একটা সময় বাংলা সাহিত্যে তিন দাদার দাপট ছিল ব্যাপক। ফেলুদা, টেনিদা এবং ঘনাদা। প্রেমেন্দ্র মিত্রের ঘনাদা যারা পড়েছেন তারা জানেন কি অসাধারন আকর্ষনে পাঠককে গল্পগুলো আটকে রাখে। ঘনাদার প্রতি ভালোবাসা থেকে শুরু করলাম এই সিরিজ, শারদদা। ছোটছোট গল্প দিব, তবে সবই হবে যুক্তিতর্ক এবং জীবনের গল্প। চেষ্টা করবো যাতে গাল-গল্প মনে না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে। - নিয়াজ।
অপু আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। আমি কিছুক্ষন রাগে গজগজ করলাম। পারলে চিৎকার করতাম, কিন্তু কেন যেন সে সহস আর হলো না। ততক্ষনে নিচতলা থেকে রায়হান ডাকাডাকি শুরু করেছে. “কি রে? তোরা কি যাবি না নাকি শারদদাকে গিয়ে বলবো এই বেলা আর আড্ডা হবে না?” আমি নিচু গলায় বললাম আসছি। তারপর অপু সহ নেমে এলাম।
পাঠক বিভ্রান্ত হবেন না। বিষয়বস্তু আসলে খুবই সরল, অন্তত শারদদার আগমনের আগ পর্যন্ত তাই ছিল। আমি দিপু, থাকি আরামবাগের গলির মাঝের এক নিরিবিলি মেসে। সাথে আছে আরো চারজন; অপু, রায়হান, ইদ্রিস এবং মানিক। অপু আর আমি পড়ি নটরডেমে, অন্যরাও আশেপাশের কলেজেই পড়ে। সবাই আমরা সমবয়সী এবং ঢাকার বাহির থেকে এসেছি। কলেজ জীবনের প্রথম তিন মাস দেখতে দেখতে কেটে গেলো। বেশ সুখেই ছিলাম বলতে হবে। কিন্তু কার যে আমরা কি বিগড়ে ছিলাম, খোদাই জানেন। মাস তিনেক পরেই হঠাৎ একদিন এই বিপদের আবির্ভাব।
আমাদের মেসের চিলেকোঠায় একটা রুমের মত জায়গা খালি ছিল। রায়হান বললো ওটা ভাড়া দিলে গড়ে সবার ভাড়া আরো কমে আসবে। তাছাড়া আমরা একটু বিলাসিতা করে একটা বসার ঘরের মত রেখেছিলাম। ক্যারাম-দাবা খেলতে খেলতে আড্ডা দেয়া যাবে, এই ছিল পরিকল্পনা। ফলে সবার ভাগে ভাড়াটাও খানিকটা বেড়ে গিয়েছিল। তাই গড়ভাড়াটা একটু কমিয়ে আনার জন্য বুদ্ধিটা খারাপ ছিলনা। আরামবাগের দেয়ালে দেয়ালে পোস্টারের মত করে বিজ্ঞাপন দেয়া হলো। কিছু দিনের মধ্যেই আনেকে দেখতে আসতে লাগলো। যথারীতি শারদদাও এলেন। তবে তার আসাটা একটু অন্যরকম ছিল। তিনি জিনিসপত্র নিয়ে হাজির, যেন দুবাই থেকে মাত্র ল্যান্ড করলেন। বসার ঘরে ওনাকে বসিয়ে আমরা নিজেরা আলোচনা করতে শুরু করলাম কি করা যায়। আমরা চাচ্ছিলাম সমবয়সী কাউকে ভাড়া দিতে কিন্তু এ যে রীতিমত পচিশ-ছাব্বিশ বছরের যুবক। বয়স আরো বেশি হলেও অবাক হবো না। আমি প্রথম থেকেই না বললাম। কিন্তু রায়হানের মায়া হলো। যুক্তি দেখিয়ে বললো ঘরে কোন মুরুব্বি থাকা দরকার। তাছাড়া লোকটাকে দেখেতো ভদ্রঘরেরই মনে হয়। কিছুক্ষনের মধ্যে অন্যরাও নরম হয়ে গেলো। কি আর করা, আমার একার ভোটে শারদদার আগমন ঠেকানো গেলো না।
সমস্যা আসলে শারদদার আগমনে ছিল না। বরং অবস্থানে। তিনি যে এসে মেসে ঢুকেছেন, গত পনেরদিনে আর বের হননি। অনুরোধে মানুষ ঢেকি গেলে, আমরা এখন দালান-কোঠা গিলতে শুরু করেছি। ওনার বাজার থেকে শুরু করে সবই এখন আমরা করছি। খুব নরম গলায় অনুরোধ করেন, “আজ যদি পারো একটু পালং শাক কিনে এনো। সাথে চিংড়ী। চিংড়ী দিয়ে পালং শাকের তরকারী খেতে খুব ইচ্ছে করছে।” সাথে সাথে রায়হান বলবে, “কেন নয়? আজ সবার জন্য এই তরকারীই হোক।” বলাইবাহুল্য টাকাটা আমাদের পকেট থেকেই যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত শারদদা কি করেন সেটা আমরা অবিষ্কার করতে পারিনি। এমন কি রুমেও ঢোকার সুযোগ হয়নি। মানিক কয়েকবার রুমে উঁকি দেয়ার চেষ্টা করেছিল তবে সে প্রচেষ্টা চেষ্টাতেই সীমাবদ্ধ ছিল, কিছু দেখার সুযোগ হয়নি।
আজ সকাল থেকে একটু মেঘমেঘ। দুপুরে খেতে খেতে শারদদা বলল, “আজ বিকেলে ডালপুরী হলে কেমন হয়?” পরবর্তি কথা যথারীতি রায়হানই বলেছে, “সামনের শরীফের দোকানে দারুন ডালপুরী পাওয়া যায়।” আর যায় কোথায়। শারদদার এখন ডালপুরী খেতে ইচ্ছে করছে খুব। আনার দায়ীত্ব আমার আর অপুর ঘাড়ে পড়লো। পরিকল্পনা হলো বিকেলে আড্ডা বসবে বসার ঘরে।
অপু আমাকে ঘুম থেকে তুলে ডালপুরী কিনতে যাওয়ার কথা বলতেই মেজাজটা বিগড়ে গেলো। কিন্তু কেন যেন একটা অদ্ভুত অনুভুতি কাজ করে আমাদের সবার মাঝে। আমরা কেউই শারদদার মুখের উপর কথা বলতে পারিনা। যা বলছেন সবই বিনাবাক্য ব্যয়ে তামিল করে চলেছি আমরা।
ডালপুরী কিনে ফিরে এসে দেখি শারদদা পাঞ্জাবী পড়ে বেশ ফিটফাট বাবু সেজে বাসার ঘরে বসে পুরোনো পত্রিকাটা উল্টেপাল্টে দেখছেন। ডালপুরীর গন্ধেই কি না, অন্যরাও তখন এসে হাজির হয়েছে। ডালপুরীগুলো একটা বাটিতে ঢেলে যেই ঠোঙ্গাটা ফেলতে যাব, অমনি ইদ্রিস খপ করে আমার হাত ধরে বসলো।
“করিস কি রে তুই?”
“কেন? ফেলে দিচ্ছি। এখন কি ঠোঙ্গাও চাটবি নাকি?”
“দেখছিস না ঠোঙ্গায় আরবী লেখা। আরবী হচ্ছে আল্লাহর ভাষা। তুই এই লেখা মাটিতে ফেলতে যাচ্ছিস?”
এতক্ষনে লক্ষ্য করলাম ব্যপারটা। ঠোঙ্গার কাগজে আরবী হরফে কি যেন লেখা। ইদ্রিস আমাদের মধ্যে একটু হুজুর ধরনের, বেশ কয়েক বছর মাদ্রাসায় পড়ার পর এসএসসি থেকে বাংলায় পড়ছে। এ সব বিষয় ওর চোখেই সবার আগে পড়ে। আমার হাত থেকে ঠোঙ্গাটা নিতে নিতে ইদ্রিস গজগজ করতে লাগলো, “আল্লাহর ভাষার কদর বোঝে না এরা। এই যে বাংলা ইংরেজী, এসবের কত দাম। অথচ এগুলো হচ্ছে সব মানুষের তৈরী ভাষা। আল্লাহর দুনিয়ায় এগুলোর কোন দামই নেই। একমাত্র আরবীই হচ্ছে আল্লাহর ভাষা।”
“তাই নাকি?”
কথাটা কে বলল প্রথমে বুঝতে পারে নাই ইদ্রিস। তাকিয়ে দেখি পুরোনো পত্রিকায় মুখ ঢেকেই শারদদা বলছেন, “তাহলেতো তোমার ঈমান নষ্ট হয়ে গেলো।”
বিস্ফোরিত চোখে ইদ্রিস তাকিয়ে আছে। তার পর বলল, “কি বললেন? আরবী আল্লাহর ভাষা এটা বললে ঈমান নষ্ট হয়?”
শারদদা পত্রিকাটা ভাঁজ করে ডালপুরীর প্লেটের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বললেন, “নাহ। সেটার জন্য নয়। ঐযে বললে বাংলা-ইংরেজী মানুষের ভাষা, এটার জন্য।”
ইদ্রিস মনে হচ্ছে রেগে যাচ্ছে। রাগত গলায় বললো, “আরবী ছাড়া অন্য ভাষা মানুষের ভাষা, এটা বললে ঈমান নষ্ট হয় কে বললো আপনাকে?”
শারদদা ডালপুরীতে প্রথম কামড়টা দিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, “কয়টা বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করলে ঈমান পূর্ন হয়?”
“সাতটা।” গম্ভির ভাবে জবাব দিল ইদ্রিস।
“কী কী?”
“আল্লাহর উপর বিশ্বাস, ফেরেশতাকূলে বিশ্বাস, নবী-রসুলগনে বিশ্বাস, আসমানী কিতাবসমূহে বিশ্বাস...”
শারদদা ইদ্রিসকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “এতটুকুতেই হবে। এবার বলো আসমানী কিতাব কয়টি ছিল?”
“একশ চারটি। এর মাঝে চারটি বড়।” ইদ্রিস তখনও গম্ভীর।
“বড় চারটি কী কী?”
“তাওরাত, জাবুর, ইঞ্জিল এবং কোরআন।”
“তাওরাত কোন ভাষায় নাজিল হয়েছিল জানো?”
ইদ্রিস চুপ করে আছে, কোন জবাব দিল না।
“হিব্রু ভাষায়।” শারদদা বলে চললেন। “ইঞ্জিলও নাজিল হয়েছিল প্রাচিন এক ইউরোপিয়ান ভাষায়। এখন প্রশ্ন হলো তোমার মতে যেহেতু এগুলো মানুষের ভাষা অতএব এ কিতাবগুলো আসমানী কিতাব এটা তুমি মেনে নিচ্ছ না, কারন মানুষের ভাষায়তো আল্লাহ কিতাব নাজিল করবেন না। তাই না?”
ইদ্রিসের মুখ খানিকটা হা হয়ে গিয়েছে। কোন কথা বললো না। শারদদা বলে চললেন, “অতএব ঈমানের একটা ভিত্তি তোমার নষ্ট হয়ে গেল।”
আমরা সবাই তখন অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি। শারদদা এক সাথে দুটো ডালপুরী তুলে নিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন, “কোরআনে বিভিন্ন জায়গায় আল্লাহতালা বলেছেন তিনি সমস্ত পৃথিবীর জন্য যুগেযুগে নবী ও রসুলগনকে প্রেরন করেছেন। সঠিক সংখ্যা একমাত্র আল্লাহতালাই জানেন। তবে লক্ষনীয় বিষয় হচ্ছে তাঁদের শুধু আরবের জন্যই প্রেরন করা হয়নি। অতএব, তাদের মুখের ভাষাও ভিন্ন ভিন্ন হবে স্বাভাবিক। কিন্তু তোমার বক্তব্য অনুযায়ী তাহলে তাঁরা নবী কেমন করে হন কারন তারাতো মানুষের ভাষায় কথা বলতেন। এমনকি অন্য আসমানী কিতাব যেগুলো তাদের কাছে প্রেরিত হয়েছিল, কোরআনে কোথাও বলা নেই সেগুলোও আরবীতে ছিল। অতএব ঈমানের আরেকটি ভিত্তি, নবী ও রসুলগনের উপর বিশ্বাসও তোমার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।”
ইদ্রিসের চেহারা তখন দেখার মত হয়েছিল। কোন কথা বলতে পারছিল না। শুধু বিড়বিড় করে কি যেন উচ্চারন করছিল। শারদদাও থামার পাত্র নয়। বলে চলেছেন তখনও, “এবার আসি আল্লাহতালায় বিশ্বাসের বিষয়ে। এ বিশ্বাসটা খুবই গুরুত্বপূর্ন। এখানে বলা হয়েছে আল্লাহ এক, তিনি সবকিছুর স্রষ্টা এবং সকল এবাদতের একমাত্র হক্বদার। কিন্তু তুমি একটু আগে আরবী বাদে অন্য সব ভাষাকে মানুষের ভাষা বানিয়ে দিলে। এখন তুমিই চিন্তা করে দেখো, তুমি কি আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বকে অস্বীকার করলে না? এর পরও তোমার ঈমান থাকে?”
ইদ্রিসের মুখ এবার পুরোই হা হয়ে গিয়েছে। সাথে আমাদেরও। এর ফাঁকে আমি প্লেট থেকে শেষ ডালপুরীটা তুলতে গিয়েছিলাম। শারদদা ছোঁ মেরে সেটা তুলে নিয়ে রুম থেকে বের হতেহতে বললেন, “দেখো ইদ্রিস, এই যে পৃথিবী, মানুষ এবং মানুষের মুখের ভাষা। এ সবই আল্লাহতালার মহিমা এবং কুদরত। এর সব কিছুই আল্লাহর সৃষ্টি। সেটা আরবী ভাষা হোক আর বাংলা বা অন্য কোন ভাষা। তুমি ভাষার প্রতি সম্মান দেখাচ্ছিলে, সেটা খুবই ভালো। তবে সেটা সব ভাষার প্রতিই থাকা উচিত। আর তোমাকে এতক্ষন যা বললাম সেটা শুনতে হালকা লাগতে পারে তবে কথাগুলো একদম ফেলে দিও না। পরে চিন্তা করে দেখো, হয়তো আর অর্থহীন মনে হবে না।”
শারদদা বের হয়ে যাবার পরও ইদ্রিস পাথরের মত বসে রইলো। সাথে আমরাও।
১০ জুলাই ২০০৮
ডাবিলন, আয়ারল্যান্ড।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই জুলাই, ২০০৮ রাত ২:৩০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



