somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... অলগা কারেলেনকো - ইউক্রেনের সাগর কন্যা, পারবে কি হতে হলিউডের নুতন সূর্য?
যশ এবং খ্যাতি তখন অলগার হাতে ধরা দিতে শুরু করেছে সবে। নিয়তী অলগাকে ওখানেই থামাতে চায়নি। হলিউডের রুপালী জগৎ যেন অলগাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছিল। ২০০৭ সনে হিটম্যান দিয়ে হলিউডে প্রবেশ। এরপর ২০০৮ এর সুপার হিট বন্ড মুভি কোয়ান্টম অব সোলেস-এর বন্ড গার্ল, সাথে আরেক সুপার হিট ম্যাক্স পেইনের নাতাশা। অলগা যেন আকাশে উড়তে শুরু করেছে। ইতিমধ্যে ইন্টারভিউ আর আন্তর্জাতিক কভারেজের বন্যার মাঝে অলগা আবিষ্কার করে ফেলেছে এক নুতন জগৎ যা দরিদ্র স্বদেশের সাথে পুরোই বেমানান। ইউক্রেনের সেই সাগর কন্যা যেন আজ হতে চলেছে হলিউডের নুতন সূর্য।

তবে সাফল্যের গল্প শুনতে যত সহজ শোনায়, বাস্তবে অর্জন করতে তত সহজ ছিলনা মোটেও। বন্ড গার্ল হতে অলগাকে তিনবার ইন্টারভিউ দিতে হয়েছে। প্রথমে প্যারিসে। অলগার ভাষায়, সে ধরেই নিয়েছিল হবে না। কোন ত্রুটির কারনে স্ক্রিপ্টের অর্ধেক তাকে দেয়া হয়নি। ফলে অডিশনের সময় সে ঠিকমত পারফর্মই করতে পারেনি। তবুও তাকে দ্বিতীয় সুযোগ দিয়ে লন্ডনে ডাকা হয়। এবার অলগা বুঝতে পারে হয়তো রোলটা সে পেলেও পেতে পারে। তবে তবুও তাকে চুড়ান্তভাবে কিছু না জানিয়ে তৃতীয়বার অডিশনে ডাকা হয়। সিএনএন-কে দেয়া সাক্ষাৎকারে (ক্লিপ - ১) অলগা বলেছিল "ইট ওয়াজ সো ক্লোজ, বাট টু ফার এ্যাওয়ে"। এরপর যখন অলগাকে চুড়ান্তভাবে বন্ডগার্ল হিসেবে নির্বাচিত করা হলো, তখন যেন হলিউডের সোনার কাঠি অলগার হাতে দিয়েই দেয়া হলো। অলগার জন্য মুহুর্তটা ছিল আরো স্মরনীয় কারন এবারের বন্ডমুভি বিশ্বব্যাপি মুক্তি দেয়া হয়েছিল ১৪ নভেম্বর (যদিও বৃটেন ও আয়ারল্যান্ডে সীমিত ভাবে ৩১ অক্টোবর মুক্তি দেয়া হয়েছিল) যা অলগার জন্মদিন। কোয়ান্টম অব সোলেস ছাড়াও বছরের আরেক সুপার হিট মুভি ম্যাক্স পেইনে অলগা একটা ছোট কিন্তু দাগ কেটে যাওয়া চরিত্রে অভিনয় করে। নাতাশার ভুমিকায় ম্যাক্স পেইনে অলগার অভিনয় ছিল রীতিমত মোহনীয়। ইতিমধ্যে অলগা সাইন করেছে আরো দুটো মুভিতে অভিনয় করার জন্য এবং ওর পেছনে পরিচালকের লাইন দেখে মনে হচ্ছে দুই-এর পাশে শুন্য বসতে সময় নেবে না।

হলিউডের সাফল্যর পরও অলগা যেন সেই ইউক্রেনের সাগর কন্যাই রয়ে গিয়েছে। ইন্টারভিউ এবং টিভি এপিয়ারেন্সে তেমন কোন অতিরিক্ত অহঙ্কার নেই তার মধ্যে। অলগার সাথে তাই কথা বলতে বলতে (ক্লিপ - ২) ফক্স টিভির উপস্থাপকরা যেন নিজের পাশের বাড়ির মেয়ের সাথে কথা বলার মত স্বাচ্ছন্দবোধ করছিল। আসলে অলগা এমনই; মিলিয়ন ডলারের রোলে অভিনয় করেও এখনও নিজের স্বাতন্ত্রকে ঠিকই ধরে রেখেছে। ঘর বানিয়ে নিয়েছে প্যারিসকে তবুও ভোলেনি নিজের দেশ ও দেশের মানুষকে। ফিরে গিয়েছিল ইউক্রেনে। প্রেসিডেন্টের কান্ট্রি হাউজে একান্তে অলগাকে আমন্ত্রন জানিয়েছিল ইউক্রেনের ফার্স্টলেডী। অলগার শহর বার্ডিয়ান্সক-এর মেয়র ইতিমধ্যে ঘোষনা দিয়েছে অলগার নামে সড়কের নামকরন করার। বলার অপেক্ষা রাখেনা সময়টা বেশ কাটছে অলগার। এখন দেখার বিষয়, এই উড়ন্ত সূচনাটাকে ধরে রেখে অলগা কি হলিউডের আগামী সূর্য হবে নাকি উল্কার মত ক্ষনিক আলো ছড়িয়েই হারিয়ে যাবে।

(আগ্রহী পাঠক ইউটিউব থেকে সংযুক্ত ক্লিপগুলো দেখতে পারেন।)

১৬ নভেম্বর ২০০৮
ডাবলিন, আয়ারল্যন্ড।

তথ্য সূত্র
১. Talking Shop: Olga Kurylenko (বিবিসি থেকে)
২. হোম সাইট

ক্লিপ সমূহ
ক্লিপ - ১ : সিএনএন ইন্টারভিউ


ক্লিপ - ২ : ফক্স ইন্টারভিউ

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/notredamean/28870513 http://www.somewhereinblog.net/blog/notredamean/28870513 2008-11-18 02:56:55
থাইল্যান্ড ভ্রমন ১৯৯০ (২য় ও শেষ পর্ব) Click This Link

আজও যেন আমি চোখ বন্ধ করলে বেভার্লি কফি হাউজকে দেখতে পাই। আমাদের রুমটা ছিল দোতালায়, একদম সামনে। পর্দা সরালেই কাঁচের গ্লাসের দেয়ালের ভেতর দিয়ে রাস্তা দেখা যেত। বাস, ট্রাক, কার আর মানুষের ভীড়ে এক ব্যস্ত শহর থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক। সেই ব্যস্ত শহরের এক নির্জন রুমকে বাসা বানিয়ে নিলাম আমরা।

সকাল শুরু হতো অমলেট আর ব্রেড এন্ড বাটারের ব্রেকফাস্ট দিয়ে। বাঙালী খাবারে অভ্যস্থ এই আমার কাছে ইংলিশ ব্রেকফাস্টটা বেশ লাগতো। যদিও পরিমানে অল্প থাকতো, তবুও চলে যেত। এরপর বের হতাম শপিং-এ। প্রাতুনাম (ব্যাংকককের সবচেয়ে বড় শপিং সেন্টার) সহ অন্যান্য শপিং মলগুলো আমরা চষে ফেলতাম। আম্মুর শপিং করার অবস্থা দেখে মনে হতো সাত দিনে পারলে পুরো ব্যাংকক কিনে ফেলবে। শপিং-এ আমার আপত্তি ছিল না, কিন্তু যন্ত্রনা শুরু হতো অন্য জায়গায়। হাটতে হাটতে ক্লান্ত হয়ে যেতাম, কিন্তু আম্মুর শপিং আর শেষ হয়না। মাঝে মাঝে লাঞ্চ করে নিতাম শপিং-এর ফাকে ফাকে। লাঞ্চে আমাদের ভাত দিত, সাথে একটা স্যূপের মত কি যেন থাকতো। আমার বদ্ধমূল ধারনা ছিল ওটা ভাতের মাড়। না হলে ভাতের সাথে ওটা দিত কেন!

হোটেলে ফেরার সময় হলে একটু শান্তি শান্তি লাগতো। টেক্সিতে বসে পাগুলোকে আরাম দেয়ার কথা ভাবলেই মনটা ভালো হয়ে যেত। সাধারন টেক্সিগুলো একটু ব্যয়বহুল হলেও তুকতুকগুলো বেশ সস্তা ছিল। আমাদের দেশে বেশ ছোট কিছু মাইক্রবাস আছে, যেগুলোর দুই দিকেই দরজা থাকে। সেগুলোর দরজা কেটে এবং ভেতরের সিট মুখোমুখী করে এক বিশেষ ধরনের টেক্সি বানানো হয় যার নাম তুকতুক। আমার খুব প্রিয় বাহন ছিল এটা। আমরা যখনই বের হতাম, তুকতুক নিতাম। যদিও আম্মুর খুব একটা পছন্দ ছিলনা। আম্মুর আবার বরাবরই "ঠাটে-বাটে" চলার স্বভাব! বাহিরে বের হলে টেক্সি না নিলেই মেজাজ গরম হয়ে যেত। তবে ভোটে হেরে শেষ পর্যন্ত তুকতুকে চড়তে হতো।

কয়েকদিন আমাদের দুই ভাই-বোনকে সাথে নিয়ে আম্মু বুঝে ফেলেছিল শপিং নামক ক্রিয়ার মূল তৃপ্তি তার সংসার অনভিজ্ঞ ছেলেমেয়ের দ্বারা উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। অতএব, একদিন পরিকল্পনা হলো আমাদের রেখেই শপিং-এ যাবে। আমার বরং ভালোই লাগলো। এত হাটা আর সহ্য হচ্ছিল না। একা রুমে আমি এবং আমার ছোট বোন পিংকী রাস্তার গাড়ী যাওয়া দেখতে দেখতে বেশ কাটাচ্ছিলাম সময়। হঠাৎ পিংকী পানি খাবার বায়না ধরলো। কি বিপদ! রুমে পানি নেই। আম্মু দেখিয়ে দিয়ে গিয়েছিল ইন্টারকমে করে কিভাবে নীচে রিসিপশনের সাথে কথা বলে। চাইলেই ওরা পানি দিয়ে যাবে উপরে। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। কি বলবো ওদের? ফ্লাইটের সেই জুসের ঘটনা মনে পড়ে গেলো। কিন্তু কিছু একটা করতেতো হবে। শেষ পর্যন্ত অনেক সাহস সঞ্চার করে রিসিপশনে কল দিলাম। ওপা জানতে চাইলো কি ব্যপার। আমি কোন ক্রমে বললাম, "টু বোটল ওয়াটার প্লিজ।" একটু পর দুই বোতল পানি দিয়ে গেলো আমাদের রুমে। আমার উল্লাস কে দেখে তখন! জীবনে প্রথম আমি অবাঙালী কারো সাথে পরিপূর্ন ভাবে ইংরেজীতে কথা বলেছি। আনন্দে তখন লাফাতে ইচ্ছে করছিল। এই স্মৃতিটাও আমার সারা জীবনের স্মৃতি হয়ে আছে।

ঘোরাঘোরী করেছিলাম অনেক। বিভিন্ন পার্ক এবং ভিজিটিং স্পটে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেসব স্মৃতি আজ আর পরিষ্কার মনে নেই। তবে এক রাতের কথা জ্বলজ্বলে হয়ে আছে স্মৃতিতে। সন্ধার পর আমরা হাটতে বের হয়েছিলাম। নির্জন রাস্তা ধরে হাটছিলাম। হঠাৎ দেখলাম একটা আন্ডারগ্রাউন্ডের মত কি যেন দেখা যাচ্ছে। কাছে গিয়ে দেখলাম আলো জ্বলছে। যেই নীচে নামলাম, বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। বিশাল শপিং মল। অথচ উপর থেকে একটুও বোঝা যাচ্ছিল না। শপিং মলের ভেতর দিয়ে হাটছিতো হাটছি, শেষ আর হয় না। যাইহোক এক সময় যেভাবে ঢুকেছিলাম সেভাবেই আবার হুট করে বের হয়ে আসলাম উপরের ফুটপাতে। সামনে এক বড় রাস্তা, যেখানে ভারী যানবাহন চলাচল করছে। কি করবো ভাবছি, এমন সময় একটা তেলের ট্যাঙ্কার এসে আমাদের সামনে থেমে গেলো। তারপর একটা বাস এবং তার পর অন্যান্য গাড়ী। আমার আট বছরের বালক দৃষ্টি বিস্ফরিত হয়ে তাকিয়ে দেখছিল। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম আমরা আসলে একটা জেব্রা ক্রসিং-এর সামনে দাড়ানো। যদিও কোন সিগনাল ছিলনা (যেমনটা এখন উন্নত শহরগুলোতে দেখা যায়), তবুও ট্রাফিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে এতগুলো গাড়ী থেমে গিয়েছে। নিজের মনে আমি এর পর বহুবার ভেবেছি, আমার দেশে এমন দিন কবে আসবে? এখনওতো দেখি সিগনাল ছাড়ার সাথে সাথে ড্রাইভাররা গাড়ীগুলোকে প্রায় মানুষের উপর দিয়ে চালিয়ে দিতে চায়। অথচ পাশের দেশের মানুষ এই নূন্যতম ভদ্রতা জ্ঞানটুকু আঠারো বছর আগেই বেশ ভালো ভাবে শিখে নিয়েছিল।

দেখতে দেখতে আমাদের ফেরার সময় ঘনিয়ে এলো। কেমন যেন একটা মায়া পড়ে গিয়েছিল ব্যাংককের উপর। শহরটাকে অনেক আপন লাগছিল তখন। যাবার বেলায় দিনে ফ্লাইট থাকায় মেঘের খেলা দেখতে দেখতে ফিরতে পেরেছিলাম। বিশাল আকাশের বুক থেকে নীচের পৃথিবীকে স্ববিস্ময়ে দেখছিলাম। কি সুন্দর ছিল সে ভ্রমনটা। আব্বুর সাথে সেই প্রথম এবং সেই শেষ বিদেশ ভ্রমন। মাঝে আরেকবার সুযোগ এসেছিল। অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর এবং ইন্দোনেশিয়া ট্যুরে যাচ্ছিল আব্বু। আমারও যাবার কথা ছিল। কিন্তু আমার ভিসা হয়ে যাবার পর আর যেতে ইচ্ছে করছিল না, তাই সে দফায় যাত্রা বাতিল করেছিলাম। তখন কি জানতাম, আব্বু আমাদের এত দ্রুত ফাকি দিয়ে চলে যাবে। এক-জীবনে যেন জীবন আমাকে কয়েক-জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে দিয়েছে। যাইহোক, এর পর বিদেশ ভ্রমনে গিয়েছি আরো বেশ কিছু দেশ। কিন্তু সেই প্রথম ভ্রমন সব সময় অন্যরকম, যেন সারা জীবনের স্মৃতি হয়ে আছে অমলিন ভাবে। (সমাপ্ত)

৫ নভেম্বর ২০০৮
ডাবলিন, আয়ারল্যান্ড।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/notredamean/28865254 http://www.somewhereinblog.net/blog/notredamean/28865254 2008-11-05 23:32:21
থাইল্যান্ড ভ্রমন ১৯৯০ (প্রথম পর্ব)
১৯৯০ সন। সেবার আম্মু-আব্বু এবং আমার ছোটবোন সহ আমরা স্বপরিবারে শ্বেতহস্তির দেশ তথা থাইল্যান্ড দর্শনে গিয়েছিলাম। আব্বু জাপানে গিয়েছিল একটা ট্রেনিং-এ অংশ নিতে। আব্বু-আম্মু পরিকল্পনা করে ট্রেনিং-এর পর থাইল্যান্ড ঘুরে আসার। আব্বু জাপান থেকে ব্যাংকক যাবে, আর এদিকে আম্মু, আমার ছোটবোন পিংকী এবং আমি বাংলাদেশ থেকে রওনা হয়ে আব্বুর সাথে ব্যাংককে মিলিত হবো - এই ছিল আমাদের পরিকল্পনা।

ঠিক কোন মাসে গিয়েছিলাম সেটা আজ আর মনে নেই, হয়তো আম্মুর পাসপোর্ট দেখে বের করা যাবে, তবে সেটাও এই মুহুর্তে সম্ভব নয় যেহেতু আমি এখন বাংলাদেশ থেকে অনেক অনেক দূরে। সেটার খুব একটা দরকারও নেই। ধরে নিচ্ছি কোন এক শুভক্ষনে আমরা রওনা হয়েছিলাম থাইল্যান্ডের উদ্দেশ্যে। এয়ারপোর্টে এসে যখন থাই এয়ারওয়েজের বোইং এয়ারক্রাফ্টটাকে দেখলাম, তখন প্রথম যে চিন্তাটা মাথায় এসেছিল সেটা হলো, এত বড় যন্ত্রটা উড়বে কি করে? বলাইবাহুল্য, সেবারই আমার প্রথম আকাশে ওড়ার অভিজ্ঞতা। জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অবস্থা তখন তথৈবচ। টার্মিনাল থেকে সরাসরি প্লেনে ওঠা যেতো না। বাসে করে প্লেনের কাছে গিয়ে তারপর সিড়ি দিয়ে উঠতে হতো। আমার আজও স্পষ্ট মনে আছে আমাদের ফ্লাইট ছিল সন্ধা সাতটায়। চার দিক অন্ধকার হয়ে এসেছে। আমি দুরুদুরু বুকে প্লেনে উঠলাম। দেখতে দেখতে দরজা বন্ধ হয়ে গেলো। বিশাল শরীর নিয়ে থাই এয়ারওয়েজের বোইংটা নড়তে শুরু করলো। সিটবেল্ট লাগিয়ে আমরা বসে আছি। অনুভব করলাম ধীরেধীরে গতি বাড়ছে প্লেনের। এরপর দপ! আমার দুকান বন্ধ হয়ে গেলো। আঠারো বছর আগের সেই কান বন্ধ হয়ে যাওয়ার স্মৃতি যেন আজও আমি অনুভব করি। চোখের পলকে এতবড় শরীর নিয়ে লৌহগোলকটি আকাশে উঠে পড়লো।

এরপর সিটবেল্ট খুলে রিলাক্সড হয়ে বসলাম। তরুনী এয়ারহোস্টেজ ড্রিংস নিয়ে আসলো। আমি যারপরনাই চেষ্টা করলাম নার্ভাসনেস ঢেকে হাসার। সম্ভবত আমার অতি স্মার্ট সাজার বিষয়টা তিনি আঁচ করে নিয়েছিলেন। তাই হেসে আমাকে অভয় দিয়ে অরেঞ্জ জুস ধরিয়ে দিয়ে গেলেন হাতে। আমি যখন জুস খাচ্ছিলাম, তখন আমার মধ্যে অন্য এক নার্ভাসনেস কাজ করতে শুরু করে। গ্লাসটা আমি নেয়ার জন্য কি করে বলবো? "আমার গ্লাসটি নিয়ে যান", "আমার খাওয়া শেষ, এবার আপনি গ্লাসটি নিতে পারেন" ইত্যাদি বাংলা বাক্যকে আমি প্রানপণ ইংরেজীতে অনুবাদ করার চেষ্টা করছিলাম। তবে আমার ক্লাস টু-এর বিদ্যায় সেটা বড্ড বেশি কঠিন অনুভুত হচ্ছিল। একসময় হাল ছেড়ে ভদ্রমহিলার দিকে গ্লাসটি বাড়িয়ে দিলাম, যাতে খাওয়া শেষ হয়ে যাওয়ায় নিয়ে যান। কিন্তু বিধিবাম! আমার গ্লাসটা আরো জুস দিয়ে ভরিয়ে দিয়ে গেলেন তিনি। কি আর করা; বসে বসে দ্বিতীয় গ্লাসও শেষ করলাম পরবর্তি কিছু সময় ধরে।

রাতে রওনা হওয়াতে বাহিরে কিছু দেখা যাচ্ছিল না। ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে শুধু মনে হচ্ছিল আমরা যেন উড়ে চলেছি দূর থেকে বহুদূরে, কোন নাম না জানা অজানার উদ্দেশ্যে। তবুও দেখতে দেখতে সময় যে কিভাবে কেটে গেলো নিজেই বুঝিনি। কিছু সময় পর আমাদের ফ্লাইট ব্যাংকক এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করলো। এয়ারপোর্টে নামার সময় আরেক দফা অবাক হলাম। কী সুন্দর! প্লেন থেকে সরাসরি টার্মিনালে চলে যাওয়া যায়, যেন পথ নিজ থেকে এসে প্লেনের সাথে মিশে গিয়েছে! পাঠক হয়তো হেসে ফেলেছেন। তবুও বলবো, আজও যখন আমার শৈশবের এসব ছোটছোট বিস্ময়ের কথা মনে পড়ে, আমি পুলকিত হই। হয়তো অনুভুতিগুলো নিতান্তই ছেলেমানুষী, তবুও কেন যেন আমাকে ভিষন ভাবে আন্দোলিত করে যায়।

আম্মু বলেছিল দুই ঘন্টা লাগবে ব্যাংকক পৌছাতে। ক্যাপ্টেনও জানিয়ে ছিল ফ্লাইট যথাসময়ে পৌছেছে। কিন্তু এয়ারপোর্টে নেমে দেখি ঘড়িতে বাজে এগারোটা। সাতটায় রওনা হয়ে এগারোটায় পৌছালাম, অথচ সবাই বলছে দুইঘন্টার জার্নি ছিল! বিষয়টা মাথার মধ্যে যন্ত্রনা দিতে শুরু করলো। আমার হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আরো অবাক হলাম। আমার ঘড়িতে নয়টা বাজে অথচ এয়ারপোর্টের ঘড়িতে এগারোটা। নিজের চুল নিজে ছেড়ার মত অবস্থা। হঠাৎ দেখলাম আব্বু অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। দৌড়ে ছুটে গেলাম অব্বুর দিকে। কিন্তু মাথায় তখনও সময়ের গন্ডগোলের বিষয়টা ঘুরছে। লাগেজ নিতে নিতে আব্বুকে জিজ্ঞেস করলাম। আব্বু হেসে ফেললো। এরপর সুন্দর করে বুঝিয়ে দিল সময়ের তারতম্য এবং বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের মাঝের দুই ঘন্টার পার্থক্যের বিষয়টা। আজও মনেপড়ে, দেশে ফেরার পর এ প্রশ্ন আমি অসংখ্য মানুষকে করেছিলাম। অবাক করা বিষয়, বড়রাও অনেকে বোকা হয়ে যেত এ প্রশ্নে। তবে তাদের দোষ না দেয়াই ভালো; জুলভার্নের এ্যারাওন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেজ-এর মূল রহস্যইতো এটা। অতএব কেউ কেউ না পারার দলে থাকাই ভালো!

আমরা যখন এয়ারপোর্ট থেকে বের হই তখন মধ্যরাত। অথচ পুরো ব্যাংকক শহর যেন জেগে ছিল। রঙিন আলোয় পুরো শহরটা ঝকঝক করছিল। টেক্সিতে চড়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছিলাম হোটেলের দিকে। আজও স্পষ্ট মনে আছে হোটেলের নাম - বেভার্লি কফি হাউজ। (চলবে)

৩ নভেম্বর ২০০৮
ডবলিন, আয়ারল্যান্ড।

২য় পর্ব - Click This Link]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/notredamean/28864335 http://www.somewhereinblog.net/blog/notredamean/28864335 2008-11-04 03:20:28
নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড ভ্রমন ২০০৮ (৫ম ও শেষ পর্ব)

১ম পর্ব - Click This Link
২য় পর্ব - Click This Link
৩য় পর্ব - Click This Link
৪র্থ পর্ব - Click This Link

শহরের লোকালয় ছেড়ে আমরা যত বের হয়ে আসছিলাম ততই অবাক হচ্ছিলাম। এত সুন্দর একটা দেশ হতে পারে! সবুজ আর সবুজ। পাহাড়গুলো ভয়ঙ্কর কিন্তু ভয়াবহ না। সমুদ্র উন্মাতাল কিন্তু উত্তাল না। রাস্তার দুপাশে ঢেউ খেলে যাওয়া মাঠ। সে মাঠে চরে বেড়াচ্ছে অগুনিত সাদা সাদা ভেড়ার পাল। তাদের ছোট এবং গোলগোল শরীরগুলো নিয়ে হেলে দুলে ঘাস খাচ্ছে। অদ্ভুত নিরব পুরো দেশটা। যেন সবাই জানে কার কি করতে হবে, তাই যার যার কাজ সে সে করে যাচ্ছে।

ঘন্টা দেড়েক পর আমরা এসে পৌছালাম কলেরিনের একটা টুরিস্ট স্পটে। এখানে দেখার মত অনেক কিছু আছে। একটা রোপ ব্রিজ আছে যেটার প্রতি সবার আকর্ষন। সমস্যা হলো ওটা দেখতে হলে আলাদা করে টিকেট কাটতে হয়। ফলে কেউ আর যেতে চাইলো না। অন্যদিকে রয়েছে পাহাড়ের মাঝ থেকে আটলান্টিক মহাসাগর দেখার সুযোগ। যেহেতু এটার জন্য কোন টিকেটের প্রয়োজন ছিল না, তাই সবাই এটাই দেখতে চাইলো। আমার খুব ইচ্ছে ছিল রোপব্রিজটা দেখার, কিন্তু কি আর করা! সবাই যখন অন্য দিকে যাচ্ছে তখন দল ভেঙ্গে সেটা দেখতে যাওয়া অশোভনীয়। মনেমনে ঠিক করলাম পরে আবার এসে সেটা দেখে যাবো।

আমার ধীরে ধীরে পাহাড়ের রাস্তা ধরে নেমে যেতে শুরু করলাম। কঠিন শিলায় গড়া পাহাড়ের ফাক দিয়ে সাবধানে নামতে হচ্ছিল। কোথাও কোথাও রীতিমত ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে পাহাড়। শেষ পর্যন্ত পানির একদম কাছাকাছি গিয়ে অনেকে থেমে গেল। এরপর যেতে হলে বিপদের সম্ভাবনা আছে। আমাদের সাথের ইংলিশ ছেলেটা এক লাফে এলোমেলো এবং ভাঙ্গা পাথরের উপর দিয়ে হেটে চলে গেলো। অবস্থা তখন এমন যে পার হতে না পারলে লজ্জায় পড়ে যাচ্ছে সবাই। টার্কিস ছেলেটা খানিকটা পার হতে গিয়ে মাঝে থেমে গেলো। একটা চীনা ছেলে পার হয়ে গিয়েছে। মনে সাহস এনে আমিও পার হতে শুরু করলাম। অবাক হয়ে দেখলাম রাস্তাটা অতটা ভয়ঙ্কর না যতটা ভেবেছিলাম। একসময় পাথরগুলো পার হয়ে সমতল জায়গায় চলে এলাম। বাহ! অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম সমুদ্রের দিকে, যেন কথা বলারও সাধ্য রইলো না। এত সুন্দর, এত সুন্দর কেন সব কিছু?

এই স্পটটা থেকে স্কটল্যান্ড দেখা যায়। আয়ারল্যান্ড এবং গ্রেট বৃটেন দ্বীপের মাঝে এই অংশে ব্যবধান সবচেয়ে কম। যেন একটা নৌকা হলেই পার হয়ে যাওয়া যায়! ছোটছোট কিছু দ্বীপ রয়েছে। অদ্ভুত সুন্দর দ্বীপগুলোর ছবি তুলতে শুরু করলাম। ঘুরেঘুরে নীচ থেকে, উপর থেকে, বিভিন্ন ভঙ্গিতে একেবেকে চার পাশের দৃশ্যগুলোকে ক্যামেরায় তুলে নিতে লাগলাম। ছবি তুলতে তুলতে সময় যে কখন পার হয়ে গিয়েছিল টেরই পাইনি। হঠাৎ একজন বললো আমাদের ড্রাইভার বলেছিল দুটার মধ্যে বাসে ফিরে যেতে। ঘড়ি জানিয়ে দিচ্ছিল দুটা বাজতে আর বেশি বাকি নেই। ফিরতি পথে অনেকটা হাটতে হবে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো এবার আমাদের ঢাল বেয়ে উপরে উঠতে হবে। তাই সবাই ধীরেধীরে ফেরার পথ ধরলো। কিন্তু আমার ফিরে যেতে ইচ্ছে করছিল না। এক অদ্ভুত আকর্ষনে আমি তখন থেমে আছি আটলান্টিকের সেই মায়াচ্ছন্ন পাহাড়ের মাঝে। ছবি তুলছি তখনও। বিভিন্ন ভাবে বিভিন্ন দিক থেকে। হঠাৎ দেখি আমার দলের সবাই গায়েব। এরা যে উঠে চলে গিয়েছে সেটা আমি লক্ষ্য করিনি। দ্রুত ক্যামেরা গুছিয়ে লাফ দিয়ে পথ চলতে শুরু করলাম। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উঠতে উঠতে ঘেমে যাচ্ছিলাম। অগাস্ট, তবুও সূর্যের তেজ যেন এপ্রিল-মের মত। বাসে ফিরে এসে দেখি সবাই আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমি আসার সাথে সাথেই বাস ছেড়ে দিল। আবার চলতে শুরু করলাম, অন্য কোন স্পটের উদ্দেশ্যে।

আগ্রহী পাঠক নিচের লিঙ্ক থেকে এই স্পটে তোলা কিছু বাছাই করা ছবি দেখতে পাবেন।
Click This Link

আবার আয়ারল্যান্ডের অপরুপ সবুজের মাঝ দিয়ে আমরা ছুটে চললাম। বাস চালাতে চালাতে ড্রায়ভার জানালো আমরা এখন যাচ্ছি নর্দার্নের সব চেয়ে নাম করা টুরিস্ট স্পট জায়ান্টস কজওয়ের দিকে। পাঠক, নামটা কি পরিচিত লাগছে? যারা মুভি দেখেন নিয়মিত তারা হয়তো ধরে ফেলেছেন। হেল বয় টু - দ্যা গোল্ডেন আর্মি মুভিটা যারা দেখেছেন তারা হয়তো মনে করতে পারছেন যে প্রাচীন রাজা গোল্ডেন আর্মির ভয়াবহতায় আতঙ্কিত হয়ে তাদের ঘুম পাড়িয়ে একটা গোপন স্থানে লুকিয়ে রাখে। হেলবয় এবং যুবরাজ আলাদা ভাবে সারা ছবিতে এই গোপন স্থানটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। ছবির ক্লাইম্যাক্সে তারা দুজনই এ গোপন স্থানের খোঁজ বের করতে সক্ষম। এই স্থানটা ছিল নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের জায়ান্টস কজওয়ে।

বিশ মিনিটের মধ্যে আমরা জায়ান্টস কজওয়েতে এসে পৌছালাম। ঢালু পথ বেয়ে বেশ খানিকটা নেমে যাওয়ার পর আমরা মূল স্পটে এসে দাড়ালাম। এ স্থানটা ৪০ হাজার হেক্টাগোনাল পাথরের কলামে তৈরী। এ কলামগুলো অনেক অনেক বছর আগে অভ্যন্তরিন চাপে লাভার দ্বারা সৃষ্ট। এগুলোর উচ্চতা একে স্থানে একেক রকম। কোনকোনটা বারো মিটার পর্যন্ত উঁচু। আটলান্টিকের নীল পানি এসে ভেঙ্গে পড়ছিল কঠিন শিলায় গড়া কলামগুলোর উপর। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলে মাঝে মাঝে মনে হয় পৃথিবীটা বড্ড বেশি সুন্দর।

জায়ান্টস কজওয়ে নিয়ে অনেক গল্প প্রচলিত আছে। যদিও নিতান্তই গাল-গল্প কিন্তু শুনতে মন্দ লাগে না। কথিত আছে যে আইরিশ জায়ান্ট Finn McCool তার স্কটিশ শত্রু Benandonner এর সাথে যুদ্ধ করার জন্য স্কটল্যান্ড যাবার পথে এ রাস্তা তৈরী করে। যাবার পথে সে বিশ্রাম নিতে নিতে ঘুমিয়ে পড়েছিল। এমন সময় স্কটল্যান্ড থেকে Benandonner তেড়ে আসতে থাকলে Finn McCool স্ত্রী Oonagh একটা কম্বল দিয়ে তাকে ঢেকে দেয় যাতে Benandonner মনে করে এটা আসলে ওদের বাচ্চা। Benandonner আয়ারল্যান্ড আসার পর যখন Finn McCool কে দেখে এবং ভাবে যে এটা ওর বাচ্চা, তখন ভীত হয়ে পড়ে। মনেমনে ভাবে যার বাচ্চা এত বড়, সে না জানি কত বড় হবে! এরপর Benandonner দৌড়ে স্কটল্যান্ড চলে যায় এবং যাবার পথে রাস্তার একাংশ ভেঙ্গে দিয়ে যায় যেখানে এখন অটলান্টিকের পানি বয়ে চলেছে দুই দেশের মাঝে।

নিচের লিঙ্ক থেকে আমার ক্যামেরায় তোলা জায়ান্টস কজওয়ের কিছু ছবি দেখা যাবে।
Click This Link

জায়ান্টস কজওয়ে দেখতে দেখতে সময় গড়িয়ে গেলো আরো অনেক। আমাদের ডেরী ফিরতে হবে। প্রায় আড়াই থেকে তিন ঘন্টা সময় লাগবে। সবাই ঠিক করলো এবার ফেরা উচিত। ধীরে ধীরে সবাই ফিরে আসলাম বাসে। আবার যাত্রা শুরু আয়ারল্যান্ডের সবুজের মধ্য দিয়ে। রাজনীতি দুই আয়ারল্যান্ডকে ভাগ করে দিলেও প্রকৃতি ঠিকই তাদের আজও এক করে রেখেছে, প্রকৃতির চাদরের নিচে।

সেদিন ডেরী ফিরে এসে যে যার মত রুমে চলে যাই আমরা। পরদিন সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে সোজা অলস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে যাই। সিদ্দিকী স্যারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবার ছোটা শুরু করলাম স্টেশনের উদ্দেশে। ভাগ্য খুব একটা সুপ্রসন্ন ছিল। ট্রেন মিস করলাম। তিন ঘন্টা স্টেশনে বসে থেকে পরের ট্রেনে ডেরী থেকে বেলফাস্ট আসলাম। সেখানে আরো দেড় ঘন্টা কাটিয়ে দিনের শেষ ট্রেনে বেলফাস্ট থেকে ডাবলিন এসে পৌছালাম। বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত প্রায় এগারোটা হয়ে গিয়েছিল। ক্লান্তিতে দুচোখ বুজে আসছিল। তবুও একটা অদ্ভুত তৃপ্তি লাগছিল। অপরুপা আয়ারল্যান্ডকে দেখার তৃপ্তি, প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যাওয়ার তৃপ্তি এবং সর্বপরি ভয়ঙ্কর সুন্দরকে নিজের মাঝে ধারন করার তৃপ্তি।

প্রিয় পাঠক, সেদিন রক্তে ভ্রমনের নেশাটা তিব্র ভাবে বইতে শুরু করেছিল। মনেমনে বলছিলাম, নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডতো হলো, এবার তবে ইংল্যান্ড! হ্যা, একমাস পরই ঘর ছেড়ে আবার বের হয়ে পড়ি আমি। গত অক্টোবর মাসে ঘুরে এসেছি ইংল্যান্ডও। সেই বর্ননা নিয়ে আবার আরেকটা সিরিজে হাজির হবো আপনাদের সামনে। আজকের মত এই সিরিজের এখানেই সমাপ্তি।

২ নভেম্বর ২০০৮
ডাবলিন, রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ড। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/notredamean/28863819 http://www.somewhereinblog.net/blog/notredamean/28863819 2008-11-03 02:27:51
বন্ড, জেমস বন্ড
তিনটি চরিত্রই ঘুরে ফিরে এসে মিশে গিয়েছে লন্ডন শহরে। সৃষ্টি করেছে ক্রেইজ, কোটি কোটি অনুরাগী এবং বিশ্বকে বিনোদন দিয়ে গিয়েছে এবং যাচ্ছে যুগযুগ ধরে। প্রকাশনা এবং চলচিত্র, সর্বত্রই এই তিনটি চরিত্র দাপটের সাথে নিজেদের প্রমান করেছে। শার্লক হোমস অনুদিত হয়েছে প্রায় একশ ভাষায়, চলচিত্র নির্মিত হয়েছে অগুনিত। আজও লন্ডনের ২২১বি বেকার স্ট্রিটের ঠিকানায় হোমসের নামে চিঠি আসে নিয়মিত। এমনকি সেই চিঠিগুলো সংগ্রহের জন্য সরকার নিয়ে রেখেছে বিশেষ ব্যবস্থা, খুলে দিয়েছে পোস্টবক্স। হোমস এতটাই জীবন্ত এখনও! অন্য দিকে, ডাবলিনে অবস্থিত ড্রাকুলা মিউজিয়ামে তালিকা বদ্ধ রয়েছে প্রায় আড়াইশ চলচিত্রের নাম যা ড্রাকুলার উপর নির্মিত। তাছাড়া ইন্টারনেট মুভি ডেটাবেইজের পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে ড্রাকুলাকে নিয়ে বিভিন্ন ভাষায় এ পর্যন্ত নির্মিত হয়েছে অন্তত ৬৩০টি চলচিত্র। তবে জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে সম্ভবত এদের পেছনে ফেলে খানিকটা এগিয়ে রয়েছে তুলনামূলক নবীন চরিত্র জেমস বন্ড।

জেমস বন্ড হচ্ছে বৃটেনের প্রধান দুটো গেয়েন্দা সংস্থার একটি, MI6-এর এজেন্ট। ১৯৫৩ সনে ক্যাসিনো রয়াল প্রকাশের মধ্য দিয়ে ইয়ান ফ্লেমিং বিশ্বের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন বন্ডকে। সেদিন সম্ভবত ফ্লেমিং-ও চিন্তা করেননি একদিন বন্ড এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠবে সারা বিশ্বে। বন্ডকে নিয়ে ফ্লেমিং ১২টা উপন্যাস এবং দুটো গল্পগ্রন্থ প্রকাশ করেন। পরবর্তিতে তার মৃত্ত্বুর পর আরো চারজন লেখক বিভিন্ন সময়ে বন্ডকে নিয়ে উপন্যাস এবং গল্প লিখেছেন যার অধিকাংশই প্রধানত চলচিত্রের জন্য। ই.ও.এন প্রডাকশন বন্ডের অফিসিয়াল চলচিত্র নির্মাতা যারা ক্যাসিনো রয়াল বাদে অন্য সবগুলো উপন্যাস এবং বন্ড চরিত্র ব্যবহার করার সত্ব অর্জন করে ৫০-এর দশকে। পরবর্তিতে ১৯৯৯ সনে ক্যাসিনো রয়ালের সত্ব অর্জনের মধ্য দিয়ে পরিপূর্নভাবে তারা বন্ডকে ঘরের ছেলে করে নেয়!

বন্ডের জন্মদিন ১১ নভেম্বর ১৯২০ (যদিও একটি উপন্যাসে ১৯২৪ দেখানো হয়েছে)। লন্ডনে বসবাসরত MI6-এর এই তুখোড় এজেন্টের কোড ০০৭। কোডের প্রথম দুটো শুন্য 'লাইসেন্স টু কিল' অর্থাৎ যে কাউকে যে কোন সময় হত্যার আইনগত অধিকার নিশ্চিত করার নির্দেশক। ২০০০ সনের এক জরিপে দেখা গিয়েছিল ০০৭ বিশ্বের সর্বাধিক আলোচিত সংখ্যা। একমাত্র 'ইউ অনলি লিভ টোয়াইস' ছাড়া অন্যসব উপন্যাসে বন্ড এই কোড ব্যবহার করেছে ('ইউ অনলি লিভ টোয়াইস'-এ বন্ডের কোড ছিল ৭৭৭৭)। বন্ডের গল্প-উপন্যাসে M ছদ্মনামের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে বন্ডের বস যার অধিনে সে কাজ করে চলেছে অক্লান্ত ভাবে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এবং বিভিন্ন জাতির সাথে। প্রতিটা উপন্যাস এবং চলচিত্রে M নামক এই ভদ্রমহিলার ভূমিকা ব্যাপক, অনেকটা অবিভাবকের মত। সিলভার কালারের এ্যাস্টন মার্টিন কার যেন বন্ডের আরেকটা ট্রেডমার্ক। আরও রয়েছে পরিচয় দেয়ার সেই অসাধরন ধরন - 'বন্ড, জেমস বন্ড' - যা কিনা আজ হয়ে দাড়িয়েছে রীতিমত কিংবদন্তী।

১৯৬২ সনে প্রথম ডক্টর নো-এর মধ্য দিয়ে জেমস বন্ড চলচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে। এ পর্যন্ত ছয়জন অভিনেতা এবং দশজন পরিচালক বন্ডকে রুপালী পর্দায় তুলে ধরেছেন ২২টা অফিসিয়াল চলচিত্রে। রজার মুর সর্বাধিক সাতটা বন্ড মুভিতে মূল ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। অন্যদিকে জন গ্লেন সর্বাধিক পাঁচটা বন্ড মুভি পরিচালনা করেছেন। বন্ড চলচিত্র শুধু দর্শকদের হৃদয় জয় করেই থেমে থাকেনি, বরং বন্ডের কর্মস্থল MI6-এর কর্তাব্যক্তিদেরও মন গলাতে সক্ষম হয়। ১৯৯৯ সনে রিলিজ হওয়া 'দ্যা ওয়ার্ল্ড ই্জ নট ইনাফ' সর্বপ্রথম সরাসরি দক্ষিন লন্ডনে অবস্থিত MI6-এর হেডকোয়ার্টারে স্যুট করার অনুমতি পায়। এই ছবিতে একটা বমব্লাস্টের দৃশ্য ধারন করার হয় যা মূল অফিসের ভেতরেই সঙ্ঘটিত হয়। যদিও প্রথমে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আপত্তি তোলা হয়, তবে পরবর্তিতে পররাষ্ট্র সচিব রবিন কুকের হস্তক্ষেপে স্যুটিং সফল ভাবে সম্পন্ন হয়। এ ব্যাপারে কুক এভাবে মন্তব্য করেছিলেন, "After all Bond has done for Britain, it was the least we could do for Bond." এরপর একে একে 'ডাই এ্যানাদার ডে' এবং 'ক্যাসিনো রয়াল'-এর একাংশের সুটিংও মূল হেডকোয়ার্টার বিল্ডিং-এ করা হয়।

বন্ডের প্রথম ২১টি চলচিত্র বক্স অফিসে $11,615,711,960 ব্যবসা করেছে যেখানে $1,098,000,000 ব্যয় হয়েছে নির্মানে। এছাড়া আরো $602,860,000 আয় করেছে আনঅফিসিয়াল দুটো বন্ড মুভি। বন্ডকে নিয়ে তৈরী টিভি সিরিজ এবং রেডিও ড্রামা থেকেও আয় হয়েছে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার। এখন আর বন্ড শুধু গল্পের চরিত্রই নয়, রিতীমত আয়ের সোনার হরিনও!

৩১ অক্টোবর বৃটেন এবং আয়ারল্যান্ডে মুক্তি পেয়েছে বহুল প্রতিক্ষিত নুতন জেমস বন্ড চলচিত্র কোয়ান্টম অব সোলেস। নভেম্বরের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়া সহ সারা বিশ্বে মুক্তি পাবে ছবিটি। কোয়ান্টম অব সোলেস জেমস বন্ডের ২২তম অফিসিয়াল চলচিত্র। বিশ্ব ইতিহাসে সব চেয়ে বেশি ব্যবসা সফল সিরিজগুলোর মধ্যে বন্ড অন্যতম এবং সবচেয়ে দির্ঘ্য। আর কোন সফল সিরিজ সংখ্যার দিক দিয়ে বন্ডের অর্ধেকও আসতে পারেনি।

জেমস বন্ড প্রকাশিত হচ্ছে গত পঞ্চাশ বছর ধরে, প্রথমে ইয়ান ফ্লেমিং-এর হাতে এবং পরবর্তিতে চলচিত্রের মধ্য দিয়ে। এত সুদির্ঘ্য সময় ধরে বিশ্বের বুকে রাজত্ব করার পরও বন্ডের জনপ্রিয়তা আজও অটুট। ২২টি চলচিত্র নির্মিত হবার পরও বন্ডের জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি এতটুকু বরং যেন বেড়ে চলেছে দিনদিন! এখনও মানুষ অধির আগ্রহে অপেক্ষা করে বন্ডের নুতন চলচিত্রের জন্য, ডাবল-ও-সেভেনের ঝলক দেখার জন্য, সিলভার এ্যাস্টন মার্টিনের গতির ঝড়ের জন্য এবং সেই জনপ্রিয় সংলাপ শোনার জন্য - 'বন্ড, জেমস বন্ড'। একেই সম্ভবত বলে 'জীবন্ত কিংবদন্তী'!

১ নভেম্বর ২০০৮
ডাবলিন, আয়ারল্যান্ড। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/notredamean/28863297 http://www.somewhereinblog.net/blog/notredamean/28863297 2008-11-02 06:31:35
নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড ভ্রমন ২০০৮ (৪র্থ পর্ব)

১ম পর্ব - Click This Link
২য় পর্ব - Click This Link
৩য় পর্ব - Click This Link
৫ম পর্ব - Click This Link

আমার অবস্থা ক্লান্ত এবং বিদ্ধস্ত কিন্তু একই সাথে পুলকিত এবং রোমাঞ্চিত। ভোর থেকে শুরু হয়েছে আজকের দিনের কার্যকক্রম। কখনও ট্যুরিস্ট আবার কখনও ট্যুরিস্ট গাইড, কখনও পাহাড়ের মাঝে হেটে চলা ভবঘুরে আবার কখনওবা মুগ্ধ ফটোগ্রাফার। একদিনে অনেকগুলো পরিচয়ে পরিচিত হয়ে গিয়েছি! এখন সমস্যা হচ্ছে কোথা থেকে শুরু করবো সেটাই বুঝে উঠতে পারছি না। শুধু শহরের বর্ননা দিতে গেলেই অনেক বড় একটা পোস্ট হয়ে যাবে। আর শহরের বাহিরে কেমন কাটলো সেটা আদৌ বর্ননা করতে পারবো কি না চিন্তা করছি; এতটা বাকরুদ্ধ।

ভোরে ঘুম থেকে উঠে শাওয়ার নিয়ে মিগির মূল ভবনের ক্যাফেতে চলে গেলাম ব্রেকফাস্টের জন্য। গিয়ে দেখি তখনও ব্রেকফাস্ট সার্ভ করা শুরু হয়নি। আসলে উত্তেজনায় আমার সারা রাত ঘুম হয়নি। তাই বোধয় একটু বেশি আগে আগেই উঠে পড়েছিলাম। খানিকটা সময় ক্যাম্পাসে ঘোরাঘুরি করে, ব্রেকফাস্ট সার্ভ করা শুরু হবার আগেই ওদের বিরক্ত করে করে ব্রেকফাস্ট প্রায় চুলা থেকে সরাসরি প্লেটে নামিয়ে এনে এবং অতঃপর সেটা সাবাড় করে আমি যখন মূল কার পার্কিং-এ গিয়ে দাড়ালাম তখনও কেউ আসেনি। একটু বিরক্ত লাগছিল। করার কিছু ছিল না তাই এলোমেলো ছবি নিচ্ছিলাম কার পার্কিং-এর। এমন সময় এক তরুনী মেয়ে (আল্লাহ জানেন লাইসেন্স আছে কি না!) প্রায় গায়ের উপর গাড়ী পার্ক করে ফেলছিল। দুকথা শোনাতে যাচ্ছিলাম যখন, তখন দেখলাম আমাদের দলের একজন কার পার্কিং-এ ঢুকলো। উল্লেখ্য যে আগেই সিদ্দিকী স্যার ভ্রমনে আগ্রহীদের নাম সংগ্রহ করে পচিশ পাউন্ড করে সবার থেকে তুলে একটা দল তৈরী করে দিয়েছিলেন। আজ সবাইকে এক হতে বলেছিলেন কারপার্কিং-এ যেখান থেকে আমাদের বাস ছাড়বে।

যাইহোক, ছেলেটা আমার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো সবাই কোথায়। আমি হাসলাম। জানালাম সবাই বলতে আপাতত আমরা দুজনই আছি। বেচারা দুঃখ করে বললো সে নাকি সকালে ঠান্ডা পানি দিয়ে শাওয়ার নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে এসেছে, ভেবেছিল দেরী হয়ে যাবে। ঠান্ডা পানির কথা শুনে আমি হেসে ফেললাম। বললাম একই ঘটনার ভুক্তভোগী আমিও! আসলে আমাদের বিল্ডিং-এ কি যেন হয়েছিল ফলে সকালে গিজার অন করা ছিলনা। এমনিতেই ভোরে বৃষ্টি হয়েছে। সে অবস্থায় ঠান্ডা পানি দিয়ে শাওয়ার নেয়ায় মনে হচ্ছিল বরফের মুর্তি হয়ে হয়তো বাকি জীবন বাথরুমে দাড়িয়ে থাকতে হবে।

এরপর একেএকে সবাই এসে জড়ো হতে লাগলো। সিদ্দিকী স্যার আমাদের লাইনে দাড় করিয়ে মাথাগুনে বাস ড্রাইভারের হাতে সপে দিলেন। সবাইকে ঘুরিয়ে সন্ধায় আবার এখানে নামিয়ে দিয়ে যাবে, এই হলো মূল পরিকল্পনা। আমাদের দলের প্রসঙ্গে একটু বলে নেয়া দরকার। দলে ছিলাম আমরা আটজন। সাতজন ছাত্র এবং একজন প্রফেসার। আমি বাদে অন্য ছাত্ররা ছিল ইসরাইল, টার্কি, জাপান, চীন এবং অন্য একটা দেশ থেকে (যথা সময়ে পরিচয় খোলাসা করা হবে!)। প্রফেসার ছিলেন পর্তুগিজ। যাত্রার শুরুতেই আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো টুরিস্ট বোর্ডের সিটি অফিসে। ওখান থেকে অন্য একটা বাসে শুরু হবে আমাদের সিটি ট্যুর। ঘন্টাখানেকের সিটি ট্যুর শেষে আমরা বের হয়ে পড়বো অপরুপা নর্দার্নের রুপ সূরভী পান করতে - এই ছিল প্রাক পরিকল্পনা।

টুরিস্ট বোর্ডের অফিসে ঢুকে দেখি বিভিন্ন ধরনের বই আর ম্যাগাজিনে ঠাসা পুরো এলাকাটা। দুই সারিতে অনেকগুলো বুকসেলফ রাখা। একটা সারির উপরে লেখা "টুরিস্ট ইনফরমেশন ফর নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড" আরেকটায় "টুরিস্ট ইনফরমেশন ফর রিপাবলিক অব অয়ারল্যান্ড"। ঠিক বুঝলাম না নর্দার্নে রিপাবলিককে কেন প্রোমোট করা হচ্ছে। হয়তো ওদের মধ্যে এমনই চুক্তি আছে, একে অপরকে প্রোমোট করবে। যাইহোক, আমরা যখন দুই আয়ারল্যান্ড নিয়ে কথা বলা শুরু করলাম তখন ধীরে ধীরে তাদের স্বাধীনতা, নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের অপট-আউট, দ্যা ট্রাবল ইত্যাদি আলোচনায় আসতে লাগলো। ফলে আমি টুরিস্ট থেকে টুরিস্ট গাইডে পরিনত হলাম। দ্যা ট্রাবলের ফলে এখানে কি অবস্থা হয়েছিল, বেলফাস্ট এগ্রিমেন্টের মাধ্যমে সেটাকে কি করে দমানো হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আবার দাঙ্গা দেখা দেয়ার সম্ভাব্যতা - সবকিছু নিয়ে আমি লেকচার দেয়া শুরু করলাম। হঠাৎ দেখি দলের সবাই আমার চারপাশে গোল হয়ে তন্ময় হয়ে গল্প শুনছে। আমিও মজা পেয়ে গেলাম। জানালাম সারাদিনে আজ অনেক গল্প শুনিয়ে দেব। অন্তত আর কোন দিন কোথাও গিয়ে আয়ারল্যান্ড নিয়ে কথা বললে আটকাবে না!

গল্পে যখন সবাই তন্ময়, তখন আমাদের ডাক আসলো; সিটি ট্যুরের বাস এসেছে। বাসে উঠে দেখি দুই তরুনী টুরিস্ট গাইড তাদের সাজানো হাসি দিয়ে সবাইকে স্বাগতম জানাচ্ছে। সোজা বাসের আপার সেলুনে উঠে খোলা সিটের অংশে গিয়ে বসলাম। ক্যামেরাটা হাতে নিয়ে প্রস্তুত হলাম অক্লান্ত ফটোসেশনের জন্য।

মূল বর্ননায় যাবার আগে ডেরী শহরের কথা একটু বলে নেয়া প্রয়োজন। এই শহরটা নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ন শহর। যদিও নাম ডেরী, তবে ব্রিটিশরা ডাকে লন্ডনরেডী। নামের মধ্যেও ব্রিটিশ-আইরিশ দ্বন্দ্ব। ফলে শহরের অনেক জায়গায় "ডেরী/লন্ডনডেরী" - এভাবে শহরের নামকে লেখা হয়। এমন কি গুগল ম্যাপে সার্চ দিলেও একই বিষয় দেখা যাবে। সিটি কাউন্সিলের নাম ছিল আগে "লন্ডনডেরী সিটি কাউন্সিল" যেটা আইরিশদের চাপের মুখে পড়ে কয়েকবছর আগে "ডেরী সিটি কাউন্সিল" করা হয়েছে। এই ডেরী শহরের আরেকটি বিশেষত্ব হচ্ছে এটা ইউনিয়নিস্টদের দেশের শহর হওয়া স্বত্ত্বেও প্রধানত ন্যাশনালিস্টদের বসবাস এখানে। ফলে আইরিশ স্বাধীনতার সংগ্রাম, দ্যা ট্রাবল - সব কিছুতে এখানে দাঙ্গা হয়েছে সর্বাধিক। এ বিষয়ে একটু পরেই বিস্তারিত জানানো হবে।

আমাদের যাত্রা শুরুর সাথে সাথে নীচ থেকে মাইকে তরুনী কন্ঠ ভেসে এলো। বর্ননা করে চলেছে মেয়েটা সিটি ওয়াল এবং তার ইতিহাস। সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনছে। যদিও আমি আগেই সিটি ওয়ালের কথা জানতাম, তবুও শুনতে লাগলাম, যদি নুতন কোন তথ্য পাই সেই আসায়। পাঠকবৃন্দ হয়তো এতক্ষনে আমার উপর বেশ বিরক্ত হয়ে পড়েছেন। আমি ইউনিয়নিস্ট, ন্যাশনালিস্ট, অপট-আউট, দ্যা ট্রাবল ইত্যাদি অনেক জার্গন ইতিমধ্যে ব্যবহার করে ফেলেছি যেগুলোর কোন ব্যাখ্যাই দেইনি। এখন আবার শুরু করেছি সিটি ওয়াল! আসলে সবগুলোর ব্যখ্যাই আমি দেব। তবে সেটা যথাসময়ে। তাছাড়া হয়তো মনে আছে, একজনের পরিচয় আমি গোপন করে রেখেছি। সেটারও একটা তাৎপর্য আছে!

আর ভণিতা না করে সরাসরি সিটি ওয়ালের কথায় চলে আসি। ডেরী হলো ইউরোপের একমাত্র শহর যেটার চারপাশে পূর্নাঙ্গ দেয়াল রয়েছে। ইউরোপে এরকম দেয়ালে ঘেরা শহর আরো দেখা যায় বটে, তবে সেটা এরকম পূর্নাঙ্গ নয়। ডেরীরর দেয়ালে কোথায় ছেদ নেই, এটাই এর প্রধান বৈশিষ্ট। সতের শতকের গোড়ার দিকে এই দেয়াল তৈরী করেছিল ট্রেড গিল্ড অব দ্যা সিটি অব লন্ডন। ১৬১৩ সনে দেয়ালের কাজ শুরু হয় যা ১৬১৮ সনে শেষ হয়। সেবছরই লন্ডন শব্দটা যোগ করা হয় ডেরীর শুরুতে এবং লন্ডনডেরী নামের সূচনা হয়।

শহরের বিভিন্ন জায়গা ঘুরতে ঘুরতে আমরা এমন একটা এলাকায় চলে আসলাম যেখানে ঢোকার পর থেকেই অদ্ভুত একটা অনুভুতি কাজ করতে শুরু করেছিল। সেখানে লেখা ছিল - ইউ আর এন্টারিং ফ্রি ডেরী! চার দিক রিপাবলিকের পতাকায় ছেয়ে ছিল। একটাও ইউনিয়ন জ্যাক (যুক্তরাজ্যের পতাকা) অথবা অলস্টার ব্যানার (নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের পতাকা) নজরে আসেনি। বড়বড় পেইন্টিং দিয়ে এলাকাটা সাজানো ছিল। পেইন্টিং-এর বিষয় বস্তু ছিল আইরিশ স্বাধীনতার যুদ্ধ থেকে শুরু করে দ্যা ট্রাবল পর্যন্ত ঘটে যাওয়া ঘটনাসমূহ। গাইড নীচ থেকে মাইকে জানালো গত প্রায় ত্রিশ বছর এই শহর ইউরোপের সবচেয়ে বিপদজনক শহর হিসেবে চিহ্নিত ছিল। দিনে-দুপুরে হত্যা আর বোমাবাজী এখানে ছিল নিত্য দিনের ঘটনা। শতশত সিভিলিয়ান মারা গিয়েছে এই শহরে, কেউ দোষী ছিল - কেউ বা নির্দোষ।

প্রিয় পাঠক, এবার ফিরে যাচ্ছি ইতিহাসের দিকে। কিছু ব্যাখ্যা দেয়া নিতান্তই প্রয়োজন হয়ে পড়েছে, না হলে পরবর্তি বর্ননার অনেক কিছুই হয়তো বোঝা দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে।

অনেকেই হয়তো জানেন যে যুক্তরাজ্য চারটা রাজ্যের (বর্তমানে সাংবিধানিক রাষ্ট্র) সমন্বয়ে গড়া একটা ইউনিয়ন। ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড এবং ওয়েলস মিলে গড়ে তুলেছিল এক কালের প্রবল প্রতাপশালী ইউনাইটেড কিংডম অব গ্রেট ব্রিটেন এন্ড আয়ারল্যান্ড রাজ্যকে। এ ইউনিয়নের অন্যতম লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ আইলস তথা গ্রেট ব্রিটেন এবং আয়ারল্যান্ড দ্বীপকে এক করে একটা শক্তিশালী রাজ্য গঠন করা। ব্রিটিশরা তাদের লক্ষ্যে সফলও ছিল কারন আমেরিকা, ক্যানাডা, অস্ট্রেলিয়া, এশিয়া এবং আফ্রিকা সহ পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকা এ রাজ্যের পতাকা তলে এসেছিল। ব্রিটিশ রাজ্য যখন বড় হচ্ছিল, তখন তাদের ইউনিয়ানের মধ্যেই দানা বাধতে শুরু করে ক্ষোভ আর বিদ্রোহ। ইউনিয়নের অন্যতম শক্তি আয়ারল্যন্ডে তখন দুটো দলের সৃষ্টি হয়। ইতিহাসে একটা দল ইউনিয়নিস্ট এবং অন্য দলটি ন্যাশনালিস্ট নামে পরিচিত। ইউনিয়নিস্টরা ছিল ব্রিটিশ রাজের প্রতি অনুগত এবং তারা মনেপ্রানে চাইতো আয়ারল্যান্ড যাতে ইউনিয়নে অবস্থান করে। তাদের মতে ইউনিয়নে থাকাই আয়রল্যান্ডের জন্য মঙ্গলজনক। অন্যদিকে ন্যাশনালিস্টরা ছিল ব্রিটিশ রাজের প্রতি দুর্বিনীত এবং স্বাধীনতাকামী। তারা চাইতো আয়ারল্যান্ডকে মুক্ত করে একটা স্বাধীন এবং সার্বভৌম আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে।

ন্যাশনালিস্টদের পক্ষ থেকে ক্রমবর্ধমান চাপ এবং স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার পদক্ষেপ স্বরুপ গঠন করা হয়েছিল আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি যারা আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করছিল। এরই জবাবস্বরুপ ইউনিয়নিস্টদের পক্ষ থেকে রিপাবলিকানদের স্বাধীনতার পরিকল্পনাকে শেষ করার জন্য গড়ে তোলা হয়েছিল অলস্টার ভলেন্টিয়ার। শেষ পর্যন্ত আয়ারল্যান্ড আংশিক ভাবে স্বাধীন হয় এবং নর্দার্ন আয়রল্যান্ড নামে অলস্টারের ছয়টা কাউন্টি আইরিশ ফ্রি স্টেট থেকে অপট-আউট করে আবার ইউনিয়নে প্রবেশ করে।

ষাটের দশকের শুরুর দিকে ন্যাশলালিস্টদের পক্ষ থেকে আবার জোর প্রচেষ্টা শুরু হয় নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডকে স্বাধীন করে অল-আয়ারল্যান্ড গঠন করার। এরই ফল স্বরুপ প্রভেশনাল আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি গঠন করা হয় যারা নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতার জন্য ব্রিটিশ আর্মির বিপক্ষে যুদ্ধ করতে শুরু করে। অন্য দিকে তখন আবার ব্রিটিশ রাজের প্রতি অনুগতরা অলস্টার ভলেন্টিয়ার ফোর্স গঠন করে যারা নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডকে ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত রাখার জন্য এবং প্রভেশনাল আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির সদস্যদের হত্যা বা ধরিয়ে দেয়ার জন্য কাজ করতে শুরু করে। সোজা কথায় এদের কর্মকান্ড এবং প্রকৃতিতে বাংলাদেশের রাজাকার-আলবদরদের সাথে কোন পার্থক্য ছিল না। ফলে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে ১৯৬৮ থেকে ১৯৯৮ সন পর্যন্ত ত্রিশ বছর গৃহযুদ্ধ লেগে থাকে। এই গৃহযুদ্ধ ইতিহাসে দ্যা ট্রাবল নামে পরিচিত। বর্তমানে একটা চুক্তির মাধ্যমে (বেলফাস্ট এগ্রিমেন্ট) দুই পক্ষকে শান্ত রাখা হয়েছে তবে এ শান্তি কতদিন বিরাজ করে সেটাই দেখার বিষয়।

এবার আমাদের আজকের ট্যুরে ফিরে আসা যাক। দ্যা ট্রাবল চলাকালীন সময়ে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনাকে ফ্রি-ডেরীতে সুবিশাল পেইন্টিংস-এর মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। আমরা বাসে করে ঘুরছিলাম আর একেকটা পেইন্টিং দেখছিলাম। সা. ইনের পাঠকের কথা ভেবে আমি বেশ কিছু পেইন্টিংস এর ছবি তুলে এনেছি যা নীচে বর্ননা করা হলো:

ফ্রি-ডেরীতে ঢোকার মূহুর্ত:



ট্রাবল চলাকালীন সময় কারাগারে বন্দি স্বাধীনতাকামী (ব্রিটিশদের ভাষায় সন্ত্রাসী) প্রবেশনাল আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির সদস্যরা একটা হাঙ্গার স্ট্রাইক করেছিল। যদিও কম্বলের কথা বলে এই স্ট্রাইক শুরু হয়েছিল তবে এর মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বের কাছে তাদের স্বাধীনতার দাবী পৌছে দেয়া। এর নেত্রীত্বে ছিলেন ববি সেন্ডস যিনি স্ট্রাইক করার সময় কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় পার্লামেন্টের এম.পি. নির্বাচিত হন। ৬৬ দিন একটানা না খেয়ে থেকে ১৯৮১ সনের ৫ মে তিনি মৃত্ত্ববরণ করেন। পরবর্তিতে তার সাথে হাঙ্গার স্ট্রাইকে অংশ নেয়া আরো নয়জন সঙ্গী মারা যায়। তাদের স্মৃতিতে নিচের পেইন্টিংটা আঁকা।


মাত্র চোদ্দ বছরের এই মেয়েটি দ্যা ট্রাবলের একশতম শিকারে পরিনত হয়েছিল:


দ্যা ট্রাবল চলাকালীন আরো কিছু বিদ্রোহ ও বিপ্লবের ছবি:


ফ্রি-ডেরী থেকে বের হওয়ার একটু পরই ইউনিয়ান জ্যাক দেখা যেতে লাগলো। বুঝতে পারলাম আবার ইউনিয়নিস্টদের জগতে চলে এসেছি। এসময় বিভিন্ন নাম করা ব্রিটিশ ব্রিগেডের পরিত্যাক্ত ব্যারাক, জেনারেলদের বাড়িঘর দেখা যাচ্ছিল। হঠৎ একটা জায়গায় এসে আমাদের বাস থামলো। তাকিয়ে দেখি ফ্রি-ডেরীর মত করে এখানে অলস্টার ভলেন্টিয়ার ফোর্সের সমর্থকরা পেইন্টিং একেছে। পেইন্টিংটা দেখার সাথে সাথে মনে হলো এর থেকে হীন দৃশ্য আর হতে পারে না। স্বদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে গিয়ে ব্রিটিশরাজকে কুর্নিশ করার যে ভঙ্গিতে ছবিটা আঁকা হয়েছে তা আসলে মানবতারই অপমান। এই সেই ছবি:


আমরা যখন ঐতিহাসিক এলাকাগুলো ঘুরে আবার শহরে প্রবেশ করি তখন রোদ উঠে গিয়েছে। বেশ গরমও লাগছিল। ফয়েল নদীর পাশ ঘেসে আমাদের বাস এগিয়ে যাচ্ছিল সাই সাই করে। ফয়েলকে বলা হয় ইউরোপের দ্বিতীয় দ্রুততম স্রোতের নদী। এই ফয়েলের পাড়েই ডেরী নগরী গড়ে উঠেছে।

যাইহোক, অল্প কিছু সময়ের মধ্যে আমরা টুরিস্ট ইনফরমেশন সেন্টারে এসে পৌছালাম এবং সিটি ট্যুর বাস থেকে নেমে আমাদের জন্য বরাদ্দ মিনি বাসে এসে আবার চেপে বসলাম। বাস ছাড়ার আগে আমি সবাইকে এতক্ষন দেখে আসা বিভিন্ন ঘটনা আবার খুলে বললাম। প্রতিটা ঘটনায় কে কেন এবং কিভাবে দায়ী সেটা ব্যখ্যা করলাম। বলাইবাহুল্য, আমার প্রত্যেকটা মন্তব্যে আমি প্রধানত ব্রিটিশরাজকে দায়ী করছিলাম। হঠাৎ দেখলাম আমাদের সাথের একটা ছেলে (যার পরিচয় আমি তখনও জানতাম না) আমার কথা শুনে একটু একটু করে রেগে যাচ্ছে। বিষয়টা তখনও বুঝতে পারিনি। সন্দেহ হলো, একি তবে ব্রিটিশ? জিজ্ঞেস করতেই বের হলো শুধু ব্রিটিশই না, ইংলিশ ব্রিটিশ! সথে সাথে সবাই এমন ভাবে ওর দিকে তাকাতে শুরু করলো যেন এ হচ্ছে সবচেয়ে বড় কালপ্রিট আমাদের মাঝে!

খানিক পরেই আমরা ডেরী শহরের সীমানা ছাড়িয়ে ধীরে ধীরে সবুজ আর সবুজে ঘেরা আয়ারল্যান্ডের প্রাকৃতিক লীলাভূমির মাঝে চলে আসলাম। পেছনে ফেলে এসেছি দ্যা ট্রাবল, যুদ্ধ, হিংসা আর হানাহানি। দুচোখ ভরে তখন দেখছি অপরুপা এ দ্বীপকে। যতই দেখছিলাম, ততই মুগ্ধ হচ্ছিলাম। অসহ্য সুন্দরের মাঝে যেন একটু একটু করে নিজেকে হারিয়ে ফেলছিলাম। সুবিশাল পাহাড় আর মৃত্ত্বুখাঁদে ঘেরা সমুদ্র যেন এক হয়ে মিশে গিয়েছে - একেই সম্ভবত বলে ভয়ঙ্কর সুন্দর। (আগামী পর্বে বিস্তারিত বর্ননা ও ছবি থাকবে)

২১ অগাস্ট ২০০৮
ডেরী, নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/notredamean/28833493 http://www.somewhereinblog.net/blog/notredamean/28833493 2008-08-22 06:04:48
নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড ভ্রমন ২০০৮ (৩য় পর্ব)

১ম পর্ব - Click This Link
২য় পর্ব - Click This Link
৩য় পর্ব - Click This Link
৪র্থ পর্ব - Click This Link
৫ম পর্ব - Click This Link

আজ সারাদিন চরম দৌড়ের উপরে কেটেছে। সকাল থেকে সন্ধা পর্যন্ত একটার পর একটা লেকচার এবং প্রেজেন্টেশন সেশনের ধকল সামলে যখন একটু রেস্ট নেয়ার সময় এলো তখন বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ জানালো তারা তাদের রিসার্চগ্রুপের বিভিন্ন কর্মকান্ডের উপর একটা ট্যুর করাবে। ফলে আধো ঘুম, আধো জাগ্রত অবস্থায় আবার দৌড়াতে হলো তাদের পেছনে। সব শেষ হলে স্টুডেন্ট ভিলেজের রুমে ফিরে এসে একটু ফ্রেশ হয়ে আবার ছুটলাম ম্যাকডোনাল্ডসের দিকে, উদ্দেশ্যে ডিনার। ফিরে এসেছি একটু আগে। এখন ক্লান্তিতে দুচোখ বন্ধ হয়ে আসছে, কিন্তু তবুও লিখছি। সিরিজটায় যেন ছেদ না পড়ে সেজন্যই প্রধানত এই নির্ঘুম লেখালেখী।

দিনের বর্ননায় ঢোকার আগে অলস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের মিগি ক্যাম্পাসের একটা সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরার চেষ্টা করবো। এটা করার প্রধান কারন, আগের দুটো পর্ব পড়ে আমার কাছে মনে হয়েছে প্রেক্ষাপট বর্ননা না করেই আমি একের পর এক ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো লিখে গিয়েছি যা নুতন পাঠকদের (যারা আমাকে ব্যাক্তিগত ভাবে চেনেন না) জন্য ঠিক বোধগোম্য হচ্ছে না।

মার্থা মিগি নামে এক ভদ্রমহিলা ১৮৪৫ সনে ২০,০০০ পাউন্ড অনুদান দিয়ে ছিলেন স্থানীয় এক প্রটেস্ট্যান্ট চার্চকে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য। ফলে তার নাম অনুসারে মিগি কলেজের যাত্রা শুরু হয় ১৮৬৫ সনে তৎকালিন আয়ারল্যান্ড এবং বর্তমান নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিম অংশের ডেরি শহরে। প্রথমে এটা একটা ধর্মীয় শিক্ষা কেন্দ্র ছিল তবে পরবর্তিতে বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হতে থাকে। ১৮৮০ সনে কলেজটি রয়েল ইউনিভার্সিটি অব আয়ারল্যান্ডের একটি কলেজ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয় কিন্তু কিছু দিন পরই রয়েল ইউনিভার্সিটির বিলুপ্তির পর এর অস্তিত্ব নড়বড়ে হয়ে পড়ে। তখন এটিকে ডাবলিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সংযুক্ত করা হয় যা প্রায় পরবর্তি পঞ্চাশ বছর পর্যন্ত কার্যকর ছিল। ১৯৫৩ সনে কলেজটিকে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের স্ট্যাটাস দেয়া হয় এবং ১৯৬৯ সনে কলেজটি নিউ ইউনিভার্সিটি অব অলস্টার নামে পূর্নাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিনত হয়। ১৯৭১ সনে জর্ডানসটাউন পলিটেকনিক, কলেজ অব আর্টস এন্ড ডিজাইন এবং নিউ ইউনিভার্সিটি অব অলস্টারের দুটো ক্যাম্পাস (মিগি এবং কলেরিন) একত্রিত হয়ে বর্তমান ইউনিভার্সিটি অব অলস্টার প্রতিষ্ঠা করে। উল্লেখ্য যে অন্য তিনটি ক্যাম্পাসের নাম স্থানের নাম অনুসারে তথা বেলফাস্ট, কলেরিন এবং জর্ডানসটাউন রাখা হলেও মিগিকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের কারনে ডেরী ক্যাম্পাস না বলে মিগি ক্যাম্পাস বলা হয়। এ বিশ্ববিদ্যালয়টি আয়ারল্যান্ড দ্বীপে অবস্থিত নয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ছাত্রসংখ্যার হিসেবে সবচেয়ে বড় এবং নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে অবস্থিত দুটো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি (অন্যটি কুইনস ইউনিভার্সিটি অব বেলফাস্ট)।

গত ১৮ অগাস্ট থেকে মিগি ক্যাম্পাসে শুরু হওয়া একটা সামার স্কুল এবং ওয়ার্কশপে অংশ নিতে আমি ডেরি আসি। প্রধানত বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশী শিক্ষক ড. এন এইচ সিদ্দিকী স্যারের আমন্ত্রন এবং আন্তরিকতার জন্যই এখানে আসা। দেখতেই খুব ভালো লাগছে যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা নাম করা পন্ডিতদের নিয়ে অনুষ্ঠিত এই ইভেন্টের মূল আয়োজন একজন বাংলাদেশীর হাতে।

উপরের প্যারাটা যখন লিখছি তখন নীচে একটা গাড়ী এসে থামলো। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি সিদ্দিকী স্যার সবাইকে গাড়ী দিয়ে যার যার বিল্ডিং-এ নামিয়ে দিয়ে যাচ্ছেন (স্টুডেন্ট ভিলেজটা ছোটছোট বিল্ডিং-এ বিভক্ত)। আজকে পন্ডিতরা (ছাত্রদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল) সবাই মিলে পাবে গিয়ে একটু আদটু মজা করেছেন। যদিও রাত খুব বেশি হয়নি, ১১টা মাত্র; তবুও তারা ফিরে এসেছেন কারন কাল সকালে আমাদের পুরো নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড ট্যুরে বের হতে হবে। সবাই হয়তো আজ আগে আগেই ঘুমাতে যাবার পরিকল্পনা করছেন।

যাইহোক, আজ বেশ কিছু লেকচার ছিল যা অনেক নামী-দামী প্রফেসাররা নিয়েছিলেন। ব্যাক্তিগত কারনে প্রফেসার হল্যান্ড আসতে পারেননি, তাই আমার বেশ আফসোস হচ্ছিল। যারা আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্স নিয়ে কাজ করেন তারা ভালো করেই তাকে চেনেন। তিনি জেনেটিক এ্যালগরিদমের জনক এবং প্রবক্তা। সিদ্দিকী স্যারের কাছে শুনলাম প্রতি ঘন্টার লেকচারের জন্য তিনি কতৃপক্ষের কাছে ১০ হাজার ইউ.এস. ডলার চেয়েছিলেন এবং কতৃপক্ষ সেটা দিতে হাসি মুখে রাজীও ছিল!

দুপুরের দিকে মুক্ত আলোচনা নামক একটা সেশন ছিল। সেখানে ছাত্র এবং দর্শকরা পাইওনিয়ারদের প্রশ্ন করছিল এবং তারা তাদের দৃষ্টিকোন থেকে মতামত এবং উত্তর জানাচ্ছিলেন। এক সময় যুক্তরাষ্ট্রের উপর সন্ত্রাসী হামলা এবং তার ফল স্বরুপ প্রফেসারদের উপর নিরাপত্তা সংক্রান্ত চাপ বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হলো। অনেকেই হয়তো জানেন যে যুক্তরাষ্ট্রের গবেষনার ফান্ডিং-এর একটা বড় অংশ আসে সেনাবাহিনী এবং হোমল্যান্ড সিকিউরীটি থেকে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে প্রফেসাররা বেশ কিছু অভ্যন্তরিন খবর জানতে পারেন। তাই তাদের উপর মাঝে মাঝে অনুরোধের স্বরে প্রতিরোধের রেখা টেনে দেয়া হয়। এরকম একটা উদাহরন দিতে গিয়ে একজন ইরানের প্রসঙ্গ টেনে আনলেন। তাকে বলা হয়েছিল ইরানের প্রফেসার, গবেষনা (পেপার রিভিউ) এবং ছাত্রদের সাথে ইমেইলে যোগাযোগে সতর্কতা অবলম্বন করতে। আরেকজন জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসারকে বলা হয়েছিল ইরানী কোন ছাত্রের মেইলের যেন রিপ্লাই না দেয়া হয়।

হঠাৎ এক সময় লক্ষ্য করলাম পশ্চিমা বিশ্ব ইরানকে অন্য ভাবে দেখছে, যেটা তারা ইরাক আক্রমনের সময় একদমই পরোয়া করেনি, তা হলো ইরানের প্রযুক্তিগত ক্ষমতা। যুক্তরাজ্যের নাম করা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় ইরানী ছাত্র এবং প্রফেসারে ছেয়ে আছে। লন্ডনের তিন জায়ান্ট তথা ইম্পেরিয়াল, ইউ.সি.এল এবং কিংস-এর একটা বিশাল অংশ ইরানী। কিংস-এর সেন্টার ফর টেলিকমিউনিকশন রিসার্চে গতবছর পি.এইচ.ডিতে আমার এ্যাডমিশন হয়েছিল। সেই সূত্রে ওদের ব্যাপক ভাবে জানারও সুযোগ হয়েছিল। তখন দেখেছিলাম সেখানে হেড থেকে শুরু করে প্রধান সব প্রফেসার ইরানের। এখানেই মূলত ইরাক এবং ইরানের পার্থক্য। ইরাককে যতটা বুল-হেডেড হিসেবে নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র এবং বৃটেন, ইরানকে ততটা নিতে পারছে না। তাই ইরান যখন পারমানবিক বোমার কথা বলে তখন তারা একটু হলেও ভীত হয়। আমি ইরানের সমর্থক নই, নই যুদ্ধ-নির্ভর বর্তমান বিশ্বরাজনীতির একনিষ্ঠ ভক্ত। এ উদাহরনটা দিয়ে আমি যেটা পাঠকের সামনে তুলে আনার চেষ্টা করেছি সেটা হলো শিক্ষার ক্ষমতা। সম্ভবত বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে রক্ষনশীল দেশ হওয়া সত্ত্বেও শুধু জ্ঞান এবং শিক্ষার কারনে ইরান এই সম্ভ্রমটুকু আদায় করে নিতে পেরেছে পশ্চিমা বিশ্ব থেকে।

ফিরে আসছি অলোচ্য প্রসঙ্গে। লেকচার সিরিজ শেষ হয়ে যাওয়ার পর আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল অলস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের মিগি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন গবেষনার কার্যক্রম দেখাতে। সত্য কথা বলতে কি, এখানে অর্থের অভাব রয়েছে, কিন্তু আন্তরিকতা এবং প্রচেষ্টার কোন কমতি নেই। যেহেতু নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড যুক্তরাজ্যের চারটি দেশের মধ্যে সবচেয়ে অনুন্নত, তাই এখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ফান্ডিং-ও তেমন একটা আসে না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই উদ্যোগ নিয়ে ইন্ডাস্ট্রিকে আকর্ষন করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু দারুন দারুন প্রজেক্টের কাজ সফল ভাবে সমাপ্তির দিকে এগিয়ে চলেছে।

একটা প্রজেক্টে দেখা গেলো মানুষের ব্রেন থেকে চিন্তাকে পড়ার যন্ত্র বানানো হয়েছে। যন্ত্রটা মাথায় লাগিয়ে দিয়ে কম্পিউটারের সামনে বসিয়ে দেয়া হলো। কম্পিউটার স্ক্রিনে দুটো বল ছিল, একটা লাল এবং একটা সবুজ। শুধু মনে মনে চিন্তা করলেই কম্পিউটার বুঝতে পারছিল কোন বলটা নড়বে! এই যন্ত্র দিয়ে প্রধানত তারা একটা হুইল চেয়ার বানাচ্ছে যেটা সেই সব মানুষদের জন্য ব্যবহৃত হবে যারা স্ট্রোকের কারনে কোমায় রয়েছে। এ ধরনের রোগীদের অভ্যন্তরিন চিন্তাশক্তি সম্পূর্ন সবল থাকে। যদিও তারা বাহ্যিক ভাবে প্যারালাইজড থাকে, কিন্তু শোনা এবং চিন্তা করার ক্ষমতা তাদের আগের মতই রয়ে যায়। এই যন্ত্রের মাধ্যমে তারা চিন্তা করে করে চেয়ারে করে ঘুরে বেড়াতে পারবে।

আরেকটা প্রজেক্টে একটা রোবট বানানো হয়েছে যেটা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্ত্বার এমন একটা বিশেষ স্তরে পৌছে গিয়েছে যে এখন তার মধ্যে অনুভুতি এবং আবেগ সৃষ্টি হচ্ছে। এই রোবটটার শরীরে প্রায় ত্রিশটা লেজার সেন্সর বসানো আছে যার একেকটার দাম ৬,০০০ পাউন্ড; অর্থাৎ রোবটের শরীরের শুধু সেন্সরগুলোর দাম আড়াই কোটি টাকার উপরে! এরপরও তারা বলে তাদের নাকি টাকা নাই গবেষনার জন্য!!!

যাইহোক, ল্যাবগুলো সব ঘুরে দেখে, ফাইনাল ফটোসেশন করে আমি যখন রুমে ফিরছিলাম তখন বারবার ডাবলিনের কথা মনে পড়ছিল। মাত্র তিন দিন হয়েছে নর্দার্নে এসেছি অথচ মনে হচ্ছে যেন কতদিন ডাবলিনের বাহিরে। ইশ! কত্তদিন সিটি সেন্টারের স্পাইকটা দেখা হয় না, দেখা হয় না ট্রিনিটির অপরুপা ক্যাম্পাসকে। কি আজব! আমি ঢাকাকেও এভাবে মিস করি না যতটা করছি ডাবলিনকে। এ শহর আসলে আমার কাছে অন্যরকম ভালোলাগার শহর। এ শহরইতো আমাকে শিখিয়েছে স্বাবলম্বি হতে, স্বনির্ভর হতে। আমাকে শিখিয়েছে নিজের পায়ে দাড়াতে। তাই জীবনে যেখানেই যাই, ডাবলিন এবং আয়ারল্যান্ড আমার কাছে প্রথম প্রেমের মত অমলিন হয়ে থাকবে চিরদিন।

২০ অগাস্ট ২০০৮
ডেরী, নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য।

দ্রষ্টব্য
১. সংযুক্ত ছবিতে মিগি কলেজের মূল ভবন দেখা যাচ্ছে। ছবিটি উইকিপিডিয়া থেকে নেয়া।

২. ইরানী ছাত্রদের নিয়ে নিউজউইকের একটা তথ্যপূর্ন রিপোর্ট রয়েছে নিচের লিঙ্কে। আগ্রহী পাঠক পড়ে দেখতে পারেন (রাগিব ভাইয়ার সৌজন্যে)।
http://www.newsweek.com/id/151684
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/notredamean/28833021 http://www.somewhereinblog.net/blog/notredamean/28833021 2008-08-21 05:16:40
নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড ভ্রমন ২০০৮ (২য় পর্ব) Click This Link
৩য় পর্ব - Click This Link
৪র্থ পর্ব - Click This Link
৫ম পর্ব - Click This Link

আজ সকাল থেকে দিনটা ব্যস্ত যাচ্ছে। ভোরে ঘুম থেকে উঠে শাওয়ার নিয়েই দৌড় দিলাম অলস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসের দিকে। সকালে একটা লেকচার ছিল, তার পর শুরু হলো পেপার প্রেজেন্টেশন। এক ফঁকে ব্রেকফাস্ট করে কফির কাপটা নিয়ে হুড়মুড় করে আবার ঢুকলাম লেকচার থিয়েটারে যেখানে প্রেজেন্টেশনগুলো হচ্ছিল। আমাদের মত নান্নি-মুন্নি বাচ্চারা তাদের পেপার প্রেজেন্ট করছিল আর বড় বড় চুলপেকে যাওয়া প্রফেসাররা সেটা দেখছিল আর হাসছিল। হাসার ধরনটা অনেকটা এমন - "এসব কি কাজ করেছো তোমরা? কিছুইতো হয়নি!"

কিছু প্রফেসার ছিল যাদের মূল উদ্দেশ্যই ছিল প্রত্যেককে ত্যাড়া টাইপের প্রশ্ন করা। আমি কিছুসময় লক্ষ্য করে তাদের প্রশ্নের একটা প্যাটার্ন বের করলাম। প্রধানত তারা কোন পেপারের সাথে সম্পর্কযুক্ত কোন বিশেষ তত্ত্বকে (যেটা সেই পেপারে আদৌ ব্যবহার করা হয়নি!) রেফারেন্স হিসেবে ধরে এবং সেটার উপর ভিত্তি করে প্রশ্নগুলো করছিল। ফলে দেখা যাচ্ছিল উত্তরদাতার জন্য সেটা বেশ কঠিন এবং ক্ষেত্রবিশেষে বিব্রককর অবস্থার সৃষ্টি করছিল। এটা ঠিক যে তারা অনেক দক্ষ এবং অভিজ্ঞ। আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্সকে তারা ইতিমধ্যে গুলে খেয়ে এসেছে। কিন্তু যে ছাত্ররা পেপার প্রেজেন্ট করছিল, তারাতো নিতান্তই নুতন। অনেকেই পি.এইচ.ডির প্রথম বর্ষের ছাত্র। অতএব তাদের জন্য সব তত্ত্ব না জানাটাই স্বাভাবিক। তবুও প্রফেসারদের ভাব এমন যেন - "এটাও জান না?" বলাইবাহুল্য, যে যত আটকাতে পারছিল তার কৃতিত্ব তত বেশি মনে করছিল।

একজন ছিল যে প্রতিটা প্রশ্ন শুরু করতো "আই থিং..." দিয়ে; তারপর চলতো দুইমিনিটের একটা লেকচার। উত্তরদাতাকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতে হতো এবং সব শেষে প্রশ্নটা আসতো অনেকটা অবজেকটিভ টাইপ - ডু ইউ এগরী উইথ মী? যথারীতি তাকে থামানোই তখন সবার মূখ্য উদ্দেশ্য হয়ে দাড়াতো এবং সাথে সাথে এক বাক্যে এগরী করতে কেউ কার্পন্য করতো না। শেষের দিকে এসে দেখা গেলো কেউ আর তার প্রশ্ন শোনে না। কারন দুই মিনিটের লেকচারের পর মূল প্রশ্নটা কি হবে সেটা সবার জানা। অতএব শোনার দরকার কি!

তবে কখনএ কখনও বিষয়টা প্রফেসারদের মধ্যেও তর্ক সৃষ্টি করছিল। যেমন এক জাপানী ছেলেকে এক পর্তুগিজ প্রফেসার একটা ত্যাড়া প্রশ্ন করেছিল। প্রশ্নটা এরকম ছিল যে একটা বিশেষ থিউরীর রেফারেন্স দিয়ে (যথারীতি!) সে বলেছিল - আই ডোন্ট থিংক ইটস গোনা ওয়ার্ক এ্যাট অল। সেই থিউরীটা ছেলেটার পুরোই মাথার উপর দিয়ে গিয়েছিল এবং পাক্কা প্রায় দশ সেকেন্ড সে হা করে তাকিয়ে ছিল। একসময় দর্শকসারী থেকে তার সুপারভাইজার উত্তর দেয়া শুরু করলো। চুল-দাড়ি-গোফ পাকা জাপানী প্রফেসার আর তুলনামূলক মধ্যবয়সী পর্তুগিজ প্রফেসারের চরম বিতর্ক আমাদের মনে বেশ আনন্দের সঞ্চার করেছিল। মনেমনে যেন সবাই বলছিল - "এবার দ্যাখ কেমন লাগে!" <img src=" style="border:0;" />

দুপুরে লাঞ্চে গিয়ে বললাম চিকেন দিতে। হায় খোদা, চিকেন বলতে যে চিকেনই বোঝাবে সেটা কে জানতো! প্রায় আস্ত একটা চিকেন ধরিয়ে দিল। ছোট বাচ্চা মুরগী, তার উপর রান্না করেছে অমৃতের মত। মুখে দিলে গলে যাচ্ছিল। সাথে আমার মোস্ট ফেভারিট স্ম্যাশ পটাটো আর ফুলকপির একটা স্পেশাল আইরিশ কারি আছে, সে দুটো নিয়ে লাঞ্চে বসলাম। এক সময় দেখলাম আমি যুগযুগ ধরে খেয়েই যাচ্ছি, কিন্তু খাওয়া আর শেষ হয় না!

লাঞ্চ থেকে যখন বের হয়েছি তখন হাটাও রীতিমত কষ্টকর একটা কাজ হিসেবে অনুভুত হচ্ছিল। এদিকে রুমের ভাড়া এসেছে চার রাতের জন্য ১০০ পাউন্ড। কিন্তু এতটা আমার কাছে ক্যাশ নেই। অফিসের ভদ্রমহিলা যদিও বললো কোন সমস্যা নেই, যে কোন সময় আমি তাকে বিলটা দিলেই হলো; তবুও নিজের কাছে খারাপ লাগছিল। সবাই রেজিস্ট্রেশনের সময়ই পে করেছে, আর আমিতো উল্টা একদিন দেরী করে ফেলেছি কারন কাল যখন এসে পৌছাই ততক্ষনে অফিস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাই বের হয়ে পড়লাম এটিএ