আমাদের জীবনে আমাদের সামনে অনেক সময় এমন কিছু ঘটনা ঘটে, যেগুলি হয়তো নিতান্তই সাধারণ ঘটনা; কিন্তু সেই ঘটনাগুলিকে যদি একটু গভীরভাবে চিন্তা করা যায়, হয়তো সেই ঘটনাগুলির অন্তর্নিহিত অর্থই অসাধারণ হয়ে দাড়ায়! আমার কাছে এই ঘটনাটি তেমনই একটি ঘটনা...
সেদিন আমার গন্তব্য গাবতলী, যেটি ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত একটি বাসস্ট্যান্ড। ব্যক্তিগত প্রয়োজনে দূরপাল্লার একটি বাসের অ্যাডভান্স টিকেট কেটে রাখাটা জরুরি। একটি লোকাল বাসে উঠে পড়লাম গাবতলী যাওয়ার উদ্দেশ্যে। গাবতলীর দূরত্ব তখন আর বেশি দূর নয়। বাস ভর্তি যাত্রী। সিট পাওয়ার আশা ছেড়ে দিলাম। বাসের দরজা দিয়ে ঢোকার সময় একেবারে প্রথম সিটের একজন যাত্রী নেমে গেলেন বলে খালি সিটটিতে বসে পড়লাম। মাঝপথে লোকাল বাসে খালি সিট এখন দুর্লভ বিষয়ে পরিণত হচ্ছে।
যা হোক, লোকাল বাসের সামনের দিকে ড্রাইভারের পেছনে ও রেগুলার সিটের মাঝে আড়াআড়ি একটি বাড়তি সিটের ব্যবস্থা থাকে, যাতে চার থেকে পাঁচ জন যাত্রী বসতে পারে। সেই সিটে বসা দেখলাম একজন মধ্যবয়সী মহিলা। পড়নে ময়লা জীর্ণ কাপড়; লালচে কালো শাড়ি এবং হলুদ ব্লাউজ। চেহারা ও পোষাকে পরিস্কার দারিদ্রতার ছাপ। হয় সে কোন বাড়িতে কাজের বুয়া হিসেবে কাজ করে, নয়তো গার্মেন্টস কর্মী (যে আজ হয়তো কাজে যায়নি), অথবা রিক্সাওয়ালা শ্রেণীর কারো স্ত্রী। আরো একটু পরই বুঝতে পারলাম, তার পাশে যে দু'টি বাচ্চা বসা, তারা তারই মেয়ে। উল্লেখ্য, তাদের পোষাকে যে দারিদ্রতার চিহ্ন কিছুটা হ্রাস পেয়েছে, সেটি ভাবলে ভুল হবে।
বড় বাচ্চাটির বয়স হয়তো পাঁচ, নয়তো ছয়; আর ছোটটি সবে কথা বলতে শিখে থাকবে। আমার দৃষ্টি আরেকটু গভীর হলো! লক্ষ্য করলাম বড় বোনটি ছোট বোনটির হাত খুব শক্ত করে ধরে রেখেছে। তার মায়ের অবর্তমানে বড় বোনটির নিজের নিরাপত্তাই যেখানে প্রশ্নের মুখে, সেখানে তাকে দেখলাম ছোট বোনটির নিরাপত্তার বিষয়ে সে রীতিমত আপোষহীন।
আমার ভাবনায় ছেদ পড়লো যখন হেলপার "গাবতলী-গাবতলী-নামেন-নামেন" বলে রীতিমত তাড়াহুড়া শুরু করে দিলো। যাত্রীদের মাঝে হেলপারের হাঁক মুহূতেই সঞ্চারিত হলো। লক্ষ্য করলাম যাত্রীর ভিড়ের চাপে বড় ও ছোট বোনের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে গিয়েছে এবং হেলপার ছোটটিকে এক হাতে ধরে আগেই নামিয়ে দিয়েছে। বেচারি নেমেই আরেকদিকে হাঁটা শুরু করে দিলো। এদিকে বড় বোনের চোখে রীতিমত আতংক জমে গিয়েছে! সে তার ছোট্ট হাত দু'টি দিয়ে ভীড় ঠেলে অবেশেষে বাস থেকে নামতে পারলো। আর নেমেই একেবারে জীবন-মরণ দৌড় দিলো ছোট বোনটির দিকে। গিয়ে হাত ধরে সোজা নিয়ে আসতো থাকলো তাদের মায়ের দিকে, যে এতক্ষণে বাস থেকে নেমে খালি জায়গায় দাড়িয়েছেন।
বড় বোনটি ছোট বোনটিকে বলছে- "তোকে না বলছি, একা একা হাইট্টা যাইতে হয় না! সবসময় আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকবি, বুঝছস? যদি গাড়ির নিচে পড়তি, তখন কী হইতো? আর কখনো যাইবি?"
ছোট বোনটির রোগা শরীর এমনিতেই ছোট, তার উপর বকা খেয়ে সে যেন আরো ছোট হয়ে গেলো! সে কী বুঝলো, জানি না; তবে দেখলাম সে না-সূচক একটা ভঙ্গি করে আস্তে আস্তে মাথাটা নাড়াচ্ছে! অতঃপর তারা তিন জন তাদের গন্তব্যের দিকে হাঁটা শুরু করলো। আমিও কিছু মুগ্ধাবিষ্ট মুহূর্তু সেদিকে অপলক চোখে তাকিয়ে থেকে টিকেট কাউন্টারগুলির দিকে এগিয়ে যেতে থাকলাম।
সাথে সাথে আমার চিন্তাও এগিয়ে যেতে থাকলো। ভাবলাম, এই যে দু'টি বাচ্চা, যারা এখন পর্যন্ত হয়তো এক বেলা ভালো করে পেট ভরে খায়নি, ভালো কোন জামা-কাপড় পরেনি, ভালো কোথাও ঘুরতে যায়নি, ভালো একটি পারিপার্শ্বিক পরিবেশ পায়নি, পরিবারের কাছ থেকে আর আট-দশটা নূন্যতম পরিবারের মতো ভালো কেয়ার পায়নি, এই ক্ষুদ্র বয়সেই তাদের মধ্যে কী অকল্পনীয় মমতা, গাঢ় ভালোবাসা; ছোট বোনের প্রতি বড় বোনের কী অপরিসীম দায়িত্বশীলতা এবং বড় বোনের প্রতি ছোটবোনের কী বিয়ন্ড কোয়েশ্চেন শ্রদ্ধাবোধ!
তাদের এই নিখাদ, নিটোল, নিষ্পাপ ভালোবাসার ক্ষুদ্রতম একটি অংশও যদি পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের মাঝে সত্যিকারেই থেকে থাকে, তাহলে হয়তো পৃথিবী থেকে একদিন সত্যিই হিংসা, বিদ্বেষ, ঘৃণা, ক্রোধ, লোভ, ঈর্ষা, যুদ্ধ, ধ্বংস, প্রতিশোধ ইত্যাদি নেতিবাচক শব্দগুলির অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে! হয়তো একদিন সত্যিই গড়ে উঠবে নতুন একটি পৃথিবী; সম্পূর্ণ নতুন, সম্পূর্ণ নিষ্পাপ!
কিন্তু অমন ভালোবাসার ক্ষুদ্রতম অংশ সত্যিই সবার মাঝে আছে কি???
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০১০ রাত ৩:১৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



