থাইল্যান্ড ভ্রমন ১৯৯০ (২য় ও শেষ পর্ব)
আজও যেন আমি চোখ বন্ধ করলে বেভার্লি কফি হাউজকে দেখতে পাই। আমাদের রুমটা ছিল দোতালায়, একদম সামনে। পর্দা সরালেই কাঁচের গ্লাসের দেয়ালের ভেতর দিয়ে রাস্তা দেখা যেত। বাস, ট্রাক, কার আর মানুষের ভীড়ে এক ব্যস্ত শহর থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক। সেই ব্যস্ত শহরের এক নির্জন রুমকে বাসা বানিয়ে নিলাম আমরা।
সকাল শুরু হতো অমলেট আর ব্রেড এন্ড বাটারের ব্রেকফাস্ট দিয়ে। বাঙালী খাবারে অভ্যস্থ এই আমার কাছে ইংলিশ ব্রেকফাস্টটা বেশ লাগতো। যদিও পরিমানে অল্প থাকতো, তবুও চলে যেত। এরপর বের হতাম শপিং-এ। প্রাতুনাম (ব্যাংকককের সবচেয়ে বড় শপিং সেন্টার) সহ অন্যান্য শপিং মলগুলো আমরা চষে ফেলতাম। আম্মুর শপিং করার অবস্থা দেখে মনে হতো সাত দিনে পারলে পুরো ব্যাংকক কিনে ফেলবে। শপিং-এ আমার আপত্তি ছিল না, কিন্তু যন্ত্রনা শুরু হতো অন্য জায়গায়। হাটতে হাটতে ক্লান্ত হয়ে যেতাম, কিন্তু আম্মুর শপিং আর শেষ হয়না। মাঝে মাঝে লাঞ্চ করে নিতাম শপিং-এর ফাকে ফাকে। লাঞ্চে আমাদের ভাত দিত, সাথে একটা স্যূপের মত কি যেন থাকতো। আমার বদ্ধমূল ধারনা ছিল ওটা ভাতের মাড়। না হলে ভাতের সাথে ওটা দিত কেন!
হোটেলে ফেরার সময় হলে একটু শান্তি শান্তি লাগতো। টেক্সিতে বসে পাগুলোকে আরাম দেয়ার কথা ভাবলেই মনটা ভালো হয়ে যেত। সাধারন টেক্সিগুলো একটু ব্যয়বহুল হলেও তুকতুকগুলো বেশ সস্তা ছিল। আমাদের দেশে বেশ ছোট কিছু মাইক্রবাস আছে, যেগুলোর দুই দিকেই দরজা থাকে। সেগুলোর দরজা কেটে এবং ভেতরের সিট মুখোমুখী করে এক বিশেষ ধরনের টেক্সি বানানো হয় যার নাম তুকতুক। আমার খুব প্রিয় বাহন ছিল এটা। আমরা যখনই বের হতাম, তুকতুক নিতাম। যদিও আম্মুর খুব একটা পছন্দ ছিলনা। আম্মুর আবার বরাবরই "ঠাটে-বাটে" চলার স্বভাব! বাহিরে বের হলে টেক্সি না নিলেই মেজাজ গরম হয়ে যেত। তবে ভোটে হেরে শেষ পর্যন্ত তুকতুকে চড়তে হতো।
কয়েকদিন আমাদের দুই ভাই-বোনকে সাথে নিয়ে আম্মু বুঝে ফেলেছিল শপিং নামক ক্রিয়ার মূল তৃপ্তি তার সংসার অনভিজ্ঞ ছেলেমেয়ের দ্বারা উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। অতএব, একদিন পরিকল্পনা হলো আমাদের রেখেই শপিং-এ যাবে। আমার বরং ভালোই লাগলো। এত হাটা আর সহ্য হচ্ছিল না। একা রুমে আমি এবং আমার ছোট বোন পিংকী রাস্তার গাড়ী যাওয়া দেখতে দেখতে বেশ কাটাচ্ছিলাম সময়। হঠাৎ পিংকী পানি খাবার বায়না ধরলো। কি বিপদ! রুমে পানি নেই। আম্মু দেখিয়ে দিয়ে গিয়েছিল ইন্টারকমে করে কিভাবে নীচে রিসিপশনের সাথে কথা বলে। চাইলেই ওরা পানি দিয়ে যাবে উপরে। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। কি বলবো ওদের? ফ্লাইটের সেই জুসের ঘটনা মনে পড়ে গেলো। কিন্তু কিছু একটা করতেতো হবে। শেষ পর্যন্ত অনেক সাহস সঞ্চার করে রিসিপশনে কল দিলাম। ওপা জানতে চাইলো কি ব্যপার। আমি কোন ক্রমে বললাম, "টু বোটল ওয়াটার প্লিজ।" একটু পর দুই বোতল পানি দিয়ে গেলো আমাদের রুমে। আমার উল্লাস কে দেখে তখন! জীবনে প্রথম আমি অবাঙালী কারো সাথে পরিপূর্ন ভাবে ইংরেজীতে কথা বলেছি। আনন্দে তখন লাফাতে ইচ্ছে করছিল। এই স্মৃতিটাও আমার সারা জীবনের স্মৃতি হয়ে আছে।
ঘোরাঘোরী করেছিলাম অনেক। বিভিন্ন পার্ক এবং ভিজিটিং স্পটে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেসব স্মৃতি আজ আর পরিষ্কার মনে নেই। তবে এক রাতের কথা জ্বলজ্বলে হয়ে আছে স্মৃতিতে। সন্ধার পর আমরা হাটতে বের হয়েছিলাম। নির্জন রাস্তা ধরে হাটছিলাম। হঠাৎ দেখলাম একটা আন্ডারগ্রাউন্ডের মত কি যেন দেখা যাচ্ছে। কাছে গিয়ে দেখলাম আলো জ্বলছে। যেই নীচে নামলাম, বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। বিশাল শপিং মল। অথচ উপর থেকে একটুও বোঝা যাচ্ছিল না। শপিং মলের ভেতর দিয়ে হাটছিতো হাটছি, শেষ আর হয় না। যাইহোক এক সময় যেভাবে ঢুকেছিলাম সেভাবেই আবার হুট করে বের হয়ে আসলাম উপরের ফুটপাতে। সামনে এক বড় রাস্তা, যেখানে ভারী যানবাহন চলাচল করছে। কি করবো ভাবছি, এমন সময় একটা তেলের ট্যাঙ্কার এসে আমাদের সামনে থেমে গেলো। তারপর একটা বাস এবং তার পর অন্যান্য গাড়ী। আমার আট বছরের বালক দৃষ্টি বিস্ফরিত হয়ে তাকিয়ে দেখছিল। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম আমরা আসলে একটা জেব্রা ক্রসিং-এর সামনে দাড়ানো। যদিও কোন সিগনাল ছিলনা (যেমনটা এখন উন্নত শহরগুলোতে দেখা যায়), তবুও ট্রাফিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে এতগুলো গাড়ী থেমে গিয়েছে। নিজের মনে আমি এর পর বহুবার ভেবেছি, আমার দেশে এমন দিন কবে আসবে? এখনওতো দেখি সিগনাল ছাড়ার সাথে সাথে ড্রাইভাররা গাড়ীগুলোকে প্রায় মানুষের উপর দিয়ে চালিয়ে দিতে চায়। অথচ পাশের দেশের মানুষ এই নূন্যতম ভদ্রতা জ্ঞানটুকু আঠারো বছর আগেই বেশ ভালো ভাবে শিখে নিয়েছিল।
দেখতে দেখতে আমাদের ফেরার সময় ঘনিয়ে এলো। কেমন যেন একটা মায়া পড়ে গিয়েছিল ব্যাংককের উপর। শহরটাকে অনেক আপন লাগছিল তখন। যাবার বেলায় দিনে ফ্লাইট থাকায় মেঘের খেলা দেখতে দেখতে ফিরতে পেরেছিলাম। বিশাল আকাশের বুক থেকে নীচের পৃথিবীকে স্ববিস্ময়ে দেখছিলাম। কি সুন্দর ছিল সে ভ্রমনটা। আব্বুর সাথে সেই প্রথম এবং সেই শেষ বিদেশ ভ্রমন। মাঝে আরেকবার সুযোগ এসেছিল। অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর এবং ইন্দোনেশিয়া ট্যুরে যাচ্ছিল আব্বু। আমারও যাবার কথা ছিল। কিন্তু আমার ভিসা হয়ে যাবার পর আর যেতে ইচ্ছে করছিল না, তাই সে দফায় যাত্রা বাতিল করেছিলাম। তখন কি জানতাম, আব্বু আমাদের এত দ্রুত ফাকি দিয়ে চলে যাবে। এক-জীবনে যেন জীবন আমাকে কয়েক-জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে দিয়েছে। যাইহোক, এর পর বিদেশ ভ্রমনে গিয়েছি আরো বেশ কিছু দেশ। কিন্তু সেই প্রথম ভ্রমন সব সময় অন্যরকম, যেন সারা জীবনের স্মৃতি হয়ে আছে অমলিন ভাবে। (সমাপ্ত)
৫ নভেম্বর ২০০৮
ডাবলিন, আয়ারল্যান্ড।
একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন
কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?
হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন
আসলে কেউ ফেরে না।
মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর
যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন
দ্য ড্রাগ কিং

সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।
খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন
সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে
আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।