন পড়া মেয়ে। সত্য কথা বলতে, মিনি স্কার্টের থেকেতো আমার একেই বেশি ভালো লাগলো।
অর্বাচিনের ভাবনার শেষ থাকে না। আমারও নেই। মাঝেমাঝে ভাবি যদি একবার আইরিশ মেয়েদের সুন্দর ভাবে, হিজাব পড়ানোর দরকার নেই, অন্তত ভদ্র এবং মার্জিত ভাবে সাজানো যেত, তবে কি নজরুল আরেকবার লিখতো না - "আইরিশ মেয়ের ঘোমটা খোলা"? সম্ভবত লিখতো।
৩ এপ্রিল ২০০৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

