somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ঐন্দ্রিলা (গল্প)

১১ ই জুলাই, ২০০৮ বিকাল ৫:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

**এক**

“এবার গুনে বলো আমার হাতে কয়টা আঙ্গুল?” বাম হাতে তন্ময়ের চোখ চেপে ধরে ডান হাতটা ওর হাতে রাখতে রাখতে ঐন্দ্রিলা বলল।
তন্ময় হাসতে হাসতে বলল, “এরকম ছেলেমানুষীর কি কোন মানে হয়?”
“তোমাকে গুনতে বলেছি, তুমি গুনে বলো।” ঐন্দ্রিলা কপট রাগ দেখিয়ে বলে।
“আচ্ছা বাবা, মহারানীর যা হুকুম তাই হবে।”

তন্ময় গুনতে শুরু করলো, “এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ, ...ছয়।” তন্ময় অবাক হলো না বরং মনে মনে ঐন্দ্রিলার চালাকীটা ধরার চেষ্টা করল। কারসাজিটা কোথায় করা হয়েছে? সম্ভবত কোন আঙ্গুল গুনে ফেলার পর বাঁকা করে অন্যপাশে রেখেছে। তবুও ঐন্দ্রিলার হাতের ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করলো তন্ময়। সাথে সাথে ‘চোর’ ‘চোর’ বলে চিৎকার করে ঐন্দ্রিলা হাতটা টেনে নিল। তার পর শাড়ির আঁচলটা নিয়ে খেলা করতে করতে বললো, “এবার বিশ্বাস হলো যে আমরা সব সময় যা দেখি তাই কেবল সত্য, আর যা দেখিনা তা মিথ্যা – এমনটা নয়?”
“তুমি একটা কারসাজি দেখিয়েছ। একটা ম্যাজিক, হাত সাফাইয়ের ম্যাজিক। এ দিয়ে কি সত্য মিথ্যার প্রভেদ করা যায়?”
“তুমি এখনও বিশ্বাস করনি?”
“করাটা কি জরুরী?”
“আমার কথা বিশ্বাস করবাইবা কেন?”
ঐন্দ্রিলা কিশোরী মেয়েদের মত মন খারাপ করে খাটের অন্য প্রান্তে গিয়ে জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে থাকলো।

বিষয়টা আসলে হাতের আঙ্গুল গোনার মত তুচ্ছ বিষয়ে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটা ছিল একটা রুপক উদাহরন। ঐন্দ্রিলার মতে পৃথিবীতে অশরীরীরা ঘুরে বেড়াচ্ছে প্রতিনিয়ত কিন্তু আমরা তাদের দেখতে পাই না। তারা যদি চায় একমাত্র তখনই আমরা তাদের দেখি। তাদের না দেখতে পাওয়ার অর্থ এই নয় যে তারা নেই। প্রথম প্রথম তন্ময় হেসে উড়িয়ে দিত এসব কথা, কিন্তু ধীরেধীরে দেখলো ঐন্দ্রিলা বিষয়গুলোকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখে। এমন কি নিজের চারপাশে সবসময় একটা রহস্যের জগৎ তৈরী করে রাখতে পছন্দ করে সে। যা নেই তাকে নিজের মনের মাঝে একটু একটু করে ‘আছে’ বলে বিশ্বাস দেয়ার চেষ্টা করছে সে দিনের পর দিন।

ঐন্দ্রিলার মন খারাপ করিয়ে দিতে ইচ্ছে করছিল না তন্ময়ের। তাই পেছনে এসে দাড়িয়ে বলল, “আচ্ছা বাবা, বিশ্বাস করলাম। এবার অন্তত একটু হাসো।”
ঐন্দ্রিলা তবুও অভিমানী গলায় বললো, “তোমাকে আসল প্রমান না দেখালে তুমি বিশ্বাস করবা না কোনও দিন, আমি জানি।”
তন্ময় হেসে বললো, “আসল প্রমানতো তুমিই আছো। ভূতের থেকে তুমি কোন অংশে কম রহস্যময়ী নয়।”
ঐন্দ্রিলা সাথে সাথে সংশোধন করে দেয়, “ভূত নয়, আমি পেত্নি!”
দুজনেই এবার একসাথে হেসে ফেললো।

ওদের পরিচয়ের গভীরতা দেখে যে কেউ ঘাবড়ে যাবে। হয়তো ভাববে অনেক দিনের পরিচয়। আসলে কিন্তু তা নয়। সপ্তাখানেকের বেশি হয়নি ওরা পরিচিত হয়েছে একে অপরের সাথে। অথচ এই কয়দিনে ঐন্দ্রিলা তন্ময়ের জীবনের অনেক গভীরে চলে এসেছে; এত গভীরে যেখান থেকে ফিরে যাওয়া হয়তো অসম্ভব।

তন্ময় একজন চিত্রশিল্পী। ছবি আঁকা আগে ওর নেশা ছিল, এখন পেশাও। চারুকলা থেকে পাশ করে বের হবার পর প্রথম প্রথম একটু হতাশ ছিল সে। কোন উপার্জন নেই। পেট চালাতে হলে কিছু করতে হবে, শিল্প দিয়ে অন্তত পেট ভরে না। কিছু দিন কেটে যাওয়ার পর এক ভদ্রমহিলার সাথে ওর পরিচয় হয় যিনি প্রধানত ইংল্যান্ডে থাকেন। তবে আসা যাওয়ার মধ্যেই চলে তার জীবন। তন্ময়কে তিনি চাকরী দিয়েছেন, ছবি আঁকার চাকরী। তন্ময়ের কাজ হলো মাসে সুর্নিদিষ্ট সংখ্যক পেইন্টিং তৈরী করে দিতে হয়, যেগুলো ভদ্রমহিলা লন্ডনে নিয়ে বিক্রি করেন। তন্ময় বুঝতে পারে এই পেইন্টিংগুলো অনেক বেশি দামে লন্ডনে মানুষ কিনছে, কিন্তু তবুও যে টাকা সে এখানে পাচ্ছে তাতে তার ভালই চলে যায়।

এভাবেই কাটছিল ওর জীবন। কিন্তু শাশ্বত সত্য হচ্ছে শিল্পকে কখনও নাগারিক জীবনের বলয়ে আটকে ফেলা যায় না। আঁকার কাজটা যখন তন্ময় চাকরী হিসেবে নিল তখন থেকেই ওর আঁকার অনুপ্রেরনা কমে যায়। এক সময় দেখা গেলো হয় সে বিষয়বস্তু খুঁজে পাচ্ছে না অথবা আঁকার পর নিজেরই আর পছন্দ হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে যে কিছুদিনের মধ্যে ওর চাকরী যাবে সেটা সহজেই অনুমান করতে পারছিল তন্ময়। ফলে চাকরী এবং পেট দুটোকেই বাঁচাতে বিকল্প পথ খোঁজা শুরু করলো সে।

তন্ময়রই চারুকলার এক বন্ধু ওকে পরামর্শ দিল দূরে কোথাও নির্জনে গিয়ে কিছুদিন একা থেকে আঁকার চেষ্টা করে দেখতে। পরামর্শটা তন্ময়ের বেশ মনে ধরলো। এমন একটা পরিবেশ যেখানে জনমানব প্রায় নেই বললেই চলে। তন্ময় একা একা ছবি আঁকবে, শুধুই ছবি। এভাবে এক মাস থাকতে পারলে অনেকগুলো পেইন্টিং আঁকা হয়ে যাবে, মনে মনে ভেবেছিল তন্ময়।

যেমন ভাবা তেমন কাজ; এক দুঃস্পর্কের আত্মিয়র সাহায্য নিয়ে রাজশাহীর এক অজপাড়া গাঁয়ে এসে উঠলো সে। হোটেলের মত আপ্যায়ন এখানে তন্ময় আশা করেনি তবে এতটা খারাপ অবস্থা হবে সেটাও ভাবেনি। ইলেক্ট্রিসিটি নামে মাত্র রয়েছে। দিন-রাত প্রায় পুরোটাই লোডসেডিং-এর নামে ইলেক্ট্রিসিটি আসা যওয়া করতে থাকে। থাকার জন্য যে বাড়িটায় উঠেছে সেটায় আর কেউ থাকে না। একটা বৃদ্ধ কেয়ারটেকার রয়েছে যে পাশের কোন একটা বাড়িতে থাকে। এক-দুদিনে হয়তো একবার এসে তন্ময়ের খোঁজ নিয়ে যায়। স্টোভ আছে, রান্না নিজেকেই করে নিতে হয়। মোটের উপর ইংরেজী ‘সেল্ফ-সার্ভিস’-এর বেশ ভালই চর্চা করে চলেছে তন্ময় এখানে গত কিছুদিন।

তবে সময়টা যে খুব খারাপ যাচ্ছে ওর তা কিন্তু নয়। এখানে এসে ওঠার পর দিনই ঐন্দ্রিলার সাথে দেখা। বৃদ্ধ কেয়ারটেকার বাথরুমে পানি দিয়ে গিয়েছিল। সে পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে যেই বের হয়েছে অমনি যেন ভূত দেখার মত চমকে উঠেছিল তন্ময়। বারান্দায় শাড়ি পড়া এক তরুনী মেয়ে দাড়িয়ে আছে। কোনদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। এক মনে বারান্দায় দাড়িয়ে উঠানের অনেক বছরের পুরোনো অসত্থ গাছটার দিকে তাকিয়ে ছিল। তম্ময় যখন ঐন্দ্রিলার কাছে গিয়ে দাড়ায় তখনও ওর নজর গাছের দিকে। হঠাৎ তন্ময়কে দেখে ভূত দেখার মত চমকে উঠেছিল ঐন্দ্রিলা। বেচারীর অপ্রস্তুত অবস্থা দেখে সেদিন তম্ময় হেসে ফেলেছিল। সাথে সাথে ঐন্দ্রিলা ছুটে বের হয়ে যাচ্ছিল। তন্ময়ই ডেকে থামায় ওকে। তার পর নিজের পরিচয় দিয়ে পরিবেশটা হালকা করে। ঐন্দ্রিলাও জানায় সে পাশের চৌধুরী বাড়ির মেয়ে। এই পোড়া বাড়িটা ওর খুব প্রিয়। তাই মাঝে মাঝে ঘুরতে আসে। তবে সে জানতো না যে এখানে তন্ময় এসে উঠেছে কিছুদিন থাকার জন্য।

এরপর তন্ময়ের আঁকা পেইন্টিংস দেখতে দেখতে, বিভিন্ন বিষয়ে গল্প করতে করতে দুজনে একে অপরের অনেক কাছে চলে আসে। গত সাতদিন ওরা অনেকটা সময় এক সাথে কাটিয়েছে। তন্ময় কাজ না থাকলে খুব একটা বাহিরে যায় না। ঐন্দ্রিলাই চলে আসে সুযোগ পেলে। যদিও সময় মাত্র সাতদিন, কিন্তু এ সাতদিনে ওরা সম্পর্কের এমন একটা পর্যায়ে চলে এসেছে যেখান থেকে আর মাত্র একটা পদক্ষেপ এগিয়ে গেলেই হয়তো সম্পর্ক আর শুধু বন্ধুত্বে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তন্ময় চেয়েছিল ঐন্দ্রিলার পরিবারের সাথে দেখা করতে কিন্তু ঐন্দ্রিলা বারবার বাধা দিয়েছে। বলেছে এখনও সময় আসেনি। তাছাড়া ঐন্দ্রিলা নিজেকেও সব সময় একটা রহস্যের মধ্যে রাখে। একদিন হাসতে হাসতে বলেছিল, “আমি হচ্ছি তোমার ছায়ার মত। যতই আগ্রহ দেখিয়ে কাছে আসতে চাইবে আমি ততই দূরে চলে যাব। আর যদি আমাকে আমার মত থাকতে দাও তাহলে সব সময় তোমার সাথে থাকবো।”

ঐন্দ্রিলার আরেকটা রহস্যময়ী দিক হচ্ছে অশরীরী দর্শন। সে নাকি এমন কিছু মানুষকে দেখতে পায় যারা অনেক বছর আগেই মারা গিয়েছে। তন্ময় ঐন্দ্রিলাকে বোঝাতে চেয়েছে এটা ওর মনের ভুল। নিঃসঙ্গতা থেকে নিজেনিজেই এসব কল্পনা করে নেয় সে। কিন্তু ঐন্দ্রিলা এ যুক্তি মানতে রাজী নয়। ওর মতে সে প্রায়ই একটা বৃদ্ধলোককে দেখে যে অনেক বছর আগে মারা গিয়েছে। সেই লোক অশত্থ গাছের গোড়ায় এসে ঐন্দ্রিলার দিকে তকিয়ে থাকে। লোকটার চোখে কেমন জানি একটা ভয় থাকে সবসময়। এ সব গল্প শুনলে তন্ময় হেসে বাঁচে না। হাসতে হাসতে সেদিন বলেছিল, “তুমি কি ভূতের চেয়েও ভয়ঙ্কর যে ভূতও তোমাকে ভয় পায়?”

ঐন্দ্রিলা বিরক্ত হয় যখন দেখে তন্ময় ওর কথা বিশ্বাস করছে না। তখন আপ্রান চেষ্টা করে নানা ভাবে ওকে বোঝাতে। আজও এরকমই একটা তর্ক থেকে এই আঙ্গুল বিষয়ক হেয়ালীর সূত্রপাত। ঐন্দ্রিলা আজ বিকেল এক বৃদ্ধ মহিলাকে দেখেছে যাকে সে অনেক মাস পরপর দেখতে পায়। তন্ময় খোঁচা দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল সেই মহিলাও কি ভয় পাচ্ছিল। ভেবেছিল ঐন্দ্রিলা রাগ করবে। কিন্তু ঐন্দ্রিলা রাগ করেনি, হয়তো খোঁচাটা গায়ে মাখেনি, অথবা সে তখন অন্য কোন জগতে ছিল। গম্ভীর ভাবে জানিয়েছিল এই মহিলা ওকে দেখলে ভয় পায় না, বরং যেন কিছু বলতে চায়। কিন্তু কখনই তার বলা হয়ে উঠেনা। ঐন্দ্রিলাও চায় তাঁর সাথে কথা বলতে, একটা তিব্র আকর্ষন বোধ করে সে, কিন্তু মহিলা কখনও কাছে আসে না।

তন্ময়ের চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করেছিল, “বুল-শিট।” অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়েছিল। তারপর ঐন্দ্রিলাকে বোঝাতে শুরু করে বাস্তবতা, বিজ্ঞান এবং এসব ভ্রান্ত বিষয়গুলো দেখার সম্ভাব্য কারন।

গল্প করতে করতে কখন সময় গড়িয়ে গিয়েছে ওরা লক্ষ্য করেনি। সন্ধা তখন প্রায় রাতের কাছে ধরা দিচ্ছে। ঐন্দ্রিলার যেতে হবে, না হলে বাড়িতে সবাই চিন্তা করবে। তন্ময়ও আর আটকে রাখেনি। নিচের দরজা পর্যন্ত নামিয়ে দিয়ে ফিরে আসলো। ঐন্দ্রিলা চায় না গ্রামের মানুষ দেখুক তন্ময় ওর সাথে সন্ধারাতে হাটছে।

সেদিন রাতেই তন্ময় ঠিক করলো আগামীকাল সকালে চৌধুরীবাড়ীর দিকটা ঘুরে আসবে।

**দুই**

পরদিন তন্ময় একটু বেলা করে বের হলো। ভেবেছিল গ্রামটা ঘুরে দেখবে সাথে চৌধুরীবাড়ীর দিকটাও। পথে এক ছেলেকে চৌধুরীবাড়ী কোন দিকে জিজ্ঞেস করতেই ছেলেটার চেহারা বদলে গেলো। আঙ্গুল দিয়ে সামনে ইশারা করেই সে দৌড় দিল। তন্ময় ঠিক বুঝতে পারলো না এমনটা কেন করলো। হয়তো অচেনা মানুষ দেখে ঘাবড়ে গিয়েছে, মনেমনে ভাবলো।

আরও খানিকটা পথ এগিয়ে আসার পরও তন্ময় এমন কোন লোকালয় দেখতে পেলো না যেটা ঐন্দ্রিলার বর্ননার সাথে মিলে যায়। ফলে আর বুঝতে অসুবিধা হলো না সে পথ হারিয়েছে। তন্ময় তবুও হেটে চলল। হাটতে হাটতে এক সময় জঙ্গলে ঘেরা একটা এলায়কায় চলে আসলো সে। সামনে গাছে ঢাকা একটা বড় বাড়ী দেখা যাচ্ছিল তবে সেটায় কেউ থাকে বলে মনে হলো না। তন্ময় আরো কাছে যাওয়ার পর নিশ্চিত হলো আসলেই এখানে কেউ থাকে না। বাড়ীটার উঠানে দাড়িয়ে চারপাশটা দেখতে লাগলো তন্ময়। এলাকাটা অসম্ভব নিরব যেন কোন জনমানব নেই এ বাড়ীর আসেপাশে। ধুলার আস্তর দেখেও বোঝা যায় এদিকটায় মানুষ খুব একটা আসে না। বাড়ীটা পাকা, আংশিক চাল আর আংশিক কঙ্ক্রিটের ছাদ।

হঠাৎ করে বাড়ীর ভেতর থেকে কিছু একটা বের হয়ে দ্রুত তন্ময়ের দিকে এসে আবার পাশকাটিয়ে চলে গেল। প্রথমে একটু ভয় পেয়েছিল সে, তারপর ঠান্ডা মাথায় বিষয়টা ভেবে নিজেই হেসে ফেললো। ওটা আসলে একটা বাদুড় ছিল। দিনের আলোয় হয়তো ভুল করে বের হয়ে পড়েছে, তাই মাথাখারাপ হয়ে এলোমেলো চক্কর দিয়ে আবার বাড়ীর ভেতরে গিয়ে ঢুকেছে। তন্ময় বুঝতে পারে এটা আসলেই একটা পরিত্যক্ত বাড়ী তা না হলে বাদুড় আস্তানাগাড়তো না এখানে।

তন্ময় বের হতে যাচ্ছিল তখন পোড়াবাড়ীর বৃদ্ধ কেয়ারটেকার দৌড়াতেদৌড়াতে এসে উঠানে পৌছালো।
“বাবু, আপনি এখানে কি করছেন? আমার ছোট ছেলের কাছে শুনলাম আপনি এদিকে এসেছেন। তাই দৌড়ে এলাম।”
“ঘুরে দেখছি গ্রামটা। কেন? কোন সমস্যা আছে নাকি?”
“ঘোরার জন্য শেষবেলায় আপনি এই অভিশপ্ত বাড়ীটাই পেলেন?”
তন্ময় তাচ্ছিল্যের স্বরে বললো, “তাই নাকি? দেখেতো দিব্যি অবস্থা সম্পন্ন মানুষের বাড়ীই মনে হচ্ছে, অন্তত এক সময় তাই ছিল সম্ভবত।”
“হ্যা, তা ছিল ঠিক। কিন্তু গত পচিশ বছরে এ বাড়ীর অনেক কিছুই বদলে গেছে। মালিক মারা গিয়েছে, পরিবার ধংশ হয়েছে, এখন এই পরিত্যক্ত দালানগুলোই শেষ চিহ্ন।”
গল্পের গন্ধ পেয়ে তন্ময় বললো, “কি হয়েছিল খুলে বলেনতো?”
বৃদ্ধ অনুরোধ করে বললো, “বাবু এ উঠান ছেড়ে বের হন। তার পর বলছি।”
তন্ময়ের জেদ চেপে গিয়েছে তখন। বলল, “এ বাড়ীর গল্প এবাড়ীর উঠানেই শুনবো।”

বুড়ো কেয়ারটেকার অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও উঠানে দাড়িয়েই বলতে শুরু করলো, “এ বাড়ীটা এই গ্রামের খুব নাম করা খান পরিবারের। এক কালে তাদের অনেক প্রতিপত্তি ছিল। কিন্তু সত্তরের দশকের শেষের দিকে এক নিষ্ঠুর আচরনের জন্য তাদের পুরো পরিবারের উপর অভিশাপ নেমে আসে। ধংশ হয়ে যায় যে যেখানে ছিল সবাই।”
“কি হয়েছিল?” মন্ত্রমুগ্ধের মত জানতে চাইলো তন্ময়।
“হত্যা। নিশ্পাপ শিশু হত্যার দায় সবাইকে নিতে হয়েছিল।” বৃদ্ধ বলে চললো, “সে বছর বৃষ্টি হচ্ছিল না। মাঠে ফসল নেই, ঘরে এক মুঠো চাল নেই। গ্রামের সবাই নিদারুন কষ্টে দিন কাটাচ্ছিল আর খোদার কাছে এক পষলা বৃষ্টির জন্য কেঁদে বুক ভাসাচ্ছিল। তখন রুস্তম খান অর্থাৎ এই বাড়ীর কর্তার ছোট বৌ সন্তানসম্ভবা ছিলেন। এমন সময় এক সাধুবাবা এসে রুস্তম খানকে জানায় তার অনাগত সন্তান অভিশপ্ত। এ জন্য তার এলাকায় আজ এমন অবস্থা। রুস্তম খান এসব বিষয় খুব মানতো। তাই এ সন্তান সে নিতে চায়নি। কিন্তু তখন অনেক দেরী হয়ে গিয়েছে। ছয়মাসের সন্তান তখন তার স্ত্রীর পেটে। মনেমনে তখনই হয়তো রুস্তম খান ঠিক করেছিল এ সন্তানকে পৃথিবীর মুখতো দেখাবে ঠিকই তবে সেদিনই হবে জীবনের শেষ দিন।”

বৃদ্ধ কেয়ারটেকার থেমে একটু দম নিল। তারপর চারপাশে চোখবুলিয়ে বলতে শুরু করলো আবার, “এরকমই এক নিরব দিনে রুস্তম খানের একটা ফুটফুটে মেয়ে হলো। ধাত্রিদের কাছে শুনেছিলাম সে মেয়ে দেখতে ছিল ভিষন সুন্দর আর পবিত্র। কিন্তু সাধুর বলা সেই কথা রুস্তম খানের মনে এতটাই ভয় এবং ঘৃনা সৃষ্টি করেছিল যে শিশুকন্যার পবিত্র চেহারাটাও তাকে থামাতে পারেনি এতবড় পাপ থেকে। সেদিনই বিকেল বেলা এবাড়ির কোন এক অজানা জায়গায় জীবন্ত কবর দেয়া হয় সেই নিশ্পাপ একদিনের শিশুকে। এর পরই শুরু হয় সেই অভিশাপ। ধীরেধীরে মারা যায় পরিবারের সবাই। রুস্তম খানকে দিয়ে শুরু, এরপর তার ছেলেরা এবং দুই বৌ। ছোট বৌ মারা গিয়েছিল সবার শেষে। মেয়েকে হারিয়ে পাগলের মত হয়ে গিয়েছিল। বারবার বলতো আমার মেয়েকে এনে দাও, আমি শুধু একটা কথা বলবো, একটা কথা। বেঁচে থাকা আর মরে যাওয়া তার জন্য সমানই ছিল।”

বৃদ্ধ থামলে তন্ময় অবাক হয়ে বাড়ীটাকে দেখছিল। এ বাড়ীরই কোন এক জায়গায় বছর পচিশ আগে এক বিকেলে একটা একদিনের ফুটফুটে শিশুকে জীবন্ত কবর দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। ভাবতেই কেমন যেন লাগে।

আর দাড়িয়ে থাকার মানে হয় না, বরং একটু কেমন যেন অন্যরকম লাগছিল। তাই তন্ময় বের হয়ে এলো উঠান থেকে। বের হতে হতে বৃদ্ধ কেয়ারটেকারকে জিজ্ঞেস করলো চৌধুরীবাড়ীটা কোথায়, একবার সে যেতে চায়। বৃদ্ধ অবাক হয়ে বলল, “আরে বাবু, এটাইতো চৌধুরীবাড়ী। খানদের কোন এক পূর্বপুরুষ খান বাহাদুর চৌধুরী উপাধী পেয়েছিল। সেই থেকে এ বাড়ীর নাম চৌধুরীবাড়ী।”

মুহুর্তে তন্ময় দাড়িয়ে গেল। জীবনে এতবড় বিস্ময় সম্ভবত ওর সামনে আর কোনদিন উপস্থিত হয়নি। হতবাক হয়ে বাড়ীটাকে আবার দেখতে লাগলো। আর ভাবছিল ঐন্দ্রিলার কথা। তবে কি…? প্রশ্নটা নিজের মনেই আটকে গেলো।

তারপর বৃদ্ধ কেয়ারটেকারকে জিজ্ঞেস করলো, “যে শিশুকন্যাকে হত্যা করা হয়েছিল তার কি কোন নাম ছিল?”
“নাহ বাবু। একদিনের বাচ্চার কি আর নাম থাকে? যেদিন জন্ম সেদিনইতো সব শেষ।”
“ওহ..!” হতাশ ভাবে তন্ময় বললো।

হাটতে হাটতে ওরা আরো কিছুদূর চলে আসার পর তন্ময় আবার জিজ্ঞেস করলো, “এত সুন্দর একটা শিশু, কি এমন দেখলো রুস্তম খান যে মনে হলো সে অভিশপ্ত?”
“কি আর বলবো বাবু”, বৃদ্ধ বলল, “ঐ সময়তো আর আজকের মত এত উন্নত ছিলনা সব কিছু। মানুষ সাধারন জিনিসগুলোকেও অশুভ মনে করতো। বাচ্চাটার ডান হাতে ছয়টা আঙ্গুল ছিল। রুস্তম খান মনে করেছিল এটাই অশুভ এবং অভিশাপের চিহ্ন।”

বৃদ্ধ কেয়ারটেকার আরো কী কী যেন বলছিল। কিন্তু কিছুই আর তন্ময়রে কানে ঢুকছিল না। তন্ময় তখন একটা ঘোরের মধ্যে ছিল। ওর মনে পড়ছিল ঐন্দ্রিলার কথা, ওদের প্রথম দেখার কথা, সেই বৃদ্ধলোকটার কথা যে ঐন্দ্রিলাকে দেখে ভয় পেতো, সেই বৃদ্ধ মহিলার কথা যে ঐন্দ্রিলাকে কি যেন বলতে চাইতো কিন্তু কোন দিনও বলা হয়ে উঠতো না, ঐন্দ্রিলার ডান হাতের ষষ্ঠ আঙ্গুলটার কথা যা তন্ময় কোন দিনও দেখেনি কিন্তু স্পর্শ করেছে।

তন্ময়ের আরো মনে পড়ছিল ঐন্দ্রিলার বলা একটা কথা - “আমি হচ্ছি তোমার ছায়ার মত। যতই আগ্রহ দেখিয়ে কাছে আসতে চাইবে আমি ততই দূরে চলে যাব। আর যদি আমাকে আমার মত থাকতে দাও তাহলে সব সময় তোমার সাথে থাকবো।”

**তিন**

২০২৫ সনের ফেব্রুয়ারী মাসে লন্ডনের এক নাম করা আর্ট গ্যালারীতে মানুষের উপচে পড়া ভীড় দেখা গেলো। বাংলাদেশের প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী তন্ময় হাসানের একক প্রদর্শনী চলছে। অধিকাংশ মানুষের আকর্ষনের কেন্দ্র বিন্দু ছিল একটা প্রমান সাইজের পোট্রেট - “ঐন্দ্রিলা”। শাড়ীতে এক অপরুপা নারী দাড়িয়ে আছে। আলো-আঁধারী আর রহস্য দিয়ে ঘেরা সেই পোট্রেটকে অনেকেই মোনালিসার সাথে তুলনা করছিল। মোনালিসার যেমন ভ্রু ছিল না বলে অনেকে ধারনা করে সেটা একটা খুঁত, ঐন্দ্রিলারও একটা খুঁত ছিল। ডান হাতে ছয়টা আঙ্গুল ছিল। মানুষ ভাবতো শিল্পী হয়তো ভুল করে একটা আঙ্গুল বেশি এঁকেছেন।

কে এই ঐন্দ্রিলা? তাকে কোথায় খুঁজে পেলেন তন্ময় হাসান? এই নিয়ে চলছিল বিস্তর আলোচনা। স্কাই নিউজের রিপোর্টার যখন এ প্রশ্ন তন্ময় হাসানকে করে তখন তিনি হেসে বলেছিলেন, “আমার ছায়ার মাঝে।” (সমাপ্ত)

১১ জুলাই ২০০৮
ডাবলিন, আয়ারল্যান্ড।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জুলাই, ২০০৮ বিকাল ৫:২৬
১৪টি মন্তব্য ১৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×