নোমান বিন আরমান : প্রগতির সংজ্ঞা কী, বিশেষত হিজাব প্রশ্নে যখন প্রগতিকে দাঁড় করানো হয় তখন কী হবে _ প্রগতি ও প্রগতিশীলতার সংজ্ঞা। উত্তর আমার জানা নেই। যে লেখাটিকে কেন্দ্র করে এই আলোচনার জন্ম তাকে যদি জিজ্ঞেস করি তখন জানব, বে-আবরু। বে-আবরুই প্রগতি ও প্রগতিশীলতার বড় একটি মানদণ্ড। "মিডিয়াপাঠ : হিজাব সৌন্দর্যের নাকি সর্বনাশের" http://www.numanbinarmansyl.blogspot.com মিডিয়াওয়াচের ৪৬তম সংখ্যায় জব্বার হোসেনের এই লেখাটি অন্তত সে উত্তরই দেয়।
হিজাব একটি ধর্মীয় নির্দেশনা। একে অমান্য করার সুযোগ অন্তত ধার্মিকদের নেই। জব্বার যদি বলেন ধর্মই মানবেন না, তখন অবশ্য তাকে কিছু বলার থাকে না।
কিন্তু হিজাবের মধ্যে তিনি সর্বনাশের যে ছায়া দেখেছেন, এ নিয়ে দুয়েক কথা বলা যায়। পাঠকরা বিরক্ত না হলে তার লেখার একটি উদ্ধৃতি এখানে দিতে চাচ্ছি :_ “২০১০ সাল এখন। বিজ্ঞানে, শিল্পকলায়, দর্শনে সারা দুনিয়া এগিয়ে। এই যখন সারা দুনিয়ার পরিস্থিতি, তখন আমাদের মিডিয়ার যেকোনো কূপমণ্ডুকতা, সীমাবদ্ধতা, সংকীর্ণতা দেখে হতাশা তো জাগেই, বেদনাও বোধ হয়।" পত্রিকা ও টিভি প্রোগ্রামে হিজাব নিয়ে আলোচনায়ই এই বেদনা ও হতাশা জব্বারের। কেন? প্রশ্নটি অবশ্য তাকে করা যায়।
জব্বারের বেদনা ও হতাশার পরিমাপ দেখলে যেকারো মনে হতে পারে, টিভির চব্বিশ ঘণ্টার প্রোগ্রাম আর পত্রিকার সব পৃষ্ঠাজুড়েই মনে হয় শুধু হিজাব আর হিজাব। আদতে কি তাই? পারসেন্টিসের হিসেবও যদি করা হয়, তবে কত পারসেন্ট হবে হিজাবের উপস্থিতি। ২ পারসেন্টও কি হবে? আমার তো মনে হয় না। প্রথম সারির দশটি দৈনিক আর সবগুলো টিভি চ্যানেলের হিসেবও যদি করা হয়, তবু দেখা যাবে এক ইসলামিক টিভি ছাড়া আর সব প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় হিজাব তো একটি অংশমাত্র _ পুরো ইসলামেরই পাঁচ পারসেন্টও উপস্থিতি নেই। টিভি চ্যানেলগুলো বিশেষ দিবস ছাড়া চব্বিশ ঘণ্টায় পাঁচ বার আযান শুনিয়ে আর পত্রিকাগুলো (প্রথম আলো ও আমাদেরসময় ছাড়া) সপ্তায় ধর্মের জন্যে এক পৃষ্ঠা বরাদ্দ দিয়ে তাদের "ইসলামবান্ধব" পরিচয়ের দায়িত্ব আদায় করছে। ইসলামের জন্যে প্রিন্ট ও ইলেকট্রিক মিডিয়ার এইটুকুন "মহানুভবতা" যতটা না আন্তরিকতার তার চে' বেশি বাণিজ্য ও নিজেদের "ধার্মিক" পরিচয়ের স্বার্থে। বাণিজ্য আর স্বার্থের এই ছাড়টুকুও জব্বারের সহ্য হয়নি। তিনি একেও বলছেন, কূপমণ্ডুকতা, সীমাবদ্ধতা, সংকীর্ণতা। তার লেখা আরেকটি লাইন পড়ুন :_ "বিশেষ করে শুক্রবার হলে এধরনের অনুষ্ঠানে টেলিভিশনের পর্দা সয়লাব হতে দেখা যায়।" তার এই বক্তব্যে ঈমান রাখলে, মিডিয়াওয়ালা ও আভিধানিকদের নিশ্চয় নতুন করে সয়লাবের অর্থ শিখতে হবে।
পত্রিকা ও টিভি প্রোগ্রামের যেটুকু সময় ইসলামের জন্য বরাদ্দ, সন্দেহ নেই হিজাব এখন সেখানে প্রধান আলোচ্য। কেনো? কারণ এই সময় সরকারের ও মিডিয়ার আলোচনায় রয়েছে ইভ টিজিং প্রসঙ্গটি। এই চলতি বছরের দশ মাসেই ইভ টিজিংয়ের শিকার হয়ে কমপে ২৩ জন মেয়ে আত্মহত্যা করেছে। ২ জন ইভটিজারদের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন। আর ইভ টিজিংয়ের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে পনেরোশর মতো। মোটামোটি ভয়াবহ অবস্থা। এমনি মুহূর্তে শিক্ষামন্ত্রণালয়ও "বোরকা পরতে বাধ্য" করা যাবে না মর্মে একটি পরিপত্র জারি করেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই হিজাব আলোচনার আলোয় চলে এসেছে। পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা হচ্ছে। দু'পক্ষই সমান তালেই কথা চালাচালি করছেন। এই লেখকেরও একটি লেখা ইতোমধ্যে কারো কারো পড়া হয়ে থাকবে। সেখানে এই পরিপত্রের ভবিষ্যৎ দেখার চেষ্টা করা হয়েছে। তার অনেকটা এখানে আনার দরকার হলেও দ্বিরুক্তি এড়ানোর জন্য বাদ দিচ্ছি। "সরকারের হিযাবনীতি : বালিকা তুমি বে-আবরু হও" শিরোনামের লেখাটি (http://www.numanbinarmansyl.blogspot.com) এই ঠিকানায় চাইলে দেখতে পারেন।
জব্বার লিখলেন, "ধর্ম পুরুষকে কখনো ভোগায় না, ভোগ করায়, নারীকে ভোগায়। সেখানে মিডিয়া আরও ধর্মবাদী হয়ে যদি পুরুষের ভোগের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, মেয়েদের পীড়নের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, তখন তো দুঃখজনকই বটে।" আপসুস তার জন্যে। তিনি ভুল বললেন এবং বালকদের মতো কথা বললেন। ভালো হতো তিনি যদি, কীভাবে ধর্ম পুরুষকে ভোগ করায়, আর ভোগায় তার তরিকা বলতেন। তখন স্পষ্ট কিছু বলা যেত। কিন্তু তিনি সেটি করেননি। তার তো জানা থাকার কথা, ধর্ম কখনো নারীকে ভোগায় না, লোভী পুরুষের লিপ্সা থেকে তাকে নিরাপদ রাখতেই ধর্ম (ইসলাম) তার এতোসব আইন করেছে। হিজাব, এই হিজাব তো নারীকে ভোগ থেকে নিরাপদের জন্যেই। কারণ পুরুষের প্রথম ভোগ হচ্ছে চোখের ভোগ। এটা কি জব্বার অস্বীকার করবেন। যারা নিজেকে ভোগাতে চায়, পুরুষের ভোগ্যপণ্য করতে চায় তাদের জন্যে ইসলামের হিজাব নয়। সে সব কিছু খুলে দিক, ঢেলে দিক _ এ তার 'স্বাধীনতা'। এমন স্বাধীনচেতা নারীই জব্বারদের কাম্য! না হয় মিডিয়ার পুরো আয়োজনেই নারীকে নগ্নভাবে উপস্থাপন করার প্রতিযোগিতার উদ্দেশ্য কী? সিনেমা, নাটকে, পণ্যে, বিজ্ঞাপনে আর অনুষ্ঠানে কেনো নগ্ন, স্বল্পবসনা হিসাবে দেখানো হচ্ছে নারীকে। আর একেই নারীদের মডেল ও ফ্যাশন বলে তালিম দেয়া হচ্ছে।
হিজাবের বিরোধিতা যারা করেন, তারা নারীকে ওয়াসওয়াসা দিতে চান যে, শুধু নারীর জন্যেই ইসলাম পর্দার আইন করেছে। এখানে তারা এটি আর বলেন না যে, এ ব্যাপারে পুরুষের জন্যে কী নির্দেশনা রয়েছে। ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় এই বিষয়টি আড়াল করে নারীকে তারা সুড়সুড়ি দেন, বে-আবরু হতে। কারণ এরা জানে, নারীকে একবার বে-আবরু করা গেলে, তাকে বিবস্ত্র করতে সময় লাগে না। উদাহরণের জন্যে এখানে কয়েক সংখ্যা আগে মিডিয়াওয়াচেই যে প্রভার জন্যে তিনি বিলাপ করেছেন, সেই প্রসঙ্গটি তাকে স্মরণ করাতে চাচ্ছি। এই প্রভা যদি রাজিবের সামনে বে-আবরু না হতো তাহলে কখনো এমন অন্যায্যভাবে সে তার সাথে শুতে পারতো না। শুতো না। অথচ এই বে-আবরু হওয়ার তালিমই তো বিশ্বব্যাপী মিডিয়াগুলো দিয়ে যাচ্ছে। যাকে জব্বার বলছেন, "সভ্য দুনিয়া"। আর এই বে-আবরু ও বিবস্ত্র হওয়াকেই তারা প্রগতিশীলতার নামে মহিমান্বিত করার চেষ্টা করছেন।
জব্বার লিখলেন, "এই পোশাক বা বাড়তি আচ্ছাদন আমাদের দেশের প্রকৃতি, সংস্কৃতির সঙ্গে মানানসই তো নয়ই, বরং একটি বিশেষ উদ্দেশ্য প্রকাশ করে। উদ্দেশ্যটি নারীকে বন্দী করা, পিছিয়ে রাখা, এগোতে না দেওয়া"। বাড়তি আচ্ছাদন বলতে হিজাব-বোরকাকেই নির্দেশ করছেন জব্বার। কিন্তু এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে তার যে সিদ্ধান্ত, এযে কতটা পিছিয়ে থাকার নজির তা বোধ করি ব্যাখ্যার দরকার নেই। প্রশ্ন, পোশাক কি কাউকে বন্দী করতে পারে? পোশাক বন্দিত্ব! কৌতুক আর কাকে বলে! কিন্তু আমি দুঃখিত যে, এই কৌতুক হাসির হওয়ার চেয়ে কৌতুককারীকেই হাস্য করছে বলে। প্রিয় জব্বার, রিলাক্স। রিলাক্স।
হিজাবকে বাদ দিতে চাইছেন, কারণ জব্বার যেটি বললেন, আমাদের নারীরা তো আরবের নারী নয়, এটাও বুঝতে হবে। হিজাবের অপরাধ তাহলে, সে 'আরবের'। এই অপরাধে গ্রহণ করা যাবে না তাকে? প্রশ্ন, আমাদের সংস্কৃতিটা তাহলে কি? একটা গানের চিত্রায়ন করতে যেয়ে চৌদ্দবার মেয়েছেলের চুমোচুমি, ক্রমশ নেংটা হওয়ার তালিম আর ... আর বললাম না 'সভ্য দুনিয়ার' এইসব আমাদের সংস্কৃতি? জব্বাররা যে মিডিয়ার বন্দনা করেন, সেসব তো এই সংস্কৃতিই আমাদের হজম করাতে চাইছে।
জব্বার বড়ো খেপেছেন আমারদেশ’র নারী পাতায় কেনো হিজাবকে 'সৌন্দর্য' বলা হলো এনিয়ে। ওই লেখায় হিজাব পরা নারীদের ছবি উপস্থাপনকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেছেন তিনি। লিখেছেন, "মনে হচ্ছে এরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নারী। তারা হিজাব পরেছে বলে সবাইকে তাই করতে হবে।" তার এই ভুল ব্যাখ্যা যে অনিচ্ছাকৃত বা অসর্তকতায় এমন না। জেনেবুঝেই বিষয়টিকে তিনি ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। আর এই অংশকেই মিডিয়াওয়াচ ফোকাস করেছে। কেনো? তার লেখার গুরুত্বপূর্ণ অংশ এটি? নাকি, তার ভুলকে নির্দেশ করতেই এমনটা করা হয়েছে।
নারীকে হিজাবে-বোরকায় ঢেকে নিলেই নারী নিরাপদ এমনটা কিন্তু ইসলাম একবারও বলেনি। কারণ একটি বিষয় নিয়ে কোনো কর্মসূচির নাম ইসলাম নয়। ইসলাম জীবনের সামগ্রিক একটা বিষয়। তাই এখানে পুরুষকেও সে দায়িত্ব দিয়েছে। আইন করেছে কোনো পুরুষ যেন অন্য নারীর প্রতি চোখ তুলে না তাকায়। এই চাওয়াটাকেও 'জিন' (ভেবিচার) বলে গণ্য করা হচ্ছে। এই কঠোরতা নারী-পুরুষের স্বাভাবিক বিকাশ আর শুদ্ধতা ও নিরাপত্তার জন্যেই। একে ভুল বোঝা ভুল।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই নভেম্বর, ২০১০ বিকাল ৪:৪১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



