তিনটি চরিত্রই ঘুরে ফিরে এসে মিশে গিয়েছে লন্ডন শহরে। সৃষ্টি করেছে ক্রেইজ, কোটি কোটি অনুরাগী এবং বিশ্বকে বিনোদন দিয়ে গিয়েছে এবং যাচ্ছে যুগযুগ ধরে। প্রকাশনা এবং চলচিত্র, সর্বত্রই এই তিনটি চরিত্র দাপটের সাথে নিজেদের প্রমান করেছে। শার্লক হোমস অনুদিত হয়েছে প্রায় একশ ভাষায়, চলচিত্র নির্মিত হয়েছে অগুনিত। আজও লন্ডনের ২২১বি বেকার স্ট্রিটের ঠিকানায় হোমসের নামে চিঠি আসে নিয়মিত। এমনকি সেই চিঠিগুলো সংগ্রহের জন্য সরকার নিয়ে রেখেছে বিশেষ ব্যবস্থা, খুলে দিয়েছে পোস্টবক্স। হোমস এতটাই জীবন্ত এখনও! অন্য দিকে, ডাবলিনে অবস্থিত ড্রাকুলা মিউজিয়ামে তালিকা বদ্ধ রয়েছে প্রায় আড়াইশ চলচিত্রের নাম যা ড্রাকুলার উপর নির্মিত। তাছাড়া ইন্টারনেট মুভি ডেটাবেইজের পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে ড্রাকুলাকে নিয়ে বিভিন্ন ভাষায় এ পর্যন্ত নির্মিত হয়েছে অন্তত ৬৩০টি চলচিত্র। তবে জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে সম্ভবত এদের পেছনে ফেলে খানিকটা এগিয়ে রয়েছে তুলনামূলক নবীন চরিত্র জেমস বন্ড।
জেমস বন্ড হচ্ছে বৃটেনের প্রধান দুটো গেয়েন্দা সংস্থার একটি, MI6-এর এজেন্ট। ১৯৫৩ সনে ক্যাসিনো রয়াল প্রকাশের মধ্য দিয়ে ইয়ান ফ্লেমিং বিশ্বের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন বন্ডকে। সেদিন সম্ভবত ফ্লেমিং-ও চিন্তা করেননি একদিন বন্ড এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠবে সারা বিশ্বে। বন্ডকে নিয়ে ফ্লেমিং ১২টা উপন্যাস এবং দুটো গল্পগ্রন্থ প্রকাশ করেন। পরবর্তিতে তার মৃত্ত্বুর পর আরো চারজন লেখক বিভিন্ন সময়ে বন্ডকে নিয়ে উপন্যাস এবং গল্প লিখেছেন যার অধিকাংশই প্রধানত চলচিত্রের জন্য। ই.ও.এন প্রডাকশন বন্ডের অফিসিয়াল চলচিত্র নির্মাতা যারা ক্যাসিনো রয়াল বাদে অন্য সবগুলো উপন্যাস এবং বন্ড চরিত্র ব্যবহার করার সত্ব অর্জন করে ৫০-এর দশকে। পরবর্তিতে ১৯৯৯ সনে ক্যাসিনো রয়ালের সত্ব অর্জনের মধ্য দিয়ে পরিপূর্নভাবে তারা বন্ডকে ঘরের ছেলে করে নেয়!
বন্ডের জন্মদিন ১১ নভেম্বর ১৯২০ (যদিও একটি উপন্যাসে ১৯২৪ দেখানো হয়েছে)। লন্ডনে বসবাসরত MI6-এর এই তুখোড় এজেন্টের কোড ০০৭। কোডের প্রথম দুটো শুন্য 'লাইসেন্স টু কিল' অর্থাৎ যে কাউকে যে কোন সময় হত্যার আইনগত অধিকার নিশ্চিত করার নির্দেশক। ২০০০ সনের এক জরিপে দেখা গিয়েছিল ০০৭ বিশ্বের সর্বাধিক আলোচিত সংখ্যা। একমাত্র 'ইউ অনলি লিভ টোয়াইস' ছাড়া অন্যসব উপন্যাসে বন্ড এই কোড ব্যবহার করেছে ('ইউ অনলি লিভ টোয়াইস'-এ বন্ডের কোড ছিল ৭৭৭৭)। বন্ডের গল্প-উপন্যাসে M ছদ্মনামের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে বন্ডের বস যার অধিনে সে কাজ করে চলেছে অক্লান্ত ভাবে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এবং বিভিন্ন জাতির সাথে। প্রতিটা উপন্যাস এবং চলচিত্রে M নামক এই ভদ্রমহিলার ভূমিকা ব্যাপক, অনেকটা অবিভাবকের মত। সিলভার কালারের এ্যাস্টন মার্টিন কার যেন বন্ডের আরেকটা ট্রেডমার্ক। আরও রয়েছে পরিচয় দেয়ার সেই অসাধরন ধরন - 'বন্ড, জেমস বন্ড' - যা কিনা আজ হয়ে দাড়িয়েছে রীতিমত কিংবদন্তী।
১৯৬২ সনে প্রথম ডক্টর নো-এর মধ্য দিয়ে জেমস বন্ড চলচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে। এ পর্যন্ত ছয়জন অভিনেতা এবং দশজন পরিচালক বন্ডকে রুপালী পর্দায় তুলে ধরেছেন ২২টা অফিসিয়াল চলচিত্রে। রজার মুর সর্বাধিক সাতটা বন্ড মুভিতে মূল ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। অন্যদিকে জন গ্লেন সর্বাধিক পাঁচটা বন্ড মুভি পরিচালনা করেছেন। বন্ড চলচিত্র শুধু দর্শকদের হৃদয় জয় করেই থেমে থাকেনি, বরং বন্ডের কর্মস্থল MI6-এর কর্তাব্যক্তিদেরও মন গলাতে সক্ষম হয়। ১৯৯৯ সনে রিলিজ হওয়া 'দ্যা ওয়ার্ল্ড ই্জ নট ইনাফ' সর্বপ্রথম সরাসরি দক্ষিন লন্ডনে অবস্থিত MI6-এর হেডকোয়ার্টারে স্যুট করার অনুমতি পায়। এই ছবিতে একটা বমব্লাস্টের দৃশ্য ধারন করার হয় যা মূল অফিসের ভেতরেই সঙ্ঘটিত হয়। যদিও প্রথমে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আপত্তি তোলা হয়, তবে পরবর্তিতে পররাষ্ট্র সচিব রবিন কুকের হস্তক্ষেপে স্যুটিং সফল ভাবে সম্পন্ন হয়। এ ব্যাপারে কুক এভাবে মন্তব্য করেছিলেন, "After all Bond has done for Britain, it was the least we could do for Bond." এরপর একে একে 'ডাই এ্যানাদার ডে' এবং 'ক্যাসিনো রয়াল'-এর একাংশের সুটিংও মূল হেডকোয়ার্টার বিল্ডিং-এ করা হয়।
বন্ডের প্রথম ২১টি চলচিত্র বক্স অফিসে $11,615,711,960 ব্যবসা করেছে যেখানে $1,098,000,000 ব্যয় হয়েছে নির্মানে। এছাড়া আরো $602,860,000 আয় করেছে আনঅফিসিয়াল দুটো বন্ড মুভি। বন্ডকে নিয়ে তৈরী টিভি সিরিজ এবং রেডিও ড্রামা থেকেও আয় হয়েছে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার। এখন আর বন্ড শুধু গল্পের চরিত্রই নয়, রিতীমত আয়ের সোনার হরিনও!
৩১ অক্টোবর বৃটেন এবং আয়ারল্যান্ডে মুক্তি পেয়েছে বহুল প্রতিক্ষিত নুতন জেমস বন্ড চলচিত্র কোয়ান্টম অব সোলেস। নভেম্বরের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়া সহ সারা বিশ্বে মুক্তি পাবে ছবিটি। কোয়ান্টম অব সোলেস জেমস বন্ডের ২২তম অফিসিয়াল চলচিত্র। বিশ্ব ইতিহাসে সব চেয়ে বেশি ব্যবসা সফল সিরিজগুলোর মধ্যে বন্ড অন্যতম এবং সবচেয়ে দির্ঘ্য। আর কোন সফল সিরিজ সংখ্যার দিক দিয়ে বন্ডের অর্ধেকও আসতে পারেনি।
জেমস বন্ড প্রকাশিত হচ্ছে গত পঞ্চাশ বছর ধরে, প্রথমে ইয়ান ফ্লেমিং-এর হাতে এবং পরবর্তিতে চলচিত্রের মধ্য দিয়ে। এত সুদির্ঘ্য সময় ধরে বিশ্বের বুকে রাজত্ব করার পরও বন্ডের জনপ্রিয়তা আজও অটুট। ২২টি চলচিত্র নির্মিত হবার পরও বন্ডের জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি এতটুকু বরং যেন বেড়ে চলেছে দিনদিন! এখনও মানুষ অধির আগ্রহে অপেক্ষা করে বন্ডের নুতন চলচিত্রের জন্য, ডাবল-ও-সেভেনের ঝলক দেখার জন্য, সিলভার এ্যাস্টন মার্টিনের গতির ঝড়ের জন্য এবং সেই জনপ্রিয় সংলাপ শোনার জন্য - 'বন্ড, জেমস বন্ড'। একেই সম্ভবত বলে 'জীবন্ত কিংবদন্তী'!
১ নভেম্বর ২০০৮
ডাবলিন, আয়ারল্যান্ড।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

