somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ডাবলিনের ডায়েরী - তিন (৭ এপ্রিল ২০০৮)

১১ ই জুন, ২০০৮ দুপুর ১:৪২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

রাত এগারোটা বাজে। দশ মিনিট আগে বাসায় আসলাম। প্রচন্ড ক্লান্ত - কিন্তু ঘুম আসছে না। মাঝে মাঝে অবাক হয়ে যাই শরীর নামক যন্ত্রের আচরন দেখে। ভর দুপুরে ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসে আর এখন রিতিমত মাঝ রাতে ঘুম নেই।

আজ দিনটা শুরু করেছিলাম খুব গোছালো ভাবে আর শেষ করলাম চরম এলোমেলো সব কাজ করে। সকালেই চিন্তা করে রেখেছিলাম স্টিফানের দেয়া কিছু পেপার পড়ে শেষ করবো। আমার গবেষনার খুব গুরুত্বপূর্ন একটা পর্যায়ে আছি এখন। বলা যেতে পারে আগামী এক মাসে যে সিদ্ধান্তগুলো নেব সেগুলোই আমার মাস্টার্সের থিসিসের ভিত্তি হবে। স্টিফান বেশ কিছু পেপার দিয়েছেন যেগুলো আমাকে প্রেজেন্ট করতে হবে কাল অথবা পরশুর মধ্যে। একটা পেপার পড়ে শেষও করেছিলাম। কিন্তু অন্য একটা পেপারের মাঝে এসে কি যে হলো, ইচ্ছে করলো গান শুনতে, যথারিতি ইউটিউব এবং সেখান থেকে হিন্দী সিনেমা...। লেখাপড়া সব গোল্লায় গেল।

ডিভিডি প্রিন্টের একটা মুভি পেলাম - রেস। এমনিতেই আমি আব্বাস-মাস্টানের ফ্যান, তার উপর নুতন মুভি। ভাবলাম দশ মিনিট দেখি, তার পর আবার পড়ায় ফিরে আসবো। কোথা থেকে যে কি হলো, দশ মিনিট একশ ষাট মিনিটে পরিনত হলো। সত্য কথা বলতে কি, অনেকদিন পর আমি মুগ্ধ হয়ে একটা হিন্দী মুভি দেখলাম। এক সেকেন্ডের জন্য বিরক্ত বা একঘেয়ে লাগেনি। অনেকটা যেন দমবন্ধ করে পুরো মুভিটা দেখে ফেললাম। বলাইবাহুল্য, আব্বাস-মাস্তানীয় ডায়ালগগুলো ছিল রিতিমত জটিল। বিশেষত সেই ডায়ালগটা যখন সাইফ রেসে হেরে বলে, "কখনো কখনো আমি আমার হারও সেলিব্রেট করি।" শুনতে খুব সাধারন লাগছে কিন্তু মুভির প্রেক্ষাপটে মারদাঙ্গা হিট হয়েছে ডায়ালগটা। একেকবার আমি জোরে হেসে উঠি আর পাশ থেকে অন্যরা আড়চোখে আমাকে দেখে। আমি রিসার্চগ্রুপের পিসিতে বসে হেডফোন লাগিয়ে মুভি দেখছিলাম আর আমার পাশে তখন সবাই কাজে ব্যাস্ত। হায়রে বঙ্গসন্তান, সুযোগের কি অপূর্ব সদব্যবহার!

আজও চরম স্নো পড়েছে। মুগ্ধ হয়ে কিছু সময় বাহিরে তাকিয়ে ছিলাম। সাধে কি আর ইউরোপে এত কবি সাহিত্যিকের জন্ম। মেঘ না চাইতে যেখানে স্নো পড়ে, ভাবের মেলাতো তাদের জন্য প্রস্তুতই থাকে। এমনি এমনিই কবিতা বের হয়ে আসতে থাকে তখন। এক রবীন্দ্রনাথ ছাড়া ভাবের সাগরে বেড়ে ওঠা কবি বঙ্গদেশে সম্ভবত আর কেউ ছিল না। তবে সত্য বলতে কি, প্রাচুর্য ভাবালুতা দিতে পারে তবে ভাব নয়। সে জন্যই বুঝি সুকান্ত পূর্ণিমার চাঁদকে ঝলসানো রুটি বানাতে পেরেছিল কিন্তু রবিবাবু নারীর মনের রসায়ন ছেড়ে যেটুকু সময় বাস্তবে বের হয়েছিলেন, কেবল দুইবিঘা জমিতে ঘোরাঘুরি করেছেন!

কবিতা থেকে বাস্তবে ফিরে আসা যাক। কাল সকালে ঝলসানো সূর্য ছাড়া বুঝি খাবার আর কিছু নেই। আজ বাজারে যাবার কথা ছিল। ঘরে কোন খাবারই নেই। কিন্তু এক হিন্দী মুভি সব এলোমেলো করে দিল। মুভি শেষে যখন কেনাকাটার জন্য দৌড় দিলাম, বুঝলাম অনেক দেরী হয়ে গিয়েছে। পুরো শহর তখন ঘুমিয়ে পড়েছে। একটা দোকানও খোলা নেই। হুস করে দু-একটা গাড়ি বের হয়ে যাচ্ছিল, মাঝে মাঝে অকারনে হেসে গড়িয়ে পড়া তরুনী মেয়েদের এলোমেলো কথোপোকথন কানে আসছিল। দু-একজনকে ফাকা রাস্তায় দাড়িয়ে ভালোবাসায় গলে যেতেও দেখা যাচ্ছিল। অতঃপর হাটা শুরু করলাম। আমার হিমু-মার্কা হাটা। পার্থক্য শুধু এতটুকু যে হিমু পড়তো হলুদ পাঞ্জাবী আর আমি কালো ওভারকোট।

হাটতে হাটতে চলে আসলাম লিফি নদীর পাড়ে। হঠাৎ দেখি এক মেয়ে চরম ঠান্ডায় নির্জন ফুটপাতে বসে আছে। পাশে একটা কাগজে লেখা - নো জব, নো মানি, নো হোম। হাতে কিছু রং পেন্সিল আর স্কেচ খাতা। এলোমেলো কি যেন আঁকার চেষ্টা করছে। পথচারী বলতে তখন আমি আর আরো দুজন লোক। লোক দুটো মেয়েটার আঁকার খাতা দেখতে লাগলো। মেয়েটা চরম উৎকন্ঠায় অপেক্ষা করছে, যদি ছবিগুলো ভালো লাগে তাদের তাহলে হয়তো কিছু দেবে। মনে মনে ভাবলাম, রাতে কি কিছু খাওয়া হয়েছে তার? শুকনো মুখ আর দু'চোখের আকুতি যেন বলে দিচ্ছিল আমার প্রশ্নের উত্তর ঋনাত্বক।

আরও খানিকটা পরে আমি লিফি নদীর উপর ও' কনেল ব্রিজ দিয়ে হেটে যাচ্ছিলাম। নিয়ন বাতির হলুদ আলো লিফির পানিতে প্রতিবিম্ব সৃষ্টি করছিল। হালকা ঢেউ-এ তা বারবার ভেঙ্গে যাচ্ছিল, তবুও যেন নুতন করে প্রতিবিম্ব গড়ে তোলার অবিরত প্রচেষ্টা। আমি এক মনে ভাবছিলাম আমার কথা, পরিবারের কথা, মানুষের কথা, একটু আগে পেছনে ফেলে আসা সেই মেয়েটির কথাও। সবাই আসলে এই পৃথিবীতে আমরা যাযাবর। প্রতিনিয়ত ভেঙ্গে যাচ্ছি তবুও কি দুর্নিবার চেষ্টা নুতন করে গড়ার। আমার চোখে তখনও ভাসছিল একটা আর্ট পেপার আর তাতে লেখা তিনটা বাক্য - "নো জব, নো মানি, নো হোম"।

৭ এপ্রিল ২০০৮
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জুন, ২০০৮ বিকাল ৫:৫৮
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এমন কেন?

লিখেছেন তাই-ফি, ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৪৪

একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক।

শেষ বিচারের পর নরকে শাস্তি ভোগ করছে পাপীরা। বিশাল বিশাল তেলের ড্রামে তাদের একবার ডুবিয়ে আবার ভাসিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিটি ড্রামের সামনে একজন করে পাহারাদার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×