somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রুপান্তর (ছোটগল্প)

০৩ রা জুলাই, ২০০৮ রাত ১২:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

শাহেদ খুব দ্রুত হাটার চেষ্টা করছিল। কিন্তু সরু ফুটপাতের উপর দিয়ে ঠিকমত হাটাও যেন কষ্টকর। অথচ ওর এখন ইচ্ছে করছে রীতিমত দৌড়াতে। একবার হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময়টা দেখে নিল - দুইটা বাইশ। সূর্য ঢলে পড়েছে কিন্তু রোদের তেজ তখনও কমেনি। ভ্যপসা গরম চারদিকে। জ্যামের কারনে গাড়িটা পেছনে রেখে বেশ খানিকটা পথ সে হেটে এসেছে। জায়গায় জায়গায় ফুটপাত কাটা। এই শহরে হাটাও যেন দুঃসাধ্য হয়ে পড়ছে ধীরেধীরে।

মনে মনে সিটি কর্পোরেশনের ইঞ্জিনিয়ারদের গালাগালি করতে করতে ভিকারুন্নেসার মূল কলেজ গেটের প্রান্তে এসে যখন পৌছালো শাহেদ তখন দেখলো সব মেয়েরা বের হয়ে যাচ্ছে। এই আরেক যন্ত্রনা। ইউনিফর্মে সব মেয়েকেই ওর এক লাগে। এদের মধ্য থেকে বিশেষ একজনকে খুঁজে বের করা রীতিমত পীড়ার পর্যায়ে অনুভুত হয়।

ভীড় এড়িয়ে শাহেদ যখন সামনে এগিয়ে যাবে, তখন এক মধ্য বয়সী ভদ্রলোক গাড়ি থেকে নামলেন। ভদ্রলোকের নামার গতি দেখেই শাহেদ প্রমাদগুনলো। প্রথমে চেষ্টা করলো এড়িয়ে সামনে চলে যেতে। কিন্তু পারলো না। ভদ্রলোক একটা লাঠিতে ভর দিয়ে খুব আস্তে হেটে যাচ্ছেন। শরীর মনে হয় খুবই দুর্বল। শাহেদ পেছনে হাটছে। দুবার তাকে এড়িয়ে সামনে ওঠার চেষ্টা করলো কিন্তু উল্টা দিকের মানুষের জন্য পারলো না। তৃতীয়বার চরম বিরক্তি নিয়ে ভদ্রলোককে খানিকটা ধাক্কা দিল। কিন্তু দূর্ভাগ্য শাহেদের, এবারও সামনে যেতে পারলো না। কি আজব! এই সব লোক রাস্তায় বের হয় কেন? মনে মনে ভাবলো। ওর চোখ তখনও গেটের দিকে, বৃষ্টি মনে হয় এখনও বের হয়নি। আজ যেভাবেই হোক বৃষ্টির সাথে ওর কথা বলতেই হবে। অথচ এই জলজ্যান্ত জড় পদার্থটা ওর সমস্ত সমস্যার কারন হয়ে দাড়িয়েছে। আরো বারকয়েক ব্যার্থ চেষ্টার পর লোকটাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে আধো মনে আর আধো মুখে 'ব্লাডি ডাফার' বলে এগিয়ে গেল সে। মনেমনে তখনও ভাবছে এই সব লোককে বাড়ি থেকে বের হতে দেয় কেন মানুষ!

আট বছর পরের ঘটনা। আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনের উপকূলীয় এলাকা ক্লনটার্ফের একটা বাস স্ট্যান্ডে দাড়িয়ে শাহেদ অপেক্ষা করছে বাসের জন্য। হঠাৎ দেখলো একজন লোক আরেকজন লোককে হাত ধরে বাস স্ট্যান্ডে নিয়ে আসলো। যাকে নিয়ে আসা হয়েছে তিনি বেশ দূর্বল। ঠিকমত দাড়াতে পারছেন না। কিন্তু এই ব্যস্ত ইউরোপে সময়ের যে প্রচুর দাম। যিনি নিয়ে এসেছেন তারও অফিসে যেতে হবে। তাই তার আত্মিয়কে রেখেই চলে গেলেন। শাহেদ আড় চোখে তাকাচ্ছিল। ভদ্রলোকের শরীর খুবই দূর্বল। হাতের চামড়া কুঁচকে গিয়েছে। প্যান্টটা বেল্ট দিয়েও যেন আটকে রাখা যাচ্ছে না কোমরে। একা চলতে পারবে কিনা সন্দেহ।

এক সময় বাস এসে দাড়ালো। ভদ্রলোক ওঠার চেষ্টা করলেন কিন্তু পারলেন না। রুগ্ন শরীরের যেন একটা পদক্ষেপ রাখারও শক্তি নেই। শাহেদ এগিয়ে গিয়ে বলল, মে আই হেল্প ইউ স্যার? দেখা গেলো ভদ্রলোকের তেজ অনেক। সাথে সাথে বললেন, না না। আমিই পারবো। কিন্তু মুখের কথা শরীরের কথা আর হলো না। তাই দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস না করেই শাহেদ জড়িয়ে ধরলো তাঁকে। তার পর আস্তে আস্তে বাসে তুলে সিটে বসিয়ে দিল। ভদ্রলোক তখনও হাপাচ্ছিলেন।

ডাবল ডেকারের দোতালায় উঠে যখন শাহেদ বসেছে তখন ওর চোখে ভেসে উঠলো বাবার ছবি। শাহেদের বাবার দূরারোগ্য কিডনী রোগ হয়েছিল। শরীর ভেঙ্গে গিয়েছিল একদম। অথচ হাতের কুচকানো চামড়া আর বেল্ট দিয়ে কোনক্রমে বেধে রাখা প্যান্টটার উপস্থিতি অস্বীকার করে বাবা রাগী গলায় বলতো, "আরে তোমরা আমাকে ধরো কেন? দেখো আমি একাই হাটতে পারবো।" যদিও পারতো না, এক সময় শাহেদ গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরতো।

শাহেদ আজও ভাবে, হয়তো সে জড়িয়ে ধরায় দূর্বলতা ছিল কোথাও। তাইতো বাবা ওদের ছেড়ে চলে গিয়েছে এমন এক দেশে যেখানে কেবল যাওয়াই যায়, ফিরে আসা যায় না।

সেদিন ক্লনটার্ফের সমুদ্রের পাশ দিয়ে যখন ১৩০ রুটের বাসটি এগিয়ে যাচ্ছিল, চারপাশের মানুষ তখন অবাক হয়ে শাহেদকে দেখছিল। দেখছিল একজন রুপান্তরিত মানুষকে, যে তখন ডুকরে ডুকরে কাঁদছিল।

২ জুলাই, ২০০৮
ডাবলিন, আয়ারল্যান্ড
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা জুলাই, ২০০৮ রাত ১:৪৮
১১টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×