somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যেভাবে আমি আজ ট্রিনিটিতে (প্রথম খন্ড)

১৮ ই জুন, ২০০৮ রাত ১১:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আয়ারল্যান্ড আসার স্বপ্ন আমি কোন দিনও দেখিনি। এমন কি ইউরোপ আসার ইচ্ছেটাও আমার নিতান্তই নুতন। ২০০৫ এর দিকে, যেটাকে আমরা সাহিত্যের ভাষায় বলি "উচ্চশিক্ষা", তার সন্ধানে লন্ডনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে খোঁজ নেয়া শুরু করি। ২০০৬ এর সেশনটা বেশ কিছু ব্যক্তিগত কারনে মিস করার পর ২০০৭ এর জন্য সিরিয়াসলী প্রস্তুতি নিতে শুরু করি। এরই মাঝে আমাদের ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের মাত্র কয়েক সেমিস্টার আগে খোলা মাস্টার্স প্রোগ্রামে অনেকটা মজা করেই ঢুকে গেলাম। চলতে লাগলো লেখাপড়া, সাথে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের চেষ্টা। দেখতে দেখতে কখন আমার মাস্টার্স শেষ হয়ে গেল আর কখন যে আমি ইংল্যান্ডের প্রায় এক ডজন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করে ফেললাম, নিজেই বুঝতে পারিনি।

মজার ব্যাপার, তখন পর্যন্ত আয়ারল্যান্ডের চিন্তা আমার মাথায় আসেনি। একদিন উইকিপিডিয়াতে কাজ করতে করতে ইউনিভার্সিটি কলেজ ডাবলিন (ইউ.সি.ডি.) - এর আর্টিকেলটা চোখে পড়ে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি ২০০৬ সনের বিশ্ববিতর্ক প্রতিযোগীতার আয়োজক হওয়ায় নামটা আমার পরিচিতই ছিল। এটা এমন একটা সময়, যখন আমি ইংল্যান্ডের বিভিন্ন প্রফেসারদের স্কলারশীপের জন্য ব্যাপক ভাবে মেইল করছি। অনেকটা দেখা-যাক-কি-হয় ভাবেই ইউ.সি.ডি. এর ইলেক্ট্রিকাল এবং কম্পিউটার সায়েন্স ডিপার্টমেন্টের বেশ কয়েকজন প্রফেসারকে মেইল করলাম ওয়ারলেস কমিউনিকেশনস অথবা ডিজিটাল সিগনাল প্রসেসিং-এ এম এস সি বাই রিসার্স করার আগ্রহ দেখিয়ে। শর্ত ছিল স্কলারশীপ দিতে হবে, কেননা আমার ব্যাক্তিগত সামর্থ নেই এত টাকা টিউশন ফি দেয়ার। কয়েকদিন পর কম্পিউটার সায়েন্সের প্রফেসার ক্রিস আমাকে মেইল করে জানালো তাঁর কাছে এই মুহুর্তে স্কলারশীপ নেই, তবে তিনি একটা ফান্ডের জন্য আবেদন করেছেন যেটা পেলে আমার কথা বিবেচনা করবেন। অন্য প্রফেসারদের মধ্যে কয়েকজন রিপ্লাই দিয়েছিল, তবে সবই 'না' ছিল এবং বুঝলাম বাংলাদেশটা আসলে কোথায় অথবা এই নামে যে আদৌ একটা দেশ আছে সেটা বুঝতে তাদের বেশ কষ্টই হচ্ছিল। যেহেতু আয়ারল্যান্ড আমার লক্ষ্য ছিল না, তাই এ ধরনের হতাশাজনক রিপ্লাই পেয়ে খুব একটা মন খারাপ হয়নি। বরং কিছুটা মজাই পেয়েছিলাম। আর সে জন্যই সম্ভবত ইউনিভার্সিটি কলেজ কর্ক, ডাবলিন সিটি ইউনিভার্সিটি এবং আয়ারল্যান্ডের সবচেয়ে নাম করা বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অভ ডাবলিন - ট্রিনিটি কলেজ - এর ইলেট্রিকাল এবং কম্পিউটার সায়েন্সের প্রায় সব প্রফেসারকে মেইল করে ফেললাম। আসলে তখন আমাকে মেইল করায় পেয়ে বসেছে। ইংল্যান্ডের একেক প্রফেসারের সাথে রীতিমত ডিবেট করতে শুরু করে দিয়েছিলাম মেইলে। তাই সীমাটা আয়ারল্যান্ড এবং এডেনবার্গ, গ্লাসগো সহ স্কটল্যান্ডের সবগুলো নাম করা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বিস্তৃত করার চেষ্টা করলাম। পরবর্তিতে হিসেব করে দেখেছিলাম আমি প্রায় সত্তরজন প্রফেসারকে মেইল করেছিলাম ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড এবং আয়ারল্যান্ডে। যাই হোক, এত মেইল করার পরও আয়ারল্যান্ড থেকে কয়েকটা 'সরি' জানিয়ে লেখা দুই লাইনের রিপ্লাই ছাড়া উল্লেখ করার মত কোন খবর ছিল না এবং সিংহভাগ প্রফেসারই রিপ্লাই দেয়ার প্রয়োজনবোধ করেননি।

দেখতে দেখতে কেটে গেল প্রায় মাসখানেক। বিশ্বকাপ ক্রিকেট শুরু হয়েছে। তাই নিয়ে ব্যস্ত। ভুলেই গিয়েছি মেইল করার ব্যাপারগুলো। ১৭ই মার্চ ছিল বাংলাদেশ ও ভারতের খেলা। একই দিনে অন্য একটা মাঠে ছিল পাকিস্থান ও আয়ারল্যান্ডের খেলা। এখানে উল্লেখ্য যে ক্রিস্টমাসের পর আয়ারল্যান্ডের সবচেয়ে আকাঙ্খিত ছুটি এবং আনন্দের দিন হলো সেইন্ট পেট্রিক্স ডে, এবং সেটা ১৭ ই মার্চ। ফলে রাগবী পাগল পুরো অইরিশ জাতি যেন সেদিন ক্রিকেটে মেতে উঠেছিল। ভাগ্য বুঝি একেই বলে, এক খেলায় বাংলাদেশ হারালো ভারতকে আর অন্য খেলায় আয়ারল্যান্ড পাকিস্তানকে, তাও বিশ্বকাপ থেকে নক-আউট করে দিয়ে। ফলে ১৮ই মার্চের আইরিশ সংবাদপত্রের মূল আলোচনায় উঠে আসলো ক্রিকেট এবং যথারিতি বাংলাদেশও। সম্ভবত কোন আইরিশ প্রফেসারের আর জানতে বাকি রইলো না বাংলাদেশ নামক দেশটাকে। অনেকটা যেন প্রমানস্বরুপই ১৯শে মার্চ আমি ট্রিনিটির প্রফেসার ভিনির কাছ থেকে মেইল পেলাম। যদিও ভিনি তখন ছাত্র নিচ্ছিলেন না, তবে আমাকে জানালেন তার কলিগ ড. স্টিফান ওয়েবার ছাত্র নিচ্ছেন এবং তিনি আমার জন্য সুপারিশ করে দেবেন।

ভিনির পরামর্শ মত আমি ড. স্টিফানকে মেইল করলাম এবং কয়েকদিনের মধ্যে বুঝতে পারলাম আমার মতই আরেক ক্রিকেট পাগলের দেখা পেয়েছি আমি। আমাদের প্রতিটা মেইলের শেষে একটা বড় অংশ জুড়ে থাকতো ক্রিকেট আলোচনা। বাংলাদেশ এবং আয়ারল্যান্ড তখন সুপার এইটে খেলছে। রিতিমত টানটান উত্তেজনা। বাংলাদেশ সাউথ আফ্রিকাকে হারালো। স্টিফান আমাকে মেইল করে কনগ্রাটস দিলেন। এরই মাঝে আমি আয়ারল্যন্ডের খেলা দেখা শুরু করে দিয়েছি, যেগুলো আগে আমি নিতান্তই ছেলেমানুষী খেলা বলে দেখার প্রয়োজনবোধ করতাম না। আমি আয়ারল্যান্ডের খেলা দেখে আবার স্টিফানকে মেইল করে প্রসংশা করি। সুপার এইটের খোলায় বাংলাদেশ হেরে বসলো আয়ারল্যান্ডের কাছে। অনেকটা দেশদ্রোহীর মতই আমি আহলাদে আটখানা হয়ে স্টিফানকে মেইল করে কনগ্রাটস জানালাম। স্টিফান আবার আমাকে স্বান্তনা দিয়ে জানালেন বাংলাদেশ আসলে ভালই খেলছিল! চলতে লাগলো আমাদের মেইল চালাচালি আর ক্রিকেট আলোচনা। এর পাশাপাশি স্টিফান আমার ফান্ড জোগাড় করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করতে শুরু করলেন যদিও তখনো সবটাই ছিল অনিশ্চিত এবং আমার স্পষ্ট ধারনা ছিল না স্টিফান ঠিক কিভাবে ফান্ড জোগাড় করতে যাচ্ছেন। আমি আমার সব সার্টিফিকেট, ট্রান্সক্রিপ্ট এবং রেফারেন্স লেটার স্ক্যান করে পিডিএফ আকারে তাঁকে মেইল করে দিয়েছিলাম। তাছাড়া মাঝে মাঝে স্টিফান আমাকে প্রশ্ন করতেন প্রাসঙ্গিক পড়ালেখার বিষয়ে এবং আমার মাস্টার্সের থিসিসের একটা কপিও চাইলেন যেটা আমি সাথে সাথেই মেইল করে দিয়েছিলাম। এর পর ধীরে ধীরে বিশ্বকাপ শেষ হয়ে এলো এবং আরো কিছু ব্যাস্ততার কারনে স্টিফানের সাথে মেইলের যোগাযোগটাও কমে গেল অনেকাংশে। (চলবে)

৩১ মার্চ ২০০৮

দ্বিতীয় খন্ড - Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে জুন, ২০০৮ রাত ১২:৩২
৫টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×