মৌসুমী ভৌমিক এর স্বপ্ন দেখব বলে গানটায় একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে। কেমন যেন একটা আকুতি। বিশেষ করে শেষের দিকে এসে যখন বলে,
“আস্থা হারানো এই মন নিয়ে আমি আজ
তোমাদের কাছে এসে দু’হাত পেতেছি;
আমি দু’চোখের গহবরে শূন্যতা দেখি শুধু,
রাত ঘুমে আমি কোন স্বপ্ন দেখিনা,
তাই স্বপ্ন দেখব বলে আমি দু’চোখ পেতেছি;
তাই তোমাদের কাছে এসে, আমি দু’হাত পেতেছি।”
তামিমদার খুব প্রিয় গান। যখনই সময় পায় চালিয়ে দেয়। যথারীতি সাথে আমিও থাকি। তবে আজকে শোনার কারন সময় পাওয়া নয়, বরং সময় পার করা। আজকে তামিমদার কাছে প্রথম কেস আসছে। আমরা সে জন্য অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছি এবং গানটা শুনছি।
তামিমদা সম্পর্কে আমার খালাতো ভাই। আমরা থাকি গুলশান এলাকার একেবারে শেষের দিকে খুব নিরিবিলি একটা এ্যাপার্টমেন্টে। তামিমদারা চারতালায় আর আমরা পাঁচে। তামিমদা একটা প্রথমসারির বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে ফাইনাল ইয়ারে পড়ছে। যদিও এখনও পাশ করেনি, কিন্তু এরই মাঝে ওর ভেতর একটা পরিনত ভাব চলে এসেছে।
আমি এবার টেনে উঠলাম। ডিসেম্বর মাস। স্কুল খুলতে অনেক দেরি। ছুটি কাটাচ্ছিলাম। হঠাৎ তামিমদার মাথায় একটা প্রাইভেট ডিটেকটিভ এ্যাজেন্সি খোলার চিন্তা আসল। যেমন চিন্তা তেমন কাজ। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে, লিফলেট ছাপিয়ে হুলুস্থুল অবস্থা। একদিকে আমার খালা রেগে আগুন অন্য দিকে ডেপুটি পুলিস কমিশনারের ফোন। তিনি জানালেন বাংলাদেশে আইনত এটা সম্ভব নয়। এরকম কিছু করার অনুমতি দেয়া হয় না। শেষ পর্যন্ত আনেক আলোচনার পর এই রফায় আসা হলো যে তামিমদা পেশাগত ভাবে এ কাজ করতে পারবে না। তবে যদি সাহায্যস্বরুপ কিছু করে থাকে সেটা অন্য ব্যাপার। কেউ সাহায্য চাইলে প্রচলিত আইনের মধ্যে থেকে তামিমদা সেটা করতে পারবে। তামিমদা এই শর্ত মেনে নিয়েই পরবর্তি বিজ্ঞাপনগুলোতে ভাষার একটু পরিবর্তন করে দেয়।
এর পর দিনপনের কেটে যায় কোন খবর ছাড়াই। হঠাৎ গতরাতে আশরাফ হোসেন নামে এক ভদ্রলোক ফোন করলেন। জানালেন তিনি রংপুর থেকে ফোন করেছেন। রংপুরের কোন এক সাবেক জমিদারি স্টেটের ম্যানেজার। তামিমদার ব্যাপারে তারা পত্রিকার মাধ্যমে জেনেছেন। তাদের কি একটা সমস্যা হয়েছে, সে জন্য তাদের কর্তা তামিমদার সাহায্য চাচ্ছেন। সাক্ষাতে বিস্তারিত জানাবেন। তামিমদা তাকে আজ সকালে আসার জন্য বলেছে। আমরা তারই অপেক্ষয় বসে আছি এবং স্বপ্ন দেখব বলে শোনার পাশাপাশি দেখছিও!
কিছুক্ষনের মধ্যে তামিমদাদের কাজের ছেলে রনি এসে জানালো একজন ভদ্রলোক এসেছেন তামিমদার সাথে দেখা করতে। বুঝতে অসুবিধা হলোনা কে আসতে পারে। দুজনেই উঠে দাড়ালাম।
জমিদারী স্টেটের ম্যানেজার বলতে একটা প্রৌড় লোক, কাঁচা পাকা দাড়ি থাকতে পারে, একটু রোগাটে এবং যেন শহরে এসে খানিকটা অস্থির - এরকম একটা ছবি চোখের সামনে ভেঁসে আসে। কিন্তু এখানে ঠিক উল্টোটা। একেবারেই তরুন এক ভদ্রলোক। ছিপছিপে দেহের গড়ন, সুন্দর করে সেভ করা, একটু সেকেলে স্টাইলে চুল আঁচড়ানো। আমরা ড্রইংরুমে ঢোকার সাথে সাথে উঠে দাড়ালো। তবে দাড়ানোর ভঙ্গিটা ছিল আধো দাড়ানো আধো বসা। মনে হয় চাকরীতে নুতন। জমিদরী বা সামন্ত পরিবারে চাকরী করা মানুষগুলো মজ্জাগত ভাবে অধীন হয়ে পড়ে। তখন যাকেই দেখে তাকেই অতিরিক্ত বিনয় দেখিয়ে ফেলে। এই মানুষটাও ধীরে ধীরে সেরকম হচ্ছে। কিন্তু হয়তো তার ভেতরে আধুনিক সংষ্কার আছে। এখনও সেই সংষ্কার তাকে সামন্ত প্রভুদের প্রভুত্ব মেনে নিতে বাঁধা দেয়।
তামিমদা হ্যান্ডশেক করে একটা সোফায় বসলো। ভদ্রলোক একটু হেসে বললেন, আমিই আশরাফ হোসেন। আপনাকে ফোন দিয়েছিলাম গতকাল।
প্রতুত্তরে তামিমদা একটু হাসলো। তার পর বলল, “আপনাদের সমস্যাটা যদি এবার একটু বিস্তারিত জানান।”
আশরাফ সাহেব একটু ইতস্তত করে বলল, “আসলে হয়তো আপনার কাছে এটা কোন সমস্যাই না। তবুও ইহসান চৌধুরী, আর্থাৎ আমি যার হয়ে আপনার কাছে এসেছি, তিনি চান আপনি একটু যেন কেসটা দেখেন। পুলিশের প্রতি তাঁর কখনই আস্থা ছিলনা। এবারও নেই।”
“কেসটা কি সেটাইতো শোনা হলো না?” তামিমদা একটু গম্ভীর ভাবে বলল।
একটা চুরির প্রচেষ্টা। কোন কিছু চুরি হয়নি তবে ইহসান সাহেব ধারনা করছেন এর পেছনে অন্য কোন উদ্দেশ্যও থাকতে পারে।
কি ধরনের চুরির প্রচেষ্টা?
আমি আপনাকে পুরো ব্যাপারটা খুলে বলছি। তার আগে ‘ফটক বাড়ি’ অর্থাৎ ইহসান চৌধুরীদের গত চার পুরুষের যে বাড়ি, তার ব্যাপারে একটু বলছি। এই বাড়ি তৈরী করেছিলেন ইহসান সাহেবের দাদার বাবা। বাড়ীটা গ্রামে ঢোকার মুখেই। এ জন্যই এর নাম ফটক বাড়ি। চার পুরুষের বসবাসের সময়ে অনেক পরিবর্তন হয়েছে বাড়িটার। কিন্তু একই রীতিরেওয়াজ বজায় ছিল সব সময়। বাড়ির দোতালায় থাকেন সবাই। রুমের সংখ্যা মোট আঠারোটি। ঘুরিয়ে করা বাড়ি। মাঝে বিশাল উঠোন। এখনও ধানের সময় ধান এনে জমা করা হয় এখানে। নিচতালাটা মোটামোটি অফিস ঘর, ব্যাঙ্ক ঘর এবং যারা কাজ করে, তাদের থাকার জন্য। পাঁচ জনের একটা পাহারা দেয়ার দল আছে। এরা পালাক্রমে বাড়ি পাহারা দেয়। বাহিরের লোক একরকম ভেতরে আসা অসম্ভব। এই বাড়িতে ইহসান সাহেব একাই থকেন। পরিবারের অন্যান্য সবাই ঢাকার বনানীতে থাকে। ইহসান সাহেবের স্ত্রীও ঢাকাতেই থাকেন। শুধু ইহসান সাহেব থাকেন না। তার মতে গ্রামের বাড়িই শান্তির জায়গা। এখানেই তিনি জীবনের বাকি সময়টা কাটাতে চান।
আশরাফ সাহেব একটু যেন হাপিয়ে গেলেন। রনি এসে এক ফাকে কিছু নাশতা আর ড্রিংস দিয়ে গিয়েছিল। তামিমদা আশরাফ সাহেবকে ড্রিংস অফার করে নিজেও একটা গ্লাস তুলে নিল। আসরাফ সাহেব খানিকটা খেয়ে গ্লাসটা টেবিলে নামিয়ে রাখলো। এর পর আবার বলতে শুরু করলো।
বাড়ির বর্ননাতো শুনলেন। এবার আসি আসল ঘটনায়। গত কিছুদিন আগে ইহসান সাহেবের পুরো পরিবার ঢাকা থেকে দেশে এসেছে। পরিবার বলতে তিন ছেলে এবং বড় ছেলের স্ত্রী। বড় ছেলে বিয়ে করেছে অল্প কিছুদিন হয়েছে। ছেলের বৌ-এর গ্রামের বাড়ি আসা এটাই প্রথম। তাই একটু সাজ সাজ রব উঠেছিল বাড়িতে। হয়তো অন্যান্য নিয়ম এবং নিরাপত্তার কড়াকড়িটাও একটু কম ছিল। গ্রামের মানুষ মাঝে মাঝে বৌ দেখতে আসতো। ইহসান সাহেবও চাচ্ছিলেন গ্রামের সবার সাথে সম্পর্কটা একটু স্বাভাবিক করতে। গত চার পুরুষে তাদের বলা না বলা অনেক পাপ আছে। অত্যাচারও কম করেনি তারা। ইহসান সাহেবের বাবা ইমাম চৌধুরীই ছিলেন সবচেয়ে নিষ্ঠুর আর খানিকটা চরিত্রহীনও। সে অন্য কাহিনী। যাই হোক, সব কিছু মিলিয়ে সম্পর্কটা গ্রামের মানুষের সাথে আবার একটু স্বাভাবিক হয়ে আসছিল।
এরকম সময়ে ঘটলো ঘটনাটা। আজ থেকে ঠিক পাঁচ দিন আগে, ব্যাঙ্ক ঘরে চোর ঢোকার আলামত পাওয়া গেল।
তামিমদা কথার মাঝে একটু বাঁধা দিয়ে বলল, “ব্যঙ্ক ঘরটা কি?”
একটু হেসে আশরাফ সাহেব বলল, “একটা ঘর আছে ফটক বাড়িতে। সেই ঘরে আগে টাকা পয়সা, গহনা, দলিলপত্র এগুলো রাখা হতো। এখন কেবল গুরুত্বপূর্ন দলিল আর কাগজপত্র রাখা হয়। এই ঘরটার কোন জানালা নেই। একটাই দরজা। লোহার তৈরী। বেশ মজবুত। বড় একটা জার্মান কম্বিনেশন তালা দিয়ে সব সময় অটকানো থাকে। পিটিয়ে ভাঙ্গা যেমন সম্ভব না তেমনই কম্বিনেশন জানা না থাকলে কারো পক্ষে সরাসরি খোলাও অসম্ভব।”
“এই ঘরেরই চুরি হয়েছে?” তামিমদা বলল।
ঠিক চুরি বলা যায় না। চোর এসেছিল। দলিলপত্র ঘাটাঘাটি করেছে। কিন্তু কিছু নেয়নি। এ জন্যই ইহসান সাহেব আরো বেশি উদ্বিগ্ন।
পাহারাদার ছিল না?
ছিল। কিন্তু পরিবেশটাই একটু অন্যরকম ছিল। সবাই আনন্দ হুল্লোড়ে ব্যাস্ত ছিল। শুনেছি পাহারাদাররা নাকি সেদিন তাড়ির আসর বসিয়েছিল।
এরকম একটা ঘটনা, অন্য কেউ দেখলো না ? তাছাড়া এত দামী এবং মজবুত জার্মান কম্বিনেশন লক, খুললো কি করে?
সেটাও আরেকটা রহস্য। তালার ভেতরের সব কিছু গলিয়ে ফেলেছে। খোলসটা ঠিকই আছে। কিন্তু ভেতরের পদার্থগুলো গলে গিয়েছে। হয়তো গভীর রাতে করেছে কান্ডটা। কেউ নাকি দেখেনি।
তামিমদা বিস্মিত হয়ে বলল, সে কি করে সম্ভব। তালা গলালইবা কি করে?
এত কিছুতো জানি না! সে জন্যইতো আপনার কাছে আসা। ইহসান সাহেবের ধারনা এর পেছনে অন্য চক্রান্ত আছে। আপনি কি একবার যাবেন রংপুর?
তামিমদার দিকে তাকানোর দরকার ছিল না। আমি জানি ও যাবে। একেতো প্রথম কেস, তার উপর আবার বেশ ইন্টারেস্টিং। তামিমদা তাই আশরাফ সাহেবকে বলল, সে যাবে। তবে এক সপ্তাহ পরে। তামিমদার সেমিস্টার ফইনাল চলছে। শেষ হবে ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ। ঠিক হলো আমরা জানুয়ারির তিন তারিখের রাতের ট্রেনে রংপুর রওনা হবো। আশরাফ সাহেব আমাদের স্টেশনে নিতে আসবেন।
* * *
আশরাফ সাহেব চলে যাবার পর তামিমদা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, কিরে? কি মনে হয়?
সেটা আমি কি করে বলব? গোয়েন্দাতো তুমি।
তুই একটা আস্ত গাধা। তোপসেতো এমন ছিল না। তোকে দিয়ে হবে না মনে হচ্ছে।
আমি একটু কপটরাগ দেখিয়ে বললাম, “আগে নিজে ফেলুদা হয়ে নাও। তার পর আমি তোপসে হবো।
তামিমদা কোন জবাব দিলনা। হটাৎ করে অন্যমনস্ক হয়ে কি যেন ভাবছিল। আমি বললাম, কি ব্যাপার এখনই ফেলুদা হয়ে গেলে নাকি? তামিমদা একথাটাও গায়ে না মেখে বলল, “তোর কেমিস্ট্রি বইটা একটু দিসতো। সক্রিয়তা সিরিজটা কি মনে আছে?” নিজের মনে মনেই বিড়বিড় করতে লাগলো, “কে না কে ম্যাকগাইভার এলো, জেন ফিরে সোনা পেলো, হাই কুলাঙ্গার হাজি আজি পেটাবে আমায়!”
আমি আর কথা বললাম না। তামিমদার হয়তো মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে।
(চলবে)
২য় পর্ব - Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে জুন, ২০০৮ দুপুর ২:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


