প্রচন্ড ক্লান্ত একটা দিন শেষে ঘরে ফিরে আর ল্যাপটপের সামনে বসতে ইচ্ছে করছিল না। তবুও বসলাম, কারন আমার আসলে দিনগুলোই ব্যাস্ত যায়, রাতে করার কিছু থাকে না। উপন্যাসগুলো লিখে শেষ করার চেষ্টা করছি, তাও আর কত সময়। গত কিছুদিন উইকিপিডায় এত কাজ করেছি যে সেখান থেকেও একটা বিরতী নেয়া জরুরী হয়ে পড়েছে। ফলে করার আর কিছুই নাই, অতঃপর ব্লগ নিয়ে বসা।
একটা নুতন চাকরী পেয়েছি। এক মেয়ের জন্য লেকচার নোট তুলতে হচ্ছে। সবই কম্পিউটার সায়েন্সের বিষয়, এজন্যই রক্ষা। আজ তিনটা ক্লাস ছিল পরপর। ছাত্র-ছাত্রীদের আনন্দ আর হৈ চৈ দেখে আমার নিজের ইস্ট ওয়েস্ট জীবনের কথা মনে পড়ে গেল। কত দুষ্টামী করতাম আমরা। যদিও এরাও কম যায় না, যথা সময়ে বলব।
প্রথম ক্লাসে আমি বসেছিলাম বিশাল লেকচার থিয়েটারের একদম উপরের সারির দিকে। বেশ তরুন এক লেকচারার, সিসটেম প্রোগরামিং ক্লাস নিচ্ছে। প্রথমে আবেগ শুন্য ভাবে নোট নিচ্ছিলাম। কিন্তু একটু পরেই আমার রক্তে প্রোগ্রামিং-এর মাদকতা কাজ করতে শুরু করলো। এস.টি.এল. -এর মাল্টিম্যাপ ব্যবহার করে ইন্ডেক্সার নামে একটা ক্লাস লিখছিল তরুন লেকচারার। বেচারা। প্রথমবার রান করানোর পর এ্যারর এর বন্যা বয়ে গেল সুবিশাল (প্রায় সিনেমা হলের সমান) স্ক্রিনে। তার পর শুরু হলো তার যুদ্ধ। ছাত্ররা হাসতে শুরু করেছে ততক্ষনে। মজার ব্যাপার, মেয়েগুলোর মনে হয় মায়া হলো; ছেলেদের ধমক দিচ্ছিল। তবে তাদের তরুন শিক্ষক দেখতেও সেরকম, মায়া (!) না হলেই বিচিত্র লাগতো। এক সময় সে কোডের মাঝে কমেন্ট প্রিন্ট করে করে ডিবাগ করার চেষ্টা করতে শুরু করলো। প্রথমে লক্ষ করিনি, পরে তার কমেন্টগুলো (এডিটরে, রান যেহেতু করছে না, কনসোলে আসার প্রশ্নই আসে না) দেখে না হেসে পারলাম না। লিখেছে - আই এ্যাম ফিলিং ইসসেন্স। কিন্তু কম্পাইলার যেহেতু ইংরেজি পরতে পারে না, সে এ্যারর দিয়েই চলল। এক সময় লিখলো - দিস ইজ উইয়্যার্ড এবং সাথে সাথে সেটা কনসোলে আসলো, অর্থাৎ এক ঘন্টার কষ্ট সার্থক, কোড রান করেছে। শেষ পর্যন্ত বুঝি ধমকে কাজ হলো! আমার তখন মনে পড়লো উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার জীবনে একদিন ল্যাব ক্লাসে ক্রিপ্টোগ্রাফির আর-এস-এ ইম্লিমেন্ট করতে গিয়ে আমার এ অবস্থা হয়েছিল। আমি যখনই ছাত্রদের দিকে তাকাচ্ছিলাম মনে হচ্ছিল ওরা মনে মনে ভাবছে এই লোক কিছু পারে না। তবে সেদিন আমিও সম্মানের সাথে ক্লাস থেকে বের হতে পেরেছিলাম।
যাই হোক, এর পর যে ক্লাসটা ছিল সেটা হলো "প্রোগ্রামিং টেকনিক" এবং যে প্রফেসার ক্লাস নিচ্ছিল সে আমার প্রান অতিষ্ঠ করে ফেললো অল্প সময়ের মধ্যে। একেতো নাম্বার থিউরী পড়াচ্ছে, তাও আবার সুপারসনিক বেগে। আমি যে সুন্দর করে নোট নিব তার কোন উপায় নাই। বলাইবাহুল্য আমাকে বুঝতে হচ্ছে তার পর নোট নিতে হচ্ছে। নাম্বার থিওরী এমনিতেই আমার খুব প্রিয় একটা বিষয়, তাই যেন তেন নোট নিয়ে মেয়েটাকে দিতে ইচ্ছে করছিল না। আমি যখন নোট নিতে রিতিমত যুদ্ধ করছি তখন আমার সামনের তিনটা ল্যাপটপে চলছে ট্রিনিটির বিদ্বান ছাত্রদের লেখাপড়া। তবে নমুনাটা এরকম, একটায় যুগলবন্দি হয়ে একজোড়া কপোত-কপোতী মিউজিক ভিডিও দেখছে (ইয়ার ফোনের একটা ছেলের কানে, অন্যটা মেয়ের) আর একটু পরপর আবেগে দ্রবিভূত হয়ে পরষ্পর চুম্বন বিনিময় করছে। অন্য একটা ল্যাপটপে এক ছেলে দারুন মশগুল হয়ে গেইম খেলছে। কয়েকজন দর্শকও হয়েছে পাশে। আর আমার ঠিক সামনের ল্যাপটপে আমার ছাত্রী (যার হয়ে আমি নোট নিচ্ছি) আরেকটা ছেলের সাথে কমিকস্ পড়ছে! আমি প্রমদগুনলাম। বেচরা জ্ঞানদানকারী 'অজ্ঞান' প্রফেসার লেকচার শেষ করলো ফিফটিন পাজেল প্রবলেমটায় নুথের একটা থিওরী দিয়ে (রেনডোমাইজড ফিফটিন পাজেলকে সর্বোচ্চ ৩৭ মুভে মেজিক স্কয়ার বানানোর থিওরী)। সাথে সাথে ছাত্ররা (যারা এতক্ষন বিদ্যার ঝড় বইয়ে দিচ্ছিল ল্যাপটপে) এমন একটা ভাব করলো, যেন এ আর এমন কি! নুথের এই পেপারটাতো তারাই দেখে-টেখে দিয়েছিল।
সব শেষের লেকচার ছিল চরম বোরিং। এক্স.এম.এল. নিয়ে এক ঘন্টা বকবক শোনার পর মুক্তি পেলাম। তবে তা সাময়িক মুক্তি। আমার এক বন্ধুকে (বান্ধবীও বলা যায় কারন জেন্ডারে সে মেয়ে) কথা দিয়েছিলাম তার গবেষনায় স্বেচ্ছাস্বেবক হয়ে সাহায্য করবো। অতএব এখান থেকে বের হয়েই দৌড় দিতে হলো কম্পিউটার গ্রাফিক্স রিসার্চ গ্রুপের রুমে। ওখানে আরও এক ঘন্টা কাজ করে বের হবার সময় রেচেল বলল "নাই-আজ (বিচিত্র কারনে সে আমার নাম, অর্থাৎ নিয়াজ উচ্চারন করতে পারে না) তোমরার জন্য বই কেনার দশ ইউরো গিফ্ট ভাউচার রেখেছি"। উপরে বললাম - কি দরকার ছিল, আর মনে মনে বললাম এক ঘন্টা খাটিয়ে মাত্র দশ ইউরো!
যেহেতেু গিফ্ট ভাউচারটা বই কেনার, অতএব আমাকে বই-ই কিনতে হবে। কি করবো ভবছি। হঠাৎ মনে পড়লো একটা লাইব্রেরীতে পবিত্র কোরআনের ইংরেজী অনুবাদ দেখেছিলাম। অক্সফোর্ডের দুইজন প্রফেসার করেছে। আন-বিলিভারদের কোরআনের প্রতি শ্রদ্ধা কতটুকু সেটা জানার জন্যই প্রধানত কিনতে আগ্রহী হয়েছিলাম, কিন্তু আর কেনা হয়নি। দামও ঠিক ১০ ইউরো। ভেবে দেখলাম এই গিফ্ট ভাউচারটার এর থেকে ভালো ভাবে খরচ করার আর কোন উপায় থাকতেই পারে না। কিন্তু যখন কিনতে গেলাম তখন দ্বিধায় পড়ে গেলাম। কারন আরেকটা অনুবাদ এসেছে, পেঙ্গুইন থেকে করা। দাম একটু বেশি - ২৫ ইউরো - কিন্তু অনুবাদ বেশ ঝরঝরে এবং সহজে বোঝা যায়। কোনটা কিনবো এই নিয়ে নিজের সাথে যুদ্ধ করছি। এক সময় ভাবলাম, দুটাই নয় কেন?
পেমেন্ট কাওন্টারে এসে দেখি কম্পিউটার হ্যাং করে বসে আছে। বয়স্ক একজন ভদ্রলোক ঠিক করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। খানিকটা সময় দাড়িয়ে থেকে বললাম - আমি কি একটু দেখতে পারি? অসহায়ের মত তিনি আমার হাতে কম্পিউটার ছেড়ে দিলেন। আমি হ্যাং করা ইন্টারনেট এক্সপ্লোরারটাকে টাস্ক ম্যানেজার থেকে এন্ড প্রসেস করে দিতেই সব ঠিক হয়ে গেল। সাথে সাথে যেন অনেক কিছু করে ফেলেছি এরকম কদর করা শুরু করলেন তিনি। প্রশ্ন করলেন আমি কি করি। বললাম আমি কম্পিউটার ইনজিনিয়ার, ট্রিনিটিতে ওয়ারলেস কমিউনিকেশনস পড়ছি। কদর যেন আরও বেড়ে গেল। বললেন - দাও দাও, তোমার বইগুলো আমি প্যাক করে দিচ্ছি। আমি নির্লিপ্ত ভাবে তার হাতে দুটো গ্রন্থ তুলে দিলাম। আল-কোরআনের দুটো ইংরেজী অনুবাদ। আঁড় চোখে তাকিয়ে দেখলাম ভদ্রলোকের চোখে তখন বিস্ময় আর সম্ভ্রম জড়ানো অদ্ভুত এক দৃষ্টি।
১ এপ্রিল ২০০৮
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জুন, ২০০৮ সন্ধ্যা ৬:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



