আ জার্নি টু দি সেন্টার অব দি আর্থ দেখার জন্য এসি থিয়েটারে বসে বসে আমি চিন্তা করছিলাম আমাকে দেয়া সানগ্লাসটা নিয়ে। এটা কেন দেয়া হলো সেটাই প্রধানত আমার চিন্তার বিষয়। থ্রিডি মুভি, তাই টিকেটের সাথে একটা সানগ্লাসও দিয়েছে। এটা পরে ছবি দেখতে হবে ভেবেই কেমন যেন অস্বস্তি লাগছিল। বারদুয়েক পরেও দেখলাম; কোন বিশেষত্ব নেই। ঢাকায় একবার গুলশানের ওয়ান্ডারল্যান্ডে থ্রিডি শো দেখেছিলাম। আসলে দেখার পরিবর্তে আমরা ওটা নিয়ে হাসাহাসিই করেছিলাম বেশি। শো দেখার আগে এরকম একটা করে সানগ্লাস দিয়েছিল সবাইকে। সেখানে লেখা ছিল এটা ভেঙ্গে গেলে অনেক টাকা জরিমানা, কারন নাকি ওটা অনেক দামী। আর আয়ারল্যান্ডে সেই সানগ্লাস ফ্রি তে দিচ্ছে, এবং ছবি দেখা শেষ হলে সেটা সাথে করে নিয়েও যাওয়া যায়! মনেমনে এখন হাসি। দেশে কত হাইকোর্ট দেখলাম। এত হাইকোর্ট দেখার পরও যদি থ্রিডি শোতে কিছু দেখার সৌভাগ্য হতো, তাহলে একটু শান্তি লাগতো। কিন্তু সেদিন থ্রিডির থ্রিও দেখিনি।
যাইহোক, হঠাৎ স্ক্রিনে লেখা আসলো এবার সানগ্লাসটি চোখে পড়ুন। সাথে সাথে সবাই সানগ্লাস পড়ে আজব মানুষের মত চেহারা নিয়ে স্ক্রিনে তাকালো, সাথে আমিও। এবং ধাক্কাটা তখনই খেলাম। জীবনে থ্রিডি চলচিত্র কাকে বলে প্রথম উপলব্ধি করলাম। আমার মনে হচ্ছিল আমি যেন মানুষগুলোর মাঝেই বসে আছি। প্রতিটা ডেপথ আমি দেখতে পাচ্ছিলাম। পার্সপেক্টিভগুলো এত পরিষ্কার যে কোন বস্তু সামনে এগিয়ে আসলে আমার মনে হচ্ছিল যেন আমার গায়ে এসে ধাক্কা দেবে। বলাইবাহুল্য, ততক্ষনে আমার মাথা থেকে ছবি দেখার ভূত নেমে গিয়েছে এবং আমি তখন ব্যস্ত হয়ে পড়লাম থ্রিডির রহস্য উদ্ধার করতে। সানগ্লাসটা খুলে দেখি আমি কিছুই ঠিক মত দেখতে পাচ্ছি না। স্ক্রিনে সব ঝাপসা। একটু ভালো করে লক্ষ্য করার পর বুঝতে পারলাম আসলে স্ক্রিনে কয়েকটা স্তরে ছবি রয়েছে। বিশেষত রঙের ক্ষেত্রে একটা বিভ্রাট ঘটেছে। পরে ইউকিপিডিয়া থেকে পড়ে জেনে ছিলাম দুটো রঙের স্তর ব্যবহার করে এটা আসলে আমাদের মস্তিষ্ককে বিভ্রান্ত করে থ্রিডি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টির একটা কৌশল। মজার ব্যাপার হলো সানগ্লাসেও দুটো ভিন্ন রঙের গ্লাস রয়েছে। দুই চোখে যখন দুটো বিশেষ ভিন্ন রঙের গ্লাস দিয়ে সেই দ্বিস্তর বিশিষ্ট স্ক্রিনে তাকানো হয় তখন সেটা আমাদের মস্তিষ্ককে বিভ্রান্ত করে ডেপথের সৃষ্টি করে। একেই আমরা বলছি থ্রিডি চলচিত্র। বিস্তারিত এখানে পাওয়া যাবে (কৌশল।)
বারকয়েক গবেষনা করে এবং যথারীতি ক্লান্ত হয়ে আবার ছবি দেখায় মনোনিবেশ করলাম। বিশাল ডায়নোসর, মানুষ খোকো গাছ, বিভৎস বিশাল মাছ - সবই থ্রিডিতে জীবন্ত হয়ে আসতে লাগলো। ডাইরেক্টরও শয়তান আছে! একটা দৃশ্যে একটা ভয়ঙ্কর মাছকে হঠাৎ ছুড়ে দেয় দর্শকদের দিকে। মুহুর্তে মনে হলো যেন এখনই আমাদের উপরে এসে পড়বে। হলের নারী দর্শকরা কোরাসে চিৎকার করে উঠলো আর সাথে বসা পুরুষরা সুযোগ পেয়ে দুকথার ভাব নিয়ে নিল। চলতে লাগলো আমাদের ঠাকুর মার ঝুলি। আসলেই তাই। জুল ভার্ন বেঁচে থাকলে এবং মুভিটা দেখলে হয়তো হৃদযত্রের ক্রিয়া তখনই বন্ধ হয়ে যেত। বেচারা কি লিখেছিল আর তার চলচিত্ররুপ হিসেবে কি বের হয়ে এলো! যারা মুভিটা দেখেছেন তাদের জন্য সমবেদনা আর যারা দেখেননি তাদের অনুরোধ করছি অন্য কিছু দেখুন, তবুও এটা নয়। থ্রিডি এক্সপেরিয়েন্সের জন্য চমৎকার মুভি কিন্তু এন্টারটেইনমেন্টের জন্য রীতিমত হাস্যকর (যদিও নিতান্তই ব্যক্তিগত অভিমত।) যাইহোক, সেদিন থেকে শুরু হলো আমার আনলিমিটেড মুভি দেখা।
পরদিন আবার গেলাম সিনেমায়। এবার এক সাথে দুটা মুভির টিকেট কাটলাম, দ্যা মিস্ট এবং কিসমাত কানেকশন। উল্লেখ্য যে ভারতীয় মুভিও এখন নিয়মিত এখানে দেখাচ্ছে ফলে ইংলিশ এবং হিন্দী, দুটোই দেখার সৌভাগ্য হচ্ছে। দ্যা মিস্ট দেখতে ঢুকে বিপদে পড়লাম। হলের উপরের দিকের সিটগুলো সব ভর্তি। বাধ্য হয়ে সামনের নীচের দিকের সিটে বসলাম। একটু পরই টের পেতে শুরু করলাম ঘাড় ব্যথা কাকে বলে। একটানা তাকিয়ে থাকতে থাকতে এক সময় অসহ্য হয়ে উঠে আসতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু উঠেই বা কি করবো? এরপর তো আরেকটা মুভির টিকেট কাটা আছে। ওটা দেখতেতো অপেক্ষা করতেই হবে। অতএব, আধো ঘুম, আধো সিনেমা স্টাইলে মুভিটা দেখে ফেললাম। মুভিটার শেষে নায়ক তার ছেলে এবং সব সঙ্গিকে মেরে নিজে অত্মহত্যা করতে যায় কিন্তু পারে না। এক সময় নিজেকে যখন নিয়তির হাতে সপে দেয় এবং দানব আকৃতির জানোয়ারগুলোকে চিৎকার করে বলে তাকে হত্যা করতে, তখন দেখা যায় শহরের উপরে আর্মির নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা হয়েছে এবং তারা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে এনেছে! এ দৃশ্য দেখে নায়ক বেচারা পাগলের মত আর্তনাদ করে উঠে। খুবই হৃদয়ছুয়ে যাওয়া দৃশ্য। কিন্তু বাস্তবে ছবিটা এত বেশি পেইন দিচ্ছিল সবাইকে যে এ দৃশ্য দেখে পুরো হলের মানুষ হো হো করে হাসছিল। বিরক্তিটা কার উপরে ছিল মানুষের? বেচারা নায়কের উপর? নাকি ডাইরেক্টরের উপরে?
কিসমাত কানেকশনও ঝুলিয়ে ফেলেছিল। আসলে আজিজ মির্জার কোন মুভিই আমার ভালো লাগে না। কোথায় যেন একটা দূর্বলতা সব সময় খুঁজে পাই, যেন সবই ঠিক আছে কিন্তু একটা তুলির আচড় বাকি রয়ে যায়। শাহেদ কাপুরের অভিনয় অনেক বেশি পরিনত হচ্ছে দিনদিন। যারা 'যাব উই মেট' দেখেছেন তারা স্বীকার করতে বাধ্য হবেন সেই মুভিতে শাহেদকে অসাধারন লেগেছে। এখানেও চেষ্টার ত্রুটি সে করেনি। সাথে ছিল বিদ্যাবালান এবং জুহি। তবুও ছবিটা সম্ভবত মাঝারী সাফল্য পাবে, এর বেশি নয়।
সাফল্যের কথা তুললে চলে আসবে ডার্ক নাইটের গল্প। প্রথম দিনে সর্বোচ্চ ব্যবসা করার বিশ্বরেকর্ড ইতিমধ্যে ভেঙ্গে দিয়ে এগিয়ে চলেছে আরো বেশ কয়েকটার দিকে। একটা ছোট উদাহরন দিলে বিষয়টা পরিষ্কার হবে যে এখানে কেমন ব্যবসা করছে মুভিটা। সিনে ওয়ার্ল্ডের সতেরটা স্ক্রিনের সাতটায় একটানা চলছে ডার্ক নাইট, সকাল থেকে মধ্যরাদ পর্যন্ত একটানা। রিলিজের পর কেটে গিয়েছে প্রায় একমাস, অথচ ভিড় সেই একই। অন্যদিকে সমসাময়িক যে মুভিগুলো রিলিজ হয়েছে সেগুলো এখন একটা স্ক্রিনে দুই থেকে তিনটা শো হচ্ছে সারা দিনে! প্রশ্ন হচ্ছে সাফল্যের রহস্যটা কোথায়? ব্যাটম্যান সিরিজের আগের মুভিগুলোতো এরকম সাফল্য দেখাতে পারেনি। তাহলে কেন ডার্ক নাইট? উত্তরটা হয়তো এর গল্প এবং শক্তিশালী প্লট বিন্যাস। উল্লেখ্য যে এই মুভিটা কিন্তু ফ্যান্টাসি নয়, অর্থাৎ এখানে কারো (ব্যাটম্যান অথবা জোকার) সুপারন্যাচারাল শক্তি নেই। ব্যাটম্যানের রয়েছে প্রযুক্তি আর জোকারের তিব্র মানসিক শক্তি। পাল্লাটাও হয়েছে সমানে সমান। হিরো এখানে দুজনই। যাইহোক, বিষদ বলে মুভির মজাটা নষ্ট করবো না। শুধু এতটুকু বলবো, অবশ্যাই দেখা উচিত - এমন একটা মুভি। আমি ইতিমধ্যে হলে গিয়ে দুইবার দেখেছি
এবার স্ক্রিনের বাহিরে বের হয়ে আসা যাক। যেদিন ডার্ক নাইট দেখবো বলে ঠিক করেছিলাম (রিলিজের প্রথম দিন), প্রচন্ড ভিড়ে সেদিন সিনে ওয়ার্ল্ডে দাড়ানো যাচ্ছিল না। কোনক্রমে টিকেট নিয়ে দৌড়িয়ে হলে ঢুকে দেখি মানুষ আর মানুষ। এর মধ্যে দিয়েছে ফ্রি সিটিং অর্থাৎ যেখানে খুশি বসো! অনেক কষ্টে একটা সিট খালি পেলাম, একদম উপরের সারির ডান কোনায়। কোনার পরিবর্তে 'চিপা' শব্দটাই যথার্থ। গিয়ে বসার সময় দেখলাম আবার বাম পাশে একটা ভারতীয় ছেলে বসেছে আর ডান পাশে একটা আইরিশ। আইরিশ ছেলেটার বয়স খুব বেশি না, হয়তো পনেরো ষোল বা তারও কম। মুভি শুরু হবার আগে কিছু সময় এ্যাড এবং নুতন যে মুভিগুলো আসবে সেগুলোর ট্রেলার দেখায়। এসময়টা হল বেশ আলোকিত থাকে। আমি খুব একটা পাশের দিকে নজর না দিয়ে ট্রেলার দেখছি। হঠাৎ শুনতে পেলাম 'চপ-চপ' শব্দ হচ্ছে পাশে! তাকিয়ে দেখি আইরিশ ছেলেটা এবং তার গার্লফ্রেন্ড এই শব্দের স্রষ্টা। চুম্বন এবং সেই সাথে আরো বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপে তারা মগ্ন। মনেমনে ভাবলাম আলো নিভে গেলে এরা কোথায় যাবে খোদামালুম।
একটু পর যথারীতি আলো নিভে গিয়ে মুভি শুরু হলো। সবাই তন্ময় হয়ে মুভি দেখছে। আমি আড় চোখে তাকিয়ে দেখি মেয়েটার হাত ভয়াবহ জায়গায় বিচরন করছে। সাথে সেই অডিওতো আছেই। খানিক পরে দেখলাম ছেলেটা উঠছে। একটু অবাক হলাম। এখন আবার কি নাটক শুরু হবে? মনেমনে ভাবছি। তবে বেশি সময় ভাবার দরকার পড়লো না। দেখলাম ছেলেটা উঠে মেয়েটার সিটে বসলো এবং মেয়েটাকে ছেলেটার উপর বসালো। তারপর প্রায় দুই ঘন্টা তারা পাবলিক হলে কি করলো সেটা শিশুতোষ ব্লগে লেখা সম্ভব নয়। আলো আধারীতে যা দেখা গেলো তাতে সামনে ডার্ক নাইট আর পাশে নাইট ডার্ক মিলে একটা শব্দই মাথায় কাজ করেছে - এক টিকেটে দুই ছবি। মাঝে মাঝে মেয়েটার গোঙ্গানীর মত কিছু শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম - 'প্লিজ', 'ওহ নো', 'নট হিয়ার' ইত্যাদি। মেয়েটা যখনই এমন শব্দ করছিল তখনই পাশে বসা ভারতীয় ছেলেটা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছিল!
এরপর অক্লান্ত ভাবে একের পর এক মুভি দেখে চলেছি। ইতিমধ্যে দেখেছি ম্যারেড লাইফ, ফরবিডেন কিংডম, হ্যানকক, এক্স ফাইলস, লাভগুরু, মমি - ৩, মাম্মা মিয়া, এলিজি, ম্যান অন অয়ার এবং বলিউডের সিং ইজ কিং। নাটকও হয়েছে অনেক মজার মজার। ম্যারেড লাইফ দেখার ঘটনা নিয়ে রীতিমত একটা উপন্যাস লেখার পরিকল্পনা করে ফেলেছি। অন্যগুলোতেও কম বেশি দারুন কেটেছে সময় যা অনস্ক্রিনের পাশাপাশি অফস্ক্রিন এন্টারটেইনমেন্ট বললেও মন্দ বলা হয়না।
তবে এত মুভি দেখার পরও একটা আফসোস থেকেই যাচ্ছে; অন্য ভাবে বললে বলা যায় বেড়েই চলেছে। আমার জীবনের একটা সুপ্ত বাসনা - একদিন আমিও মুভি বানাবো। আমার কল্পনার গল্প আর বাস্তবের প্রযুক্তিকে এক করে আমি এমন কিছু বানাবো যা দেখে সবাই মুগ্ধ হয়ে যাবে। সেদিন মানুষ দেখবে আমার সৃষ্টিকে আর আমি দেখবো মানুষের চোখের বিস্ময়। আমি জানি সেদিন আসবে। অবশ্যই আসবে। শুধু জানি না কবে! ঈশ্বর আমাকে সেদিন পর্যন্ত সুস্থ ভাবে বাঁচিয়ে রাখো, এই আমার প্রার্থনা। (শেষ)
১৩ অগাস্ট ২০০৮
ডাবলিন, আয়ারল্যান্ড।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

