somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কোরবানির ঈদে শিশুদের ক্ষেত্রে তিনটি সাবধানতা..

১৯ শে ডিসেম্বর, ২০০৭ রাত ১২:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আলভি ক্লাস টু-এর ফাইনাল পরীক্ষা শেষ। সে এবার ক্লাস থ্রিতে উঠবে। সে যে আবার নতুন একটি ক্লাসে উঠবে, এ কথা ভাবতেই তার মন ভালো হয়ে যাচ্ছে। আর তার চেয়েও বড় কথা হলো, এবার এই কোরবানির ঈদে তার পড়ালেখা নিয়ে কোন টেনশন নেই। এবার আগেরবারের চেয়ে কয়েকদিন আগেই তাদের কোরবানির গরু কেনা হয়ে গেছে। এইতো সেদিন মজা করতে করতে মনের আনন্দে বাবার সাথে কোরবানির গরু কিনতে গিয়েছিলো আলভি; আসলে যাবার খুব একটা ইচ্ছে তার ছিলো না; কিন্তু বাবা সাধাতে সে রাজি হয়েছে। রাজি হবার অবশ্য আরেকটি গোপন কারণও রয়েছে; সেটি হলো, তাহলে সে বন্ধুদেরকে বড় গলায় বলতে পারবে যে, এবার সে গরুর হাটে গরু কিনতে গিয়েছিলো।

এবারই সে প্রথমবারের গরুর হাটে গেলো এবং এরই মধ্যে সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে যে, আর কখনো গরুর হাটে যাবে না। তার কারণ চারটি:
এক. গরুর হাটে অনেক বাজে গন্ধ থাকে। সবসময় নাক ধরে রাখতে গিয়ে সে খুব বিরক্ত হয়ে গেছে। প্রায় বমিই চলে এসেছিলো তার।
দুই. তার ধারণা ছিলো হাটে গিয়েই গরু কিনে চলে আসতে পারবে। কিন্তু বাবার মোটে গরু পছন্দই হয় না; যেটা হয় সেটা আবার দামে পোষায় না! বড্ড জ্বালা, হাটতে হাটতে আলভির পা দু'টিই ব্যথা হয়ে গিয়েছিলো। একটা গরু কিনতে লেগে গেলো তিনটা ঘন্টা, আশ্চর্য! তার উপর আবার পায়ের চামড়ার স্যান্ডেলটায় অসাবধানে লেগে গেছে গোবর; এখানে গোবর, সেখানে গোবর, পরিস্কার করার কি কেউ নেই নাকি!
তিন. তার সব সময় মনে হয়েছে যে, গরুগুলি এখনই তাকে গুঁতো মারতে আসবে! সারাক্ষণ কি এমন আতঙ্কের মধ্যে থাকা যায়!
চার. এটিই সবচেয়ে বড় কারণ, তা হলো গরু দেখতে দেখতে সে হঠাৎ দেখে তার বাবা নেই! সে হারিয়ে গেছে! ভাগ্যিস বুদ্ধি করে সে আর সেই জায়গা থেকে সরেনি; কিছু সময় পরই তার বাবা তাকে খুজে পেলো। অবশ্য তার অন্যমনস্কতার জন্য বাবা ভীষণ বকেছিলো।

অন্যদিকে, তার সবচেয়ে বন্ধু লামিয়ার মন একটুও ভালো নেই। তার বারবার মনে পড়ে যাচ্ছে গতবারের একটি বিশেষ স্মৃতির কথা। এবার সে একটি বিষয় নিয়ে খুবই চিন্তিত। তার চিন্তা জুড়ে রয়েছে বাবা কি এবার আগের বারের মতো একটা ছাগলই কিনবে? নাকি গরু কিনবে? কিনলে কত টাকার গরু? গতবার তার কয়েকজন বন্ধু তাদের ছাগল কোরবানি দেয়া নিয়ে খুব উপহাস করেছিলো তাকে। সেই বন্ধুদের সবার বাসাতেই কোরবানি দেয়া হয়েছিলো গরু। তাও রক্ষা যে, অন্তত কোরবানি তো দেয়া হয়েছিলো; যদি তাও না দিতো তাদের বাসায়, তাহলে যে কী হতো! বন্ধুদের সামনে মুখ দেখানোটাই লজ্জার বিষয় হয়ে দাড়াতো! সমস্যা যদি ওটুকু হতো, তাহলেও চলতো; কিন্তু সমস্যা আরো আছে। সেটি হলো গরুর দাম। গতবার তার বন্ধুদের মধ্যে ভীষণ প্রতিযোগিতা চলছিলো গরুর দাম নিয়ে। একেকজন যে দাম বলেছে, তা দিয়ে অনায়াসেই দুই-চারটা গরু কেনা যায়! সে ঠিক বুঝতে পারছে না যে, বলার সময় সে দাম বাড়িয়ে বলবে কিনা; আবার মনটাও তার শুধু খচখচ করছে যে, মিথ্যা বলাটা বোধহয় ঠিক হবে না। অবশ্য বাবাকে সে বলেছে এবার গরু কিনতে; তাছাড়া, গরুতে তো মাংশও বেশি পাওয়া যায়!

তাদের আরেক বন্ধু সিফাতকে এবার কোরবানির গরু জবাই করার সময় সামনে রাখা হচ্ছে না। কারণ গতবার যা ঘটেছিলো, তাতে এবার তাকে জবাইয়ের স্থান থেকে পাচশ’ হাত দূরে রাখাই সঠিক হবে। গতবার সিফাত বায়না ধরলো যে, সে গরু জবাই দেখবে। তাকে তার ছোট মামা মানা করলো যে, বাচ্চাদের জবাই করার সময় থাকতে হয় না। কে শোনে কার কথা, গরু জবাই তাকে দেখতেই হবে; ঈদ কোরবানির, অথচ গরু জবাই দেখবে না, তা কি করে হয়! যা হোক, ঈদের নামায শেষে গরু জবাই করার স্থানে তাকে নিয়ে যাওয়া হলো। জবাই করার পর অনেক রক্ত বের হলো; এমনকি, যিনি জবাই দিয়েছেন, তার সাদা পাঞ্জাবিও রক্তে লাল হয়ে গেলো। এই দৃশ্য দেখে প্রায় অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার অবস্থা সিফাতের। চেহারা পুরো ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিলো তার; আর কেমন আটোসাটো হয়ে গিয়েছিঅে সে। কথা বলাই প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিলো সে। বাইরে কোথায় যেতেও সে চায়নি। সেই ঈদটি তার সারাদিন বিছানায় শুয়েই কেটেছিলো। তাই এবার আর তাকে রাখা হচ্ছে না গরু জবাইয়ের স্থানে।

আসলে উপরের তিনটি বিষয়ের একটিও হালকা ভাবে দেখার কোন সুযোগ নেই। প্রথমটি থেকে বোঝা যাচ্ছে, শিশুদের কোরবানির গরু-ছাগলের হাটে না নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। অসাবধানতায় শিশু হারিয়ে যেতে পারে। তাছাড়া শিশুর মনে যদি প্রথমেই কোরবানির হাটের প্রতি বিতৃষ্ণা চলে আসে, তাহলে সেটি তার মনের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
দ্বিতীয় বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়। কোরাবানির পশুর দাম নিয়ে অপ্রয়োজনীয় ও হাস্যকর অহংকার অনেক বড় মানুষের মধ্যেও দেখা যায়; তারই প্রভাব ওই শিশুদের মাঝেও পড়েছে। কোরবানি বিষয়টির আসল মর্ম যারা বোঝে না অথবা বুঝতে চায় না, তাদের মধ্যেই এই মূল্য নিয়ে বড়াই করার প্রবণতা দেখা যায়। শিশুদের মন ফুলের মতো পবিত্র। তাদের মনে যদি ঈদুল আযহার মতো পবিত্র একটি বিষয়ের কোরবানির পশুর দাম নিয়ে প্রতিযোগিতা দেখা যায়, সেটি অবশ্যই তাদের জন্য সুস্থ মানসিকতার লক্ষণ হবে না। শিশুরা অনেক কিছুই বড়দের মতো করে বোঝে না। তারা তাদের চারপাশের বড়দের কার্যকলাপ থেকে অধিকাংশ বিষয়ই শেখে। তাই, অভিভাবকদের উচিত হবে কোরবানির আসল মাহাত্ম শিশুদেরকে গপ্লের আকারে বুঝিয়ে দেয়া এবং কোরবানির পশুর মূল্য যে তেমন মূল্যবান কোন বিষয় নয়, সেটিও তাকে জানিয়ে রাখতে ভুলে যাওয়াটা উচিত হবে না।
আর সবশেষের বিষয়টি পুরোটাই মানসিক। শিশুদের মন স্বভাবতই কোমল ও নরম। বেশিরভাগ শিশুর জন্যই করবানির পশুর জবাইয়ের দৃশ্যটি স্বস্তিকর নাও হতে পারে। ছুড়ি দিয়ে কোরবানির পশুর গলা কাটার পরিচিত দৃশ্য ও সেখান থেকে ফিনকি দিয়ে বের হওয়া রক্ত শিশুদের সাদা মনে কালো দাগ ফেলতেই পারে। তাই, শিশুদের মনস্তত্ত্বের বিষয়টি মাথায় রেখে তাদেরকে কোরবানির পশু জবাই করার সময় দূরে রাখাটা শিশুর প্রতি যত্নবান ও আদর্শ অভিভাবকদের দায়িত্বের মধ্যে পড়া উচিত। শিশুদেরকে ঈদে শুধু আনন্দ আর অনেক অনেক আনন্দ পেতে দেয়া বড়দের অবশ্য-দায়িত্ব। শিশুদের ঈদের আনন্দে যাতে একটুও ঘাটতি না হয়, সে বিষয়টি লক্ষ্য রাখার দায়িত্ব অবশ্যই সেই বড়দেরই।

সবশেষে, সব শিশুদের আগাম ঈদ মোবারক!

পুনশ্চ: ১৬ ডিসেম্বর ২০০৭ তারিখে 'যায়যায়দিন'-এ প্রকাশিত (সামান্য এডিটেড)।
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×