somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

স্বপক্ষ-বিপক্ষ [শারদদা - ২] (গল্প)

১২ ই জুলাই, ২০০৮ রাত ২:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

শারদদার আগমন (শারদদা - ১)

“এবারের নির্বাচনে আওয়ামে লীগ যদি না জেতে তো আমার নাম…” উত্তেজনায় নবীন তোলতাতে শুরু করলো। সম্ভবত যুতসই নাম খুঁজে পাচ্ছিল না।

সম্ভাব্য জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আলোচনা চলছে আমাদের আরামবাগের মেসের বসার ঘরে। আলোচনায় আজ নুতন মুখ নবীন। নবীন মানিকের বন্ধু, থাকে পাশেরই এক মেসে। আমাদের প্রতিদিনের বিকেলের আলোচনার গল্প শুনে সে মুগ্ধ। তাই আজ এসেছে যোগ দিতে।

শরীফের দোকানের ডালপুরি আমাদের মেসে এখন চরম হিট। রোজই আনা হচ্ছে। ইদ্রিস একটা আলাদা প্লেটে বেশ কিছু ডালপুরি নিয়ে শারদদার পাশে রেখেছে। রায়হানের থেকে এখন শারদদার বড় ভক্ত ইদ্রিস। সে নিজ উদ্যোগে একটা দৈনিক সংবাদপত্রও রাখার ব্যবস্থা করেছে। শারদদা পুরোনো পত্রিকা পড়বে, এটা সে মেনে নিতে পারছিল না। শারদদা পত্রিকার পাতায় ডুবে গিয়ে মাঝে মাঝে পুরিতে কামড় দিচ্ছিলেন আর এদিকে চলছে আমাদের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে জমিয়ে আড্ডা।

নবীন আবারো বললো, “এবারের নির্বাচনে আওয়ামে লীগের না জেতার কোন কারনই নেই। জনগন এখন সবাইকে চেনে, সবই বোঝে। স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তিকেই এবার তারা ক্ষমতায় আনবে।”

“হুম…”
শব্দটা সম্মতি সূচক ছিল নাকি হাসি, ঠিক বোঝা গেলো না। তবে উৎপত্তিস্থল যে পত্রিকার আড়াল থেকে, সেটা বেশ বোঝা গেলো। শারদদার সাথে নবীনের পরিচয় হয়নি এখনও। তাই সে একটু অবাক হয়ে তাকালো। তারপর জিজ্ঞেস করলো,
“আপনি কি মনে করেন না জনগন স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তিকে আবার ক্ষমতায় দেখতে চায়?”

শারদদা পত্রিকাটা ভাঁজ করে আমাদের কাছে এসে বসলেন। সেটা কতটা কথা বলার জন্য আর কতটা খালি প্লেটটাকে পুরি দিয়ে পূর্ন করার জন্য ঠিক বোঝা গেলো না। নবীন তখনও জবাবের জন্য অপেক্ষা করছে। শারদদা আমাদের বড় প্লেট থেকে একটা পুরি তুলে নিয়ে বললেন, “শরীফের পুরির আসলে তুলনা হয় না, কি বলো তোমরা?”
ইদ্রিস বেশ বিগলিত হয়ে জবাব দিতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই রায়হান বলে ফেললো, “শারদদা, আমরা চুক্তি করেছি শরীফের সাথে। প্রতিদিন এমন পরিমানে পুরি আনলে আমাদের হাফ দামে দেয়া হবে।”
“আরে তাই নাকি?” শারদদা বেশ উচ্ছসিত হয়ে উঠলেন।

কথার মাঝখানে ফোড়ন কেটে পুরি বিষয়ক আলোচনায় ব্যাস্ত হয়ে পড়াটা নবীন ঠিক পছন্দ করছিল না। তাই আবার শারদদাকে বললো, “আপনার মতামততো বললেন না?”

শারদদা আরাম করে বসতে বসতে বললেন, “কোথায় ছিলাম আমরা? ওহ! স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি। ওটা আসলে কারা?”
নবীন একটু বিরক্ত হয়ে বললো, “আওয়ামে লীগ এবং তাদের মিত্রদলগুলো।”
“ও আচ্ছা।” যেন একটা নুতন তথ্য জানলেন, এভাবে শারদদা বলতে লাগলেন, “৯১-এর নির্বাচনে যদিও আওয়ামে লীগ ক্ষমতায় আসতে পারেনি তবে মোট ভোট তাদের বেশি ছিল। তবে সেটার পরিমান খুব বেশি হলে চল্লিশ শতাংশ, কিম্বা পয়তাল্লিশ কিম্বা বড়জোড় পঞ্চাশ শতাংশ। তাহলে কি এটা প্রমান হয়ে গেলো যে এদেশের অর্ধেক মানুষ স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তিকে সমর্থন করে?”

নবীনের মুখ হঠাৎ করে অন্ধকার হয়ে গেলো আর ইদ্রিসের হাসিটা হলো দেখার মত। কয়েকদিন আগেই এমন খোঁচা খেয়েছে সে। তাই আজ অন্যকে শারদীয় খোঁচায় জর্জারিত হতে দেখে সে বেশ পুলকিত বোধ করছে বোঝা গেলো।

শারদদা বলে চললেন, “আচ্ছা, বাদ দাও ৯১-এর ঘটনা। অনেক পুরোনো বিষয়। তার থেকে ২০০১-এর নির্বাচন নিয়েই কথা বলি। বি.এন.পি-তো নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিজয়ী হয়েছিল। তো সেই নির্বাচন কি প্রমান করেছিল এদেশের মানুষ সব রাজাকার হয়ে গিয়েছে?”
নবীনের চোখ চকচক করে উঠলো। বুঝলাম এবার জবাব দেয়ার মত পয়েন্ট পেয়েছে সে। বলল, “২০০১-এর নির্বাচনে চরম কারচুপি হয়েছে। আওয়ামে লীগ সেই নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাক্ষানও করেছিল।”

শারদদা হাসলেন। ইদ্রিস সাথে সাথে পুরির প্লেটটা রসদ হিসেবে বাড়িয়ে দিল। যেন “কি দরকার ছিল” এমন ভাবে দুটো পুরি তুলে নিয়ে শারদদা আবার বললেন, “ঠিক আছে ২০০১-ও বাদ দিলাম। ৯৬-এর নির্বাচনতো আওয়ামে লীগের ভাষায় স্মরনকালের নিরপেক্ষ ছিল। তা সেই নির্বাচনেও তো তারা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। বি.এন.পি এবং জাতীয় পার্টি থেকে এম.পি নিয়ে জাতীয় ঐক্যমতের সরকার গঠন করেছিল। তাহলে প্রশ্ন হলো স্মরনকালের নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে কি এটাই প্রমান হলো যে এদেশে স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই বরং বিপক্ষের সেটা রয়েছে?”

নবীনের মুখ আবারও কালো হয়ে গেলো। উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছে তখন সে। শারদদা বলে চলেছেন তখনও, “একটা কথা স্বীকার কর বা না কর, সত্য হলো এরশাদের নয় মাসের শাসনামল বাদ দিলে এদেশটা স্বাধীনতার সক্রিয় শক্তিরাই চালিয়েছেন সব সময়। বঙ্গবন্ধুর পর জিয়ার শাসন; এর পর নয় বছরের বিরতী দিয়ে আবার বি.এন.পি এবং আওয়ামে লীগ। একটা জাতিরজনকের দল, আরেকটা স্বাধীনতার ঘোষক এবং একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার দল। এদেশের মানুষ কখনও স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তিকে সমর্থন দেয়নি এবং দেবেও না।”

নবীন আওয়ামে লীগের পক্ষে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। শারদদা ওকে থামিয়ে দিয়ে বললো, “প্রতিটা দেশে কিছু দল থাকে যারা জাতীয় ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। বাংলাদেশে আওয়ামে লীগ হচ্ছে সেরকম একটা দল। শুধু তাই নয়, এদেশের মহান স্বাধীনতায় নেত্রীত্বদানকারী একমাত্র দল আওয়ামে লীগ। তাদের এতটা করুন অবস্থা হয়নি যে মোবাইল কোম্পানীর বিজ্ঞাপনের মত ছেলেভোলানো ‘ট্যাগ লাইন’ হিসেবে নির্বাচন জিততে ‘স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি’ কথাটা ব্যবহার করতে হবে।”

তারপর যেন দেশের সব রাজনৈতিক ব্যাক্তিদের উদ্দেশ্য করে দুহাত জোড় করে শারদদা বললেন, “আমার সাধ্য থাকলে সবাইকে বলতাম, দয়া করে নির্বাচনে জেতার জন্য আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাকে পন্য বানিয়ে ফেলবেন না। অনুগ্রহ করে আমাদের স্বাধীনতাকামী জাতিকে দলে দলে বিভক্ত করে স্বাধীনতার প্রকৃত বিরোধীতাকারীদের সক্রিয় হবার সুযোগ করে দেবেন না। এদেশ গড়ার এখনও অনেক বাকি। একাত্তরের যুদ্ধপরাধীরা এখনও বীরদর্পে ঘুরে বেড়ায়, জাতিরজনকের হত্যাকারীরা বুকফুলিয়ে এখনও গর্ব করে; তারা একটি জাতির বুককে রক্তাক্ত করে দিয়েছে অথচ তাদের কোন বিচার হয়নি। মন্ত্রি-এমপি-হুইপ পুত্ররা দিনের আলোয় হত্যা করে যায়, কিন্তু তাদের খুঁজে পায় না পুলিশ। হাওয়া-মাটি-পানি নামের ভবনগুলো দেশটাকে দূর্নীতির সিরিঞ্জ দিয়ে চুষে খেয়ে চলেছে বছরের পর বছর। সেসবের সমাধান করুন, জনগন এমনিতেই ভোট দেবে।”

তারপর যেন নিজেকে আর আমাদের উদ্দেশ্য করে বললেন, “এ দেশ রক্তে পাওয়া। এ রক্তের ঋন এখনও অনেক বাকি। এ প্রজন্মকেই দেশ গড়ার বাকি কাজটা করতে হবে।”

শারদদা যখন থামলেন তখন রুমে পিনপতন নিরবতা। একটু পর নবীনই প্রথম উঠে দাড়ালো। শারদদাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললো, “দাদা, আপনি পাশে থাকলে বাকি কাজটাও আমরা শেষ করতে পারবো। সে বিশ্বাস আমার আছে।”

ইদ্রিস, রায়হান, মানিক, অপু এবং আমিও উঠে দাড়ালাম। সেদিন আমাদের মাঝে দাড়ানো ছয়ফুট উচ্চতার শারদদাকে যেন আরো অনেক অনেক উঁচু মনে হচ্ছিল।

১১ জুলাই ২০০৮
ডাবলিন, আয়ারল্যান্ড।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই জুলাই, ২০০৮ দুপুর ২:২৯
১২টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×