“জাস্ট চিল বেবী।” আনিকাকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করে মার্ক। আনিকা তাতে আরো চিৎকার করে ওঠে, “কীভাবে? আজকে বিশ তারিখ। অথচ পাবলিক ল’র টার্ম পেপারের কিছুই হয় নি এখনও। আঠাশ তারিখ সাবমিশন।”
“এখনও আট দিন হাতে আছে।” এবার আশান্বিত করার চেষ্টা করে মার্ক।
“হোয়াটএ্যাভার! আই নিড অ্যা রেড বুল।”
আনিকা হনহন করে হেঁটে স্টুডেন্ট ইউনিয়ন শপের দিকে যেতে থাকে। কিন্তু মার্ক বাধা দিয়ে থামায়।
“শোনো,এখন রেড বুল নিয়ে না বসে চলো কোন নাইটক্লাবে যাই। ফ্রাইডে নাইটটা আজকে অনেক মজা করে কাটাবো।”
আনিকা হাতের মোটামোটা দুটা বই মার্কের মুখের উপর তুলে ধরে বলে, “এগুলো নিয়ে নাইট আউট? আর ইউ আউট অফ ইওর মাইন্ড?”
“আচ্ছা ঠিক আছে। তোমার বাসায় চলো। একটু ফ্রেশ হয়ে তারপর ইস্ট লন্ডনের কাছাকাছি কোন পাব-এ যাবো।”
আনিকা আর কিছু বলে না। সোজা টিউব স্টেশনের দিকে হাঁটা দেয়। মার্কও হেসে পাশে হাঁটতে থাকে। আনিকা মাঝে মাঝে আড় চোখে মার্ককে দেখে। ছয় ফুট তিন ইঞ্চি লম্বা এই ইংরেজ তরুনের প্রতি কিংস কলেজের কত দেশের কত মেয়ে যে পাগল ছিল তার হিসেব নেই। অথচ আজ সে অনিকার চোখের ইশারায় ওঠে, বসে। তবে এই ছেলে এত সহজে বশে আসে নি। একে পটাতে আনিকার অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। কত মানুষের কত কটু কথা শুনতে হয়েছে। ভাবলেই আনিকার মেজাজ তিক্ত হয়ে যায়।
যদিও কে কী বলল সেসব কথায় আনিকার কিছুই যায় আসে না। মার্কের সাথে আনিকা কেবল এক সাথে থাকে না। তাছাড়া ওদের মাঝে আর সবই হয়েছে। হয়তো এক সাথে থাকার ব্যাপারটাও ধীরেধীরে ঘটবে। আনিকার কাছে ‘সোশাল নর্মস’, ‘ভ্যালুজ’, ‘রিলিজিওন’ অথবা ‘কালচার’ কোন মূল্য রাখে না। এসব ওর কাছে অসহ্য লাগে। মনে হয় মানুষ যেন পুরোনো ভাঙ্গা রেডিও বারবার বাজাচ্ছে। দেশে থাকতে ১৬ই ডিসেম্বর বা ২৬শে মার্চ এলে মানুষের কাজকর্ম ওর কাছে ভাঁড়ামো মনে হত। ৪০ বছর হতে চলল কিন্তু স্বাধীনতা নিয়ে কপচানো বন্ধ হল না এখনও। একটু টাইট টি-শার্ট পরে বের হলেই সবাই এমন ভাবে বুকের দিকে তাকায় যেন মেয়েদের বুক জীবনে দেখে নি। ছেলেদের সাথে রাত করে বাইরে থাকলে মায়ের দুশ্চিন্তা শুরু, সিগারেট ধরালে যেন প্রতিবেশীর ঘুম হারাম। মেয়ে উচ্ছন্নে যাচ্ছে বলে সবার চিৎকার। আরে বাবা ইউরোপ-এ্যামেরিকার ছেলেমেয়েরাতো তাহলে জন্ম থেকেই উচ্ছন্নে গিয়েছে।
এসব নিয়ে আনিকা আগে কথা বলত। এখন সেটাও বলে না। বাঙালীদের থেকে সে বেশ দূরে থাকে এবং খুব গর্বের সাথে বলে এসব বাঙালী সংস্কৃতির তার দরকার নেই। এগুলো সে কুলি করে ফেলে দিয়েছে। এমন কি মার্ককেও সে ঠিক মত বলে নি কোন দেশী সে। শুধু বলেছে দক্ষিণ এশিয়া। আসলে ওর সংস্কৃতি যেন ওর কাছে এক যন্ত্রণা। একে যতটা ভুলে থাকা যায় তত ভালো। লন্ডন আসার সময় এয়ারপোর্টে ওদের ড্রাইভার ভাই হেসে বলেছিল, “আপা, আমার জন্যে ফেরার সময় একটা বিলাতী কুত্তা আইনেন”। আনিকা হেসেছিল আর মনেমনে ভেবেছিল ‘বিলাত’ জগৎটাই যেন রঙ্গিন। তাইতো লন্ডনের উন্মুক্ত জীবনে এখন সে মুক্ত, স্বাধীন। জীবনের প্রতিটা ক্ষণকে সে উপভোগ করছে। এটাই এখন তার সংস্কৃতি।
বাসায় গিয়ে তৈরি হয়ে আনিকা এবং মার্ক বের হয়ে পড়ে পাব-এর উদ্দেশে। বেশী দূর যেতে হয় নি ওদের। কাছেই একটা নাম করা পাব পেয়ে যায়। আজকে শুক্রবার রাত। পাব গিজগিজ করছে মানুষে। কত মানুষের কত পাগলামি। একটা দল বাজীতে তাস খেলছে। যে হারবে তাকে একটা করে কাপড় খুলতে হবে। ছেলেগুলোর মাঝে একটা মেয়ে ইতিমধ্যে প্রায় সব কাপড় খুলে বসে আছে। পুরো টেবিল জুড়ে মানুষের ভিড় সেখানে। কিন্তু মেয়েটা আর বাজীতে হারছে না। সবাই খানিকটা হতাশ। পুরো নগ্ন দেখতে না পাওয়ার দুঃখে কাতর।
আনিকারা বিয়ার নিয়ে এক পাশের সোফায় বসে টিভিকে ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্সের সিক্স নেশনস রাগবী ম্যাচের প্রিভিউ দেখতে থাকে। সাথে চলতে থাকে অলস সময়। সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত গভীর হতে থাকে লন্ডন নগরীর বুকে। দেখতে দেখতে বিয়ার দিয়ে শুরু করে রাম এবং ভদকাতে গিয়ে থামে ওদের নৈশ পানাহার। আনিকা অনুভব করে নিজের পায়ে হাঁটার শক্তিও যেন সে হারিয়ে ফেলেছে। মার্কের অবস্থা খানিকটা ভালো। ছোট বেলা থেকে ড্রিং করে অভ্যস্ত হওয়ায় ওকে ধরে দেরিতে। তবে সেও যথেষ্ট মাতাল। দুজন হাসতে হাসতে যখন পাব থেকে বের হয়ে আসে তখন প্রায় মধ্যরাত।
মার্ক বলে, “চলো একটা ব্ল্যাক ক্যাব নেই।” আনিকা বাধা দেয়। “দরকার নেই। আজকে হাঁটব। অনেক হাঁটব। সারা রাত হাঁটব।” আনিকার কথা শুনে মার্ক হাসে। আনিকাকে জড়িয়ে ধরে কোলে নিয়ে নেয়। তারপর টলতে টলতে হাটতে থাকে।
রাস্তায় এলোমেলো হাটা আর অহেতুক হাসির মাতাল ফোয়ারা ছোটাতে ছোটাতে ওরা যে কখন এক ভীড়ের সামনে এসে দাঁড়ায় নিজেরাই টের পায় না। আনিকা প্রায় বন্ধ চোখে বোঝার চেষ্টা করে কি হচ্ছে এখানে। মার্কও তখন অন্ধকারে। প্রচুর ব্রিটিশ এবং এশিয়ান এক সাথে ভিড় করে আছে। টিভি ক্যামেরাও দেখা যাচ্ছে বেশ কয়েকটা।
আনিকাকে রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে মার্ক কাছের একটা ছেলের কাছে খোঁজ নিতে যায়।
“এখানে কী হচ্ছে?”
“মানুষ ফুল দিতে এসেছে।”
“কেন? কেউ মারা গিয়েছে নাকি?”
“আজকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ১৯৫২’র এই দিনে পাকিস্থানের ইস্ট বেঙ্গল প্রভিন্সে, যারা পরে স্বাধীন হয়ে বাংলাদেশ হয়, ভাষার জন্যে প্রাণ দিয়েছিল বেশ কয়েকজন তরুণ। তাদের স্মৃতিতে এখানে একটা সৌধ আছে। সেটায় সবাই নগ্ন পায়ে ফুল দিতে আসে প্রতি বছর।”
মার্ক অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখে। সামনে একটা পার্ক। সেখানে অন্যরকম সুন্দর একটা সৌধ আছে। মানুষগুলো ফুল নিয়ে সারি সারি ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে সেদিকে। অনেকের পায়ে জুতা নেই। প্রচণ্ড ভিড় অথচ কত শান্তিপূর্ণ ভাবে সবাই ফুল দিয়ে বের হয়ে আসছে।
আনিকার মাতাল ভাবটা তখন বেশ খানিকটা কমে এসেছে। চার দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ সামনে চোখ পড়তেই দেখতে পায় শহীদ মিনার। বুঝতে বাকি থাকে না সে আলতাব আলি পার্কের সামনে দাঁড়ান। এটাও বুঝতে পারে বিশ তারিখ গড়িয়ে একুশে পড়েছে। আজ একুশে ফেব্রুয়ারি। সাদা-কালো-বাদামী নির্বিশেষে সবাই ফুল দিচ্ছে। একুশে ফেব্রুয়ারি আজ আর শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়। ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে।
মার্ক ছুটে এসে উত্তেজিত ভাবে আনিকাকে ইতিহাস শোনাতে যাচ্ছিল। ওকে হাতের ইশারায় থামিয়ে দিয়ে আনিকা বলে,
“আমি জানি এসব।”
“তোমারতো তাহলে ইতিহাসে ভাল জ্ঞান।”
“এর জন্যে জ্ঞানের দরকার হয় না। আমি ঐ দেশেরই মেয়ে।” আনিকা বিরক্তবোধ করতে শুরু করে। কিন্তু কেন সেটা সে নিজেও বুঝতে পারে না।
“তুমি বাংলাদেশী?” মার্কের গলার উত্তেজনা বেড়ে যায় আরো কয়েক গুন।
অনিকা কিছু বলে না। মার্ক বলে চলে,
“তুমি জানো, আমার দাদা বলতেন তোমরা নাকি বীরের জাতি। ৭১’র স্বাধীনতা যুদ্ধে মাত্র নয় মাসের মধ্যে তোমরা পাকিস্থানের মত একটা সুসজ্জিত বাহিনীকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করেছিলে। এত বড় রেজিমেন্ট এরকম অসহায় ভাবে আত্মসমর্পণের নজির ইতিহাসে খুব কম আছে। আজ তোমাদের তৈরি করা দৃষ্টান্ত সারা পৃথিবীর মানুষের জন্যে মায়ের ভাষার প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শনের দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ইউ মাস্ট বি প্রাউড অফ ইউর নেশন এন্ড কালচার।”
আনিকা মার্কের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে অপলক দৃষ্টিতে। কিছু বলে না। কেমন যেন অসহায় বোধ করতে থাকে ভেতরে ভেতরে। মার্ক আবার বলে, “চলো আমরাও ফুল দেব। আমি দুটো ফুলও সংগ্রহ করেছি।”
এবার অনিকা কেঁপে ওঠে। বলে, “নাহ। আমার শরীরটা ভালো লাগছে না। বরং তুমি একাই দিয়ে এসো।”
“আর ইউ শুওর?”
আনিকা ম্লাস হাসে। বলে, “কোন সমস্যা নেই। আমি ওই রাস্তার মুখে অপেক্ষা করছি তোমার জন্যে।”
মার্ক ফুল দিতে চলে যায়। আনিকা ক্লান্ত পায়ে হেঁটে ব্রিকলেনের মুখে এসে দাঁড়ায়। তাকিয়ে দেখে সামনে লন্ডন শহীদ মিনারে জনতার ভিড় ক্রমেই বেড়ে চলেছে। চাইলে সেই ভীড়ের অংশ আনিকাও হতে পারতো। কিন্তু সে হয় নি। আসলে কেন যেন সেই সাহস আনিকার হয় নি। বিবেকের ভেতর থেকে এক অবরুদ্ধ বোধ ওকে গ্রাস করে নিচ্ছিল প্রতিক্ষণে। ভিড়ের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকতে থাকতে আনিকা হারিয়ে যায় ওর চিন্তার জগতে। মনে পড়ে মার্কের বলা কথাগুলো। আজ মার্ককে ওর শুধুই একজন ইংরেজ বলে মনে হয় নি। মার্ক যেন সারা পৃথিবীর মানুষের প্রতিনিধি হয়ে আজ আনিকার সামনে এসে দাঁড়িয়ে ছিল। প্রশংসা করেছিল ওর জাতীয়তাবাদ, ভাষা এবং সংস্কৃতির। কিন্তু এ প্রশংসা গ্রহণ করার অধিকার কি আজ আনিকার আছে? আনিকার মনে পড়ে ওদের ড্রাইভার ভাইয়ের বলা সেই কথাটা – ‘আপা, একটা বিলাতী কুত্তা আইনেন’। একটা কুকুর সেটা ‘বিলাতী’ হোক আর ‘দেশী’, তারও একটা জাত থাকে, থাকে স্বকীয়তা। অথচ মানুষ হয়েও আজ আনিকা বা ওর মত যারা নিজের সংস্কৃতিকে অস্বীকার করে, পায়ে মাড়িয়ে চলে যায় অথবা বর্জন করে; তাদের যেন সেটাও নেই। সেদিন প্রথমবারের মত অনিকার নিজেকে কুকুরের থেকেও নীচ মনে হচ্ছিল।
২১ ফেব্রুয়ারী ২০০৯
ডাবলিন, আয়ারল্যান্ড।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১১ সন্ধ্যা ৬:৪১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



