শাহেদ খুব দ্রুত হাটার চেষ্টা করছিল। কিন্তু সরু ফুটপাতের উপর দিয়ে ঠিকমত হাটাও যেন কষ্টকর। অথচ ওর এখন ইচ্ছে করছে রীতিমত দৌড়াতে। একবার হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময়টা দেখে নিল - দুইটা বাইশ। সূর্য ঢলে পড়েছে কিন্তু রোদের তেজ তখনও কমেনি। ভ্যপসা গরম চারদিকে। জ্যামের কারনে গাড়িটা পেছনে রেখে বেশ খানিকটা পথ সে হেটে এসেছে। জায়গায় জায়গায় ফুটপাত কাটা। এই শহরে হাটাও যেন দুঃসাধ্য হয়ে পড়ছে ধীরেধীরে।
মনে মনে সিটি কর্পোরেশনের ইঞ্জিনিয়ারদের গালাগালি করতে করতে ভিকারুন্নেসার মূল কলেজ গেটের প্রান্তে এসে যখন পৌছালো শাহেদ তখন দেখলো সব মেয়েরা বের হয়ে যাচ্ছে। এই আরেক যন্ত্রনা। ইউনিফর্মে সব মেয়েকেই ওর এক লাগে। এদের মধ্য থেকে বিশেষ একজনকে খুঁজে বের করা রীতিমত পীড়ার পর্যায়ে অনুভুত হয়।
ভীড় এড়িয়ে শাহেদ যখন সামনে এগিয়ে যাবে, তখন এক মধ্য বয়সী ভদ্রলোক গাড়ি থেকে নামলেন। ভদ্রলোকের নামার গতি দেখেই শাহেদ প্রমাদগুনলো। প্রথমে চেষ্টা করলো এড়িয়ে সামনে চলে যেতে। কিন্তু পারলো না। ভদ্রলোক একটা লাঠিতে ভর দিয়ে খুব আস্তে হেটে যাচ্ছেন। শরীর মনে হয় খুবই দুর্বল। শাহেদ পেছনে হাটছে। দুবার তাকে এড়িয়ে সামনে ওঠার চেষ্টা করলো কিন্তু উল্টা দিকের মানুষের জন্য পারলো না। তৃতীয়বার চরম বিরক্তি নিয়ে ভদ্রলোককে খানিকটা ধাক্কা দিল। কিন্তু দূর্ভাগ্য শাহেদের, এবারও সামনে যেতে পারলো না। কি আজব! এই সব লোক রাস্তায় বের হয় কেন? মনে মনে ভাবলো। ওর চোখ তখনও গেটের দিকে, বৃষ্টি মনে হয় এখনও বের হয়নি। আজ যেভাবেই হোক বৃষ্টির সাথে ওর কথা বলতেই হবে। অথচ এই জলজ্যান্ত জড় পদার্থটা ওর সমস্ত সমস্যার কারন হয়ে দাড়িয়েছে। আরো বারকয়েক ব্যার্থ চেষ্টার পর লোকটাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে আধো মনে আর আধো মুখে 'ব্লাডি ডাফার' বলে এগিয়ে গেল সে। মনেমনে তখনও ভাবছে এই সব লোককে বাড়ি থেকে বের হতে দেয় কেন মানুষ!
আট বছর পরের ঘটনা। আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনের উপকূলীয় এলাকা ক্লনটার্ফের একটা বাস স্ট্যান্ডে দাড়িয়ে শাহেদ অপেক্ষা করছে বাসের জন্য। হঠাৎ দেখলো একজন লোক আরেকজন লোককে হাত ধরে বাস স্ট্যান্ডে নিয়ে আসলো। যাকে নিয়ে আসা হয়েছে তিনি বেশ দূর্বল। ঠিকমত দাড়াতে পারছেন না। কিন্তু এই ব্যস্ত ইউরোপে সময়ের যে প্রচুর দাম। যিনি নিয়ে এসেছেন তারও অফিসে যেতে হবে। তাই তার আত্মিয়কে রেখেই চলে গেলেন। শাহেদ আড় চোখে তাকাচ্ছিল। ভদ্রলোকের শরীর খুবই দূর্বল। হাতের চামড়া কুঁচকে গিয়েছে। প্যান্টটা বেল্ট দিয়েও যেন আটকে রাখা যাচ্ছে না কোমরে। একা চলতে পারবে কিনা সন্দেহ।
এক সময় বাস এসে দাড়ালো। ভদ্রলোক ওঠার চেষ্টা করলেন কিন্তু পারলেন না। রুগ্ন শরীরের যেন একটা পদক্ষেপ রাখারও শক্তি নেই। শাহেদ এগিয়ে গিয়ে বলল, মে আই হেল্প ইউ স্যার? দেখা গেলো ভদ্রলোকের তেজ অনেক। সাথে সাথে বললেন, না না। আমিই পারবো। কিন্তু মুখের কথা শরীরের কথা আর হলো না। তাই দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস না করেই শাহেদ জড়িয়ে ধরলো তাঁকে। তার পর আস্তে আস্তে বাসে তুলে সিটে বসিয়ে দিল। ভদ্রলোক তখনও হাপাচ্ছিলেন।
ডাবল ডেকারের দোতালায় উঠে যখন শাহেদ বসেছে তখন ওর চোখে ভেসে উঠলো বাবার ছবি। শাহেদের বাবার দূরারোগ্য কিডনী রোগ হয়েছিল। শরীর ভেঙ্গে গিয়েছিল একদম। অথচ হাতের কুচকানো চামড়া আর বেল্ট দিয়ে কোনক্রমে বেধে রাখা প্যান্টটার উপস্থিতি অস্বীকার করে বাবা রাগী গলায় বলতো, "আরে তোমরা আমাকে ধরো কেন? দেখো আমি একাই হাটতে পারবো।" যদিও পারতো না, এক সময় শাহেদ গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরতো।
শাহেদ আজও ভাবে, হয়তো সে জড়িয়ে ধরায় দূর্বলতা ছিল কোথাও। তাইতো বাবা ওদের ছেড়ে চলে গিয়েছে এমন এক দেশে যেখানে কেবল যাওয়াই যায়, ফিরে আসা যায় না।
সেদিন ক্লনটার্ফের সমুদ্রের পাশ দিয়ে যখন ১৩০ রুটের বাসটি এগিয়ে যাচ্ছিল, চারপাশের মানুষ তখন অবাক হয়ে শাহেদকে দেখছিল। দেখছিল একজন রুপান্তরিত মানুষকে, যে তখন ডুকরে ডুকরে কাঁদছিল।
২ জুলাই, ২০০৮
ডাবলিন, আয়ারল্যান্ড

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

