প্রথম যেদিন কথা হল তার সাথে সে ছিল ভীষণ শান্ত কিন্তু তার নির্লিপ্ত চোখজোড়া থেকে মায়াবী এক আলো বের হচ্ছিল। এই ঝলকানিটা হয়তো তেমন গ্রাহ্য করবার মতো নয় কিন্তু তার বিচ্ছুরণে সেই মুহুর্তে আমি প্রায় ধসে যাচ্ছিলাম। ধসে যাবার সময়ে নিজেকে কঠিনভাবে বাঁধবার কথা মনে হয়েছিল এবং পুরোনো স্মৃতিগুলো কাঁটার মতো এসে চোখে বিঁধছিল। সেদিনের ঐ বিকেলে তার সামনে থেকে চলে যাবার কোনো উপায় আমার ছিলনা, যেমন আজও নেই। মনে হচ্ছিল পা দুটোকে কেউ যেন আঠা দিয়ে লাগিয়ে রেখেছে। একটা অদ্ভুত অনুভূতিতে চোখ বুজে আসছিল এবং নিজেকে অসাধারণ মনে হচ্ছিল কারণ যার সামনে বসে ছিলাম সে ছিল অনন্যসাধারণ।
অনেকটা গম্ভীর প্রকৃতির হলেও নিশ্চিত জানতাম আমার চোখের দিকে তাকিয়ে সে তরুণ হয়ে উঠেছিল , ইচ্ছে করছিল আমার হাত ধরে সারা শহর ঘুরে বেড়াতে। কিন্তু সে কথা সে বলছিল না এবং তার মনোভাব বুঝতে পারলেও নিজেকে সংযত করে রাখছিলাম। বিশেষ করে নিজেরও যখন ভীষণ ইচ্ছে করছিল তার সাথে ঘুরে বেড়াতে। কিন্তু আমি কিছুতেই নিজেকে প্রকাশ করতে পারছিলাম না, হয়তো চাইছিলামও না।। মানে আমার মধ্যে যে দুজন ছিল তাদের একজন চাইছিল প্রকাশ করতে ,আর অন্যজন তেমন কিছুই চাইছিলনা ক্লান্তিতে তার সারা শরীর ভেঙ্গে আসছিল। তবু সেই বিকালে কমলা রং এর আলোটা জানালার শার্সি গলে গালে এসে পড়তেই তাকে একটা বাট খোলা তলোয়ারের মতো দেখাচ্ছিল। আর সে তখন ঝলসাচ্ছিল গনগনে কয়লার আঁচে। সেই আঁচে উত্তপ্ত হয়ে উঠলাম, সারা শরীর মোমের মতো গলে পড়তে লাগল। কে যেন কথা বলছিল ভেতর থেকে। তার উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ ত্বকে এসে বিঁধল ,আর আমি কেঁপে কেঁপে উঠলাম। যখন কথা বলছিলাম চারপাশে কারা ছিল তা যেন ভুলে গেলাম । বিকালের আলোটা নিভতেই মনে হল সেও কেমন যেন নিস্প্রভ হয়ে পড়ল। একটু একটু করে তার নীলাভ ডানায় বিষাদের চিহ্ন জেগে উঠল। তার কণ্ঠ থেকে খুলে নিলাম বিষন্ন সুরটি। সেও নিজেকে খুলে দিল।
শেষ বিকেলের আলোয় দুজন আগন্তুক ভীষণ ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠল,তারা পরস্পরকে স্পর্শ করল যতটুকু একজন বন্ধু অন্যজনকে করতে পারে। তাদের দুজনের মধ্যে যে ভারটা ছিল তা গলে জল হয়ে গেল। ঐ মুহূর্তটি এত স্রোতস্বিনী হয়ে উঠল যে তার প্রচণ্ড শক্তি আমাকে ক্ষত-বিক্ষত করে তুলল, চোখ ফেঁটে গড়িয়ে পড়তে লাগল ক্ষারীয় জলধারা। মনের মধ্যে জমে থাকা বিষাক্ত জমাট ভেঙ্গে চূর্ণ । মনে হচ্ছিল অচেনা কোনো আলোয় আবৃত হয়ে আছি। যার বিক্ষিপ্ত রশ্মির স্পর্শে কোমল হয়ে গলে পড়ছিলাম। আর ভেতরে হচ্ছিল তাইফুন। প্রাচ্যদেশীয় ঝরো হাওয়ায় শরীর থেকে শাখা-প্রশাখা বিছিন্ন হয়ে গেল। নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে এলাম কাঁচের ঘরটি থেকে। খুব দ্রুত পা চালিয়ে ঐ স্থান ছেড়ে চলে এলাম। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হলনা, ভেতরে দেখা দিল প্রচণ্ড অস্থিরতা। তার শক্তি এত তীব্র যে, ভেঙ্গে টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়লাম। তখন দেখি আমার হাত কই? পা কই? চোখ কই? চুম্বকীয় বিকর্ষণে সব ছিটকে গেছে। ভেতর থেকে তৈরি ঝরো হাওয়ার তাণ্ডবে বিধ্বস্ত প্রকৃতি।
ভেতরে যে আরেকজন, সে ভয় দেখাচ্ছে; বলছে-দ্রুত অন্যত্র চলে যেতে। কিন্তু আমার পা যে আঠার মতো জোড়া লেগে আছে। কোনোভাবেই তাকে স্থানচ্যুত করতে পারছিনা। আবারও অপেক্ষা করছি ত্রিকোনাকৃতি কাঁচের ঘরে। জানি সে চলে গেছে কিন্তু আবার হয়তো ফিরে আসবে। সেদিনের সেই মুহূর্তটি ভেঙ্গে দিয়েছে সমস্ত জড়তা। ছিটকে পড়া দেহখণ্ডগুলো জোড়া দিয়ে যে অবয়বটি পেলাম তার সবকিছুই নতুন। তার স্পর্শ,গন্ধ,রূপময়তা পুরাতন আমাকে ভুলিয়ে দিল। মনে জেগে উঠল উৎসবের রং। এতদিন যে ক্ষত থেকে অবিরত রক্ত ঝরতো সেখান থেকে আজ অঝোর ধারায় বৃষ্টি ঝরছে। জলে ডুবে যাচ্ছি আর শরীর থেকে জল কাটবার জন্য পাখনা গজাচ্ছে। জানিনা সে ফিরে আসবে কিনা কিন্তু তার গুরুত্বও যেন কমে গেছে। তার সাথে আর যদি দেখা নাও হয় তবু যেন কিছু যায় আসেনা। মনের ভেতর যে উতুঙ্গতার সৃষ্টি হয়েছে তা আমাকে মৃত্তিকার মতো সয়ম্ভু করে তুলেছে,শরীরে গজিয়েছে ঝলমলে ডানা, যার উড্ডীয়মানতা উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। স্রোতস্বিনী নীল জলে ভেসে যাচ্ছি ,আবার জেগে উঠছি লোকালয়ে।
সেদিনের সেই শেষ বিকেল,তার মৃদু আলো,প্রচণ্ড তাপ উদগিরণ, নিগুঢ়তা আমাকে জাগিয়ে তুলেছে। অগ্নুৎপাতে বিকশিত হয়েছে তাপদগ্ধ মৃত্তিকার ,যার শরীরে আঁকা উল্কি, দুই চোখে মুদ্রিত স্বপ্ন, মনে ক্রোয়েটজার সোনাটা।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা জুন, ২০০৯ রাত ১০:৩২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


