গতকাল রাতে স্কাই ওয়ানের পর্দায় চোখ রেখে বসে ছিলাম অস্কার শুরুর প্রায় দেড় ঘন্টা আগে থেকে। আমাদের স্থানীয় সময় রাত দেড়টায় শুরু হবার কথা ছিল এ্যাকাডেমী এ্যাওয়ার্ড। কিন্তু স্কাই টিভি এর আগে থেকেই লাইভ টেলিকাস্ট শুরু করে সম্ভবত মানুষ যাতে ঘুমিয়ে না যায় তার প্রতিশেধক হিসেবে। রেড কার্পেটে বিভিন্ন তারকাদের ড্রেসের প্রদর্শনী চলছিল অনুষ্ঠান শুরুর অনেক আগে থেকেই। সাথে চলছিল সাক্ষাৎকার নেয়ার চেষ্টা। যে মেয়েটাকে স্কাই থেকে এবারের অস্কার কভার করতে এল. এ.-তে পাঠানো হয়েছে সে এর আগে গোল্ডেন গ্লোব এবং বাফটাও কভার করেছিল। ফলে তার লম্পঝম্প মোটামোটি পরিচিতই ছিল। বড়ই দুঃখ করে বারবার সে জানাচ্ছিল গত দুটো এ্যাওয়ার্ডের একটাতেও সে কেট উইন্সলেটকে ধরতে পারেনি সাক্ষাৎকারের জন্য। এবার সে ধরবেই ধরবে!
এবারের অস্কারকে ব্রিটিশদের ভুমিধস বিজয়ের মঞ্চ হিসেবে আগেই চিহ্নিত করা হয়েছিল। তাই আমন্ত্রিত অতিথির তালিকায় তাদের প্রাধান্য ছিল নজরে পড়ার মত। ব্রিটিশদের একটা বিষয় আমি সব সময় লক্ষ্য করেছি। তাদের দেশাত্ববোধটা তারা চেষ্টা করে সব সময় প্রবল ভাবে প্রকাশ করতে। এবার স্কাই টিভি অনেকগুলো ছোট ছোট ইউনিয়ন জ্যাক (ব্রিটিশ ফ্ল্যাগ) তাদের ক্রুদের সাথে দিয়েছিল বিতরনের জন্য। অনুষ্ঠান শুরুর আগে তারা একেকজন ব্রিটিশ তারকাকে খুঁজে বের করছিল, একটা ফ্ল্যাগ দিচ্ছিল আর একটাই কথা বলছিল, "উই আর লাইভ টু ইউকে! ইউ ওনা সে সামথিং টু ইউর ফ্যামেলী?" সাথে সাথে নামী-বেনামী সব তারকা যেভাবে আবেগ আপ্লুত হয়ে 'হাই মম, হাই ইংল্যান্ড" শুরু করলো, আর সাথে ইউনিয়ান জ্যাক ওড়ানো - মনে হচ্ছিল যেন অস্কার দেখতে বসে ভুল করে অলিম্পিকের চ্যানেল ওপেন করে ফেলেছি!
যাইহোক, যেই মেয়ে সাক্ষাৎকার নিচ্ছিল, সেও দেখলাম কম পরিচিত না। বিভিন্ন তারকারা তার খোঁজ-খবর নিচ্ছে, অনেকের সাথেতো গলায় গলায় খাতির! মাম্মা মিয়ার এ্যামান্ডাতো রীতিমত লাফ দিয়ে জড়িয়ে ধরলো, যেন সাত জনম দেখা সাক্ষাৎ বন্ধ ছিল। ড্যানিয়েল ক্রেগকে ধরার চেষ্টা করেও ব্যার্থ হয়। এম আই সিক্সের এ্যাজেন্টের হাতে পতাকা তুলে দিতে না পারার দুঃখে খানিক কাতর থেকে আবার দ্রুত ছোটাছোটি শুরু করে অন্য কাউকে ধরার। শুধু যে ব্রিটিশদেরই ফোকাস করছিল তা নয়, অন্যদেরও সাক্ষাৎকার নিচ্ছিল। পেলিনোপি ক্রজকেও অল্পের জন্য মিস করে। নিকোল কিডম্যানকে সম্ভবত ধরতে পেরেছিল (সেরকমই মনে পড়ছে)। কিন্তু তার মূল দৃষ্টি তখন অন্যখানে। আসরের মধ্যমনি হয়ে রেড কার্পেটে তখনও হাটাহাটি করছে কেট। এদিকে সময় প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। বেচারীর যখন প্রায় নিশ্চিৎ যে সে এবারও কেটকে ধরতে পারবে না, তখনই অনেকটা অপ্রত্যাশিত ভাবে দূর দিয়ে হেটে যাওয়া কেটের কানে "উই আর লাইভ টু ইউকে" ঢুকিয়ে দেয়ায় কেট নিজেই দৌড়ে এসে সাক্ষাৎকার দিয়ে যায়। অবস্থা দেখে মনে হলো এ্যাঙ্করের রাতের ঘুম নিশ্চিত হবার উপকরন সে পেয়ে গিয়েছে!
অনুষ্ঠানের শুরুতেই হিউজ জ্যাকম্যান দুঃখের স্বরে কৌতুক করে জানায় মাল্টিন্যাশনালিজম ছাড়া আসলে অস্কারে নমিনেশন পাওয়া যায় না। উদাহরন হিসেবে প্রথমেই দেখায় কেটকে যে সেরা অভিনেত্রীর অন্যতম দাবিদার ছিল। ইংলিশ অভিনেত্রী হয়েও কেট রিডারে অভিনয় করেছে নাজি জার্মানের ভূমিকায় যা আজ তাকে অস্কারের দোর গোড়ায় পৌছে দিয়েছে। ট্রপিক থান্ডারের রবার্টকে (সেরা পার্শ-অভিনেতার নমিনেশন পেয়েছিল) দেখিয়ে বলে সে এ্যামেরিকান হয়ে অভিনয় করেছে একজন অস্ট্রেলিয়ানের ভুমিকায় যে কিনা পুরো ছবিতে আফ্রিকান সেজে বসেছিল! সব শেষে নিজের ব্যাপারে যা বললো তা শুনে না হেসে কেউ থাকতে পারেনি - "আমি অস্ট্রেলিয়ান হয়ে একজন অস্ট্রেলিয়ানের ভুমিকায় অভিনয় করেছি এমন এক ছবিতে যার নাম অস্ট্রেলিয়া !" সেজন্য নাকি সে কোন নমিনেশনই পায়নি।
তারপর শুরু হয় পারফর্মেন্স। নাচে-গানে যখন সবাই মশগুল তখন হঠাৎ বছরের প্রথম ক্যাটাগোরীর নমিনেশন দেখানো হয়। কোন রকম ধারাবাহিকতা ছাড়াই মাঝ থেকে সেরা পার্শ অভিনেত্রীর ক্যাটাগোরী দিয়ে এবারের অস্কার ঘোষনা শুরু হয়। মনেপ্রানে চাচ্ছিলাম পেলিনোপি ক্রুজ জিতুক। ভিকি ক্রিস্টিনা বার্সিলোনায় অভিনয় অসাধারন কিছু সে করেনি, তবে অন্য নমিনেশনের তুলনায় খারাপও ছিলনা। তারপর আসলো সেই সময় - দ্যা অস্কার গোজ টু ... পেলিনোপি ক্রুজ! হাস্যজ্বল স্পেনিশ অভিনেত্রী তার রুপের মগ্ধতা ছড়িয়ে নিয়ে গেলো অস্কারটা।
এরপর চলতে লাগলো অন্যান্য ক্যাটাগোরী। স্লামডগ মিলেনিয়ার যে নয়টা ক্যাটাগোরীতে দশটা নমিনেশন পেয়েছিল তার প্রথমটি ছিল সেরা সাউন্ড। অনেকেই ধারনা করেছিল এটা পাবে তারা, কিন্তু ডার্ক নাইটের কাছে পরাজিত হতে বাধ্য হয়। তবে সাউন্ড মিক্সিংটা ঠিকই পায় পরে। সেরা ডকুমেন্টারী পায় বিবিসির তৈরী ব্রিটিশ ফিল্ম ম্যান অন দ্যা ওয়্যার। এ ছবিটা যারা দেখেন নাই, তাদের বলবো একবার দেখতে। ডকুমেন্টারী হওয়া স্বত্ত্বেও মন্ত্রমুগ্ধের মত আমি দেখেছিলাম রিলিজের পরের দিনই। আরেকটা সেরা মুভির ক্যাটাগোরী ছিল এ্যানিমেটেড ফিল্মের জন্য। এটা প্রায় সবাই জানতো ওয়াল-ই পাবে; বাস্তবেও তাই হয়েছে। সেরা বিদেশী ভাষার ছবি ছিল জাপানের ডিপার্চার। যিনি এ্যাওয়ার্ডটা নিয়েছেন তিনি থ্যাঙ্ক ইউ ছাড়া আর কোন ইংলিশ বলতে পারেনি। দেখে বুঝলাম যথার্থই যে বিদেশী ভাষার পরিচালক! সেরা এ্যাডাপটেড স্ক্রিন প্লে যথারীতি আবারও স্লামডগ মিলেনিয়ার পায়, তবে আমার অনুমান ভুল প্রমান করে অরিজিনাল স্ক্রিন প্লেটা ছিনিয়ে নেয় মিল্ক।
সেরা পার্শ অভিনেতার পুরষ্কার ঘোষনার সময় এক আবেগঘন মূহুর্তের সৃষ্টি হয়। ডার্ক নাইটে হিথ লেজারের অসাধারন অভিনয় যে তাকে ইতিহাসে দ্বিতীয় ব্যাক্তি করতে যাচ্ছিল যে মৃত্যুর পর অস্কার জিতেছে, সেটা কারোর অজানা ছিলনা। হিথের মা, বাবা এবং বোন এসেছিল এ্যাওয়ার্ড গ্রহন করতে। অবেগজড়িত কণ্ঠে তারা তাদের পরলোকগত সন্তান এবং ভাইয়ের স্মৃতিচারন করে এ্যাওয়ার্ডটা গ্রহন করে।
ধীরে ধীরে সময় ঘনিয়ে আসতে লাগলো মূল চারটা এ্যাওয়ার্ড ঘোষনার। আর তার ঠিক মাঝে পড়ে গেলো সেরা মিউজিক এবং গানের এ্যাওয়ার্ড দুটো। দুরুদুরু বুকে সবাই অপেক্ষা করছে কি হয় দেখার জন্য। তবে কোন দুর্ঘটনা ছাড়াই রীতিমত হেসে খেলে সব এ্যাওয়ার্ড পকেটে ভরে ফেললেন এ. আর. রহমান। প্রথমে নেন বেস্ট স্কোরের এ্যাওয়ার্ড। এরপর স্টেজে নিজেই পারফর্ম করেন জয় হো এবং ও সায়া। পরবর্তিতে যখন জয় হো'র জন্য আবার এ্যাওয়ার্ড পান, তখন এ. আর. রহমান স্টেজেই দাড়িয়েছিলেন। দেখে মনে হচ্ছিল যেন সেই বিশ মিনিট বিধাতা তার জন্য বিশেষ ভাবে তৈরী করেছেন। দুটো এ্যাওয়ার্ড এবং ঠিক মাঝ খানে একটা পারফর্মেন্স। এক কথায় অসাধারন ছিল।
সেরা অভিনেত্রীর অস্কার ঘোষনার আগে আবার শ্বাস বন্ধ করে বসলাম। অস্কারে মাঝে মাঝে পাগলামীর ঘটনা ঘটে যায়। বলা যায় না কি হয়। কিন্তু না। শেষ পর্যন্ত কেটই জিতলো। কেট তার স্পিচে বলেছিল সে আট বছর বয়স থেকে বাথরুমে শ্যাম্পুর বোতল হাতে এই মূহুর্তের জন্য অপেক্ষা করছিল। এর আগে পাঁচবার (আমার গত পোস্টে লিখেছিলাম চারবার। আসলে হবে পাঁচ) নমিনেটেড হয়েও জিততে পারেনি এই এ্যাওয়ার্ড। ষষ্ঠবার সেটা কেট করে দেখালো। তবে সেরা অভিনেতার ক্ষেত্রে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটেই গেলো। মিকি রুরক এর পরিবর্তে পেয়ে গেলো শন পেন। যদিও নিজের স্পিচে পেন মিকির কথা উল্লেখ্য করে বলে এই অস্কারটায় তারও দাবী আছে।
এরপর আসে চুড়ান্ত সময়। শেষ দুটো এ্যাওয়ার্ড। সেরা পরিচালক এবং সেরা চলচিত্র। সেরা পরিচালক যথারীতি স্লামডগ মিলেনিয়ারের জন্য ড্যানি বয়েল এবং সেরা চলচিত্র স্লামডগ মিলেনিয়ার। সেরা ছবির এ্যাওয়ার্ড নিতে গতকাল স্লামডগের প্রায় পুরো কাস্টই উঠে গিয়েছিল মঞ্চে। সে দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছিল যেন এক টুকরো ভারত অস্কারের মঞ্চে দাড়িয়ে আছে। যে নয়টি ক্যাটাগোরীতে স্লামডগ মিলেনিয়ার নমিনেশন পেয়েছিল, তার আটটিই জিতেছে তারা। আর মাত্র তিনটি মুভি একাধিক অস্কার জিততে পেরেছে - কিউরিয়াস কেইস অব বেঞ্জামিন বাটন তিনটি এবং ডার্ক নাইট ও মিল্ক দুইটি করে। দিন শেষে মনে হচ্ছিল এ. আর. রহমানের জয় হো গানটাই যেন কোডাক থিয়েটারে স্লামডগ মিলেনিয়ারের রুপক হয়ে দাড়িয়েছিল!
২৩ ফেব্রুয়ারী ২০০৯
ডাবলিন, আয়ারল্যান্ড।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ ভোর ৫:৪১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



